বৃষ্টি ভেজা রোজ
(১)
ঘড়িতে এগারটা কুড়ি। বাইরে থেকে ভেসে আসছে ঝি ঝি পোকার ডাক। একনাগাড়ে, এক টানা ঝিম ধরা ডাকটা।
বিশাল বাগানের পেটের ভেতর এই ‘বিশ্বাস ভিলা’। তবে এখন আর তার কৌলীণ্য নেই। বাগান তো পুরোপুরি আগাছার জঙ্গল। যত্ন আত্তি পড়ে না। শ্বশুরমশাইয়ের কালে মালি টালি লাগিয়ে রঙ বেরঙের মরসুমি ফুল ফোটানো হত। বাগান আলো হয়ে হাসত। এখন সেখানে থোকা থোকা ঝি ঝি পোকার বাসা। রাত হলেই জাঁকিয়ে বসবে, শুরু হবে ঝি ঝি গান।
বারান্দার গ্রিলে মুখ লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে জয়া। বারান্দার কোণাকুণি একটা নিমগাছ। একটা আগুনের ফুলকি ফুটফুট জ্বলতে দেখেই জয়া গলা তোলে। ‘খগেনদা, কী গো, সাপ কোপের কামড় খাবে নাকি? ঘুটঘুট্টি অন্ধকার, তুমি এখনও গাছতলায়?’
খগেনদা গলা খাঁকারি দেয়, ‘এই খগেনকে কেউ ছোঁবে না হে। তা, তুমি এখনও ঘুমোও নি যে? মেয়ে ফেরে নি বুঝি?’
পিয়ার ফিরতে সত্যিই আজ দেরি হচ্ছে। সেই কোন ভোরে বেরিয়েছে অফিস ক্যাবে, এখনও ফেরার নাম নেই। এত কী কাজ!
এ ব্যাপারে দেবেশের সঙ্গে মিল খুব। বাপ বেটি দুজনেই প্রবল উচ্চাকাঙ্খী। মাত্র চার পাঁচ বছরেই কোম্পানির শক্ত পোক্ত উঁচু ডাল ধরে ফেলেছে পিয়া। আইটি কোম্পানি, প্রতিযোগী অনেক, তবু সবাইকে পেছনে ফেলে ও ঠিক নিজের জায়গা করে নিচ্ছে। ছুটে চলার যে কী নেশা, ছুটবে আর ঘন ঘন বাঁক পাল্টাবে। আর ফেলে আসা বাঁকের দিকে ফিরেও তাকাবে না।
জয়ার কানে আসে গানের সুর। বাগান পেরিয়ে ভেসে ভেসে আসছে বাতাসে। ‘নিবিড় ঘন আঁধারে, জ্বলিছে গ্রহ তারা …’ খগেনদা গাইছে, খাসা গলা।
আজ খগেনদার যেন কী হয়েছে। সকাল থেকেই গুমসুম। এত রাতেও নড়ে নি ওই আগাছার জঙ্গল থেকে। অন্যান্য দিন সন্ধ্যে হলেই পিঠটান দেয় বসাক পাড়ার দিকে। ওদিকেই নাকি ওর ঘর বাড়ি। একসময় বড় বাড়ির ছেলে ছিল। গান গান করে ঘর ছাড়ল, চলে গেল সিধে মুম্বাই। স্বপ্ন দেখত বিরাট গাইয়ে হবে। কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। শকটা নিতে পারল না। মাথার সার্কিট ধীরে ধীরে অকেজো হতে শুরু করল খগেনদার। পরনে ময়লা জামা, ময়লা প্যান্ট, এদিক ওদিক ফ্যা ফ্যা ঘুরে বেরায়। একদিন আস্তানা গাড়ল বিশ্বাস ভিলার পোরো জমিতে। নিমগাছ তলায় সেই যে গ্যাঁট হয়ে বসল, অন্ধকার না নামলে নড়ে না কোথাও। জয়ার শ্বশুরমশাই তখনও জীবিত। রেগে মেগে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতে গেলেন একদিন, ‘যা, ভাগ। যত উৎপাত’।
জয়া বাধা দেয়, ‘থাক না বাবা। লোকটা তো আপন মনেই থাকে, কোনও ক্ষতি করে না কারোর। গান টান বেশ গায়। আর পাহারাদারির কাজও হয় দিনের বেলাটুকু। কুকুর, বেড়াল, উটকো ফেরিওলা দেখলেই এমন হ্যাট হ্যাট তাড়ায়’।
সেই থেকে সে রয়ে গেল। জয়া ভাত রুটি সবজি, যখন যা থাকে দেয়।
হঠাৎ বাড়ির সামনে জোরালো হেডলাইট, সঙ্গে গাড়ির হর্ন। ধড়মড় করে ওঠে জয়া। পিয়া এসে গেছে। তাড়াতাড়ি চাবির গোছা নিয়ে গ্রিলের গেট খুলতে যায়। যা অন্ধকার, ঠাহর হয় না কিছু। কয়েকবার ভুল চাবি ঘুরিয়েও ফেলল তাড়াহুড়োয়। মেয়ের মুখে বিরক্তি, ‘কী গো? এতক্ষণ লাগে?
জয়া নতুন করে ঠিক চাবিটা খুঁজতে থাকে। কিন্তু এবারও ফলস।
-মা, দিন দিন কী হচ্ছ তুমি। দাও আমাকে। – গ্রীলের বাইরে থেকে পিয়া হাত বাড়ায়।
জয়া বোকা বোকা হাসল, ‘আর বলিস না। চালসে পড়া চোখ, চশমা ছাড়া কিচ্ছু দেখি না’।
পিয়া হাত বাড়িয়ে চাবি নেয়, তারপর অদ্ভুত পটুতায় কট করে খুলে ফেলল তালা। ঘড়ঘড় শব্দে সামনের দিকে গেট টেনে ঢুকে যায় ভেতরে। পয়েন্টেড হিল জুতোর একেক পাটি একেক জায়গায় ছিটকে পড়ে। চরম বিরক্তি নিয়ে মসমস করে ঘরে ঢুকে আসে পিয়া।
নীচু হয়ে মেয়ের জুতো কুড়িয়ে শেলফে তুলে রাখতে রাখতে ওর গায়ে বাসি পারফিউমের গন্ধ পায় সে। রান্নাঘরের কলে হাত ধুয়ে মাইক্রো ওভেনে খাবার বসাতে যাবে, কানে এল পিয়া চেঁচাচ্ছে নিজের ঘর থেকে, ‘খাবার বাড়ছ নাকি?’
-হ্যাঁ। কেন? আমিও বসব তোর সঙ্গে।
-বলে গেলাম যে আজ টিম ডিনার ছিল। বাড়িতে নো মিল।
জয়ার হাত থেমে যায়। গলা তুলে বলে, ‘বলেছিলি? খেয়াল করি নি। একটু কিছু মুখে দে। চিংড়ির মালাইকারি করেছি’।
-উফ, না।
জয়া রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। মেয়ের ঘর অন্ধকার। হাতড়ে হাতড়ে ডিম আলোটা জ্বালে। বিরক্তি নিয়ে তাকায় পিয়া, ‘লাইট জ্বালালে কেন? মাথা ধরেছে। বললাম তো খাব না। চিংড়ি ফিংড়ির নাম করবে না। দু সপ্তাহে দু কেজি বাড়িয়েছি। আজ মাপলাম’।
ঘর ছেড়ে বেরিয়েই আসছিল জয়া, কী ভেবে থমকে দাঁড়ায় আবার। মুখে কিছু বলব বলব ভাব। আজ অভিজিত ফোন করেছিল, বেলা তখন একটা দেড়টা। এ সময় সচরাচর করে না। অবশ্য ওর ফোন ইদানিং আসেও কম। পিয়ার সঙ্গেই যত কথাবার্তা, তাও বেশি রাতে। একটু উদ্বিগ্ন হয়েই সে ফোন ধরেছিল, ‘হ্যাঁ অভি, বল। অফিস নেই আজ?’
-হ্যাঁ, মা। এখন অফিসেই। ব্যস্ত আছেন ?’
-না, না। আমার আর কী ব্যস্ততা। ঘরের কাজকর্ম সারছি, বল। তোমার শরীর টরীর ভাল তো বাবা? একা থাকো। ভাবনা হয় আমার’।
-জানি, আপনি ভাবেন আমার জন্য। – অভিজিত হাসছে। -ঠিক আমার মায়ের মতো। আর ওঁর ওপরেই কিনা একসময় কত রাগ দেখাতাম। রিপেন্ট করি এখন। আসলে এত তাড়াতাড়ি বিনা নোটিসে যে চলে যাবে ভাবতেই পারি নি। – অভিজিত থেমে গেল। শেষের দিকে ওর কথার মধ্যে কান্নার দানা। – যাক, মায়ের জায়গাটা আপনি পূরণ করলেন। আমি লাকি।
জয়াও হাসল। ভেতরটা ছলছলিয়ে উঠেছে। ছেলেটা এত মিষ্টি করে কথা বলে। মা ডাকটাও যেন ওর ভেতর থেকেই আসে। কখন যেন সন্তানের জায়গাটাই দিয়ে দিয়েছে সে ওকে।
-পিয়ার কি এখন মর্নিং শিফট?
-মর্নিং! কী জানি। তবে রোজই সকাল সাতটায় অফিস ক্যাব আসে, ফিরতে ফিরতে রাত এগার কখনও বারো। মেয়েটা একেবারে ওর বাবার মতো, ওয়ার্কহোলিক।
-আপনি একটু পিয়াকে বোঝান না, আমার আর একা থাকতে ভাল লাগছে না। অনেকদিন তো হল। এত বড় কোয়ার্টার, ঘরের পর ঘর, থাকার লোক নেই।
আচমকা প্রসঙ্গ ঘুরে যেতেই জয়া কথা হাতড়াল। অভিজিতের সঙ্গে পিয়ার বিয়ে প্রায় পাঁচ বছর ঘুরল। ছেলেপিলে হয় নি, নেবে না বলেই হয় নি। বিয়ের পর থেকেই দুজন দু মেরুতে। মেয়ে যদি মুম্বাই তো জামাই চেন্নাই। এই যেমন পিয়া এখন কলকাতায়, অভিও তোড়জোড় শুরু করল কলকাতায় ফিরবে, অমনই খবর এসে গেছে মাস দুয়েকের মধ্যে মেয়েকে উড়ান দিতে হবে অন সাইট। সিধে অস্ট্রেলিয়া। আর গেলে, বছর তিনেকের আগে ফেরা নয়।
জয়া মিনমিন করে, ‘আমি তোমার ব্যাপারটা ফিল করি বাবা, কিন্তু কী বলব বল? পিয়াকে তো তুমি চেনো। ক্যারিয়ারটাকে বড্ড ভালবাসে।
-এগুলো ভালবাসা নয় মা। এগুলো এক্সসেনট্রিসিটি, পাগলামো। – অভির গলা চড়ছিল। – এটা একটা লাইফ? অফিস থেকে ফিরে চুপচাপ একা হয়ে বসে থাকি। কথা বলার লোক নেই, নিজের ভাল লাগা, মন্দ লাগা শেয়ার করার কেউ নেই।
ঘন ঘন ব্লাউজের হাতায় মুখ মুছল জয়া। এসব কথা কি তার অজানা? কিন্তু কাকে বোঝাবে? বংশের ধারা পেয়েছে পিয়া। আত্মকেন্দ্রিক, উচ্চাকাঙ্খী এবং এক বগগা। তবে শৈশবটা ওর অন্যরকম ছিল। তুলতুলে, সহজ, সরল একটা মেয়ে। রূপকথার গল্প শুনতে ভালবাসত। বেড়াতে যাওয়ার কথা উঠলেই নদীর কাছে যাব বলে বায়না ধরত। কিন্তু এখন?
সব সময় নিজের চারদিকে একটা বৃত্ত এঁকে রেখেছে। অফিস থেকে ফিরেই দরজা ভেজানো, হাতে ল্যাপটপ। কানে হেড ফোন। কেউ সামনে দাঁড়ালেও চোখে মুখে বিরক্তি।
-আমি সন্তান চাই মা। আমাদের সন্তান।
জয়া চুপ।
-খুব কি অন্যায় দাবি, মা?
-না, না। তা কেন?
-তবে? পিয়া কিছুতেই বুঝতে চায় না।
জয়া ঢোক গেলে, ‘জানি, মাঝে মাঝে ও বড্ড অবুঝ হয়’।
-তাহলে? এভাবেই জীবন চলবে? আমি তো ওর মতো উন্মাদ হই নি। আমি পরিবার চাই, পরিবারের ভালবাসা চাই।
জয়া বিড়বিড় করে, ‘সেটাই তো স্বাভাবিক, বাবা। ঠিক আছে, আমি ওর সঙ্গে কথা বলব। কতটা কী লাভ হবে বলতে পারছি না। তবে বলব’।
অভিজিত ফোন ছাড়ার আগে অদ্ভুত ভাবে হাসল। বলে, ‘হ্যাঁ, একটু বলুন মা। আপনার ওপর আমার বিরাট আস্থা’।
শব্দ করে হেসে উঠেছিল জয়া। পাগল ছেলে! কী যে বলে। সংসারে যার অবস্থান পুরনো হলদে পাতার মতো, যে কোন মুহূর্তে হাওয়া দিলেই ডাল থেকে খসে পড়বে, তার ওপর আবার আস্থা! দেবেশ তো চিরকাল তাকে গুড ফর নাথিং ভেবেই গেল। ভাবাটা স্বাভাবিক। দেখছে তো বিয়ের পর থেকেই। এখনও পর্যন্ত গুছিয়ে ঘরকন্নাটাও শিখল না। এদিকে বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই।
এ বাড়ির সবাই রুটির ভক্ত। খাওয়ার পাতে গরম গরম রুটি চাই। জয়াকে হাতে হাতে সাহায্য করার লোক আছে, কিন্তু রান্নাঘরে সে ছাড়া সকলের নো এন্ট্রি। অতএব দিস্তা দিস্তা রুটি বানাতে হয়, একটাও ফোলে না। উপরন্তু কোনটা কাচা, কোনটা পোড়া। আগে তুমুল অশান্তি হত। এখন মুখে সবার কুলুপ আঁটা। জয়া সকলের করুণার পাত্র।
আরও এক রোগে ধরেছে ইদানিং তাকে। প্রচন্ড অন্যমনস্ক। আগেও ছিল, এখন মাত্রাতিরিক্ত। মুহূর্তের মধ্যে সব জিনিস হারিয়ে ফেলে, কোথায় কী রেখেছে মনে করতে পারে না। কাজের মাসি কাপড় কেচে ধুয়ে চলে যায়। ছাদে গিয়ে শুকোতে দেওয়ার দায়িত্ব তার। লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠে তো আসে ছাদে। তারপর যে কী হয়। মেঘ দেখে, মেঘের ছায়ার সঙ্গে আপন মনে লুকোচুরি খেলে। কখনও আবার মেঘের ভেতর চেনা চেনা মুখের ছবি খোঁজে। এভাবেই বেশ খানিকক্ষণ কাটিয়ে নীচে চলে আসে। ওদিকে দলা পাকিয়ে পড়ে থাকে ভেজা জামা কাপড়ের স্তূপ।
এরকম আরও কত ঘটনা আছে। রান্না করতে করতে কোনও এক পাখির শিস শুনে একদিন ছুটে এসেছে বারান্দায়। কেটে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। আর ওদিকে পুড়ে ছাই হয়েছে কড়ায় চাপানো রান্না।
-কী, কিছু বলবে? অনেকক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে আছো?’
-হুম, বলতাম। তুই তো বিশ্রাম নিচ্ছিস।
পিয়া হাসল। মেয়ের মুখে হাসি কতকাল পরে দেখল। একটু ভরসাও পায় মনে মনে। তবু ফিরে তাকায় আবার। হাসিটার মধ্যে কেমন একটা ক্লিষ্ট ভাব আছে না? ও কি খুব ক্লান্ত? হতেই পারে, সারাদিন যা ধকল যায় অফিসে। কেন যে এত দায়িত্ব নেয় ঘাড়ে? বয়সই বা কত? এই তো সামনের অঘ্রাণে ত্রিশে পা রাখবে। এখনও চাকরি অনেক বছর। সব কাজ কি এখনই শেষ করতে হবে?
-বললে বল, নইলে এখন যাও প্লিজ। কাল শুনব। আর লাইটটা অফ কর যেও, চোখে লাগছে।
-অভিজিৎ ফোন করেছিল। – কথাটা ভাসিয়ে দিল জয়া। তারপর মেয়ের চোখ মুখের রেখা পরোখ করতে থাকে।
-হুম, তো? – পিয়ার চোখে জিজ্ঞাসা, যেন এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা।
এসময় ওর ফোনে একটা মেসেজ টোন। বালিশের তলা হাতড়ে ও মোবাইল নেয়, স্ক্রিনে চোখ রেখেই বলে, ‘কী বলল তোমার গ্রেট সান-ইন-ল? কখন ফোন এসেছিল?’
-দুপুরের দিকে। খুব আপসেট লাগল আজ ওকে। তোর সঙ্গে কথা হয়েছে?
-না। স্ট্রাইক চলছে এখন আমাদের।
-কেন, স্ট্রাইক কীসের?
পিয়ার চোখ মোবাইল থেকে সরে এখন মায়ের দিকে। আস্তে বলে, ‘অভি দিন
দিন খুব অসহ্য হয়ে যাচ্ছে, জানো। কী সব ভূত চেপেছে মাথায়। ফ্যামিলি লাইফ নাকি খুব মিস করছে। সারাক্ষণ শুধু … থামল একটু পিয়া। মুখে সামান্য সংকোচ। তারপরে বলেই ফেলে – বাচ্চা বাচ্চা করে জ্বালিয়ে মারছে দিন রাত। তাই দিয়েছি কথা বন্ধ করে। ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপেও ব্লকড।
জয়ার ভ্রু কুঁচকে যায়, কেন?
-কিছু করার নেই। সামনের কয়েকটা দিন আমি ভীষণ ব্যস্ত। প্রোজেক্টটা শেষের দিকে। ওটা ঠিকঠাক শেষ হলে ‘ই এ’ কনফার্মড। – বলেই ফিচেল হাসল ও। -বুঝলে না তো? মাথার ওপর দিয়ে গেল নিশ্চয়ই? আরে, ই এ মানে এক্সিডিং অল। মানে যেটাকে আউটস্ট্যান্ডিং বলে আর কী। ওই গ্রেড মিললেই সিডনি যাওয়া পাকা।
মেয়ের মুখের ওপর থেকে এক চুল দৃষ্টি সরাতে পারল না জয়া। কেমন এক অচেনা, অপরিচিত লাগছে পিয়াকে। এই মেয়েকেই দুশো আশি দিন গর্ভে লালন করে, ছিন্ন, বিদীর্ণ হয়ে, রক্ত স্রোতের ভেতর থেকে তুলে বুকে ধরেছিল?
-সারভাইভ্যাল অফ দা ফিটেস্ট, বুঝলে মা। মার্কেটে এখন শুধু শক্ত পোক্তরাই টিকে থাকবে। সিম্পল কথা। ডারউইন তো কবেই থিয়োরিটা দিয়ে গিয়েছে। – পিয়া কথা থামিয়ে হাসল। – তাই বলছি, এখন ছেলেপুলে নিয়ে জমিয়ে সংসার করার সময় নেই মা আমার হাতে। অভি যতই কাঁদুনি গাক, আমি হেল্পলেস, অসহায়।
-তুমি তাহলে সন্তান চাও না?
-এই মুহূর্তে নয়।
-মহার্ঘ মুহূর্তটা আসবে কবে?
-এখনই বলা যাবে না। তবে আগামী দশ বছরের মধ্যে নয়। আমি একটা জায়গায় উঠে নিই আগে। এখন কনসিভ করলে, কী অবস্থা হবে ভেবে দেখেছ?
-না, ভাবতে চাইও না। আমার ভাবনা অন্য কিছুতে। দশ বছর বাদে অর্থাৎ তুমি যখন চল্লিশ, তখন তুমি প্রথম মা হওয়ার প্ল্যান নিচ্ছো?
-হ্যাঁ, ক্ষতি কী? দশ বছরে আমি অনেকখানি নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারব। আর চল্লিশে মা হওয়াটা কোনও ব্যাপার, বল তো? এখন …
ওকে হাত দিয়ে থামিয়ে দেয় জয়া, ‘জানি, তুমি এখন উন্নত চিকিৎসার ওপর ছোটখাট একটা লেকচার দেবে। অত শত শুনে আমার কাজ নেই বাপু, আমি ভাবছি অভিজিতের কথা।
-ভেবে যাও। আমার তাতে কিছু যায় আসে না। একটা কথা শুধু সাফ জেনো রাখো, এই মুহূর্তে বাচ্চার ফিডিং বোতল আর ডাইপারের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখতে পারব না, সরি।
পিয়া ওর ল্যাপটপের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, একবার মায়ের দিকেও তাকাল। ভাবটা এমন যেন এবার তুমি আসতে পারো।
জয়া তবু নড়ে না। কথা যখন উঠেছে পুরোপুরি নিজের বক্তব্য শেষ না করে নড়বে না। মেয়েটা তার। ওকে ভুল পথে হাঁটতে দেখেও চুপ করে থাকতে পারবে না। অন্তত সঠিক পথটা চেনানো দরকার। এরপর কোন পথ ও বাছবে, সে স্বাধীনতা সম্পূর্ণ ওর।
ল্যাপটপে চোখ রেখেই আবার কথা শুরু করল পিয়া, ‘জানো, গত মাসেই আমাদের ডিপার্টমেন্টেই একটা ঘটনা ঘটল। একটি মেয়ে ছুটির অ্যাপ্লিকেশন করল ডাক্তারের সার্টিফিকেট দিয়ে, তাও মাত্র পনেরো দিনের জন্য। সার্টিফিকেটে লেখা, আর্লি স্টেজ অফ প্রেগনেন্সি। ব্যস, সাড়ে সর্বনাশটি ওতেই ঘটল। দু দিনের মধ্যেই ওর হাতে টার্মিনেশন লেটার। কারণ দেখানো হয়েছে, পুওর পারফরমেন্স। গ্রেড ‘এম এস’, অর্থাৎ মিটিং সাম এক্সপেকটেশনস। যাকে বলে চলনসই কাজকর্ম। ফলে সে বছরের ইনসেনটিভও মার, সঙ্গে চাকরিটাও।
খানিক আগে মেয়েকে কিছু বোঝানোর যে তাগিদটা অনুভব করেছিল জয়া, এখন সেই জ্বলন্ত শিখাটা নিভে গেছে। ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য সে দরজার দিকে মুখ ঘোরায়। বুকের ভেতর একটা আতঙ্ক চেপে বসছে ক্রমশ। এ কী প্রলয়ের দিন এল চারপাশে! অন্তঃসত্তা বলে একটি মেয়েকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হল? তার মানে কি নতুন সৃষ্টিকে কেউ আর চায় না? ভবিষ্যত প্রজন্ম অনাহূত? তাই কোথাও অঙ্কুরোদগম হতে দেখলেই যে কোন অছিলায় তাকে নষ্ট করার জন্য সকলে উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু কেন? সৃষ্টি না এলে যে পৃথিবী খা খা মরুভূমি হয়ে উঠবে। চারিদিকে পড়ে থাকবে শুধু পুরনো ঝরা পাতা।
জয়া পা বাড়ায় বাইরের দিকে। চিন্তাগুলো গুলিয়ে দিচ্ছে সব।
-যাওয়ার আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে, মা?
জয়া থমকাল। কিন্তু মেয়ের দিকে সরাসরি তাকাল না। কোণাকুণি, এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে পিয়ার গালের একপাশটা শুধু দেখা যাচ্ছে।
-একটি মেয়ের জীবনে মা হওয়াটাই কি একমাত্র লক্ষ্য?
ভেবেছিল কোনও জবাব না দিয়েই চলে আসবে। কিন্তু পিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে মত বদলালো। মেয়ের চোখে কীসের এক প্রতীক্ষা। হয়তো সত্যিই ও-ও সন্দিহান উত্তরটা জানার জন্য।
জয়া ধীরে হেঁটে মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ‘আমি যা বলব, তোমরা জেন ওয়াইরা কি তা মানতে পারবে?’
হঠাৎ অট্টহাসি। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে পিয়া, ‘কী বললে, কী বললে? জেন ওয়াই! বাবা, মা! কত কী শিখে গেছ তুমি’।
মেয়ের হাসিতে তার মুখেও হাসি। বলে, ‘জানতে হয়, নইলে যে পিছিয়ে পড়তে হয়, সোনা’। – পিয়ার মাথায় আলতো হাত রাখল জয়া। – ‘আমি তোমার সঙ্গে একমত। মা হওয়াটাই মেয়েদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। কিন্তু … – সামান্য থামল জয়া। – একটা কিন্তু থেকেই যায়। তোমরা সব জেন ওয়াইরাই যদি এই ভাবনা নিয়ে চলতে শুরু করে, তাহলে পৃথিবীটার কী হবে?
-কিচ্ছু না। জাস্ট কিচ্ছু হবে না মা। পৃথিবী তার আয়তনে এক চুল কমবেও না, বাড়বেও না। বরং দেশের জন সংখ্যার ওপর একটু দাড়ি টানা যাবে। – কথা বলতে বলতে হাই তোলে পিয়া। – এবার তুমি যাও মা, আর বকতে পারছি না। ভীষন টায়ার্ড আজ আমি।
-যাচ্ছি, তবে অভিজিতের ওপর কিন্তু তুমি অন্যায় করছ।
-আমি ? অন্যায় করছি? কেন? কীভাবে? সন্তান চিরকালের জন্য নেব না, একবারও তো বলি নি। একটু সময় চেয়েছি শুধু। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এইটুকু আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকবে না?
-আন্ডারস্ট্যান্ডিং। তোমার সেটা আছে পিয়া? তুমি সব দিক থেকে ছেলেটাকে ঠকাচ্ছ? সন্তান ছাড়াও ছেলেটা তোমার সঙ্গ চায়, ভালবাসা চায়, মমতা চায়। সেগুলো তুমি দিচ্ছো?
-মা! অবাক লাগছে তোমায় দেখে। তুমি কার মা? আমার না অভিজিতের!
জয়া আর দাঁড়াতে চাইল না ওখানে এক মুহূর্ত।
-একটা কথা শুনে যাও। আগেকার মানুষ সন্তান জন্ম দিত নিজেদের কথা ভেবে। সন্তান হবে শেষ বয়সের লাঠি, এই ছিল ধ্যান ধারণা। কিন্তু জেন ওয়াইরা তা ভাবে না। কারণ নিজের নিজের জগতে তারা লাট্টুর মতো ঘুরপাক খাচ্ছে, কোথাও একটু স্টপেজ নেই। বাপ মায়ের প্রতি কী কর্তব্য করবে অমন লাট্টু ঘোরা জীবনে? তাই তো আমাদের কাছে মাতৃত্ব কমপালসারি নয়, অপশনাল।
না, আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। নইলে মেয়েটা আরও কঠিন, আরও কর্কশ, কিছু শুনিয়ে দেবে। যেতে যেতে শোনে পিয়া পেছন থেকে চেঁচিয়ে ডাকছে, ‘কোথায় যাচ্ছো মা? তোমার প্রিয় চিলেকোঠার ঘরে? জায়গাটা ভালোই বেছেছো, রাগ অভিমান হলেই সটান সেখানে। বাবাও সেদিন হাসছিল আর বলছিল তোমার যত প্রেম ওই জোব্বা পরা বুড়োর সঙ্গে’। – পিয়া বলছে আর হেসে চলেছে। – আমি বলি কী, এবার বেরিয়ে এসো রবীন্দ্রনাথ থেকে। একটু খোলা বাতাসের মাঝখানে এসে দাঁড়াও মা। চারিদিকে তাকিয়ে দেখো, সবাই এগোচ্ছে, তুমি শুধু কতগুলো ঘুণধরা সংস্কারের মধ্যে আটকে পড়ে আছো’।
জয়ার পা দুটো থমকে দাঁড়িয়েছিল ঘরের কোণে। ওর কথা শেষ হতেই হনহন করে হেঁটে যায় সামনের দিকে। অন্যসময় হলে মেয়ের বিদ্রুপ গায়ে মাখাত না। আজ কষ্ট হল। এত পরিবর্তন কবে ঘটে গেল পিয়ার মধ্যে। সব চেনা গন্ডি অতিক্রম করে যেন ও চলে গেছে যোজন যোজন দূরে।
বুকটা তোলপাড় করে উঠল। এই পিয়াই কিছু বছর আগেও দুলে দুলে রবীন্দ্রনাথ আওড়াত না! শিশু খন্ডের কবিতাগুলো বলে যেত অনর্গল। -‘এখনো তো বড়ো হই নি আমি, ছোটো আছি ছেলেমানুষ বলে। দাদার চেয়ে অনেক মস্ত হব, বড়ো হয়ে বাবার মতো হলে।
তাহলে কি ও এখন মস্ত বড় হয়ে উঠেছে? তাই এত অচেনা, অপরিচিত!
আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসে সে চিলেকোঠার ঘরে। কিছুদিন আগেই এই এক ফালি ঘরটাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে। রবীঠাকুরের ফটোটাকে বুকে করে নিয়ে চলে এসেছে এখানে। পিয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, জোব্বা পরা এক মুখ দাঁড়ি গোঁফের রবি ঠাকুর, এক্কেবারে বেমানান তাদের ড্রয়িংরুমে। তার জায়গায় আর্ট গ্যালারির দামী কোনও পেইন্টিং বসবে।
অভিমান করেই তাই … রবিঠাকুরের এখন আস্তানা তাই তার চিলেকোঠায়। গীতবিতান, আর হারমোনিয়ামটাও সঙ্গে এনেছে। গান বাজনা এক যুগ আগে শেষ, তবু সকাল সন্ধ্যে ঢাকনা খুলে শব্দহীন রিডগুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। মনে হয় সুরে ভেসে গেল বাতাস। একটা ধূপ জ্বালে। তারপর মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম। ফোয়ারার মতো বেরিয়ে আসে প্রার্থনা, ঘন্টা আর শাঁখ বাজায়, ব্যস, পুজো শেষ। আলাদা করে অন্য কোনও দেবতাকে আর সে পুজো করে না।
(২)
চিলেকোঠার ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে এখন জয়া। ভেজা বাতাস ভাসিয়ে দিচ্ছে ওই একচিলতে ঘর। কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয়। এখানেও নামবে যে কোন সময়ে। আকাশ লাল। বাইরে কুই কুই করে লব কুশের গলা। ঝড় তুফানকে বড় ভয় পায় ওরা। পাবেই তো, সদ্য চোখ ফুটেছে দুই কুকুর ছানার। আশ্চর্য! কীভাবে যেন টেরও পেয়ে যায় ওরা আগে ভাগে, ঝড় উঠবে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকালেই কোথায় লুকোবে বুঝে পায় না। জয়া ছুটে গিয়ে তখন দুটোকেই দু কাঁখে নেয়। ব্যস, তাহলেই শান্তি। তার বুকের ওম পেয়ে আবার ওরা কুই কুই ডাকে। তবে এ ডাকে ভয় নেই, আছে ভরসা।
লব কুশের মা রকিটাও আজকাল কেমন কেমন হয়ে গেছে। এতগুলো বাচ্চার জন্ম দিয়ে বোধহয় কাহিল, শুধু ঘুমোয়।
লব কুশের কুই কুই ডাকটা এবার আর একটু জোরালো। ভেতরে নিয়ে আসবে কি ওদের? পরক্ষণেই মত পাল্টায়। না থাক, নতুন করে আর কারোকে স্নেহ বিলাবে না। নিজের সন্তানকে দিয়েই তো দেখল। মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই।
এই রকিকেও একদিন রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছিল পিয়া। কলেজ থেকে ফিরল ওকে বুকে জড়িয়ে। দাদুকে ভয় পেতে খুব। তাই রকিকে রাখার অনুমতি আদায় করার জন্য সে কী কান্না। বলে, ‘প্লিজ, ওকে রেখে দাও। রাস্তায় এলোপাথারি গাড়ি ছুটছে। বাচ্চা কুকুর, বুদ্ধি সুদ্ধি তো কিছু হয় নি। তুপ তুপ করে এদিক ওদিক ছুটে বেরায়। কখন কোন গাড়ির তলায় চাপা পড়ে মরে যাবে’। ।
নাতনির দিকে তাকিয়ে শ্বশুরমশাই অনুমতি দিলেন। সেই থেকে খগেনদার মতো রকিও বিশ্বাস ভিলায় স্থায়ী বাসিন্দা। দেখতে দেখতে কতগুলো দিন পেরিয়ে গেল। ইতিমধ্যে কত ছানাপোনার মা হয়েছে রকি।
একসময় পাখির নেশাতেও পেয়েছিল ওকে। কিন্তু হঠাৎ কী হল। একদিন সকালে উঠে আচমকা খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিল সব পাখিদের। বলে, ‘ওদের মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিলাম’।
চোখ বেয়ে যে কখন জল গড়িয়ে নামছে, খেয়ালই হয় নি। তাড়াতাড়ি আঁচলে চোখ মুছে চিলেকোঠার জানলায় মুখ রেখে বাইরে তাকায়। থমথমে আকাশ। তারই মতো জমাট বাঁধা কান্না যেন আকাশের বুক জুড়ে। পিয়ার কথাগুলো এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে মনে। বুকে তুফান। নিজেকে বড় নিঃস্ব লাগছে আজ। একটু আশ্রয়, একটু আশ্রয় চাই তার। ধীর পায়ে হেঁটে সে রবীন্দ্রনাথের ফটোর নীচে দাঁড়ায়। আজকাল তো তেমন সুর খেলে না গলায়। সে জায়গায় কবিতা এসেছে। একসময় গান, কবিতা, দুটোতেই জয়া পারদর্শী ছিল। যদিও ওই সব গুনোপনার দাম কেউ দেয় নি। বরং সব চাপা পড়ে গেছে রান্নাঘরের কালি ঝুলি মাখা দেয়ালের আড়ালে।
পিয়াকেও খুব যত্ন করে কবিতা শিখিয়েছিল। ও যখন আবৃত্তি করত, মনে হত ঝরনা নামছে পাহাড় বেয়ে।
বুক চেরা দীর্ঘশ্বাসটাকে চাপা দিতে পারে না জয়া। এই পিয়াকে নিয়ে মনে মনে কম অহংকারী ছিল! ভাবত নিজের কমা জায়গাগুলো মেয়ে ঢেকে দেবে। কিন্তু না, পিয়া যত বড় হয়েছে প্রমাণ করেছে সে বাবার মেয়ে, ফাদারস চাইল্ড। জয়ার বুক থেকে ঝরণাটা শুকিয়ে গেল একসময়, ফেলে গেল পাহাড় চেরা একটা দাগ।
(৩)
বাইরে প্রচন্ড বেগে বৃষ্টি, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বজ্রপাত আর বিদ্যুৎ ঝিলিক। জানলা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট ঢুকছে ভেতরে। জয়া পাল্লা বন্ধ করে না। আসুক বৃষ্টি। বুকের ভেতরে খরা, একটু বৃষ্টি দিয়ে ভিজিয়ে নিলে ক্ষতি কী?
এতক্ষণ লব কুশের কুই কুই কানে আসছিল, এবার শুরু হয়েছে রকির ভৌ ভৌ। জয়া ভেতর থেকে ধমকে ওঠ, ‘রকি চুপ। একদম ওপরে উঠবি না। আমার মন ভাল নেই’। আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে রকি চুপ। লব কুশেরও আওয়াজ নেই।
ধীরে ধীরে সে রবীঠাকুরের ফটোর কাছে দাঁড়ায়। কী যে হল হঠাৎ। রাশি রাশি স্মৃতি ধেয়ে আসছে বুকের মধ্যে। … ছোট্ট পিয়া দুলে দুলে কবিতা বলছে , ওর কচি কন্ঠের আবৃত্তিতে সবাই মুগ্ধ। কবিতা শেষে ছুটে আসছে মায়ের কাছে, লাজুক লাজুক মুখটা চেপে ধরেছে মায়ের আঁচলে।
স্মৃতি, স্মৃতি, কত স্মৃতি। ভিজিয়ে দিচ্ছে তার দু চোখ। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ডুকরে ওঠে জয়া। তখনই দেখে দরজার ফ্রেমে পিয়া। কোলে লব আর কুশ। দু হাতের বেষ্টনি দিয়ে ওদের আগলে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে মিট মিট হাসি। হাসতে হাসতেই কয়েক পা করে এগোচ্ছে মায়ের দিকে। জয়া চোখ নামিয়ে নেয়। কী চায় কী মেয়েটা?
মায়ের কাছে এসে ধীরে ধীরে তার থুতনি তোলে। বলে, ‘বেচারাদের এমন ধমক ধামক দিয়েছ, দেখি বাইরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে একশা হচ্ছে। রকিটারই কষ্ট বেশি। ছানাপোনাগুলোকে বাঁচাতে কী করবে, কী না করবে, বুঝেই পাচ্ছে না। ভাগ্যিস দেখলাম, নিয়ে এলাম কোলে তুলে’।
চিলেকোঠায় এসেই পিয়ার কোল থেকে হ্যাচর প্যাঁচর করে নামল লুব আর কুশ। তারপর বোঁ করে এক চক্কর ঘুরে নিল দুটোয় মিলে। এটা ওদের প্রিয় জায়গা। টুক করে কখন এক ফাঁকে জয়ার পা দুটোও চেটে নিল। হঠাৎ পিয়াও এক কান্ড করে বসে। মা-কে জাপটে ধরে গালে গাল ঠেকিয়ে সে কী আদর। জয়া হকচকিয়ে তাকায় মেয়ের দিকে। দেখে পিয়া বিড়বিড় করছে, ‘রকিকে দেখে ভীষণ মায়া হচ্ছিল, জানো মা। হট করে তোমার মুখটা ভেসে উঠল। আচ্ছা মা, সব মায়েরাই কি এমন করে সন্তানদের ভালবাসে? আমি আজ বুঝছি, তুমি কতটা আমায় ভালবাস। মায়েদের ভালবাসাটাই অন্যরকম। সবার থেকে আলাদা’।
পিয়া বলছে আর কাঁদছে। হ্যাঁ, একটুও ভুল দেখছে না জয়া। পিয়া কাঁদছে, মা-কে আড়াল করে একবার চোখও মুছে নিল। তারপর ছুটে গিয়ে আবার লব কুশকে কোলে নিয়ে দুদ্দাড় সিঁড়ি ভেঙে নীচে চলে যায়।
তখন থেকে জয়া ভেবেই চলেছে, শুধু ভেবেই চলেছে। মায়ের ভালবাসা আবার নতুন করে আবিষ্কার করতে শিখল পিয়া, আবার ওর চোখে জল, আবার লব কুশের প্রতি ভালবাসা। তাহলে কি আগের সেই পিয়াই জেগে উঠছে ধীরে ধীরে?
জয়ার মন বলছে আর দেরি নেই। এর পর মাতৃত্বের তৃষ্ণাও ওর জাগবে। হয়তো ধীরে, খুব ধীরে।
তখন রাত কটা খেয়াল নেই জয়ার। ঘড়ির দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করছে না। শুধু সন্তর্পণে নিজের মোবাইলটা হাতে তুলে নেয়। অভিকে একটা ফোন করা দরকার। হ্যাঁ এখুনি, এত রাতেই। বলতে হবে, তুমি প্রস্তুত থেকো, আমার পাগলি পিয়াটা যে কোনদিন চলে আসবে তোমার কাছে। আসবেই।
খগেনদা কি এখনও ঠায় বসে নিমগাছতলায়? কই, না তো। কিন্তু গুনগুন সুরটা আসছে কোথ থেকে? ভেজা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ভেসে ভেসে আসছে, ‘নিবিড় ঘন আঁধারে, জ্বলিছে ধ্রুবতারা …’
