২৫
সেদিন আমরা সামনে দিয়ে ঢুকে বসার ঘরে বসেছিলাম। এই ঘরটা পেছন দিকে একটা শোওয়ার ঘর। আসবাব খুব বেশি নেই। মোবাইল ফোনের আলোতে যেটুকু দেখা যায়, তাতে মনে হল এটা সম্ভবত রেখাদেবীর নিজের শোওয়ার ঘর ছিল। দেয়ালে তাঁর স্বামীর একটি বাঁধানো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি টাঙানো। একটা ডাবল বেডের খাট ছাড়া একটা আলনা, আলমারি আর ড্রেসিং টেবিল রয়েছে ঘরে। আলনায় কয়েকটা সাদা শাড়ি পাট করে ভাঁজ করা রয়েছে। এই ঘরে ক’দিন আগেই একজন মানুষ থাকতেন। আজও তাঁর ব্যবহৃত জিনিসগুলো একইভাবে রয়েছে। শুধু তিনি নেই, কোথাও নেই। অথচ এই মুহূর্তে এই ঘরের ভিতর দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, এই ঘরের প্রতিটি দেয়ালে, আলনায় সাজানো কাপড়ে, ড্রেসিং টেবিলে রাখা পাউডারের কৌটোয় সর্বত্র তিনি আছেন, ভীষণভাবে আছেন। পুত্রতুল্য তন্ময়কে বাঁচাতে দুষ্কৃতিদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন তিনি। কে জানে, তন্ময়কে আদৌ বাঁচাতে পেরেছেন কি না?
টাপুরদি ত্বরিতগতিতে ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। জিনিসপত্র উলটেপালটে দেখছে। আলমারির দরজা টেনে দেখল একবার। তালা লাগানো। পুলিশ নিশ্চয়ই এইসব কিছুই সার্চ করে গেছে। পকেট থেকে চাবির গোছা বার করে আলমারির কি-হোলে ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করছে টাপুরদি। আমায় বলল, ‘মিতুল, ড্রেসিং টেবিলের দেরাজগুলো ভালোভাবে চেক কর।’
ড্রয়ারগুলো খোলাই ছিল। টেনে টেনে দেখলাম। বিশেষ কিছু চোখে পড়ল না। চুলে বাঁধার কালো সরু ফিতে, কয়েকটা কাঁটা ক্লিপ, একটা কাগজের ঠোঙায় রবারব্যান্ড, আরও টুকিটাকি কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রয়েছে শুধু। মাঝের ড্রয়ারটা খালি দেখলাম। নীচেরটা খুলতে দেখলাম, একটা খুব পুরোনো অ্যালবাম রাখা। টাপুরদিকে ডাকলাম, ‘এটা দেখো।’
আলমারি খোলার চেষ্টায় ক্ষান্ত দিয়ে টাপুরদি এগিয়ে এল। মোবাইল টর্চের আলো ফেলে ছবির পাতা ওলটাতে লাগলাম আমি। বেশিরভাগই রেখাদেবীর স্বল্পদৈর্ঘ্যের সংসার জীবনের ছবি। পুরোনো হলুদ হয়ে যাওয়া ছবিগুলিতে রেখাদেবীর সুখী দাম্পত্যের কিছু তাজা বাতাস ধরা আছে। অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে কয়েকটা ছবি দেখা গেল। শেষের দিকে কয়েকটা তাঁর কুমারী জীবনের ছবি, গ্রুপ ফোটো। ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় থেমে গেলাম। ছবিটি নিঃসন্দেহে কোনো অনুষ্ঠানের। মঞ্চে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছেন রেখাদেবী, বয়স আঠারো-উনিশের বেশি হবে না। পাশে সমবয়সি আরেকটি মেয়ে গলা মেলাচ্ছে। মেয়েটিকে কেমন চেনা মনে হল। কোথাও যেন দেখেছি। মঞ্চে অতিথির আসনে বসে আছেন রথীন ঘোষ, একটু দূরে ব্যাক স্টেজের কাছে দাঁড়ানো যুবকটিকে চিনতে অসুবিধে হল না। ইনিই অমিয় চক্রবর্তী।
টাপুরদি চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘চিনতে পারছিস, মিতুল?’
‘অমিয় চক্রবর্তী তো!’ বললাম আমি।
‘হুম, আর মেয়েদুটি?’
‘ইনি তো রেখাদেবী। অপরজনকে চিনতে পারছি না।’
‘অনামিকা রায়। তন্ময়ের মা,’ বলল টাপুরদি, ‘সেদিন তন্ময়ের ফ্ল্যাটে ছবি দেখেছিলি মনে নেই?’
‘ঠিক, সেদিন ছবিটা এক ঝলক দেখেছিলাম। চেহারাটা মনে ছিল না।’
ড্রেসিং টেবিলের পাশের দরজাটা শেকল তুলে বন্ধ করা। সেটা নিঃশব্দে খুলে পাশের ঘরে ঢুকলাম আমরা। এই ঘরটা অপেক্ষাকৃত ছোটো, একটা সিঙ্গল বেড পাতা, বিছানার চাদরটা অগোছালো, অর্থাৎ শেষবার এই বিছানায় কেউ শুয়েছিল। এই ঘরে একটি ছোট আলমারি থাকলেও তাতে তালা লাগানো নেই। আলমারিটা খুলে তাতে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। দুটো ভাঁজ না ভাঙা নতুন বিছানার চাদর, তোয়ালে, একটা টিনের বাক্সে কিছু কয়েন, রেখাদেবীর নামের রেশন কার্ড, নীচের তাকে কিছু পুরোনো পোকায় কাটা বইপত্র, উলটেপালটে দেখা গেল সেগুলি রেখাদেবীর বিয়েতে পাওয়া, আরও কিছু সংসারের ব্যবহৃত অব্যবহৃত জিনিস জমানো আছে আলমারির ভিতর। নীচের তাকে রাখা কিছু পেতল ও কাঁসার বাসনপত্র যেগুলি সম্ভবত পুজোর কাজে ব্যবহার হত। জিনিসগুলি সরিয়ে দেখতে গিয়ে হঠাৎ আমার হাত লেগে অসাবধানে একটা কাঁসার ঘটি ঝন ঝন শব্দে গড়িয়ে পড়ল। শব্দে আমরা নিজেরাই চমকে উঠলাম।
‘এই যাঃ!’ লাফিয়ে উঠল টাপুরদি।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের ঘরের দরজায় শব্দ পেলাম। কেউ তালা খুলে ঢুকছে। সম্ভবত পুলিশের রক্ষী শব্দ পেয়ে চেক করতে আসছে।
টাপুরদি আমায় এক ধাক্কা মেরে বলল, ‘শিগগির খাটের তলায় ঢোক। কুইক!’
আর কিছু ভাবার সময় নেই। টাপুরদি দৌড়ে পাশের ঘরে গিয়ে বারান্দার দিকের দরজাটাতে শেকল তুলে দিল। বিপদের সময় টাপুরদির মাথা বরফের মতো ঠান্ডা থাকে বরাবর দেখেছি। ওই দরজা দিয়ে আমরা ঢুকেছি। আমি আর অপেক্ষা না করে প্রায় ডাইভ দিয়ে খাটের তলায় ঢুকলাম। টাপুরদি পাশের ঘরে কোথায় লুকোল কে জানে? বুকের ভিতর রীতিমতো দামামা পিটছে। ধরা পড়লে কী কপালে আছে কে জানে? হে ভগবান! এই যাত্রায় বাঁচিয়ে দাও গো।
খাটের তলায় শুয়েই টের পেলাম কেউ একজন টর্চ জ্বেলে ঘরে ঢুকল। প্রাণপণে নিশ্বাস বন্ধ করে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছি। নিজেকে যতটা সম্ভব পিছিয়ে নিয়ে পেছনের দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে শুয়ে আছি। বেশ বুঝতে পারছি লোকটা সারা ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবার খাটের তলে টর্চের আলো নেমে এল। ভয়ে চোখ বুজে ফেললাম আমি। টর্চের আলো আমায় ছুঁল না। খাটের তলায় সামনের দিকটাতে বুলিয়ে নিয়ে সরে গেল। বন্ধ করে রাখা নিশ্বাসটা এতক্ষণে বুক থেকে বেরিয়ে এল। লোকটা দরজা দিয়ে পাশের ঘরে ঢুকল দেখতে পেলাম। ওই ঘরে টাপুরদি আছে। কে জানে কোথায় লুকিয়েছে টাপুরদি? যদি ধরা পড়ে যায়? কী হবে? কান্না পেয়ে যাচ্ছে আমার। এ-রকম বিপদে জীবনে পড়িনি। পুলিশের সিলড ফ্ল্যাটে বেআইনিভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে ঢোকার সাজা কী হতে পারে ভেবেই শরীর ঠান্ডা হয়ে এল আমার।
কতক্ষণ সময় পেরোল হিসেব রাখিনি। প্রতিটা মুহূর্ত যেন অনন্তকাল বলে মনে হচ্ছে। বাইরের দরজায় তালা লাগানোর শব্দ পেলাম। মনে হল লোকটা বাইরে বেরিয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত গেল এভাবেই। বেরিয়ে আসার সাহস হচ্ছে না। এমন সময় টাপুরদির গলা শুনতে পেলাম, ‘বেরিয়ে আয় মিতুল।’
মেঝের উপর মাথা নীচু করে হামাগুড়ি দিয়ে বেরোলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘গেছে?’
‘হুম, তবে বেশিদূর যায়নি। বাইরেই আছে। শব্দ পেলে আবার আসবে। বার বার লুকিয়ে বাঁচা যাবে না। চল বাইরের ঘরটা একবার দেখে নিই চট করে।’ বলে দরজার দিকে এগোল টাপুরদি। বাইরের এই ঘরটাতেই সেদিন আমরা এসে বসেছিলাম। বাইরের দরজার সামনে মার্ডার স্পট মার্ক করে রাখা আছে দেখলাম, কলকাতা পুলিশের লোগোর ছাপ মারা বেল্ট দিয়ে জায়গাটা ঘেরা। মনটা কেমন করে উঠল। এই তো সেদিন সম্পূর্ণ সুস্থ দেখলাম রেখাদেবীকে। কত কথা হল এই ঘরেই বসে। অথচ আজ ঠান্ডা মেঝের উপর শুধু তাঁর শরীরের বহিরাঙ্গের আউটলাইন আঁকা, ভিতরের মানুষটা কোথায় হারিয়ে গেছে।
দেখা শেষ করে পেছনের দরজা দিয়ে বেরোলাম আমরা। পেছনের বারান্দার দিকের দরজাটা, যেটা দিয়ে ভিতরে ঢুকেছিলাম আমরা, সেটা আর বাইরে থেকে বন্ধ করা সম্ভব নয়। দরজাটা ঠেলে ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এবার? আবার গাছে চড়তে হবে?’
‘তা ছাড়া আর উপায় কী?’ হেসে বলল টাপুরদি।
‘টাপুরদি।’ মৃদুস্বরে ফিসফিস করে ডাকলাম আমি।
‘বলে ফেল,’ পেয়ারা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে একটা ডাল ধরে বলল টাপুরদি।
‘এটা ধরো।’ জিনসের পকেট থেকে হাতটা বার করে টাপুরদির সামনে মেলে ধরলাম। টাপুরদি আমার হাতের তালুতে ধরা পেনড্রাইভটার দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকাল। বলল, ‘এটা কোথায় পেলি?’
‘খাটের নীচের দিকে তক্তায় সেলোটেপ দিয়ে আটকানো ছিল। লুকোলাম বলে চোখে পড়ল এটা।’ হাসিমুখে বললাম।
টাপুরদি আমার হাত থেকে পেনড্রাইভ নিয়ে পকেটে চালান করে বলল, ‘এবার গাছে ওঠ। ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই।’
২৬
বাড়ি যখন ফিরলাম, পুবের আকাশ ততক্ষণে ফর্সা হতে শুরু করেছে। ক্লান্তিতে শরীর যেন আর বইছে না। টাপুরদি চাবি ঘুরিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই বসার ঘরের সোফায় শুয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছে শোওয়ার ঘর অবধি যাওয়ার শক্তিও নেই শরীরে। দুইবার করে গাছে চড়া, নামা, দেয়াল টপকানো, পুলিশের নজর এড়িয়ে সিলড মার্ডার লোকেশনে হানা দেওয়া, এক রাতের মধ্যে এমন ঘনঘোর অ্যাডভেঞ্চার জীবনে করিনি কখনো।
টাপুরদি বলল, ‘ঘরে গিয়ে একটু শুয়ে বিশ্রাম নিয়ে নে। অফিস আছে তো?’
‘ইমপসিবল। আজ আমি অফিস কাটব। তুমি শোবে না?’
‘দেখি রে। একটু কাজ আছে।’ বলল টাপুরদি।
‘এখন?’ মাঝে মাঝে টাপুরদিকে আমার অতিমানবী বলে মনে হয়। বললাম, ‘এত এনার্জি পাও কোথা থেকে বলো তো?’
হাসল টাপুরদি। তারপর বলল, ‘সময় খুব কম রে মিতুল। এখন প্রতিটা মুহূর্ত খুব ইম্পর্ট্যান্ট। তন্ময় কী অবস্থায় আছে আমরা জানি না। আমার হাতে এখন শুয়ে বসে নষ্ট করার মতো সময় নেই।’
সত্যিই তো। আমি এক রাত জেগে ভাবছি দুঃসাহসিক অভিযান করে ফিরলাম। এবার বিশ্রাম দরকার। অথচ তন্ময় না জানি কোথায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কীভাবে আছে! উঠে বাথরুমে ঢুকলাম। ব্রাশ করে চোখে-মুখে জল দিয়ে কিছুটা ফ্রেশ লাগল। বেরিয়ে দেখি টাপুরদি চা বসিয়েছে। আমায় দেখে বলল, ‘চা-টা খেয়ে বরং গিয়ে শো।’
আমি বললাম, ‘এখন আর শোবো না। তুমি বলো, আজকের অভিযান কতটা সফল?’
‘কতটা সফল, সেটা এই মুহূর্তেই বলা যাচ্ছে না।’ চায়ের কাপদুটো ট্রেতে বসিয়ে বসার ঘরে নিয়ে এসে সেন্টার টেবিলের উপর রাখল টাপুরদি। তারপর সোফায় বসে বলল, ‘পেনড্রাইভটা দেখতে হবে। সেটাই আসল কাজ। আমার ধারণা এটা তন্ময়ের পেনড্রাইভ। ও জানত, যেকোনো সময় ওর উপর হামলা হতে পারে। তাই লুকিয়ে রেখেছিল ওভাবে। তাড়াহুড়োতে পালাতে গিয়ে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি।’
‘ভীষণ এক্সাইটেড লাগছে টাপুরদি। যে ডকুমেন্টের জন্য এতসব কিছু, সেটা এখন আমাদের হাতে।’ সোৎসাহে বললাম আমি।
হাসল টাপুরদি। বলল, ‘হুম, কিন্তু আমার কেসে, আই মিন তন্ময়কে খুঁজে বার করার কাজে সেটা কতটা কাজে লাগবে সে নিয়ে সন্দেহ আছে আমার। চা-টা খেয়ে মাথাটা খালি করি, তারপর পেনড্রাইভটা নিয়ে বসব। তবে তুই দারুণ কাজ করেছিস।’
‘আচ্ছা টাপুরদি, অ্যালবামে যে ছবিটা ছিল, সেটার মানে তো এই দাঁড়াচ্ছে যে অনামিকা রায় ও অমিয় চক্রবর্তী একে অপরকে চিনতেন।’
‘চিনতেন তো বটেই। তবে কতটা গভীরভাবে চিনতেন, সেটা এই ছবি দেখে বলা সম্ভব নয়। সেদিন আমরা যখন রেখাদেবীকে অনামিকা রায়ের পরকীয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কিন্তু অস্বীকার করেছিলেন। সেটা কতটা সত্যি আর কতটা বন্ধুকৃত্য, সেটা জানা যাচ্ছে না। রেখাদেবীর সঙ্গে সঙ্গে সেই গোপন সত্যগুলিও হারিয়ে গেল। কিন্তু, শুধুমাত্র স্টেজে দুজনের একসঙ্গে ছবি দেখে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো সম্ভব নয় রে। তবে চিনতেন, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।’ বলল টাপুরদি।
‘আর তা ছাড়া তোমার বন্ধুও তো জানাল যে অনামিকাদেবীর ট্রান্সফারটাও অমিয় চক্রবর্তীর সুবাদে হয়েছিল।’ আমি বললাম।
টাপুরদি একটু ভেবে বলল, ‘আমরা যদি ধরে নিই যে অমিয়বাবু আর অনামিকাদেবীর মধ্যে ভালোরকম আলাপ পরিচয় ছিল, তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে? অমিয়বাবু খুন হলেন। অমিয়বাবুর অতীতের কিছু তথ্য এসে পড়ল তন্ময়ের হাতে। সে সেটা নিয়ে গা-ঢাকা দিল। সেটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটার জন্য খুন হতে হল রেখাদেবীকে। তন্ময়ের প্রাণও সংকটে। সব মিলিয়ে কী মনে হচ্ছে তোর?’
‘মনে হচ্ছে সব সুতোর জট ওই পেনড্রাইভে আছে। ওটা দেখা যাক তাহলে। দাঁড়াও তোমার ল্যাপটপটা নিয়ে আসি।’ বলে উঠে গিয়ে টাপুরদির শোওয়ার ঘর থেকে ল্যাপটপ নিয়ে এসে বসলাম। বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করছে। কে জানে কী এমন গোপন তথ্য আছে এই পেনড্রাইভে যার জন্য এতসব কিছু ঘটে চলেছে। টাপুরদি ল্যাপটপের সুইচ অন করল, পেনড্রাইভের ঢাকনাটা খুলে ল্যাপটপের ইউএসবি পোর্টে ঢোকাল। ড্রাইভ খুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘যেটা ভয় পেয়েছিলাম, সেটাই হল। বিটলকার দিয়ে পাসওয়ার্ড প্রোটেক্ট করা আছে।’
‘যাঃ, তাহলে এবার কী হবে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি, ‘ট্রাই করে দেখবে?’
‘কোনো লাভ নেই রে। ওভাবে সিনেমায় পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করা যায়। বাস্তবে সম্ভব নয়।’
‘ইশ, জিনিসটা হাতে পেয়েও কিছু করতে পারব না আমরা?’ আমি হতাশ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম।
‘পারব না কেন? পারতে তো হবে। শুধু একজনের একটু সাহায্য লাগবে!’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি।
‘অর্জুনদা? নো! নো ওয়ে। তুমি এটা পুলিশকে দেবে না, রাইট? এটা তোমার সাকসেস। পুলিশ এটার ক্রেডিট নিয়ে নেবে, তা হয় না।’ মুখ গোঁজ করে বললাম আমি।
‘এটা তোর সাকসেস। তুই যদি পুলিশকে দিতে না চাস, তাহলে দেব না।’ ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল টাপুরদি, ‘কিন্তু ভেবে দ্যাখ বাবু, এটাতে কী আছে জানা না গেলে অনেক কিছু জানা যাবে না। তন্ময়কে উদ্ধার করা মুশকিল হয়ে যাবে। এবার তুই ঠিক কর, কী করবি!’
হাসলাম আমি। বললাম, ‘তোমরা ঝগড়া করো কেন বলো তো? সেই তো তুমি আর অর্জুনদা দুজনেই জানো, তোমাদের দুজনেরই দুজনকে প্রয়োজন, কাজের জন্যেও, এবং অবশ্যই ইমোশনাল ও মরাল সাপোর্টের জন্য। ঝগড়া করে তোমরা কেউই ভালো থাকো না। অথচ মুখে সেটা স্বীকারও করবে না।’
টাপুরদি কিছু বলল না, শুধু মুচকি হাসল। আমি বললাম, ‘হেসো না। খুব রাগ হয় আমার তোমাদের উপর। যেভাবেই হোক, তন্ময়কে খুঁজে বার করো।’
টাপুরদি করুণ মুখে হাসল। তারপর বলল, ‘জানিস তো মিতুল, আমাদের প্রাইভেট ডিটেকটিভদের স্বাধীনতা খুব কম। আমাদের ক্লায়েন্টরা আমাদের কাছে তখনই আসে, যখন পুলিশের কাছে যেতে পারে না, অথবা গিয়ে লাভ হয় না। আমাদের হাতে না আছে পুলিশের মতো সুযোগসুবিধে, না আছে টেকনোলজির সাপোর্ট। তারপর প্রতি মুহূর্তে আমাদের আইন বাঁচিয়ে কাজ করতে হয়। গল্পের গোয়েন্দাদের মতো অত লাকি আমরা বাস্তবের গোয়েন্দারা নই রে। পুলিশের সাহায্য ছাড়া এগোনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুশকিল হয়ে পড়ে।’
টাপুরদিকে যেন কিছুটা হতাশ দেখাচ্ছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। বললাম, ‘অমন করে বোলো না টাপুরদি। তোমার মতো লজিক, বিশ্লেষণ ক্ষমতা পুলিশ বিভাগেও কম অফিসারের আছে। আর সেজন্যই কলকাতা পুলিশও বিভিন্ন কেসে তোমার সাহায্য নেয়। স্বয়ং ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল তোমায় যথেষ্ট সম্মান দেন, স্নেহও করেন। এর আগে অনেক কেসে তুমি পুলিশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছ। তুমি না থাকলে কার্শিয়াং-এ স্মাগল্ড সোনা ধরা পড়ত না, বিজন চট্টরাজকে তুমিই ধরেছিলে। পুলিশ জানে তুমি কী। তুমি নিজের ক্ষমতাকে অত আন্ডারএস্টিমেট কোরো না। আমার ভালো লাগে না।’
টাপুরদির মুখে হাসি ফুটল। আমার গাল টিপে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা আমার ঠাকুমা, বলব না আর।’
টাপুরদির ফোনটা বেজে উঠল। টাপুরদি ফোনটা তুলে বলল, ‘হুম, বলো।’
বুঝলাম অর্জুনদার ফোন। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রাখল। বলল, ‘দুটো খবর।’
‘কী কী?’ জানতে চাইলাম আমি।
টাপুরদি হাসিমুখে বলল, ‘রেখাদেবীর খুনিরা ধরা পড়েছে। আর ডিসিডিডি আমার সঙ্গে দেখা করতে চান।’
২৭
লালবাজারে এসে বসে থাকতে হল বেশ কিছুক্ষণ। ডিসিডিডি জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। প্রায় চল্লিশ মিনিট অপেক্ষার পর ডিসিডিডির ঘরে ডাক পড়ল। ঘরে ঢুকে দেখলাম সেখানে অর্জুনদা ও আরেকজন মধ্যবয়সি অফিসার আগে থেকেই ঘরে উপস্থিত। সৌরভবাবু ফোনে কথা বলছিলেন কারও সঙ্গে। আমরা ঢুকতে ইশারায় আমাদের বসতে বললেন। ফোনে কথা শেষ করে টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সংঘমিত্রা, কেমন আছেন বলুন?’
‘ভালো স্যার।’ হেসে বলল টাপুরদি।
‘বেশ,’ হাসলেন ডিসিডিডিও। বললেন, ‘পরিচয় করিয়ে দেই। অর্জুনকে তো তুমি চেনো। আর ইনি সিনিয়ার ইন্সপেক্টর রজত দত্ত। আর ইনি হলেন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর সংঘমিত্রা ব্যানার্জি। রজত, তোমার বোধ হয় মনে আছে বিজন চট্টরাজের কেসটার কথা। সেটা কিন্তু সংঘমিত্রাই ক্র্যাক করেছিলেন।’
রজতবাবু হাত তুলে নমস্কার করলেন। আমরাও প্রতিনমস্কার করলাম। সৌরভবাবু বললেন, ‘এবার আর সময় নষ্ট না করে কাজের কথায় আসা যাক। অর্জুনের মুখে শুনলাম আপনি রেখাদেবীর মার্ডার কেসটার সঙ্গে অন্য কোনো কেসের ব্যাপারে কোনোভাবে জড়িয়ে গেছেন। ব্যাপারটা ঠিক কী, জানতে পারি কি?’
টাপুরদি একবার আড়চোখে অর্জুনদার দিকে তাকাল। অর্জুনদা পাথরের মতো গম্ভীর মুখে চেয়ারে বসে আছে। সৌরভবাবুর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল টাপুরদি, ‘আপনাকে জানাতেই তো আসা। সত্যি বলতে কী, এই কেসের ব্যাপারে আমার পক্ষে যতদূর করার ছিল আমি করেছি। আমার হাতে আর তেমন কিছু নেই।’
‘আগে শুনি, ঘটনাটা কী।’ বললেন সৌরভ সান্যাল।
টাপুরদি রিদ্ধিমার প্রথমদিন আসা থেকে শুরু করে আমাদের সুবিনয় মুখার্জির অফিসে যাওয়া, রেখাদেবীর সঙ্গে দেখা করা, রিদ্ধিমার কাছে আসা রেখাদেবীর ফোনের ব্যাপারে সব খুলে বলল। তেমনই বেশ কিছু ছোটো অথচ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার পুরোপুরি চেপে গেল সেটা খেয়াল করলাম। যেমন আমাদের গত রাতের নৈশ অভিযানের অধ্যায়টা পুরোপুরি এড়িয়ে গেল স্বাভাবিক কারণেই। সৌরভ সান্যাল মন দিয়ে শুনলেন সব কথা। তারপর বললেন, ‘আচ্ছা সংঘমিত্রা, আপনার কী ধারণা? তন্ময়ের কেসটার সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর কোনোরকম যোগাযোগ আছে বলে মনে হয় আপনার?’
টাপুরদি বলল, ‘আমি তো অমিয় চক্রবর্তীর মার্ডার কেসের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। টিভিতে দেখে সারা দেশের লোক যেটুকু জেনেছে, সেটুকুই আমিও জেনেছি। সেই জায়গা থেকে বলা সম্ভব নয় আদৌ কোনো যোগাযোগ আছে কি না। তবে এটুকু বলতে পারি তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর অতীতের কোনো না কোনো যোগ হয়তো আছে।’
সৌরভ সান্যাল একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মনে হল নিজের মনে গভীরভাবে কিছু ভাবছেন। তারপর বললেন, ‘দেখুন সংঘমিত্রা, আপনি যথেষ্ট ইন্টেলিজেন্ট। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কেসটা ভীষণ সেনসিটিভ। এই ধরনের পলিটিক্যাল কেসে আমাদের অনেক মেপে পা ফেলতে হয়। মিডিয়াও শকুনের মতো ওঁত পেতে বসে থাকে একেকটা বাইটের জন্য। আর এটা যেকোনো পেটি পলিটিক্যাল কেস নয়। খোদ হবু মুখ্যমন্ত্রীর মার্ডার কেস। সারা দেশ তাকিয়ে আছে এই কেসের দিকে। আপনি নিশ্চয়ই এই কেসের গুরুত্ব বুঝতে পারছেন?’
টাপুরদি মৃদু হেসে বলল, ‘অবশ্যই বুঝতে পারছি। কলকাতা পুলিশ মুখ্যমন্ত্রীর মার্ডার কেসে খুব ভালো কাজ করছে। ধনঞ্জয় মণ্ডলের ব্যাপারটা…’
‘সংঘমিত্রা,’ টাপুরদিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলেন সৌরভ সান্যাল, ‘দেখুন, আপনার বুদ্ধি ও কাজের ধরনের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। তার চেয়েও বড়ো কথা তন্ময়ের ব্যাপারটা নিয়ে এগিয়ে আপনার বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়, ব্যাপারটা অতটাও সহজ নয়, যতটা উপর থেকে দেখাচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই, তন্ময়ের কেসটা নিয়ে আপনি যেমন কাজ করছেন, করুন। পুলিশের সবরকম সহযোগিতা আপনি পাবেন। তবে দুটো শর্ত আছে। প্রথমত, আপনার তদন্তের অগ্রগতি পুলিশের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে, কোনো রিস্কি বা সেনসিটিভ স্টেপ নেওয়ার আগে পুলিশকে জানাতে হবে। দ্বিতীয়ত, যদি কেসটা নিয়ে এগোতে গিয়ে কখনো আপনার মনে হয়, তন্ময়ের অন্তর্ধান কেসের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর কোনো যোগাযোগ আছে, পুলিশকে সেটা জানাতে হবে। সেক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ আমরা আলোচনা করে ডিসাইড করব।’
টাপুরদি স্থিরদৃষ্টিতে সৌরভবাবুর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হল, মনের মধ্যে শর্তগুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করে সেগুলির ওজন মেপে দেখছে টাপুরদি। তারপর হেসে বলল, ‘স্যার, আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ। পুলিশ ইচ্ছে করলেই আমার তদন্ত বন্ধ করে দিতে পারেন। লাইসেন্সও রদ করে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে আমি আবার আমার সফটওয়্যারের প্রফেশনে ফিরে যাব। কিন্তু এতসব শর্ত মেনে আমার পক্ষে তদন্ত চালানো সত্যিই একটু সমস্যার ব্যাপার। তবে এগুলো যদি অনুরোধ হয়, তবে ভেবে দেখতে পারি।’
টাপুরদির মুখে এহেন বচনামৃত শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কী ভয়ংর সাহস টাপুরদির! লালবাজারে বসে খোদ ডিসিডিডিকে এই কথা বলছে। তাকিয়ে দেখলাম অর্জুনদার মুখ প্রায় ঝুলে পড়েছে বিস্ময়ে, রজতবাবুরও অবস্থা তথৈবচ। সৌরভ সান্যাল স্থিরদৃষ্টিতে টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। সারা ঘরে পিনপতন স্তব্ধতা। হঠাৎই সৌরভবাবু হো-হো করে হেসে উঠলেন। আমরা সকলেই বিস্মিত মুখে তাঁর দিকে তাকালাম। হাসি থামিয়ে তিনি বললেন, ‘দ্যাটস হোয়াই আই রিয়ালি অ্যাডমায়ার দিস লেডি।’ তারপর একটু থেমে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘বেশ সংঘমিত্রা, অনুরোধই সই। অফ কোর্স যদি আপনি এই কেস নিয়ে আর এগোতে চান। কারণ এ-রকম সেনসিটিভ কেসের ক্ষেত্রে আমি কোনোরকম রিস্ক নিতে পারব না। আমাকেও উপরে জবাবদিহি করতে হয়। তবে হ্যাঁ, যদি কেসের কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনার ও আমাদের মনে হয় যে তন্ময়ের কেসের সঙ্গে অমিয় চক্রবর্তীর খুনের কোনো যোগাযোগ আছে, সেক্ষেত্রে আপনি আনঅফিশিয়ালি অমিয় চক্রবর্তীর কেসে পুলিশের সঙ্গে কাজ করতে পারেন যদি আপনার ইন্টারেস্ট থাকে। আপনি চাইলে এই ব্যাপারে কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে পারি। এই অফারটা দিচ্ছি, কারণ আমি আপনাকে চিনি। আমার ধারণা আপনি অমিয় চক্রবর্তীর কেস নিয়ে কৌতূহলী। তবে ব্যাপারটা বাইরের কেউ জানবে না। পুরোপুরি কনফিডেনশিয়াল থাকবে। মিডিয়ার কাছে এটা কোনোভাবেই ডিসক্লোজ করা যাবে না।’
টাপুরদির মুখে হাসি ফুটল। বলল, ‘আই উড লাভ টু! আমি রাজি। তবে আমারও শর্ত, না, অনুরোধ হল, আমি যাতে পুলিশের কাছ থেকে সবরকম সহায়তা পাই, সেটা প্লিজ দেখবেন।’
‘নিশ্চয়ই,’ হেসে বললেন সৌরভ সান্যাল। তারপর অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অর্জুন, মিস ব্যানার্জির সঙ্গে টাচে থেকো।’
অর্জুনদা বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল। টাপুরদি বলল, ‘স্যার, আমার আপনাদের সাইবার সেলের সাহায্য চাই। একটা পাসওয়ার্ড প্রোটেকটেড পেনড্রাইভ খুলতে হবে। কাজটা একটু তাড়াতাড়ি হলে ভালো হয়।’
ডিসিডিডি বললেন, ‘ওকে, আমি কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাচ্ছি।’
টাপুরদি হাসিমুখে মাথা নাড়ল।
২৮
‘তুমি কি পাগল?’ গম্ভীর মুখে জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা। সন্ধেবেলা অর্জুনদা এসেছে টাপুরদির ফ্ল্যাটে। সোফায় বসেই প্রথম প্রশ্ন ছুড়ে দিল। টাপুরদি কোনো উত্তর না দিয়ে হাসল। অর্জুনদা মুখখানা ততোধিক গম্ভীর করে বলল, ‘হেসো না। কী কাণ্ডটা করলে আজ ডিসিডিডির সামনে?’
টাপুরদি মুখের হাসি বজায় রেখে বলল, ‘সৌরভবাবু তোমার বস, আমার তো নয়। আমার তাহলে ভয়টা কীসের, শুনি? সৌরভবাবুকে আমিও শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তাঁর শর্তে আমার না পোষালে সেটা বলতে তো হবে, না?’
‘পেনড্রাইভের কেসটা কী?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
টাপুরদি আড়চোখে আমার মুখের দিকে তাকাল, আর আমি টাপুরদির দিকে। তারপর টাপুরদি কণ্ঠস্বরকে যথাসম্ভব সহজ স্বাভাবিক রেখে বলল, ‘বললাম তো, একটা পেনড্রাইভ খুলতে হবে। পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড আছে।’
‘সে তো আমি আগেই শুনেছি। কিন্তু আছেটা কী সেই ড্রাইভে? কোত্থেকে পেলে?’
‘না খুললে কী করে জানব কী আছে! সেজন্যই তো বলছি খোলার ব্যবস্থা করো।’ বলল টাপুরদি।
‘হুম, আগে কমিশনার সাহেব তোমায় কেসে ইনভলভ করার ব্যাপারে গ্রিন সিগনাল দিক। সেটা পেয়ে গেলেই কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু এটা কোত্থেকে পেলে, সেটা তো বললে না?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
টাপুরদি অর্জুনদার চোখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বলল, ‘বলব কি না সেটা ডিপেন্ড করে প্রশ্নটা কে করছে তার উপর। যদি বন্ধু হিসেবে জানতে চাও, বলব। পুলিশ হিসেবে প্রশ্ন করলে উত্তর দেব না।’
অর্জুনদার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার পেটের ভিতর কুলকুল করে হাসির স্রোত বইছে। টাপুরদি মাঝে মাঝে অর্জুনদাকে এমন বিপদে ফেলে, সে আর বলার নয়। বেচারার মুখের বিস্ময়, অসহায়তা, জিজ্ঞাসার মিলিত অভিব্যক্তি দেখে মায়া হল। টাপুরদি অর্জুনদার মুখের দিকে চেয়ে এবার জোরে জোরে হাসতে শুরু করল। আমিও হেসে বললাম, ‘এ কিন্তু তোমার ভারি অন্যায় টাপুরদি।’
টাপুরদি হাসতে হাসতেই বলল, ‘বোসো, চা বসিয়েছি। জল ফুটে গেল বোধ হয়। বানিয়ে নিয়ে আসি আগে। তারপর সব বলছি।’
চা খেতে খেতে টাপুরদি আমাদের নৈশ অভিযানের কথা বলল অর্জুনদাকে। টাপুরদিকে এতদিন ধরে চেনার পর অর্জুনদা আজকাল টাপুরদির আর কোনো দুঃসাহসিক কাজেকর্মে বিস্মিত হয় না। কিন্তু আজ সব শুনে তারও চোখ কপালে উঠল। হাঁ করে কিছুক্ষণ টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ধরা পড়লে কী হতে পারত কোনো আইডিয়া আছে তোমার? নিজে গিয়েছ, সঙ্গে মিতুলটাকেও টেনে নিয়ে গিয়েছ। টাপুর, তোমার মাথাটা কি সত্যিই খারাপ হয়ে গেল? দুঃসাহসের একটা সীমা থাকে।’
টাপুরদি অর্জুনদার কথার উত্তর না দিয়ে হেসে বলল, ‘সাহসই বলো, আর দুঃসাহস, এটুকু না করলে কি পেনড্রাইভটা পেতাম? তোমার অফিসার কি আমায় কেসের ভিতরে ঢুকতে দিত? যদি বলতাম, আমি রেখাদেবীর বাড়ি সার্চ করতে চাই, দিত পুলিশ আমায় তা করতে?’
অর্জুন বলল, ‘সেইজন্য তুমি রাতদুপুরে পুলিশের সিল করা মার্ডার স্পটে গাছে চড়ে দেয়াল টপকে ঢুকবে? হে ভগবান! তুমি সত্যিই পাগল।’
টাপুরদি এবার বেশ গম্ভীর মুখে বলল, ‘জোকস অ্যাপার্ট, পেনড্রাইভটা খোলানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আমার মন বলছে এর মধ্যেই আছে সব রহস্যের সূত্র। এটা না খুললে এগোনো মুশকিল।’
অর্জুনদা বলল, ‘সেটা আমি দেখছি। আগে দেখি কাল কমিশনার সাহেব কী বলেন। যদি থাম্বস আপ করে দেন, তাহলে তো ভালোই, আর না হলে আমায় সাইবার সেলের কাউকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নিতে হবে। অবশ্য যদি তুমি আমায় ভরসা করো।’
অর্জুনদার গলায় একটু যেন অভিমানের সুর বাজল। আমরা অর্জুনদাকে না জানিয়ে এত কিছু করেছি, সেটাতে স্বাভাবিকভাবেই দুঃখ পেয়েছে অর্জুনদা, সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না। টাপুরদি দেখলাম অর্জুনদার অভিযোগটা সযত্নে এড়িয়ে গেল। বুঝলাম, দুজনের মনেই জমে আছে কিছুটা করে অভিমানের মেঘ। সামনাসামনি স্বাভাবিক বন্ধুত্বের অভিনয় করছে দুজনে। কিন্তু টাপুরদি ও অর্জুনদার সম্পর্কটা সাধারণ বন্ধুত্বের মধ্যে আর পুরোপুরি সীমাবদ্ধ নেই, মুখে না বললেও সেটা ওরা দুজনেই বোঝে। আমি জানি, দুজনেই মানসিকভাবে দুজনের উপর নির্ভর করে। সেই নির্ভরতার ভিতটা যেন গত কয়েকদিনের ঘটনায় কিছুটা চিড় খেয়ে গেছে। দুজনেই ভিতরে ভিতরে ধিকিধিকি পুড়ছে। কিন্তু অহংকার তো কারওরই কম নয়। কেউই আগে নত হবে না। এই মানুষ দুটোই আমার খুব প্রিয়, খুব কাছের। ওদের মন ভালো না থাকলে আমার কষ্ট হয়। ঠিক যেমন এখন হচ্ছে।
টাপুরদি বলল, ‘রেখাদেবীর হত্যাকারীদের মুখ দিয়ে কথা বার করতে পারলে?’
‘পেটি হিস্ট্রি শিটার সব। নিয়ম করে জেলে ঢোকে। তাই গায়ের চামড়াও মোটা। মুখ টিপে আছে। কতদিন আর থাকবে? চেপে ধরলেই উগরে দেবে।’ বলল অর্জুনদা।
আমি বললাম, ‘কী করবে অর্জুনদা? মারধর করবে? তুমি মারধর করো? আই মিন ওই থার্ড ডিগ্রি-টিগ্রি দাও? ইশ, কী নিষ্ঠুর!’
অর্জুনদা ম্লান হেসে বলল, ‘পুলিশের কাজটা ভদ্রলোকের কাজ নয় গো সখি। ক্রিমিনাল, স্মাগলার, খুনি, রেপিস্টদের ভদ্রতা দিয়ে ডিল করা সম্ভব নয়।’
‘জানি,’ বললাম আমি, ‘সেটা বুঝি। কিন্তু তোমার সঙ্গে ব্যাপারটা ঠিক মেলাতে পারি না।’
‘না পারাই মঙ্গল। মনে করো ওটা আমার চাকরির অঙ্গ।’ বলে টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সে যাই হোক, কাল আমি লোকগুলোকে ইন্টারোগেট করব। কী বলে শুনে জানাচ্ছি তোমায়। আর পেনড্রাইভের ব্যাপারটাও দেখছি। এমনিতেও কালকের মধ্যে আশা করি জেনে যাব কমিশনার সাহেব কী বলছেন। আজ উঠি।’ বলে অর্জুনদা উঠে দাঁড়াল। টাপুরদি কিছু বলল না। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল, অনেক কিছু হয়তো-বা বলার ছিল, আরও কিছু শোনার ছিল। কিন্তু অভিমান। আমি বললাম, ‘এখনই যাচ্ছ? রাতে খেয়ে যাও অর্জুনদা।’
অর্জুনদা ফিকে হাসল। হয়তো অর্জুনদা মনে মনে চেয়েছিল, টাপুরদি অন্যান্য দিনের মতো বলুক, ‘এত তাড়া কীসের?’ মুখে বলল, ‘কাজের খুব চাপ চলছে। ক্লান্ত লাগছে। আজ বাড়ি যাই।’
বেরিয়ে গেল অর্জুনদা। মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমি এসব মনের ব্যাপার-স্যাপার কমই বুঝি। তবু টাপুরদি ও অর্জুনদার সম্পর্কটাকে চোখের সামনে একটু একটু করে গড়ে উঠতে দেখেছি। দুজনের কেউ কখনো একে অপরকে বলেনি, ‘ভালোবাসি’। তবু দুজনের মনের কাছেই অপরের মনটা পরিষ্কার ছিল। বিজন চট্টরাজের কেসের ক্ষেত্রে দেখেছি, টাপুরদিকে নিয়ে অর্জুনদা কতটা গর্ববোধ করে। সেবার মুর্শিদাবাদে গিয়ে টাপুরদির উপর অ্যাটাক হল। সারারাত হাসপাতালে অর্জুনদা ঠায় টাপুরদির পাশে বসে থেকেছে। আমাকেও থাকতে দেয়নি, কিন্তু নিজে টাপুরদির কাছ থেকে সরেনি। আবার অপর দিকে অর্জুনদার প্রতিটি সাফল্যে আমি টাপুরদিকে গর্বিত হতে দেখেছি। মানসিকভাবে দুর্বল মুহূর্তেও অর্জুনদার একটা ফোন টাপুরদিকে নতুন করে লড়াই করার শক্তি জোগাতে দেখেছি আমি। আজ দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য প্রাচীর উঠেছে সেটা যতটা সত্যি, ততটাই সত্যি সেইসব মুহূর্তগুলো, যখন একে অপরের পাশে স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে থেকেছে। আমি জানি, এসবই সাময়িক। টাপুরদি আর অর্জুনদা কখনো একে অপরের উপর অভিমান করে থাকতে পারে না।
টাপুরদি উঠে গিয়ে রিমোটটা দিয়ে টিভি চালাল। নিউজ চ্যানেলে অম্লান চক্রবর্তীর ইন্টারভিউ দেখাচ্ছে। অমিয় চক্রবর্তীর স্বপ্ন, রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে কথা বলছে অম্লান চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অমিয়বাবুর আকস্মিক মৃত্যুতে দলের মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, আপনি সেটা কতটা সামাল দিতে পারবেন বলে মনে করেন?’
অম্লান চক্রবর্তী গম্ভীর মুখে বললেন, ‘বাবার শূন্যস্থান কখনোই পূর্ণ হওয়ার নয়। আমাদের জীবনে, পরিবারে এবং বাংলার রাজনীতিতে বাবার অভাব সবসময় থাকবে। আমি বিশ্বাস করি, বাবার আদর্শ শেষ হয়ে যেতে পারে না। একজন হত্যাকারী বাবার নশ্বর দেহকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু অমিয় চক্রবর্তীর রাজনৈতিক মূল্যবোধকে হত্যা করা অত সহজ নয়। অমিয় চক্রবর্তী বেঁচে থাকবেন আমাদের মননে, চেতনায়। আমাদের দলের প্রতিটি কর্মীর হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন তিনি।’
সঞ্চালক এবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অমিয়বাবুর কেন্দ্র থেকে উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে দলের তরফ থেকে প্রার্থী এখনও ঘোষণা করা হয়নি। অনেকরকম সম্ভাবনার কথাই শোনা যাচ্ছে। আপনি কি আমাদের দর্শকদের জানাবেন, অমিয়বাবুর জায়গায় প্রার্থী কে হচ্ছেন?’
অম্লানবাবু বললেন, ‘বাবার নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে বাবা গত বাইশ বছর ধরে টানা জিতেছেন। তার আগেও জিতেছেন বহুবার। কেন্দ্রের মানুষের যেমন আমাদের দলের সিদ্ধান্তের উপর পূর্ণ আস্থা আছে, আমাদেরও তেমন সম্পূর্ণ আস্থা আছে তাদের উপর। আমি জানি, যিনিই বাবার জায়গায় প্রার্থী হবেন, তিনি তাঁর কেন্দ্রের মানুষের সার্বিক উন্নতির জন্য সর্বশক্তি দিয়ে বাবার আদর্শকে সামনে রেখে কাজ করবেন।’
সঞ্চালক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে আমরা, তথা দর্শকেরা কি জানতে পারি প্রার্থীর নাম?’
অম্লানবাবু মুখে হাসি বজায় রেখে বললেন, ‘নিশ্চয়ই পারেন। এই রাজ্যের জনতার অধিকার আছে তাদের সম্মানিত প্রার্থীর নাম জানার। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা দুটি ব্যাপার মাথায় রেখেছিলাম। প্রথমত, এমন কেউ যে বাবাকে ব্যক্তিগতভাবে জানত, বাবার আদর্শ সম্বন্ধে সম্যক অবহিত, দ্বিতীয়ত, যার দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সাধারণের সন্দেহের অবকাশ নেই।’
টাপুরদি বিড়বিড় করে বলল, ‘একটু বেশি ফ্যানাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। অম্লান চক্রবর্তীর কথা বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে প্রার্থী সম্পর্কে তাঁর নিজেরই পুরোপুরি ভরসা নেই। জনতা তাকে কীভাবে নেবে সেই নিয়েও সন্দেহ আছে। তাই যেন একটু বেশিই যুক্তি সাজাচ্ছে।’
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। অম্লান চক্রবর্তী বলে চলেছেন, ‘আমাদের নতুন প্রার্থী রাজনীতি জগতের লোক না হয়েও এই রাজ্যের রাজনীতি জগতে তাঁর অবাধ বিচরণ। আমার বাবা অমিয় চক্রবর্তীর স্নেহধন্য ছিলেন তিনি। অনেকেই হয়তো চেনেন তাঁকে। তিনি হলেন, সুবিনয় মুখার্জি। রাজ্য জুনিয়ার দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার সুবিনয় মুখার্জি কলকাতার একটি বিখ্যাত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। নিজে একটি নামকরা সিকিউরিটি এজেন্সির কর্ণধার। আজ আমি বাবার উপনির্বাচন কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে সুবিনয় মুখার্জির নাম ঘোষণা করছি।’
প্রচণ্ড বিস্ময়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। টাপুরদি হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, ‘মিলে গেছে হিসেব, মিতুল, হিসেব মিলে গেছে। সেই থেকে ভেবে যাচ্ছিলাম। সুবিনয় মুখার্জির মতো ব্যবসায়ী মানুষ শুধু বন্ধুকৃত্য করার জন্য বিনয় বোসের দেওয়া প্রোজেক্টের কথা অম্লানবাবুকে জানিয়ে দেবেন, সেটা কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। ভাব, এমন কোনো তথ্য তো সুবিনয়বাবুর হাতে নিশ্চয়ই ছিল, যেটা ইলেকশনের রেজাল্টের হাওয়া বদলে দিতে পারত। সেটা বিনয় বোসকে দিলে প্রচুর টাকা পেতেন সুবিনয় মুখার্জি। তবে কেন দিলেন না? তন্ময় তার আগে নিয়ে পালিয়েছিল বলে? উঁহু। সেটাও যদি হয়, প্রমাণ হয়তো হাত থেকে বেরিয়ে গেছিল তন্ময়ের জন্য, কিন্তু ফ্যাক্টস তো জেনে গেছিলেন সুবিনয়বাবু। তাহলে সেটা কেন জানালেন না বিনয় বোসকে? কী এমন গরজ তাঁর? কীসের জোর টাকার থেকেও বেশি? ড্যাম। আমি কী বোকা! দ্যাট ইজ পাওয়ার। ক্ষমতা, ক্ষমতা রে মিতুল। টাকার অভাব নেই সুবিনয় মুখার্জির। রাজনৈতিক ক্ষমতা, সম্মান, এসবের লোভ ত্যাগ করা খুব কঠিন।’
‘কিন্তু ওই কেন্দ্রের লোকেরা অমিয় চক্রবর্তীর জায়গায় সুবিনয় মুখার্জির মতো রাজনীতির বাইরের লোককে মেনে নেবে কেন?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘খুব সহজ অঙ্ক রে মিতুল,’ বলল টাপুরদি, ‘অমিয় চক্রবর্তী লম্বা সময় ধরে ওই নির্বাচনী কেন্দ্রের প্রার্থী হিসেবে টানা জিতে এসেছেন। তাঁর মৃত্যুতে সারা রাজ্যের মানুষ শোকাহত। সুতরাং বুঝতেই পারছিস তাঁর নিজের কেন্দ্রের জনতা কতটা সেনসিটিভ হয়ে আছে এই মুহূর্তে। অমিয়বাবুর জায়গায় তাই যাকেই দাঁড় করানো হবে, সিমপ্যাথি ভোট তাঁর দিকেই যাবে। জনতা সুবিনয় মুখার্জিকে ভোট দেবে না, দেবে দলকে। দেবে এমন একজনকে, যে কিনা তাঁর নিজের ছেলের বয়ান অনুযায়ী অমিয় চক্রবর্তীর স্নেহধন্য। সহজ হিসেব।’
আমি বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালাম টাপুরদির দিকে। রাজনীতি ব্যাপারটা আমি বরাবরই কম বুঝি। আজ যখন এই কেসের সূত্রে রাজনীতির অলিগলিতে ঢুকতে হচ্ছে, মনে হচ্ছে রাজনীতি কম বুঝে খুব বেশি ক্ষতি আমার হয়নি।
২৯
ফোনটা এল সকাল এগারোটা নাগাদ। কমিশনার অমিয় চক্রবর্তীর হত্যার কেসে শর্তসাপেক্ষে টাপুরদিকে গ্রিন সিগনাল দিয়েছেন। শর্তগুলি শুনে টাপুরদির মুখে কোনোই ভাব বই লক্ষণ্য দেখলাম না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী শর্ত দিয়েছে, টাপুরদি?’
টাপুরদি খুব স্বাভাবিক অভিব্যক্তিতে বলল, ‘ছাড় তো। আগে কাজটা করি।’
আর কথা বাড়ালাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তাহলে হোয়াট নেক্সট?’
‘অর্জুন বলল, পেনড্রাইভটা সাইবার সেলের একজন জুনিয়ার অফিসারকে দিয়েছে। ওটা ডিসাইফার করতে পারলেই আমাদের জানাবে।’ টাপুরদি বলল, ‘আপাতত অর্জুন যাচ্ছে অমিয়বাবুর বাড়িতে। জিজ্ঞাসা করছে, আমি যেতে চাই কি না।’
‘যাবে না?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘যেতে তো হবেই।’ হেসে বলল টাপুরদি।
দেড় ঘণ্টা পরে যাদবপুরে অমিয় চক্রবর্তীর বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছি আমরা। জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটি অফিসার আমাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়েই ভিতরে ঢুকতে দিয়েছেন। অর্জুনদা, আমি আর টাপুরদি এসেছি। একজন মহিলা এসে ট্রেতে করে তিন গ্লাস জল রেখে গেল। মনে হল এই বাড়িতে কাজ করেন। বললেন, ‘আপনারা একটু বসুন। ম্যাডাম আসছেন এখনই।’
বেশ বড়ো ঘর। একদিকের দেয়ালজোড়া বইয়ের শেলফ। টাপুরদি উঠে গিয়ে ঘুরে ঘুরে বইগুলি দেখতে লাগল। ঘরে বসার জায়গাতে চারখানা সোফা সাজানো। বোঝাই যায় যে এই বাড়িতে যথেষ্ট অতিথি সমাগম হয়। দেয়ালে অমিয় চক্রবর্তীর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন বয়সের ছবি সাজানো। মাঝে একটি বেশ বড়ো আকারের ফ্রেম, অমিয় চক্রবর্তীর হাসি মুখের ছবিতে মালা ঝোলানো হয়েছে দেখলাম। এটা সম্ভবত অমিয়বাবুর মৃত্যুর পর এখানে লাগানো হয়েছে। টাপুরদি বইয়ের দিক থেকে এদিকে হেঁটে এসে ছবিগুলোর সামনে দাঁড়াল। আমিও উঠে গিয়ে পাশে দাঁড়ালাম। খুব কম বয়স থেকে শুরু করে এবারের নির্বাচনী প্রচারের ছবিও স্থান পেয়েছে সংগ্রহে। দীর্ঘ বর্ণময় রাজনৈতিক জীবন।
মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিলাম, এমন সময়ে পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন সুনয়নাদেবী। সঙ্গে এলেন অমিয়বাবুর সেক্রেটারি মনোময় মজুমদার। ইনি অমিয়বাবুর দীর্ঘদিনের সঙ্গী, রাজনীতি জীবনের শুরু থেকে অমিয়বাবুর ছায়াসঙ্গী হয়ে আছেন। বয়স সত্তরের কাছাকাছি হলেও যথেষ্ট শক্তসমর্থ ভদ্রলোক। মুখের ভাব অভিব্যক্তিহীন। পূর্ণ দৃষ্টি মেলে আমাদের জরিপ করলেন, তারপর পাশের একটা সোফায় গিয়ে বসলেন খবরের কাগজ মুখের সামনে মেলে। আমার কেন জানি না মনে হল, খবরের কাগজে দৃষ্টি রুদ্ধ হলেও কান এদিকে পড়ে থাকবে ভদ্রলোকের। সুনয়নাদেবী আমাদের সামনের সোফায় এসে বসলেন। এর আগেও দূরদর্শনের পরদায় ভদ্রমহিলাকে দেখেছি। এবার প্রথম সামনে থেকে দেখে মনে হল, টিভিতে যেমন দেখায়, বয়স তার থেকে অনেকটাই বেশি। এমনও হতে পারে, হয়তো স্বামীর মৃত্যুর শোকে এই ক’দিনে চেহারা ভেঙেছে। তবে এক ঝলক দেখলেই তাঁর ব্যক্তিত্বের আন্দাজ পাওয়া যায়। সুনয়না চক্রবর্তী নিজে একসময় সক্রিয় রাজনীতি করতেন। অমিয় চক্রবর্তী ও সুনয়না চক্রবর্তী, দুজনেরই রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু ছিলেন রথীন ঘোষ। রথীন ঘোষের আমলে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন সুনয়না চক্রবর্তী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দূরে সরে আসেন।
সোফায় এসে আমাদের মুখোমুখি বসলেন সুনয়নাদেবী। আমার ও টাপুরদির দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালেন একবার। অর্জুনদা যেন একটু ইতস্তত করে আমাদের পরিচয় জানাল সুনয়নাদেবীকে। তারপর বলল, ‘এঁরা একটি পৃথক কেসে কাজ করছিলেন, যার সঙ্গে অমিয়বাবুর কেসের সম্ভবত কোনো সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। তাই কমিশনার সাহেবের অনুমতিক্রমে মিস ব্যানার্জি এই কেসে পুলিশকে আনঅফিশিয়ালি সাহায্য করছেন। এই বিষয়ে আপনার কোনো আপত্তি নেই তো?’
সুনয়নাদেবী এবার আমাদের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। ঠোঁটে হাসি টেনে বললেন, ‘আমার অনুমতির কি কোনো প্রয়োজন আছে? এটা কলকাতা পুলিশের কেস। পুলিশ যা ভালো বুঝবে, করবে। আর কমিশনার সাহেব যখন এঁকে এই কেসে কাজ করার যোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন, তখন সেখানে আমার কী বলার থাকতে পারে?’
তারপর টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটা কথা না বলে পারছি না, ইউ রিয়েলি হ্যাভ আ ভেরি প্রিটি ফেস, মাই গার্ল। কে বলে সুন্দরী মেয়েরা বুদ্ধিমতী হয় না? আই ওয়ান্ট মোর স্টং অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট উইমেন লাইক ইউ টু কাম ফরোয়ার্ড টু বিল্ড দিস স্টেট, দিস কান্ট্রি। অমিয়ও তাই চাইত। হি অলওয়েস ফট ফর উওমেন লিবারেশন, মোর পার্টিসিপেশন বাই উইমেন ইন পলিটিক্স।’
শেষের কথাগুলো কিছুটা অন্তঃসারশূন্য বলে বোধ হল আমার। সুনয়নাদেবীর বিয়ের পর পলিটিক্স ছাড়ার খবরটা জানা ছিল। তাই উইমেন লিবারেশন নিয়ে অমিয়বাবুর ভূমিকায় ঠিক বিশ্বাস রাখতে পারলাম না। যা হোক, টাপুরদি দেখলাম শোকার্ত মুখে মাথা নাড়ল। বলল, ‘অমিয়বাবুর মৃত্যুতে আমরা সকলেই গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর মৃত্যু এই রাজ্যবাসীর জন্য সত্যিকারের ক্ষতি।’
সুনয়নাদেবীর মুখে শোকের ছায়া আরও যেন বেশি করে ঘনিয়ে এল। একটু উদাস কণ্ঠে বললেন, ‘অমিয়র শূন্যস্থান কখনো পূর্ণ হওয়ার নয় আমাদের জীবনে। কিন্তু লড়াইটা তো থামবে না। দ্য শো মাস্ট গো অন। আমাদের পরিবার, দলের সদস্যরা সকলেই অমিয়র আদর্শে দীক্ষিত। মানুষের সেবাধর্ম এই পরিবারের প্রতিটি মানুষের রক্তে বইছে। আমার স্থির বিশ্বাস, অম্লান অমিয়র অসমাপ্ত সমস্ত কাজ সম্পন্ন করবে, অমিয়র স্বপ্নের বাংলা অম্লান গড়ে তুলবে।’
সুনয়নাদেবীর কথা শুনে আমার মনে হল, রাজনৈতিক পরিবারের লোকেরা কি সহজভাবে কোনো কথা বলতে পারেন না? নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে কথা বললেও মনে হয় জনসভায় নির্বাচনী বক্তৃতা দিচ্ছেন। মনে প্রশ্ন জাগে, এঁরা কি বাড়ির লোকেদের সঙ্গেও এই ভাষাতেই কথা বলেন? কী জানি! অর্জুনদা এবার বলল, ‘আপনার কাছে কিছু কথা জানার ছিল। সেই কারণেই আজ এখানে আসা।’
এবার মনোময়বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন সুনয়নাদেবী, ‘মনোময়, তুমি আজ পার্টি অফিসে যাবে না?’
মনোময়বাবু গম্ভীর মুখে বললেন, ‘সেখানেই যাচ্ছিলাম। অম্লান বাড়িতে থাকতে বলল। বলল, আপনার প্রেশারটা আবার বেড়েছে। ডক্টর সোমকে কল করেছি, আপনার প্রেশার মাপতে আসবেন তিনি এখুনি। ডক্টর চলে গেলে যাব অফিসে।’
‘ও আচ্ছা, ঠিক আছে।’ বলে অর্জুনদার দিকে ফিরলেন সুনয়নাদেবী। বললেন, ‘হ্যাঁ অফিসার। কী যেন জানতে চাইছিলেন অমিয়র হত্যার তদন্তের বিষয়ে? অমিয়র হত্যা তদন্তে কলকাতা পুলিশের দক্ষতায় আমরা খুবই সন্তুষ্ট। ধনঞ্জয় যে এমন কাজ করবে, আমরা কেউ এখনও ভাবতে পারছি না।’
অর্জুনদা বলল, ‘ঠিক সেই ব্যাপারেই কিছু কথা জানতে চাই আপনার কাছে। ধনঞ্জয় মণ্ডলকে আপনি কবে থেকে চেনেন?’
একটু ভাবলেন সুনয়না চক্রবর্তী। তারপর বললেন, ‘সে অনেক বছর হল। আমাদের দল তখন ক্ষমতায় ছিল। রথীনদা আমাদের নেতা। সেই সময় ধনঞ্জয় এসেছিল দলে। কতই বা ওর বয়স তখন? বড়োজোর পঁচিশ ছাবিবশ হবে। হুগলিতে একটা জনসভায় ওর সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল মনে আছে। অল্পবয়সি ছেলে, গরম রক্ত। একে হাঁকছে, ওকে ডাকছে। পার্টির জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছেলে। রথীনদা অমিয়কে বললেন, ছেলেটাকে ওঠা। অমিয়ই ধনঞ্জয়কে কলকাতায় নিয়ে এসেছিল। ধনঞ্জয় পার্টির জন্য অনেক করেছে। বলতে পারেন, পার্টির জন্য প্রাণ দিতে পারত ও। ওর বউ মারা গেল, ছেলে মারা গেল। পার্টি আঁকড়েই বেঁচে ছিল ধনঞ্জয়। বুকের ভিতরটা পুড়েছিল, সন্দেহ নেই। হয়তো মানসিকভাবেও সুস্থ ছিল না পুরোপুরি। নইলে ধনঞ্জয় অমিয়কে খুন করবে, এ আমার বিশ্বাস হতে চায় না।’
‘আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন, ধনঞ্জয় মণ্ডলের কাছ থেকে একটি সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। যেখানে সে ছেলের মৃত্যুর জন্য অমিয়বাবুকেই দায়ী করেছে,’ বলল অর্জুনদা।
‘জানি। শুনেছি। খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। ওর ছেলের অপারেশনের ব্যাপারটা হঠাৎই ডিসাইড হয়েছিল। অমিয় কিছু জানত না সেই বিষয়ে। ও তখন দিল্লিতে ছিল। অমিয় এখানে থাকলে নিশ্চয়ই সবরকম সাহায্য করত ধনঞ্জয়কে। কিন্তু ধনঞ্জয় ওকে বার বার ফোন করেও পায়নি। অমিয় সেই সময় একটা দীর্ঘ মিটিং-এ ছিল। অনেকের কাছেই ছোটাছুটি করেছিল ও সেই সময়ে। অমিয়র উপরে ও যে রাগ পুষে রেখেছিল, সেটা কল্পনাও করতে পারিনি।’
টাপুরদি বলল, ‘আমি একটু ইন্টারাপ্ট করছি। একটা কথা জানার ছিল। অমিয়বাবুকে ফোনে না পেয়ে নিশ্চয়ই ধনঞ্জয় মণ্ডল অম্লানবাবুকে যোগাযোগ করেছিলেন, বা করার চেষ্টা করেছিলেন। অম্লানবাবু কি ওকে সাহায্য করেননি?’
সুনয়নাদেবী একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘আসলে সেই সময়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে সবাই খুব ব্যস্ত ছিল। অম্লানের সঙ্গে আমার সেই সময় এই বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। কিন্তু ধনঞ্জয় সুইসাইড করার পর সমস্ত ঘটনা জানতে পেরে আমি অম্লানকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ও বলেছিল, ও এই বিষয়ে কিছু জানত না। আসলে এ বাড়িতে সকলেই খুব ব্যস্ত থাকে। এই নিয়ে আর কথা হয়নি।’
‘আচ্ছা, অমিয়বাবু কি সিগার খেতেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি, ‘নিশ্চয়ই শুনেছেন যে অকুস্থলে একটি সিগারের বক্স পাওয়া গেছে?’
‘না, আগে একসময় খুব ধূমপান করত অমিয়। তবে গত দুই বছর ধরে ডাক্তারের পরামর্শে ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। ওই সিগারের বাক্সটার ব্যাপারে শুনেছি। তবে সেটা কার আমি বলতে পারব না।’ সুনয়নাদেবী বললেন।
‘ধন্যবাদ,’ বলল টাপুরদি, ‘আরেকটা কথা জানার ছিল, যদিও এই কেসের সঙ্গে রিলেটেড নয়। যদি আপনার আপত্তি না থাকে, তবেই উত্তর দেবেন।’
সুনয়নাদেবী ভুরু কুঁচকে তাকালেন টাপুরদির দিকে। টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘অনামিকা রায় নামের কোনো মহিলাকে চিনতেন আপনি?’
আমি আর অর্জুনদা রীতিমতো চমকে তাকালাম টাপুরদির দিকে। টাপুরদির দুঃসাহস দেখে আমরা দুজনেই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সুনয়নাদেবীর কোঁচকানো ভুরু আরেকটু বেশি কোঁচকাল। তারপর বললেন, ‘কে অনামিকা রায়? আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। পার্টির কেউ?’
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে দরজা অবধি গিয়ে একবার পেছন ফিরে দেখলাম, সুনয়নাদেবী টাপুরদির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।
