৫০
আমাদের গাড়ি সুনয়নাদেবীর বাড়ির সামনে পৌঁছোল যখন, ঘড়িতে রাত সাড়ে ন’টা বাজে। গেটে একজন নিরাপত্তারক্ষী উপস্থিত, চেয়ারে বসে এফএম-এ ফিল্মি গান শুনছে। তাকে আইডি কার্ড দেখিয়ে ভিতরে ঢুকতে পেলাম। এই বাড়িতে জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটি থাকার কথা। কিন্তু খুব বেশি লোক গেটে অন্তত চোখে পড়ল না। বসার ঘরে ঢুকে আমি সোফায় বসলাম। টাপুরদি সোজা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল দেয়ালে লাগানো ছবিগুলোর সামনে। খুব মন দিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল ঘুরে ঘুরে। এমন সময় উলটোদিক থেকে পরদা সরিয়ে মনোময়বাবু এসে ঢুকলেন ঘরে। আমাদের দেখে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আপনারা এসে গেছেন? বসুন। ম্যাডাম আসছেন একটু পরে।’
আমরা বসে আছি, মনোময়বাবুও বুকের কাছে দুই হাত বদ্ধ করে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন পাথরের মতো গম্ভীর মুখে। পরিস্থিতিটা খুবই বিরক্তিকর, মনোময়বাবুর অভিব্যক্তিটাও তাই। এভাবে কেউ মুখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে নিজেদের মধ্যে কথা বলাও মুশকিল। মা-ছেলের সংসার, সারা বাড়িতে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কিছুক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতা নিয়ে বসে রইলাম। ঘরের চারদিকে চোখ বোলানো ছাড়া কোনো কাজ নেই। আগের দিন সকালে এসেছিলাম, তখন দিনের আলোয় ঘরে তবু বুঝি কিছুটা প্রাণের স্পন্দন ছিল। আজ রাতের বৈদ্যুতিন আলো এ ঘরের দীর্ঘশ্বাস, বুক চাপা বেদনা যেন মুছে দিতে পারছে না।
কিছুক্ষণ এভাবেই গেল। খুব রাগ হচ্ছিল, ছুটতে ছুটতে অফিস থেকে এসে ফ্রেশ হওয়ারও সময় পাইনি। পেটের ভিতর ইঁদুর ডন দিচ্ছে। ডেকে এনে এভাবে বসিয়ে রাখার মানে কী?
মিনিট বিশেক পরে পরদা সরিয়ে অম্লান চক্রবর্তী বেরিয়ে এলেন। শরীরী ভাষায় অসন্তাোষ স্পষ্ট। আমাদের দেখে থামলেন। বললেন, ‘আপনারা এখানে? এখন? কী ব্যাপার?’
আমরা উঠে দাঁড়ালাম দুজন। হাতজোড় করে নমস্কার করলাম। অম্লানবাবু রীতিমতো ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, ‘এত রাতে কেন এসেছেন এখানে? এটা কি কারও বাড়িতে আসার সময়? কী দরকার বলুন?’
‘ওদের আমি আসতে বলেছি,’ পেছন থেকে বলতে বলতে সুনয়নাদেবী ঘরে ঢুকলেন।
‘তুমি? কেন? এঁদের সঙ্গে তোমার কী দরকার মা?’ অম্লানবাবু অসন্তুষ্ট স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘কিছু না রে। একটু গল্পগুজব করব। তুই যা না যেখানে যাচ্ছিলি,’ বললেন সুনয়নাদেবী।
‘মা, এটা কারও সঙ্গে গল্পগুজব করার সময়? প্লিজ, এসব বন্ধ করো। আর ভালো লাগছে না আমার। না না, আপনারা এখন যান। কাল সকালে আসবেন না হয়,’ অম্লানবাবু বললেন।
‘আ হা, তুই যা না। তোর দেরি হচ্ছে। তুই তো সারাদিন কাজে কাজে বাইরেই থাকিস। আমার একা একা সময় কাটতে চায় না। নাতনিটা থাকলে তবু গল্পগুজব করে সময় কেটে যেত। যাক গে। তুই অত মাথা গরম করিস না, যা তো এখন,’ বললেন সুনয়নাদেবী।
অম্লানবাবু একবার আমাদের দিকে একবার সুনয়নাদেবীর দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকালেন। মনে হল, মা ও ছেলেতে চোখে চোখে কিছু কথা হল। মনোময়বাবু এগিয়ে এসে বললেন, ‘চলুন, দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
অম্লানবাবু আর কোনো কথা না বলে গটগট করে পা ফেলে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সুনয়নাদেবী। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চলো তোমরা, উপরে বসে কথা বলা যাক।’
সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম আমরা। সুনয়নাদেবী বললেন, ‘চলো বরং ব্যালকনিতে বসি। এই ব্যালকনিটা দক্ষিণমুখী। ভালো হাওয়া আসে। যা প্যাচপ্যাচে গরম পড়েছে।’
আমরা কিছু না বলে ব্যালকনির দিকে এগোলাম। আগের দিনের সুনয়নাদেবীর সঙ্গে আজকের মানুষটির যেন অনেকটা পার্থক্য। দিনের আলো ফুরোনোর সঙ্গে সঙ্গে যেন ক্ষমতার খোলস ছেড়ে ভিতরের মানুষটি বেরিয়ে এসেছেন। আজ অম্লানবাবু যেভাবে কথা বলছিলেন সুনয়নাদেবীর সঙ্গে, আমার সত্যিই খারাপ লাগছিল খুব। বয়স হলে মানুষ বুঝি বা নিজের সন্তানের কাছেও বাতিলের পর্যায়ে পড়ে যায়। সদ্য স্বামী হারিয়েছেন তিনি। মায়ের প্রতি অম্লানবাবুর ব্যবহার দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ব্যালকনিটা বেশ চওড়া। একটা বেতের সোফা আর দুটো চেয়ার রাখা। মাঝে একটা বেতের গোল কফি টেবল। মাঝখানে গোলাকৃতি একটা কাচ বসানো। তার উপর একটা পানমশলার কৌটো আর একটা বই খোলা অবস্থায় উলটো করে রাখা দেখলাম। বোধ হয় সুনয়নাদেবী পড়ছিলেন। তারপর ওভাবে রেখে উঠে এসেছেন। ইংরেজি বই, নাম ‘দাস ক্যাপিটাল’। বইটি সম্পর্কে জানা আছে আমার, যদিও পড়া হয়নি। কার্ল মার্ক্সের লেখা এই বইয়ে তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও দুইয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন।
টাপুরদি বইটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করছিল, ‘দাস ক্যাপিটাল?’
সুনয়নাদেবী টেবিলের উপর রাখা কৌটো থেকে পানমশলা বের করে মুখে পুরলেন। বেশ উগ্র কস্তুরীর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। বইটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, কী আর করব? সারাদিন বই পড়েই সময় কাটে আর কী। তুমি পড়েছ বইটা?’
টাপুরদি বলল, ‘পড়েছিলাম। যদিও অনেক বছর আগে। কলেজ জীবনে একটু রাজনীতি বোঝার শখ হয়েছিল। তখন একটু পড়াশোনা করেছিলাম, যদিও খুব বেশি নয়।’
সুনয়নাদেবী আমাদের সোফায় বসতে ইশারা করলেন, নিজে বসলেন একটা বেতের চেয়ারে। বললেন, ‘খুব ভালো। রাজনীতি বুঝতে গেলে পড়াশোনা করতে হয়। এই পৃথিবীতে কত রকম ইজম, কত মতবাদ, কতরকম রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ। আজ আমি ‘দাস ক্যাপিটাল’ পড়ছি। আগেও বহুবার পড়েছি। গতকাল চরম দক্ষিণপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে পড়ছিলাম। ডান বাম সবরকম রাজনৈতিক মতবাদ সম্পর্কে পড়াশোনা করেছি। রাজনীতিটা শুধু ক্ষমতার জন্য করিনি। রাজনীতি বুঝে, ভালোবেসে রাজনীতিতে এসেছি। অথচ আজকাল ছেলে-মেয়েরা বিন্দুমাত্র পড়াশোনা না করে, সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে না জেনে খুব সহজে সব পেয়ে যেতে চায়। তারা তো কোনো আদর্শকে ভালোবেসে রাজনীতিতে আসে না। তারা পার্টি করতে আসে। যেখানে সুবিধা পায়, দল বদলে সেখানেই যায়। দলের মতাদর্শ সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।’
টাপুরদি মুগ্ধ হয়ে শুনছিল সুনয়নাদেবীর কথা। এবার বলল, ‘আপনি রাজনীতি ছেড়ে দিলেন কেন?’
সুনয়নাদেবীর চোখে যেন বেদনার আভাস ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল।
‘আমি আর অমিয় একসঙ্গে রাজনীতি শুরু করেছিলাম। আমি ছিলাম কলেজ ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি। টানা তিন বছর জিতেছি, জানো?’ সুনয়নাদেবী গর্বিত কণ্ঠে বললেন।
‘তারপর?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘তারপর আর কী? কলেজে থাকতেই তরতর করে পলিটিক্যাল কেরিয়ারে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম দুজনেই। কলেজ থেকে পাশ করে বেরোলাম। ততদিনে রাজনীতিতে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েছি। পড়াশোনা আর কন্টিনিউ করা হল না। মাস্টার্স করার ইচ্ছেটা ততদিনে মন থেকে বিদেয় নিয়েছে। রথীনদার যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ ছিলাম আমি আর অমিয় দুজনেই। যুব রাজ্য দলের সভাপতি হিসেবে আমার মনোনয়ন হল।’
‘আর অমিয়বাবু?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
সুনয়নাদেবী এবার লাজুক হাসলেন। বললেন, ‘আমাদের বিয়েটা কিন্তু প্রেমের বিয়ে। সেই কলেজের প্রথম দিন থেকে ভালো লাগা, তারপর আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের মিল থেকে মনও জুড়ে গেল। একসঙ্গে দুজনে রাজনীতি করেছি। আমি রাজ্য যুব দলের সভাপতি মনোনীত হওয়ার পরেই অমিয় আমায় বিয়ের প্রস্তাব দেয়।’
‘আপনি কি বিয়ের পরেই রাজনীতি ছেড়ে দিলেন?’ জানতে চাইল টাপুরদি।
‘না। ঠিক তা নয়। কিন্তু তখনও আমার শাশুড়ি বেঁচে। তিনি পছন্দ করতেন না আমার রাজনীতি করা। বিয়ের ছয়মাসের মাথায় প্রেগন্যান্ট হলাম। অম্লান এল। ওকে নিয়ে আরও সংসারে জড়িয়ে গেলাম। রাজনীতি থেকে বাধ্য হয়েই সরে আসতে হল।’
টাপুরদি বলল, ‘কিছু মনে করবেন না। আমি শুনেছি, আপনার রাজনৈতিক প্রতিভা অমিয়বাবুর চেয়ে অনেক বেশি ছিল। অনেক সম্ভাবনা ছিল আপনার মধ্যে। তাহলে কেন বরাবরের মতো রাজনীতি ছেড়ে দিলেন আপনি?’
‘কে বলেছে একথা? মৃণালদা, তাই না? তোমরা তো মৃণালদার কাছে গেছিলে খোঁজখবর নিতে,’ মুচকি হেসে বললেন সুনয়নাদেবী।
টাপুরদি উত্তর দিল না।
সুনয়নাদেবী হেসে বললেন, ‘এসব খবর চাপা থাকে না।’
টাপুরদির মুখের দিকে তাকালাম। সুনয়নাদেবী তার মানে আমাদের সব গতিবিধি জানেন। টাপুরদির মুখের রেখা অভিব্যক্তিহীন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তবে মৃণালদা ভালোমানুষ। অমিয়র উত্থানে ওঁর পলিটিক্যাল কেরিয়ারটা নষ্ট হয়ে গেল। কী আর বলব? মৃণালদা খুব আবেগপ্রবণ মানুষ। অত আবেগ দিয়ে রাজনীতি হয় না। অমিয়ও ওঁর সঙ্গে কখনো সম্মুখ সংঘাতে যায়নি, বরং শ্রদ্ধাই করত ও মৃণালদাকে। আমিও করতাম। তবু অভিমান করে রাজনীতি ছেড়ে দিলেন।’
‘কী করে জানলেন মৃণালবাবু অভিমান করে রাজনীতি ছেড়েছেন?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘সব কি বলে দিতে হয়? যোগাযোগ রাখেননি আমাদের সঙ্গে অনেকদিন। তারপর যখন সুপর্ণার ছেলেটা অসুস্থ হল, একদিন পার্টি অফিসে এসেছিলেন মৃণালদা। নাতির রক্ত বদলাতে হত, অনেক টাকার ব্যাপার। অমিয়র কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। অমিয় মেডিক্যাল কলেজে ব্যবস্থা করেও দিয়েছিল। কিন্তু তাতে বোধ হয় মৃণালদা খুশি হতে পারেননি। হয়তো তিনি আর্থিক সাহায্য আশা করেছিলেন। ভদ্র মানুষ তো, মুখ ফুটে চাইতে পারেননি। তবে এরপর থেকে আর যোগাযোগ রাখেননি আমাদের সঙ্গে।
টাপুরদি প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘আপনার রাজনীতি ছাড়ার ব্যাপারে কি অমিয়বাবুর তরফে কোনো চাপ ছিল?’
সুনয়নাদেবী চুপ করে তাকিয়ে রইলেন টাপুরদির মুখের দিকে। তারপর মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘তুমি খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। সব মেয়েদের জীবনেই বোধ হয় এমন একটা বাঁক আসে, যখন নিজের জীবন সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ইচ্ছে থাক বা না থাক, কিছু ছাড়তে হয়। আমিও ছেড়েছি।’
‘সেজন্য কোনো দুঃখ নেই আপনার?’ টাপুরদির জিজ্ঞাসা।
সুনয়নাদেবী মিষ্টি করে হাসলেন। উত্তর দিলেন না কিছু। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘ভালোবাসার মানুষটার জন্য সব ছাড়া যায়, বুঝলে মেয়ে? ভালোবেসেছ কখনো কাউকে? অমিয় আমায় খুব একা করে চলে গেল।’
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘যাই, হোক, তোমরা মৌয়ের সঙ্গে দেখা করেছ শুনেছি। আজ তোমাদের সেইজন্যই ডাকা। একটা অনুরোধ আছে তোমাদের কাছে, মৌকে এসবের মধ্যে জড়িয়ো না। ও বাচ্চা মেয়ে। এসব জটিলতার কিছু বোঝে না ও।’
টাপুরদি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
সুনয়নাদেবী চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন বেশ কিছুক্ষণ। মনে হল, গভীরভাবে কিছু যেন ভাবছেন। তারপর হঠাৎ যেন চটকা ভেঙে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা, অনেক রাত হল। তোমরা এসো এখন।’
সিঁড়ি দিয়ে নেমে বসার ঘরের দরজা দিয়ে বাইরে বেরোলাম। শুনতে পেলাম সুনয়নাদেবী উপরে ব্যালকনিতে বসে আত্মমগ্ন হয়ে গাইছেন, ‘তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়।’ আমার জানি না কেন মনে হল, সেই গানের সুর যেন সব হারানোর হাহাকার তাঁর চার দেয়ালের ব্যর্থ জীবনে মাথা কুটে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
কলকাতার বুকে মধ্যরাত আসে অপ্সরার সাজে। মহানগর ঘুমোয় না কখনো। রাত বাড়ে, নির্জনতার মাঝে তিলোত্তমার মোহিনী রূপ আবেশ ছড়ায়। কোলাহল স্থিমিত হয়ে আসে। সারাদিনের কর্মচঞ্চল শহর তখন যেন রাতের বাসরসাজে স্থিতা প্রেয়সী।
মা ফ্লাইওভার দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলে। আজ এই মুহূর্তে ড্রাইভিং সিটে আমি। টাপুরদি জানালার দিকে মুখ করে চুপ করে আছে। গাড়িতে ওঠার পর থেকে একটা কথাও বলেনি। ওর মনের মধ্যে যে ঝড় চলছে, সেই ঝড়কে ওকে নিজেকেই শান্ত করতে হবে। সব প্রশ্নের উত্তর অন্য কেউ খুঁজে দিতে পারে না। নিজের মনের গহনে ডুব দিতে হয়। দিক, আজ বরং ভাবুক টাপুরদি। শুধু আজ? নাকি কাল, পরশু, আরও কত দিন কে জানে?
রাতের কলকাতার রাস্তায় ড্রাইভ করার একটা আলাদাই অনুভূতি আছে। এক অন্যরকম ভালো লাগা। পাশ দিয়ে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী ট্রাকগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে আপনমনে। আমি এগোই গন্তব্যের দিকে, বাড়ির উদ্দেশ্যে। একসময় মনে হল টাপুরদি বোধ হয় কাঁদছে। কী জানি, আমার ভুলও হতে পারে। গাড়ির ভিতর অন্ধকারে মুখের অভিব্যক্তি বোঝা যায় না। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কানে আসে না। তবু বললাম, ‘অর্জুনদা, অমিয় চক্রবর্তী নয় টাপুরদি। অর্জুনদার মতো মানুষকে ভালোবেসে কিছু ছাড়তে হবে কাউকে, এ আমি বিশ্বাস করি না। এতদিনেও চিনলে না মানুষটাকে?’
৫১
সকালে বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা আমার স্বভাব। কিন্তু আজ সকাল সাতটার আগেই উঠতে হল। টাপুরদি টেনে তুলল। বসার ঘরে টিভি চলছে। ঘুম চোখে হাই তুলতে তুলতে এসে টিভির সামনে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘কী ব্যাপার? আবার কী হল?’
টাপুরদি টিভির দিকে আঙুল দিয়ে নির্দেশ করল। দেখলাম, টিভিতে একটি অল্পবয়সি মেয়ে কেঁদে কেঁদে কিছু বলছে। মেয়েটি আমাদের পূর্বপরিচিত। দুই দিন আগে সনাতন বিশ্বাসের বাড়িতে তাঁর ঘর থেকে রাতের অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে বেরোতে দেখেছি মেয়েটিকে। আজ টিভিতে চারপাশে ঘিরে থাকা সাংবাদিকদের সামনে সে কেঁদে কেঁদে যা বলছে, তার সারমর্ম হল সনাতন বিশ্বাসের কাছে সে তাদের জমি সংক্রান্ত একটা ব্যাপারে ফয়সালার জন্য গিয়েছিল। সনাতন বিশ্বাস ব্যস্ত ছিলেন বলে তাকে রাতে আসতে বলেন। তারপর রাতে একা অফিসঘরে মেয়েটির সম্মানহানি করেছেন সনাতন বিশ্বাস। মেয়েটি এখন তার বিচার চাইছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেদিনকার দাড়িওয়ালা ফেজ টুপি পরা বৃদ্ধ। জানা গেল, মেয়েটির নাম অঞ্জুমা বিবি, সে এই বৃদ্ধের স্ত্রী।
আমি আর টাপুরদি একে অপরের মুখের দিকে বিস্মিত চোখে তাকালাম। বললাম, ‘এসব কী টাপুরদি? মেয়েটি তো একা যায়নি। তাকে জোর করে কিছু করা হয়েছে বলেও সেদিন মনে হচ্ছিল না। বরং মনে হয়েছিল, খেলাটা শুধু একদিনের নয়।’
সংবাদ সঞ্চালক বলছেন, ‘এবার সনাতন বিশ্বাসের পার্টি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই দেখার বিষয়। দল কি একজন ধর্ষণকারীকে আশ্রয় দেবে? সেরকম হলে অমিয় চক্রবর্তীকে যে ভরসা ও বিশ্বাসের সঙ্গে জনগণ ক্ষমতায় এনেছিল, অম্লান চক্রবর্তী হয়তো সেই বিশ্বাসের জায়গাটা হারাবেন। চলুন দেখে নিই সনাতন বিশ্বাস নিজে এই বিষয়ে কী বলছেন?’
একজন তরুণী সাংবাদিক সনাতন বিশ্বাসের বাড়ির সামনের উঠোন দিয়ে বারান্দায় উঠছেন দেখা গেল। সনাতন বিশ্বাসের অফিসঘরে লোকজনকে ঠেলে ঢুকে সোজা সনাতন বিশ্বাসের মুখের সামনে মাইক ধরে বলল, ‘অঞ্জুমা বিবি আপনার নামে যে অভিযোগ এনেছেন, আপনি সে ব্যাপারে কী বলবেন?’
সনাতন বিশ্বাসের চোখ-মুখ বসে গেছে, মাথার চুল উশকোখুশকো, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। হাতের ঝটকায় মাইক সরিয়ে দিয়ে গর্জন করে উঠলেন, ‘কার পারমিশন নিয়ে এই ঘরে এসেছেন?’
মেয়েটি অকুতোভয়। জিজ্ঞাসা করল, ‘জনগণ আপনার বক্তব্য জানতে চায়। অঞ্জুমা বিবির অভিযোগ কতটা সত্যি?’
সনাতন বিশ্বাস রাগে কাঁপছেন। চিৎকার করে বললেন, ‘যান যান, যান এখান থেকে। কে অঞ্জুমা বিবি? কাউকে চিনি না আমি। বেরোন ঘর থেকে।’
‘চিনি না বললে তো চলবে না সনাতনবাবু! অঞ্জুমা বিবি আপনার নামে গুরুতর অভিযোগ এনেছে। তার অভিযোগ, আপনি কাজের অছিলায় এই বাড়িতে ডেকে তাকে ধর্ষণ করেছেন। আপনার কী মনে হয়, এবার দল আপনার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেবে?’
সনাতন বিশ্বাসের মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠেছে। এদিকে সাংবাদিক তরুণী প্রবল উৎসাহে মাইক এগিয়ে একের পর এক প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করে চলেছে। বয়স কম, উৎসাহ প্রচুর। সনাতন বিশ্বাস এবার সংযম হারালেন। প্রচণ্ড রাগে কাঁপতে কাঁপতে মেয়েটির প্রতি একটি অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে এক ঝটকায় মাইক সরাতে গেলেন। ধাক্কায় মাইকটা মেয়েটির হাত থেকে ছিটকে উড়ে গিয়ে লাগল ক্যামেরাম্যানের মুখে। ক্যামেরা দুলে উঠল। পরবর্তী দৃশ্যপট সমুদ্রে প্রবল ঝঞ্ঝাবায়ের মধ্যে খড়কুটোর নৌকোর মতো দোদুল্যমান। ওদিকে স্টুডিয়ো থেকে সূত্র-সঞ্চালক মহাশয় চেঁচিয়ে যাচ্ছেন, ‘রেশমি, তোমরা ঠিক আছ? রেশমি? আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, কীভাবে সনাতন বিশ্বাস স্পটে আমাদের সাংবাদিক রেশমি সেন ও ক্যামেরাম্যান অভীকের উপর আক্রমণ করেছেন।’ দোদুল্যমান ক্যামেরা স্থির হল কয়েক মুহূর্ত পরে। রেশমি সেন হাঁপাচ্ছে রীতিমতো। কতটা সত্যি, কতটা অভিনয় বোঝার উপায় নেই। নিজেই এগিয়ে গিয়ে ক্যামেরা হাতে নিয়ে দেখাচ্ছে, ক্যামেরাম্যান অভীকের ঠোঁট নীল হয়ে ফুলে উঠেছে। রেশমি সেন বলছে, ‘আমাদের দর্শকেরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে সনাতন বিশ্বাসের ব্যবহার। অভীক, এই যে, এদিকে, তোমার ঠোঁটটা দেখাও, আরে ধ্যাত্তেরি, এটা জুম কীভাবে করে, যাক গে এই যে দেখুন, আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন সনাতন বিশ্বাস, যাঁর উপর অঞ্জুমা বিবি ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন, সেই জনপ্রতিনিধির সত্যিকারের চেহারা। এই অভীক, ক্যামেরাটা ধরো, হ্যাঁ এই যে, ক্যামেরায় অভীক বসুর সঙ্গে আমি রেশমি সেন, চ্যানেল আনন্দসংবাদ।’
‘কী বুঝলি?’ টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল।
‘কেসটা কী হল?’ আমি বিস্ময়াহত।
জোরে জোরে হেসে উঠল টাপুরদি। বলল, ‘যে বা যারা এর পেছনে আছে, তারা সনাতন বিশ্বাসের দুর্বলতাগুলোকে খুব ভালো করে জানে। তাই নির্ভুলভাবে ফাঁদ পেতেছে। যে স্বামী জমির সমস্যা সমাধানের জন্য মাঝরাতে স্ত্রীকে এমএলএ-এর সঙ্গে শুতে পাঠাতে পারে, সে আরও বেশি কিছুর জন্য স্ত্রীর সম্মানহানিকে জনসমক্ষে ভাঙিয়ে রোজগার করতে দ্বিধা করবে না, এ তো জানা কথাই। পুরো ব্যাপারটাই প্রিপ্ল্যানড।’
‘কী সাংঘাতিক। কিন্তু কারা আছে এর পেছনে? বিরোধী দল?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি বলল, ‘হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। ভুলে যাস না, সনাতন বিশ্বাস অম্লান চক্রবর্তীকে ব্ল্যাকমেল করছিলেন। তাঁকে মন্ত্রীত্ব দেওয়া না হলে সে তাঁর অনুগামীদের নিয়ে দল ছেড়ে বিরোধী দলে যোগ দেবেন বলে ভয় দেখাচ্ছিলেন।
‘কিন্তু অম্লান চক্রবর্তী তো রাজিও হয়েছিলেন, যদ্দূর শুনেছি,’ বললাম আমি।
‘হয়েছিলেন হয়তো, দায়ে পড়ে। নইলে সনাতন বিশ্বাসের যা রেপুটেশন, তাকে গদিতে বসানোর ভুল কোনো দলই সহজে করবে বলে মনে হয় না,’ টাপুরদি বলল, ‘এবার দেখার বিষয় হল দল কী অ্যাকশন নেয়।’
দলের তরফ থেকে ‘রিঅ্যাকশন-অ্যাকশন’ সব জানা গেল বেলা ন’টার মধ্যে। প্রেস কনফারেন্স ডেকে অম্লান চক্রবর্তী জানালেন, সনাতন বিশ্বাসকে দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। তাঁর সম্পর্কে যে অভিযোগ উঠেছে, তারপর দল তাঁর সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক রাখতে রাজি নয়। বিধায়ক হওয়ার জন্য আলাদা কোনো সুযোগ তাঁকে দেওয়া হবে না। পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত করে অভিযোগকারিণীর ন্যায় সুনিশ্চিত করার। বিরোধী দলনেতা বিনয় বোসও জানালেন, তাদের দলে সনাতন বিশ্বাসের মতো নারী নির্যাতনকারীর কোনো জায়গা নেই। তার ফলে দলবদলের আশাটুকুও মিলিয়ে গেল। অনুগামীরাও যে মুখ ফিরিয়েছে, বোঝা গেল অচিরেই।
‘আচ্ছা টাপুরদি, তাহলে তো সনাতন বিশ্বাস আর এমএলএ থাকবেন না, না?’ ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘কেন থাকবেন না? নির্দল হিসেবে থাকতেই পারেন। অন্য কোনো দলেও যোগ দিতে পারেন। চাইলে নিজেও দল বানাতে পারেন, তবে এই মুহূর্তে যেমন পরিস্থিতি, ছোটো বড়ো কোনও নেতাই তাঁর সঙ্গে থাকবে বলে মনে হয় না,’ বলল টাপুরদি।
‘একজন ক্রিমিনাল এমএলএ হবে?’ আমার বিস্মিত প্রশ্ন।
‘প্রথমত আমাদের দেশের সংবিধান অনুসারে কেউ ততক্ষণ ক্রিমিনাল নয়, যতক্ষণ না আদালত তাকে দোষী ঘোষণা করছে, তা সে যতই গুরুতর অফেন্স হোক। এমনকী হাতেনাতে ধরা পড়লেও না। দ্বিতীয়ত, কারও উপর হাজারটা কেস চললেও তার ইলেকশনে দাঁড়ানো বা জনপ্রতিনিধি হওয়াতে কোনো বাধা নেই। এ দেশে এমন অনেক নেতা মন্ত্রী আছে যাদের উপর অনেক কেস চলছে। এই সনাতন বিশ্বাসের উপরেই আছে অনেক কেস ঝুলছে,’ বলল টাপুরদি।
‘তোমার কী মনে হয় টাপুরদি? কে আছে এসবের পেছনে?’ জানতে চাইলাম আমি।
‘তোর কী মনে হয়?’
‘অম্লান চক্রবর্তী,’ বললাম আমি।
টাপুরদি হাসল। কিছু না বলে টোস্টে কামড় বসাল।
৫২
‘মিতুল, টাপুর কোথায়?’ ফোনের ওপারে অর্জুনদা।
‘স্নানে ঢুকেছে। বেরোলে তোমায় ফোন করতে বলছি,’ বললাম আমি।
‘আমি যাচ্ছি তোমাদের ওখানে। রেডি হয়ে থাকো। একটা ব্যাপার হয়েছে। গিয়ে বলছি,’ বলেই অর্জুনদা ফোনটা রেখে দিল। আমি অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। এমন অবস্থায় আর যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ভাগ্যিস আমার অফিসে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর সুবিধে আছে। নইলে গোয়েন্দাগিরির চক্করে পড়ে চাকরিটা কবেই যেত আমার।
টাপুরদি বাথরুম থেকে বেরোতেই ওকে বললাম অর্জুনদার কথা। মুখে কিছু না বলে ঘরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। আমায় দেখে বলল, ‘তোর অফিস?’
‘চাকরিটা ছেড়ে দেব ভাবছি,’ হেসে বললাম।
টাপুরদিও হাসল। বলল, ‘অফিসে অসুবিধে না হলে চল আমার সঙ্গে। অনেক কাজ আজকে। আগে দেখি অর্জুন কী বলে।’
অর্জুনদা এল আধ ঘণ্টার মধ্যেই। টাপুরদি জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ব্যাপার?’
‘সুবিনয় মুখার্জি কিডন্যাপড,’ গম্ভীর মুখে বলল অর্জুনদা।
‘হোয়াট?’ বিস্ময়ে থমকে গেলাম আমি আর টাপুরদি দুজনেই।
‘পুরো পুলিশ ফোর্স লাগিয়ে দিয়েছেন কমিশনার সাহেব, যদিও নিউজটা এখনও অফিশিয়ালি ডিজক্লোজ করা হয়নি। তোমায় ডিসিডিডি ডাকছেন, আর্জেন্ট। আমায় বললেন, তোমায় সঙ্গে করে নিয়ে যেতে,’ অর্জুনদা বলল।
‘চলো। আমি রেডি আছি।’
দ্রুতবেগে ছুটল অর্জুনদার গাড়ি। আজ অর্জুনদা যেন খুব গম্ভীর, মুখটা বড়ো বেশি থমথমে। গাড়ির মধ্যে পিনপতন স্তব্ধতা; কেউ কোনো কথা বলছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যই হয়তো টাপুরদি বলল, ‘তদন্তের কত দূর অর্জুন?’
অর্জুনদা নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। তারপর মৃদুস্বরে মাথা নীচু করে ভাঙা গলায় বলল, ‘হেরে গেলাম টাপুর। কাল কেসের রিপোর্ট জমা হবে। তারপর কেস ক্লোজ।’
উলটোডাঙা পেরিয়ে কিছুটা এগোতেই দেখলাম রাস্তার পাশে জটলা। সকালে অফিসযাত্রীদের ভিড় রাস্তায়। অর্জুনদা ড্রাইভারকে বলল, ‘গাড়ি থামাও।’
অর্জুনদার পিছে পিছে আমরা নামলাম। ভিড় সরিয়ে সামনে গিয়ে দেখি রাস্তার ধুলোর উপর এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলা পড়ে কাতরাচ্ছে, চিৎকার করে কাঁদছে গর্ভযন্ত্রণায়। প্রসব সময় আসন্ন তার। জরায়ুর জল ভেঙে প্রসবযন্ত্রণা শুরু হয়েছে। পুলিশের পোশাকে অর্জুনদাকে দেখে লোকজন সসম্ভ্রমে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে সরে দাঁড়াল।
‘কে আছে এঁর সঙ্গে?’ জিজ্ঞাসা করল অর্জুনদা।
‘জানি না। কাউকে তো দেখিনি। এভাবেই পড়ে আছে,’ একজন বলল।
অর্জুনদা এগিয়ে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসল মহিলার পাশে। জিজ্ঞাসা করল, ‘কেউ আছে আপনার সঙ্গে?’
মহিলা কথা বলার অবস্থায় নেই। মাথা নেড়ে ‘না’ বলল।
অর্জুনদা দেখলাম এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। তারপর নীচু হয়ে মহিলাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। গাড়িতে তুলে ড্রাইভারকে বলল, ‘আগে হাসপাতাল চলো। কুইক।’
পেছনের সিটে মহিলাকে শোয়ানো হয়েছে। আমি আর টাপুরদি যথাক্রমে পায়ের আর মাথার কাছে বসেছি। টাপুরদি মহিলার হাতটা শক্ত করে ধরে মাথায় হাত বোলাচ্ছে। আর মুখে বলছে, ‘একটুখানি ধৈর্য ধরুন। এক্ষুনি পৌঁছে যাব হসপিটালে।’
মহিলা এখন বোধ হয় চিৎকার করে কাঁদার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। নেতিয়ে পড়ে আছে গাড়ির সিটের উপর। অর্জুনদা ট্র্যাফিক কন্ট্রোলে সমানে ফোন করে যাচ্ছে পরের ট্রাফিক খোলা রাখার জন্য। অফিসটাইমে গ্রিন করিডর করা খুব মুশকিল। তবু কলকাতা পুলিশ চাইলে সব সম্ভব, আরেকবার প্রমাণিত হল। অল্পসময়ের মধ্যেই আমরা হসপিটালে পৌঁছোলাম। অর্জুনদার আদেশে সেখানে আগে থেকেই পুলিশ উপস্থিত ছিল। তাদের দায়িত্বে মহিলাকে দিয়ে অর্জুনদা ফিরে এল। টাপুরদির মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম, অর্জুনদার মুখের দিকে কোমল দৃষ্টিতে চেয়ে মুখ নীচু করল। আপাত কঠিন নারীও বুঝি ভালোবাসলে নরম হয়। পৃথিবীতে অন্তত একজনের কাছে সকলেই বোধ হয় শক্ত থাকার দায় থেকে অব্যাহতি চায়। টাপুরদির মুখ ঝলমল করছে। টাপুরদিকে আমি চিনি। আজ এই মুহূর্তে আমি নিশ্চিত জানি, মেঘ কেটে গেছে।
অর্জুনদা বলল, ‘ভদ্রমহিলার বাড়ির লোকের খোঁজ চলছে। আশা করি খবর পেয়ে যাব।’
টাপুরদি নরম গলায় বলল, ‘কী খবর হয় আমায় জানিয়ো।’
৫৩
‘সংঘমিত্রা, সুবিনয় মুখার্জির ব্যাপারটা কি আপনি শুনেছেন অর্জুনের মুখে?’ জিজ্ঞাসা করলেন ডিসিডিডি সৌরভ সান্যাল।
টাপুরদি উপর-নীচে মাথা নাড়ল। অর্জুনদা পাশ থেকে বলল, ‘আমি বলেছি কিছুটা।’
সৌরভ সান্যাল বললেন, ‘বেশ, তাহলে তো ভালোই হল। আজ সকালে মর্নিংওয়াক করতে বেরিয়েছিলেন তিনি রোজকার মতো। তারপর আর বাড়ি ফেরেননি। বাড়ির লোক দেরি দেখে খোঁজখবর শুরু করেন। কিছু খবর না পেয়ে পুলিশকে জানান তাঁরা। ঠিক তিনদিনের মাথায় উপনির্বাচন, যেখানে সুবিনয় মুখার্জি একজন প্রার্থী। এই মুহূর্তে তাঁর এভাবে হারিয়ে যাওয়াটা রাজ্য রাজনীতিতে একটা বিশাল ক্রাইসিস। বুঝতেই পারছেন, পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।’
‘আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
সৌরভবাবু অর্জুনকে বললেন, ‘রজতকে পাঠিয়েছি সুবিনয়বাবুর বাড়িতে ইন্টারোগেশনের জন্য। অর্জুন, তোমার ব্যাপারে আমি পরে আসছি। আগে মিস ব্যানার্জির সঙ্গে ক’টা দরকারি কথা সেরে নিই।’
তারপর টাপুরদির দিকে ঘুরে তাকিয়ে সৌরভবাবু বললেন, ‘সংঘমিত্রা, ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস। আমি আপনাকে একটু বুঝিয়ে বলি। আপনি তো অমিয় চক্রবর্তীর মৃত্যু সংক্রান্ত জটিলতা সবই জানেন। অমিয়বাবু মারা গেলেন। তাঁর কেন্দ্র থেকে সুবিনয় মুখার্জি ভোটে দাঁড়ালেন। এখন তিনিও মিসিং। এ রকম অবস্থায় আমরা পুলিশের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব চেষ্টা করছি তাঁকে যথাসম্ভব দ্রুত খুঁজে বের করার।’
‘আপনি বুদ্ধিমতী। আপনাকে নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলতে হবে না যে আমরা শত হলেও সরকারি কর্মচারী। এই ধরনের হাই প্রোফাইল পলিটিকাল কেসে আমাদের কিছু ক্ষেত্রে হাত-পা বেঁধে যায় পুরোপুরি। কেসের প্রতি স্টেপের মাইনিউট ডিটেইলস আমাদের উপর মহলে জানাতে হয়। ফলে, কেসের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের কান অবধি খবর পৌঁছে যাওয়া অসম্ভব নয়। অনেক স্টেপ আমরা ইচ্ছে থাকলেও নিতে পারি না। কারণ সেই একই। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রিত হয়। আজ এত বছর চাকরি করার পর এসব মুখে স্বীকার করতে লজ্জা করে। যাই হোক, এখন আমাদের হাতে সময় খুবই কম। তাই আমি চাই, আপনি পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে সুবিনয় মুখার্জিকে খোঁজার কাজে যোগ দিন। অফিশিয়াল পারমিশনের জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। সে আমি বার করে নেব। আপনাকে আমাদের প্রয়োজন কারণ, যা অফিশিয়ালি পুলিশ করতে পারবে না, আপনি সেটা পারবেন, এবং সবচেয়ে বড়ো কথা হল, আপনার বুদ্ধি, বিবেচনা ও ক্ষমতার উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে।’
এবার অর্জুনের দিকে ঘুরলেন সৌরভবাবু। বললেন, ‘এই কেসে তুমি ও রজত কাজ করবে। আপাতত বাকি সব ছেড়ে সুবিনয় মুখার্জিকে খোঁজার দিকে মন দাও। অমিয় চক্রবর্তীর মার্ডার কেস নিয়ে ভেবে লাভ নেই। ওটা ভুলে যাও আপাতত। এই কেসে তোমায় সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া রইল। পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। সংঘমিত্রাকে প্রয়োজনমতো সাপোর্ট দেবে। ওঁদের সুরক্ষা আমাদের দায়িত্ব। সেরকম কোনো বিপদ দেখলে ওঁদের সেফলি সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে স্পট থেকে। আমায় আপডেট দিতে থাকবে। নাউ গেট ব্যাক টু ওয়ার্ক।’
এবার টাপুরদি বলল, ‘স্যার, একটা পেনড্রাইভ দিয়েছিলাম অর্জুনকে। সেটা পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড ছিল। সেটা খোলা খুব দরকার।’
‘সেই তোমার গড়িয়ার মহিলার মার্ডার কেস সংক্রান্ত, তাই না? বলেছিলে তুমি আমায় পেনড্রাইভটার কথা। সেটা এখনই কী দরকার? পরে ভাবা যাবে ওটা নিয়ে না হয়,’ বললেন সৌরভবাবু।
‘দরকার স্যার,’ টাপুরদি বলল, ‘ওটা খুলতে পারলে এই কেসেরও গিঁট খুলবে। আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি ওটা ক্র্যাক করার ব্যবস্থা করুন।’
‘আচ্ছা বেশ, আমি দেখছি।’
আমরা তিনজনেই বেরিয়ে এলাম ডিসিডিডির ঘর ছেড়ে।
বাইরে বেরোতেই অর্জুনদার মোবাইলে ফোন এল। ফোনে কথা বলা শেষ করে আমাদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘রজতদার ফোন। আজ সকালে সুবিনয় মুখার্জি রোজকার মতো মর্নিংওয়াকে যান ভোর পাঁচটায়। অত সকালে খুব কম মর্নিংওয়াকারই থাকে রাস্তায়। একজন ভবঘুরে গোছের ফুটপাথবাসী বয়ান দিয়েছে যে সে একটা কালো এসইউভিকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। তারপর সেটা জগার্স পার্কের দিকে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরেই আবার সেই রাস্তা দিয়ে ফিরে এসে তিরের বেগে বেরিয়ে যায় সেটা। তবে কাউকে কিডন্যাপ করতে সে দেখেনি। গাড়ির নম্বরও বলতে পারেনি।’
‘আবার সেই কালো এসিউভি?’ কপালে চোখ তুলে বলল টাপুরদি।
‘হুম, খবর এখানেই শেষ নয়। আজ সকালে একটা কালো এসইউভি অতিরিক্ত বেগের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়েতে একটা ট্রাকে ধাক্কা দেয়। সিসিটিভি ক্যামেরাতে রেকর্ডেড আছে পুরো ব্যাপারটা। গাড়িটার সামনের দিকটা দুমড়ে গেলেও সেই অবস্থাতেই না থেমে গাড়িটা বেরিয়ে যায়। ভিতরে কেউ ইনজিয়োর্ড ছিল কি না বোঝা যায়নি। পুলিশ পোস্টে অ্যালার্ট করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে বেশ কিছুটা দূরে হাইওয়ে থেকে নীচে নেমে আলের ধারে গাড়িটাকে লোকেট করেছে পুলিশ। গাড়িতে কেউ ছিল না।’
‘বলো কী? কার গাড়ি? আইডেন্টিফাই হয়েছে?’ উত্তেজিত টাপুরদি প্রশ্ন করল।
‘হুম,’ বলে মাথা নাড়ল অর্জুনদা।
‘কার?’
‘পার্টি অফিসের সেই কালো এসইউভিটা,’ টাপুরদির দিকে তাকিয়ে বলল অর্জুনদা।
টাপুরদি প্রায় লাফিয়ে উঠল। শূন্যে ঘুসি মেরে বলল, ‘ইয়েস। আমি সেটাই সন্দেহ করেছিলাম। আচ্ছা আমরা পুরো কেসটা সাজিয়ে নিয়ে যদি ভাবি, তাহলে কী পাচ্ছি? প্রথমে অমিয় চক্রবর্তী খুন হলেন। তন্ময়, যার কাছে অমিয় চক্রবর্তীর অতীতের কোনো দলিল ছিল, সে হারিয়ে গেল। সনাতন বিশ্বাস, যে দল থেকে অনুগামীদের নিয়ে বেরিয়ে বিরোধী দলে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক জীবন মোটামুটিভাবে শেষ করে দেওয়া হল। শেষমেষ সুবিনয় মুখার্জি, যিনি জানতেন তন্ময়ের কাছে কী তথ্য আছে, এবং সেই তথ্যের জোরে পার্টির টিকিট পেয়ে অমিয় চক্রবর্তীর সিট থেকে ভোটে দাঁড়াচ্ছেন, তাঁকেও গায়েব করে দেওয়া হল, এখন অমিয় চক্রবর্তীর হত্যার জন্য ধনঞ্জয় মণ্ডলকে ফ্রেম করে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, এইসবে কার সবচেয়ে বেশি লাভ?’
অর্জুনদা কিছু বলার আগেই আমি বললাম, ‘অফ কোর্স অম্লান চক্রবর্তীর।’
‘কিন্তু একটা প্রশ্ন তাহলেও থেকেই যায় টাপুরদি। সুবিনয়বাবুকে কিডন্যাপ কেন করা হল? খুন করে ফেললেই তো ল্যাটা চুকে যেত,’ বললাম আমি।
‘খুন করা অত সহজ নয় রে। অলরেডি কেসটা অনেকটা জট পাকিয়ে গেছে। যেখানে কিডন্যাপ করলেই কাজ হাসিল হতে পারে, সেখানে খুন কেন করতে যাবে। আমি শিয়োর, সুবিনয় মুখার্জিকে এমনভাবেই কিডন্যাপ করা হয়েছে, যাতে তিনি ছাড়া পেলেও কিডন্যাপারকে আইডেন্টিফাই করতে পারবেন না। স্মৃতিশক্তি কতটুকু অবশিষ্ট থাকবে তাঁর, আই রিয়েলি ডাউট। আর কিডন্যাপ হয়েছেন বলেই যে সুবিনয়বাবুর লাইফরিস্ক নেই, তাও জোর দিয়ে বলা যায় না,’ বলল টাপুরদি।
আমি বললাম, ‘টাপুরদি, মনে করে দেখো, আমরা যেদিন রাতে সুনয়নাদেবীর সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম, সেদিন অম্লানবাবু চাইছিলেন না আমরা ওঁর সঙ্গে কথা বলি। মায়ের সঙ্গে খুব রূঢ়ভাবে কথা বলছিলেন। যেন আমাদের তাড়াতে পারলে বাঁচেন। হয়তো, সুনয়নাদেবী এইসব ব্যাপার কোনোভাবে জানতে পেরেছিলেন। সুনয়নাদেবী যে জানেন, সেটা অম্লান চক্রবর্তী জেনে ফেলেছেন। তাই আমাদের সঙ্গে কথা বলতে দিতে চাইছিলেন না। ভয় পাচ্ছিলেন যে সুনয়নাদেবী তোমায় হয়তো সব বলে দেবেন। আর সুনয়নাদেবীও হয়তো তোমাকে সব বলতেই ডেকেছিলেন। কিন্তু ছেলের হুমকিতে পরে মন পরিবর্তন করেন।’
অর্জুনদা ও টাপুরদি দুজনেই প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। অর্জুনদা বলল, ‘টাপুর, সুবিনয় মুখার্জি ইজ ইন হাই রিস্ক। তিনি এমন কিছু জেনে ফেলেছেন, যা অম্লানবাবুর পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্মানহানির কারণ হতে পারে। এমনকী হয়তো-বা তা দলের ভাবমূর্তির জন্যেও ক্ষতিকর হতে পারে। আমরা এখনও জানি না কোন ইনফর্মেশন ছিল তন্ময়ের কাছে, কিন্তু সেটা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু তা বুঝতে অসুবিধে হয় না, যখন তন্ময়কে ধরার জন্য রেখাদেবীকে খুন করতেও পিছপা হয় না অপরাধী বা তাঁর লোকেরা।’
‘তার মানে কি অম্লান চক্রবর্তীই কালপ্রিট?’ বললাম আমি।
টাপুরদিকে কিছুটা অন্যমনস্ক দেখাল। যেন মন দিয়ে কিছু ভাবছে। আমাদের কথা কতটা কানে গেল কে জানে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী ভাবছ টাপুরদি?’
চিন্তার ঘোর ছিঁড়ে গেল টাপুরদির। চটকা ভেঙে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কী যেন বলছিলি?’
‘বলছি, যে কী ভাবছ?’
অর্জুনদার দিকে ফিরে তাকিয়ে টাপুরদি বলল, ‘কালো গাড়িটা সম্পর্কে আর কী কী খোঁজ পেয়েছ অর্জুন? কে কে ব্যবহার করে গাড়িটা?’
মাথা নাড়ল অর্জুনদা। বলল, ‘পার্টি অফিসের গাড়ি। অফিসের নীচে পার্কিং-এই থাকে। যার যখন দরকার পড়ে, ব্যবহার করে। চাবি থাকে মনোময়বাবুর কাছে।’
‘এই মনোময়বাবুকে আমার তেমন সুবিধের মনে হয় না,’ বললাম আমি।
অর্জুনদা বলল, ‘লোকটা অমিয়বাবুর রাজনৈতিক জীবনের একদম শুরু থেকে সঙ্গে আছেন। ওঁদের পরিবারের, দলের ভীষণ বিশ্বস্ত। রাজনীতির ব্যাপারে খুব একটা মাথা গলান না। কিন্তু ছায়ার মতো ওঁদের পরিবারকে প্রোটেক্ট করেন সবসময়ে।’
‘কেন? এতে তাঁর স্বার্থটা কী?’ জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘তা জানি না,’ মাথা নেড়ে বলল অর্জুনদা।
‘অর্জুন, এই মনোময়বাবুর সম্পর্কে খবর নাও। যদিও জানি হাতে সময় খুব কম, কিন্তু লোকটা অনেক কিছু জানেন। ক্র্যাক করার চেষ্টা করো,’ টাপুরদি বলল।
‘হয়তো জানেন। কিন্তু মনোময়বাবুকে মেরে ফেললেও মুখ খুলবেন না। ওই পরিবারের প্রতি সমর্পিত প্রাণ ভদ্রলোক,’ অর্জুনদা বলল।
‘নিজে হয়তো বলবেন না। কিন্তু তাঁর অতীত সম্পর্কে জানে, অমিয় চক্রবর্তীর পরিবারের প্রতি তাঁর ডেডিকেশনের কারণ জানে এমন তো কেউ থাকবে নিশ্চয়ই,’ টাপুরদি চিন্তিত মুখে বলল।
‘সেরকম লোকও পাওয়া মুশকিল। যতদূর শুনেছি, গত প্রায় ছয় বছর ধরে লোকটা অমিয়বাবুর বাড়িতেই থাকেন। নিজের কেউ আছে বলে মনে হয় না,’ অর্জুনদা বলল।
টাপুরদি ভুরু কুঁচকে চিন্তা করল একটুক্ষণ। তারপর বলল, ‘একজন আছেন, যিনি বলতে পারবে হয়তো।’
‘কে?,’ আমি আর অর্জুনদা সমস্বরে জিজ্ঞাসা করলাম।
‘মৃণাল দত্ত,’ হাসিমুখে বলল টাপুরদি। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে সিরিয়াস মুখ করে বলল, ‘সেটা আমি দেখছি কথা বলে। কিন্তু সময় খুব কম। আমাদের পরিকল্পনা মাফিক এগোতে হবে। এক মিনিট সময়ও নষ্ট করা যাবে না। যতক্ষণ না আমরা সুবিনয় মুখার্জিকে উদ্ধার করতে পারছি, প্রতিটা মুহূর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
‘ওহ আরেকটা কথা তোমায় বলতে ভুলে গেছিলাম টাপুর। অনিমেষবাবুর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোনো সাসপিশাস ট্রানজ্যাকশন বা উইথড্রয়াল পাওয়া যায়নি। ওঁর সার্ভিস রেকর্ড, স্বভাব সম্পর্কে সব রকম খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। একদম ক্লিন। ধনঞ্জয়ের সঙ্গেও যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তিনি যে সেদিন পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন, সেটা ঠিক। ওই সুপারস্টোরের সিসিটিভি রেকর্ডিংয়ে সেটা দেখা গেছে।’
৫৪
আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে ব্যস্ত শহরের রাস্তা দিয়ে। ঘড়ির কাঁটায় এখন সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা ছুঁই ছুঁই। পুলিশের গাড়িতে চলেছি এখন। আমাদের আশপাশ দিয়ে পথচলতি মানুষ, গাড়িঘোড়া নিরুদবেগে চলেছে নিজ নিজ গন্তব্যে। অফিসফেরত ক্লান্ত জনতার ঢল নেমেছে রাস্তায়। তেরো ঘণ্টার বেশি হল সুবিনয়বাবু অপহৃত হয়েছেন। তাঁর ফোন সেই থেকে সুইচ অফ। তাঁর বাড়ির লোকেরা র্যানসম কলের অপেক্ষায় ফোনের সামনে বসে আছে দিনভর। তাঁরা এখনও জানেন না এই অপহরণ র্যানসমের জন্য করা হয়নি। সুবিনয়বাবুকে সুস্থ ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা পুলিশের কাছে এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। এখনও মিডিয়া জানে না কিছু। আজই সকালে সনাতন বিশ্বাসের খবরটা প্রথমে এল। তারপর এই সুবিনয়বাবুর খবর। আজকের দিনটা সত্যিই বড়ো বেশি ঘটনাবহুল। অনেক বিশ্বাস, অনেক ভরসা নিয়ে মানুষ অমিয় চক্রবর্তীর দলকে ক্ষমতায় এনেছিল। সেই ক্ষমতা ভোগ করতে পারলেন না তিনি। একটা মানুষ সারাটা জীবন ছুটে চললেন একটা লক্ষ্যের পেছনে। অথচ সেই স্বপ্ন যখন করায়ত্ত হল, তিনিই রইলেন না।
সেটা তবুও মেনে নেওয়া গেল, কিন্তু তার বদলে ক্ষমতা যাঁর হাতে যাচ্ছে, তিনি যদি সত্যিই পিতৃহত্যার অপরাধী হন, তাহলে তাঁর হাতে রাজ্যের দায়িত্ব দিয়ে কীভাবে নিশ্চিন্তে থাকা যায়! অথচ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তিনি। টাপুরদি নিবিষ্টমনে কিছু ভাবছে। চোয়াল শক্ত। অর্জুনদা তার টিম নিয়ে বেরিয়ে গেছে আলাদাভাবে। টাপুরদির কী প্ল্যান আছে এখনও জানি না আমি। শুধু বেরিয়ে আসার আগে অর্জুনদাকে ডেকে আলাদা করে কীসব বলল দেখলাম। এখন কিছু জিজ্ঞাসা করাও যাবে না জানি। তাই চুপচাপ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি।
লালবাজার থেকে বেরিয়েই টাপুরদি মৃণাল দত্তকে ফোন করেছিল। তিনি কী বলেছেন জানি না। কিন্তু ফোন রাখার পর থেকেই দেখছি টাপুরদি অস্বাভাবিক গম্ভীর। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কী বললেন মৃণালবাবু?’
টাপুরদি উত্তর দেয়নি কোনো। শুধু অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে হেসেছিল। বলেছিল, ‘এই রাজনীতির দুনিয়ায় বড়ো অন্ধকার রে মিতুল। এ এক অতল কৃষ্ণগহ্বর। কেউ কেউ সেই অন্ধকারে ডুবে থেকেও মুক্তির পথ খুঁজে মরে, কেউ বা সেই অন্ধকারের মোহে জড়িয়ে তাতেই ডুবে কাটিয়ে দেয় সারাটা জীবন। অদ্ভুত এক মোহ। সেই অন্ধকার তাকে টেনে নিয়ে চলে আরও গভীরে। সেই মোহগ্রস্ত চোখ বন্ধ করে তলিয়ে যেতে থাকে রাজনীতির অন্ধকূপে। তাতেই তার সুখ, তাতেই তার তৃপ্তি।’
টাপুরদির এইসব দার্শনিক উক্তির মর্মোদ্ধার করা আমার কম্ম নয়। শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তুমি কি শিয়োর, অম্লানবাবুই আছে এসবের পেছনে?’
টাপুরদি হেসেছিল। তারপর বলেছিল, ‘শিয়োর? না, শিয়োর অবশ্যই নই। এখনও অন্ধকারেই পথ হাতড়াচ্ছি আমরা। তবে এটাও ঠিক, যেটুকু এগিয়েছি, সেটা মৃণালবাবুর সাহায্য ছাড়া সম্ভব হত না।’
‘কিন্তু এসবের পেছনে যে মৃণালবাবু নেই, তিনি যে তদন্তকে গোড়া থেকেই ভুল পথে চালনা করছেন না, সেটা কী করে বুঝলে? সুনয়নাদেবীর কাছে আমরা শুনেছি, নাতির চিকিৎসার ব্যাপারে সাহায্য চেয়েও সেরকম সাহায্য পাননি তিনি অমিয়বাবুর কাছ থেকে। রাগ তো তাঁর থাকাই স্বাভাবিক,’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
‘সন্দেহের বাইরে কেউই নয় রে। মৃণালবাবুরও যথেষ্ট স্টং মোটিভ আছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।’
‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘কী তাহলে?’ ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করল টাপুরদি।
‘ধুর, আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। অম্লানবাবু, মৃণাল দত্ত, বিনয় বসু, অনিমেষবাবু, মোটিভ তো সবারই আছে। খুনটা তাহলে করলটা কে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘আমি কী করে জানব? জেনে গেলে আর এত খেটে মরতাম কেন?’
‘তবু? তোমার কিছু তো মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘মৃণালবাবুর সঙ্গে কথা হয়েছে আমার এই নিয়ে। তিনি স্বীকার করেছেন, অমিয়বাবুর উপর তিনি খুশি ছিলেন না। অমিয়বাবু চাইলে তাঁর নাতির চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন। আফটার অল, অতীতে মৃণালবাবু রাজনীতি থেকে সরে এসে জায়গা ছেড়ে না দিলে অমিয়বাবুর উত্থান এত সহজ হত না। এমনকী নাতির মৃত্যুর পর তিনি চূড়ান্ত হতাশায় ডুবে গেছিলেন। ভেবেওছিলেন, অমিয়বাবুর সঙ্গে দেখা করে নিজের মনের জমা ক্ষোভগুলো উগড়ে দেবেন।’
‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘মৃণালবাবু আমায় জানিয়েছেন, সেই সময় সুপর্ণা তাকে বাধা দিয়েছিল। মৃণালবাবুও তার কথা রাখতে আর এগোননি। পরে যখন এ নিয়ে ভেবেছেন তিনি, বুঝতে পেরেছেন সুপর্ণাই ঠিক ছিল। জন্ম মৃত্যুর উপরে কারও হাত থাকে না।’
‘এতটা উদারতা কেমন যেন অবিশ্বাস্য ঠেকে টাপুরদি,’ বললাম আমি।
আর কিছু বলেনি টাপুরদি, আমিও আর কিছু জানতে চাইনি। বুঝলাম, কালো গাড়িটা পুরো কেসটাকে একটা নির্দিষ্ট অভিমুখ দিয়েছে। গাড়িটার অ্যাক্সিডেন্ট না হলে হয়তো অম্লানবাবুকে সন্দেহ করার এতটা শক্তিশালী প্রমাণ হাতে আসত না। অম্লান চক্রবর্তী যে কতটা ক্ষমতাবান, তা আর কাউকে বলে দেওয়ার দরকার নেই। তাঁকে অ্যারেস্ট করা সহজ নয়। তাঁর পুলিশ, তাঁর প্রশাসন তাঁর হাতে কী করে হাতকড়া পরাবে? এমনিই এই কেসে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পদে পদে পুলিশকে বাধা পেতে হচ্ছে। যে কারণে বাধ্য হয়ে টাপুরদির মতো প্রাইভেট ডিটেকটিভের শরণ নিতে হয়েছে কলকাতা পুলিশকে। এটা সত্যি, পুলিশের যত টেকনিকাল সুযোগ সুবিধে আছে, টাপুরদির তা নেই, তেমনি এটাও ঠিক টাপুরদির হাত পুলিশের মতো বাঁধা নয়। টাপুরদি স্বাধীন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, সাহস আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাই টাপুরদির অস্ত্রশস্ত্র। পুলিশ অম্লান চক্রবর্তীকে অ্যারেস্ট করতে পারবে কি না জানা নেই, কিন্তু টাপুরদি হারবে না সেই বিশ্বাসও আমার আছে।
আমাদের গাড়িটা অম্লানবাবুর বাড়ির বেশ কিছুটা আগে থেমে গেল। টাপুরদি আর আমি নেমে এলাম গাড়ি থেকে। গাড়িতে আমরা ছাড়াও আছেন কলকাতা পুলিশের দুজন কনস্টেবল। আমরা নামতেই একজন বললেন, ‘ম্যাডাম, আমরা কাছেই থাকব। আপনি কোনো রিস্ক নেবেন না।’
টাপুরদি মিষ্টি করে হেসে মাথা নাড়ল। মনে মনে ভাবলাম এঁরা এখনও টাপুরদিকে চেনেননি।
অম্লানবাবুর বাড়ির উলটোদিকের ফুটে দুটো বাড়ির পরেই একটা ছোট্ট ক্যাফে আছে আগের দিনই দেখেছিলাম। একটা বাড়ির গ্যারেজে বেশ ঘরোয়া মতো ব্যবস্থা। সেখানে গিয়ে ঢুকলাম আমরা দুজন। এক কোণে একটা টেবিলে বসে দুটো কফি অর্ডার দিল টাপুরদি। এখান থেকে অম্লানবাবুর বাড়ি পরিষ্কার দৃষ্টিগোচর হয়। টাপুরদির কানে একটা ওয়্যারলেস ব্লুটুথ ইয়ারফোন গোঁজা। চুল দিয়ে ঢাকা বলে চোখে পড়ছে না। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুসারে অম্লানবাবু পার্টি অফিস থেকে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছেন আধ ঘণ্টা আগে।
দুটি সুদৃশ্য কাপে করে কফি এল। সঙ্গে একটি ছোট্ট সেরামিকের দুধসাদা বাটিতে কয়েক টুকরো মার্শমেলো। ছোট্ট ক্যাফে হলেও আতিথেয়তা বড়ো ভালো লাগল। কফিটাও যথেষ্ট ভালো। টাপুরদির দৃষ্টি বাইরের দিকে। অম্লানবাবুর বাড়ির গেটে বেড়ালের মতো দৃষ্টি মেলে বসে আছে। আর ধৈর্য ধরতে না পেরে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমরা এখানে অপেক্ষা করছি কেন?’
টাপুরদি মাথা নীচু করে বলল, ‘এই বাড়ির উপর নজর রাখতে হবে। অম্লানবাবু যেকোনো সময় আসবেন এখানে।’
‘তাতে কী হবে?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
টাপুরদি কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই দেখলাম বাড়ির গেট থেকে একটা সাদা রঙের টয়োটা সেডান বেরিয়ে আসছে। ক্যাফের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভিতরে দৃষ্টি চালিয়ে ধূসর কাচের ভিতর থেকে মনোময়বাবুকে চিনতে অসুবিধে হল না। গাড়িটা ক্যাফে পেরিয়ে এগোতেই টাপুরদি মাথা নীচু করে ইয়ারফোনে কাউকে কিছু নির্দেশ দিল।
আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার টাপুরদি? মনোময়বাবুর তো এখন অম্লানবাবুর সঙ্গে থাকার কথা, যতদূর জানি তিনি প্রায় সবসময়ই অম্লানবাবুর সঙ্গে থাকেন।’
‘থাকেন, কিন্তু আজ নেই। মনোময়বাবুকে পুলিশ ফলো করবে, আমাদের গাড়ি অপেক্ষা করছে। আমাদেরও যেতে হবে। ওঠ,’ বলেই উঠে দাঁড়াল টাপুরদি।
ঝটিতি বিল মিটিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। টাপুরদি ইয়ারফোনে টানা কথা বলে চলেছে। দৌড়োতে গিয়ে সেদিকে কান দিতে পারছি না। আমাদের গাড়িটা দেখলাম উলটোদিক থেকে এগিয়ে আসছে। প্রায় লাফিয়ে গাড়িতে উঠলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে টাপুরদির ফোনে ফোনটা এল। অর্জুনদার ফোন। পেনড্রাইভটা অবশেষে খোলা সম্ভব হয়েছে।
‘আমায় মেইলে পাঠাও,’ বলল টাপুরদি।
ওদিক থেকে অর্জুনদা কী বলল শোনা গেল না। টাপুরদি উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘অসম্ভব। আমরা এখন মনোময়বাবুকে ফলো করছি। এখন লালবাজারে যাওয়া সম্ভব নয়।’
অর্জুনদা আবার কিছু বলল। টাপুরদি অসন্তুষ্ট মুখে বলল, ‘ঠিক আছে, আসছি।’
আমাদের গাড়ি লালবাজারের দিকে ঘুরল।
‘কী হল টাপুরদি? অর্জুনদা কী বলল?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
‘বলল, পেনড্রাইভে যা আছে সেটা নাকি এভাবে পাঠানো সম্ভব নয়। হাইলি কনফিডেনশিয়াল। ডিসিডিডি আমাদের ডেকেছেন এখুনি। আর্জেন্ট,’ অসন্তুষ্ট মুখে বলল টাপুরদি।
