কৃষ্ণগহ্বর – ৩০

৩০

‘রেখাদেবীর বাড়িতে পাওয়া ফিঙ্গারপ্রিন্টস ম্যাচ করে যাওয়ায় থানায় তুলে এনেছিল লোকগুলোকে। সব ক’টা আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে গেছিল। গর্তের ভিতর থেকে ঘাড় ধরে টেনে আনতে হয়েছে।’ বলল অর্জুনদা, ‘এরা সব পুরোনো পাপী। আইন আদালতের আটঘাট জানে। থার্ড ডিগ্রি গিলে নেয় মুখ বুজে। জানে এদের জন্য হিউম্যান রাইটস আছে, পলিটিক্যাল পার্টিগুলো আছে। এদের মাথার উপর যারা আছে, তারা বড়ো বড়ো উকিল লাগিয়ে ছাড়িয়ে নেবে এদের। বলছে, ডাকাতি করতে গিয়ে ভুল করে খুন করেছে। মারতে চায়নি। অলরেডি উকিল এসে গেছে থানায়, জামাইআদর করে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে। তবে আমার ধারণা, রেখাদেবীকে সত্যিই মারতে যায়নি ওরা। শুধু রেখাদেবীকে কেন, তন্ময়কেও হয়তো মারার প্ল্যান ছিল না। মোস্ট প্রোব্যাবলি, তন্ময়কে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান ছিল। রেখাদেবী সামনে বাঘিনির মতো রুখে দাঁড়ানোয় তাঁকে সরাতে গিয়ে অতি উৎসাহের বশে চাকু চালিয়ে দিয়েছে। সেই ফাঁকে তন্ময় পালিয়েছে।’

‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু ওদের অ্যাপয়েন্ট কে করেছিল?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘সেটাই তো বলেনি। সেইজন্যই তো ডাকাতির গল্প বানাচ্ছে।’

‘কোর্টে কবে তুলছ ওদের?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘কাল। জামিন যাতে না পায়, তার জন্য গুছিয়ে চার্জশিট বানানো চলছে। সহজে ছাড়া পাবে না। তবে একটা কথা। এদের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলাম, এরা সকলেই বিভিন্ন সময়ে পলিটিক্যাল ছত্রছায়ায় থেকেছে।’

‘কোন পার্টি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

অর্জুনদা হাসল। তারপর উদাস কণ্ঠে বলল, ‘এরা সব ভাড়ার টাট্টু। এরা সব রঙের জন্যই অস্ত্র ধরে। যখন যে ক্ষমতায় আসুক, যতই গদির রং বদলায়, এদের মুখগুলো কিন্তু একই থাকে। আসলে কী জানো টাপুর, এরা সব ক’টা সৈনিক। দলের নেতারা সব নিরাপদ থাকে। তারা আইন নিজের হাতে নেয় না। তাদের হয়ে খুচরো পাপগুলো এই লোকগুলো করে। উপরতলায় নিরাপদ দূরত্বে বসে থাকা লোকেরা একটু চুকচুক করে এদের পিঠ থাবড়ে দেয়, এরা ল্যাজ দোলায়, নিজেদের রাজা ভাবে। তারপর একদিন নিজেদের মধ্যে লড়াই করে, অথবা পুলিশের গুলিতে মরে। ওদের মাথায় হাত রাখা লোকগুলো কিন্তু তখন আর এদের চিনতে পারে না। এরা কারও নাম বলবে না। সেটুকু দায়বদ্ধতা এদের আছে। কিন্তু উপরের লোকগুলো বেকায়দায় পড়লে কিন্তু সবার আগে এদেরই ফাঁসাবে। আসলে এরা মরার জন্যই জন্মায় টাপুর। মাঝের সময়টুকু এরা রাজা।’

অবাক হয়ে তাকালাম অর্জুনদার দিকে। অর্জুনদা এমন গভীরভাবেও ভাবতে পারে, জানা ছিল না। টাপুরদির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, নরম চোখে তাকিয়ে আছে অর্জুনদার মুখের দিকে। তারপর চোখের পাতা নামিয়ে নিল। চোখের পাতায় ভালোবাসার ছায়া বড়ো সহজেই পড়ে, লুকোনো যায় না। মনে মনে হাসলাম আমি। যতই অভিমান জমুক মনে, সেসব বড়ো ঠুনকো। ভালোবাসার শক্তি অনেক বেশি। বরফ গলছে।

আমি বললাম, ‘আচ্ছা, আজ সুনয়নাদেবীকে কেমন লাগল তোমার টাপুরদি?’

‘ভালোই তো।’ বলল টাপুরদি।

‘ভালো-মন্দের কথা কে জানতে চাইছে? ধুর! আমি জিজ্ঞাসা করছি, কী মনে হল? ভদ্রমহিলা কিন্তু খুব শক্ত ধাতুতে গড়া, তাই না?’

‘সে তো হবেই। ভুলে যাস না, তিনি শুধু অমিয় চক্রবর্তীর স্ত্রী-ই নন, একসময় নিজেও একজন প্রথম সারির নেত্রী ছিলেন। ওয়ান্স আ পলিটিশিয়ান ইজ অলওয়েজ আ পলিটিশিয়ান।’

‘এই কোটটা আবার কোত্থেকে পেলে?’ হেসে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

অর্জুনদা মুখ টিপে হেসে বলল, ‘মাতা সংঘমিত্রা উবাচ!’

টাপুরদি বলল, ‘সে যেই বলে থাকুক, কথাটা ভুল নয়। আসলে পলিটিক্যাল ইন্টেলেক্ট সবার থাকে না। পলিটিক্যাল কেরিয়ারে সাক্সেসফুল হতে গেলে এমন কিছু বিশেষ গুণ থাকা দরকার, যেগুলি সবসময় শিখে হয় না। অনেকসময় জিনের মধ্যেই সেগুলো নিয়ে জন্মায়, বা পরিবারের মধ্যে রাজনৈতিক পরিবেশ থাকলে ছোটো থেকে ব্যক্তিত্বের মধ্যে মিশে যায় রাজনীতি। সুনয়নাদেবী আপাতভাবে অ্যাকটিভ পলিটিক্স থেকে সরে এলেও রাজনীতি থেকে কখনোই দূরে যাননি। ওঁদের পরিবারটাই রাজনৈতিক পরিবার। তুই ভাব মিতুল, যেখানে বাড়িতে চলতে-ফিরতে-ঘুমোতে-জাগতে সবসময় রাজনীতি নিয়ে কথাবার্তা, ভাবনাচিন্তা চলছে, সেই বাড়িতে থেকে কি রাজনীতি থেকে দূরে থাকা সম্ভব আদৌ?’

‘হুম, কিন্তু টাপুরদি, তুমি আজ যেভাবে সুনয়নাদেবীকে দুম করে অনামিকা রায়ের কথা জিজ্ঞাসা করে বসলে, তাতে আমি সিরিয়াসলি বলছি, পুরো চমকে গেছিলাম।’

অর্জুনদা বলল, ‘আগ বাড়িয়ে দুঃসাহস দেখানোয় তোমার দিদির স্পেশাল এক্সপার্টাইজ আছে, সে আমি বরাবরই জানি।’

টাপুরদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘মনে হল জিজ্ঞাসা করা দরকার। তাই জিজ্ঞাসা করলাম। আমি আসলে সুনয়নাদেবীর অভিব্যক্তিটা দেখতে চেয়েছিলাম।’

‘তুমি জানো টাপুর, সুনয়না চক্রবর্তী চাইলে তোমার এই কেসে তদন্ত করায় ইতি টেনে দিতে পারেন। ভুলে যেয়ো না, সুনয়নাদেবী এই রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রীর মা। অনেক কষ্টে ডিসিডিডি স্যার তোমার জন্য পারমিশনটা বের করেছেন। এখন তুমি যদি এভাবে সবার এফোর্টে জল ঢেলে দাও, তাহলে আর কিছু বলার নেই তোমায়।’ গম্ভীর মুখে বলল অর্জুনদা।

এই রে, পরিবেশ আবার গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি বললাম, ‘আচ্ছা অর্জুনদা, ধনঞ্জয় মণ্ডলের কাছে যে সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে, সে নিজেকে অমিয় চক্রবর্তীর খুনি বলে ক্লেইম করেছে, সেটা পুলিশ তো খতিয়ে দেখেছে? কতটা যুক্তিগ্রাহ্য সেটা?’

‘কোনো সন্দেহ নেই। খুনটা ধনঞ্জয় মণ্ডলই করেছে।’ বলল অর্জুনদা।

‘তুমি শিয়োর?’ জিজ্ঞাসা করলাম।

‘সমস্ত এভিডেন্স তো তাই বলছে। ক্যান্টিনের ছেলেটাও সার্টিফাই করেছে, ফ্লাস্কটা ধনঞ্জয় মণ্ডলই ক্যান্টিনে পৌঁছে দিয়ে বলেছিল চা করে অমিয়বাবুর কেবিনে পাঠাতে। সেদিন ধনঞ্জয় পার্টি অফিসে গিয়েছিল বিকেল নাগাদ, বেশিক্ষণ থাকেনি। ইদানীং ধনঞ্জয় মণ্ডল একটু চুপচাপ থাকত। কিন্তু সেদিন নিজে থেকেই কয়েকজনকে ডেকে কথাবার্তা বলেছে। তবে অমিয়বাবুর ঘরে দেখা করতে গিয়েছিল একবার। একজন স্টাফ তাকে ফ্লাস্ক হাতে নিয়ে কেবিন থেকে বেরোতে দেখেছে শুনলাম। স্টাফরুমে গিয়ে ঘুরে এসেছে বারদুয়েক। মোটামুটিভাবে তাকে সেদিন অফিসে ও অমিয়বাবুর রুমে অনেকেই দেখেছে।’

টাপুরদি এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবার বলল, ‘এতদিন চুপচাপ থাকত। তেমনভাবে কথা বলত না। হঠাৎ করে যেদিন অমিয়বাবুকে খুন করবে, সেদিনই সকলের সঙ্গে কথা বলল, অফিসে ঘুরে বেড়াল, সকলের সামনে দিয়ে ফ্লাস্ক নিয়ে গেল। কেন? ধনঞ্জয় মণ্ডল কি ইচ্ছে করেই সাক্ষী রাখছিল? যাতে সবাই সহমত হয়ে সাক্ষী দিতে পারে?’

আমি বললাম, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডল যদি খুনি হয়, তাহলে তো কেস ক্লোজ হয়েই গেল। আর কী খুঁজছ তাহলে?’

অর্জুনদা হাসল। বলল, ‘ক্লোজ হয়ে যাওয়াই তো উচিত। যেখানে খুনি নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে, সব এভিডেন্স তার দাবিকেই সত্যি বলে মেনে নিচ্ছে, সেক্ষেত্রে কেসের আর কিছু বাকি থাকে না। সারা রাজ্যে কত ক্রাইম হচ্ছে, রোজ কত ফাইল জমা হচ্ছে, সেখানে একটা খুন নিয়ে বসে থাকলে পুলিশের চলে না। কিন্তু এক্ষেত্রে ভিকটিম হলেন রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী। তাই এত সহজে ফাইলটা বন্ধ করে সরিয়ে রেখে অন্য কাজে মন দেওয়া যাচ্ছে না। বাই চান্স, কাল যদি অন্য কোনো অ্যাঙ্গেল বেরোয়, প্রেস মিডিয়া পুলিশকে ছিঁড়ে খাবে, বুঝলে সখি?’

টাপুরদি এবার হেসে বলল, ‘তোমরা মিডিয়াকে এত ভয় পাও কেন বল তো?’

অর্জুনদা টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চাকরির প্রশ্ন, ম্যাডাম। হাত পেতে সরকার বাহাদুরের থেকে মাইনা নিই। আপনার মতো দুঃসাহস আমার কোথায়?’ তারপর হাত উলটে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এবার উঠি।’

টাপুরদি বলল, ‘চুপ করে বোসো। খেয়ে যাবে।’

বরফ গলছে।

৩১

রাতে খাওয়া-দাওয়া সারা হলে পরে অর্জুনদা বেরিয়ে গেল। কাজকর্ম সারা হতে হতে রাত সাড়ে এগারোটা বাজল। আমি বিছানায় শুতে যাওয়ার সময় দেখলাম, টাপুরদি ল্যাপটপ নিয়ে সোফার উপর বসে নিবিষ্টমনে কিছু দেখছে। আমি আর বিরক্ত করলাম না, ঘরের শুতে চলে গেলাম।

সকালে উঠে দেখি টাপুরদি বসার ঘরে সোফার উপরে এক কোণে গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে। দেখে মনে হল ভোরের দিকেই ঘুমিয়েছে। আর ডাকলাম না। বাথরুম সেরে ফিরে এসে দেখি টাপুরদি সোফায় উঠে বসেছে। ঘুম জড়ানো চোখে হাই তুলে বলল, ‘অনেক বেলা হয়ে গেল তো!’

‘একদিন বেলায় ঘুম থেকে উঠলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয় শুনি? তুমি ফ্রেশ হও, আজ আমি চা করছি।’ বলে কিচেনে ঢুকলাম। আমি জানি টাপুরদি চায়ের ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে। চা-টা টাপুরদির বিলাসিতা। বাজারের বেস্ট কোয়ালিটির মাসকাটেল ফ্লেভারের দার্জিলিং চা আসে টাপুরদির কিচেনে। সেই চা আবার ভীষণ অভিমানী। বানানোর ক্ষেত্রে সামান্য ভুলচুক হলেই চিত্তির। অবশ্য টাপুরদির ট্রেনিংয়ে আমি এখন বেশ চা বানাতে শিখে গেছি। বাবা প্রায়ই বলে, ‘টাপুর এই একটা অন্তত কাজের কাজ করেছে। মেয়েটাকে চা-টা অন্তত নিজে হাতে করতে শিখিয়েছে।’ অফিসে এত এত কোডিং করছি, ফরেন ক্লায়েন্টদের মাথায় হাত বুলোচ্ছি, টাপুরদির সঙ্গে গোয়েন্দার অ্যাসিস্ট্যান্টগিরি করছি, সেসব যেন কিছু না। বাবার অপদার্থ মেয়ে চা বানাতে শিখেছে বলে বাবা ভারি খুশি।

ট্রেতে দুই কাপ চা সাজিয়ে এনে বসার ঘরের সেন্টার টেবিলের উপর রাখলাম। তারপর ঘরের জানালার পরদাগুলো সরিয়ে দিতেই সকালের এক ঝলক নরম আলো দুষ্টু ছেলের দলের মতো ছুটে এসে ধুয়ে দিল গোটা ঘরটাকে। সোফায় এসে বসলাম। টাপুরদি চায়ের কাপে চোখ বুজে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বেড়ে বানিয়েছিস চা-টা।’

‘সারারাত জেগে করলেটা কী?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘একটু গবেষণা করলাম।’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি।

‘তা সেটা কেমন গবেষণা?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘এই কেসটা কেমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তথ্যগুলো হাতে আসছে, কিন্তু বাঁধা পড়ছে না। সেগুলোকে এক সুতোয় বাঁধতে পারলে ব্যাপারটাকে কিছুটা গুছিয়ে তোলা যায়। তাই চেষ্টা করলাম সুতোয় বাঁধতে।’

‘গেল বাঁধা?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

টাপুরদি মাথা নাড়ল। বলল, ‘নাঃ, বিস্তর ফাঁকফোকর রয়ে গেছে এখনও রে। তবে বেশ কিছু নতুন ব্যাপার আবিষ্কার করলাম, যেগুলো এতদিন চোখে পড়েনি।’

‘নতুন কোনো ডিসকভারি?’ জানতে চাইলাম।

‘নতুন তেমন কিছু নয়। তবে পুরোনো খবরের কাগজ ঘেঁটে-টেটে মনে হল, অমিয়বাবুর চরিত্রে বেশ কালোর ছোপ রয়েছে হয়তো। এখনকার কথা বলছি না, তবে অতীতে তিনি আর যাই হোক, ঠিক সাধুসন্ত ধরনের মানুষ বোধ হয় ছিলেন না। আমার ধারণা সেটা জেনেই বিনয়বাবু ইউনিকর্নকে প্রজেক্টটা দিয়েছিল, অতীত খুঁড়ে প্রমাণ বের করার জন্য।’

‘আর সেই প্রমাণের পিছনেই এখন সকলে ছুটছে। গ্রেট! তাহলে নেক্সট মুভ কী?’

‘আরেকটু জানতে হবে রে মিতুল। এই কেসের সঙ্গে জড়িত মানুষগুলিকে আরেকটু বেশি বুঝতে হবে। তাদের জীবনের, চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। আমরা এখনও অন্ধকারে হাতড়াচ্ছি। এখনও জানি না যে অমিয়বাবুর মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হয়ে গেছে কি না। অর্থাৎ, যদি ধনঞ্জয় মণ্ডলই হত্যাকারী হয়ে থাকে, তাহলে এই কেসে আর নতুন করে খোঁজার আদৌ কিছু আছে কি? অম্লানবাবুর সঙ্গে একটু সামনাসামনি কথা বলতে পারলে ভালো হত।’

‘উনি কি আর কথা বলবেন? পুলিশের সঙ্গে যদি বা বলেন, প্রাইভেট ডিটেকটিভের সঙ্গে বলতে চাইবেন না হয়তো।’ বললাম আমি, ‘আফটার অল, অম্লান চক্রবর্তী এই রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী।’

‘সেটাই চিন্তা। কিন্তু কথা বলাটা খুব দরকার রে মিতুল। একটা মানুষকে সামনাসামনি না দেখলে তাকে জানার অনেকটাই বাকি থেকে যায়।’

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আচ্ছা, অম্লানবাবু বিয়ে করেননি, না?’

‘কে বলেছে করেননি?’ চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলের উপর রেখে বলল টাপুরদি।

‘করেছেন? জানতাম না তো? কোনোদিন তো অম্লানবাবুর স্ত্রী বা পরিবার সম্পর্কে কিছু শোনা যায়নি!’ বিস্মিত কণ্ঠে বললাম।

‘জানা যায়নি, কারণ সেই খবরগুলোকে ইন্টেনশনালি চেপে দেওয়া হয়েছে। অম্লানবাবুর বিয়ে হয়েছে প্রায় কুড়ি বছর আগে। প্রেমের বিয়ে। ইউনিভার্সিটির জুনিয়ার ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তাঁর স্ত্রীর পরিবার রাজনীতি জগতের লোক নন। বিয়ের বছর খানেকের মাথায় একটি মেয়ে হয় তাঁদের। ঠিক তার ছয় মাসের মাথায় অম্লানবাবুর স্ত্রী আত্মহত্যা করেন। পুলিশি তদন্তে জানা যায়, পোস্ট পার্টাম ডিজর্ডার অর্থাৎ সন্তানের জন্ম-পরবর্তী অবসাদে ভুগছিলেন তিনি। অম্লানবাবুও সময় দিতে পারতেন না স্ত্রীকে। একাকিত্ব, অবসাদ দিনে দিনে গভীরতর হয়ে উঠেছিল, কেউ সেটা বোঝেনি। তার পরিণাম আত্মহত্যা।’

‘যাহ, এটা কিন্তু ভীষণ দুঃখজনক ব্যাপার।’ বললাম আমি।

‘হুম, আসলে আমাদের সমাজে এখনও মনের অসুখকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না রে। মন খারাপকে অবসাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে বেশিরভাগ মানুষ। সে যাই হোক, সেই সময় খবরের কাগজ, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এই মৃত্যু নিয়ে বেশ জলঘোলা করেছিল। এমনকী বধূহত্যার অভিযোগও এনেছিল বউয়ের বাপের বাড়ির তরফ থেকে, যদিও পরে কেস তুলে নেয়। শুনেছি, অম্লানবাবুর মেয়েটি এখন দাদুর বাড়িতেই থাকে। সেখানেই বড়ো হচ্ছে।’

‘আর এই তথ্যগুলো কোথা থেকে জানলে তুমি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি, ‘তোমার মধ্যরাতের রিসার্চ?’

‘ইয়েস।’ হেসে বলল টাপুরদি।

‘হিসেবমতো মেয়েটির বয়স এখন আঠারো-উনিশ। তাই না টাপুরদি?’

‘হ্যাঁ। তাই তো দাঁড়াচ্ছে।’ বলল টাপুরদি।

‘আচ্ছা, এত বছরে অম্লানবাবু আর বিয়ে করলেন না কেন?’

‘আমি কী করে জানব কেন করলেন না।’ ঠোঁট উলটে বলল টাপুরদি।

‘হুম, ইন্টারেস্টিং,’ মাথা নেড়ে বললাম আমি, ‘আর কী কী জানলে কাল রাত জেগে?’

‘সেসব পরে হবে। এখন উঠে ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করি। রাত জাগলে বড্ড খিদে পায়।’ বলে উঠে পড়ল টাপুরদি।

ব্রেকফাস্ট শেষ হওয়ার আগেই অর্জুনদার ফোন এল। জানাল, অম্লান চক্রবর্তী দেখা করতে চেয়েছেন টাপুরদির সঙ্গে।

‘আরে এ তো মেঘ না চাইতেই জল। ব্যাপারটা কী টাপুরদি?’ টোস্টে কামড় বসিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘কী আর। সুনয়নাদেবী ছেলেকে বলেছেন আমার ব্যাপারে। তাই তলব। চাকরিটা যাওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা।’ মুচকি হেসে বলল টাপুরদি।

‘তোমার আবার চাকরি! তুমি হলে নিজেই নিজের মালিক। চাকরির চিন্তা তো আমার মতো দরিদ্র কনিষ্ঠ কেরানিদের করতে হয়। পান থেকে চুন খসল কিনা ব্যস, হয়ে গেল চাকরির দফারফা। ক্লায়েন্ট ব্যাজার, বসের মুখ ভার, প্রোজেক্ট ম্যানেজারের হুড়কো, খাসা জীবন আমার। তোমার একটা কেস হাত থেকে গেলে লাইন দিয়ে আরও ক’টা এসে যায়। অম্লান চক্রবর্তীর চোখ রাঙানিতে বয়েই গেল তোমার।’ বললাম আমি।

‘বয়ে গেলে কি চলবে? ভুলে যাস না, তন্ময়কে আমরা এখনও খুঁজে পাইনি। তন্ময় কোথায় আছে, কীভাবে আছে কিচ্ছু জানি না আমরা।’ বলল টাপুরদি। টাপুরদিকে যেন কিছুটা চিন্তিত দেখাল।

৩২

ঠিক দুপুর সাড়ে বারোটায় আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন অম্লান চক্রবর্তী। সেইমতো আমরা সোওয়া বারোটা নাগাদ পার্টি অফিসে পৌঁছে গেলাম। অর্জুনদা এল বারোটা পঁচিশ নাগাদ। দেখেই মনে হল খুব ব্যস্ত। ঠিক বারোটা পঁয়ত্রিশ নাগাদ অম্লান চক্রবর্তীর কেবিনে ডাক পড়ল আমাদের। অর্জুনদা নীচু গলায় বলল, ‘অম্লান চক্রবর্তী এখন অমিয় চক্রবর্তীর কেবিনে বসছেন। এই ঘরেই খুন হয়েছিলেন অমিয়বাবু।’

ঘরে ঢুকে দেখলাম অমিয়বাবু ল্যাপটপে কিছু করছিলেন। অর্জুনদা দরজায় নক করতে তিনি ভিতরে আসতে বললেন। আমরা তিনজন ভেতরে গিয়ে সামনে দাঁড়াতে মাথা না তুলেই বললেন, ‘বসুন।’

বিরাট সেক্রেটারিয়ট টেবিলের সামনে অনেকগুলি চেয়ার রয়েছে। আমরা তিনজন চেয়ার টেনে বসলাম। অম্লান চক্রবর্তী ঝড়ের বেগে টাইপ করে চলেছেন। আমরা যে সামনে বসে আছি, যেন মনেই নেই তাঁর। মিনিট পাঁচেক কাটল। এর মধ্যে অর্জুনদা বার তিনেক ঘড়ি দেখল, আমিও উশখুশ করছি। শুধু টাপুরদি স্থির, অচঞ্চল।

মিনিট পাঁচেক পর ল্যাপটপ থেকে মুখ তুললেন অম্লান চক্রবর্তী। তাঁর দৃষ্টি পর্যায়ক্রমে আমাদের তিনজনের দিকে একবার ঘুরে গেল। তারপর অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার নাম কী, অফিসার?’

অর্জুনদা বলল, ‘অর্জুন রায়।’

‘হুম। আইপিএস?’

‘হ্যাঁ,’ অর্জুনদা মাথা নেড়ে বলল।

অম্লানবাবু বললেন, ‘বাহ, খুব ভালো। তা আপনি আমার বাবার মৃত্যুর তদন্ত করছিলেন?’

অর্জুনদা বলল, ‘স্যার, আমি তদন্তদারী দলের সদস্য। আমি ছাড়াও আরও অনেকে আছে দলে। আর অমিয়বাবুর মৃত্যুর মতো হাই প্রোফাইল কেসে ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল নিজে টিমকে লিড করছেন। কমিশনার সাহেবকে তদন্তের প্রতি মুহূর্তের আপডেট জানানো হচ্ছে।’

‘কীসের তদন্ত?’ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন অম্লান চক্রবর্তী।

অর্জুনদা এবার একটু থমকাল। বলল, ‘স্যার, আমি অমিয়বাবুর মৃত্যুর তদন্তের কথা বলছি।’

‘কিন্তু আমি যতদূর জানি, বাবার খুনি ধনঞ্জয় মণ্ডল। সে খুনের দায় স্বীকার করে আত্মহত্যা করেছে। সবরকম প্রমাণও পাওয়া গেছে তার দাবির সপক্ষে। তাই তো?’

‘হ্যাঁ স্যার,’ অর্জুনদা বলল।

অম্লানবাবু চোখ ছোটো করে অর্জুনদার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তাহলে কীসের তদন্ত চলছে এখনও? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। একটু খোলসা করে বললে ভালো হয়।’

অর্জুনদা দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলল, ‘আসলে খুনি সুইসাইড করেছে ধরে নিলেও কেস ক্লোজ করার আগে আমাদের কিছু সার্টেন প্রোসিডিয়োরের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়। খুনির দাবি সম্পর্কে একশো শতাংশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কেস ক্লোজ করা যায় না। আর ভিকটিম এক্ষেত্রে রাজ্যের হবু মুখ্যমন্ত্রী। তাই আমাদের সব দিক খতিয়ে দেখাটা দরকার।’

‘নিশ্চয়ই, সে তো একশোবার,’ বলে হাসলেন অম্লান চক্রবর্তী, ‘এইজন্যই কলকাতা পুলিশ হল দ্য মোস্ট এফিশিয়েন্ট ওয়ান ইন দ্য কান্ট্রি। আচ্ছা, সে যাই হোক, এঁদের তো চিনলাম না!’ আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন অমিয়বাবু। যেন ভুলেই গেছেন যে নিজেই ডেকে পাঠিয়েছেন আমাদের।

অর্জুনদা টাপুরদির ও আমার পরিচয় দিলেন অম্লানবাবুকে। অম্লানবাবু স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ টাপুরদির দিকে। তারপর হেসে উঠলেন। বললেন, ‘দ্য মোস্ট এফিশিয়েন্ট কলকাতা পুলিশের তাহলে আজকাল প্রাইভেট ডিটেকটিভের হেল্প দরকার হচ্ছে কেস সলভ করার জন্য। বাই দ্য ওয়ে, আপনারা চা খাবেন, না কফি?’

চা-কফির প্রস্তাব শুনেই মনে পড়ে গেল এই কেবিনে বসেই অমিয়বাবু বিষ মেশানো চা খেয়ে মারা গেছেন। আমি ‘খাব না’ বলার আগেই অর্জুনদা বলল, ‘না স্যার। অন ডিউটি আছি।’

অম্লান চক্রবর্তী হেসে বললেন, ‘আরে মশাই আপনি না হয় অন ডিউটি আছেন। হোয়াট অ্যাবাউট দ্য লেডিজ? পুলিশের তদন্তে মাথা গলানো আশা করি প্রাইভেট ডিটেকটিভের ডিউটির আওতায় পড়ে না!’

অর্জুনদা অপ্রস্তুত মুখে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই টাপুরদি বলল, ‘আমি কিন্তু চা খাব। দার্জিলিং ব্ল্যাক টি, উইদাউট সুগার অ্যান্ড মিল্ক। পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই?’

আমি আর অর্জুনদা চমকে উঠে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। টাপুরদির দুঃসাহস যেন দিন দিন সীমা ছাড়াচ্ছে। কার সামনে আমরা বসে আছি, টাপুরদি কি ভুলে গেছে? অম্লান চক্রবর্তীও বুঝি কিছুটা চমকালেন, কিন্তু তিনি অসম্ভব বুদ্ধিমান লোক। মুখের অভিব্যক্তিটাকে মুহূর্তে স্বাভাবিক করে হেসে বললেন, ‘নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। বাবার জন্য বেস্ট কোয়ালিটির দার্জিলিং ব্ল্যাক টি আসত। সেই চা থেকেই তো…।’

বলতে বলতে বেল বাজিয়ে কাউকে ডাকলেন তিনি। একজন উর্দি পরা লোক ভিতরে ঢুকল। এই ঘরে ঢোকার মুখে এই লোকটাকে আমরা বাইরে টুলে বসে থাকতে দেখেছি। অম্লানবাবু তাকে এক কাপ ব্ল্যাক টি আনতে বললেন। লোকটা দরজা টেনে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে অম্লানবাবু টাপুরদির দিকে ফিরলেন। বললেন, ‘তা আপনি তো প্রাইভেট ডিটেকটিভ, তাই তো?’

মাথা নাড়ল টাপুরদি। অম্লানবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘লাইসেন্স আছে?’

টাপুরদি আবার সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।

অম্লানবাবু বললেন, ‘গুড। কাল তো আপনারা আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন শুনেছি। তা অফিসার, আমার বাড়িতে যাওয়ার আগে আমার কাছে পারমিশন নেওয়াটা বোধ হয় তেমন জরুরি বলে বোধ হয়নি, না? মানে শিয়োর, আপনি তো আর নিজের ইচ্ছেয় যাননি। চাকরি বলে কথা। তা সৌরভ সান্যালের তো অনেক বছর চাকরি হল। এসব তো তাঁর জানা উচিত। ঠিক কি না?’

অর্জুনদা অপ্রস্তুত গলায় বলল, ‘আসলে সুনয়নাদেবীর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার হয়ে পড়েছিল। তাই আমিই গিয়েছিলাম। ডিসিডিডি স্যার জানতেন না।’

অম্লান চক্রবর্তী অর্জুনদার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘আপনার মনে হল আমার মার সঙ্গে দেখা করা দরকার। আর আপনি উইদাউট এনি পারমিশন প্রাইভেট গোয়েন্দা সঙ্গে করে আমার বাড়ি চলে গেলেন! গুড। বাই দ্য ওয়ে, আপনি আইপিএস ট্রেনিং কবে শেষ করলেন?’

অর্জুনদা বলল, ‘দুই বছর হল।’

‘ওহ, শুরুতেই লালবাজারে পোস্টিং, আপনি তো মশাই দারুণ ভাগ্যবান,’ বলে হো-হো করে উচচকণ্ঠে হাসলেন অম্লানবাবু। তারপর হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ঝাড়গ্রামের দিকটা খুব রেস্টলেস, জানেন তো? ঝামেলা লেগেই থাকে। আপনার মতো সাহসী, এলিজিবল অফিসারকে ওই অঞ্চলে খুব প্রয়োজন। ভাবছি আপনাকে ওখানে রেকমেন্ড করি। আপনি কী বলেন?’

অর্জুনদা সামান্য কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর মুখে মৃদু হাসি টেনে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলল, ‘স্যার, আইপিএসে চান্স পাওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি। বাড়ির লোকেরা, বন্ধুবান্ধব চেয়েছিল আমি আইএএস ট্রাই করি। আমি করিনি, করতে চাইনি। কারণ, আমি পুলিশ সার্ভিস জয়েন করতে চেয়েছিলাম। আর সেক্ষেত্রে আমাকে যেকোনো জায়গায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে কাজ করতে হবে জেনেই সেটা চেয়েছিলাম। চাকরির ক্ষেত্রে যেখানে আমায় পোস্টিং দেওয়া হবে, সেখানেই যাব। চেয়ার টেবিলে বসে আরামের চাকরি করতে হলে আইএএস-এর জন্য চেষ্টা করতাম স্যার। আরেকটা কথা, যেখানেই চাকরি করব, সেখানেই সম্পূর্ণ সততার সঙ্গে করব। পুলিশের চাকরি শুরুর আগে আমাদের ওথ নিতে হয়েছিল স্যার। আর পরিস্থিতি বিশেষে যা প্রয়োজনীয় বলে মনে হবে, সেটাই করব।’

অম্লানবাবু চুপচাপ চেয়ে রইলেন অর্জুনদার মুখের দিকে। আমি আড়চোখে টাপুরদির মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম, টাপুরদি মুগ্ধদৃষ্টিতে অর্জুনদার দিকে তাকিয়ে আছে। এইরকম পরিস্থিতিতে না থাকলে হয়তো খুশি হতে পারতাম, কিন্তু অম্লান চক্রবর্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে। দরজায় টোকার শব্দ হল। তারপর ট্রেতে করে চায়ের কাপ নিয়ে ভিতরে এল বেয়ারা। কাপটা টাপুরদির সামনে টেবিলের উপর রেখে জিজ্ঞাসা করল আর কিছু লাগবে কি না। টাপুরদি মাথা নাড়তে লোকটি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। চায়ের কাপটার দিকে তাকিয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল।

অম্লানবাবু সেদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যাক, কাজের কথায় আসা যাক। আমি জানি না বাবার হত্যার ব্যাপারটা নিয়ে পুলিশ কী ভাবছে। এই ব্যাপারে আমায় কমিশনারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি এই ব্যাপারে কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভের নাক গলানো পছন্দ করছি না। কিন্তু আমার মায়ের আবার আপনাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। তাঁর ইচ্ছে, পুলিশ যা করছে করুক, ডিটেকটিভ ম্যাডামকেও নিজের মতো কাজ করতে দেওয়া হোক। আমার মা খুব একগুঁয়ে। তাই মায়ের যখন ইচ্ছে, তখন আপনারা কাজ করুন। কিন্তু, তদন্তের স্টেপস যেন আমাকে জানানো হয়। আমার সেক্রেটারির নম্বর নিয়ে যাবেন যাওয়ার সময়।’

তারপর টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘সুবিনয় মুখার্জির অফিসে আপনিই তো গিয়েছিলেন, তাই না?’

টাপুরদি চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বাহ, চা-টা ভালো।’ তারপর অম্লানবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, ‘হ্যাঁ, আমিই গিয়েছিলাম। সঙ্গে আমার এই বোনটি।’

অর্জুনদার মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে অম্লানবাবু টাপুরদিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তন্ময়ের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল?’

টাপুরদি বলল, ‘আপনারাও তো খুঁজছেন। আপনাদের সোর্সও অনেক বেশি আমার থেকে। তো আপনারাই যদি ওকে না পান, আমি কী করে পাব বলুন তো?’

একেই বোধ হয় বলে সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি। অম্লানবাবু এবার অর্জুনদার দিকে তাকালেন। বললেন, ‘আপনি এবার আসতে পারেন অফিসার। আমি একটু ডিটেকটিভ ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলব।’

অর্জুনদা ও টাপুরদির মধ্যে চকিতে একবার চোখাচোখি হল। তারপর অর্জুনদা বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।

অর্জুনদা পুরোপুরি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করলেন অম্লান চক্রবর্তী। তারপর টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখুন, আপনি তদন্ত যেমন করছেন করুন। তবে পুলিশকে সব তথ্য দেওয়ার দরকার নেই। আপনি আপনার ফাইন্ডিংস আমায় জানাবেন। আর তন্ময়কে পেলে সেটাও আমাকে আগে জানাবেন। আর সুবিনয়কে কিছু বলার দরকার নেই। তন্ময়ের ব্যাপারেও নয়।’

টাপুরদি কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে অম্লানবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘রেখাদেবীকে যারা খুন করেছে, তাদের কে পাঠিয়েছিল অম্লানবাবু? আপনি, না সুবিনয় মুখার্জি?’

অম্লানবাবুর মুখের রেখায় একসঙ্গে অনেকরকম অভিব্যক্তি খেলে গেল। চিবিয়ে চিবিয়ে তিনি বললেন, ‘কী বলতে চান আপনি?’

টাপুরদি মৃদু হেসে সহজ কণ্ঠে বলল, ‘আপনার না বোঝার মতো কিছু তো জিজ্ঞাসা করিনি আমি। খুব সহজ একটা প্রশ্ন করেছি শুধু। এর মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই। তবে জবাবটা আপনি দেবেন কি না, সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। জবাব দিন আর না দিন, আমি উত্তরটা খুঁজে বার করে ফেলব। আর শুনুন, আমি সরকারের বেতনভুক কর্মচারী নই। কাউকে কোনো জবাব দিতেও বাধ্য নই। আমি জানি, আপনার অনেক ক্ষমতা। আপনি চাইলে আমার কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারেন। আমার লাইসেন্স ক্যানসেলও করে দিতে পারেন। এমনকী রেখাদেবীর মতো আমাকেও সরিয়ে দিতে পারেন সহজেই। তা আপনার যা ইচ্ছে আপনি করুন। কিন্তু আমায় কিনতে চেষ্টা করবেন না প্লিজ।’

অম্লানবাবুর কেবিন থেকে বেরিয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘চা-টা কীভাবে খেলে তুমি? আমার তো ভয়ে বুক কাঁপছিল। অম্লানবাবু বললেন, ওই চা খেয়েই তো…’

‘ধুর বোকা,’ হেসে বলল টাপুরদি, ‘সেই চায়ের কৌটো এখন পুলিশের জিম্মায়।’

‘তাহলে অম্লানবাবু যে বললেন?’ আমি বললাম।

‘আমাদের সঙ্গে একটু প্যাকটিক্যাল জোক করছিলেন,’ বলে হাসল টাপুরদি।

৩৩

গেটের বাইরে অর্জুনদা দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের অপেক্ষায়। আমরা বেরোতেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল টাপুরদির দিকে। টাপুরদি হেসে বলল, ‘যাওনি তুমি এখনও?’

উত্তর না দিয়ে অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী বললেন?’

‘তেমন কিছু না। একটু আমায় বাজিয়ে দেখছিলেন আর কী।’

আমি কথা বলতে যেতেই টাপুরদি আমার হাতে দিল এক রামচিমটি। আমি ঢোঁক গিলে চুপ করে গেলাম। টাপুরদি হেসে অর্জুনদাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি এখন অফিসে ফিরবে?’

‘হ্যাঁ, তোমরা বাড়ি যাবে তো?’ অর্জুনদা জিজ্ঞাসা করল।

টাপুরদি মাথা নাড়ল অন্যমনস্কভাবে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখলাম, পার্টি অফিসের উলটো ফুটে কয়েক পা দূরে একটা চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে আছে একটা লোক, দৃষ্টি আমাদের দিকেই নিবদ্ধ। লোকটাকে কোথাও দেখেছি বলে মনে হল। কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না কোথায় দেখেছি। আমরা যখন গাড়িতে উঠে বসছি একবার পিছু ফিরে দেখলাম, লোকটাও দোকানের সামনে রাখা বাইকে স্টার্ট দিল।

অর্জুনদা পুলিশের জিপে অফিসের দিকে রওনা হয়েছে একটু আগে। টাপুরদি ড্রাইভিং সিটে বসে সামনের ফ্রন্ট মিররটা অ্যাডজাস্ট করে নিল। আমি বললাম, ‘টাপুরদি, পেছনের লোকটা…’

‘দেখেছি,’ বলল টাপুরদি, ‘ফলো করছে।’

‘কে লোকটা চিনতে পারলে? মুখটা চেনা লাগছে। ঠিক মনে পড়ছে না।’

‘সুবিনয় মুখার্জির অফিসের স্টাফ। অফিসেই দেখেছিস,’ বলল টাপুরদি।

‘তার মানে সুবিনয় মুখার্জি আমাদের পেছনে লোক লাগিয়েছে?’ বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘তাই তো দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা,’ বলে হাসল টাপুরদি। বলল, ‘চল, আজ একটু কলকাতা ঘোরা যাক।’

সারাটা দিন ঘুরে বেড়ালাম আমরা। অফিসের কাজের চাপে, ব্যস্ততার মাঝে কতদিন এভাবে একটা পুরো দিন কাটানো হয়নি। কতদিন এভাবে উদ্দেশ্যহীনভাবে তিলোত্তমার বুকে ঘুরে বেড়ানো হয়নি। গড়ের মাঠে বাদাম খেলাম, অ্যাকাডেমিতে এক্সিবিশন দেখলাম, কত বছর পরে আবার আজ জাদুঘরে গেলাম, পার্কস্ট্রিটের রেস্তরাঁতে দুপুরের লাঞ্চ সারলাম। সারাদিন ধরে লোকটা আমাদের পিছু ছাড়ল না দেখলাম।

গাড়িতে করে বাড়ি ফেরার রাস্তায় আমি জিজ্ঞাসা করলাম টাপুরদিকে, ‘কী বুঝছ?’

টাপুরদি ড্রাইভ করতে করতে সামনে রাস্তায় চোখ রেখে মুচকি হেসে বলল, ‘রাজনীতি ব্যাপারটাই বড়ো ঘোরালো রে মিতুল। আসলে রাজনীতি বলা ভুল, বলা ভালো ক্ষমতার লোভ। সেই লোভ মানুষের ভিতরকার যাবতীয় ভালো প্রবৃত্তিগুলোকে নষ্ট করে ফেলে। পরিবর্তে সেখানে জায়গা করে নেয় ঈর্ষা, অবিশ্বাস। অম্লানবাবু ও সুবিনয়বাবু ছোটোবেলাকার বন্ধু। কিন্তু এই মুহূর্তে দুজনের সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বের মধ্যে আটকে নেই। সম্পর্কটা এখন লেনদেনের, পাওয়া ও পাইয়ে দেওয়ার, স্বার্থের। আর সেই কারণে দুই বন্ধুর সম্পর্কেও এখন এসেছে অবিশ্বাস। একদিকে অম্লানবাবু অনেক কিছু সুবিনয়বাবুর কাছ থেকে গোপন করে চলেছেন। অপর দিকে, সুবিনয়বাবুও অম্লানবাবুকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না। তাই লোক লাগিয়েছেন অম্লানবাবুর অফিসের দিকে নজর রাখার জন্য। অফিসে কে আসছে কে যাচ্ছে, সব খবর সেই লোক পৌঁছে দেয় সুবিনয়বাবুর কাছে। তুই হয়তো খেয়াল করিসনি, আমরা যখন অফিস থেকে বেরিয়ে অর্জুনের সঙ্গে কথা বলছিলাম, লোকটা মোবাইলে ফোনে কথা বলছিল। সম্ভবত সুবিনয়বাবুকে জানাচ্ছিল আমাদের ব্যাপারে। এরপর সুবিনয়বাবুর নির্দেশেই আমাদের ফলো করতে শুরু করে।’

‘কী কাণ্ড গো টাপুরদি,’ আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, ‘এরা নাকি বন্ধু! এ কেমন বন্ধুত্ব?’

হাসল টাপুরদি। বলল, ‘এ-রকম বন্ধুত্ব না বোঝাই ভালো রে। মোদ্দা কথা হল, সুবিনয়বাবু অম্লানবাবুকে ব্ল্যাকমেল করে টিকিট পেয়েছেন। জিতেও যাবেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে। সেক্ষেত্রে পার্টির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর সুযোগ তিনি পেয়ে যাবেন। অম্লানবাবুর হাতে সুবিনয়বাবুর দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া ছাড়া গতি নেই এই মুহূর্তে। আর স্বাভাবিক কারণেই সেগুলো তিনি যে খুব খুশিমনে মানছেন এমন নয়।’

‘তাই অম্লানবাবু চান, যাতে আমি গোপনে তন্ময়ের খবর তাকে এনে দিই। এই কথাগুলি তিনি তো আর পুলিশকে বলতে পারেন না। তাই প্রাইভেট ডিটেকটিভ পেয়ে ভাবলেন, তন্ময়কে খুঁজে পেলে টাকার বিনিময়ে আমি তন্ময়কে খুঁজে তাঁর হাতে তুলে দেব। আবার এদিকে সুবিনয়বাবুও গদি না পাওয়া অবধি অম্লানবাবুকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। ফলে তাঁর গতিবিধি জানার জন্য অফিসের সামনে লোক লাগিয়েছেন।’

‘বাপ রে,’ মাথায় হাত দিয়ে বললাম আমি, ‘কী নাটক! কিন্তু সেই লোক তো আমাদের পিছে পিছে সারাদিন ধরে সারা শহর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন অম্লানবাবুর অফিস পাহারা দেবে কে?’

‘তোর কি মনে হয় একজনই লোক ছিল ওখানে? আশেপাশে পার্টি অফিস ঘিরে অন্তত তিন-চার জন লোক আছে। এক্কেবারে যাকে বলে আঁটসাঁট পাহারা, ‘পালাবার পথ নাই’ গোছের।’

আমি হেসে বললাম, ‘যাই বলো টাপুরদি, লোকটা কিন্তু আজকে দারুণ জব্দ হয়েছে। সারাদিন ধরে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বেজার মুখ করে সারা কলকাতা চরকিপাক মেরে বেড়াতে হয়েছে বেচারাকে। মোকাম্বোর সামনে তো লোকটার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের পারলে ভস্ম করে দেবে। খিদে পেয়েছিল বোধ হয়।’

‘সুবিনয়বাবুও ঘোড়েল লোক রে মিতুল। ফোনে আমাদের কথা জানতে পেরে ঠিক সন্দেহ করেছে যে তন্ময়ের ব্যাপারে হয়তো অম্লানবাবু আমাদের সাহায্য চাইবেন, বা হয়তো আমরা তাকে সাহায্য করছি,’ বলল টাপুরদি।

‘তার মানে হল, এখন তন্ময়কে নিয়ে অম্লানবাবু ও সুবিনয়বাবুর মধ্যে টাগ অফ ওয়ার চলছে। তাই তো?’

‘হুম, অনেকটা সেরকমই দাঁড়াচ্ছে বই কী!’ বলল টাপুরদি।

সারা শহর ঘুরে টাপুরদির ফ্ল্যাটের গেট দিয়ে যখন আমাদের গাড়ি ঢুকছে, হাতঘড়িতে সন্ধে পৌনে সাতটা বাজে। রিয়র মিররে দেখলাম আমাদের অনুসরণকারী লোকটি কিছু দূরে একটা দোকানের সামনে বাইক থামাল, তারপর হতাশ দৃষ্টিতে আমাদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বার করল। সেদিকে তাকিয়ে আমি আর টাপুরদি দুজনেই হেসে উঠলাম। হাসতে হাসতেই বললাম, ‘ইউনিকর্ন মশাই এবার রাগে-দুঃখে মাটিতে শিং ঘষবে।’

৩৪

অর্জুনদার ফোনটা এল রাত ন’টা নাগাদ। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে চুপচাপ সোফায় এসে বসল টাপুরদি। তাকে যেন একটু চিন্তিত দেখাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী হল? কোনো সমস্যা?’

টাপুরদি মাথা নেড়ে বলল, ‘তা সমস্যা তো বটেই। বড়োসড়ো সমস্যা। পেনড্রাইভটা খোলা যতটা সহজ মনে হয়েছিল, ততটা সহজ হচ্ছে না। বিটলকার পাসওয়ার্ড ব্রেক হয়ে গেছে। পেনড্রাইভে কয়েকটা ফোল্ডার আছে। তার মধ্যে দুটোতে তেমন কোনো কাজের জিনিস নেই বলল। একটাতে রিদ্ধিমার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে তোলা বেশ কিছু ফোটো আছে, আরেকটাতে কিছু কম্পিটিটিভ এক্সামের স্টাডি মেটেরিয়ালস। কিন্তু তিন নম্বর ফোল্ডারটা থ্রি স্টেপ পাসওয়ার্ড দিয়ে সুরক্ষিত করা। অর্জুন জানাল, সেটা খুলতে সমস্যা হচ্ছে। সাইবার সেলের লোক চেষ্টা করছে। হয়তো একটু সময় লাগবে, কিন্তু হয়ে যাবে বলল। তন্ময় টেকনিক্যালি বেশ সাউন্ড ছিল, সন্দেহ নেই।’

‘যাহ, তাহলে তো কেসটা আবারও ঝুলে গেল,’ বললাম আমি।

‘একটু পিছিয়ে গেল বটে। আমরা আসলে এই পেনড্রাইভটার উপরে বড্ড বেশি নির্ভর করে ছিলাম। এখন যতদিন না পাসওয়ার্ড ব্রেক করা যাচ্ছে, আমাদের অন্যান্য দিকগুলোও খতিয়ে দেখতে হবে। অন্যভাবে এগোতে হবে। সময় বেশি নেই। আগামী সপ্তাহে উপনির্বাচন। তার আগে তন্ময়কে খুঁজে বার করার চেষ্টা করতে হবে,’ বলল টাপুরদি।

‘উপনির্বাচনের আগে কেস সলভ করতে হবে বলছ? কেন? মানে কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে কি?’ কৌতূহল চাপতে না পেরে জানতে চাইলাম আমি।

‘কেস সলভ তো করতে হবেই। অমিয়বাবুর হত্যারহস্য নিয়ে যদি মাথা নাও ঘামাই, তন্ময়কে খুঁজে বার করাটা জরুরি। আমরা এখনও জানি না ও কী অবস্থায় আছে, কোথায় আছে। দ্বিতীয়ত, তন্ময়ের অন্তর্ধানের সঙ্গে যে সবচেয়ে বেশি গভীরভাবে জড়িত, সে হল সুবিনয় মুখার্জি। এ ছাড়া অম্লান চক্রবর্তী তো আছেনই। আগামী সপ্তাহেই অম্লানবাবুর শপথগ্রহণ। অর্থাৎ এর পরে তিনি এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। সেক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা এক লহমায় অনেকটাই বেড়ে যাবে। ইলেকশনে জিতে গেলে সুবিনয়বাবুর ক্ষেত্রেও সেই একই কথা প্রযোজ্য। সুতরাং বুঝতেই পারছিস, সেক্ষেত্রে এদের মধ্যে কেউ যদি অপরাধী হন, বা কোনোভাবে অমিয়বাবুর হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকেন, কিংবা যদি সেসব কিছু নাও হয়, তবু তন্ময়ের বিপদ বাড়বে বই কমবে না। তাই আমি চাইছি, তার আগেই কেসটার গভীরে পৌঁছাতে। তুই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস যে এই কেসে আমাদের অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। সুতরাং তাঁদের শক্তি আরও বেড়ে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়,’ বলে মৃদু হাসল টাপুরদি।

‘তাহলে এখন কী কর্তব্য?’ জানতে চাইলাম।

‘ছবি দেখি আপাতত,’ বলে উঠে গিয়ে শোওয়ার ঘর থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে ফিরে এল।

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কীসের ছবি?’

‘পেনড্রাইভে কিছু ছবি আছে একটা ফোল্ডারে, বললাম না তোকে?’ টাপুরদি বলল।

‘ওহ, অর্জুনদা পাঠিয়েছে? কিন্তু সে তো বললে রিদ্ধিমার সঙ্গে তন্ময়ের ছবি। সে দিয়ে কী হবে?’

‘কী দিয়ে কী হয়, কে বলতে পারে রে? নেই কাজ তো খই ভাজ। ছবি দেখতে দোষ কী?’ টাপুরদি গুগল ড্রাইভে লগ ইন করতে করতে বলল।

মোট তিনশো সাতাশিখানা ছবি রয়েছে দেখলাম গুগল ড্রাইভে শেয়ার করা ফোল্ডারে। আগে রিদ্ধিমার মোবাইলে তন্ময়ের ছবি দেখেছি। এখানে আরও ভালো করে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে অনেক ছবি দেখে বুঝলাম, তন্ময় যথেষ্ট সুদর্শন। রিদ্ধিমার মতো সুন্দরীর পাশে একেবারেই বেমানান লাগে না দেখতে। ছবিগুলো পর পর দেখতে থাকলাম। বেশিরভাগ ছবিই কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় তোলা হলেও দেখলাম দিঘা, ডায়মন্ড হারবারেও দুজনের ছবি আছে। কিছু ছবি তো যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ। টাপুরদি অলস চোখে ছবিগুলোতে আলগা দৃষ্টি বোলাচ্ছে দেখলাম। কিছু ছবিতে দেখা যাচ্ছে অনেক বাক্স প্যাঁটরার মাঝখানে দুজনে হাসিমুখে বসে আছে। পরের ছবিটাতে তন্ময় কাঁধে করে একটা কার্টন তুলছে হাসিমুখে। একটা সেলফিতে দেখলাম, ছড়ানো জিনিসপত্রের মাঝে মেঝেতে বসে তন্ময় একটা সবুজ রঙের ডায়েরিতে খুব মন দিয়ে কিছু দেখছে, আর রিদ্ধিমা পাশে উবু হয়ে বসে হাসিমুখে সেলফিটা তুলেছে। অথচ তন্ময়ের সেদিকে দৃষ্টি নেই।

ছবিটা টাপুরদি অন্যগুলির মতো দ্রুত পেরিয়ে গেল না। মন দিয়ে দেখল সময় নিয়ে। পরের ছবিটাতে দেখলাম রিদ্ধিমা একটা কার্টনে কিছু বাসন-কোসন ঢোকাতে ঢোকাতে ঠোঁট উলটে দুঃখী মুখ করে সেলফি তুলেছে। বুড়ো আঙুল দিয়ে পেছনে সেই সবুজ ডায়েরিতে মুখ গুঁজে বসে থাকা তন্ময়ের দিকে নির্দেশ করছে। এই ছবিতেও তন্ময় একইভাবে একই জায়গায় ডায়েরি নিয়ে বসে আছে। টাপুরদি নড়েচড়ে বসল। পরের বেশ কয়েকটা ছবিতে তন্ময় ও রিদ্ধিমাকে জিনিসপত্র গোছগাছ করতে দেখা গেল। টাপুরদি নিঃশব্দে আঙুল দিয়ে দেখাল, সব ক-টি ছবির ফ্রেমে সবুজ ডায়েরিটা দেখা যাচ্ছে হয় তন্ময়ের হাতে অথবা টেবিলের উপরে।

টাপুরদি দ্রুত হাতে মোবাইল ফোনটা হাতে তুলে নিল। রিদ্ধিমার নম্বর ডায়াল করল ফোনটা স্পিকারে দিয়ে। বার দুয়েক রিং হতেই ওপারে রিদ্ধিমার কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

‘হ্যালো!’

হ্যালো রিদ্ধিমা, আমি সংঘমিত্রা বলছি।’

‘মিস ব্যানার্জি, তন্ময়ের কোনো খবর পেলেন?’

‘না রিদ্ধিমা, এখনও পাইনি। তোমার কাছ থেকে একটা ইনফর্মেশন চাই,’ বলল টাপুরদি।

ফোনের ওপাশে রিদ্ধিমার দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট শোনা গেল। বলল, ‘হ্যাঁ বলুন, কী জানতে চান!’

টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘রিদ্ধিমা, আপনারা কি ইদানীং বাড়ি শিফট করেছিলেন?’

‘হ্যাঁ,’ রিদ্ধিমা বলল, ‘তবে ইদানীং ঠিক নয়, দুই মাস আগে। আসলে মা মারা যাওয়ার পর মায়ের ফ্ল্যাটে আমার থাকতে আর ভালো লাগছিল না। খুব একা হয়ে গেছিলাম ওই সময়ে। অত বড়ো ফ্ল্যাটে আমি একা মানুষ, মন টিকত না একদম। তখন তন্ময়ই বলেছিল, ওই ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে নতুন ফ্ল্যাট কেনার কথা। সেইমতো আমি কাছেপিঠেই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মায়ের পুরোনো ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দিই। কিন্তু কেন জিজ্ঞাসা করছেন? এর সঙ্গে তন্ময়ের নিরুদ্দেশ হওয়ার সম্পর্ক কী?’

টাপুরদি বলল, ‘সম্পর্ক আছে কি না, সেটা এখনই বলা সম্ভব নয় রিদ্ধিমা। যাই হোক, এই শিফটিংয়ের সময় কি তন্ময় আপনাকে সাহায্য করেছিল?’

‘হ্যাঁ, নইলে আমার একার পক্ষে অত জিনিসপত্র নিয়ে শিফট করা সম্ভব ছিল না। আগের ফ্ল্যাটটা অনেক বড়ো ছিল। তিনটে বেডরুম ছিল। বড়ো ড্রয়িংরুম, মায়ের স্টাডি ছিল। এখন আমি যেই ফ্ল্যাটে থাকি, সেটা টু বিএইচকে। ছোটো, তবে কোজি। বেশ কিছু পুরোনো জিনিসপত্র, ফার্নিচার অনলাইন স্টোরে বিক্রি করে দিতে হয়েছে,’ রিদ্ধিমা বলল।

‘সে ঠিক আছে। আপনি আমায় বলুন, সেইসব জিনিসপত্রের মধ্যে কি কোনো সবুজ রঙের ডায়েরি ছিল?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।

রিদ্ধিমা বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কী করে জানলেন? হ্যাঁ, আমার মায়ের প্রচুর বইপত্র, ফাইল, কাগজপত্র একটা ট্রাঙ্কে ছিল। কোনো কাজের না, সব মায়ের পুরোনো সব প্রজেক্টের হাবিজাবি জমানো রিপোর্ট, হাতে লেখা নথি এইসব। আমি তো ফেলেই দিতাম। তন্ময় সেগুলো ঘেঁটে দেখতে বসল। ওই ওখান থেকেই একটা সবুজ ডায়েরি বেরিয়েছিল। আমার মায়ের জিনিস। তন্ময় ওটা নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে উলটেপালটে দেখছিল।’

‘আপনি কি দেখেছেন সেই ডায়েরিতে কী ছিল?’ জানতে চাইল টাপুরদি।

‘না, মার কাজের ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না কোনোদিনই’, অভিমানী গলায় বলল রিদ্ধিমা, ‘সত্যি কথা বলতে কী, আমার আর মায়ের মধ্যে সম্পর্কে উষ্ণতার একটু অভাব ছিল। মা আমার থেকে নিজের কাজকে বেশি ভালোবাসতেন। আই গ্রিউ আপ হেটিং মাই মাদার’স ওয়ার্ক।’

টাপুরদি উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘সেই ডায়েরি এখন কোথায় রিদ্ধিমা?’

‘তা তো বলতে পারব না,’ রিদ্ধিমা টাপুরদির যাবতীয় উত্তেজনায় জল ঢেলে দিয়ে বলল, ‘ওই দিনের পর থেকে আমি তো আর দেখিনি ডায়েরিটাকে। অত জিনিসপত্র ওলটপালট হয়েছিল সেই সময়। একটা ছোট্ট ডায়েরি নিয়ে মাথা ঘামাইনি আর। ট্রাঙ্কের সব কাগজপত্র রদ্দিওয়ালাকে বেচে দিয়েছিলাম। ওর সঙ্গে চলে গেছে হয়তো।’

‘একটু মনে করার চেষ্টা করুন রিদ্ধিমা। শেষ কখন ডায়েরিটাকে দেখেছিলেন আপনি? বাই এনি চান্স, তন্ময় কি ওটা নিয়ে গেছিল?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘আমার ঠিক মনে পড়ছে না মিস ব্যানার্জি। তবে তন্ময় যদি নিয়ে যায়, সেটা আমার জানা নেই। নিলেও সেই নিয়ে আমি বদার্ডও নই। ওটা আমার কোনো কাজের জিনিস নয়। তন্ময় যদি নেয় তো নিতেই পারে। সেজন্য কী হল? আমি কিছু বুঝতে পারছি না,’ একটু যেন বিরক্ত স্বরেই বলল রিদ্ধিমা।

টাপুরদি একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘ঠিক আছে। আপনার যদি কিছু মনে পড়ে আমায় জানাবেন।’

কথোপকথন শেষ করে ফোন অফ করল টাপুরদি। আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার টাপুরদি? তোমার কি মনে হয় ডায়েরিটা সত্যিই এতটা ইম্পর্ট্যান্ট?’

‘জানি না রে মিতুল। তবু কোথাও থেকে একটা তো শুরু করতে হবে,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল টাপুরদি। তারপর মনযোগ সহকারে ছবিগুলো দেখতে থাকল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *