জলতরঙ্গ – শাশ্বতী নন্দী

জলতরঙ্গ

সকাল থেকেই আকাশের মুখ থমথমে, বৃষ্টি নামবে যে কোন সময়। তবে চিলতে রোদের ফালিও ঢুকে পড়ছে কখনও সখনও ধূসর মেঘের ফোঁকর গলে। এ এক অদ্ভুত মেঘ- রোদ্দুরের চোর-পুলিশ খেলা। কিন্তু আমি জানি আজ বৃষ্টি নামবেই। ভোর থেকেই যে বৃষ্টির রেণু উড়ছে চারপাশে। আমি বৃষ্টির গন্ধ পাই।

তাছাড়া আজ ঝুলন উৎসব। এ দিন বৃষ্টি হয়, আমার ছাব্বিশ বছরের জীবনে বাদ পড়ে নি একদিনও। আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার, সুজয় যেখানেই থাকুক, ঠিক হাজির হয় এ দিন আমার কাছে। তারপর দুজনে মিলে ঝুলন দেখতে বেরোই। বালির পাহাড়, আয়নার ভাঙা টুকরো দিয়ে এক ফালি নদী, ইটের গা থেকে তোলা শ্যাওলার ভেলভেট মাঠ, আরও কত কী। ঝুলন ঘর দেখি আর মনে মনে স্বপ্নে বুনি, নিজেদের কখনও এমন একটা ঘর হবে।

কিন্তু ঘরটা স্বপ্নেই রয়ে গেল। সুজয় এখন কোথায়, জানি না ঠিক। মাঝে কলকাতায় একটা প্রকাশনায় কাজ জুটিয়েছিল, প্রুফ রিডার। কিন্তু মাস দুই আড়াইও গেল না, ঘরের ছেলে ঘরে। দেখা হতেই বলে, ‘চাকরিটা তেমন যুতসই হল না তো কী করব’।

আমি মুচকি হাসি, ‘জানতাম হবে না। কিন্তু প্রুফ রিডারের চাকরি, ভালোই তো ছিল’।

-উঁহু, বড় কঠিন কাজ। অজস্র ঠিক শব্দের মাঝখানে কোথায় যে ঘাপটি মেরে বসে থাকে একটা বেঠিক শব্দ, তাকে টেনে হিচড়ে শনাক্ত করা, ওহ্‌, অত ধৈর্য নেই আমার’।

সত্যি বড় অস্থির মতির ছেলে এই সুজয়। তবে এক জায়গায় ও ঐশ্বর্যশালী। যেমন ভাল গায় তেমন সুন্দর গান লেখে। সঙ্গীত জিনিসটা ওর শিরায় উপশিরায়।

সুজয়কে সেদিন বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। দৃষ্টি আনমনা। কথার মাঝখানে ফস করে একটা বিড়ি ধরাল, দেশলাইয়ের আগুনটা জ্বলতে দিল শেষ অবধি। তারপর পোড়া কাঠিটা ছুড়ে দিল দূরে। বলে, ‘কিছুই হল না জীবনে। সেদিন এক জায়গায় য এর জায়গায় প্রিন্ট হয়েছে ষ, খেয়াল করিনি পেটটা কাটা আছে, ব্যস, স্যাট স্যাট ছেপে বেরোল এত্তো কপি, সব ডাস্টবিনে। মালিক তো আগ্নেয়গিরি। বলে এত অন্যমনস্ক প্রুফ রিডার দিয়ে কাজ চলবে না’।

সত্যিই, কেন এত অন্যমনস্ক ও? খামখেয়ালী, দায়িত্ব জ্ঞানহীন? তবু যেন কী একটা ছিল ওর মধ্যে। ভালবাসতাম সুজয়কে, ভীষণ, ভীষণ, ভীষণ। সুজয় এলেই মনে হত বৃষ্টি ঝরছে আমার বুকে।

তবে বৃষ্টি অন্য কারণেও ভারি প্রিয় আমার। বৃষ্টি মানেই আমার টালির ছাদের বাড়িতে জলতরঙ্গ। শব্দগুলো এতো মিঠে! কিন্তু এখন এই শ্বশুর বাড়ির ছাদে তো টালি নেই, বিশাল মার্বেল বিছানো ঢালাই ছাদ! তাহলে? বৃষ্টি ঝরলে জলতরঙ্গ শুনব কীভাবে?

পঞ্চাদাকে ধরলাম, ‘আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাবে? বিকেলেই ফিরব’।

পঞ্চাদা এ বাড়ির পুরনো ড্রাইভার, বিশ্বস্ত, গাড়ি চালায় উড়িয়ে। বয়স অনেক, তবু হাত পাকা। আপাতত সে-ই এখন আমার গার্জেন। বাড়ি ফাঁকা, শ্বশুর শাশুড়ি ফরেন ট্যুরে, বছরে ছ আট মাস এমনই চলে। পয়সার পাহাড়, খরচ করতে হবে তো। আর টালির ঘরের মেয়েকে বৌমা করার এই তো সুবিধে, গ্যারেজ পোস্টিং করিয়ে দিয়েছে, সাজিয়ে গুছিয়ে এখন সংসার সামলাচ্ছি।

স্বামী বৈজয়ন্ত, ইঞ্জিনিয়ার। নিজেই ফ্যাক্টরি খুলেছে, কিন্তু খাটে কুলি কামিনের মতো, ওয়ার্কহোলিক। ভোর থেকে শুধু কাজ আর কাজ। ফিরবে রাত দশ কী এগারো কী আরও পরে।

পঞ্চাদা গাঁই গুঁই করল, ‘আজ হঠাৎ ও বাড়ি? বলা নেই, কওয়া নেই’। আমি ঘাড় নাড়লাম, ‘সব আছে, তুমি চল। জলতরঙ্গের শব্দ কতদিন শুনিনি’। পঞ্চাদা কী বুঝল কে জানে, হাঁ করে খানিক দেখল তারপর গাড়ি বার করে।

রওনা দেওয়ার আগে টুক করে মা-কে একটা ফোন, ‘আসছি, আমি’।

মা যেন কী বলতে শুরু করেছিল। ধুস! শুনিনি, আমার বলে কত তাড়া। যে কোনও মুহূর্তে তুমুল বর্ষা নামবে।

গাড়ির জানলায় কনুই ঝুলিয়ে বসে আছি, হঠাৎ উইন্ডস্ক্রিনে চোখ, আরে আশ্রম মাঠ পেরিয়ে যাচ্ছি যে। আমি চেঁচালাম, ‘এই থামাও, থামাও, এখানেই নামব আমি’।

(২)

খানিক আগেই বৃষ্টি ঝরেছে বোধহয়। মাটি ভেজা। গাছের পাতায় জমে থাকা জল টুপটাপ ঝরছে। কদম গাছটা ছেয়ে আছে গোল গোল নরম উলের বলের মতো হলুদ ফুলে। ওর নীচে এসে দাঁড়ালাম, আহ্‌, কী শান্তি! কিন্তু তারপরেই হুড়মুড় করে ধেয়ে এল স্মৃতির ঢেউ।

আবার সেই সুজয়। ওর ছন্নছাড়া কথা, ওর লেখা গানের লাইন, ওর গলায় তোলা সুর, সব মনে পড়ে যাচ্ছে। কী হল আমার? বিয়ে হয়েছে তিন মাস। নতুন সংসার, নতুন বর, নতুন জীবন, তবু কেন ভুলতে পারি না আমার পুরনো সেই সুজয়কে? খুব বোকা আমি? কিছু ভুলতে পারি না? সামান্য ছাপেই ছাঁচ পড়ে যায়।

কী যেন বলত সুজয়? স্মৃতি থেকে টেনে আনলাম কথাগুলো। ‘জানো জয়ী, একেকটা অক্ষরের ওপর আমার বড় মায়া। এই যেমন শব্দের আদি অক্ষর যদি হয় জ, সমস্ত পৃষ্ঠা জুড়ে ভেসে ওঠে তোমার মুখ, আমার জয়িতার মুখ। দেখি তুমি ঠোঁট টিপে হাসছ, ব্যস, সব ভুল হয়ে যায় তখুনি। আর ওই নিষ্পাপ জ বর্ণের গায়ে ছুঁচোলো কলমের ডগা চেপে য লিখতে বড় কষ্ট হয়’।

এ কী পাগল! আমি বেবাক স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম ওর দিকে।

-তাহলেই বোঝ কেমন পাগল তোমার ভালবাসায়। – সুজয় হাসার চেষ্টা করত। – সব কিছুতে ডাহা ফেল, কিন্তু ভালবাসায় একশোয় একশো’।

গাল বেয়ে দু ফোঁটা জল নামছে, ঘাড় উঁচু করে তাকাই। কদম গাছটা নাকি আমার চোখ, কোনটা ঝরিয়ে দিচ্ছে এই জল?

হঠাৎ দূরে তাকিয়ে আমি অবাক। মনিকা না! এই অসময়ে, ভরদুপুরে! কদম গাছের বেদীতে একা বসে। আমায় দেখল, কিন্তু না- চেনা চাহনী। মনে মনে হোঁচট খেলেও ওর হাত ধরে ঝাঁকুনি দিই, ‘কী রে তুই?’

ওর একই রকম ভাবলেশহীন মুখ। আস্তে বলে, ‘বোস’। ফুঁ দিয়ে বেদীতে পড়ে থাকা ঝরা পাতা ফুল উড়িয়ে দেয়। বলে, ‘বৈজয়ন্তদা আসে নি? কেমন আছে সে?’

-ভাল, তবে ভীষণ ব্যস্ত।

-বৈজয়ন্তদা তোকে খুব ভালবাসে না রে ?’

আচমকা প্রশ্নে আমি হকচকিয়ে তাকাই।

– আচ্ছা, ওর ভালবাসাটা কি সুজয়ের থেকেও বেশি? খুব আদর করে তোকে? আরে, লজ্জার কী আছে, বল না’। -মনিকা দাঁত ঝিকিয়ে হাসে।

আমি অল্প দূরে সরে বসলাম। একটা দমচাপা কষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টি কোথায় গেল? সব বৃষ্টি মেঘ কি উধাও হয়ে গেল! মনিকা হেসেই চলেছে। হাসিটা হায়নার মতো। অস্বস্তি হচ্ছে, নিঃশব্দে উঠে দাঁড়িয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াতে যাই। মনিকা হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিল। তারপর হিসহিসে গলায় বলে, ‘সুজয়কে এভাবে ছেড়ে গিয়ে ভাল আছিস এখন?’

ঢোক গিললাম, হাতের মুঠো অজান্তেই শক্ত হচ্ছে। কী বলতে চায় ও? ওর মুখটাও কঠিন দেখাচ্ছে, কপালের শিরাগুলো দপদপ লাফাচ্ছে। মনিকা আমার স্কুলবেলার বন্ধু। কলেজে পড়াও একসঙ্গে। এই আশ্রম মাঠ, বিকেলটা ছিল আমাদের কবলে। কত আড্ডা। মাঝে মাঝে সুজয়ও আসত। প্রথম থেকেই সুজয়ের প্রতি মনিকার একটা চোরা টান, যদিও ভালবাসায় রূপান্তরিত হয় নি। সুজয় কোনদিনই ওকে পাত্তা দেয় নি, ওই আড্ডার সঙ্গী, এই পর্যন্ত। ভেতরে ভেতরে তাই একটা রাগকে লালন করে চলে ও। যতটা না সুজয়ের ওপর, ঢের বেশি আমার ওপর।

-কী রে জবাব দিচ্ছিস না তো? – মনিকার মুখে আবার প্রশ্ন।

আমি চিরকালের ভীতু। নার্ভাস ভাবটাকে ঢাকবার জন্য তাই সামান্য হাসি, তারপর ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলি, ‘সুজয় কোথায় এখন? কেমন আছে ও?’

মনিকা হাসল, ‘সুজয় কোথায় জেনে তোর লাভ?’

-সব কিছুতে আমি লাভ লোকসান কষি না।

-আলবাত কষিস। তাই তো প্রেম করলি একজনের সঙ্গে, আর বিয়ের মন্ত্র পড়লি …

আমার মুখ ফ্যাকাসে। এমন দোষারোপ নিজেকেও কি কম করেছি আমি? কী করব? সুজয় শুধু ভালই বাসল, বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয় মোটেই। বলে, ‘বিয়ে করলে ভালবাসা বাসি হয়ে যায়। তখন আর তোমায় নিয়ে গান লিখতে পারব না, তোমায় ভেবে সুর বাঁধতে পারব না’।

গরীব বাড়ির মেয়ে, কত কাল আর মা বাবা পুষবে? তাই রূপ দেখে যেচেই যখন ব্যানার্জি পরিবার থেকে সম্বন্ধ এল, সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলার কথার ভাবতেও পারল না কেউ।

 -যাক গে শোন, সুজয় আছে, ভালভাবেই আছে। হারিয়ে যায় নি, ওকে আমি হারাতে দিই নি।

-বাহ্‌, ভাল তো।

-হ্যাঁ, ভালোই তো। তুই একা কেন ভাল থাকবি? আমরাও ভাল আছি। সুজয়কে নতুন জীবন দিয়েছি। ওকে ভাল থাকতে শিখিয়েছি। ও এখন ব্যবসা করছে, গার্মেন্টসের। ষ্টেশন রোডে দোকান। আর একটু দাঁড়িয়ে যাক, তারপরেই আমাদের বিয়ে।

-গান লেখে এখনও?

আলটপকা প্রশ্নটা করেই চোখ নামিয়ে নিই। ভুল সময়ে ভুল কথা বলা, এ স্বভাব আমার আর শোধরালো না।

-না। গানের খাতাগুলো লুকিয়ে নিয়ে এসেছিলাম ও বাড়ি থেকে। তারপর … হা হা হা – হেসে গড়িয়ে পড়ছে মনিকা – ডায়রেক্ট ওভেনে। একেবারে নিশ্চিহ্ন। ফিরে পাওয়ার কোনও চান্স নেই।

চমকে তাকালাম। এত নিষ্ঠুর মানুষ! কারোর সৃষ্টিকে হত্যা করে এমন অবলীলায় হাসতে পারে!

-কেন করব না? গান গান করেই তো ওর নুন আনতে পান্তা ফুড়ুৎ। ওই সুর আর কথা মনে পড়লেই ওর সব কাজ ভুল হয়ে যায়। একটা চাকরিও টেঁকাতে পারে নি। গান! সারা জীবন কী দিয়েছে ওকে?

ধীরে ধীরে পা বাড়ালাম সামনে। মাঠটা পেরিয়ে যাওয়ার আগে, ঘাড় ফেরালাম আবার। আরও দুজন ক্ষুদে বন্ধু ছিল এই মাঠে। মুক্তা আর অপরাজিত, তেরো চোদ্দ বয়স হবে। স্কুল ফেরত এখানে তাদের আসা চাই-ই চাই। গাছের ঝরা ফুল কুড়িয়ে রান্না বাটি খেলে, মাটি দিয়ে গড়ে সুন্দর সুন্দর পুতুল। একদিন লুকিয়ে দেখি বর-বউ বর-বউ খেলছে জমিয়ে। খুদে বর-বউয়ের কী মিষ্টি সংসার! দেখতে দেখতে আমি হেসে বাঁচি না।

(৩)

বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই জ্যেঠি, ন পিসি, আর কাকাদের ভিড়। ভাই বোনগুলোও ছুটে এল পিলপিল করে। প্রথম দরজাটাই আমাদের। ছয় বাই ছয়ের এক ফোঁটা ঘর। ওখানে দাঁড়িয়েই বড় করে একটা শ্বাস টানি, সেই আপন আপন, ঘর, ঘর, গন্ধ। কিন্তু মাধবীলতাটাকে ছেঁটে দিল কে এমন করে! আগে জানলার শিক গলে কেমন উঁকিঝুঁকি দিত গাছটা। এখন ন্যাড়া। ভেতরটা জ্বালা জ্বালা করে ওঠে।

কিন্তু ভিড়ের মধ্যেও আমার চোখ দ্রুত খুঁজতে থাকে মা-কে। কোথায় গেল মা? হঠাৎ পিঠে একটা ঠান্ডা হাত, ছোঁয়াটা আমার চেনা। পেছনে মা। ঘর্মাক্ত মুখ, কপালের সিঁদুর লেপ্টানো, হাসছে। পরনে হাল্কা গোলাপি শাড়ি, ঢলঢলে গোলাপি ব্লাউজ। এগুলো আগে দেখি নি কখনও, নিশ্চয়ই ধার নেওয়া কাকিদের আলমারি থেকে।

 কোথায় ছিলে এতক্ষণ?- রাগ দেখালাম।

– আরে, মাছ কাটছিলাম। তোর ফোন পেয়ে শেষ বাজার থেকে একটু মাছ নিয়ে এলাম। কিছুই তো ছিল না ঘরে। মেয়ে অত বড় বাড়ির বউ, নিরামিষ খাওয়ানো যায় আর? – মা হাসছে। – বৈজয়ন্ত কৈ?’

-আসেনি, কাজে আটকে গেছে। বাবা কোথায় গো?’

-বড়বাজারে, টাইপরাইটার ছেড়ে খাতা লেখার কাজ জুটিয়েছে। পেট চালাতে হবে তো। চোখে ভাল দেখে না, টাইপে ভুল হয়। তাছাড়া টাইপিস্টের এখন বাজার নেই।

চোখের সামনে ভেসে উঠল কদমছাঁট এক মাথা সাদা চুল, গেঞ্জির মাপ ছাব্বিশ ইঞ্চির আমার বাবা। চোখে নিকেলের চশমা, একটা ভাঙা ডাঁটি সাদা সুতোয় বাঁধা।

জ্যেঠি হঠাৎ হেসে হেসে দুলে দুলে বলে ওঠে, ‘ঠাকুরপোর আর কাজ করার দরকার কী? মেয়ে অত ধনী, বুড়ো বাপটাকে একটু সাহায্য করতে পারে তো’।

আমি ফ্যাকাসে মুখে অল্প হাসি।

(৪)

আমার থালার চারপাশে ছোট ছোট কত বাটির সমাহার। ছোলার ডাল, ধোঁকার ডালনা, মাছ ভাজা, ছোট মাছের চচ্চড়ি। মায়ের হাতের রান্নাও অমৃত। কিন্তু এত খাবারের সুঘ্রাণেও গা-টা এমন গোলাচ্ছে কেন? শুধু মনে হচ্ছে এত আয়োজনের নিট ফল এ বাড়িতে কয়েক সপ্তাহ রেশন বন্ধ আর পাতে স্রেফ নুন লঙ্কা ভাত।

ন কাকিকে এতক্ষণ দেখি নি। চিরকালই সে একটু গা- আলগা মানুষ। এক সময় ন কাকা দু হাতে রোজগার করেছে আর উড়িয়েছেও দেদার। এখন তাদের পড়ন্ত বেলা।

হাসি হাসি মুখে এক সময় সেও সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘একটু পেট খালি রেখো। আইসক্রিম আনিয়েছি। বড়লোক বাড়িতে তো শুনেছি শেষ পাতে মিষ্টি থাকে। রোজই প্রায় বিয়ে বাড়ি, বিয়ে বাড়ি ব্যাপার। সত্যি, ভাগ্য করে এসেছিলে’।

পেটের ভেতর থেকে সব খাবারগুলো এবার মন্ড হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। এত তাড়াতাড়ি এ পরিবার থেকে বিছিন্ন হয়ে যাব ভাবিনি কখনও। সবাই আমাকে ব্যানার্জি বাড়ির বউ ছাড়া অন্য কিছুই যেন ভাবতে পারছে না।

কোনরকম নাকে মুখে গুঁজে একরকম পালিয়েই এলাম নিজের ঘরে। দাঁড়ালাম খুপরি জানলায় মুখ ঠেকিয়ে। চৌখুপি আকাশটা অমনি এক লাফে সামনে। একটা পাখি ভেসে বেরাচ্ছে, ধীর স্থির ভঙ্গি। দূরে শালিখের কিচির মিচির। আগে ওরা দোল খেত মাধবীলতার ডালে। এখন তো গাছের অঙ্গচ্ছেদ হয়েছে। তাই পাখিরা দূরে দূরে। কষ্ট হল আবার। কেন যে সবাই আমার ছোট ছোট সুখের ওপর কুড়ুল চালাতে ভালবাসে?

হঠাৎ দেখি ন কাকি, পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। একটু ত্রস্ত ভঙ্গি। বলে, ‘ঘুমোবে না?’

-না গো। এস না, বস এখানে। – আমি হাত ধরে টানি খাটের দিকে।

কাকির হাতে একটা পাট ভাঙা শাড়ি। বলে, ‘এটা পরে নাও। একেবারে ধোওয়া কাচা’।

-কী দরকার? শীলার একটা নাইটি দিলেই তো হত।

-না, না। ওসব এখন তোমাকে মানায় নাকি? সুতির, জ্যালজ্যালে নাইটি। শোন না, একটা কথা বলতে এসেছিলাম। – ন কাকি আমতা আমতা করছে।

-এ বাবা, বল না। এত কিন্তু কিন্তু কেন? – আমি কাকির পিঠে হাত ছোঁয়াই।

-তোমরা তো খুব ধনী মানুষ, লজ্জা করছে বলতে। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, কী করব বল।

ন কাকি হাত দিয়ে নিজের ঠোঁট ঘষে। একসময় কাকির রূপের দেমাক ছিল খুব। এখন চেহারায় ধস নেমেছে।

-আসলে কী হয়েছে জানো, – কাকি আমার হাত দুটো চেপে ধরল। – শীলা তো আমার একটাই মেয়ে। বড় আদরের। ছোটবেলায় অভাব দেখে নি কখনও। ওর বাবার দু হাতের রোজগার ছিল। কিন্তু এখন সে পঙ্গু, রোজগারপাতি বন্ধ, জমানো টাকাও শেষ। কিন্তু মেয়ে এসব মানবে কেন? বড় অবুঝ যে। শুধু চাই আর চাই। ভাল হোটেলে খাব, সিনেমা দেখব, ভাল ভাল পোশাক পরব। কোথ থেকে জোগাব এতসব? এই দেখ না, তুমি আসবে শুনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। মা তো, বুঝি সব। ওরও তো বিয়ের বয়স হল। কিন্তু আমরা যে অক্ষম। পাড়ার ভুলভাল কিছু ছোকরা এখন ওর বন্ধু হয়েছে’।

ন কাকির কথার আসল উদ্দেশ্য ধরতে পারছি না, তবু অপেক্ষায় আছি। হঠাৎ তার চোখ থেকে দু ফোঁটা জল পড়ল আমার হাতের চেটোয়। – তোমার শ্বশুর শাশুড়ির তো বড় বড় কানেকশন। শুনেছি দান ধ্যানেরও হাত আছে। আমার মেয়েটার একটু গতি করে দাও না। অনেক সম্বন্ধই এসেছে, কিন্তু এত পণের চাহিদা। যদি একটু অর্থ সাহায্য কর, বা যদি একটা চাকরি বাকরিরও ব্যবস্থা হয় তোমাদের ফ্যাক্টরিতে। সম্ভব কি?

প্রথমে অবাক, তারপর অসহায় হয়ে চেয়ে রইলাম কাকির দিকে। ব্যানার্জি বাড়ির পুত্র বধূ আমি, খুব ধনী পরিবার, সবই সত্যি, কিন্তু সংসারে তো আমার এন্ট্রি মাত্র তিন মাস, তাই অবস্থানটা এখনও অনেকটা বোঁটা আলগা ফলের মতো। কিন্তু এসব বোঝাই কাকে? সুতরাং নিশ্চুপ। ন কাকি কী বুঝল জানি না, নিঃশব্দে যেমন এসেছিল, বেরিয়েও গেল।

কষ্ট হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। এখানে না এলেই কি ভাল করতাম? কিন্তু ব্যানার্জি বাড়ির প্রাসাদোপম বাড়িতেও যে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। মন পড়ে থাকত এই টালির চালের ঘরে, এই ঘুলঘুলি জানলায়, আর মায়ের ঠান্ডা হাতের ছোঁয়ায়। একটা পুরনো সুর, পুরনো ধুন, খুঁজতে এসেছিলাম। এখন দেখছি সুরটা বাজছে, কিন্তু বড্ড বেসুরো হয়ে।

জলতরঙ্গের শব্দও বুঝি আর শুনতে পাব না কখনও। বৃষ্টি মেঘগুলো কি সব চুরি হয়ে অন্য আকাশে চলে গেল? কিন্তু বৃষ্টি না হলে যে সুজয়ও আসবে না। বৃষ্টিই তো টেনে আনে ওকে আমার কাছে।

সুজয়ের মুখটা আবার ভেসে উঠল। এখন কি ও দোকানদারিতে ব্যস্ত? চারিদিকে খদ্দেরের ভিড়, তার ওপর ক্যাশ বাক্স সামলানো। একটু অসতর্ক হলেই বিরাট ক্ষতি। আচ্ছা, গানের দু চার কলি কি এখন আর ভেসে আসে না ওর মনে? বা কয়েকটা গানের নতুন নতুন কথা, নতুন সুর? জোয়ারের মতো আছড়ে পড়ে না মনে?

(৫)

শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাচ্ছি। আশ্রম মাঠ পেরোবার সময় খুব জোরে পা চালাই। যদি সুজয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় হঠাৎ? যদি আজ ঝুলন বলে সাত তাড়াতাড়ি ও দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে চলে আসে? যদি কদমতলার সামনে এসে … না, না, এসব অন্যায়। মনিকার সঙ্গে খুব শিগগিরি ওর বিয়ে।

হঠাৎ পেছন থেকে একটা কচি কন্ঠে ডাক, ‘দিদি’।

ঘাড় ফেরাতেই দেখি মুক্তা। ছুটে ছুটে আসছে।

– ওমা, তুই? – আমি পা চালিয়ে এগিয়ে যাই।

মুক্তা হাঁপাচ্ছে, ‘আমি তোমায় দুপুরেই আসতে দেখেছি, স্কুল আজ হাফ ছুটি হয়েছে’।

-তাই! ডাকিস নি তো।

মুক্তা হাসে, ‘বাড়ি গিয়েছিলাম একটা জিনিস আনতে। তুমি কেমন আছো দিদি?’

গাল টিপে দিই ওর, ‘খুব ভাল রে। তুই? এখনও মাটির পুতুল বানাস? তোর বন্ধুটির কী খবর? সেই অপরাজিত?

লম্বা করে ঘাড় নাড়ল ও, ‘ভাল আছে। কিন্তু আমাদের মন খারাপ, তুমি নেই বলে’।

ওর হাত ধরে পুরো মাঠটাকে চক্কর কাটলাম কয়েকবার। কী ভাল লাগছে। শেষ বিকেলের গায়ে সুন্দর একটা রঙ, আকাশ হাল্কা নীল। তবে কি আজ বৃষ্টি হল না? কিন্তু মন যে এখনও আশা ছাড়ে নি। এক খন্ড কালো মেঘ একটু দূরে দেখছি থমকে আছে। যে কোন সময়ে গুড়ো গুড়ো হয়ে ঝরে পড়তে পারে।

একটা কাগজের মোড়ক খুলছে মুক্তা। আমি ছেলেমানুষের মতো করছি, তর আর সয় না। কী ওটা? দেখি মোড়ক থেকে বেরিয়ে আসছে একটা মাটির মূর্তি। আমি হতবাক। রাধা কৃষ্ণের মূর্তি। কী অপূর্ব সুন্দর! মুক্তার হাতে গড়া! কচি মুখ হেসেই চলে। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম মুক্তা আর অপরাজিতের পবিত্র মুখ দুটোই যেন খোদাই হয়ে আছে এই মূর্তির মধ্যে।

এদিকে আমার দেরি দেখে পঞ্চাদা ফোনের পর ফোন, চার মাথার মোড়ে নাকি অপেক্ষা করছে সেই অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু আমার যে এখন কোথাও যাওয়া হবে না। মন বলছে বৃষ্টি নামবে এখুনি, তুমুল ভাবে। শুধু কি তাই? মন চুপিচুপি আরও একটা কথা বলল। . ইস কী লজ্জা! সুজয়ও নাকি আসবে, শুধু আমার সঙ্গে দেখা করতেই …

আমি রাধা কৃষ্ণের মূর্তি কোলে দাঁড়িয়ে রইলাম স্থাণুর মতো। হঠাৎ দেখি ঈশান কোণ থেকে রে রে করে ছুটে আসছে সেই খন্ড কালো মেঘটা। কিন্তু আমার মাথার ওপর এসেই থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাকি আকাশটাও কৃষ্ণবর্ণে সেজে উঠছে। যে কোনও সময়ে ঢেলে দেবে ঝালরের মতো বৃষ্টি।

আমার সবজান্তা মনের ক্ষমতা দেখে আমি অবাক। একটু আগেই তো পূর্বাভাষ দিয়েছিল যে … তাহলে কি সুজয়ও … হঠাৎ আপন মনে হেসে উঠলাম। মনিকাটা বড্ড বোকা! ও কি জানে না গানের কথা আর সুরের কারিগর, সুজয়ের সব গান লেখা আছে ওর বুকে? ওর একটা গানের খাতা ওভেনের আঁচে পুড়িয়ে ওকে নিঃশেষ করা যায় না। ওর বুকের ভেতর সুরের ঝরণা, বয়ে চলেছে অবিশ্রান্ত ধারায়। তাকে আটকাবার ক্ষমতা কারো নেই। সুজয় একজন শিল্পী, এত সহজে তার মৃত্যু নেই। ও আবার গান বাঁধবে, সুর বসাবে, আর হয়তো কখনও আমাকে নিয়ে ছোট্ট একটা ঘর … এ জন্মে না হোক, অন্য কোনও জন্মে।

স্বপ্নটাকে নিয়ে আমি চলতে শুরু করলাম।

জল ভরা মেঘগুলো এতক্ষণে গুড়ো গুড়ো হয়ে ভাঙতে শুরু করেছে। আমি এবার ছুট লাগিয়েছি। না ব্যানার্জি বাড়ির দিকে নয়, আমার টালির ছাদের বাড়ির অভিমুখে। পঞ্চাদা রাগ করছে, করুক। আমি ছুটছি উর্ধ্বশ্বাস। টালির ছাদে যে এতক্ষণে জলতরঙ্গ বাজতে শুরু করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *