আলোর গান – শাশ্বতী নন্দী

আলোর গান

‘সানসাইন’ রিহ্যাব। হোর্ডিংটার দিকে একভাবে চেয়েছিল জিনিয়া, মনে মনে হেসেওছিল। তাদের মতো মাদকাসক্ত ছেলেমেয়েদের নিকষ অন্ধকারে ডুবে থাকা জীবনে এরা নাকি সূর্য কিরণ ছড়াবে! অসম্ভব! যেখানে সব আলো নিভে গেছে, সেখানে আবার …

কিন্তু জিনিয়ার মা নাছোড়। মেয়েকে আবার সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সে মরিয়া। তাই আবার সেই রিহ্যাব, এই নিয়ে তিনবার।

প্রতিবারের মতো প্রথম দিন এখানে এসে ছটফট করে জিনিয়া, মনে হয় একটা ভিন গ্রহে তাকে ষড়যন্ত্র করে ছুঁড়ে ফেলে গেল মা। বুকে অভিমান, ফুলে ফেঁপে ওঠা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। তবু দাঁতে দাঁত চিপে সে চোখের নোনা জলকে প্রাণপণ বেঁধে রাখে। না, কাঁদবে না, কিছুতেই না। এখানেই সে থেকে যাবে বরাবরের মতো, কোনদিন ফিরে যাবে না মায়ের কাছে। তার জন্য এই পৃথিবীতে কেউ নেই। সে একা। সে খারাপ, সে নেশারু, দিন রাতে মাদকের নেশায় সে বুঁদ হয়ে থাকত। সমস্ত স্বজন, পরিজন তাদের ত্যাগ করেছে। পারলে একশো মাইল দূর থেকে অন্য পথ ধরে চলে যায়। সুতরাং এই-ই ঠিক, এই-ই তার পাওনা। এবার অন্তত মা শান্তিতে বাঁচুক। মা-কে কোনদিনও আর সে স্বপ্নের ঘোরেও খুঁজে বেরাবে না।

কিন্তু তবু অবুঝ মনটা কথা শোনে না। সামনের রাস্তা দিয়ে যখনই সেই অন্ধ ভিখীরি গান গাইতে গাইতে যায়, ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবন ভরা …’, মায়ের মুখটা দুলতে থাকে চোখের সামনে। এই গানটা তো মা-ও গাইত, তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিত।

ট্রেনে ট্রেনে গান ফেরি করে রোজ সন্ধ্যা নামার আগেই ঘরে ফেরে সেই অন্ধ গানওলা। গলায় যেমন মিষ্টতা, তেমনি দরদ। ভারি আশ্চর্য লাগে মাঝে মাঝে। যার চোখ থেকে সমস্ত আলো মুছে গেছে, চারপাশে ঘন আঁধার, সে-ই কিনা গাইছে অমন গান।

মায়ের প্রিয় গান এই আলোর গান। মা! তার মা। দুবার মনে মনে ডেকেও উঠল। কতদিন দেখা হয় নি মায়ের সঙ্গে। এই রিহ্যাবের নিয়ম বড় কঠিন।

আজ আকাশটা অনেকক্ষণ এক কান্না ভাঙ্গা মেয়ের মুখ করে বসেছিল। এক পশলা বৃষ্টি ঝরতেই, দিব্যি সে তাজা, ঝরঝরে। রিহ্যাবের ছাদে দাঁড়িয়ে বিভোর হয়ে আকাশ দেখছিল । সামনেই একটা ঝিল। তার চারপাশে নারকেল, সুপুরির বাগান। ভোরের সূর্য আর পূর্ণিমার চাঁদ যখন খেলতে নামে ওই ঝিলের জলে, দেখার মতো এক দৃশ্য তখন।

হঠাৎ নীচ থেকে বড়দির গলা, ‘জিনিয়া, নীচে নেমে এসো। প্রেয়ারের সময় হয়ে গেছে’। বড়দিই এই রিহ্যাবটা চালান। মানুষটা নরম সরম, ভাল।

প্রথম যে বার সে এখানে আসে, খুব অল্প কয়েকদিনের মধ্যে মা-ই ফিরিয়ে নিয়ে গেল বাড়িতে। বাড়িতে পৌঁছেই ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ‘প্রতিজ্ঞা কর, আর ও সব জিনিস ছুঁবি না’।

বাধ্য মেয়ের মতো মাথা হেলিয়ে ও-ও বলেছিল, ‘কক্ষনও না মা। এই তোমাকে ছুঁয়ে প্রমিস করলাম’।

ঠিক সেই সময়ই বাড়ির ল্যান্ড লাইনটা কড়কড় করে বেজে উঠল। মা তড়িঘড়ি ছুটল ধরতে, কিন্তু পৌঁছনোর আগেই লাইন কেটে যায়। আর সেও ছেলেমানুষের মতো বায়না জুড়ে দিল, ‘কতদিন ফোন হাতে নিই নি। আমার মোবাইলটা বার করে দেবে মা? প্লিজ?’

মা অন্য দিকে সরে যেতে যেতে বলেছিল, ‘আর কিছুদিন যাক না’।

-প্লিজ মা। একবার শুধু। সেভ করা কত ছবি ছিল। প্লিজ।

মেয়ের কথা ফেলতে না পেরে মা অসহায় মুখে মোবাইল বার করে দেয়। বলে, ‘দিচ্ছি একটা শর্তে। কোনও ফোনাফুনি যেন না হয়। ওরা কিন্তু এখনও ওত পেতে আছে। সুযোগ পেলেই জাল পাতবে। আর ভুল করিস না মা’।

ভুল তো করতে চায় নি সে। সত্যিই প্রতিজ্ঞা করেছিল, ওই অন্ধকার জীবন আর নয়। কিন্তু মোবাইলটা অন করার সঙ্গে সঙ্গে দেখে ইন বক্স ভর্তি মেসেজ। কে পাঠিয়েছে, নাম ধাম কিছু নেই। শুধু খেজুরে আলাপসালাপ। আর কিছু সাংকেতিক কথাবার্তা। সতর্ক হয়ে ও তাড়াতাড়ি মোবাইল বন্ধ করতে যায়। আশ্চর্য, তখনই রিং টোন বেজে ওঠে। ধরবে কী ধরবে না ভাবতে ভাবতেই বোতাম টিপে ফেলল অন্যমনস্কভাবে।

-জিনিয়া, ইউ আর ব্যাক? – রনির গলা শুনেই শিরদাঁড়ায় হিমস্রোত।

এই সেই রনি, কুখ্যাত ড্রাগ পেডলার, যে ওকে ব্রাউন সুগারের নেশা ধরিয়েছিল। দূর্গা পূজোর মন্ডপে পরিচয়। ফ্রেঞ্চ কাট দাঁড়ি। ফর্সা গাল। হ্যান্ডসাম চেহারা। একটু ডাকাবুকো গোছের। চড়া গন্ধের পারফিউম ব্যবহার করত। শান্ত, ভীতু গোছের জিনিয়া ওকে দেখেই ক্লিন বোল্ড। পরিচয়টা গাঢ় হওয়ার পর একদিন বলে, ‘তুমি সব সময় এমন লো প্রোফাইল হয়ে থাকো কেন ? আমার সঙ্গে একটু মেশামেশি শুরু কর। দেখবে কনফিডেন্স তুঙ্গে চড়বে’।

কীভাবে ? –ও জানার জন্য উৎসুক।

উত্তরে রনি শুধু হেসেছিল। তারপর একদিন একটা ছোট্ট পুরিয়া ওর হাতে দিয়ে বলল, ‘ট্রাই কর, মনে হবে সব তোমার হাতের মুঠোয়। যা চাইবে, তাই পাবে’।

তবু দোনামোনা ভাব কাটছিল না তার। দুদিন পুরিয়াটা সঙ্গে নিয়ে ঘুরল, তারপরে মনে অদ্ভুত এক ভাবনা। দেখাই যাক না একবার ট্রাই করে। জীবনে সব অভিজ্ঞতাই প্রয়োজন।

সেই শুরু। নেশাটা ক্রমে রক্তের মধ্যে ছড়াতে শুরু করল। প্রথম প্রথম শরীর, মন, দু-ই চাঙ্গা লাগত। মনে হত পিঠের ওপর বুঝি দুটো ডানা ভাঁজ করা। পটাপট খুলে নিলেই হল। তারপর ডানা মেলে উড়ে গিয়ে ছুঁয়ে আসবে ওই এভারেস্টের চূড়া।

হঠাৎ রনির হাসির শব্দে জিনিয়ার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। – ‘জানো জিনি, রোজই তোমার মোবাইল নম্বরে একবার করে ট্রাই করতাম। বাট রোজই নো রেসপন্স। আজ কী ভাগ্য …

তড়িঘড়ি লাইন কাটতে যায় ও। তার আগেই রনি বলে ওঠে, ‘উহু, উহু, ডোন্ট ডিসকানেক্ট। এভাবে কতদিন পালিয়ে বেরাবে? তোমার ইউজার পার্টনার, বব, বেচারি তোমার শোকে পাগল হতে বসেছে। আজ একবার দেখা করবে ? জাস্ট একবার।

জিনিয়া কাঁপা হাতে লাইন কেটে দিয়ে মোবাইল বন্ধ করে। বুকে ধড়াস ধড়াস ভাব। রনি কি ওর পিছু ছাড়বে না কখনও? হঠাৎ টেবিলে রাখা ফটো স্ট্যান্ডের দিকে নজর পড়ল। বাবার কোলে ছোট্ট সে। পাশে মা। বাবা দু ঠোঁট ছড়িয়ে হাসছে। ফটোটা বুকে আঁকড়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।

মা হঠাৎ মুখোমুখি, অবাক হয়ে দেখছে তাকে। ‘কী রে চোখে জল কেন? ওহ্‌, আবার পুরনো কথা ভাবছিস?’ জিনিয়ার চোখ মোছাতে মোছাতে বলে, ‘এতদিন পর বাড়ি এলি। ভেবেছিলাম বিরিয়ানি করব। কিন্তু চিকেন কম পড়ে গেল। একবার বাজার ঘুরে এলে হত’।

– যাও না।

-যাব ? – মায়ের মুখে ইতস্তত ভাব। – একা থাকবি ঘরে? কিছু যদি হয়? দরজা লক করে রাখবি তো?

মাথা নেড়ে সায় দেয় জিনিয়া, মা বেরিয়ে গেল। দরজাতে ছিটকিনি আঁটে ও। তবু কী এক ভয়, হাত পা অবশ অবশ লাগছে। রনির কথা এত কেন মনে ঘুরপাক খায়? নিজেকে অন্যমনস্ক করতেই ও বুক কেস থেকে টেনে নেয় গানের খাতা। এক ঝাঁক পুরনো স্মৃতি চোখ ঝাপসা করে দিল। ছোটবেলায় নতুন গান তুললেই বাবা পাশে এসে বসত। মাও গুনগুন করে গলা মেলাত মেয়ের সঙ্গে। সে সব এখন শুধুই স্মৃতি। বাবা চলে গেল তার শোকে শোকেই। হঠাৎ সেরিব্রাল অ্যাটাক। হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ারও সময় দেয় নি।

ল্যান্ড লাইনটা আবার বেজে ওঠে। জিনিয়া ধরল না। কিন্তু দু তিনবার বাজার পর কী ভেবে ও উঠে যায়। মা-ও তো হতে পারে। কিন্তু ফোন ধরতেই শোনে ওপাশে বব। বলে, ‘তুই ফিরে এসেছিস পার্টনার? অথচ আমি জানলাম না?’

জিনিয়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে রিসিভার আঁকড়ে থাকে।

আজ একবার দেখা কর না।

-না, একদম না।

কেন ? ফাঁকা বাড়ি। বেরিয়ে এলেই হয়। তোর মা তো মাংস কিনছে বাজারে। জানলাম কেমন করে? আরে ইয়ার, আমাদের কাছে সব খবর থাকে। যাক গে, কাম শার্প।

অসম্ভব, আমি যাব না। তোদের কাছে গেলেই আবার নিজেকে হারিয়ে ফেলব।

নো প্রব। হারিয়ে গেলে এই বান্দা আবার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে। মনে নেই, ডেড নাইটেও ড্রপ করে দিয়েছি তোর বাড়ির দরজায়।

জিনিয়া শিউরে উঠল। পুরনো কোনও কিছু মনে করতে চায় না। অনেক কষ্টে নিজেকে এই নরক থেকে ছাড়িয়ে এনেছে।

সত্যি ওটা নরক। ইস্টার্ন বাইপাশের ধারে একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বাড়ির দোতলায় ঠেক বসত। পাশে নর্দমা, ময়লার ভ্যাট। কিন্তু নেশায় বুঁদ হয়ে ওদিকে কারোর নজর নেই। পৌঁছনো মাত্র রনি খুব যত্ন করে নেশার সরঞ্জাম সাজিয়ে বসত। বলত, ‘উই আর অন দা সেম বোট ব্রাদার। দাও সুখটান। দেখবে সমস্ত ডিপ্রেশন এই ধোঁয়ার সঙ্গে ভেপার হয়ে উবে যাবে’।

নেশার পয়সা জোগাড় করতে প্রথমে বাবার ব্যাগে হাত দিয়েছিল জিনিয়া। কিন্তু সেখানে রাশ টানা হতেই, চোখ পড়ল মায়ের জিনিসে। ছোটখাটো সোনার জিনিস, শেষদিকে ঠাকুর ঘরের কাঁসার বাসন পত্তরও বাদ যায় নি।

-কখন আসছিস তাহলে ?

ববের কথায় চমক ভাঙল। ও কাকুতি মিনতি করে, ‘প্লিজ আমায় ছেড়ে দে। আমি মা-কে কথা দিয়েছি’।

থমথমে গলায় বব বলে, ‘ওকে। আমি আর তোকে ডিস্টার্ব করব না। কিন্তু রনিকে তো তুই চিনিস। তোক না পেলে ও তোর মায়ের ওপর কোনও রিভেঞ্জ …’

কুড়ি মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিল সে ওদের আখড়ায়। যাওয়ার আগে ড্রয়ার হাতড়েও তেমন কিছু পায় নি। শুধু বাবার আঙ্গুলের একটা আংটি, বাবার শেষ স্মৃতি।

বড়দি কাছে এসে হাত ধরতেই জিনিয়া আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, ‘কে ?’

-আমি। আরে, আমি। এত চমকে ওঠ কেন? কখন থেকে ডাকছি,

সাড়া শব্দ দিচ্ছ না। বাধ্য হয়ে উঠে এলাম। চল প্রেয়ার টাইম হয়ে গেছে।

(২)

 জিনিয়ার বেশ কিছুদিন কেটে গেছে সানসাইন রিহ্যাবে। কিন্তু এবার কেন যেন মনে একটা পালাই পালাই ভাব। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ হয়ে গেছে তার জন্য। কেউ কোথাও নেই, চারপাশটা অচেনা। মায়ের ওপরেই যত অভিমান।

এই রিহ্যাবের পাশেই ছেলেদের হোম। মাঝখানে উঁচু দেওয়াল। তবু দেওয়াল পেরিয়ে ছেলেদের গলার আওয়াজ ভেসে আসে। দুই হোমেরই অনুশাসন বড্ড কড়া। ভোর সাড়ে পাঁচটায় সক্কলকে জাগায় এক বাজখাই মর্নিং বেল। তারপর যার যার নির্দিষ্ট কাজকর্মে কোমর বেঁধে লেগে পড়তে হয়। ওর ডিউটি ভোরে উঠে বাগান পরিষ্কার করে গাছের ফুল সাজি ভরে তোলা। কাজটায় কী যে তৃপ্তি!

 অত ভোরেই শুনতে পায় অন্ধ গানওলা গাইতে গাইতে চলেছে। তার হাত ধরে তার স্ত্রী। দুজনেই দৃষ্টিহীন। যুগলে গাইতে গাইতে এগিয়ে যায় ষ্টেশন রাস্তায়, বাতাসে ভাসতে থাকে গানের সুর। দিনটা অন্যরকম হয়ে যায়। কিন্তু আজ বেলা চড়ে গেল। তবু ওদের দেখা নেই কেন ?

 প্রার্থনা ঘর থেকে সেকেন্ড বেল বাজল। এবার না গেলেই নয়। মন খারাপ নিয়ে ও ভেতরে যায়। বিশাল হলঘরে সার সার সবাই বসে, চোখ বন্ধ। শিরদাঁড়া টানটান। কিন্তু সেই নতুন মেয়ে, পিঙ্কাই, বিছিন্ন হয়ে একটু দূরে গুম মেরে বসে। ভীষণ মারকুটে ও। কথায় কথায় মেজাজ, আর ছেলেদের মতো হুমকি।

 বড়দি ডাকলেন, ‘পিঙ্কাই, তুমি চোখ বন্ধ কর। এখনই প্রেয়ার শুরু হবে’।

 সে রাগী চোখে তাকাল, ‘তোমাদের ওই প্রেয়ারে ভগবানবাবুর কাছে কাকুতি মিনতি করা, আমার জাস্ট পোষায় না’।

-ঠিক আছে তাহলে শুধু চোখ বন্ধ করে প্রিয় মানুষটার মুখ মনে কর।

– আমার প্রিয় মানুষ বলে কেউ নেই। সবাই আমায় একলা ফেলে কেটে

পড়েছে। তোমরা মেলা ফ্যাঁচফ্যাঁচ না করে ভগবানবাবুর কাছে হত্যে দাও।

 তোমার ভালো হতে ইচ্ছে করে না? – বড়দি ধৈর্য ধরে পিঙ্কাইয়ের সঙ্গে কথা বলে চলেন।

না। কারণ আমি কোনদিন ভাল হব না। এখান থেকে বেরোলেই আবার নেশা করব। এই নেশা আমি ছাড়তে পারব না।

পারবে । পারবেই। আমার দৃঢ বিশ্বাস তোমরা সবাই আগামীতে এক একজন সুন্দর মানুষ হয়ে জীবন যাপন করবে। তাই তো ঈশ্বরের কাছে শক্তি আরাধনা করতে বলছি।

চুপ, একদম চুপ। আর কোন একস্ট্রা জ্ঞান শুনতে চাই না। – পিঙ্কাই ঘর থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে যায়।

খানিক পরে আবার ফিরেও আসে । হাতে সাদা কাগজ আর কালো স্কেচ পেন। রোজই এই কাজটা করে ও। একটা ছবি এঁকে তাতে কালো কালি বুলিয়ে নষ্ট করে দেয়। কেন যে এমন ধ্বংস করে নিজের আঁকা সুন্দর ছবিটাকে?

 জিনিয়ার মন বেশ খারাপ ইদানিং। সেই অন্ধ ভিখীরিটা কোথায় যে হারিয়ে গেল ?

তবে কদিন ধরে একটা নতুন জিনিস দেখা যাচ্ছে। প্রেয়ারের সময় পিঙ্কাই থমথমে মুখে এসে বসে থাকছে হল ঘরে। সবাই যখন চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা সংগীত গায়, ও তখন সাদা কাগজে অনেক রেখা টানতে থাকে। বড়দি একদিন কী ভাবে যেন দেখে ফেলল তার হাতে আঁকা একটা ছবি। উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি বলে উঠলেন, ‘স্বয়ং ঈশ্বর ভর না করলে এমন ছবি তুমি আঁকতে পারতে না। যাও, আর ভয় নেই। তুমি ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেয়ে গেছো। এখন থেকে জীবনের সমস্ত সংগ্রাম তুমি একাই লড়তে পারবে’।

পিঙ্কাই কিছুই বলল না। শুধু অন্য দিকে সরে বসল।

এখন একটা নতুন নিয়ম চালু হয়েছে সানসাইনে। বিকেলের দিকে খানিকক্ষণ ওই ঝিলের পাশে রিহ্যাবের ছেলেমেয়েরা হাঁটাহাঁটি করতে পারে। তবে সময় মাপা।

আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একদিন একটা চেনা সুর কানে এল জিনিয়ার। সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকায় ও। সুরটা হাওয়ায় ভেসে ভেসে আসছে। আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবন ভরা …

সুরের টানে টানে ও এগোতে থাকে। দেখে একটা নারকেল গাছের বাঁধানো বেদিতে বসে আছে একটি ছেলে। বাইশ তেইশের হবে। প্রায় ওর সমবয়সী। এক মনে ঝিলের দিকে তাকিয়ে গুন গুন করছে। জিনিয়াকে দেখে একটু অপ্রস্তুত।

ও অল্প হেসে বলে, ‘গাও না। থামলে কেন? আমি তো ভাবলাম ও-ই অন্ধ ভিখীরি আবার ফিরে এসেছে। কোথায় যে গেল লোকটা?’

-এ বাবা, আমিও তো ওকে খুঁজছি। রোজ অপেক্ষা করি ওর জন্য। -ছেলেটি আবার গুনগুন করে সুর ধরে।

জিনিয়া শুনল। গলাটা ভাল তবে অত বেশি দরদ নেই। বলে, ‘কোথায় থাকো তুমি?’

ওই তো, সানসাইনে মেল সেকশনে।

-আমি ফিমেলে। কী নাম তোমার ? আমি জিনিয়া সেন।

আমি দেবার্য চোধুরী। এই তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন ? বোস। – দেবার্য সরে বসে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দারুণ জমে উঠল ওদের আড্ডা। দেবার্য খুব কথা বলে। একেবারে নন স্টপ ট্রেন। হা হা করে হাসিটাও দিলখোলা। জিনিয়ার মনে হল কতদিনের চেনা এই ছেলেটা।

কথা বলতে বলতে হঠাত ওর নজর গেল দূরে আর একটা গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে পাশে বসে আছে পিঙ্কাই। আঁকছে মন দিয়ে।

(৩)

এখন বিকেল হলেই জিনিয়ার মন উড়ু উড়ু। একটা ভাল লাগা, একটা প্রতীক্ষা বুকের মধ্যে তোলপাড় করে। দেবার্য আসে প্রতি বিকেলে। সময়টা তখন কীভাবে কেটে যায়। কত গল্প, কত গান। তবে মাঝে মাঝে এর বিপরীত কিছুও ঘটে। দেবার্য কখনও কখনও ডিপ্রেশনে তলিয়ে থাকে। বলে, ‘এখান থেকে বেরিয়ে আবার বাবা মা-কে কাঁদাব না তো? নিজের ওপরে থেকেই যেন ভরসা চলে গেছে’।

জিনিয়া ওর পিঠে হাত রাখে। ‘কেন, অমন ভাবছ? সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো’। – তবে মুখে যাই বলুক, একটা দুশ্চিন্তা ওর বুকেও ছেয়ে থাকে। সত্যি পারবে তো এই এত বড় যুদ্ধে জয়ী হতে?

আজ ঝিলের কাছে গিয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল ও। দেবার্য এল না। এত তো দেরি হয় না। এলোমেলো ঘুরল খানিক একা একা। কিন্তু কোথায় দেবার্য?

হঠাত গাছের ফাঁক গলে দেখে ধীর গতিতে একটা বাইক আসছে ওরই দিকে। বাইকের ওপর যে বসে আছে তার অবয়বটা বড্ড চেনা চেনা। বব না কি রনি?

শরীরটা অস্থির করে উঠল। এখানেও ওরা পৌঁছে গেল? তবে তো পালাতে হবে এক্ষুনি। ও উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করে। কিন্তু ঘাসে পা জড়িয়ে যাচ্ছে বারবার। বাইকের শব্দ স্পষ্ট হচ্ছে। তার মানে একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ওরা। ওর চোখ ঝাপসা হতে থাকে। হঠাৎ বাইকটা সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

জিনিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় সামনে। একটা গোঙানির মতো স্বর ফুটে বেরোয় গলা দিয়ে, ‘প্লিজ আমায় বাঁচতে দাও’।

বাইক থামিয়ে মাটিতে পা রাখল কেউ। তারপর অবাক গলায় বলে, ‘একী, ছুটছ কেন তুমি? কী হয়েছে তোমার ?’

জিনিয়া হতবাক, দেবার্য তুমি!

-হ্যাঁ আমি। তুমি কি ভেবেছিলে ডাকাত?

ফুঁপিয়ে উঠে দেবার্যর বুকে মুখ ঘষতে থাকে ও। শরীর তখনও থরথর করে কেঁপে যাচ্ছে।

দেবার্যও ওকে দু হাতের বেষ্টনীতে জড়িয়ে থাকে। বলে, ‘বোকা মেয়ে। তুমি কাকে ভেবেছিলে? বব, রনি, জনি? আরে ওরা সব অন্ধকারের মানুষ। সমস্ত আনাচ কানাচেই লুকিয়ে আছে। তবে আলো দেখলেই পালিয়ে যায়। আমরা তো এখন আলোর পৃথিবীর মানুষ। আমাদের সামনে ওরা আর ঘেঁষতেই পারবে না’। – কথা বলতে বলতে দেবার্য একটু থামে। তারপর আবার শুরু করে কথা। বলে, ‘আজ নিজের কাছেই নিজে একটা পরীক্ষা দিয়ে ভাল ভাবে পাশ করলাম, জানো। অনেকগুলো টাকা আমার কাছে দেওয়া হয়েছিল রিহ্যাবের কিছু জিনিস কেনার জন্য। অতগুলো টাকা পেয়েও আমার একবারের জন্যও নেশা করার কথা মনে এল না। দেখো লিস্ট মিলিয়ে কেমন গুছিয়ে বাজার হাট করে ফিরছি। তুমি ঠিকই বলেছিলে, যুদ্ধটা আমরা জিতেই গেছি’।

কথার মাঝখানেই দেখে পিঙ্কাই পা চালিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সানসাইন রিহ্যাবের দিকে। প্রেয়ারের বেল শোনা যাচ্ছে। সে বোধহয় প্রেয়ার রুমের দিকে যাচ্ছে।

জিনিয়ার মুখ থেকে এখনও ভয় সরে নি। বুকটা হাঁপরের মতো ওঠা নামা করছে। দেবার্য ওর হাত দুটো ধরে বলে, ‘দেখো পিঙ্কাইয়ের ছবিতেও এখন আর কোনও কালো রেখা নেই। ওখানে শুধু নানা রঙের আলপনা। আমরা পারব জিনিয়া, আমরা নিশ্চয়ই পারব। কেউ আর আমাদের অন্ধ কূপে নিয়ে যেতে পারবে না’।

জিনিয়া অস্ফুটে বলে, ‘চল এবার। প্রেয়ার শুরু হয়ে যাবে এক্ষুণি’।

কিন্তু চলতে গিয়েও ওর পা থমকে যায়। আরে, ঠিক শুনছে কি? হ্যাঁ, ওই তো পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে সেই গান। আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবন ভরা … অন্ধ ভিখীরিটা ফিরে এসেছে। গাইতে গাইতে হেঁটে আসছে ওদের দিকে।

জিনিয়া কাঁদতে কাঁদতেই হেসে ফেলল। দেবার্যও হাসছে। ওর হাসিতেও জল কণা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *