সুনামি আবার

সুনামি আবার

জ্বর হয়েছে বলে দু’দিন অফিসে যায়নি কিংশুক। আজ বিকেলের দিকে একটু বেরিয়েছিল সিগারেট কিনতে। ফিরে এসে এত দুর্বল, এত ক্লান্ত বোধ হতে লাগল যে, আলোটা নিভিয়ে একটা বালিশ টেনে শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়েও গেল আর অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখল ঘুমিয়ে। দেখল সেই দেড়-দু’বছর আগে যে-ছোট্ট অভয়ারণ্যের ওপর স্টোরি করেছিল, সেখানে আবার পৌঁছে গেছে। আর এবার তনুশ্রীও এসেছে ওর সঙ্গে।

উত্তরবাংলায় এলেই মনটা কেমন অন্যরকম হয়ে যায় না? তনুশ্রী বলল।

এটা ঠিক উত্তরবাংলা নয় তনু, এখান থেকে উত্তরবাংলা শুরু হচ্ছে বলতে পারো, কিংশুক বলল।

তোমার আর মৃত্তিকার সম্পর্কটাও তো ঠিক প্রেম ছিল না বলো? প্রেমের ট্রেলার ছিল বলা যায়!

কিংশুক কোনও উত্তর না দিয়ে তনুশ্রীর দিকে তাকাল। ডগডগে সিঁদুর দিয়েছে সিঁথিতে, দু’হাতে দুটো ধবধবে শাঁখা। শাঁখার একটু ওপরে ডান হাতে কিংশুকের মায়ের সেই গাবদা মকরমুখী বালাটা। কিন্তু ওই বালাটা মা বড়বউদিকে দেবে এমনই কথা ছিল না? তনুশ্রী কি তা হলে পটিয়ে ফেলল মাকে? কিন্তু এই ঘন জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে মায়ের সঙ্গে ও কথা বলল কীভাবে?

তনুশ্রী বোধহয় ওর মনের ভাবনা আন্দাজ করেই মোবাইলটা শূন্যে তুলে ধরল। কিংশুক এগিয়ে গিয়ে ওর হাত থেকে মোবাইলটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল, দাও তো আমাকে, আমি ছবি তুলব।

কার? আমার? তনুশ্রী জিজ্ঞেস করল।

না তোমার নয়, ওই হরিণগুলোর ছবি তুলব। কিংশুক বলল।

ওই যে সামনে হেঁটে বেড়াচ্ছে যে-হরিণগুলো?

না, না, ওরা তো সব চিতল হরিণ। ছাগলের জাতভাই। আমি কাদের ছবি তুলব দেখতে হলে আমার সঙ্গে এসো, বলে কিংশুক তনুশ্রীর হাত ধরে এগিয়ে গেল।

হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর চলে এসেছে ওরা, তনুশ্রী হাঁটতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ছে মাঝে মাঝে এমন সময় কিংশুক বলল, তনু দেখতে পাচ্ছ, ঘেরা জায়গাটার মধ্যে দু’জন ঘুরছে? ওরাই কৃষ্ণসার।

ওমা কী অপূর্ব! আর কী সুন্দর ওদের জুটিটা তাই না? তনুশ্রী উচ্ছ্বসিত।

ওরা জুটি নয় তনু, ওরা দু’জনই পুরুষ। ওদের সঙ্গে একটি কৃষ্ণসার হরিণীও ছিল, কিন্তু সেই হরিণীটিকে পাওয়ার লড়াইয়ে ওরা তাকে মেরে ফেলেছে। আর যেহেতু এই জঙ্গলে আর একটিও কৃষ্ণসার হরিণী নেই ওরা বাকি জীবন চিরকুমার ব্রত পালন করতে বাধ্য।

কী কষ্ট ওদের! কিন্তু ওরা ওই তোমার চিতল হরিণীর সঙ্গে থাকতে পারে না?

সে-প্রশ্নের উত্তর শুধু ওরাই দিতে পারবে তনু।

যাব? জিজ্ঞেস করব?

হ্যাঁ যাও, ওই যে ডানদিকে যে বসে আছে তার নাম কিংশুক। আর বাঁদিকে যে চরে চরে ঘাস খাচ্ছে, তার নাম কৃষ্ণগোপাল।

যাই আলাপ করে আসি গিয়ে, তনুশ্রী বলল।

তনুশ্রী অনেকটা এগিয়ে গেছে এমন সময় পেছন থেকে পাগলের মতো চেঁচাতে শুরু করল কিংশুক, তনু আমার একটা ভুল হয়ে গেছে। ওই ডানদিকে যে ঘাস খাচ্ছে তারও নাম কিংশুক। ওদের দু’জনের নামই কিংশুক।

নিজের চিৎকারেই ঘুম চটে গেল কিংশুকের। বালিশের তলা থেকে মোবাইলটা বের করে দেখল সতেরোটা মিসড কল। একটাই নম্বর থেকে। একটু অবাক হয়ে অচেনা নম্বরটায় ফোন লাগাল কিংশুক। ওপাশ থেকে সায়ন্তন বলল, কিংশুক আমি খুব বিপদে পড়ে আপনাকে ফোন করছিলাম, আপনি একটু আমার আস্তানায় চলে আসতে পারেন?

কিংশুক বলল, আমার আসলে জ্বর গত দু’দিন ধরে। কিন্তু কী হয়েছে আপনার?

সায়ন্তন একটা অদ্ভুত গলায় বলল, সেটা ঠিক ওভার দ্য ফোন বলা যাবে না। আমি অনিরুদ্ধকেই খুঁজছিলাম, কিন্তু ও তিন দিন হল কোচবিহারে গেছে, তাই…

কিংশুক হেঁচকি তুলল, পরশু সন্ধেয় অনিরুদ্ধ তিরিশ টাকা ধার নিল ওর থেকে আর সায়ন্তন বলছে অনিরুদ্ধ তার চব্বিশ ঘন্টা আগে থেকে কোচবিহারে আছে? অনিরুদ্ধর যা স্বভাব, তাতে আশ্চর্য নয়। আবার আশ্চর্যও বটে। ‘ভৌ’ ওরফে ‘ওয়ার্মথ’ শুরু হবে-হবে, এই সময়টা অনিরুদ্ধ সায়ন্তনকে অ্যাভয়েড করছে কেন?

আপনার পক্ষে কি কোনওমতেই একবার আসা সম্ভব হবে না কিংশুক? সায়ন্তনের গলায় এমন একটা আর্তি যে কিংশুক চমকে গেল।

তাও ও একটা শেষ চেষ্টা করে বলল, আমি যদি কাল সকালে যাই হবে না?

সায়ন্তন ধরা গলায় বলল, না কিংশুক, আপনাকে এক্ষুনি আসতে হবে। আপনি ট্যাক্সি করে সোজা চলে আসুন, আমরা ওটাতে করেই বেরোব।

এই যে কথাটাকে স্পিন করে ছেড়ে দেওয়া, টাকা দিলেও ‘টাকা দিচ্ছি’ সেটা সরাসরি না বলা, ভাল লাগল কিংশুকের। ও মায়ের প্রবল আপত্তি অগ্রাহ্য করে দুটো ট্যাবলেট প্যান্টের পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

সায়ন্তন ওর অ্যাপার্টমেন্টের সামনের রাস্তায় পায়চারি করছিল। কিংশুক ট্যাক্সিটা নিয়ে পৌঁছোনোমাত্রই প্রায় দৌড়ে দরজাটা খুলে উঠে ট্যাক্সিচালককে বলল, টালিগঞ্জের দিকে যেতে। মিনিট দুয়েক থমথমে নীরবতার পর কিংশুকও একটা গুগলি দিয়ে বলল, আমরা কি টালিগঞ্জের কারও বাড়িতে যাচ্ছি?

সায়ন্তন নিজের হাত দুটো বার চার-পাঁচেক নিজের মুখে বুলিয়ে বলল, রূপু, আই মিন রূপমতীর কোনও ট্রেস পাচ্ছি না আজ দুপুর থেকে।

কিংশুক ঘাবড়ে গিয়ে বলল, কী সাংঘাতিক! থানায় জানিয়েছেন?

না, থানায় জানালে একটা স্ক্যান্ডাল, বুঝতেই পারছেন, তাই ভাবছিলাম…

এসব ভাবাভাবির সময় নয় এখন। ম্যাডামকে যদি কেউ কিডন্যাপ করে থাকে?

সায়ন্তন দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলল, তা হলে তো থানা-পুলিশ করতেই হবে, কিন্তু আমি ভাবছিলাম আগে ওর বন্ধুবান্ধবদের কাছে একটু খোঁজ নিয়ে নিই। সেজন্যই… বাই দ্য ওয়ে আপনি দিব্যকে চেনেন?

দিব্য মানে, সিরিয়ালের নায়ক?

হ্যাঁ। পরিচয় আছে?

না, পরিচয় সে অর্থে নেই কিন্তু একবার একটা ইন্টারভিউ করেছিলাম ওর। কেন বলুন তো?

না, মানে কীভাবে বলব… কিন্তু আপনাকে আমায় বলতেই হবে, দিব্যকে নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা টেনশন… মানে দিব্য সিডিউস করার চেষ্টা করছিল রূপুকে, সায়ন্তন দুটো লম্বা শ্বাস ছাড়ল কথাটা বলে।

আপনারা কতদিন ধরে লিভ-টুগেদার করছেন? কিংশুক স্বচ্ছন্দ হয়ে গেল।

প্রায় বছরখানেক। কিন্তু তার আগেও আমরা একসঙ্গে বহু জায়গায় গিয়েছি, থেকেছি। ইনফ্যাক্ট বিগত আড়াই-তিন বছর ধরে ওকে কেন্দ্র করেই আমার জীবন ঘুরছে, কিংশুক।

কিন্তু রূপমতীরও কি তাই?

একশোবার তাই। ও খুব ডাউন টু আর্থ সাদামাটা মেয়ে। ওর বাবার চাকরির সূত্রে ও পৃথিবীর কত দেশে ঘুরেছে, দিল্লি, জয়পুরে থেকেছে। তবু কী সুন্দর বাংলা বলে দেখেছেন?

আমি জানতে চাইছিলাম রূপমতী কতটা সিনসিয়ার?

আমার মতোই, মানে, দিব্য ওর মাথায় সিনেমার নায়িকা হওয়ার ভূত চাপানোর আগে পর্যন্ত আমার জগৎটাই ওর জগৎ ছিল।

কিংশুক চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। ‘আমার জগৎটাই ওর জগৎ’ বলে কী বোঝাতে চাইল সায়ন্তন?

কিংশুককে চুপ করে থাকতে দেখে সায়ন্তন বলল, রূপু খুব ভাল সেতার বাজাত, জানেন? আমি যখন দিল্লির কাগজে স্পেশাল করেসপনডেন্ট, তখন একটা ঘরোয়া আসরে ওর বাজানো শুনতে গিয়েই আলাপ।

ওঁর বাবা-মা জানেন আপনাদের সম্পর্কের কথা?

কেন জানবেন না? তবে…

লিভ-টুগেদারের ব্যাপারটা জানানো হয়নি, তাই তো?

ওই আর কী! সেজন্যই রূপু সেদিন ওর নিজের বাড়ি ফিরবে বলছিল।

কবে?

আপনার সঙ্গে যেদিন আমার আলাপ হল। ওর বাবা-মা তখন কলকাতায়, ট্যাক্সিটাকে টালিগঞ্জ থেকে কুঘাটের বড় স্টুডিয়োটার দিকে যেতে বলল সায়ন্তন।

আপনার কি মনে হচ্ছে দিব্য আর রূপমতী এখন ওই স্টুডিয়োয় শুটিং করছেন? কিংশুক জিজ্ঞেস করল।

সে করছে না আমি জানি। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমি আর আপনি দিব্য আউটডোরে গেছে কিনা, তার একটা হদিশ তো পাব।

আপনার কি ধারণা দিব্য রূপমতীকে সঙ্গে নিয়ে গেছে?

আমার মনে হচ্ছে। তা নইলে রূপমতী কোথায়? ওর মা-বাবা কলকাতায় না থাকলে ও ওদের সল্টলেকের বাড়িতে থাকে না। ওদিকে ওর গোলপার্কের ফ্ল্যাটও তালা বন্ধ।

রূপমতীর নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে?

হ্যাঁ, কেন?

ভাই ট্যাক্সিটা ঘুরিয়ে নিন, গোলপার্ক যাব, কিংশুক বলল।

গোলপার্ক আবার যেতে যাব কেন? নিজে গিয়ে দেখে এসেছি ওখানে তালা ঝুলছে, সায়ন্তন বলল।

আপনি মশাই মুখে একটু তালা-কুলুপ এঁটে বসুন তো, কিংশুক রেগে গেল।

গড়পড়তার চেয়ে সামান্য ভাল একটা ছ’তলা বাড়ির সামনে নেমে ওরা যখন গেট পেরোতে যাচ্ছে, একটা মাঝবয়সি লোক সায়ন্তনের রাস্তা আটকে বলল, উও আভিতক লওটে নেহিঁ।

ওকে পাঁচশোটা টাকা দিন সায়ন্তন, কিংশুক বিনা ভূমিকায় বলল।

সায়ন্তনের মানিব্যাগ থেকে বেরোনো কড়কড়ে নোটটার দিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, রুপিয়া কিঁউ?

ফোর সি-র ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট যে-চাবিটা তোমার কাছে থাকে, সেটা দাও, সায়ন্তন বলল।

লোকটা থরথর করে কেঁপে গেল, নেহিঁ নেহিঁ, আমি পারব না।

সায়ন্তন দুটো পাঁচশো টাকার নোট ওর হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, তুমি তো আমাকে চেনো ব্রিজলাল?

ব্রিজলাল পকেটের ভিতর থেকে একটা রিং বের করে দিয়ে দিল।

লিফটের ভিতর কিংশুক পইপই করে সায়ন্তনকে বোঝাল কিছুতেই মাথা গরম না করতে। ফোর সি-র সামনে দাঁড়িয়ে ব্রিজলালের দেওয়া চাবিটা দিয়ে প্রায় নিঃশব্দে তালাটা খুলতে খুলতে কিংশুক বলল, ব্রিজলাল প্রথমবার আপনাকে বাধা দেয়নি, তার কারণ ও জানত দরজায় তালা ঝুলছে দেখে আপনি আপসেই ফিরে যাবেন।

সায়ন্তন বলল, দ্বিতীয়বারও তো ফিরেই যেতাম।

কিংশুক আলতো করে তালাটা খুলে পকেটে রেখে ভীষণ সাবধানে দরজার হাতলটা ঘুরিয়ে বলল, দরজা তালাবন্ধ দেখেও যে-লোক সঙ্গে লোক নিয়ে আবার ফিরে আসে সে যে অত সহজে ফিরে যেতে না-ও পারে, সেটা ব্রিজলাল বোঝে।

ড্রয়িংরুমের নিচ্ছিদ্র অন্ধকার সায়ন্তনের হাত দিয়ে আড়াল করা মোবাইলের আলোয় চলার পথ হয়ে উঠল। একটু বাঁ দিকে বেঁকতেই যে-ঘরটা, তার ভিতর থেকে সেতারের হালকা আওয়াজ আসছিল। সায়ন্তন কান খাড়া করে শুনে ফিসফিসিয়ে বলল, সিডি বাজছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সায়ন্তনকে ঠোঁটে আঙুল দেওয়ার ইশারা করে কিংশুক একটা আলতো ঠেলা দিল। ভেজানো দরজা সামান্য ফাঁক হল। তাতেই বিশ্বরূপ দর্শন ঘটে গেল।

দেড় জন ঠিকঠাক শুতে পারে এরকম একটা খাটে রূপমতী আর দিব্য মুখোমুখি বসে আছে। রূপমতী দুটো গোড়ালির ওপর নিজের নিতম্ব রেখে একদম খাড়া হয়ে বসে আছে। ওর একটা হাত নাভির ওপর, আর একটা হাত মাথার পিছনে। দিব্য রূপমতীর মতো বজ্রাসনে নয়, পদ্মাসনে বসে রয়েছে। ওর একটা হাত নাভিতে কিন্তু আর একটা হাত থুতনির নীচে। দু’জনেরই চোখ অর্ধনিমীলিত এবং দু’জনেই সম্পূর্ণ নগ্ন। ঘরে একটা হালকা নীল আলো জ্বলছে।

তনুশ্রী ওকে ঘুমের জন্য যে যোগাসন করতে বলেছিল সেটা কি এই ধরনের কিছু? ভাবতে ভাবতে কিংশুক প্রায় শব্দ না করে সায়ন্তনকে জিজ্ঞেস করল, একে কী আসন বলে?

পাথরের মতো রুদ্ধবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সায়ন্তন। কিন্তু কিংশুকের প্রশ্নে ও যেন টাইম মেশিনে চড়ে পিছিয়ে গেল লক্ষ বছর। তারপর কোনও আদিম বাইসনের মতো বিকট শব্দ করে ছুটে গেল ঘরের ভিতরে আর পলক পড়ার আগে এলোপাথাড়ি ঘুসি চালাতে শুরু করল রূপমতী আর দিব্যর চোখেমুখে।

ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিংশুক। কিন্তু মার যে খাবে তার ভিতরে তো প্রতিবর্ত ক্রিয়ার কোনও না কোনও প্রকাশ দেখা দেবেই। দিব্য তাই পালটা মার দিতে গেল সায়ন্তনকে কিন্তু সায়ন্তনের সর্বগ্রাসী আক্রোশের সামনে দাঁড়াতে না পেরে বিছানা থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, কোনওরকমে উঠে, ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। রূপমতী, বোধহয় সায়ন্তনের মারের হাত থেকে বাঁচতেই, বিছানার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, কিংশুক আবছা নীল আলোতে নগ্ন ভেনাসের সৌন্দর্য তেমন উপভোগ করতে পারল না কারণ রূপমতীর চুল আলুথালু, চোখে আতঙ্ক আর রক্ত গড়িয়ে নামছে ওর নাক থেকে।

দিব্য হাতছাড়া হওয়ায় সায়ন্তন আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল রূপমতীর ওপর। কিন্তু কিংশুক ঘরে ঢুকে হাতড়ে হাতড়ে বড় আলোটা জ্বালিয়ে দেওয়ায় চমকে স্থির হয়ে গেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় রূপমতীও যেন মুহূর্তে সংবিৎ ফিরে পেয়ে দু’লাফে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল। বিছানা ও মেঝেতে বেশ বড় বড় কয়েক ফোঁটা রক্ত পড়ে রইল যাদের ইতিহাস, ইতিহাস বইতে না লিখলেও চলে।

মিনিট পনেরো পরে (ততক্ষণে কিংশুক সায়ন্তনকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে রেখে দিব্যকে রূপমতীর ফ্ল্যাটের বাইরে বের করে দিতে পেরেছে) রূপমতী নাকে-মুখে একটা ভেজা রুমাল চাপা দিয়ে ওর শোওয়ার ঘরে ফিরে এসে সায়ন্তনকে বলল, আমি বাপিকে ফোনে পাচ্ছি না, বাট আই প্রমিস ইউ কাল বেলা বারোটার মধ্যে তোমাকে লক-আপে ঢুকিয়ে ছাড়ব।

সায়ন্তন মেঝেতে বসে ছিল। অবজ্ঞার স্বরে বলল, তোর যা খুশি তাই কর গিয়ে, ইউ বিচ!

রূপমতী এগিয়ে এসে একটা চড় মারল সায়ন্তনের গালে। তারপর চিৎকার করে বলল, ইয়েস আই অ্যাম আ বিচ। আমার বাবাকে ভাঙিয়ে ভুতোরিয়া আর প্রেমলিঙ্গকে দিয়ে ইনভেস্ট করানোর সময় মনে ছিল না? ফ্ল্যাট কেনার জন্য আমার থেকে আড়াই লাখ টাকা হাতানোর সময় মনে ছিল না?

সায়ন্তন উত্তর না দিয়ে চুপ করে ছিল। কিংশুক কে জানে কেন নাক গলাল, সেই টাকাগুলো উনি আপনাকে ভালবাসার অধিকারে নিয়েছেন। উনি তো তখন জানতেন না আপনি এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করবেন।

রূপমতী ক্ষিপ্ত হয়ে গেল। কীসের বিশ্বাসঘাতকতা? আমি কি ওর কনসেপ্ট অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দিয়েছি? আমি কি ওর রিক্রুট করা লোকেদের ওর নামে খারাপ কিছু বলেছি?

তুই আমাদের সম্পর্কটাকে নর্দমার জলে চুবিয়ে নোংরা করেছিস। ওই বাস্টার্ডটার সঙ্গে শুয়েছিস! সায়ন্তন চেঁচিয়ে উঠল।

রূপমতী সায়ন্তনকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে খুব ঠান্ডা গলায় কিংশুককে বলল, আমার বাঁ দিকের একটা দাঁত নড়ছে, আপনি কাল সকালেই আমাকে নিয়ে একবার ডেন্টিস্টের কাছে যাবেন।

কিংশুক অবাক, আমি?

হ্যাঁ আপনি। কেন, আপনি ওই লুম্পেনটাকে এখানে নিয়ে আসতে পারেন আর আমাকে নিয়ে যেতে পারেন না? রূপমতী বলল।

কিংশুক তোকে নিয়ে কোথাও যাবে না। ও আমার বন্ধু। তোর মতো ছেনালের সঙ্গে ওর কোনও সম্পর্ক নেই, সায়ন্তন আবার চেঁচিয়ে উঠল।

রূপমতী হিসহিসে গলায় বলল, আমার শরীর কি আমি তোকে উইল করে লিখে দিয়েছিলাম যে তার ওপর আমার কোনও অধিকার থাকবে না?

তাই বলে দিব্যর সঙ্গে?

হ্যাঁ, দিব্যর সঙ্গে। যার সঙ্গে ইচ্ছে তার সঙ্গে।

কিংশুক আবারও মুখ খুলল, কিন্তু এটা তো দ্বিচারিতা হয়ে গেল রূপমতী?

রূপমতী চাপা গলায় বলল, কীসের দ্বিচারিতা কিংশুক?

আফটার অল একটা সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস থাকবে না?

বিশ্বস্ততার সঙ্গে যৌন বিশ্বস্ততার কী সম্পর্ক? রূপমতী কিংশুকের চোখে চোখ রাখল।

মানে? কিংশুক হতভম্ব।

রূপমতী ব্যাঙ্গের গলায় বলল, সারাদিন ‘ভৌ’-এর কথা বলছেন, আবার মানে জিজ্ঞেস করছেন? ভাবুন না, সায়ন্তন যেভাবে কুকুরের অ্যাঙ্গল থেকে সব কিছু ভাবে, সেভাবে ভাবুন।

কী ভাবব, আপনি বলে দিন, কিংশুক বিহ্বল।

যে-কুকুর একজনের হাতে ছাড়া খায় না, সে-ও কিন্তু অনেকের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে। কী বলবেন আপনি তাকে? বিশ্বাসঘাতক? সে কিন্তু আপনাকে পাহারা দেয়, আপনার দিকে কেউ কুদৃষ্টি নিয়ে এগোলে তার গলা কামড়ে ধরে, শুধু শারীরিক সম্পর্কটা নিজের মর্জিমতো করে। অন্যায়?

সায়ন্তন ঝিম ধরা গলায় বলল, অন্যায়।

রূপমতী বলল, আমি মানি না অন্যায়। আমার শরীরে তুমি সাড়া জাগাতে পারো না, দিব্য পারে। আমার শরীর তাই দিব্যকে চায়।

কিন্তু আপনি ছল-চাতুরির আশ্রয় নিতে গেলেন কেন? তালা ঝোলাতে গেলেন কেন দরজায়? কিংশুক জানতে চাইল।

তালা না ঝোলালে সায়ন্তন হাজারবার বেল বাজাত। তাই… আপনারা যে এটুকু ডিগনিটিও মানবেন না, ভাবতে পারিনি, রূপমতী বলল।

ডিগনিটি! বাংলা কী শব্দটার? মর্যাদা? সম্রম? কিংশুক রূপমতীর শোওয়ার ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে বসার ঘরের টিভিটা চালাল। সায়ন্তন আর রূপমতীর পারস্পরিক দোষারোপ ভেসে আসছিল ওই ঘর থেকে। কিন্তু এগুলো কী ভেসে উঠছে স্ক্রিনে? মুম্বইয়ের স্টেশন টার্মিনাসে, হাসপাতালে, কফিশপে, ফাইভ স্টার হোটেলে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে সন্ত্রাসবাদীরা। কাটা কলাগাছের মতো অজস্র মানুষ লুটিয়ে পড়ছে রাস্তায়। লুটোচ্ছে কাফেতে, হোটেলের ডাইনিং রুমে, এমনকী হাসপাতালেও।

আমরা যদি জাগ্রত কুকুর হয়ে দিনরাত্রি পাহারা দিতে না পারি আমাদের দেশকে, তা হলে এরকম ঘটনা আবারও ঘটবে, টিভিতে বলছিলেন এক বিখ্যাত নিউজ রিডার।

সেদিকে তাকিয়ে কিংশুক যৌনতা পীড়িত কুকুর কিংবা যৌন উদাসীন কুকুর কাউকেই দেখতে পেল না, শুধু দেখল রক্ত। নিরীহ মানুষের রক্ত। কর্পোরেশনের জলের মতো যা তোড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মুম্বইয়ের শিরা-উপশিরা ছিঁড়ে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *