ইনজুরি টাইম – ৬০

৬০

মধ্যরাতে বাড়ির ছোট ছাদে স্কচের গ্লাস নিয়ে বসেছিলেন শ্যামলেন্দু নস্কর। কানে ধরা ছিল মোবাইল। সুদূর তুরস্ক থেকে এসেছে কল। আসার কথাই ছিল। ওপারের বক্তা জেনে নিচ্ছেন তাঁর কমান্ডার-ইন-চিফ ইখলাস রুবেলের নির্দেশমতো সমস্ত ব্যবস্থা হয়েছে কিনা।

কথা সেরে ফোন নামিয়ে রেখে এক পিস ফিশ ফ্রাই মুখে পুরলেন শ্যামলেন্দু। একদম টাটকা ভেটকি, ঠিকঠাক ওজনের। অন্যদিন হলে তৃপ্তিটা বেশি হত, আজ একটু মানসিক চাপ আছে তাই স্বাদটা খুব বেশি উপভোগ করছিলেন না তিনি।

উদ্যোক্তা হলেই তো হয় না, দায়িত্ব নিলে সুষ্ঠুভাবে তা পালন করতে হয়। আগামীকাল সকালেই চ্যাম্পিয়ন আর রানার্স টিমের প্রাইজগুলো এসে যাবে। সেগুলোকে ঠিকঠাক করে প্যাক করার ব্যাপার আছে। ট্রফিটাও শিলিগুড়ি থেকে এসে পড়বে বিকেলের মধ্যে। ছেলেদের বায়না, ইওরোপিয়ান ফুটবলের সব ট্রফির মতো এরও হাতলে সরু সরু ফিতে বেঁধে দিতে হবে। মেনে নিয়েছেন শ্যামলেন্দু। এটুকু করাই যায়।

তাঁর উলটোদিকে যে ব্যক্তি বসে আছে এই মুহূর্তে, তার ডান হাতের কব্জিতে ব্যান্ডেজ। সদ্য চিকিৎসা করা হয়েছে সেখানে। সে খবর পেয়েছে আজই বিকেলে বামনগোলার দিকে দুই ব্যক্তি গিয়ে কিছু খোঁজখবর নিয়েছে। এতে শ্যামলেন্দুর কিছু করার নেই। তিনি বুঝতেই পারছেন স্থানীয় পুলিশ ওই কাজ করেনি। প্রান্তিক অঞ্চল নিয়ে তারা মাথাই ঘামায় না, যতক্ষণ না গুরুতর কিছু ঘটে। খোঁজখবর করেছে অন্য কেউ। কিন্তু কেন? জখম ব্যক্তি বুঝতে চাইছে শ্যামলেন্দুর তরফ থেকেই কোনো তথ্য ফাঁস হয়েছে কিনা।

স্কচে চুমুক দিয়ে শ্যামলেন্দু নস্কর বললেন, “এত সহজেই পুলিশের কাছে পেট ফাঁক করে দেওয়া অভ্যেস থাকলে আর এত বড় কারবার গড়ে তুলতে পারতাম না ভাই। আপনারা আপনাদের কাজ করুন, আমাকে সন্দেহ করে ফালতু সময় নষ্ট করবেন না।”

সেই ব্যক্তি স্কচের গ্লাস টেবিলে নামিয়ে রেখে নির্দেশের ভঙ্গিতে জবাব দিল, “নতুন ডিউটি জয়েন করা এসআই এরকম স্টেপ নেবে না। চেহারার ডেসক্রিপশন আগের এসআইয়ের সঙ্গেই মিলছে। শুধু সে নয়, আরো একজন গিয়েছিল আজ ওই এরিয়ায়। আপনি এখানকার নামকরা লোক, হোল্ড আছে বিভিন্ন জায়গায়। খুঁজে বের করুন এরা কারা?’’

অনেকদিন থেকেই এদের দেমাক সহ্য করে আসছেন শ্যামলেন্দু, কারণ তিনি নিরুপায়। আজ প্রথমবার মেজাজ হারালেন তিনি। একটা খোঁচা খাওয়া বাঘ যেন বেরিয়ে এল গর্ত থেকে। সব ভয়, আশঙ্কা ঝেড়ে ফেলে তিনি উঠে দাড়ালেন। আর যে এক মুহূর্তও এই অতিথিকে সামনে দেখতে চান না, আচরণে সেটা স্পষ্ট করে দিয়ে বললেন, “আমি তো ভাই এই পুলিশ প্রশাসনের আন্ডারে থেকেই কারবার চালাচ্ছি। কোনোদিন তো প্রবলেম হয়নি। একটা গোডাউনেও আজ অবধি রেইড হয়নি। আপনার কাজে নিশ্চয়ই গলদ আছে। আর শুনুন, আমাকে অর্ডার দেবেন না। বরং কালিয়াচকে গিয়ে নিজের কাজটায় মন দিন।”

কথা শেষ করে ছাদ থেকে ঘরের দিকে রওনা দিলেন শ্যামলেন্দু। অতিথি সামান্য হকচকিয়ে গিয়েছে তাঁর ব্যবহারে।

রাত সোয়া একটা: সল্টলেক এইচবি ব্লকের বাড়িতে রবিউল আলমের মোবাইল বেজে উঠল। ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলেন তিনি। দু’ দিন ধরে এমনিতেই ঘুমের বারোটা বেজেছে। আজ একটু এসেছিল আর অমনি…

রবিউলকে বলা হল তাঁর বাড়ি থেকে কয়েক পা দূরে মোড়ের মাথায় একটি স্যান্ট্রো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। চার লাখ টাকা ক্যাশ, যা আলমের ঘরে সযত্নে রাখা আছে কিছুদিন ধরে একটি ব্যাগে, সেটি সেই গাড়িতে তুলে দিতে হবে।

এসব ঝুঁকির কাজ সাগরেদদের হাতে ছাড়েন না রবিউল। নিজেই ঘুমন্ত স্ত্রী’র অজান্তে পাশের ঘরে গিয়ে ক্যাশের ব্যাগ বের করে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরোলেন। গাড়ির ড্রাইভার ইশারায় ব্যাগটা জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে পিছনের সিটে রেখে দিতে বলল। কাজ মিটতেই গাড়ি রওনা হয়ে গেল। গাড়ির চালকের জানার উপায় ছিল না নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে আলমের বাড়ির উপরে সারাক্ষণ নজর রাখছে কেউ। গাড়ি সামান্য এগোতেই বাইকের ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল। চিংড়িহাটা পেরিয়ে গাড়ি চলেছে সায়েন্স সিটির দিকে। মধ্যরাতের কলকাতা শুনশান। রাতের নিস্তব্ধতাকে চাকার গর্জনে চিরে দিয়ে ‘মা’ ফ্লাইওভার দিয়ে বুলেটের গতিতে ইতিউতি ছুটে যাচ্ছে কিছু গাড়ি। বাইকওয়ালার টার্গেট যে গাড়ি, সে অবশ্য ফ্লাইওভার ধরল না। সায়েন্স সিটির মোড়ের কাছে ট্র্যাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়েছে গাড়িটা। বাইকওয়ালা সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট জায়গায় বার্তা পাঠিয়ে দিল। সিগন্যাল সবুজ হল, গাড়ির গতি বাড়তে শুরু করল। রুবি মোড়ের কাছে আরেকটা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনুসরণকারী। টার্গেট গাড়ির নম্বর ইতিমধ্যেই এসে পৌঁছেছে তাদের কাছে। গাড়িটাকে কালিকাপুরের দিকে এগিয়ে যেতে দিল তারা। তারপর শুরু হল অনুসরণ করা। অজয়নগর মোড় থেকে ডান দিকে ঘুরল গাড়িটা। আঁকাবাকা রাস্তা দিয়ে সেটা চলেছে সন্তোষপুর জোড়া ব্রিজের দিকে। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি এবং দুটি বাইক দ্রুত এগোচ্ছিল। অবশেষে সুকান্ত সেতুর ঠিক মাঝখানে দাঁড়াল স্যান্ট্রো। সেতুর ধারের সিঁড়ি দিয়ে এক ব্যক্তি উঠে এল। প্রথম বাইকওয়ালার চোখ চকচক করে উঠল।

‘এই তো সেই তিনটে মালের একটা’ মনে মনে বলল সে। গাড়ির ড্রাইভার নামেনি। সেই ব্যক্তি শুধু গাড়ির জানালা দিয়ে শরীর ঢুকিয়ে ব্যাগটা বের করে নিচ্ছে। বাইক থামিয়ে নিঃশব্দে এগোল তিনজন। দুজন গিয়ে দাঁড়াল সেই ব্যক্তির পিছনে, তৃতীয়জন একেবারে ড্রাইভারের হাতখানা চেপে ধরল।

গোলমাল বুঝে গাড়ির বাইরে শরীর বের করতেই দু’ পাশে দুজনকে দেখে দিশেহারা হয়ে গেল সেই ব্যক্তি। তবু সে টাকাভর্তি ব্যাগের হাতল ধরে সেটাকে ব্যাটের মতো ব্যবহার করতে চাইল। কিন্তু এসটিএফের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অফিসাররাও জানেন চকিতে ধেয়ে আসা আক্রমণ কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়। ব্যর্থ হল প্রতিপক্ষের প্রয়াস। এক হাতে সেই ব্যাগকে সরিয়ে রিভলভারের বাঁটধরা আরেক হাতের এক মোক্ষম বাড়ি গিয়ে পড়ল তার চোয়ালে।

দুজনকে কাবু করতে এসটিএফের তিন অফিসারের আর বেশি বেগ পেতে হল না। টিমহেডের কাছে খবর চলে গেল। আধ ঘণ্টার মধ্যেই এসটিএফের স্করপিও এসে পৌঁছল সুকান্ত সেতুর মাথায়। তুলে দেওয়া হল দুই আসামীকে। স্করপিও চলে গেল অভীষ্ট লক্ষ্যে। তিন বাইকওয়ালা একে অপরের সঙ্গে হাত মেলাল। স্যান্ট্রোটাকে চালিয়ে নিয়ে গেল একজন। বাকি দুজন যে যার জায়গায় ফিরে গেল। আগামীকাল পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো হবে। রবিউল আলমের বাড়ির কাছে থেকে টার্গেটকে অনুসরণ করে আসছিল যে তার মোবাইল বেজে উঠল। যে টিমহেড গতকাল বাপ-মা তুলে কাঁচা খিস্তি করেছিলেন, তিনিই মেসেজ করেছেন— ‘‘গুড জব।” মৃদু হেসে মোবাইল পকেটে রাখল সে। এই তো জীবন!

৬১

সৌভিকের অনুপস্থিতি ভোগালেও লিগের সেকেন্ড লেগের দুটো ম্যাচের একটা জিতল আর একটা ড্র করে সেমিফাইনালে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে নিল প্রভাতী সংঘ। যদিও দুটো ম্যাচই ওরা হেরে যেতে পারত যদি না অশ্বিন দেওয়াল হয়ে দাঁড়াত। প্রথম ম্যাচে বাজে ফাউল করে লাল কার্ড দেখার ফলে কলকাতার টিমের বিরুদ্ধে খেলতো পারেনি ইসমাইল। তাই ১-১ টা আর ২-১ করা যায়নি। সৌভিক থাকলে হয়ে যেত পাক্কা। তবে ডিফেন্সের অবস্থা নড়বড়ে। অশ্বিন অন্তত চারটে অবিশ্বাস্য গোললাইন সেভ করেছে।

খেলা দেখতে এসেছিলেন প্রতীক সেনও। ভীষণ উপভোগ করছিলেন। নিজে এক সময় নিয়মিত খেলতেন তাই সেই খেলোয়াড় সত্তা যেন শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে জার্সি গায়ে তাঁকে মাঠে নামিয়ে দিতে চাইছিল। লিগের খেলা শেষ হল বিকেল চারটেতে। ফিক্সচার দাঁড়াল— প্রথম সেমিফাইনালে কালিয়াচক বনাম শিলিগুড়ি, দ্বিতীয় সেমিফাইনালে গাজোলের প্রভাতী সংঘ বনাম বাংলাদেশের গ্রিন বুটস।

প্রতিপক্ষের স্কিল নিয়ে অশ্বিন, জয়রা একেবারেই চিন্তিত নয়। কয়েকজনের বয়স বাকিদের চেয়ে বেশ কিছুটা বেশি। ওরা শুধু গায়ের জোরে খেলছে, দমে পারছে না। পাওয়ার গেমে ওদের সঙ্গে এঁটে ওঠা একটু কঠিন হতে পারে অশ্বিনদের পক্ষে। প্রভাতীর ইসমাইল আছে, কিন্তু তাকে নিয়ে ভরসার চেয়ে চিন্তাটাই বেশি হচ্ছে অশ্বিনের। ওরা মারলে ইসমাইলও পালটা মারবে। লাল কার্ড দেখে ফেলেছে একবার। সেমিফাইনালে যদি মাথাগরম করে ফেলে তাহলে ফাইনালে ভুগতে হবে। স্যার ইসমাইলকে ডেকে নিয়েছেন আলাদা করে। নিশ্চয়ই ওকে মাথা ঠান্ডা রাখারই পরামর্শ দিচ্ছেন।

আবার সন্ধে সাতটা থেকে খেলা, তাই প্রভাতী সংঘের ছেলেরা যে যার বাড়ি চলে গেল একটু বিশ্রাম নিতে। তখন ছ’টা বাজে, অশ্বিন শুনতে পেল তার নাম ধরে বাড়ির বাইরে থেকে চেঁচাচ্ছে জয়। অদ্ভুত সেই চিৎকারের সুর; যেন খুব খারাপ খবর নিয়ে এসেছে। হ্যাঁ খারাপ খবরই। শোনামাত্র ঘরে খাবার ফেলে জয়ের সঙ্গে দৌড়ল অশ্বিন। স্যার চলে যাচ্ছেন। কলকাতা থেকে খবর এসেছে তাঁর মায়ের অবস্থা সঙ্কটজনক। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে ওদের। এরকম একটা অবস্থায় স্যার চলে যাবেন! আগামীকাল যদি ওরা চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে উৎসব করবে কার সঙ্গে? যে লোকটা এতদিন ধরে ওদের তিল তিল করে তৈরি করেছে, আজ এই সময় সে থাকবে না?

স্যারের বাড়ির কাছে তখন গোটা টিম। ক্লাবের বড়রাও রয়েছেন। তাঁরা অবশ্য স্যারকে বলছেন এই সময়ে খেলার কথা না ভেবে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোটাই তাঁর কর্তব্য। ধীমান তো প্রায় কেঁদেই ফেলে। স্যারের কাছে সবচেয়ে বেশি বকা সেই খায় রোজ; তবু তার কষ্ট হচ্ছে। খুব খারাপ লাগছে পল্টুরও। সে টিমের কেউ নয়, তবু রোজ প্র্যাকটিসে এসেছে। স্যারকে তার বড় পছন্দ হয়েছিল।

একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। এত অল্প সময়ে ট্রেনে টিকিট পাওয়া অসম্ভব তাই স্যার গাড়িতেই যাবেন। দরজায় তালা দিয়ে বিরাট ব্যাগ কাঁধে নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন স্যার, পিছনে পিছনে চলল গোটা টিম। গাড়িতে উঠে ইসমাইলকে কাছে ডেকে নিলেন স্যার। মাথায় হাত বুলিয়ে কী যেন বললেন। তারপর ডাকলেন অশ্বিনকে।

“ট্রফি জিতেছিস, কলকাতায় বসে যেন খবর পাই,” বলে তার পিঠ চাপড়ে দিলেন। অশ্বিনের কাছে স্যার ইদানীং শুধু কোচ নয়, বিভিন্ন কারণে বড় দাদা হয়ে উঠেছিলেন। তার চোখ ছলছল করে উঠল।

গাড়ি এগিয়ে গেল বড় রাস্তা ধরে। টিমের সকলে যেন একটু ঘেঁটে গিয়েছিল। কী করবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। জয়ের বরাবরই আবেগ বেশি। সে গলা নামিয়ে বলল, “ধুর বাল, কিছু ভালো লাগছে না। ওয়াকওভার দিয়ে দেবো?”

সে কথা ক্লাবের এক দাদা শুনতে পেয়ে তেড়ে এল।

“এই কী বললি রে? কানের গোড়ায় খাবি? ওয়াকওভার? ঠ্যাং ভেঙে ফেলে রেখে দেব, জীবনে আর ফুটবলে লাথাতে হবে না, বুঝতে পেরেছিস?”

বিএসএ গ্রাউন্ডের পরিবেশ হাইস্কুলের মাঠের থেকে একেবারেই আলাদা। এখানে স্টেডিয়াম আছে, বড় টুর্নামেন্টের মেজাজের সঙ্গে মানানসই, কিন্তু হাইস্কুলের মাঠের খোলামেলা ব্যাপারটা এখানে নেই। একটা যেন চাপা চাপা ভাব। স্টেডিয়াম ভর্তি হয়ে গেছে দর্শকে, অজয়দা নিজস্ব স্টাইলে ধারাভাষ্য দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে; দুই সেমিফাইনালিস্ট টিম মাঠে নামার জন্য তৈরি হচ্ছে, অশ্বিন কিছুটা দূরে বসে তার পুরনো সিনগার্ডটা ফেলে নতুন লাগাচ্ছে, এমন সময় সে কাঁধে একটা হাতের স্পর্শ অনুভব করল। সে ফিরে তাকানোর আগেই কানে কানে কেউ বলল, “তোকে শ্যামলকাকা ডাকছে একটু।”

পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সৌভিক। সে জার্সি পরে সেমিফাইনালে নামার জন্য মরিয়া।

“কোথায়?” অশ্বিন প্রশ্ন করল।

‘‘স্টেডিয়ামের গেটের বাইরে,” সৌভিক জবাব দিল।

অশ্বিন গেটের দিকে এগোল। আজব ব্যাপার! এক্ষুনি খেলা শুরু হবে; কালিয়াচক ফাইনালে উঠবে ধরেই নেওয়া যায়, তাদের খেলা দেখা দরকার। এই সময়ে শ্যামলকাকা ডাকছেন কেন? স্টেডিয়ামের গেটের বাইরে কিছুটা জায়গায় আলো খুব কম। অশ্বিন দেখল ইসমাইল আর জামশেদ সেদিক থেকে হেঁটে আসছে। ওদেরকেও কি ডেকেছিলেন শ্যামলকাকা? দুজনেই ওকে দেখে কেমন যেন থতমত খেয়ে, “তাড়াতাড়ি আয়” বলে এড়িয়ে চলে গেল।

অশ্বিনকে দেখে শ্যামলকাকা সিগারেট ধরিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, “শোন, কথা আছে। ঠান্ডা মাথায় শুনবি যা বলছি।”

৬২

যেমন সকলে ভেবেছিল, প্রথম সেমিফাইনালে শিলিগুড়ির টিমকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে চলে গেল কালিয়াচক। এবার দ্বিতীয় সেমিফাইনালে নামবে প্রভাতী সংঘ। বাকিরা ছটফট করছে গ্রিন বুটসকে বুঝে নিতে, কিন্তু অশ্বিন কোথায়?

সবাই খুঁজছে তাকে। সৌভিক বলল, “ওকে শ্যামলকাকা ডেকেছিলেন। বোধহয় ওঁর সঙ্গে কোথাও গেছে।”

জয় বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, “মালটা টাকা ধার চেয়ে চেয়েই গেল। নিশ্চয়ই শ্যামলকাকার কাছে টাকা চাইতে গেছে। আরে বালটা, খেলার পরেও তো চাইতে পারতি!”

কোথাও তার খোঁজ নেই দেখে মোবাইলে ধরার চেষ্টা হল কিন্তু বারবার কেটে দিচ্ছে সে। তারপর অজয়দা মাইকে বলতে শুরু করল, “অশ্বিন, তুমি যেখানেই থাকো, এক্ষুনি মাঠে এসো। দ্বিতীয় সেমিফাইনালের খেলা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে।”

অবশেষে দেখা গেল প্রভাতী সংঘের গোলকিপার ক্যাপ্টেনকে। সে তার বাড়ির দিক থেকে হেঁটে আসছে মাঠের দিকে, কিন্তু পায়ে যেন গতি নেই।

“কোথায় গাড় মারাচ্ছিলি বাল?” জয় মানানসই অঙ্গভঙ্গি করে প্রশ্ন ছুঁড়ল।

অশ্বিন জবাব দিল না। সে একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। শ্যামলকাকা এ কী বললেন ওকে? এই চাপ নিয়ে খেলা সম্ভব? কিন্তু তিনি বলেছেন ভেঙে পড়লে চলবে না, খেলা শেষ করতেই হবে। রণজয় চলে গেছেন, তাই প্রভাতী সংঘের আগের কোচ প্রফুল্লদা আবার পুরনো ফর্মে এখন। সে অশ্বিনের কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, “কী রে, কী হয়েছে তোর? এরকম ভ্যাবলা হয়ে আছিস কেন? টেনশন হচ্ছে? আরে জিতব জিতব, আমরাই জিতব।”

নির্দিষ্ট সময়ে শুরু হল খেলা। সৌভিক চোট আঘাতে নড়বড়ে অবস্থায়, তবু শুরুতেই তার একটা দুর্দান্ত দৌড় প্রায় গোল এনে দিয়েছিল প্রভাতী সংঘকে। হল না কারণ কড়া ট্যাকেল এড়াতে শেষ মুহূর্তে নঈমকে বলটা পাস করে দিয়েছিল সে। কিন্তু নঈম কেন বল অবধি পৌঁছতে পারল না সেটা সৌভিক বুঝতে পারল না।

খেলা পনেরো মিনিটে পড়েছে, এমন সময় কর্নার কিক পেল গ্রিন বুটস। সকলে পজিশন নিচ্ছে, কিন্তু অশ্বিনের বুক ধুক ধুক করছে। কী করবে এবার সে? গ্রিন বুটস-এর প্লেয়ারদের উচ্চতা ভালো, অনেকটা ফাঁকা জায়গা ওদের সামনে। প্রভাতী সংঘের সবচেয়ে লম্বা খেলোয়াড় জামশেদ। সে সঠিক পজিশনে নেই। অশ্বিন জানে তার উচিত জামশেদকে ইশারায় গ্রিন বুটস-এর সামনে আড়াল তৈরি করতে বলা, কিন্তু…

অজয়দার ধারাভাষ্য গমগম করে উঠল— ‘‘কর্নার থেকে লম্বা ক্রস ভেসে আসছে গোলের দিকে এবং… এবং গোওওওল! সামনের ফাঁকা জায়গাকে কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত হেডে গোল করে এগিয়ে গেল গ্রিন বুটস। প্রভাতী সংঘের গোলরক্ষক নিজের জায়গা থেকে সরারও সুযোগ পেল না। এই মুহূর্তে স্কোরলাইন গ্রিন বুটস ১ : প্রভাতী সংঘ ০।’’

জালের কোণে জড়িয়ে পড়ে থাকা বলটা কুড়িয়ে নেওয়ার সময় অশ্বিনের চোখ ঠেলে জল বেরিয়ে আসছিল। অনেক টুর্নামেন্ট খেলেছে সে। কখনো দারুণ খেলেছে, কখনও তার বিশ্রী গোল খাওয়ার জন্য টিম লজ্জার হার হেরেছে। কিন্তু কোনোদিন খেলার মাঠে তার কান্না আসেনি চোখে।

সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও জামশেদ ফাঁকা জায়গাটা কভার করার চেষ্টা করেনি। সে এখন বুঝতে পারছে শ্যামলকাকা কেন আজ তার আগে ওদের দুজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন।

ছত্রিশ মিনিটের মাথায় প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের ভয়ংকর ট্যাকেলে সৌভিক ছিটকে গিয়ে পড়ল সাইডলাইনে। কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছে ছেলেটা। সবাই ছুটে গেল তার কাছে; অশ্বিন বারপোস্টের নিচ থেকে নড়ল না। সে বুঝে গেছে এবারের মতো সৌভিকের ফ্রেন্ডশিপ কাপ শেষ।

সৌভিকের শুশ্রূষার জন্য দু’ মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ হল প্রথমার্ধে। একেবারে শেষে মুহূর্তে ইসমাইলের একটা জোরালো শট বারের উপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। আর সামান্য গতি কম হলেই হয়ত সেটা গোলে ঢুকে যেতে পারত।

হাফটাইমে থমথমে মুখে বসেছিল ওরা। ধীমানের সঙ্গে জামশেদের ঝগড়া প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে চলে গেল। ডিফেন্সে জামশেদের থেকে সাপোর্ট পাচ্ছে না বলে ধীমান রেগে আগুন। অশ্বিন সেসবে কান দিচ্ছিল না। তার কিচ্ছু ভালো লাগছে না, কিচ্ছু না। সে আনমনে পায়ের নিচের নরম ঘাস ছিঁড়ছিল। অজয়দা এসে পিঠে হাত রেখে বলল, “ওটা কী করলি তুই? নড়লিই না তো জায়গা থেকে। একটু ডান দিকে সরে গেলেই তো বলটা গ্রিপে পেয়ে যেতি!”

সাইডলাইনে মুখ ব্যাজার করে দাঁড়িয়েছিল পল্টু আর দীপেশ। টিম হারছে, এটা কি সহ্য করা যায়? পল্টুর খুব ইচ্ছে করছিল প্রফুল্ল নামে লোকটাকে গিয়ে বলতে “আমাকে নামিয়ে দিন,” কিন্তু সেটা হয় না। ঘোড়ার ডিমের অ্যাকাডেমির প্লেয়ারগুলো ডোবাচ্ছে। এত মিসপাস! তাও সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে! এরকম রেজাল্টই তো হবে তাহলে!

বাষট্টি মিনিট: দল হারছে, তাই প্রভাতী সংঘের ছেলেরা নিজেদের পজিশন ভুলে সবাই উঠে পড়ছে। ইসমাইল সেন্টার থেকে নঈমকে লক্ষ্য করে পাস বাড়িয়েছিল কিন্তু দ্রুত ছুটে গিয়ে সে বল নিয়ে বিপক্ষ দুজন ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে গলে এগিয়ে আসা গোলকিপারের মাথার উপর দিয়ে বল গোলে পাঠিয়ে দিল জয়। বিএসএ গ্রাউন্ড যেন ফেটে পড়ল উল্লাসে।

“গোওওওওওওল! অনবদ্য গোল করে সমতা ফেরাল জয়”—

চেঁচিয়ে উঠল অজয়দা। অশ্বিনের দিশেহারা লাগছে। তার ইচ্ছে করছে মাঠ থেকে পালিয়ে যেতে। জয়কে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করছে ধীমান, রাজা, বাপ্পারা। জয় শুরু থেকেই লক্ষ করেছে আজ নঈম একটা বলও ঠিকঠাক রিসিভ করতে পারছে না, তাই কোনো ঝুঁকি সে নেয়নি। ইসমাইলের পাসটায় গতি ছিল না, তাই জয় দ্রুত সেটা ছিনিয়ে নিতে পেরেছে। নাহলে গ্রিন বুটস-এর প্লেয়ার বলটা পেয়ে যেত।

ছিয়াত্তর মিনিট: গ্রিন বুটস-এর গোলকিক উড়ে এসে জমা পড়ল ওদের রাইট উইংয়ের পায়ে। একটু আগেই নেমেছে ছেলেটা। একদম তাজা, দুর্দান্ত গতি তার পায়ে। নিমেষে কেটে গেল জামশেদ। এগিয়ে আসছে ধীমান। তাকে কনুইয়ের ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে বল নিয়ে প্রতিপক্ষ পৌঁছে গেল প্রায় পেনাল্টি বক্সের কাছে। সৌভিকের পরিবর্তে নেমেছে রজত। তার স্লাইডিং ট্যাকেল বলের রাস্তায় বাধা তৈরি করতে পারলেও দ্রুত বল পায়ে পেয়ে গেল গ্রিন বুটস-এর বসির। তার গতি ও শক্তির সঙ্গে পেরে উঠল না রাজা। পেনল্টি বক্সের মুখে এখন বসির আর গোলে অশ্বিন। বল নিয়ে এগিয়ে আসছে প্রতিপক্ষ। অশ্বিন জানে তার কী করণীয়। এগিয়ে গিয়ে স্ট্রাইকারের সামনে অ্যাঙ্গেলটা ছোট করে দিতে হবে। কিন্তু অশ্বিন দোটানায়। কী করবে সে এবার? “এগিয়ে যা, এগিয়ে যা” চিৎকার উড়ে আসছে মাঠের ধার থেকে। কিন্তু…

অনেকটা জায়গা ফাঁকা পেয়ে সেকেন্ড বার ঘেঁষা শট নিল গ্রিন বুটস-এর স্ট্রাইকার। বল উড়ে গিয়ে জড়িয়ে গেল জালে।

মটকা গরম হয়ে গেল অজয়ের। সে কমেন্ট্রি ভুলে মাইক নামিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “বোকাচোদা অশ্বিন, কী গাড় মাড়াচ্ছিস বাল?”

দর্শকদের মধ্যে ছিলেন প্রতীক সেনও। যে অশ্বিন বিকেল অবধি বাঘের বাচ্চার মতো খেলল, হঠাৎ তার এমন অফ ফর্ম প্রতীকের কপালে ভাঁজ ফেলছিল। কপালে ভাঁজ পড়ছিল পল্টুরও। কী যেন একটা জিনিস তার চেনা চেনা লাগছে। আবছা আবছা মনে পড়ছে; একটা অস্বস্তি খেলা করে বেড়াচ্ছে তার মনের মধ্যে।

নির্ধারিত সময় পেরিয়ে খেলা গড়াল ইনজুরি টাইমে। বিরানব্বই মিনিটের মাথায় ইসমাইলের একটা শট উড়ে গিয়েছিল গোলের দিকে কিন্তু সে শটে গতি এতই কম ছিল যে গ্রিন বুটস-এর গোলকিপার সহজেই বলের নাগাল পেয়ে গেল। তার ফিরতি ভলি যখন বাতাসে, রেফারি ফাইনাল হুইসল বাজিয়ে দিলেন। বলটা মাটিতে নেমে ড্রপ খেতে খেতে গিয়ে পৌঁছল অশ্বিনের পায়ের কাছে। তার মনের সমস্ত ঘৃণা, হতাশা নেমে এল পায়ে। বেমক্কা এক শটে সে বলটাকে সাইডলাইনের উপর দিয়ে উড়িয়ে দিল।

বিএসএ গ্রাউন্ডে যেন অকাল নিস্তব্ধতা নেমে এল। গ্রিন বুটস-এর প্লেয়ার, সমর্থকেরা উল্লাস করছে, কিন্তু উল্লাসের সেই শব্দ যেন জয়, রাজা, বাপ্পা, রজত, পল্টু, অশ্বিনদের কানের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। ছলছল চোখে একবার গোলপোস্টের জালের দিকে ফিরে অশ্বিন মনে মনে বলল, “তোমার সঙ্গে এই শেষ দেখা। আর কোনোদিন মাঠে নামবো না।”

ঘামে ভেজা জার্সি, গ্লাভস, সিন গার্ড সব মাঠেই ফেলে রেখে দ্রুত হেঁটে ফ্লাডলাইটের আওতার বাইরে চলে গেল অশ্বিন। যেন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সে। কাঁচা কাঁচা খিস্তি ভেসে আসছে; সে কান দিচ্ছে না। বিপক্ষের খেলোয়াড় বা নিজের টিমের সদস্য, কারোরই মুখ দেখতে আর ইচ্ছে করছে না অশ্বিনের। বাবাই ঠিক কথা বলছিল এতদিন ধরে। খেলাটা আগে ছেড়ে দিলেই হতো। তাহলে আজকের দিনটা তাকে দেখতে হতো না।

৬৩

সুকান্ত সেতু থেকে ধৃত ব্যক্তিকে জেরা করে এসটিএফ সেরকম কোনো তথ্য বের করতে পারল না। তার বাকি দুই সঙ্গী কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে সে প্রশ্নের জবাবে সে পাথর হয়ে বসে রইল। তবে রবিউল আলমের পাঠানো নগদ টাকা সমেত যেহেতু তাকে গ্রেফতার করা গেছে, তার ভিত্তিতে দুপুরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠানো হল রবিউল আলমকে। সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল; ঘটনাপ্রবাহের উপরে নজর রাখছিল এনএটিসি’র গোয়েন্দারাও। হকের নির্দেশে আলমকে দ্বিতীয় দফার জেরা করতে তার টিমের দুই সদস্য পৌঁছে গেল এসটিএফের দফতরে। মধ্যরাতে চার লক্ষ টাকা তিনি কোন বিশেষ কাজের জন্য পাঠাচ্ছিলেন সেটা অন্তত জানা দরকার।

দশজনের দল কমব্যাট অপারেশানের জন্য তৈরি হয়ে সকালেই চলে এসেছিল মালদা। পরিকল্পিতভাবেই তাদের এক জায়গায় না তুলে আলাদা আলাদা জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করিয়েছে হক। তবে তার কপালের ভাঁজ ক্রমশ গভীর হচ্ছে। যে আশঙ্কা সে করেছিল তা সত্যি হতে পারে এমন কোনো ইঙ্গিত এখনও পাওয়া যায়নি। প্রতীক সেনকে দিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে খেলা দেখতে আসা অনেক সমর্থকের সঙ্গে সে কথা বলিয়েছে গত দু’ দিনে; প্রতীকের শার্টের বুকপকেটে সে বসিয়ে দিয়েছিল একটি পেন ক্যামেরা। সেই ক্যামেরায় সেসব কথোপকথনের ভিডিও রেকর্ডিং গতকাল সারারাত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে সে। কোনো গোলমাল তার চোখে পড়েনি।

এরা কেউ বেআইনিভাবে এদেশে আসেনি। হিলি বর্ডারে ইমিগ্রেশন করিয়ে টিমের সঙ্গে সঙ্গেই এপারে এসে ক্লাবের পাঠানো বাস আর গাড়িতে সওয়ার হয়ে এসেছে।

তবে কি তার অনুমানে কোথাও বড় ভুল হচ্ছে? প্রতীক সেনের উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে থেকে পাওয়া রেবেটা নাইন্টিটুএফএস-এর সঙ্গে রিবাতের কোনো যোগাযোগ নেই? অন্যান্য যে সম্ভাবনাগুলো মাথাচাড়া দিচ্ছে সেগুলোও কি তাহলে ভুল? সব কি তাহলে আবার নতুন করে ভাবতে হবে?

বিকেল ফুরিয়ে আসছিল গাজোলে, দিন এবং সন্ধের সন্ধিক্ষণে আকাশে ছড়িয়ে পড়ছিল একটা লালচে আলো। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছিল বিকেলের আজানের সুর। আনমনে বিএসএ গ্রাউন্ডের দিকে এগোচ্ছিল হক। একই কায়দায় পেন ক্যামেরা ব্যবহার করে সে গতকাল একবার এলাকার বিধায়ক অমল বরাট এবং রাজ্যসভার এমপি পবিত্র দত্তের সঙ্গে কথা বলেছে। কায়দা করে পবিত্র দত্তের সামনে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিপজ্জনক কার্যকলাপে শাসকদলের মদতের প্রসঙ্গ তুলতেই সে বুঝেছে পবিত্র দত্ত অনেক কিছুই জানেন, কিন্তু মুখ বন্ধ রেখেছেন। কিন্তু তাঁর অফিসের এক মহিলা সদস্যের একটি দাবি হকের কপালে ভাঁজ ফেলেিছল। অমল বরাট গাজোলে প্রাইভেট হাসপাতাল তৈরির ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের তরফে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর শর্ত একটাই। হাসপাতালে তাঁর সুপারিশে কোনো পেশেন্ট গেলে তার পরিচয়পত্র-টত্র নিয়ে কড়াকড়ি করা চলবে না। কিওর প্লাসের প্রতিনিধিরূপী শংকর শর্মা তাঁর কোম্পানি সেই শর্তে রাজি বলে জানিয়ে এসেছেন। কেন তাঁর সুপারিশের রোগীর পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়া যাবে না, সেটা বরাট স্পষ্ট করেননি, কিন্তু যা বোঝার হক বুঝে নিয়েছে।

আজ আর একটু পরেই ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল। কিন্তু হোমটিম হেরে যাওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে তেমন মাতামাতি নেই। সেমিফাইনালে টিমের হেরে যাওয়াটা অনেকেরই যে হজম হচ্ছে না সেটা ইতিউতি কিছু মানুষের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হচ্ছিল।

সন্ধে সাতটা: মাঠ থেকে প্রধান অতিথি উত্তরবঙ্গের মন্ত্রীর বক্তৃতা ভেসে আসছে; আর একটু পরেই ফাইনাল শুরু হবে, এমন সময়ে বাবা-মা’কে প্রণাম করে পিঠে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোল অশ্বিন। বুক ভেঙে যাচ্ছিল তার বিএসএ গ্রাউন্ডের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু…। আজ রাতের গৌড় এক্সপ্রেস ধরে কলকাতা চলে যাবে সে। ফিরে আসবে তিনদিন পরে। এখান থেকে স্টেশন অনেকটা পথ, তাছাড়া খেলার পরিবেশের মধ্যেও তার যন্ত্রণা বাড়ছিল তাই তাড়াতাড়িই ঘর ছেড়েছে অশ্বিন।

প্রভাতী সংঘের গোলকিপার ক্যাপ্টেন জানত না তার উপরে নজর রাখা হয়েছে। সে যখন মালদা স্টেশনে ঢুকছে, প্রতীক সেনের কাছে তাঁর এক সহকর্মী মারফত খবর পৌঁছে গেল। রয়্যাল এনিফিল্ডে সওয়ার হলেন প্রতীক সেন। একটা গোলমালের গন্ধ পাচ্ছেন তিনি।

প্রভাতী সংঘ টিমের জনা পাঁচেক সদস্য সেমিফাইনালে হারের যন্ত্রণা বুকে নিয়েও স্টেডিয়ামে এসেছে। এসেছে ধীমান, রাজা, দীপেশ আর পল্টু। জয় বলেছে আসতেও পারে, না’ও পারে। ওরা ফুটবল পাগল, তাই চোখের সামনে খেলা হলে কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন ওদের মাঠের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

মাঠে এল নতুন ট্রফি এবং দুই দলের সমস্ত উপহার। ওরা ছুটে গেল ট্রফিটা দেখতে। দারুণ দেখতে ট্রফিটা, অনেকটা আইপিএল ট্রফির মতো বড়। ওদেরই কথায় সেই ট্রফির হাতলে লাগানো হয়েছে সরু সরু ফিতে। ঝকঝকে সোনালি ট্রফিটা দেখতে দেখতে একটা কান্না যেন জয়ের চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছিল। কিটব্যাগগুলোও দারুণ দেখতে। আগের বছরের চেয়ে লম্বায় বেশ খানিকটা বড়। কোয়ালিটিও ভালো বলে মনে হল ওদের।

মাঠের ধারে বিশিষ্টদের বসার ব্যবস্থা হয়েছে। রয়েছেন মন্ত্রীসহ অন্যান্য অতিথিরা। দুই দল এবং অতিথিদের জন্য জন্য বাঁশ আর সামিয়ানা দিয়ে ঘেরা বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছে। শ্যামলকাকা প্রভাতী সংঘের ছেলেদেরও সেখানেই বসার জন্য ডেকে নিলেন। যে কারণে ডিপার্টমেন্ট তাকে ‘হক’ উপাধি দিয়েছে, সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মাঠের এ কোনা থেকে ও কোনা ঘোরাচ্ছিল এনএটিসি’র সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এজেন্ট। না, কপালে ভাঁজ পড়তে পারে এমন কিছু এখনও তার নজরে পড়েনি।

রেফারির বাঁশি বেজে উঠল নির্ধারিত সময়ে; শুরু হয়ে গেল ফাইনাল ম্যাচ। পাঁচ মিনিটের মাথায় কালিয়াচক প্রায় গোল করে ফেলেছিল কিন্তু ফাঁকা গোল পেয়েও ওদের প্লেয়ার বল তিন কাঠির মধ্যে রাখতে পারল না। গ্রিন বুটসকে আজ গতকালের চেয়েও চনমনে লাগছে; বল দখলে রাখছে বেশি। কিন্তু গোল পাচ্ছে না।

পঁয়ত্রিশ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি পেয়ে এক গোলে এগিয়ে গেল গ্রিন বুটস। স্টেডিয়ামে ওদের দর্শকেরা উল্লাসে ফেটে পড়ছে। এবার টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই ওরা একটু সন্দিহান ছিল। গ্রিন বুটস এবার তাদের দলে চারটে বদল করেছে। গুরুত্বপূর্ণ চারজন প্লেয়ারকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে যারা এসেছে তারা কেমন খেলবে তা নিয়ে সমর্থকদের চিন্তা ছিল। কিন্তু এখন ওরা খুব খুশি।

হাফ টাইমে স্কোরলাইন ১-০ হয়ে রইল।

মালদা স্টেশনে কালো গ্রানাইটের তৈরি সিটে বসে উদাস দৃষ্টিতে ট্রেনের আসাযাওয়া দেখছিল অশ্বিন। তার ট্রেনের এখনও দেরি আছে। একটু ভয় পাচ্ছে অশ্বিন। এভাবে একা সে কোথাও যায়নি কোনোদিন। কলকাতায় তো কোনোদিনই যায়নি। সেখানে গিয়ে কি হারিয়ে যাবে সে? যদিও কীভাবে যেতে হবে সবই ভালো করে বুঝিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে তাকে। তবু…

মোবাইলে সময় দেখল অশ্বিন। বিএসএ গ্রাউন্ডে এতক্ষণে হয়তো সেকেন্ড হাফের খেলা শুরু হয়ে গেছে, মনে মনে বলল সে। তার পাশেই এক বৃদ্ধ দম্পতি বসে আছেন। তাদেরকে ওর ব্যাগের দিকে একটু নজর রাখতে বলে অশ্বিন উঠল। বসে বসে গা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। একটু শরীরটাকে ছাড়িয়ে নেওয়া দরকার। এক পাক স্টেশনের এ মাথা থেকে ও মাথা হেঁটে আসার জন্য সিট ছাড়তেই সে চমকে উঠল। যিনি এগিয়ে আসছেন, সেই ব্যক্তি ওর চেনা। থানার বড়বাবু। এখন নাকি উনি ডিউটিতে নেই।

প্রতীক সেন সটান এগিয়ে এসে ওর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “কোথায় যাচ্ছিস অশ্বিন?”

তিপ্পান্ন মিনিটের মাথায় গ্রিন বুটস এগিয়ে গেল দু’ গোলে। কালিয়াচকের টিমটার খেলায় কেমন যেন একটা গা ছাড়া ভাব লক্ষ করল পল্টু। এখনও সময় আছে, দুটো গোল শোধ দেওয়া যায় কিন্তু ওরা যেন শুধু ডিফেন্ড করতেই ব্যস্ত।

একটা গোল অবশ্য সাতষট্টি মিনিটের মাথায় শোধ হল। ব্যবধান বজায় রাখতে গ্রিন বুটস এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। মাঠের মধ্যে চোরাগোপ্তা মারামারি হচ্ছে যথেচ্ছ। গ্রিন বুটস-এর একটা পাস বিপক্ষের প্লেয়ারের পায়ে লেগে সাইডলাইন পেরিয়ে পল্টুর কাছে চলে এসেছিল। সে বলটা কুড়িয়ে নিয়ে ফেরত দিতে যাচ্ছিল কিন্তু গ্রিন বুটস-এর বসির উত্তেজনার চোটে ওকে ছিটকে ফেলে দিয়ে বলটা কেড়ে নিল। মাটিতে পড়েই বসিরের দিকে ফিরে তাকাল পল্টু। এক মুহূর্তের চোখাচোখি, কিন্তু মনে কেমন যেন একটা ধাক্কা লাগল পল্টুর। সে বসে রইল মাটিতে। তার শরীরটা যেন কেমন খারাপ লাগছে।

দ্বিতীয় সেমিফাইনালের মতোই খেলা গড়াল ইনজুরি টাইমে। পল্টুর শরীর ভালো লাগছে না। সে দীপেশকে প্রায় জোর করেই তার সঙ্গে মাসির বাড়ি ফিরে চলতে বলল। দীপেশ রেগে যাচ্ছিল কিন্তু বুঝতে পারছিল তার বন্ধু স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।

শেষ বাঁশি বেজে গেল। শেষ মুহূর্তে গোল শোধ দিতে মরিয়া কালিয়াচক টিম গোলকিপার সমেত উঠে এসেছিল বিপক্ষের অর্ধে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটা সহজ গোল করে ব্যবধান আরো বাড়িয়ে ট্রফি নিশ্চিত করে ফেলল গ্রিন বুটস।

মন্ত্রীর তাড়া ছিল। তিনি জয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দিয়েই বেরিয়ে গেলেন স্টেডিয়াম থেকে। হতাশাকে সঙ্গী করে মাঠ ছাড়ল হকও। নাশকতার কোনো ঘটনা এতক্ষণ যখন ঘটেনি, আর ঘটবে না।

কিন্তু, গল্প তখনও শেষ হয়নি। রাঙাভিটায় তার অস্থায়ী বাসস্থানের গেটে হাত রেখেছে হক, ঠিক সেই সময়ে তার মোবাইল বেজে উঠল। কল আসছে সীমান্তের ওপার থেকে। বাংলাদেশের ইন্টেলিজেন্স অফিসার শোহরাব জানালেন তিনি অনুসন্ধান করে জেনেছেন এনএটিসি’র অফিসারের অনুমান নির্ভুল ছিল। রিবাতের বর্তমান কমান্ডার-ইন-চিফ ইখলাস রুবেল এক সময়ে দুর্দান্ত ফুটবল খেলতোো। স্কুল, কলেজ তো বটেই কুমিল্যার একটি ফুটবল টিমের নিয়মিত সদস্য ছিল সে; খেলেছে ওখানকার ফার্স্ট ডিভিশন লিগেও।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বন্ধুকে সহযোগিতার জন্য অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানাল হক। অঙ্ক মিলে যাচ্ছে। ফোনে রাজেশের সঙ্গে যোগাযোগ করল হক। রাজেশকে একজন ব্যক্তিকে গতকাল বিকেল থেকেই অনুসরণ করতে বলে দিয়েছিল সে। যে ব্যক্তির যাওয়ার কথা ছিল কলকাতায়, সে বসে আছে বোলপুর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত প্রান্তিকের একটি রিসর্টে।

চমকের যে এরপরেও বাকি ছিল সেটা হকও ভাবেনি। সে বাড়ির দরজায় পা রাখতেই দেখল প্রবুদ্ধবাবু পল্টুকে সঙ্গে করে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছেন তার দিকেই।

“আপনার খোঁজেই বেরোচ্ছিলাম। পল্টু একটা সাংঘাতিক কথা বলছে। আপনাকে তো ওর সেই কিডন্যাপিং-এর ব্যাপারটা বলেইছি,” উত্তেজিতভাবে বললেন প্রবুদ্ধবাবু।

হক দ্রুত পল্টু আর প্রবুদ্ধবাবুকে নিয়ে তার ঘরে ঢুকল। ভেজিয়ে দিল দরজা।

“কী হয়েছে বল তো,” পল্টুর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল হক। পল্টুর কথা জড়িয়ে আসছে, সারা শরীর কাঁপছে। প্রবুদ্ধবাবু বললেন, “ও বলছে বাংলাদেশের ফুটবল টিমটাতে একজন প্লেয়ার রয়েছে যে ওর কিডিন্যাপিংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। প্লেয়ারটার নাম বসির, কিন্তু ও বলছে তার আসল নাম শাহজাদ। এই শাহজাদই ওকে কিডন্যাপ করেছিল। পরে সে সন্ত্রাসবাদীদের দলে যোগ দেয়।”

হকের মনের মধ্যে নিমেষে ঝড় উঠল। মনের মধ্যে সাজানো ছবিগুলোর উপর থেকে অস্পষ্টতার পর্দা যেন উড়ে যাচ্ছে সেই ঝোড়ো হাওয়ায়। আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা যাবে না। সশস্ত্র ফোর্সকে ফিল্ডে নামার নির্দেশ দিল সে। ভয়ংকর একটা ষড়যন্ত্রের নকশা ফুটে উঠেছে। প্রতিপক্ষের প্রস্তুতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তার, কিন্তু ছকটা সে ধরতে পারছে।

পল্টুকে সঙ্গে নিয়ে বিস্ফারিত চোখে প্রবুদ্ধ সরকার দেখলেন মুহূর্তের মধ্যে একটা মানুষের আমূল বেশ বদল। ঘরের কোণে রাখা ট্রলি ব্যাগের মধ্যে থেকে একটা সবজেটে লম্বা বাক্স বের করল হক। সে বাক্স থেকে বেরিয়ে এল মাঝারি সাইজের একটি বন্দুক, যার পোশাকি পরিচয় এমপিফাইভ কারবাইন। বেরোল একটি পিস্তলও। বাক্সের ভিতরে রাখা পাউচ থেকে বেরিয়ে এল বুলেট, দ্রুত ম্যাগজিন ভর্তি হওয়ার পরে ধাতব শব্দের মাধ্যমে তা যুক্ত হল এমপি ফাইভের শরীরে। কোমরে বাঁধা হল হোলস্টার,তার মধ্যে ঢুকে গেল পিস্তলটি। সবশেষে বেরোল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। পায়ের পাতলা চটি সরে গিয়ে উঠল ভারী বুট। সংঘর্ষের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল হক। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল দ্রুত।

পল্টু ফ্যালফ্যাল করে মেসোমশাইয়ের দিকে চাইল। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা। মেসোমশাই একটা ঢোক গিলে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

প্রান্তিকে রিসর্টের ঘরে স্যাটেলাইট ফোন কানে ধরে বসেছিল সে। সুদূর তুরস্ক থেকে দলের কমান্ডার-ইন-চিফের সঙ্গে কথা বলছেন জাহির আহমেদ। মিশনের আগে এটাই দু’ পক্ষের মধ্যে শেষ কথোপকথন।

নাশকতার পরিকল্পনাটি ফুলপ্রুফ জেনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন জাহির। ভারতবর্ষের ইন্টেলিজেন্সকে একটা মোক্ষম ধাক্কা দেওয়ার ছক তৈরি। তাদের অনেক বছরের একটা ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দেওয়া এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। আগামী পরশু সেই ভোর, যখন রিবাতের গর্জনে কেঁপে উঠবে মাটি, হতচকিত হয়ে যাবে সকলে।

দলের প্রধানকে বিদায় জানিয়ে কল ডিসকানেক্ট করল সে। গিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। আজ একটু আগে অবধি সে নিজের খোলসটা ধরে রেখেছিল কারণ রিসর্টে তার ফ্লোরে আরো চারটে ঘরে অতিথি ছিল। এখন সে একা।

সে খুলে ফেলল তার টুপি, সরিয়ে নিল তার সাধারণ হেয়ারকাটের পরচুলা। বেরিয়ে পড়ল ছোট্ট ছোট্ট করে ছাঁটা আসল চুল। পুরনো ক্ষত ঢেকে রাখার জন্য সযত্নে বাড়িয়ে তোলা দাড়ি ইলেকট্রনিক শেভারের শক্তির কাছে পরাস্ত হয়ে খসে পড়ল একটু একটু করে। তার চোখের চাহনিতে এতদিন যে উষ্ণতা, আবেগ ছিল, তা মিলিয়ে যাচ্ছে, বদলে প্রকাশ পাচ্ছে একটা শীতলতা। সে দৃষ্টিতে কোনো আবেগের জায়গা নেই, আছে শুধু সংকল্পে স্থির থাকার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

আয়নার প্রতিবিম্ব থেকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলেন রণজয় বিশ্বাস, আড়াল থেকে সামনে এল এক অন্য মানুষ।

যাকে এযাবৎকাল কেউ দেখেনি।

ইখলাস রুবেল!!!

ফোর্সের পাঁচজনকে গ্রিন বুটস-এর টিম যে বাড়িতে উঠেছে সেই বাড়ির দিকে এগোতে বলে বাকিদের নিয়ে কোচ রণজয় বিশ্বাসের বাড়ির দিকে ছুটল হক। প্রত্যেকেই হকের মতোই সামরিক সাজে সজ্জিত। ইতিমধ্যেই প্রতীক সেনের কাছ থেকে সে খবর পেয়ে গেছে বাংলাদেশের টিমকে ফাইনালে ওঠানোর জন্যই গতকাল সেমিফাইনাল ম্যাচ ইচ্ছে করে হেরে গিয়েছিল প্রভাতী সংঘ। তাদের ক্যাপ্টেন অশ্বিনকে জোর করে সত্তর হাজার টাকা আর এখানে ভালো চাকরির প্রস্তাব দিয়ে ম্যাচ ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন টুর্নামেন্টের উদ্যোক্তা শ্যামলেন্দু নস্কর। অশ্বিন সব কথা খুলে বলেছে প্রতীককে।

কোচের বাড়ি আর পঞ্চাশ মিটারের মধ্যে, এখনই সেটাকে ঘিরে ফেলতে হবে, তারপরে ভাঙতে হবে দরজার তালা। কী কাণ্ড চলছিল ওই ঘরের মধ্যে এতদিন, সেটা আগে জানা জরুরি। সকলে বাড়ির সামনে পৌঁছে গেছে, এমন সময় হঠাৎই ফাঁকা বাড়ির ভিতর থেকে শব্দ করে ছুটে এল একটা গুলি, এসে লাগল হকের ফোর্সের এক সদস্যের কাঁধে!

৬৪. ইনজুরি টাইম

যে বাড়ির দরজায় তালা ঝুলছে তারই ভিতর থেকে গুলি ছুটে আসছে; অর্থাৎ আক্রমণের জন্য তৈরি হয়ে সেখানে বসেছিল প্রতিপক্ষ। গুলিটা এসেছে একটা জানালার দিক থেকে। পালটা সেদিকে ফায়ার করল এনএটিসি’র কমান্ডো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীও।

ট্যাট ট্যাট ট্যাট ট্যাট ট্যাট ট্যাট… এক ঝাঁক আলোর ঝলকানি দেখা দিল সেই বাড়ির জানালায়। কমান্ডোদের পায়ের সামনের মাটি ছিটকে ছিটকে উঠতে লাগল। আহত সহকর্মীকে কোনো রকমে রাস্তার ধারে একটা গাছের নিচে বসিয়ে বাড়ির দিকে ছুটল হক। এনএটিসি’র কমান্ডোদের এমপিফাইভ কারবাইনের দাপটে বাড়ির দুর্বল কাঠের দরজার হাল বেহাল হয়ে যেতে বেশিক্ষণ লাগল না। ভিতরে সম্ভবত একজনই আছে। কারণ এই মুহূর্তে জানালার দিক শান্ত, গুলি আসছে ফুটো হয়ে যাওয়া দরজার ওপার থেকে। ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসা গুলিকে কোনো রকমে এড়িয়ে দরজার দুই পাশে সরে গেল কমান্ডোরা। খানিকক্ষণ সব চুপচাপ। ফোনে দ্বিতীয় দলের মার্ক্সম্যান প্রতাপকে ডেকে নিল হক। প্রতিপক্ষ দরজার ওপারে রাইফেল নিয়ে বসে আছে। তাকে নিকেশ করতে গেলে দরজাটা আগে উড়িয়ে দিতে হবে। সে কাজের জন্য মেশিনগান দরকার। স্থানীয় একটি ছেলের বাইকে লিফট নিয়ে প্রতাপ এসে পৌঁছে গেল পাঁচ মিনিটের মধ্যেই। আবার এক ঝাঁক গুলি ছুটে গেল বাড়ির জানালা দিয়ে তার দিকে, কিন্তু ক্ষতি কিছু হল না।

প্রতাপের দক্ষ হাতে মেশিনগান গর্জে উঠল। তার আক্রমণে বাড়ির দরজা খসে পড়ল অল্প সময়ের মধ্যেই। হক ততক্ষণে কারবাইন নামিয়ে রেখে কোমরের হোলস্টার থেকে নাইনএমএম পিস্তল তুলে নিয়েছে। দরজা ভেঙে যাওয়ায় প্রতিপক্ষ কিছুটা পিছিয়ে গেছে। দ্রুত হককে কভার দিল দুই সহকর্মী। তাদের কারবাইন গর্জে উঠল। উলটোদিকের রাইফেল সামান্য প্রতিআক্রমণের পরেই স্তব্ধ হল। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল লুকিয়ে থাকা আক্রমণকারী।

অশ্বিনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসছিলেন প্রতীক। ফায়ারিংয়ের শব্দ শুনতে পেয়েই ছুটলেন সেদিকে। সঙ্গে সার্ভিস রিভলভার নেই, তবু এই অপারেশানে সামিল হতে চান তিনি। ফুটবল কোচের বাড়িতে ঢুকে প্রথমেই যেটা তাঁর চোখে পড়ল তা হল মাটিতে লুটিয়ে পড়া ব্যক্তির ডান হাতের কবজিতে জড়ানো ব্যান্ডেজ। সেই অস্ত্র উদ্ধারের রাতে বোরখার আড়ালে আত্মগোপন করা শয়তানের হাতের ঠিক ওই জায়গাতেই প্রতীকের সার্ভিস রিভলভারের গুলি লেগেছিল। বাড়ির ভিতরে তল্লাশি শুরু হল। এমন অনেক জিনিস সেখানে পাওয়া গেল যা হকের হৃদ্স্পন্দন বাড়িয়ে দিল। প্রতীক সেন ইতিমধ্যে দেখে এসেছেন বাড়ির পিছনদিকে বাগানের শেষ প্রান্তে পাঁচিলের গায়ের দরজাটা খোলা। অর্থাৎ সকলের চোখের আড়ালে এই ঘরের বাসিন্দার কাছে সদ্যমৃত ব্যক্তি আসত ওই চোরাপথে। বাড়ির পিছনে আগাছার জঙ্গল, সুতরাং মানুষের দৃষ্টি এড়ানো খুব কঠিন নয়।

প্রতীক ফিরে এসে দেখলেন মেঝেতে কিছু কাগজপত্র ছড়িয়ে নিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে সেগুলো দেখছে হক। তার শার্টের বাঁ হাতা রক্তে ভিজে গিয়েছে কিন্তু সেটা যেন সে জানেই না।

বিপদ আঁচ করতে পেরে অতিথিশালা থেকে ফুটবল প্লেয়ারবেশী জঙ্গিরাও শুরু করে দিল গুলিবর্ষণ। পালটা আক্রমণ করতে করতে বাড়িটার দিকে এগোতে লাগল এনএটিসি’র কোমান্ডাও বাহিনীও। অবস্থা গুরুতর, তাই হকের নির্দেশে অভিমান ভুলে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন প্রতীক সেন। তাঁর অনুরোধে দ্রুত সাড়া দিয়ে গাজোলের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশকর্তা এসপি’র অফিসে খবর পাঠালেন; জানালেন এই অপারেশনে জেলা পুলিশের স্পেশাল অপারেশান গ্রুপের সাহায্য অবিলম্বে প্রয়োজন।

ফুটবল টুর্নামেন্টের উত্তেজনা ধিকি ধিকি জ্বলতে জ্বলতেই যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে তা সকলের কল্পনার বাইরে ছিল। গুলি চলার শব্দ, দৃশ্য টিভিতেই দেখেছে সকলে, চোখের সামনে এমন গুলি পালটা গুলি দেখার অভিজ্ঞতা কারোর নেই। মাঠে ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পরে জয় যাচ্ছিল ধীমানের সঙ্গে তার বাড়িতে। ঠিক এমন সময়ই গোলাগুলিটা শুরু হয়। কৌতূহল চাপতে না পেরে বিপদের মধ্যেও ওরা চলে এসেছিল বিয়েবাড়িটার কাছাকাছি।

ওই বাড়িতে তো বাংলাদেশের ফুটবল টিম আছে। তাহলে ভিতর থেকে গুলি চালাচ্ছে কারা? ধীমান আর জয় চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। ওদের থেকে মাত্র দশ-বারো হাত দূরে দাঁড়িয়ে একজন বাড়ির দোতলার একটা জানালা লক্ষ্য করে রাইফেল চালাচ্ছে। কীসব যেন টুংটাং শব্দে খসে খসে পড়ছে পিচের রাস্তার উপরে। রাস্তার ধারে একটা বড় গাছের আড়ালে ধীমানকে টেনে নিয়ে গেল জয়।

ধীমান ফিসফিস করে বলল, “মাটিতে ওগুলো কী পড়ছে রে জয়? বন্দুকটা খারাপ আছে মনে হয়, গুলিগুলো রাস্তায় পড়ে যাচ্ছে?”

জয় দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল, “ধুর গান্ডু! ওগুলো হল গুলির খোল।”

“খোল! খোল মানে?”

“বাল, তুই থামবি!”

স্পেশাল অপারেশান গ্রুপ এসে রাত ন’টা নাগাদ ঢুকে পড়ল বিয়েবাড়িতে। এনএটিসি’র কমান্ডোদের অ্যামুনিশান কমে আসছে। কিছুক্ষণ স্পেশাল অপারেশান গ্রুপকেই কমব্যাট চালাতে হবে। যে অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে সারা বছর হয় সানাই নয়তো ডিস্কো মিউজিক ভেসে আসে তার মধ্যে থেকে ট্যাট ট্যাট ট্যাট ট্যাট; ঠাস ঠাস শব্দ বেরিয়ে আসতে দেখে এলাকাবাসী স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছিলেন। বছরের বেশিরভাগ সময় আলোয় ঝলমল করতে দেখে তারা এই বাড়িটাকে। এই মুহূর্তে তার জানালাগুলো দিয়ে বেরিয়ে আসছে ধোঁয়া, সঙ্গে বিকট গন্ধ।

রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ স্তব্ধ হল বাড়ি। দোতলা থেকে উদ্ধার করা হল তিনজনের নিথর দেহ। পাশের ঘরে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল ন’জন। বেচারা ফুটবলারেরা ভাবতেই পারেনি হঠাৎ দু’ দিন আগে তাদের টিমের পাঁচজন প্লেয়ারকে বসিয়ে দিয়ে যাদের ঢোকানো হয়েছিল তাদের একটা অন্য পরিচয় আছে। গতকালের সেমিফাইনাল আর আজকের ফাইনাল, দুটোই যে বিপক্ষ টিমের ইচ্ছাকৃত খারাপ খেলার কারণে তারা জিতে গেছে সে খবর তাদের কাছে আর নতুন নয়। কেন এমনটা করার দরকার হল সেটা তাদের বলা হয়নি তবে কিছু একটা যে তলায় তলায় চলছে তা তারা অনুমান করতে পেরেছিল।

ঘণ্টাখানেক আগে পুরস্কার পাওয়া কিটব্যাগ থেকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত কতগুলো যন্ত্রাংশকে জুড়ে তাদের টিমমেটদের রাইফেল বানাতে দেখে বেচারাদের সবকিছু মাথায় উঠে গিয়েছিল। টাইট করে আটকানো ট্রফিটার ঢাকনা খুলে ভিতর থেকে টেপ দিয়ে জড়ানো কতগুলো কালচে সাবানের মতো প্যাকেট বের করে নিয়েছিল ওই পাঁচজন। নিজেদের মধ্যে কী সব কথা বলে তাদের মধ্যে দুজন ওই প্যাকেটগুলো ব্যাগে ভরে ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল। রয়ে গিয়েছিল বাকি তিনজন।

গাড়ির ব্যবস্থা করা ছিল আগে থেকেই। তাতে চড়ে ভোররাতে প্রান্তিকে পৌঁছে গেল ইজাজ ও শাহজাদ। রামপুরহাট পেরিয়ে এসে ড্রাইভারটাকে শেষ রাতের অন্ধকারে খুন করে লাশটা রাস্তার ধারে ফেলে রেখে এসেছে তারা। প্রান্তিকের এই রিসর্ট থেকেই চূড়ান্ত অপারেশানে যাওয়ার কথা তাদের। কিন্তু দলের বাকি তিন সদস্য কেন এখনও এসে পৌঁছল না তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিল।

নিজের ঘরে তখন প্রার্থনা শেষ করে বিশেষ রণসজ্জায় সজ্জিত হচ্ছিল ইখলাস রুবেল। সে আঁচ করতে পেরেছে কী হয়েছে মালদায়। তার বাড়ির দিকে কয়েকজন বন্দুকধারী ছুটে আসছে এটাই শেষ খবর সে পেয়েছিল তার সহযোদ্ধার থেকে। তারপর থেকে সব স্তব্ধ।

ভোরের আলো ফুটে গেছে, এবার রওনা হতে হবে। এক জায়গায় জড়ো হয়ে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য তিনজনে শপথ নিল। কিন্তু…

রিসর্টের রিসেপশন থেকে খবর এল জনা দশেকের একটা সশস্ত্র টিম বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। চোয়াল শক্ত হল ইখলাস রুবেলের। এই যুদ্ধে সে হার মানবে না। শুধু কোমরে গোঁজা পিস্তলে হবে না, তাই অত্যাধুনিক মেশিনগান সঙ্গের ব্যাগ থেকে বের করে নিয়ে হাতে তুলে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল সে। আচমকা কম দূরত্ব থেকে ফায়ারিংয়ে হতচকিত হয়ে ছিটকে গেল হকের বাহিনী। এলপাথাড়ি নয়, পরিকল্পিত কায়দায় একশো আশি ডিগ্রিতে ফায়ার করতে করতে রিসর্ট থেকে বেরিয়ে আসছে একজন, তাই আত্মরক্ষার জন্য আড়াল খুঁজতে হল হকের লোকেদের। একজনের বুকে, আরেকজনের পেটে গুলির ধাক্কা লাগল। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পথে আসতে আসতেই পরে নিয়েছে তারা, তবু ছিটকে পড়ল মাটিতে। রিসর্টের তিনতলার জানালা দিয়েও ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি নেমে আসছে, আবার ছিটকে ছিটকে উঠছে মাটি।

প্রতিপক্ষরা একটু কোণঠাসা বুঝে বেতের মতো চেহারার লোকটা একটা নিরাপদ দূরত্বে চলে গিয়ে মেশিনগান ফেলে রেখে ছুটে চলে গেল স্টেশনের দিকে। আড়াল থেকে তাকে দেখে নিয়েছে হক। হুলিয়া বদলে ফেলেছে লোকটা। কিন্তু সুঠাম চেহারা বদলাবে কেমন করে? সেদিন ওই চেহারা আর তার গেরিলা কায়দায় দ্রুত ইসমাইলের বাড়ির দেওয়াল বেয়ে ওঠা হকের মনে প্রথম সন্দেহ জাগিয়েছিল। এই দ্রুততা, এই গতিতে দেওয়াল বেয়ে ওঠার কসরত কোথায় যেন দেখেছে সে। মিলটা সে খুঁজে পেয়েছিল মোবাইলে সেভ করে রাখা পশ্চিম পাকিস্তানের রুক্ষ ভূমিতে সূর্যাস্তের সময়ে ইখলাস রুবেলের সেই ট্রেনিংয়ের ভিডিওর সঙ্গে। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে স্থানীয় সহকর্মী রাজেশকে সে নির্দেশ দেয় ফুটবল কোচ রণজয় বিশ্বাসের উপরে চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারির ব্যবস্থা করতে।

প্রভাতী সংঘের ছেলেরা তাকে জানিয়েছে রোজ সকালের নামাজের ঠিক পরেই ওদের প্র্যাকটিস শুরু করাতেন কোচ। শীতকালেও সেই রুটিনের নড়চড় হয়নি। তারা আরো জানায় বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও স্যার তাদের মধ্যে বাছাই করা জনা পাঁচেক সদস্য ছাড়া কাউকে কোনোদিন বাড়িতে ভিডিও দেখতে ডাকেননি। ওরা দেখতে চাইলেই “আচ্ছা হবে একদিন,” “টুর্নামেন্টের পরে হবে” জাতীয় কথা বলে ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতেন তিনি। ভারত সেবকের অফিসে পবিত্র দত্তের মহিলা সহযোগী যে ভয়ংকর সন্দেহের কথা বলেছিলেন সেদিন শংকর শর্মারূপী হককে, জয়দের বক্তব্যও তাঁর সেই কথাকে সমর্থন করছিল।

বাহিনীর পাঁচজন ঢুকে পড়ল রিসর্টে, বাকি চারজন ধাওয়া করল টার্গেটকে। রিসর্টের ভিতরে অপারেশান চালিয়ে একজনকে হত্যা করতে বাধ্য হল এনএটিসি’র কমান্ডোরা, কিন্তু দ্বিতীয় জঙ্গিকে তারা জ্যান্তই কাবু করে ফেলল। হক ও তার সহকর্মীরা তখন ধাওয়া করেছে মূল টার্গেটকে। দূরত্ব বেশি নয়, কিন্তু অস্ত্রচালনায় দক্ষ জঙ্গি মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে পিস্তল থেকে গুলি চালাচ্ছে। একটি গুলি এসে জখম করল হকের এক সহকর্মীকে। পা মুড়ে রাস্তায় বসে পড়ল সে; গুলিটা লেগেছে তার ডান হাঁটুর নিচে। বাকিরা কারবাইন নামিয়ে রেখে হোলস্টার থেকে নাইনএমএম পিস্তল বের করে নিল। ছুটতে ছুটতে কারবাইনের লক্ষ্য স্থির রাখা কঠিন।

ইখলাস রুবেলের শরীরের বিশেষ জায়গায় নিশানা স্থির করে নিয়ে পিস্তলের ট্রিগার টিপলো হক। গুলি গিয়ে লাগল তার ডান কনুইতে।

মোক্ষম জায়গা! এরপরে ওই হাত দিয়ে পিস্তল চালানো কঠিন হয়ে যাবে তার পক্ষে।

কিন্তু সে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। জখম অবস্থাতেই প্রান্তিক স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে সে লাফিয়ে পড়ল রেললাইনে, তাকে ধাওয়া করছিল হক। তার পিস্তলের আরেকটা গুলি গিয়ে লাগল তার পায়ে। হুমড়ি খেয়ে রেললাইনের খোয়ার উপরে পড়ে গেল সে। সুযোগ বুঝে এনএটিসি’র দুই কমান্ডো তাকে টপকে গিয়ে সামনের রাস্তা আটকে দিল।

গুলি চালিয়ে এখনই নিকেশ করে দেওয়া যায় লোকটাকে, কিন্তু এরা হল প্রাইজ ক্যাচ। জীবিত অবস্থায় ধরতে পারলে কৃতিত্ব বেশি।

যন্ত্রণাকে পরাস্ত করে আহত বাঘের মতো উঠে দাঁড়াল সে।

“ইখলাস রুবেল! কতগুলো ছোট ছোট ছেলের বিশ্বাস জিততে পারলেও রণ জয় করা তোমার আর হল না। অনেক খেলেছ; ফাইনাল হুইসলটা শুনতে পাচ্ছ নিশ্চয়ই,” পিস্তল টার্গেটের দিকে তাক করে চেঁচিয়ে বলল হক। সে হাঁফাচ্ছে, তার কথার সঙ্গে দ্রুত শ্বাস টানার সাঁই সাঁই শব্দ বেরিয়ে আসছে। ভোরের প্রান্তিক স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা হাতে গোনা মানুষের চোখের সামনে সেই মুহূর্তে এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি হচ্ছে।

অসহ্য যন্ত্রণা সত্ত্বেও টান হয়ে দাঁড়াল ইখলাস রুবেল। ঘুরে তাকাল তার প্রতিপক্ষের দিকে। যন্ত্রণায় তার মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল; তবু সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। সে হাঁফাচ্ছে না। তার চাহনিতে এক অদ্ভুত ছাই চাপা আগুন যেন ধিকি ধিকি জ্বলছে।

এক অবর্ণনীয় তাচ্ছিল্যভরা হাসি ফুটল তার মুখে। দাঁতে দাঁত চেপে বরফঠান্ডা স্বরে সে বলল, “তুই কি ফাইনাল হুইসল বাজাবি? এ খেলার ফাইনাল হুইসল নেই। প্লেয়ার যাবে আসবে, টিম হারবে জিতবে, খেলাটা থামবে না।” সে যে কতখানি হিংস্র ও ঠান্ডা মাথার শয়তান, যাকে ইংরিজিতে বলে সেরিব্রাল অ্যাসাসিন, তা হক টের পাচ্ছে এই মুহূর্তে। সে এগোতে যাচ্ছিল, কিন্তু থমকে দাঁড়াতে হল তাকে। ইখলাস রুবেল তার পেটের কাছে বুড়ো আঙুল দিয়ে একটা আলতো চাপ দিয়েছে।

টি টি টি টি টি টি টি টি টি টি টি টি টি টি…

একটা যান্ত্রিক শব্দ ভেসে আসছে। ক্রমশ জোরালো হচ্ছে সেটা। হক বুঝল কী হতে চলেছে।

“এভরিবডি ফল ব্যাক!”— সে চেঁচিয়ে উঠল। এই ধরনের যুদ্ধে কখনো কখনো পিছুও হঠতে হয়। সে পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করল। দলের বাকিরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিকওদিক সরে যেতে লাগল নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করার জন্য। সকলেই বুঝেছে তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে পরিস্থিতি।

চোখ বুজল ইখলাস রুবেল। ধরা সে দেবে না। জেহাদের পথে যে কোনো কাঁটাকে উপড়ে ফেলাই নিয়ম। সে কে, কী তার পরিচয়, কত বড় তার ভূমিকা, তাতে কিছু যায় আসে না। দলের চেয়ে বড় হতে পারে না কোনো নেতা। সে যদি দলের বোঝা হয়ে ওঠে, তার জন্য রিবাত-এর অভিধানে একটিই শব্দ বরাদ্দ করা আছে।

সে জানে যান্ত্রিক যে শব্দটা তার প্রতিপক্ষকে আপাতত কিছুটা দূরে সরিয়ে দিয়েছে, সেটার আয়ু আর দশ সেকেন্ড। তারপর…

বড় করে শ্বাস নিল ইখলাস রুবেল। মুখে বলল— “ডিডাক্ট!”

যান্ত্রিক শব্দ থামল। তার পরেই একটা তীব্র আলোর ঝলকানি এবং কান ফাটানো একটা শব্দ। রেললাইনের উপরে শুয়ে পড়ল হক। শুয়ে পড়ল তার সঙ্গীরাও।

প্রাইজ ক্যাচটা অধরাই থেকে গেল।

অন্তিম যুদ্ধে হেরেও যেন জিতে গেল ইখলাস রুবেল। হক যখন পিছন ফিরল ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর কটু গন্ধ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

দু’ দিন পরের কথা

মালদার গাজোলে সেই অনুষ্ঠান বাড়িরই হলঘরে সাংবাদিক সম্মেলন করছিল এনএটিসি। মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং শিলিগুড়িতে রিবাতের মডিউল তৈরি করার দায়িত্ব নিয়ে এ দেশে এসেছিল ইখলাস রুবেল। ধীরে ধীরে মগজ ধোলাই করে কিছু যুবকের মধ্যে জেহাদের বীজ বপন করছিল সে। গাজোলে যে বাড়িতে সে ফুটবল কোচ সেজে বসবাস করছিল সেখান থেকে পাওয়া গেছে কিছু ডিভিডি, যেগুলো এলাকার কিছু ছেলেকে নিয়ম করে প্রতি সন্ধ্যায় দেখাতো সে। সেই ডিভিডির প্রথম পনেরো মিনিট ও শেষ পনেরো মিনিটে রয়েছে ফুটবলের ভিডিও, মাঝে রয়েছে জেহাদী বক্তৃতা। বক্তা জাহির আহমেদ, এই মুহূর্তে যিনি তুরস্কতে বসে আছেন। এই ভিডিও দেখিয়ে যে ওদের জেহাদ সম্বন্ধে অনেক কিছু বোঝাতেন কোচ রণজয় সেটা ইতিমধ্যেই ভারত সেবকের কর্মীদের হাতে প্রহৃত রিয়াজুল এনএটিসিকে জানিয়েছে। সে এ কথাও জানিয়েছে ভাইজ্যাগের একটি জায়গায় ফুটবল ট্রেনিং ক্যাম্পের নামে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়ার জন্যও একটু একটু করে তাদের মানসিকভাবে তৈরি করছিল ইখলাস রুবেল ওরফে ফুটবল কোচ রণজয় বিশ্বাস।

রিবাতের কাজ সুষ্ঠুভাবে করে চলেছিল রুবেল। কিন্তু গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে যাওয়ায় মেদিনীপুরের মডিউলটা তাদের ধ্বংস করে দিতে হয়েছিল, হারাতে হয়েছিল দুই দক্ষ সহযোদ্ধাকে। এটা তাদের মধ্যে একটা প্রতিহিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। প্রান্তিকের রিসর্ট থেকে ধৃত শাহাজাদকে জেরা করে জানা গেছে রিবাতের মূল পরিকল্পনা ছিল বিধাননগরে এনএটিসি’র নতুন ভবন উদ্বোধনের দিন ভোরবেলায় সেই ভবনেরই সামনে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্টমন্ত্রক ও এনএটিসিকে বার্তা দেওয়া যে তোমাদের নাকের ডগাতেই আমাদের দম দেখিয়ে গেলাম। কলকাতা শহর সন্ত্রাসবাদীদের নিরাপদ অলিন্দ, তাই সেখানে তারা নাশকতার ঘটনা ঘটাবে না, এনএটিসি’র এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দেওয়াও রিবাতের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। একইসঙ্গে আলিপুর ট্রেজারি বিল্ডিং, শিয়ালদহ সাউথ স্টেশন, বিধানসভার বাইরে এবং মাঝগঙ্গায় লঞ্চে বিস্ফোরণ ঘটানোর ছক কষেছিল রিবাত। প্রায় দেড় মাস ধরে এইসব জায়গায় রেইকি চালিয়েছে তারা। রণজয় বিশ্বাস ওরফে ইখলাস রুবেলের গাজোলের বাড়িতে তার সহযোগীর মোবাইলে পাওয়া গেছে সেইসব রেইকির ভিডিও, পাওয়া গেছে প্রচুর কাগজ, যেখানে চুলচেরা হিসেব কষা হয়েছে প্রতিটা বিস্ফোরণের সময়ের, কোথায় কখন কেমন পুলিশি নিরাপত্তা থাকে এবং কাজ সেরে কোন পথে পালিয়ে যাওয়া যায়, সেসবের। প্রান্তিকের রিসর্টের ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সেই শক্তিশালী বিস্ফোরক।

এনএটিসি’র অফিসের সামনে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গ্রেফতারি এড়িয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল কভারিং ফায়ার দেওয়ার কাজে দক্ষ সৈনিকের, তাই সুচতুর কায়দায় দলের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচজন সদস্যকে মালদায় আনিয়ে নিয়েছিল ইখলাস রুবেল। কাজে লাগিয়েছিল এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি শ্যামলেন্দু নস্করকে। বাংলাদেশের ফুটবল টিমে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল পাঁচ জঙ্গিকে। তারা খেলোয়াড়, তাই সহজে সন্দেহের দৃষ্টিতে কেউ দেখবে না এটাই স্বাভাবিক। তাদের সঙ্গে ছিল বৈধ পরিচয়পত্রও, সুতরাং চ্যালেঞ্জ করার কোনো উপায় ছিল না। ফাইনাল ম্যাচ চলাকালীন পল্টুর সঙ্গে বসির ওরফে শাহজাদের ধাক্কাধাক্কিটা না হলে রিবাতের জঙ্গিরা মসৃণভাবেই মালদার অলিন্দকে ব্যবহার করে প্রান্তিক পৌঁছে যেত। জঙ্গিদের পরিকল্পনা ছিল রাতের অন্ধকারে প্রািন্তক থেকে কলকাতার গোপন ডেরায় পৌঁছনো। সেখান থেকেই পরদিন ভোরে নাশকতার উদ্দেশ্যে রওনা হত তারা।

রুবেলেরই নীল নকশা অনুযায়ী ফুটবল টুর্নামেন্ট এগিয়ে আনা হয়। তারই নির্দেশমতো ট্রফির ডিজাইন বদল করা হয়। ট্রফির মধ্যে বিস্ফোরক ভরে আনা হয় শিলিগুড়ির পানিট্যাঙ্কি রোড দিয়ে, কালিয়াচকে প্লেয়ারদের উপহারের কিট ব্যাগে আর্মস ভরে নিয়ে আসা হয় গাজোলে।

শ্যামলেন্দু নস্কর সবই স্বীকার করেছেন। তাঁর বিভিন্ন বেআইনি ব্যবসার কথা ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়েই সবকিছু করিয়ে নিয়েছে জাহির আহমেদ। শ্যামলেন্দু প্রথমে বুঝতেও পারেননি যাকে তিনি রণজয় বিশ্বাস বলে চিনতেন, সে ভাই বলে পরিচয় দিয়ে তার এক সহযোগীকে প্রান্তিক অঞ্চলে পাঠিয়েছে যুবকদের মধ্যে জেহাদের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং কালিয়াচকে অস্ত্রের কারববার দেখাশোনা করার উদ্দেশ্যে এবং সেটাও শ্যামলেন্দুরই ব্যবসার তদারকির লোক হিসেবে নিযুক্ত করিয়ে। এনএটিসি নিশ্চিত এই চক্রান্তের বিষয়ে স্থানীয় বিধায়ক অমল বরাটও জানতেন এবং যে কোনো সময়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের দফতর থেকে তলব পাবেন তিনি। বরাটকে আরো বিপাকে ফেলবে দুটি তথ্য— প্রথমত, ফুটবল কোচ রণজয় বিশ্বাসকে এখানে থাকার জন্য এক আত্মীয়, যিনি বহুদিন ধরে অন্য রাজ্যের বািসন্দা, তাঁর বাড়িটি দিয়েছিলেন অমল বরাট। দ্বিতীয়ত, প্রতীক সেন তাঁর ফোর্স নিয়ে যে রাত্রে অস্ত্র পাচার রুখেছিলেন, সে রাত্রে অমল বরাটের জবরদখল করা জমির উপরে সেই ঝুপড়িতেই ছিল সেই জঙ্গি, যাকে ইখলাস রুবেলের বাড়িতে নিকেশ করে এনএটিসির কমান্ডোরা। ইতিমধ্যেই তদন্তে উঠে এসেছে যে এই ব্যক্তিই শ্যামলেন্দু নস্করের ব্যবসার তদারকি করতো প্রান্তিক অঞ্চলে এবং তার আড়ালে চালাতো মগজ ধোলাইয়ের কাজ। ইখলাস রুবেলের ঘরেরই একটি চোরাকুঠুরিতে অন্যান্য কিছু জিনিসের সঙ্গে পাওয়া গেছে দুই বান্ডিল সবুজ হ্যান্ডবিল, যার একটি হক জোগাড় করেছিল বামনগোলার সেই দর্জির কাছ থেকে। খিদিরপুরে ‘সময়ের চাকা’র প্রেসে তল্লাশি চালিয়ে এসটিএফ ইতিমধ্যেই একই হ্যান্ডবিল উদ্ধার করেছে।

অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানা ও সঞ্জয়শেখর রুবেলের মিশনের নিশানা ছিলেন না প্রথমে, কিন্তু দলের প্রধানের নির্দেশে সেই অপারেশানের দায়িত্বও সে কাঁধে তুলে নেয়। কলকাতায় রবিউল আলমের খোসা ছাড়ানো চলছে। তাঁকে এবং লিটন মণ্ডলকে চাপ দিয়ে বের করে নেওয়া গেছে সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে আসা সেই তিনজনের বাকি দুজনের সম্ভাব্য গা ঢাকা দেওয়ার আস্তানার সন্ধানও। এসটিএফের জালে তাদের জড়িয়ে পড়া এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

সাংবাদিক সম্মেলনের শেষে তার দলের আহত সদস্য, যে এই মুহূর্তে মালদা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাকে একবার দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল হক। প্রতীক সেন তার সঙ্গী হয়েছিলেন। বিয়েবাড়ির বাইরে স্থানীয় মানুষের ভিড় উপচে পড়ছিল। পল্টু, জয়, রাজা, অশ্বিনদের দেখতে পেল হক। ওদের চোখের ভাষায় বিস্ময় পড়ে নিতে পারল হক। যাকে তারা ভগবানের মতো শ্রদ্ধা করতো, সেই মানুষটার একটা পৈশাচিক পরিচয় ছিল, সেটা যেন ওরা এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। বিয়েবাড়িটা তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুলির ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একই রকম ক্ষতের ছাপ যেন ফুটে উঠছে ওদের অভিব্যক্তিতেও। টুর্নামেন্টের সময় যে ছেলেটাকে প্লেয়ারদের অটোগ্রাফ সংগ্রহ করতে দেখেছিল হক, তার সঙ্গে দেখা হল গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে। ছেলেটি এগিয়ে এল। তার বাড়িয়ে দেওয়া খাতায় অটোগ্রাফ দিয়ে ফেলেও থমকে দাঁড়াল হক। একটা হিন্দি ছবির ডায়ালগ তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল— ‘‘উসনে আপনা নাম মুঝে বতায়া থা লেকিন ম্যায় কিসিকো নেহি বাতা সকতা। ইনসান নাম মে মজহব ঢুন্ড লেতা হ্যায়!”

বড় সত্যি কথা! একজন সৈনিকের কোনো জাত, ধর্ম হয় না। তার একমাত্র ধর্ম সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আজও শুধু নাম ও পদবির মধ্যেই মানুষ একে অপরের অভিসন্ধি খুঁজতে চায়।

নামটা লিখে ফেলেও কেটে দিল সে। বাকিটুকু হিজিবিজির আড়ালে চলে গেল, নতুন করে লেখা হল—  HAWK!

গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল হক। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় গাজোলকে কেমন যেন মুহ্যমান দেখাচ্ছিল। একটা ভয়ংকর ঘটনা এখানকার মানুষগুলোর বিশ্বাসের ভিতটাই যেন নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। সমাজের বুকে এভাবেই চকিতে নেমে আসে চোরা আক্রমণ, আঘাত হানে মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস, ভরসা, ভালোবাসায়। গাজোলে সন্ধ্যা নামবে একটু পরেই। প্রকৃতির নিয়ম মেনে কাল আবার ভোর হবে। নিশ্চয়ই সকলেই আবার ধীরে ধীরে ফিরে পাবে স্বাভাবিকতা।

প্রতীক সেনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে হক বলল, ‘‘আপনার সিভিটা আমাকে মেল করে দেবেন। দরকার আছে।’’

 গাড়ি যখন বড় রাস্তায়, প্রতীক চাপা গলায় বললেন, “একটা ইন্টারেস্টিং ইনফরমেশন আপনাকে দেওয়া হয়নি!”

হক কৌতূহলী হল।

“ইসমাইল আর জামশেদকে গতকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকজন বলছে ওদের কাল একেবারে ভোরে হিলির দিকে যেতে দেখেছে।”

এনএটিসি’র সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এজেন্ট ফের মুখ ফেরাল জানালায়। শূন্যতা ছিল সেই দৃষ্টিতে। দু’ দিন আগে শোনা একটা কথা তার কানে বাজছে—  ‘‘প্লেয়ার আসবে যাবে, টিম হারবে জিতবে, খেলাটা থামবে না!!!”

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *