এক ছিল রাজকন্যে – শাশ্বতী নন্দী

এক ছিল রাজকন্যে

 -তোমার ছুটি কটায় ইলা? পারলে এখুনি একবার বাড়ি এসো। – সুনন্দর গলা থমথমে।

-কেন, কী হয়েছে? সুমি ঠিক আছে তো? – সুনন্দর স্ত্রী, ইলা, রীতিমত আতঙ্কিত।

 সুনন্দ সামান্য চুপ। তারপর বড় একটা শ্বাস ফেলে বলেন, ‘সুমি ছাড়াও আর একটা প্রাণী আছে সংসারে, ভুলে যাচ্ছো আজকাল। – কথাগুলোয় কেমন একটা অভিমান অভিমান গন্ধ।

 ইলা গোপনে শ্বাস ফেলে, উফ্‌! আবার নাটক।

সুনন্দ মানুষটাই এমনি। সব বিষয়ে বাড়াবাড়ি রকমের রহস্য করেন। ইদানিং রিটায়ার করার পর, নাটুকেপনা আরও বেড়েছে।

 -আচ্ছা, তোমার মেয়ে যে দিন দিন লাগামছাড়া হয়ে উঠছে, খবরটা রাখো? – তীব্র ভৎসর্নার সুর আবার সুনন্দর গলায়।

 ইলার দুই ভ্রু কুঁচকে এল, ‘লাগামছাড়া মানে?’ – কথা বলতে বলতেই নজর বোলায় হাত ঘড়িটার দিকে।

মিনিট পনেরোর মধ্যে তিনতলার হলঘরে যেতে হবে। আজ একটা টিচার্স মিটিং ডাকা হয়েছে।

ততক্ষণে সুনন্দর স্কেল অনেকখানি খাদের পর্দায় নেমে এসেছে, ‘না মানে বলতে চাইছিলাম … যাক গে যাক। একটা কথা বলো তো। তোমার ঘড়িতে এখন কটা বাজে?’

এবার পিত্তি জ্বলে গেল। এই সব হেঁয়ালি এখন ভাল লাগে! ইলার মেজাজটা এমনিতেই চড়ে আছে সকাল থেকে। স্কুলে আজ অর্ধেক টিচার অ্যাবসেন্ট। মিটিং এর দিন ইচ্ছাকৃত ভাবে ডুব। যাই হোক, হেড দিদিমনি যখন, সামলাতেই হবে। তাই সুনন্দর চাইতে দ্বিগুণ গাম্ভীর্যে বলে ওঠে, ‘গৌরচন্দ্রিকা ছেড়ে সোজাসুজি কথা বলবে?’

-গৌরচন্দ্রিকা! হাহ্‌! এই সব বনেদি শব্দ হারিয়েই যাচ্ছে আজকাল। যাই হোক, পয়েন্টে আসি। তোমার মেয়ের আজ হয়েছেটা কী? নটায় বিশাখ এল, হর্নের পর হর্ন, মেয়ের ঘুমই ভাঙল না। আমি ডাকতে গেলাম, সে কী ঝাঁঝ! স্পর্ধা ভাবো। কিন্তু ঘড়িতে যখন বারোটা বাজবে বাজবে করছে, আর সহ্য হল না! সংসারে একটা ডিসিপ্লিন থাকবে তো! দিলাম টান মেরে বালিশ, চাদর ফেলে।

-অ্যাঁ, তাহলে তো দক্ষযজ্ঞ বাঁধিয়েছ। – ইলার গলায় আতঙ্ক। -কী যে করো! জানো কাল কত রাত অবধি মেয়ের কাজ চলেছিল! ইউ এস এ ক্লায়েন্ট। কলের পর কল। সকালে তাই হয়তো একটু ল্যাদ লাগছিল, উঠতে পারে নি। সিম্পল। এই নিয়ে …

-ক্কী, কী লাগছিল ? ল্যাদ! তোমারও দেখছি গুরু চন্ডাল দোষ। কখনও শুদ্ধ, কখনও …

ইলা লজ্জা পায়। ছি ছি! ল্যাদ! শব্দটা কী করে যে ফস করে বেরিয়ে এল। ওই সুমিকে শুনে শুনে শিখেছে। প্রায়ই বলে। সেদিনও বিছানায় শুয়ে শুয়ে বলল, ‘মা বড় ল্যাদ লাগছে গো’।

-আজ ছুটি নে তাহলে।

-নো ওয়ে। বড্ড চাপ! এখানে একটু সুড়সুড়ি দাও না মা। এই এখানে, ভ্রুর ওপরে। ছোটবেলার মতো। আসলে কী হয়েছে জানো, ইউ এস এর একটা ধাসু প্রজেক্ট ঘাড়ে চেপেছে। এটাকে নামাতেই হবে। আমাকে তো প্রথমে এ প্রজেক্টের জন্য সিলেক্টই করছিল না ।

-সে কী! –ইলার বিলি কাটা আঙুল থেমে গেল।

-আসলে এ প্রজেক্টের দায়িত্ব অনেক। ম্যানেজারদের ধারণা, মেয়েরা অত রেসপনসিবিলিটি নিতে পারে না। যার যত কোয়ালিটিই থাক, মেয়েদের শেষ গোল একটাই। বিয়ে, বাচ্চা, সংসার।

ইলা খুক খুক হাসে।

-কিন্তু আমিও তেমনি, ছাড়ার পাত্রী নই। জেদ ধরলাম, হয় ইউ এস এর প্রজেক্ট নয়তো … – সুমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে চলেছিল।

এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ইলা। নিজের পেটের মেয়েটাকেই যেন চিনতে পারছে না। কেমন শক্ত, কর্কশ মুখ। কথা বলছে চোয়াল শক্ত করে। প্রতিটি শব্দ ধারালো বর্শার মতো তীক্ষ্ণ।

মেয়েটা কবে এমন পাল্টে গেল? এত আগ্রাসী, কেরিয়ার সর্বস্ব? পড়াশোনায় তুখোড় বরাবরই। কিন্তু ভেতরে একটা নরম সরম মনও ছিল। গল্পের বইয়ের পোকা। সিনেমা বা নাটকে দুঃখের সিন দেখে ভ্যা ভ্যা কাঁদত। কোথায় হারাল সেই স্বভাব! এখন চোখে শুধু আকাশ ছোঁয়ার তৃষ্ণা!

সুনন্দর গলা খাঁকারিতে হুঁশ ফিরল। ওখানে আবার গর্জন, ‘আপসোস হয় এখন। বুঝলে গিন্নী। ভীষণ আপসোস। কেন চাকরিতে আগে ভাগেই ভি আর এস নিলাম না। অন্তত সংসারটা এভাবে ভেসে যেত না। কোথাও কোনও অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নেই। যে যার মতো চলছে। ছিঃ! বলতে আমার জিবে আটকায়। আমার মেয়ে তো এখন রায় বংশের কলঙ্ক’।

ব্যস, আর পারা গেল না। ইলার মাথা এমনিতেই আজ ফোর ফট্টি ভোল্ট। এবার একেবারে মুখঝামটা দিয়ে ওঠে, ‘অ্যাই খবরদার! মেয়ের নামে কী যা তা বলছ! ও রায় বংশের কলঙ্ক! আর তুমি? কোন কীর্তিটা রেখে যাচ্ছো বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে?’

সেরেছে! সুনন্দ ব্যাক গিয়ার টানবে কি টানবে না, ভাবতে থাকেন। বউটার এত চোপা না!

-কী হল, বল? আমার সুমি তোমার রায় বংশে কী কালি লেপেছে? স্পিক আউট।

বাবা রে বাবা! কী দাউ দাউ আগুন! ফায়ার ব্রিগ্রেডও নেভাতে পারবে না। ভাবলেন একবার ফোনটা কেটে দেবেন। পরক্ষণেই ভেতরটা গর্জে উঠল, নো, নেভার। আফটার অল তিনি হেড অফ দা ফ্যামিলি! এভাবে পিছিয়ে এলে চলে!

অতএব গলায় তেজ নিয়েই বললেন, -তোমার মেয়ের বিয়ে ফাইনাল হয়ে গেছে। অথচ ওর চাল চলন এমন ধারা কেন? প্রতিদিন নতুন নতুন ছেলের পিঠে চেপে বাইকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছেন রাজকন্যে। শুধু তাই! পোশাক বদলানোর মতো রাজপুত্র বদলাচ্ছে সে আজকাল। পাঁচ দিনে পাঁচটাই নতুন ছেলে বাইক চালিয়ে আসছে। এগুলো যদি বিশাখের কানে যায়?

 মানে! ইলাও সামান্য বিব্রত। বাইকে চেপে সুমি অফিস যাচ্ছে! নিত্য নতুন ছেলে! হঠাত কথাটা মাথায় আসতেই বলে, ‘ও হো! ভগবান। সুমি আজকাল র‍্যাপিডো চেপে অফিস যাচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি সর্টকাট ধরে ওরা পৌঁছে দেয়’।

 -কী ডো? আবার বলো।

 -শোন ওগুলো হল বাইক ট্যাক্সি। মেয়ে আজকাল ওতেই চড়ে অফিস যায়। যাক, তোমার সঙ্গে আর কথা বাড়াব না, আমার প্রেশার হাই হচ্ছে।

 সুনন্দর গলায় উদত্ত হাসি, ‘এসব কথায় ভবি ভুলবে না কিন্তু ম্যাডাম। তোমার মেয়ের মনে এখন অন্য কিছু চলছে। নইলে সেদিন আমায় অমন সটান জানিয়ে দেয়, বাবা, বিয়েটা খুব জরুরি জীবনে? বোঝ!

 এবার সত্যি ইলা থমকাল। ঠোঁটের কোণ কামড়ে বলে, ‘ঠিক আছে, এসব আলোচনা পরে হবে’খন। ছাড়ি এখন, মিটিং আছে’।

 তারপর থেকে সারাক্ষণই মাথাটা ভার হয়ে আছে। সুমি টা সত্যি কেন এমন করছে? কেন ওর এই হঠাত সিদ্ধান্ত, বিয়ে করবে না। জিজ্ঞাসা করলে, চুপ। তবে সেদিন কড়া হাতে চেপে ধরতেই উগরে দিল সব। ‘বিশাখটা যাচ্ছেতাই! ওকে আর ভাল লাগছে না’।

 -মানে? বিয়ের দিন পর্যন্ত ঠিক। এখন এসব কী ছেলেমানুষি !

-ছেলেমানুষি নয়, আই অ্যাম সিরিয়াস। বিশাখকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না।

-কিন্তু কেন?

-ও রোজ এক পাতা করে আজকাল কবিতা লিখে এনে আমায় শোনাতে শোনাতে অফিস যাচ্ছে। হরিবল! আধ ঘন্টার রাস্তা ফুরোতে লাগছে সোয়া এক ঘন্টা। প্রতিদিন অফিস লেট। তাড়া দিলে কবিতার বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।

 ইলার কিন্তু বেশ লাগল শুনে। খুশিতে মুখ ঝলমলে। আহা, কবি মানুষের প্রতি তার বরাবরের দুর্বলতা। এমন জামাই …

 -থামো তো! – সুমি একেবারে জল ঢেলে দিল ইলার খুশিতে। -কাজ কম্ম মাথায় তুলে তিনি কবিতা লিখছেন! আবার কী? একেক সিজনে একেক ধরনের কবিতা, পুরো রবীঠাকুর। তাই চিন্তা করে দেখলাম, এই কবি টাইপ ছেলে আমার পোষাবে না।

 -একটা সম্পর্ক গড়ে এখন এভাবে পিছিয়ে আসা কি ঠিক?

 -একদম ঠিক। যখন ওকে পছন্দ করেছিলাম, তখন ও একজন সিরিয়াস টাইপ মানুষ ছিল। ডাকাবুকো ইঞ্জিনিয়ার, চেহারাও হ্যান্ডু। আর এখন? উফ্‌ বাবা!

 সেদিনের পর থেকেই ইলা চিন্তিত। এদিকে বিয়ের তারিখ পর্যন্ত ঠিক হয়ে গেছে, আত্মীয় স্বজন কেউ জানার বাকি নেই। কথাটা এতদিন সুনন্দকে জানতে দেয় নি। কিন্তু এবার তো ফাঁস করতেই হবে। আর তারপর? রায় বংশের সেই বীর পুঙ্গব নিশ্চয়ই হাতেই তার মাথা কাটবে।

***

 ইলা আজ তিনদিন হল বাড়ির বাইরে পা রাখে নি। চাকরি জীবনে এটা রেকর্ড। এবার নিজেই লম্বা ছুটির অ্যাপ্লিকেশন পাঠিয়ে দিল অথরিটির কাছে। মনটাকে কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না। একটা মাত্র মেয়ে! সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিল। বিয়ের ঠিক কদিন আগে, সুমি ড্যাং ড্যাং করে রওনা দিল টেক্সাস।

(২)

 ইলা এখন বিছানায় শুয়ে। মন খারাপ। চোখের পারটা ভেজা ভেজা। খানিক আগেও বর্ষা ঝরেছে। আজকাল প্রায় এমন হয়। আচ্ছা, মেয়েকে কি সে ঠিক ভাবে মানুষ করতে পারল না? নইলে এত একগুঁয়ে, ক্যারিয়ার সর্বস্ব হয়ে গেল কখন?

কিন্তু তার তো কোনও ত্রুটি নেই। ইলা আপন মনেই মাথা নাড়ে। যথা সম্ভব সুশিক্ষা দিয়েছে। আসলে এই প্রজন্মটাই বড্ড স্বার্থপর। ওরা কাউকে গভীর ভাবে ভালবাসতে জানে না। ওদের ভালবাসার নদীতে চরা পড়ে গেছে।

আজ কি বিয়ের তারিখ কোনও? দূরে সানাইয়ের সুর। বাতাস ভাসিয়ে আনছে সুরটাকে। মনটা হু হু করল। সাতদিন বাদে তার বাড়িতেও এমন সানাই বাজত। হাহ্‌!

দরজা খোলার শব্দ, সুনন্দ বাইরে থেকে হেঁটে ফিরলেন। ইভিনিং ওয়াক। আজকাল মানুষটা অদ্ভুত শান্ত। কোথায় নাকি কোন বুড়োদের সার্কেল হয়েছে, বিকেলে সার সার সবাই প্রাণায়ামে বসেন।

মোবাইল বাজছে। নিশ্চয়ই স্কুল সেক্রেটারি। বাজুক, ধরবে না ইলা। সুনন্দই তড়িঘড়ি পাশের ঘর থেকে এসে মোবাইল ধরেন, ‘আরে বল, বল। কেমন আছিস তুই মা?’

ইলা জোর করে চোখ টিপে রাখে। হুড়মুড় করে একগাদা অভিমান বুক ছেয়ে ফেলছে। স্পিকার অন করে সুনন্দ কথা বলছেন, ‘এই শোন, তোমাকে মেয়ে কী একটা আর্জেন্ট কথা বলবে বলছে’।

মোবাইলের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল ইলা, ‘কান খোলা আছে, শুনছি’।

-মা!-গলায় রিনরিনে স্বর সুমির। – ও মা! রাগ করেছ না খুব?

ইলা কঠোর হতে চায়। কিন্তু মা ডাক ভেতরটাকে গুড়িয়ে দিচ্ছে। আবেগকে বশে রাখতে চেয়েও পারছে কই। ঝরঝর করে দু চোখ বেয়ে প্লাবন এল।

-শোন মা। তোমার রাগ ভাঙানোর মোটে সময় নেই হাতে। শুধু বলি, আমার এদিকে কিন্তু সব অ্যারেঞ্জমেন্ট রেডি। তোমাদের ওদিকে কী অবস্থা?

-কীসের অ্যারেঞ্জমেন্ট!

-মানে! আমার বিয়ের। আমি কিন্তু ওই দিনই বিয়ে করছি।

-বেশ বেশ। – ইলার গলায় উদাস ভাব। – তা পাত্রটি কে, জানতে পারি? কোনও লালমুখো সাহেব বুঝি?

হা হা হা। সুমি হাসছে। -না গো। তোমার সেই প্রিয় ছেলে, কবি বিশাখ চন্দ্র।

-মানে? বিশাখ তো কলকাতায়। তুই এখন কোথায়? – উত্তেজনায় ইলা বিছানায় উঠে বসে।

-কেন টেক্সাসে! শোন, কাজের কথাটা আগে সারি। আমার এদিকে সব কমপ্লিট। ফ্রম পুরোহিত টু লোক খাওয়ানো। তবে বেশি ভিড় বাড়াবো না। দু চারজন, যারা খুব ক্লোজ। ওই সন্ধ্যা লগ্নেই বিয়ে। তবে এই বিয়েটা একটু অন্য রকম, অন-লাইন ম্যারেজ। ভিডিয়ো চালিয়ে…

-হোয়াট! এসব কী হেঁয়ালি হচ্ছে ? দুজন দুদিকে, শুধু ভিডিয়োয় …

-ডোন্ট ওরি মা। সব ঠিক হবে। হাতে অল্প সময়, কী করি বলো। তবে পুরোহিত মশাই একেবারে চ্যাম্পিয়ান। সব মুশকিল আসান উনিই করলেন। বলেন, ‘ই-ম্যারেজ অ্যাপ চালিয়ে দেব। যজ্ঞ, মন্ত্রোচ্চারণ, সব আচার বিচার পুঙ্খানুপুঙ্খ হয়ে যাবে। স্মোক ফ্রি, ডাস্ট ফ্রি, ঝামেলা ফ্রি’। কী দারুণ না! শুনেই আমি রাজি। তবে এরপরেও যেটুকু বাকি থাকবে, কলকাতায় ফিরে হবে। সেটারও ব্যবস্থা পাকা। শিগগিরি ফিরছি। চ্যালেঞ্জটা আমি জিতে গেছি মা, প্রজেক্টটা দারুণ সাকসেসফুল হয়েছে। একেবারে একশোয় একশো, ম্যানেজমেন্ট খুশি।

ভেতরে ভেতরে আর একটু উত্তেজিত হল ইলা। -‘এই নাকি কবি বর তোমার পছন্দ নয়?’

সুমি হাসছে, ‘শোন, ভূমিকম্পের আগে মাটিটাকে একটু শক্ত করে নিতে চাইছিলাম। এই যে প্রায় বিয়ের মুখে টেক্সাস চলে এলাম, নিঃসন্দেহে এটা তোমাদের কাছে একটা জার্ক। তাই আগে থেকে একটু … তবে বিশাখ সব জানত। আমাদের মধ্যে আগে থেকেই সব আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল। – সুমি কথার মাঝখানে একটু দম নিল। – এই প্রজন্মটাকে এত দোষারোপ কোর না মা। ওরা কমিটমেন্ট রাখতে জানে’।

-কিন্তু এই অনলাইন বিয়ে? সেটা তো সম্পূর্ণ অভিনয়। মিথ্যে বিয়ে। ভার্চুয়াল ম্যারেজ।

-চুক চুক চুক। – আওয়াজ শুনেই ঘাড় ফেরাতে ইলা দেখে, সুনন্দ কাছেই দাঁড়িয়ে, হাসছেন মুচকি মুচকি। ‘আরে, জীবনের রংগমঞ্চে আমরা তো সবাই-ই কম বেশি অভিনেতা। শোন মা, আমি রাজি এই বিয়েতে। তবে একটা অধ্যয় যে বাকি রয়ে যাবে। ওই চার্য হান্ড ওভারের পর্বটা। বুঝলি কিছু? আরে ওই যে, কন্যা সম্প্রদানের ব্যাপারটা।

সুমি চুপ। লাইন কি কেটে গেল? সুনন্দ হ্যালো হ্যালো করে চলেন। তখনই মেয়ের গলা ওপাশে, ‘আমায় সম্প্রদান করে দেবে? কেন বাবা? আমি যে আজীবন তোমার মেয়ে হয়েই থাকতে চাই’।

এবার সুনন্দও চুপ। ইলা লক্ষ করে স্বামীর চোখে ঝিলকাচ্ছে কান্নার ফোঁটা । তবু মুখে হাসি মেখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন তিনি, ‘দেখো, এই হল, রায় বংশের মেয়ে। সকলের থেকে আলাদা। কত ট্যালেন্ট ওর, তবু ওই ‘ই’ দুনিয়া ওর আবেগকে শুষে নিতে পারে নি। হ্যাঁ রে মা, এই রাজা বাবাটার বুকে আজীবন তুই রাজকন্যা, কার ক্ষমতা দেখি কেড়ে নেয়’।

দূরের ওই সানাইয়ের সুর এখন আরও স্পষ্ট। বুকটা হঠাৎ তোলপাড় করে উঠল ইলার। আবার নতুন করে ঝেঁপে এল কান্না। কর্তা গিন্নী এবার দুজনেই হাপুস হয়ে কাঁদছেন। তবে এ কান্নার জলে রামধনু রং আঁকা।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *