৬০
আমার জ্ঞান অবশ্য ফিরেছিল, কিন্তু ঘোর কাটতে সময় লেগেছিল। শরীরের তেমন কিছু ক্ষতি হয়নি অবশ্য। এর মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি আমার মগ্ন চৈতন্যের উপর দিয়ে হালকা তুলির টানের মতো বুলিয়ে গেছে শুধু, বোধের স্তরে প্রবেশাধিকার পায়নি। মাঝে মাঝে ছেঁড়া ছেঁড়া চেতনা ও অচৈতন্যের ঢেউয়ে দুলেছি পুরো সময়টা। জ্ঞান যখন ফিরল, দেখি টাপুরদি আমার মুখের উপর ঝুঁকে তাকিয়ে আছে। আমি চোখ খুলে তাকাতে মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘উঠে বসতে পারবি?’
হাতে ভর দিয়ে উঠে বসতে চেষ্টা করতেই মাথাটা টলে গেল। টাপুরদি তাড়াতাড়ি আমায় ধরে ফেলল। নরম গলায় বলল, ‘আস্তে আস্তে।’
টাপুরদির হাত ধরে উঠে বসলাম। স্যাঁৎসেঁতে বদ্ধ একটা ঘরের মেঝেতে বসে আছি। একটা পয়েন্ট ফাইভ ওয়াটের বালব টিমটিম করে জ্বলছে। মেঝের একপাশে কিছু ডাঁই করে রাখা কার্টন ও গৃহস্থালির বাতিল সরঞ্জাম পড়ে আছে অবহেলা ভরে। চারিদিকে তাকিয়ে এতক্ষণে লক্ষ করলাম, এই ঘরে কোনো জানালা নেই। টাপুরদি মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা কর।’
মাথার ভিতরটা ঝিম ঝিম করলেও উঠে দাঁড়াতে অসুবিধে হল না। মনে পড়ে গেল কীভাবে মনোময়বাবুর সঙ্গে কথার মাঝপথে পেছন থেকে আমার ও টাপুরদির মুখে রুমাল চেপে ধরা হয়েছিল। কখন মনোময়বাবুর লোকেরা আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল খেয়ালই করিনি। আমাদের আরও বেশি সাবধান হওয়া উচিত ছিল। হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত আড়াইটে বাজে। মাঝে কেটে গেছে বেশ কয়েক ঘণ্টা।
টাপুরদি বলল, ‘তোর জ্ঞান ফেরার অপেক্ষাতেই ছিলাম।’
‘আর তুমি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি হাসল। বলল, ‘মুখে রুমাল চেপে ধরতেই নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলেছিলাম। তবু যে একেবারেই কিছু হয়নি, তা নয়। তবে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে এসেছে।’
‘টাপুরদি, বেরোব কী করে এখান থেকে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘ঘণ্টায় ঘণ্টায় একজন এসে দেখে যাচ্ছে। এতক্ষণ তোর জন্য কিছু করতে পারিনি। পেনড্রাইভটা না পাওয়া অবধি ওরা আমাদের কিছু করবে না। অজ্ঞান অবস্থায় নিশ্চয়ই আমাদের বডি সার্চ করেছে ওরা। কারণ মোবাইল ফোন নিয়ে নিয়েছে। পেনড্রাইভ না পেয়ে এখানে বন্ধ করেছে আমাদের ভয় দেখিয়ে সেটা হস্তগত করার জন্য।’
‘বডি সার্চ করেছে?’ ঘৃণায় মুখ বাঁকালাম আমি।
‘গেট আপ মিতুল। এখন ওসব নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই। তোর কি ভয় করছে?’
‘না,’ বললাম আমি। রাগে গা রি রি করছে আমার।
‘ভেরি গুড। লোকটার আবার রাউন্ডে আসার সময় হয়ে এল। তৈরি থাক,’ বলে উঠে গিয়ে সুইচ টিপে লাইটটা নিভিয়ে দিল টাপুরদি। ঘরের ভেতর এই মুহূর্তে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।
‘চোখটা অন্ধকারে সইয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর মিতুল,’ টাপুরদি বলল।
মিনিট পনেরো এভাবেই কাটল। বাইরে খুটখাট শব্দ হতেই কান খাড়া করলাম। টাপুরদি ফিসফিস করে বলল, ‘মিতুল, গেট রেডি।’
পদশব্দ এবার দরজার বাইরে পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। দরজার পেছনে দাঁড়ালাম আমরা দুইজন। চোখের দৃষ্টি এখন অন্ধকারে অনেকটাই সয়ে এসেছে। বাইরে থেকে দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম। পরক্ষণেই একজন লোক ভিতরে এসে ঢুকল। ঘরের ভিতর পা রেখেই হতচকিতভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। ঘরের ভেতর এমন নিকষ আঁধার স্বাভাবিকভাবেই সে আশা করেনি। টাপুরদিও এই মুহূর্তের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। অন্ধকারে চিতাবাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার উপরে। হতভম্ব লোকটা আত্মরক্ষার চেষ্টাটুকু করারও সময় পেল না। তার আগেই টাপুরদি লোকটাকে মাটিতে পেড়ে ফেলে তার বুকের উপর চেপে বসল। ডান ও বাঁ-হাতে লোকটার চোয়াল ও নাক লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটা ঘুসি ঝাড়তেই লোকটা নেতিয়ে পড়ল। ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। লোকটাও শেষ মুহূর্তে ডান হাত তুলে টাপুরদির মুখে আঘাত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু টাপুরদি তাকে সেই সুযোগ দিল না। চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় মুখ সরিয়ে নিয়ে শেষ একটা মোক্ষম ঘুসি মারতেই লোকটা জ্ঞান হারাল।
আমি আর টাপুরদি মিলে লোকটাকে ধরে টেনে ঘরের এক কোণে কার্টনের আড়ালে শোয়ালাম। তারপর টাপুরদি ঘরের দরজার দিকে এগোল। আমায় ঘরের ভিতরে থাকতে বলে নিজে দরজা দিয়ে বাইরে উঁকি দিল। তারপর নিঃশব্দে আমায় ইশারায় ওর সঙ্গে বেরোনোর জন্য ডাকল।
দুজনে ঘরের বাইরে পা রাখলাম। একটা টিমটিমে আলো যতটা না আলো ছড়াচ্ছে, তার চেয়েও বেশি কোণের খাঁজে খাঁজে অন্ধকারকে প্রকট করছে। জায়গাটা ঠিক কোথায় বুঝতে পারছি না। একটা সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের দিকে। সিঁড়িগুলোতে অযত্নের ছাপ, ভেঙে গেছে অনেক জায়গায়। আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে আর কোনো ঘর চোখে পড়ল না।
আমি বললাম, ‘টাপুরদি, এখানে তো আর কোনো ঘর দেখছি না। তাহলে সুবিনয়বাবুকে ওরা কোথায় রেখেছে?’
টাপুরদি বলল, ‘আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে সুবিনয়বাবু এ বাড়িতেই কোথাও নিশ্চয়ই আছেন। কোথায় আছেন জানি না। সেটাই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। বেশি সময় হাতে নেই। খুব শিগগিরই ওরা টের পেয়ে যাবে যে আমরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি। খোঁজ শুরু হলে ধরা পড়তে সময় লাগবে না। চল উপরে যাওয়া যাক।’
আমরা দুজনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। সিঁড়ির মুখে দরজাটা ভেজানো। হাত দিয়ে আলতো করে ঠেলে দেখল টাপুরদি। না, তালা লাগানো নেই। সম্ভবত লোকটা আমাদের দেখতে আসার সময় দরজা খোলা রেখে এসেছিল। দরজার বাইরের আংটাতে একটা চাবিসুদ্ধু বড়ো তালা ঝুলছে। টাপুরদির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটতে দেখলাম। সবচেয়ে বেশি অবাক লাগল যেটা দেখে, তা হল, দরজাটা দিয়ে বেরোতেই আমরা বাড়ির মেন বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এলাম। অর্থাৎ, যে ঘরে আমাদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল, সেটা আন্ডারগ্রাউন্ড ঘর। আমি স্তব্ধ বিস্ময়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। বললাম, ‘মাই গড টাপুরদি, এ যে মাটির নীচের গুপ্তকক্ষ গো!’
টাপুরদি ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে আমায় কথা না বলতে নির্দেশ করল। দরজাটা আলতো করে আরেকটু ঠেলতেই জুঁইফুলের গন্ধ আমাদের দুজনের নাকেই ধাক্কা মারল। টাপুরদি আমার দিকে তাকাল। সেদিন সুনয়নাদেবীর সঙ্গে দেখা করতে এসে রাতে এই জুঁইয়ের গন্ধ পেয়েছিলাম। এ বাড়ির পেছনের দেয়ালের কাছে জোড়া জুঁইয়ের গাছ সেদিনই চোখে পড়েছিল আমাদের। তার মানে, এটা বাড়ির পেছন দিক।
দুইজনে বাইরে বেরিয়ে এলাম। এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে টাপুরদি পেছন ফিরে দ্রুত হাতে তালাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। চাবিটা নিজের ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল, ‘চল। তবে খুব সাবধান। চারিদিকে সিকিউরিটির লোকেরা ঘুরছে।’
৬১
উপরের দিকে চোখ তুলে মইটা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে জরিপ করল টাপুরদি। বাড়ির পেছনে বাঁ-দিকে সীমানা প্রাচীরের গা ঘেঁষে মইটা সোজা উঠে গেছে উপরে। বাড়ি যিনি বানিয়েছিলেন, বোধ করি তিনি ইউরোপীয় রুচিতে বাড়িটি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ড ঘর, ফায়ার এস্কেপ দেখে সেই সন্দেহই জোরদার হচ্ছে। পরবর্তীতে অমিয় চক্রবর্তী বাড়িটি কিনে নিলে এই ফায়ার এস্কেপের কোনো যত্ন হয়নি কস্মিনকালে, তা এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়। ইউরোপীয় ছবিতে যেমন সুচারু শৈল্পিক ফায়ার এস্কেপ সিঁড়ি দেখা যায়, তেমন কিছু নয়। নেহাতই একখানা লোহার মই গোছের বস্তু, যার ধাপগুলি একে অপরের থেকে এতটাই দূরে যে একটি ধাপে দাঁড়ালে পরেরটি একজন মাঝারি উচচতাসম্পন্ন ব্যক্তির কোমরের উপরে পড়বে। মইটি না শোভাবর্ধক, না সত্যিকারের প্রয়োজনের সময় কাজে আসার উপযোগী। যেন শুধু বানানোর জন্যেই বানানো হয়েছে। নিতান্ত কপিপ্রজাতির না হলে এই মই বেয়ে ওঠা অসম্ভব। তার উপর অব্যবহারে, অযত্নে এতটাই জীর্ণ অবস্থা, পা রাখতে ভয় হয়, বুঝি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে।
টাপুরদি টেনেটুনে মইয়ের অবস্থা পরীক্ষা করে বলল, ‘পারবি মিতুল?’
আমার প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম। টাপুরদি বার বার বলত, ‘মিতুল একটু এক্সারসাইজ কর, ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়া।’ তখন কানে নিইনি। রেখাদেবীর বাড়ির গাছে যদি বা উঠতে পেরেছি, এই মইয়ে উঠব কীভাবে?
টাপুরদি আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ঠিক পারবি। শুধু একটু সাহস করতে হবে।’
মইয়ের প্রথম ধাপটি মাটি থেকে প্রায় বুকসমান উচচতায়। কী জানি বাড়ির তদানিন্তন মালিকের বোধ হয় মনে হয়েছিল, আগুন লাগলে পুড়ে মরার চেয়ে লাফিয়ে পড়ে কোমর ভেঙে মরা বেশি সম্মানের। তাই এই ব্যবস্থা।
‘কী করে এখানে উঠব টাপুরদি! পা তো পৌঁছোবেই না অতদূর অবধি,’ কাতর স্বরে বললাম আমি।
টাপুরদি বলল, ‘আমি তোকে তুলে ধরছি। তুই ওঠ।’
টাপুরদি আমার কোমর ধরে উপরে শূন্যে তুলে ধরল। টাপুরদির শারীরিক শক্তির পরিচয় আগেও পেয়েছি অনেকবার। তাই অবাক হলাম না। নির্দ্বিধায় আমার বাহান্ন কেজির শরীরটাকে উপর দিকে তুলে প্রায় ছুড়ে দিল টাপুরদি। আমিও দ্বিতীয় ধাপটিকে হাত দিয়ে লুফে ধরলাম। ঝুলন্ত অবস্থায় পা রাখলাম নীচের প্রথম ধাপে। নিজের কৃতিত্বে নিজেই মুগ্ধ হলাম।
টাপুরদি নীচ থেকে চাপা গলায় বলল, ‘মিতুল, চেষ্টা কর পরের ধাপে পা রাখতে।’
পরবর্তী প্রতিটি ধাপ নীচের ধাপের চেয়ে আমার কোমর সমান উঁচু। মা দুর্গার নাম করে তৃতীয় ধাপটা ধরে ঝুলে আগের মতোই দ্বিতীয় ধাপে পা রাখলাম।
নীচ থেকে শুনলাম টাপুরদি বলল, ‘শাবাশ মিতুল। উঠতে থাক।’
নীচ থেকে টাপুরদিও উঠে আসছে টের পেলাম। একবার মনে হল, এতদিনের পুরোনো জীর্ণ মই দুজনের ওজন নিতে না পেরে দেহ রাখলেই চিত্তির। তখন বন্দিদশা তো ঘুচবেই না, উপরিপাওনা হবে ভাঙা হাত-পা। টাপুরদি নীচ থেকে আমাদের আরণ্যক পূর্বপুরুষদের মতো দ্রুতগতিতে উঠে আসছে। আমি ধীরে ধীরে ওঠা শুরু করলাম। অনেকটা কসরত করে শেষমেষ শেষ ধাপে পা রাখতে সমর্থ হলাম। ছাদের কার্নিশের শেষ প্রান্ত থেকে এই ধাপ অনেকটাই নীচে শেষ হয়েছে। এখান থেকে ছাদে ওঠার কোনও উপায় খুঁজে পেলাম না। ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এবার? এবার কী করব টাপুরদি?’
টাপুরদি একেবারে আমার পেছনের ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে। উপরটা মাথা তুলে দেখে বলল, ‘ভালো করে দেখ মিতুল। ছাদের ধার থেকে ইঞ্চিখানেক দূর থেকে কার্নিশের গাঁথনি উঠেছে। ওখানে পা রেখে উঠতে হবে। আর কোনো উপায় নেই।’
‘অসম্ভব,’ আঁতকে উঠে বললাম আমি, ‘দোতলার ছাদ থেকে নীচে পড়লে যদি বা প্রাণে বাঁচি, হাড়গোড় একটাও বাঁচবে না টাপুরদি। ওইটুকু স্পেসে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, পাও রাখা যাবে না। রক্ষে করো, আমার দ্বারা হবে না।’
‘পারবি। এতদূর যখন উঠতে পেরেছিস, এটাও পারবি। আর আমি তো আছি তোর পেছনে। তোকে আমি পড়তে দেব ভাবলি কী করে?’
অন্ধকারে নীচের ধাপে দাঁড়ানো টাপুরদির মুখ আমি দেখতে পাচ্ছি না। টাপুরদির কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল, আমার চোখটা হঠাৎ জ্বালা করে উঠল। অন্ধকার রাতে ভগ্নপ্রায় ফায়ার এস্কেপের শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে দোতলার ছাদের কার্নিশ পেরোনোর আগে চোখ জ্বালা করা মোটেই কাজের কথা নয়। তবে টাপুরদির কথায় মনে বেশ কিছুটা জোর এল। মনে হল, চেষ্টা করলে পারতেও পারি। কিন্তু ধরব কী?
‘হাত বাড়িয়ে ছাদের কার্নিশ ধর মিতুল,’ নীচ থেকে বলল টাপুরদি।
টাপুরদির কথামতো ডান হাতটা উপরে বাড়াতে ছাদের কার্নিশ হাতে ঠেকল। কিছুটা স্যাঁৎসেঁতে, অন্ধকারে চোখে দেখা না গেলেও বুঝলাম পরিচর্যার অভাবে শ্যাওলা পড়েছে। টাপুরদি ফিসফিস করে বলল, ‘হাতে বেশি সময় নেই মিতুল। ওঠ, তুই পারবি।’
বাঁ-হাতটা ছাড়তেই ব্যালেন্স হারালাম। মুখ থেকে একটা ভয়ার্ত আর্তনাদ বেরিয়ে আসতেই টাপুরদি নীচের ধাপ থেকে আমার কোমরটা একহাতে সবলে জড়িয়ে ধরল। কোনোরকমে ছাদের বর্ধিত অংশ ধরে নিজেকে সামলালাম।
‘সাবধান,’ বলল টাপুরদি, ‘নীচে তাকাস না মিতুল।’
এবার আর ভুল করলাম না। সাবধানে একে একে দুই হাত বাড়িয়ে কার্নিশের ধারটা ধরে ফেললাম শক্ত হাতে। টাপুরদি কিছু নির্দেশ দেওয়ার আগেই ডান পায়ের হাঁটু ভেঙে ছাদের ধারের অংশতে পা রাখলাম। আমার পায়ে স্নিকার পরা। মনে হল, খালি পায়ে থাকলে বোধ হয় সুবিধে হত। কিন্তু এখন কিছু করার নেই। হাতে ভর দিয়ে শরীরটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে তুলে ধরতেই বাঁ-পাটাও পৌঁছে গেল ডানপায়ের পাশে। এরপর নিজেকে সামলে নিয়ে কার্নিশ পেরিয়ে ছাদে পা রাখতে বিশেষ কসরত করতে হল না। টাপুরদিও একইভাবে উঠে এসে দাঁড়াল আমার পাশে। দুজনেরই মুখে যুদ্ধজয়ের হাসি। টাপুরদি আমার পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে বলল, ‘ওয়েল ডান। এবার থেকে আর ফাঁকি নয়। রোজ এক্সারসাইজ করবি, মনে থাকে যেন।’
ফিক করে হেসে মাথা নাড়লাম আমি।
৬২
পরের চ্যালেঞ্জটা যে সহজেই উতরানো গেল, তার জন্যে এই বাড়ির পরিচর্যার অভাবই দায়ী। আগে থেকে অবশ্য ভেবেই রেখেছিলাম সিঁড়ির দরজা ভিতর থেকে বন্ধ থাকবে, এবং তা ছিলও। ভিতরে কাঠের দরজার বাইরে কোলাপসিবল গেটে একটা তালা ঝুলছিল অবশ্য, সেটা টাপুরদি অনায়াসেই খুলে ফেলল। বাড়ির গেটে আমাদের সার্চ করা হবে জানাই ছিল। টাপুরদির জিনসের কোমরে যে বেল্টটা থাকে, সেটা অর্ডার দিয়ে বিশেষভাবে বানানো। গত সপ্তাহেই এটা হাতে এসে পৌঁছেছে। জিনিসটা ভারি সুন্দর। বিশেষ করে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভের জন্য খুবই কাজের জিনিস। উপর থেকে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই। চামড়ার পেছনে সার সার সরু পকেটে ছোটো আকারের কিছু মিনিয়েচার যন্ত্রপাতি থাকে, বেশিরভাগই বেশ নমনীয়। যন্ত্রপাতিগুলি কিছু বিদেশি সাইট থেকে অনলাইনে কেনা, বাকিগুলি অর্ডার দিয়ে ধর্মতলার কোনো দোকান থেকে বানিয়ে এনেছে টাপুরদি। ওর সুঠাম পাতলা কোমরে বেল্টটা সেঁটে থাকে, কিছু বোঝা যায় না।
বেল্ট থেকে একটা স্ক্রু -ডাইভারের মতো দেখতে পাতলা যন্ত্র বার করে আনল টাপুরদি। সামনেটা খাঁজকাটা মতো। তালার ভিতর ঢুকিয়ে হালকা মোচড় দিতেই খুট করে শব্দ হল। পুরোনো মরচে পড়া তালা খুলতে বেশি কষ্ট করতে হল না। কাঠের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। কয়েকবার হাত দিয়ে ঠেলে বোঝা গেল ভিতরে দরজার উপরের দিকে ছিটকিনি লাগানো আছে।
‘কী করবে টাপুরদি? খুলবে কী করে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘দাঁড়া, চেষ্টা করে দেখি। এতদূর এসে খালি হাতে ফিরব না,’ চাপা গলায় বলল টাপুরদি।
দরজাটা নড়ছে। কাঠের দরজা ছিটকিনির কারণে উপরে শক্ত হয়ে এঁটে থাকলেও নীচের দিকটা ঠ্যালা দিলে নড়ছে। দরজাটা ছাদের দিকে খোলে। টাপুরদি ঝুঁকে দেখে বলল, ‘আজ আমাদের কপাল ভালো রে মিতুল। দরজার হিঞ্জটা দেখ।’
দেখলাম। কোনো অজ্ঞাত কারণে নীচের দিকের হিঞ্জের স্ক্রু খুলে এসেছে। যতটা নিঃশব্দে পারা যায়, বেশ কয়েকবার ঠেলতে উপরের হিঞ্জটাও নড়বড়ে হয়ে এল। টাপুরদি হাতের স্ক্রু ডাইভারের মতো বস্তুটি ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে বেশ কয়েকবার গায়ের জোরে চাড় দিল। মনে হল, ভাগ্যিস বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ছিল, নইলে ব্যাপারটা এতটা সহজে হত না। অমিয়বাবু, অম্লানবাবু ব্যস্ততার কারণে হয়তো বাড়ির বাইরেই বেশি সময় থাকতেন। আর সুনয়নাদেবীকে যতটুকু দেখেছি, মনে হয়েছে সাংসারিক ব্যাপারে কিছুটা যেন উদাসীন। সেই কারণেই বহুদিন এই বাড়ির লোকজন বোধ হয় বাড়ির যত্নের দিকে খেয়াল রাখেনি। তাদের উদাসীনতা আজ আমাদের কাজটা সহজ করে দিল। মিনিট পনেরো বিশেকের চেষ্টার পর দরজাটা হিঞ্জের দিক থেকে খুলে গেল। আরও একটু ঠেলতে মড়মড় শব্দ করে ছিটকিনির দিকের কাঠ কিছুটা ভেঙে উলটোদিক দিয়ে আমাদের ঢোকার মতো দরজা ফাঁক হল।
টাপুরদি প্রথমে ঢুকল ভিতরে, আমি পিছে পিছে ঢুকলাম। সিঁড়িতে ঘুটঘুটে অন্ধকার। টাপুরদিকে অনুসরণ করে পা টিপে টিপে নীচে নামলাম আমরা।
আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘টাপুরদি, আমরা ঘুরে-ফিরে সেই সিংহের গুহাতেই যেচে মাথা গলালাম। এখন যদি সুবিনয়বাবু এখানে না থাকেন?’
‘যদি না থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে আমার ডিডাকশন নিতান্তই বোগাস। আমার গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেওয়া উচিত,’ মৃদু অথচ গম্ভীর গলায় বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে থাকল টাপুরদি। অগত্যা আমিও পিছু নিলাম।
সিঁড়িটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে সামনে কিছুটা প্রশস্ত জায়গা। একদিকের দেওয়ালে অমিয় চক্রবর্তীর রাজনৈতিক জীবনের বেশ কিছু ছবি লাগানো আছে। তার ডান হাতে একটা করিডর গিয়েছে। আগের দিন ওই পথেই আমরা সুনয়নাদেবীর ঘরে গিয়েছিলাম। উলটোদিকের একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল টাপুরদি। আমি জিজ্ঞাসা করতে যেতেই নিজের ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে মুখ বন্ধ রাখতে ইশারা করল। কান পাততে কথাবার্তার মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল। গলার স্বর দুটো যথেষ্ট চাপা হলেও দুটোই পুরুষ কণ্ঠ সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না। দরজার কাছে এগিয়ে গেল টাপুরদি, পিছে পিছে আমি। এবার কথাবার্তার শব্দ কিছুটা পরিষ্কার হল। দুজন পুরুষের মধ্যে চাপা গলায় উত্তেজিত বাগবিতণ্ডা চলছে।
‘পুলিশ সন্দেহ করছে। মেয়েদুটোকে এভাবে আটকে রাখা যাবে না। তা ছাড়া ওরা বোকা নয়, আটঘাট বেঁধেই এসেছে। পুলিশের সঙ্গে ওদের যোগাযোগ আছে।’
‘কিছু করার ছিল না। এই অবস্থায় কোনোরকম রিস্ক নেওয়া যাবে না। ওরা সুবিনয়ের রিলিজ চাইছে পেনড্রাইভের বদলে।’
‘সুবিনয়কে এভাবে আটকে রাখার কোনো মানে হয় না। সুবিনয়কে একটা পদ দিলেই ঝামেলা মিটে যেত।’
‘ঝামেলা যে মিটে যেত সে গ্যারান্টি কে দিত? সুবিনয়? এই রাজনীতিতে কেউ কারও হয় না। সেটা শিখতে আর কত সময় লাগবে তোমার?’
‘এত অবিশ্বাস, এত ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকো কী করে? ক্লান্তি আসে না? নিজের উপর রাগ হয় না? রাজনীতি, ক্ষমতা, লোভ, আরও আরও উঁচুতে ওঠার তৃষ্ণা, আর কত?’
‘রাজনীতিতে আবেগের কোনো জায়গা নেই। নিজের জন্য কেউ কিছু করছে না। মানুষের জন্য লড়াইয়ে যদি নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়, তাতে অন্যায় কিছু নেই।’
‘মানুষের জন্য লড়াই?’ এবার চাপা ব্যঙ্গাত্মক হাসির শব্দ শোনা গেল। তারপর হিসহিসে গলায় বলল, ‘সত্যি মানুষের জন্য এত কাণ্ড করছ? কাকে ঠকাচ্ছ? জনগণকে, আমাকে না নিজেদের? এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার কি কোনো শেষ নেই? আর কত হারাতে হবে এই খেলায়, ভেবে দেখেছ? যে জনতা মাথায় তুলতে পারে, সে ছুড়ে ফেলতেও মুহূর্তের জন্যে দ্বিধা করবে না। আমি আর পারছি না, বিশ্বাস করো। এই খেলা থেকে আমায় রেহাই দাও এবার।’
‘জনতা যাতে আস্থা না হারায়, সেজন্যই এত কিছু করা হচ্ছে। যেভাবেই হোক, এই পেনড্রাইভের কনটেন্ট বাইরে আসা চলবে না।’
‘ওই পেনড্রাইভে যা আছে তা অতীত। একটা পুরানো পাপকে ঢাকার জন্য একটার পর একটা পাপ ঘটে চলেছে। ছি ছি, এ মানা যায় না। তোমাদের এই অন্যায়কে মেনে নিয়ে আমিও এই পাঁকে ডুবে চলেছি। আমি আর নিতে পারছি না।’
‘নিতে তো হবেই। ভুলে যেয়ো না, আইনের চোখে তুমিও সমান অপরাধী। পালানোর উপায় নেই তোমার।’
‘না, আমি অপরাধী নই। শুধু ষড়যন্ত্রের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছি। কিন্তু আর পারছি না আমি, আর পারছি না।’
ভিতরে খচমচ শব্দ শোনা গেল। চাপা গলায় আরও কিছু কথা হল যা আমাদের কর্ণগোচর হল না। টাপুরদি হঠাৎ আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিল। দেয়ালে পিলারের পেছনে দাঁড়াতেই অন্ধকারে দেখলাম ঘরের দরজা খুলে গেল। দরজা দিয়ে যে ব্যক্তি বেরিয়ে এলেন তাঁকে আমরা ভালোভাবেই চিনি। তিনি মনোময় মজুমদার। গটগট করে হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন মনোময়বাবু। সেদিকে তাকিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অপরজন কে টাপুরদি?’
‘চিনতে পারলি না? অম্লানবাবু।’
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অম্লানবাবু মনোময়বাবুকে দিয়ে জোর করে এসব করাচ্ছেন? তার মানে অমিয়বাবুকে হত্যা করার পেছনেও অম্লান চক্রবর্তীর হাত আছে?’
অন্ধকারেও টাপুরদির হাসি চোখ এড়াল না আমার। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হাসছ যে?’
‘হাসছি, কারণ তুই শুধু কথাগুলোই শুনেছিস। কণ্ঠস্বর দুটো চিনতে পারিসনি,’ বলল টাপুরদি।
‘মানে?’ আমার বিস্মিত জিজ্ঞাসা।
‘মানে হল তুই যা ভাবছিস, ব্যাপারটা তার ঠিক উলটো। তবে এখন আর কথা নয়। পরে সব বুঝিয়ে বলব। এখন ঠিক সময় নয়,’ বলে চুপ করে গেল টাপুরদি।
জানি এখন আর টাপুরদিকে কিছু জিজ্ঞাসা করে কোনো লাভ নেই, উত্তর পাব না। আর এখন সেই পরিস্থিতিও নেই। কিন্তু ব্যাপারটা উলটো, একথার মানে কী? মনোময়বাবু অম্লান চক্রবর্তীকে দিয়ে এসব করাচ্ছে? তাহলে কি মনোময়বাবুই এই সব কিছুর পেছনে আসল মুখ? যাক গে, সেসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে।
ডান দিকের করিডর দিয়ে আমরা আগের দিনও গিয়েছি। এদিকটা আমাদের চেনা। আগের দিনই দেখেছিলাম, করিডরের প্রথমে একটা ছোট স্টাডি মতো ঘর রয়েছে। এর পাশেই ঠাকুরঘর। একদম শেষে সুনয়নাদেবীর ঘর।
‘সুবিনয়বাবু কোথায় থাকতে পারেন টাপুরদি? এখানে তো এই ক’টাই ঘর? তাহলে কি নীচের তলায় কোন ঘরে আটকে রাখা হয়েছে ভদ্রলোককে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নীচে একটা শোরগোলের শব্দ শোনা গেল। দ্রুতপদে দোতলার করিডরে শেষ প্রান্তের জানালা দিয়ে উঁকি দিল টাপুরদি, সঙ্গে আমিও। নীচে কিছু লোককে টর্চ হাতে ছোটাছুটি করতে দেখা গেল। টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম আমি। সিঁড়িতে লোকজনের পায়ের শব্দ শোনা গেল।
টাপুরদির মুখে উত্তেজনার চিহ্ন স্পষ্ট। ফিসফিসে স্বরে বলল, ‘আমাদের খুঁজছে। ওরা জেনে গেছে যে আমরা পালিয়েছি।’
৬৩
হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে টাপুরদি ছুটে ঢুকল সামনের ঠাকুরঘরে। ভিতর থেকে দরজাটা ভেজিয়ে দিল, আলো জ্বালল না। ঘরটি প্রস্থে বেশ চওড়া, দৈর্ঘ্য অপেক্ষাকৃত অনেকটাই কম। মারবেলের মেঝে, কাঠের টাইলস লাগানো দেওয়ালে। সিলিং থেকে ঝুলছে একটা বেশ ছিমছাম সুন্দর ঝাড়বাতি। অন্ধকারে অন্দরসজ্জা খুব বেশি চোখে পড়ছে না। ঘরের ভিতরে ধূপের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। অন্য সময় হলে এমন সুন্দর গন্ধে হয়তো মনটা শান্ত হয়ে আসত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্যরকম। বুকের ভিতরে দামামা পিটছে। হৃৎযন্ত্রের লাবডুব বাইরে থেকে শুনতে পাচ্ছি। এরা যেমন ভয়ংকর মানুষ, ধরা পড়লে দুটো নিরস্ত্র মেয়েকে খতম করে লাশ গায়েব করে দিতে খুব বেশি অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।
ঠাকুরের সিংহাসনটি ঘরে ঠিক মাঝ বরাবর প্রতিষ্ঠিত। মার্বেলের উপর কারুকার্য করা বড়োসড়ো আকারের সিংহাসন, ভিতরে ঠাকুরের মূর্তি অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না। ঘরটা দৈর্ঘ্যে কম হওয়ায় সামনে বসে পুজো করার জায়গাটা বেশ কম। সিংহাসনটা আরেকটু পিছিয়ে বসালে আরেকটু জায়গা বেরোত, এই ব্যাপারটা যে কেন কারও মাথায় আসেনি, সেটাই আশ্চর্য! যাই হোক, এতে আমাদের কিছুটা সুবিধেই হল। টাপুরদি আর আমি সিংহাসনের পেছনে গিয়ে বসলাম। তেমন সুরক্ষিত জায়গা নয় বটে, অন্তত এখানে আমাদের খুঁজতে এলে সহজেই খুঁজে পাবে। তবু এই মুহূর্তে এখানে লুকোনো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। অতএব সিংহাসনের পেছনে গুটিসুটি মেরে বসলাম। টাপুরদি কিন্তু বসল না। বরং আমার পাশে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল।
‘কী হল টাপুরদি? বসে পড়ো। কেউ এসে গেলে ধরা পড়ে যাবে তো!’ বললাম আমি।
‘ধরা তো পড়তেই হবে ডার্লিং। ওরা ধরতে না পারলে নিজেদেরই ধরা দিতে হবে,’ মৃদুস্বরে হেসে বলল টাপুরদি।
‘ধরা দেবে? সে কী? ধরা পড়লে আর বেঁচে বেরোতে পারব না এই বাড়ি থেকে। যা সব ভয়ংকর লোকজন এখানে! তুমি প্লিজ এসব অলক্ষুণে কথা বলে আমার হার্ট রেট বাড়িয়ে দিয়ো না।’
টাপুরদি এখনও বসেনি। বরং খুব মন দিয়ে সিংহাসনের পেছনটা হাতড়ে হাতড়ে দেখছে।
‘কী খুঁজছ এখানে বলো তো?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘এই ঘরটা দৈর্ঘ্যে এত ছোটো কেন? ভেবে দেখ মিতুল। এর পাশের ঘরটাই সুনয়নাদেবীর শোওয়ার ঘর, যেখানে আমরা সেদিন গিয়েছিলাম। সেটা তো বেশ লম্বা, ওদিকের স্টাডিরও দৈর্ঘ্য প্রস্থের চেয়ে অনেকটাই বেশি। তাহলে এটার দৈর্ঘ্য এত কম কেন? অথচ পেছন দিকে তো দেওয়াল সরলরেখা বরাবরই গিয়েছে,’ চিন্তান্বিত স্বরে বলল টাপুরদি।
‘তাহলে?’ আমার সংক্ষিপ্ত জিজ্ঞাসা।
‘তাহলে জটায়ুর ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় হাইলি সাস্পিশাস’, বলল টাপুরদি। একমাত্র টাপুরদিই পারে এ-রকম দমবন্ধ উত্তেজনার মধ্যে দাঁড়িয়ে জটায়ু আওড়াতে। টাপুরদি পেছনের দেয়ালে হাত বুলিয়ে কিছু খুঁজছে। আমার আর এসব এখন ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে এখান থেকে বেরোতে পারলে বাঁচি। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, আমি টাপুরদির মতো অত সাহসী নই। এখন, এই মুহূর্তে খুব ভয় করছে আমার। এই প্রাক গ্রীষ্মেও শরীরে শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
ঠাকুরের সিংহাসনের গায়ে সেঁটে বসলাম আমি। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পা সিংহাসনের পাশের দিকের কারুকার্য করা অংশে ঠেকে গেল। হাত বাড়িয়ে প্রণাম করতে যাব, ঠিক তখনই অনুভব করলাম, সিংহাসনের সেই অংশটা যেন নড়ে উঠল। একটু চমকে উঠলাম। আমার মনের ভুল কি না বোঝার জন্য আবার হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলাম জায়গাটা। না সত্যিই নড়ছে। চাপ পড়তেই শ্বেতপাথরে কারুকার্য করা স্ল্যাবের গা থেকে ইঞ্চি দুয়েকের বর্গাকার অংশ দেবে গিয়ে ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে।
‘টাপুরদি, এদিকে দেখো। তাড়াতাড়ি এসো,’ উত্তেজিত স্বরে ডাকলাম আমি।
টাপুরদি এগিয়ে এসে নীচু হয়ে বসল। জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে রে?’
আমি ব্যাপারটা দেখালাম টাপুরদিকে। টাপুরদি সেখানে হাত বুলিয়ে উত্তেজিত স্বরে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘ব্র্যাভো!’
তারপর হাত দিয়ে জোরে চেপে ধরল সিংহাসনের বর্গাকার অংশটা। একটা খুব হালকা খস খস শব্দ করে পেছনের দেয়ালের কাঠে টাইলসের একটা অংশ সরে গেল ধীরগতিতে। লাফ দিয়ে টাপুরদি এগিয়ে গেল সেই দিকে। আমিও এগোলাম পিছনে পিছনে। পেছনে একটা ছোট্ট কুঠুরি মতো অন্ধকার জায়গা। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না। আমি পায়ে পায়ে ফিরে এলাম ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে। বেশি খুঁজতে হল না। সামান্য হাতড়াতেই হাতে এল বস্তুটি, একটি দেশলাই বাক্স। সেটা নিয়ে গিয়ে টাপুরদির পাশে দাঁড়িয়ে একটা কাঠি বের করে জ্বালালাম। মুহূর্তের মধ্যে ঘরটি হালকা আলোয় ভরে উঠল। সেই আলোয় দেখলাম। ঘরের মেঝেতে মুখ, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছেন সুবিনয় মুখার্জি। চোখ বন্ধ, সম্ভবত মূর্ছিত।
‘টাপুরদি…’ চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলাম আমি।
‘শশশশশ…’ টাপুরদি সাবধান করল আমায়। সুবিনয় মুখার্জির হাতের কবজিটা ধরে পালস চেক করল, তারপর বুকে কান ঠেকিয়ে হৃৎস্পন্দন শুনে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠাকুরের আসনের সামনে খুঁজে দেখ তো মিতুল, জল পাস কি না। জল না থাক, অন্তত গঙ্গাজলের শিশি তো ঠাকুরঘরে অবশ্যই থাকবে। খুঁজে দেখ। পেলে নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি।’
টাপুরদির অনুমান ঠিক। একটা নয়, দুটো গঙ্গাজলের ছোটো বোতল রাখা ঠাকুরের সিংহাসনের পাশে। একটার সিল খোলা, অপরটা বন্ধ। দুটোই হাতে নিয়ে ছুটে গেলাম টাপুরদির কাছে।
জলের ছিটে বেশ কয়েকবার দিল টাপুরদি। সুবিনয়বাবুর জ্ঞান ফেরার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। রীতিমতো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ভদ্রলোক। দেশলাই কাঠির স্বল্প আলোতে টাপুরদির মুখের হতাশার রেখাগুলো লুকোনো যাচ্ছে না।
হঠাৎই বাইরে লোকজনের কথাবার্তার শব্দ শোনা গেল। শব্দটা এদিকেই এগিয়ে আসছে। টাপুরদি আর আমি দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকালাম। জানি না কেন, টাপুরদিকে তেমন চিন্তিত মনে হল না আমার। টাপুরদির মনের ভিতর কী চলছে তা টাপুরদিই জানে। কিন্তু আমার মনের অবস্থা বলার মতো নয়। হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে। টাপুরদির পাশে ঘেঁষে দাঁড়ালাম।
‘ভয় করছে?’ নিষ্কম্প স্বরে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
শুধু মাথা নাড়লাম, কথা বলতে গেলে গলার স্বর যদি না বেরোয় সেই ভয়ে।
টাপুরদি বলল, ‘তুই এখানে থাক। আমি দেখছি।’
আমি বললাম, ‘দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলে ওরা আর এখানে ঢুকতে পারবে না টাপুরদি।’
‘কতক্ষণ? দরজা ভেঙে ঢুকতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয় ওদের। আর তা ছাড়া অপরাধীকে ধরতে হলে আজ ওদের কনফ্রন্ট করতেই হবে মিতুল,’ শান্ত কণ্ঠে বলল টাপুরদি।
‘তোমার ভয় করছে না টাপুরদি?’ বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে এই পরিস্থিতিতেও জিজ্ঞাসা করেই ফেললাম।
ক্ষণিক নীরবতা। তারপর টাপুরদি মাথা নেড়ে মৃদুকণ্ঠে বলল, ‘করছে।’
৬৪
‘পেনড্রাইভটা আমাদের চাই,’ গম্ভীর গলায় বললেন মনোময় মজুমদার, যিনি এই মুহূর্তে আমাদের সামনে একটা কাঠের টুলের উপরে বসে আছেন। আমার আর টাপুরদির দুই পাশে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দুইজন মুসকো মতো লোক দাঁড়িয়ে।
‘পেনড্রাইভটা দিতে আমার আপত্তি নেই, সে তো আগেই বলেছি,’ অকম্পিত কণ্ঠে বলল টাপুরদি, ‘দেখুন, ওই পেনড্রাইভ আমার কোনো কাজে লাগবে না। পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে আমি আগ্রহী নই মোটেই। আমার শর্তও আমি আগেই বলেছি। সুবিনয়বাবুকে নিয়ে এখান থেকে সুরক্ষিতভাবে বেরিয়ে যাব আমরা। পেনড্রাইভ আপনি পেয়ে যাবেন।’
‘এখান থেকে বেরোনোর পর পেনড্রাইভ যে আমি হাতে পাব, তার নিশ্চয়তা কোথায়? অম্লান এতে কখনো রাজি হবে না,’ বললেন মনোময়বাবু।
‘বাজে কথা রাখুন মশাই,’ সামান্য বিরক্ত স্বরে বলল টাপুরদি, ‘অম্লানবাবু? হাসালেন আপনি। অম্লানবাবুর এসবের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, সে আমি ভালোমতোই জানি। তিনি আপনাদের হাতের পাপেট ছাড়া আর কিছু নন। কোথায় তিনি এখন? আপনার লোকদের দিয়ে নিশ্চয়ই তাঁকে ঘরে পাহারায় রেখেছেন, যাতে তিনি এসবের মধ্যে না এসে পড়েন? এসব গল্প আমায় শোনাতে আসবেন না। যাই হোক, আপনাদের পেনড্রাইভ চাই, আর আমার চাই সুবিনয়বাবুকে। আমাদের সুবিনয়বাবুকে নিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে দিন, পেনড্রাইভ আমি নিজে এনে দেব আপনার হাতে।’
খুক খুক করে হাসলেন মনোময়বাবু। এই প্রথমবার ওঁকে আমি হাসতে দেখলাম। বললেন, ‘আমায় এত বোকা ভাবেন টিকটিকি ম্যাডাম? এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে পেনড্রাইভ আপনি এনে দেবেন তার গ্যারান্টি কী? আর তা ছাড়া আপনারা বড়ো বেশি জেনে ফেলেছেন। এই অবস্থায় আপনাদের আমি ছেড়ে দিতে পারি না, তাই না?’
‘সে আপনার ব্যাপার। তবে আপনাকে আগেও বলেছি, আমরা সময়মতো ফিরে না গেলে আপনারাও বাঁচবেন না। পুলিশ জানে আমরা এখানে এসেছি,’ বলল টাপুরদি।
‘কিচ্ছু প্রমাণ করতে পারবেন না। আপনি বোধ হয় ভুলে যাচ্ছেন, অম্লান এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছে, সঙ্গে পুলিশমন্ত্রীও। সুতরাং পুলিশ প্রশাসন সব ওরই হাতে,’ বললেন মনোময়বাবু।
‘তা আমি জানি মনোময়বাবু। কিচ্ছু ভুলিনি,’ হেসে বলল টাপুরদি, ‘কিন্তু আমরা না ফিরলে পেনড্রাইভের কন্টেন্ট যখন দেশের সমস্ত নিউজ চ্যানেলে টেলিকাস্ট হবে, তখনও অম্লানবাবু মুখ্যমন্ত্রী বা পুলিশমন্ত্রী থাকবেন তো? তা যাক গে, সেসব আপনাদের ব্যাপার। আমার কিছু হারানোর নেই। আর মরতে আমি ভয় পাই না। কিন্তু আপনাদের অনেক কিছু হারানোর আছে এই মুহূর্তে। এবার আপনারা কী করবেন, নিজেরাই ভেবে দেখুন। দরকার হলে আপনার বসের সঙ্গে আলোচনা করে আমায় জানান। আমি অপেক্ষা করছি।’
মনোময়বাবু জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকালেন আমাদের দিকে। তারপর বললেন, ‘এখানে আমার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। আমার কোনো বস নেই টিকটিকি ম্যাডাম। আপনি ঠিক বলেছেন, অম্লান আমার হাতের পুতুল। আমি ওকে বানিয়েছি। আমায় ছাড়া অম্লানের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা আমার সাম্রাজ্য। আর এখানে সেটাই হয় যা আমি চাই। আপনি মরতে ভয় পান না, খুব ভালো কথা। কিন্তু আপনার সহচরীটি? সেও বুঝি অকুতোভয়?’
টাপুরদি স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল মনোময়বাবুর মুখের দিকে। মনোময়বাবুর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা খেলে গেল। সে হাসি বড়ো নিষ্ঠুর। তিনি এবার বললেন, ‘আপনার এই অ্যাসিস্ট্যান্টটি বরং আমাদের জিম্মায় থাকুক। আপনি গিয়ে পেনড্রাইভ নিয়ে আসুন। আমাদের হাতে তুলে দিন। একে নিয়ে যান।’
টাপুরদি হাসল। বলল, ‘আপনার বোধ হয় টেকনিক্যাল নলেজ একটু কম, তাই না মনোময়বাবু? তাই এমন বোকার মতো কথা বলছেন। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে আমি আপনার হাতে পেনড্রাইভটা তুলে দিলাম, তাহলেও আমি যে সেটার কপি নিজের কাছে রাখব না সেটা কী করে ভাবলেন? আমি সেটাকে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করব। মিডিয়ার হাতে তুলে দেব। জনগণের প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে ভাবতে পারছেন? এটা গণতন্ত্র মশাই। যে জনতা সরকারে আপনাদের এনেছে, তারাই টান মেরে আপনাদের উপড়ে ফেলতে দ্বিধা করবে না। ’
‘সে যাই হোক, আপনাদের সরকারে থাকা না থাকা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। লঙ্কায় যে যায়, সেই রাবণ। আমি শুধু সুবিনয়বাবুকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে এসেছি। আমাদের যেতে দিন, আমি কথা দিচ্ছি পেনড্রাইভের কন্টেন্ট সব ডিলিট করে দেব। যা গোপন ছিল, তা গোপনই থাকবে। দেখুন মনোময়বাবু, আপনাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই। আমি একা মানুষ, যা রোজগার করি তাতে আমার দিব্যি চলে যায়। তাই ব্ল্যাকমেল করে টাকাপয়সা বা ক্ষমতা পাওয়ার অভিসন্ধিও নেই। আমি এখানে সুবিনয়বাবুকে নিতে এসেছি। সুবিনয়বাবুকে নিয়ে চলে যাব। আপনাদের যা দরকার সেটা আপনারা পেয়ে যাবেন। আপনাকে আমার উপর ভরসা করতেই হবে। তা ছাড়া আপনার কাছে আর কোনো অপশন নেই,’ কেটে কেটে বলল টাপুরদি।
মনোময়বাবু কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘সুবিনয়কে ছাড়া যাবে না। আপনারা চলে যান, আপনাদের কেউ আটকাবে না।’
টাপুরদি নিঃশব্দে হাসল। বলল, ‘আপনারা না একদম হোমওয়ার্ক করেন না। আমার সম্পর্কে খবরাখবর ঠিকঠাক করে নেননি দেখছি। কেউ আপনাদের বলেননি যে সংঘমিত্রা ব্যানার্জি খুব জেদি। আমার বক্তব্য জানিয়েছি। আপনারা, মানে আপনি আর আপনার বস এখন আলোচনা করে আপনাদের সিদ্ধান্ত জানান। আমার আর কিছু বলার নেই।’
উঠে দাঁড়ালেন মনোময়বাবু। বাঘের মতো মুখটা রাগে গনগন করে জ্বলছে। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘বেশি বাড় বেড়েছে তোর দুই পয়সার টিকটিকি। তোর মতো অনেককে পায়ের তলায় পিষে মেরেছে এই মনোময় মজুমদার।’
টাপুরদি হি-হি করে হেসে বলল, ‘সে আপনি যতই ক্রেডিট নেওয়ার চেষ্টা করেন মনোময়বাবু, আমি জানি আপনার মাথার উপর আসল ছড়িটা কে ঘোরান। তাই আর বাজে না বকে এক কাজ করুন, তাঁকেই বরং ডাকুন। বাকি কথাবার্তা তাঁর সঙ্গেই সেরে নিই। এই ভায়া হয়ে কথা বলাটা আমার নাপসন্দ। আর ডাকার বোধ হয় দরকার নেই, তিনি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আমাদের সব কথা শুনতে পাচ্ছেন। তাঁর পানমশলার গন্ধটা বড্ড উগ্র, সহজেই তাঁর উপস্থিতি জানান দেয়।’
চমকে উঠে দরজার দিকে তাকালাম আমি। দরজার বাইরে কে আছে? কে মনোময়বাবুর এই বস? টাপুরদি কীভাবে জানল যে তিনি দরজার বাইরেই রয়েছেন, আমি তো টের পাইনি। পানমশলার গন্ধ? এতক্ষণে গন্ধটা আমিও পেলাম। এই গন্ধ আমার চেনা, অথচ এতক্ষণ এই সম্ভাবনার কথাটা মাথাতেই আসেনি আমার।
