কৃষ্ণগহ্বর – ২০

২০

লাঞ্চে আজ পাউরুটি টোস্ট আর ওমলেট দিয়ে কাজ সারা গেছে। সকাল থেকে যা গেল, আর রান্না করা, খাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা কারওরই ছিল না। এখন দুজনে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে কেস নিয়েই কথা বলছি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তাহলে নেক্সট স্টেপ কী?’

‘সব আবার নতুন করে শুরু করতে হবে রে মিতুল,’ বলল টাপুরদি, ‘যেটুকু এগিয়েছিলাম, তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে সবটুকু শেষ হয়ে গেল। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানেই পৌঁছে গেলাম আবার।’

‘তাহলে এবার কীভাবে এগোবে কিছু ভাবলে?’ জানতে চাইলাম আমি।

টাপুরদি বাইরে জানালার দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর উঠে গিয়ে একটা কাগজ আর পেন নিয়ে ফিরে এল। বলল, ‘এখনও পর্যন্ত আমরা কী কী জানতে পেরেছি? রিদ্ধিমার আমাদের কাছে আসার দিন থেকে শুরু করি। রিদ্ধিমা আমাদের কাছে এল ওর বয়ফ্রেন্ড তন্ময়ের খোঁজ পেতে। তন্ময় ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসে চাকরি করত, জানা গেল তন্ময় সেখান থেকে কিছু ডকুমেন্ট চুরি করে পালিয়েছে। এই ইউনিকর্ন সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিসেসে গিয়েই আমরা জানতে পারছি তন্ময় একটি হাইলি কনফিডেনশিয়াল প্রজেক্টে কাজ করছিল। রূপমের কাছে এর আগেই আমরা জেনেছিলাম, প্রজেক্টটার ব্যাপারে। রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিরোধী নেতা অমিয় চক্রবর্তীর ইমেজে কালি লাগানোর জন্য তাঁর অতীত ঢুঁড়ে অন্ধকার সত্য খুঁজে বার করার বরাত দেওয়া হয়েছিল সংস্থাটিকে। এখন প্রশ্ন হল, কেন তন্ময় ডকুমেন্টস চুরি করে পালাল এভাবে?’

‘বাকি আরও কয়েকজনের সঙ্গে তন্ময়ও এই প্রজেক্টেই কাজ করছিল। এ-রকম সময় একদিন তন্ময় নিরুদ্দেশ হল। জানা গেল, রাতে অফিসে ঢুকে সে প্রোজেক্টের কিছু কনফিডেনশিয়াল ডকুমেন্টস কম্পিউটার থেকে ডিলিট করে পালিয়ে গেছে। আমরা এখনও জানি না কী ছিল সেই ফাইলে। সেটা না জানলে এগোনোটা মুশকিল। আমাদের জানতে হবে, কী এমন গুরুত্বপূর্ণ নথি ছিল, যার জন্য তন্ময় এতটা ঝুঁকি নিল। ও কি ভেবেছিল, সেগুলি দিয়ে অমিয় চক্রবর্তীকে ও ব্ল্যাকমেল করবে? ও কি এতটাই বোকা যে এতবড়ো রিস্ক নেবে? আর একটা ব্যাপার। ডকুমেন্টটার ব্যাপারে কে কে জানত? আই মিন, প্রজেক্টটাতে তো তন্ময় ছাড়াও আরও কয়েকজন ছিল। রূপমও ছিল। ওরা কি জানে ওই ফাইলে কী ছিল? নাকি ডকুমেন্টটা তন্ময় নিজেই সংগ্রহ করেছিল? সেটা সে প্রথমে অফিসের সিস্টেমে সেভও করে রেখেছিল। হয়তো পরে নিজের মন বদলায়, সেটাকে সরিয়ে ফেলে সে।’

‘এবার যেটা হল, ইলেকশনে অমিয় চক্রবর্তী জিতে গেলেন। তিনি রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু শপথগ্রহণের আগের দিন পার্টি অফিসে নিজের কেবিনে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া গেল। মৃত্যুর কারণ বিষ প্রয়োগ। আচ্ছা মিতুল, তোর মনে আছে নিশ্চয়ই, অমিয় চক্রবর্তী যখন মারা যান, সেইদিন বিকেলের পর তিনি অফিসের সবাইকে ছুটি দিয়েছিলেন। একাই ছিলেন অফিসে। কেন? আরেকটা ব্যাপার। তাঁর মৃতদেহের পাশে লোডেড রিভলভার পাওয়া গেছিল, সাইলেন্সার লাগানো। এখানেও সেই একই প্রশ্ন, কেন? সবাইকে অফিস থেকে বার করে একা তিনি কী করতে চেয়েছিলেন? কারও কি আসার কথা ছিল? রিভলভার কেন? কী প্ল্যান ছিল? আত্মহত্যা করার কথা ভাবছিলেন, না খুন?’

‘তন্ময় রেখাদেবীর কাছে লুকিয়ে ছিল। ওরা জানতে পেরে গিয়ে সেখানে অ্যাটাক করে। এখন প্রশ্ন হল, তন্ময় কোথায়? ও কি ধরা পড়ে গেছে না পালাতে পেরেছে? তন্ময় যদি পালিয়ে গিয়ে থাকে ওরা তন্ময়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে ওকে ফিরে আসতে বাধ্য করবে। সেক্ষেত্রে রিদ্ধিমা একেবারেই সেফ নয়।’

‘প্রশ্ন তো পাওয়া গেল,’ বললাম আমি, ‘উত্তর মিলবে কীভাবে?’

‘খুঁজতে হবে।’ হেসে বলল টাপুরদি।

‘তার মানে, তুমি মোটামুটি নিশ্চিত যে এই কেস দুটো রিলেটেড। তাই তো?’ জানতে চাইলাম আমি।

টাপুরদি হাসল। বলল না কিছু।

‘কিন্তু টাপুরদি, এর মানে দাঁড়াচ্ছে তন্ময়কে খুঁজে বার করতে হলে তোমায় অমিয় চক্রবর্তীর কেসটার মধ্যে না চাইলেও জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। কিন্তু অমন হাই প্রোফাইল কেসে তুমি ঢুকবে কী করে বলো তো? পুলিশ কোনোভাবেই তোমায় অ্যালাও করবে না। তুমি স্পটে যেতে পারবে না। কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে না। গোপনে কতটুকু তদন্ত সম্ভব?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

টাপুরদি বাইরে জানালার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘কীভাবে কী সম্ভব হবে আমি সত্যিই জানি না রে মিতুল। আদৌ পারব কি না তাও জানি না। তবু একবার চেষ্টা না করে হাল ছেড়ে দিতে মন সায় দিচ্ছে না। বিশেষ করে যেখানে তন্ময়ের প্রাণসংকটের প্রশ্ন, সেখানে যদি ওকে বাঁচানোর চেষ্টাটুকু না করি, আর ওর যদি সত্যিই কোনো বিপদ হয়, নিজেকে আমি ক্ষমা করতে পারব না কোনোদিন।’

আমি হাসলাম। বললাম, ‘আমি জানি টাপুরদি। তন্ময়ের বিপদ জেনেও তুমি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারবে না কখনো। আর দেখো, এই কেসটাও তুমি ঠিক ক্র্যাক করবে, সেটাও আমি জানি। অর্জুনদা মুখে যাই বলুক, তোমার পাশেই থাকবে। কারণ আমার মতো অর্জুনদাও তোমায় সফল হতে দেখতে চায়, সেটা তুমিও জানো।’

আমার ফোনটা বাজছে। উঠে গিয়ে ফোনের স্ক্রিনে নামটা দেখে মুচকি হাসলাম। ফোনটা রিসিভ করে কানে ঠেকিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, বলো অর্জুনদা।’

‘মিতুল, টাপুরকে বলে দিয়ো রিদ্ধিমার বিল্ডিং-এ দুজন সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ওর সেফটির দিকটা দেখা হচ্ছে।’ গম্ভীর গলায় বলল অর্জুনদা।

আমি হেসে বললাম, ‘সেটা তো তুমি আমাকে না বলে সরাসরি টাপুরদিকেই বলতে পারতে।’

‘তুমি বলে দিয়ো,’ বলল অর্জুনদা, ‘আর এটাও বোলো যে পুলিশ অতটাও ইররেস্পন্সিবল নয় যতটা ও ভাবে।’

ফোনটা কেটে দিল অর্জুনদা। আমি সোফায় ফিরে এসে বসলাম। বললাম, ‘রিদ্ধিমার বাড়িতে প্লেন ড্রেসড পুলিশ বসানো হয়েছে, অর্জুনদা বলল।’

‘হুম,’ বলল টাপুরদি। তারপর চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করল, ‘আর কিছু বলল ও?’

বুঝতে পারলাম, অর্জুনদার অভিমান ওকেও কষ্ট দিচ্ছে। টাপুরদি আশা করছে, অর্জুনদা আরও কিছু বলুক, সব আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাক। টাপুরদি যতই নিজের অনুভূতিগুলো লুকোনোর চেষ্টা করুক, ভালোবাসলে শক্ত মেয়ের বুকের ভিতরটাও কাদা মাটির মতো তলতলে হয়ে ওঠে। সেখানে দুঃখ আনন্দগুলো সহজেই ছাপ ফেলে। আর কষ্ট দিতে ইচ্ছে হল না টাপুরদিকে। অর্জুনদার অভিমানটুকুও না হয় আমার কাছেই জমা থাক।

আমি দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বললাম, ‘না, এটাই জানাল। তোমাকে বলতে বলল। আর কিছু বলেনি।’

২১

নির্জন অন্ধকার গলি দিয়ে হেঁটে চলেছে একটি মানুষ, শান্ত, ধীর, কিছুটা অবিন্যস্ত পদক্ষেপে। মনে হচ্ছে যেন কোথাও পৌঁছোনোর তাড়া নেই তার। ক্লান্ত পায়ে নিঃশব্দে এগোচ্ছে সে। যেন সে জানে পথের শেষে কোনো আলোর রেখা অপেক্ষা করে নেই তার জন্য। যে চোরাবালিতে সে পা রেখেছে, সেখানে ডুবে মরাই তার নিয়তি। অথচ জীবনের থেকে খুব বেশি চাহিদা তো তার ছিল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে সে। চারিদিকের জমাট অন্ধকার তাকে যেন আরও বেশি করে ঘিরে ধরছে, পিষে ফেলতে চাইছে তাকে। লোকটার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

একটু দাঁড়াল লোকটা। পকেট থেকে দেশি মদের বোতলটা বার করে গলায় ঢেলে দিল। গলা দিয়ে যেন জ্বলন্ত তরল আগুন নামল। আঃ, কী শান্তি। যতক্ষণ সে মদে ডুবে থাকতে পারে, ততক্ষণ সে কাউকে ভয় করে না। মদ, একমাত্র মদই পারে তার বুকের ভিতর জমে থাকা সব রাগ, দুঃখ, জ্বালা, যন্ত্রণাগুলো জুড়িয়ে দিতে। যন্ত্রণা, মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে লোকটার ঠোঁটের কোণে। যন্ত্রণার সঙ্গে তো তার নিত্য সহবাস। পেটের ভিতরটা পচছে রোজ একটু একটু করে। শরীরের ব্যথা বেদনা আজকাল আর টেরই পায় না সে। শক্ত খাবার গেলা বন্ধ হয়েছে সে অনেকদিন হল। হাতে আর সময় নেই, তাও সে জানে ভালো করেই। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকেই চিনতে পারে না। একসময়ে এই শরীরটার উপর কত অত্যাচারটাই না সে করেছে। আর শরীরটাও ছিল তার জবরদস্ত। অসুরের শক্তি ছিল গায়ে, লোহা খেয়ে হজম করতে পারত সে অনায়াসে। আর এখন জল খেলেও বমি হয়ে যায়।

মদটা তবু সে খায়। মদ না খেলে এই ক’টা দিনই বা সে বাঁচবে কী নিয়ে? আজকাল বউটার মুখ খুব মনে পড়ে। কী মিষ্টিই না দেখতে ছিল তার বউ! বিয়ে হয়ে যখন এসেছিল, কতই বা বয়স ছিল মেয়েটার। শহরে ওই বয়সের মেয়েরা ফ্রক পরে ইস্কুলে যায়। বছর ঘুরতে না ঘুরতে প্রথমবার মা হল, দুই বছরের মাথায় দ্বিতীয়বার পোয়াতি। ডাক্তার বলেছিল, বয়স কম, শরীরে রক্ত কম। ভালো-মন্দ খাওয়াতে হবে, যত্ন করতে হবে। লোকটা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেদিন ডাক্তারের কথার গুরুত্ব বোঝার মতো সময় তার কোথায় ছিল। মা শুনে মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল, ‘গভভে আমরাও ছেলেপিলে ধরেছি, এত আদিখ্যেতা দেখিনি। রক্ত কম আবার কী? বাচ্চাকাচ্চা হওয়ার সময় ওরম সবার হয়।’ মাকে দোষ দিয়ে কী লাভ? সে নিজে কী করেছিল? পোয়াতি বউকে ঘরে ফেলে পার্টির কাজে ছুটে বেরিয়েছে দিনের পর দিন। যেদিন বউয়ের ব্যথা উঠল, সেদিনও সে বারাসাতের জনসভায় পড়ে ছিল। যখন বাড়ি ফিরল, ততক্ষণে সব শেষ। মা বাচ্চা দুজনের কেউই বাঁচেনি।

তারপর থেকে নিজেকে সে আরও বেশি করে ডুবিয়ে দিয়েছিল পার্টির কাজে। বাড়িতে বৃদ্ধা মা, শিশুপুত্র কারও খোঁজই রাখত না বললেই চলে। শুধু মাসের শুরুতে মায়ের হাতে একমুঠো টাকা ধরিয়ে দিয়ে আসত। এভাবেই কাটছিল দিনগুলো। মাতৃহারা ছেলেটা একা একাই বেড়ে উঠছিল নিজের মতো করে। কে জানে কেমন করে লেখাপড়ায় বেশ মাথা খুলেছিল ছেলেটার। মাঝখান দিয়ে সময়গুলো বন্ধ মুঠিতে বালির মতো মুঠির ফাঁক গলে সরসরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। লোকটার মাথার চুলে রুপোলি রেখাগুলি স্পষ্ট এখন তার মাথা ঢেকে ফেলছিল। তবু শান্তি ছিল। ছেলেটার মুখ দেখলে অকালে চলে যাওয়া বউটার কথা মনে পড়ত খুব। একইরকম নাকনকশা, একইরকম হাসি। ছেলেটা কোনোদিন মুখ ফুটে কিছু চায়নি। বড়ো ভালো ছেলে ছিল সে।

তারপর একদিন চাইল ছেলে। একটা উনিশ বছরের তরতাজা জোয়ান ছেলে তার বাবার হাত ধরে বাঁচতে চাইল। কবে কে জানে নিভৃতে তার দেহের কোণে দুরারোগ্য রোগ বাসা বেঁধেছিল, লোকটা বাবা হয়েও খবর রাখার সময় পায়নি। ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করেছিল ছেলেটার কিডনি। ডাক্তার জানালেন ভেলোরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করালে একমাত্র বাঁচার সম্ভাবনা আছে। কিডনি বদল করলে বেঁচে যাবে ছেলে। এখানে থাকলে বাঁচানো যাবে না। যে ছেলের মুখের দিকে কোনোদিন ভালো করে তাকিয়ে দেখেনি লোকটা, এবার তার জন্য প্রথমবার ঈশ্বরের সামনে মাথা নোয়াল। টাকা, টাকা, অনেক টাকা চাই তার। বউটাকে বাঁচাতে পারেনি, ছেলেকে সে কিছুতেই মরতে দেবে না। কে দেবে তাকে টাকা? কেন, পার্টি দেবে? এত বছর ধরে পার্টিকে নিজের রক্ত, ঘাম, জীবন দিয়েছে সে। পার্টির জন্য কী-ই না করেছে সে? সংসারের দিকে তাকায়নি, আপনার জনেদের থেকে দূরে থেকেছে, কোনো পদ চায়নি কখনো, নিজের রক্ত ঝরিয়েছে, অন্য লোকেরও। নিজেকে নিঃশেষে উজার করে দিয়েছে সে পার্টির জন্য। আজ তার প্রয়োজনে পার্টি নিশ্চয়ই তার পাশে দাঁড়াবে।

ছুটে গিয়েছিল সে। দলের শীর্ষনেতাদের ঘরে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। অমিয় চক্রবর্তীর পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল সে কেঁদে। বলেছিল, ‘দাদা, আমার ছেলেটাকে বাঁচান।’ অমিয় চক্রবর্তী মন দিয়ে সব শুনেছিলেন, তারপর দুই হাতে তাকে মেঝে থেকে টেনে তুলে হেসে বলেছিলেন, ‘ওরে পাগল, এভাবে কাঁদছিস কেন? তোর ছেলে আমার ছেলে। সে বাঁচবে না, তাও কি হয়? চিন্তা করিস না। তোর ছেলের চিকিৎসার সব খরচ পার্টির। সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেল মাথা থেকে। সামনের বছর ইলেকশন। জান লাগিয়ে দিতে হবে কিন্তু। এবার হাওয়া আমাদের অনুকূলে, জিততেই হবে আমাদের।’

মাথা নীচু করে অমিয় চক্রবর্তীর পা ছুঁয়েছিল সে। নেতার সামনে শ্রদ্ধায় নত অনেকবার হয়েছে সে, সেই প্রথম দিন কৃতজ্ঞতায় নত হয়েছিল। চোখের জল লুকোতে পারেনি। দ্বিগুণ উৎসাহে দলের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল লোকটা। ছেলে হসপিটালে, সে নিজে ছুটে বেড়িয়েছে রাজ্যের আনাচেকানাচে। দলনেতা তার উপর ভরসা রেখেছেন, ভরসাও দিয়েছেন। টান টান মেরুদণ্ডটা কৃতজ্ঞতায় নুয়ে গিয়েছিল তার।

তারপর এসেছিল সেই দিন। ভেলোর যাওয়ার ব্যবস্থা সব পাকা। পাওয়া গেছে একই ব্লাড গ্রুপের কিডনি। দ্রুত নিয়ে যেতে হবে ছেলেকে, যত দ্রুত সম্ভব ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে। খবরটা পেয়ে বিছানায় প্রায় মিশে যাওয়া কঙ্কালসার ছেলেটা তার হাত জড়িয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিল, ‘বাবা, আমাকে বাঁচাও। আমি মরতে চাই না বাবা। আরও পড়াশোনা করতে চাই। অনেক কাজ করেছ তুমি সারাজীবন ধরে। আমি চাকরি পেলে তুমি বিশ্রাম নেবে বাবা। তারপর আমরা বাবা-ছেলে মিলে অনেক বেড়াব, অনেক দেশ দেখব।’

লোকটা সেদিন প্রথমবার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদেছিল। আর সেদিনই শেষবার। কারণ ছেলের মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে জল আসেনি লোকটার, শুধু আগুন ঝরেছিল। অমিয় চক্রবর্তী তাকে ঠকিয়েছে। সব ব্যবস্থা করে টাকা চাইতে পার্টি অফিসে গেছিল সে। গিয়ে শুনেছিল, অমিয় চক্রবর্তী দিল্লি গেছেন, এক সপ্তাহ পরে ফিরবেন। পাগলের মতো সকলের হাতে-পায়ে ধরেছিল লোকটা। বলেছিল, অনেক কষ্টে ফ্লাইটের টিকিট কেটেছে। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ফ্লাইট মিস করলে তার ছেলেকে বাঁচানো যাবে না। অনেক অনুরোধ উপরোধের পর অমিয়বাবুর অফিস থেকে ফোন লাগিয়েছিল অমিয় চক্রবর্তীকে। কিন্তু তিনি ফোন তোলেননি। অনেকের হাতে-পায়ে ধরে অনেক অনেক চেষ্টার পরেও যখন ফোন ধরলেন না অমিয় চক্রবর্তী, বটবৃক্ষের মতো দীর্ঘদেহী লোকটা ভেঙেচুরে মেঝেতে বসে পড়েছিল। হেরে গেছিল লোকটা। সেই মুহূর্তে তার সামনে তার জীবনটা ব্যর্থ বলে মনে হয়েছিল। সে একজন ব্যর্থ স্বামী, ব্যর্থ পিতা। যে দলের কাজের জন্য পরিবার, পরিজন, সাংসারিক জীবনের যাবতীয় সুখকে উপেক্ষা করেছে সে, নিজেকে যে দলের জন্য, নেতার জন্য সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়েছে, আজ তারাই তাকে বিপদে দূরে ঠেলে দিল। তার দিকে তাকাল না।

স্খলিত পদে ফিরে এসেছিল সে পার্টি অফিস ছেড়ে। কোথায় যাবে সে, কী করবে, কার কাছে সাহায্য চাইবে! দলে বড়ো, মেজো, সেজো সব নেতাদের কাছে পাগলের মতো সেদিন ছুটে বেড়িয়েছিল এক অসহায় পিতা। শেষ অবধি সাহায্য অবশ্য সে পেয়েছিল। পেয়েছিল আরও সাহায্যের আশ্বাস। কিন্তু ততক্ষণে প্লেন উড়ে গেছে এয়ারপোর্ট ছেড়ে অনেক আগেই। শেষ চেষ্টা করেছিল লোকটা। নতুন করে প্লেনের টিকিট কেটে ছেলেকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে অনেক। রুগণ অসুস্থ ছেলেটা তার আর সেই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেনি। তীব্র হতাশাতেই হয়তো হঠাৎ করেই থেমে গেছিল ছেলেটার হৃৎস্পন্দন। আর অপেক্ষা করেনি সে, অভিমানী ছেলেটা বাবাকে আর সময় দেয়নি, পাড়ি দিয়েছিল সেই দুনিয়ার উদ্দেশে যেখানে রোগভোগ নেই, অসহায় পিতার কান্না নেই, শরীরের কষ্ট-যন্ত্রণা নেই, জরা নেই, মৃত্যু নেই।

লোকটা সেদিনই ঠিক করে নিয়েছিল, প্রতিশোধ সে নেবেই। অমিয় চক্রবর্তী ফিরে এসে তার মাথায় হাত রেখেছিলেন, বুকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, সেই সময়ে তিনি পার্টির জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। লোকটা কিছু উত্তর দেয়নি, শুধু মাথা নেড়েছিল। তারপর আগের মতোই চুপচাপ পার্টির কাজে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল। শুধু অপেক্ষা করে ছিল ঠিক সুযোগের। সে তখনও জানত না, আরেকজন মানুষও তারই মতো একই প্রতিশোধস্পৃহা পুষে রেখেছে বুকের ভিতর। সেই মানুষটি, যে তাকে বিপদের সময় টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিল। সে টাকা তার কোনো কাজে লাগেনি সত্য, কিন্তু তবু সেই সাহায্যের মূল্য সেই মুহূর্তে তার কাছে কম ছিল না। তাই যখন সেদিন সেই মানুষটি তার হাতে বিষ মাখানো ফ্লাস্কটা তুলে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, কীভাবে ক্যান্টিনে সেটা অমিয় চক্রবর্তীর ফ্লাস্কের সঙ্গে বদলে দিতে হবে, নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করতে অসুবিধে হয়নি লোকটার। পার্টি অফিসের ভিতর তার অবাধ গতি। কেউ তাকে কখনো আটকায় না, আটকাবে না তা তো জানাই ছিল।

আজ তার কাজ শেষ হয়েছে। ক্যান্টিনের ছেলেটা তাকে দেখেছে। আজ না হোক কাল ওর মনে পড়েই যাবে ফ্লাস্কটা কে দিয়েছিল। ধরা পড়তে ভয় সে পায় না, ফাঁসিকাঠেও ভয় নেই আর। ক’দিনই বা আর বাঁচত সে? মদ তাকে ভিতর থেকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। পেটের ভিতর বাসা বেঁধেছে কর্কট। এই অবস্থায় জীবনের প্রতিটা দিন শাস্তি বলে মনে হয়। কাজ শেষ হয়ে গেছে তার, ঋণশোধও হয়ে গেছে। এ পৃথিবীর সমস্ত দেনা-পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় মিটিয়ে দিয়েছে লোকটা। অন্ধকার গলির এক কোণে রাস্তার উপর বসে পড়ল সে। বুকপকেটে রাখা কাগজটা একবার হাত দিয়ে দেখে নিল। ঢলঢলে শার্টের নীচ থেকে প্যান্টে গোঁজা অস্ত্রটা বার করে হাতে নিল। দেশি কাট্টা, তার বহু পুরোনো সাথি। এ দিয়ে কম রক্তক্ষয় করেনি সে। পাপ পাপ, হয়তো সেইসব পাপের ফলেই আজ তার এই অবস্থা। বুক চিরে একটা অতি দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এল তার। অস্ত্রটার গায়ে হাত বোলাল। লোকটার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হাসির রেখা। একবার অগণিত তারায় ভরা আকাশের দিকে তাকাল, তারপর নলটা মুখের ভিতর ঢুকিয়ে ট্রিগার টেনে দিল সে নির্দ্বিধায়।

২২

খবরের কাগজের ভিতরের পাতায় খবরটা খুব বেশি গুরুত্ব না পেলেও কলকাতা পুলিশ কেসটাকে যথেষ্টই গুরুত্ব দিয়েছে। ডিসিডিডি সৌরভ সান্যালের কেবিনে টিম মিটিংয়ে সান্যাল সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডলের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে ডিটেইলড ইনফর্মেশন আমার আজ বিকেলের মধ্যে চাই। লোকাল থানাকে কিছু জানানোর দরকার নেই। ওদের বলে দেবে যেন রিপোর্টারদের কোনো বাইট না দেয়। মিডিয়া একজন পার্টি কর্মীর মৃত্যুকে এখনও তেমন গুরুত্ব না দিলেও সুইসাইড নোটের ব্যাপারটা প্রকাশ্যে এলে ঝাঁপিয়ে পড়বে পুলিশের উপর।’

অফিসার অর্জুন রায় বলল, ‘স্যার, সুইসাইড নোটটা তো প্ল্যান্টেডও হতে পারে। অমিয় চক্রবর্তীর খুনি হয়তো একজনকে হত্যাকারী সাজিয়ে নজরটা তার দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।’

‘পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা পেলে মার্ডার না সুইসাইড সেই বিষয়ে শিয়োর হওয়া যাবে। আর এই ধনঞ্জয় মণ্ডলের সম্বন্ধে এ টু জেড ইনফর্মেশন চাই আমার। উইপনটা তো দেশি কাট্টা ছিল, তাই না?’

‘হ্যাঁ স্যার,’ অর্জুন বলল, ‘ওটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলেছি। তবে ইউপি বিহার থেকে চোরাই পথে বেঙ্গলে ঢোকে এগুলো। যদিও এখন অনেকটাই কন্ট্রোলে, কাস্টমসে কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু পুরোটা তো অবশ্যই আটকানো যায়নি।’

‘বডি তুলতে তো অর্জুন আর রজত গিয়েছিলে। দেখে কী মনে হল?’ জিজ্ঞাসা করলেন সৌরভ সান্যাল।

এবার রজত বসু নামের মধ্যবয়সি অফিসার বললেন, ‘দেখে তো সুইসাইডই মনে হল স্যার। মুখের ভিতরে নল পুরে ট্রিগার টানা হয়েছে। গুলি মাথার পেছন দিকের খুলি ভেদ করে বেরিয়ে পেছনের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে গভীর দাগ পড়েছে, দেয়ালের চলটা খসে পড়েছে। বডি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় ছিল। বডি বা আশেপাশে কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। ছবিগুলো দেখেছেন তো আপনি।’

‘হুম, পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা আসুক। আর হ্যাঁ, আর বেশি দেরি করা যাবে না। চাপ বাড়ছে। তাই ভেবে দেখলাম, উই হ্যাভ টু বাই সাম মোর টাইম।’ বলে সৌরভ সান্যাল দুজন অফিসারের মুখের দিকে তাকালেন। কেউ মুখে কোনো প্রশ্ন করল না। এইসব ক্ষেত্রে চুপ থেকে ওপরওয়ালাকে বলতে দেওয়াই দস্তুর। কিন্তু দৃষ্টিতে সকলেরই প্রশ্ন।

সৌরভ সান্যাল গলা খাঁকরে বললেন, ‘পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা এলে যদি সুইসাইড কনফার্মড হয়, সেক্ষেত্রে একটা প্রেস কনফারেন্স ডেকে মিডিয়াকে জানাতে হবে। সুইসাইড নোটে ধনঞ্জয় মণ্ডল নিজের অপরাধ কবুল করেছে। আর সেদিন সে পার্টি অফিসে দীর্ঘ সময় ছিল, সেটাও সার্টিফাই করার মতো লোকের অভাব নেই। সুতরাং…,’ সৌরভ সান্যাল একটু থেমে বললেন, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডল মাস্ট হ্যাভ হিস ওন রিজনস টু কিল অমিয় চক্রবর্তী। সেটা একটু হাতড়ে দেখো। কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে। অফ কোর্স, একটা সুইসাইড নোটের উপর অন্ধভাবে রিলাই করে আমরা কেস ক্লোজ করতে পারি না। কিন্তু এই মুহূর্তে উই ক্যান বাই টাইম পোর্ট্রেইং ধনঞ্জয় মণ্ডল অ্যাজ এ প্রোবাবল কিলার অফ চিফ মিনিস্টার। কিন্তু ধনঞ্জয় মণ্ডল সুইসাইড নোটে কারণ লেখেনি। সেক্ষেত্রে খুব তাড়াতাড়ি পসিবল রিজনস খুঁজে বার করার দায়িত্ব তোমাদের। ওকে, নাউ গেট ব্যাক টু ইয়োর ওয়ার্ক অ্যান্ড রিপোর্ট মি অ্যাজ সুন অ্যাজ ইউ গেট এনি ব্রেক থ্রু!’

সৌরভ সান্যালের কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে অর্জুন রিস্টওয়াচের দিকে তাকাল। দুপুর দেড়টা বাজে। কাল থেকে তার মনটা বিশেষ ভালো নেই। অর্জুন জানে নিজের কাজের প্রতি টাপুরের সমর্পণ ঠিক কতটা। কিন্তু মাঝে মাঝে ও খুব বেশি রিস্ক নিয়ে ফেলে। টাপুরের বুদ্ধিমত্তা বা যোগ্যতা নিয়ে অর্জুনের কোনো সন্দেহ কোনোদিনই ছিল না। কিন্তু অর্জুন ভয় পায়। অর্জুন বা টাপুরের পেশাটা সহজ নয়। প্রতি মুহূর্তে বিপদের সম্ভাবনা থাকে। পুলিশের তবু কিছু সরকারি সূত্রে পাওয়া সুরক্ষার সুবিধে থাকে, কিন্তু টাপুরের? অর্জুন নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারছে তন্ময়ের কেসটা আর নিছক নিরুদ্দেশ সংক্রান্ত সাধারণ সমস্যায় থেমে নেই। এর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত, এবং সেই গভীরতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। যে বা যারা এর পেছনে আছে, তারা ভয়ংকর। দুটি মেয়েকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে তাদের হাত কাঁপবে না মোটেও। কিন্তু টাপুর যেন এই সহজ কথাটা বুঝেও বুঝছে না। সব ব্যাপারে ওর এত একগুঁয়েমি, কিছুতেই বোঝানো যায় না।

ভাবতে ভাবতে অর্জুনের ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। মনে পড়ে, টাপুরের এই স্বভাবের জন্যই তো তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল সে। সেদিনের সেই অনুভূতিটা যেমন সত্যি ছিল, আজকের এই ভয়টাও ততটাই সত্যি। হৃদয় যাকে আপন বলে মানে, তার বিপদের সামান্য সম্ভাবনাতেও মন আকুল হয়। কিন্তু সেই আশঙ্কায় যদি টাপুরকে তার কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে অর্জুন, তাহলে সেই টাপুরকে অর্জুন কোথায় খুঁজে পাবে যাকে তার মতো করেই ভালোবেসেছিল সে?

লালবাজারের প্রশস্ত বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে টাপুরের নম্বরে ফোন লাগাল অর্জুন। ফোন রিং হয়ে যাচ্ছে, কেউ ধরছে না। অভিমান হয়েছে ম্যাডামের। দ্বিতীয়বার কল করতে ফোনটা তুলল টাপুর। ধরেই বলল, ‘খুন না সুইসাইড? কিছু বোঝা গেল?’

হঠাৎ প্রশ্নে সামান্য হতচকিত হয়ে পড়লেও পরমুহূর্তেই হেসে ফেলল সে। এই হল টাপুর। তার কাজের সামনে তুচ্ছ মান-অভিমান প্রশ্রয় পায় না। বলল, ‘সম্ভবত সুইসাইড। সুইসাইড নোটও পাওয়া গেছে একটা। সেখানে সে অমিয় চক্রবর্তীকে খুনের কথা স্বীকার করেছে। পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এলে বাকিটা বোঝা যাবে।’

‘অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করেছে লোকটা? কিন্তু কেন?’ টাপুরের কণ্ঠস্বরে অবিশ্বাস ও সন্দেহ। বোঝা যাচ্ছে এই খুনের থিয়োরিতে সে মোটেই খুশি নয়। অমিয় চক্রবর্তীর খুনের মতো হাই প্রোফাইল কেসের এত সহজ সমাধান তার পছন্দ হচ্ছে না। কোনো রহস্য নেই, প্যাঁচ নেই, মাথা খাটানোর স্কোপ নেই। খুনি নিজে নিজে সাজিয়ে সুইসাইড নোট লিখে সুইসাইড করে বসল।

অর্জুনের বেশ মজা লাগল টাপুরের হতাশ অভিব্যক্তিতে। মনে মনে ভাবল, পুলিশের কাজটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রসকষহীন, রহস্যহীন রুটিন জব হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্রাইমই ঝোঁকের বশে করা ওপেনবুক কেস হয়, মাথা খাটানোর সুযোগ থাকে না। মুখে সে মনের ভাবটা প্রকাশ করল না। বলল, ‘কেন করল সেটা জানি না। জানতে পারলে জানাচ্ছি।’ তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘আর তন্ময়ের কেস কতদূর?’

‘আমি কী করে জানব?’ গম্ভীর গলায় বলল টাপুর, ‘তুমিই তো বললে ওই কেস থেকে দূরে থাকতে।’

অর্জুন হেসে বলল, ‘আমি বললাম, আর তুমি মেনে নিলে। এত বাধ্য মেয়ে তো তুমি!’

‘জানোই যখন বাধ্য নই, তাহলে বলো কেন?’

টাপুরের অভিমানী মুখটা কল্পনা করে মনটা নরম হয়ে আসে অর্জুনের।

২৩

কোনার্কের সূর্য মন্দিরে যে সান্ধ্য সূর্যদেবের মূর্তিটা আছে, সেটা আমার ভারি ভালো লাগে। পরিণত, স্থিতধী, শান্ত। যুগান্তের উদয়াস্তের অভিজ্ঞতা যেন সঞ্চিত রয়েছে তাঁর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা মৃদু মধুর হাসিতে। টাপুরদির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অস্তগত সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা দেখে আমার সূর্যদেবের সেই সৌম্য, শান্ত মূর্তির কথা মনে পড়ে গেল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মহানগরীরে ইট কাঠ কংক্রিটের প্রাচীরের পিছনে ঢাকা পড়ে যাবে সান্ধ্যতপনের বিজয়যাত্রার রথ। টাপুরদি পাশে এসে দাঁড়াল টের পেলাম। সূর্যের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কথা হল অর্জুনদার সঙ্গে?’

‘সে তো সেই দুপুরেই হয়েছে। বললাম তো তোকে।’ পড়ন্ত বিকেলের বিষণ্ণ আকাশে চোখ রেখে বলল টাপুরদিও।

‘আর কিছু জানায়নি? ওই ধনঞ্জয় মণ্ডলের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে কোনো ইনফর্মেশন?’

‘না। লালবাজারের পুলিশ অফিসারের দায় পড়েছে শখের গোয়েন্দাকে ক্ষণে ক্ষণে ফোন করে আপডেট দিতে?’

বুঝলাম টাপুরদির অভিমান কমেনি। হেসে বললাম, ‘এখনও রেগে আছ?’

‘না রে,’ একটা মৃদু নিশ্বাস চেপে বলল টাপুরদি, ‘রাগ নয়। অর্জুনের কাজটা ওর চাকরি, ওকে ওর প্রতিটা স্টেপের জন্য জবাবদিহি করতে হয়। আমি স্বাধীনভাবে কাজ করি। অর্জুন আমায় সরকারি তদন্তের ইনফর্মেশন জানাবে, এটা ওর উচিত নয়। আমাদেরও আশা করা ঠিক নয়। আমি যখন কেস হাতে নিয়েছি, ওর ভরসায় তো নিইনি। যদি নিজেদের সামর্থ্যে না কুলোয়, তো কেস ছেড়ে দেব। কিন্তু প্রতি পদে পুলিশের উপর নির্ভর করে থাকাটা ভালো লাগছে না রে।’

বুঝলাম, টাপুরদির অভিমানটা সত্যিই কমেনি এখনও। মুখে বললাম, ‘টাপুরদি, তুমি নিজের কৃতিত্বেই অনেক কেস সলভ করেছ। সেজন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি তোমার। কিন্তু এই কেসটা অন্যরকম। এখানে আমরা সব জায়গায় ঢুকতে পারব না। তাই অর্জুনদার সাহায্য আমাদের দরকার হবে। তুমি এইসব ভেবো না এখন। তন্ময়কে খুঁজে বার করার জন্য যা করতে হয়, করতে হবে।’

সূর্যটা কখন উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের পেছনে মুখ লুকিয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে টাপুরদি বলল, ‘তুই অনেক বড়ো হয়ে গেছিস মিতুল।’

টাপুরদি কিচেনে গিয়ে দুই কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে বসল। আর ঠিক সেই সময়ে অর্জুনদার ফোনটা এল। ধনঞ্জয় মণ্ডল সম্পর্কে জানা গেছে। লোকটা পার্টির পুরোনো কর্মী, খুবই বিশ্বস্ত। পার্টির প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিতপ্রাণ ছিল। একদম গ্রাসরুট লেভেল থেকে রাজনীতি শুরু করে অনেক উন্নতি করেছিল। নিজে কখনো নেতৃত্বে না এলেও দলের বড়ো নেতা মন্ত্রীদের কাছের লোক হয়ে উঠেছিল। এমনকী অমিয় চক্রবর্তীর অফিসেও ছিল তার অবাধ যাতায়াত।

তবে গত বছর তার একমাত্র ছেলে মারা যায় কিডনি বিকল হয়ে। অমিয় চক্রবর্তী আর্থিকভাবে সাহায্য করবেন কথা দিলেও শেষ মুহূর্তে কলকাতায় উপস্থিত না থাকার কারণে কোনো সহায়তা করতে পারেননি। চিকিৎসার সুযোগই পাওয়া যায়নি। কিডনি ফেলিয়োর হয়, দুর্বল শরীর ধকল নিতে পারেনি। হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যায় ছেলেটি। সেই থেকে নাকি খুব চুপচাপ হয়ে গেছিল ধনঞ্জয়। পার্টির কাজ করত ঠিকই, কিন্তু তার সহকর্মীদের মতে তার কাজে মন ছিল না। কথা কম বলত, অফিসেও কম আসত। খুব বেশি মদ খেত লোকটা। পুরোনো কর্মী বলে আর তার ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা ভেবে তাকে কেউ কিছু বলত না। তবে ধনঞ্জয় মণ্ডল যে মনের মধ্যে রাগ পুষে রেখেছিল, তা কেউই আঁচ করতে পারেনি। অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করে নিজে সুইসাইড করেছে ধনঞ্জয় মণ্ডল। পোস্ট মর্টেমে আত্মহত্যা কনফার্মড হয়েছে।

‘তাহলে তো টাপুরদি, আমাদের ক্যালকুলেশন ভুল ছিল। অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুটা একটা সম্পূর্ণ আলাদা অ্যাঙ্গল। তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’

টাপুরদি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ উঠে গিয়ে টিভি চালাল।

নিউজ চ্যানেলে প্রতিবেদক কণ্ঠস্বরের মাপা উত্থানপতনে স্টুডিয়োর সাজানো মঞ্চে বসে চাপা উত্তেজিত ভঙ্গিতে ধনঞ্জয় মণ্ডলের মৃত্যুর সংবাদ পরিবেশন করছে। কিছুক্ষণ এভাবেই কাটল। এবার দৃশ্যান্তর। লালবাজারের বড়ো হলে কলকাতার পুলিশ কমিশনার ও তাঁর পাশে ডিসিডিডি সৌরভ সান্যালকে দেখা গেল। সাংবাদিকদের সৌজন্য সম্ভাষণ করে কমিশনার সাহেব বললেন, ‘অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, অমিয় চক্রবর্তী হত্যা রহস্যের সমাধান হয়েছে। পার্টির জনৈক সদস্য ধনঞ্জয় মণ্ডল আসল ফ্লাস্কের বদলে বিষ মাখানো ফ্লাস্ক ক্যান্টিনে পৌঁছে দিয়ে এসেছিল। ধনঞ্জয় মণ্ডল নিজের অপরাধ স্বীকার করে আত্মহত্যা করেছে। প্রসঙ্গত, এক বছর আগে তার ছেলে চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। অমিয়বাবু সাহায্য করবেন কথা দিয়েও নির্দিষ্ট সময়ে অনুপস্থিতির কারণে সেটা করতে পারেননি। দুর্ভাগ্যক্রমে ছেলেটির মৃত্যু হয়। এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই ধনঞ্জয় মণ্ডল অমিয় চক্রবর্তীকে হত্যা করে।’

এক তরুণী সাংবাদিক উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, ‘প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এতদিন অপেক্ষা করল কেন ধনঞ্জয় মণ্ডল? এত কষ্টই বা করতে গেল কেন? পার্টি অফিসে, মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে যখন তার অবাধ যাতায়াত ছিল, সেক্ষেত্রে সে তো অনেক আগেই মারতে পারত অমিয় চক্রবর্তীকে?’

কমিশনার সাহেবকে একটু যেন দিশেহারা দেখাল। কিন্তু সেটা মুহূর্তের ভগ্নাংশ মাত্র। তার পরেই তিনি স্বভাবসুলভ কৌতুকপূর্ণ হাসি হেসে জবাব দিলেন, ‘সেটা তো ধনঞ্জয় মণ্ডলই বলতে পারত। কিন্তু সমস্যা হল, মৃত ব্যক্তিকে জেরা করার নিয়ম নেই।’

উপস্থিত সকলে হেসে উঠল। কমিশনার সাহেব বললেন, ‘সম্ভবত পুত্রশোকের অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছিল। তারপর তার মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে। ধনঞ্জয় মণ্ডল নিজেও অসুস্থ ছিল, লিভার ক্যানসারে ভুগছিল। একদম লাস্ট স্টেজ চলছিল।’

সাংবাদিক সম্মেলন শেষ হল। টাপুরদি টিভিটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘রাতে আজ একটু হালকার মধ্য দিয়ে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা সারছি রে মিতুল। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক শুয়ে নিতে পারিস। রাতে বেরোব।’

‘রাতে? কোথায় যাবে?’

‘রেখাদেবীর ফ্ল্যাটে।’ হাসল টাপুরদি।

‘যাঃ, ওখানে কেমন করে যাবে? মার্ডার স্পটে পুলিশ গার্ড থাকবে। ভিতরে ঢুকতেই দেবে না।’

টাপুরদি হাসল। বলল, ‘পুলিশ জানলে অবশ্যই ঢুকতে দেবে না। কিন্তু টের না পেলে?’

‘মানে?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘মানে পরে বোঝাব। আপাতত রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা করি। রাত একটা নাগাদ বেরোব।’ বলে আমার চুল ঘেঁটে দিয়ে হাসিমুখে রান্নাঘরের দিকে এগোল টাপুরদি।

২৪

এর আগে দিনের বেলা রেখাদেবীর বাড়িতে এসেছিলাম আমরা। রাতের অন্ধকারে জায়গাটা চিনতে আমার একটু অসুবিধে হলেও টাপুরদি সহজেই গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে গেল। দেখলাম, রেখাদেবীর বাড়ির গলিতে না ঢুকে পাশের গলিতে গাড়ি ঢোকাল টাপুরদি। রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমায় বলল, ‘নেমে আয়।’

‘এখানে?’

‘এখানে নয়তো কী? রেখাদেবীর বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নেমে পুলিশকে বলবি, আমি একজন শখের গোয়েন্দা। গেট খুলে দিন তো দাদা, ভিতরটা একটু ঘুরে দেখি? সে তোকে স্যালুট করে গেট খুলে দেবে আর তুই ভিতরে গিয়ে তদন্ত করবি? তাই ভেবেছিলি বুঝি?’ মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল টাপুরদি।

কিছু উত্তর দিলাম না। টাপুরদির মাথার ভিতরে কী চলছে বোঝা সম্ভব নয়। তাই এই মুহূর্তে চুপ করে থাকাই শ্রেয়। অন্ধকারে গলির পথে নিঃশব্দে পা ফেলে এগোচ্ছে টাপুরদি। অগত্যা আমিও পিছু নিলাম। বেশ কয়েকটা বাড়ি ছাড়িয়ে একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল টাপুরদি। একবার এগিয়ে একবার পিছিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে বাড়িটার আশপাশটা দেখে নিল। চারধারে দেয়াল দেওয়া একতলা বাড়ি। দেয়ালের পাশে কচুপাতার জঙ্গল। আমায় হাত দিয়ে ইশারা করে পিছে পিছে এগোতে বলল টাপুরদি। তারপর দুটি বাড়ির মাঝের সংকীর্ণ কচুপাতার জঙ্গলাকীর্ণ গলিপথ দিয়ে সন্তর্পণে এগোল। প্রতি বাড়ির ক্ষেত্রে অন্তত তিন ফিট করে সীমানা ছাড়ার পুরসভার নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুই বাড়ির দেওয়ালের মধ্যবর্তী স্থান এতটাই সরু যে একজন ছিপছিপে চেহারার মানুষও সহজে হেঁটে যেতে পারে না। তার উপরে বিচ্ছিরি জঙ্গল, তেমনি ঘুটঘুটে অন্ধকার। দুই বাড়িই বোধ হয় এই জায়গাটাকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করে। পলিথিনের প্যাকেটে মোড়া পচা সবজির খোসা থেকে শুরু করে হরেকরকম আবর্জনার অপূর্ব কালেকশন দেখলে ধাপার মাঠের ক্ষুদ্র সংস্করণ বলে ভুল হওয়া বিচিত্র নয়। চড়ুইপাখির সাইজের মশককুল বীরবিক্রমে আমাদের জিনস ট্রাউজার ভেদ করে হুল ফোটাচ্ছে। ভাগ্যিস পায়ে স্নিকার পরে এসেছিলাম। নইলে এতক্ষণে পায়ে কী কী যে বিঁধত কে জানে?

বেড়ালের মতো টিপে টিপে পা ফেলে নিঃশব্দে এগোলাম। বাড়ির পেছনে কিছুটা প্রশস্ত জায়গা। এতক্ষণে প্রাণ ভরে একটু খোলা হাওয়ায় নিশ্বাস নিলাম। বাড়িটির পেছনের প্রাচীরের পেছনে ফুটচারেক ফাঁকা জায়গা ছেড়েই অন্য একটি বাড়ির দেওয়াল উঠেছে। দেওয়ালের পেছনে একটা রাধাচূড়া গাছ। টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে গাছটার গায়ে হাত রেখে উপরে কী দেখল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কি বাই এনি চান্স মাঝরাতে গাছে চড়ার কথা ভাবছ?’

টাপুরদি ফিক হলে হেসে মাথা নাড়ল। বলল, ‘শুধু আমি না তুইও চড়বি।’

আমি সবেগে মাথা নেড়ে বললাম, ‘প্রশ্নই ওঠে না। হোয়াই অন আর্থ গাড়ি করে গড়িয়াতে এসে ঘুটঘুটে অন্ধকারে গাছে উঠতে যাব আমি? আর তার চেয়েও বড়ো কথা, আমি গাছে চড়তে পারি না।’

গাছটা একবার প্রদক্ষিণ করে এসে একটা শক্তপোক্ত ডাল বেছে নিয়ে টেনেটুনে দেখছে টাপুরদি। তারপর বলল, ‘সামনে চোখ মেলে দ্যাখ রে হাঁদা, সামনের দেওয়ালটা রেখাদেবীর বাড়ির পেছনের দেওয়াল। এই গাছ বেয়েই বাড়ির ভিতরে ঢুকতে হবে আমাদের।’

এবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম। এই অন্ধকারে কচুবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের হাত-পা ঠাহর করতে পাচ্ছি না ঠিকঠাক, রেখাদেবীর বাড়ির পেছন চেনার প্রশ্নই ওঠে না। হঠাৎ সন্দেহ হতে চোখ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কীভাবে বুঝলে এটা রেখাদেবীর বাড়ির পেছন দিক? এখানে আসার এই বিচ্ছিরি রাস্তাটাই বা আবিষ্কার করলে কীভাবে? তার মানে তুমি আগে এখানে এসেছ টাপুরদি?’

টাপুরদি হেসে বলল, ‘এসেছি রে। তুই যেদিন অফিস গেছিলি, দুপুরে এসে সব দেখে গেছি।’

‘হুম, ঠিক বুঝেছি। নইলে এহেন অন্ধকারে প্যাঁচার মতো নির্দ্বিধায় যেখানে-সেখানে গলে ঢুকে যাচ্ছ, এখন নাকি গাছে চড়বে।’ ব্যাজার মুখে বললাম, ‘তুমি যাবে যাও। আমায় গাছে চড়তে বোলো না। আর গাছ বেয়ে দেওয়ালে উঠে বাড়ির ভিতরে লাফ দেবে নাকি? তারপর ঠ্যাং ভেঙে পড়ে থাকতে হবে একমাস। বেজে যাবে তোমার গোয়েন্দাগিরির বারোটা।’

‘ভাঙলেই হল? চোখ মেলে দেখ মিতুল, দেওয়ালের ওপাশে একটা পেয়ারা গাছ আছে। দেওয়াল পেরিয়ে পেয়ারা গাছ বেয়ে নীচে নেমে গেলেই হল।’ বলে হাসল টাপুরদি।

‘রাধাচূড়া বেয়ে উঠবে আর পেয়ারা গাছ বেয়ে নামবে? কী আশ্চর্য!’ বিস্ময়ে এর বেশি কথা গলা দিয়ে বেরোল না আমার।

টাপুরদি পেছনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘উঠে পড়। আমি ধরছি।’

আমি কাঁদো কাঁদো মুখে বললাম, ‘প্লিজ টাপুরদি, আমি পারব না।’

‘কেন পারবি না? ঠিক পারবি। আর গাছটা ভালো, ডালগুলোর অ্যালাইনমেন্ট চমৎকার। পা দিয়ে দিয়ে টুকটুক করে উঠে যা। সফটওয়্যার কোডিং করা থেকে গাছে ওঠা ঢের সহজ। সেটা যখন সহজেই পারিস, এটাও পারবি। নে, ওঠ ওঠ।’ বলে টাপুরদি ঠেলা মারল। আমি ভয়ে ভয়ে নীচের দিকের একটা ডালে পা রাখলাম। শরীরে ঝাকুনি দিয়ে সামান্য উপরের ডালটা হাত দিয়ে ধরে ফেললাম। উলটে পড়তে পড়তে সামলে নিলাম নিজেকে। তারপর ভয়ে ভয়ে উপরের আরেকটা ডালে পা রাখতেই সেটা মড়মড় শব্দ করে তীব্র আপত্তি জানাল। ভয়ে তাড়াতাড়ি পা সরিয়ে নিলাম। টাপুরদি নীচ থেকে বলল, ‘বাঁ-দিকের মোটা ডালটাতে ওঠ মিতুল।

পরবর্তী প্রায় মিনিট বিশেকের যুদ্ধের পর দেওয়ালের সম উচচতায় উঠতে পারলাম। নীচ থেকে টাপুরদি তরতর করে এ ডালে ও ডালে পা রেখে পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ে আমার কাছের আরেকটা ডালে উঠে এল। অন্ধকারে টাপুরদিকে দেখে কপিগোত্রীয় বলে ভ্রম হওয়া অস্বাভাবিক নয় একটুও। এক পা গাছে এক পা দেওয়ালে রেখে পেয়ারা গাছের একটা ডাল ধরে ফেলল টাপুরদি। আমায় বলল, ‘এই ডালটা ধর মিতুল। শক্ত আছে।’

মোটামুটি আরও পনেরো মিনিট পর আমরা ভূমিতে অবতরণ করলাম। রিস্টওয়াচে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। পকেট থেকে মোবাইল বার করে দেখলাম দুটো পঁচিশ বাজে। টাপুরদিকে শুধু কাঁদো কাঁদো গলায় একবার জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ফেরার সময়ও কি এভাবেই ফিরতে হবে?’

‘হুম,’ গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বলল টাপুরদি, ‘এবার চুপ একদম। আর কোনো কথা নয়। পায়ের শব্দ যেন না হয়। সাবধান!’

বেড়ালের মতো পা টিপে টিপে অন্ধকারে এগোলাম। বুকের ভিতরে হৃৎপিণ্ডটা লাফাচ্ছে রীতিমতো। পুলিশের সিল করা মার্ডার স্পটে বেআইনিভাবে ঢুকছি। ধরা পড়লে হাজতবাস নিশ্চিত। অর্জুনদাও বাঁচাতে পারবে না। হে ভগবান! কপালে দুইবার আঙুল ছোঁয়ালাম। মনে হল টাপুরদির পাল্লায় পড়ে জেলে গেলে চাকরিটাও যাবে। অসহায় দৃষ্টিতে টাপুরদির দিকে তাকালাম। ধুর! যা থাকে কপালে ভাবতে ভাবতে এগিয়ে গেলাম।

বাড়ির পেছনে বারান্দার গ্রিলে তালা লাগানো। টাপুরদি ব্যাগ থেকে পরিচিত চাবির গোছা বার করল। সস্তার জং ধরা পুরোনো তালা, বিশেষ জ্বালাল না। কয়েকবারের চেষ্টাতেই খুট শব্দ করে খুলে গেল। টাপুরদি হাতের আলতো চাপে গ্রিলের দরজাটাতে ঠেলা মারল। ক্যাঁচ করে মৃদু একটা শব্দ হল। বারান্দায় উঠে দাঁড়াল টাপুরদি। ভিতরে জমাটবাঁধা ঘন অন্ধকার। সামনের কাঠের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। আমি টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। এবার? টাপুরদি এগিয়ে গিয়ে দরজাটা টেনে দেখল। দুই পাল্লার মাঝে সামান্য একচিলতে ফাঁক হল, আঙুল ঢোকার মতো নয়। হালকা হাতে নাড়াতে ভিতরে ঝনঝনানি শব্দ শোনা গেল। পুরোনো বাড়ি, ছিটকিনির ব্যবস্থা নেই। শেকল তুলে দরজা বন্ধ করা আছে।

বারান্দায় একটা কাঠের টুল রাখা ছিল। সেটাকে তুলে আনল টাপুরদি। তারপর টুলে চড়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মিতুল, তোর অস্ত্রশস্ত্র বের কর।’

আমার ব্যাগে টুকটাক ছোটোখাটো যন্ত্রপাতি থাকে। একটা পকেট নাইফ এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এটা চলবে?’

‘দে দেখি,’ বলে হাত বাড়িয়ে নাইফটা নিয়ে দুই দরজার উপরের দিকের ফাঁক দিয়ে ছুরিটা গলিয়ে দিল টাপুরদি। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর ভিতরে ঝনাৎ করে একটা শব্দ শোনা গেল। চিচিং ফাঁক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *