একটি বিকেল – শাশ্বতী নন্দী

একটি বিকেল

এই নিয়ে তিনদিন হল। টিফিন ব্রেক থেকে ফিরে এসেই পিউ শুনতে পায় ওর ফোন এসেছিল ডিপার্টমেন্টের ল্যান্ড লাইনে। সনৎ কমপিউটরে টাইপ করতে করতে ঠাট্টার গলায় বলে, ‘তিনদিন ধরে একটা মানুষ হন্যে হয়ে খুঁজছেন আপনাকে। এদিকে আপনিই নেই. কোথায় থাকেন? কাল থেকে ঘরে বসে টিফিন করবেন’। – বলতে বলতে ম্যানুসক্রিপ্টের ওপর ঝুঁকে পড়ে সনৎ। চোখের চশমাটাকে আর একটু ঠেলে ওপরে তোলে। আবার পিউর দিকে তাকায়, ‘কতদিন বলেছি, দিদি এবার একটা মোবাইল কিনুন। তাও কিনবেন না। ওটা থাকলে ভদ্রলোককে নম্বরটা দেওয়া যেত। উনি ডেসপারেটলি আপনাকে খুঁজছেন, গলার স্বরেই বোঝা যায়’।

সীমাদির বাড়াবাড়ি রকমের কৌতূহল। সরু ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বলে, ‘কে গো, পিউ ? পুরনো বন্ধুটন্ধু নাকি ?

কী করে বলি? – পিউ হাসে। – বুঝতেই পারছি না কার ফোন। তিনদিন ধরে আমায় নাকি খুঁজছে, আশ্চর্য! অথচ নিজের নাম বা নাম্বারটা জানিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যেত। আমি রিং ব্যাক করে নিতাম। – ও আপন মনে বিড়বিড় করে।

আরে, নিশ্চয়ই তোমার ক্লোজ কেউ। – বলেই সীমাদি দাঁত দিয়ে ঠোঁটের কোণা টিপে হাসল। – তোমায় সারপ্রাইজ দেবে বলেই … কী বলিস সনৎ ?

সনতের চোখের পাওয়ার বুঝি গড়বড় করছে। বার বার চশমা খুলছে, পরছে। অন্যমনস্ক ভাবে মাথা নেড়ে বলে, ‘হুঁ, তাই তো’।

পিউ নিজের সিটে ফিরে আসে। গতকালের একটা অর্ধেক কাজ এখনই শেষ করতে হবে। কিন্তু মন লাগছে না কেন? হাজারো ভাবনা, ছায়া ছায়া হয়ে ঘিরে আছে যেন। তিনদিন ধরে … কে ?

পাশের সিটে সনতের মোবাইল বাজছে। টাইপিং থামিয়ে গাক গাক চেঁচাচ্ছে। উফ্‌, কান একেবারে ঝালাপালা। সাংসারিক কথাবার্তা, পাবলিকলি কেউ বলে? ঘরের বাইরে যা না বাবা! তবে ছেলের মনটা সাফ। সীমাদির মতো লোকের নাড়ি নক্ষত্র টেনে বার করায় কোনও উৎসাহ নেই।

(২)

পরদিন টিফিন ব্রেকের আগেই পিউ একটু শশা আর ছোলা মাখা মুড়ি কিনে আনে। টিফিনে এই হাল্কা পাতলাই ওর মেনু। এক সময় মুখরোচক খাবারের দিকে মন ছিল, সাধ্য ছিল না। গুণে গুণে হিসেব করে চলা সংসার, মোগলাই, ফিশ কাটলেট তখন বিলাসিতা।

আজ কিন্তু প্রতীক্ষায় প্রতীক্ষায় সময় কেটে যায়। কোনও ফোন এল না। দেখা যাক, কাল কিংবা পরশু যদি আসে। এ অপেক্ষার মধ্যে, কম বয়সের একটা উত্তেজনা চলছে বুকের মধ্যে। মন্দ লাগছে না। এখন বয়স কত হল ওর? আরও চোদ্দ বছর বাকি রিটায়ারমেন্টের, হিসেব মত ছেঁচল্লিশ।

স্মৃতির পাতাগুলো এলোমেলো উড়তে উড়তে দাঁড়িয়ে পড়ল এক জায়গায়। তুহিন। মুখটা ভেসে উঠছে স্মৃতির ভাঁজে। কত বন্ধুতা দুজনের, পাশাপাশি জায়গা না পেলেই মনে হত, ধ্যুত, বাড়ি ফিরে যাই। হিস্ট্রি অনার্স দুজনেরই। সেই তুহিনই কি …

কিন্তু এ অফিসের ফোন নম্বর তো ওর জানার কথা নয়। তবে তুহিনের বোনের সঙ্গে একদিন দেখা হয়েছিল রাসবিহারীর মোড়ে। তখনই নম্বর নেওয়া দেওয়া। টিয়া এখন কলেজের অধ্যাপিকা।

সেদিন টিয়ার মুখে পিউ খুঁজে বেরাচ্ছিল তুহিনকে। বোকা বোকা ব্যাপার, তবু … বড্ড যে দেখতে ইচ্ছে করে তুহিনকে। কত বছর পেরিয়ে গেল, জীবনের গায়ে কত শ্যাওলা জমল, তবু তুহিন এখনও বুক জুড়ে। আশুতোষ কলেজ, হেঁটে হেঁটে আসত দেশপ্রিয় পার্ক। তারপর সবুজ ঘাসের ওপর থেবড়ে বসে আড্ডা।

দুজনেরই ভরসা বাবার হোটেল, তুহিন সামান্য সচ্ছল। কয়েকটা টিউশনি হাতে ছিল। যেদিন যেমন পকেটের অবস্থা, সেদিন তেমন খাবারের অর্ডার দিত। মাসের প্রথমে এক প্লেট ঘুঘনি, দুজনে পাঁচ চামচ করে ভাগাভাগি। আর শেষ মাসে চিনে বাদাম, বা শুধুই প্রজাপতি বিস্কুট উইথ চা।

সেকশন অফিসারের ঘরে ডাক পড়ল । -কী ব্যাপার মিস ব্যানার্জি, আপনি ওই ফাইলটা এখনও পুট আপ করেন নি ? ছেড়ে দিন তাড়াতাড়ি। একজন অসহায় মহিলার কেস! দেখি কোনও হোম টোম ব্যবস্থা করা যায় কিনা।

পিউ সিটে এসে ফাইল খোলে। মহিলার আবেদন পত্রটা আগেই পড়া ছিল,

আবার পড়ল প্রথম থেকে। এক বয়স্কা নারী, শেষ বয়সে এখন ঠাঁই নাড়া। অনুনয় করে লিখছেন, “সংসারে একসময় নিজেকে নিংড়ে দিয়েছি, তখন সকলের কত প্রশংসা এই আত্মত্যাগের জন্য। মা বাবা, ভাই বোনের, সকলের চোখের মণি। কিন্তু আজ সেই আমি-রই ঘর নেই। অবিবাহিতা রয়ে গিয়েছি ছোট ছোট ভাই বোনের দিকে তাকিয়ে। ভেবেছি ওরাই তো আমার সন্তান। দুঃখ এলেও ঘেঁষতে দিই না। কিন্তু আজকের পরিণতির কথা কে জানত? ভাই বোনেরা এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, বিবাহিতও। ভাইয়ের বউরা এই বয়স্কা ননদের দায়িত্ব নিতে রাজি নয়, উপরন্তু আমার ছিটেফোঁটা সম্পত্তির ভাগ লিখিয়ে নিতে চায়। বোনেরাও মুখ ফিরিয়েছে”।

ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটল পিউর, অনুজ্জ্বল, কষ্টে ভেজা হাসি। নিজের জীবনটাই যেন আঁকা ওই চিঠির পাতায় পাতায়। তাহলে কি ঈশ্বরের লেখা সব গল্পই শেষে এক হয়ে যায় ?

পিউর বাবার কারখানার চাকরিটা চলে যাওয়ার পর ওকেও পড়া বন্ধ করে সংসারের জোয়াল কাঁধে নিতে হয়েছিল। বারোশ টাকার চাকরি। তাই সই। নইলে উপোসী থাকবে চার চারটে মুখ।

তুহিন তবু সম্পর্ক রেখে চলে। কিন্তু ডব্লু বি সি এস পাশ করে কোনও একটা রুরাল পোস্টিং পাওয়ার পর সম্পর্কটাকে সে আলগা করে দিল। কষ্ট হয়েছে মানতে। তবু শেষমেশ পেরেওছে। তুহিনের স্ট্যাটাসের সঙ্গে তার স্ট্যাটাস যে আর মিলবে না।

কারবার দেখেছ পিউ, আজ তুমি টিফিন টাইমে একটুও নড়লে না, অথচ

ওই ফোনের আর পাত্তা নেই। – সীমাদি হাসছে।

ওর মুখ ফ্যাকাসে। মাথা নামিয়ে কাজে মন দেয়।

আজ মনটা খালি অতীতের আনাচ কানাচ ছুঁতে চাইছে। চাকরি করতে করতে প্রাইভেটে পড়া শুরু করেছিল পিউ। নিঃসঙ্গ জীবন, বইকেই টেনে নিল। এর চাইতে আর ভাল সঙ্গী হয় না। বি এ, এম এ শেষ করে চাকরির পরীক্ষা। তারপর এই সরকারী চাকরি। সংসার নামক নুয়ে পড়া গাছটা ততদিনে তরতাজা হয়ে বেঁচে উঠছে। জল আর অক্সিজেনের অভাব নেই। ভাই ভাল চাকরি পেতেই মা , বাবা, চোখে চশমা এঁটে রবিবারের ‘পাত্রী চাই’ কলম চষে বেরালেন।

 কিন্তু পিউর এক ঢাল চুলের সিঁথি তখনও ফ্যাটফ্যাটে সাদা। কারোর নজরই নেই।

ডিপার্টমেন্টের পিয়ন এসে সামনে দাঁড়ায়, ‘ব্যানার্জি দিদি, এস ও ফাইলটা চাইছেন’।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, দিচ্ছি। – পিউ হাত চালায়।

(৩)

একটা অদ্ভুত প্রতিক্ষায় আজকাল দিন কাটে। ফোনটা কবে আসবে? যদি তুহিনই হয়, যা ক্ষ্যাপাটে আর জেদি ও। যদি আবার আগের মতো জেদ ধরে টেনে নিয়ে যায় ওই দেশপ্রিয় পার্কের সবুজ ঘাসে?

যাহ্‌, এটা মানা সম্ভব নয়। এই মধ্যবয়সে ছেলেমানুষের মতো পার্কে গিয়ে বসা, দাঁত দিয়ে ঘাসের ডগা চিবনো। ধ্যাত! আচ্ছা, ওই ফুলওয়ালা, সে কি এখনও আসে? ডাই করা এক ঝুড়ি ফুল নিয়ে?

না বোধহয়। তখনই কত বয়স হয়ে গিয়েছিল। তবু যদি কোনভাবে দেখা হয়ে যেত! বড্ড জুলুম করত তখন ফুল কেনার জন্য। কিছুতেই বুঝতে চাইত না, ওদের পকেট ধূ ধূ মাঠ।

চাকরি জীবনের বিভিন্ন বাঁকে পরিচয় হয়েছিল ঋষি, কৌস্তভ, শঙ্খদের সঙ্গে। একে একে সব তারা পরিযায়ী পাখির মতো এল আবার চলেও গেল। ওদের মধ্যে কেউ ফোন করল না তো? যেই হোক, আবার কবে ফোন আসবে?

(৪)

অবশেষে এল সেই ফোন। রিসিভার তুলেই সনৎ চাপা গলায় ডাকছে, ‘দিদি আসুন, কুইক, সেই ভদ্রলোক’। সীমাদি পেন চিবোতে চিবোতে হাসছে। পিউ জড়োসড়ো হয়ে ফোন ধরল, ‘হ্যালো’।

পিউ ? আমি কিশোর বলছি। কিশোর শ্রীবাস্তব। চিনতে পারছ ? অনেকদিন পরে যদিও।

পিউর স্মৃতিতে রি ওয়াইন্ডিং চলছে। কিশোর, কিশোর, কোন কিশোর ?

আরে বাবা, তোমার সঙ্গে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পরিচয় হল না ? রিসার্চ ওয়ার্কের ব্যাপারে দিল্লী থেকে এসেছিলাম। তুমি খুব হেল্প করেছিলে। এরকম বোবা হয়ে থেকো না বস। স্পিক আউট সামথিং।

 পিউ চারিদিকে নজর বোলায়। সীমাদির হাসিটা কুৎসিত লাগল। টুকরো টুকরো কথা কানে আসছে, ‘সামনে মলমাস। শুভ কাজ নেই কিন্তু। তোর দিদিকে জানিয়ে দিস সনৎ’।

পিউ মিহি করে হাসল, এতদিনে মনে পড়ল আমাকে, কিশোর ?

সরি বস। । বাট বিলিভ মি, দেশে ছিলাম না। তবে এবার পার্মানেন্টলি

দেশে। এবং তোমাদের কলকাতায়। এই, আজ ফ্রি?

আজ ?

ওরে সনৎ, ডেটিং চলছে রে। – সীমাদি দেদার মজা লুটছে।

 হ্যাঁ, অ্যারাউন্ড ফাইভ। তোমার অফিস তো রাসবিহারিতে, রাইট? দেখো সব

মনে আছে আমার। সেবার ক্যানটিনে নিয়ে দারুণ চপ আর চা খাইয়েছিলে। তাহলে দেশপ্রিয় পার্কের সামনে দাঁড়াও। ওটাই কাছের হবে। তুমি তো গাছপালা ভালবাস। ওহ্‌, আমি যা ভয় পাচ্ছিলাম না ! পাঁচ বছর আগের পরিচয়। কোনও মোবাইল নম্বর নেই। ভাগ্যিস চিনতে পারলে। আর তোমার দেওয়া অফিসের নম্বরটাও লাইভ আছে দেখছি। রিয়েলি সারপ্রাইজিং। এনি ওয়ে পিউ, আই ফিল সো হ্যাপি।

কিশোর দম নেয়, ‘আচ্ছা পিউ, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব ?

স্বচ্ছন্দে।

তুমি কি এখনও পিউ আগরওয়াল আছো না কি সারনেম পাল্টেছে ?

ও ঢোক গেলে। তাহলে সন্দেহটাই ঠিক। ওদের ডিপার্টমেন্টের পি

আর ও, পিউ আগরওয়ালকে খুঁজে যাচ্ছে এই কিশোর। কিন্তু সে তো কবেই বিয়ে করে স্বামীর সঙ্গে দুবাই চলে গিয়েছে। ভুলটা ধরিয়ে দেবে ? নইলে কিশোর যে অনেক স্বপ্ন বুনে রাখবে আজ পিউ আগরওয়ালকে দেখবে বলে।

হ্যালো পিউ, হ্যালো, তাহলে পাঁচটায় দেশপ্রিয় পার্ক তো ?

ও নিঃশব্দে মাথা নাড়ে, হ্যাঁ। তারপর নিজের সিটে এসে বসে।

টেবিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই জমে গেছে ফাইলের পাহাড়। ও হাত চালিয়ে কাজ শেষ করছে। চারপাশের গুঞ্জন তখনও থামেনি। ও ভ্রুক্ষেপ করল না।

হঠাৎ ঘড়ির দিকে নজর গেল। সাড়ে তিনটে। কিশোর অপেক্ষায় থাকবে পাঁচটা থেকে। একবার যাবে ? কী লাভ ? উঁহু, সব সময় লাভ লোকসানের খাতা খুলতে নেই।

মনটা হঠাতই টগবগে এক ঘোড়ার মতো ছুট লাগাল। পিউ যাবেই। আর গিয়েই প্রথম হাত বোলাবে ওই অশ্বত্থ গাছের গায়ে। ওর বাকলে তার সেই নখের দাগগুলো আছে? তুহিনের সঙ্গে ঝগড়া হলেই … দূর, কবেকার দাগ! থাকে কখনও? তবু ছুঁয়ে আদর করবে গাছটাকে। আর যদি দেখা হয়ে যায় সেই নাছোড় ফুলওয়ালার সঙ্গে ? কিনে নেবে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ। আজ ব্যাগ ভর্তি পয়সা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *