১০
ইউনিকর্ন থেকে বেরিয়ে ঘড়ি দেখল টাপুরদি। তারপর বলল, ‘চল মিতুল, লাঞ্চটা বরং বাইরেই সেরে নেওয়া যাক।’
সিটি সেন্টারের ফুড কোর্টে বসে চাউমিন আর চিলি চিকেন খেতে খেতে বললাম, ‘তুমি ভদ্রলোককে বেশ কড়কে দিয়েছ, টাপুরদি।’
টাপুরদি গরম থুকপা চামচে তুলে মুখে দিয়ে বলল, ‘না রে, সুবিনয় মুখার্জি ভীষণ প্রফেশনাল লোক, আর তেমনই বুদ্ধিমান। এ-রকম প্রতিপক্ষ পেলে লড়েও সুখ।’
‘লোকটা কী ভীষণ হ্যান্ডসাম টাপুরদি, দেখে মনে হয় হলিউড হিরো। প্রথমবার দেখে আমার মাথা ঘুরে গিয়েছিল পুরো,’ হেসে বললাম আমি।
‘সেটা ঘরে ঢোকার পর তোর মুখের ভেবলে যাওয়া দশা দেখে শুধু আমি কেন, সুবিনয় মুখার্জি নিজেও বুঝেছেন। যা ড্যাবড্যাব করে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে ছিলি। তবে ভদ্রলোক বোধ হয় মহিলাদের চোখে মুগ্ধতা দেখে অভ্যস্ত। আর তোর জ্ঞাতার্থে জানাই, সুবিনয় মুখার্জির মা ছিলেন ডাচ। পরবর্তীতে ডিভোর্স করে ও দেশেই থেকে যান উনি। সুবিনয়বাবুর বাবা ছেলেকে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। তার উপর উনি স্পোর্টসম্যান। তাই তোর ওঁকে হলিউড হিরো বলে মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়,’ বলল টাপুরদি।
‘বাপ রে, তুমি সুবিনয় মুখার্জির এত ঠিকুজিকুষ্ঠি জানলে কী করে?’ চিকেনে কামড় বসিয়ে বললাম আমি।
‘চোখ-কান খোলা রাখতে হয় বাছা। সুবিনয়বাবুর ফ্যামিলি বেশ বিখ্যাত, তিন প্রজন্মের ব্যবসায়ী ওরা সে তো শুনলিই। এ ছাড়াও আরও অনেক রকম ব্যাবসা আছে। সুবিনয় মুখুজ্জেকে কিন্তু গুগলবাবুও চেনেন। একটু সার্চ করলে অনেক তথ্য তুইও পেয়ে যেতিস। বাকিটা জেনেছি রূপমের কাছে,’ বলল টাপুরদি।
‘আচ্ছা, বুঝলাম,’ বলে খাওয়াতে মন দিলাম। টাপুরদির খাওয়া হয়ে গেছে। বসে বসে মোবাইলে খুটখাট করছিল। এমন সময় ফোনটা বাজতে শুরু করল। তাকিয়ে দেখলাম টাপুরদির ভুরুতে ভাঁজ। ফোন তুলে গম্ভীর গলায় বলল, ‘হ্যালো!’
ওদিক থেকে কে কথা বলছে বোঝা না গেলেও ফোনটা কানে নিয়ে টাপুরদির মুখের ভাবে পরিবর্তন লক্ষ করলাম। ফোন রাখতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কার ফোন, টাপুরদি?’
‘সনকাদেবী,’ বলল টাপুরদি।
‘সে কী গো? সেদিন তো আমাদের প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিলেন। আজ নিজে থেকে ফোন করেছেন, কী ব্যাপার?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘ভদ্রমহিলা বোধ হয় স্বামীকে খুব ভয় পান, বুঝলি? ভাইয়ের প্রতি টান আছে। কিন্তু সম্ভবত সনকাদেবীর হাজব্যান্ড তন্ময়কে পছন্দ করে না। কারণ বোধ করি ওদের ফ্যামিলি হিস্ট্রি,’ বলল টাপুরদি।
‘তো আজ কী বলতে ফোন করেছিলেন?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ কর। গড়িয়া যেতে হবে,’ টাপুরদি বলল।
‘গড়িয়া? গড়িয়ায় আবার কী আছে?’ চিলি চিকেনের শেষ টুকরোটা মুখে ঢোকাতে ঢোকাতে জিজ্ঞাসা করলাম।
‘সনকাদেবী জানালেন, তাঁর মায়ের এক খুব কাছের বান্ধবী গড়িয়াতে থাকেন। যখন তাঁর বাবার সঙ্গে মায়ের সমস্যা চলছিল, তন্ময় তখন খুব ছোটো। মাঝে মাঝে অশান্তি চরমে উঠলে বাড়ি ছেড়ে তন্ময়কে নিয়ে সেই বান্ধবীর বাড়িতে চলে যেতেন তাঁর মা। মেয়েকেও নিয়ে যেতে চাইতেন। সনকাদেবী মাকে ঘৃণা করতেন, তাই যেতেন না সঙ্গে। যাই হোক, যেটা কাজের কথা সেটা হল, সেই সময় তিনি দেখেছিলেন, তন্ময় তার মায়ের সেই বন্ধুর খুব ন্যাওটা ছিল। পরেও যখন সনকাদেবী তাকে বোর্ডিংয়ে রেখে আসেন, তখনও ছুটিছাটাতে তন্ময় সেই ভদ্রমহিলার বাড়িতেই গিয়ে থাকত মাঝেমধ্যে। তিনিও খুব স্নেহ করতেন তন্ময়কে।’
‘আচ্ছা টাপুরদি, তন্ময়ের ফোন লোকেশন ট্রেস করা হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা করলাম।
টাপুরদি আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন ভস্ম করে দেবে। বলল, ‘এত কাণ্ড করে হন্যে হয়ে কাল জামশেদপুর, আজ গড়িয়া করছি সে কি ফোন ট্রেস না করে? কী আশ্চর্য! আর তোর এতদিনে মনে হল ফোন লোকেশন ট্রেস করার কথা? মিতুল, কাল থেকে রাতে রোজ একশোটা করে অঙ্ক করবি। তোর গ্রে ম্যাটারগুলো দিনে দিনে অকেজো হয়ে যাচ্ছে। তন্ময়ের ফোন অনেকদিন থেকেই সুইচড অফ।’
সিটি সেন্টারের আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে গাড়ি বার করে বিশ্ববাংলা সরণি দিয়ে আমরা ছোটালাম। টাপুরদির ফোনটা বাজছে। গাড়ি ড্রাইভ করার সময় ফোন ধরে না টাপুরদি। একটু থেমে আবার বাজতে শুরু করল। তারপর আবার থেমে গেল। এবার শুনলাম পিক পিক করে মেসেজ ঢুকছে। আমায় বলল, ‘দেখ তো কার মেসেজ!’
টাপুরদির ব্যাগ থেকে ফোনটা বার করে দেখলাম অর্জুনদার ফোন। মেসেজও অর্জুনদার। অমিয় চক্রবর্তীর যে সমস্ত জিনিসপত্র সিজ করা হয়েছিল, তার মধ্য থেকে ফ্লাস্কে ও কাপের চায়ে বিষ ছিল, বাট্রাকোটক্সিন। টাপুরদিকে খবরটা বলতে ওর মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখলাম না। সামনে রাস্তার দিকে চোখ রেখে বলল, ‘সেটাই তো স্বাভাবিক। বন্ধ ঘরে আর কোথা থেকে বিষ আসবে, যদি না সেটা আগে থেকেই কেউ অমিয়বাবুর খাবারে মিশিয়ে দিয়ে যায়? পুলিশ নিশ্চয়ই ক্যান্টিনের ছেলেটাকে ধরেছে?’
‘তাই হবে। ছেলেটাকে ধরে কড়কে দিলে কথা বের হবে,’ আমি বললাম।
‘ছাই হবে। যে বা যারা হবু মুখ্যমন্ত্রীকে মারার মতো দুঃসাহস দেখায়, তারা অমন প্রমাণ রেখে কাজ করবে বলে তোর মনে হয়? ছেলেটাকে দিয়ে যদি বিষ মেশাত, তাহলে ছেলেটাকেও আর এতদিন বাঁচিয়ে রাখত না।’
‘কে মারতে পারে বলো তো অমিয়বাবুকে? তোমার কী মনে হয় টাপুরদি,’ জানতে চাইলাম আমি।
‘কী করে বলি বল তো? তবে, এত বছর ধরে রাজনীতি করছেন, শত্রুর তো অভাব থাকার কথা নয়। যেমন ধর, বিরোধী নেতা তথা আমাদের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোস। গত ষোলো বছর ধরে গদিতে বসে আছেন তিনি। এবার গদি ছাড়তে হল। খুব খুশি তো হওয়ার কথা নয়। অথচ তিনি অমিয়বাবুর মৃত্যুর দিন বিকেলে তাঁর অফিসে নিজে গিয়েছিলেন শুভকামনা জানাতে। সুবিনয়বাবুর মুখে তো শুনলিই বিনয় বোসের সেক্রেটারি সঞ্জয় পাল তাঁর ক্লায়েন্ট ছিলেন। আদতে সঞ্জয় পাল তো পাপেট, আসল কলকাঠি ছিল বিনয় বোসের হাতে। মানে সুবিনয়বাবুর আসল ক্লায়েন্ট হলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোস।
‘তারপর ধর, দলের মধ্যে ইদানীং একটু টেনশন তৈরি হয়েছিল বলে শুনেছি। অমিয়বাবু যেভাবে মিনিস্ট্রি সাজিয়েছিলেন, সেটা নিয়ে দলের মধ্যেই অসন্তাোষ তৈরি হয়েছিল। এইসব বিক্ষুব্ধ এমএলএ-দের মধ্যে বিশেষ করে বলতে হলে বলা যায় সনাতন বিশ্বাসের নাম। কোlত্রদ্ধ মিনিস্ট্রি না পাওয়ায় তিনি নাকি আরও কিছু এমএলএ-দের একত্র করে দল ছেড়ে বেরিয়ে আসার প্ল্যান করছিলেন। ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি নাকি বলেছিলেন, অমিয়বাবুকে উচিত শিক্ষা দেবেন তিনি। সেদিন কিন্তু তিনিই শেষ ব্যক্তি যিনি অমিয়বাবুর ঘরে ঢুকেছিলেন হুমকি দিতে,’ বলল টাপুরদি।
‘উরিববাস, তুমি তো ঘরে বসেই কেস গুছিয়ে ফেলেছ দেখছি। এত তথ্য পেলে কোথা থেকে? অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর তদন্তের হাল-হকিকত তো পুলিশ গোপন রেখেছে, প্রেস মিডিয়াকে জানাচ্ছে না। কিন্তু তুমি তো সবই জানতে পারছ দেখছি,’ হেসে বললাম আমি।
টাপুরদি হাসল, কিছু বলল না। ভালো করেই জানি ভিতরের খবরগুলো কে সরবরাহ করছে টাপুরদিকে।
‘একটা ব্যাপারে একটু খটকা লাগছে টাপুরদি। খবরে শুনেছি, সেদিন অমিয়বাবু সন্ধের পর অফিসের সকলকে ছুটি দিয়েছিলেন। এমনকী সিকিউরিটির লোকেদেরও চলে যেতে বলেছিলেন অফিস ছেড়ে। আর সেদিনই তিনি খুন হলেন। এটা কেন?’
টাপুরদি এবারেও চুপ করে রইল। মনে হল টাপুরদি নিজেও ভাবছে এই বিষয়ে। একটু পরে মেন রোড থেকে একটা গলিতে গাড়ি ঢুকিয়ে কিছুটা এগিয়ে বাঁ-দিকে একটা বাড়ির সামনে গাড়িটা দাঁড় করাল। বলল, ‘নাম মিতুল, আমরা এসে গেছি।’
১১
কলিংবেল বাজিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। আবার বেল বাজাল টাপুরদি। এবারও কেউ দরজা খুলল না।
‘বাড়িতে কেউ নেই বোধ হয়!’ বললাম আমি।
‘আছে,’ টাপুরদির সংক্ষিপ্ত উত্তর। বলতে বলতেই একটি অল্পবয়সি মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল। আমাদের দেখে বোধ হয় একটু বিস্মিত হল। জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকে চান?’
টাপুরদি উত্তর দিল, ‘রেখা মজুমদারের বাড়ি তো এটা? আমরা ওঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।’
মেয়েটি বলল, ‘জুতোটা বাইরে খুলে ভিতরে এসে বসুন আপনারা। মাসিমার শরীর ভালো নেই। শুয়েছেন। আমি ডাকছি।’
মেয়েটি ভিতরে চলে গেল। আমরা সোফার উপর বসে রইলাম। ছোট্ট ফ্ল্যাট, ছিমছাম গোছানো। দেওয়ালে একজন কমবয়সি ভদ্রলোকের মালা পরানো ছবি। মালা বদলানো হয়নি অনেকদিন, ফলে শুকিয়ে হলদে হয়ে গেছে। দরজার পাশে একটা শুর্যাক রাখা। ঘরে একটা পুরোনো আমলের বক্স টিভি। ঘরের দক্ষিণ দিকে ছোট্ট একটা ব্যালকনি, তাতে নাইলনের দড়িতে কিছু কাপড়চোপড় মেলা। মেয়েটি সম্ভবত রেখাদেবীর পরিচারিকা।
মিনিট পাঁচেক পরে যিনি বেরিয়ে এলেন, তাঁর বয়স ষাট-পঁয়ষট্টি হবে। তাঁকে দেখেই অসুস্থ মনে হল। ধরা গলায় বললেন, ‘আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না!’
টাপুরদি আমাদের পরিচয় দিল। বলল, ‘আপনি বোধ হয় অসুস্থ। আপনাকে বিরক্ত করতে খারাপ লাগছে। বেশি সময় নেব না।’
রেখাদেবী সোফায় বসলেন। মনে হল, বসতে কষ্ট হল তার। একটু হাঁফ নিয়ে একটু ধরা গলায় বললেন, ‘কোমরের ব্যথাটা পূর্ণিমা অমাবস্যায় বাড়ে। তখন কষ্ট হয়। আর ঠান্ডা লেগে একটু জ্বর মতো এসেছে। তেমন কিছু না। আসলে আমার একটু বেশিবার স্নান করার স্বভাব তো, তাই। যাক গে, বলো, আমি তোমাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’
টাপুরদি বলল, ‘আপনি অনামিকা রায়কে চেনেন?’
‘অনামিকা?’ রেখাদেবী ভুরু কোঁচকালেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, চিনব না কেন? অনামিকা আমার ছোটোবেলার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল।’
‘অনামিকাদেবী সম্পর্কে তাহলে তো আপনি সবই জানেন। তাই না?’
‘হ্যাঁ, ওর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ওর জীবনের সব কিছু আমি জানি। ও আমার কাছে কিছু গোপন করত না,’ রেখাদেবীর মুখের রেখাগুলি কোমল হয়ে এল।
‘আমরা আপনার কাছে অনামিকাদেবী সম্পর্কে জানতে চাই। আসলে আমরা তন্ময়ের খোঁজ করছি।’ বলল টাপুরদি।
‘কী জানতে চান বলুন। তার আগে বলুন তো ব্যাপারটা কী? আজ এতদিন পরে হঠাৎ অনামিকার সম্পর্কে জানার দরকার পড়ল কেন?’ জিজ্ঞাসা করলেন রেখাদেবী।
‘তন্ময়কে চেনেন তো আপনি?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
‘ও মা, তন্ময়কে কেন চিনব না? অনেকদিন ধরে দেখাসাক্ষাৎ হয় না ছেলেটার সঙ্গে। তবে ফোন-টোন করে মাঝে মাঝে।’
‘শেষ কবে ফোন করেছে আপনাকে?’
রেখাদেবী সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন একটু। তারপর বললেন, ‘তাও মাস দুয়েক হবে।’
‘এর পরে আর তন্ময়ের সঙ্গে দেখা বা কথা হয়নি আপনার?’ জানতে চাইল টাপুরদি।
‘না, হয়নি।’ জোর দিয়ে বললেন রেখাদেবী।
‘তন্ময়কে পাওয়া যাচ্ছে না। হয় তো কোনো বিপদে পড়েছে ও। আমায় অ্যাপয়েন্ট করেছে ওর বান্ধবী রিদ্ধিমা। ও খুব চিন্তায় আছে তন্ময়কে নিয়ে। সেই কারণেই আপনার কাছে আসা।’ বলল টাপুরদি।
‘সে কী!’ রেখাদেবীর মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ল। বললেন, ‘কোথায় গেল ছেলেটা? কোনো বিপদ হয়নি তো ওর?’
‘সেটা আমরা এখনও জানি না। তবে ওর কাছে এমন কিছু জিনিস আছে, যেগুলি হাতে না পাওয়া অবধি ওর কেউ ক্ষতি করবে না। একবার পেয়ে গেলে তারপর অবশ্য করতে পারে। আর যতদূর মনে হচ্ছে জিনিসটা এখনও কারও হাতে যায়নি। গেলে এতদিনে সারা দেশ জেনে যেত।’ টাপুরদি একটু অন্যমনস্কভাবে কথাগুলো বলল, যেন নিজেই নিজের যুক্তিজালকে খতিয়ে দেখছে।
‘আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। যাই হোক, তোমরা কী জানতে চাও বলো।’
‘আপনি অনামিকাদেবী সম্পর্কে যা যা জানেন আমাদের বলুন প্লিজ।’
রেখাদেবী একটু ভেবে বলতে শুরু করলেন, ‘অনামিকা ও আমি স্কুল-কলেজে একসঙ্গে পড়েছি। ও আগে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে চাকরি পেল। পরের বছর আমি পোস্ট অফিসে ক্লার্ক হয়ে ঢুকলাম। চাকরি পাওয়ার পর ওর বিয়ে হয়ে যায়। বছর দেড়েকের মধ্যে সনকা হল। আমার আরও তিন বছর পর বিয়ে হল। ওর সঙ্গে যোগাযোগটা একটুও আলগা হয়নি। তখন তো আর এখনকার মতো অত ফোন, মোবাইল ছিল না। আমার অফিসে অবশ্য ফোন ছিল, কিন্তু ওর স্কুলে ছিল না। ও পাবলিক বুথ থেকে আমার অফিসে ফোন করলে কথাবার্তা হত। সময় সুযোগ করে দেখাও করতাম। আমার স্বামী পুলিশে চাকরি করতেন। খুব ভালোমানুষ ছিলেন। বিয়ের তিন বছরের মাথায় একটা অ্যাকশন করতে গিয়ে সমাজবিরোধীদের গুলিতে মারা যান তিনি।’
রেখাদেবী দেওয়ালে লাগানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। টাপুরদি বলল, ‘ওহ, আই অ্যাম সরি!’
রেখাদেবী মুখে হাসি টেনে বললেন, ‘না না, সরি কেন? অনেকদিনের কথা এসব। আর তা ছাড়া আমি খুব ভাগ্যবতী। স্বল্পদৈর্ঘ্যের হলেও আমার বিবাহিত জীবনে সুখের অভাব ছিল না। কিন্তু অনামিকার ভাগ্য আমার মতো ভালো ছিল না। ওর স্বামীকে ঠিক কী বলা যায় আমার জানা নেই। উপর থেকে দেখলে মনে হত ওরকম গভীরভাবে স্ত্রীকে ভালোবাসতে কেউ পারে না। কিন্তু আসলে লোকটা একটা মানসিক রোগী ছিল, জানেন? তার উপর অসম্ভব রকম মদ খেত। দিনরাত নেশা করে থাকত। অনামিকার প্রতি ওর ভালোবাসাটা একটা অবসেশনের রূপ নিয়েছিল। প্রতি মুহূর্তে অনামিকাকে ও সন্দেহে করত, চোখে চোখে রাখত। এমনকী অনামিকা স্কুলে গেলেও ফলো করত ওকে। অনামিকা আমার কাছে কাঁদত। বলত, ‘আমি আর পারছি না রে রেখা।’ ডিভোর্স নিতে চাইলে আত্মহত্যার ভয় দেখাত লোকটা ওকে। সনকাও বড়ো হচ্ছিল। রোজ রোজ বাড়িতে অশান্তি দেখতে দেখতে মেয়েটার মনও বিষিয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ। মাকে ও ঘৃণা করতে শুরু করছিল।
‘বিয়ের পর এভাবেই ষোলো-সতেরো বছর কেটে গিয়েছিল। এরপর অনামিকা দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হল। আর তার পরেই শুরু হল আসল সমস্যা।’
‘সরি আমি আপনাকে ইন্টারাপ্ট করছি। অনামিকাদেবীর কি কারও সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল? কিছু মনে করবেন না, কিন্তু সনকাদেবী আমাদের জানিয়েছেন, তন্ময় তাঁর মায়ের অবৈধ সন্তান,’ টাপুরদি দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল।
রেখাদেবী বিস্ময়মাখা চোখ তুলে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালেন।
১২
‘কিছু কি জানতে পারলেন?’ জিজ্ঞাসা করল রিদ্ধিমা। আজ গড়িয়া থেকে ফিরে টাপুরদির ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছে দেখি রিদ্ধিমা লিফট থেকে বেরোচ্ছে। আমাদের দেখে হালকা হেসে বলল, ‘এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম। ভাবলাম দেখা করে যাই। ফোন না করেই চলে এসেছিলাম। এসে দেখি কোল্যাপ্সিবল গেটে তালা ঝোলানো। তাই ফিরে যাচ্ছিলাম।’
টাপুরদি হেসে বলল, ‘তোমার কাজেই বেরিয়েছিলাম। চলো, ঘরে চলো।’
সন্ধে হয়েছে। বাইরের আকাশে অন্ধকারের একটা অস্বচ্ছ পরদা ঢেকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। একটা দুটো করে তারা ফুটছে আকাশের চাঁদোয়ায়। জানলাগুলো সব খুলে দিল টাপুরদি। সারাদিন বন্ধ ঘরে জমে থাকা তপ্ত, বদ্ধ বাতাসটুকু হালকা হয়ে এল। দক্ষিণের জানলা দিয়ে ফুরফুর করে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে, সারাদিনের দৌড়োদৌড়িতে ক্লান্ত শরীর যেন জুড়িয়ে যায়। টাপুরদি রিদ্ধিমাকে বসতে বলে সোজা ঢুকে গেল কিচেনে। গ্যাস ওভেনে সসপ্যানে চায়ের জল চড়িয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে সকলের জন্য চায়ের কাপ আর স্ন্যাকস ট্রেতে সাজিয়ে এনে সামনে রেখে নিজে সোফার উপরে বসল।
রিদ্ধিমার প্রশ্নের উত্তরে বলল, ‘না রিদ্ধিমা, কিছু এখনও জানতে পারিনি। মিথ্যে আশা দেব না তোমায়।’
‘ইউনিকর্নে গিয়ে কিছু লাভ হল? কিছু জানা গেল?’ জানতে চাইল রিদ্ধিমা।
‘নাথিং ইম্পর্ট্যান্ট!’ বলল টাপুরদি। সুবিনয়বাবুর কেবিনে হওয়া নাটকের কথা বেমালুম চেপে গেল দেখলাম।
রিদ্ধিমা চেষ্টা করেও হতাশা লুকোতে পারছে না। ওর মনের উপর দিয়ে যে ঝড় চলছে তার চিহ্ন ওর চেহারাতেও পড়েছে। এই ক’দিনেই যেন কয়েক বছর বয়স বেড়ে গেছে ওর, যেন একটু বেশি শীর্ণ, চেহারাতে অযত্নের ছাপ একটু নজর করে দেখলেই চোখে পড়ে। ওর বিষাদ আমাদেরও ছুঁয়ে যাচ্ছে। টাপুরদি মরমি স্বরে বলল, ‘চিন্তা কোরো না রিদ্ধিমা। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি।’
রিদ্ধিমা মুখ নীচু করে চায়ের কাপে চুমুক দিল। তারপর বাইরে জানলার দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে উদাস কণ্ঠে বলল, ‘কী জানি মিস ব্যানার্জি, আমি আর নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করি না। আমার সঙ্গে কখনো কিছু ভালো হয়নি জানেন। তন্ময় ওয়াজ দ্য বেস্ট থিং এভার হ্যাপেন্ড টু মি। হি ওয়াজ নট অনলি মাই লভ, হি ওয়াজ মাই লাইফ! তন্ময়ের মতো করে এতটা ভালো আমাকে কেউ কখনো বাসেনি। যেসব পুরুষ আমার কাছে এসেছে, তারা আমার রূপে মুগ্ধ হয়ে এসেছে, আমার শরীরকে চেয়ে কাছে এসেছে। ভালোবাসার উপর থেকে বিশ্বাসটাই হারিয়ে গেছিল, জানেন? ঠিক সেই মুহূর্তে তন্ময় এসেছিল আমার জীবনে। কিন্তু আমার কপাল দেখুন, ওকেও ধরে রাখতে পারলাম না।’
টাপুরদি উঠে গিয়ে রিদ্ধিমার পাশে গিয়ে বসল। ওর পিঠে হাত রেখে বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি হতাশ হবেন না রিদ্ধিমা। আমার ধারণা তন্ময় ঠিক আছে, সুস্থ আছে।’
রিদ্ধিমা চোখ তুলে বলল, ‘নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করি না আমি। আসলে কী জানেন, আমিও আমার মায়ের মতো দুর্ভাগ্য নিয়েই জন্মেছি।’ রিদ্ধিমা আজ যেন বুকের ভিতরের জমা কষ্টটুকু বের করে দিতে চায়। মনের কথা কাউকে খুলে বলতে না পেরে সেও হাঁপিয়ে উঠেছে। টাপুরদি ওকে বাধা দিল না। রিদ্ধিমা বলতে থাকল, ‘জানেন মিস ব্যানার্জি, আমার মায়ের জীবনটাও খুব কষ্টের ছিল। আমার মা কিন্তু আমার চেয়েও বেশি সুন্দরী ছিল। বাবাদের ফ্যামিলি ছিল ভীষণ অর্থোডোক্স, টিপিক্যাল গুজরাটি ফ্যামিলি। প্রেমের বিয়ে ছিল বাবা-মায়ের। বিয়ের আগে মা সেটা বোঝেনি। আগের দিন আপনাকে বলেছিলাম না, আমার মা জার্নালিস্ট ছিলেন। কলকাতার একটি নামকরা ইংরেজি দৈনিকে স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন মা। বিয়ের পর তাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হল। মা মেনেও নিয়েছিলেন, সংসারী হতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বাবার ফ্যামিলির লোকেরা মায়ের জীবনটা নরক বানিয়ে ছেড়েছিল।
একটা সময় মা সিদ্ধান্ত নিলেন, অনেক সয়েছেন, আর না। কলকাতার সেই দৈনিকে আবার যোগাযোগ করলেন। শুরু করলেন ফ্রিল্যান্সিং। শ্বশুরবাড়ির তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও কলকাতায় আসা-যাওয়া শুরু করলেন। বাবার সঙ্গে মায়ের মানসিক দূরত্ব বেড়েই চলেছিল। আমার মা ছিলেন ক্রাইম রিপোর্টার। সেই সময় পলিটিক্যাল ক্রাইমস খুব বেড়েছিল সারা রাজ্য জুড়ে। মা সেইসব নিউজ কভার করতেন। শুনেছি, মায়ের সাহসী জার্নালিজমের কারণে সেই সময়কার ক্ষমতাসীন সরকারের লোকেরা মায়ের উপর বেশ কয়েকবার হামলা অবধি করেছে, এমনকী মাকে খুন করার চেষ্টাও হয়েছে বেশ কয়েকবার। কলকাতায় থাকলেও মাঝে মাঝে সুরাটে বাবার কাছে গিয়ে থাকতেন মা, কিন্তু সম্পর্কের ভাঙনটা তাতেও সামাল দেওয়া যায়নি। এর পরেই আমার মা প্রেগন্যান্ট হন। আমার জন্মের পরেই ডিভোর্সটা হয়ে যায়। মা আমায় নিয়ে বরাবরের জন্য কলকাতায় চলে আসেন। বাবা বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন। আমার মা কিন্তু আর বিয়ে করেননি। আমি জানি, মাকে কত কিছু ফেস করতে হয়েছে, কত লড়াই লড়তে হয়েছে।’
টাপুরদি রিদ্ধিমার কথার মাঝে বলে উঠল, ‘তোমার মায়ের নাম কী রিদ্ধিমা?’
‘মল্লিকা। মল্লিকা দাশগুপ্ত।’ উত্তর দিল রিদ্ধিমা।
রিদ্ধিমা বেরিয়ে গেছে ঘণ্টাখানেক হল। টাপুরদি রান্নাঘরে রান্না বসিয়েছে। তারই মাঝে ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। আমি টিভিটা চালিয়ে বসলাম। নিউজ চ্যানেলে কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে দেখাচ্ছে। তাকে ঘিরে ধরেছে মিডিয়া রিপোর্টাররা। সবাই তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চায়। তিনি গম্ভীর মুখে বলছেন, ‘অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর তদন্ত চলছে। পুলিশের হাতে বেশ কিছু সূত্র এসেছে। আশা করা যাচ্ছে খুব শিগগিরই রহস্যের কিনারা হবে।’
একটি মাঝারি মাপের নিউজ চ্যানেলের তরফ থেকে একজন রিপোর্টার জিজ্ঞাসা করল, ‘কলকাতা পুলিশ কি আদৌ এই কেসের রহস্যভেদ করতে পারবে? আপনাদের উপরে কি কোনোরকম পলিটিক্যাল প্রেশার আসছে? আপনার কি মনে হয় না কেসটা সিবিআইকে দেওয়া উচিত?’
লক্ষ করলাম, কমিশনারের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল মুহূর্তের জন্য। তারপর আবার সহজ গলায় তিনি বললেন, ‘না, কোনোরকম পলিটিক্যাল প্রেশার নেই। কলকাতা পুলিশ এর আগেও অনেক জটিল কেসে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, আশা রাখি এই কেসেরও দ্রুত মীমাংসা হবে। আর কেন্দ্র যদি কেসটা সিবিআইকে দিতে চায়, সেক্ষেত্রে কলকাতা পুলিশ তদন্ত কমিটিকে পূর্ণ সহযোগিতা করবে।’
ভিড় ঠেলে লালবাজার হেডকোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে গেলেন কমিশনার। সত্যি, সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে কী আশা করে কে জানে? একটা তদন্তের জন্য কতটা পরিশ্রম করতে হয়, পুলিশের চাকরিতে কতটা সমর্পণ, ত্যাগ প্রয়োজন সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। যারা পুলিশে চাকরি করে, তারাও তো মানুষ। এই অমিয় চক্রবর্তীর মার্ডারের মতো হাই প্রোফাইল কেস নিয়ে পুলিশ যে কতটা খাটছে, অর্জুনদার সূত্রে জানি। ক্যান্টিনের যে ছেলেটি সেইদিন চা করেছিল, তার জবানবন্দি অনুসারে জানা গিয়েছে, সাধারণত পার্টি অফিসের ক্যান্টিন বন্ধ হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। ইলেকশনের আগে সারারাত খোলা থাকত ক্যান্টিন। কারণ অনেক কর্মীরা সারারাতই কাজ করত। ফলে তাদের চা দিতে হত ঘন ঘন। অফিসে একজনও থাকলে ক্যান্টিন খোলা রাখতে হয়। এটাই নিয়ম।
অমিয়বাবু খুব ঘন ঘন চা খেতেন। তাঁর চা ক্যান্টিনের চা পাতা দিয়ে বানানো হত না। তাঁর জন্য স্পেশাল পাতা আসত। অমিয়বাবুই বলেছিলেন, বার বার চায়ের জন্য তলব করা অসুবিধে। তাই তাঁর চা যেন একবারে করে ফ্লাস্কে ভরে তাঁর টেবিলে রাখা হয়। সেই ব্যবস্থাই এতদিন বহাল ছিল।
সেদিনও বিকেলের কিছু আগে কেউ একজন ফ্লাস্ক নিয়ে এসে জানিয়েছিল, অমিয়বাবুর চা শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে বানিয়ে ভরে দিয়ে আসতে। ক্যান্টিনের ছেলেটি মনে করতে পারছে না অফিসের এতজন কর্মীর মধ্যে কে বলেছিল কথাটা। ছেলেটি নিজে হাতে চা বানিয়ে ফ্লাস্কে গরম চা ভরে সে নিজেই দিয়ে এসেছিল অমিয়বাবুর ঘরে। এর বেশি আর সে কিছু জানে না।
এইসব কথাই অবশ্য আমার টাপুরদির মুখে শোনা। আর টাপুরদি জেনেছে অর্জুনদার কাছে। নইলে এসব আমার জানার কথা নয়। অর্জুনদা এই কেসের দায়িত্বে থাকা টিমের একজন সদস্য। তাই মেঘ না চাইতে জলের মতো কিছু তথ্য টাপুরদির কানে আসে। অবশ্য ঠিক না চাইতে কি না জানি না। আমার ধারণা টাপুরদি মুখ্যমন্ত্রীর কেসটা নিয়ে যথেষ্ট ইন্টারেস্টেড। টাপুরদি এমন মানুষ, রহস্যের গন্ধ পেলেই যার মস্তিষ্ক স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কাজ করতে শুরু করে দেয়। তন্ময়কে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও অমিয় চক্রবর্তীর হত্যাকাণ্ড টাপুরদিকে ভাবাচ্ছে, সে আমি জানি।
রান্না চড়িয়ে তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে টাপুরদি আমার পেছনে এসে দাঁড়াল। দৃষ্টি টিভি স্ক্রিনে স্থির। এখন টিভিতে অমিয় চক্রবর্তীর স্ত্রী সুনয়নাদেবীকে দেখাচ্ছে। ভদ্রমহিলার বয়স পঁয়ষট্টির আশেপাশে হওয়ার কথা। এই বয়সেও তিনি যথেষ্ট সুন্দরী। এক সময় তিনি রাজনীতিতে অমিয়বাবুর সহযোদ্ধা ছিলেন। পরবর্তীতে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে আসেন। সুনয়নাদেবীর চোখে-মুখে স্পষ্ট শোকের চিহ্ন। বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাঁকে। নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন তিনি। অমিয়বাবুর মৃত্যুর পরে এই প্রথম তিনি মিডিয়ার সামনে এলেন। রিপোর্টার মেয়েটি প্রশ্ন করল, ‘আপনার কী মনে হয়? কে হত্যা করতে পারে অমিয়বাবুকে?’
সুনয়নাদেবী কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘সেদিনের পর থেকে এই প্রশ্নের উত্তর তো আমিও খুঁজে যাচ্ছি। আসলে রাজনীতির মঞ্চটা তো খুব পরিষ্কার নয় কোনোদিনই। অমিয় প্রায়ই বলত যে ও যেকোনো দিন খুন হয়ে যেতে পারে। ভয় যে আমারও ছিল না তা তো নয়। তবু মনে হত এত মানুষ ওকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, ওর সঙ্গে খারাপ কিছু হতে পারে না। আজ মনে হচ্ছে আমিই ভুল ছিলাম। কে ওকে খুন করল তা আমার জানা নেই। কিন্তু সেভাবে তলিয়ে ভাবতে গেলে মনে হচ্ছে, যে মানুষের মঙ্গলের জন্য সমস্ত জীবনটা উৎসর্গ করে, তার শত্রু থাকাটাই তো স্বাভাবিক। এমন শত্রু যারা ওকে থামিয়ে দিতে চাইবে, ওর আদর্শকে ধ্বংস করে দিতে চাইবে। কিন্তু আজ আমি সুনয়না চক্রবর্তী অমিয়র খুনিকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি। অমিয়র নশ্বর দেহকে সে হত্যা করতে পারে, কিন্তু অমিয়র আদর্শকে হত্যা করা অত সহজ নয়। অমিয় বেঁচে থাকবে সারা রাজ্যের লাখ লাখ পার্টির প্রতি সমর্পিত প্রাণ কর্মীদের মধ্যে, অমিয় বেঁচে থাকবে যারা তাকে বিশ্বাস করে, ভালোবেসে ক্ষমতায় এনেছেন তাঁদের হৃদয়ে, অমিয়র আদর্শ বেঁচে থাকবে তার সন্তানের মধ্যে। অম্লান স্পোর্টসম্যান, ও চ্যালেঞ্জ নিতে জানে। অমিয়র শূন্যস্থান কখনোই পূরণ হওয়ার নয়, কিন্তু অম্লানও ওরই সন্তান। আশা রাখি, সেও তার বাবার মতো প্রাণমন দিয়ে রাজ্যের সেবা করবে।’
‘আপনি কি কেন্দ্রর কাছে সিবিআই তদন্ত দাবি করবেন?’ জানতে চাইল রিপোর্টার।
‘না।’ বলিষ্ঠ কণ্ঠে উত্তর দিলেন সুনয়নাদেবী, ‘নতুন যে মিনিস্ট্রির তালিকা তৈরি করেছিল অমিয়, তাতে মুখ্যমন্ত্রীত্বের সঙ্গে পুলিশ বিভাগও সে নিজের হাতেই রেখেছিল। অমিয়র যথেষ্ট আস্থা ছিল এই রাজ্যের পুলিশের উপর। আমারও আছে। তাই আমি চাই কলকাতা পুলিশই এই কেসের তদন্ত করুক।’
‘শেষ প্রশ্ন,’ বলল রিপোর্টার মেয়েটি, অমিয়বাবুর অবর্তমানে এ-রকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে কি আপনি পার্টির হাল ধরার জন্য আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসবেন?’
‘নাঃ।’ বললেন সুনয়নাদেবী, ‘অম্লান যথেষ্ট যোগ্য। এ ছাড়া পার্টিতে আরও অনেক বর্ষীয়ান ও অভিজ্ঞ নেতারা আছেন। তাঁদের অবিভাবকত্বে অমিয়র অবর্তমানেও এই রাজ্য সুরক্ষিত হাতেই থাকবে।’
সাক্ষাৎকার শেষ হল।
রাতে খেতে বসে টাপুরদি বলল, ‘আমার বন্ধু মিহিকা ফোন করেছিল রে।’ অনামিকাদেবীর ওয়ার্ক প্রোফাইল খুঁজে বার করেছে ও। বলল, ‘প্রথমে বারাসাতে পোস্টিং ছিল। পরে এক রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত রেফারেন্সে বাড়ির কাছে পোস্টিং পান। ওয়ার্ক হিস্ট্রি ক্লিন।’
‘কোন রাজনৈতিক নেতা?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘অমিয় চক্রবর্তী,’ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল টাপুরদি। আমি হেঁচকি তুলে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার দিকে।
১৩
‘কেসটা ক্রমেই ঘেঁটে ঘ হয়ে যাচ্ছে টাপুরদি গো। সব মাথার ভিতর জট পাকিয়ে গেল,’ বেসিনে হাত ধুতে ধুতে বললাম আমি।
টাপুরদি হেসে বলল, ‘যাই বলিস মিতুল, বেশ একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার আছে কিন্তু কেসটাতে। যত ভাবছি এই বুঝি ব্যাপারটাকে বেশ বাগে আনা গেছে, অমনি কোথা থেকে একখান নতুন অ্যাঙ্গেল এসে উপস্থিত হচ্ছে। আমি কিন্তু দারুণ এনজয় করছি।’
আমি বললাম, ‘করো তুমি এনজয়। আমি আর অফিসে ছুটি নিতে পারছি না। এবার প্রোজেক্ট ম্যানেজার পেছনে বাম্বু দেবে, বুঝলে। আমি তো আর তোমার মতো নিজেই নিজের বস নই! যে রেটে লিভ নিচ্ছি, এরপর কোম্পানি আদর করে আমায় বহির্নিগমনের পথ দেখিয়ে দেবে হাতে পিংক স্লিপ ধরিয়ে।’
‘হুম,’ চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি, ‘এই সমস্যা সমাধানের উপায় আপাতত আমার হাতে নেই। তাহলে আর কী? কাল থেকে সমরসজ্জা করে কর্মক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হও বৎসে।’
রণাঙ্গনই বটে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এভাবে মাঝপথে কেস ছেড়ে যেতে কোনোদিনই ভালো লাগে না। কিন্তু প্রায়ই সেটা করতে হয়। বললাম, ‘অফিস থেকে ফিরে পুরো আপডেট চাই কিন্তু।’
অফিস জয়েন করতেই হু-হু করে বন্যার জলের মতো কাজের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল আমার কাঁধের উপর। টাপুরদির কাছে আপডেট নেব কী, ফোন করার কথাই মাথায় রইল না আর। কোথা দিয়ে যে ক’টা দিন কেটে গেল টেরই পেলাম না। ঠিক চারদিন পর অফিস ফেরত টাপুরদির ফ্ল্যাটে হানা দিলাম। টাপুরদি ঘরেই ছিল। আমায় দেখে বলল, ‘সময় হল আসার?’
বললাম, ‘সব ওই বাম্বুর মহিমা। তুমি কী বুঝবে?’
টাপুরদি উঠে কিচেনে গিয়ে দুইজনের জন্য দুই কাপ চা আর পেঁয়াজ-লঙ্কা-চানাচুর দিয়ে দিব্যি ঝালঝাল মুড়ি মাখা করে নিয়ে এল। বলল, ‘নে। খা।’
জমিয়ে বসে খেতে খেতে বললাম, ‘এবার বলো, কত দূর এগোল।’
টাপুরদি বলল, ‘ক’দিন শুধু ভাবলাম রে!’
‘শুধু ভাবলে? যাববাবা!’
‘চল, আমরা বরং মুখে মুখে কেসের আপডেটগুলোকে একটু সাজিয়ে নিই, কী বলিস?’ বলল টাপুরদি।
‘চলো, হয়ে যাক!’ মুড়ি চিবোতে চিবোতে বললাম আমি।
‘প্রথমে আমাদের কাছে এল রিদ্ধিমা দেশাই, তার বয়ফ্রেন্ড তন্ময়, যে কিনা ইউনিকর্ন সিকিউরিটি এজেন্সিতে কাজ করত, সে মিসিং। রিদ্ধিমার কাছে আমরা জানতে পারছি, বিগত কয়েক মাস ধরে তন্ময় একটি পলিটিক্যাল প্রোজেক্টে কাজ করছিল। রূপমের কাছ থেকে আমরা জানতে পারছি, কাজটা হল অমিয় চক্রবর্তীর হিস্ট্রি ঘেঁটে লুপহোলস বার করা। তাই তো?’
‘ঠিক ঠিক। বলে যাও,’ অর্ধনিমীলিত নেত্রে কাঁচালঙ্কায় কামড় লাগিয়ে বললাম আমি। এই ঝালমুড়ি ব্যাপারটা টাপুরদির হাতে দিব্যি খোলে।
‘রূপমের কাছেই আমরা জানতে পারছি যে তন্ময় এজেন্সির কিছু ডকুমেন্টস চুরি করে পালিয়েছে। এজেন্সির লোকেরা ওকে পাগলা কুকুরের মতো খুঁজছে। ডকুমেন্টগুলি ছিল অমিয় চক্রবর্তী সম্পর্কে কিছু তথ্য, যেগুলি তন্ময়ের অফিসের সিস্টেমে সেভ করা ছিল। সুবিনয় মুখার্জি আমাদের ধারণাতে মৌন থেকে স্ট্যাম্প লাগিয়েছেন। সুবিনয়বাবুর হাতে সেগুলি এখন আর নেই। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, সেই নথিগুলি এই মুহূর্তে শুধুমাত্র তন্ময়ের কাছেই আছে, যদি না তন্ময় সেগুলোকে নষ্ট করে ফেলে থাকে। সেই নথিগুলি কী ছিল? আমরা আন্দাজ করতে পারি, নিশ্চয়ই সেগুলি অমিয় চক্রবর্তী সম্বন্ধীয় কিছু ছিল। এমন কিছু, যেগুলি অমিয়বাবুর বিরোধীদের হাতে গেলে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের ক্ষতি হতে পারত। কারণ এক্ষেত্রে সেই কাজ করার জন্যই ইউনিকর্নকে অ্যাপয়েন্ট করা হয়েছিল।’
‘এবার প্রশ্ন হল, তন্ময় এ-রকম করল কেন? এই প্রোজেক্টের ক্লায়েন্ট ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোসের বকলমে তাঁর সেক্রেটারি সঞ্জয় পাল। সুতরাং প্রোজেক্টটা একাধারে হাইলি কনফিডেনশিয়াল এবং হাই প্রোফাইল। এই প্রোজেক্টটা সফলভাবে ডেলিভার করতে পারলে নিঃসন্দেহে তন্ময়ের কেরিয়ারের মুকুটে একটা পালক যোগ হত। ওর প্রোমোশন, ইনক্রিমেন্ট বাঁধা ছিল। তা সত্ত্বেও এমন একটা বাজে রিস্ক ও নিল কেন? ওর ব্যক্তিগত স্বার্থটা কী?’
‘ঠিক এই জায়গাটাতে এসেই আটকে গেলাম আমি। মনে হল, তন্ময়ের এভাবে এতটা রিস্ক নেওয়ার পেছনে কারণ কী? কেন এভাবে নিজের জীবন বিপন্ন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ও? আর সেই নথিটাই বা কী, যা এতটা মূল্যবান? যেটা বিনয় বোসের হাতে এলে অমিয় চক্রবর্তীর বড়োসড়ো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল? ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মনে হল, তাহলে সেই জিনিসটা কি এমন কিছু যা অমিয় চক্রবর্তীকে তন্ময়ের সঙ্গে জোড়ে? তাহলে কি তন্ময়ের কোনো সম্পর্ক আছে অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে, যে জন্য ও এতটা রিস্ক নিচ্ছে? নাকি তন্ময় নিজেই ব্ল্যাকমেল করতে চেয়েছিল অমিয়বাবুকে?’
এতটা বলে থামল টাপুরদি। আমি তখন মুড়ি চেবানো বন্ধ করে হাঁ করে টাপুরদির যুক্তিজাল শুনছিলাম। এবার বললাম, ‘মাই গড, টাপুরদি! তার মানে কি অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর সঙ্গে তন্ময়ের নিরুদ্দেশ হওয়ার কোনো যোগ আছে?’
টাপুরদি চিন্তিত মুখে বলল, ‘সেটা এখনও নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় রে। থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। আমি আপাতত অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। ওটা পুলিশের কাজ, পুলিশ করছে। ওটা নিয়ে আমার আপাতত সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আমি ভাবছি অন্য কথা। তন্ময়ের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর যোগসূত্রটা কী? কেন তন্ময় এভাবে পালাল?’
‘আচ্ছা, তোমার বন্ধু মিহিকাদি জানাল, অনামিকা রায়ের ট্রান্সফারে অমিয় চক্রবর্তীর হাত ছিল। তাহলে তো ধরে নেওয়া যেতে পারে, অনামিকা রায় অমিয় চক্রবর্তীকে চিনত,’ বললাম আমি।
‘হুম, তা ধরে নেওয়া যায় বই কী। কিন্তু কতটা ঘনিষ্ঠভাবে চিনত সেটা ভাববার বিষয়,’ বলল টাপুরদি, ‘দেখ, যেই সময়ে এই ঘটনাগুলি ঘটেছিল, সেটা আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছরেরও আগে। সেই সময় অমিয়বাবুর দলই কিন্তু এই রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। রথীন ঘোষ তখন মুখ্যমন্ত্রী, যাকে অমিয় চক্রবর্তীর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু বলা যায়। সেই সময়েও অমিয় চক্রবর্তী কিন্তু দলের প্রমিনেন্ট ফেস, ক্ষমতাশালী যুব নেতা। টিকিট পেয়ে এমএলএ হয়েছেন। কলকাতাসহ দক্ষিণবঙ্গের অনেকটা জুড়ে ধীরে ধীরে তাঁর আধিপত্য বিস্তৃত হচ্ছিল। অমিয়বাবু ছিলেন সুবক্তা, সুপুরুষ, সর্বোপরি অত্যন্ত সুচতুর নেতা। খুব কম সময়ের মধ্যেই দলের মধ্যে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। জানিস, অমিয়বাবু আর সুনয়নাদেবীর কিন্তু লাভ ম্যারেজ। এখানে তাঁদের অতীত নিয়ে সামান্য নাড়াচাড়া করলে আমরা জানতে পারছি যে বিয়ের আগে কিন্তু সুনয়নাদেবীও রাজ্য রাজনীতিতে একজন প্রতিষ্ঠিত নেতা ছিলেন। বিয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসেন।’
‘আমি কোত্থেকে জানব?’ বললাম আমি, ‘অত বছর আগেকার কথা, আমি তখন জন্মাইনি।’
‘চোখ কান খোলা রাখলেই জানা যায়। গুগলদাদু আছেন কী করতে? শুধু অজুহাত,’ ভুরু কুঁচকে চোখ পাকাল টাপুরদি, ‘যাই হোক, ব্যাপারটা হল, গত বাইশ বছর ধরে লড়াইটা চালিয়ে আসছেন অমিয়বাবু। ইলেকশনে হারার বছর দুয়েকের মধ্যেই রথীন ঘোষ হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তারপর থেকে অমিয়বাবুই দলের চেয়ার পার্সন হন।’
‘আচ্ছা টাপুরদি, অমিয়বাবুদের দল তো শুনেছি বেশ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল। হঠাৎ হারলেন কেন তাঁরা?’ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলাম আমি। এমনিতে রাজনীতিতে আমার তেমন কোনো উৎসাহ নেই। সেভাবে বুঝিও না। কিন্তু এই কেসটার গভীরে যত ঢুকছি, তত কৌতূহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। টাপুরদি যা-ই বলুক, আমার মন চাইছে যেন অমিয় চক্রবর্তীর হত্যা রহস্যের সঙ্গে তন্ময়ের কেসের কোনো যোগসূত্র বেরোয়। তাহলে বেশ ভালো হবে। অন্তত এই সূত্রে অমিয় চক্রবর্তীর হত্যার কেসে টাপুরদি কিছু অন্তত নিজের মাথা ঘামানোর সুযোগ পাবে।
টাপুরদি বলল, ‘একটা দল বেশি দিন ক্ষমতায় থাকলে নিজেদের সর্বশক্তিমান ভেবে বসার প্রবণতা তৈরি হয়, বুঝলি? রথীন ঘোষের রাজত্বেও তাই হয়েছিল। রথীনবাবুর বয়স হয়েছিল। গ্রাউন্ড লেভেলের কর্মীদের উপর থেকে তাঁর রাশ আলগা হয়ে গেছিল। তার ফলে বেড়েছিল দুর্নীতি, সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার। সেই সময় মানুষ তাদের উপর বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। কিছু বিখ্যাত খবরের কাগজও ক্রমাগত তাদের দুর্নীতির খবর প্রচার করে যাচ্ছিল। যদিও রথীন ঘোষের সরকার তাদের মুখ বন্ধ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেই চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। জনগণের মন বিষিয়ে উঠেছিল। পরিণাম, ভোটের ব্যালটে জনতা জনার্দন নিজেদের উষ্মা উগড়ে দিল।’
‘টাপুরদি, তোমার মনে আছে সেই দিন রিদ্ধিমা বলছিল ওর মা নাকি সেই সময় সরকারের এগেন্সটে কাগজে লিখত?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘আছে রে, মনে আছে,’ মুচকি হাসি হেসে বলল টাপুরদি।
‘হাসলে যে?’ জিজ্ঞাসা করলাম।
‘অঙ্ক করছিস বুঝি আজকাল? স্মৃতিশক্তিটা বেশ কাজ করছে দেখছি,’ হেসে বলল টাপুরদি।
১৪
রাতে ডিনারের পর টাপুরদি ল্যাপটপ নিয়ে বসল। একবার উঁকি দিয়ে দেখলাম, সার্চবারে অম্লান চক্রবর্তী লিখে সার্চ করছে। সারাদিন অফিসে খাটুনির পর ঘুম পেয়ে গেছিল, আমি ঘরে চলে গেলাম শুতে। রাত প্রায় দুটো নাগাদ টাপুরদির গলার স্বরে ঘুম ভাঙল একবার। কারও সঙ্গে গুনগুনিয়ে কথা বলছে। আমি জানি, ফোনের ওপারের ব্যক্তিটি অর্জুনদা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। দুজনেই যে যার কাজ নিয়ে সারাটা দিন ব্যস্ত থাকে। দিনের শেষে দুজনাই দুজনার ক্লান্তিটুকু ভাগ করে নেয় নিজেদের মতো করে। আমি জানি, টাপুরদির মতো স্বাধীনচেতা, শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী মেয়ের খুঁটি হওয়ার জন্য কোনো পুরুষের দরকার নেই। কিন্তু একজন বন্ধুর দরকার বোধ হয় সকলেরই থাকে, দিনের শেষে যে হতে পারে হৃদয়ের আশ্রয়। কখনো মন অস্থির হলে, আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরলে যে পাশে দাঁড়িয়ে কানে কানে বলতে পারে, ‘আমি আছি। হাল ছেড়ো না, ঠিক পারবে তুমি।’ অর্জুনদা টাপুরদির কাছে সেই আশ্রয়। টাপুরদি মুখে স্বীকার না করলেও আমি জানি, অর্জুনদা টাপুরদির মনে অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে।
সাধারণত ভোরের সূর্য আমার দর্শন কোনোদিনই পায় না। আজ কিন্তু খুব ভোরে ঘুমটা ভেঙে গেল, আর সেটাও একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে। দেখলাম, অমিয় চক্রবর্তী মারা গেছেন। টাপুরদি আর আমি পুলিশের সঙ্গে সেখানে তদন্ত করতে গিয়েছি। গিয়ে দেখলাম অমিয় চক্রবর্তী নন, মারা গিয়েছে রিদ্ধিমা। আমি টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘রিদ্ধিমা কেমন করে মরে গেল?’ টাপুরদি, গম্ভীরভাবে বলল, ‘রিদ্ধিমা মুখ্যমন্ত্রী হবে, তাই ওকে মেরে ফেলেছে কেউ।’ ঘুম ভেঙে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। স্বপ্নটা মাথায় ঘুরছে। এ আবার কী অদ্ভুত স্বপ্ন? রিদ্ধিমা শুধুমুধু কেন মরতে যাবে? মা বলে ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়, ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সাড়ে পাঁচটা বাজে। টাপুরদি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিছানা ছাড়বে। টাপুরদি উঠলে ওকে বলতে হবে একবার রিদ্ধিমাকে ফোন করতে। ও ঠিক আছে সেটা না জানা অবধি মনের অস্থিরতাটা কাটবে না। রিদ্ধিমার জন্য খারাপ লাগছে। তন্ময়কে ও সত্যিই ভালোবাসে। তন্ময়ের অন্তর্ধানে ও ভেঙে পড়েছে পুরোপুরি।
রিদ্ধিমা আর তন্ময়ের কথাই ভাবছিলাম। কখন টাপুরদি পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। ধ্যান ভাঙল টাপুরদির কণ্ঠস্বরে।
‘কী রে? এত মন দিয়ে কী ভাবছিস?’
ঘুরে তাকিয়ে হাসলাম। টাপুরদি আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘আজ তোর হল কী? কাক ডাকা ভোরে উঠে বসে আছিস যে?’
টাপুরদিকে স্বপ্নটার কথা বললাম। টাপুরদি মন দিয়ে শুনল। তারপর বলল, ‘চিন্তা করিস না। আসলে ক’দিন ধরে সারাদিন ওদের নিয়েই ভাবনাচিন্তা কথাবার্তা চলছে তো। তাই ঘুমের মধ্যেও ওদের নিয়েই স্বপ্ন দেখেছিস। আরেকটু বেলা হোক, তোর মনের শান্তির জন্য আমি রিদ্ধিমাকে ফোন করে নেব, কেমন?’
রিদ্ধিমাকে ফোন করতে হল না। প্রাতঃকৃত্য সেরে বাথরুম থেকে বেরোচ্ছি, এমন সময় দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল। ঘড়িতে এখন ছ’টা বাজে, এত সকালে কে এল? বিস্মিত দৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। টাপুরদি আমাকে দাঁড়াতে বলে নিজে গিয়ে দরজা খুলল। অবাক হয়ে দেখলাম রিদ্ধিমা দাঁড়িয়ে আছে। চোখের নীচে কালি, মাথার চুল উশকোখুশকো। ভীষণ উত্তেজিত দেখাচ্ছে ওকে। টাপুরদি তার হাত ধরে ভেতরে এনে বসাল। আমি এক গ্লাস জল এনে রিদ্ধিমার হাতে দিলাম। ঢক ঢক করে পুরো জলটা একনিশ্বাসে খেয়ে নিয়ে বলল, ‘একটা ফোন এসেছিল মিস ব্যানার্জি।’
‘ফোন? কার ফোন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘আমি জানি না। মোবাইলে কোনো নম্বর শো করেনি। নম্বর মাস্ক করা ছিল। প্রাইভেট নম্বর লেখা দেখাচ্ছিল। তবে কোনো মহিলার গলা’, উত্তেজিত কণ্ঠে বলল রিদ্ধিমা।
‘কী বলল?,’ টাপুরদি জানতে চাইল।
‘বলল তন্ময়কে না খুঁজতে। সময় হলে ও নিজেই আসবে। বেশি খোঁজাখুঁজি করলে ওর বিপদ বাড়বে বই কমবে না।’ রিদ্ধিমা কাতর স্বরে বলল, ‘এবার কী হবে মিস ব্যানার্জি? তার মানে কি তন্ময়কে কেউ কিডন্যাপ করেছে?’
‘সেটা আমার মনে হয় না,’ চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি।
‘তাহলে ওই মহিলা কে? সে কীভাবে তন্ময়ের ব্যাপারে জানে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না এসব কী হচ্ছে। তন্ময়ের কোনো ক্ষতি হবে না তো? আমার খুব ভয় করছে মিস ব্যানার্জি।’ বলে দুই হাতে মাথার চুল খামচে ধরল রিদ্ধিমা। মাথা নীচু করে বসে রইল অনেকক্ষণ। টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখল। বলল, ‘ধৈর্য ধরুন রিদ্ধিমা। একটু সময় দিন আমায়, প্লিজ।’
‘আর কত ধৈর্য ধরব মিস ব্যানার্জি? আর কত সময়?’ কেঁদে উঠল রিদ্ধিমা, ‘আমি যে আর পারছি না। জানেন সারারাত আমি জেগে থাকি। সামান্য শব্দ হলেই চমকে উঠি। মনে হয় এই বোধ হয় তন্ময় ফিরে এল। মনে হয়, আমি ঘুমিয়ে পড়লে যদি তন্ময় এসে ফিরে যায়? আমার শোওয়ার ঘরের জানালা দিয়ে রাস্তা দেখা যায়। বার বার গিয়ে জানালায় দাঁড়াই আমি। ভিড়ের মধ্যে ওকেই খুঁজি। আমি নিজেও কখনো বুঝিনি যে তন্ময় আমার ঠিক কতটা জুড়ে আছে।
‘জানেন মিস ব্যানার্জি, ছোটো থেকে অনেক লড়াই করে বড়ো হয়েছি। বাবাকে জ্ঞান হওয়া ইস্তক চোখেই দেখিনি। আমার মার জীবনে তাঁর কাজই ছিল সব কিছু। নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আমি কাজের লোকের কাছে বড়ো হয়েছি। শেষ জীবনে মানসিক সমস্যা হয়েছিল মার। শিশুর মতো আগলাতে হত সবসময়। সেও এক লড়াই। কোনো পুরুষকে সহ্য করতে পারতেন না। এমনকী আমাকেও সহ্য করতে পারতেন না মাঝে মাঝে। ভাবতে পারেন, তাঁর মতো একজন একনিষ্ঠ সাংবাদিক নিউজ চ্যানেলে পলিটিক্যাল নিউজ দেখলে মাঝে মাঝে হিংস্র হয়ে উঠতেন। হাতের কাছে যা পেতেন ছুড়ে মারতেন টিভিতে। মাকে সামলাতে গিয়ে নিজের কেরিয়ারে কনসেনট্রেট করতে পারলাম না।’
‘মডেল ছিলাম আমি। অভিনেত্রী হতে চেয়েছিলাম। সামান্য রোলের বিনিময়ে পেতাম একের পর এক কাস্টিং কাউচের অফার। সারাটা জীবন পুরুষের চোখে শুধু লুব্ধ দৃষ্টিই দেখেছি। তন্ময়ই প্রথম মানুষ, যে আমায় আমার সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তেও ভালোবেসে গ্রহণ করেছে। আমার ভালো মন্দ সবটুকু নিয়ে আমায় ও ভালোবেসেছে। আমার কষ্টটুকুকেও ও আপন করে নিয়েছে। ও আমায় খুব ভালোবাসে, এত ভালো আমায় কেউ কোনোদিন বাসেনি। আমার জন্য ও সব করতে পারে। ওকে ছাড়া বাঁচতে হলে আমার মরে যাওয়া ভালো।’
কাঁদছে, ভীষণ কাঁদছে রিদ্ধিমা। আমি অসহায় দৃষ্টিতে তাকালাম টাপুরদির দিকে। টাপুরদি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। বোধ হয় ইচ্ছে করেই ওকে কাঁদতে দিচ্ছে। ওর অবরুদ্ধ কষ্টটুকু, কাউকে বলতে না পারা যন্ত্রণাটুকু আমাদের সামনে মুক্ত করে হালকা হতে চাইছে ও। টাপুরদি সোফায় গিয়ে রিদ্ধিমার পাশে বসল। রিদ্ধিমার পিঠে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘রিদ্ধিমা, আমি এই মুহূর্তে হয়তো তন্ময়কে আপনার কাছে এনে দিতে পারছি না। বাট ট্রাস্ট মি, আমি বলছি, তন্ময় ঠিক আছে। হয়তো ও বিপদের মধ্যে আছে। কিন্তু, সুরক্ষিত আছে ও। সেই বিপদ থেকে ওকে বার করে নিয়ে আসার জন্যই আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। যাতে ও সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত হয়ে আপনার কাছে ফিরে আসতে পারে। আমার ধারণা ফোনটা ও-ই কাউকে দিয়ে করিয়েছে আপনাকে, যাতে আপনি দুশ্চিন্তা না করেন।’
‘আপনি বলছেন? তন্ময় ঠিক আছে?’ রিদ্ধিমা প্রশ্ন করল, ঠিক যেভাবে ডুবন্ত মানুষ খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরতে চায় সেভাবে।
‘আছে রিদ্ধিমা। তন্ময়কে যারা খুঁজছে তারা জিনিসটা না পাওয়া অবধি ওর কোনো ক্ষতি করবে না। আর সেটা যে ওরা পায়নি এখনও, সেই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। বাই দ্য ওয়ে, ফোনটা যে মহিলা করেছিল, তার গলাটা কেমন ছিল?’
রিদ্ধিমা মনে করার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘কেমন যেন, একটু ধরা ধরা!’
লক্ষ করলাম টাপুরদির ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল।
রিদ্ধিমা মাথা নীচু করে নীরবে বসে রইল অনেকক্ষণ। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি তবে আসি।’
