ব্ল্যাক বেরি – শাশ্বতী নন্দী

ব্ল্যাক বেরি

এখন ভোর সাড়ে পাঁচটা। আকাশের গায়ে সূর্যর ছোট্ট সিঁদুর টিপ। ধীরে ধীরে সেই সিঁদুর রঙই লেপ্টে যাবে পূব আকাশের গায়ে।

কলকাতায় এ সময়ে মোহর আর দাদু, চুপটি করে বসে থাকত লেকের সামনে, একটা মহুয়া গাছের নীচে। যত আকাশ রাঙা হয়, দাদুর খুশিয়াল মুখে নামে তত খুশির নানা রঙ।

 -হাই মোহর। – কেডস পায়ে হন হন করে হেঁটে গেল শ্রীরাজ। ভিশাখাপটনামের ছেলে শ্রীরাজ, যেতে যেতে হাত তুলল। -কাম অন। জয়েন মি।

মোহর এক পাও নড়ে না। ঘাড় ফিরিয়ে হাসে শ্রীরাজ, ‘ইউ বেঙ্গলীজ আর ভেরি লেজি’।

উঁ, মোহর আড়াল করে ভেংচি কাটল। বাঙালীরা অলস! কাঁচকলা। বাঙালীদের কতটুকু চেনো হে।

তবে শ্রীরাজের সাদা মনে কাদা নেই। ওই না বুঝে দু চারটে আলটপকা কথা ছোড়ে, এইটুকু দোষ। বড্ড মিশুকে ছেলে। টিমে একেকটা মেয়ে এই শ্রীরাজের নামেই পাগল। বলে, ডার্ক, টল অ্যানড হ্যান্ডসাম। ধুস! কাদা কাদা গায়ের রঙ শ্রীরাজের আর বেশ ঢ্যাঙা।

তবে মগজটা খাসা! কোডিং ল্যাঙ্গুয়েজে তুখোড়। আর স্মৃতিশক্তি, ওহ, একশো আটাশ জিবই। একটাই সমস্যা। যখন তখন তোড়ে তেলেগু ভাষা চালায়। তখন ওর বন্ধুরা ছাড়া সবাই বেবাক স্তব্ধ। একেবারে বোবা।

মোহরের মোবাইল বাজছে। মা। ধরতেই এক রাশ টেনশন উগড়ে দিল, ‘তোদের ক্যাম্পাসে কি খুব ঝোপ ঝাড় আছে? আজ ভোরে, উফ, বাবা গো, কী সাংঘাতিক স্বপ্নটা দেখলাম। একটা চিতাবাঘ ঝোপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে …

-মা! আবার শুরু করলে! –মোহর বিরক্ত। এখানে সব সময় সিকিউরিটি ঘুরছে। আধ ঘন্টা পর পর, লাল বাতি গাড়ি টহল মারছে। কোথাও কোনও বিশৃঙ্খলা নেই। ছাড়ো’।

মা ফোন ছেড়ে দেয়, তার রাগের পারদ বেশ চড়েছে বোঝা গেল।

মোহর এবার হাঁটতে শুরু করে। ক্যাম্পাসের ধারে ধারে বাহারি বাগান। রঙ বেরঙের প্রজাপতি আর পাখি ওড়ে। সামনেই একটা পাহাড়, ওর চূড়ায় দাঁড়ালে ক্যাম্পাসটা যেন এক রাজকন্যা। এই ক্যাম্পাসে আর একটা বৈষিট্য হল, ফুলের নামে রাস্তার নাম। এখন যেমন ও দাঁড়িয়েছে ড্যাফোডিলস স্ট্রটে। উজ্জ্বল হলুদ রঙা ফুল ছাওয়া রাস্তা।

দিন পনেরো হল, টমসন অ্যান্ড ববসনে মোহর ট্রেনি হিসেবে ঢুকেছে। কিন্তু এত নিয়মের কড়াকড়ি! যৌথ পরিবারে মানুষ হওয়া আহ্লাদী পাখিটা এই সোনার খাঁচায় ছটফট করে, পালাবার ছক কষে। কিন্তু ট্রেনিং শেষে মাইনা লাফিয়ে দাঁড়াবে ছ অঙ্কে, ভাবলেই পাখি শান্ত।

ক্যাম্পাসের মাঝখানে বিশাল জুবিলি গার্ডেন। তার চারধারে পাক খেতে খেতে এখন জগিং করছে শ্রীরাজ। শরীরে লবণ স্রোত। আর একবার মুখোমুখি দুজনে।

ড্যাফোডিলস কর্ণার ছাড়ালেই মোহরের হস্টেল। ও সেদিকে হাঁটতে থাকে। হঠাত পায়ের আওয়াজ, ঘাড় ফেরতেই দেখে. শ্রীরাজ পেছনে। বাবুর শারীরিক কসরত শেষ হল তবে।

ও এখন কথা বলল না, মাথা মাটির দিকে নামানো। এটাকে বলে নাকি, ‘জপা ওয়াক’। নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে জপ চলছে শ্রীরাজের। দারুণ ধার্মিক ছেলেটা। টানা পাঁচ শো একবার চলবে জপ। তারপর হাঁটা থামাবে।

বাগানের ঝাড়ের মধ্যে একটা গাঢ় বেগুনি ফুলে একটা হলুদ ডানার প্রজাপতি চুপটি করে বসে আছে। ওহ্‌, লাভলি! মোহর থমকে দাঁড়ায়। কী যেন মাথায় চাপল। ধাওয়া করল প্রজাপতিটাকে। তখনই ফোন। আবার মা।

একই রকম উদ্বিগ্ন স্বর। -‘আচ্ছা তখন তোর গলাটা কেমন ন্যাতানো শোনাচ্ছিল। টনসিলটা ভোগাচ্ছে নাকি? গার্গেল করিস না?

-উফ, নাকু নাচাতলে।

-কী ? কী বললি? আবার বল? নাচাচ্ছে তোকে? কে?

নিজের ওপরেই রাগ হল বেদম। কীভাবে যে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল কথাগুলো। তেলেগু কথা। শ্রীরাজ প্রায়ই বলে, বিরক্তি প্রকাশের সময়। পাশে বসে শুনে শুনে, সেও শিখেছে। কিন্তু এবার যে প্রতিটা শব্দের মানে বোঝাতে হবে মা-কে। কপাল!

-শোন, তুই কিন্তু নেচে কুঁদে সময় নষ্ট করিস না। ট্রেনিংটা কঠিন। মানে মানে পার কর। চাকরির বাজারে মন্দা। ইঞ্জিনিয়াররা ফ্যা ফ্যা রাস্তায় রাস্তায়।

-থামবে তুমি মা?

-কেন? ঠিকই বলছি। আমি তো চেষ্টায় আছি, যদি স্পেশল কোনও পাস পাওয়া যায়। তোতে আমাতে থাকতাম হোস্টেলে। আমিই পড়া মুখস্ত করিয়ে দিতাম। চিরকাল যা করিয়েছি। ট্রেনিংটা ভাল ভাবে উতরাতেই হবে।

ভীষণ রেগে উঠবে নাকি হো হো হাসিতে রাগটা বাতাসে মিশিয়ে দেবে, ভাবতে থাকে মোহর। তখনই প্রশ্নটা কানে এল, ‘হ্যাঁ রে তোর ব্ল্যাক বেরির খবর কী? অনেকদিন শুনিনি ওর কথা’।

কে? মোহর চমকায়, তারপরেই লজ্জা পায়। শ্রীরাজকে যে আড়ালে ব্ল্যাক বেরি বলে ডাকা হয়, সে কথাটা একসময় গল্পে গল্পে মা-কেই বলে ফেলেছিল।

-ওমা, কী সুন্দর একটা পাখির গান ভাসছে রে। কী পাখি দেখ তো।

কথার মোড় ঘুরছে, যাক স্বস্তি। মোহর ঘাড় ঘোরায়। ঝাঁকড়া গাছের মাথায় এক কালো কুচকুচে পাখি। দেখতে কালোকুলো, কিন্তু ওর শিসটা সুন্দর। অবিকল বাঁশি।

-নাম জানি না। যাক, তুমি ছাড়ো এখন মা। হস্টেলে ঢুকছি।

মোহর হাঁটতে থাকে জুবিলি গার্ডেনের দিকে। দুজন ছেলেমেয়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে। রোজই আসে ওরা। ঠিক এই সময়ে। দুজনই ট্রেনি ইঞ্জিনিয়ার। দক্ষিণ ভারতীয় ভাষায় কথা বলে। প্রেমের কথা। আড়ি না পাতলেও বোঝা যায়। প্রেমের ভাষা আলাদা, অভিব্যক্তি আলাদা। কথাগুলো গুনগুন গান হয়ে ভেসে বেরায় বাতাসে।

ছোটবেলায় খুব প্রেম করার ইচ্ছে ছিল তারও। ছোটখাট একটা হয়েওছিল। কিন্তু মা বলেছে, প্রেমে পড়া বারণ। -‘প্রেম করেছিস কী, লাইফ লোডশেডিং। তোকে ওপরে উঠতে হবে, অনেক ওপরে। তোকে নিয়ে কত স্বপ্ন।

তখন মোহর ছোট। জোরে বলার সাহস নেই। তাই বিড়বিড় করত আপন মনে, ‘ওপরে! কত ওপরে মা? মাপটা বলে দাও। ওই আকাশের কাছাকাছি? তাহলে তো ছুঁতেই পারব না কিছু। এই মাটি, গাছ, ফুলপাতা আর তোমাকেও। সবই নাগালের বাইরে।

মা বিলি কাটতে কাটতে অন্যমনস্ক চোখে দূরের দিকে তাকিয়ে বলত, ‘দরকার কী মাটি ছোঁয়ার? মাটি এখন রুক্ষ্ম। কিছুদিন পর আর ফুল ফুটবে না। থাকবে শুধু কাঁটা ভরা ক্যাকটাস। সারদা মিশনে আমিও ফার্স্ট গাল ছিলাম। কত স্বপ্ন জমিয়ে ছিলাম ঝোলা ব্যাগে। কী হল? সব জলে। তোর বাবার রাগ জেদ মেটাতে মেটাতেই …

কথাগুলো আর শেষ করতে পারত না মা। শুধু একটা হাহাকার বাতাসে পাক খেত।

মোহরের মনটা হঠাৎ ছটফট করে। কান্না পায়। ফুঁপিয়ে উঠে বলতে ইচ্ছে করে, আমি মাটির কাছাকাছিই থাকতে চাই, মা। সকলের সঙ্গে, একসাথে। আকাশ বড় একলা, নিঃসংগ।

মায়ের লাইন কখন কেটে গেছে খেয়াল করে নি।

একটা ফার্ন গাছের সামনে কী ভেবে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ও। মনটা হু হু করছে। চোখে জল। একেক সময় বড় ক্লান্ত লাগে। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে করতে মনে হয় জীবনটাই ফুরিয়ে যাবে। তবু মা-কে কষ্ট দিতে বুকে বাজে।

শ্রীরাজের গলা পেয়ে পেছন ফেরে, ‘হোয়াই আর ইউ স্ট্যান্ডিং হিয়ার অ্যালোন? এনি প্রবলেম ?’

মোহর অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে মাথা নাড়ে। গাল বেয়ে চোখের জল নামছে। শ্রীরাজ দেখে ফেলল না তো ওর কান্না?

সেই হলুদ ডানার প্রজাপতিটা এখন ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়ছে ওর চারপাশে। ইচ্ছে করলেই ধরে ফেলা যায়। কিন্তু ইচ্ছেটা আর এল না।

শ্রীরাজ আর একটু সামনে এগিয়ে এসে ফার্ন গাছের একটা পাতা ছেঁড়ে। ওর দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বলে, ‘মায়ের জন্য মন কেমন করছে, বুঝি?’

-কেন? না তো। – মোহর নিজেকে লুকোতে চায়।

-আমি জানি মা-কেই তোমার মনে পড়ছে। বোকা মেয়ে। আর তো কটা দিন। ট্রেনিং শেষ হলে হোম টাউনের জন্য অ্যাপলাই করবে। কেঁদো না। – হাত বাড়িয়ে গাছের পাতাটা দেয় ও, এই নাও। এটা গালে বুলিয়ে নাও। মনে হবে মা তোমায় আদর করছে।

মোহর অবাক।

শ্রীরাজ ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলে, ‘তুমি তো লাকি। দূর থেকেও মায়ের গলার স্বর শুনতে পাও। আমার মনেই পড়ে না মা-কে। সেই কোন ছোটবেলায় ছেড়ে চলে গেছে। তারপর থেকে ঠাকুমা দাদুই সব। ওঁদের মনে পড়লে আমি গাছ, ফুল, পাতাদের সঙ্গে কথা বলি, ওরা দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। আমার ঠাকুমা গাছপালা খুব ভালবাসেন।

শ্রীরাজের কথায় ম্যাজিক হল। ফার্ন গাছের পাতাটা গালে বোলাতে বোলাতে চোখ বুজে আসছিল। সত্যি, মা বুঝি ওর পাশেই। সেই একই রকম সুড়সুড়ি!

(২)

চার মাসে পড়ল ক্যাম্পাস জীবন। তবু বাড়ির কথা, স্কুল, কলেজ বন্ধুদের কথা এমনকি জয়কেও আজকাল মনে পড়ে খুব। ছোটবেলার প্রেম, তবু কী গভীর। কত বিকেল নাবালক দুই প্রেমিক প্রেমিকা হাত ধরাধরি করে পথ হেঁটেছে।

তখন ওরা মাধবপুরে। স্কুলের পর হেঁটে ফিরত। কখনও ধু ধু মাঠ, ভাট ফুলের বন, শালুকভরা নয়ানজুলি, একের পর এক পেরিয়ে গেছে। তবু কথা ফুরোয় নি।

প্রেমটা কিন্তু টেঁকে নি। মা বাধ সেধেছিল। -‘শেষ কালে জয়? কোনমতে এইচ এস পাশ ছেলে। আর তুই! কত ব্রিলিয়ান্ট। ওই সবের থেকে বেরিয়ে আয়। জীবন একটাই, নষ্ট করবি? পথ হারিয়ে অন্ধকারে ডুবে যাবি তো’।

হারিয়েই তো যেতে চেয়েছিল। জয়কে ছাড়া পৃথিবী শূন্য। কিন্তু মা শূন্য হতে দিল না। – আরে বোকা মেয়ে, প্রেম কি একবারই আসে জীবনে? আবার আসবে। এবার দেখবি এক রাজপুত্তুর। টগবগ করে ঘোড়ায় চেপে … নিজের কথায় নিজেই হেসে উঠেছে মা। হাসতে হাসতে চোখের কোণা পেরিয়ে জল হু হু করে নেমেছে। মোহর মুছিয়ে দিয়েছে। অস্ফুটে বলেছে, ‘কবে, কবে আসবে সেই প্রেমের ফেরিওলা? আমি বড় একা মা।

(৩)

শ্রীরাজের সব কিছুই বেশ লাগত মোহরের। কিন্তু যখন তোড়ে তেলেগু ভাষা চালাত বন্ধুদের সঙ্গে … উফ, কান ঝাঁ ঝাঁ করত। ইল্লে ইল্লে শব্দটা বার বার কানে আসত। একদিন বলতেই হেসে বলে, ‘ইল্লে মানে তো না। তুমি শুধু ইল্লেই শুনতে পাও। আমরা তো আরও কত কথা বলি। সব তোমাকে নিয়ে।

-অ্যাঁ ! আমাকে নিয়ে? –মোহর ঢোঁক গেলে। কী কথা?

শ্রীরাজ লজ্জা পায়, ‘বলব? যদি রাগ কর?’

-সে কী! রাগ হবে বুঝি শুনলে? তাহলে তো না শুনে ছাড়বই না। বলো, বলো।

শ্রীরাজ সময় নিচ্ছে নিজেকে প্রস্তুত করতে। একটু ইতস্তত ভাব, ‘বলি, তোমার সব সুন্দর। কেবল মানুষটা তুমি ভীষণ কম মিশুকে। কারোকে বন্ধু করতে চাও না।

-ব্যস, এইটুকু! না, না, রাগ করলাম না মোটেই। – মোহর হাসে।

মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিনে মা কলিং। ধরতেই বলে, ‘কী করছিস?’

-এই শ্রীরাজের সঙ্গে গল্প স্বল্প চলছে। জানো ওরা আমাকে নিয়ে কী আলোচনা করে? – বলেই খানিক আগের সব কথা উগড়ে দিল।

পুরনো অভ্যেস, মা-কে না বলে যেন শান্তিও পায় না। কিন্তু সব শুনে মা অমন একটা রায় দেবে, ভাবনাতেই ছিল না। -‘ ব্যাপারটা কিন্তু ভাল বুঝছি না রে। এসব কথা সব তোকে মিস গাইড করার জন্য। নিজেকে যত তুই সুন্দরী ভাববি, নিজের প্রতি বেশি মনোযোগী হবি, তত তোর পড়াশোনা মাথায় উঠবে। ট্রেনিংয়ে ডাহা ফেল। আর ওরা তাল বুঝে তোকে টপকে চাকরি বাগিয়ে চলে যাবে। না, না, তোকে অনেক ওপরে উঠতে হবে। আমার কত স্বপ্ন!

ওফ্‌, আবার স্বপ্ন! রাগ করে ফোন ছেড়ে দিল মোহর।

ঘন্টা দুয়েক পর আবার ফোন। ওপাশে মা। রাগ করেও রাগ করতে পারে না মোহর। হেসে বলে, ‘আবার কী ?’

-বলছিলাম কী, – মা ঢোঁক গিলল, -তুই সাউথ ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজে একটা সর্ট কোর্স করে নে বরং। ওদের কথাবার্তা বুঝতে সুবিধা হবে। এমনও তো হতে পারে, হয়তো তোর পেছনে কেউ কাঠি করছে …

অসম্ভব! আর পারা যাচ্ছে না। রাগ করে মোবাইলটাকে একেবারে সুইচড্‌ অফ করে দিল মোহর। শ্রীরাজ লাঞ্চ ব্রেকে এসে ওর মুখের ভাব দেখে হাঁ করে তাকিয়ে রইল খানিক।

মোহর ভ্রু কোঁচকায়, ‘কিছু বলবে?’

-সাহস পাচ্ছি না। যা রেগে আছো। আচ্ছা তোমরা সুন্দরীরা এতো রাগো কেন বলো তো? সব বিউটিকে ওই রাগ একেবারে পুড়িয়ে কয়লা করে দেয়।

-রাগ এলে কী করব? রাগব না?

-না, তুমি অন্তত রাগ কোর না। আমার খারাপ লাগে। – বলেই শ্রীরাজ তেলেগু ভাষায় খটমট কী একটা শব্দ বলে ওঠে। বেশি খুশি হয়ে উঠলেই ও ইঙ্গরেজির মাঝখানে তেলেগু গুঁজে দেয়।

মোহর শুনে হেসেই অস্থির, ‘এটা কী বললে?’

শ্রীরাজও হাসল, ‘যাক, হাসলে যে অ্যাট লাস্ট। এভাবে সব সময় হাসবে। রাগকে ধারে কাছে ঘেঁষতে দেবে না। একান্তই যদি এসে পড়ে রাগ, ভাববে একটা অদৃশ্য ক্যামেরা তোমাকে ফলো করছে। যেই তুমি রাগলে অমনি ক্লিক ক্লিক। ছবি উঠে গেল। এবার সেই বিশ্রী মুখের ছবি যাবে তোমার প্রিয়জনের কাছে।

আবার হাসল মোহর। শ্রীরাজ একটা আঙুল তুলে বলে, ‘স্ট্যাচু। একটুও নড়বে না কিন্তু। একটা স্ন্যাপ নেব মোবাইলে। তুমি রেগে থাকলেই এই হাসিখুশি ছবিটা দেখব’।

কথাগুলোয় কেন যে গা-টা শিরশির করে ওঠে মোহরের।

(৪)

 খবরটা শুনে হতবাক হয়ে গেল মোহর। শ্রীরাজ ট্রেনিং শেষের আগেই চলে যাচ্ছে ক্যাম্পাস ছেড়ে। গ্রামে ওর ঠাকুমা ভীষণ অসুস্থ। দাদু অষ্টাশি বছরের বৃদ্ধ। অসুস্থ স্ত্রী আর জায়গা জমি কিছুই দেখভাল করার ক্ষমতা নেই। শ্রীরাজই ওঁদের একমাত্র ভরসা।

-তাই বলে তোমার কেরিয়ার জলাঞ্জলি দিয়ে চলে যাবে? এত ভাল চাকরি, এত প্রসপেক্ট! দাদু ঠাকুমা আর কদিন? তারপর তোমার জীবন? – মোহর আকুল হয়ে বোঝাবার চেষ্টা করে।

শ্রীরাজ হাসল। দার্শনিকের মতো বলল, ‘যাঁদের আলোয় এতদিন আলোকিত হলাম, এই দুর্দিনে তাঁদেরই অন্ধকারে রেখে দেব ? অসম্ভব। পারব না’।

মোহরের মনটা এখন জলভরা মেঘ হয়ে আছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, আবার তার পৃথিবীটা শূন্য হতে চলেছে।

সেদিন মা ফোন করতেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।

মা উদ্বিগ্ন, ‘কী হয়েছে সোনা, ব্যথা পেয়েছিস কোনও? আমায় বল, সেই মন্ত্রটা পড়ে ব্যথা সারিয়ে দেব ছোটবেলার মতো।

মেঘটা ভেঙে এবার গুড়ো গুড়ো হয়েছে। বৃষ্টি ঝরা গলায় মোহর বলে, ‘ডাহা বোকা, জানো ওই ব্ল্যাক বেরি। ও কিচ্ছু বোঝে না। কারোর কথা ভাবে না। শুধু দাদু ঠাকুমা’।

মা আজ গম্ভীর। সব শুনল মন দিয়ে, কিন্তু মুখে নো কমেন্টস। শুধু দুটো বাক্য শুনিয়ে লাইন কেটে দিল। -‘অমন কান্নাকাটি কর না। তোমার কান্না শুনলে আমারও কান্না পায়।

(৫)

আজ শ্রীরাজ চলে যাচ্ছে ক্যাম্পাস ছেড়ে। মোহরের বুকটা অসম্ভব ফাঁকা। মা-ও আজকাল তেমন ফোন টোন করে না। তাহলে কাকে যে কথাগুলো শেয়ার করবে? মোহরের একা লাগছে।

দুপুরের ট্রেনে শ্রীরাজ চলে যাবে। মোহর ঠিক করেছে একটা স্পেশাল গেট পাস জোগাড় করে ওকে ষ্টেশনে গিয়ে সি অফ করে আসবে।

মায়ের ফোন এল বেলা দশটা নাগাদ। বেশ ব্যস্ত সমস্ত গলা, ‘কয়েকটা লাইন ইংরেজিতে লিখে নে তো চটপট’।

মোহর বিরক্ত। -কিসের লাইন? এখন পারব না। শ্রীরাজ এক্ষুনি চলে যাবে। আমার মন খারাপ।

-সে তো হবেই। তবে এত ইমোশনাল হওয়াও ভাল নয়। জীবনে বন্ধুদের যাওয়া আসা তো লেগেই আছে। নে, যা বলছি তাড়াতাড়ি লেখ।

দুর্বোধ্য কতগুলো বাক্য মা বলে গেল এবং হোঁচট খেতে খেতে সেগুলো লিখে ফেলল মোহর। বহুবার মনে হয়েছে কলমের নিব এবার বুঝি ভাঙ্গল। লেখা শেষ হওয়ার পর বেশ রাগী গলায় ও জিজ্ঞাসা করে, ‘এসবের মানে কী মা? এসব ছাইপাঁশ কী লেখালে আমাকে দিয়ে? কী ভাষা এটা? হিব্রু?’

মা হেসেই বাঁচে না। -‘না তেলেগু’।

-মানে? তুমি তেলেগু ভাষা শিখলে কোথ থেকে?

-কোথ থেকে আবার? সর্ট কোর্স করে ফেললাম। তুই তো আর শিখলি না। অগত্যা আমাকেই … যাক গে। ওই লাইন কটার মানে কিছু বুঝলি?

-পাগল নাকি? আমি কী করে বুঝব?

মা এবার গম্ভীর। বলে, ‘মানেটা হল, তুমি যেখানেই থাকো, জানবে সব সময় আমি তোমার পাশে আছি। তোমার মতো এমন বিরল মানুষের অপেক্ষায় আমি কতদিন ধরে ছিলাম। অবশেষে খুঁজে পেলাম’।

-এগুলো কাকে লিখব মা?

-ন্যাকা! তোমার ব্ল্যাক বেরি আবার কাকে। থুড়ি শ্রীরাজকে। চটপট ওই লাইন কটা ও-কে এস এম এস করে দাও।

মানে? কী বলছে কী মা? মোহর স্তম্ভিত। এসব কথা কে বলছে? তার মা ? তাহলে সেই রাজপুত্তুরের গল্পটার কী হবে? শ্রীরাজ কি রাজপুত্তুর নাকি? ভুসো কালি মাখা এক ছেলে…। যদিও এই কালো ছেলেকেই ও কোন অজান্তে ভালবেসে ফেলেছে।

তবে শ্রীরাজ তো সব রাজ ঐশ্বর্য ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এমন চাকরি, এমন প্রসপেক্ট, সব জেনেও মা কেন তাহলে …মা-কে তো ও চিরকাল বড় হিসেবী জানত।

-কী হল, আবার কী ভাবতে বসলি? এস এম এসটা পাঠিয়ে দে তাড়াতাড়ি। আর শোন, খবরদার ওকে আর ব্ল্যাক বেরি বলে ডাকবি না। ও তোর ব্ল্যাক প্রিন্স। বলেছিলাম না সে একদিন আসবে। আসবেই।

মোহর স্তব্ধ। বাঁধ না মানা চোখের জল ওর দু গাল ভাসিয়ে চলেছে।

হঠাৎ মায়ের হাসির শব্দ, ‘আরে বোকা মেয়ে, অন্ধকার খনির ভেতরেই যে মহা মূল্যবান হিরে থাকে।

মোহর কাঁদতে কাঁদতেই এবার হাসছে আর বলছে, আমার মা সব জানে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *