৩৫
ভোরের দিকে কিছু একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, টাপুরদির ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙল। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম যতটা ভোর ভেবেছিলাম ততটা নয় মোটেই। সাড়ে ছ’টা বাজে। তবে আমার জন্য সাড়ে ছ’টাও কাকভোর। জড়ানো গলায় বললাম, ‘টাপুরদি, তুমি জানো তো একজন সুস্থ পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য দিনে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুম দরকার।’
‘কথা না বাড়িয়ে চটপট উঠে পড়,’ বলে পরদাগুলো টেনে খুলে দিল টাপুরদি।
চোখে আলো পড়তেই বালিশে মুখ গুঁজে মৃদু প্রতিবাদ করলাম, ‘আরে বাবা, আমি তো তোমার মতো সুপারউওম্যান নই যে রাতে তিন চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে বা না ঘুমিয়েও দিব্যি রাত কাটিয়ে দেব।’
‘বেশি না বকে ওঠ। একদিন একটু কম ঘুমোলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। উঠে চটপট রেডি হ’। বেরোব,’ বলল টাপুরদি।
চোখের উপর থেকে বালিশটা সরিয়ে বললাম, ‘কোথায় যাবে গো?’
‘উফ, সব প্রশ্নের উত্তর কি তোর বিছানায় শুয়েই চাই? তুই উঠলি, না গায়ে জল ঢেলে দেব?’ ছদ্ম কোপ দেখিয়ে বলল টাপুরদি।
টাপুরদির চোখ রাঙানো উপেক্ষা করে কাঁহাতক আর শুয়ে থাকা যায়? তা ছাড়া ঘুমটাও গেছে চটে। মনের মধ্যে কৌতূহলও যে উঁকিঝুঁকি মারছে না, তা বললে অনৃতভাষণ হবে। কে জানে, সকাল সকাল কোথায় যাওয়ার প্ল্যান আঁটছে টাপুরদি?
রেডি হয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে আটটা বাজল। এতক্ষণ কিছু জিজ্ঞাসা করিনি, গাড়িতে বসে এবার বললাম, ‘কোথায় যাচ্ছি জানতে পারি কি?’
‘অবশ্যই পারিস। যাচ্ছি হুগলি, চুঁচড়োর কাছাকাছি,’ গাড়িতে স্টার্ট দিতে দিতে বলল টাপুরদি।
‘হুগলি! কেন? মানে হুগলি কেন?’ আমার বিস্মিত প্রশ্ন।
‘ভাব তো দেখি,’ হেসে বলল টাপুরদি।
হুগলিতে আবার কে আছে? আমাদের কেসের মধ্যে হুগলি এল কোত্থেকে অনেক ভেবেও মাথায় এল না। অগত্যা হাল ছেড়ে বললাম, ‘ধুর, আমার মাথা কাজ করছে না। প্লিজ তুমিই বলো হুগলি কেন যাচ্ছি আমরা।’
টাপুরদি রাস্তায় চোখ রেখে বলল, ‘যাচ্ছি ধনঞ্জয় মণ্ডলের শেকড়ের সন্ধানে। বুঝলি হাঁদা?’
‘ধনঞ্জয়ের সঙ্গে হুগলির কী সম্পর্ক? সে তো কলকাতাতেই থাকত বলে জানি,’ বললাম আমি।
টাপুরদি বলল, ‘সেদিন সুনয়নাদেবী কী বললেন শুনিসনি? হুগলিতে একটা জনসভা থেকে ধনঞ্জয় মণ্ডলকে প্রথম পার্টিতে এনেছিলেন রথীন ঘোষ। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অর্জুন ঠিকানাটা জোগাড় করেছে। সেখানেই যাব আপাতত।’
‘সেখানে কি কিছু পাওয়া যাবে আদৌ?’ সন্দিগ্ধ স্বরে প্রশ্ন করলাম আমি।
‘সে কী করে বলি রে? পাওয়া যাবেই যে তা কি জোর দিয়ে বলা যায়? আবার কিছু পাওয়া যাবে না তাও বলতে পারি না। চল, খুঁজে দেখতে দোষ কী?’
রাস্তায় একবার থেমে চা খেলাম। সকালে কিছু না খেয়েই বেরোতে হয়েছে। খিদে পেয়েছিল জববর। দুটো নানখাটাই বিস্কুট দিয়ে ঘন দুধে জাল দেওয়া চা-টা যেন অমৃত মনে হল। গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা টাপুরদি, এত বছর পরে ধনঞ্জয় মণ্ডলের সম্পর্কে কি কেউ কিছু বলতে পারবে? তার রাজনৈতিক জীবনের পুরোটাই তো প্রায় কলকাতায় কেটেছে।’
‘হ্যাঁ, খালি হাতে ফেরার সম্ভাবনাটাই বেশি। তবু দেখি, যদি কিছু মিলে যায়,’ বলে হাতের চায়ের খুড়িটা নীল ড্রামে ফেলল টাপুরদি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোর হল রে? এক কাপ চা খেতে তো দিন কাবার করে দিলি।’
‘চলো হয়ে গেছে।’
কলকাতা ছাড়ার দেড় ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম ধনঞ্জয় মণ্ডলের পুরোনো পাড়ায়। আগে এই অঞ্চলটা কোনোকালে হয়তো গ্রাম ছিল, এখন নাগরিক জীবনের স্পর্শ থেকে নিজেকে বাঁচাতে না পেরে ছোটোখাটো টাউনে পরিণত হয়েছে। ছোটোবেলায় একবার কোনো এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বিয়ে উপলক্ষে বাবা-মায়ের সঙ্গে চুঁচুড়াতে এসেছিলাম মনে আছে। ব্যান্ডেল চার্চ, হংসেশ্বরী মন্দির ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম। এতদিন পরে এসে সেইসব স্মৃতি মনে পড়ে গেল। মনে হল, কাজের পেছনে ছুটতে ছুটতে কতদিন মা-বাবার সঙ্গে একটু সময় কাটানো হয় না, কোথাও যাওয়া হয় না ওদের নিয়ে। মা প্রায়ই অভিযোগ করে আমি ওদের সময় দিই না বলে। বাবা অবশ্য কিছু বলে না। কিন্তু আমি জানি আমি বাবার সঙ্গে কিছু সময় বসলে বাবা খুব খুশি হয়।
ধনঞ্জয় মণ্ডলের পুরোনো পাড়া অবশ্য চুঁচুড়া টাউনের মধ্যে নয়, বরং কিছুটা বাইরের দিকে। আধুনিকতার ছোঁয়াচ লাগলেও পুরোনো পাড়ার গন্ধটা এখনও ছেড়ে যায়নি পুরোপুরি। সে একদিক থেকে ভালো। এই পুরোনো পাড়াগুলি মহানগরের মতো স্মৃতিহীনতার রোগে ভোগে না। বরং, জীর্ণ বাতিল দিনগুলোকে বুকের গোপন কুঠুরিতে ভরে রাখে সযত্নে।
ঠিকানা খুঁজে বার করতে তেমন বেগ পেতে হল না সংগত কারণেই। জায়গাটা কলোনি ধরনের। ঠিকানাটা পুরোনো, এখন সেই জায়গায় একটা ছিমছাম দোতলা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গলির মোড়ে টাইম কলের পাশে ক-জন মহিলা জটলা করে গল্পগুজব করছে, সামনে কয়েকটা বালতি গামলা সার দিয়ে রাখা। নাইটির উপর ওড়না চাপিয়ে বাচ্চাকে স্কুলবাসে তুলে দিতে বাচ্চার হাত ধরে ছুটছে মা। সামনেই একটা চায়ের দোকান। বড়ো সসপ্যানে দুধের চা ফুটছে। একজন মধ্যবয়সি মহিলা চা বানাচ্ছেন, আরেকজন বয়স্ক প্রৌঢ় সেই চা কাচের গ্লাসে করে খদ্দেরদের হাতে হাতে তুলে দিচ্ছেন। কয়েকটা বয়ামে রাখা বিভিন্ন রকমের বেকারি বিস্কুট ও কেক। সামনের পাতা বেঞ্চে কয়েকজন বয়স্ক লোক আড্ডা দিচ্ছে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজ পড়ছে।
টাপুরদির ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, ‘কোনো পাড়া কারও সম্পর্কে যদি কিছু খবর জানতে চাস কখনো, মনে রাখবি এই চায়ের দোকানের আড্ডাধারীরা যেকোনো নিউজ এজেন্সিকে হার মানান। দিস ইজ দ্য প্লেস।’
টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে আমাদের দুজনের জন্য দুই কাপ চা দিতে বলল। কাচের জারে বাপুজি কেকগুলো দেখে আবার আমার শৈশবের এক ঝলক টাটকা বাতাস ছুঁয়ে গেল আমায়। আমি একটা কেক দিতে বললাম। হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকলাম। সেই একই গন্ধ, এত বছরে কিচ্ছুটি বদলায়নি। কিছু জিনিস কখনো বদলায় না বলেই হয়তো স্মৃতিগুলো বেঁচে থাকে।
চায়ের গ্লাসটা হাতে নিতে বেঞ্চে বসা একজন বয়স্ক লোক একটু সরে বসলেন, সম্ভবত আমাদের বসার জায়গা করে দিতে। যদিও জায়গা বিশেষ হল না। তবু দেখলাম টাপুরদি নির্দ্বিধায় সেই একচিলতে জায়গায় বসে পড়ল। মুখোমুখি বসা এক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে আমাদের জরিপ করছিলেন অপাঙ্গে। এবার কৌতূহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনারা কি বাইরে থেকে আসছেন? আগে তো এই পাড়ায় দেখিনি!’
টাপুরদি মুচকি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, কলকাতা থেকে আসছি। একজনের সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নেওয়ার ছিল। তাই আসা।’
ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এখানে? কার সম্পর্কে জানতে চান আপনারা?’
‘ধনঞ্জয় মণ্ডল নামে কাউকে চেনেন?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
ভদ্রলোক এবার সোজা হয়ে বসলেন। চকিতে পাশে বসা টাকমাথা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোকের সঙ্গে চোখাচোখি করলেন দেখলাম। অন্যরাও যেন সচকিত হয়ে উঠল। টাকমাথা ভদ্রলোক গলা খাঁকরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনারা কি পুলিশ?’
বুঝলাম, ধনঞ্জয় মণ্ডল বহু যুগ পাড়া ছাড়া হলেও তার খবর এই পাড়ায় পৌঁছে গেছে। টাপুরদির ধারণা ভুল ছিল না। ধনঞ্জয় মণ্ডলের ইতিহাস এখানেই জানা যাবে।
৩৬
‘ওই যে দোতলা বাড়িটা দেখছেন, ওখানে ওদের বাড়ি ছিল,’ বললেন টাকমাথা ভদ্রলোক, ‘ধনঞ্জয়ের বাবা হাই স্কুলে পিয়োনের চাকরি করত। ধনঞ্জয় আমাদের থেকে অনেকটাই ছোটো ছিল। পড়াশোনায় তেমন ভালো ছিল না, তবে স্কুলের টিমে ফুটবল খেলত। সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলত। ভালো প্লেয়ার ছিল। কেন যে মরতে রাজনীতি করতে গেল!’
টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডল কেমন মানুষ ছিল, জানেন আপনারা?’
অপর প্রৌঢ় ভদ্রলোক বললেন, ‘ধনঞ্জয় স্কুলে আমার চার বছরের জুনিয়র ছিল। সেই ছোটো থেকে চিনি ওকে। বরাবর খুব ডানপিটে স্বভাবের ছিল ও। ক্লাসের থেকে ক্লাসের বাইরে ওকে বেশি পাওয়া যেত। তেমনি সাহসীও ছিল। পাড়ায় যেকোনো বাড়িতে কারও বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ত। তবে ছেলেটার মনটা ছিল নরম। পাড়ার রাস্তার সব কুকুর-বেড়াল ছিল ওর পোষ্য। একটারও কিছু হলে রাগে পাগল হয়ে যেত। একবার একটা বেড়ালছানাকে একটা গাড়ি চাপা দিয়েছিল। ধনঞ্জয় সেই গাড়ির নম্বর দেখে গাড়ির ড্রাইভারকে খুঁজে বার করে চন্দননগরে গিয়ে পিটিয়ে এসেছিল। পাড়ার লোকেরা ওকে ভালোই বাসত। ছেলেটা খারাপ ছিল না। পেপারে, নিউজ চ্যানেলে ধনঞ্জয় অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করেছে জেনে আমরা সকলে অবাক হয়ে গেছি।’
‘হুম,’ গম্ভীর মুখে বলল টাপুরদি, ‘তা ধনঞ্জয় মণ্ডল রাজনীতিতে এলেন কী করে?’
টাকমাথা ভদ্রলোক এবার বললেন, ‘টেনেহিঁচড়ে কোনোক্রমে স্কুলের গণ্ডি পার করেছিল ধনঞ্জয়। কলেজে গিয়ে পড়াশোনাটা আর এগোল না ওর। বরং কলেজ ইউনিয়নের প্রমিনেন্ট মুখ হয়ে উঠল খুব তাড়াতাড়ি। হাতে ক্ষমতা এলে যা হয়, এলাকার বেশ উঠতি মস্তান হয়ে উঠল। একে ধমকাচ্ছে, তাকে চমকাচ্ছে। কলেজে ছাত্র ভরতি করতে হলে ধনঞ্জয়ের ইউনিয়নকে প্রণামি না দিলে যত ভালোই রেজাল্ট হোক, ভরতি হতে পারত না। তবে হ্যাঁ, গরিব ছাত্রদের থেকে এক পয়সাও নিত না ও। বরং ফান্ডের টাকা খরচ করে তাদের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে ধনঞ্জয়, এমনও শুনেছি, বুঝলেন? বললাম না, ছেলেটার মনটা নরম ছিল।’
‘শুনেছি রথীন ঘোষ জনসভায় ধনঞ্জয় মণ্ডলকে দেখে কলকাতায় নিয়ে গেছিলেন। এই কথাটা কি সত্যি?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
টাকমাথা ভদ্রলোক একটু চিন্তা করে বললেন, ‘দেখুন এতসব কথা তো আমরা জানি না। ওদের বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই। তবে এক কাজ করতে পারেন, সামনে একটু এগিয়ে বাঁ-দিকে একটা গলি ছেড়ে পরের গলিটাতে ধনঞ্জয়ের বোন বীণার বাড়ি। ওর বাবা-মা তো অনেক দিন আগেই মারা গেছেন। থাকার মধ্যে আছে ওই বোন। এই পাড়াতেই বিয়ে হয়েছে। ওর কাছে গিয়ে দেখতে পারেন। তবে শুনেছি, ধনঞ্জয়ের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ ছিল না। গলিতে ঢুকে কাউকে জিজ্ঞাসা করবেন নীরেন হালদারের বাড়ি কোনটা। যে কেউ বলে দেবে। নীরেন হল গে ধনঞ্জয়ের বোন জামাই। তিন বছর আগে মারা গেছে অবশ্য। তবে ধনঞ্জয়ের বোন আছে।’
‘অসংখ্য ধন্যবাদ,’ বলে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি। আমিও দাঁড়ালাম। চায়ের গ্লাসটা পাশে রাখা অ্যালুমিনিয়ামের র্যাকে রেখে দাম মিটিয়ে রাস্তায় নামলাম।
গলিতে ঢুকে একটি অল্পবয়সি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করতেই নীরেন হালদারের বাড়ি দেখিয়ে দিল। ছোটো একতলা বাড়ি, প্রাচীনত্বের চিহ্ন বাড়ির সর্বত্র। একটা বক্স ভাঙা কলিংবেলও দেখলাম। হাত দিতে ভয় হল, যদি কারেন্ট লাগে। টাপুরদি একবার কাছ থেকে কলিংবেলটা নিরীক্ষণ করে সুইচটা টিপল। দ্বিতীয়বার বাজানোর আগেই দরজাটা খুলে গেল। একটি কমবয়সি বউ দরজা খুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল আমাদের দিকে। টাপুরদি বলল, ‘এটা তো নীরেনবাবুর বাড়ি। ওঁর স্ত্রী, মানে বীণাদেবী বাড়িতে আছেন? আমরা একটু তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
‘মার সঙ্গে?’ বউটি এমন বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল, মনে হল এই বাড়িতে এ-রকম অতিথি বুঝি প্রথম এল যে নীরেনবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চায়। তারপর বলল, ‘আসুন, ভিতরে আসুন। মাকে ডাকছি।’
মহিলা ভিতরে চলে যেতে আমি বললাম, ‘বীণাদেবীর মেয়ে বোধ হয়!’
‘না, সম্ভবত ছেলের বউ,’ ফিসফিস করে বলল টাপুরদি, ক্যাবিনেটের উপরে রাখা ছোট্ট ফ্রেমে এক নবদম্পতির ছবির দিকে নির্দেশ করল। বউটিকে চিনতে পারলাম।
পরদা সরিয়ে একজন খুব রোগা, বয়স্ক মহিলা ঘরে ঢুকলেন। তাঁর চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট। তিনি ঘরে ঢুকতে আমরা উঠে দাঁড়ালাম। বুঝলাম ইনিই ধনঞ্জয়বাবুর বোন বীণাদেবী। সামনের চেয়ারের উপর জড়োসড়ো হয়ে বসলেন তিনি। বউটি দেখলাম দরজার সামনে এসে দাঁড়াল, চোখে কৌতূহলী দৃষ্টি। শাশুড়িকে অপরিচিত লোকদের সঙ্গে একা ছাড়তে সে রাজি নয় বোঝা গেল।
টাপুরদি বলল, ‘আমরা কলকাতা থেকে এসেছি। ধনঞ্জয়বাবুর ব্যাপারে আপনার থেকে কিছু জানার ছিল।’
‘আপনারা পুলিশ?’ বীণাদেবী একটু সংকুচিতভাবে বললেন।
টাপুরদি দেখলাম অবলীলায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। বীণাদেবী একটু অস্বস্তি ভরে দরজায় দাঁড়ানো পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘বউমা, এঁদের জন্য একটু চা করে আনো।’
বউটি বলল, ‘মা, আপনার ছেলেকে ফোন করি? উনি বলেছিলেন, ‘তুমি একা কারও সঙ্গে মামাবাবুর ব্যাপারে কথা বলবে না। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দেবে না।’ এসে শুনলে উনি রাগ করবেন।’
বীণাদেবী মাথা নাড়লেন। অসহায় দৃষ্টিতে টাপুরদির দিকে তাকালেন। টাপুরদি এবার কড়া গলায় বউটিকে শুনিয়ে বলল, ‘আমরা কলকাতা থেকে এসেছি। যেটুকু জানার জেনে চলে যাব। এটা অফিশিয়াল এনকোয়ারি। পুলিশের কাজে বাধা দিলে কলকাতায় লালবাজারে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। আপনার ছেলে যদি সমস্যা তৈরি করার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর ক্ষেত্রেও পুলিশি কাজে বাধা দেওয়ার জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বউটি আর কিছু বলল না। ভিতরে চলে গেল বোধ হয় চা আনতে। বীণাদেবী সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাকালেন আমাদের দিকে। টাপুরদি এবার নরম গলায় বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই। আমরা আপনার কাছ থেকে ধনঞ্জয়বাবুর ব্যাপারে জানতে এসেছি।’
এবার যেন বীণাদেবীর চোখের পাতা দ্রব হল। হলুদের দাগ ধরা সাদা শাড়ির আঁচল তুলে চোখ মুছে বললেন, ‘ওর ব্যাপারে আর আমি কী বলব? সে তো আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতই না। আগে তো তবু ভাইফোঁটা নিতে আসত। তারপর বউদি মারা যাওয়ার পর আসা বন্ধ করে দিল। কেমন যেন বদলে গেল দাদা।’
টাপুরদি বলল, ‘ধনঞ্জয়বাবু কলকাতায় কবে যান?’
বীণাদেবী একটু ভাবলেন। তারপর উদাস কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন, ‘কলেজে পড়ার সময় সেই যে রাজনীতিতে জড়াল, ওই রাজনীতিই দাদাকে খেল। কোন সাল হবে সেটা ঠিক মনে নেই। বছর তিরিশ হবে বোধ হয়। কলেজে পড়াশোনা তো করল না। তখন দাদা এই এলাকার উঠতি নেতা। এখান থেকে কলকাতা গেল। নাকি রাজনীতি করবে। বড়ো নেতারা তাকে কলকাতায় ডেকেছে। দাদা তো পার্টিকে নিজের সবটা দিয়েছিল, কিন্তু কী পেল বলুন তো? সারাজীবন ধরে মুখের রক্ত তুলে পার্টির জন্য খেটে গেল। না পেল কোনো পদ, না কোনো ক্ষমতা। মরলও বদনাম নিয়ে।’
‘আজকাল দেখি পার্টি করতে গিয়েই কত অল্পসময়ের মধ্যে লোকে কত পদ, সম্মান পেয়ে যায়। আমার দাদাটা তো কই কিছু পেল না? আমার উনি ছিলেন দাদার বন্ধু। সবসময় বলতেন, ‘ধনাটা ভারি বোকা। পার্টি ওকে ব্যবহার করে নিল। ও ফিরে পেল না কিছু।’ সত্যিই তাই। বউদি গেল, ছেলেটা গেল। দাদা তো মরেই গেছিল কবেই। আত্মহত্যা-টত্যা সব বাজে কথা। রাজনীতিই দাদাকে মেরে ফেলল। আমি বললে আপনি হয়তো এখন বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু আমার দাদা সত্যিই খুব ভালোমানুষ ছিল।’
টাপুরদি চুপ করে থেকে বীণাদেবীকে কিছুটা সামলে নেওয়ার সময় দিল। তারপর বলল, ‘ধনঞ্জয়বাবু যখন কলকাতায় যান, সে সময়ের কথা আপনার মনে আছে?’
বীণাদেবী মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, তখন অবশ্য আমার বিয়ে হয়ে গেছে। তবে একই পাড়ায় বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ি তো, সবসময়েই যাওয়া আসা চলত। তা ছাড়া আগেই বললাম না আপনাদের, আমার উনিও ছিলেন দাদার বন্ধু। দাদার সঙ্গে পার্টিও করতেন। তবে উনি দাদার মতো অতটা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েননি। দাদা কলকাতায় চলে যাওয়ার পর রাজনীতি থেকে দূরে চলে আসেন। দাদাকে আমি অনেক মানা করেছিলাম কলকাতায় যেতে। তখন বাবা মারা গেছেন। দাদা সদ্য বিয়ে করেছে। বউদি যে কী ভালো ছিল, বলে বোঝাতে পারব না। অমন মেয়ে হয় না। বুক ফাটলেও মুখ ফুটত না মেয়ের। বউদিকে বলেছিলাম, দাদাকে যেতে মানা করো। তা বউদি তো দাদাকে ভগবানের মতো পুজো করত। সে আর কী বলবে। দাদা মা আর বউদিকে নিয়ে এখানকার পাট তুলে দিয়ে কলকাতায় চলে গেল।’
‘ঠিক কী ঘটেছিল এইসময়, মনে আছে আপনার?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি। এমন সময় বীণাদেবীর পুত্রবধূ হাতে করে দুটো প্লেটের উপর চায়ের কাপ সাজিয়ে নিয়ে এল। সঙ্গে চায়ের প্লেটের উপরেই এক দিকে দুটো করে বাটার বিস্কুট। তার শরীরী ভাষায় স্পষ্ট অসহযোগিতা ও বিরক্তি। কাপদুটো টেবিলের উপর বেশ শব্দ করে রাখল। কিছুটা চা চলকে পড়ল প্লেটে রাখা বিস্কুটের উপর। সেটা দেখেও গম্ভীর মুখে ভিতরে চলে গেল সে। বোঝা গেল শাশুড়ি ও আমাদের উপর সে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ।
বীণাদেবী বলে চললেন, ‘সেই সময় পলিটিক্সে এই অঞ্চলে দাদার বেশ নামডাক হয়েছে। চন্দননগরে একটা সভা ছিল। সেখানে রথীন ঘোষ এসেছিলেন। সঙ্গে অন্যান্য অনেক নেতারাও ছিলেন। বেশ বড়ো সভা। সেখানেই দাদাকে দেখেছিলেন রথীন ঘোষ। এরপর মৃণাল দত্ত দাদাকে বলেন কলকাতায় যাওয়ার জন্য। আরও বলেন তার মতো পার্টিকর্মীদেরই দরকার পার্টিতে।’
‘মৃণাল দত্ত কে? আমি তো শুনেছিলাম অমিয় চক্রবর্তী ধনঞ্জয়বাবুকে কলকাতায় যেতে বলেন,’ বলল টাপুরদি।
‘না না। অমিয় চক্রবর্তীও ছিলেন সেদিনের সভায়। কিন্তু তিনি দাদাকে বলেননি। মৃণালবাবুকে দাদা খুব শ্রদ্ধা করত। তাঁর কথাতেই দাদা কলকাতায় গিয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে,’ বীণাদেবী বললেন।
‘এই মৃণাল দত্ত কে?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
বীণাদেবী বললেন, ‘মৃণাল দত্তকে চেনেন না? অবশ্য আপনারা এ যুগের মেয়ে, তাঁকে চিনতে নাও পারেন। সেই সময়ে অমিয় চক্রবর্তী যদি হন রথীন ঘোষের ডান হাত, তাহলে মৃণাল দত্ত ছিলেন তাঁর বাঁ-হাত। খুব সৎ রাজনীতিক ছিলেন তিনি। রথীন ঘোষের মৃত্যুর পর দলে অমিয় চক্রবর্তীর ক্ষমতা যত বাড়তে থাকল, মৃণাল দত্ত নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকলেন। কয়েক বছরের মধ্যে নিজেকে হঠাৎই রাজনীতি থেকে সরিয়ে নেন তিনি।’
টাপুরদি নড়েচড়ে বসল। বলল, ‘ধনঞ্জয়বাবুর সঙ্গে পরে আর যোগাযোগ ছিল মৃণালবাবুর?’
‘সেটা তো আমি আর জানি না,’ বললেন বীণাদেবী, ‘আমার সঙ্গেই দাদা আর যোগাযোগ রাখেনি। দাদার কোনো খবরই পেতাম না। এতদিন পরে যদি বা খবর পেলাম, সেটাও দাদার মৃত্যুর খবর।’
আমরা বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। বীণাদেবীও উঠে দাঁড়ালেন। তারপর হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তে ‘একটু দাঁড়ান আপনারা, আমি এখনই আসছি’ বলে পরদা সরিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। ফিরলেন সামান্য পরেই। টাপুরদির হাতে দিলেন একটা ল্যামিনেট করা পেপার কাটিং ও একটা ছবি।
টাপুরদির পাশে এগিয়ে গেলাম। ছবির লোকটিকে টিভি স্ক্রিনে দেখেছি, ধনঞ্জয় মণ্ডল। তবে এই ছবিতে তার বয়স অনেক কম, বড়োজোর পঁচিশ ছাবিবশ হবে। গায়ে গরদের পাঞ্জাবি। হাসিমুখ। তাগড়াই জোয়ান চেহারার ধনঞ্জয় মণ্ডলের মুখের হাসিটা অমলিন। বীণাদেবী বিষণ্ণ স্বরে বললেন, ‘এই ছবিটা দাদার বিয়ের দিন তোলা। দেখুন কী সুন্দর লাগছে দাদাকে।’
পেপার কাটিংটা কোনো সভার। বীণাদেবী নিজেই বললেন, ‘এই ছবিটা সেই দিনের সভার পরে পেপারে ছাপা হয়েছিল। দেখুন, স্টেজে রথীন ঘোষ আছে। এই যে অমিয় চক্রবর্তী,’ বলে তিনি আঙুল দিয়ে দেখালেন।
‘আর এই যে ইনি হলেন মৃণাল দত্ত,’ বলে একজনের দিকে নির্দেশ করলেন। দেখলাম স্টেজে ঠিক রথীন ঘোষের পাশে দাঁড়িয়ে একজন দীর্ঘদেহী পুরুষ। রথীন ঘোষের পাশে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছেন, আর রথীনবাবু তাঁর কানে কানে কিছু বলছেন।
‘আর এই দেখুন দাদা,’ বলে স্টেজের একপাশে দাঁড়ানো যুবক ধনঞ্জয় মণ্ডলকে দেখালেন বীণাদেবী। এই ছবিটা পেপারে বেরোনোর পর আমার স্বামী ল্যামিনেট করে এনে দিয়েছিলেন আমায়। এটাই আমার কাছে দাদার শেষ ছবি ছিল। এটা আপনি রাখুন।
এতটা বলে একটু থামলেন বীণাদেবী। কয়েকবার জোরে জোরে নিশ্বাস নিলেন। বললেন, ‘দেখুন, আমার দাদা বলে বলছি না। কিন্তু ওকে আমি চিনি। রাজনীতির জন্য নিজের সব হারিয়েছে ও। তবু শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতিকে বুকে আঁকড়ে বেঁচেছে দাদা। তার এভাবে অপমানের মৃত্যু আমি মেনে নিতে পারছি না। আমার বয়স হয়েছে, আর ক’দিনই বা বাঁচব? যদি দাদার মাথার উপর থেকে এই বদনামের দাগ মুছতে পারেন, আমি মরেও শান্তি পাব।’
৩৭
গতকাল চুঁচুড়া থেকে ফিরে এসে টাপুরদি অর্জুনদাকে ফোন করেছিল। বলেছিল, ‘মৃণাল দত্তের খোঁজ চাই।’ আজ দুপুরে ফোন করে অর্জুনদা মৃণাল দত্তের ঠিকানা, ফোন নম্বর জানিয়েছিল টাপুরদিকে। টালিগঞ্জে বাড়ি মৃণাল দত্তর। দুপুরেই ফোন করে মৃণালবাবুর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিল টাপুরদি। মৃণালবাবু কিছু জিজ্ঞাসা করেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘সন্ধেবেলায় আসুন, ছ’টা নাগাদ।’
টালিগঞ্জ মেট্রোর কাছেই গলির ভিতর দোতলা বাড়ি। যখন বাড়ির সামনে পৌঁছোলাম, হাতঘড়িতে ছ’টা বাজতে দশ সময় দেখাচ্ছে। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে কলিংবেল বাজালাম। এক মধ্যবয়সি ভদ্রমহিলা গ্রিলের তালা খুলতে খুলতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনাদেরই কি বাবার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল?’
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল টাপুরদি। ভদ্রমহিলা গেটের তালা খুলে হাসিমুখে বললেন, ‘আসুন ভিতরে। বসুন। আমি সুপর্ণা দত্ত, মৃণাল দত্ত আমার বাবা হন। বাবা সন্ধেবেলায় একটু হাঁটতে বেরোন। এখুনি চলে আসবেন।’
টাপুরদি বলল, ‘আপনাকে বড্ড চেনা লাগছে। আপনি কি থিয়েটার করেন?’
সুপর্ণা দত্ত হাসলেন। বললেন, ‘ওই টুকটাক করি। সেরকম কিছু নয়।’
টাপুরদি বলল, ‘আমি আপনার ‘শখের বাগান’ নাটকটা দেখেছি। অনবদ্য অভিনয়, উফফ মনে পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। ম্যানারিজমহীন, মাপা এক্সপ্রেশন, একদম ন্যাচারাল অভিনয় আপনার। শেষে বাগানের মাঝখানে বসে ছেলের মৃতদেহ জড়িয়ে আপনার সেই বুকভাঙা কান্না আমি ভুলব না।’
সুপর্ণা দত্ত মিষ্টি করে হাসলেন। বললেন, ‘বাহ, আমার অভিনয় কেউ মনে রেখেছে জেনে ভারি আনন্দ পেলাম।’
টাপুরদি বলল, ‘শুধু আমি কেন, ‘শখের বাগান’-এ আপনার অভিনয় যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা আপনার অভিনয় ভুলতে পারবেন না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। বাই দ্য ওয়ে, ‘আমি সংঘমিত্রা ব্যানার্জি, আর ও হল মৈথিলী সেন’ বলে ব্যাগ থেকে নিজের কার্ড বের করে সুপর্ণার হাতে দিল টাপুরদি।
‘প্রাইভেট ডিটেকটিভ?’ চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞাসা করলেন সুপর্ণা, ‘কেন?’
‘সেরকম কিছু নয়,’ হেসে বলল টাপুরদি, ‘একটা ব্যাপার একটু জানার ছিল। তাই আসা। গুরুতর কিছু নয়। যাই হোক, আপনি কতদিন ধরে এই অভিনয় জগতে আছেন?’
বুঝলাম কথার অভিমুখ ঘোরানোর জন্যই জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘আসলে বাবার উৎসাহেই খানিকটা বেশি বয়সে আমার অভিনয়ে আসা,’ বললেন সুপর্ণা, ‘শখ ছিল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে অল্পসল্প স্টেজে অভিনয় করেছি। তারপর বিয়ের পর সব বন্ধ। আমি আশুতোষ কলেজে পার্টটাইম লেকচারার। চাকরি, সংসার, ছেলে নিয়ে অভিনয়ের জন্য সময় থাকত না। তারপর এখানে ফিরে আসার পর অভিনয়টা আবার শুরু করি। খুব বেশি সময় পাই না। যেটুকু পাই, তাতেই করার চেষ্টা করি আর কী।’
‘আপনি সত্যিই অসাধারণ অভিনেত্রী,’ বলল টাপুরদি।
সুপর্ণা হাসলেন। বললেন, ‘কিন্তু বাবার কাছে আপনারা কী ব্যাপারে এসেছেন, বললেন না কিন্তু। আসলে কী জানেন, বাবার বয়স হয়েছে। বিপি, সুগার হাই। তাই বাবাকে নিয়ে একটু টেনশনে থাকি।’
‘বুড়ো ছেলেকে নিয়ে তোর চিন্তার আর শেষ নেই, সুপু,’ বলতে বলতে হাসিমুখে যিনি ঘরে ঢুকলেন, তাঁকে দেখে আমি আর টাপুরদি দুজনেই উঠে দাঁড়ালাম। ইনিই মৃণাল দত্ত। বীণাদেবীর দেওয়া ছবিতে দেখেছি তাঁকে। কাল টাপুরদি গুগল করেও কিছু পুরোনো ছবি বার করে দেখিয়েছে আমায়। কিন্তু সেসবই তাঁর যৌবনের ছবি। এখন যে অতি সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন, তাঁকে দেখে মনে হল, রাজনীতিবিদ না হলে তিনি অনায়াসে অভিনেতা হতে পারতেন। টকটকে ফর্সা গায়ের রং, মাথার চুল ধবধবে সাদা, তীক্ষ্ণ নাসা, নরম চোখের দৃষ্টি, দীর্ঘ দেহ সব মিলিয়ে যেন সেলুলয়েডের কোনো রূপবান বৃদ্ধ রাজা। রাজাসুলভ আভিজাত্যই ঘিরে আছে মানুষটাকে।
আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। বললেন, ‘আপনাদের মধ্যে কে কাল ফোন করেছিলেন আমায়?’
টাপুরদি বলল, ‘আমি করেছিলাম।’
মৃণালবাবু বললেন, ‘চলুন, আমার স্টাডিতে বসে কথা বলা যাক।’
তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার স্টাডিতে সবার জন্য চা পাঠিয়ে দে সুপু।’
মৃণালবাবুর স্টাডিটিকে রত্নখনি বললে কম বলা হয়। ঘরের দেওয়ালে একটি দরজা ও দুটি জানলা বাদে বাকি সর্বত্র দেওয়ালজোড়া বুক শেলফে ঠাসা শুধু বই আর বই। মাঝে একটা ছোট্ট স্টাডি টেবিলের উপরেও বই রাখা। টেবিলের এক কোণে একটা ফোটোফ্রেমে সুপর্ণার কোলে একটি চার-পাঁচ বছরের বাচ্চা ছেলের ছবি, সম্ভবত সুপর্ণার ছেলে। একদিকে একটা সিংগল খাটে শুধু পাতলা তোশকের উপর সাদা চাদর টান টান করে পাতা। মেয়েলি হাতের যত্নের ছোঁয়া সর্বত্র। ঘরে ঢুকে মনে হল এ কোনো জ্ঞানতাপসের সাধনাস্থল। মৃণালবাবু বললেন, ‘তোমাদের তুমি বলে সম্বোধন করছি। তোমরা আমার সুপুর চেয়েও অনেক ছোটো। তোমাদের এই ঘরে ডাকলাম কারণ যে বিষয় নিয়ে তোমরা আলোচনা করতে এসেছ, সেসব কথা আমি সুপুর সামনে করতে চাই না। বসার জায়গায় একটু অভাব আছে। তোমরা দুজনে বরং বিছানার উপর আরাম করে বোসো। আমি এখানে চেয়ারে বসি।’
টাপুরদি ঘুরে ঘুরে বই দেখছিল। বলল, ‘এত বই, সব পড়েছেন আপনি?’
মৃণালবাবু হেসে বললেন, ‘এই সংগ্রহের মোটামুটি সবই আমার পড়া। অসীম জ্ঞানসমুদ্র, জীবন বড়ো ছোটো। তবে আমি বেকার মানুষ। কোনো কাজ তো নেই। চা ছাড়া নেশাও নেই কোনো। এই বই-ই আমার নেশা বলতে পারো। পড়াশোনা নিয়ে সময় দিব্যি কেটে যায়।’
‘অসাধারণ সংগ্রহ আপনার। আজ কাজের জন্য এসেছি। তবে আপনি যদি বিরক্ত না হন, এবং যদি অনুমতি দেন, তবে পরে আবার আসব আপনার এই সংগ্রহ আরও ভালোভাবে দেখার জন্য।’
‘নিশ্চয়ই আসবে। একশোবার আসবে। বই কারও একার নাকি? যে বলে আমার বই, সে মূর্খ। টাকা দিয়ে কিনলেই কি আর বইয়ের মালিক হওয়া যায়, না ভিতরের জ্ঞানটাকে কিনে ফেলা যায়? সে যে অগাধ, অসীম। যত পড়ো, যতই বিলোও, তা শেষ হবে না কখনো।’
টাপুরদি এসে বসল। নিজের কার্ডটা এগিয়ে দিল মৃণালবাবুর হাতে। মৃণালবাবু আলগোছে তাতে চোখ বুলিয়ে মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘সংঘমিত্রা। তোমার নাম তো সংঘমিত্রা। তুমি জানো সংঘমিত্রা কে ছিলেন?’
টাপুরদি হাসল। বলল, ‘জানি। সম্রাট অশোকের কন্যা ছিলেন রাজকন্যা সংঘমিত্রা।’
‘ঠিক,’ মাথা নেড়ে বললেন মৃণালবাবু, ‘রাজকন্যা সংঘমিত্রা। কালের প্রবাহচক্রে কত রাজা-রানি-রাজপুত্র-রাজকন্যার নাম ইতিহাস ভুলে গেছে। কিন্তু সংঘমিত্রাকে মনে রেখেছে। কেন জানো?’
‘রাজকন্যা সংঘমিত্রা সিংহলে গিয়েছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারের জন্য,’ বলল টাপুরদি।
‘সিংহলে গিয়েছিলেন, ঠিক,’ মাথা নাড়লেন মৃণালবাবু। তারপর বললেন, ‘তবে বলাটা যত সহজে বলছি আমরা, সেই যুগে কাজটা এত সহজ ছিল না। একজন সম্রাটের কন্যা, যে আজীবন বিলাসিতায় অভ্যস্ত, একদিন মনে করলেন সব ছেড়ে সন্ন্যাসী হবেন। ভাবতে পারো সংঘমিত্রা? কী নেই তাঁর কাছে? রাজকন্যা তিনি। স্বামী, সন্তান, সংসার, আজন্মলালিত চার দেওয়ালের সংস্কার, সুখ সম্পদ, বিলাসব্যসন সব এককথায় ছেড়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। সিংহলের রাজা দেবানামপিয় তিস্য রাজকন্যা সংঘমিত্রাকে নিজ রাজত্বে আমন্ত্রণ জানিয়েছে রাজ্যে নারীদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারের জন্য। সংঘমিত্রা তো এক পায়ে খাড়া। সম্রাট অশোক কন্যার ছেলেমানুষিকে গুরুত্ব দিলেন না। তখন সংঘমিত্রা তাঁর বাবা, না, এক সম্রাটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে বললেন, ‘রাজপুত্র মহেন্দ্রর যাওয়াটা যদি রাজধর্মের জন্য জরুরি হয়, আমার যাওয়াটাও তবে আমার হৃদয়ের ধর্মের জন্য, আরও অনেক নারীকে ধর্মের সঠিক দিশা দেখানোর জন্য জরুরি।’ ভাবতে পারো সংঘমিত্রা, আজ থেকে দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে, যখন আমাদের দেশের সংস্কৃতি নারীর অধিকারকে পৌরুষের অহংকারে দলিত করে চলেছিল, বলছিল ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্যমর্হতি’, সেখানে সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এক নারী এক সম্রাটের চোখে চোখ রেখে নিজের হৃদয়ের ধর্মকে অনুসরণ করার অনুমতি চাইছেন, দাবি জানাচ্ছেন। কী অপরিসীম দার্ঢ্য, ভেবে দেখো। জন্মসূত্রে পাওয়া সুখসৌভাগ্যকে এককথায় ছেড়ে সন্ন্যাসিনীর কৃচ্ছ্রকে বরণ করে নিতে কতটা মনের জোর লাগে ভাবতে পারো?’
টাপুরদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম টাপুরদি মুগ্ধদৃষ্টিতে মৃণালবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা শুনছে। সত্যি, মুগ্ধ হওয়ার মতোই মানুষ তিনি।
এবার মৃণালবাবু বললেন, ‘আচ্ছা দেখো, আমি একাই বকে চলেছি। বুড়ো হয়েছি তো। তাই আজকাল বেশি বকবক করি। সুপুও তাই বলে। যা হোক, তোমরা যে জন্য এসেছ, এবার সেই ব্যাপারে কথা বলা যাক।’
‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন, আমি কেন এসেছি?’ নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
৩৮
হাসলেন মৃণালবাবু। বললেন, ‘জানি। আমি নিজেকে যতই দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি, আমার অতীত আমায় ছাড়ে না। অতীত বড়ো বিষম বস্তু, বুঝলে হে। আমরা ভাবি, কালকে বুঝি খুব সহজেই অতিক্রম করা যায়। ভুল ভাবি। কাল হল সেই গর্বোদ্ধত সম্রাট, সে চলার পথের প্রতি প্রান্তে তার পদচিহ্ন ছেড়ে যায়। আমার অতীত আমার সঙ্গেই চলে পরম বন্ধুর মতো। বলো, কী জানতে চাও।’
‘অমিয় চক্রবর্তীকে আপনি কবে থেকে চেনেন?’
মৃণালবাবু খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন, বাইরে সন্ধে নেমেছে। তাঁর চোখ দেখে মনে হল তাঁর মন ফিরে যাচ্ছে তাঁর ফেলে আসা অতীতে। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃণালবাবু বললেন, ‘অমিয় আমার থেকে বছর পাঁচেকের ছোটো ছিল। আশুতোষ কলেজে পড়ত। ইউনিয়ন করত জমিয়ে, দারুণ ব্রাইট। উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও প্রতিভাবান। খুব দ্রুত উন্নতি করছিল। আমাদের দল তখন সরকারে ক্ষমতায়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে অমিয়র রাজনৈতিক কেরিয়ারের গ্রাফ তরতরিয়ে উপরে উঠল। কলেজ ইউনিয়ন থেকে শুরু করে মাত্র বছর পাঁচেকের মধ্যে দলের প্রমিনেন্ট যুবনেতা হয়ে উঠল অমিয়। রথীনদা খুব স্নেহ করতেন ওকে। আমায় প্রায়ই বলতেন, ‘দেখিস মৃণাল, এই ছেলেটা অনেক উপরে যাবে।’ ওর মধ্যে কিছু করার, আরও উপরে ওঠার একটা খিদে ছিল।’
‘সরি, চা-টা দিতে একটু দেরি হয়ে গেল,’ বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন সুপর্ণা।
‘আরে না না, কোথায় দেরি?’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর হাত থেকে চায়ের ট্রেটা নিলাম আমি। টেবিলের উপর রাখতে সুপর্ণা এগিয়ে এসে একটা কাপ নিয়ে মৃণালবাবুর হাতে এগিয়ে দিলেন। বললেন, ‘বাবার চিনি ছাড়া।’ তারপর মৃণালবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাবা, কিছু লাগবে আর?’
‘না রে, তুই যা, রেওয়াজে বসবি তো?’ বললেন মৃণালবাবু।
‘আসছি। আপনারা কথা বলুন,’ বলে মিষ্টি করে হেসে সুপর্ণা বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে।
সেদিকে তাকিয়ে টাপুরদি বলল, ‘আপনিও তো রথীনবাবুর খুব কাছের লোক ছিলেন। অমিয়বাবুর উত্থানে আপনার খারাপ লাগেনি?’
মৃণালবাবু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘হিংসে হয়েছিল কি না জানতে চাইছ? আজ এতদিন পরে মিথ্যে বলে লাভ কী? তা একটু হয়েছিল। আসলে অমিয়কে আমি হাতে ধরে তৈরি করেছিলাম। কলেজের রাজনীতি আর সত্যিকারের মাঠে নেমে রাজনীতির ময়দানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে পার্থক্য তো আছে। কলেজ ইউনিয়নের নেতা থেকে শুরু করে দলের যুবনেতা হওয়ার পথটা আমিই ওকে পার করিয়েছিলাম। কারণ রথীনদার মতো আমারও মনে হয়েছিল, ছেলেটার মধ্যে মেটেরিয়াল আছে। ও নিজেও সেই সময় আমার খুব ন্যাওটা ছিল। সারাক্ষণ মৃণালদা মৃণালদা করে সঙ্গে সেঁটে থাকত। ওকেও আমি ছোটো ভাইয়ের মতো ভালোবাসতাম।’
‘তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম, অমিয় ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ও শুধু যুবনেতা হয়ে থেমে যাওয়ার জন্য পলিটিক্সে আসেনি। ওর লক্ষ্য আরও দূরে, আরও উঁচুতে। আমি ছিলাম রথীনদার কাছে পৌঁছোনোর জন্য ওর সিঁড়ি। সেই সময় একটু রাগ হয়েছিল। দুঃখ পেয়েছিলাম। কিন্তু জানো তো, রাজনীতিতে এইসব সেন্টিমেন্টের কোনো দাম নেই।’
‘সুনয়নাদেবীকে চিনতেন আপনি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘সুনয়না? ভারি ভালো মেয়ে। কী অপূর্ব গাইত মেয়েটা! আমায় দাদা বলে ডাকত, শ্রদ্ধা করত।’
‘শুনেছি সুনয়নাদেবীও অমিয়বাবুর সঙ্গে একইসঙ্গে রাজনীতি করতেন সেই সময়?’
মৃণালবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, অমিয় আর সুনয়না একসঙ্গে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিল। সত্যি বলতে কী, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, সুনয়নার রাজনৈতিক প্রতিভা ও বুদ্ধি দুটোই অমিয়র চেয়ে অনেকটাই বেশি ছিল। লেগে থাকলে কে বলতে পারে, আজ হয়তো অমিয়র জায়গায় ও গদিতে বসত। কিন্তু কেন কে জানে, বিয়ের পর থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে দূরত্ব বাড়তে থাকল ওর। তারপর অম্লানের জন্মের পরে পুরোপুরি সরে গেল। অথচ ওকে দেখে মনে হত, রাজনীতি ও ভালোবাসে। তবু কেন সরে গেল, ভিতরের কথা জানি না আমি। তবে আমাদের সমাজে তো স্যাক্রিফাইস বরাবর নারীরাই করে,’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন মৃণালবাবু।
‘ধনঞ্জয় মণ্ডলকে চিনতেন আপনি?’ জানতে চাইল টাপুরদি।
‘চিনতাম। আসলে দলে গ্রাসরুট লেভেল থেকে উপরতলা অবধি লক্ষাধিক কর্মী কাজ করে। সবাইকে মনে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু ধনঞ্জয়কে মনে আছে। কারণ, রথীনদা ওকে পছন্দ করতেন। আমি ওদের বাড়ি গেছিলাম। খুব কাজের ছেলে ছিল। পার্টির জন্য প্রাণ দিতেও পারত। আমাদের দল ক্ষমতা হারাল। এতগুলো বছরে কত লোক যে পার্টি বদলাল, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু ধনঞ্জয় মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে। ও রাজনীতি যে খুব ভালো বুঝত, তা নয়। সেইজন্যই হয়তো এত বছরে তেমন উন্নতি করতে পারেনি। দলের সাধারণ কর্মী হয়েই রয়ে গেছিল। তবে সে নিয়ে ওর দুঃখ ছিল বলে মনে হয় না। দলকে ও ভালোবাসত। আমি যে ধনঞ্জয়কে চিনতাম, সে ভীষণ আবেগপ্রবণ নরম মনের ছেলে ছিল। ও অমিয়কে খুন করেছে, এ আমি মানতে পারি না। আবার এটাও ঠিক যে, এ-রকম নরম মনের আবেগপ্রবণ মানুষেরা সেরকম আঘাত পেলে ভয়ানক হয়ে ওঠে। ধনঞ্জয়ের সঙ্গে হয়তো তাই-ই হয়েছিল।’
‘ধনঞ্জয়ের সঙ্গে আপনার পরে আর যোগাযোগ হয়নি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘হয়েছিল,’ বললেন মৃণালবাবু। একটু থেমে বললেন, ‘ওর ছেলে তখন খুব অসুস্থ। ও আমায় ফোন করেছিল। বলেছিল, ওর টাকার খুব দরকার। অমিয় নাকি টাকা দেবে বলেও দেয়নি।’
টাপুরদি উত্তেজিত ভঙ্গিতে সামনে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি দিয়েছিলেন টাকা?’
মৃণালবাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, ‘দিয়েছিলাম কিছু। যদিও সেটা ওর প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। তখন সন্ধের পর ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে গেছিল। এটিএমে টাকার উইথড্রয়ালের লিমিট আমার খুব বেশি নয়। ওকে বলেছিলাম, পরের দিন আসতে। ব্যাঙ্ক থেকে তুলে আরও কিছু দেব। কিন্তু ও আর আসেনি। পরে শুনেছি সেদিনই শেষ রাতে ওর ছেলে মারা যায়।’
‘এবার একটু অন্য কথায় আসি। আপনি কেন সরে এলেন রাজনীতি থেকে?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
পাশের ঘরে সুপর্ণা রেওয়াজ করছেন। বিলম্বিত ইমন গাইছেন অপূর্ব সুরে। দীর্ঘ আলাপ গেয়ে চলেছেন একতালের বিলম্বিত লয়ে। বাতাসে সুর ভাসছে দীর্ঘায়িত কান্নার মতো। সেদিকে কান পেতে চুপচাপ কিছুক্ষণ শুনলেন মৃণালবাবু। তারপর বললেন, ‘আমার রাজনীতি থেকে সরে আসার সঙ্গে কি এই কেসের সত্যিই কোনো সম্পর্ক আছে?’
‘হয়তো নেই। তবু জানতে ইচ্ছে করছে। আপনি বলতে না চাইলে বলবেন না,’ বলল টাপুরদি।
মৃণালবাবু চায়ের কাপটা শেষ করে বললেন, ‘তোমাদের চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খেয়ে নাও।’
উঠে গিয়ে খোলা জানলার সামনে দাঁড়ালেন তিনি। পাশের গলিতে রিকশার ঠুংঠাং ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দু’চারটা গাড়ি হুসহাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। মৃণালবাবু কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ। তারপর ফিরে এসে আবার চেয়ারে বসলেন। বললেন, ‘আমার আর ভালো লাগছিল না। ক্লান্ত বোধ করছিলাম।’
‘সেই ক্লান্তি কি অমিয় চক্রবর্তীর উত্থানবশত?’ প্রশ্ন করল টাপুরদি।
মৃণালবাবু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘না। তুমি যেটা ভাবছ, সেটা নয়। প্রথমদিকে অমিয়র দ্রুত উত্থানে ঈর্ষা হয়তো সামান্য হয়েছিল, আফটার অল, আমিও তো মানুষ। রিপুর নিগড়ে আমিও তো বাঁধা। কিন্তু আমি মনে মনে মেনে নিয়েছিলাম যে অমিয় আমার থেকে যোগ্য ব্যক্তি। আসলে আমার জীবনে রাজনীতি নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না, যেটা অমিয়র ছিল। শুধু রাজনীতি কেন, যেকোনো কেরিয়ারেই যদি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকে, তাহলে বেশি দূর এগোনো যায় না।’
‘আপনি বলতে চান আপনি অমিয় চক্রবর্তীর জায়গায় নিজেকে দেখতে চাননি?’
‘তখনও আমাদের দল ক্ষমতায়। রথীনদা মুখ্যমন্ত্রী। রথীনদাকে টপকে সেই জায়গায় আমি নিজেকে ভাবতে চাইনি। রথীনদা আমার ও অমিয়র দুজনেরই রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু। খুব শ্রদ্ধা করতাম আমি মানুষটাকে।’
‘তারপর সময় বদলাল। আমাদের দল বিধানসভা ভোটে হেরে গেল, ক্ষমতা থেকে সরে গেল। ইলেকশনের আগের বছরই রথীনদার একটা হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। সে যাত্রায় বেঁচে উঠলেও ভিতরে ভিতরে দুর্বল হয়ে গেছিলেন রথীনদা। বয়সও হয়েছিল। দলের ভিতরে রথীনদার মুঠি আলগা হচ্ছিল একটু একটু করে। অস্বীকার করব না, এত বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার ফলে দলের মধ্যেও বেনোজল ঢুকছিল। ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হয়েছিল। খবরের কাগজে সেসব নিয়ে বিস্তর লেখালেখি শুরু হয়েছিল। কয়েকটা নিউজ পেপার তো আমাদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছিল। দলের ভিতরে অমিয়রও ক্ষমতা বাড়ছিল ক্রমশ।
এরপর ইলেকশনে আমাদের দলের হার হল। রাজ্যে আমাদের বিরোধী দল ক্ষমতায় এল। দলে দলে আমাদের দলের নেতা কর্মীরা গিয়ে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিতে শুরু করল। মুঠোর মধ্যে বালির মতো ক্ষমতা আমাদের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে থাকল। যারা সেই অবস্থাতেও দলে টিকে রইল, তাদেরও মনোবল তলানিতে।’
‘সরি, আমি একটু ইন্টারাপ্ট করছি,’ বলে উঠল টাপুরদি, ‘আমি সেই সময়ের খবরের কাগজ কিছু দেখেছি ইন্টারনেটে। অমিয়বাবুর সম্পর্কে যা যা ছাপা হত, সব নিশ্চয়ই মিথ্যে নয়?’
মৃণালবাবু সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালেন টাপুরদির দিকে। বললেন, ‘ইন্টারনেটে অত পুরোনো খবরের কাগজও পাওয়া যায় বুঝি? আমি পুরোনো মানুষ। বই বুঝি, ইন্টারনেট-টেট অত ভালো বুঝি না। তবে মেল চেক করতে পারি, সুপু শিখিয়ে দিয়েছে। তবে তুমি কেসটা নিয়ে বেশ খেটেছ দেখে ভালো লাগল।’
‘আসলে কী জানো, অমিয়রও তখন বয়স কম। ওর কাজ করার ধরন আলাদা ছিল। একটু বেশিই অ্যাগ্রেসিভ ছিল। ফলে ওকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হত। মানুষ হিসেবে কারও বিচার করার অধিকার আমার নেই। আর আমি অনেকদিন ধরে রাজনীতির বাইরে আছি। এখন আর এইসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না। অমিয় চলে গেল। আমি এটুকু জানি, যেই স্বপ্নটা ওর লড়াইয়ের প্রেরণা ছিল, সেই স্বপ্ন সার্থক হওয়ার মুখে এসে ওকে চলে যেতে হল, এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু হতে পারে না।’
টাপুরদি বলল, ‘তার মানে আপনি বলছেন, অমিয়বাবুর সঙ্গে স্বার্থের সংঘাতে আপনি পলিটিক্স ছাড়েননি?’
‘স্বার্থের সংঘাত?’ মৃণালবাবু একটু ব্যথিত দৃষ্টিতে তাকালেন টাপুরদির দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘না মা। স্বার্থ আমার ছিল না। রথীনদার জন্য রাজনীতিতে ছিলাম আমি। রথীনদার আদর্শকেই নিজের আদর্শ বলে মেনেছিলাম। রথীনদা চলে গেলেন। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, অমিয় দলকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে চাইছিল। ওর কর্মপন্থা, চিন্তাভাবনার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারছিলাম না। স্বার্থের সংঘাত নয়, বলতে পারো আদর্শের সংঘাত। তা ছাড়া আমার স্ত্রীও অসুস্থ ছিলেন। ক্যানসার। ওঁর আমাকে দরকার ছিল। এখন মাঝে মাঝে ভাবি, ধনঞ্জয়ও যদি আমার মতো সময় থাকতে পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারত, তাহলে বোধ হয় আজ অনেক কিছু অন্যরকম হত। আজ জীবনের এই পর্যায়ে এসে বুঝেছি, দিনের শেষে পরিবারই সঙ্গে থাকে।’
‘একজন জার্নালিস্ট সেই সময় অমিয় চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে খুব লেখালেখি করতেন। নাম মল্লিকা দাশগুপ্ত। আপনি চিনতেন তাকে?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
মৃণালবাবু বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালেন টাপুরদির মুখের দিকে। বললেন, ‘মল্লিকা দাশগুপ্ত? চিনতাম বই কী! আগুনের মতো মেয়ে মল্লিকা দাশগুপ্ত। ভীষণ সাহসী, লড়াকু মেয়ে। হ্যাঁ, ও আমাদের দলের এগেন্সটে লিখত। কিন্তু আমায় খুব শ্রদ্ধাও করত। সত্যি বলতে কী, ও একাই সেই সময় আমাদের দলের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট ছিল মল্লিকা দাশগুপ্ত। পলিটিক্স নিয়ে লিখত। পাগলি মেয়ে, আমায় এসে বলত, আপনাকে আমি এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই মৃণালদা। নিজের কাজ নিয়ে দারুণ সিরিয়াস ছিল মেয়েটা।’
‘আপনার কি মনে হয় অমিয় চক্রবর্তী সম্পর্কে কোনো গুরুতর তথ্য তাঁর হাতে এসেছিল?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
‘আমি বলতে পারব না এই বিষয়ে। সেরকম কিছু থেকে থাকলেও আমার জানা নেই। কিন্তু হঠাৎ মল্লিকার কথা আসছে কেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। অমিয়কে তো ধনঞ্জয় খুন করেছে বলে শুনেছি। তুমি এতসব জানতে চাইছ, কারণটা কী বলো তো? তাহলে কি অমিয়র মৃত্যুতে কোনো রহস্য আছে?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন মৃণালবাবু।
‘রহস্য আছে কি না তা এখনও জানি না। সেটাই খুঁজে দেখার চেষ্টা করছি আপাতত। আজ তাহলে আসি,’ বলে উঠে দাঁড়াল টাপুরদি। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। আমার দিকে তাকিয়ে মৃণালবাবু হেসে বললেন, ‘মৈথিলী, আজ তোমার সঙ্গে কথা হওয়ার সুযোগ হল না। এরপর যবে আসবে, তোমায় আরেকজন মৈথিলীর গল্প শোনাব, যিনি রাজ্যসুখ, স্বামী, সন্তান সব ত্যাগ করেছেন শুধু আত্মসম্মানের জন্য। রামায়ণের গল্প তো সবাই জানে, মৈথিলীকে আসলে চেনে ক-জন? অনেকে বলে মহাকাব্যের সবচেয়ে বলিষ্ঠ নারী চরিত্র যাজ্ঞসেনী। আমি কিন্তু তা মনে করি না। আমার মনে হয়, মৈথিলীকে পরবর্তী অনুবাদক ও কবিরা ঠিকমতো এক্সপ্লোর করেনি। বাল্মীকির মৈথিলী জানকী এক অনন্যসাধারণ চরিত্র।’
ঘর থেকে বেরোনোর সময় স্টাডি টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে গেল টাপুরদি। ফোটোফ্রেমটা হাতে তুলে হেসে বলল, ‘এটি বুঝি আপনার নাতি? তা কোথায় সে? দেখলাম না তো? বাড়িতে নেই বুঝি?’
মৃণালবাবু ছবিটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ও তো নেই। থ্যালাসেমিয়া নিয়েই জন্মেছিল। তিন বছর হল চলে গেছে আমাদের ছেড়ে, ওর মাকে ছেড়ে। বড়ো একা হয়ে গেছে মেয়েটা।’
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। পাশের ঘরে সুপর্ণার গলায় বিলম্বিত ইমনের বন্দিশ বাতাসে যেন মাথা কুটে কেঁদে বেড়াচ্ছে,
‘মেরা মন বাঁধ লিনোরে, হাঁ রে ইন যোগিয়াকে সাথ,
সদারঙ্গ করম করো কিউ না ইন প্রাণনাথ কি হাথ…’
৩৯
মৃণালবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় অনেকক্ষণ কারও মুখে কোনো কথা জোগাল না। টাপুরদি নিঃশব্দে ড্রাইভ করতে লাগল। আমি গাড়ির জানালা দিয়ে চেয়ে রইলাম বাইরের দিকে। আজকের দিনটা আমার জীবনের অভিজ্ঞতার খাতায় সঞ্চিত হল। মনটা বড্ড ভারী হয়ে আছে, কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। জানি টাপুরদিরও মনের একই অবস্থা।
টাপুরদির ফোনটা বাজছে। গাড়ি চালাতে চালাতে টাপুরদি ফোন ধরে না। আমায় বলল, ‘ফোনটা ধর মিতুল।’
অর্জুনদার ফোন। কথা শেষ করে ফোনটা রাখতে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ব্যাপার?’
‘কিছু না। জিজ্ঞাসা করছে আমরা বাড়ি আছি কি না। আমি বললাম, আর পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছোচ্ছি।’
‘এখন আসবে অর্জুন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘হুম। তাই তো বলল,’ বললাম আমি।
টাপুরদি কোনো কথা বলল না। আজকাল কেন জানি না মনে হচ্ছে টাপুরদি আর অর্জুনদা দুজনে একটা সাঁকোর দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যবর্তী দূরত্বটা তারা যেন চেয়েও অতিক্রম করতে পারছে না। দুজনেই একই পেশায় থাকার এটাই বোধ হয় খারাপ দিক। না চাইতেও কোথাও একটা সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা চলেই আসে। মানুষের মনের চেয়ে জটিল বোধ হয় আর কিছু নেই। এসব ভাবলেই মনটা বড়ো খারাপ হয়ে যায়। ওদের দুজন দূরে সরে গেলে সত্যিই আমি খুব কষ্ট পাব।
অর্জুনদা এল রাত ন’টা নাগাদ। খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে অর্জুনদাকে। ঘরে ঢুকেই বলল, ‘একটা মাথা ব্যথার ওষুধ থাকলে দাও তো!’
টাপুরদি ঘর থেকে অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট এনে দিল অর্জুনদাকে। জল দিয়ে ট্যাবলেটটা গিলে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজল অর্জুনদা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘খুব চাপ যাচ্ছে, না অর্জুনদা?’
‘খুউউব!’ বলে ফিকে হাসল অর্জুনদা। তারপর বলল, ‘উপর লেভেল থেকে চাপ আসছে অমিয় চক্রবর্তীর কেসটা ক্লোজ করে দেওয়ার জন্য।’
‘অর্থাৎ ধনঞ্জয় মণ্ডলকে মার্ডারার হিসেবে ফ্রেম করে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলার জন্য। তাই তো?’ বলল টাপুরদি।
‘হুম, সেরকমই বলতে পারো। আর সব সাক্ষীসাবুদ, প্রমাণ, এমনকী সুইসাইড নোটও তো ধনঞ্জয়ের দিকেই ইঙ্গিত করছে।’
‘সেসবই তো বুঝলাম। কিন্তু তাই বলে সেটা একবার খতিয়ে দেখা হবে না, যে ধনঞ্জয় মণ্ডল যা দাবি করছে সেটা কতটা সত্যি? এমনও তো হতে পারে যে কেউ কাজটা ওকে দিয়ে করিয়েছে? যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে ধনঞ্জয় মণ্ডলই খুনি, তবু এই খুনের পেছনে মাস্টারমাইন্ড যে অন্য কেউ নয়, সে ব্যাপারে কীভাবে এত শিয়োর হচ্ছে সকলে?’ বিরক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘শিয়োর হচ্ছে তো বলিনি। বলেছি, উপর মহল থেকে চাপ আসছে কেস ক্লোজ করে দেওয়ার জন্য। আমরা তো সরকারি কর্মচারী টাপুর। মাথার উপর যাঁরা বসে আছেন, ইচ্ছেয় হোক, অনিচ্ছেয় হোক, তাঁদের কথা আমাদের মেনে চলতে হয়। আর মানাতে না পারলে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। পুলিশের হাতে অনেক ক্ষমতা, কিন্তু সত্যি বলতে কী, আমরা নেতা মন্ত্রীদের হাতের পাপেট ছাড়া আর কিছু নই। সুতো তাঁদের হাতে’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল অর্জুনদা। তারপর বলল, ‘ঘরে কফি আছে?’
‘আছে,’ বলল টাপুরদি।
‘কড়া করে একটু ব্ল্যাক কফি খাওয়াতে পারো? তাতে যদি মাথাটা ছাড়ে একটু,’ বলে চোখ বুজল অর্জুনদা।
টাপুরদি বলল, ‘তুমি ঘরে গিয়ে একটু শোও। একটু বিশ্রাম করলে হয়তো আরাম পাবে। আমি কফি করে আনছি।’
‘নাঃ, শোব না। এখানেই বসি। তুমি কফি দাও আমায়,’ বলল অর্জুনদা।
টাপুরদি কফি বানিয়ে নিয়ে ফিরে এল কিছুক্ষণ পর। কফির কাপটা টেবিলের উপর রেখে অর্জুনদার সামনে বলল, ‘অর্জুন, আমি বুঝতে পারছি এই কেসটা নিয়ে তোমরা অনেক পরিশ্রম করেছ। এতটা এগোনোর পর এটা বন্ধ করে দিতে হলে তোমাদের কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। তুমি সরকারি কর্মচারী। তোমার হাত বাঁধা, কিন্তু আমার তো তা নয়। আমি তো এগোতে পারি কেসটা নিয়ে। পারি না?’
‘তুমি বুঝতে পারছ না, টাপুর,’ বলল অর্জুনদা, ‘আমাদের কেস ক্লোজ করে দিলে তোমাকে দেওয়া পারমিশনও ফিরিয়ে নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে তুমিই বা কী করে এগোবে? আর তা ছাড়া, আমি জানি তুমি আমায় ভুল বুঝবে, তবু বলছি এই কেসটা ভীষণ বিপজ্জনক। এই কেসে রাজনীতির সব রাঘববোয়ালদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। তাদের ল্যাজে পা পড়লে ওরা তোমাকেও ছাড়বে না। ওরা…’
‘অর্জুন,’ অর্জুনদাকে থামিয়ে দিয়ে বলল টাপুরদি, ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করো তো?’
অর্জুনদা উত্তর না দিয়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
টাপুরদি আবার বলল, ‘আমায় বলো, আমার হাতে আর ক’দিন আছে? কেস ক্লোজ করতে হলে ক’দিনের মধ্যে সেটা করা হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?’
‘অফিশিয়াল কাজকর্ম মিটিয়ে ফাইনাল রিপোর্ট জমা দিতে বড়োজোর দিন চারেক। কারণ সামনে উপনির্বাচন। তার আগে উপর মহল ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে চাইছেন,’ বিমর্ষ মুখে বলল অর্জুনদা।
‘বেশ। আমি তাহলে চারদিন ধরেই এগোচ্ছি। মানে আমাদের হাতে আর চার দিন আছে কোনো এসপার বা ওসপার করার জন্য। শেষ মুহূর্ত অবধি লড়ব অর্জুন। অমিয় চক্রবর্তীর জন্য না লড়লেও তন্ময়ের জন্য লড়ব। তন্ময় খুব বিপদের মধ্যে আছে। আমি ওর কাছে পৌঁছোনোর আগে যদি অম্লান চক্রবর্তী বা সুবিনয় মুখার্জি ওর কাছে পৌঁছে যায়, ওকে বাঁচানো কঠিন হবে।
‘তুমি কি তন্ময়ের লাইফ থ্রেট আছে বলে মনে করছ?’ অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল।
‘মনে করছি না। আমি শিয়োর। আর তন্ময়ও সেটা জানে বলেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে,’ বলল টাপুরদি।
‘কিন্তু কেন? কীসের বেসিসে তুমি এই বিষয়ে শিয়োর হচ্ছ এত? তন্ময়ের পেনড্রাইভ এখন আমাদের কাছে,’ অর্জুনদা কফিতে চুমুক দিয়ে বলল।
‘হ্যাঁ, পেনড্রাইভ তোমার কাছে আছে। কিন্তু সেটা তুমি জানো, আমি জানি, অম্লান চক্রবর্তী বা সুবিনয় মুখার্জি জানেন না। তাই না? আর পেনড্রাইভে যাই থেকে থাকুক সেটা আমরা জানি না। জানেন শুধু তিনজন। অম্লানবাবু, সুবিনয়বাবু আর তন্ময়। সেই তথ্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তার জন্য অম্লান চক্রবর্তী সুবিনয় মুখার্জিকে বিধানসভায় সিট অবধি দিতে পারেন। সুতরাং তাঁদের দুজনের কেউই নিশ্চয়ই চাইবেন না যে সেই সিক্রেটের আর অংশীদার থাকুক।’
‘না টাপুর, তুমি যাঁদের কথা বলছ, তাঁদের মধ্যে একজন রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী, আরেকজন হবু বিধায়ক। তাঁরা এমন রিস্ক নেবেন কেন?’ অর্জুনদা বলল।
‘নেবেন, নেবেন। রিস্ক ওঁরা নেবেন যদি সেই রিস্কটা না নিলে নিজেদের সম্মান হারানোর বা গদি হারানোর ভয় থাকে। যাক গে ছাড়ো, মোট কথা আমাদের হাতে আর চার দিন সময় আছে। তার মধ্যে যা করার করতে হবে,’ টাপুরদি বলল।
‘কী করতে চাও, বলো,’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
‘সনাতন বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করতে চাই,’ স্থির গলায় বলল টাপুরদি।
একটু সময় লাগল মনে করতে, কে এই সনাতন বিশ্বাস। তার পরেই মনে পড়ে গেল, ইনি হলেন সেই বিক্ষুব্ধ বিধায়ক, যিনি দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দিতে চাইছেন। অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর দিন এই সনাতন বিশ্বাসই শেষবারের মতো গিয়েছিল অমিয় চক্রবর্তীর কেবিনে।
অর্জুনদা বলল, ‘সনাতন বিশ্বাস? তোমার মাথা খারাপ? তিনি কেন কথা বলবেন প্রাইভেট ডিটেকটিভের সঙ্গে?’
‘ঠিক,’ বলল টাপুরদি, ‘প্রাইভেট ডিটেকটিভের সঙ্গে কথা বলবেন না। কিন্তু রিপোর্টারের সঙ্গে তো কথা বলবেন। নয়নিকা দাস আর রত্নদীপা নিয়োগীর ছদ্মবেশটার প্রয়োজন আরও একবার পড়বে আমাদের।’
অর্জুনদা বোধ হয় টাপুরদির অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই আজকাল অবাক হওয়াও ছেড়ে দিয়েছে। হেসে নরম গলায় বলল, ‘ধরা পড়লে কী হবে জানো? এত রিস্ক নাও কেন টাপুর? সুবিনয় মুখার্জি আর সনাতন বিশ্বাস কিন্তু এক নন। সুবিনয় মুখার্জি এখনও রাজনীতিতে পুরোপুরি আসেননি। আর সনাতন বিশ্বাস পোড়-খাওয়া রাজনীতিক। আর যতদূর শুনেছি, মেয়েঘটিত ব্যাপারে লোকটার রেকর্ড ভালো নয়। আমি কিন্তু অফ রেকর্ড বলছি। তোমাদের দুজনের যাওয়াটা ঠিক হবে না।’
‘বাহ বাহ তোমার অফ রেকর্ডে বলা সনাতন বিশ্বাসের রেকর্ডখানা ভারি কাজের,’ জোরে জোরে হেসে উঠে বলল টাপুরদি।
‘বি সিরিয়াস টাপুর,’ গম্ভীর গলায় বলল অর্জুনদা, ‘আগুন নিয়ে খেলতে যেয়ো না। সনাতন বিশ্বাস এমনিতেও তোমাকে অম্লান চক্রবর্তীর এগেনস্টে কিছু বলবে বলে মনে হয় না। অমিয় চক্রবর্তী সনাতন বিশ্বাসকে মন্ত্রীসভার লিস্ট থেকে বাদ দিয়েছিলেন। কিন্তু শুনতে পাচ্ছি অম্লান চক্রবর্তীর মন্ত্রীসভায় সনাতন বিশ্বাসকে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। সনাতন বিশ্বাস আরও ক-জন বিধায়ক নিয়ে দল ছাড়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সেটাতেই সম্ভবত কাজ হয়েছে। এই অবস্থায় সনাতন বিশ্বাস অম্লান চক্রবর্তীকে চটাবে না। সুতরাং আমি বলব, তোমরা অন্যভাবে ভাবো। অন্য কোনো দিক দিয়ে এক্সপ্লোর করা যায় কি না সেটা দ্যাখো।’
‘অন্য দিকও আমার ভাবা আছে। সেখানেও যেতে হবে। কিন্তু তার আগে সনাতন বিশ্বাসের সঙ্গে একবার দেখা করব। এনিওয়ে, অন্য দিকের কথা যেটা বললাম, তার জন্য তোমায় আমাকে একটা ঠিকানা আর একজনের সম্পর্কে ডিটেইলস জোগাড় করে দিতে হবে। খুব তাড়াতাড়ি।’
‘কে সে?’ জানতে চাইল অর্জুনদা।
‘একটা মেয়ে। নাম মৌবনী চক্রবর্তী,’ বলল টাপুরদি।
এ আবার কে ঠিক বুঝতে পারলাম না। অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, অর্জুনদা স্থিরদৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
