কফিশপে দু’জন

কফিশপে দু’জন

পাহাড়?

কাঞ্চনজঙ্ঘা।

সমুদ্র?

ভাইজাগ।

সিনেমা?

শোলে।

গান?

হয়তো তোমারই জন্য, হয়েছি প্রেমে যে বন্য…

জঙ্গল?

কলকাতা।

এটা তুই কী বলছিস? অনিরুদ্ধ চটে গেল।

ঠিকই বলছি। মৃদুলদা ওরকম মোবাইল কানে নিয়ে কথা বলতে বলতে প্ল্যাটফর্ম থেকে লাইনে গেল, হাঁটতে থাকল, হাঁটতেই থাকল যতক্ষণ পর্যন্ত একটা ট্রেন এসে পিষে দিল ওকে অথচ কেউ একটু সতর্ক করল না। পিছন থেকে একটা ডাক দিল না কেউ! একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে হাঁপাচ্ছিল কিংশুক।

কে ডাকবে? কার দায় পড়েছে? তোর মৃদুলদা যদি এতটা ক্যালাস হয়, কথা বলতে বলতে এতই মত্ত হয়ে যায় যে, স্থান-কাল-পাত্রর খেয়াল রাখতে পারে না, তা হলে, আমি সরি…

থাক, তোমাকে আর কিছু বলতে হবে না। একটা লোক মারা গেছে, তবু তার প্রতি যদি সামান্য সমবেদনাও দেখাতে না পারো, তা হলে আর কী বলব? কিংশুক মুখ দিয়ে একটা চুকচুক শব্দ করল।

তুই ভুল করছিস। এটা সমবেদনার ব্যাপার নয়। যে-কোনও লোক মরে যাওয়াই দুঃখের। মৃদুলের মৃত্যু আরও। কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে দ্যাখ, বেঁচে থাকার প্রাথমিক শর্তই তো সতর্কতা। একটা লোক যদি এতটা অসচেতন হয় তা হলে কে বাঁচাবে তাকে? তাকে পাহারা দেওয়ার জন্য দশটা পোষা কুকুর তো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে না, তাই না?

ও বাবা! তার মানে তুমি বলতে চাইছ পোষা কুকুর না থাকলে মানুষকে বাঁচানোর কেউ নেই?

ঠিক তা বলতে চাইনি। তবে ভেবে দেখিস কথাটা, মানুষ কিন্তু নিজের চারপাশে কুকুর চায়। তার কতটা পশুপ্রেমের জন্য আর কতটা নিজের নিরাপত্তার জন্য সেটা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। অনিরুদ্ধ স্যান্ডউইচে একটা কামড় দিয়ে বড় করে চুমুক দিল কফিতে। তারপর দাঁত দিয়ে ওপরের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে বলল, অবশ্য কুকুর যে শুধু কুকুরের চেহারাতেই আসবে, তা নয়। ব্যাপারটা আরও অনেক জটিল, রহস্যময়, ইন্টারেস্টিং।

কিংশুক চুপ করে গেল। এই জটিল রহস্যময় ব্যাপারটা ওর একদমই ইন্টারেস্টিং লাগছিল না। বরং ঠিকঠাক বলতে গেলে, জঘন্য লাগছিল। আজ তিন দিন তিন রাত ও ঘুমোতে পারেনি একছিটে। কিংবা হয়তো ঘুমিয়েছে, কিন্তু দশ মিনিট, বিশ মিনিট পরপর ভেঙে গেছে সেই ঘুম আর মৃদুলদার ভারী মুখটা ওর বন্ধ চোখের সামনে দুলে দুলে বলেছে, অনুষ্ঠান সম্প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় দুঃখিত। কেন দুঃখিত মৃদুলদা?

পান দেখেছিস কখনও? মৃদুলদার গলা ভারী।

হ্যাঁ দেখেছি, খেয়েছি, কিন্তু তাও তুমি বলো, কিংশুক উত্তেজিত।

বলছি যে, পানের কোনও ফুল নেই, ফল নেই, শুধু লতা। এই ব্যাপারটা অবাক করে দেয় না?

এভাবে তো ভেবে দেখিনি কখনও। শুধু সবুজ একটা লতা, আশ্চর্য!

আচ্ছা যখন আমরা বলি পান পাতার মতো মুখ, কী বোঝাই তখন?

খুব সুন্দর, কিংশুক আত্মবিশ্বাসী।

ভেবে দ্যাখ, মানুষ যদি পান হয়ে যায়, যদি শুধু লতাটুকু বেঁচে থাকে, না ফুল, না ফল….

কী বলতে চাইছ মৃদুলদা?

বলতে চাইছি, যদি প্রেম না থাকে, ঈর্ষা না থাকে, রাগ-অভিমান না থাকে, লজ্জা না থাকে, বিশ্বাস না থাকে, ভরসা না থাকে, শুধু থেকে যায় সৌন্দর্য?

সৌন্দর্য?

হ্যাঁ, সৌন্দর্য। কলাপাতার ওপর শুইয়ে রাখা একদলা মাখনের মতো যদি কেউ তাকে ভাসিয়ে দেয় জলের এপার থেকে আর সে ভাসতে ভাসতে চলে আসে জলের ওপারে!

জলের ভিতরকার মাছ, কচুরিপানা?

তারা কেউ তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারে না, কারণ কোনও এক ডুবসাঁতারু তাকে পাহারা দিতে দিতে নিয়ে আসে, সভ্যতা থেকে সভ্যতায়, গল্প থেকে গল্পে, ট্রয় থেকে মুম্বইতে।

সে কি হেলেন, মৃদুলদা?

দমফাটা হাসিতে ফেটে পড়ে মৃদুলদা। যেরকম ভাবে কখনও হাসত না, সেরকম একটা হাসিতে। হাসতে হাসতেই বলে, না, সে হেলেন নয়। সে সৌন্দর্য। সে পান। যাকে মুখে দেওয়ার পর আর কোনও খাবার মুখে দেওয়া যায় না। সে মাখন। সে কলাপাতায় ভাসবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তাকে এর-ওর মুখে প্রতিষ্ঠা দেব, এক সন্ধ্যার জন্য প্রতিষ্ঠা দেব। মৃদুলদা আবার হাসতে থাকে।

সেই হাসির শব্দের ভিতরেই ওর মুখটা দূরে সরে যেতে থাকে, আরও দূরে সরে যেতে থাকে, অনুষ্ঠান সম্প্রচার থেকে দূরে সরে যেতে থাকে বিঘ্ন। ঘুম আসে। অথবা ঘুমের মতো কিছু। কিংশুক পান ভেবে চিবিয়ে ফেলতে চায় তাকে। পারে না। পানপাতা সরে যায়। মাখন সরে যায়। জেগে ওঠে মৃদুলদার ছিন্নভিন্ন দেহটা। এদিক-ওদিক ছেতরে থাকা রক্ত। যা তুলি থেকে ছিটকে আসা রঙের থেকে অনেকটা আলাদা। নাক বাড়িয়ে সেই রক্ত শুঁকে বেড়ানো কুকুরগুলো সম্ভবত পোষা নয়। কিংশুকের ইচ্ছে করে ওদের ডাকতে। কিন্তু তার আগেই ওর চটকা ভেঙে গেছে। আর অনিরুদ্ধ ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

অনিরুদ্ধ বলল, আমি বুঝতে পারছি তোর ওপর দিয়ে কী যাচ্ছে। আমার কথা শোন, একটু রিল্যাক্স কর।

রিল্যাক্স করব বলেই তো এখানে এলাম, কিংশুক নিচু গলায় বলল।

কফি খেয়ে রিল্যাক্স হয় না বন্ধু। উলটে কফিতে স্ট্রেস আরও বেড়ে যায়। তুই আমার কথা মান। দুটো পাঁইট নিয়ে আসি, দেখবি কেমন ফুরফুরে ভাব খেলা করবে মাথায়।

আমার এখন একদম ইচ্ছে করছে না গো।

ইচ্ছে তোর খুবই করছে। কিন্তু তোর ইগো তোকে বাধা দিচ্ছে।

কীসের ইগো? আমি তো খাই-ই না প্রায়, খেলেও অকেশনালি।

পথে এসো গুরু! অনিরুদ্ধ হাত চেপে ধরল কিংশুকের, আজ কি সেই অকেশন নয়? আজ তোর মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে, ভিতরে দপদপ করছে মৃদুলের মুখটা, সাতের দশকে নকশালরা পিছন ফিরে দৌড়োতে শুরু করলেই পুলিশ যেমন গুলি চালিয়ে দিত, স্মৃতির সঙ্গে তোর একটা সেরকম যুদ্ধ চলছে, কি ঠিক বলছি তো?

বুঝলাম না।

মানে, স্মৃতির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে স্মৃতি তোর পিঠে ছুরি বসিয়ে দিচ্ছে কিংবা গুলি চালিয়ে দিচ্ছে মেরুদণ্ডে। আর ঠিক ওরকমটাই করবে যদি তুই ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর হাত থেকে ছুরি কিংবা বন্দুক ছিনিয়ে নিস। স্রেফ দুশো টাকা খরচ আছে।

বন্দুক ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য!

না, হুইস্কি খাওয়ার জন্য।

আমার হুইস্কি সহ্য হয় না।

বেশ তোর জন্য ভদকা।

বারে যেতে হবে? আমি পারব না।

কুছ পরোয়া নেহি। তুই এখানেই এক প্লেট ফিশফিঙ্গার অর্ডার দে। আমি মাল নিয়ে আসছি।

খেপেছ নাকি? এখানে খেতে দেবে কেন? এটা তো কফিশপ!

দুপুরে কফিশপই বার। মানে ইচ্ছে করলে ম্যানেজ করে নেওয়া যায়। তুই ছাড় না আমার উপর। দুটো পাত্তি বের করে এলিয়ে বস, আমি দশ মিনিটের ভিতর আসছি।

একজন ওয়েটারকে সাইডে ডেকে নিয়ে কিছুক্ষণ গুজুর-গুজুর করল অনিরুদ্ধ। তারপর বেরিয়ে গেল এক ঝটকায়। কড়কড়ে দুশো টাকা চলে যাওয়ায় মানিব্যাগটা হালকা লাগছে। তাও আর এক প্লেট ফিশফিঙ্গারের অর্ডার দিল কিংশুক। তারপর চোখ বন্ধ করে ভাবতে শুরু করল, দু’পেগ ভদকা পেটে পড়ার পর ওর ভিতরে ঠিক কীরকম ভুসভুসুনি শুরু হবে, চার পেগের মাথায় ও কোন কথাগুলো বমি করতে শুরু করবে অনিরুদ্ধর কাছে।

সুকু ডার্লিং কি এখনও ঘুমোচ্ছে? মোবাইল খোলার পরপরই কটকট করে মেসেজটা আসত।

কিংশুক তাড়াহুড়োয় একচোখে জল দিয়ে আর একটায় না দিয়েই নম্বর ডায়াল করা শুরু করত, হ্যালো?

কী ব্যাপার ডার্লিং, আজ এত বেলা অবধি ঘুমোচ্ছিলে? কাল শেষ রাতে স্বপ্নে স্পেশ্যাল কেউ এসেছিল? মৃত্তিকার গলায় একটা দুষ্টুমি ভেজা আনন্দ খেলা করত।

স্পেশ্যালের চাইতেও বেশি স্পেশ্যাল যদি কিছু থেকে থাকে, তা হলে তা আমার জীবনে চলে এসেছে। আমি এর বাইরে কিছু দেখতে চাই না, শুনতে চাই না, গলা বেয়ে ওপরে ওঠা হাইটাকে গলাতেই খুন করে ফেলত কিংশুক।

খিলখিল করে হেসে উঠত মৃত্তিকা। মোবাইলের ভিতর দিয়ে সেই শব্দটা আসত, যেভাবে ফিল্টারের ভিতর দিয়ে জল আসে। কিংশুকের মনে হত ওর প্রতিদিনকার রুটিনের ভিতর থেকে লোহা, আর্সেনিক সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কেউ।

আজ তা হলে কখন দেখা হচ্ছে আমাদের? মৃত্তিকার গলায় একটা আদেশের আভাস।

কিংশুক সেই আভাসটুকুকে শিরোধার্য করে হুকুম তামিল করার গলায় বলল, আপনি বলুন জাহানারা।

দুপুর তিনটে। মৃত্তিকা বলল।

অত তাড়াতাড়ি বেরোতে পারব না অফিস থেকে। সাড়ে চারটে করি? কিংশুকের গলায় অনুনয়।

না, চারটে। আর আমার চারটে মানে কিন্তু চারটেই। মৃত্তিকার গলা কঠিন।

তথাস্তু। তা হলে ভিক্টোরিয়া?

না, ভিক্টোরিয়া না। ওই একশো জোড়া লোকজনের মধ্যে তোমার ভাল লাগে বসতে?

না, ভাল তো লাগে না, কিন্তু…

কিন্তু কীসের? একটা ফ্ল্যাট নেই কোথাও যেখানে আমরা দু’জন, শুধু দু’জনই থাকব?

আছে তো! মুশকিলটা হল তার চাবিটা এই মুহূর্তে আমার হাতে নেই।

ইয়ারকি কোরো না। একেই কাল গোটা রাত আমি তোমার জন্য একটুও ঘুমোতে পারিনি…

আমার জন্য? কেন? আমি কী করলাম?

তুমি মোবাইলটা বন্ধ করে রেখেছিলে সুকু ডার্লিং! তুমি জানো না রাতে তোমার গলার আওয়াজটা শুনতে না পেলে আমার কীরকম আনচান করে?

জানলেও বুঝতে পারত না কিংশুক। এই তো সেদিন মৃত্তিকার সঙ্গে আলাপ। ওর বন্ধু প্রতাপদের বাগানবাড়িতে। বছরে একদিন ওদের বন্ধুদের পিকনিক হয় সেখানে। কিন্তু বন্ধুবান্ধবদের বাইরেও অনেকে থাকে, মৃত্তিকা যেমন ছিল, প্রতাপের কোনও এক বন্ধুর বোনের বন্ধু হিসেবে। সেদিন ও একটা গোলাপি রঙের সালোয়ার-কামিজ পরেছিল। নিজে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি ভলিবল খেলবেন আমাদের সঙ্গে?

অবাক হয়ে গিয়েছিল কিংশুক। মেয়েরা ব্যাডমিন্টন খেলে ও জানত। কিন্তু তাই বলে ভলিবল? ওকে চুপ করে থাকতে দেখে মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করেছিল, ভলিবল খেলতে জানেন না?

আঁতে লেগেছিল কিংশুকের। বলেছিল, জানব না কেন?

তা হলে দাঁড়িয়ে না থেকে আসুন, মৃত্তিকা খুব সহজ গলায় বলেছিল।

সেই শুরু। ভলিবল ম্যাচ চলাকালীন মৃত্তিকা যখন লাফিয়ে উঠে স্ম্যাশ করছিল মুগ্ধ হয়ে দেখছিল কিংশুক। লম্বা না হলেও গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের তুলনায় ভালই উচ্চতা মৃত্তিকার, পাঁচ-চার তো হবেই। একটু বেশিও হতে পারে। তবে যা ওর সত্যিই বেশি, তা হল স্পিরিট। নইলে এত উৎসাহের সঙ্গে ক’টা বাঙালি মেয়েই বা ভলিবল খেলে?

মৃত্তিকার উৎসাহ যে সব ব্যাপারেই একটু-আধটু আছে, দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর টের পেল কিংশুক। অবলীলায় ওদের বন্ধুদের টপকে ওর কাছে এসে বসে পড়ল আর চোখে চোখ রেখে বলল, আপনি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সম্বন্ধে কী লিখেছেন?

কিংশুক কিছুটা অবাক হয়ে গিয়ে বলল, কিন্তু আমি তো সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে কোনও লেখাই লিখিনি।

মৃত্তিকা মুখ টিপে হাসল একটু, জানি তো, আপনি লিখেছেন লতা মঙ্গেশকরকে নিয়ে।

এগজ্যাক্টলি, হাঁপ ছাড়ল কিংশুক।

ওখানেই তো আপত্তি। আপনি কেন লিখবেন, ‘লতা মঙ্গেশকর একাই আমাদের তিরিশ বছরের সব ক’টা সন্ধ্যা ভরিয়ে তুলেছেন, ‘কোকিল’ শব্দটাকে ছাপিয়ে হয়ে উঠেছেন গানের সবচেয়ে বড় পাখি।’ মৃত্তিকা একদম হুবহু মুখস্থ বলল।

আপনি এত যত্ন নিয়ে পড়েছেন লেখাটা! কিংশুক আবেগে গলে গেল প্রায়।

মৃত্তিকা স্ম্যাশ করল সঙ্গে সঙ্গে, আপনাকে খুশি করব বলে পড়িনি। আপনি কীভাবে ভুলে গেলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কথা? আদ্যিকাল থেকে গ্রামোফোন কোম্পানির ওই কুকুরটা যেমন তার প্রভুর গলার আওয়াজ শোনার জন্য বসে থাকে, আমরাও সেরকম কত যুগ ধরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গলাটা শুনব বলে রেডিয়োর সামনে বসে থেকেছি, টেপরেকর্ডার নিয়ে শুয়ে থেকেছি বিছানায়, ওয়াকম্যানের তার দুটো কানে গুঁজে বেরিয়ে গেছি বাড়ি থেকে। আর আপনি লিখে দিলেন যে, লতা একা! আজ বাড়ি ফিরে কী লিখবেন, দুপুরে আপনি একা খেলছিলেন ভলিবল? মৃত্তিকা উত্তেজনার চোটে কথা বলতে বলতে কিংশুকের ডান হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিল।

কিংশুকের মনে হল ওর হাতটা আনন্দে অবশ হয়ে গেল। আশেপাশে বসে থাকা সবাইকে অগ্রাহ্য করে ও তাকাল মৃত্তিকার দিকে, পূর্ণদৃষ্টিতে। এক মাথা হালকা কোঁকড়ানো চুল কাঁধ ছাপিয়ে আর-একটু নেমেছে, টকটকে ফরসা গায়ের রং, ধারালো দুটো চোখ, পুরু দুটো ঠোঁট আর যেন বা কনট্রাস্টের জন্যই একটু চাপা নাক। কী বলা যায় একে? সুন্দরী? সেক্সি? সপ্রতিভ? ধাঁধায় পড়ে গেল কিংশুক। আর ওকে চুপ করে থাকতে দেখে মৃত্তিকা আবারও একবার ওর ডান হাতটা ধরে নাড়িয়ে দিয়ে বলল, কী হল বললেন না?

কিংশুকের মনে হল যেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানের ভিতর থেকে সেই ইন্দ্রধনু বেরিয়ে গিয়ে আকাশে চক্কর কাটতে কাটতে একটা হাতে এসে পড়েছে। সেই হাতের আঙুলগুলোর মধ্যে দিয়ে সঞ্চারিত হয়েছে ওর হাতে, চারিয়ে গেছে শিরা-উপশিরায়। ও আস্তে আস্তে ওর বাঁ হাতটা বাড়িয়ে মৃত্তিকার ডান হাতটা ধরে বলল, ভলিবল তো একা-একা খেলা যায় না!

প্রেমও একা-একা করা যায় না। তাই ওরা দু’জন মিলেই একদিন আরম্ভ করে দিল। তবে সেই আরম্ভের উদ্যোগ মৃত্তিকার মধ্যে অনেক বেশি ছিল একথা মানতেই হবে। কিংশুক অবাক হয়ে ভাবত মাঝে মাঝে যে, ওর মধ্যে কী এমন দেখল মৃত্তিকা, যাতে এতটা ভেসে যাওয়ার শক্তি পেল? মৃত্তিকাকে জিজ্ঞেস করলে মুখঝামটা খেতে হত।

কেন তোমাকে ভাল লেগেছে তাই নিয়ে থিসিস লিখে জমা দিতে হবে তোমার কাছে? তোমাদের ট্যাবলয়েডে ছাপবে? মৃত্তিকা বলত ওকে।

কিংশুক কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে ওর মাথাটা রাখত মৃত্তিকার কাঁধে। পাহাড়ি রাস্তার মতো উচ্চাবচ ওর চুলের ঢাল, যাকে মৃত্তিকা বলত, ‘স্টেপস’, কিংশুককে কানায় কানায় পূর্ণ করে দিত। মনে হত, কোনও কাঁচি কখনও এই মুগ্ধতার নির্মাতা হতে পারে না। এই সৌন্দর্য সনাতন। আর সনাতন বলেই সমুজ্জ্বল।

তুমি ক’বছর হল কলকাতায় এসেছ? জিজ্ঞেস করত কিংশুক।

আসি-যাই তো অনেকদিন। পাকাপাকি আছি আজ বছরচারেক, মৃত্তিকা বলত। তারপর একটু থেমে যোগ করত, চার বছর আগে আমার স্কিন দেখলে না তোমার চোখ কপালে উঠে যেত। একদম মাখনের মতো ছিল!

কিংশুক তখনই একেবারে নিভে যেত। ওর নিজের কেরিয়ার ঠিক রাস্তার উপর রাখা পিচের মতো, কালো, তপ্ত। দাহ্য ক্ষমতা ছাড়া অন্য কোনও ক্ষমতাই তার নেই। এর আগে ও একটা রঙের কোম্পানিতে চাকরি করেছিল কিছুদিন। কিন্তু দেড়বছর অসমের নানা জায়গায় ঘুরিয়ে ওরা যখন ওকে নাগাল্যান্ডে পোস্টিং দিল, তখন ওর ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। আসলে তার কয়েকদিন আগেই ও একটা ভয়ংকর বিস্ফোরণ থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল। ও যে-স্টেশনে ট্রেন থেকে নামে, তার ঠিক দুটো স্টেশন পরে বোমাগুলো ফাটে। তিরিশ জনের বেশি মারা যায়, যাদের ভিতর কিংশুকও একজন হতেই পারত। কিন্তু মৃত্তিকা ওর কপালে নাচছে বলেই হয়তো বেঁচে গিয়েছিল। সেই থেকে ভাগ্যের ওপর একটা বিশ্বাস ওর জন্মে গেছে। নইলে ও এত সহজে এই ট্যাবলয়েডের জগতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারত না। এখানে দিন-রাত শুধু কেচ্ছা, কেলেঙ্কারি আর চাটনির খোঁজ। মাঝে মাঝে ধ্রুপদি দু’-একটা বিষয় থাকে, তবে সেগুলোকেও অনেকটা তেঁতুল আর লঙ্কা দিয়ে কষিয়ে না দিলে সম্পাদকমণ্ডলীর ঠিক পছন্দ হয় না। যেমন কিছুদিন আগে ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের উপর একটা লেখা লিখেছিল। দ্বিজেন্দ্রলালের গান এবং সংসারজীবন বিষয়ে, কবি তাঁর স্ত্রীকে কত ভালবাসতেন, অল্প বয়সে স্ত্রী মারা যাবার পর থেকে কীরকম সংসারে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করতেন, চুলে তেল দিতেন না, গায়ে সুগন্ধ দিতেন না… এই সমস্ত নিয়ে একটা সুন্দর লেখা। কিন্তু রিজেক্টেড হয়ে গেল। শেষে লেখাটার অ্যাঙ্গল বদলে আবার লিখতে হল। এবার জোর দেওয়া হল দ্বিজেন্দ্রলাল বিপত্নীক হওয়ার পরে যে-বিধবা ভদ্রমহিলা ওঁর প্রেমে পাগল হয়ে ওঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, তাঁকে কবি কেন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, ফিরিয়ে দিলেও তার সঙ্গে কোনও সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটেছিল কিনা, যদি ঘটে থাকে, তা হলে সেই সম্পর্ক দানা বাঁধল না কেন, ইত্যাদির উপর। লেখাটা আবার লিখতে কান্না পাচ্ছিল। কিন্তু উপায় কী? চাকরি বলে কথা!

এবারের কভার স্টোরিটা যেমন কিংশুককে লিখতে হবে বিখ্যাত এক অভিনেতার সঙ্গে এক পরিচালকের সমকামী সম্পর্ক নিয়ে। দু’জন কি মানসিকভাবে যতটা কাছাকাছি শারীরিকভাবেও ততটাই? লেখার মূল ধরতাই এটাই। মৃত্তিকা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বলল, লেখাটাকে একটা তৃতীয় চক্ষু দেওয়া যায় না? থার্ড ডাইমেনশন? এই ধরো সমকামী পরিচালক, সমকামী নায়ক আর তার সঙ্গে সমকামী সাংবাদিক। জমে যাবে না?

তার মানে? আমি সমকামী নাকি?

তা ছাড়া কী? হাত-পা গুটিয়ে পদ্মাসনে বসে আছ আর আমি বলে সেজেগুজে এলাম…

এরপর মৃত্তিকাকে হাত বাড়িয়ে ধরতে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। মৃত্তিকা গাঁইগুই করে প্রথমে, কিন্তু পুরোটাই দপ করে জ্বলে ওঠার আগে তুবড়ির প্রাথমিক প্রতিরোধ। তারপর আগুন ছড়িয়ে পড়ে দশ দিগন্তে। ফুলকিগুলোকে দূর থেকেও চেনা যায়। কিন্তু কিছুতেই কিংশুক চিনে উঠতে পারে না মৃত্তিকাকে। কেন ও ওদের প্রেমটাকে মোড়কের ভিতর রেখে দিতে চায়? যা তিনতলার ছাদের উপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলার কথা, তাকে কেন চালান করে দিতে চায় কার্পেটের নীচে? কিংশুক জানে না, প্রশ্ন করে করে যে-উত্তরগুলো পায়, তার ভিতর যুক্তি থাকলেও মেনে নিতে মন চায় না। মৃত্তিকা বলে যে ওর বাবা পুলিশ, চতুর্দিকে তার নেটওয়ার্ক ছড়ানো। কিন্তু কিংশুক কি ক্রিমিনাল নাকি? মৃত্তিকা মানে না। বলে, তুমি এমন কিছু এস্ট্যাব্লিশড পাত্রও নও যে, তোমার জন্য মেয়ের বাবারা লাফিয়ে পড়বে। একটু দাঁড়াও, এমন একটা জায়গায় যাও যেখান থেকে চট করে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই, আমি তো পালিয়ে যাচ্ছি না।

কিন্তু যদি যেতে না পারি? স্ট্যাটিসটিক্স বলে, ভারতে যে-কোনও ভাল চাকরির জন্য একশোজন যদি ইন্টারভিউ দেয় তবে পায় চারজন। আমি যদি হেরে যাওয়া ছিয়ানব্বইজনের একজন হয়ে বেঁচে থাকি?

তা হলে আর বেঁচে থেকো না, মরো, মৃত্তিকা এমন একটা নিষ্ঠুরতার সঙ্গে কথাটা বলে যে কিংশুকের তলপেটে গিয়ে লাগে। আর ঠিক তখনই খুনসুটি শুরু করে মৃত্তিকা। ওর ঠোঁট থেকে রস শুষে নিতে-নিতে কিংশুকের মনে হয় কোত্থেকে আসে এত সম্পর্ক? এত প্রেম? এত ভাঙাগড়া?

তোমার মৃদুলদার কাছে একদিন সাজতে কীরকম লাগে? মৃত্তিকা খুব আদুরে গলায় জানতে চায়।

তোমাকে সাজাতে মৃদুলদা পয়সা নেবে না।

কেন?

আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো ভালবাসে!

কীভাবে চেনা তোমাদের?

ওরা ভাড়া থাকত আমাদের বাড়িতে। বড় ফ্যামিলি ছিল ওদের, কিন্তু মৃদুলদা তার ভিতরেও একটু একাচোরা, একটু পালিয়ে বেড়ানো টাইপ ছিল। আমাদের দোতলার পিছন দিকে একটা বারান্দা আছে। ওটাই ছিল মৃদুলদার প্রথম স্টুডিয়ো। সেখানেই আমি দেখি, আজও আশ্চর্য লাগে ভাবলে, পোস্টকার্ড পোড়ানো ছাই আর সিঁদুর মিশিয়ে কপালে পরার টিপ বানাচ্ছে মৃদুলদা।

পোস্টকার্ড মানে চিঠি?

হ্যাঁ, পনেরো কুড়ি বছর আগেও তার চল ছিল দুনিয়ায়। বিজয়ার পর কিংবা নববর্ষে‘আমার প্রণাম জানিবেন’ অথবা ‘বুকভরা স্নেহাশীর্বাদ গ্রহণ করিয়ো’ জানিয়ে যে-চিঠিগুলো আসত, পুরনো হয়ে গেলে সেগুলো চুপিসাড়ে সরিয়ে ফেলত মৃদুলদা। আর দুপুর-বিকেলের কোনও একটা সময়ে শুরু হত ওর এক্সপেরিমেন্ট। সেইসব মালমশলা আজও ডাঁই করা আছে ওখানে। সিঁদুর আর ছাইয়ের অনুপাত বাড়িয়ে কমিয়ে মৃদুলদা টিপটার রং বদলাত। মেরুন থেকে লাল, লাল থেকে খয়েরি, খয়েরি থেকে আবার মেরুন। সাজেশনও চাইত। ওর মধ্যে কোনও রিজিডিটি ছিল না।

তোমার মৃদুলদা একটা নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে বললে না?

হ্যাঁ, কিনেছে তো। কিন্তু হঠাৎ?

আমি যদি সেই ফ্ল্যাটে একদিন যেতে চাই, মানে তোমাকে নিয়েই যেতে চাই, তুমি কি আমাকে রিজিড, আই মিন, অনমনীয় বলবে? মৃত্তিকা চোখের দৃষ্টিতে প্রশ্ন বাদ দিয়ে আর সবকিছু ফুটিয়ে তোলে।

আড়ষ্টতা গ্রাস করে কিংশুককে, যেন মেপে নিতে চায় ওর বলা কথাগুলোর ওজন। মৃত্তিকা উঠে দাঁড়ায়। কিংশুকও ওর দেখাদেখি উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে, পারে না। সন্ধে-সন্ধে ঘরে ফেরা পাখিদের ডাকের সঙ্গে গাড়ির হর্নের আওয়াজ মিলেমিশে যায়। মৃত্তিকার ফিরে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়কে অবজ্ঞা করে, সময় বইতে থাকে।

তুই কোনও পাহাড়ি হোটেলের জানলা দিয়ে ভোরবেলা বাইরে তাকিয়ে দেখেছিস কখনও? অনিরুদ্ধ টেবিলের তলায় দু’হাত নিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় পেগটা বানাতে বানাতে বলল।

কিংশুক ওর প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, এখানে মাল খাওয়ার পারমিশন কীভাবে পেলে বলো তো?

এই ওয়েটারগুলো ক’টাকা করে পায় তুই জানিস?

না, জানি না। তবুও জিজ্ঞেস করছি, একদম ফাঁকা আছে বলে ওরা যে রিস্কটা নিল, দুম করে লোকজন চলে এলে কী হবে?

সেটা ওরা ভাববে, আমরা নয়। সেজন্যই ওরা একশো টাকা পাবে।

একশো টাকা পাবে মানে? কে দেবে?

তুই দিবি, আবার কে দেবে?

কিংশুক এক ধাক্কায় চেয়ারটা পিছনে ঠেলে উঠে দাঁড়াল, সব বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে অনিরুদ্ধদা। অন্তত থাকা উচিত। কফি হল, স্যান্ডউইচ হল, ফিশফিঙ্গার হল, মদ হল, এখন আবার মদ খাওয়ার প্রণামি? আমি পারব না। তুমি বসে বসে খাও, আমি যাচ্ছি।

অনিরুদ্ধ গেলাস দুটো মাটিতে রেখে একদম নিচু হয়ে জড়িয়ে ধরল কিংশুকের পা। জড়িয়ে ধরেই বলল, লক্ষ্মী ভাইটি, সিন ক্রিয়েট করিস না এখানে। তুই আর পাঁচটা মিনিট বোস, তার মধ্যে যদি আমি তোকে পুরো প্ল্যানটা বোঝাতে না পারি, তোর যা ইচ্ছে তাই করিস।

পা ধরে নাটক কোরো না। ওতে বিরক্তি বাড়ছে বই কমছে না। কিংশুক বসতে বসতে বলল।

অনিরুদ্ধ টেবিলের তলা থেকে গ্লাস দুটো সমেত উঠে এল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, তুই সায়ন্তনকে চিনিস তো?

কে সায়ন্তন? কিংশুক জিজ্ঞেস করল।

আরে, ‘সুনামি’ সায়ন্তন, অনিরুদ্ধ বলল।

ও, আচ্ছা। কী হয়েছে তার?

খারাপ কিছু হয়নি। ও তো চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। তা এখন ও নিজেই একটা প্রোজেক্টে নামছে। অবশ্য আরও অনেক বড় বড় মাথা ওর সঙ্গে আছে। কিন্তু মূল খুঁটি হচ্ছে ও। ওকে কেন্দ্র করেই পুরো ব্যাপারটা পাক খাবে। তুই তো সায়ন্তনের সুনামির ওপর ওরকম ধামাকেদার রিপোর্ট করে লাইমলাইটে চলে আসাটা জানিস। বাংলা আঞ্চলিক ভাষা হলে কী হবে, ওই সময়কার ওর রিপোর্টিং ভারতের একটা বড় অংশের মিডিয়ার চোখে পড়েছিল।

আমি জানি। আমিও ফলো করতাম ওর লেখালেখি তখন। কিন্তু বাংলাকে আঞ্চলিক ভাষা বোলো না, বড় গায়ে লাগে।

অত সেন্টিমেন্টাল হলে হবে না। প্র্যাক্টিক্যাল হ। সায়ন্তনকে দ্যাখ, ওই অত মৃত্যু, অত ধ্বংস, তার ভিতরেও কিন্তু মাথা ঠান্ডা রেখে রিপোর্টিংটা করে গেছে। সেন্টিমেন্টের মোচড় দিয়েছে, কিন্তু একটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে পুরো খবরটা পাবলিকের কাছে পৌঁছেও দিয়েছে, অনিরুদ্ধ মাস্টারের ঢঙে বলল।

যে-ধ্বংসের ওপর পৃথিবীর কারও কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না, সেই ধ্বংসের খবরে রিপোর্টার তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে বলছ? হাসল কিংশুক।

রাখতে পারলেই সাকসেস। সুনামির কেসটাই দ্যাখ।

কিন্তু তোমার সুনামি তো সাফল্যের ওপর নিজের কন্ট্রোল রাখতে পারল না। ধূমকেতুর মতো উঠেছিল, কিন্তু আকাশের কোথায় যে মিলিয়ে গেল…

ওইটেই তোর ভুল। প্রতিভা কখনও হারিয়ে যায় না। একটু গ্যাপ নিয়ে আবার ফিরে আসে। তুই কি ভাবতিস ও চাকরি-বাকরি ছেড়ে সন্ন্যাস নিয়ে চলে গিয়েছিল? মোটেই না। ও বুঝতে চেষ্টা করছিল মার্কেটে ওর ভ্যালু কতটা।

ক্যাশে না ক্রেডিটে?

দুটোতেই। ক্যাশ না ফেললে দশজন কাজ করবে না। আর যে ক্যাশ ফেলবে, তাকে কোথাও থেকে বিরাট অ্যামাউন্টের ক্রেডিট ম্যানেজ করতেই হবে।

কিন্তু এই ভ্যানতাড়া তুমি আমায় শোনাচ্ছ কেন? কিংশুকের মাথা গরম হয়ে গেল ফিশফিঙ্গারের প্লেটটা খালি দেখে।

তোর একটা দোষ কী হয়েছে বল তো কিংশুক, তুই বড় অধৈর্য হয়ে গিয়েছিস এখন।

বয়স বাড়ছে, অনিরুদ্ধদা।

বয়স তোর চেয়ে আমার বেশি। কিন্তু স্বপ্ন দেখার কোনও বয়স হয় না।

কী স্বপ্ন দেখাতে চাও আমাকে?

তার আগে বল, ওই ট্যাবলয়েডে তুই সুখে আছিস?

এই মাইনেতে, এই ওয়ার্কলোড সামলে কারও পক্ষে সম্ভব সুখে থাকা? তুমি নিজে যখন ওখানে কাজ করতে, সুখী ছিলে?

তা হলে আমরা দু’জনেই একটা ব্রেক চাইছি, তাই না?

আমি অন্তত চাইছি। তুমি কী চাইছ, জানি না। তোমার তো চাকরিই নেই, মুখ ফসকে শেষ কথাগুলো বলে ফেলে সামান্য অনুতপ্ত হল কিংশুক।

অনিরুদ্ধ পাত্তা না দিয়ে আবার একগ্লাস কিংশুকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এই শেষ। তারপর নিজে একটা বড় চুমুক দিয়ে বলল, আমার আবার চাকরি হচ্ছে।

কনগ্র্যাচুলেশনস। কোথায়?

আমি সায়ন্তনের সঙ্গে জয়েন করছি।

কিন্তু সুনামি তো শেষ হয়ে গেছে।

তোর নেশা হয়ে গেছে। তবে তোর কথাতেই তোকে বলি, সুনামি আবার আসছে। আর এবার অন্যরা ভেসে যাবে, আমরা অনেক উঁচু থেকে দেখব।

কে আনবে সুনামি? সায়ন্তন?

এগজ্যাক্টলি। একটা নতুন বাংলা চ্যানেল খুলছে। সায়ন্তন হচ্ছে তার সিইও।

চ্যানেল? টিভি চ্যানেল?

না, রেডিয়ো। মানে রেডিয়ো স্টেশন আর কী।

রেডিয়ো স্টেশনে আমরা কী করব? গান না অ্যাঙ্করিং?

বাওয়াল করিস না। রেডিয়ো স্টেশনে স্ক্রিপ্ট লিখতে হয় না নাকি? কে লিখবে আমরা ছাড়া? আর তা ছাড়া এটা ঠিক থোড়-বড়ি-খাড়া ব্যাপার হচ্ছে না। একদম অন্যরকম একটা কনসেপ্ট থেকে ব্যাপারটা শুরু হচ্ছে।

কী রকম কনসেপ্ট শুনি?

আগে প্রমিস কর, তোর আর আমার বাইরে কেউ কথাটা জানবে না।

মদ খাওয়ার জন্য এরকম প্রমিস কতজনের থেকে আদায় করেছ?

আমায় যতটা খেলো ভাবিস, আমি কিন্তু সবসময় ততটা খেলো নই। তোকে ব্যাপারটা বলব বলে এখানে ডেকে এনেছি, কারণ আমি সিনসিয়ারলি চাই তুই এটাতে জয়েন কর। তুই যদি ইন্টারেস্টেড না হোস তো বলে দে, আমি বেরিয়ে যাচ্ছি…

ওকে, সরি। বলো, বলো। আসলে মাথাটায় কেমন একটা ড্রামের বাড়ি পড়ছে কিছুক্ষণ ধরে…

আরও ভদকা খা। কতবার করে বললাম, হুইস্কি টান।

পাহাড়ি হোটেলের জানলা দিয়ে ভোরবেলা বাইরে তাকালে কী একটা দেখা যায়, বলছিলে?

গুঁড়ো গুঁড়ো বরফ আর সেগুলোকে একদম ভদকার মতো দেখতে। তুই এই ব্যাপারটা নিয়েও একটা প্রোগ্রাম করতে পারিস। অন্যের মনে হচ্ছে বরফ কিন্তু তোর মনে হচ্ছে ভদকা।

নেবে, পাবলিক নেবে?

আলবাত নেবে। পুরো ব্যাপারটাই তো বিশ্বাস-অবিশ্বাসের। নীচে যেটা মদ ওপরে সেটাই বরফ।

আর সমতল থেকে পাহাড়ে ওঠার মতো, মদ থেকে বরফে ওঠার মতো পুরো জীবনটাই তো একটা ঊর্ধ্বগামী অ্যাডভেঞ্চার। খাবে তো লোকে, অনিরুদ্ধদা?

খাবে রে খাবে! আমি এই যে চাকরি খুইয়ে লাথি-ঝাঁটা খেয়ে বেড়াচ্ছি। সক্কলের, তুই তখন আমাকে যা খাওয়াচ্ছিস, যখন খাওয়াচ্ছিস, আমি খাচ্ছি না?

আই অ্যাম সরি অনিরুদ্ধদা। আমি তোমাকে খাওয়াই আবার কথাও শোনাই। বিশ্বাস করো, মন থেকে কিছু বলি না।

বিশ্বাস করি বলেই তো তোর কাছে ছুটে আসি।

তুমি কি রিক্রুটার, অনিরুদ্ধদা?

রিক্রুট ‘সুনামি’ নিজেই করবে। আমি শুধু ওর কানে মন্ত্র দেব। কিন্তু আগে বল কনসেপ্টটা তোর কেমন লাগল?

কী কনসেপ্ট আমি তো কিছু শুনলামই না।

ওই যে বললাম, বিশ্বাস। অথবা অবিশ্বাস। আর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকা সতর্কতা।

পুরো ব্যাপারটা গুলিয়ে গেল বস। আসলে মৃদুলদা দুম করে মারা যাওয়ার পর থেকে মাথাটা ঠিকঠাক কাজ করছে না।

এই মৃদুলের ব্যাপারটা নিয়েই একটা স্টোরি কর না। কীরকম আমি বলছি। মৃদুল একজন অসম্ভব প্রতিভাবান মেকআপ-ম্যান। সে এরকমভাবে মারা গেছে সেটা অবিশ্বাস্য। আবার আমাদের বিশ্বাস যে মৃত্যুর পরও সে তার কাজের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকবে।

কীভাবে বাঁচবে? মৃদুলদা তো কবিতা লিখত না। নতুন মেকআপ-ম্যানের হাত পড়লেই পুরনো মুছে যাবে। মৃদুলদা যেমন গেল। মোবাইলে কথা বলতে বলতে।

মৃদুলকে লাস্ট ফোনটা কে করেছিল কিংশুক?

মৃদুলদাকে আমি ফোন করেছিলাম দুপুর আড়াইটেয়। কিন্তু ও তো মারা গেছে সন্ধে সাতটা দশে। তা হলে, লাস্ট ফোন… আমি কী করে জানব, অনিরুদ্ধদা?

বের কর, খুঁজে বের কর। এটাই তোর অ্যাসাইনমেন্ট। ভরসার পাশাপাশি তদন্ত, অসতর্কতাকে প্রতিরোধ করা সতর্কতা, এটাই তো আমাদের ট্রেডমার্ক। আমাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেন, ভৌ। আমাদের বিশ্বাস করতে পারেন, ভৌ। আমরা আপনার সঙ্গে আছি, ভৌ।

ভৌ?

হ্যাঁ, ‘ভৌ’। আমাদের রেডিয়ো স্টেশনের নাম। দেখিস যেন পাঁচকান না হয়!

তুমি সত্যি বলছ, ‘ভৌ’?

হ্যাঁ, রে। আমরা শ্রোতাদের লেজ নাড়িয়ে আনন্দ দেব, ভৌ। আমরা শ্রোতাদের সাবধান করব, ভৌ। এবার বল আমি ‘সুনামি’কে গিয়ে কী বলব? তুই জয়েন করবি তো?

আমাকে মৃদুলদাকে লাস্ট ফোনটা কে করেছিল সেটা খুঁজে বের করতে দেবে তো?

দেব রে বাবা, দেব। কিন্তু তার সঙ্গে তোকে মাইনেপত্র দিতে হবে তো, নাকি এমনিই কাজ করবি?

যা বলবে। মৃদুলদাকে লাস্ট ফোনটা…

চল কিংশুক, ওঠ। তুই একদম আউট হয়ে গিয়েছিস। শোন জিনিসটা পাকাপাকিভাবে স্টার্ট হতে আরও মাস দুয়েক, তবে আমি দশ দিনের ভিতর তোর আর সুনামির একটা বৈঠক করিয়ে দিচ্ছি। তবে সেদিন বাবু তোমাকে ভদকা খাওয়াব না। তুমি একদম বেহেড হয়ে যাও।

উঠে দাঁড়াতে গিয়ে কিংশুক টাল খেল একটা। সামলে নিয়ে সামনে তাকাতে সব কিছু ঝাপসা দেখল প্রথমে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো মানিব্যাগটা অনিরুদ্ধর হাতে চালান করে দিয়ে দেখল, অনিরুদ্ধ একশো টাকা ওয়েটারকে দিয়ে একটা পঞ্চাশ টাকা নিজের প্যান্টের পকেটে গুঁজে নিয়ে মানিব্যাগটা ওকে ফেরত দিচ্ছে। পুরো দৃশ্যটাই ওর পাহাড়ি হোটেলের জানলা দিয়ে দেখা ভোরবেলার তুষারপাত বলে মনে হল। হালকা, গুঁড়িগুঁড়ি। কিন্তু তার ভিতরে কোথায় যেন একটা ইঞ্জিনের শব্দ। কু-উ-উ ঝিকঝিক। লাইনের এপার আর ওপারকে যা জুড়ে দেয়। ও একটা ফোন করেছিল ওর মৃদুলদাকে। দুপুরবেলা। সন্ধেয় আসা একটা ফোনে কথা চালাতে চালাতে মৃদুলদা মারা যায়। কিংশুক শুনতে পেল ইঞ্জিনের আওয়াজটা আবার ফিরে আসছে। এবার ওটা শুধু লাইনের এপার আর ওপার জুড়ে দিয়েই চলে যাবে না। ওর সঙ্গে মৃদুলদাকেও জুড়ে দেবে। ‘জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ায়ে…’ গুনগুন করতে চাইল কিংশুক। পারল না।

কপিশপ থেকে রাস্তায় বেরিয়ে অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করল, মনে থাকবে তো কথাগুলো?

কিংশুক ওর দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর বলল, ভৌ।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *