বড় ঘড়ির তলায়
হাওড়া ষ্টেশনে পৌঁছেই থামে সুকন্যা। এনকোয়েরি অফিসটা কোথায়? ওখানেই সুতনুর অপেক্ষা করার কথা, ঠিক পাঁচটায়। এখনও সময় হাতে আছে।
মোবাইল বাজছে। ঝিনচাক ঝিনচাক। রিং টোনটা অসহ্য। এসব মুসকানের কাজ। দু দিন অন্তর ওর মোবাইলে রিংটোন পালটাবে। কিন্তু দু হাত যে জোড়া, পিঠেও ঢাউস ব্যাগ। কলটা ধরবে কী করে? ওপারে সুতনু হয়তো। কিংবা মুসকান।
ও স্কুল থেকে ফেরার আগেই সুকন্যা বেরিয়ে এসেছে। নইলে মুসকানের বেড়ি কেটে বেরোনো অসম্ভব। দিদিকে এক মুহুর্ত চোখের আড়াল হতে দেয় না। কাল সারা রাত আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ঘুমচ্ছিল। কিছু কি আঁচ করেছিল যে আজ দিদি চলে যাচ্ছে?
ঘুমের মধ্যেই সুকন্যার গালে কতবার চুকচুক চুমু খেল। বিড়বিড় করে কী বললও যেন। বুকটা তখনই মুচড়ে উঠেছে সুকন্যার, বাকি রাতে ঘুম, টা টা বাই বাই। নিজেকে শক্ত করতে করতে ভেবেছে এই মায়ার কাছে হারলে চলবে না। আজ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই হবে।
রিং টোনটা থেমে গিয়েছিল, কিন্তু মিনিট কয়েকের বিরতি। আবার বাজছে, ঝিনচাক ঝিনচাক। জ্বালালো! নিশ্চয়ই সুতনু। বড্ড অধৈর্য ছেলেটা। আসলে ও-ও আজ নার্ভাস। এত বড় দায়িত্ব কাঁধে নিতে যাচ্ছে। সেরকম ভাবে দুজনের কেউই তো এখনও দাঁড়ায় নি। আপাতত ওরা এক দিদির বাড়িতে গিয়ে উঠবে, ঠিক করেছে। বাকিটা ফিউচর টেন্স।
ব্যাগের ভেতর হাত গলিয়ে মোবাইল বার করে সে। ওমা, স্ক্রিনে তো অন্য নাম, ‘দুষ্টু লোক’ ! ভ্রু কুঁচকে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে।
দুষ্টু লোক নামটা মুসকানের দেওয়া। বারবার ওই নম্বর থেকে দিদিকে কেউ বিরক্ত করে, সুতরাং সতর্কতাবশতঃ বোন অমন নামে নম্বরটা সেভ করে রেখেছে। ক্লাস ফাইভে পড়া মেয়ে, বুদ্ধি ক্ষুরধার। চোখ গোল গোল করে বলেছিল, ‘খবরদার, দুষ্টু লোকের কল ধরবি না’।
সুকন্যা সত্যিই ধরত না ওই নম্বর। কিন্তু এখন মাথায় রাগ চড়েছে। কলটা ধরে বাজখাই একটা হুঙ্কার ছাড়ার প্রস্তুতি নিল, অমনি এক অল্পবয়স্ক ছেলে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে টিপ্পনি কেটে গেল, ‘চলতে চলতে মধ্যিখানে স্ট্যাচু! প্ল্যাটফর্মের সাইডে গিয়ে ফোনটা করুন না?’
-কী? কী বলছেন? -সুকন্যা চোখ পাকিয়ে বলতে যায়।
ছেলেটা ততক্ষণে ভিড়ে মিশে গেছে। কিন্তু মোবাইলের ওপ্রান্ত থেকে একটা ঝাঁঝ কান জ্বালিয়ে দিল, ‘কী আবার বলব? বাড়ি থেকে বেরিয়ছো? আর কত লেট হবে তোমার? সেই তখন থেকে হাওড়া স্টেশনে বড় ঘড়ির তলায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, ঠ্যাং দুটো আর নেই’।
মানে? সুকন্যা হকচকিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। হাওড়া ষ্টেশন! বড় ঘড়ি! কে কথা বলছে ? সুতনু? না, এই তো স্ক্রিনে স্পষ্ট উঠেছে ‘দুষ্টু লোক’।
কী বলছে কী ছেলেটা? ও জানল কেমন করে সুকন্যা এখন হাওড়া স্টেশনে? তাহলে কি ওকে ফলো করে যাচ্ছে দূর থেকে? কিন্তু কেন? কারোর গুপ্ত চর হয়ে কাজ করছে নাকি? তাতে লাভ?
মোবাইলে তখনও শাসানি ভেসে আসছে, ‘পই পই করে তখন বললাম, আজ ঘর থেকে বেরিয়ো না। তা মেয়ের তেজ কত। সেই এলে। আজই তোমাকে বাড়ি থেকে পালাতে হল? যত্তসব। -যাক, এখন আছো কোথায় দয়া করে বলে আমায় উদ্ধার কর’।
সুকন্যা চুপ। ছেলেটার কথার তোড়ে নিজের কথা হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আজ ‘দুষ্টু লোক’ বড্ড বাড়াবাড়ি করছে। আগে কখনও এভাবে কথা বলেনি। ফোনে তার গলা পেলেই, ওহ্, সরি সরি, কীভাবে যে বার বার আপনার নম্বরে কলগুলো চলে যায়, এ জাতীয় কথা বলে ছেড়ে দিত।
একদিন তো মোটা টাকার রিচার্জও করে দিল। তারপরেই কাঁচুমাচু স্বরে ফোন, ‘বিশ্বাস করুন ম্যাডাম, আমার ছাত্রীর নম্বরের সঙ্গে আপনার নম্বরের জাস্ট শেষ দুটো নম্বরের এদিক ওদিক। ভুলটা তাই হয়ে যায়’।
-কারোকে বোকা বানাতে গেলে নিজেকে একটু চালাক হতে হয়। – সুকন্যা গম্ভীর ভাবে বলেছিল। – নম্বর দুটো আলাদা নামে সেভ করে রাখেন না কেন?
-রাখতে তো চাইছি, মোবাইল নিচ্ছে না।
-অত্যন্ত দুর্বল যুক্তি, – সুকন্যা চোখ বুজে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে করতে বলে, -এরকম চালাকি আর কখনও করবেন না। বলেই সে ফোন কেটে দেয়। তারপর দীর্ঘদিন শান্ত। লোকটা আর রং নম্বরের গল্প ফেঁদে ফোন করে নি। কিন্তু আজ আবার! আর যা যা বলে চলেছে, হাওড়া স্টেশন, বড় ঘড়ির তলায়, সবই তো তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কাকতালীয় কি সবটাই?
সুকন্যা তো সত্যিই আজ বাড়ি থেকে … না, না। নিজেকে শুধরে নেয় সে তৎক্ষণাৎ। বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে না মোটেই। অভিমান করে চলে যাচ্ছে। কেন যাবে না? যেখানে কেউ তাকে ভালবাসে না, সেখানে থাকা যায় না। মুসকান, একমাত্র ব্যতিক্রম। জন্মের পর থেকে দিদিই ওর সব। ওর কচি মনে বা মগজে কেউ এখনও ঢোকাতে পারে নি, সুকন্যা ওর সৎ দিদি।
তবে বাবার ওপরেই সমস্ত অভিমান সুকন্যার। এত ভীরু একজন মানুষ! মনে মনে বড় মেয়েকে ভালবাসলেও বর্তমান স্ত্রীর সামনে সব ভালবাসা নিভে যায়।
(২)
ট্রেনের খবরাখবর জানিয়ে মাইকে ঘোষণা চলছে। ঘোষিকার গলাটা বড় কর্কশ। মেয়েদের এমন কর্কশ স্বর ভাল শোনায় না। সুকন্যার নতুন মায়ের গলাটাও এমনই। চেহারাতেও পুরুষালি ভাব। তবু শহরের মধ্যে কত লোক মান্যি করে। মহিলা ডাক্তার বলে কথা। নিজের নার্সিংহোম। বাবা আগে ওই নার্সিংহোমেরই কার্ডিওলজিস্ট ছিল।
সুকন্যার যখন বয়স দশ, তখন হঠাৎ তার মা মারা যায়। কিছুদিন পরেই বাবা নতুন মা-কে বিয়ে করে ঘরে আনে। অনেকদিন সে মেনে নিতে পারে নি সম্পর্কটা, মন বিদ্রোহ করেছে। তবে মুসকানের জন্মের পর রাগ, অভিমান কীভাবে যেন কর্পূর হয়ে উবে গেছে।
কানে মোবাইলটা নিয়ে সুকন্যা এনকোয়েরির সামনেই হাঁটাহাঁটি শুরু করে। এখনও পাঁচটা বাজতে ঘন্টাখানেক বাকি। মুসকান নিশ্চয়ই ফিরে এসেছে স্কুল থেকে। তাকে কি খুঁজবে সারা বাড়ি? আজ সকালে বোনের রোগা বুকটা নিজের বুকের মধ্যে জাপটে ধরে রেখেছিল কিছুক্ষণ। আর হয়তো দেখা হবে না। টের পাচ্ছিল নিজের বুকের ভেতর ভাঙন।
কব্জি উল্টে আর একবার ঘড়ি দেখল সে। সুতনুকে কি ফোন করে জানাবে, জায়গা মতো পৌঁছে গেছে? ছেলেটা আজ ভীষণ নার্ভাস, সকাল থেকেই মুখে ভুলভাল কথা। একবার আমতা আমতা করে বলেওছিল, ‘কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? আর একবার ভাল করে ভেবে দেখলে হত না? তুই এম এ সেকেন্ড ইয়ার, ইংলিশ। কিন্তু কবে চাকরি বাকরি জুটবে, ঠিকঠিকানা নেই। আমি তো কাঠ বেকার। পাস গ্র্যাজুয়েট। টুকটাক কাজ করি। দুটো পেট চালাব কেমন করে? থাকবই বা কোথায়?
সুকন্যা হেসেছিল, ‘কেন, গাছতলায়?’
-ও সব নভেলের ডায়ালগ। সত্যি সত্যি হয় না। আর গাছই নেই তো গাছতলা। মাথার ওপর ছাউনি কে ধরবে রে? ভাল কথা বলছি, এখনও মত পাল্টা। আর একটু দাঁড়িয়ে নিই, তারপর ভাবা যাবে।
ক্ষেপে গিয়ে সুকন্যা ফোন ছেড়ে দিয়েছিল। কয়েক ঘন্টা বাদে খুলতেই দেখে লম্বা লম্বা ইমোশনাল মেসেজ। সুতনু মেনে নিয়েছে তার প্রস্তাব। ছেলেটা এমনি, আত্মবিশ্বাসটা বড্ড কম। কিন্তু শরীরে মায়াদয়া আছে। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব সেই স্কুলে পড়া দিন থেকে। নতুন মায়ের দুর্ব্যবহার যখন চরমে উঠছিল, ভালবাসা দিতে পারে এমন একজন কাউকে খুঁজে বেরাচ্ছিল মনে মনে, তখনই সুতনু আসে জীবনে। মনে হয়েছিল, ওর ছায়াতেই নিবিড় আশ্রয়।
মোবাইল বাজছে। ভগবান! আবার সেই দুষ্টু লোক। ‘মন দিয়ে শোন, আমি অপেক্ষা করছি বড় ঘড়ির তলায়। কাছাকাছি এসেই আমায় একটা ফোন করবে। এখন রাখছি’।
কপালের রগ দুটো হঠাৎ রাগে দপ দপ করে উঠল। স্কাউন্ড্রেল! আজ একটা তুমুল কিছু করবেই। পায়ে পায়ে এনকোয়েরি অফিস ছেড়ে সে পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করে। ওই তো বড় ঘড়ি। কে আছে ওখানে দাঁড়িয়ে, দেখা যাক।
(৩)
কিন্তু বড় ঘড়ির সামনে গিয়েও দুষ্টু চরিত্রের কোনও লোকের মুখ আলাদা করে চিনতে পারল না। আশেপাশে কটা অবাঙালি পরিবার, মেঝেয় শতরঞ্চি পেতে টিফিন কৌটো খুলে জমিয়ে খেতে বসেছে। কোনও দূর পাল্লার ট্রেন লেট চলছে বোধহয়। কারো কারো আবার মেঝেতেই ঢালাও বিছানা। সুকন্যা ঘড়ি দেখল, পৌনে পাঁচটা। সুতনু পৌঁছল না এখনো? আর একবার ফোন করবে?
হঠাৎ নজর পড়ে, লাল গেঞ্জি গায়ে একটি কম বয়সী ছেলে অস্থির ভাবে পায়চারী করছে এদিক ওদিক। কানে মোবাইল, উত্তেজিত কথাবার্তা কারোর সঙ্গে, টুকরো টাকরা ছিটকেও আসছে, তবে বোধগম্য হল না। অল্প সন্দেহ হল। এই কি তবে ‘দুষ্টু লোক’? কথা শেষ করে ও পকেটে মোবাইল রাখতেই সুকন্যার মাথায় কী খেয়াল চাপল, কল রেজিস্টারে থাকা নম্বরটা ডায়াল করে ফেলল।
ধারণা খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। লাল গেঞ্জির মোবাইল বাজছে। তার মানে এ-ই সেই কালপ্রিট! কিন্তু চেহারায় তো নিপাট ভালমানুষ। ফর্সা, টকটকে রং, যথেষ্ট ভদ্র। একটু মোটার দিকে গড়ন। তেল দেওয়া চুল টেনে টেনে আঁচড়ানো। তাড়াতাড়ি লাইন কেটে দিল সুকন্যা।
মাইকে এখন ঘোষণা হচ্ছে কিছু কিছু জায়গায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের জন্য বহু দূর পাল্লার ট্রেন বাতিল হয়েছে। লাল গেঞ্জি পায়চারী করতে করতে তার সামনে এসে থামল। হঠাৎ ওই অবাঙালী পরিবারের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ওঠে আপন মনে। তার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘দেখছেন, কী সুন্দর আনন্দ করে সময় কাটাচ্ছে? এই যদি বাঙালী হত, ট্রেন লেটের খবর পেয়েই পেট ফেট গরম করে একেবারে যাচ্ছেতাই করে ফেলত’।
ফালতু ভাব পাতানোর চেষ্টা। সুকন্যা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ছেলেটা পেছনে হাত দিয়ে আবার একটু হাঁটাহাঁটি শুরু করেছে। ঘাড় বাঁকিয়ে বলে, ‘বাইরে কি খুব বৃষ্টি?’
-আপনি যেখানে আমিও সেখানে। কী করে জানব? – সুকন্যা ক্যাটক্যাট করে জবাব দেয়।
-না, কাল তো দেখেছিলাম চাঁদটা ঠেলেঠুলে আকাশে উঠেছে। বেশ বড়সড় থালার মতো। আজই বর্ষা বাদল।
ঠেলেঠুলে চাঁদ আকাশে! বলার ধরনে হাসি পেলেও সুকন্যার মুখ গম্ভীর।
-আচ্ছা, আপনি কখনও চাঁদ আর বৃষ্টি একসঙ্গে দেখেছেন?
ভারি বাচাল তো। রাগ ধরল এবার। হাত ঘুরিয়ে ঘড়ির দিকে তাকায়। সুতনু কি তাহলে বৃষ্টিতেই আটকে পড়েছে ? তাহলে কি আসবে না?
-সম্ভবত না।
সুকন্যা চমকে তাকায়, ‘কী না? ও আসবেই’।
লাল গেঞ্জি ঘাবড়ে গিয়ে বলে, ‘ও হো, আমি অন্য কথা বলেছি। আপনি বুঝি কারোর অপেক্ষায়? আমিও। সেম কেস। এক পাগলী ছাত্রীর পাল্লায় পড়েছি, বুঝলেন না। বাড়ি থেকে পালাচ্ছে। পরীক্ষার পড়া তৈরি হয়নি। কোনও মানে হয় বলুন?’
সুকন্যা হাই তোলে, ‘কী পরীক্ষা?’
-হায়ার সেকেন্ডারী। যাচ্ছেতাই নাকি প্রিপারেশন। কোনভাবেই টেনে তোলা যাবে না। তাই ফট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল বাড়ি থেকে পালাবে। আমি তার মাস্টার মশাই, তাই আমাকেই নাকি সাহায্য করতে হবে। বুঝুন, কেমন ঝোলা ঝুলিয়েছে আমায়? বুঝিয়ে পারছি না, এমন কত পরীক্ষা জীবনে আসবে।
সুকন্যার চোখ ঘন ঘন ঘড়িতে চলে যাচ্ছে। সুতনু কি সত্যিই আসবে না? দেখা যাক, আর একবার ফোন লাগিয়ে।
লাল গেঞ্জির মোবাইলটাও একই সঙ্গে বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়েই ও আতঙ্কিত গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আয়লা দিদি! সরি দিদি, সরি। আজ আমার জীবনে বড় টেনশনের দিন, বিলিভ মি। দু চারবার আবার আপনার নম্বরে কল চলে গেছে। আর যাবে না’।
এক হাত দূরে দাঁড়ানো লাল গেঞ্জির কথা হতভম্বের মতো শুনে চলে সুকন্যা। কী হল কেসটা? ও হো, সুতনুকে ফোন করতে গিয়ে ও আবার ‘দুষ্টু লোক’ টিপে ফেলেছে। কিন্তু আয়লা দিদি বলে ছেলেটা ডাকল কাকে? কান থেকে মোবাইল নামিয়ে ও ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘কে আয়লা দিদি? কাকে আপনি …এত স্পর্ধা আপনার?’
লাল গেঞ্জির কাঁদো কাঁদো মুখ, ‘এ কী! আপনি ফোন করেছিলেন নাকি? তার মানে আপনিই … – বলেই সে জিব কাটে, – সরি, সরি, ম্যাডাম, আসলে ওই নম্বরের ওদিকে যিনি, তাকে আমি আয়লা দিদি বলেই ডাকি। উফ, যেন একটা ঝড়। কিন্তু আপনি যে …
সুকন্যার মুখে এখনও গনগনে আঁচ। একটাও শব্দ খরচ করল না।
হঠাৎ ফিক করে হেসে উঠল লাল জামা, ‘কী তাজ্জব ব্যাপার! তাহলে রং নম্বরটা আপনার সংগেই হত? আচ্ছা, একটা কথা বলবেন? আপনিও কি কারোর অপেক্ষায়? না মানে এই বড় ঘড়ির তলায় তো!
উত্তরে রাগী চোখে শুধু তাকাল সুকন্যা।
ছেলেটা চুপসে যায়, ‘সরি ম্যাডাম, সরি। আর কথা বলব না’।
সুকন্যার চোখ আবার মোবাইলে। সুতনুর নম্বর টিপছে এবার সতর্ক হয়ে। লাইন এনগেজড। ওদিকে লাল গেঞ্জিও কাকে ফোনে ধরে গাঁক গাঁক চেঁচাচ্ছে।
-আপনারা কত দূর? মোনালিসা আসছে, ফোন করেছিল। ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করবে। বিশ্বাস করুন, আমি মোনালিসার ভাল চাই। তাই আপনাদের খবর দিলাম। ও এখনও বড় অবুঝ। শান্ত ভাবে, ভালবেসে কাছে ডেকে নিলে ওকে আপনারা সঠিক রাস্তায় ফেরাতে পারবেন। পরীক্ষায় পাশ ফেলটা খুব বড় কিছু নয়। ও যেন জীবনের পরীক্ষায় হেরে না যায়’।
সুকন্যা বিরক্তির চোখে তাকায়। হেবি লেকচার ঝাড়ছে ছেলেটা।
-হ্যাঁ, কী বলছেন? – লাল জামা ঘাড় নিচু করে কথা বলতে বলতে পায়চারি করছে। – পালাবার প্ল্যান ছিল ওকে নিয়ে? ছিঃ, ছিঃ! আমাকে হানড্রেড পার্সেন্ট বিশ্বাস করতে পারেন। আমি কারোর খারাপ চাই না। এখনও বলছি, সময় আছে। শাসন দিয়ে নয়, মোনালিসাকে ভালবাসা দিয়ে কাছে ডেকে নিন। দেখবেন ও একদিন সেরা মেয়ে হয়ে উঠবে। রাখলাম তাহলে।
ঘড়ি সাড়ে ছটার ঘর ছুঁইছুঁই। বাইরে দুর্যোগ নাকি বেড়েছে। ট্রেন বাতিলের খবরে স্টেশন চত্ত্বর কেমন ফাঁকা ফাঁকা। সে আবার সুতনুকে ধরার চেষ্টা করে। এবার রিং হল। হ্যালো বলল সুতনু।
কী রে ? কোথায় তুই?
-সরি বন্ধু, রিস্কটা নিতে পারলাম না। তুই ফিরে যা। মাথা ঠাণ্ডা কর। -সুতনুর গলাটা ফ্যাসফ্যাসে। – লাইন কেটে দিল ও কট করে।
মানে? সুকন্যা হতভম্ব। এটা কী হল? দাঁতে দাঁত চেপে আবার নম্বর টিপতে থাকে। কিন্তু এবার মোবাইল সুইচড্ অফ। বুকের ভেতরে দামামা বাজতে শুরু করেছে। এবার কী হবে?
পাশে নজর পড়তেই দেখে লাল গেঞ্জি নেই। যাহ্, কোথায় গেল ছেলেটা? বাচাল খুব, তবু তো ছিল। শরীর অস্থির লাগছে এখন। খিদেও পেয়েছে ভীষণ। সেই দুপুরে একটুখানি ভাত খেয়ে বেরিয়েছে।
-এই নিন, গরম গরম আলুর চপ। ভাজছিল, নিয়ে এলাম। বাবা, কী লাইন। – লাল গেঞ্জির হাতে দুটো ঠোঙা। -নিন, নিন, খান। তবে আড়াইটের বেশি পাবেন না। পাঁচটাই পড়ে ছিল। তাই ইকোয়াল ডিভিশন, আড়াই আড়াই। – ছেলেটা একটা আলুর চপ তার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
সুকন্যা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, ‘রাস্তার জিনিসে আমার অ্যাসিডিটি হয়’।
-দুর মশাই, অ্যাসিডিটি। -খালি পেটে এমনিতেই আপনার অ্যাসিডিটি হচ্ছে। নিন ধরুন। আপনি না খেলে আমিও খেতে পারব না।
বাধ্য হয়ে হাত বাড়ায় সে। লাল গেঞ্জি আর একটা ঠোঙা এগিয়ে দেয়, ‘এক গাল মুড়ি খান সঙ্গে। নইলে সত্যি অ্যাসিডিটি হবে। এই দাঁড়ান, দাঁড়ান, বলে সে হাত দিয়ে ওর খাওয়া থামিয়ে দেয়, ‘একটা জলের বোতল কিনে আনি দৌড়ে। তেলেভাজা খাওয়ার আগে জল খেতে হয়’।
কেন যেন ভীষণ কান্না পাচ্ছে সুকন্যার। সুতনুকে বিশ্বাস করেছিল বলে? নাকি এখন নিজের অন্ধকার ভবিষ্যত ভেবে ?
ঘড়িতে সাতটা। বাড়ি থেকেও তো কোনও ফোন এল না। অবশ্য কেই বা করবে? কিন্তু মুসকান? কান্নাকাটি করে বাবার কাছে বায়না ধরেনি একবারও? বলে নি, দিদির একটা খোঁজ নাও। ও নিজেও তো ফোন করতে পারত।
বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরল। না, কেউ তার আর কোনও খোঁজ নেবে না। আজ থেকে সে সম্পূর্ণ একা। কিন্তু কোথায় যাবে ও?
মোবাইল বেজে উঠল এ সময়। নিঃশ্বাস বন্ধ করে ও স্ক্রিনের দিকে তাকায়, বাড়ির ল্যান্ড লাইন নম্বর। বোতাম টিপতে হাত কেঁপে গেল। ভাঙা স্বরে বলে, ‘হ্যালো’।
ওপাশে বাবা। আতঙ্কিত কন্ঠস্বর, ‘কোথায় তুই? সেই দুপুরে বেরিয়ে গিয়েছিস। পাশের বাড়ির কাকিমা বলল। আমি তো ফিরলাম এখন চেম্বার সেরে। মুসকান কেঁদে কেঁদে জ্বর এনে ফেলেছে’।
সুকন্যা চুপ।
-কী রে মা, বলবি না? কোথায় তুই এখন? ছোটবেলার মতো লুকোচুরি খেলার শখ হয়েছে বুঝি খুব?
দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে রেখেছে সে। নইলে হয়তো এখুনি কেঁদে ফেলবে।
-আমি গাড়ি বার করছি। বল সোনা, কোথায় আছিস? দিনকাল কত খারাপ জানিস না?
আর নিজেকে বেঁধে রাখা গেল না। সে ডুকরে কেঁদে বলে, ‘ও বাড়িতে আমি আর ফিরতে পারব না, বাবা। প্লিজ’।
বাবা চুপ। একটু পরে বোজা গলায় বলে, ‘এসব বলতে নেই। তুই বড় হয়েছিস, বুঝিস না তোর বাবাটা কিছু জায়গায় বড় অসহায়। তাকে একা ফেলে চলে যাবি? ওরে, তুই আমার প্রথম ভালবাসার স্মৃতি। কেড়ে নিবি সব স্মৃতিগুলো?’
সুকন্যা বলতে যায় কিছু, তখনই দেখে লাল গেঞ্জি ছুটে ছুটে আসছে। হাতে জলের বোতল। হাত বাড়িয়ে বলে, ‘এক ঢোঁক জল খেয়ে তবে চপ মুড়ি খান। অ্যান্টাসিডও কিনে এনেছি। নির্ভয়ে খেয়ে যান। একী, চোখে জল কেন? লঙ্কা কামড়ে ফেলেছেন? দেখো কান্ড, এখন চিনি পাই কোথায়?’
সুকন্যা ইশারায় বলে, ফোন চলছে। লাল গেঞ্জি জিব বার করে হাসে, ‘সরি, সরি, বুঝি নি একদম। নিশ্চয়ই কোনও ইমোশনাল সিন। ক্যারি অন’। – ও একটু দূরে সরে দাঁড়ায়।
(৪)
সুকন্যার বাবা আসছে হাওড়া স্টেশনে মেয়েকে নিতে। কিন্তু এত রাতেও জ্যাম। রাস্তার খানাখন্দর নাকি সারাই চলছে। এতক্ষণের আলাপে লাল গেঞ্জির নাম জানা হয়ে গেছে। ও কমল। হেসে হেসে কমল বলে, ‘মোনালিসাকে ওর বাবা মায়ের হাতে তুলে দিলাম। ব্যাকস্টেজে যে আমি ছিলাম, মেয়েটা বুঝে গিয়েছে। ভীষণ চালাক তো। একটু অবুঝও। আমার ওপর এবার দেদার অভিমান দেখাবে। দেখাক। ওর জীবনটা তো বেঁচে গেল। ওর বাবা মা কথা দিয়েছে পড়াশুনো নিয়ে অতিরিক্ত কিছু আর করবে না’।
সুকন্যা উসখুস করছে, বাবা কখন আসবে ? মাঝে মাঝে সুতনু উঁকি দিচ্ছে মনে, আর তখনই ভেতরে একটা হাহাকার। এত ভুল করল ওকে চিনতে?
কমল ঠোঁটের ওপর একটা আঙুল রেখে কী যেন ভাবছে। চোখাচুখি হতেই অন্যদিকে তাকাল। তারপর আলটপকা প্রশ্ন করে, ‘মেয়েরা খুব মনের কারবারি, তাই না?’
সুকন্যা হকচকিয়ে বলে, ‘কেন?’
-না, মনে হল বললাম। ভুলও বলতে পারি। আসলে আমি আচ্ছা আচ্ছা মেয়ে দেখেছি জানেন, বারুদে ঠাসা, কিন্তু যেই না ভালবাসল কাউকে, অমনি সব বারুদ ভিজে একসা। কেন এত দুর্বল হয়ে যান আপনারা?’
কমলের কথাগুলো শুনে স্বগতোক্তি করে সুকন্যা, ‘ওটা দুর্বলতা নয়। ওটা মেয়েদের গর্ব। তারা ভালবাসতে খুব ভালবাসে। কিন্তু কজন মূল্য দেয়?’
-অপাত্রে দিলে, মূল্য পাবেন কী ভাবে?
-অ্যাঁ! কিছু বললেন? -সুকন্যা চমকে তাকায়। তারপরই প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলে, ‘বেশ কায়দা করে মোনালিসাকে গার্জেনদের হাতে তুলে দিলেন। কিন্তু ও তো আপনাকে ভরসা করেছিল?’
-কীসের কায়দা ম্যাডাম? ভুল বুঝছেন। আমি কাউকে ভালবাসলে দাম দিতে জানি। হাজার প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বুক দিয়ে ভালবাসাকে আগলাতে জানি। কিন্তু মোনালিসা আমার ছাত্রী, শিশু সুলভ মন। বড় অবুঝ। ও একটা ভুল করতে যাচ্ছিল। কিন্তু ওর কথায় রাজি হয়ে এখানে আজ না এলে, নিজে নিজেই ভালমন্দ কিছু ঘটিয়ে ফেলত। ছোট্ট অভিনয় করেছিলাম। পরিস্থিতি পাল্টাতেই … যাক, এবার ওর অভিভাবকেরাই মেয়েকে সামলাবে’।
কয়েকজন ভবঘুরে জাতীয় লোক ওদের দেখতে দেখতে চলে গেল। একটা পাগলী নোংরা পুঁটলি হাতে, হাঁ করে খানিক দেখল ওদের, তারপর ফিকফিক হেসে চলে গেল। সে উসখুস করে। ঘড়িতে সাড়ে আটটা। কমলের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বৃষ্টি এখনও থামে নি?’
-বৃষ্টি! কে জানে, বোধহয় না। কেন?
-আপনি আটকে আছেন, তাই। মোনালিসা তো আর আসবে না।
কমল ভ্রু কুঁচকে তাকায়, ‘না, আশা করি ও এতক্ষণে বাবা মায়ের হাত ধরে বাড়ির পথে। আচ্ছা আমি আপনার সামনে দাঁড়ালে কি কোনও অসুবিধা বোধ করছেন?’
-না, না। ঠিক আছে, দাঁড়ান। ছাতা আনেন নি?
কমল এবার বেশ বিরক্ত। একটু সরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ছাতা, লাঠি, যা খুশির খবর নিন। আমি এখান থেকে এখন নড়ব না। আপনার বাবা কদ্দুর এলেন, আর একবার জেনে নিন’।
সুকন্যা অবাক, ‘সে কী! শুধু শুধু দাঁড়িয়ে থাকবেন?’
-হ্যাঁ, থাকব। তাতে আপনার অসুবিধা কী? আমি বরং একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি। আপনিও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকুন।
সুকন্যার মোবাইল বেজে উঠল। বাবা এসে গেছে। মাটিতে নামিয়ে রাখা ব্যাগ দুটো পিঠে পরতে পরতে ও বলে, ‘আসি তাহলে। আপনি কোন দিকে যাবেন?’
কমল হাসে, ‘আপনার উল্টো দিকে। সাবধানে যান। ভাল থাকবেন।
-আপনিও চলুন, সঙ্গে গাড়ি আছে। আপনাকে নামিয়ে দেব।
-না, না। বললাম যে, আপনার উল্টো দিকের রাস্তা আমার।
চলতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ঘাড় বাঁকিয়ে বলে, ‘হোক উল্টো দিক, তবু চলুন। এতক্ষণ আপনার অনেক বকাবকানি শুনেছি। বিরক্ত লেগেছে, তবু সহ্য করেছি। এবার আপনি আমার কথা শুনবেন’।
-কী দরকার? বললাম যে …
-জানেন তো, ভেজা বারুদ শুকিয়ে উঠলে কী হয় ?
কমলের ভ্যাবাচ্যাকা মুখ, ‘বিস্ফোরণ, বিস্ফোরণ। বিলক্ষণ জানি। চলুন তাহলে, কোন দিকে যেতে হবে।
যেতে যেতে বড় ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল তার। পাক্কা নটা।
বিড়বিড় করে সুকন্যা বলে, ‘আর কিছুক্ষণ পরেই একটা নতুন দিনের শুরু’।
___
