সেগুনবনি – শাশ্বতী নন্দী

সেগুনবনি

আজ বেশ সন্ধ্যে সন্ধ্যে কলেজ থেকে ফিরেছে রোহন। সুমনা খুশি। অন্যদিন ছেলে ছাত্র পড়িয়ে, লাইব্রেরি সেরে ঘরমুখো হয় রাত করে। কারণটা কিছুই নয়, তার বউ, মিঠি, আফটার নুন শিফট সেরে বাড়ি ফেরে একটু রাতে। একা ঘরে ছেলের মন উচাটন, তাই …

সুমনা আড়ালে বলে, ‘হু, আদিখ্যেতা!

কিন্তু আজ পুরো উলটো কেস। লক্ষ্মী ছেলের মতো রোহন ফিরল যখন, পাড়ার স্ট্রীট লাইট জ্বলে ওঠে নি। তারপরেও আর এক কান্ড। ঠিক ছোটবেলার মতো ছেলেটা ‘মা’ বলে পেছন থেকে এমন জাপটে ধরেছে …

‘আরে, ছাড়, ছাড়। ধেড়ে ছেলে, এখনও ছেলেমানুষি!’

যদিও মায়ের বুকের ইয়াব্বর চাঁইটা ভাঙতে শুরু করেছে। ভাঙতে ভাঙতে একেবারে গুড়ো গুড়ো। বলে, ‘যা, গা হাত পা ধুয়ে আয়। ধান দুর্বা সব রেডি। আগে আশীর্বাদ হবে, তারপর খাওয়া দাওয়া’।

রোহনের আজ জন্মদিন, ছাব্বিশ বছর পেরোল ছেলে। সুমনা আগের মতোই ঘেমে নেয়ে সারা বেলা রান্নাবান্না করেছে। তবে ভেতরে ভেতরে ভয়, কে জানে মিঠি এসেই আইটেমগুলোকে যদি বাতিল করে দেয়? ও মেয়ের সবটাতেই বাড়াবাড়ি। হাত পা নেড়ে শুধু বলবে, ‘আমি বাবা, একটু অফবিট ধরণের। যা করব, সবার থেকে আলাদা’।

রোহন একেবারে স্নান সেরে নতুন পাজামা পাঞ্জাবি পরে রেডি। ‘কই মা, আশীর্বাদ টাশীর্বাদ যা করার জলদি কর। খিদে পেয়েছে ভীষণ’।

ছেলেকে দুচোখ ভরে দেখছে সুমনা। আহা, রাজপুত্র, রাজপুত্র! তারপরেই তার কড়ে আঙুলটা কামড়ে দিল। মায়ের নজর খারাপ।

আরে একী! রোহনের জন্য জন্মদিনে কেনা পাঞ্জাবির রঙ তো এমন ছিল না। শুধু পাজামাটা মিলছে! নির্ঘাৎ মিঠির কারসাজি। মাথা সঙ্গে সঙ্গে টঙ। রান্নাঘর থেকে পায়েসের বাটি ছেলের সামনে ধরে বলে, ‘দেখো, এসব এখন তোমার মুখে রোচে কি না। তোমার বউ তো এবার অন্য ভাবে জন্মদিন পালন করবে বলে গেছে। হয়তো দশতলা বাড়ি সমান কেক আসবে। এইসব পায়েস টায়েস …

দূর থেকে পিটপিট করে তাকাল রোহনের বাবা, আনন্দ। আবার এক রাউন্ড কালবৈশাখি উঠবে কি? সকাল থেকে তো দফায় দফায় চলেছে। দুদিন ধরেই অবশ্য মন বলছিল, আসছে, সে আসছে। অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল।

সকালবেলায় সবে কাগজটা নিয়ে ইজিচেয়ারে সে বসেছে, হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল সুমনা।

-কী বলেছিলাম, তোমার আহ্লাদী বউমনিটি আজও দেরি করে ফিরবে? বাহানা দেখাবে, অনসাইট কল, মিটিং, ইত্যাদি ইত্যাদি। –সুমনার চিৎকার একেবারে সি শার্পে, কান এ ফোঁড় ও ফোঁড় হয়ে গেল আনন্দর।

 – দেখো মেসেজে কী লিখেছে। – মামনি, কেক শপ থেকে একটা কেক ডেলিভারি দিয়ে যাবে। পেমেন্ট ডান। আমার ফিরতে দেরি হতে পারে। তবে আমি ফেরার পরই যেন কেক কাটা হয়। তোমার ছেলে কিন্তু ভীষণ লোভী, কেকের সাইডগুলো যেন চেটে না ফেলে’।

সুমনার আশি কেজির শরীর থরথর কাঁপছে। – ‘বোঝ, আমার ছেলেকে বলে লোভী। আর ও নিজে? ডিমের বড় কুসুম দেখলেই বরের পাত থেকে খপাৎ করে তুলে খায় না! আর আমাকে সব সময় কনফারেন্স, মিটিং এর গল্প শোনাচ্ছে। আরে বাবা, আমার ছেলেও টপার, নরেন্দ্রপুরের। এখন কলেজের অধ্যাপক। কম কীসে?’

আনন্দ খবরের কাগজের পৃষ্ঠায় মাথা গলিয়ে দিয়েছিল। ওটাই নিরাপদ আশ্রয়। স্ত্রী যাই বলুক, মিঠি বড্ড ভাল মেয়ে। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, ছটফটে একটু ঠিকই, তবে কী সুন্দর বাবি বাবি বলে তাঁকে ডাকে, সিগারেট ফিগারেট নিয়ে শাসনও চালায়। আহা, এমন মেয়েরই তো শখ ছিল।

-এই যে শ্বশুরবাবা, – সুমনার দাঁত খিঁচুনিতে এবার হাত থেকে খসে পড়ল খবরের কাগজ। – ও, মহারানীর নিন্দে মন্দতে তো তোমার আবার গায়ে ফোস্কা পড়ে। বর আর শ্বশুরকে তো তিনি মিষ্টি কথা দিয়ে … যাক গে, আমিই শুধু খারাপ, কারণ আমি তার কথায় ওঠা বসা করি না। ওই সব মাম মাম টাম মামে এ ভবি ভোলে না, বুঝলে?’

মাটি থেকে কাগজটা তুলবে কি তুলবে না, ভাবতে থাকে আনন্দ। ভেতরের পৃষ্ঠাগুলো হাওয়ায় পত পত উড়ছে। ঝুঁকে একটা হাত আলতো এগিয়ে দিয়েছে সবে, সাঁ করে বেরিয়ে গেল আর এক রাউন্ড গুলি, একেবারে কান ঘেঁষে। -‘এই যে তোমাকে বলছি। সংসার সংসার করে জান দিলাম এতকাল, এখন আমি ফ্যালনা, তাই তো?’

-এ বাবা, তুমি ফ্যালনা? কে বলল? – আনন্দ মিনমিন করে বলতে বলতে এগোতে থাকে দূরে সরে যাওয়া পৃষ্ঠাটার দিকে। আর একটু, আর একটু। প্রায় হামাগুড়ি দিতে থাকে সে এবার। আয়ত্তের মধ্যে আসতেই হাত লম্বা করে বাড়িয়ে দিল, খপাৎ। ব্যস, শান্তি। পৃষ্ঠাটাকে ধরে ফেলেছে। হাসি হাসি মুখে তাকাল – কী যে বল না, তুমি ছাড়া আমার বলে চলেই না।

-অ্যাই চুপ, মিথ্যুক কোথাকার। – সুমনার কান্না মেশানো হুঙ্কার। – হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আনন্দ থ।

আজকাল প্রায়ই এমন করে । কী যে হল? তবে তিনি জানেন ওর গন্তব্য এখন কোথায়? ওই যে বাড়ির পেছনে বাগান, সেখানে যে সেগুন গাছ, ওর নীচে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে এখন। নিজের মনে বিড়বিড় করবে, পর্বত প্রমাণ অভিমান ওগড়াবে, তারপর সব শান্ত।

যেদিন হাসপাতাল থেকে রোহনকে কোলে নিয়ে ঘরে এসেছিল, ওই সেগুন গাছটাও সঙ্গে আসে। হাসপাতাল থেকেই হাতে ধরিয়ে দেয়। বলে, ‘এই শিশু গাছটাকেও সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে বড় করবেন’। সেই শিশু সেগুন সত্যিই এখন ডালপালা ছড়িয়ে মানুষ সমান বড়। কত দালাল রাতদিন ঘুরছে, গাছটার অনেক দাম দিয়ে গেছে, বাগান থেকে কেটে নিতে চায়, সুমনা দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়ে বলেছে, ‘আমার অত অভাব নেই, নিজের সন্তানকে বেচে টাকা নিতে পারব না’।

(২)

রোহন মা-কে জড়িয়ে ধরে, ‘পায়েস! মাই ফেবারিট। খাব না মানে? এই তো হা করছি, দাও খাইয়ে। পায়েসে বেশি করে মিষ্টি দিয়েছ তো?’

তখনই হই চই করে ঘরে ফিরেছে মিঠি। পেছন পেছন একগাদা লোক, হাতে ইলেকট্রিক তার, টুনি বাল্ব, টেবিল, চেয়ার। মিঠির হাতেও প্যাকেটের পর প্যাকেট, ঘাম ঝরছে সারা শরীরে। বলে, ‘জাস্ট দু মিনিটে ফ্রেস হয়ে আসছি’। লোকগুলো হাতের সরঞ্জাম নিয়ে বাগানের দিকে চলে গেল, ওখানটা নাকি পরিস্কার হবে।

সুমনা গুটি গুটি এগিয়ে এসে মিঠির একটা প্যাকেটে উঁকি দেয়। ‘একী, রাখি কেন? ও কি রোহনকে রাখি পরাবে আজ? মাগো!’

আ কপাল। আনন্দর মুখও শুকিয়ে গেছে। বেশি অফবিট করতে গিয়ে মেয়েটা কি … ।

মিঠি অল্প সময়েই ফিটফাট হয়ে এসেছে। বরের দিকে তাকিয়ে বুড়ো আঙুল তুলে বলে, ‘পারফেক্ট দেখাচ্ছে তোমায়। একেবারে মায়ের নাড়ু গোপাল ছেলে। আচ্ছা, বাবি, সামনে এসো দেখি। একবার চেক করে নি। হু, ড্রেস ওকে, চলবে’।

সুমনার ঠোঁট অভিমানে ফুলছে। তার দিকে কারো নজর নেই। কেন থাকবে? সে তো ফ্যালনা। পেছন দিকে সরতে থাকে সে। তখনই হাত ধরে পথ আটকায় মিঠি। জড়িয়ে ধরে বলে, ‘মাম মাম, নতুন শাড়ি এনেছি, যাও চেঞ্জ করে এসো’।

-কোনও দরকার নেই। আমি সংসারের এক কোণে থাকা মানুষ … – সুমনার থমথমে গলা।

শাশুড়ির ঠোঁটে আলতো আঙুল ছোঁয়ায় মিঠি, ‘বাজে কথা রাখো। যাও বলছি। এত ফটো উঠবে, এই শাড়ি পরে?

-আমার কীসের ফটো? যার জন্মদিন তার ফটো। – গলার স্কেলে এখনও খাদে।

-আজ তোমারও জন্মদিন মাম মাম। তোমাদের ওই নাড়ু গোপাল আজ ক্যামেরার ফোকাসে শুধু থাকবে না, তুমিও থাকবে। কারণ আজ তোমার মধ্যেও এক নতুন মানুষের জন্ম হয়েছে। তুমি মেয়ে থেকে মা-য়ে রূপান্তরিত হয়েছ।

চমকে তাকায় সুমনা।

-হ্যাঁ গো, ঠিক বলছি। এতকাল আমরা শুধু যার জন্মদিন তাকে নিয়েই মাতামাতি করেছি, জন্মদাতা যিনি, তাঁর কথা জাস্ট ভুলে মেরে দিই। এখন থেকে অন্যভাবে ভাবব। সেদিনটা কত কষ্ট করে তুমি তোমার সন্তানকে পৃথিবীতে এনেছ বল তো। কত ব্যথা, কত কান্না চেপেছ, কিন্তু সন্তান জন্মের পর, সব কান্না হাসি হয়ে গেছে। রাইট? তাই আরও একটা কেক এনেছি আমি। প্রথমটাই মাম মাম তুমি কাটবে, দ্বিতীয়টা তোমাদের নাড়ুগোপাল।

-আর রাখি? ওগুলো কি আমাকে পরাবি? – আনন্দ ভয়ে ভয়ে বলে।

-না, এরপর আমরা সবাই যাব বাগানে। ওখানে এখন পরিস্কার টরিস্কার চলছে। এরপর টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো হবে জায়গাটা। ওই সেগুন গাছটাও সেজে উঠবে। তোমরা নাকি ওকে সন্তান ভাবো? রোহনের সঙ্গে সঙ্গেই ও এই সংসারে এসেছে? তাই বুঝি মা এক ঝুড়ি দুঃখের কথা শোনায় শুধু তাকে? কেন, আনন্দের কিছু ওর সঙ্গে শেয়ার করা যায় না? আজ তো ওরও জন্মদিন। তাই ও-ও আলোর পোশাক পরবে। ওর তলায় বসে আমরা গল্প করব, গান করব, ও সব চুপ করে শুনবে। তারপর ওকে রাখি পরাব।

-রাখি! কেন? – আনন্দ অবাক।

 -হ্যাঁ, আজ ওর গায়ে রাখি পরিয়ে একটা শপথ করব, সারা জীবন ধরে যেন ওকে আমরা আগলে রাখতে পারি। এই যে গাছ দালালদের ভিড়, সে সব থেকে যেন ওকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। ও-ও তো ছায়া দিয়ে রেখেছে আমাদের। ওর তলায় দাঁড়ালেই তো মাম মামের প্রাণ জুড়োয়। তার বিনিময়ে ও আমাদের ভালবাসা চায়, নিরাপত্তা চায়। আজ সে কাজটাই করব। কি, ক্লিয়ার করে বোঝাতে পারলাম?’

দূরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে মিঠিকে দেখছে সুমনা, মুখে ফিকে হাসি। আনন্দ একদৃষ্টে তাকিয়ে স্ত্রীকে দেখছে। তার অভিজ্ঞ চোখ বলছে, এই হাসির পেছনেও দাঁড়িয়ে আছে একগাদা স্লেট রঙা মেঘ। তবে এই মেঘে ঝড় ওঠে না, বৃষ্টি ঝরায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *