1 of 2

শকওয়েভ – ৩২

বত্রিশ

চাকায় ঝড় তুলেছে রানা। ইঞ্জিন-মিটারের কাঁটা লাল দাগ ছুঁই ছুঁই করছে।

পিছে তাড়া করে আসছে কালো দুই অডি কিউসেভেন।

প্রাণপণ চেষ্টায় সামনে থেকে সরে যেতে লাগল অন্য গাড়িগুলো। অসংখ্য হর্নের কর্ণপীড়াদায়ক চিৎকারে ভরে উঠেছে রাজপথ। ডানে আর বাঁয়ে, বাঁয়ে আর ডানে রাবারের চাকার গা রি-রি করা ঘষটানি আর কাঁচ ভাঙার আওয়াজে গুলজার হয়ে উঠল নরক। দিশেহারা হয়ে পড়া যানবাহনের মাঝ দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ছুটিয়ে নিয়ে চলল রানা মার্সিডিসটাকে।

খানিক পরেই ঝলসে উঠল আবার ট্রাফিক সিগনালের আলো।

ও তো নয়ই, অডি দুটোও স্পিড কমাল না এবার লাল বাতি দেখে। পথচারীদের সন্ত্রস্ত করে তুলে ক্রসিং পেরিয়ে গেল পাল্লা দিয়ে। ব্যস্ত ইন্টারসেকশনের উল্টোমুখী গাড়ির গিজগিজে স্রোতের পাশ কেটে কেটে উড়ে চলল রীতিমত।

হঠাৎ পিছনের সিট থেকে চিলের মত চিল্লান দিল সেলেনা।

উইওস্ক্রিনের ওপাশে নিঃশব্দ চিৎকারে হাঁ হয়ে গেছে ড্রাইভার—ধাম করে ওর ফিয়াট গাড়িটা গুঁতো মেরে বসল মার্সিডিসের এক পাশে।

থরথর করে কেঁপে ওঠায় রানার হাত থেকে ছুটেই যাচ্ছিল স্টিয়ারিং। মুনশিয়ানার সঙ্গে বাগে আনল ও হড়কে যাওয়া ট্যাক্সিটাকে। ছুট লাগাল আবার বেদিশা গাড়িগুলোর জটলার মাঝ দিয়ে।

রেসিং ড্রাইভারের মত রাস্তার উপর কেন্দ্রীভূত ওর মনোযোগ। চোখের কোণ দিয়ে অডি এবং আরেক গাড়ির ভয়ানক সংঘর্ষের সাক্ষী হলো রিয়ার-ভিউ মিররে। বিচূর্ণ কাঁচ আর প্লাসটিক ছিটিয়ে এক পাশে কাত হয়ে পড়ল অন্য গাড়িটা।

এদিকে এক মোটরসাইকেল আরোহী ভড়কে গিয়ে ফ্রন্ট হুইল লক করতেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল দ্বিচক্রযানটি থেকে। টারমাকের উপর দিয়ে মার্সিডিসের দিকে পিছলে আসছে বাহন ও তার আরোহী।

বনবন করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করল রানা মোটরসাইক্লিস্টকে। কার্বের দিকে রওনা দিয়েছে ট্যাক্সি, পার্ক করা এক সার গাড়ির নাক ছেঁচে দেয়ার উপক্রম করল ওটা।

সামান্য ডানে কেটে এড়াতে পারল। উঁচু কার্বে চড়ে বসার আগেই ভিতরদিকে টেনে নিয়েছে উইং মিরর। ফ্রন্ট সাসপেনশনের ব্যাপারে নিদারুণ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল বিচ্ছিরি একটা আওয়াজ শুনে। অবশ্য বোঝা গেল, আশঙ্কা অমূলক। খেল দেখিয়েছে জার্মান ইঞ্জিনিয়ারিং।

সারি সারি বৃক্ষশোভিত পেভমেন্ট, দালান আর দোকানপাটের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ণ ফাঁকা জায়গা দিয়ে এগিয়ে চলল মার্সিডিস। ছত্রভঙ্গ কবুতরের ঝাঁক যেন; যে যেদিক পারে, ছুট লাগাল মানুষগুলো।

পার্ক করা গাড়ির সারিতে খোলা একটা গলিমুখ দেখতে পেয়ে সেদিক দিয়ে আবার রাস্তায় গিয়ে পড়ল ট্যাক্সিটা। টায়ারের তীক্ষ্ণ হেষাধ্বনি চাপা পড়ে গেল স্কিড করে সরে যাওয়া গাড়িগুলোর বেসুরো হর্নের নিচে। এখনও পিছু ছাড়েনি দুই অডি।

তীক্ষ্ণ মোড় নিল রানা ডান দিকে। পিচের আকর্ষণ কাটিয়ে শূন্যে উঠে গেল বাঁয়ের চাকা জোড়া। অন্য দু’চাকায় কাত হয়ে প্রায় উড়ে চলল মার্সিডিস।

রানাদের পর পরই বাঁক পেরোল প্রথম অডি। দ্বিতীয়টা পাশে সরতে গিয়ে ছেঁচা খেল ওদিকের কার্বসাইডে। সোজা এগিয়ে যাচ্ছে কোণের ক্যাফে টেরাসের দিকে।

ব্রেকফাস্ট করতে আসা খদ্দেররা ভীষণ আতঙ্কে ঘাড়- মাথা গুঁজল এদিক-সেদিক। প্লাসটিকের চেয়ার, টেবিল, ক্রোসাস্ আর কফিকাপ বনেটের উপর দিয়ে পাখনা মেলল বাতাসে।

থেমে পড়ল গাড়ি। মুহূর্তেই ক্রুদ্ধ জনতা ঘিরে ধরল ওটাকে। দমাদম থাবা মারছে জানালায়। সঙ্গে চলছে অবিশ্রান্ত গালিবর্ষণ। আরেকটা মোড় ঘুরতেই অডিটাকে আর দেখতে পেল না রানা।

কিন্তু পিছনেই রয়েছে ওটার যমজ ভাই।

সাঁত করে পিছে পড়ল পেরিফেরিকের দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড।

মন্থরগতি গাড়িগুলোর মাঝ দিয়ে নির্মমভাবে ধাক্কা-গুঁতো মেরে পথ করে চলতে লাগল রানা।

অডিটাও আসছে গোঁ গোঁ গর্জন তুলে। এদিকে আকাশপথে অনুসরণ করে চলেছে চপারটা

এতখানি স্পিডে মাত্র ক’মুহূর্ত লাগল পশ্চিমমুখী প্যারিস রিং রোডে পড়তে। যথাসম্ভব দ্রুত ছোটাচ্ছে রানা গাড়িটাকে। পেণ্ডুলামের মত রাস্তা জুড়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে যা- কিছু পড়ছে সামনে, ওভারটেক করছে সব কিছু।

ছোট এক হ্যাচব্যাক গাড়ি বেমক্কা একটা ধাক্কা মেরে বসল ধাওয়ারত অডির পিছনে। চলন্ত অবস্থাতেই ঘুরপাক খেয়ে ছিটকে চলে গেল ওটা রাস্তার বাম পাশে।

দ্বিতীয় কিউসেভেন-টার কী অবস্থা, কে জানে!

‘ওই যে ওটা!’ সেলেনার সঙ্কেত সতর্ক করল রানাকে।

ফিরে এসেছে দ্বিতীয় অডি। নির্ঘাত রেডিয়োতে নির্দেশনা পেয়েছে হেলিকপ্টার থেকে। ঝড়ো গতি তুলে ফের ধাওয়া করছে রানাদের। কিছুতেই হাল ছাড়বে না যেন।

জোড়া টানেলের এন্ট্রান্স দেখা গেল দৃষ্টিপথে। মুহূর্ত পরে তীব্র গতিতে ছুটে চলল দু’পক্ষ আণ্ডারপাস ধরে।

সাঁই সাঁই করে পিছিয়ে যাচ্ছে কংক্রিটের পিলারগুলো। ধীরে চলা গাড়িগুলোকে পাশ কাটানোর জন্য এধার থেকে ওধারে সরতে হচ্ছে রানাকে।

আবারও একাট্টা হয়েছে অডি দুটো। বিড়ালের জান। একটু চান্স পেলেই চলে আসবে ট্যাক্সিটার সমান্তরালে।

‘আসছে, রানা!’ দুই গাড়ির একটা সামনে বাড়তেই চেঁচিয়ে উঠল সেলেনা।

ওদের বাম পাশে চলে এসেছে ওটা। নেমে গেল প্যাসেঞ্জার সাইডের টিনটেড কাঁচ।

চকিতে ভিতরের লোকগুলোকে দেখে নিল রানা।

কঠোর চেহারা। শক্তপোক্ত গড়ন। সোনালি চুল। পঁয়তিরিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে হতে পারে গাড়িচালকের বয়স।

ভাবনা-চিন্তার অবকাশই পেল না পাশেরজনের চেহারাসুরত নিয়ে। হাতের পিস্তল নিশানা করছে লোকটা মার্সিডিসের দিকে।

সহজাত প্রবৃত্তির বশে হুইল ঘোরাল রানা। দড়াম করে ট্যাক্সির, সাইড দিয়ে ধাক্কা মেরে বাঁয়ে সরতে বাধ্য করল প্রতিপক্ষকে। ফুলকির ফুলঝুরি ছিটিয়ে কংক্রিট ডিভাইডারে ঘষটে গেল অডিটার বাম পাশ।

দ্রুত এগিয়ে আসছে আরেকটা পিলার। বাঁ দিকে আটকে রাখতে চায় রানা অডিটাকে, যাতে বাধা পায় ওটা সামনের পিলারে।

একদম শেষ মুহূর্তে ডানে কাটল ও দাঁতে দাঁত পিষে। আর আধ সেকেণ্ড দেরি হলেই এড়ানো সম্ভব হতো না মারাত্মক সংঘর্ষটা।

সময়মতই সক্রিয় হয়েছে অডির ড্রাইভারও। কুশলী প্রচেষ্টায় বাঁ দিকের উইং মিরর খসে পড়া এবং ইস্পাতের হুইল আর্চ বিদীর্ণ হওয়া ছাড়া আর কোনও ক্ষতি হতে দিল না গাড়িটার।

অনিয়ন্ত্রিতভাবে পিছলে যাচ্ছে ওটা। পিছন থেকে ষাঁড়ের মত গোঁত্তা মারা এড়াতে হার্ড ব্রেক কষতে হলো দ্বিতীয় অডিকে।

ঘণ্টায় এক শ’ বিশ কিলোমিটারেরও বেশি বেগে সুড়ঙ্গ থেকে উজ্জ্বল সূর্যালোকে বেরিয়ে এল মার্সিডিস ট্যাক্সি। অনেক পিছনে পড়েছে দুই অডি। চোখে ধুলো দেয়ার সত্যিকার সুযোগটা এতক্ষণে দেখতে পেল রানা।

সাঁ করে পাশ কাটাল ও গদাই লশকরি চালে চলতে থাকা এক ভক্সল কোরসা-কে। পরক্ষণে গাল দিয়ে উঠল বিশাল আকারের এক জোড়া ট্রাককে অর্ধেক গতিতে লেন আটকে এগোতে দেখে। পাশে কিংবা মাঝ দিয়ে যাওয়ার কোনও উপায়ই রাখেনি ও-দুটো।

সুযোগটা হাত ফসকাল রানার। সামলে উঠে বাইরের রাস্তায় হাজির হয়ে গেছে জোড়া অডি।

সামনের গাড়ির প্যাসেঞ্জার আগ্নেয়াস্ত্র তাক করল জানালা দিয়ে। ইঞ্জিনের গর্জনের মাঝে মৃদু ‘ফট’ আওয়াজের উপর উঠবে না গুলির শব্দ।

রিয়ার উইণ্ডোর মিসরির গুঁড়োর মত ভাঙা কাঁচের টুকরোয় সেলেনাকে গোসল করাল গুলিটা।

বাংলা খিস্তি বেরিয়ে গেল রানার মুখ দিয়ে।

‘কী বললে?’ কান খাড়া করল সেলেনা।

‘তোমাকে না,’ ওকে আশ্বস্ত করল রানা।

বাঁয়ে চাপল ও প্রাণপণে। লাফ দিয়ে সেন্ট্রাল রিজার্ভেশন ভেঙে দুই লেনের উল্টো রাস্তায় গিয়ে পড়ল মার্সিডিস। ঘণ্টায় দু’শ’ কিলোমিটারের গড়পড়তা বেগে ছুটন্ত গাড়ির সাগরে আবিষ্কার করল ওরা নিজেদের।

রানার মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে মন্তব্য করতে যাচ্ছিল মেয়েটা, সামনে এক রেঞ্জ রোভারকে সোজাসুজি ওদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে চিল-চিৎকারে পর্যবসিত হলো কথাগুলো।

ছিটকে সরে গেল আগুয়ান রেঞ্জ রোভার। অল্পের জন্য বাঁচল ওরা মুখোমুখি কলিশনের হাত থেকে। আর একটা সেকেণ্ড দেরি হলেই পরপারের টিকেট কাটতে হতো দুই গাড়ির সবাইকে।

ফাইটার পাইলটের মত মনোযোগের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যবহার করতে হচ্ছে রানাকে। দু’পাশ দিয়ে সরে যাওয়া উচ্চকিত হর্নের ঝাপটা এসে লাগছে কর্ণকুহরে। তেড়ে আসা হেডলাইটগুলোর রক্তচক্ষুতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে দৃষ্টি।

তবে রানা যদি মাথাপাগল হয়, অডির চালকেরা মাথা থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত পুরোটাই পাগল। মার্সিডিসের পিছু নিয়ে ওরাও চলে এসেছে রাস্তার রং সাইডে, ট্রাফিকের উজানে পথ করে নিচ্ছে বিদ্যুদ্‌গতিতে। যেন নেমেছে কোনও আত্মঘাতী মিশনে।

যান্ত্রিক ফড়িংটাও তা-ই। ওটাকে আর দেখতে পাচ্ছে না রানা, কিন্তু রোটরের গভীর ধুবধুব অনুভব করছে রোমকূপে। ঠিক উপরেই ভাসছে হেলিকপ্টার। নির্দিষ্ট ব্যবধান রেখে উড়ে আসছে নিচু দিয়ে।

পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি এতটুকু।

বরং আরও খারাপ হয়েছে। পেরিয়ে আসা সতর্ক-সঙ্কেত ঘোষণা করছে—সামনে কনস্ট্রাকশন সাইট।

পরবর্তী দু’শ’ মিটারের বাঁকটা অতিক্রম করে দেখতে পেল রানা আয়োজনটা। নতুন ওভারপাস নির্মাণের জন্য ক্রেন আর অন্যান্য সরঞ্জাম জড়ো করা হয়েছে পোর্টে দে সেভরেসের কাছে। এক্সিট রুটের উপর, দীর্ঘ এলিভেটেড সেকশন দিয়ে চলাচল করছে গাড়িগুলো। দূরে, সিঙ্গল লেন ধরে ধীর গতিতে এগোচ্ছে দু’দিকের যানবাহন।

ওভারপাসের দেড় শ’ গজ সামনে তৃতীয় আরেকটা কালো অডিকে স্পট করে বুঝতে পারল রানা, শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে ওদের নিস্তার পাওয়ার সম্ভাবনা। প্রতি মুহূর্তেই দূরত্ব কমছে ঝড়ো গতি তোলা গাড়িটার।

ফাঁদে পড়ে গেছে রানারা। ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে ফাঁদের পরিধি। আর কয়েক সেকেণ্ডেই অবসান ঘটবে এ টম অ্যাণ্ড জেরি খেলার।

কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে ও তিন অডির আরোহীদের। প্রস্তুত ওরা ট্যাক্সিটার উপর টার্গেট প্র্যাকটিসের জন্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত হওয়ার আগেই কাজ সেরে সটকে পড়বে দৃশ্যপট থেকে।

ঢাল বেয়ে ওভারপাসে উঠে পড়ল মার্সিডিস। বিশ ফুট নিচে রুফটপ, আর তারও নিচে রাস্তা। ডোরা কাটা রিবনের মত দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টি করে পিছিয়ে যাচ্ছে দু’পাশের ব্যারিয়ারগুলো।

মার্সিডিসের সানরুফ দিয়ে দেখা যাচ্ছে চপারের দোদুল্যমান পেটটা। পিছনে ধাওয়া করে আসছে জোড়া গাড়ি। আলাদিনের চেরাগ থেকে বেরিয়ে আসা দৈত্যের মত বড় হচ্ছে সামনেরটা।

নব্বই গজ!

সত্তর!

পথ নেই পালানোর!

তবুও থামবে না রানা। সজোরে চাপ প্রয়োগ করল পেডালে।

‘নিচু হয়ে বসো!’ কাঁধের উপর দিয়ে চকিতে চেয়ে বলল ও চিৎকার করে।

ষাট গজ!

চল্লিশ!

নাহ, কোনও অপশন নেই ওদের সামনে!

সিকি-মোচড়ে ডানে চাপল রানা। সেলেনা চিৎকার দেয়ার আগেই আঘাত হেনে বসল গাড়িটা রাস্তার পাশের বেষ্টনীতে। ধাতুতে ধাতুতে সংঘর্ষের কর্ণবিদারক আওয়াজের সঙ্গে গোড়া থেকে উপড়ে এল ব্যারিয়ারের গোটা সেকশনটাই।

শূন্যে উড়াল দিয়েছে মার্সিডিস!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *