৫৫
লালবাজারের গেট দিয়ে গাড়ি ঢুকল আমাদের। গাড়ি থেকে নেমে প্রায় ছুট লাগালাম। সৌরভবাবুর কেবিনের বাইরে অর্জুনদার সঙ্গে মুখোমুখি প্রায় ধাক্কা লাগল। আমাদের দেখে বলল, ‘এসে গেছ? চলো, স্যার অপেক্ষা করছেন।’
ভিতরে গিয়ে দেখলাম সৌরভ সান্যালের মুখে যেন কেউ এক পোঁচ কালি ঢেলে দিয়েছে। আমাদের দেখে ইঙ্গিতে বসতে বললেন। তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, ‘এই পেনড্রাইভ নিয়মমতো আমার দেখানো উচিত নয় কাউকে। কিন্তু যেহেতু এটা আপনারাই এনেছেন, তাই মনে হল, আপনাদের জানার অধিকার আছে এতে কী আছে। কিন্তু আপনাকেও সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। আপনার উপর আমার সেই বিশ্বাস আছে বলেই এটা আপনাকে দেখাচ্ছি।’
নিজের ল্যাপটপটা আমাদের দিকে ঠেলে দিলেন সৌরভবাবু। স্ক্রিনের উপর একটাই ফোল্ডার রয়েছে দেখতে পেলাম। সেটায় ক্লিক করতে দেখা গেল বেশ ক-টি পিডিএফ ফাইল। একে একে সব কটি পিডিএফ খুলে দেখলাম আমরা। উত্তেজনায় আমাদের মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠেছে। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে একের পর এক ফাইল খুলে দেখছে টাপুরদি। সবগুলো ফাইল দেখা শেষ করে ল্যাপটপটা সৌরভবাবুর দিকে এগিয়ে দিল টাপুরদি। বলল, ‘এবার কী?’
‘রিদ্ধিমা দেশাইয়ের বিল্ডিং-এর আশেপাশে সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এখনই আর কিছু অ্যাকশন নেওয়া হচ্ছে না। এখন মোটামুটিভাবে তাকে হাউজ অ্যারেস্টে রাখা হবে।’
‘ঠিক আছে,’ চিন্তিত মুখে বলল টাপুরদি, ‘এখন আর এই ব্যাপারে কিছু করারও নেই। তন্ময়ের জন্য চিন্তা হচ্ছে।’
সৌরভবাবুর মুখে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আপনি যখন আমাকে বলেছিলেন, তন্ময়ের ব্যাপারটা অমিয় চক্রবর্তীর খুনের সঙ্গে রিলেটেড, আমি স্বীকার করছি সেই কথাটাকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিইনি। সেটা আমারই ভুল। তখন তন্ময়কে খুঁজে বার করার উপর আরেকটু বেশি জোর দিলে বোধ হয় এত কিছু ঘটত না। এমনকী অর্জুন না বললে আপনাকে এই কেসে ইনভলভ করার কথা আমার মাথাতেও আসত না। এনিওয়ে, ইট ওয়াজ আ গুড ডিসিশন ইনডিড।’
টাপুরদি একবার বিস্মিত মুখে অর্জুনদার মুখের দিকে তাকাল। অর্জুনদার মুখ পাথরের মতো শক্ত ও অভিব্যক্তিহীন। টাপুরদি এবার বলল, ‘স্যার, একটা কালো এসইউভি রিদ্ধিমাকে ফলো করে, আমি দেখেছি। দূরত্বের জন্য গাড়িটার নম্বর দেখতে পারিনি। আজ সুবিনয়বাবুকে কিডন্যাপের ব্যাপারেও কালো এসইউভি জড়িয়ে আছে। যে গাড়িটা উদ্ধার হয়েছে সেটা পার্টি অফিসের গাড়ি,’ বলল টাপুরদি।
এবার অর্জুনদা বলল, ‘একটা কথা। যে বা যারা এসবের পেছনে আছে, তারা তন্ময়কে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। হাতে পেলে হয়তো বাঁচবে না ও, যদি না এখনও ধরা পড়ে গিয়ে থাকে ওদের হাতে। কিন্তু তারা রিদ্ধিমাকে কিছু করল না কেন?’
টাপুরদি অর্জুনদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘আমার ধারণা একটু অন্যরকম। সম্ভবত তন্ময় অলরেডি ওদের কবজায় আছে। আর ওরা তন্ময়ের কাছেই জেনেছে যে রিদ্ধিমা এই ডায়েরির ব্যাপারে কিছু জানে না। তাই রিদ্ধিমাকে কিছু করেনি। অযথা রিস্ক নিতে চায়নি। যদিও আমি শিয়োর নই, রিদ্ধিমা জানে কি না।’
‘আপনি বলছেন তন্ময়কেও কিডন্যাপ করেছে ওরা?’ সৌরভবাবু জিজ্ঞাসা করলেন।
টাপুরদি একটু চিন্তা করে বলল, ‘তাই তো দাঁড়াচ্ছে স্যার। নইলে এতদিনে রিদ্ধিমা সেফ থাকত না। ওরা রিদ্ধিমাকে কিডন্যাপ করে তন্ময়ের উপর প্রেশার তৈরি করত।’
‘তাহলে এবার ভাবতে হবে, কে কে জানত এই গোপন কথা? কার কার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল? স্যার, এখন সময় কম। এদিক-ওদিক অন্ধের মতো দৌড়ে লাভ নেই। আগে ভাবা দরকার। ধনঞ্জয় মণ্ডলের কাছে অমিয় চক্রবর্তীকে হত্যা করার কারণ ছিল। তবে সে ছাড়াও আর কিছু মানুষের কাছে সেরকম কারণ ছিল।’
‘এখন প্রশ্ন হল, কার কারণটা সবচেয়ে জোরদার? এই পেনড্রাইভটা না খুললে আমরা অন্ধকারেই থেকে যেতাম। কিন্তু এখন এটা স্পষ্ট যে, অমিয় চক্রবর্তীর এই ইতিহাস বাইরে এলে পার্টির ইমেজে কালি লাগত। এত দিনের লড়াইয়ের পরে পাওয়া কুর্সি হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সেক্ষেত্রে কার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হত? অমিয়বাবুর মৃত্যুতে কে সবচেয়ে বেশি লাভবান হল?’
‘আপনি কীভাবে শিয়োর হচ্ছেন, যে খুনটা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নয়?’ জিজ্ঞাসা করলেন সৌরভ সান্যাল।
‘আমি শিয়োর হচ্ছি না স্যার,’ বলল টাপুরদি, ‘জাস্ট সম্ভাবনাগুলোকে খতিয়ে দেখছি। ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেথড ব্যবহার করছি, বলতে পারেন।’
‘কীরকম?’ জানতে চাইলেন সৌরভবাবু।
‘দেখুন স্যার, প্রথমে আমরা ভাবি, কে কে খুন করতে পারে অমিয়বাবুকে। অনিমেষবাবু ওই পরিবারের জন্য নিজের মেয়েকে হারিয়েছিলেন। এবার নাতনিকে নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন। রাগ ছিল ওই পরিবারের উপর। কিন্তু অনিমেষবাবুর যা বয়স, আর যা রেকর্ড, তাতে তিনি এতটা রিস্ক নেবেন বলে মনে হয় না আমার। তা ছাড়া ধনঞ্জয় মণ্ডলের সঙ্গেও কোনো যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
‘এবার আসি মৃণালবাবুর প্রসঙ্গে। মৃণাল দত্ত ধনঞ্জয়কে টাকা দিয়েছিল। কিন্তু আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি, সেটা মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা। তা দিয়ে ধনঞ্জয় মণ্ডলের খুব বেশি লাভ হত না। অমিয় চক্রবর্তীর উপর রাগ হয়তো ছিল মৃণালবাবুর। কিন্তু এতদিন পরে প্রতিশোধ নিতে যাওয়ার লজিকটা আমার তেমন যুক্তিগ্রাহ্য বলে মনে হচ্ছে না। প্রসঙ্গত, মৃণালবাবুর বয়স ও স্বাস্থ্যও ঠিক খুন করার উপযোগী নয়।’
‘এবার আসি বিনয় বোসের কথায়। ভোটে হেরে রাগের মাথায় হবু মুখ্যমন্ত্রীকে খুন করার মতো বোকা লোক বিনয় বোস নন। তিনি পোড়-খাওয়া রাজনীতিবিদ। জানেন, অমিয়বাবু খুন হলে সন্দেহের আঙুল তাঁর দিকেই প্রথমে উঠবে। অমিয়বাবুকে খুন করে তাঁর কোনো লাভ নেই।’
‘তাহলে বাকি থাকল কে, স্যার? অমিয়বাবুকে মারার মোটিভ আর কার বেশি ছিল বলে আপনার মনে হয়?’
সৌরভ সান্যাল একদৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ‘আপনি কী বলতে চাইছেন, আমি বুঝতে পারছি মিস ব্যানার্জি। কিন্তু আপনি ভাবতে পারছেন সেটা যদি সত্যি হয়, রাজ্য রাজনীতিতে কী তুমুল ঝড় উঠতে চলেছে? এ ব্যাপারে নেক্সট অ্যাকশন প্ল্যান করার আগে আমায় কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ব্যাপারটা আর আমার হাতে নেই। আমি এই ব্যাপারে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারব না।’
অর্জুনদা এগিয়ে এল এবার। বলল, ‘স্যার, এই কেসটা নিয়ে আমরা অনেকদিন ধরে লড়ছি। দিনরাত ছুটে বেড়াচ্ছি। যত এগোনোর চেষ্টা করছি, রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করে পিছিয়ে আসছি। পুলিশের চাকরিতে জয়েন করার আগে শপথ নিয়েছিলাম, আইনের রক্ষা করব যেকোনো মূল্যে। আজ যদি রাজনৈতিক রক্তচক্ষুকে ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসি, অম্লান চক্রবর্তীকে অপরাধী জেনেও ছেড়ে দিই, কাল যখন তিনি মসনদে বসে এই রাজ্যের কয়েক কোটি মানুষের হর্তা-কর্তা-বিধাতা হবেন, রাজ্যের ভাগ্যনিয়ামক হয়ে আরও অনেক কেসে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করবেন, তখন নিজের উপর আমাদের লজ্জা হবে না স্যার? যে মানুষ নিজের স্বার্থে নিজের বাবাকেও খুন করতে পারে, নিখুঁত প্ল্যানিং করে সনাতন বিশ্বাসের মতো পথের কাঁটা দূর করতে পারে, তন্ময়কে, সুবিনয় মুখার্জিকে কিডন্যাপ করাতে পারে সে ক্ষমতা পাওয়ার পর আর কী কী করতে পারে ভাবতে পারেন?’
সৌরভ সান্যাল অর্জুনদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘লেটস গেট ব্যাক টু ওয়ার্ক। আমি কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে পারমিশনের ব্যবস্থা করছি। কিন্তু মনে রেখো, সলিড প্র&ফ ছাড়া কিন্তু অম্লান চক্রবর্তীর মতো পাওয়ারফুল লোককে অ্যারেস্ট করা যাবে না।’
‘ইয়েস স্যার। আমাদের একটা গাড়ি মনোময়বাবুকে ফলো করে ডেস্টিনেশনে পৌঁছে গেছে। সোনারপুরের দিকে একটা জায়গায় অপেক্ষা করছে ওরা। রজতদাও আছে ওখানে। আমাদের তাড়াতাড়ি সেখানে যাওয়া দরকার,’ অর্জুনদা বলল।
‘যাও। আমার প্রতি মিনিটের আপডেট চাই।’
‘ইয়েস স্যার,’ স্যালুট ঠুকল অর্জুনদা।
৫৬
ঝড়ের বেগে আমাদের গাড়ি টালিগঞ্জ ছাড়িয়ে ছুটে চলেছে আরও দক্ষিণের দিকে। কামালগাজি পেরোতে রিং হল অর্জুনদার ফোনে। ফোন তুলে কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে টাপুরদির দিকে তাকাল অর্জুনদা। বলল, ‘রজতদার ফোন। সোনারপুরে একটা পুরোনো বাগানবাড়ির ভিতর ঢুকেছে মনোময়বাবুর গাড়ি। রজতদা খোঁজখবর নিয়ে জেনেছে, ওই বাড়িতে এক বুড়ো কেয়ারটেকার ছাড়া আর কেউ থাকে না। শীতের কয়েক মাস পিকনিকের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। অন্য সময় খালিই পড়ে থাকে। বাড়ির মালিক প্রবাসী, কালেভদ্রে কলকাতায় আসেন। মনোময়বাবু ঢোকার পর ভিতর থেকে তালা লাগানো হয়েছে গেটে। ভিতরে কী হচ্ছে বোঝার উপায় নেই। ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’
‘সুবিনয় মুখার্জিকে কি ওরা ওখানে বন্দি করে রেখেছেন?’ ভুরু কুঁচকে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
‘হি মাস্ট বি দেয়ার,’ দাঁতে দাঁত চেপে বলল অর্জুনদা। ড্রাইভারের সামনের গ্লাভ বক্স থেকে একটা রিভলভার বার করে টাপুরদির হাতে দিল অর্জুনদা। বলল, ‘এটা ধরো। লোডেড আছে।’
টাপুরদি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ক’দিন আগেই পেয়েছে। রিভলভারটা জিনসের পকেটে ঢুকিয়ে নিল টাপুরদি। চোখে-মুখে প্রত্যয়ের ছাপ।
অল্পসময়ের মধ্যে সোনারপুরের বাগানবাড়ির সামনে পৌঁছে গেলাম আমরা। উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা বাড়ি, সামনে বড়ো লোহার গেটে জায়গায় জায়গায় মরচে পড়েছে। আমাদের গাড়ি থামতেই রজতবাবুদের গাড়িও এগিয়ে এল। আমাদের গাড়িতে বসতে বলে অর্জুনদা নেমে গেল। লোহার গেটে দুম দুম করে ঘুসি মারতে থাকল অর্জুনদারা। বেশ কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কির পর একজন ছোটোখাটো চেহারার লোক এসে দরজা খুলে দিল। পরনে ছিটের শার্ট আর লুঙ্গি। সম্ভবত এই বাড়ির কেয়ারটেকার, পুলিশ দেখে তার দুই চোখে বিস্ময় ঝরে পড়ছে। তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পুলিশের দল ভিতরে গেল। আমরা বসে রইলাম গাড়িতেই।
‘আমরা ভিতরে যাব না টাপুরদি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘এটা হাই রিস্ক পুলিশ অপারেশন মিতুল। এখানে তো আমাদের যাওয়ার পারমিশন নেই,’ বলে চিন্তাগ্রস্ত মুখে গেটের ভিতরে যতদূর দৃষ্টি প্রসারিত করা যায়, সেইভাবে সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে বসে রইল টাপুরদি। যতই স্থৈর্য বজায় রাখার চেষ্টা করুক, ভিতরে ভিতরে টাপুরদি যে কতটা উত্তেজিত তা কেউ না জানুক, আমি জানি।
প্রায় কুড়ি মিনিট পর ফিরে এল পুলিশের দল, এবং সেটা খালি হাতে। টাপুরদি এবার লাফিয়ে গাড়ি থেকে নামল। উত্তেজিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল?’
অর্জুনদা হতাশ মুখে হাত নেড়ে বলল, ‘কেউ নেই এখানে। পুরোটাই পুলিশকে বোকা বানানোর ফন্দি ছিল। গাড়ি সামনের গেট দিয়ে ঢুকে পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে। কেয়ারটেকার কিছুই জানে না। ব্যাটা মালিকের অনুপস্থিতিতে বাড়ি টুকটাক ভাড়া-টাড়া দিয়ে কিছু রোজগার করে। কিছু টাকার বিনিময়ে গেট খুলে দিয়েছিল শুধু।’
‘ভালো করে খুঁজে দেখেছ তোমরা?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘রীতিমতো চিরুনিতল্লাশি করা হয়েছে। কেউ নেই।’
‘এর মানে দাঁড়াচ্ছে, মনোময়বাবু জানতেন তাঁদের গতিবিধির দিকে, বাড়ির দিকে নজর রাখা হচ্ছে। সেজন্য পুলিশকে ল্যাজে খেলানোর জন্য এই ফন্দি এঁটেছেন। জানেন, পুলিশ ফোর্স এদিকে তাকে ফলো করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। সেই সুযোগে কাজ উদ্ধার করবেন,’ রজতবাবু এগিয়ে এসে বললেন।
‘ঠিক তাই,’ বলল টাপুরদি, ‘এটা একটা আইওয়াশ ছিল। মাই গড, আমাদের আগেই বোঝা উচিত ছিল, অপরাধী যেভাবে প্রতিটা স্টেপ এক্সিকিউট করেছে, তাতে মনে হচ্ছে ওর জন্য এসব নেহাতই খেলা, সাম সর্ট অফ ফান। একে একে পথের কাঁটা সরিয়ে চলেছে সে, কোনো সাক্ষী না রেখে। যারাই দলের কাছে থ্রেট হয়ে দেখা দিচ্ছে, তাদেরই চতুরভাবে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। অপরাধী ভীষণরকম বুদ্ধিমান। অথচ আমরা ভেবে নিয়েছিলাম, এত সহজে ধরে ফেলব তাকে। ভুলটা আমাদেরই ছিল।’
‘আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, অপরাধী বিরোধী দলের কেউ। সরকারে আসীন দলের উপর দায় চাপানোর জন্য, তাদের বদনাম করার জন্য এসব করছে,’ আমি বললাম।
‘সেটা হতেও পারে, আশ্চর্য কিছু না,’ বললেন রজতবাবু।
‘আমার তা মনে হয় না রজতদা। সব সাক্ষ্য অম্লানবাবুর দিকেই নির্দেশ করছে। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। ধনঞ্জয়ের ফোন রেকর্ডেও অম্লানবাবু বা মনোময়বাবুর দেখা পাইনি। নিখুঁত পরিকল্পনা, সব বুঝেও তাঁকে হাতকড়া পরানোর কোনো উপায় নেই, শুধু হাতেনাতে ধরা ছাড়া,’ বলল অর্জুনদা।
অনেকক্ষণ ধরে বড্ড অন্যমনস্ক লাগছে টাপুরদিকে। এবার বলল, ‘মনোময়বাবু আর অম্লানবাবুর মোবাইল টাওয়ার লোকেশন চেক করতে বলুন। ফাস্ট।’
পুলিশের কল সেন্টারে ফোন লাগালেন রজতবাবু। কথা সেরে ফিরে এসে উত্তেজিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘মনোময়বাবুর ফোন এখন কসবার কাছে। অম্লানবাবুর টাওয়ার লোকেশন তাঁর বাড়িতেই দেখাচ্ছে। আমাদের মনোময়বাবুকে ফলো করা উচিত।’
‘ওরাও এটাই চায় রজতবাবু,’ শান্ত গলায় বলল টাপুরদি, ‘মনোময়বাবুও চান যে আমরা ওঁকে ফলো করি। পুলিশকে বোকা বানানোর জন্য উনি আমাদের সারা কলকাতা ঘোরানোর প্ল্যান ভেঁজেছেন। কোনো লাভ নেই।’
‘আপনি কী করে এত শিয়োর হচ্ছেন?’ গম্ভীর মুখে জিজ্ঞাসা করলেন রজতবাবু। একটু যেন বিরক্ত দেখাল তাঁকে।
‘এ রকম পরিস্থিতিতে আমরা কেউই কোনো ব্যাপারে শিয়োর নই। তবু যেভাবে মনোময়বাবু এখানে আমাদের বোকা বানালেন, সেই কথা ভেবেই বলছি, মনোময়বাবু অত বোকা খেলোয়াড় নন যে মোবাইল ফোন অন করে নিজেকে রেডহ্যান্ডেড ধরিয়ে দেবেন। নাহ, পসিবল নয়,’ মাথা নেড়ে বলল টাপুরদি।
‘তাহলে এখন?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
‘আমার মন বলছে সুবিনয়বাবুকে ওরা এমন জায়গায় রাখবে যেখানে কেউ সন্দেহ করবে না,’ টাপুরদি বলল।
‘সেটা কোথায়?’ অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল।
টাপুরদি একটু ভেবে বলল, ‘ভেবে দেখো, মনোময়বাবু জানেন, ওঁকে আমরা ফলো করব। ফলে যদি এমন কোনো জায়গায় সুবিনয়বাবুকে রাখা হয় যেখানে তাঁকে যাওয়া-আসা করতে হবে, তাহলে তাকে ফলো করে আমরা ধরেই ফেলব। অম্লানবাবু বা মনোময়বাবু কেউই তাই এমন ভুল করবেন না। আবার এই বিষয়টা বেশি লোক জানাজানিও তিনি করবেন বলে মনে হয় না। কারণ, রাজনীতিতে কেউ কারও নিজের নয়। অন্য কাউকে দিয়ে অপহরণটা করালে একদিন না একদিন সেই ব্যক্তি মুখ খুলতেই পারে। সুতরাং, কাজটা যথাসাধ্য গোপনে করা হয়েছে একান্ত নিজের লোককে দিয়ে, যাকে অম্লানবাবু চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারেন। সেরকম লোক বলতে আমরা কাকে পাচ্ছি?’
‘মনোময়বাবু,’ বলল অর্জুনদা।
‘রাইট, মনোময়বাবু। কারণ মনোময়বাবুর প্রভুভক্তি সন্দেহাতীত। এবার আমাদের ভাবতে হবে, সুবিনয়বাবুকে অপহরণ করে কোথায় রাখতে পারেন। এমন জায়গায় যেখানে অম্লানবাবু যাওয়া-আসা করলেও কেউ তাকে সন্দেহ করবে না। সেই জায়গা কোথায় হতে পারে?’ অর্জুনদা ও রজতবাবুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘পার্টি অফিস?’ অর্জুনদার চোখ জ্বলে উঠল।
‘পার্টি অফিস হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট,’ বলল টাপুরদি, ‘কিন্তু সেখানে সারাদিনে অনেক লোকের যাতায়াত আছে। সেরকম জায়গায় একজনকে অপহরণ করে লুকিয়ে রাখা কি আদৌ সেফ?’
‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
‘অম্লানবাবুর নিজের বাড়ি,’ চোয়াল শক্ত করে বলল টাপুরদি, ‘সেফেস্ট প্লেস। কেউ ভাবতেও পারবে না সুবিনয়বাবু সেখানে থাকতে পারেন। পুলিশ হন্যে হয়ে সারা কলকাতায় ঘুরে মরবে। সুবিনয়বাবু যে অম্লানবাবুর বাড়িতে থাকতে পারেন, কেউ ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারবে না। তা ছাড়া অম্লানবাবুর নিজের সরকারি সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে। তাঁর বাড়িতে বিনা অনুমতিতে কেউ চট করে ঢুকতেও পারবে না। পুলিশেরও ঢুকতে গেলে অনেক পারমিশনের দরকার পড়বে। সেটা অম্লানবাবুর কানে পৌঁছেই যাবে।’
‘মাই গড!’ লাফিয়ে উঠল অর্জুনদা, ‘লেট’স গো দেয়ার।’
রজতবাবু এবার অর্জুনদার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘অর্জুন। অম্লানবাবুর বাড়িতে আমরা এভাবে রেড করতে পারি না। সেজন্য আমাদের কমিশনার সাহেবের থেকে পারমিশনের দরকার হবে। কোনো প্রমাণ ছাড়া, প্রপার কাগজপত্র ছাড়া শুধু একটা ধারণার বশে ওখানে ঢুকতে পারব না আমরা।’
‘তাহলে?’ অর্জুনদা হতাশ দৃষ্টিতে তাকাল রজতবাবুর দিকে।
‘তাহলে আমি আছি কী করতে?’ টাপুরদি মুচকি হেসে বলল।
‘তুমি?’ রজতবাবুর উপস্থিতি ভুলে চেঁচিয়ে উঠল অর্জুনদা, ‘তুমি একা ওই বাড়িতে লুকিয়ে ঢুকবে? ইমপসিবল! এটা কত রিস্কি জানো? অম্লানবাবুর জেড সিকিউরিটি আছে। মুহূর্তে ধরা পড়ে যাবে তুমি। আমি সেটা কিছুতেই হতে দিতে পারি না।’
রজতবাবু অবাক চোখে একবার অর্জুনদার দিকে একবার টাপুরদির মুখের দিকে তাকাল।
‘আহ অর্জুন, এখন এসব ভাবার সময় নয়। সুবিনয়বাবুকে রেসকিউ করাটা আমাদের প্রাথমিক দায়িত্ব।’ টাপুরদি বলল।
‘আমি সব জানি। তোমার, আমার, আমাদের সকলের দায়িত্ব সম্পর্কে তোমার চেয়ে আমার চিন্তা কিছু কম নয়। তবু আমি তোমাকে ওখানে এভাবে যেতে দিতে পারি না। ওরা যেভাবে পথের কাঁটা সরাতে উঠে-পড়ে লেগেছে, তাতে টের পেলে ওরা তোমাকেও ছাড়বে না টাপুর,’ অর্জুনদা বলল।
রজতবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, তিনি এতক্ষণে অর্জুনদা ও টাপুরদির মধ্যে সম্পর্কের রসায়নটা ধরে ফেলেছেন। হাজার হোক, পুলিশের লোক তো।
টাপুরদি বলল, ‘অর্জুন, ভুলে যেয়ো না আমাকে এই কেসে সৌরভবাবু ইনভলভ করেছেন এই শর্তে যে যেখানে পুলিশের হাত নিয়মে আটকে যাবে, সেখানে আমায় কাজ করতে হবে। এবং এই কেসে সেই সম্ভাবনাটা তৈরি হবে সে বিষয়ে সৌরভবাবু নিশ্চিত ছিলেন। ঠিক সেই কারণেই প্রাইভেট ডিটেকটিভের শরণাপন্ন হওয়া। নইলে কলকাতা পুলিশে দক্ষ অফিসারের অভাব তো ছিল না অর্জুন।’
অর্জুনদা আরও কিছু বলত হয়তো, রজতবাবু বললেন, ‘লেটস গো। গাড়িতে যেতে যেতে ডিসিডিডি স্যারের পারমিশন নিয়ে নেওয়া যাবে।’
‘রজতদা, এটা কি ঠিক হবে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
‘এর চেয়ে বেটার চয়েস তোমার কাছে আছে অর্জুন?’ ঠান্ডা গলায় বললেন রজত দত্ত, ‘সংঘমিত্রা ম্যাডাম যোগ্য বলেই স্বয়ং ডিসিডিডি স্যার ভরসা করেছে ওঁর উপর।’
অর্জুনদা কিছু না বলে এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে।
৫৭
‘তুমি অম্লানবাবুর বাড়িতে ঢুকবে কী করে? জেড ক্যাটাগরির সুরক্ষা ভেঙে ঢোকা অসম্ভব। তা ছাড়া মনে রেখো ওখানে একজন বৃদ্ধা মহিলা আছেন যিনি সদ্য স্বামীকে হারিয়েছেন। সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে,’ বলল অর্জুনদা।
‘ওই বাড়িতে লুকিয়ে ঢোকার মতো কোনো সুযোগ নেই সংঘমিত্রা ম্যাডাম। যেভাবেই ঢুকতে যান, ধরা পড়েই যাবেন,’ রজতবাবু বললেন।
টাপুরদি মুচকি হাসল। তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘লুকিয়ে তো ঢুকব না। কারণ সেটা অসম্ভব। অম্লানবাবুর পারমিশন নিয়ে সবার সামনে দিয়েই ঢুকব।’
‘মানে?’ বিহ্বল আর্তনাদ করে উঠল অর্জুনদা, ‘মানেটা কী? অম্লানবাবু তোমায় ঢুকতে দেবেন কেন? সত্যিই যদি তোমার আন্দাজ ঠিক হয়, যদি সুবিনয়বাবু অম্লানবাবুর বাড়িতে থাকেন, তাহলে বাইরের কাউকেই ঢুকতে দেবেন না সেখানে।’
‘দেবেন দেবেন। দিতে বাধ্য তিনি। ভুলে যেয়ো না পেনড্রাইভ এখন আমাদের কাছে,’ বলে হাসল টাপুরদি।
‘আপনি কি, বাই এনি চান্স, অম্লান চক্রবর্তীকে ব্ল্যাকমেল করে ঢোকার প্ল্যান করছেন নাকি?’ রজতবাবু এবার বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন।
টাপুরদি আড়চোখে অর্জুনদার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠিক তাই।’
‘ইমপসিবল,’ দাঁতে দাঁত চেপে বলল অর্জুনদা, ‘অকারণ দুঃসাহস দেখানোতে কোনো বাহাদুরি নেই টাপুর। এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝে গেছ, ওরা সাংঘাতিক লোক। একা ওই বাড়িতে ঢোকা আর ক্ষুধার্ত বাঘের মুখে মাথা গলানো একই ব্যাপার।’
এতক্ষণ চুপচাপ উভয় পক্ষের চাপানউতোর শুনছিলাম। এবার আমি বললাম, ‘একা কেন যাবে টাপুরদি? আমি যাব সঙ্গে।’
‘নো ওয়ে! তুই যাচ্ছিস না মিতুল,’ চোখ পাকিয়ে বলে উঠল টাপুরদি।
‘তুমি যদি বিপদ ঘাড়ে করে যেতে পারো, আমিও পারি টাপুরদি। এর আগেও অনেক বিপজ্জনক মিশনে আমি তোমার সঙ্গে থেকেছি।’
‘এবারের মিশনটা যথেষ্ট বিপজ্জনক মিতুল। আমি এখানে তোকে সঙ্গে নিতে পারব না,’ টাপুরদি বলল।
‘তুমি যদি যাও, আমিও যাব। ব্যস। অর্জুনদার মতো আমিও তোমাকে এইরকম বিপজ্জনক মিশনে একা ছাড়তে পারব না। আমি যাব তোমারসঙ্গে,’ বললাম আমি।
টাপুরদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে হতাশ চোখে তাকাল অর্জুনদার দিকে। অর্জুনদা কিছু বলল না। পাথরের মতো মুখ করে সামনের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। যেন হাল ছেড়ে দিয়েছে। রজতবাবু এবার বললেন, ‘আমি সৌরভ স্যারের পারমিশন ছাড়া আপনাদের অ্যালাও করতে পারব না। স্যারকে ফোন করছি আমি।’
পরবর্তী কিছুক্ষণের মধ্যে রজতবাবু সমস্ত পরিকল্পনা বিশদে জানালেন সৌরভবাবুকে। ফোন রাখার পর বললেন, ‘স্যার একা এই ডিসিশন নিতে পারবেন না। কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে জানাবেন।’
উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে কাটল প্রায় মিনিট বিশেক। আমাদের গাড়ি অম্লান চক্রবর্তীর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এমন সময় রজতবাবুর ফোনে ফোন এল। বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে রজতবাবু ফোনটা টাপুরদির হাতে বাড়িয়ে দিলেন স্পিকার অন করে।
‘মিস ব্যানার্জি?’
‘হ্যাঁ স্যার! বলুন।’
‘রজতের থেকে আপনার প্ল্যান শুনলাম আমি। আই রিয়েলি অ্যাপ্রিশিয়েট ইয়োর সেন্স অব রেসপন্সিবিলিটি অ্যান্ড কারেজ। বাট আই অ্যাম সরি, আই ক্যানট গিভ ইউ পারমিশন। কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি একেবারেই রাজি নন আপনাকে আর ইনভলভ করার ব্যাপারে। দিস ইস আ হাই রিস্ক মিশন। আমি এভাবে আপনাকে এর মধ্যে ঢুকতে দিতে পারি না। দিস ইস বিয়ন্ড মাই অথরিটি।’
‘কিন্তু স্যার…’
‘নো ‘কিন্তু’ সংঘমিত্রা। দিস কনভার্সেশন এন্ডস হিয়ার। অম্লান চক্রবর্তীর বাড়ির ভিতর এভাবে কোনো মিশন করা যায় না, এটা আপনাকে বুঝতে হবে।’
‘স্যার, অফ কোর্স আই আন্ডারস্ট্যান্ড। আর সেজন্যই বলছি আমি যেতে চাই। পুলিশ সেখানে যেতে পারবে না। কিন্তু আমি তো পুলিশ নই। ধরা পড়লে আপনি আমায় চেনেন না ব্যস। আমার সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগের কথা আপনি অস্বীকার করবেন। আমি কাজটা নিজ দায়িত্বে করতে চাইছি। স্যার প্লিজ, আমার কোনো স্বার্থ নেই এক্ষেত্রে। আমি শুধু সুবিনয়বাবুকে বাঁচাতে চাইছি।’
সৌরভ সান্যাল গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘সে দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ প্রপার ওয়েতে এগোবে। ইউ ডোন্ট ওয়ারি।’
‘কিন্তু স্যার, ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে,’ টাপুরদির গলায় আকুতি।
‘স্টপ ইট সংঘমিত্রা। আমি আর আপনার সঙ্গে আরগিউ করতে চাই না। হেয়ারবাই আই ডিসমিস ইউ ফ্রম দিস কেস। অ্যান্ড বয়েজ, কাম ব্যাক টু অফিস অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল,’ সৌরভবাবুর কণ্ঠে আদেশের নির্ঘোষ।
ফোন ডিসকানেক্ট করে রজতবাবু টাপুরদির দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকালেন। টাপুরদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর মুখ থমথম করছে। রজতবাবু বললেন, ‘চলুন ম্যাডাম, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।’
টাপুরদি ফিকে হেসে বলল, ‘ইটস অলরাইট মিস্টার দত্ত। আমরা চলে যাব।’
বলে পকেট থেকে বের করে রিভলভারটা ভদ্রলোকের হাতে দিল টাপুরদি।
‘অ্যাজ ইউ উইশ। কিন্তু বেশিক্ষণ এখানে থাকবেন না। এনিওয়ে, গুড নাইট। চলো অর্জুন, যাওয়া যাক,’ বলে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন রজতবাবু।
অর্জুনদার মুখের অভিব্যক্তিতে একাধারে দুঃখ ও স্বস্তির মিশেল। আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল অর্জুনদা। টাপুরদি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। অর্জুনদা একবার হতাশ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল অর্জুনদা, তারপর মুখ তুলে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘টাপুর, আমি জানি তুমি আমার উপর রেগে আছ। তোমার রাগ ভাঙানোর, তোমায় বোঝানোর চেষ্টা করব না। কারণ জানি, তুমি আমায় বুঝবে না। শুরু থেকে এই কেসে আমি তোমায় বাধা দিয়েছি। কারণ আমি ভয় পেয়েছি, তোমাদের বিপদের ভয়। ভেবো না আমি কোনও কৈফিয়ত দিচ্ছি। এই কেসে যে সমস্ত রাঘববোয়ালরা জড়িয়ে আছে, নিজেদের ইমেজ বাঁচানোর জন্য তোমাদের মতো দুটো মেয়েকে শেষ করে দিতে তাদের হাত কাঁপবে না। যাই হোক, আজ এই মুহূর্তে এখানে দাঁড়িয়ে লালবাজারের পুলিশ অফিসার হিসেবে নয়, তোমার বন্ধু হিসেবে আমি তোমাকে বলছি, তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে, তোমার সব সিদ্ধান্তে আমি তোমার সঙ্গে আছি।’
অর্জুনদা আর দাঁড়াল না। একবার আমার দিকে তাকিয়ে পিছু ফিরে গাড়ির দিকে এগোল।
পুলিশের গাড়ি বেরিয়ে যেতে আমি টাপুরদির দিকে তাকালাম। দেখলাম ওর চোখ ছলছল করছে। এতদূর এগিয়ে এসে এভাবে পিছিয়ে আসা ওর বরদাস্ত হচ্ছে না বুঝতে পারছি। টাপুরদি যেন ভুলেই গেছে আমি সঙ্গে আছি। একা একা অন্যমনস্কভাবে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগোল। আমি ছুটে এগোলাম টাপুরদির পাশে। বললাম, ‘এবার টাপুরদি?’
টাপুরদি শূন্যদৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। গভীরভাবে কিছু যেন ভাবছে। তারপর বলল, ‘চল, আজ বাইরে কোথাও ডিনারটা সেরে নিই।’
‘তাহলে আমাদের কেস কি এখানেই শেষ? আর এগোবে না তুমি? তন্ময়ের কী হবে তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করলাম।
এতদূর এগিয়ে এসে পিছিয়ে যেতে আমার এতটা খারাপ লাগছে, টাপুরদির না জানি কত কষ্ট হচ্ছে! টাপুরদি বলল, ‘এখান থেকে পিছিয়ে আসার কোনো প্রশ্নই আসে না মিতুল। তবে আমি একা যাব, তুই না। আই ক্যানট পুট ইয়োর লাইফ অ্যাট রিস্ক। তুই ডিনার সেরে বাড়ি যাবি।’
চলতে চলতে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি। বললাম, ‘প্রথম থেকে আমি এই কেসে তোমার সঙ্গে আছি। আজ তুমি বলছ, ইউ ক্যানট পুট মাই লাইফ অ্যাট রিস্ক? এর আগে রিস্ক নিইনি আমরা? এর আগে আমি যাইনি বিপদের মাঝখানে? টাপুরদি, আমি তোমার মতো অত সাহসী নই, তোমার মতো শারীরিক, মানসিক শক্তিও আমার নেই। যতই তুমি আমায় তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে লোকের কাছে পরিচয় দাও, আমি জানি তোমাকে অ্যাসিস্ট করার কোনো যোগ্যতাই আমার নেই। আমি শুধু তোমার সঙ্গে, তোমার পাশে থাকতে পারি, আর সেটুকুই করি। যাই হোক, তুমি আমায় সঙ্গে নিতে না চাও, নিয়ো না। কিন্তু আমি যাব। তুমি না নিলে একাই যাব। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে তোমাকে একা আমি ওখানে যেতে দেব না।’
টাপুরদি চোখ বড়ো বড়ো করে আমার দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘বা রে, আজ সবাই আমায় দেখছি একদফা করে ইমোশনাল স্পিচ ঝেড়ে যাচ্ছে। তোর কিছু হলে আমি তোর বাবা-মাকে কী জবাব দেব ভেবে দেখেছিস?’
‘কিছু জবাব দিতে হবে না। আমার বা তোমার কারওরই কিছু হবে না। এখন চলো তো। পেটে ইঁদুর দৌড়োচ্ছে। আর জাস্ট পারা যাচ্ছে না,’ হেসে বললাম আমি।
৫৮
‘অম্লানবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি আমরা। জরুরি প্রয়োজন।’
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটি অফিসারকে নিজের কার্ডটা এগিয়ে দিল টাপুরদি। উলটেপালটে দেখে অবহেলা ভরে টাপুরদির হাতে ফেরত দিয়ে বললেন, ‘দেখা হবে না। এখন স্যার কারও সঙ্গে দেখা করেন না। কাল সকালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসবেন।’
টাপুরদি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘প্রয়োজনটা খুবই জরুরি। এখনই দেখা করতে হবে আমাদের। আপনি ওঁকে বলুন, সংঘমিত্রা ব্যানার্জি এসেছেন। দেখা করতে চাইছেন।’
লোকটি বিরক্ত মুখে বললেন, ‘বললাম না, অর্ডার আছে কাউকে বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়ার। দেখা হবে না। যান এখন।’
টাপুরদির চোয়াল শক্ত হল। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, যাচ্ছি। কিন্তু আজ আমায় দেখা করতে না দেওয়ার জন্য কাল যদি অম্লানবাবু কোনো বিপদে পড়েন, তখন কিন্তু আপনাকেই জবাবদিহি করতে হবে। স্বার্থটা আমার নয়, অম্লানবাবুর। তাঁর প্রয়োজনের জন্যই দেখা করতে এসেছি।’
টাপুরদির কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল, যা ভদ্রলোক পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারলেন না। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত দেখাল তাঁকে। বললেন, ‘আপনি অপেক্ষা করুন। আমি ভেতরে খবর পাঠাচ্ছি।’
টাপুরদি বলল, ‘অম্লানবাবুকে শুধু এটুকু বলবেন, তন্ময়ের পেনড্রাইভ আমার কাছে আছে।’
ভদ্রলোক ওয়াকিটকিটা নিয়ে একটু ভিতরের দিকে যেতে আমি টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী মনে হয় টাপুরদি? ওরা ডাকবে আমাদের ভিতরে?’
‘ডাকবে ডাকবে। ডাকতে বাধ্য,’ বলল টাপুরদি। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করেও টাপুরদি উত্তেজনা লুকোতে পারছে না। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে দ্রুত কিছু টাইপ করল টাপুরদি। তারপর সেটা আবার পকেটে ঢোকাল।
ভদ্রলোক ফিরে এলেন। বললেন, ‘যান, ভিতরে ডাকছেন আপনাদের।’
আমি আর টাপুরদি চোখ চাওয়াচাওয়ি করলাম একবার। টাপুরদি ফিসফিস করে বলল, ‘এখনও সময় আছে মিতুল। ভেবে দেখ যাবি কি না।’
বাবার মুখটা মনে পড়ে গেল এই মুহূর্তে। গলার ভিতর একটা ব্যথা দলা পাকাচ্ছে। সেটাকে গিলে নিয়ে বললাম, ‘ভাবার কিছু নেই টাপুরদি। আমি যাব।’
‘চল তবে,’ বলল টাপুরদি।
‘এক মিনিট দাঁড়ান,’ বলে পেছন থেকে এগিয়ে এলেন সিকিউরিটি অফিসার। আমাদের সামনে এসে বললেন, ‘সিকিউরিটি চেক হবে। ওয়েট করুন।’
বুঝলাম এই নির্দেশটাও ভিতর থেকে এসেছে। কারণ আগে যতবার এসেছি, এমন কিছু হয়নি।
সিকিউরিটি চেকিং সেরে বাড়ির ভিতর গেলাম আমরা। ভিতরে বসার ঘরে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখলাম না। কী করব ভাবছি, এমন সময় মনোময়বাবু ঘরে ঢুকলেন। আমাদের দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বসুন।’
আমরা বসলাম। মনোময়বাবু আমাদের সামনে দাঁড়ালেন, বসলেন না। একইরকম গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কী ব্যাপার?’
টাপুরদি একটু হাসল। বলল, ‘অম্লানবাবুর কাছে একটা কাজে এসেছি।’
‘এখন? এটা কি কাজের সময় বলে মনে হয় আপনাদের?’ ভুরু কুঁচকে বিরক্ত মুখে তাকালেন মনোময়বাবু। এর আগে মনোময়বাবু কখনো আমাদের সঙ্গে কথা বলেননি। ওঁকে দেখে আমার কেমন ঘাড় হেলানো রোবট বলে মনে হত। যেন উপরওয়ালার নির্দেশ পালন করাই তাঁর জীবনের মোক্ষ। অম্লানবাবুর সঙ্গে ছায়ার মতো সেঁটে থাকা ছাড়া তাঁর জীবনের যেন কোনো উদ্দেশ্য নেই। আজ প্রথম তাঁর কণ্ঠস্বর শুনলাম। তারপর বললেন, ‘যাই হোক, কী কাজ বলুন।’
‘সেটা ওঁকেই বলব না হয়,’ মিষ্টি হেসে বলল টাপুরদি।
‘উনি ব্যস্ত আছেন। এখন দেখা করতে পারবেন না। যা বলার আমায় বলুন,’ বললেন মনোময়বাবু।
‘ব্যস্ত আছেন? তাহলে আমাদের ভিতরে দেখা করতে ডাকলেন যে?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘বললাম তো, উনি এখন আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। যা বলার আমাকে বলুন, উনি খবর পেয়ে যাবেন। আর হ্যাঁ, অম্লানবাবু এই রাজ্যের ভাবী মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে রাতবিরেতে যখন খুশি বাড়িতে এসে দেখা করতে চাইলেই দেখা করা সম্ভব নয় এভাবে, সেটা আপনার জানা উচিত।’
‘জানি না যে তা তো নয়। তবে প্রয়োজনটা আমাদের থেকে বেশি অম্লানবাবুর। তাই এসেছিলাম। যাক গে, তিনি যখন দেখা করতে পারবেন না, আমরা তবে আসি আজ। শুধু অম্লানবাবুকে বলে দেবেন, তন্ময়ের পেনড্রাইভটা আমার কাছে আছে। ওঁর যদি সেটা দরকার থাকে, তবে যেন আমার সঙ্গে দেখা করেন। চল মিতুল, যাওয়া যাক,’ অকম্পিত, ঠান্ডা গলায় বলল টাপুরদি।
অবাক হলাম। এভাবে এসে ফিরে যাব? তাহলে সুবিনয়বাবুকে উদ্ধারের কী হবে? টাপুরদি আমায় চোখের ইশারা করল। দরজার দিকে এগোলাম আমরা।
‘দাঁড়ান,’ পেছন থেকে প্রায় হুংকার দিয়ে ডাকলেন মনোময়বাবু। আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। টাপুরদির ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি।
ঘুরে দাঁড়াল টাপুরদি, সঙ্গে আমিও। টাপুরদি ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কিছু বলবেন?’
‘পেনড্রাইভটা কোথায়?’ জিজ্ঞাসা করলেন মনোময়বাবু।
‘সেটা আমি অম্লানবাবুকেই বলব মনোময়বাবু। আমি কোনো তৃতীয় ব্যক্তি মারফত কথোপকথন পছন্দ করি না।’
মনোময়বাবুর চোখটা যেন মুহূর্তে হিংস্র শ্বাপদের মতো জ্বলে উঠল। ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘আপনারা বসুন। অম্লানবাবু একটা জরুরি ফোনে ব্যস্ত আছেন। আমি গিয়ে বলছি আপনাদের কথা। একটু হয়তো সময় লাগবে। অপেক্ষা করতে হবে।’
‘সে ঠিক আছে। অপেক্ষা করছি আমরা,’ বলল টাপুরদি।
মনোময়বাবু পরদা সরিয়ে ভিতরে গেলেন। আমি টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কী টাপুরদি? অম্লানবাবু ব্যস্ত, দেখা করতে পারবেন না? তাহলে আমাদের ডাকলেন কে?’
টাপুরদি দেখলাম দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরেছে। বলল, ‘শুধু চুপচাপ এখন দেখে যা মিতুল। কোনো প্রশ্ন করিস না। যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মনকে প্রস্তুত রাখ।’
মিনিট পাঁচেক বসে রইলাম চুপচাপ। কারও কোনো সাড়া পেলাম না। তারপর ভিতর থেকে পরদা সরিয়ে এক মহিলা ঘরে এলেন। আগের দিনও দেখেছি এই মহিলাকে এই বাড়িতে, সম্ভবত গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন। হাতে একটা ট্রেতে দুই কাপ কফি আর একটা প্লেটে কিছু বিস্কুট। আমাদের সামনে টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে বললেন, ‘আপনারা খান, দাদাবাবু আসবেন এখনই।’
কফিটা তুলে চুমুক দিতে যাচ্ছিলাম, টাপুরদি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ পাকাল। তাড়াতাড়ি কাপটা টেবিলের উপর রেখে দিলাম।
৫৯
বসে আছি তো আছিই। অম্লানবাবুর দেখা নেই। প্রায় মিনিট বিশেক এভাবেই কাটল। তারপর পরদা সরিয়ে সুনয়নাদেবী ঘরে এলেন। সম্ভবত অন্য কোনো কাজে ঢুকেছিলেন, আমাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বিস্মিত যে হয়েছেন তা মুখ দেখেই বোঝা গেল। বললেন, ‘আরে তোমরা এখানে? কখন এলে? কী ব্যাপার?’
টাপুরদি বলল, ‘অম্লানবাবুর কাছে একটা কাজে এসেছি। বেশ কিছুক্ষণ আগেই এসেছি, অপেক্ষা করছি।’
‘ও মা, সে কী? অম্লান জানে তোমরা এসেছ? এভাবে তোমাদের বসিয়ে রেখেছে কেন? দাঁড়াও, আমি দেখছি,’ বলে দরজার দিকে এগোলেন। তারপর কী মনে হতে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তার চেয়ে বরং এক কাজ করো। তোমরাও চলো আমার সঙ্গে।’
আমরা উঠে দাঁড়ালাম। সুনয়নাদেবীর পিছে পিছে এগোলাম। করিডর ধরে কিছুটা এগোতে দেখলাম সিঁড়ি দিয়ে মনোময়বাবু নেমে আসছেন। আমাদের দেখে ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘এ কী, আপনারা এখানে কেন?’
‘মনোময়। এই যে ওরা এসেছে অম্লানের সঙ্গে দেখা করতে। অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে বলল। তাই আমি ওদের দেখা করতে নিয়ে যাচ্ছিলাম,’ সুনয়নাদেবী বললেন।
মনোময়বাবু একটু কড়া গলায় সুনয়নাদেবীকে বললেন, ‘আপনি কেন নীচে এসেছেন? বাইরের লোককে এভাবে বাড়ির ভিতরে ঢুকিয়ে আনছেন, অম্লান শুনলে কিন্তু রাগ করবে। আপনি উপরে নিজের ঘরে যান।’
সুনয়নাদেবী কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘আহা, রাত হয়েছে। মেয়েদুটো আবার একা ফিরবে। ওদের কী কাজ আছে করে দাও না বাপু। অম্লানের সঙ্গে কথা বলিয়ে দাও না।’
এই বাড়িতে সুনয়নাদেবীর অবস্থান বোধ করি মনোময়বাবুরও নীচে। তাই মনোময়বাবুও তাঁর উপর চোখ পাকাতে পারেন। অথচ ক’দিন আগেই সুনয়নাদেবী ছিলেন এই রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী। মানুষের ভাগ্যের চাকা এইভাবে ঘোরে, অবস্থান পালটায়। মনে হল, অম্লানবাবু মাকে হয়তো যথেষ্ট তাচ্ছিল্য করেন বলেই মনোময়বাবুও এ-রকম ব্যবহার করতে সাহস পান। আজ এই মুহূর্তে ভদ্রমহিলার উপর আমার সত্যিই করুণা হল।
সুনয়নাদেবী নরম গলায় একটু যেন ভয়ে ভয়েই বললেন, ‘মনোময়, আমার প্রেশারের ওষুধটা ফুরিয়ে গেছে। নীচে তো কাউকে দেখলাম না। একটু আনিয়ে দেবে কাউকে দিয়ে?’
‘আপনি উপরে যান,’ বলে রীতিমতো গর্জে উঠলেন মনোময়বাবু, ‘ওষুধ আপনার ঘরে দিয়ে আসবে।’
‘আর ওদের একটু…,’ করুণ স্বরে কিছু বলতেই ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন মনোময়বাবু। বললেন, ‘আপনি এসবের মধ্যে থাকবেন না। যান, উপরে যান। এদের অম্লান বুঝে নেবে। আপনাকে ভাবতে হবে না।’
রাগে গা জ্বলে গেল আমার। একজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কেউ এভাবে কথা বলে? আমরা তো বাইরের লোক। আমাদের সামনে একজন ভদ্রমহিলাকে এভাবে অপমান করছেন মনোময়বাবু, আর টাপুরদি কোনো প্রতিবাদ না করে চুপ অরে আছে দেখে অবাক লাগল। টাপুরদিকে যতটা চিনি, এই ব্যবহার টাপুরদির স্বভাববিরুদ্ধ। আমি আর থাকতে না পেরে বলে উঠলাম, ‘এভাবে কথা বলছেন কেন ওঁর সঙ্গে?’
মনোময়বাবু আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। সুনয়নাদেবী একবার মনোময়বাবুর মুখের দিকে আরেকবার আমাদের মুখের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলেন। মনোময়বাবু এবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারা আসুন আমার সঙ্গে।’
‘কোথায়?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
মনোময়বাবুর ঠোঁটে ফুটে উঠল ক্রুরতার হালকা হাসি। বললেন, ‘অম্লান চক্রবর্তীকে ব্ল্যাকমেল করতে এসে নিজেই সিংহের গুহায় মাথা ঢুকিয়ে দিলেন। এখন ভয় পাচ্ছেন টিকটিকি ম্যাডাম?’
টাপুরদিও হেসে উত্তর দিল, ‘ভয় না পেয়ে উপায় কী? আপনারা যেভাবে পথের কাঁটা সরাতে লেগেছেন, তাতে আমি যে খুব বেশি সুরক্ষিত অবস্থায় নেই, তা কি আমি আর জানি না? আপনাদের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড়ো পথের কাঁটা তো আমি। তবে সত্যি বলতে কী, খুব বেশি ভয় আমার করছে না। কারণ পেনড্রাইভের কপি আমি সেফ জায়গায় রেখে এসেছি। আমার কিছু হলে পেনড্রাইভের সিক্রেট ফোল্ডারের কন্টেন্ট দেশের সব ক’টা নিউজ চ্যানেলে লাইভ টেলিকাস্ট হবে। সুতরাং আপনিই ভেবে দেখুন কী করবেন।’
‘কী চাই আপনার? কত টাকা চাই বলুন?’ মনোময়বাবু চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘আমার যা চাই তা আমি অম্লানবাবুর সামনেই বলব, আপনাকে নয়’, বলল টাপুরদি।
মনোময়বাবুর দৃষ্টিতে যেন দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। ক্রুর হেসে বললেন, ‘টিকটিকি ম্যাডাম, একটা কথা আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই। আপনাদের অম্লানবাবু শুধু চেয়ারে বসেন। চেয়ারের পেছনে আঙুলটা আমার ঘোরে। সুতরাং যা জানানোর আমাকে স্বচ্ছন্দে জানাতে পারেন।’
মনোময়বাবুর কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। কী অপরিসীম অহংকার লোকটার। তার মানে কী সব কিছুর পেছনে এই মনোময় মজুমদারই রয়েছেন? অম্লানবাবুকে সামনে রেখে দাবার চাল এই মনোময়বাবুই দিচ্ছেন? তিনি যেভাবে সুনয়নাদেবীকে ধমকালেন দেখলাম, আর এখন অম্লানবাবুর সঙ্গে আমাদের দেখা করতে দিচ্ছেন না, তাতে সেই সন্দেহই দৃঢ় হচ্ছে। এই বাড়িতে যে এই ভদ্রলোকের ক্ষমতা অসীম তা বুঝতে কষ্ট হয় না। সুনয়নাদেবী না হয় বৃদ্ধা, কিন্তু অম্লানবাবু কেন মেনে নিচ্ছেন এই উদ্ধত লোকটির অবিভাবকত্ব? কে জানে?
টাপুরদি ঠান্ডা চোখে তাকাল মনোময়বাবুর মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘তা আপনি যখন এত করে জানতে চাইছেন, তাহলে আপনাকে বলেই দিই বরং। দেখুন ওই পেনড্রাইভে যা আছে, সে নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। সেটা আমি অনায়াসেই অম্লানবাবুর হাতে দিয়ে দেব। কিন্তু আমার দুটো শর্ত আছে। প্রথমত, পুরো ডিলটাই হবে অম্লানবাবুর সঙ্গে, আপনার সঙ্গে নয়। দ্বিতীয়ত, আমি এই বাড়ি থেকে সুবিনয় মুখার্জিকে সঙ্গে করে নিয়ে ফিরব। সুবিনয় মুখার্জিকে ছেড়ে দিন, পেনড্রাইভ নিন। দ্যাটস ইট।’
‘সুবিনয় মুখার্জি? সে এখানে কেন থাকবে?’ ভ্রূ কোঁচকালেন মনোময় মজুমদার।
‘সে তো আমার চেয়ে আপনিই বেশি ভালো জানবেন মিস্টার মজুমদার। আমার যা বলার আমি বলেছি। বাকিটা আপনি বুঝে নিন কী করবেন,’ টাপুরদি বলল।
মনোময়বাবুকে আমার এই মুহূর্তে সাপের চেয়েও নিষ্ঠুর আর খল বলে মনে হচ্ছে। কিছু সময় আমাদের দুজনের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর হেসে বললেন, ‘আপনাদের যখন তাই-ই ইচ্ছে, তবে তাই হোক। চলুন, যাওয়া যাক।’
