কৃষ্ণগহ্বর – ৫

‘তন্ময় যে ডকুমেন্টস চুরি করেছে, সেটা ধরা পড়ল কীভাবে?’

আমরা বসে আছি ই এম বাইপাসের ধারে একটি ক্যাফেতে। তন্ময়ের সহকর্মী রূপম মিনিট পাঁচেক হল এসে পৌঁছেছে। রূপম এভাবে দেখা করতে প্রথমে ভয় পাচ্ছিল। এজেন্সিতে তন্ময়ের ব্যাপারটা নিয়ে ইন্টারনাল এনকোয়ারি শুরু হয়েছে। রিদ্ধিমা অনেক কাকুতিমিনতি করায় কেবল মিনিট পনেরো সময় দিতে রাজি হয়েছে রূপম।

‘রাতের বেলা অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নিজের এমপ্লয়ি পাস ব্যবহার করে অফিসে ঢুকেছিল তন্ময়। গার্ডকে বলেছিল, ফ্ল্যাটের চাবি ভুল করে ফেলে গেছে। সেটা নিতে হবে। সিসিটিভিতে দেখা গিয়েছে, তন্ময় নিজের সিস্টেমে বসে পেনড্রাইভে কোনো কিছু স্টোর করছে। তারপর চুপচাপ বেরিয়ে গেছে অফিস থেকে,’ বলল রূপম।

‘তাই যদি হয়, তাহলে সেই কাজটা তো তন্ময় অফিস টাইমেই করতে পারত। সবাই নিশ্চয়ই সারাদিন তার দিকে তাকিয়ে বসে থাকেনি। অফিসে কাজের ফাঁকে সুযোগ বুঝে যা ডকুমেন্ট বার করার, সেটা সহজেই করে নিতে পারত। কেউ টেরও পেত না। এত রিস্ক নেওয়ার তো কোনো দরকার ছিল না। তা ছাড়া তন্ময় নিশ্চয়ই জানত, ফ্লোরে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। সবাই জেনেই যাবে ওর চুরির কথা, তাই না? আপনার কী মনে হয় রূপমবাবু? ও বোকার মতো এ রকম রিস্ক কেন নিল?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।

‘নো আইডিয়া! কেন যে তন্ময় এমন বোকার মতো একটা কাজ করল?’ বিমর্ষ মুখে বলল রূপম।

‘হুম, অফিসের ভিতর তন্ময়ের কোনোরকম সাস্পিশাস অ্যাক্টিভিটি সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে কি?’ টাপুরদি জানতে চাইল।

‘আমি ঠিক বলতে পারব না। আমি তো ভিডিয়োটা দেখিনি। অফিসে যেটুকু কানাঘুসো শুনেছি, তার বেসিসে বললাম। রিদ্ধিমাকে জানানোটা দরকার বলে মনে হল, তাই ফোন করেছিলাম ওকে। মনে হয়েছিল, জানলে একমাত্র ওই জানতে পারে তন্ময় কোথায় আছে,’ রিদ্ধিমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল রূপম। মনে হল, ওর এখনও বিশ্বাস যে রিদ্ধিমা তন্ময়ের ব্যাপারে জানে।

রিদ্ধিমা উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘আমি কী করে জানব রূপম? আমি জানি না বলেই তো আপনাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলাম আপনি কিছু জানেন কি না। এমনকী ও যে অফিসে যাচ্ছে না, সেটাও আপনার কাছেই প্রথম জেনেছিলাম আমি।’

টাপুরদি এবার রিদ্ধিমাকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘রূপম, তন্ময় কোন ধরনের প্রজেক্টে কাজ করছিল, আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন?’

রূপমের অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট দ্বিধা দেখা গেল। তারপর বলল, ‘দেখুন, এসব এজেন্সির হাইলি কনফিডেনশিয়াল ইনফর্মেশন। এভাবে বলাটা…’

‘প্লিজ রূপম! উই নিড ইয়োর হেল্প,’ গলা নামিয়ে কণ্ঠস্বরে হালকা মাদকতা মিশিয়ে রূপমের চোখে চোখ রেখে বলল টাপুরদি। উফফ, টাপুরদি পারেও বটে! বেচারা রূপম কেমন যেন লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, ‘না না, তন্ময়ের ব্যাপারে হেল্প করতে চাই বলেই তো রিদ্ধিমা ডাকতেই এসেছি। আসলে এসব ব্যাপার একটু সেন্সিটিভ তো। তাই আর কী…! তন্ময় খুব সিনসিয়ার ছিল কাজের ব্যাপারে। শুরুতে জাস্ট ডেটা এন্ট্রির কাজই করত, যেমন সব ফ্রেশাররাই করে থাকে। কিন্তু খুব কম সময়ের মধ্যে অনেকটা প্রগ্রেস করে ফেলেছিল ও। গত তিন বছরে বেশ কিছু ইমপর্ট্যান্ট প্রজেক্টে যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে কাজ করেছিল তন্ময়। প্রমোশনও হয়েছিল। ইভেন সিইও স্যারও ওর উপরে যথেষ্ট ভরসা করতেন। গত বছরের মাঝামাঝি দিকে আমি আর তন্ময় একসঙ্গে একই প্রজেক্টে কাজ শুরু করি।’

‘কী প্রজেক্ট?’ জানতে চাইল টাপুরদি।

একটু ইতস্তত করল রূপম। তারপর বলল, ‘দেখুন, আমি আপনাদের জানিয়েছি এই কথাটা বাইরে এলে আমি কিন্তু ভীষণ বিপদে পড়ে যাব। চাকরি তো যাবেই, আরও যে কী কী হতে পারে, ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া।’

‘কেউ জানবে না, আই প্রমিস। এই কথাগুলো আমাদের তিনজনের বাইরে বেরোবে না,’ রূপমকে আশ্বস্ত করে বলল টাপুরদি।

রূপম গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, ‘আমাদের এজেন্সি বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিকে ফিজিক্যাল ও ডেটা সিকিউরিটি প্রোভাইড করে। বিভিন্ন সিকিউরিটি অ্যাপ তৈরি করে। এ ছাড়াও বিভিন্ন হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্টদের রিকোয়ারমেন্ট মতো ইনভেস্টিগেশনসও করে থাকে। পুরো ব্যাপারটাই একদম প্রাইভেট অ্যাফেয়ার। গত বছর একটা ভীষণ ইমপর্ট্যান্ট, কিন্তু হাইলি কনফিডেনশিয়াল প্রজেক্ট আসে আমাদের এজেন্সিতে। এই বছর মার্চের শেষে ছিল ইলেকশন। কার তরফ থেকে এসেছিল প্রজেক্টটা তা আমাদের জানানো হয়নি। অফিশিয়ালি এর সঙ্গে সরকারের কোনো যোগ ছিল না। অমিয় চক্রবর্তীর অতীত সম্পর্কে যতটা সম্ভব খুঁড়ে বার করার নির্দেশ ছিল আমাদের উপর, যতটা লুপহোলস পাওয়া যায়, ততই ভালো। সেইসব ইনফর্মেশন যে অমিয় চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ইলেকশন ক্যামপেইনে ব্যবহার করা হবে, তা বুঝতে অসুবিধে হয় না।’

টাপুরদি আড়চোখে আমার দিকে তাকাল। তারপর রূপমের দিকে চেয়ে বলল, ‘হুম, তারপর? পেলেন কিছু সেরকম গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য?’

‘সেরকম কিছু নয়। রাজনৈতিক নেতাদের নানারকম ডার্ক সিক্রেটস তো থাকেই। কিন্তু অমিয় চক্রবর্তী লোকটার অতীতে আমরা সিরিয়াস কোনো অফেন্স খুঁজে পাইনি। হয় তিনি সারপ্রাইজিংলি অনেস্ট, নইলে অত্যন্ত চালাক। অনেক আগে টুকটাক যেটুকু বা দাগ পাওয়া গেছিল, এখন এতদিন পরে সেগুলো দিয়ে সেরকম কিছু পলিটিক্যাল ফায়দা তোলা সম্ভব ছিল না বিরোধীদের পক্ষে। আমরা একটা টিম হিসেবে কাজ করছিলাম। উপর লেভেলের নির্দেশমতো পুরো টাস্কটা ভাগ করে নিয়েছিলাম। সকলে নিজের নিজের ফাইন্ডিংসের রেকর্ড রাখত। সপ্তাহে একবার মিটিং করে সেইসব রেকর্ডসের মধ্যে যেগুলো ইমপর্ট্যান্ট, সেগুলো ফাইনাল করে রিপোর্ট পাঠাতাম। টিম হিসেবে কাজ করলেও সকলের মধ্যেই একটা চাপা প্রতিযোগিতা চলত, কে কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন খবর সংগ্রহ করতে পারে।’

‘ইন্টারেস্টিং,’ মাথা নেড়ে বলল টাপুরদি, ‘তাহলে আপনি বলতে চাইছেন অমিয় চক্রবর্তীর এগেন্সটে সেরকম কোনো খবর আপনারা জোগাড় করতে পারেননি?’

দুই পাশে মাথা নাড়ল রূপম। বলল, ‘এমন কিছু অবশ্যই নয়, যেগুলো ব্যবহার করে ভদ্রলোকের খুব বেশি ক্ষতি করা চলে।’

ঘড়ির দিকে দেখল রূপম। আমিও দেখলাম। পনেরো মিনিটের জায়গায় আধ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। রূপম তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি এখন চলি।’ তারপর একবার রিদ্ধিমার দিকে, একবার টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি যেটুকু জানতাম, বলেছি আপনাদের। এর বেশি সাহায্য করা সম্ভব হবে না আমার পক্ষে। আমিও চাই তন্ময় ফিরে আসুক। সব মিটে যাক। কিন্তু প্লিজ, আমাকে আর এসবের মধ্যে জড়াবেন না।’

রিদ্ধিমা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘প্লিজ রূপম, তোমার কোনো আইডিয়া আছে তন্ময় কোথায় যেতে পারে?’

রূপম স্থির চোখে রিদ্ধিমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সেটা তো তোমার জানার কথা, রিদ্ধিমা। তবে ও ফোন করলে ওকে বলে দিয়ো যেন ফিরে আসে। নিজের তরফ থেকে ওর বক্তব্য এজেন্সির সামনে রাখার সুযোগ আছে ওর কাছে। না হলে কিন্তু পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। আরও বেশি বিপদে পড়বে ও। আই থিঙ্ক ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আই মিন।’

রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে সোফায় বসলাম আমি আর টাপুরদি। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অর্জুনদার সঙ্গে কথা হল, টাপুরদি?’

টাপুরদি মাথা নাড়ল। বলল, ‘অমিয় চক্রবর্তী মারা যাওয়ায় এখন পুলিশের উপর খুব চাপ। পুরো ডিপার্টমেন্টের সম্মানের ব্যাপার। এখন ওকে ফোন করে বিরক্ত করার মানে হয় না।’

‘হুম,’ মাথা নেড়ে বললাম আমি, ‘যাক গে, তোমার দুঃখ ছিল মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যু রহস্যে মাথা ঘামানোর সুযোগ পাচ্ছ না বলে। এবার তন্ময়ের কেসের সূত্রে সেই অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গেই জড়িয়ে গেলে।’

টাপুরদি চিন্তিত মুখে বলল, ‘কেসটা খুব সেনসিটিভ রে মিতুল। তন্ময়কে নিয়ে সত্যিই চিন্তা হচ্ছে।’

‘তোমার কি মনে হয় তন্ময় এমন কিছু জানতে পেরেছিল, যেটা লুকোনোর জন্যই ও পালিয়েছে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘হতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, জানতেই যদি পারে সেটা সে এজেন্সিকে না জানিয়ে পালাল কেন? এজেন্সির হাতে সেরকম গোপন কোনো তথ্য তুলে দিতে পারলে তো আখেরে ওরই লাভ হত। প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট বাঁধা ছিল। সেটা না করে ও সেই তথ্য নিয়ে পালাল কেন? আবার দেখো, রিদ্ধিমার কথামতো, পালানোর ক’দিন আগে থেকেই তন্ময় কিছুটা ডিস্টার্বড ছিল। এবার প্রশ্ন হল, কেন? ওর হাতে যদি তেমন ইমপর্টেন্ট কোনো তথ্য এসে থাকে, ওর তো খুশি হওয়ার কথা, তাই না? তাহলে ও অত ভয় কেন পেল? গোলমাল আছে রে মিতুল, পুরোদস্তুর গোলমাল আছে। এক কাজ করা যাক, ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসের সম্পর্কে ইন্টারনেটে কী কী পাওয়া যায়, খুঁজে দেখি,’ বলে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি। ল্যাপটপটা নিয়ে ফিরে এসে সোফাতে বসল।

সার্চ ইঞ্জিনে এজেন্সির নামটা দিয়ে সার্চ করতে অনেকগুলো লিংক এল। প্রথম লিংকটা এজেন্সির নিজস্ব ওয়েবসাইটের লিংক, সেটাতেই ক্লিক করল টাপুরদি। পরবর্তী প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কোম্পানির সাইটে থাকা প্রতিটি ছবি, প্রতিটি অক্ষর মন দিয়ে বুঝে নিল। আমি কিছুক্ষণ দেখার পর টিভিতে নিউজ চালিয়ে বসলাম। আজ খুব স্বাভাবিক কারণেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান করা যায়নি। অমিয়বাবুর কেন্দ্রে ফের উপনির্বাচন করতে হবে। দলীয় ও বিরোধী পক্ষের নেতারা বিভিন্ন বক্তব্য রাখছেন। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বিনয় বোস অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন, অমিয়বাবুর মতো মহান নেতার মৃত্যুতে রাজ্য রাজনীতিতে গভীর শূন্যতা তৈরি হল। রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভেদ থাকলেও অমিয় চক্রবর্তীর সততা ও লড়াকু মনোভাবের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিল। বিনয়বাবুর বক্তব্য শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল আজ ক্যাফেতে শোনা রূপমের কথাগুলো। বিনয়বাবুর পার্টির তরফ থেকে ইউনিকর্ন এজেন্সিকে অ্যাপয়েন্ট করা হয়েছিল অমিয়বাবুর লুপহোলস খোঁজার জন্য। কী আশ্চর্য এই রাজনীতির জগৎটা!

টাপুরদির ফোনটা ডাইনিং টেবিলের উপর বাজছে। উঠে গিয়ে ফোনটা এনে দিলাম টাপুরদির হাতে, অর্জুনদার ফোন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। টাপুরদিকে শুভরাত্রি জানিয়ে শুতে গেলাম ঘরে। অর্জুনদা এত ব্যস্ততার মধ্যেও টাপুরদিকে ফোন করেছে। এর মধ্যে আমি আর থাকি কেন?

টাপুরদির ডাকে ঘুম ভাঙল, দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম সবে ভোর পাঁচটা বাজে। বালিশে মুখ গুঁজে বললাম, ‘এত ভোরে উঠে কী করব?’

টাপুরদি নিষ্ঠুরের মতো পরদা টেনে খুলে দিল। সকালের সূর্যের আলো আমার শোয়ার ঘরে ঢুকে সারা ঘর ঝলমল করে উঠল, ঘুমের রেশটুকু নিমেষে কেটে গেল। বিছানায় উঠে বসলাম। বললাম, ‘কী ব্যাপার বলো তো? কীভাবে এগোবে কিছু ঠিক করলে?’

‘আমরা আজ জামশেদপুর যাব। তাড়াতাড়ি স্নান করে রেডি হয়ে নে, কুইক। সাড়ে সাতটায় হাওড়া থেকে ট্রেন। ছ’টার মধ্যে এখান থেকে বেরোতে হবে। দেরি হলে ট্রেন মিস করব,’ বলল টাপুরদি।

‘জামশেদপুরে?’ প্রশ্নটা করেই মনে হল তন্ময়ের দিদির বাড়ি জামশেদপুরে। রিদ্ধিমার মুখে শুনেছিলাম।

‘কোথাও থেকে তো শুরু করতে হবে, তাই না? জামশেদপুর থেকেই শুরু করা যাক। দেখা যাক, যদি কিছু থ্রেড পাওয়া যায়!’ টাপুরদি বলল।

দেরি না করে বিছানা ছাড়লাম। আধ ঘণ্টার মধ্যে স্নান সেরে ত্বরিতগতিতে তৈরি হয়ে নিলাম। আদ্যন্ত স্বাস্থ্য সচেতন টাপুরদি দেখি তড়িঘড়ি করে কতকটা বাধ্য হয়েই ইন্সট্যান্ট নুডলস বানিয়ে ফেলেছে। দুই জনে গোগ্রাসে সেটাই গলাধঃকরণ করলাম। আর সময় নেই, বেরোতে হবে। টাপুরদি ক্যাব বুক করে ফেলল। সব সেরে যখন আমরা ক্যাবে উঠলাম, ঘড়িতে ঠিক পাঁচটা পঞ্চান্ন বাজে।

নম্বর মিলিয়ে ট্রেনের জানালার ধারের সিটে গুছিয়ে বসে টাপুরদিকে প্রশ্ন করলাম, ‘তন্ময়ের সঙ্গে তো শুনেছি ওর দিদির সম্পর্ক ভালো ছিল না। যোগাযোগও তেমন একটা ছিল না। ওখানে গিয়ে কি লাভ কিছু হবে আদৌ? তোমার কি মনে হয় ও কলকাতা থেকে পালিয়ে জামশেদপুর যাবে?’

জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল টাপুরদি, ‘না রে। ওকে জামশেদপুরে পাব, সেই আশা নিয়ে ওখানে যাচ্ছি না। বরং আমি নিশ্চিতভাবে জানি, ওকে ওখানে পাব না। সমস্যা হল, এই কেসটা বলতে পারিস ডেডলক হয়ে আছে। ঢোকার দরজা সব বন্ধ। এজেন্সির ভিতরে ঢুকে আমরা ইনভেস্টিগেট করতে পারব না। ওখানে আদতে কী হয়েছিল সেটা বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। এজেন্সির সঙ্গে আমাদের যে ক্ষীণ যোগসূত্র ছিল রূপম, সেও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে সে কোনোরকম সাহায্য করতে পারবে না। এগোতে না পারলে কেসটা ছেড়ে দিতে হয়। তার আগে একটু চেষ্টা করে দেখতে চাই রে। দেখা যাক, অন্য রাস্তা দিয়ে ঢোকা যায় কি না!’

‘অনেক বছর হয়ে গেল তন্ময়ের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই,’ গম্ভীর মুখে বলল সনকা আইচ, তন্ময়ের দিদি। টাপুরদি সম্ভবত রিদ্ধিমার থেকে জোগাড় করেছিল তন্ময়ের দিদির ঠিকানা। এখানে এসে পরিচয় দিয়ে আসার কারণ জানাতে প্রায় গলাধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বেশ বোঝা গেল, দিদি ও ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কটা যারপরনাই তিক্ত। অথচ মাতৃপিতৃহীন ভাই-বোনের ক্ষেত্রে তো উলটোটাই হওয়ার কথা ছিল।

অনেক সাধ্যসাধনার পর বেশি সময় নষ্ট করব না কথা দিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি পেয়েছি আমরা। ছোট্ট দোতলা বাড়ি, একতলাটা ভাড়া দেওয়া। দোতলায় আইচ দম্পতি থাকেন। সনকাদেবীর স্বামী বাড়িতে নেই। সনকাদেবীকে দেখে মনে হল আমাদের উপস্থিতিতে তিনি যথেষ্ট বিরক্ত। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই জানিয়ে দিলেন তন্ময়ের কোনো খোঁজ তিনি রাখেন না, রাখার প্রয়োজনও বোধ করেন না।

ঘরে এসে বসলাম। ছিমছাম সাজানো গার্হস্থ। সনকাদেবীর বয়স পঁয়তাল্লিশের কম হবে বলে মনে হয় না। মোটাসোটা থলথলে চেহারার কারণে আরও বেশি বয়স্ক লাগে। কিছু মানুষ আছে যাদের মুখের রেখায় চিরস্থায়ী অসন্তাোষ বিরাজ করে। সনকাদেবীও মনে হল সেই গোত্রের মানুষ। অযাচিত হয়েই আমরা সোফায় বসলাম। গৃহকর্ত্রী দাঁড়িয়েই রইলেন ঠায়। যেন আমাদের বিদায় করেই একবারে বসবেন তিনি। আমার নিজেরও এক মুহূর্ত আর সেখানে বসতে ইচ্ছে করছিল না। টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। টাপুরদি শান্ত গলায় বলল, ‘সেরকম কেন, সেটাই তো জানতে চাইছি।’

উত্তেজিত ভঙ্গিতে সনকাদেবী বললেন,‘সেটা আপনাকে কেন বলব? আমাদের পারিবারিক ব্যাপার আপনার কাছে ডিসক্লোজ করব কেন? দেখুন, আপনাদের এখানে আসাটা আমার হাজব্যান্ড পছন্দ করবেন না। এখান থেকে আপনারা চলে যান।’

‘পারিবারিক ব্যাপার?’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি, ‘কেমন পরিবার বলুন তো? আপনার একমাত্র ভাই মিসিং, তার কোনো খোঁজই রাখেন না আপনি। অনাথ ভাইয়ের সমস্ত সম্পত্তি গাপ করে তাকে পথে বসানোটাই বুঝি আপনার পারিবারিক মূল্যবোধ?’

‘কার সম্পত্তি? কে গাপ করেছে?’ দপ করে জ্বলে উঠলেন সনকাদেবী।

টাপুরদি একইরকম নির্লিপ্ত গলায় বলল, ‘কার আবার সম্পত্তি? বাবামায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকার আপনারা ভাই-বোন দুজনে হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সকলেই জানেন আপনারা তন্ময়বাবুর নাবালকত্বের সুযোগ নিয়ে ওকে বঞ্চিত করেছেন।’

টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল টাপুরদি বোধ হয় সনকাদেবীকে ইচ্ছে করে আরও বেশি করে রাগিয়ে দিচ্ছে। সনকাদেবীর মুখখানি আগুনের মতো গনগনে লাল হয়ে উঠেছে। ভদ্রমহিলা বোধ হয় উচচ রক্তচাপের রোগী, কিছুটা স্নায়বিক প্রকৃতির। ঘোঁতঘোঁতে স্বরে বলে উঠলেন, ‘কী জানেন আপনি আমাদের ব্যাপারে? হ্যাঁ? কে লাগিয়েছে আপনাকে আমাদের পেছনে? তন্ময়, না? বেশি চালাক ভাবে ও নিজেকে? জেনে রাখুন, আমরা যদি চাইতাম, ওকে পড়াশোনা শেখানোর টাকাটুকুও দিতাম না, বোর্ডিংয়ে রেখে পড়ানোর খরচও বইতাম না। ঘাড় ধরে রাস্তায় বের করে দিলেও কেউ কিছু বলতে পারত না আমাদের। আইনত আমার বাবার সম্পত্তিতে তন্ময়ের কোনো অধিকারই নেই। যেটুকু দিয়েছি, দয়া করে দিয়েছি। স্বামীর বিরুদ্ধে, পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে দিয়েছি ওকে। গিয়ে বলে দেবেন তন্ময়কে। আইন আদালত করতে চাইলে আমরাও ছাড়ব না। তাতে আমাদের কিছু যাবে আসবে না, ওরই সম্মান নষ্ট হবে।’

টাপুরদিও এবার যেন তন্ময়ের হয়ে ওকালতি করতে শুরু করল। গম্ভীর মুখে বলল, ‘এ-রকম আপনি কীভাবে বলতে পারেন? তন্ময় যদি তার বাবামায়ের সম্পত্তি ক্লেইম করতে চায়, কোর্ট অফকোর্স ওর ডিমান্ডকে গুরুত্ব দেবে, তাই না? আপনারা অন্যায়ভাবে ওর ভাগের সম্পত্তিও দখল করে বসে আছেন।’

‘অন্যায়ভাবে?’ প্রায় গর্জন করে উঠলেন সনকাদেবী, ‘কে বলেছে অন্যায়ভাবে? ন্যায়ত আমার বাবার অর্জিত অর্থের উপর ওর কোনো অধিকারই নেই। কারণ ওর সঙ্গে আমাদের বংশের কোনো সম্পর্কই নেই।’

‘মানে?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘কেন? যে আপনাকে এখানে ওকালতি করতে পাঠিয়েছে, সে বলেনি আপনাকে?’ মুখ বেঁকিয়ে বিরক্তি ভরে জিজ্ঞাসা করলেন সনকাদেবী। বললেন, ‘না জেনে থাকলে জেনে রাখুন, তন্ময় আমার মায়ের অবৈধ সন্তান। যদিও ওই মহিলাকে মা বলতে ঘেন্না করে আমার। ছোটো থেকে তন্ময়কে নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তি দেখে বড়ো হয়েছি। বাবা হার্ট অ্যাটাক করে মারা যানও সেই অশান্তির জেরেই,’ ভদ্রমহিলা জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে বলতে থাকলেন, ‘পাপ পাপ, বুঝলেন না? মায়ের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছিল। গলায় দড়ি দিলেন তাই। আমি জানি না কী হয়েছিল। ততদিনে আমি বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়িতে। তন্ময় জানলেও জানতে পারে। তবে যা হয়েছে বেশ হয়েছে। নিজের মা বলে তার প্রতি আমার একটুও করুণা হয় না। আর শুনুন, আমার মা চাকরি করতেন। মায়ের মৃত্যুতে যা টাকাপয়সা মায়ের ছিল, তা আমরা পুরোটাই তন্ময়ের নামে করে দিয়েছিলাম। যদিও মায়ের গর্ভজাত সন্তান হিসেবে তাতে আমারও ভাগ ছিল, কিন্তু আমি সেই টাকা ছুঁইনি। আমি ঘেন্না করি আমার মাকে। ওই টাকা দিয়েই নামি বোর্ডিংয়ে থেকে লেখাপড়া করেছে তন্ময়। তবে আমার বাবার সম্পত্তি থেকে এক পয়সাও পাবে না ও। আপনারা যা করতে পারেন, করে নিন গে।’

‘তন্ময় তাহলে জানে ওর জন্মবৃত্তান্ত?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘জানবে না কেন? সবই জানে,’ বললেন সনকাদেবী, ‘এসব কথা কি চাপা থাকে? জন্ম থেকেই বাবা-মায়ের অশান্তিগুলো তো ও-ও দেখেছে। ঝগড়াঝাঁটি তো ওকে লুকিয়ে কিছু হয়নি।’

‘শেষ প্রশ্ন,’ উঠে দাঁড়িয়ে বলল টাপুরদি, ‘আপনার আর বেশি সময় নেব না। কিন্তু এই প্রশ্নটার উত্তর আশা করি পাব আপনার থেকে।’

সনকাদেবী উত্তর দিলেন না, শুধু তাকালেন টাপুরদির মুখের দিকে। টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘তন্ময়ের বাবা কে?’

‘আমি জানি না,’ বললেন সনকাদেবী। তাঁর মুখের রেখা বেশ কঠিন। বোঝা গেল, জানলেও বলবেন না। একটু থেমে বললেন, ‘কেন, তন্ময়কেই জিজ্ঞাসা করে নিন না। সে-ই সব বলবে।’

টাপুরদি ব্যাগ থেকে নিজের কার্ড বের করে সনকাদেবীর হাতে দিল। বলল, ‘যদি কিছু বলতে চান, কিছু মনে পড়ে আমাকে ফোন করে জানাবেন। তন্ময় খুব বিপদের মধ্যে আছে। হয়তো আপনার দেওয়া কোনো ছোটোখাটো ইনফর্মেশনও ওকে বাঁচাতে আমাদের কাজে লাগতে পারে।’

আমাদের বাইরের গেট অবধি এগিয়ে দিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে গেটটা টেনে বন্ধ করলেন সনকাদেবী। তারপর হঠাৎ কী মনে করে বললেন, ‘আপনি ডিটেকটিভ?’

টাপুরদি কিছু বলল না, শুধু হাসল। সনকাদেবী একটু দ্বিধা করে মৃদুস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন আছে তন্ময়? কী হয়েছে ওর? ও একদম মায়ের মতো দেখতে ছিল ছোটো থেকে। অনেকদিন দেখি না ওকে!’

‘দেখতে চেয়েছিলেন কখনো?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

সনকাদেবী কিছু বললেন না, শুধু উৎগত দীর্ঘনিশ্বাস চেপে বললেন, ‘আপনারা এখন আসুন। আমার স্বামীর ফেরার সময় হল। আর আসবেন না এখানে।’

ফোনটা রিং হয়ে হয়ে বেজে গেল। আবার কল করতে কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওই প্রান্তে রিদ্ধিমার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘সরি, অন্য ঘরে ছিলাম। ফোনের রিং শুনতে পাইনি। কিছু খবর পেলেন তন্ময়ের?’

ফোনের স্পিকার অন রেখেছিল টাপুরদি। সব কথাই শুনতে পাচ্ছিলাম আমি। টাপুরদি রিদ্ধিমার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, ‘রিদ্ধিমা, আপনি কি আমায় বলতে পারবেন তন্ময়ের মা কোথায় চাকরি করতেন? আর হ্যাঁ, ওর মায়ের নাম কী?’

‘তন্ময়ের মা?’ রিদ্ধিমার কণ্ঠে বিস্ময়।

‘হ্যাঁ, জানেন আপনি কিছু? এনিথিং ক্যান বি হেল্পফুল!’

‘যতদূর জানি, বিরাটির দিকে কোনো প্রাইমারি স্কুলের টিচার ছিলেন। কোথাকার বলতে পারব না। নাম অনামিকা রায়। আসলে তন্ময় ওর অতীতের ব্যাপারে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করত না। প্রথম প্রথম আমি জিজ্ঞাসা করতাম, ও ভাসা ভাসা জবাব দিয়ে এড়িয়ে যেত বরাবর। তারপর মনে হয়েছিল ছোটোবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে, দিদির থেকে আঘাত পেয়ে ওর মনের ভিতর যে ক্ষতটা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা ওকে যন্ত্রণা দেয়। সেটা থেকে পালাতে চায় ও। তাই পরে আর আমিও কিছু জিজ্ঞাসা করতাম না। আসলে কী জানেন তো মিস ব্যানার্জি, আমরা দুজনেই নির্বান্ধব, ভীষণ একা। আমাদের একাকীত্ব ও তিক্ত শৈশবের যন্ত্রণা আমাদের বেঁধেছিল। তন্ময় যদি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়, এই পৃথিবীতে কারও কিছু যাবে আসবে না বিশ্বাস করুন। কিন্তু আমি আবার একা হয়ে যাব।’

টাপুরদি একটু চুপ করে রইল। ফোনের ওপ্রান্তে রিদ্ধিমার আবেগ, যন্ত্রণার তরঙ্গ আমাদেরও স্পর্শ করছিল। টাপুরদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর মুখের রেখাগুলি কোমল হয়ে এসেছে। নীরবতা ভঙ্গ করে টাপুরদি বলল, ‘তন্ময়কে খুঁজে পেতে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব রিদ্ধিমা। কিন্তু সে জন্য আমাদের ওর সম্পর্কে আরও জানতে হবে। আর ওর এজেন্সিতে ঢুকতে হবে, যেভাবেই হোক। আপনাকে কোনোভাবে রূপমকে কনভিন্স করতে হবে। পারবেন?’

‘না মিস ব্যানার্জি, আমার মনে হয় না রূপম আর রাজি হবে,’ বিষণ্ণ স্বরে বলল রিদ্ধিমা।

‘ওই অফিসে আপনাকে কে কে চেনে তন্ময়ের গার্লফ্রেন্ড হিসেবে?’ টাপুরদি জানতে চাইল।

‘দুই-তিন জন। তন্ময় ব্যক্তিগত জীবন সবার সঙ্গে শেয়ার করা পছন্দ করত না। একটু চুপচাপ, মুখচোরা স্বভাবের ছিল ও,’ বলল রিদ্ধিমা।

‘তার মানে আপনার পক্ষে ওই অফিসে ঢোকা সেফ হবে না। সেক্ষেত্রে আমায় যেতে হবে,’ বলল টাপুরদি।

‘আপনি যাবেন? ইউনিকর্নের অফিসে? সেটা বেশি রিস্ক নেওয়া হয়ে যাবে না? ওদের সিকিওরিটি খুব স্টং। ঢুকবেন কী করে?’ রিদ্ধিমার কণ্ঠে বিস্ময়।

‘সেই ব্যবস্থা আপনাকে করতে হবে রিদ্ধিমা। আপনার জার্নালিজমের ব্যাকগ্রাউন্ড আমাদের সাহায্য করবে। আপনি আমাদের দুইজনের জন্য ফেক আইডেন্টিটিতে আপনার খবরের কাগজের দুটো জার্নালিস্ট আই-কার্ড জোগাড় করে দিতে পারবেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

রিদ্ধিমা চুপ করে থেকে একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘সে না হয় ব্যবস্থা করা গেল। কিন্তু ওরা আজ না হোক কাল আপনার আসল পরিচয় খুঁজে বার করেই ফেলবে।’

‘জানি। তাতে কিছু যাবে আসবে না। আমি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে পরিচয় দেব। ঝামেলা হলে পরে দেখা যাবে সেটা কীভাবে মেটানো যায়।’

‘ঠিক আছে, আমি দেখছি। যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি,’ বলল রিদ্ধিমা।

ফোনটা রাখার পর আমি টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘রিদ্ধিমাকে বললে না আমাদের জামসেদপুর যাওয়ার খবরটা?’

‘কী দরকার?’ একটু অন্যমনস্ক গলায় বলল টাপুরদি, ‘এই মুহূর্তে কাউকেই কিছু বলার দরকার নেই,’ বলতে বলতে টাপুরদি মোবাইলে কাউকে ডায়াল করতে শুরু করল। ফোনটা কানে ধরে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর অপর প্রান্তে কেউ বোধ হয় ফোন তুলল। টাপুরদি হাসিমুখে কুশল বিনিময়ের পর বলল, ‘তুই তো প্রাইমারি স্কুল বোর্ড কাউন্সিলে আছিস, তাই না মিহিকা?’

অপর প্রান্তে টাপুরদির মিহিকা নাম্নী বন্ধুটি সম্ভবত সম্মতি জানাল। টাপুরদি বলল, ‘আমায় একটা হেল্প কর না। বিরাটির দিকে কোনো প্রাইমারি স্কুলে অনামিকা রায় নামের টিচার ছিলেন। বছর পনেরো-ষোলো আগে মারা গেছেন। তাঁর সম্পর্কে ডিটেলস চাই। জানি কাজটা সহজ নয়। কিন্তু খবরটা খুব দরকার রে।’

আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ফোনটা রাখল টাপুরদি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি হঠাৎ তন্ময়ের মাকে নিয়ে পড়লে কেন?’

‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। তাই আমিও ছাই ওড়াচ্ছি। দেখ মিতুল, এতদিন ধরে আমার সঙ্গে কাজ করার পর এটা বোধ হয় বুঝেছিস, জুতোর কাদা দেখে, হাতের কাটা দাগ দেখে সব কিছু জেনে যাওয়া সেসব গল্পে হয়। বাস্তবে যদি হয়ও, তাহলেও আমি মেনে নিচ্ছি আমার অত বুদ্ধি নেই। শার্লক হোমস শুধু অবজার্ভেশন দিয়ে কেস সলভ করতে পারেন। মিস মার্পল কেস শুনেই শুধু ডিডাকশন দিয়ে বলে দিতে পারেন অপরাধী কে! আমরা রিয়েল লাইফ গোয়েন্দারা অতটা ব্লেসড নই। অবজার্ভেশন ক্ষমতা না থাকলে ডিটেকটিভ হওয়া যায় না এটা যেমন সত্যি, আবার শুধু অবজার্ভেশন দিয়ে কেস সলভ হয় না এটাও সত্যি। আমাদের মাথার সঙ্গে সঙ্গে গা-ও ঘামাতে হয়, ছোটাছুটি করতে হয়। সব পসিবিলিটি খতিয়ে দেখতে হয়। আমার জন্য কোনো সিধু জ্যাঠা বা মাইক্রফট হোমস নেই। ঘরের কোণে বসে শুধু বুদ্ধি খাটিয়ে অপরাধী ধরতে পারি না আমি। আমায় ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথডে ডিডাকশন করতে হয়। ভুল করি, আবার ভুল থেকে শিক্ষা নিই। এক্ষেত্রেও তাই। আমি জানি না এই কেস পোয়ারো বা ফেলুদার হাতে গেলে তাঁরা কী করতেন, কিন্তু আমি কোনো নির্দিষ্ট পথ এখনও খুঁজে পাইনি। তাই সব সম্ভাবনাই আমায় খতিয়ে দেখতে হবে।’

মনে হল টাপুরদি একটু হতাশ হয়ে পড়েছে। টাপুরদি মুখে যাই বলুক, আমি খুব ভালো করেই জানি টাপুরদির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অত্যন্ত প্রখর। একেকটা কেসের পেছনে টাপুরদি কতটা পরিশ্রম করে সেটা আর কেউ না জানুক, আমি জানি। টাপুরদির সঙ্গে থেকে জেনেছি, আসল ইনভেস্টিগেশন কাকে বলে। সেটা গল্প-উপন্যাস থেকে অনেকটাই আলাদা। গল্পের গোয়েন্দারা ক্লান্ত হয় না, হারে না, ভয় পায় না, তাদের মানসিক শক্তি অসীম। টাপুরদিকে না জানলে আমি জানতেও পারতাম না, বাস্তবে গোয়েন্দাগিরিও আর পাঁচটা পেশা থেকে আলাদা নয়। গোয়েন্দারাও মানুষ, কোনো সুপারহিরো নয়।

তন্ময় বেশ কিছুদিন হল নিরুদ্দেশ। আদৌ ও কী অবস্থায় আছে, আমরা কেউ জানি না। এখনও আমরা পুরোটাই অন্ধকারে আছি। ব্যর্থতাকে টাপুরদি ভয় পায় না জানি। কিন্তু যেখানে একটি মানুষের প্রাণের ভয় আছে, তার ভালো-মন্দ জড়িয়ে আছে, সেখানে এগোতে না পারাটা টাপুরদিকে ভিতরে ভিতরে অশান্ত করে তুলেছে। টাপুরদির মনটা একটু অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য টিভিটা চালালাম। টিভিতে অমিয় চক্রবর্তীর ছেলে অম্লান চক্রবর্তী স্টুডিয়োতে স্টার রিপোর্টারকে ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। অম্লান চক্রবর্তী পার্টির যুব নেতা, বয়স পঁয়তাল্লিশের বেশিই হবে। দলে তাঁর প্রতিপত্তি অমিয়বাবুর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অমিয়বাবু তাঁকেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তুলছিলেন। অমিয়বাবুর অবর্তমানে পার্টির রাশ তাঁরই হাতে। সদ্য শেষ হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে অম্লানবাবু তাঁর কেন্দ্র থেকে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। পরের সপ্তাহে অমিয়বাবুর নির্বাচন কেন্দ্রে উপনির্বাচনের দিন স্থির হয়েছে, যদিও নির্বাচনের ফলাফল কী হবে তা সকলেরই জানা। খুব স্বাভাবিক, অমিয়বাবুর মৃত্যুতে সিমপ্যাথি ভোটের পুরোটাই পাবে তাঁর কেন্দ্রের নতুন প্রার্থী। অফিশিয়ালি ঘোষণা করা না হলেও অমিয়বাবুর অবর্তমানে তাঁর ছেড়ে যাওয়া কুর্সিতে যে অম্লানবাবু বসবেন, সে ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, তাঁর থেকে আর যোগ্য কে-ই বা আছে? পার্টির ভিতরেও অম্লানবাবুর প্রভাব অপরিসীম, পার্টির যুব সংগঠনকে গোড়া থেকে গড়ে তুলেছেন তিনি নিজের হাতে। দলকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন তিনি।

সন্ধেবেলায় আজ অর্জুনদা ফোন করেছিল। যদিও এখনও পুলিশ অফিশিয়ালি কিছু ঘোষণা করেনি, কিন্তু অমিয় চক্রবর্তীর পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এসে গেছে আজ দুপুরে। মৃত্যুর কারণ যদিও হার্ট অ্যাটাক, কিন্তু অমিয়বাবুর শরীরে পাওয়া গেছে মারাত্মক বিষ বাট্রাকোটক্সিন। টাপুরদি দেখলাম নিউজ দেখতে দেখতে এবার গুগলে বিষের নাম দিয়ে সার্চ করছে। দেখে ভালো লাগল, কিছু সময়ের জন্য হলেও টাপুরদির মন অন্য ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। টাপুরদিকে হতাশ দেখতে আমার ভালো লাগে না।

আমার ফোনটা বাজছে। হাতে নিয়ে দেখলাম অফিস থেকে ফোন। কথা বলা শেষ করে ফোন কাটতে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘কী রে, এখন অফিসের ফোন?’

হাই তুলে বললাম, ‘হুম। আসলে রাত তিনটেতে একটা জব রান করে। তাতে সারাদিন ধরে বিভিন্ন সিস্টেমে স্টোর করা সব ফাইলের মেইন সার্ভারে ব্যাক আপ হয়। সেই জবটা যে দেখে তার শরীর খারাপ। তাই আমারও কপাল খারাপ। আজ আমার নাইট ডিউটি।’

টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন কিছু ভাবছে গভীরভাবে।

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার আবার কী হল? কী এত ভাবছ?’

টাপুরদির মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল উজ্জ্বল হাসিতে। বলল, ‘তুই নোবেল প্রাইজ পাবি মিতুল।’

নিউটাউনে ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসের রিসেপশনের লবিতে বসে আছি আমি আর টাপুরদি। বুকের ভিতরটা ধুকপুক করছে। আজ আমরা সংঘমিত্রা ব্যানার্জি ও মৈথিলী সেন নই। টাপুরদির নাম নয়নিকা দাস, আমি রত্নদীপা নিয়োগী। টাপুরদি একজন ফ্রিল্যান্স নিউজ রিপোর্টার, আমি ফোটোগ্রাফার। আমরা এখানে এসেছি, ইউনিকর্নের বর্তমান মালিক ও সিইও সুবিনয় মুখার্জির ইন্টারভিউ নিতে। পুরো ব্যাপারটা প্রায় নিখুঁতভাবে সাজিয়েছে রিদ্ধিমা। মানুষ দুটি মিথ্যে হলেও নামদুটি সত্যি। দুজনেই ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্টার। ইউনিকর্ন থেকে যদি নাম দিয়ে ভেরিফাই করেও, মিথ্যেটা ধরা পড়বে না সহজে। রিসেপশনে একজন বেশ সুন্দরী তরুণী বসে আছেন। রিসেপশন ডেস্কের সামনে ব্রোঞ্জের তৈরি ইউনিকর্নের লোগো। সকলে যে যার কাজে ব্যস্ত। বেশ একটা পেশাদারি পরিবেশ অফিস জুড়ে। বুঝতে অসুবিধে হয় না, ইউনিকর্ন নেহাত ছোটোখাটো সিকিউরিটি এজেন্সি নয়, বরং এই ব্যাপারে অগ্রণী সংস্থা।

প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর সিইওর ঘরে ডাক পড়ল আমাদের। সুবিনয় মুখার্জি সম্পর্কে মোটামুটি রিসার্চ করেই এসেছিলাম, গুগলে ছবিও দেখেছিলাম। কিন্তু সিইওর বিশাল কেবিনে ঢুকে থমকে গেলাম। গুগলের অস্পষ্ট ছবি দেখে সত্যিই বোঝা যায়নি ভদ্রলোক এতটা সুদর্শন। গুগল বলছে বয়স পঁয়তাল্লিশ, কিন্তু সেটা দেখে বোঝার উপায় নেই। ঘন নীল রঙের স্যুট পরিহিত সুবিনয় মুখার্জি বসে আছেন বিশাল টেবিলের ওপ্রান্তে। আমাদের দেখে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের জন্য ভ্রূ-টা সামান্য কোঁচকালেন, তার পরে হাসিমুখে ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টের ইংরেজিতে বললেন, ‘আসুন আসুন। আসন গ্রহণ করুন!’

এত সুন্দর করেও কেউ হাসতে পারে! এই মুহূর্তে আমার মনে হল, সুবিনয়বাবু অনায়াসে সিনেমায় হিরো হতে পারতেন। কিছু কিছু মানুষের উপস্থিতিটাই অনেক কিছু বদলে দেয়, সুবিনয় মুখার্জি হলেন সেই গোত্রের লোক। টাপুরদি আমার মুগ্ধ হতভম্ভ দশা দেখেই বোধ হয় কনুই দিয়ে আস্তে করে ঠেলা মারল। আমরা টেবিলের সামনে রাখা দুটি চেয়ারে গিয়ে বসলাম।

টাপুরদি নিজেদের ছদ্ম পরিচয় দিয়ে বলল, ‘তাহলে ইন্টারভিউটা শুরু করা যাক?’

সুবিনয়বাবু তাঁর সবচেয়ে সুন্দর হাসিটা হেসে বললেন, ‘কিন্তু কলকাতা শহরে এত বিখ্যাত লোক থাকতে হঠাৎ আমার ইন্টারভিউ কেন, সেটা তো বললেন না?’

টাপুরদিও জবরদস্ত অভিনেত্রী। মিষ্টি হেসে বলল, ‘বিখ্যাত মানুষের অভাব নেই সত্যি। কিন্তু বাঙালি সফল ব্যবসায়ীর বড়ো অভাব। আর এই ধরনের ব্যাবসার দিকে কম বাঙালিই যায়। ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেস আজ শুধু একটা সিকিউরিটি এজেন্সিতে থেমে নেই। এতটা ভার্সেটাইল ওয়েতে বিজনেস স্প্রেড করার কথা যে মানুষটি ভেবেছেন, তার কথা আরও বেশি লোকের জানা দরকার বই কী!’

সুবিনয়বাবু এতক্ষণ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে টাপুরদির কথা শুনছিলেন। এবার টেবিলের দিকে একটু ঝুঁকে বসে ভরাট গলায় বললেন, ‘বলুন, কী জানতে চান?’

টাপুরদি রেকর্ডার অন করল। তারপর সেটা টেবিলের উপর রেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘এই বিজনেসে আসার কথা ভাবলেন কেন?’

সুবিনয়বাবু বলতে শুরু করলেন, ‘আমাদের কিন্তু তিন প্রজন্মের ব্যবসায়ী পরিবার। এই এজেন্সি ছাড়াও আমাদের বেশ কিছু পারিবারিক ব্যাবসা আছে। সেগুলি আমার ফ্যামিলির অন্যরা দেখাশোনা করে। ইংল্যান্ড থেকে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পড়ে আসার পর আমি নিজের আলাদা বিজনেস শুরু করার কথা ভাবি। আমি কিন্তু বরাবরই খেলাধুলোয় ভালো ছিলাম। স্টেট জুনিয়র লেভেলে ক্রিকেট খেলেছি। ফাস্ট বোলার ছিলাম। ইউকেতে থাকাকালীন প্রফেশনাল রেসলিং করেছি। যাই হোক, সংক্ষেপে বলছি, খেলাধুলো, শরীরচর্চার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধির চর্চাটাও বেশ পছন্দ করি আমি। তাই ভাবলাম, এমন কিছু করা যাক, যাতে আমার ইন্টারেস্টগুলো কাজে লাগানো যাবে। এই হল গে ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসের গোড়াপত্তনের গল্প।’

‘ইন্টারেস্টিং!’ বলল টাপুরদি, ‘ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেস তো হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্টদের নিয়ে কাজ করে, তাই না?’

‘হ্যাঁ, আমাদের বেশ কিছু ভিআইপি ক্লায়েন্টস আছে। আসলে ইউনিকর্ন খুবই প্রফেশনাল। সেজন্য মার্কেটে অন্যান্য কম্পিটিটরদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে। আমাদের কর্মীরা ভীষণ ডেডিকেটেড। হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্টরা আমাদের এজেন্সির এই অ্যাপ্রোচটাই পছন্দ করে,’ বললেন সুবিনয় মুখার্জি।

‘আপনারা তো সিকিউরিটি প্রোভাইডার। নামে ‘অ্যান্ড সার্ভিসেস’গুলো কী কী? জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি। বুঝলাম সন্তর্পণে আসল প্রশ্নের দিকে এগোচ্ছে টাপুরদি।

সুবিনয় মুখার্জি তাকালেন টাপুরদির দিকে। একটু থামলেন। লক্ষ করলাম তাঁর দৃষ্টিতে কৌতুক। একটু আশ্চর্য লাগল। তিনি বললেন, ‘সার্ভিসেস অনেকরকমই আছে। সে ধরুন বিভিন্ন অফিসের বা ব্যক্তিবিশেষের সম্পূর্ণ সিকিউরিটির দিকটা দেখা, সফটওয়ার সিকিউরিটি অ্যাপ ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট, এ-রকম আরও অনেক কিছু।’

টাপুরদি এতক্ষণ ডিফেন্সে খেলছিল। এবার সোজাসুজি অ্যাটাকে গেল। বলল, ‘আমি শুনেছি আপনারা ক্লায়েন্টের হয়ে ইনভেস্টিগেশনসও করেন। সেটা কি সত্যি?’

সুবিনয়বাবু এবার সোজা হয়ে বসলেন। সহজ গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ, করি তো।’

‘কী ধরনের ইনভেস্টিগেশনস জানতে পারি কি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘ক্লায়েন্টদের গোপনীয়তা রক্ষা করা আমাদের পেশার মূল শর্ত। সুতরাং আপনার এই প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দিই বলুন তো মিস ব্যানার্জি, ওহ সরি মিস দাস? অবশ্য সেটা তো আপনি নিজে ভালোই জানেন,’ বলে হেসে উঠলেন সুবিনয় মুখার্জি। আমার বুকের ভিতর দিয়ে সেই মুহূর্তে যেন একটা হিমশীতল তরঙ্গ খেলে গেল। কী সাংঘাতিক লোক, ইনি শুরু থেকেই তার মানে আমাদের পরিচয় জানতেন। তবু এতক্ষণ কেমন ভাবলেশহীন মুখে অভিনয় করে গেলেন। টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। দেখলাম টাপুরদি স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুবিনয় মুখার্জির চোখের দিকে। যেন বক্সিংয়ের রিং-এ দুইজন প্রতিপক্ষ পরস্পরকে মেপে নিচ্ছে। লড়াইটা সমানে সমানে। সুবিনয়বাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল আমার। মনে হল, এ সহজ লোক নয়। তাঁর দুই চোখে কৌতুক খেলা করছে। এই মুহূর্তে তাঁর সুন্দর মুখটা দেখতে কেমন নিষ্ঠুর লাগছে, কাচের মতো স্বচ্ছ, ছুরির ফলার মতো ধারালো চোখের দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। টাপুরদি কিন্তু চোখ সরায়নি। এই টাপুরদিকে আমি চিনি, জানি। অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে শুধু মনের জোরে কাবু করার ক্ষমতা রাখে টাপুরদি।

কত মুহূর্ত, সেকেন্ড, মিনিটের হিসেব রাখিনি। একসময় মনে হচ্ছিল এই যুদ্ধ বুঝি বা অনন্তকালের। কিন্তু একসময় শেষ হল লড়াই। কে জিতল কে হারল বোঝা গেল না। দেখলাম দুজনের ঠোঁটের কোণেই মৃদু হাসি। এবার নীরবতা ভেঙে পাশে রাখা রেকর্ডারটা বন্ধ করল টাপুরদি। তারপর হেসে বলল, ‘তাহলে সোজা কথা সোজাভাবেই বলা ভালো, তাই না মিস্টার মুখার্জি? আমার কিছু কথা জানার আছে। সেগুলো জেনে গেলেই আমি চলে যাব।’

‘আর যদি আমি না বলি মিস সংঘমিত্রা ব্যানার্জি? মানে, আপনি ভাবলেন কী করে আপনি নাম ভাঁড়িয়ে আমার অফিসে, আমার কেবিনের ভিতর ঢুকে আসবেন, আর আমি জানতে পারব না? হাউ সিলি! আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে দিইনি, এই আপনার অশেষ ভাগ্য। বাই দ্য ওয়ে, অনেক নাম শুনেছিলাম আপনার। আলাপ করে ভালো লাগল। কিন্তু অনেস্টলি, আপনাকে যতটা বুদ্ধিমতী ভেবেছিলাম, ততটা আপনি নন। আর এ ক্ষেত্রে তো একটু বেশিই বোকামি করে ফেলেছেন। আরেকবার প্রমাণ হল, এই শহরে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন্সের ক্ষেত্রে আই অ্যাম দ্য বেস্ট!’ বলে হা-হা করে অট্টহাসি হাসলেন সুবিনয় মুখার্জি। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, ‘এনি ওয়ে, আই মাস্ট সে দ্যাট ইউ লুক রিয়েলি প্রিটি, ভেরি প্রিটি ইনডিড। আপনি যদি ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসের হয়ে কাজ করতে চান, ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম। জানেন নিশ্চয়ই আমাদের কাজে প্রিটি ফেসের প্রায়ই দরকার পড়ে। তা ছাড়া আপনার আবার লালবাজারেও স্পেশ্যাল কানেকশন্স আছে।’

রাগে সারা শরীর রি রি করে উঠল। টাপুরদি নির্বিকার; হেসে বলল, ‘থ্যাঙ্কস আ লট ফর ইয়োর প্রোপোজাল, মিস্টার মুখার্জি। বাট আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড। অ্যাকচুয়ালি আই উড প্রেফার ইউ টু বি মাই অপোন্যান্ট,  রাদার দ্যান মাই বস! যাই হোক, প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে আমি অবশ্যই আপনাকে জোর করতে পারব না। আর আপনি অলরেডি যে কাদায় গলা অবধি ডুবে আছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে আপনি ভয় পাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। আই টোটালি আন্ডারস্ট্যান্ড ইয়োর সিচুয়েশন!’

‘কী বলতে চাইছেন আপনি?’ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন সুবিনয় মুখার্জি। সুবিনয়বাবুর মুখটা দেখে হাসি পেয়ে গেল আমার। একেই বলে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি।

‘আপনি জানেন না আমি কী বলতে চাইছি? আমি কিন্তু আপনাকে আরেকটু বেশি বুদ্ধিমান বলে মনে করেছিলাম,’ কঠিন স্বরে বলল টাপুরদি, ‘ভণিতা না করে এবার কাজের কথায় আসি। শুনুন মিস্টার মুখার্জি, আপনি এক্কেবারে যাচ্ছেতাইভাবে ফেঁসে গেছেন। বুঝতেই পারছেন, তন্ময়ের হাতে যে ডকুমেন্টগুলো আছে, সেগুলো বাইরে বেরোলে আপনার পায়ের তলার মাটি আর থাকবে না। না সরকারে ক্ষমতাসীন দল, না বিরোধী দল, আপনাকে কেউই ছাড়বে না। আপনি না বললেও আপনার ক্লায়েন্ট যে যথেষ্ট ক্ষমতাবান লোক, সেটা ধারণা করতে কষ্ট হয় না। তো তিনি কি জানেন, আপনি এত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট জাস্ট হারিয়ে ফেলেছেন?’

‘হারিয়ে ফেলিনি। দ্যাট ইডিয়ট তন্ময়…’ গর্জন করে উঠে টেবিলে এক ঘুসি মারলেন সুবিনয় মুখার্জি।

‘ইয়েস, তন্ময়! সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আমরা দুজনেই তন্ময়কে খুঁজছি, যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। কিন্তু তন্ময়কে খুঁজে বার করাটা খুব জরুরি। তন্ময় আপনার এমপ্লয়ি। আপনি ভালোভাবেই জানেন ওর যদি কোনো ক্ষতি হয়, যদি ডকুমেন্টগুলো অন্য কারও হাতে গিয়ে পড়ে, ব্যাপারটা অন্তত আপনার জন্য সুখকর হবে না আশা করি। তাই যদি আপনি সেগুলি ফেরত পেতে চান, কোঅপারেট করুন আমার সঙ্গে,’ কঠিন কণ্ঠে বলল টাপুরদি।

‘হাহ, আপনি কি মনে করেন তন্ময়কে খুঁজে বার করার জন্য আমাদের আপনাকে দরকার পড়বে মিস ব্যানার্জি? সেরকম ভাবলে আমি বলব আপনি এখনও মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন,’ মিস্টার মুখার্জি বললেন।

‘পড়বে মিস্টার মুখার্জি, দরকার পড়বে,’ বলে চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করে বসল টাপুরদি। তারপর হেসে বলল, ‘তন্ময় কম্পিউটার থেকে আপনাদের গোপন নথি চুরি করেছে। এই কথাই তো সকলকে বলেছেন আপনারা, তাই না?’

‘হ্যাঁ, সেটাই ঘটেছে,’ বললেন সুবিনয়বাবু।

‘অর্ধসত্য,’ ঠান্ডা গলায় বলল টাপুরদি। এবার সামনে এগিয়ে এসে সামনে ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘আমি প্রথম থেকেই ভাবছিলাম, যদি পেনড্রাইভে করে কোনো ফাইল বার করেই নিতে হয়, সেটা তো ও অফিস টাইমে সকলের সামনেই করতে পারত। লুকিয়ে কেন করল? তারপর মনে হল, ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অত সহজ নয়। ও সেরকম করলেও মূল ফাইলটা আপনাদের সিস্টেমে রয়েই যেত, যেটা মেইন সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত। অফিসের সব ক’টা সিস্টেমে স্টোরড সব ফাইলের ব্যাক আপ সেখানেই থাকে। তখনই বুঝলাম, ও রাতে লুকিয়ে এসেছিল অন্য কোনো কারণে।

‘কী কারণ হতে পারে? ভাবতে শুরু করলাম। তারপর আমার এই বোনটি দু’দিন আগে কথায় কথায় বলল, ওর অফিসে রাত তিনটের সময় একটা জব রান হয় সিস্টেমে। যার ফলে সারাদিনে অফিসে যা যা ডেটা বিভিন্ন সিস্টেমে স্টোর হয়, সেগুলির ব্যাক আপ রাত তিনটেতে গিয়ে মেইন সার্ভারে সেভ হয়ে যায়। আমার মাথায় তখুনি ব্যাপারটা ক্লিক করল। এই অফিসেও সেরকমই কিছু হয়। সেই কারণেই তন্ময় সেদিন রাতে ছুটে এসেছিল। সেদিন দিনের বেলায় ফাইলটা সিস্টেমে স্টোর করেছিল ও। আপনাকে জানিয়েওছিল সেটার কন্টেন্টের ব্যাপারে। আপনি ওকে বিশ্বাস করতেন, তাই আর ফাইলের কপি নিজের কাছে নিয়ে রাখেননি। ভেবেছিলেন ব্যাক আপ তো থাকবেই। কিংবা হয়তো ওকে বলেছিলেন আপনাকে মেল করে পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু সেটা ও করেনি। হয়তো বাড়ি ফিরে শেষ মুহূর্তে মত বদলেছিল ও। তাই ওর সিস্টেমে স্টোর করা ডেটার ব্যাক আপ স্টোর হওয়ার আগেই সেটাকে বের করে নেওয়ার দরকার পড়েছিল। ও আসলে কিছু চুরি করতে নয়, নিজের স্টোর করা ফাইলটা সিস্টেম থেকে ডিলিট করতে রাতে লুকিয়ে এসেছিল। ঠিক সেই কারণেই ওর পেছনে হন্যে হয়ে পড়েছেন আপনারা। যেভাবে শোরগোল বাঁধিয়ে আপনারা তন্ময়কে খুঁজতে শুরু করেছেন, তাতে এই কথাটা বাইরে চাউর হয়ে গেলে আপনারা কিন্তু বেশ বিপদে পড়বেন।’

সুবিনয় মুখার্জি জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল টাপুরদির দিকে। টাপুরদি হেসে বলল, ‘এবার আশা করি মানবেন যে প্রিটি ফেসের সঙ্গে গ্রে ম্যাটারের কোনো ঝগড়া নেই। দুটো একসঙ্গেই থাকতে পারে কারও কারও মধ্যে। আর একটা কথা, আপনি যে আমাদের আসল পরিচয় জানেন, সেটা আমার শুরু থেকেই জানা ছিল। আপনার সম্বন্ধে যেটুকু জেনেছিলাম, তাতে বুঝেছিলাম আপনি চ্যালেঞ্জ পছন্দ করেন। তাই মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম, ব্যাপারটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েই আপনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন। ছদ্মবেশ ধরে আপনাকে বোকা বানানো নয়, আসলে এজেন্সির ভিতরে আপনার কেবিনে ঢোকাটাই আমার উদ্দেশ্য ছিল। আশা করি, একসঙ্গে এই কেসে কাজ করতে আর কোনো আপত্তি নেই আপনার?’

সুবিনয় মুখার্জি চুপ করে কিছু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘বলুন, কী জানতে চান?’

টাপুরদি দীর্ঘ একটা নিশ্বাস চেপে হেসে বলল, ‘বেশি কিছু নয়, আপনার ক্লায়েন্টের নামটা, যিনি অমিয় চক্রবর্তীর ইতিহাস খুঁড়ে বার করার কাজে লাগিয়েছিলেন আপনাদের।’

‘সঞ্জয় পাল,’ গম্ভীর মুখে বললেন সুবিনয় মুখার্জি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *