১
দুপুরের পর থেকেই আকাশের মুখ গোমড়া ছিল। চৈত্রের দুপুরের পিচগলা রোদ্দুর হঠাৎই তার তীব্রতা হারিয়ে ধূসর চাদরে মুখ ঢেকেছিল কে জানি কী অভিমানে। দেওয়াল ঘড়ির কাঁটা এখন সন্ধে ছ’টা পেরিয়েছে। পার্টির প্রধান কার্যালয়ের তিন তলার কাচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে রাস্তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে ছিলেন অমিয় চক্রবর্তী। ক’দিন থেকে মন বড়ো অস্থির অমিয়বাবুর। সারাজীবনে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা তিনি অতিক্রম করেছেন, অনেক লড়াই লড়েছেন। আজ তিনি যেখানে আছেন, সেখানে সকলে পৌঁছোতে পারে না। এর জন্য অনেক ত্যাগ দরকার, দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা দরকার। সুদীর্ঘকাল বিরোধী দলে থেকে নেতৃত্ব দিতে হলে শক্ত স্নায়ুর প্রয়োজন। রাজনীতির পথ সহজ নয়। ন্যায়-অন্যায়, পাপ-পুণ্যের স্রোতে মন টালমাটাল হলে মনকে চোখ পাকিয়ে শাসন করতে হয়। দুর্বলতার কোনো জায়গা নেই এখানে। কত বার ক্ষমতাসীন দল থেকে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রস্তাব দিয়ে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি যাননি। কারণ শুরু থেকে তিনি খুব স্পষ্টভাবে জানতেন তিনি আসলে কী চান। এই দলকে টিকিয়ে রাখার জন্য, খারাপ সময়ে দলীয় কর্মীদের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য কী-ই না করেছেন তিনি?
আজ তাঁর সারাজীবনের স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। পথটা সহজ ছিল না। ঘরে-বাইরে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাত দিতে হয়েছে। এতদিনের পরিশ্রমের ফল তিনি পেয়েছেন। সুদীর্ঘ আঠাশ বছর ধরে যে লড়াই তিনি লড়ে এসেছেন, আজ তা সফল। বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে তাঁর দল। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। তিনি মানুষকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাতে পেরেছেন। তিনি দক্ষ রাজনীতিক, জানেন দিনের শেষে স্বপ্নই জিতে যায়। স্বপ্ন পূরণের আশা হয়তো রাখে মানুষ, শর্ত রাখে না কেউ। অমিয়বাবু রাজ্যবাসীর কাছে সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে এসেছিলেন।
কাল তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান, রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন অমিয় চক্রবর্তী। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর নিজের লড়াইটা জিততে। আজ তিনি জয়ী। রাজ্যবাসী খুশি, দলীয় কর্মীরা খুশি। কিন্তু তবু অমিয়বাবু খুশি হতে পারছেন না কেন? কেন তাঁর মনে হচ্ছে, কোথাও যেন তাল কেটে গেছে? তাঁর ভাগ্য যেন আজ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে অট্টহাসি হাসছে। যে অতীতকে কবরে পুরে এত বছর নিশ্চিন্ত ছিলেন, সেই অন্ধকার অতীত আজ তাঁর ও তাঁর সাফল্যের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ এ-রকম হওয়ার তো কথা ছিল না।
সেই যৌবনে যখন রাজনীতিতে দীক্ষা নিয়েছিলেন অমিয় চক্রবর্তী, সেই সময় তাঁর গুরু রথীন ঘোষ বলেছিলেন, ‘আর যাই করো বাপু, কাউকে বিশ্বাস করবে না। রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করা চলবে না।’ সেই নীতিই তো তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছিলেন এত বছর ধরে। এত দলীয় কর্মীদের সঙ্গে এত বছর ওঠ-বস করেছেন, তাদের চালনা করেছেন, কিন্তু বিশ্বাস কাউকে করেননি। অবশ্য সেটা বুঝতেও দেননি কাউকে। নেতা হিসেবে তিনি সফল। তাই আজ এতটা পথ পার করে এসে আর ভুলের অবকাশ নেই। বিশ্বাস তিনি করেন না কাউকে করবেনও না। তিনি জানেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে এই ভুলের চরম মূল্য চোকাতে হবে তাঁকে। আর ফেরবার উপায় নেই তাঁর। একটা দীর্ঘশ্বাস তাঁর বুক ঠেলে বেরিয়ে এল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
বড়ো সেক্রেটারিয়েট টেবিলে এসে বসলেন তিনি। আজ তিনি অফিসের সকলকে ছুটি দিয়েছেন। আজ শেষবারের মতো এই অফিসে তিনি একা কাটাতে চান। দুই যুগের অনেক বেশি সময় ধরে এই ঘর, এই টেবিল তাঁর সাম্রাজ্য। এখানে বসেই কত মিটিং করেছেন তিনি, কত কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন। এই ঘরের সঙ্গে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তাঁর। এই ঘরেই তো…! কাল থেকে তাঁর নতুন অফিস হবে, যে অফিসে একদিন মাথা উঁচু করে ঢোকার স্বপ্ন তিনি এতগুলো বছর ধরে লালন করেছেন সংগোপনে। মুখ্যমন্ত্রীর কেবিনে তাঁর নামের নেমপ্লেট সাজানো থাকবে। এই রাজ্যের সর্বোচচ ক্ষমতা থাকবে তাঁর করায়ত্ত। সবই যখন একদম ঠিক পথে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই কেন এল এই ঝড়? এর থেকে কীভাবে বেরোবেন অমিয়বাবু? একটা ছোট্ট ভুলের জন্য তাঁর এতদিন ধরে তিন তিল করে গড়ে তোলা ভাবমূর্তি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে? ভুলই তো, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে সমস্যাটাকে জিইয়ে রাখার ভুল। ঊনত্রিশ বছর আগে সেদিনই যদি সমূলে উপড়ে দিতেন সমস্যার শেকড়, তাহলে আজ এই দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটাতে হত না তাঁকে। কিন্তু, ব্যবস্থা আজই নেবেন অমিয়বাবু, নইলে আজ যারা তাঁকে মাথায় তুলে জয়ধ্বনি দিচ্ছে, কাল তারাই তাঁর গায়ে থুতু ছেটাবে। ন্যায়মূর্তি, সততার প্রতীক অমিয় চক্রবর্তীর মুখটা তখন সকলের কাছে মুখোশ বলে মনে হবে। লক্ষ লক্ষ হাত, নখ, দাঁত এগিয়ে আসবে সেই মুখোশটা টেনে ছিঁড়ে দেওয়ার লক্ষ্যে। সকলকে কী জবাবদিহি করবেন অমিয় চক্রবর্তী?
মাথার ভিতর তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে অমিয় চক্রবর্তীর। ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন অমিয়বাবু। ফ্লাস্কে তাঁর স্পেশাল দুধ চিনি ছাড়া কালো চা সবসময়ই তৈরি থাকে। শেষ হতেই কেউ না কেউ ভরে রেখে যায়। আজ বিকেলের পর থেকে কাজ গোটানোর চাপে আর চা খাওয়া হয়নি। তাই বোধ হয় মাথাটা দপ দপ করছে। কাপে ঢেলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন তিনি। নতুন মন্ত্রীসভায় কাদের কোন পদ দেবেন, সেই নিয়ে একের পর এক মিটিং করতে হয়েছে। এমনিতেই অমিয়বাবু হাই ব্লাডপ্রেশারের রোগী। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। মাইগ্রেনের সমস্যাও আছে। যাই হোক, আজ আর সেসব সমস্যা নিয়ে ভাবনা নেই। ধীরে ধীরে আয়েশ করে চা-টা শেষ করলেন তিনি। তারপর পকেট থেকে চাবি বার করে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ড্রয়ারটা খুললেন অমিয়বাবু। ফাইলপত্রের নীচে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে তাঁর ছোট্ট কালো কুচকুচে প্রিয় অস্ত্রটা। হাতে তুলে নিয়ে সেটার গায়ে আদর করে হাত বোলালেন তিনি। লোড করলেন যত্ন নিয়ে। ব্যারেলের মাথায় সেট করলেন সাইলেন্সার। তারপর নিজের মাথার এক পাশে ঠেকালেন সেটা। সামনে জানালার কাচে নিজের প্রতিফলনের দিকে চেয়ে রইলেন একদৃষ্টিতে। ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল তাঁর। কোনো প্রমাণ রাখা চলবে না। সেই ব্যবস্থা অবশ্য তিনি করেই রেখেছেন। আর ঘণ্টা দুয়েক। তারপর সব শেষ।
২
সারা সপ্তাহের অফিস শরীর মনের সব শক্তি নিংড়ে নেয়। শনিবারের সকালটাতে আমি সারা সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি সুদে-আসলে উসুল করে নিতে চেষ্টা করি। অবশ্য অভ্যেস বশে ঘুমটা যথারীতি সাতটাতেই ভেঙে যায় রোজ। তারপর আমি পাশ ফিরে শুয়ে আবার নিদ্রাদেবীর আরাধনা শুরু করি। আরেক রাউন্ড ঘুম শেষ করে সাড়ে ন’টা নাগাদ বিছানা ছাড়ি।
আজও সেরকমই ইচ্ছে ছিল। সেইমতো পাশ ফিরে পায়ের কাছে অবহেলায় পড়ে থাকা চাদরটা টেনে নিয়ে চোখ বুজেছিলাম। এমন সময় বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। ঘুমচোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নামটা দেখলাম, টাপুরদি। ব্যস, বেজে গেল ঘুমের বারোটা। এখনই এত বেলা অবধি বিছানায় শুয়ে থাকার জন্য এক পশলা জ্ঞান বর্ষণ হবে। ফোনটা স্পিকারে দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজলাম আমি। ফোনের ও প্রান্তে টাপুরদির উত্তেজিত কণ্ঠে শুনতে পেলাম, ‘মিতুল, আজ সকালে নিউজ দেখেছিস?’
বালিশ থেকে মুখ না তুলেই জবাব দিলাম, ‘সকাল সাড়ে সাতটাই তো বাজে। এত সকালে কে টিভি চালায় টাপুরদি?’
‘তাড়াতাড়ি টিভিতে যেকোনো নিউজ চ্যানেল চালা। আমি ধরছি’, বলল টাপুরদি।
আর কী? টাপুরদির আদেশের পরও শুয়ে থাকা সম্ভব নয় কোনোমতেই। সুতরাং ব্যাজার মুখে উঠে আমার বেডরুমের টিভিটা চালালাম। এটা আমি দুই মাস হল কিনেছি। ড্রয়িংরুমে টিভি আছে বটে, তবে আজকাল রাত জেগে কিছু ওয়েব সিরিজ দেখি মাঝে মাঝে। কনটেন্টের জন্য সেসব ড্রয়িংরুমে বসে দেখাটা একটু মুশকিল হয়ে যায়। সন্ধে থেকে মায়ের সিরিয়াল চলতে থাকে একের পর এক। তাই অফিস থেকে ফিরে নিজের ঘরে এক কাপ চা নিয়ে জম্পেশ করে বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে নিজের ইচ্ছেমতো টিভি দেখার মজাই আলাদা।
টিভিতে নিউজ চ্যানেল চালাতেই খবরটা দেখলাম। রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী অমিয় চক্রবর্তীকে তাঁর অফিসে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী সুনয়নাদেবী ফোনে তাঁকে না পেয়ে অফিসের নম্বরে ফোন করেন। ফোন বেজে যায়, কেউ ধরে না। তারপর অমিয়বাবুর সেক্রেটারি মনোময় মজুমদার অমিয়বাবুর বাড়িতেই থাকেন। সেদিন তিনি তখনও বাড়ি ফেরেননি। তাঁকে ফোন করেন সুনয়নাদেবী। তাঁর থেকেই জানতে পারেন তিনি আজ সকলকে ছুটি দিয়েছেন। মনোময়বাবু অফিসের সিকিউরিটিকে ফোন করে নিজেও রওনা দেন অফিসে। অফিসে পৌঁছে দেখেন সিকিউরিটি অফিসার সমেত আরও দুই-তিনজন গার্ড অমিয়বাবুর কেবিনের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ডাকাডাকি করেও ভিতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। দরজা ভেঙে দেখা যায় অমিয়বাবু চেয়ারে বসে আছেন সামনের টেবিলে মাথা রেখে, প্রাণহীন দেহ। দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
খবরটা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। ভুলেই গিয়েছিলাম টাপুরদি ফোন ধরে আছে। মনে পড়তেই ফোনটা তুলে কানে লাগালাম।
‘হ্যালো, টাপুরদি?’
‘হ্যাঁ, দেখলি নিউজটা?’ উত্তেজিত গলায় জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘হ্যাঁ,’ বললাম আমি, ‘আজই তো মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল। তার আগেই…?’
‘সেটাই তো! কাল রাতে সাড়ে বারোটা নাগাদ অর্জুন ফোন করেছিল। তখনই সব জানতে পারি,’ বলল টাপুরদি। আমার শুনে একটু অভিমান হল। কাল রাতে জেনেও আমায় আজ সকালে জানাল টাপুরদি। সেটা মুখে প্রকাশ না করে বললাম, ‘কিন্তু এ-রকম হাই প্রোফাইল কেসে তো তোমার কিছু করার নেই। হয়তো ডিরেক্ট সিআইডির হাতে যাবে কেসটা। ফ্যামিলি সিবিআই তদন্তও ক্লেম করতে পারে। তা তোমার কী মনে হয়? নর্মাল ডেথ না মার্ডার?’
‘সেটা কী করে বলি রে? বডি তো আর আমি দেখিনি। পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এলে জানা যেতে পারে। তবে অর্জুনের কাছে শুনলাম শরীরে কোনো ক্ষতচিহ্ন নেই। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার জানিস? অর্জুন বলল, টেবিলের উপর লোডেড রিভলভার রাখা ছিল একটা, সাইলেন্সার লাগানো।’
‘সে কী? ব্যাপারটা তাহলে বেশ ফিশি, কী বলো?’
‘হুম। ফিশি তো বটেই। তবে আমার মাথা ঘামিয়ে লাভ কী?’ বলল টাপুরদি। আমি ফোনের ওপ্রান্ত থেকে টাপুরদির দীর্ঘশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম। হেসে বললাম, ‘কী আর করবে? বাড়িতে বসে মাথা ঘামাও। হাতে এখন কেস তো কিছু নেই আপাতত।’
‘কে বলল নেই?’ টাপুরদি গম্ভীর গলায় বলল।
‘আছে?’ লাফিয়ে উঠলাম আমি, ‘কী কেস? কবে এল?’
‘আসেনি এখনও, আসবে। আজ সকাল সাড়ে ন’টায়। কাল বিকেলে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছেন একজন। নাম বলল রিদ্ধিমা দেশাই। আজ সকালে আসবেন। কী কেস, সেটা তিনি এলেই জানতে পারব। তুই চলে আয় চটপট। ব্রেকফাস্ট এখানে করবি,’ বলে কটাস করে ফোনটা কেটে দিল টাপুরদি। আর শুয়ে থাকার উপায় নেই। সুতরাং বিছানা ছাড়তেই হল।
টাপুরদির ফ্ল্যাটে যখন পৌঁছোলাম, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক পৌনে ন’টা বাজে। কলিংবেল টিপতে টাপুরদি দরজা খুলল। দেখে বুঝলাম, সকাল সকাল ব্যায়াম সেরে স্নান করে নিয়েছে টাপুরদি। রান্নাঘর থেকে সরষে কারিপাতা ফোড়নের গন্ধ ভেসে আসছে।
‘কী বানাচ্ছ গো?’ জিজ্ঞাসা করলাম।
‘চিঁড়ের পোলাও,’ বলে রান্নাঘরে ঢুকে গেল টাপুরদি। বসার ঘরের টিভিতে নিউজ চলছে। একই খবর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখানো হচ্ছে বার বার। টাপুরদি ট্রেতে সাজিয়ে দুজনের চিঁড়ের পোলাও আর দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা দার্জিলিং চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। খেতে খেতে নিউজ চ্যানেলে চোখ রেখে বলল, ‘আজ অমিয় চক্রবর্তীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল। তাহলে গতকাল তো অনেক কাজ থাকার, অনেক লোকজন দেখা করতে আসার কথা। সেক্ষেত্রে বিকেলে সকলকে অফিস থেকে ছুটি দিয়ে তিনি একা অফিসে রয়ে গেলেন কেন বল তো?’
‘কে জানে? কী চলছিল ভদ্রলোকের মনে সে আর এখন কী করে জানা যাবে?’ বললাম আমি, ‘বাই দ্য ওয়ে, চিঁড়ের পোলাওটা বেড়ে হয়েছে।’
‘হুম,’ অন্যমনস্কভাবে বলল টাপুরদি। খাওয়া শেষ করে প্লেট-টেট গুছিয়ে রান্নাঘরে রেখে এলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি এমন সময় কলিংবেলটা বেজে উঠল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম ন’টা পঁচিশ বাজে। অর্থাৎ আমাদের অতিথি ‘বিফোর টাইম’ পৌঁছে গেছেন।
৩
ভদ্রমহিলার বয়স ঊনত্রিশ-ত্রিশ হবে। প্রথম দর্শনে কেমন যেন চেনা ঠেকল। ছিপছিপে সুন্দরী, দীর্ঘাঙ্গী, বেশ তরতরে ধারালো মুখ, একবার দেখলে দ্বিতীয়বার ঘুরে দেখতে ইচ্ছে হয়। ঘরে ঢুকে আমাদের দিকে তাকিয়ে দুই হাত জোড় করে নমস্কার করল। তারপর ঝরঝরে বাংলায় বলল, ‘আমার নাম রিদ্ধিমা দেশাই। আমিই কাল ফোন করেছিলাম। আপনাদের মধ্যে মিস ব্যানার্জি কে?’
টাপুরদি হেসে বলল, ‘আমিই সংঘমিত্রা ব্যানার্জি। আমার সঙ্গেই কথা হয়েছে আপনার। এ হল মৈথিলী সেন, আমার বন্ধু তথা সহকারী। এর সামনে নির্দ্বিধায় সব বলতে পারেন আপনি।’
রিদ্ধিমা একবার দ্বিধাভরে আমার দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘আমার সমস্যাটা একটু অদ্ভুত। বুঝতে পারছি না, ঠিক কী বলি আপনাকে।’
‘আপনি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন যা বলতে চান। ডোন্ট ওয়ারি, আমরা আপনাকে জাজ করব না,’ হেসে রিদ্ধিমা দেশাইকে আশ্বস্ত করল টাপুরদি।
রিদ্ধিমা বলতে শুরু করল, ‘আমি জন্মসূত্রে গুজরাটি বাবার মেয়ে হলেও এখানেই বড়ো হয়েছি। কারমেল কনভেন্টে লেখাপড়া করেছি। উনিশ বছর বয়সে যখন আমি কলেজের ফার্স্ট ইয়ার, সেই সময়ে কলকাতার একটা বিউটি পিজেন্ট জিতি। তারপর থেকে টুকটাক মডেলিং করতাম। টেলিভিশন, ফিল্মে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমার চেহারাটা ঠিক গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের মতো নরম-সরম নয়। তাই অভিনয় লাইনে সফল হতে পারিনি। খুব বেশি চেষ্টাও যে করেছিলাম, তাও নয়। আমার মা ছিলেন সিঙ্গল পেরেন্ট। আমার জন্মের পর পরই বাবার সঙ্গে মার ডিভোর্স হয়ে যায়। তারপর মা আমায় নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, আমার মা কিন্তু বাঙালি।’
‘বাবাকে আমি দেখিনি। স্কুলের ফাইলে অভিভাবকের নামের জায়গায় মায়ের নামই ছিল। তবে বাবার পরিচয় আমি জানতাম, মা লুকোননি কখনো। বাবা আমাদের খোঁজ নেননি কোনোদিন।
ডিভোর্সের পরে মাও তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেননি। বাবা এখন বিবাহিত, এই পক্ষের ছেলে-মেয়ে আছে। আমার সঙ্গে তাঁর কোনোরকম যোগাযোগ কখনো হয়নি। আমি তাঁকে চোখেও দেখিনি। তবে মায়ের কাছে ছোটোবেলায় ছবি দেখেছিলাম।’
‘হুম, এবার বলুন আপনার সমস্যাটা কী?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘বছর দুই আগে আমার মা মারা যান। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, হসপিটালে নিয়ে যাওয়ারও সময় পাইনি। আমি একাই থাকি। আমার এক বয়ফ্রেন্ড আছে, সে মাঝে মাঝে এসে আমার ফ্ল্যাটে থাকে; একটি সিকিউরিটি এজেন্সিতে চাকরি করে। ওর নাম তন্ময়।’
‘এবার আসি আসল কথায়। ইলেকশনের আগে থেকে তন্ময়দের এজেন্সির কাজের চাপ বেশ বেশি ছিল। সবাই বুঝতে পারছিল, এবারের ইলেকশনের রেজাল্ট অন্যরকম হবে। একটা বড়োসড়ো বদল আসতে যাচ্ছে। ওদের এজেন্সির ক্লায়েন্টরা সমাজের উঁচুতলার লোক। অভিনেতা থেকে শুরু করে নেতা, শিল্পপতি সকলেই রয়েছে সেই তালিকায়। অনেক পলিটিশিয়ানরা নিজেদের সরকারি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও পরিবারের জন্য বেসরকারি সুরক্ষা হায়ার করেন ওদের এজেন্সি থেকে। স্বাভাবিকভাবেই ইলেকশনের আগে কাজের প্রেশার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেশি থাকে। ইলেকশনের কিছুদিন আগে থেকে তন্ময়কে কেমন যেন অন্যরকম লাগছিল। সবসময় অন্যমনস্ক, বড্ড বেশি গম্ভীর। ওর উদবেগের কারণ জিজ্ঞাসা করলে উত্তর পেতাম না, একটুতেই রেগে যেত। যেসব রাতে ও আমার ফ্ল্যাটে থাকত, দেখতাম সারারাত ছটফট করছে। মাঝরাতে দেখতাম ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে।’
‘ইলেকশনের সপ্তাহখানেক আগে রাত দুটো নাগাদ আমার ফ্ল্যাটে এল তন্ময়, হাতে একটা ছোটো ট্রলিব্যাগ। দেখে মনে হচ্ছিল কোথাও যাচ্ছে ও। মুখ দেখে মনে হল কোনো কারণে খুব ভয় পেয়েছে। এসে বলল, ‘আজকের রাতটা থাকব এখানে। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবে না আমি এখানে আছি।’ অবাক হয়েছিলাম, কিন্তু বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করিনি আর। সেদিন ভোর সাড়ে চারটা নাগাদ ওর মোবাইলে একটা ফোন এল। তড়িঘড়ি ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেল কিছু না বলে। সেই ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। তারপর দেড় মাস কেটে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও ওর কোনো খোঁজ পাইনি। ওর ফোন সুইচড অফ। ওর কলিগদের কাছে খবর নিয়ে জেনেছি অফিসেও যাচ্ছে না। ওরও আমার মতোই কেউ নেই। এক দিদি ছিল, বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন। দিদির সঙ্গে একেবারেই অ্যাটাচমেন্ট নেই। আমার ভয় হচ্ছে ও কোনো বিপদে পড়েছে। কিছু হয়েছে ওর।’
‘পুলিশের কাছে যাননি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘গিয়েছি তো। লোকাল থানায় ডায়েরিও করেছি। ওরা খুব বেশি গুরুত্ব দিল বলে মনে হল না। সবাই ভোট নিয়ে ব্যস্ত ছিল এতদিন। বলল, খবর পেলে জানাবে। এভাবে হাত গুটিয়েও বসে থাকতে পারছি না। তাই আপনার কাছে এলাম,’ বলল রিদ্ধিমা।
‘হুম,’ গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবল টাপুরদি। তারপর বলল, ‘আপনি কী করেন? মানে প্রফেশন কী আপনার? মডেলিং?’
‘না, মডেলিং টুকটাক করি। সেটা আমার আসল প্রফেশন নয়। আমার মা ছিলেন একটি বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিকের জার্নালিস্ট। মার ইচ্ছেতেই জার্নালিজম নিয়ে পড়েছিলাম। আমিও ফ্রিল্যান্সিং করি বেশ কয়েকটি নিউজপেপারে। মার ইন্টারেস্ট ছিল পলিটিক্স, আমি অবশ্য আমার মডেলিং কন্ট্যাক্ট ইউজ করে পেজ থ্রি করি।’
‘ও আচ্ছা। আপনি একটু মনে করার চেষ্টা করে দেখুন তো, তন্ময় আপনাকে এমন কিছু বলেছিল, বা আপনি এমন কিছু লক্ষ করেছিলেন যেটা এই কেসে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে,’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘না মিস ব্যানার্জি। গত কয়েকদিনে আমি অনেক ভেবেছি। ওর দুজন কলিগের সঙ্গেও কথা বলেছি। কেউ কিছুই বলতে পারছে না,’ বিমর্ষ মুখে বলল রিদ্ধিমা।
‘ওকে। তন্ময়বাবু এজেন্সিতে কী কাজ করত আপনি জানেন?’
‘হ্যাঁ জানি। আগে ও ইন্টারনাল এনকোয়ারি সংক্রান্ত রেকর্ডস রাখত। গত বছর প্রোমোশন হল। সিক্রেট ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টে চলে আসে। বিভিন্ন ইনভেস্টিগেশনে পার্টিসিপেট করত। একটু বুঝিয়ে বলি। আসলে এই ধরনের হাই প্রোফাইল এজেন্সিগুলোতে শুধু ক্লায়েন্টদের সিকিউরিটিই প্রোভাইড করা হয় না, সিকিউরিটি ডিসপিউটস, প্রোবাবল থ্রেটস, এ ছাড়া ক্লায়েন্ট রিকোয়ারমেন্ট অনুসারে বিভিন্ন ইনভেস্টিগেশনও টেক আপ করে থাকে ওরা। সেই সেকশনেই কাজ করত তন্ময়।’
‘ইন্টারেস্টিং! তন্ময়বাবুর ফ্ল্যাটে তিনি একাই থাকতেন তো? সেই ফ্ল্যাটের চাবি পাওয়া যাবে? একবার সেখানে যেতে পারলে ভালো হত।’
‘আমার কাছে একটা ডুপ্লিকেট চাবি আছে। কখন যেতে চান বলুন,’ জিজ্ঞাসা করল রিদ্ধিমা।
‘আজই। বিকেল পাঁচটা নাগাদ। আপনি আমায় অ্যাড্রেস আর তন্ময়বাবুর একটা ছবি হোয়াটস্যাপ করবেন,’ টাপুরদি বলল।
৪
‘কেসটা কিন্তু বেশ কমপ্লিকেটেড,’ আমি বললাম, ‘এজেন্সির ভিতরে ইনভেস্টিগেট করবে কী করে? ওরা তোমায় ভিতরে ঢুকতেই দেবে না।’
রিদ্ধিমা দেশাই চলে গেছেন কিছুক্ষণ হল। আমি আর টাপুরদি চায়ের কাপ নিয়ে বসেছি। টাপুরদি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, ‘কমপ্লিকেটেড তো বটেই। সেইজন্যই চ্যালেঞ্জটা নিতে ইচ্ছে হল। জানি, কোনো কিছুই সহজ হবে না। তবু একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী?’
‘আমার কিন্তু রিদ্ধিমা দেশাইকে দেখেই খুব চেনা চেনা লাগছিল। পরে মনে হল, মডেল যখন, কোনো অ্যাডে দেখে থাকতে পারি,’ বললাম আমি।
‘সেটাই স্বাভাবিক,’ বলল টাপুরদি। তারপর রিমোট দিয়ে টিভিটা অন করল। সংবাদ উপস্থাপিকা সপ্রতিভ ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছে, কাল কীভাবে অমিয় চক্রবর্তীর দেহ উদ্ধার হয় তাঁর নিজের অফিসের বন্ধ কেবিন থেকে। দেহ পোস্ট মর্টেমের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দলীয় ও বিরোধী দলের বিভিন্ন নেতারা গম্ভীর মুখে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। সকলেই যেন বক্তব্য রাখার ব্যাপারে একটু বেশি সাবধানি এই মুহূর্তে। দিল্লি থেকে প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছেন, এবং অমিয়বাবুর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। অমিয় চক্রবর্তীর স্ত্রী সুনয়না চক্রবর্তী কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারাচ্ছেন বার বার। তিনি সাংবাদিকদের সামনে আসতে অপারগ। তবে অমিয়বাবুর ছেলে অম্লান চক্রবর্তী সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন কেন্দ্রের কাছে। আশা করা যাচ্ছে কেন্দ্র তাঁর দাবি মেনে নিয়ে অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু রহস্য উৎঘাটনের দায়িত্ব সিবিআইকে সমর্পণ করবে শীঘ্রই।
‘ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ফিশি, টাপুরদি। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, অথচ অমিয়বাবু মৃত। হাতের সামনে লোডেড রিভলভার, অথচ মৃতদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এলে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হবে,’ বললাম আমি।
‘বেল পাকলে কাকের কী?’ গম্ভীর মুখে বলল টাপুরদি। বুঝলাম কেসটা নিয়ে টাপুরদি যথেষ্ট কৌতূহলী। অথচ এখানে ওর কিছুই করার নেই শুধু টিভিতে খবর দেখা ছাড়া।
বিকেল ঠিক পৌনে পাঁচটা নাগাদ আমরা তন্ময়ের বিল্ডিংয়ের নীচে পৌঁছোলাম। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই রিদ্ধিমা এল সেখানে। আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অপ্রস্তুত মুখে বলল, ‘অনেকক্ষণ এসেছেন? সরি একটু লেট হয়ে গেল।’
টাপুরদি মৃদু হেসে বলল, ‘না না, ঠিক আছে। আমরাও এই এলাম। চলুন উপরে যাওয়া যাক।’
গেট দিয়ে ঢুকে কার পার্কিংয়ের সামনেই লিফট। তিনজনে লিফটে উঠলাম। রিদ্ধিমা পাঁচ নম্বরের সুইচ টিপল। লিফট দিয়ে উঠে ফিফথ ফ্লোরে লিফটের বাঁ-দিকের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাগ থেকে চাবি বার করল রিদ্ধিমা। চাবি ঘুরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই থমকাতে হল। ফ্ল্যাটের অবস্থা দেখে মনে হল ভিতরে যেন ঝড় বয়ে গেছে। জিনিসপত্র সব ওলটপালট, বিছানার তোশক বালিশ কেউ যেন প্রবল আক্রোশে ধারালো কিছু দিয়ে ফালা ফালা করেছে। ওয়ার্ডড্রোবের জামাকাপড় সব মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার পুরোটা খুলে উলটে পড়ে আছে। টেবিলের উপর রাখা একটা ফোটো ফ্রেম থেকে ফোটো খুলে পড়ে আছে নীচে। রিদ্ধিমা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সারা ঘরে চোখ বুলিয়ে ধপ করে বিছানার উপর বসে পড়ল। মৃদু কম্পিত স্বরে বলল, ‘এসব কী? হে ভগবান!’
টাপুরদি কোনো উত্তর না দিয়ে নীচু হয়ে মেঝে থেকে ফোটোটা কুড়িয়ে নিল। সাদা-কালো পুরোনো ছবি। এক ভদ্রমহিলার কোলে একটি তিন-চার বছরের ছেলে। ছবিটা রিদ্ধিমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা কার ছবি? তন্ময়ের?’
রিদ্ধিমা উপরে-নীচে মাথা নাড়ল। বলল, ‘ইনি তন্ময়ের মা। খুব কম বয়সে মারা যান। ওর বাবা অবশ্য আরও আগেই মারা গিয়েছিলেন।’
‘আপনি বলেছিলেন, ওর দিদি আছে। তাঁর কাছে খবর নিয়েছিলেন? সেখানে যায়নি তো তন্ময়?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘না,’ মাথা নেড়ে বলল রিদ্ধিমা, ‘দিদি তন্ময়ের চেয়ে বয়সে প্রায় চোদ্দো বছরের বড়ো। তন্ময়ের যখন মাত্র আট বছর বয়স, তখন দিদি বিয়ে হয়ে জামসেদপুরে শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। তন্ময়ের মা মারা যান যখন, তন্ময় সবে পনেরো। ওর আর কেউ ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই দিদির কাছে গিয়ে ছিল বছরখানেক। আমায় পরিষ্কার করে কখনো কিছু না বললেও জানি, সেখান থেকে নিজেই চলে আসে ও। কেন, কী হয়েছিল আমি কখনো জিজ্ঞাসা করিনি। ও দিদির ব্যাপারে কথা বলতে চাইত না। ওর মনের দুর্বল জায়গায় আঘাত দিতে চাইনি। দিদি জামাইবাবু বাবা-মায়ের প্রপার্টি বিক্রিবাটা করে ওর নামে সামান্য কিছু টাকা ব্যাঙ্কে রাখার ব্যবস্থা করে, বাকিটা পুরোটাই নিজেরা আত্মসাৎ করে নিয়েছিল। সেই ব্যাঙ্কের জমানো টাকা দিয়ে তন্ময়ের লেখাপড়ার খরচ চলে। কলেজে থাকতেই নিজে টুকটাক রোজগার করতে শুরু করেছিল ও। নিজের খরচটুকু উঠে আসত। দিদিকে ও ঘৃণা করে। আর যাই হোক, দিদির কাছে যাবে না ও।’
‘হুম,’ চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল টাপুরদি। বলল, ‘ব্যাপারটা ক্রমেই ঘোরালো হয়ে উঠছে। তন্ময়ের ঘরে কেউ অবশ্যই ঢুকেছিল, তোলপাড় করে কিছু খুঁজেছে। কী খুঁজেছে, সেটা আদৌ পেয়েছে কি না আমরা জানি না। কিন্তু সব দেখে মনে হচ্ছে, তন্ময় কোনো বড়োসড়ো বিপদের মধ্যে ছিল। রিদ্ধিমা, আমার মনে হয় আপনার এখনই পুলিশকে সব জানানো উচিত। আই মিন, ঘরের এই অবস্থার কথা পুলিশকে জানান। কিছু ব্যাপারে পুলিশের সাহায্য ছাড়া এগোনো সম্ভব নয়। বুঝতেই পারছেন, পুলিশের যতটা রিচ আছে, সেটা আমাদের প্রাইভেট ডিটেকটিভদের নেই।’
বিমর্ষ মুখে মাথা নাড়ল রিদ্ধিমা। মাথা নীচু করে বলল, ‘আমার খুব ভয় করছে মিস ব্যানার্জি। মনে হচ্ছে তন্ময় সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছে। ওর কিছু হয়নি তো? মানে, ও বেঁচে আছে তো?’
টাপুরদি চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল। বলল, ‘এই ঘর দেখার পর আমার মনে হচ্ছে, কিছু লোক তন্ময়ের কাছ থেকে কিছু চাইছে। যার জন্য তন্ময় এখান থেকে পালিয়ে গেছে। সেই জিনিসটা হাতে না পাওয়া অবধি ওরা তন্ময়কে মারবে না। কিন্তু সেটা কী জিনিস, এবং কারা সেটা খুঁজছে তা না জানা অবধি এগোনোটা মুশকিল। লেট’স সার্চ। যদিও যারা খুঁজতে এসেছিল, তারা ঘরের কোনো কোনাই ছাড়েনি। তবু অধিকন্তু ন দোষায়।’
পরবর্তী প্রায় চল্লিশ মিনিট সময় আমরা তিনজনে মিলে সারা ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। মাঝে একবার একটা ফোন আসতে রিদ্ধিমা ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। আমি আর টাপুরদি দরজা খুলে বাথরুমে উঁকি দিলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, কমোডের পাশে পড়ে আছে অনেকটা কাগজ পোড়া ছাই। লক্ষ করলাম টাপুরদি নির্লিপ্ত মুখে সেটা নাড়াঘাটা করতে করতে সবুজ রঙের কিছু একটা জিন্সের পকেটে চালান করল। আমিও কিছু দেখিনি ভাব করে বেরিয়ে এলাম বাথরুম থেকে। ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রিদ্ধিমা কিছুটা উত্তেজিত ভঙ্গিতে ঘরে এসে ঢুকল। আমরা দুজনেই তার দিকে তাকালাম। রিদ্ধিমা ক্রমান্বয়ে আমাদের দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তন্ময়ের কলিগ রূপম ফোন করেছিল। ও বলছে, তন্ময় নাকি ওদের এজেন্সির কিছু সিক্রেট ডকুমেন্টস চুরি করে পালিয়েছে। আপনি বিশ্বাস করুন মিস ব্যানার্জি, তন্ময়কে আমি চিনি, ও এ-রকম করতে পারে না। সামথিং মাস্ট বি ভেরি রং, মিস ব্যানার্জি। দেয়ার মাস্ট বি সাম সর্ট অফ কন্সপিরেসি এগেন্সট হিম!’
রিদ্ধিমাকে দেখে মনে হল ও রীতিমতো ভেঙে পড়েছে। টাপুরদিকেও কিছুটা চিন্তিত দেখাল। একটু ভেবে টাপুরদি বলল, ‘দেখুন রিদ্ধিমা, তন্ময়কে খুঁজে বার করতে হলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে, কী চুরি করেছে ও? কেন এভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছে? সেজন্য আমাদের রূপমের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আপনি সেই ব্যবস্থা করতে পারবেন তো? আর এই দেখা হওয়ার ব্যাপারটা যেন গোপন থাকে সেটা দেখবেন।’
রিদ্ধিমা ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাল। ওর দু’চোখে জল টলটল করছে।
