কৃষ্ণগহ্বর – ৪০

৪০

‘কী জানতে চান বলুন, বেশি টাইম দিতে পারব না,’ সনাতন বিশ্বাস বললেন।

এই মুহূর্তে সনাতন বিশ্বাসের অফিস ঘরে বসে আছি আমরা। এই অবধি আসতে আমাদের বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। টাপুরদি আজ সকালেই সনাতন বিশ্বাসের সেক্রেটারিকে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিল নিজেদের রিপোর্টার হিসেবে পরিচয় দিয়ে। রিপোর্টার জানার পরেও সনাতন বিশ্বাস রাত দশটায় আসতে বলেন। কিন্তু এখানে এসে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম, তাতে মনে হচ্ছে না এলেই ভালো হত।

সনাতন বিশ্বাসের বয়স পঞ্চান্নর আশেপাশে হবে। তাঁর ইতিহাস ভূগোল সম্পর্কে কিছুটা খোঁজখবর নিয়েই এসেছিলাম। দক্ষিণ চবিবশ পরগনার একটি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত বিধায়ক তিনি। ওই কেন্দ্র থেকেই বরাবর তিনি দাঁড়িয়ে আসছেন। যদিও এর আগে মাত্র একবারই জিতেছেন। প্রায় তিরিশ বছর ধরে রাজনীতি করছেন, অমিয়বাবুর দলে আছেন বছর দশেক ধরে। আগে অন্য দলে ছিলেন, কিন্তু সেখান থেকে নিয়মভঙ্গের জন্য বিতাড়িত হন। তারপর অমিয়বাবুর দলে যোগ দেন। কিন্তু অমিয় চক্রবর্তীও তাঁর ব্যবহারে সন্তুষ্ট ছিলেন না। শেষের দিকে ফাটলটা আরও গভীর হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু সনাতন বিশ্বাসের কেন্দ্রে তাঁর কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্যতা আছে, আর তাঁর বেশ কিছু বশংবদ নেতা ও বিধায়ক আছে, সর্বোপরি সনাতন বিশ্বাসের সোজা ও বাঁকা পথে উপার্জিত প্রচুর টাকা আছে ভোট কেনার মতো, তাই ভোটের আগে অমিয় চক্রবর্তী তাকে সরাতে চাননি। কিন্তু সনাতন বিশ্বাসের ধারণা ছিল, তিনি অমিয় চক্রবর্তীর মন্ত্রীসভায় থাকবেন। তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ করেননি অমিয় চক্রবর্তী।

সনাতন বিশ্বাস আদতে দক্ষিণ চবিবশ পরগনার ফুলডুবি গ্রামের ছেলে। স্কুলের গণ্ডি পেরোননি। অসামাজিক কাজকর্মে হাত পাকিয়েছিলেন কৈশোর থেকেই। অল্পবয়সেই এলাকায় বেশ দাদা হয়ে ওঠেন। সেখান থেকে সোজা উড়ান রাজনীতিতে। নানান ঘাটের জল খেয়ে আপাতত অম্লানবাবুর দলে আছেন। বেশ বড়ো প্রাচীর ঘেরা চারতলা বাড়ির একতলায় তার অফিস। এলাকার লোকেরা নানান প্রয়োজনে দেখা করতে আসে এমএল-এর সঙ্গে। আমাদের সামনের বারান্দায় পাতা সার সার বেঞ্চের একটাতে বসে অপেক্ষা করতে হল। একজনকে জিজ্ঞাসা করতে জানলাম, এমএলএ সাহেব অফিসেই আছেন। জরুরি মিটিং চলছে। ঘরের দরজা বন্ধ। এখন রাত বলেই বোধ হয় দর্শনাভিলাষীদের ভিড় নেই। আমাদের পাশের বেঞ্চে লুঙ্গি আর ফেজ টুপি পরা এক গ্রাম্য চেহারার লোক বসে আছে। উদাস দৃষ্টিতে আকাশের তারা দেখছে। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে জরুরি মিটিং শেষ হল। দরজা খুলে একটি বছর বিশ-বাইশের রোগা বউ মাথায় ঘোমটা টেনে বেরিয়ে এসে আমাদের পাশের বেঞ্চে বসা বুড়োটার কাছে এসে দাঁড়াল। বুড়ো লোকটার উদাস দৃষ্টি এতক্ষণে বেশ সজাগ হয়ে উঠেছে। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘কী রে, জমিটার কথা কী বলল সাহেব? ফয়সালা আমাদের হকে হবে তো?’

বউটি মুখে কিছু না বলে মাথা নীচু করে উপর-নীচে মাথা নাড়ল। বুড়োটা আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘কালকে আবার আসতে হবে?’

বউটি এবার আমাদের দেখতে পেল। সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর না দিয়ে বারান্দা থেকে নেমে হনহন করে বাইরের দিকে হাঁটা দিল। বুড়োও তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম আমি। টাপুরদি দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরেছে দেখলাম। আমি বললাম, ‘চলো টাপুরদি, ফিরে যাই। অর্জুনদা ঠিকই বলেছিল। লোকটা ভালো না। তার উপর এত রাত হয়ে গেছে।’

‘চিন্তা করিস না। অর্জুন বাইরে আছে। একটা কল করলেই চলে আসবে। আর আমি তো আছিই। চল, কাজটা যেটা করতে এসেছি, করে নিই।’

সনাতন বিশ্বাসের অফিসঘরটা বেশ বড়ো। একটা বড়ো সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পেছনে একটা দামি রিভলভিং চেয়ার ও সামনে পরপর চারখানা চেয়ার রাখা। ঘরের একপাশে আরও পাঁচ ছ’টা চেয়ার সারি দিয়ে রাখা আছে দেখলাম। বোঝা যায়, এই ঘরে বেশ লোকসমাগম হয়। একপাশে একটা বেড কাম ডিভান রাখা আছে। সেদিকে তাকিয়ে অস্বস্তিতে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। আমরা ঢুকতেই সনাতন বিশ্বাস উদ্ধত গলায় বলল, ‘কী জানতে চান বলুন। বেশি টাইম দিতে পারব না।’

টাপুরদি বলল, ‘আপনার একটা ইন্টারভিউ চাই। ফোনে বলেছিলাম সকালে।’

সনাতন বিশ্বাস এবার টাপুরদি ও আমার সারা শরীরের উপর আলগোছে দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। তারপর টেবিলের সামনে ঝুঁকে এসে বললেন, ‘এই যে রাতবিরেতে ইন্টারভিউ করে বেড়াও, বাড়ির লোকে কিছু বলে না?’

সনাতন বিশ্বাসের মুখ থেকে ভকভক করে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। কথা জড়িয়ে আসছে। টাপুরদি মুচকি হেসে মাথা নাড়ল, বলল, ‘না তো, কই কিছু তো বলে না।’

‘এইজন্যই তো। এইজন্যই মেয়েদের সঙ্গে এত রেপ হয়,’ মাথা নেড়ে একটা বিচ্ছিরি হাসি হেসে সনাতন বিশ্বাস, ‘মেয়েমানুষের জায়গা হল ঘরে। বয়স তো খুব কম বলে মনে হয় না। বিয়ে-থা করে সংসার সামলাও, বাচ্চা মানুষ করো। তা না করে রাতবিরেতে ছেলেদের মতো রাস্তায় ঘুরে যদি বলো রেপ কেন হল, তাহলে চলবে? অ্যাঁ? ছেলেদের মুখের সামনে খাবার সাজিয়ে দিয়ে বলবে, খেল কেন, চলবে তাহলে?’

একটু আগে এই ঘর থেকে মেয়েটির মাথা নীচু করে ঘোমটা টেনে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল আমার। তার উপর এইসব কথাবার্তা শুনে গা-টা ঘিনঘিন করে উঠল। কী অসহ্য নোংরা লোক এই সনাতন বিশ্বাস। ছি!

টাপুরদির মাথা আমার থেকে অনেক ঠান্ডা। আমি এক ঝটকায় চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতে গেলাম। টাপুরদি টেবিলের তলা দিয়ে আমার হাত চেপে ধরল। সনাতন বিশ্বাসের কথার জবাব না দিয়ে মুখের হাসি বজায় রেখে বলল, ‘তাহলে ইন্টারভিউটা শুরু করি?’

টেপ রেকর্ডারটা বার করে টেবিলের উপর রাখল টাপুরদি। সেদিকে তাকিয়ে সনাতন বিশ্বাস বললেন, ‘করুন।’

‘আপনি তো অনেক বছর ধরে রাজনীতিতে আছেন। কীভাবে রাজনীতিতে এলেন আপনি?’

সনাতন বিশ্বাস একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘সেসব অনেক গপ্পো। রাজনীতিতে আসার আগে আমি সমাজসেবা-টেবা করতাম আর কী। বিনয় বোস তখন বিরোধী নেতা। তা বিনয় বোসের এক খুড়তুতো ভাই ছিল মোহন। মোহন আমার বন্ধু মানুষ। মানে এক বোতলের ইয়ার আর কী। এসব আবার লিখবেন না যেন। তা বন্ধুর জন্য একটু-আধটু কাজকর্ম করে-টরে দিতাম। তা মিথ্যে বলব না, সেও আমাকে সময়-অসময়ে নানান লাফড়া থেকে বাঁচাত। পরে ভাবলাম, কদ্দিন আর অমন চরে বেড়িয়ে জীবন কাটাব। মোহনকে ধরে দলে নাম লেখালাম। তিরিশ বছর ধরে রাজনীতি করছি ম্যাডাম।’

টাপুরদি খুব সহমর্মী মুখ করে বলল, ‘সে তো বটেই। আপনার মতো পোড়-খাওয়া রাজনীতিবিদ রাজ্য রাজনীতিতে ক-জন আছেন? আমার তো ধারণা ছিল এবার আপনি একটা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব পাবেন। সেটা হল না দেখে শুধু আমি কেন, বহু মানুষ খুব অবাক হয়েছেন। এটা কিন্তু খুব অন্যায় হল আপনার সঙ্গে। আপনি তো দলকে কম দেননি।’

সনাতন বিশ্বাসের চোয়াল কঠিন হল। গম্ভীর গলায় বলল, ‘দেবে না মানে? শালা শুয়োরের বাচ্চা, আলবাত দেবে। সনাতন বিশ্বাসকে চেনে না শালা। এই সনাতন বিশ্বাস চাইলে ওদের সরকার বানানোর স্বপ্নে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিতে পারে বুইলেন?’

টাপুরদি মুখ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে বলল, ‘সেই তো, অমিয় চক্রবর্তীর কাছে আপনি গিয়েছিলেন। তা তিনি নাকি রাজি হননি আপনাকে মন্ত্রীত্ব দিতে। আপনার নিশ্চয়ই খুব রাগ হয়েছিল, তাই না? আপনার জায়গায় আমি হলে তো রাগের চোটে খুনই করে ফেলতাম।’

সনাতন বিশ্বাস চোখ পিটপিট করে তাকালেন টাপুরদির দিকে। নেশার ঘোরে ভদ্রলোক বোধ হয় ভুলেই গেছের যে রেকর্ডার অন আছে। খিকখিক করে হেসে বললেন, ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। সনাতন বিশ্বাস অত সহজে কাউকে ছাড়ে না। সনাতন বিশ্বাসের ল্যাজে পা দিলে পোকার মতো পিষে মারে সনাতন বিশ্বাস। মরতে হল তো অমিয় চক্কোত্তিকে? কি?’

টাপুরদি বিগলিত হেসে বলল, ‘আমি কিন্তু আপনার দারুণ ফ্যান, স্যার। আপনি যদি অমিয় চক্কোত্তিকে এমনি ক্ষমা করে দিতেন, তাহলে আমার ভালো লাগত না। কিন্তু এখন অম্লান চক্কোত্তি কি আপনাকে মন্ত্রিত্ব দেবে?’

‘দেবে দেবে। না দিলে ওর দশাও ওর বাপের মতো হবে। আমি সনাতন বিশ্বাস। আমার সঙ্গে লাগতে এলে ফল ভালো হয় না,’ চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন সনাতন বিশ্বাস। আমার সারা শরীর শিউরে উঠল। মনে হল, এই রাতে প্রেতপুরীর মতো এই বাড়িতে একটা লম্পট মাতাল ক্রিমিনালের সামনে বসে এভাবে সহজভাবে কথা বলতে কীভাবে পারে টাপুরদি? ভয়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে ছুটে পালিয়ে যাই এখান থেকে।

হাই তুললেন সনাতন বিশ্বাস তারপর জিব উলটে টাকরায় একটা অশালীন শব্দ করলেন। তারপর অর্ধনিমীলিত চোখে একটা ইশারা করে বললেন, ‘এবার যাও মামনিরা। বেশি রাত অবধি সনাতন বিশ্বাসের গুহায় থাকতে নেই। যাও যাও।’

রেকর্ডার বন্ধ করল টাপুরদি। সনাতন বিশ্বাস লাল চোখে সেদিকে তাকিয়ে জিভ দিয়ে নীচের ঠোঁট চেটে বললেন, ‘ইন্টারভিউটা ডিলিট করে দিয়ো মামনি। এসব ছাপতে নেই। কচি কচি মেয়ে তোমরা, রাস্তাঘাটে কখন কী হয়ে যায় বলা তো যায় না। দুনিয়া খুব খারাপ, বুইলে না?’

উঠে দাঁড়াল টাপুরদি। বেরিয়ে যেতে যেতে আবার পেছন ফিরে দাঁড়াল। বলল, ‘ধনঞ্জয় মণ্ডলকে তাহলে আপনিই পাঠিয়েছিলেন অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করতে?’

বুকটা কেঁপে উঠল আমার। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল যেন। টাপুরদি ও সনাতন বিশ্বাস একে অপরের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি টাপুরদির হাত ধরে টানলাম, ফিসফিস করে বললাম, ‘চলো, প্লিজ।’

টাপুরদির ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চল।’ তারপর সনাতন বিশ্বাসের দিকে একবারও না তাকিয়ে ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে এল টাপুরদি।

৪১

‘ইউ আর জাস্ট ইনকারিজিবল, টাপুর! তুমি ওরকম পরিস্থিতি দেখেও কীভাবে ভিতরে গেলে? তোমার ফিরে আসা উচিত ছিল,’ অর্জুনদা বলল, ‘তুমি জানো, এখানে আমার কতটা টেনশন হচ্ছিল? দোষটা আমার। সনাতন বিশ্বাসের রেপুটেশন জানার পরেও তোমার অদ্ভুত সব আইডিয়ায় আমার রাজি হওয়াই উচিত হয়নি।’

সনাতন বিশ্বাসের বাড়ির গেট থেকে বেরিয়ে এখনও আমি স্বাভাবিক হতে পারিনি। এর আগেও বিভিন্ন কেসের সূত্রে নানারকম লোকেদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সময়ে-অসময়ে সাংঘাতিক সব লোকেদের ডেরায় হানা দিতে হয়েছে। কিন্তু সনাতন বিশ্বাসকে সামনে থেকে দেখে মনে হল, এই লোক হাসতে হাসতে মানুষ খুন করতে পারে। চোখের দৃষ্টি কী বিশ্রী, ছি, এমন মানুষ নাকি জনপ্রতিনিধি! এদের হাতেই দেশের রাশ। ভাবতে লজ্জা হয় এই দেশ পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। অথচ, এমন সব নোংরা মানুষ সেই গণতন্ত্রের কাঠামো।

অর্জুনদা বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই অপেক্ষা করছিল। আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। অর্জুনদার সামনে পৌঁছেই গড়গড় করে ভিতরের সব কাহিনি উগরে দিলাম। অর্জুনদার কথা শুনে টাপুরদি শুধু বলল, ‘যাওয়াটা দরকার ছিল অর্জুন। দরকার না থাকলে তো যেতাম না।’

অর্জুনদা আর কথা বাড়াল না। গম্ভীর মুখে বলল, ‘গাড়িতে ওঠো।’

সারা রাস্তা কেউ কোনো কথা বলল না। আমারও কথা বলতে ইচ্ছে হল না আজ। সনাতন বিশ্বাসের কথা মনে হলেই যেন বিবমিষা জাগছে। বাড়ির সামনে নেমে টাপুরদি বলল, ‘অর্জুন, আমার কাছে এখন সব কিছুর চেয়ে তন্ময়কে বাঁচানোটা বেশি জরুরি। তার জন্য যদি আমায় বাঘের গুহায় ঢুকতে হয়, তাও ঢুকব। একটা মানুষের জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মুহূর্তে আমার কাছে আর কিছু নয়। আশা করি তুমি বুঝবে।’

আমি দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকাটা সমীচীন বোধ করলাম না। সম্পর্কগুলো সবসময় সোজা পথে হাঁটে না জানি। বিস্তর চড়াই-উতরাই বন্ধুর পথ অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে, মতপার্থক্য সত্ত্বেও পরস্পরের মতকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই একটা সম্পর্ক পূর্ণতা পায়। টাপুরদি আর অর্জুনদার সম্পর্কটার শুরু থেকে সাক্ষী থেকেছি আমি। আমি জানি, অর্জুনদা ও টাপুরদির দুজনের মনেই পরস্পরের প্রতি সেই শ্রদ্ধার জায়গাটা আছে। আজ হয়তো দুজনের মধ্যে দূরত্ব এসেছে। কিন্তু আমি নিশ্চিত, দুজন পরিণত মনের মানুষ নিজেদের ইগোকে সম্পর্কের মাঝে আসতে দেবে না।

রাতে ঘুম ভালো হল না। ঘুমের মধ্যেও সনাতন বিশ্বাস ফিরে ফিরে আসছিল দুঃস্বপ্ন হয়ে। সকালে উঠে চটপট তৈরি হয়ে নিলাম। গতকালই অর্জুনদা অম্লান চক্রবর্তীর একমাত্র মেয়ে মৌবনী সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জোগাড় করে দিয়েছিল টাপুরদিকে। আগেই টাপুরদির মুখে শুনেছিলাম, অম্লান চক্রবর্তীর স্ত্রী বিয়ের পর বছর দুয়েকের মধ্যেই আত্মহত্যা করেন। তাঁদের একটি মেয়ে আছে যে তার দাদু-দিদার কাছে থাকে। পরশুদিন টাপুরদির মুখে মৌবনী চক্রবর্তী নামটা শুনে চিনতে পারিনি। পরে বুঝলাম, এই-ই অম্লান চক্রবর্তীর সেই মেয়ে। কিন্তু সে জ্ঞান হওয়া ইস্তক দাদু-দিদার কাছে মানুষ, এই কেসে তার সঙ্গে দেখা করে লাভ কী হবে সেটা বুঝতে পারিনি। গাড়িতে করে যেতে যেতে সেটাই জিজ্ঞাসা করলাম টাপুরদিকে। টাপুরদি বলল, ‘আমি মৌবনীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি কে বলল তোকে?’

‘মানে?’ বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম আমি, ‘তুমি তো মৌবনীর ঠিকানাই চাইলে অর্জুনদার কাছে।’

‘হুম, তা চাইলাম। কিন্তু সেই ঠিকানায় কি মৌবনী একা থাকে?’ মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

তাই তো। এই কথাটা তো আমার মনে হয়নি। মৌবনী ওর দাদু-দিদার সঙ্গে থাকে। কিন্তু তাঁদেরই বা এই কেসের সঙ্গে কী সম্পর্ক? জানতে চাইলাম টাপুরদির কাছে।

টাপুরদি বলল, ‘সম্পর্ক কিছু যে আছেই, তা বলতে পারি না। কিন্তু অমিয় চক্রবর্তীর ইতিহাস কি শুধু বাইরে বাইরেই খুঁজব রে? ঘরের ভিতরে খুঁজতে হবে না?’

‘কিন্তু সেটা এঁরা কী করে জানবেন? তাও আবার এতদিন পরে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘অম্লান চক্রবর্তীর শ্বশুর-শাশুড়ি মেয়ে হারিয়েছেন। অম্লানবাবু বা তাঁর পরিবারের লোকজনের উপর তাঁদের রাগ থাকা স্বাভাবিক। আর সাধারণত নতুন বিয়ের পর মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি সংক্রান্ত কথাবার্তা বাবার সঙ্গে না হোক, মায়ের কাছে শেয়ার করেই। সুতরাং সেই সূত্রে অমিয় চক্রবর্তীর সংসারের কথা এঁদের কিছুটা হলেও জানা উচিত।’

আমি আর কথা বাড়ালাম না। টাপুরদির মাথার ভিতর কী চলছে সেটা টাপুরদিই জানে।

অর্জুনদার দেওয়া ঠিকানা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হল না তেমন। সিঁথির মোড় পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে বাঁ-দিকের রাস্তা ধরে সামান্য এগোলেই বুক সমান দেওয়াল ঘেরা ছিমছাম দোতলা বাড়ি। গেট খুলে কয়েক পা এগিয়ে গ্রিলের ভিতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে কলিংবেল টিপল টাপুরদি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা। দ্বিতীয়বার কলিংবেল টেপার আগেই একটি সতেরো-আঠারো বছরের ঝলমলে মেয়ে বেরিয়ে এল। এই বয়সের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য বাদ দিলেও মেয়েটির চেহারার মধ্যে অদ্ভুত একটা কোমলতা আছে। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়, মন শান্ত হয়ে আসে।

‘কাকে চাইছেন?’ জিজ্ঞাসা করল মেয়েটি। মনে হল, এই-ই মৌবনী।

টাপুরদি বলল, ‘মৌবনী, বাড়িতে বড়োরা কেউ আছেন?’

অচেনা মানুষের মুখে নিজের নাম শুনে মৌবনী অবাক হল। বলল, ‘দিদান আছে। আসুন, ভিতরে আসুন।’

গ্রিলের গেটের তালা খুলে একপাশে সরে দাঁড়াল মৌবনী। আমরা জুতো খুলে ভিতরে বারান্দায় পা রাখতে সে বলল, ‘আপনারা ভিতরে বসুন। দিদান পুজোয় বসেছে। দাদুন বাজারে গেছে। একটু অপেক্ষা করতে হবে।’

পরদা সরিয়ে বসার ঘরে ঢুকলাম। ছিমছাম পরিপাটি করে সাজানো ঘর। টাপুরদি হেসে বলল, ‘তুমি বোসো, ততক্ষণ বরং তোমার সঙ্গে গল্প করি।’

মৌবনী বেশ সপ্রতিভ মেয়ে। আমাদের মুখোমুখি চেয়ারে বসল। বলল, ‘আপনারা কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন? দিদান, না দাদুন?’

টাপুরদি মুচকি হেসে বলল, ‘যদি বলি তোমার সঙ্গে?’

‘আমার সঙ্গে? কেন?’ খুব অবাক হয়ে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল মৌবনী।

টাপুরদি সেকথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কী পড়ো?’

‘ক্লাস টুয়েলভে পড়ি। এই বছর বোর্ড দেব,’ বলল মৌবনী।

‘কোথায় পড়ো?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।

‘অক্সিলিয়াম কনভেন্টে,’ উত্তর দিল মৌবনী।

‘সাবজেক্ট?’

‘হিউম্যানিটিজ,’ বলল মৌবনী, ‘তবে আমার লিটারেচার পড়তেও খুব ভালো লাগে।’

‘তাই? বাহ! খুব ভালো। কার লেখা পছন্দ?’ টাপুরদি জানতে চাইল। মনে হচ্ছে টাপুরদি যেন হালকা চালে আড্ডা দিতে এসেছে এখানে।

‘আমি সব পড়ি, জানেন। কিচ্ছু ছাড়ি না। বাংলা, ইংরেজি দুই ভাষাতেই যা বই পাই, পড়ে ফেলি। রোজ নিয়ম করে খবরের কাগজ পড়ি। এটা অবশ্য দাদুন শিখিয়েছে। দাদুন আমায় লাইব্রেরিতেও মেম্বারশিপ করিয়ে দিয়েছে। তবে এই বছর বোর্ড তো। তাই বাধ্য হয়েই রাশ টানতে হচ্ছে একটু,’ হেসে বলল মৌবনী।

‘তা তো হবেই। ক’টা দিন একটু মন দিয়ে পড়ে নাও। তারপর অন্য বই পড়ার অনেক সময় পাবে। এরপর কী নিয়ে পড়াশোনা করতে চাও? কী হতে চাও?’

মৌবনী মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘দেখি রেজাল্ট কী হয়।’

এবার টাপুরদি সামান্য গম্ভীর গলায় বলল, ‘তুমি জানো আমরা এখানে কেন এসেছি?’

‘না,’ মাথা নাড়ল মৌবনী।

টাপুরদি বলল, ‘তুমি তো রোজ খবরের কাগজ পড়ো বললে। অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর খবর পড়েছ নিশ্চয়ই?’

মৌবনীর মুখ এবার গম্ভীর হল। মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘পড়েছি।’

‘কে রে মৌ? কে এসেছে?’ বলতে বলতে এক বয়স্ক মহিলা ঘরে ঢুকলেন। আমাদের দেখে অবাক দৃষ্টিতে একটু থমকালেন। তারপর বললেন, ‘আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না।’

টাপুরদি উঠে দাঁড়াল। আমিও দাঁড়ালাম। দুই হাত জোড় করে নমস্কার করে টাপুরদি বলল, ‘আমার নাম সংঘমিত্রা ব্যানার্জি। আমি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আর এ হল আমার সহকারী, তথা বন্ধু মৈথিলী সেন।’

‘গোয়েন্দা? গোয়েন্দা কেন?’ আঁতকে উঠলেন ভদ্রমহিলা।

‘ওঁরা অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর ব্যাপারে জানতে এসেছেন,’ বলল মৌবনী।

‘অমিয় চক্রবর্তী? এখানে কেন? আমরা কী জানি?’ প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন ভদ্রমহিলা। ধপ করে চেয়ারে বসে গড়গড় করে যন্ত্রের মতো বললেন, ‘এখানকার ঠিকানা কোত্থেকে পেলেন আপনারা? মৌ কিছু জানে না। ও বাচ্চা মেয়ে। আপনারা এখান থেকে যান।’

টাপুরদি নরম গলায় বলল, ‘আপনি ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করব না। মৌবনী খুব ছোটো। ওর মনের উপর যাতে কোনো চাপ না পড়ে, সেটা দেখা আমার কর্তব্য। আর সত্যি বলতে কী, মৌবনীর সঙ্গে নয়, বরং আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই আমি।’

‘আমার সঙ্গে? আমার সঙ্গে কী কথা? আমরা কেউ কিছু জানি না। আমাদের বিরক্ত করবেন না। অমিয় চক্রবর্তীর ব্যাপারে আমরা কী করে জানব?’ বলে প্রায় কেঁদে উঠলেন ভদ্রমহিলা। মৌবনী গিয়ে দিদানের কাঁধে হাত রাখল। চাপা গলায় বলল, ‘আহ দিদান, অমন করছ কেন? ওঁরা কী জানতে চান শোনোই না!’

‘কে কী জানতে চায় রে?’ বলে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বাইরে থেকে বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আমাদের দেখে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘আপনারা? আপনাদের তো ঠিক…’

কথা শেষ করার আগেই মৌবনী বলল, ‘দাদুন, এঁরা অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যুর ব্যাপারে কথা বলতে এসেছেন, প্রাইভেট ডিটেকটিভ।’

টাপুরদি নিজের কার্ড এগিয়ে দিল ভদ্রলোকের হাতে। সেটায় চোখ বুলিয়ে একবার মৌবনীর দিকে, একবার নিজের স্ত্রীর দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে টাপুরদির দিকে তাকালেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, ‘বসুন। কী জানতে চান বলুন। শুধু একটা অনুরোধ। মৌ খুব ছোটো। ওকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না। যা জানতে চান, আমাদের জিজ্ঞাসা করুন। আমি বলব।’

ভদ্রলোকের স্ত্রী ককিয়ে উঠলেন, ‘কী বলছ তুমি? তুমিই না বলেছিলে, ওই বাড়ির কথা, ওদের সম্পর্কে কোনো কথা এই বাড়িতে আর কোনোদিন আলোচনা হবে না?’

ভদ্রলোকের চোয়াল শক্ত হল। বললেন, ‘বলেছিলাম। ভেবেছিলাম মৌকে ওই বাড়ির আওতা থেকে বের করে আনব। ওকে সুস্থ পরিবেশে বড়ো করব। কিন্তু এখন মৌ বড়ো হয়েছে। কতদিন আর এভাবে ওকে সব থেকে দূরে রাখা সম্ভব? আজ না হয় কাল এই পরিস্থিতির সম্মুখীন ওকে হতেই হবে। ওর জীবনের সিদ্ধান্ত ওকেই নিতে হবে। তার চেয়ে এই-ই ভালো।’

৪২

‘আপনার মেয়ে মধুরিমা অম্লান চক্রবর্তীর স্ত্রী ছিলেন। শুনেছি তিনি আত্মহত্যা করেন। কেন?’ সরাসরি জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

মৌবনীর দাদুন একটু চুপ করে থেকে বলতে শুরু করলেন, ‘কোত্থেকে শুরু করি? আমার নাম অনিমেষ রায়। আমার স্ত্রী নীলিমা। মধুরিমা, আমাদের একমাত্র মেয়ে। লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল, জানেন? ছোটো থেকেই খুব চুপচাপ, শান্তশিষ্ট প্রকৃতির মেয়ে ছিল ও। পাড়ার সক্কলে খুব ভালোবাসত ওকে। ভালো গান গাইত, ছবি আঁকত, কবিতা লিখত। ভীষণ অভিমানীও ছিল। বকার দরকার পড়ত না ওকে। তবু যদি ওর মা কোনো কারণে বকত, কখনো উত্তর দিত না মেয়েটা। শুধু কয়েকদিনের জন্য ভীষণরকম চুপ হয়ে যেত।’

‘কলেজে পড়াকালীন অম্লানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হল ওর। অম্লানের বাবা অমিয় চক্রবর্তী তখন এ রাজ্যের ডাকসাইটে বিরোধী নেতা। সরকারে না থাকলেও তাঁর দাপট কম নয়। অম্লানও কলেজে রাজনীতি করত। কে জানে কেমন করে আমার শান্তশিষ্ট মেয়েটা অমিয়র প্রেমে পড়ল!

‘আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ। আমি সরকারি চাকরি করতাম। তিন বছর আগে অবসর নিয়েছি। আমাদের জীবনযাপন খুব সাধারণ। একটা মাত্র মেয়ে। লেখাপড়া শিখবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দেব এ-রকমই আমি ও আমার স্ত্রী ভেবে রেখেছিলাম। বিশাল কিছু স্বপ্ন আমাদের ছিল না। অমিয় চক্রবর্তীর ছেলে ওদের সঙ্গে পড়ত জানতাম। কিন্তু মধু কলেজে রাজনীতির ধার মাড়াত না কখনো। কীভাবে যে ওদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হল আমাদের জানা নেই।’

‘মধুর মুখেই জানতে পেরেছিলাম আমরা। ও কিছু লুকায়নি আমাদের থেকে। কোনোদিন মুখ ফুটে আমাদের থেকে কিছু চায়নি মেয়েটা। সেদিন চেয়েছিল। ও অম্লানকে ভালোবেসেছিল, বিয়ে করে সারাজীবন একসঙ্গে কাটাতে চেয়েছিল। খুব সরল ছিল আমাদের মেয়েটা, জানেন। বোঝেনি, ওদের সঙ্গে আমাদের মেলে না। ওরা আমাদের থেকে আলাদা। ওদের পারিবারিক মূল্যবোধ, নিয়মনীতি আমাদের মতো নয়। অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল ওর মা। সেদিন যদি আমাদের কথা মেনে নিত, আজ তাহলে হয়তো ও বেঁচে থাকত।’

বৃদ্ধ মানুষ দুটোকে দেখে বড়ো কষ্ট হল। আমার বাবার কথা মনে পড়ে গেল। মেয়েকে হারিয়ে নাতনিকে আঁকড়ে বেঁচে আছে দুটি মানুষ। মনে হল, এখানে না এলেই বুঝি ভালো হত। শুধু এঁদের বেদনার জায়গাটা খুঁচিয়ে তোলা হল।

টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘অম্লানবাবুর বাড়ি থেকে সবাই রাজি ছিলেন?’

মাথা নাড়লেন অনিমেষবাবু। বললেন, ‘নাঃ, ছিলেন না। অম্লানের রাজনৈতিক কেরিয়ার নিয়ে ওর মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। অন্তত অত তাড়াতাড়ি ছেলে বিয়ে করুক, চাননি ওঁরা। সে তো আমরাও চাইনি। কিন্তু ওরা দুজন কাউকে না জানিয়ে বন্ধুদের নিয়ে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করল।’

‘তারপর?’ জানতে চাইল টাপুরদি।

‘তারপর আর কী? আমি সেই সময় খুব রেগে গেছিলাম। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, রাগের থেকে কষ্ট বেশি পেয়েছিলাম। ঠিক করেছিলাম, জীবনে আর মুখ দেখব না মেয়ের। তখন কী আর জানতাম, যে মেয়েটাই সেই ব্যবস্থা করে দেবে?’

অনিমেষবাবুর চোখ ছলছল করে উঠল। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বললেন, ‘মধুর বিয়ের পর থেকে আমার সঙ্গে ওর আর কথাবার্তা হত না। তবে আমার স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলত ও। শত হলেও মা তো। বাবার মতো পাষাণপ্রাণ হতে পারেনি ও। মেয়ে সব কথাই মাকে বলত। বাকি কথাগুলো তাই ও-ই আপনাকে ভালো বলতে পারবে। আমি একটু আসছি। আপনারা কথা বলুন।’

সারা ঘরে পিনপতন স্তব্ধতা নেমে এল। অনিমেষবাবু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। একটুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর নীলিমাদেবী বললেন, ‘বিয়ের পর মধু আর অম্লান এ বাড়িতে এসেছিল জোড়ে, আমাদের আশীর্বাদ নিতে। ইনি কথা বললেন না। আশীর্বাদ করলেন না। বলে দিলেন, মুখ দেখতে চান না ওদের। মেয়েটা মুখ চুন করে চোখের জলে ফিরে গেল। আমি তো মা, কী করে মেয়েকে ত্যাগ করি বলুন তো?’

‘বিয়ের এক সপ্তাহ পরে মধু একদিন ফোন করল আমায়। বলল, শ্বশুর-শাশুড়ি কথা বলেন না ওর বা অম্লানের সঙ্গে। কিন্তু অম্লান খুব ভালোবাসে ওকে। আমি শুনে সুখী হয়েছিলাম। প্রেমের বিয়েতে শুরু শুরুতে অমন রেগে থাকে অভিভাবকরা। আমার ইনিও তো রেগে ছিলেন। স্বামী ভালোবাসে, সেই অনেক। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমি ভুল ভেবেছিলাম।’

‘মধু আমাকে প্রায়ই ফোন করত। ওর সংসারের সব খবরই পেতাম আমি। বিয়ের তিন মাসের মাথায় প্রেগনেন্সি কনফার্ম হল ওর। আমি বুঝতে পারছিলাম না খুশি হওয়া উচিত না দুঃখিত হওয়া উচিত। এত তাড়াতাড়ি সন্তান আসুক চাইনি আমরা। আরেকটু গুছিয়ে নিক ও, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াটা আরও মজবুত হোক, তারপর আসুক সন্তান। কিন্তু যার আসার ছিল, সে তো এলই।’

‘এইসময় থেকেই অম্লান আরও বেশি করে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে থাকল। মধুর কাছে শুনতাম, অম্লান চাইত সদ্যোজাত মেয়ের কাছে থাকতে, স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটাতে, কিন্তু ওর বাবা-মা চাইতেন না অম্লান সংসারে জড়িয়ে যাক। একটা সময় নাকি অম্লান সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে চাকরিবাকরি করবে, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার করবে। ওর আর ভালো লাগছিল না পলিটিক্স। ও সাধারণের জীবন চাইছিল।’

‘বাচ্চা হওয়ার পর থেকেই অম্লানের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। অমিয় চক্রবর্তী অম্লানকে পার্টির কাজে বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে শুরু করেন। অবশ্য অমিয়বাবু বাড়িতে খুব কম সময়ই কাটাতেন। ছেলের সংসারে নাক গলানোর মতো সময় তাঁর ছিল না। কিন্তু মধুর শাশুড়ি চাইতেন অম্লান রাজনীতিতে আসুক। ছেলের প্রতি তাঁর ভীষণরকম অধিকারবোধ ছিল। অমিয়বাবুকে দিয়ে তিনিই অম্লানকে আরও বেশি করে রাজনৈতিক কাজকর্মে যুক্ত করতে থাকেন। ঝগড়াঝাঁটি করার মতো শাশুড়ি তিনি ছিলেন না। আমি বারদুয়েক দেখেছি ওঁকে। ব্যবহারে কোনো খুঁত পাবেন না আপনি। কিন্তু কথা বলে স্বস্তি হয় না।’

‘অম্লান যত বাইরের দুনিয়ায় জড়িয়ে পড়তে থাকল, মধু তত একা পড়ে যেতে থাকল। মেয়েকে নিয়ে সারাদিন কেটে যেত ওর। আয়া, কাজের লোক সবই ছিল। তেমন কোনো কাজও করতে হত না ওকে। তবু যেন ভিতর থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছিল মেয়েটা। মাঝেমধ্যেই অম্লানের সঙ্গে তুমুল ঝগড়া হত। মধু চাইত অম্লান ওকে, ওদের মেয়েকে আরও সময় দিক। অম্লানের কাছে আর সংসারে সময় কাটানোর মতো সময় ছিল না। যত দিন যাচ্ছিল, ততই ও আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়ছিল রাজনীতিতে। ততদিনে ওর মাথা থেকে নতুন বিয়ে, নতুন বউয়ের নেশা কেটে গেছে। রাজনীতি ছেড়ে সাধারণ জীবনযাপন করার ভূতও মাথা থেকে নেমে গেছে।’

‘কবে কোন মুহূর্তে আমার মেয়েটা একাকিত্বে ভুগে ভুগে মনের অসুখ বাধিয়ে বসেছিল, কে জানে? শেষের দিকে আমাকেও ফোন করা কমিয়ে দিয়েছিল। আমি ফোন করলেও ওর গলাটা কেমন বিষণ্ণ, ক্লান্ত শোনাত। আমি বলেছিলাম, ‘ক’টাদিন বাড়িতে এসে থেকে যা।’ বলত, ‘বাবা কি আমাকে মেনে নেবে?’ আমি বলেছিলাম, ‘তোর বাবাকে বোঝানোর দায়িত্ব আমার। তুই ওসব ভাবিস না মা। তুই বাড়ি আয়।’ কিছু বলত না। আমার স্বামীকে তো আমি জানি। প্রথমে রাগ করলেও পরে মেয়ের জন্য সারাক্ষণ মন খারাপ থাকত তাঁর। ভেবেছিলাম ওর বাবাকে রাজি করিয়ে দুইজনে মিলে ও বাড়িতে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসব। কিন্তু মেয়েটা সেই সময়ই দিল না। তার আগেই কাণ্ডটা করে বসল। পরে শুনেছি, ওর নাকি ডিপ্রেশনের চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমরা সেসব কিচ্ছু জানি না। মধু কখনো আমাদের সেই বিষয়ে কিছু বলেনি। সেরকম কিছু হলে তো আমি জানতাম, বলুন?’

এতক্ষণ নীলিমাদেবীর কথা শুনে যাচ্ছিলাম চুপচাপ। তিনি থামতে টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘মধুরিমার মৃত্যুর পর অম্লানবাবুর কী প্রতিক্রিয়া ছিল?’

নীলিমাদেবী বললেন, ‘অম্লান সেই সময় ছিল না কলকাতায়। সেই সন্ধেতেই ও বাঁকুড়া গেছিল। যাওয়ার আগে নাকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খুব ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল। মৌয়ের জ্বর ছিল। মধু চেয়েছিল, অম্লান থেকে যাক। কিন্তু অম্লান রাজি হয়নি। বলেছিল, মেয়েকে দেখার জন্য বাড়িতে আরও অনেক লোক আছে। দরকার হলে ডাক্তার বাড়িতে থাকবে সারারাত। কিন্তু ওকে যেতেই হবে। ও চলে যাওয়ার পর মধু দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল কাঁদতে কাঁদতে। তারপর দরজা ভেঙে খুলতে হয় ওর মৃতদেহ বের করার জন্য। ছোট্ট মেয়েটা একা বিছানায় শুয়ে কাঁদছিল। এসব কথা ওদেরই বাড়ির এক কাজের লোকের কাছে আমার শোনা।’

‘আমরা খবর পেয়ে ও বাড়ি যাই। অম্লানও ফিরে আসে। অম্লান খুব কান্নাকাটি করছিল। মধুকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছিল। পাগলের মতো করছিল। তারপর দুইবার অজ্ঞানও হয়ে গেল আমাদের সামনে। অমিয়বাবু ছিলেন বাড়িতে। তিনি ছেলেকে সামলাতে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু অম্লানকে সামলানো যাচ্ছিল না। আমার আর তখন এর বেশি দেখার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না।’

‘মৌবনীকে যে আপনারা আপনাদের কাছে নিয়ে এলেন, অম্লানবাবু আপত্তি করেননি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘না। অমিয়বাবু অবশ্য বাধা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তাঁদের বংশের মেয়ে তাঁদের বাড়িতেই থাকবে। কিন্তু আমার স্বামী তখন হুমকি দিয়েছিলেন, যে মৌকে আমাদের না দিলে তিনি আদালত অবধি যাবেন। এরপর অম্লানের মা-ও বলেন, অম্লান কাজে ব্যস্ত থাকবে, অত ছোটো বাচ্চাকে কে যত্ন-আত্তি করতে পারবে? তার চেয়ে ও আমাদের কাছেই থাকুক। তবে অম্লান আমাদের বাধা না দিলেও চেয়েছিল মেয়ে ওর কাছে থাকুক। বার বার বলেছিল, মধু চলে গেল। মেয়েও যদি না থাকে, তাহলে কী নিয়ে বাঁচবে ও। কিন্তু আমার স্বামী শোনেননি। মৌকে আমরা আমাদের কাছে নিয়ে আসি,’ বললেন নীলিমাদেবী।

‘এখন কি অম্লানবাবু মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘আমি রাখতে দিইনি,’ বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন অনিমেষবাবু। আসত ও এখানে। মেয়েকে দেখতে চাইত। দেখুন, আমরা এ পাড়ায় অনেকদিন ধরে থাকি। অম্লানের মতো হেভিওয়েট নেতা আসা-যাওয়া করলে পড়শিরা কৌতূহলী হয়ে ওঠে। মেয়েকে তো আমরা হারিয়েছি ওই পলিটিক্সের জন্য। নাতনিকে হারাতে চাই না।’

বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি, মৌবনী এগিয়ে এল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘বাবার সঙ্গে আমার দেখা হয়। বাবা মাঝে মাঝে স্কুল ছুটির সময় আমার স্কুলের বাইরে দেখা করতে আসে। ঠাম্মির কাছেও বাবা আমায় নিয়ে গিয়েছে দু’দিন। দাদুন দিদান জানে না। ওঁদের বলবেন না প্লিজ। ওঁরা কষ্ট পাবে।’

টাপুরদি বিস্মিত দৃষ্টিতে মৌবনীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। মৌবনী আবারও সেরকমই মৃদুস্বরে বলল, ‘আপনি তখন জিজ্ঞাসা করছিলেন না, আমি বড়ো হয়ে কী হতে চাই? আমি বাবার মতো পলিটিশিয়ান হতে চাই। ঠাম্মি আমায় বলেছে, আমাদের বংশে রাজনীতি সকলের রক্তে। আমাকেও সেই ধারা বজায় রাখতে হবে। আর হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন, আমার বাবা খুব ভালো, আমায় খুব ভালোবাসে।’

‘মৌ,’ কখন বাইরে বেরিয়ে এসেছেন অনিমেষবাবু খেয়াল করেনি।

আমাদের সামনে এসে হাত দিয়ে গেট খুলে দিলেন তিনি। মৌবনীর দিকে তাকিয়ে বললে, ‘তুই ঘরে যা মা।’

মৌবনী একবার দাদুর দিকে আরেকবার আমাদের দিকে তাকিয়ে ভিতরে চলে গেল। খেয়াল করলাম যাওয়ার আগে টাপুরদির দিকে তাকিয়ে সে চোখের ইশারা করল, যাতে টাপুরদি অনিমেষবাবুকে কিছু বলে না দেয়।

মৌবনী ভিতরে চলে যাওয়া অবধি সেদিকে তাকিয়ে রইলেন অনিমেষবাবু। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বললেন, ‘মৌ আপনাদের কী বলছিল আমি জানি। আমি এও জানি মৌ ওর বাবার সঙ্গে দেখা করে।’

টাপুরদি চোখ সরু করে অনিমেষবাবুর দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘সেই রাগে বুঝি অমিয়বাবুকে খুন করলেন? মেয়েকে হারিয়েছেন। আবার ওরা নাতনির দিকেও হাত বাড়াচ্ছে, রাগ হওয়াই তো স্বাভাবিক। আপনার জায়গায় যে কেউ থাকলে তারও রাগ হত।’

আমি অবাক হয়ে টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। কী বলছে এসব টাপুরদি? অনিমেষবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘আমি জানতাম আপনারা আসবেন। সেদিনের ব্যাপারটা চাপা যে থাকবে না জানতাম। অমিয়বাবুর কেবিনে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল দেখেছি। আর আমিও কাউকে লুকিয়ে যাইনি। আমি অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করেছিলাম, তাঁকে বলেছিলাম যাতে মৌয়ের দিকে হাত বাড়ানোর ভুল না করে।’

‘হুম, জানি তো। কবে যেন গিয়েছিলেন? ওই তো সেদিন না, যেদিন…,’ বলে থেমে গেল টাপুরদি।

অনিমেষবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘সবই তো জানেন, তাহলে জিজ্ঞাসা করছেন কেন? যেদিন অমিয়বাবু খুন হলেন সেদিনই গিয়েছিলাম, সন্ধে ছ’টা নাগাদ। কিন্তু তাঁকে খুন করিনি আমি। তবে লোকটা মরেছে, সেইজন্য একটুও দুঃখ নেই আমার।’

‘ধনঞ্জয় মণ্ডলকে চিনতেন আপনি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘না, পেপারে পড়েছি লোকটা নাকি অমিয় চক্রবর্তীকে খুন করেছে। যা করেছে, বেশ করেছে,’ ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন অনিমেষবাবু।

৪৩

‘কী বুঝলে টাপুরদি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

টাপুরদির দৃষ্টি রাস্তায়। সিঁথির মোড়ের এদিকটায় রাস্তায় খুব ভিড়। অসাবধান হলেই দুর্ঘটনা অবধারিত। তাই চুপ করে ড্রাইভিং-এ মন দিল টাপুরদি। মোড়টা পেরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় এসে বলল, ‘সত্যি কথা বলব? কিছুই বুঝলাম না। যে জন্য গিয়েছিলাম, সেটা আরও গুলিয়ে গেল।’

আমি হেসে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী গুলিয়ে গেল?’

‘অনিমেষবাবু সেদিন অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন। তিনি জানতেন না সিসিটিভি ক্যামেরা খারাপ ছিল। তাই ধরা পড়ে গেছেন ভেবে স্বীকার করে নিলেন। নইলে জানা যেত না,’ টাপুরদি বলল।

‘তোমার কি মনে হয় অনিমেষবাবু অমিয়বাবুকে সত্যিই খুন করতে পারেন?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘না পারার তো কিছু নেই। বয়সটা কোনো ফ্যাক্টর নয়। এমনিতেই তিনি ওদের পরিবারের উপর তীব্র ঘৃণা পুষে রেখেছিলেন দীর্ঘদীন যাবৎ। মেয়েকে হারিয়েছেন তিনি ওদের পরিবারের কারণে। স্বাভাবিকভাবে মৌবনীর দিকে ওদের হাত বাড়ানোটা সহ্য হওয়ার কথা নয় অনিমেষবাবুর পক্ষে।

‘একটা কথা বলব টাপুরদি?’

‘কী, বল!’

‘সেদিন মনে আসেনি। আজ হঠাৎ মনে হল, সেদিন মৃণালবাবু বললেন, ধনঞ্জয়কে তিনি টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই ধনঞ্জয় কৃতজ্ঞ ছিল তাঁর কাছে। এমন কি হতে পারে, যে মৃণালবাবুও দীর্ঘদিন ধরে রাগ পুষে রেখেছিলেন অমিয়বাবুর উপর। তাই…’

ঘ্যাঁচ করে হঠাৎ সজোরে ব্রেক কষল টাপুরদি। রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ একটা বিশাল ষাঁড় নেমে এসেছে।

‘সাবধানে,’ চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। বুঝলাম টাপুরদি একটু অন্যমনস্ক। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমি ড্রাইভ করব?’

‘নাহ, ঠিক আছে,’ বলে হর্ন বাজাল টাপুরদি। ষাঁড়টা ধীরে ধীরে রাজকীয় চালে রাস্তা পার হয়ে সরে গেল।

কিছুটা পথ চুপচাপ পেরোলাম।

‘দেড়দিন চলে গেল,’ বলল টাপুরদি।

আমি কিছুটা অন্যমনস্ক ছিলাম। বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কীসের দেড়দিন?’

‘চারদিনের থেকে দেড়দিন গেল, সেটাই বলছি,’ উদবিগ্ন স্বরে বলল টাপুরদি।

‘হুম,’ একটু থেমে আমি বললাম, ‘আর একটা কথা বলি?’

‘বলে ফেল,’ বলল টাপুরদি।

‘সনাতন বিশ্বাসও কিন্তু খুন করাতে পারে অমিয়বাবুকে। আর কাল রাতে তো সেই কথা নিজের মুখেই বলল লোকটা। সাংঘাতিক লোক সনাতন বিশ্বাস। সব কিছু করতে পারে লোকটা।’

‘তুই কি রহস্য সমাধানের চেষ্টা করছিস, না আরও বেশি কনফিউজ করছিস?’

‘না না। মানে তুমি দেখো, এদের প্রত্যেকেরই কিন্তু স্পষ্ট মোটিভ আছে। ঠিক কি না তুমিই বলো? আর সনাতন বিশ্বাস লোকটা যে একটা জানোয়ার, সে সম্বন্ধে কি সন্দেহ আছে তোমার?’

‘তা ঠিক। লোকটা খুব খারাপ, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার,’ সামনের দিকে রাস্তায় চোখ রেখে বলল টাপুরদি।

‘আর তা ছাড়া, সনাতন বিশ্বাসের মোটিভও স্টং। অমিয় চক্রবর্তীকে ধমকধামক দিয়েও টলানো যাচ্ছিল না কিছুতেই। সুতরাং তাঁকে দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দাও। তাহলেই ল্যাটা চুকে যায়। অম্লান চক্রবর্তী তো শুনলাম সনাতন বিশ্বাসের দাবি মেনেই নিয়েছে। মন্ত্রীসভার যে তালিকা অমিয়বাবু বানিয়েছিলেন, তাতে রদবদল হচ্ছে শুনলাম। সুতরাং সনাতন বিশ্বাসের উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হয়েছে। আর সেদিন অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে শেষ ব্যক্তি সনাতন বিশ্বাসই দেখা করতে এসেছিল।

‘তুই দেখছি সনাতন বিশ্বাসকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিস,’ হেসে বলল টাপুরদি, ‘ভেবে দেখ মিতুল, শুধু ধারণার উপর নির্ভর করে কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানো যায় না। প্রমাণ লাগে। আর চরিত্রহীন হলেই যে কেউ খুনি হবে, এমনটা নাও হতে পারে। এবার বল কী করে প্রমাণ করবি সনাতন বিশ্বাসই আদতে অমিয় চক্রবর্তীর খুনি? ব্যাপারটা অত সহজ নয় রে।’

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। আমাদের গাড়ি এখন যশোর রোড ধরে এগোচ্ছে। সময় কমে আসছে। মনটাও অস্থির লাগছে। টাপুরদি কি হেরে যাবে এবার? কে আছে অমিয় চক্রবর্তীর খুনের পেছনে তা কি আর জানা হবে না? তন্ময় কি হারিয়ে যাবে? কোথায় কীভাবে আছে সে, কে জানে? গতকাল টাপুরদি সারাদিন ধরে বাইরে বাইরে ঘুরে বেরিয়েছে। এ ক’দিন বাড়ি থেকে কাজ করলেও গতকাল একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং-এর জন্য অফিস যেতে হয়েছিল। সারাদিন অফিসের কাজ শেষ করে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরেই আবার ছুটেছিলাম সনাতন বিশ্বাসের ডেরায়। টাপুরদি সারাদিন কী কী করল তা আর জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

এবার জিজ্ঞাসা করলাম, ‘গতকাল সারাদিনে কিছু এগোলে টাপুরদি?’

‘তেমন কিছু না। কয়েকটা ফোন করেছি, কাল কয়েক জায়গায় যেতে হয়েছিল,’ হালকা গলায় বলল টাপুরদি।

‘কোথায়?’ জানতে চাইলাম।

‘অনামিকা রায়ের অতীত খুঁড়ে বার করতে গেছিলাম।’

আমি সোজা হয়ে বসলাম।

‘সে কী? বলোনি তো!’

‘আরে বলার সময়টা পেলাম কোথায়? যা ছোটাছুটি চলছে দু’দিন ধরে,’ টাপুরদি হেসে বলল।

আমার একটু অভিমান হল। সেটাকে প্রকাশ না করে বললাম, ‘কিছু পেলে? গুরুত্বপূর্ণ কিছু?’

‘অনামিকা রায়ের ব্লাড গ্রুপ ও পজিটিভ, তাঁর স্বামীর ব্লাড গ্রুপ এ পজিটিভ, আর তন্ময়েরও এ পজিটিভ,’ অভিব্যক্তিহীন মুখে বলল টাপুরদি।

‘তো? তাতে কী প্রমাণ হয়?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘প্রমাণ তেমন কিছুই হয় না। অমিয় চক্রবর্তীর ব্লাড গ্রুপ বি পজিটিভ, বুঝলি?’

‘নাঃ, কিছু বুঝলাম না,’ বললাম আমি, ‘এর মধ্যে আবার অমিয় চক্রবর্তী এল কোত্থেকে?’

টাপুরদি বলল, ‘কোত্থেকে এল, এল কি আদৌ এল না, সেটা তুই-ই ভাব। একটু তো মাথাটা খাটা। কাল অনামিকা রায়ের কলেজের ও পরবর্তীকালের কিছু বন্ধুবান্ধবের কাছে খোঁজ নিলাম। কলেজে থাকতে অমিয়বাবু তাঁদের কলেজে গেস্ট হিসেবে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু অনামিকা রায়ের সঙ্গে তাঁর কোনোরকম যোগাযোগের কথা কেউ বলতে পারল না। প্রাইমারি স্কুল বোর্ডের অফিসে খোঁজ নিলাম। অত পুরোনো কথা, কে কার ট্রান্সফারের জন্য রেফার করেছিল সেসব আজ আর কেউ মনে রাখেনি। তবে, পার্টির থ্রুতে বদলি-টদলিগুলো হয় অনেকাংশেই। বিভিন্ন পার্টির ইউনিয়ন মেম্বাররা সুবিধে পায়। পার্টির কোটা থাকে। অনামিকাদেবী অমিয়বাবুর পার্টির ইউনিয়নে ছিলেন। সেই কারণে হয়তো ট্রান্সফারটা তিনি রেফার করে থাকতে পারেন।’

‘তার মানে অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে অনামিকা রায়ের ঘনিষ্ঠ কোনো সম্পর্ক ছিল না বলছ?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ তো তাই বলছে,’ ঠোঁট উলটে বলল টাপুরদি।

‘তাহলে সনকাদেবী যে বলেছিলেন, তন্ময় অনামিকাদেবীর অবৈধ সন্তান? সেটা বেসলেস তার মানে?’

‘বেসলেস কি না সেটা নিশ্চিত হয়ে বলি কী করে? রেখাদেবী ছিলেন অনামিকা রায়ের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তিনি কিন্তু বলেছিলেন, এসব অনামিকাদেবীর স্বামীর মিথ্যে সন্দেহ। অনেক খুঁজেও অনামিকা রায়ের সম্পর্কে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কোনো প্রমাণ মেলেনি। আমি অন্তত খুঁজে পাইনি কিছু।’

‘যাক, তাহলে এই অনামিকা রায়ের বিষয়কে আপাতত মাথা থেকে বের করে দেওয়া যেতে পারে। তাই তো?’

‘তোর মৌবনীকে দেখে কী মনে হল মিতুল?’ হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

একটু ভেবে বললাম, ‘ওকে প্রথমে দেখে যেরকম ধারণা হয়, আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও বুদ্ধিমতী।’

‘পলিটিশিয়ান হওয়ার প্রস্পেক্ট আছে বলছিস?’ একটু হেসে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।

‘তা আছে। রক্ত কোথায় যাবে? দাদু-দিদা সারাটা জীবন ওকে রাজনীতি থেকে দূরে রেখে মানুষ করলেন। কিন্তু লাভ কী হল তাতে? মেয়েকে পলিটিক্সই টানছে। রাজনৈতিক পরিবার এঁরা। এই পরিবারের বাচ্চারা রাজনীতি মায়ের পেট থেকে শিখে আসে। সুনয়নাদেবী ওর ব্রেনওয়াশ করেছেন। যাতে বংশপরম্পরায় ক্ষমতা পরিবারের মধ্যেই থাকে। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এঁরা সব করতে পারেন। ইনিও এতদিনে তাই মেয়ের খোঁজ নিচ্ছেন,’ বললাম আমি।

এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এবার টাপুরদির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ভুরু কুঁচকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে কিছু যেন ভাবছে। আমি আর বিরক্ত করা সমীচীন বোধ করলাম না। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তার দিকে চোখ রাখলাম। এগারোটা বাজতে চলল, বাসে ট্রামে অফিসযাত্রীদের ভিড়। আমরা এগিয়ে চলেছি সেই ভিড় ঠেলে। কোথায় পৌঁছোব, সেটাই শুধু জানা নেই।

৪৪

‘কী ব্রাদার, এত মন দিয়ে কী ভাবছ?’ অর্জুনের পিঠে আলতো চাপড় মেরে সিনিয়ার ইন্সপেক্টর রজত দত্ত একটা চেয়ার টেনে পাশে বসলেন। অনেকক্ষণ ধরেই তিনি লক্ষ করছেন, ইন্সপেক্টর অর্জুন টেবিলের উপর রাখা রাইটিং প্যাডে আঁকিবুকি কাটছে। ছেলেটার বয়স কম, একটু বেশিই আবেগপ্রবণ। যেকোনো কেসের ক্ষেত্রে নিজেকে উজাড় করে দেয়। পরিশ্রম করতে পারে খুব। অল্প সময়ের মধ্যেই ডিপার্টমেন্টের সকলের মন জয় করে নিয়েছে অর্জুন। রজত দত্তের নিজের চাকরি জীবনের শুরুর দিনগুলো মনে পড়ে যায়। অমিয় চক্রবর্তীর কেসটার ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই অনেক পরিশ্রম করেছে। এখন কেসটা যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে আর এর পেছনে পরিশ্রম করার অর্থ ভস্মে ঘি ঢালা।

এ-রকমই হয়ে থাকে। প্রায় বাইশ বছরের চাকরি জীবনে কম তো দেখলেন না রজত দত্ত। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে রজত দত্ত জানেন, শুরু শুরুতে অমন উৎসাহ সবার থাকে। তারপর যখন দেখবে এতে করে লাভ কিছু হয় না, তখন শুধু গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে চলা। কত ক্ষেত্রেই তো দিন-রাত নাওয়া-খাওয়া ভুলে পরিশ্রম করে তারপর কেস ছেড়ে দিতে হয়েছে। বেগড়বাই করলে বদলির খাঁড়া মাথার উপর ঝোলে। এই দপ্তরে কাজ করতে হলে নেতা-মন্ত্রীদের সামনে ‘জো হুজুরি’ই দস্তুর। মেনে নিতে পারলে ভালো, না হলে প্রোমোশনের মোড়কে মুড়ে পানিশমেন্ট ট্রান্সফার হাসিমুখে মাথা পেতে নিতে হয়।

অর্জুনের মতো আইপিএস দিয়ে সোজা উঁচু পদমর্যাদায় এসে বসেননি রজত দত্ত। ধীরে ধীরে পরিশ্রম করে একটু একটু করে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উঠে আজ এখানে পৌঁছেছেন। রগের কাছে চুলে যে পাক ধরেছে, সেগুলো এমনি এমনি ধরেনি। এই ডিপার্টমেন্টের হাল-হকিকত তিনি খুব ভালো করে জানেন। এই কেসটা যে ছেড়ে দিতে হবে, সেটা আগেই বুঝেছিলেন রজত দত্ত। এটা শুরুই হয়েছিল, যত শিগগিরই সম্ভব ইতি টেনে দেওয়ার জন্য। নইলে এমন হাই প্রোফাইল কেস অনেক আগেই সিবিআই-এর হাতে দিয়ে দেওয়া হত। আসলে কেউ চায়ই না যে কেসটা সলভ হোক। তার উপর ধনঞ্জয় মণ্ডলকে পেয়ে সকলে হাতে চাঁদ পেয়ে গেল। যেটুকু বা পাবলিকের সামনে তদন্তের নাটকের প্রয়োজন ছিল, সেটুকুও মিটে গেল। অম্লান চক্রবর্তী এখন নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর। একমাত্র একজনই পারতেন চাপ তৈরি করে কেসটাকে চালিয়ে যেতে। তিনি অমিয় চক্রবর্তীর স্ত্রী সুনয়নাদেবী। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, তিনিও আর লড়াইটা চালিয়ে নিয়ে যেতে উদ্যোগী হলেন না। হয়তো, ছেলের কথা, পার্টির ইমেজের কথা ভেবে পিছিয়ে গেলেন তিনিও। কিংবা হয়তো তাঁরাও ধনঞ্জয় মণ্ডলের ব্যাপারটা মেনেই নিয়েছেন। অতীত আঁকড়ে তাঁরাও আর পড়ে থাকতে চান না।

অর্জুন রাইটিং প্যাড থেকে মাথা তুলে বিষণ্ণ হাসি হেসে বলল, ‘কেসটা নিয়ে আমরা এতদিন ধরে বৃথাই খাটলাম, রজতদা!’

রজত দত্ত ফিকে হেসে বললেন, ‘এসব ভেবো না অর্জুন। ভেবো না, কারণ ভেবে লাভ নেই। আমরা সরকারি চাকরি করি। ওপরে যারা বসে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন, তারা যেমন চাইবেন তাই করতে হবে ভাই। জানো তো, কর্তার ইচ্ছেই কর্ম। কেসটা নিয়ে আমরা লড়েছিলাম, দিনরাত পরিশ্রম করেছি, কারণ সেটা আমাদের ডিউটি। কাল আবার নতুন কোনও কেস এলে আবার সেটা নিয়ে খাটব…’

‘আর তারপর উপরতলা থেকে প্রেশার এলে সেটারও ফাইল ক্লোজ করে আবার অন্য কেসে মন দেব? তাহলে পুলিশে কেন এলাম? কর্পোরেট জব অনায়াসে করতে পারতাম। অন্তত নিজের বিবেকের কাছে তো জবাবদিহি করতে হত না তাতে!’ বলল অর্জুন।

রজত কিছুক্ষণ চুপচাপ চেয়ে রইলেন অর্জুনের দিকে। তারপর বললেন, ‘কী করতে চাও তুমি?’

‘আমার চাওয়া না চাওয়াতে কী যায়-আসে, রজতদা? কিছু করার সময় পেলাম কোথায়? ইশ, যদি আর একটু সময় পেতাম! তুমি কেসের রিপোর্ট তৈরি করছ। আর বড়োজোর দুই দিন। ধনঞ্জয় মণ্ডলকেই যদি মার্ডারার ডিক্লেয়ার করে কেস ফাইল ক্লোজ করতে হত, সে তো অনেক আগেই করা যেত। এতদিন খাটলাম কেন আমরা?’

রজত দত্ত গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ঠিক বলেছ অর্জুন। তেমনি এটাও ঠিক যে খেটেও কিছু করতে পারিনি আমরা। যে অন্ধকারে ছিলাম, সেই অন্ধকারেই আছি। ধনঞ্জয় মণ্ডলকে ফ্রেম করা ছাড়া আর কিছু দেখানোর মতো রেজাল্ট আছে কি আমাদের হাতে? সত্যি কথা তো এটাই, অর্জুন, এই কেসে আমরা ফেইল করেছি। এ-রকম হাই প্রোফাইল কেসে সময় পাওয়া যায় না। প্রেস, মিডিয়া, জনতা, উপরওয়ালা সবাই রেজাল্ট চায়। আমরা সেই রেজাল্ট দিতে পারিনি। বরং বলা ভালো, ধনঞ্জয় মণ্ডল মরে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে। আমাদের মুখরক্ষা করেছে। আমি বলব, তুমিও আর এটা নিয়ে ভেবো না। একটা কেস নিয়ে পড়ে থাকলে হবে? সামনে এগোতে হবে না? তোমার বয়স কম, এখনই তো এগোনোর সময়। এসব পলিটিক্যাল কেসে বেশি মাথা গলাতে যেয়ো না। যেচে আগুনে হাত দিতে নেই। তোমার ভালোর জন্যই বলছি।’

অর্জুন চুপ করে রইল। রজত দত্ত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা তুলে বললেন, ‘তুমি কষ্ট পাচ্ছ, তাই বলছি, দুইদিন সময় আছে তোমার কাছে। দুইদিনে যদি কিছু বার করতে পারো, আমায় জানিয়ো। আই প্রমিস ইউ, আমি কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলব। বুঝতেই তো পারছ। আরেকটা কথা, সব কথা সৌরভ স্যারকে জানানোর দরকার নেই। বোঝোই তো, তাঁর উপরেও পলিটিক্যাল প্রেশার আছে। তুমি যদি সত্যিই কিছু বের করতে পারো, সরাসরি আমাকে জানাবে। আমি কমিশনার স্যারের সঙ্গে কথা বলব। আমি আমার রিপোর্টে তোমার ফাইন্ডিংস লিখব।’

‘কিন্তু যদি কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোয় রজতদা?’ অর্জুন জিজ্ঞাসা করল।

রজত দত্ত হাসল। বলল, ‘নো ওয়ারিজ। আমি আছি তো। তবে হ্যাঁ, সময় কিন্তু সেই দুই দিনই। আমার রিপোর্ট তৈরি তার আগেই হয়ে যাবে। শুধু তোমার জন্য আটকে রাখব আমি।’

অর্জুন উঠে দাঁড়াল। ওর মুখটা ঝলমল করছে। রজত দত্তর হাতটা দুই হাত দিয়ে ধরে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ রজতদা। কী বলে যে তোমাকে…’

‘সময়টা কি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েই কাটিয়ে দেবে? যাও। কী করছ, কোথায় যাচ্ছ আমায় জানাবে। বুঝতেই পারছ, রিস্কি অপারেশন। আমার জানা থাকা দরকার, যাতে বাই চান্স তুমি বিপদে পড়লে অন্তত সেখানে ছুটে যেতে পারি। ডিসিডিডিকে আমি ম্যানেজ করে নেব। আমাকে ফোন কোরো। চলো, আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়ো।’

অর্জুন প্রায় দৌড়েই বেরোল বড়ো হল ছেড়ে। সেদিকে তাকিয়ে রজত দত্ত ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসলেন শুধু। তারপর মোবাইল ফোনটা তুলে নিয়ে কাউকে নম্বর মেলালেন। চাপা গলায় কাউকে বললেন, ‘হুম, এখনই বেরোল।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *