ঝরণার পাশে এক রাত – শাশ্বতী নন্দী

ঝরণার পাশে এক রাত

চিরকালই আমি একটা আলাদা ক্লাস মেইনটেইন করি। করব না কেন? চেহারায়, শিক্ষাগত যোগ্যতায়, চাকুরির পদ মর্যাদায়, সবেতেই আমি এগিয়ে। কিন্তু ‘বউ’ পছন্দ করতে গিয়েই সব গুবলেট। সাদামাটা ঝিমলিকে পছন্দ হয়ে গেল, ওর চোখে যে কী ছিল, এত টেনেছিল! কেমন মায়া জড়ানো।

আর ওই যে কী একটা কথা শুনিয়েছিল প্রথম দেখায়, শুনেই বোল্ড আউট। ঝিমলি বলেছিল, ‘আমার খুব ইচ্ছে করে জানেন, কোনও এক অমাবস্যার রাতে একটা মোমবাতি জ্বেলে ঝরণার পাশে বসে থাকব’,

ব্যস, প্রতিজ্ঞা করলাম, বিয়ে করলে ওকেই করব।

আমাদের প্রথম দেখা, একটা ছিমছাম রেস্তোরায়। একাই এসেছিল ঝিমলি, প্রস্তাবটা আমার। ওই মান্ধাতা আমলের সিস্টেম, মেয়ের বাড়ি গিয়ে মেয়ে দেখে আসা, একগাদা খাবার গাতিয়ে গিলে মেয়ের বাবার টাকা ধসিয়ে দেওয়া, ছিঃ! আই হেট।

একটা দুধ সাদা সালোয়ার কামিজ, লম্বা বিনুনি, সামনে টেনে বুকের ওপর ফেলা, মিথ্যে বলব না, আমার চোখের পলক পড়ে নি কয়েক সেকেন্ড। সুন্দরী নয়, তবু যেন ওর মধ্যে কী একটা ভীষণ সুন্দর। ঠোঁটে হাল্কা গোলাপি লিপস্টিক। একটা শিশির ফোঁটার মতো ছোট্ট স্টোন টিপ দুই ভ্রুর মাঝখানে।

 রেস্তোরার ভেতরটা আধো অন্ধকার, কাছের মানুষও ছায়া ছায়া। হাল্কা মিউজিক চলছিল। ঝিমলি একটু অস্বস্তিতে, টেবিলে রাখা জলের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল বার বার। আমারও কী বলি, কী বলি ভাব, স্মার্ট যতই হই, চট করে মেয়েদের সংগে ভাব জমাতে পারি না, কিছুটা অহং বোধের জন্যই হয়তো।

-বলছি কী, একটু বাথরুমে যাব? – ঝিমলি লাজুক লাজুক হয়ে বলল।

 -হ্যাঁ যান, ওই দিকে ওয়াশ রুম।

 ঝিমলি মুচকি হেসে চলে যায়। আমি মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি করছি। হঠাৎ দেখি ও ফিরে আসছে।

 -কী হল, খুঁজে পেলেন না? ওই তো ওদিকে।

 ঝিমলি হি হি হাসছে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, না পাওয়ার কী আছে। ওটা নাকি ওয়াশ রুম? ছিটেফোঁটা জায়গা, নড়াচড়ার উপায় নেই। আচ্ছা, ওয়াশ রুম কেন বলে বলো তো? হি হি হি।

 অবাক হলাম। হঠাত ওর মুখে কথার তুবড়ি! প্রথমে তো বেশ ঝিমিয়ে ছিল। তাহলে কি টয়লেট চেপে বসেছিল বলেই অস্বস্তিতে… হতেই পারে। একদম অপরিচিত পুরুষের সামনে।

যাই হোক, ওর হাসিখুশি ভাবটা বেশ লাগল। লক্ষ করলাম, ঝিমলি আপনি থেকে তুমিতে এসেছে। সুবিধেই হল। আপনি, আজ্ঞেতে বেশিক্ষণ কথা চালানো যায় না।

 -এই রে, দাঁড়াও, দাঁড়াও, বাথরুমে রুমালটা ফেলে এসেছি। ওহ্‌, সরি, ওয়াশরুমে ফেলে এসেছি। হি হি হি। – ঝিমলি হাসতে হাসতে দৌড়ে চলে গেল আবার।

 কিন্তু ও চলে যেতেই, একী! ওই তো রুমাল, টেবিলের কোণায় পড়ে, মোবাইল দিয়ে চাপা দেওয়া, আমি পেছন থেকে যে ডাকব, তার আগেই ভ্যানিস। বাবা, কী হড়বড়ে মেয়ে!

 অনেকক্ষণ কেটে গেছে। ওয়েটর খাবারের অর্ডার নিতে এসেছে। বুঝতে পারছি না ঝিমলির কী পছন্দ। কিন্তু এতক্ষণ লাগছে কেন? পেট ফেট বিগড়ালো নাকি? রুমাল আনার ছুতো করে …

 ওই তো আসছে, বাব্বা এতক্ষণ! সামনে এসে চেয়ারে ধপ করে বসল। ভিতু ভিতু মুখ, ঘামে কপাল চকচকে। হেসে বললাম, ‘কী হল?’

 -দরজায় লক লেগে গিয়েছিল। কী গেড়ো। এদিকে মোবাইলও ফেলে গিয়েছি, আপনাকে যে বলব… – টেবিল থেকে রুমালটা তুলে মুখ মুছল ও। একটা বোকা বোকা হাসি দিয়ে বলে, ‘না পেরে দরাম দরাম ধাক্কা দিলাম দরজায়, সেই শুনেই একজন স্টাফ নানা কসরত করে বাইরে থেকে কীভাবে যেন লক খুলল। এত খারাপ লাগছিল, একা বসে আছেন, কোনও খবরও দিতে পারছি না’।

 আবার আপনি সন্মোধনটা ফিরে এসেছে, আগের সেই কলকলানিটাও নেই। মুখের কাছে জলের গ্লাস তুলে আলতো ভাবে বলি, ‘আপনার রুমাল তো টেবিলেই পড়ে আছে, তড়িঘড়ি ছুটলেন কেন ওটা খুঁজতে?’

 -রুমাল খুঁজতে, আমি? না তো। – ঝিমলির কপাল জুড়ে রেখার আঁকিবুঁকি। এমন করে আমার দিকে চেয়ে আছে, এক রাশ সন্দেহ যেন চোখে। আমি চোখ নামিয়ে নিই।

 ও ঢকঢক করে জল খেল পুরো এক গ্লাস, একটু যেন অন্যমনস্ক। তারপর বড় করে একটা শ্বাস টেনে আমায় অবাক করে বলে, ‘একটা হাসনুহানা ফুলের গন্ধ পাচ্ছেন?’

-অ্যাঁ! – আমি চমকে তাকাই। -হাসনুহানা ফুল! তার গন্ধ কেমন আমি জানি না।

-কোনও মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছেন না? – ঝিমলির মধ্যে কেমন অস্থির অস্থির ভাব। – আমি কিন্তু পাচ্ছি।

মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। ওয়েটর আবার সামনে এসে দাঁড়ায়, ‘আপনাদের অর্ডারটা?’

-বলুন কী খাবেন। আরে ছাড়ুন তো, কেউ হয়তো ওই হাসনুহানা ফুলের কোনও পারফিউম লাগিয়ে এসেছে। -মেনু কার্ডটা বাড়িয়ে দিলাম ওর দিকে।

 ঝিমলি তখনও অন্যমনস্ক, ‘আচ্ছা, ওই মেয়েটি যে এখানে এসেছিল বললেন, দেখতে কি ঠিক আমার মতো? চুলটা ছোট না এরকমই বিনুনি বাঁধা?

 -কী জানি। অত লক্ষ করি নি। অর্ডারটা দিয়ে দিন।

 ঝিমিলি হাত থেকে মেনু কার্ডটা নেয়, সহজ হবার চেষ্টা করে একটু হাসল, ‘জানেন, আমার মতো দেখতে নাকি আর একটি মেয়েও আছে, হুবহু এক। কে জানে হয়তো সেই এসেছিল, টেবিল ভুল করে এখানে চলে এসেছে। যাই হোক, আমি চাইনিজ ভালবাসি, তবে গ্রেভিওলা নয়, হাক্কা। খেয়েই কিন্তু বাড়ি ছুটব। অনেক বেজে গেছে’।

 -শিওর। আমি ড্রপ করে দেব। এবার কি আমরা একটু ব্যক্তিগত কথা আলোচনা করতে পারি?

 -হ্যাঁ, বলুন না।

 কথাবার্তা শুরু হতেই বুঝলাম, মেয়েটা সরল। তবে সব সময় যেন কল্পনার ফানুসে ভেসে বেড়ায়।

(২)

কথা ছিল ঝিমলিকে বাড়িতে নামিয়েই ফিরে আসব। আটকালেন ওর বাবা। ‘ছিঃ, বাড়ির দোরগোড়ায় এসে, এক কাপ চা অন্তত …

অগত্যা … ভেতরে ঢুকেই দেখি বেশ ছিমছাম ঘর বাড়ি। দেয়ালে টাঙানো

সুন্দর সুন্দর ছবি। আমি ঘুরে ঘুরে দেখছি। ইতিমধ্যেই চা, সঙ্গে টুকটাক খাবারও এল। ঝিমলি মা মরা মেয়ে। সংসারে এক পিসিই মায়ের মতো আগলান। উনিই বললেন কথাটা, ‘জানো, ছবিগুলো সব আমাদের মেয়ের আঁকা। একসময় কত প্রাইজ পেয়েছে’।

 -ও বাবা, তাই! কই, এত কথা হল, আঁকার কথা তো ও বলল না।

সবাই চুপ। ঝিমলির বাবার মুখে কষ্ট, ‘কী বলবে? মাথায় পাগলামি, কার ওপরে অভিমান করে যে আঁকা ছাড়ল। দেখো আলমারিতে রঙ, তুলি, কাগজ, সব গুছিয়ে তুলে রেখেছে। ঝিমি মা, তোর ওই ছবিটা দেখা না? রাজ্যপালের হাত থেকে পুরস্কার পেয়েছিলি যার জন্য?’

ঝিমলির মুখে অনিচ্ছা। তবু বাবার কথা ফেলতে পারল না। উঠে ছবিটা আলমারি থেকে বার করে। সত্যিই দৃষ্টি ফেরানো যায় না। অসাধারণ!

-তোমার পছন্দ? নিয়ে যাও না। – ওর বাবা বলেন।

-এমা তা হয় নাকি?

-তুমি নাও, এমন আঁকা ওর আরও আছে। – ঝিমলির বাবার জোরাজুরিতেই না নিয়ে পারলাম না।

কিন্তু ঝিমলির ব্যাজার মুখ, অনেকখানি অনিচ্ছায় যেন হাতে দিল ওটা।

যাই হোক, একটা পলি প্যাকে ছবি গুছিয়ে গাড়িতে বসলাম। শীতের রাত, ফাঁকা রাস্তা, গাড়ি চালাচ্ছি উড়িয়ে। রাস্তার আলোগুলোর চারপাশে জমাট হলুদ কুয়াশা। হঠাৎ, একী! আমার গাড়ি থেকে কয়েক হাত দূরে একটি মেয়ে! আলুথালু শাড়ি, খোলা চুল। হাত দেখিয়ে গাড়ি থামতে বলছে।

কী ব্যাপার? ধন্দে পড়লাম। গাড়ি থামালে কোনও বিপদে পড়ব না তো? হর্ণ বাজাই, তবু ও সরে না। বরং আরও কাছে চলে আসছে। প্রাণপণে ব্রেক চাপি। ও হাত বাড়িয়ে কী যেন বলতে বলতে ডান দিকে চলে এল। জানলার কাচ আগেই তোলা ছিল। মেয়েটি কাচের ওপর টোকা দিতে থাকে, হাত বাড়িয়ে কী যেন চাইছে।

পকেটে হাত ঢুকিয়ে কয়েকটা টাকার নোট, জানলা অল্প ফাঁক করে বাড়িয়ে দিলাম। খিলখিল একটা হাসি। মেয়েটা হাসছে আর বলছে, ‘টাকা না, টাকা না, ছবি দে’।

মানে? আমি ঘামতে শুরু করলাম। কোন ছবি? ঝিমলির আঁকাটা? অসম্ভব! আমি দাঁতে দাঁত চিপে গাড়িতে স্টার্ট দিই। ও একটু টাল খেয়ে পেছনে সরে যায়। আমি উর্ধ্বশ্বাসে গাড়ি ছোটাই। অত রাতে সিগনালের বালাই নেই, তবু মনে হল কে যেন উন্ডস্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাত পেতে আছে, ‘ছবিটা দে, দে বলছি’।

(৩)

পরদিন ঘুম ভাঙল দেরিতে। ঝিমলির কল। ‘এখনও ঘুমোচ্ছেন?’

-ব্যাচেলার লাইফের এই তো মজা। আজ দেরিতে বেরোব। বলুন কী মনে করে?

-ছবিটা ঠিকঠাক রেখেছেন তো? আসলে ওটা আমার প্রিয় ছবি। কখনও কাছ ছাড়া করি নি’।

-বুঝেছি, ছবিটা ফেরত দিতে হবে। রাইট? পেয়ে যাবেন।

-বেরোবার পথে দিয়ে গেলে ভাল হয়।

ঝিমলিদের বাড়ি ঢোকার মুখেই যে বড় রাস্তা, ওখানে এসে ও অপেক্ষা করল। ছবিটা হাতে পেয়ে মুখে অনাবিল হাসি। আমিও ভারমুক্ত, যার জিনিস, তার জিম্মাতেই থাক বাবা।

দিনে দিনে দুজনের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। বাবা, মা মুম্বাই থেকে এসে মেয়ে দেখে গেলেন। মাস দুয়েকের মধ্যে বিয়ে সারা।

হানিমুনে এলাম উত্তর বঙ্গের এক পাহাড়ি গ্রামে। নতুন বৌ, তার পছন্দেই আমার পছন্দ। যদিও মন চাইছিল বিদেশে হানিমুনে গেলে বেশ হত। তবে নিরিবিলি এ জায়গাটা যেন এক টুকরো স্বর্গ। ঝিমলি আবার রঙ, তুলি টেনে নিয়েছে। ও যখন আঁকে, আমি বাইরেটা ঘুরে ঘুরে দেখি। বাংলোয় আমরা দুজন ছাড়াও কেয়ারটেকার রামভকত আর ওর বউ লাইকা আছে, তবে সন্ধ্যের পর ওরা ফিরে যায় নিজেদের ডেরায়।

লাইকা মেয়েটা বেশ। বাঁশ পাতার মতো ফিগার, চূড়ো করা বাঁধা চুল। ওর শরীর থেকে সব সময় একটা ফুলের গন্ধ ওড়ে। তবে মেয়েটা ডাকাবুকোও যথেষ্ট। একদিন দেখি গলায় একটা সাপ জড়িয়ে দিব্যি ঘুরে বেরাচ্ছে। রামভকত বলে, ‘পোষা সাপ, কিচ্ছু বলে না। লাইকা ওর বন্ধু’।

একদিন পাহাড়টা পায়ে হেঁটে ঘুরতে বেরলাম। একাই, ঝিমলি ভাত ঘুম দিয়েছে। মাঝ রাস্তায় দেখি লাইকা হাজির। -তুই বাবু, আমারে নিয়ে এলি না কেনে? একা একা পাহাড়ি পথ, হারায়ে যাবি’।

সত্যি ও পথ চিনিয়ে নিয়ে চলল। ঘুরে ঘুরে একসময় পা ক্লান্ত। যখন বাংলোয় ফিরলাম, বেশ বেলা হয়েছে। খিদেতে পেট চুই চুই। ঘরে ঢুকে দেখি ঝিমলি অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। চোখ মুখ লাল।

-কী হল? শরীর খারাপ নাকি?- বলতে বলতে কপালে হাত দিই। জ্বরে গা পুড়ছে। সর্বনাশ!

ও চোখ খুলে তাকায়, ঘোলাটে দৃষ্টি, তাতে কেমন অভিমান। এতক্ষণ ছিলাম না হয়তো তাই, বা লাইকা সঙ্গে ছিল। কিন্তু জানবে কী করে? হয়তো আন্দাজ। মেয়েদের ষষ্ঠেন্দ্রিয় প্রখর।

রাতে ওকে জোরাজুরি করেও খাওয়াতে পারলাম না। নীচে ডাইনিং। আমি দু গ্রাস মুখে দিয়েই ঘরে ছুটে আসি। দেখি লাইকা বিছানার কোণা ঘেঁষে বসে ঝিমলির মাথা টিপছে। আমায় দেখেই বেরিয়ে গেল।

ঝিমলি হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘ওকে আমার কাছে পাঠিয়েছ কেন? ও ছবি চুরি করতে এসেছিল। ভাগ্যিস হাতে নাতে ধরে ফেললাম’।

মানে? ঝিমলি কি জ্বরের ঘোরে ভুল বকছে? তাড়াতাড়ি একটা ওষুধ খাইয়ে বলি, ‘এখানে কোনও ভাল ডাক্তার বদ্যি নেই। চল, কালই কলকাতায় ফিরি’।

-অসম্ভব। – ঝিমলি হাত চেপে ধরে। – পরশু অবধি থাকতেই হবে। অমাবস্যা ওইদিন। আমি ঝরণার পাশে বসে ছবি আঁকব। মোমবাতি জ্বলবে পাশে’।

কথা বাড়ালাম না, যা বলে বলুক। একটু পরেই দেখি ও ঝিমিয়ে আসছে, ওষুধের এফেক্ট। হঠাৎ চোখ পড়ল টেবিলে, ঝিমলির আঁকা ছবিগুলো কেমন এলোমেলো করে রাখা। একটা ছবির ওপর প্যালেট উল্টে অনেকখানি রঙ চুইয়ে পড়ছে। ইস্‌, এগুলো কে করল? লাইকা? কেন?

কে জানে, হয়তো কৌতূহলে দেখতে গিয়েছিল, হাত লেগে প্যালেট উল্টে গেছে।

ঠিক তখনই কানে এল ঝিমলির জড়ানো গলা, ‘রিমলি, রিমলি’।

কে রিমলি? কাছ ঘেঁষে আর একটু শোনার চেষ্টা করলাম। ঝিমলি খালি বিছানায় হাত বোলাচ্ছে। ‘কাছে আয়। আয় বলছি। আমি জানি তুই এসেছিস। হাসনুহানার গন্ধ পাচ্ছি। আয় না। আসবি না? কেন? এখনও রাগ, এত অভিমান? তোকে তো ক্ষমা করে দিয়েছি সেই কবে। আয় না। আমায় কষ্ট দিয়ে কী সুখ পাস রে?’

মাথামুন্ডু কিছুই বুঝছি না। অসুখটা বাড়াবাড়ির জায়গায় চলে যাওয়ার আগে ভাবলাম শ্বশুরমশাইকে জানানো দরকার। মোবাইলে ধরলাম তাঁকে।

এত রাতে ফোন পেয়ে বেশ উদ্বিগ্ন শোনাল, ‘ঠিক আছ তো? কোনও বিপদ আপদ …

আমি ওঁর কথা কেড়ে নিয়ে সংক্ষিপ্ত ভাবে যা বলার বললাম, তারপরেই সরাসরি প্রশ্নটা ছুড়ে দিই, ‘রিমলি কে?’

ওপাশটা সম্পূর্ণ নীরব কয়েক মুহুর্ত। এ যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। বেশ খানিক পরে উনি গলা ঝাড়লেন। -‘আমাদের পরিবারের একটা অধ্যয় গোপন করে গিয়েছিলাম তোমায়। কারণ ওটা আমি ভুলতে চাই সম্পূর্ণ। কিন্তু আজ বলতেই হবে। রিমলি, ঝিমলি, আমার মেয়ে। ওরা যমজ বোন। জন্মের পরই স্ত্রী মারা গেলেন। আমার দিদির কাছে দুজনে মানুষ হল।

সে কী! রিমলি ঝিমলির বোন। এতখানি গোপনীয়তার মানে কী!

ওপাশে শ্বশুরমশাইয়ের গলাটা ক্লান্ত শোনাল। ‘জানো মেয়ে দুটো আমার দু রকম। একেবারে দক্ষিণ মেরু, উত্তর মেরু যাকে বলে। ঝিমলি যেমন শান্ত, বাধ্য। রিমলি তেমনি দুর্বিনীত। প্রচন্ড হিংসুক, ঝগড়ুটে, সকলের অপ্রিয়। আর যত রাগ, সব দিদির ওপর। সুযোগ পেলেই দিদির ক্ষতি করবে, ছবিতে কালি ঢেলে নষ্ট করবে’।

কথা শুনতে শুনতে আমি কতগুলো হিসেব মেলাতে মেলাতে চলেছি। কিন্তু শেষ ধাপে এসে সব কিছু থেমে যাচ্ছে।

-এবার যা বলব, শুনে প্লিজ ভুল বুঝো না আমায়। – শ্বশুরমশাই দম নিলেন। কথা যখন শুরু করলেন, কান্না চাপা শব্দগুলো। – তোমার আগে আমার ঝিমলির একটি বিয়ে পাকাপাকি হয়ে যায়। ছেলেটি শান্ত, ভদ্র। দুই পরিবারে ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে। বিয়ের সব ঠিকঠাক, তখনই ওদের পরিবারে একজনের মৃত্যু হয়। বিয়েটা যথারীতি পিছিয়ে দেওয়া হল এক বছরের জন্য।

কিন্তু এই একটি বছরের মধ্যে রিমলি একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলল। ওই ছেলেটির সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেল। পরে শুনেছি বিয়ে থা করে অন্য জায়গায় ওরা সেটল হয়েছে। এই ঘটনার পর আমি আসামের সমস্ত ঘর বাড়ি বেচে কলকাতায় উঠে আসি। অত বড় ব্যবসা, এককথায় ছেড়েছি। বলতে পারো সব ভুলতে’।

ঝিমলির বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

(৪)

 আজ অমাবস্যা। ঝিমলির জ্বর এখনও একশোয় আটকে। তবু মেয়ে জেদ ধরেছে, রাতে ঝরণার পাশে গিয়ে বসবে। এদিকে সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি।

 দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে একটু ফাঁকা জায়গায় ঘুরছিলাম। ঘরে ফিরে দেখি ঝিমলি নেই। কী হল? গায়ে জ্বর নিয়ে গেল কোথায়? লাইকা হাঁপাতে হাঁপাতে আমার ঘরে ঢুকল। ‘বাবু, দিদিমনিটার মাথা পুরা খারাপ। একা একা এই শরীলে ঝরণার কাছে চলি গেল। ডাকলাম কত, সাড়া নাই’।

 চমকে উঠি। সর্বনাশ!

 -তুই আমার সঙ্গে চল বাবু। ওকে নিয়ে আসবি।

 ছুটলাম লাইকার সঙ্গে। ঝরণাটা আমাদের বাংলো থেকেই দেখা যায়। লাইকা বলে, ‘ও রাস্তায় বড় সাপের ভয়, রেল লাইনের ওপর দিয়ে চল, তাড়াতাড়ি পৌছব’।

 হাঁটছি, হেঁটেই চলেছি। পথ যেন শেষ হয় না। আমি অধৈর্য, ‘ওহ্‌, আর কত দূর?’

 -আর একটু। কেন রে বাবু, হাঁটতে ভাল লাগছি না আমার সঙ্গে? – কথাগুলোর সঙ্গে ওর চাহনী ভাল লাগল না।

 আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। বলি, ‘এ রাস্তা দিয়ে যাব না’।

 ও শক্ত হাতে আমার বাজু চেপে ধরল, ‘কেন? এই পথটাই ভাল’। ।

 আমি এক ঝটকায় ওর হাত ছাড়াতে চাইলাম, পারলাম না। একজন ফিনফিনে বাঁশ পাতার মতো মেয়ের শরীরে একী শক্তি। হঠাৎ দেখি উল্টো দিক থেকে ক্ষীপ্র গতিতে ধেয়ে আসছে একটা ট্রেন। ‘লাইকা, ছাড়ো আমায়, ট্রেন আসছে’। ও তবু ছাড়ে না। মৃত্যুকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু লাইকা এমন করছে কেন? ওর তো কোনও ক্ষতি করি নি আমি।

ঠিক তখনই এক ঝটকায় কেউ যেন আমায় ছুঁড়ে দিল রেল লাইনের পাশে একটা ঝোপে। লাইকা কিন্তু দাঁড়িয়েই রইল এক জায়গায়। ক্ষিপ্র গতিতে হেডলাইট ফেলতে ফেলতে ট্রেনটা বেরিয়ে গেল চোখের নিমেষে। আমি বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে খোঁজার চেষ্টা করছি, লাইকা কোথায়??

হঠাৎ দেখি লাইনের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঝিমলি। কেমন ভূতগ্রস্তের মতো বিড়বিড় করছে আপন মনে, ‘একের পর এক আমার ভালবাসাকে খুন করেছিস তুই রিমলি। আর না। এবার তোকে তাই চরম শাস্তিটা দিলাম। আর কোনদিন তুই কাছে এসে দাঁড়াতে পারবি না’।

ঝিমলি হাসছে, উন্মত্ত হাসি। হাসতে হাসতে কাঁদছে। এমন চেহারা আগে কখনও দেখিনি। ও কি আমার ঝিমলি? এখানে কীভাবে এল ও? রিমলি রিমলি বলে কার উদ্দেশে কথাগুলো বলছে? আমার সঙ্গে তো লাইকা ছিল।

তাহলে কি ও-ই ট্রেন আসার মুহূর্তে আমায় ধাক্কা দিয়ে ঝোপের মধ্যে সরিয়ে দিয়েছে? আর লাইকা? ও কি সরে আসতে পেরেছে নাকি রেল লাইনের ওপরেই … তাহলে তো ওর শরীরটা এতক্ষণে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ার কথা। … আতঙ্কে চোখ বুঝে ফেললাম। এবার কী হবে?

হাচরে পাঁচরে * ঝোপ থেকে ওঠার চেষ্টা করি, পারছি না। মাথা টাল খাচ্ছে। তবু উঠতেই হবে। এ জায়গা ছেড়ে পালাতে হবে যত শিগগির সম্ভব। লোক জড়ো হবার আগেই।

কোনরকমে শক্তি জড়ো করে দাঁড়াই, ঝিমলিকে হ্যাঁচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে আসি। ও ফ্যালফ্যাল করে খানিক তাকাল, তারপর আমার বুকের ওপর মাথা রেখে কেঁদে উঠল।

আমরা লাট খাওয়া ঘুরির মতো পাক খেতে খেতে চলতে লাগলাম বাংলোর দিকে। ঝিমলির চলার ক্ষমতা নেই, কোনক্রমে ছ্যাঁচড়ে নিয়ে চলি ওর শরীর।

বাংলোর কাছাকাছি আসতেই অন্য এক অস্বস্তি শুরু হল। রামভকত যদি দরজা খোলে। ওর চোখের দিকে তাকাতে পারব? যদি লাইকার কথা জানতে চায়, কী বলব?

কিন্তু বাংলোর গেট হাট করে খোলা। রামভকত নেই ভেতরে। থ্যাঙ্ক গড! তাহলে কি ও লাইকার খবর পেয়ে ছুটে চলে গেছে?

ঘরে পৌঁছেই ঝিমলির শরীরটা নুয়ে পড়ল বিছানায়। জ্বরে বেহুঁশ, শরীর থেকে হল্কা বেরোচ্ছে। আমার মাথার সার্কিট খানিকক্ষণের জন্য যেন বিকল হয়ে গেছে। কী করব, কী করা উচিত এখন? এই মুহূর্তে কলকাতার দিকে রওনা দিলে কেমন হয়?

রাত বাড়ছে! আশেপাশের লোকের যদি সন্দেহ হয়। তাতে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি। তাহলে কি কাল কাকভোরেই …

হঠাৎ দরজায় বেল। আমার পা অসাড়। নিশ্চয়ই রামভকত। ঠিক তাই। রামভকতের চোখ লাল, আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে। নিজেকে কোথায় লুকোব? হঠাৎ ও আমার হাত ধরে কঁকিয়ে উঠল, ‘লাইকা চলে গেল বাবু। আমি শ্বশানে চললাম, কাল আর আসতে পারব না’।

মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘সে কী! কীভাবে ?’

– যে পোষা সাপ নিয়ে ও ঘুরে বেরাত, ও-ই ওকে আজ কেটেছে। এখান থেকে কাজ করে যাওয়ার পর কেমন গুমসুম হয়ে ঘরে বসেছিল। হঠাৎ সেই সাপ, এক ছোবলেই … – হাউ হাউ করে কেঁদে চলে রামভকত।

আমি হতবাক। বুঝতে পারছি না, কোনটা সত্যি, রামভকতের কথা নাকি একটু আগে ট্রেন লাইনে যা ঘটে গেল, তা?

(৫)

সকালে ঝিমলির ঘুম ভাঙার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। জিনিসপত্র আগেই গুছিয়ে নিয়েছি। তবে ভোর রাতের পর থেকেই ওর জ্বরটা ছেড়ে গেছে। অন্য সকালের মতো আজও পাখি ডাকছে। ভাবছি কালকের রাতটাকে কি দুঃস্বপ্ন বলে ভুলে যাওয়া যায় না?

হঠাৎ মোবাইলে ফোন, ওপাশে ঝিমলির বাবা। ‘কবে ফিরছ তোমরা? আমার ঝিমলি কেমন আছে? কাল এমন একটা স্বপ্ন দেখলাম। এবার ফিরে এসো। একা একা ভাল লাগে না। স্ত্রী চলে গেছে কবে, তারপর ছোট মেয়েটা। একা ওই ঝিমলিই সলতেটুকু জ্বালিয়ে রেখেছে’।

‘এবার সব অভিমান ভুলে রিমলিকে ডেকে নিন কাছে’। – সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলি।

ওপাশে হাসির শব্দ। হাসিটা কান্না কান্না। -সে সুযোগ আর নেই বাবা। রিমলি এখন এত দূরে, যেখান থেকে ডেকে ডেকেও ফিরিয়ে আনা যাবে না’।

-তার মানে? আমার বুকটা কেঁপে উঠল।

– গত বছর রিমলি সুইসাইড করেছে। ঝিমলিকে জানাই নি, শকটা ও নিতে পারবে না। যন্ত্রণাটা একা একাই বয়ে বেড়াচ্ছি।

বুকের ভেতর হঠাৎ দামামা বাজার শব্দ পাচ্ছি। ঠিক শুনলাম কি? রিমলি নেই? তাহলে যে ঝিমলি বলত ওর আশেপাশেই …

পিঠে একটা ঠান্ডা স্পর্শ। চমকে ঘাড় ফেরালাম, ঝিমলি হাসছে, ‘গুড মর্নিং। কখন উঠলে?’

চোখ মুখ দারুণ ফ্রেস দেখাচ্ছে আজ ওর। -এই তো, একটু আগে।

-তোমার বাবা আছেন লাইনে। কথা বলবে?

-এখন নয়। পরে বলছি। আগে চল, ওই ঝরণার কাছে গিয়ে বসি। আমার একটা ছবি অসমাপ্ত রয়ে গেছে, ওটাকে শেষ করতে হবে। ওখানে বসে এঁকে নি।

আমার কেন যেন মনে হল গত রাতের কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে গেছে ঝিমলি। আর অমাবস্যার রাতে ঝরণার কাছে যেতে চাওয়ার বায়নাও ও আর করবে না।

ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস ফিফটি ফিফটি। কিন্তু আজ সেই ঈশ্বরকেই মনে প্রাণে প্রার্থনা করলাম, ঝিমলির জীবন থেকে অমাবস্যার রাত্রিগুলোর এবার ছুটি দাও। ওর আকাশে জেগে থাক শুধু পূর্ণিমার চাঁদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *