১৫
রিদ্ধিমা চলে যাওয়ার পরও টাপুরদি অনেকক্ষণ চুপচাপ সোফার উপর বসে রইল। আমায় অফিস বেরোতে হবে। তাই স্নান করতে ঢুকে গেলাম। স্নান সেরে বেরিয়ে দেখলাম টাপুরদি ল্যাপটপ নিয়ে বসে খুব মন দিয়ে কিছু করছে। টাপুরদিকে বিরক্ত না করে নিজেই কিচেনে গিয়ে দুইজনের জন্য ব্রেকফাস্ট আর চা বানালাম। টাপুরদি সেদিকে চেয়েও দেখল না, গভীর মনোযোগের সঙ্গে কী যেন দেখে চলেছে। অফিস বেরোনোর আগে একবার টাপুরদির ল্যাপটপে উঁকি মারলাম। দেখলাম, অনেক পুরোনো কিছু খবরের কাগজের প্রতিবেদন মন দিয়ে পড়ছে।
অফিস থেকে ফিরতে রাত আটটা বাজল। কলিংবেল টিপতে টাপুরদি হাসিমুখে দরজা খুলে দিল। আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার? বেশ খুশি খুশি লাগছে?’
টাপুরদি বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে নে, আমি চা বসাই।’
ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলাম টাপুরদি রান্নাঘরে গুনগুন করে গান গাইছে। দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেসটা কী?’
টাপুরদি সুর করে বলল, ‘হলদে সবুজ ওরাং ওটাং/ ইট পাটকেল চিতপটাং/ মুশকিল আসান উড়ে মালি/ ধর্মতলা কর্মখালি।।’
‘মানে?’ অবাক চোখে তাকিয়ে বললাম।
‘সে এক ভারি কঠিন ধাঁধা। তুই বুঝবি না,’ গম্ভীর মুখে বলল টাপুরদি।
‘বুঝব না কেন? এ তো দির্ঘাংচুতে আছে।’ অভিমান ভরে বললাম, ‘না হয় তোমার মতো অত দিগগজ নই আমি। তবে ওটুকু জানি। কিন্তু এর সঙ্গে কেসের কী সম্পর্ক?’
‘সবটাই সম্পর্কিত রে মিতুল। সম্পর্কের অদ্ভুত এক সমীকরণ।’
‘মানেটা কী? কীসব বলে চলেছ, কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না আমার,’ বললাম আমি, ‘তুমি কি রহস্যটা সমাধান করে ফেলেছ?’
হাসল টাপুরদি। বলল, ‘রহস্য তো কিছু ছিল না মিতুল। আমার কাজ ছিল তন্ময়কে খুঁজে বার করা। তা সে কাজ অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে।’
‘অনেকদিন আগে হয়ে গেছে?’ আমি হাঁ করে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বলে কী টাপুরদি? তাহলে আমরা ছুটছি কীসের জন্য?
আমার বিহ্বল দশা দেখে টাপুরদি বোধ হয় মজা পেল। বলল, ‘অমন হাঁ করে থাকলে মুখে মাছি ঢুকে যাবে। মুখ বন্ধ কর।’
‘মানে? এটাকে কিন্তু টর্চার বলে টাপুরদি। তখন থেকে তুমি হেঁয়ালি করে যাচ্ছ। এখন বলছ, তন্ময়কে খোঁজা নাকি তোমার অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে।’ গম্ভীর মুখে বললাম আমি।
‘রাগ করছিস কেন?’ বলে হেসে টাপুরদি আমার গাল টিপে দিল। তারপর বলল, ‘আমি যেখানে যেখানে গিয়েছি, যা যা শুনেছি বা দেখেছি, তুইও সবই জেনেছিস। তারপরও তুই যদি তন্ময়কে খুঁজে না পাস, সে কি আমার দোষ?’
‘বললেই হল?’ রাগ রাগ গলায় বললাম আমি, ‘আমি তো অফিসের গুঁতোয় চারদিন আসতেই পারিনি। তখন তুমি নিশ্চয়ই কেস সলভ করে ফেলেছ।’
‘না রে বাবা। তুই সবই দেখেছিস, জানিস। কিন্তু নিজের মাথাটাকে ব্যবহার করিসনি। এইজন্য বলি, রোজ অঙ্ক কর।’ বলল টাপুরদি।
‘জাস্ট পারলাম না। দিনে দশ ঘণ্টা অফিসে কোডিং করে করে বাড়ি এসে অঙ্ক করতে পারব না। আমি তোমার অ্যাসিস্ট্যান্টই ঠিক আছি, গোয়েন্দা হওয়ার শখ নেই আমার।’ গোমড়া মুখে বললাম।
ট্রেতে করে চা আর ড্রাই ফ্রুটস সাজিয়ে নিয়ে টাপুরদি বসার ঘরের সেন্টার টেবিলে রাখল। তারপর সোফায় গা এলিয়ে বলল, ‘সন্দেহ আমার প্রথম দিনই হয়েছিল। সন্দেহ কেন, নিশ্চিতই ছিলাম বলতে পারিস। বাকিটা তন্ময় নিজেই জানিয়ে দিল।’
‘ওয়েট,’ হাত তুলে থামালাম টাপুরদিকে, ‘প্লিজ টাপুরদি, আমার বুদ্ধি অত্যন্ত কম তা তুমি জানো। সুতরাং হেঁয়ালি ছেড়ে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলো যাতে আমিও বুঝতে পারি। এখনও অবধি যা যা বলেছ, সব আমার মাথার উপর দিয়ে ট্যাঞ্জেনশিয়ালি পাস করে বেরিয়ে গেছে।’
টাপুরদি হেসে উঠল। বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা। বেশ। আগে তুই একটা কথা বল, তুই যদি কোথাও লুকিয়ে থাকতে চাস, কোথায় লুকোবি?’
‘কোনো সেফ প্লেসে, অফ কোর্স।’
‘আর কোন প্লেসটা সেফ?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
আমি একটু ভেবে বললাম, ‘যেখানে আমায় কেউ চিনবে না, বা চিনলেও ধরিয়ে দেবে না।’
‘ঠিক। এমন কারও কাছে, যাকে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারি। তাই তো?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। তন্ময়ও সেটাই করেছে। এবার ভেবে বল তো মিতুল, তন্ময় কাকে ভরসা করতে পারে?’ টাপুরদি ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
‘রিদ্ধিমাকে,’ বললাম আমি।
‘হ্যাঁ, রিদ্ধিমাকে তো বটেই। তাই ও প্রথমে ওর কাছেই গেছিল। কিন্তু যারা ওকে খুঁজছে, তারা খুব সহজেই রিদ্ধিমার কাছে পৌঁছে যেতে পারে। রিদ্ধিমা’স ফ্ল্যাট ইজ নট আ ভেরি সেফ প্লেস ফর হাইডিং, অ্যাট লিস্ট ফর তন্ময়। তাহলে আর কোথায় যেতে পারে ও?’
‘দিদির কাছে যাবে না ও। কারণ দিদির সঙ্গে ওর সম্পর্ক খারাপ। তাহলে কোনো বন্ধুর বাড়ি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘হল না। আরও ভাব। যারা তন্ময়কে খুঁজছে, তারা খুব পাওয়ারফুল লোক। বন্ধুদের কি ভরসা করা যায় পুরোপুরি? যত কাছের বন্ধুই হোক, চাপের মুখে গোপন কথা ফাঁস করে দিতেই পারে তো! পারে না?’
‘পারে। তাহলে আর কে?’ জানতে চাইলাম আমি। জিজ্ঞাসা করেই বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়ল, ‘রেখাদেবী?’
টাপুরদি হাসল, মুখে কিছু বলল না।
আমি আবার বললাম, ‘সত্যিই? রেখাদেবী? মাই গড! তুমি প্রথম থেকে জানতে রেখাদেবীর বাড়িতেই আছে তন্ময়?’
‘জানতাম বলব না, আন্দাজ করেছিলাম।’ দুটো কাঠবাদাম মুখে ফেলে চিবোতে চিবোতে বলল টাপুরদি।
‘তার মানে সেদিন রেখাদেবী আমাদের সামনে পুরোপুরি অভিনয় করে গেলেন? ওয়েট! এর মানে দাঁড়াচ্ছে, আজ সকালে রিদ্ধিমাকে রেখাদেবীই ফোনটা করেছিলেন, তাই তো টাপুরদি? কিন্তু তুমি কীভাবে বুঝলে?’
টাপুরদি হাসল। বলল, ‘আমরা যেদিন রেখাদেবীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তোর মনে আছে, দরজা খুলতে কত দেরি করেছিল? অথচ বাড়িতে দুজন লোক ছিল। আই হোলে বেশ কয়েকবার ছায়া পড়তে দেখেছি আমি। অর্থাৎ ধরে নিতে পারি, ভিতরে যারা ছিলেন তারা আমাদের প্রতি সন্দেহবশত বার বার দেখছিলেন। তারপর সমস্ত ব্যবস্থা করে, মানে তন্ময়ের লুকোনোর ব্যবস্থা করে দরজা খোলে।’
‘হুম। তা না হয় হল। কিন্তু শুধু দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় তুমি এত নিঃসন্দেহ হলে কী করে?’
‘না, শুধু সেটুকুতে নয় রে। রেখাদেবী খুব কম বয়সে বিধবা হয়েছেন। এই বয়সে এসে অনেক বয়স্ক মানুষদের মধ্যে অনেক সময় অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার, শুচিবাই গোছের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। রেখাদেবী যখন আমাদের সামনে বসে কথা বলছিলেন, আমি ওঁর মধ্যে ওসিডির লক্ষণ দেখেছি। মনে আছে, রেখাদেবী বলেছিলেন, তাঁর বার বার স্নান করার অভ্যেস আছে? রেখাদেবীর পরিচারিকাটি আমাদের জুতো খুলে ঘরে ঢুকতে বলল। রেখাদেবী সম্ভবত পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে। যে কারণে, তন্ময়ের লুকোনোর ব্যবস্থা করলেও তন্ময়ের জুতোটা শুর্যাকেই ভিতরের দিকে রেখেছিলেন। সেটাকে ভিতরে রাখেননি। একজন বৃদ্ধা মহিলা ও তাঁর পরিচারিকার সংসারে পুরুষ পায়ের নয় নম্বরের জুতো শুর্যাকে থাকাটা একটু অদ্ভুত নয় কি?’
‘নয় নম্বর জুতো? আমি তো জুতোই দেখলাম না। তুমি নম্বরও দেখে ফেললে? বুঝলে কী করে সেটা তন্ময়েরই জুতো?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘বুঝলাম না, আন্দাজ করলাম। ব্যালকনিতে জামাকাপড় মেলা ছিল। সবই মহিলাদের কাপড়চোপড়। কিন্তু এক কোণে যে চামড়ার বেল্টটা ছিল, সেটা অন্তত সে বাড়ির কোনো মহিলার পরিধেয় নয়, সেটা অনুমান করা যায়। এ বিষয়ে আমার সন্দেহ ছিল না, রেখাদেবীর বাড়িতে কোনো পুরুষ নিশ্চয়ই আছে। তবে সেটা তন্ময় কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম না। আজ যখন সকালে শুনলাম এক মহিলা ফোন করেছিল রিদ্ধিমাকে, এবং তাঁর কণ্ঠস্বর ধরা ধরা, তখনই নিশ্চিত হলাম। আমাদের কথা শুনে তন্ময় বুঝেছিল, রিদ্ধিমা যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় আছে। অথচ নিজে ফোন করে তাকে প্রবোধ দিতেও পারছিল না। তাই রেখাদেবীকে দিয়ে ফোন করিয়েছিল এটুকু জানাতে যে সে বেঁচে আছে, ঠিক আছে।’
‘তার মানে তোমার কেস সলভড। এখন কী করবে? রিদ্ধিমাকে জানাবে না?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘কী করে জানাই? যতদিন না তন্ময় স্বেচ্ছায় রিদ্ধিমার সামনে আসছে, ততদিন তো জানানো সম্ভব নয় কোনোমতেই। বিশেষ করে যেখানে তন্ময়ের প্রাণের ভয় আছে।’
‘কিন্তু কেসটা কি আদৌ সলভ হল, টাপুরদি? খুশি হব কি হব না ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না!’ বললাম আমি।
টাপুরদি হাসল। বলল, ‘দেখ, আমাকে রিদ্ধিমা তন্ময়কে খুঁজে বার করার দায়িত্ব দিয়েছিল। সেটা আমি বার করেছি। এখন আমি জানি তন্ময় কোথায় আছে। কিন্তু তাকে সুরক্ষিতভাবে রিদ্ধিমার কাছে পৌঁছে দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। তন্ময় বিপদের মধ্যে আছে। তাকে এখনও আমি বিপদমুক্ত করতে পারিনি। সেক্ষেত্রে কেস সলভড, কী করে বলি বল তো?’
‘হুম, আমারও মনটা খুঁতখুঁত করছিল,’ বললাম আমি।
টাপুরদি এতক্ষণ সোফায় বসে কথা বলছিল। এবার উঠে দাঁড়াল, বলল, ‘বিরিয়ানি খাবি তো? বসাচ্ছি।’
‘আরিববাস। বিরিয়ানি? কীসের ট্রিট? তন্ময়কে খুঁজে বার করার?’ হেসে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘এমনিই। ইচ্ছে হল রাঁধতে,’ কিচেনের দিকে এগোতে এগোতে বলল টাপুরদি। হঠাৎ কী মনে হতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বাই এনি চান্স, আজ কি অর্জুনদা আসছে?’
টাপুরদি হাসল, কিছু বলল না। আমিও হাসলাম, ঠিক ধরেছি।
১৬
‘উরিববাস, ভুরভুর করে খোশবাই ছাড়ছে যে!’ জুতো খুলতে খুলতে বলল অর্জুনদা। আজ অনেকদিন পরে অর্জুনদা এল। অমিয় চক্রবর্তীর কেসটা শুরু হওয়ার পর থেকে কলকাতা পুলিশের রাতের ঘুম ছুটে গেছে। দরজা দিয়ে ঢুকে জুতো খুলতে খুলতে হেসে বলল, ‘আহা, ফাটাফাটি গন্ধ। এইজন্য আজ সকাল থেকে আমার মনটা বিরিয়ানি বিরিয়ানি করছিল।’
আমি হেসে ফেললাম অর্জুনদার কথার ধরনে। বললাম, ‘টাপুরদি আজকাল ঘরে বসে তোমার মনের কথাও টের পাচ্ছে বুঝি? তা ভালো। অন্তত তোমার অনারে আজ আমার কপালেও এহেন সুখাদ্য জুটছে। নইলে এমন ভাগ্য আমার থোড়াই হয়? অন্যদিন তো টাপুরদির সো কলড হেলদি ফুড চিবোতে হয়।’
কিচেনে খুটখাট করলেও টাপুরদির কানটা এদিকেই সেটা বোঝা গেল। কিচেন থেকেই বলে উঠল, ‘তুই হেলদি ফুড খাস মিতুল? বাজে বকা বন্ধ কর। একটা ফ্যামিলি সাইজ চিপসের প্যাকেট পাঁচ মিনিটে একা সাবাড় করিস তুই।’
‘ইশ, আর তুমি যে রোজ আমায় স্যালাডের নামে গাদাগুচ্ছের হাবিজাবি কাঁচা সবজি খাওয়াও, সেই বেলা?’ আমিও উত্তর দিলাম।
অর্জুনদা বলল, ‘ব্যস ব্যস, আর না। একটু চা খাওয়াও আমাকে। মাথাটা ধরে আছে সেই সন্ধে থেকে।’
টাপুরদি কিচেন থেকেই উত্তর দিল, ‘বোসো, চা বসিয়েছি।’
আমি বললাম, ‘দেখলে তো, টাপুরদি কেমন তোমার মনের কথা না বলতেই বুঝে যায়?’
অর্জুনদা মুখে ছদ্মবিষাদ মেখে নীচু গলায় বলল, ‘শুধু যেটা বোঝা দরকার, সেটাই বোঝে না।’
হেসে উঠলাম আমি। বললাম, ‘বোঝে বোঝে সব বোঝে। না বুঝলে কি আর তুমি আসবে জেনেই বিরিয়ানি রাঁধতে বসে? লক্ষ্মী লাভ করতে চাইলে ধৈর্য ধরতে হবে। এভাবেই পূর্ণ সমর্পণ নিয়ে লেগে থাকো, দেবী বরদান করার আগে ভক্তের পরীক্ষা নেন, জানো না বুঝি?’
‘পরীক্ষাটা একটু লম্বা হয়ে যাচ্ছে না ভাই? অর্জুনদা সোফায় গা এলিয়ে বসে বলল।
টাপুরদি ট্রেতে করে চায়ের কাপ সাজিয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকল। বলল, ‘তোরা কী ফিসফাস করছিস রে?’
অর্জুনদা গম্ভীর মুখে বলল, ‘সব তোমায় জানতে হবে নাকি? এসব মিতুলের সঙ্গে আমার গোপন কথাবার্তা। তোমায় কেন বলব? অত কৌতূহল ভালো নয় মিস ব্যানার্জি।’
টাপুরদি কটমট করে একবার অর্জুনদার মুখের দিকে একবার আমার মুখের দিকে তাকাল। আমি টাপুরদির হাত ধরে টেনে এনে সোফায় বসালাম। হেসে বললাম, ‘অর্জুনদা তোমার লেগপুল করছে। বসো তো।’
চায়ে চুমুক দিতে দিতে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘কেস কতদূর এগোল তোমাদের?’
‘ধুর, এদিকে আমরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিন-রাত এক করে খেটে যাচ্ছি, ওদিকে মিডিয়া পুলিশের অপদার্থতা নিয়ে গলা ফাটাচ্ছে দিনরাত। কেস কেন এখনও সিবিআইকে দেওয়া হচ্ছে না, সেই নিয়ে গোল করছে। এইভাবে কাজ করা যায় নাকি?’ বিরক্ত মুখে বলল অর্জুনদা।
টাপুরদি বলল, ‘কিছু জানতে পারলে?’
অর্জুনদা একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘জানতে পারা বলতে সেরকম জরুরি কিছু নয়। আজ সকালে ক্যান্টিনের ছেলেটা নিজে থেকেই জানাল যে, অমিয়বাবুর স্পেশাল চায়ের পাতা তাঁর বাড়ি থেকে আসত। সেদিন নাকি চা বানানোর সময় নতুন প্যাকেট খুলেছিল ওরা।’
নড়েচড়ে বসল টাপুরদি, বলল, ‘পাতা পরীক্ষা করানো হয়েছে?’
‘হ্যাঁ,’ বলল অর্জুনদা, ‘ক্লিন। পাতায় বিষ নেই।’
টাপুরদি কিছুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে অর্জুনদার মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল, ‘এভাবে হবে না অর্জুন। আমার মন বলছে, এই কেসে এগোতে হলে অমিয়বাবুর মৃত্যুর কারণ আগে জানতে হবে। মানে, কেন মারা হল ওঁকে, সেটা জানা দরকার। পলিটিক্যাল রাইভ্যালরি, না অন্য কিছু।’
‘সেই অ্যাঙ্গেলগুলো সবই দেখা হয়েছে, টাপুর। সেদিন যারা যারা অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, যাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে সবই খতিয়ে দেখা হয়েছে। প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলা হয়েছে। দলের মধ্যে কিছু অস্থিরতা ছিল। সে তো সব রাজনৈতিক দলেই কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে। অশান্তি বাড়লে বিক্ষুব্ধ নেতারা দলবদল করে নেয়, খুন করতে যায় না, তাও আবার অমিয় চক্রবর্তীর মতো হেভিওয়েট নেতাকে যে পরদিন মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছে।’
‘বিনয় বোসের বক্তব্য কী? কী বলছেন তিনি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘বলছেন রাজনীতির মাঠে ঝগড়া লড়াই হয়। তা বলে হবু মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানানো তাঁর কর্তব্য। তাই গিয়েছিলেন। কিন্তু আসল কথাটা হল, বিকেল নাগাদ তিনি বেরিয়ে আসার পর থেকে নাকি অমিয়বাবুকে কিছুটা অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল,’ অর্জুনদা বলল, ‘কিন্তু সমস্যা হল, তিনি বেরিয়ে আসার পরেও অনেকক্ষণ অমিয়বাবু বেঁচে ছিলেন। সুতরাং খুনের ব্যাপারটা বিনয় বোসের ক্ষেত্রে ঠিক খাটে না।’
‘কেউ কি সেই সময় অমিয়বাবুর কেবিনে উপস্থিত ছিল?’
‘না, তবে বিনয়বাবু চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে ছেলে অম্লানবাবুকে কেবিনে ডেকেছিলেন অমিয়বাবু। দুজনের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হয়। এর পরে সনাতন বিশ্বাস দেখা করতে আসেন। অম্লানবাবুও সেই সময় ঘরেই ছিলেন।’
‘সনাতন বিশ্বাসের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল? অম্লানবাবু নিশ্চই বলেছেন?’ জানতে চাইল টাপুরদি।
‘হ্যাঁ, সনাতন বিশ্বাস থ্রেট দিতে এসেছিলেন। বলেছেন, তাঁকে যদি নতুন মন্ত্রীসভায় রাখা না হয়, সেক্ষেত্রে তিনি তাঁর অনুগামী বাইশ জন এমএলএ নিয়ে পার্টি ছাড়বেন। তার ফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এমনিই আর থাকবে না।’
টাপুরদি মাথা নেড়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘অমিয়বাবু নিশ্চয়ই রাজি হননি?’
‘না,’ বলল অর্জুনদা, ‘সনাতন বিশ্বাসের নামে অনেকগুলো কেস ঝুলছে। তাঁর ভাবমূর্তি জনমানসে একেবারেই পরিচ্ছন্ন নয়। যথেষ্টই বাগবিতণ্ডা হয়েছিল দুজনের মধ্যে। অম্লানবাবু দুই পক্ষকেই শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সনাতন বিশ্বাস হুমকি দিয়েছিলেন, যদি অমিয়বাবু নিজের সিদ্ধান্ত না বদলান, তিনিও দেখে নেবেন কী করে পরদিন মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ করেন তিনি।’
‘হুম, সনাতন বিশ্বাস দেখছি বেশ কনফিডেন্ট ছিলেন যে তাঁর দাবি না মানলে অমিয় চক্রবর্তী শপথগ্রহণ করতে পারবেন না! তা, ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে নিশ্চয়ই? কী বলছেন তিনি?’
‘বলছেন তাঁর পরিকল্পনা ছিল সেদিন রাতের মধ্যে মন্ত্রীমণ্ডলীর তালিকাতে তাঁর নাম না ঢোকানো হলে তিনি তাঁর বাইশজন অনুগামী নিয়ে ওয়াকআউট করতেন। খুন-টুনের কথা তিনি নাকি ভাবেনওনি।’ অর্জুনদা হাসল। তারপর বলল, ‘লোকটার নামে গুন্ডাগিরি, এক্সটরশনসহ দুইখানা খুনের মামলা নয় দশ বছর ধরে এই আদালত থেকে সেই আদালতে ক্যারামের ঘুঁটির মতো ছিটকে বেড়াচ্ছে। সনাতন বিশ্বাসকে ভরসা করা যায় না কিছুতেই।’
টাপুরদি চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, ‘সনাতন বিশ্বাস অমিয়বাবুর কেবিনে আসার আগেই কি ফ্লাস্কে নতুন করে চা ভরা হয়েছিল?’
‘সেখানেই তো আটকে যাচ্ছে তদন্তটা,’ বিমর্ষ মুখে বলল অর্জুনদা, ‘সনাতন বিশ্বাস অফিস থেকে বেরিয়ে যান পৌনে ছ’টা নাগাদ। ক্যান্টিনের ছেলেটি জানাচ্ছে, ফ্লাস্কে নতুন করে চা ভরা হয়েছিল বিকেল পাঁচটার আশেপাশে।’
‘তাহলে তো সনাতন বিশ্বাসেরও অ্যালিবাই সত্যিই স্টং, যদি না তিনি অমিয়বাবুর কেবিনে বসে ফ্লাস্ক খুলে বিষ মিশিয়ে দেন। সেটা বেশ কঠিন ব্যাপার। আরেকটা ব্যাপার হল, সনাতন বিশ্বাসের অতীত যত অন্ধকারাচ্ছন্নই হোক না কেন, যেই কাজটা একটু মোচড় দিলেই হতে পারে, তার জন্য অমিয় চক্রবর্তীর মতো হেভিওয়েট নেতা, তথা হবু মুখ্যমন্ত্রীকে খুন করাটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি লাগছে। কারও উদ্দেশ্যটাই তেমন জোরদার হচ্ছে না। খুন করাটা তো আর যেমন-তেমন ব্যাপার নয়। নেহাত অনন্যোপায় না হলে খুনি এতটা রিস্ক নেবে কেন?’ বলল টাপুরদি।
‘এটা কিন্তু আমিও ভেবেছি টাপুর। হত্যার পেছনে উদ্দেশ্য কি পুরোটাই রাজনৈতিক?’ ভুরু কুঁচকে চিন্তিত মুখে বলল অর্জুনদা, ‘আরেকটা ব্যাপার আছে। অমিয়বাবুর ডেডবডির পাশে একটা সিগারের বক্স পাওয়া গেছে। অমিয়বাবু স্মোক করতেন না। বাক্সটা কেউ আইডেন্টিফাই করতে পারেনি।’
‘ফিঙ্গারপ্রিন্টস?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘ফরেনসিকে দেওয়া হয়েছে। অফিসের কারও সঙ্গে ম্যাচ করেনি।’
১৭
সোজা হয়ে বসল টাপুরদি। বলল, ‘যাক, বাইরের কানেকশন পাওয়া যাচ্ছে, এটা ভালো কথা। তবে সিগারের বাক্সের মালিকই যে খুনি, এমনটা নাও হতে পারে। মোডাস অপারেন্ডি এখনও পর্যন্ত আমরা যেটুকু বুঝেছি তা হল, কেউ অমিয় চক্রবর্তীর ফ্লাস্কে চায়ে বিষ মিশিয়েছিল। কিন্তু কে? চায়ের ফ্লাস্কে বিষ মেশানো কার কার পক্ষে সম্ভব? সেভাবে দেখতে গেলে অনেকের পক্ষেই সম্ভব। ক্যান্টিনের কোনো কর্মী, যে অমিয় চক্রবর্তীর ঘরে ফ্লাস্ক পৌঁছে দিয়েছিল, যে বা যারা তাঁর ঘরে গিয়েছিল তাদের মধ্যে যে কেউ কাজটা করতে পারে। কিন্তু একদম বাইরের লোকের পক্ষে ব্যাপারটা একটু কঠিন। বাই দ্য ওয়ে, পার্টি অফিসে সিসিটিভি নেই?’
অর্জুনদা বলল, ‘আছে, মানে, ছিল। তবে নামেই থাকা। সারাক্ষণ সিসিটিভির সামনে বসে থাকে না কেউ। কেউ খেয়ালই করেনি যে হত্যার দিন দুপুরের পর থেকে সিসিটিভি কেউ বন্ধ করে রেখেছিল। কিছুই রেকর্ডিং হয়নি।’
‘সিসিটিভি বন্ধ ছিল? মানে অফিসের কেউ কাজটা করেছে। যে করেছে, সে সিসিটিভির পাসওয়ার্ড জানত তার মানে?’ বলল টাপুরদি।
‘নাঃ, অত কষ্ট করেনি। সিমপ্লি তার টেনে খুলে দিয়েছিল।’ বলল অর্জুনদা।
‘সেদিন সবাইকে কেন ছুটি দিয়েছিলেন অমিয়বাবু, কিছু জানা গেল কী?’
‘অমিয়বাবুর সেক্রেটারি মনোময় মজুমদার বললেন, পরের দিন শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল। তারপর অমিয়বাবুকে মুখ্যমন্ত্রীর অফিসে বসতে হত। সেই কারণে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন অমিয়বাবু। এত বছর ধরে ওই অফিসে রয়েছেন তিনি, শেষ দিন সেখানে কিছুটা সময় একা কাটাতে চেয়েছিলেন।’ বলল অর্জুনদা।
‘সে ঠিক আছে। কিন্তু একা কাটাবেন বলে সিকিউরিটিকেও চলে যেতে বলবেন, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ব্যাপারটা একটু সাস্পিশাস লাগছে অর্জুন। একটু খতিয়ে দেখো।’ ভুরু কুঁচকে বলল টাপুরদি।
‘কেন বলো তো? কী চলছে তোমার মাথায়?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে ভাবল টাপুরদি। তারপর কাউকে কিছু না বলে উঠে শোওয়ার ঘরে চলে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এল হাতে ল্যাপটপ নিয়ে। বলল, ‘আজ তোমাকে কিছু জিনিস দেখানোর জন্য ডেকেছি। জানি না, এতে কোনো লাভ হবে কি না।’
আমি আর অর্জুনদা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালাম টাপুরদির দিকে। মনে পড়ল আজ সারাদিন টাপুরদি ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে কাটিয়েছে। ল্যাপটপটা টেবিলের উপরে রেখে অন করল টাপুরদি।
সার্চবারে গিয়ে নাম টাইপ করল ‘মল্লিকা দাশগুপ্ত’। নামটা চেনা ঠেকল। পরমুহূর্তেই বিদ্যুৎচমকের মতো স্মৃতিতে ভেসে উঠল নামটা। আমি একটু অবাক হয়ে তাকালাম টাপুরদির মুখের দিকে। রিদ্ধিমার মুখে শুনেছিলাম মল্লিকা দাশগুপ্তের নাম, এই মল্লিকা দাশগুপ্ত রিদ্ধিমার মা।
টাপুরদি বলতে শুরু করল, ‘আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে মল্লিকা দাশগুপ্ত ছিলেন বিখ্যাত একটি ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্টার। পলিটিক্স ও ক্রাইম নিয়ে কাজ করতেন তিনি। সেই সময় অমিয়বাবুদের পার্টি মসনদে ছিল। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, অমিয়বাবুর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু রথীন ঘোষ। রথীনবাবু অভিজ্ঞ নেতা। কিন্তু যেই সময়ের কথা বলছি, তখন তাঁর বয়স হয়েছে যথেষ্ট। শারীরিকভাবেও পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা কর্মীদের উপরে রথীনবাবুর কোনো কনট্রোল ছিল না। সেই সুযোগে বেলাগাম স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়েছিল। সেইসব নিয়েই কলমে আগুন ঝরাচ্ছিলেন এক নির্ভীক সাংবাদিক। তিনি মল্লিকা দাশগুপ্ত। নেটে সার্চ করলে মল্লিকাদেবীর কিছু রিপোর্ট এখনও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বাঙালি হলেও মল্লিকা দাশগুপ্তের স্বামী ছিলেন গুজরাটি, সুরাটের বাসিন্দা। যদিও পরে তাঁর বিয়ে ভেঙে যায়। তিনি পাকাপাকিভাবে সুরাট ছেড়ে মেয়ে নিয়ে এসে কলকাতায় সেটল করে যান। কলকাতায় এসে তিনি তাঁর সাংবাদিকতা চালিয়ে যান। তিনি মূলত ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করতেন, অসম্ভব দুঃসাহসী মহিলা। তাঁর রিপোর্টগুলিতে অমিয়বাবুদের পার্টিকে তিনি সরাসরি আক্রমণ করেছেন বার বার। আমরা মল্লিকা দাশগুপ্তের সেই সময়কার রিপোর্টগুলো মন দিয়ে ফলো করলে অমিয় চক্রবর্তীর উত্থানের একটা গ্রাফ পাই। রথীন ঘোষ অস্তাচলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্টিতে অমিয় চক্রবর্তী অঘোষিত নেতা হয়ে ওঠেন।’
‘এই কেসের সঙ্গে মল্লিকা দাশগুপ্তের সম্পর্ক কোথায়?’ জানতে চাইল অর্জুনদা।
‘আহ, শোনোই না। শুনতে দোষ কোথায়? সম্পর্ক আদৌ আছে কি না তা আমি নিশ্চিত নই। আমি শুধু আমার ফাইন্ডিংস তোমায় বলছি। দেখো, তোমার কেসে কোনো কাজে লাগে কি না।’
‘বলো শুনি।’ হেসে বলল অর্জুনদা।
‘তন্ময়ের কেসটা তোমায় আমি বলেছিলাম। তন্ময়ের কেসের ব্যাপারে খোঁজখবর করতে গিয়ে সুবিনয় মুখার্জির সঙ্গে কথা হয় আমার। অমিয় চক্রবর্তীর অতীত থেকে লুপহোলস খুঁজে বার করার বরাত পেয়েছিলেন তাঁরা। বিগ ক্লায়েন্ট, রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী, বকলমে তাঁর সেক্রেটারি। ইলেকশন শেষ। তন্ময় যে ডকুমেন্টস চুরি করেছে, তা নিয়ে এখন আর বিরোধীদের কোনো মাথাব্যথা থাকার কারণ নেই। অবশ্য সেরকম লুপহোল বেরোলে যেকোনো সময় সেটা হাতে পেলেই লাভ। যাই হোক, আমার শুধু মনে হচ্ছিল, ওঁরা ডকুমেন্টগুলোর জন্য এ রকম হন্যে হচ্ছেন কেন? কী এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে এতে? সুবিনয়বাবুর এত তাগিদ কেন? পুরোটাই কি শুধুই ব্যাবসায়িক?
‘কথাচ্ছলে সুবিনয় মুখার্জি জানালেন তিনি একসময় স্পোর্টসম্যান ছিলেন, রাজ্যস্তরে ক্রিকেট খেলেছেন। কথাটা তখন আমার তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। তারপর টিভিতে সুনয়নাদেবীর ইন্টারভিউ দেখলাম। ইন্টারভিউতে তিনি জানালেন, অম্লান চক্রবর্তী একসময় স্পোর্টসম্যান ছিলেন। রাতে ইন্টারনেটে সার্চ করে দেখলাম, প্রায় টানা তিন বছর অম্লান চক্রবর্তী ও সুবিনয় মুখার্জি একই সময়ে স্টেট জুনিয়র টিমে একসঙ্গে ক্রিকেট খেলেছেন। দুই জনে অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বুঝলাম, ইউনিকর্নের প্রোজেক্টটের ব্যাপার অম্লানবাবুর অজানা নয়। তিনি জানতেন বিরোধী দল এ-রকম একটা কাজের বরাত দিয়েছে সুবিনয়বাবুর দলকে।’
‘সেটা তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কী করে টাপুর?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা, ‘ইউনিকর্নের মতো প্রফেশনাল এজেন্সি ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য নিজেদের সুনাম, দায়িত্ব কম্প্রোমাইজ করবে কী করে ভাবলে?’
‘করবে অর্জুন, যদি আরও বড়ো কোনো ইন্টারেস্ট থাকে। সেটা আছে কি না খোঁজ নেওয়ার দায়িত্ব তোমার, মানে পুলিশের। খোঁজ লাগাও অম্লানবাবুর অ্যাকাউন্ট থেকে বড়ো কোনো অ্যামাউন্ট ট্রান্সফার বা উইথড্র হয়েছে কি না। অবশ্য বেশিরভাগ পলিটিক্যাল পার্টি নগদ ফান্ড নিয়ে কাজ করে। ব্ল্যাক মানি থাকে প্রচুর। তাই টাকার হিসেব লাগানোটা একটু মুশকিল, বিশেষত ইলেকশনের আগে।’
‘হুম, বলে যাও,’ বলল অর্জুনদা।
‘আমার ধারণা যদি সত্যি হয়, সেক্ষেত্রে অম্লানবাবুও জানেন এই ডকুমেন্ট চুরির কথা। কিংবা হয়তো এখনও জানেন না। তিনি জেনে যাওয়ার আগে সেটাকে উদ্ধার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছেন সুবিনয় মুখার্জি।’ বলল টাপুরদি।
‘টাপুর, তোমার ধারণা যদি সত্যি হয়, তাহলেও কি এই রহস্যের সঙ্গে অমিয়বাবুর মৃত্যুর কিছু যোগ আছে বলে তোমার মনে হয়?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
‘আমি নিশ্চিত নই। সেটা জানতে হলে আগে জানা দরকার কী সেই মহার্ঘ্য বস্তু, যেটা পাওয়ার জন্য সুবিনয় মুখার্জি হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করছে।’
‘তন্ময়কে না পাওয়া গেলে সেটা জানা যাবে কী করে?’ অর্জুনদা বলল।
আমি উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলতে গেলাম যে তন্ময়ের খোঁজ আমরা জেনে গেছি। তার আগেই টাপুরদি বলে উঠল, ‘হুম, সে তো ঠিক কথা, তন্ময়কে আগে খুঁজে বার করতে হবে।’ তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ‘ও বাবা, অনেক রাত হয়ে গেল তো! তোমাদের খেতে দিয়ে দিই।’
১৮
অর্জুনদা চলে যাওয়ার পরে টাপুরদিকে চেপে ধরলাম, ‘তুমি কেন অর্জুনদাকে বললে না যে তন্ময়ের খোঁজ তুমি জেনে গেছ? অর্জুনদা তোমার কেসে সবরকম করে সাহায্য করে। আর তুমি এত ভাইটাল খবরটা অর্জুনদার কাছে চেপে গেলে?’
টাপুরদি বলল, ‘না রে। সেজন্য নয়। এই মুহূর্তে আমার একটা সামান্য ভুলের জন্যেও তন্ময়ের প্রাণসংশয় হতে পারে। আমি এমন কিছু করতে পারি না, যাতে তন্ময়ের ক্ষতি হয়। পুলিশের কার্যপ্রণালী একটু অন্যরকম। হয়তো ওরা গিয়ে রেখাদেবীর বাড়িতে তন্ময়কে জেরা করতে চলে গেল। কিংবা ওকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। তখন কিন্তু ভীষণ বিপদ হয়ে যেতে পারে। ভুলে যাস না, এই কেসে অনেক ক্ষমতাশালী মানুষও সন্দেহভাজনের তালিকায় আছে। সেক্ষেত্রে পুলিশকেও পুরোপুরি বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। অর্জুন সৎ অফিসার বলে ডিপার্টমেন্টের সবাই যে সৎ সেটা তুই কীভাবে শিয়োর হচ্ছিস? পুলিশ স্টেশনেও তন্ময় সম্পূর্ণ সুরক্ষিত নয় রে। তাই বাধ্য হয়েই চেপে যেতে হল।’
ব্যাপারটা বুঝলাম। এতক্ষণ টাপুরদির অদ্ভুত ব্যবহারটা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল ক্রমাগত। টাপুরদি অর্জুনদার কাছ থেকে তথ্য গোপন করবে, সেটা মেনে নিতে পারছিলাম না মন থেকে। এখন একটু শান্তি পেলাম। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, টাপুরদি অকারণে কিছু করে না। বললাম, ‘তাহলে এখন কী করবে টাপুরদি?’
‘সত্যি বলতে কী, আমার তরফ থেকে আর কিছু করার নেই এখন। পুলিশি তদন্তে নাক গলানোর এক্তিয়ার আমার নেই। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসেও থাকতে পারছি না। তন্ময় রেখাদেবীর বাড়িতে বেশি দিন লুকিয়ে থাকতে পারবে না। আজ না হয় কাল ধরা পড়েই যাবে। তখন আমি অন্তত নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না রে মিতুল।’ চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি।
‘তাহলে কীভাবে এগোবে? ভেবেছ কিছু?’ জিজ্ঞাসা করলাম।
‘তন্ময়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে রে। জানতে হবে, কোন সত্যকে ও আড়াল করে লুকিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কীসের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে সকলে মিলে সেটাই জানার।’
‘সে না হয় হল। কিন্তু তন্ময় কি তোমাকে বলবে? যদি বলেও বা, এতে কি আদৌ লাভ কিছু হবে?’
‘জানি না কীসে কী লাভ হবে। শুধু জানি, চেষ্টাটা করতে হবে। দেখ মিতুল, অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু রহস্য নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি আগেও বলেছি, সেটা পুলিশের কাজ। কিন্তু আমার কাজ হল, তন্ময়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই চেষ্টা আমি করবই।’ বলল টাপুরদি।
‘কীভাবে করবে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘ভাবতে হবে মিতুল, মাথা খাটাতে হবে। তবে আমার প্রথম কাজ হল তন্ময়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা। কিন্তু রেখাদেবীর বাড়িতে আর যাওয়া যাবে না। আমার ধারণা যদি ভুল না হয়, সুবিনয় মুখার্জির লোক আমার প্রতিটা স্টেপের পর নজর রাখছে।’
লাফিয়ে উঠলাম আমি, ‘কী বলছ? সেই ভয়ে তুমি দুইদিন ধরে চুপচাপ ঘরে বসে আছ?’
মাথা নাড়ল টাপুরদি। বলল, ‘না, ঠিক ভয় নয়। তবে আমি চাই না আমি কী ভাবছি তা সুবিনয় মুখার্জি ঘুণাক্ষরেও টের পাক।’
‘তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী?’
‘তুই কাল অফিস যাবি। তোদের অফিসের ল্যান্ডফোন থেকে ফোন করবি রেখাদেবীর বাড়িতে। নিজের পরিচয় দিয়ে তন্ময়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইবি। যেভাবে হোক, ওকে কনভিন্স করার দায়িত্ব তোর। পারবি তো?’
বললাম, ‘চেষ্টা করব টাপুরদি। কিন্তু তন্ময় কি আমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হবে? রেখাদেবী আদৌ হয়তো স্বীকারই করবেন না যে তন্ময় তাঁর বাড়িতে আছে।’
টাপুরদি আমার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘পারতে তোকে হবেই মিতুল। রহস্যের চাবি তন্ময়ের হাতে আছে। ওকে বাঁচাতে হলে আমায় জানতেই হবে, ওর কাছে কী আছে।’
অফিস যাওয়ার আগে টাপুরদি আমায় পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিল তন্ময়কে কী জিজ্ঞাসা করতে হবে। আমার বুকের ভিতরটা ধুকপুক করছে। টাপুরদি আমার উপর অনেকটা ভরসা করেছে। জানি না আদৌ পারব কি না, তবু চেষ্টা করব। অফিসে পৌঁছে ফোন করলাম রেখাদেবীর বাড়ির নম্বরে। দুইবার রিং হতেই ওপারে ভারী পুরুষ কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে এল, ‘কে বলছেন?’
যথাসম্ভব বিস্ময় গোপন করে নিজের পরিচয় দিলাম।
ফোনের ও প্রান্ত থেকে পুরুষ কণ্ঠ আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘রেখাদেবীকে আপনি কীভাবে চেনেন?’
কী বলি। চটজলদি ভেবে নিয়ে বানিয়ে বললাম, ‘অনেকদিন আগে আলাপ হয়েছিল। তারপর মাঝে মাঝে ফোন করে খবরাখবর নিতাম। তিনি একা মানুষ, বলতেন লোকজন ফোন করলে ভালো লাগে, তাই আর কী। রেখাদেবীও আমায় স্নেহ করতেন। কিন্তু আপনি কে বলছেন?’
ও প্রান্তের ভদ্রলোক ভারী গলায় বললেন, ‘কাল রাতে কিছু সমাজবিরোধী সম্ভবত ডাকাতির উদ্দেশ্যে রেখাদেবীর বাড়িতে ঢোকে। রেখাদেবী খুন হয়েছেন। পেটে ছুরি মারা হয়েছে। সম্ভবত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই মারা গেছেন। বাকিটা পোস্ট মর্টেম হলে বোঝা যাবে।’
আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। হাত কাঁপছে রীতিমতো। কম্পিত কণ্ঠে বললাম, ‘বাড়িতে আর কেউ ছিল না?’
‘না। রেখাদেবীর কাজের মেয়েটি দু’দিন হল নিজের গ্রামের বাড়িতে গেছে। প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, রেখাদেবী একাই থাকতেন। আচ্ছা, রাখছি।’
১৯
‘তুমি জানতে, তন্ময় রেখাদেবীর বাড়িতে আছে? তুমি আমায় একবার জানালে না?’ অর্জুনদা নিজের অসন্তাোষ লুকোতে পারছে না, ‘হাউ ক্যান ইউ বি সো রেকলেস টাপুর? তুমি একবারও ভাবলে না যে তন্ময়ের কারণে রেখাদেবীরও ক্ষতি হতে পারে?’
টাপুরদি চুপ করে আছে। আমি জানি টাপুরদি নিজেও মানসিকভাবে কতটা যন্ত্রণার মধ্যে আছে। ঘটনাটা শোনার পরেই আমি অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা টাপুরদির ফ্ল্যাটে ফিরে এসেছি সকালে। অর্জুনদা গড়িয়া থানায় ফোন করে জেনেছে পাড়াপ্রতিবেশীরা আজ সকালে দেখে বাড়ির দরজা খোলা। ভিতরে ঢুকে তারা রেখাদেবীর মৃতদেহ দেখতে পায়। বাড়িতে আর কেউ ছিল না।
অর্জুনদা সামনে এগিয়ে গিয়ে টাপুরদির মুখোমুখি বসল। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে নরম গলায় বলল, ‘টাপুর, তুমি বুঝতে পারছ তো, যারা রেখাদেবীকে মেরেছে, তারা খুব ক্ষমতাশালী লোকজন। তারা তোমার ক্ষতি করতে পারে, মিতুলের ক্ষতি করতে পারে। তুমি আর এসবের মধ্যে থেকো না টাপুর। প্লিজ আমি রিকোয়েস্ট করছি তোমায়। তুমি যদি আমায় কালই বলতে তন্ময় রেখাদেবীর বাড়িতে আছে, ওকে যদি ওখান থেকে বার করে আনতে পারতাম, আজ হয়তো রেখাদেবী বেঁচে থাকতেন। আমরা এখনও জানি না, তন্ময় কেমন আছে, কোথায় আছে, ওদের হাতে ধরা পড়েছে কি না। আর যদি সত্যিই অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর সঙ্গে তন্ময়ের বা রেখাদেবীর মৃত্যুর কোনো যোগ থাকে, সেক্ষেত্রে ইউ আর অলসো ইন গ্রেট ট্রাবল। তুমি প্লিজ এই কেস থেকে পুরোপুরি সরে এসো। পুলিশের কাজ পুলিশকে করতে দাও।’
টাপুরদির জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। মাথা নীচু করে চুপ করে বসে আছে টাপুরদি। তাকে দেখে একটা সম্পূর্ণ হেরে যাওয়া মানুষ বলে মনে হচ্ছে। টাপুরদিকে হেরে যেতে দেখতে ভালো লাগে না আমার। আমি টাপুরদির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কঠিন গলায় বললাম, ‘অর্জুনদা, সব দোষ কি সত্যিই টাপুরদির? টাপুরদি তো তোমায় সব বলেছিল, পুলিশ কেন তন্ময়ের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর হত্যার যোগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেনি এতদিন? অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। পুলিশ শুধুমাত্র একমুখী তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অমিয় চক্রবর্তীর আশেপাশের মানুষের মধ্যে খুনি খুঁজে চলেছে। অমিয়বাবুর অতীত ঘেঁটে দেখার সম্ভাবনার কথা কই কারওর তো মাথায় আসেনি এক টাপুরদি ছাড়া। এখন যখন রেখাদেবী খুন হয়েছেন, এই খুন ও তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর খুনের যোগ থাকার সম্ভাবনা দৃঢ় হচ্ছে, তখন তুমি বলছ টাপুরদিকে সরে যেতে?’
অর্জুনদা অবাক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকাল। আমি কোনোদিন এভাবে অর্জুনদার সঙ্গে কথা বলিনি। কিন্তু আজ টাপুরদির জন্য শুধু অর্জুনদা কেন, আমি দুনিয়ার সঙ্গে লড়ে যেতে পারি। অর্জুনদা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর উঠে দাঁড়াল। গম্ভীর গলায় বলল, ‘বেশ! যা ভালো বোঝো করো। আমি আসছি।’
অর্জুনদা দরজার সামনে গিয়ে জুতোতে পা গলাচ্ছে, টাপুরদি মুখ তুলে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘যদি সম্ভব হয়, রিদ্ধিমার সিকিউরিটির ব্যবস্থা কোরো। ওর বাড়ির সামনে সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করতে পারলে ভালো হয়। আমার ধারণা, শি ইজ অলসো ইন ডেঞ্জার।’
অর্জুনদা কিছু বলল না। গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেল। আমি উঠে দরজা বন্ধ করে টাপুরদির পাশে গিয়ে বসলাম। বললাম, ‘আমি জানি টাপুরদি, রেখাদেবীর মৃত্যুর জন্য তুমি নিজেকে দায়ী করছ। কিন্তু আমি বলব, কোরো না। এতদিন ওরা জানতে পারেনি যে তন্ময় রেখাদেবীর বাড়িতে লুকিয়ে আছে। জানতে পারলে আগেই ঘটনাটা ঘটত। কাল যা ঘটেছে, তন্ময়ের নির্বুদ্ধিতার জন্য ঘটেছে সেটা তুমি নিজেও জানো। রিদ্ধিমার ফোন যে ট্রেস হবে, সেটা ওর আগেই বোঝা উচিত ছিল। রেখাদেবীকে দিয়ে রিদ্ধিমাকে ফোন করানোটা ওর উচিত হয়নি। যেটা হয়েছে, সেটা ইরিভার্সিবল। আমি তোমায় বলছি টাপুরদি, তুমি হাল ছেড়ো না। পুলিশ যেভাবে এগোচ্ছে এগোক। তুমি তোমার মতো করে এগোও। অর্জুনদা এখন কিছুটা ডিস্টার্বড। মাথা ঠান্ডা হলে নিজেই বুঝবে।’
টাপুরদি আমার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ মুখে হাসল। তারপর বলল, ‘কবে এত বড়ো হয়ে গেলি রে মিতুল?’ তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘অর্জুন ভুল বলেনি রে। রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রীকে যারা হত্যা করতে পারে, তারা পেটি ক্রিমিনাল নয়। এরা সত্যিই সাংঘাতিক। আমি তোকে এর মধ্যে টানতে পারি না কিছুতেই। দুটো খুন করেছে ওরা, তিনটে খুন করতে ওদের বাঁধবে না। নিজের জন্য আমি ভাবি না। কিন্তু তোর কোনো ক্ষতি হতে দেব না আমি। গোয়েন্দাগিরিটা আমি শখে করি। এটা আমার নেশা বলে করি। কিন্তু নেশা কখনোই কারও জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। এই কেসে পুলিশ যা করে করুক। আজ এই মুহূর্ত থেকে আমি এই কেস থেকে সরে এলাম।’
আমি বললাম, ‘টাপুরদি, কেস তোমার, তাই সিদ্ধান্তও তোমার। তুমি তো আমায় ছোটো থেকে চেনো। জানো তো, ছোটো থেকে আমার ইমিউনিটি খুব কম ছিল। ভীষণ ভুগতাম। রোগা শরীরে সামান্য ধকলও সহ্য করতে পারতাম না আমি। মাও আমাকে খুব আগলে আগলে বড়ো করেছে। পড়াশোনার বাইরে আর কিচ্ছু বুঝতাম না। এভাবে চলতে চলতে আমার আত্মবিশ্বাসটাই নষ্ট হয়ে গেছিল।’
‘তারপর তুমি ইউএসএ থেকে ফিরে এলে। তোমার সঙ্গে একটা দুটো করে কেসে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে আমি নিজেই কখন বদলে গেছি, টেরই পাইনি জানো? এতটা শক্তি, এতটা সাহস যে আমার মধ্যে ছিল, আমি নিজেই জানতাম না। তুমি আমায় নিজেকে চিনিয়েছ। আমার আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছ। সারাজীবন ধরে হেরে যাওয়া, মুখ লুকিয়ে থাকা আমি জীবনকে চোখে চোখ রেখে চ্যালেঞ্জ করতে শিখেছি। ভয়, অসহায়তা নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার চেয়ে লড়াই করে বাঁচা, হেরে না গিয়ে মরে যাওয়াও ভালো। আমি আর ভয় পাই না টাপুরদি, বিশ্বাস করো। তুমিও ভয় পেয়ো না। তুমিই তো আমায় শিখিয়েছ, জীবনে যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক, চোখ-কান খোলা রেখে এগিয়ে যাওয়ার সাহসটুকু রাখলে একটা না একটা সমাধান বেরোয়ই। আমি নিশ্চিত, এই কেসেও বেরোবে। তুমি হাত তুলে নিয়ো না। প্লিজ। অর্জুনদা তোমায় ভালোবাসে টাপুরদি, তাই ভয় পাচ্ছে। যখন তুমি কেসটা সলভ করবে, আমি জানি সবচেয়ে বেশি খুশি অর্জুনদাই হবে।’
টাপুরদির গাল বেয়ে অশ্রুধারা নামছে। এতদিন ধরে এত খুনোখুনি দেখেছি আমরা, কত মৃতদেহকে চোখের সামনে দেখেছি, কিন্তু টাপুরদিকে এ-রকমভাবে ভেঙে পড়তে দেখিনি কখনো। গোয়েন্দা টাপুরদি, যে একাই যুযুৎসুর প্যাঁচে একাধিক দুষ্টু লোককে কাবু করার ক্ষমতা রাখে, নির্দ্বিধায় যেকোনো বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, জটিল পরিস্থিতিতেও যে স্নায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় না এতটুকু, সেই শক্তিশালী মেয়েটির ভিতরে একটি কোমল, নরম মানুষও বাস করে। তাকে আমি চিনি। সে একজন স্নেহময়ী দিদি, বন্ধু। সে যাকে ভালোবাসে তার জন্য সব করতে পারে। কিন্তু আজ যদি আমি টাপুরদিকে দুর্বল হতে দিই, তাহলে সারাজীবন আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। আমার মনে হবে আমার জন্য টাপুরদিকে পিছিয়ে আসতে হল। হাত বাড়িয়ে টাপুরদির গলা জড়িয়ে ধরে হেসে বললাম, ‘তুমি যদি কেস থেকে সরে আসো, আমি কিন্তু আসব না, এই আমি বলে দিলাম। তোমার কাছ থেকে যেটুকু শিখেছি, তাই দিয়েই তদন্ত করব। তুমি ভেবে দেখো এবার, একা একা আমাকে এই বিপদের মধ্যে ছেড়ে দেবে কি না।’
টাপুরদি এবার হেসে ফেলল। বলল, ‘খালি দুষ্টু বুদ্ধি না?’ তারপর উদাস গলায় বলল, ‘না রে মিতুল, আমি সাহস পাচ্ছি না। ওরা যা কিছু করতে পারে।’
আমি বললাম, ‘তুমিও যা কিছু করতে পারো। তুমি কি কম ভয়ংকর নাকি? সেটা ওরা এখনও বোঝেনি। এবার সেটা বোঝানোর সময় এসেছে।’
‘বলছিস?’ হেসে বলল টাপুরদি।
‘একদম, বলছি।’ আমিও হাসলাম।
‘অর্জুন কিন্তু ভারি রেগে যাবে?’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি।
‘পরে তুমি না হয় আদর করে রাগ কমিয়ে দিয়ো।’ হেসে বললাম আমি।
‘তবে রে,’ বলে হাসতে হাসতে আমায় গাঁট্টা মারার জন্য হাত তুলল টাপুরদি। আমি ছিটকে সরে গেলাম। টাপুরদি বলল, ‘বেশ, চল তবে। না হয় আরেকবার চেষ্টা করা যাক।’
