ইনজুরি টাইম – ৩০

৩০

সারা দিনের ক্লান্তির শেষে একটু যেন স্বস্তি পাচ্ছিল লুলো। কোথাও নিশ্চয়ই বৃষ্টি হয়েছে, তাই বাতাসে একটা ঠান্ডা ভাব। আরাম বোধ হচ্ছে তার। সন্ধেটা লুলোর মোটা রোজগারের সময় তাই জায়গা ছেড়ে ওঠার প্রশ্ন নেই, নাহলে সে লেংড়ে লেংড়েই কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে বড় মাঠটায় বসতো। অনেকটা খোলা জায়গা, সন্ধের দিকে অনেকেই ওই মাঠে বসে হাওয়া খাওয়ার জন্য।

দিনের ঠিক এই সময়টায় লাইন দিয়ে মালবোঝাই ট্রাক এই ঘোজাডাঙা সীমান্ত পারাপার করে। একটা নির্দিষ্ট ছন্দে লাইন দিয়ে একটার পর একটা বিরাট চেহারার ট্রাক এগিয়ে যেতে থাকে সীমান্তের দিকে। তাদের ইঞ্জিন আর চাকার একটানা শব্দ শুনলে মনে হয় যেন কোনো মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে তারা চলেছে। সেরকমই এক একটা ট্রাকের চালকের আসনের জানালা থেকে লুলোর বাটির আশেপাশে নেমে আসে ভেট।

আজও রোজগার ভালোই হচ্ছিল। এক মনে নোট গুনতে গুনতে লুলো খেয়ালও করছিল না তার জিভটা সামান্য বেরিয়ে রয়েছে। কিন্তু তার কাজে বাধা পড়ল হঠাৎ একটা ঘটনা চোখে পড়ায়। লুলো সবে ভেবেছিল আজ সামনের ফুচকাওয়ালাটার কাছে যাবে আর তাই ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকিয়েছিল। কিন্তু যা দেখল, তাতে তার হাত গেল আটকে।

একটা গাড়ি এসে থেমেছে ফুচকাওয়ালাটার সামনে। দুজন লোক নেমে এসেছে। কী যেন কথা বলছে তার সঙ্গে। ফুচকাওয়ালাটার শুধু ঘাড় নাড়া দেখতে পাচ্ছে লুলো, সে কী বলছে তা অনুমান করতে পারছে না। কয়েক মুহূর্ত পরে ফুচকাওয়ালাটা ঘাড় ঘুরিয়ে লোক দুটোকে লুলোর দিকে দেখাল। ওরা এখন তাকেই দেখছে। লুলোর বুক দুরদুর করতে শুরু করেছে। ওই ফুচকাওয়ালাটাকে প্রথম দিন থেকেই ওর সুবিধের মনে হয় না। কে জানে কী চুকলি করে দিল!

লোক দুটো এগিয়ে আসছে লুলোর দিকে। কেন? কী চায় ওরা? লুলো তাড়াতাড়ি তার হাতের টাকাগুলো তার বসার ছালার তলায় চালান করে দিল। না শুধু লোক দুটো নয়, ফুচকাওয়ালাটাও আসছে ওদের সঙ্গে। লুলোর মাথা কাজ করছে না, জিভটা এখনও আটকে আছে ঠোঁটের বাইরে। খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে ওরা। সন্ধের আলোয় লোকগুলোর মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না লুলো কিন্তু বুঝতে পারছে দুজনের মধ্যে একজনের চেহারাটা চাবুকের মতো। সেই লোকটাই সটান এসে বসে পড়ল লুলোর সামনে।

“উঠে আয়,” এমনভাবে দাঁতে দাঁত চেপে বলল লোকটা যে লুলোর কথাটা বুঝতে একটু সময় লাগল।

“উঠে আসতে বলছি না! কানে কথা যাচ্ছে না?” একইভাবে ধমকে উঠল লোকটা। লুলোর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। কী তার অন্যায়? এরা কারা? কেন ডাকছে ওকে? কয়েক পা দূরে চেকপোস্টের বাইরে যে জওয়ানটা দাঁড়িয়ে আছে তাকে একবার ডাকবার কথা মনে হল তার, কিন্তু সাহস হল না।

এবার ফুচকাওয়ালাটাও চাপা গলায় বলল, “নখরা করিস না, উঠে আয়।”

লুলো চমকে উঠল। এই লোকটা এরকম বাংলা বলতে পারে! এতদিন তো ওর ভাষা কিছু বুঝতেই পারত না সে। লুলো একবার চেকপোস্টের দিকে অসহায়ভাবে ঘাড় ঘোরাল। জওয়ানটা বোধহয় ওর সামনে হঠাৎ একটা জটলা দেখে কিছু সন্দেহ করেছে। সে এগিয়ে আসছে এদিকে।

চাবুকের মতো চেহারার লোকটা উঠে দাঁড়াল। সে চেয়ে আছে জওয়ানটার দিকে। জামার পকেটে হাত ঢুকিয়েছে লোকটা। জওয়ানটা আর দু’ পা এগিয়ে আসতেই লোকটা পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কালো জিনিস বের করে দেখাল তাকে। জওয়ান ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল।

“চল চল, ওঠ,” লোকটা বলল লুলোকে।

না গিয়ে আর উপায় নেই, বুঝতে পারছে লুলো। ঠিক এরকমভাবেই কিছুদিন আগে এর আগের ফুচকাওয়ালাটাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকটা লোক। সে আর ফিরে আসেনি। তবে কি তারও দিন ফুরোল? ভগবানের যত মার সব তার মতো গরিবদের কপালেই জুটবে? আর এই যে এত এত জিনিস রোজ বেড়ার এপারওপার করছে, সে বেলা? অনেকদিন হয়ে গেছে লুলোর এই জায়গায়। সে শুনতে পায় অনেক গোলমেলে জিনিস এপার ওপার করে। যারা করে তাদের কয়েকজনের চেহারাও চেনে লুলো। বেড়া ডিঙিয়ে মাঝে মাঝে এদিকে চলে আসে অনেক গোলমেলে লোকও। সেরকমই কয়েকজন কয়েকদিন আগে ঢুকেছে। কই, তাদের তো কিছু হয় না? যত দোষ তার মতো গরিবের?

মনে মনে কথাগুলো বলছিল লুলো আর ছালার তলা থেকে তার এতদিনের সঞ্চয় বের করে নিচ্ছিল।

“থাক ওগুলো। তুই উঠে আয়,” লোকটা ধমকে উঠল।

লুলোরও মনে প্রতিবাদ জন্ম নিল, সে মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিল, “য়া, থাববে য়া। এয়ুলো আমাত তাকা।”

জওয়ানটা এগিয়ে এল এবার তার সামনে, বলল, “রেখে যা, তোর টাকা কেউ নেবে না।”

বিশ্বাস হচ্ছিল না লুলোর কিন্তু সে কী করবে তাও বুঝতে পারছিল না। এবার সেই দুজনের দ্বিতীয় জন দ্রুত লুলোকে প্রায় চ্যাংদোলা করে তুলে নিল। হাঁটতে শুরু করল গাড়ির দিকে। খুব ভয় করছে লুলোর। রাগ হচ্ছে, দুঃখ হচ্ছে।

“ছেয়ে দাও, আমাকে ছেয়ে দাও,” লুলো ছটফট করে চেঁচাতে লাগল। ফল কিছুই হল না। কয়েক মুহূর্ত পরেই তার জায়গা হল গাড়ির পিছনের সিটে। যে লোকটা তাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে এসেছে, সে পাশে বসে চোখ রাঙিয়ে বলল, “বেশি মাস্তানি করবি তো রানিং গাড়ির দরজা খুলে ট্রাকের সামনে ফেলে দেবো!”

লোকটার পাশেই বসেছে ফুচকাওয়ালাটা। তাকে দেখে যদিও লুলোর একেবারেই মনে হচ্ছে না যে সে ভয় পেয়েছে। চাবুকের মতো চেহারার লোকটা সামনে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল। লুলো বুঝতে পারছিল চেকপোস্টের ব্যস্ততা, শব্দ থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে গাড়িটা। সামনে ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাড়িতে আগে চড়েনি সে, তাই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল শরীরে। বেশ দ্রুত গতিতে চলছে গাড়িটা। ভিতরে কোনো শব্দ নেই, শুধু সামনের সিটে বসা লোকটার মুখ সামান্য দেখতে পাচ্ছে লুলো। লোকটা মোবাইলে কিছু করছে আর তারই আলোয় তার মুখটা দেখা যাচ্ছে। সে মুখের কিছুটা অংশ স্পষ্ট, কিছুটা অন্ধকারের আড়ালে। সন্ধেবেলা নিমাইদার দোকানে অনেককেই এরকম মোবাইলের আলো জ্বেলে খুটখুট করতে দেখে লুলো। কিন্তু তাকে এরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কেন নিয়ে যাচ্ছে? তার টাকাগুলো যখন নেয়নি, তখন চোর, ছিনতাইবাজ নয় এরা। তাহলে এরা কারা?

একটানা অনেকক্ষণ গাড়িটা চলার পরে লুলো জানালা দিয়ে সামনে তাকিয়ে আলো দেখতে পেল। শহরের আশপাশ দিয়ে যাচ্ছে গাড়িটা। একটা বিরাট ব্রিজ পেরিয়ে ডান দিকে ঘুরে বড় রাস্তা ধরল ওদের গাড়িটা। সামনে অনেক গাড়ি, রিক্সা, সাইকেল ভ্যান, বাস দেখা যাচ্ছে। রীতিমতো জ্যাম হয়ে রয়েছে রাস্তায়। সেসব পেরোতে কিছুটা সময় চলে গেল। তারপর ফের গতি ফিরে পেল গাড়িটা।

এক সময় গাড়ির ভিতরে একটা ঠান্ডা ভাব ক্রমশ বাড়তে থাকায় লুলোর ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। সে চমকে উঠল গায়ে একটা জোর ধাক্কা খেয়ে।

“ওঠো নবাবপুত্তুর! আর কত ঘুমোবে?” লুলো চোখ মেলে দেখল পাশের লোকটা ওর উপরে ঝুঁকে আছে।

লুলোকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে সে একটা বাড়ির ভিতরে ঢুকল। সিঁড়ি দিয়ে ওকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল একটা ঘরে। ঘরে একটা টেবিল পাতা আর তাকে ঘিরে রেখেছে চারটে চেয়ার। তার একটাতে চাবুকের মতো চেহারার লোকটা বসে আছে। তার ঠিক উলটোদিকের চেয়ারে বসানো হল লুলোকে।

লোকটা ওর দিকে সামান্য ঝুঁকে বলল, “শোন, যা যা জিজ্ঞেস করবো, ভেবে ভেবে মনে করে করে বলবি, ঠিক আছে?”

লুলো ঘাড় কাত করল। সে দেখল আরেকটা লোক এসে বসল ওর উলটোদিকে। তার হাতে এক বান্ডিল সাদা কাগজ আর একটা পেনসিল। লোকটার জামার চেকটা চিনতে পারল সে। এই লোকটা গাড়ি চালাচ্ছিল।

“কয়েকদিন আগে তিনটে লোক বর্ডার পেরিয়ে এসেছিল। নিমাইয়ের দোকানে কচুরি খেয়েছিল। মনে আছে?” লুলোর দিকে প্রশ্ন ধেয়ে এল।

সে চমকে উঠল। এই খবর এরা জানলো কী করে? লুলো হাবার মতো চেয়ে রইল।

ফুচকাওয়ালাটা এবার ওর পাশে এসে বসে বলল, “মনে পড়ছে? দোকানে বসে গিলছিলি তো সেদিন।”

লুলো এবার তার দিকে চাইল। রাগ তার বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

“হে তো তুমিও ছিয়ে দোকানে! ছিয়ে য়া? আমাকে কেয়ো টায়াটায়ি কো— কোচ্চো,” সে বলল।

“যা ওঁরা জানতে চান ঠিকঠাক জবাব দে। নাহলে আর কোনোদিন ওখানে ফিরতে পারবি না,” ফুচকাওয়ালাটা চোখ রাঙাল।

এরপর শুরু হল এক অধ্যায়। জন্ম বিকলাঙ্গ লুলোর প্রতিবন্ধী বাংলা উচ্চারণে দেওয়া নানান প্রশ্নের উত্তর শুনে কাগজে পেনসিল দিয়ে একে একে ফুটিয়ে তোলা হল তিনটে মানুষের স্কেচ। একটু করে আঁকা হয় আর লুলোকে দেখিয়ে জানতে চাওয়া হয়, নাকটা এরকম? চুলটা এরকম?

কতক্ষণ চলল সে কাজ লুলো জানে না। তার খুব খিদে পেয়েছিল শেষের দিকে তাই আর সেটা না বলে পারেনি। কপালে তিন পিস মাখন লাগানো পাউরুটি আর ডিমের অমলেট জুটেছিল তার।

তার দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী যে ছবি তিনটে তৈরি হয়েছিল, ফুচকাওয়ালাটা সেগুলো দেখে ঘাড় নেড়ে বুঝিয়েছিল ঠিকঠাকই হয়েছে। সে লুলোর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিল, “ল্যাংড়া খোঁড়া হলে কী হবে, নজর আছে ছেলের।”

খাওয়া যখন একেবারে শেষের পথে, একটা ঘটনা দেখে চমকে উঠল লুলো। ফুচকাওয়ালাটার হাতটা ধরে খুব জোরে ঝাঁকিয়ে দিল চাবুকের মতো চেহারার লোকটা। মুখে কী যেন একটা বলল। লুলোর কানে গেল, “গুজ্জব।”

একটা ছোটলোক ফুচকাওয়ালার এত খাতির? তাহলে কি এই লোকটা আসলে ফুচকাওয়ালা নয়? কে তাহলে ও? এরাই বা কে? কোথায় ধরে নিয়ে এসেছে ওকে? কারা বর্ডার পেরিয়ে এসেছে তা জেনে, তাদের ছবি দিয়ে এদের কী হবে?

খুব অবাক হলে বা ঘাবড়ে গেলে লুলোর মুখ হাঁ হয়ে যায় আর টপ টপ করে লালা পড়ে। একসঙ্গে এতগুলো অচেনা লোকের কাণ্ড দেখে আজও সেই অবস্থা হচ্ছিল তার।

ফুচকাওয়ালাটা লুলোর দিকে ফিরে বলল, “ওঠো চাঁদু। ঘরের ছেলে এবার ঘরে ফিরতে হবে তো!”

৩১

রাত সোয়া এগারোটা নাগাদ এসআই প্রতীক সেনের মোবাইলে দুই শব্দের একটি টেক্সট মেসেজ এল— ‘বিড়াল বেরিয়েছে।’

প্রতীক জবাবে ‘কিপ ফলোয়িং অ্যান্ড আপডেটিং এভরি ফাইভ মিনিটস’ লিখে থানায় তাঁর চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। সহকর্মীরা তৈরিই ছিল মিশনের জন্য, প্রতীককে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখে স্যালুট দিল। আজকের কাজে প্রতি পদে সতর্কতা বজায় রাখতে হবে। প্রতীক জানেন যাদের হাতেনাতে ধরতে তিনি সদলবলে যাচ্ছেন, তারাও কম সেয়ানা নয়। কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে তা তাদেরও জানা আছে এবং বিপদের জাল কেটে বেরোনোর কসরতও তারা রপ্ত করে রেখেছে।

প্রতীকের দলের সতর্কতার প্রথম ধাপ হল পুলিশের উর্দি ছেড়ে বিশেষ ছদ্মবেশের আড়ালে চলে যাওয়া। রাস্তার মোড়ে ভিখিরি বা পাগল সাজিয়ে নজরদার রেখে দেওয়ার কৌশল এখন আর কাজ করে না, তাই ভাবতে হয় অন্য উপায়। প্রতীকের নির্দেশে তাঁর তিন সঙ্গীর একজন থাকবে রাঙাভিটার কাছে। বেহেড মাতালকে কেউ সন্দেহ করে না, বিশেষত মধ্যরাতে। বাকি দুজনের একজন থাকবে বিদ্রোহীর মোড়ে। একজন টোটোওয়ালাকে পয়সা দিয়ে আজ রাতের মতো তার থেকে টোটোটা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। ক্লান্ত টোটোচালকের বেশে গাড়ির মধ্যে ঘুমে কাদা হয়ে পড়ে থাকবে সে। দ্বিতীয়জন থাকবে যেখানে জিনিস এসে পৌঁছানোর কথা, তারই আশেপাশে। তার ছদ্মবেশের কোনো প্রয়োজন হবে না কারণ সে থাকবে একটা গাছের উপরে। সমস্ত কিছু আগে থেকে দেখে নিয়ে প্ল্যান সাজিয়েছেন এসআই প্রতীক সেন। বেছে রেখেছেন নিজের ভূমিকাও। আসল উদ্দেশ্য হল যে বা যারা জিনিস নিয়ে আসছে তাকে বা তাদের আসল জায়গা অবধি পৌঁছাতে দিয়ে তারপর ঝাঁপিয়ে পড়া। নাহলে পরে কোর্টে কেস সাজাতে অসুবিধে হবে।

রাত ১১:৩৩— প্রতীকের মোবাইলে মেসেজ এল, ‘কালিয়াচক এক বিড়াল, বালিয়াডাঙা দুই’।

মেসেজের অর্থ বুঝতে অসুবিধে হল না প্রতীকের। টার্গেট কালিয়াচক থেকে একা রওনা দিয়েছিল, বালিয়াডাঙ্গার মোড় থেকে আরেকজন তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে।

প্রতীক ও তাঁর সঙ্গীরা ছড়িয়ে পড়লেন পরিকল্পনা মতো। উর্দির পরিবর্তে তাঁদের পরনে আজ বিভিন্ন রকম পোশাক। মিন্টুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মাল আসার কথা একটা সাইকেল ভ্যানে। সে তথ্য ইতিমধ্যেই সত্য প্রমাণিত, কারণ টার্গেটকে অনুসরণ করার কথা এক সাইকেল আরোহীর। সাইকেল ভ্যানের বদলে অন্য কোনো মাধ্যম হলে সে অবশ্যই জানাতো। একটা সাইকেল ভ্যানের এই মধ্যরাতে কালিয়াচকের দিক থেকে ঘিরে গাজোলে আসতে যা সময় লাগবে তার মধ্যে সকলেই সহজে নিজেদের পজিশনে পৌঁছে যেতে পারবেন।

এক একটা মিনিট কাটছে আর প্রতীকের উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। তিনি যখন বিদ্রোহীর মোড় পেরিয়ে বিধানপল্লীর দিকে যাচ্ছেন, রাতের নিস্তব্ধতা চিরে পরপর কয়েকটা লরি হিলির দিকে চলে গেল। বিধানপল্লীর যে অঞ্চলটা একটু অন্ধকার, সেখানে একটা ছোটখাটো খাবারের দোকান আছে। এই একটিই দোকান সারারাত খোলা থাকে, কারণ খাবারের আড়ালে এখানে পাওয়া যায় দেশি মদ। সংখ্যায় কম হলেও অনেক রাত অবধি খদ্দেররা দোকানের বাইরে পাতা বেঞ্চে বসে ঢোলে। আজ যারা খদ্দের হয়ে বসে আছে তাদের অবশ্য পরিচয় আলাদা। বিভিন্ন সময়ে অপরাধ করে হাজত বাস করেছে এবং প্রতীকের উদ্যোগে তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়েছে এমন তিনজন ইতিমধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেছে খদ্দের সেজে।

গোড়ালির উপর লুঙ্গি, ছেঁড়া সুতির ফতুয়া আর কাঁচাপাকা চুলের নতুন পার্টিকে একটা বেঞ্চের ধারে এসে বসতে দেখে সেই খদ্দেররা প্রথমে একটু চমকে উঠলেও পরক্ষণেই তাকে চিনতে পারল। কিন্তু কোনো অচেনা মানুষের পক্ষে সেই সনাক্তকরণ অসম্ভব। নতুন খদ্দের তার অর্ডার বলে দিয়ে বেঞ্চে বসে প্লাস্টিকের জগ ধরে বাজাতে লাগল। প্রায় আধ ঘণ্টা বাদে তার ফতুয়ার বুকপকেটে মোবাইল কেঁপে উঠল। বার্তা এসেছে, ‘কানির মোড়—দুই পাখি কমে এক; ড্রাইভার বদল!’

স্বাভাবিক! এত লম্বা রাস্তা একজনের পক্ষে সাইকেল ভ্যান চালিয়ে আসা কঠিন, বিশেষত ভ্যানের উপরে যখন রীতিমতো ভারি জিনিসপত্র রয়েছে। কিন্তু দুজনের একজন কেন সরে পড়ল সেটা বোঝা গেল না। হয়তো কানির মোড় অবধি চালকের সঙ্গে যাওয়ারই নির্দেশ ছিল তার উপরে।

ফতুয়াধারী সেই বার্তা পাঠিয়ে দিল আরো তিনজনের কাছে।

প্রায় এক ঘণ্টার অপেক্ষা চলল। নর্দমার ধারের খাবারের দোকানে ফতুয়াপরা মানুষটা মশার কামড়ে রীতিমতো কাহিল হচ্ছিল। আজ সন্ধের দিকে মুশলধারে বৃষ্টি হয়েছে তাই বাতাসে একটা ভেজা, ঠান্ডা ভাব আছে। গতকালের মতো গরম যদি আজ থাকত, এতক্ষণ এই দোকানে বসে থাকা যেত কিনা, সে বিষয়ে তার মনে সন্দেহ জাগছিল।

রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ রাঙাভিটা থেকে খবর এল একটা সাইকেল ভ্যান এগিয়ে চলেছে বিদ্রোহীর মোড়ের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে দোকানের দুই খদ্দের গা ঢাকা দিল দোকানের মধ্যে, বাইরে বেঞ্চে বসে ঝিমোতে লাগল শুধু ফতুয়া-লুঙ্গি পরা মানুষটা। সেই ঝিমুনির আড়াল থেকেই মিনিট পনেরো বাদে সে দেখে নিল সাইকেল ভ্যানটা খাবারের দোকান ছাড়িয়ে মশালদিঘির দিকে চলে যাচ্ছে।

আজ সন্ধেতে বৃষ্টির পর থেকে টিভিতে সিগন্যালের সমস্যা হচ্ছে। মাঝে মাঝেই ছবি কেপে উঠছে দেখে ধীমান আর জয় বিরক্ত হচ্ছিল। খেলা শুরু হয়েছে মিনিট কুড়ি, কিন্তু ভালো করে দেখতে পারছে না ওরা। ধীমান জানে এরকম গোলমাল হলে বাড়ির ছাদে বসানো ডিশ অ্যান্টেনাটা একটু এদিকওদিক করলে অনেক সময় ছবির নাচানাচি বন্ধ হয়ে যায়। ধীমান আর জয় ছাদে উঠেছিল। ধীমান তার কাজ করছিল আর জয় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল পাঁচিল ঘেঁষে। একটা সিগারেট ধরিয়ে ছাদ থেকে নিচে তাকাতেই একটা দৃশ্য চোখে পড়তেই তার সিগারেট ধরা হাত, ঠোঁটের থেকে কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনজন মানুষ খুব দ্রুত অথচ নিঃশব্দে বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে মশালদিঘির দিকে চলে গেল। তাদের একজনের পরনে ফতুয়া আর লুঙ্গি। সে দাঁড়িয়ে লুঙ্গিটাকে গুটিয়ে হাঁটুর উপরে তুলে নিয়েই পায়ের গতি বাড়াল। তিনজনেরই পোশাক সাধারণ। কিন্তু কারা এরা? এভাবে কোথায় গেল? জয় বুঝতে পারল না। সে ধীমানকে ডেকে দেখাল দৃশ্যটা। ধীমান দেখে বলল, “এখানে নানারকম কাজকারবার চলে। কার কী মতলব বোঝা মুশকিল।”

সাইকেল ভ্যানটা গাছের কাছাকাছি এসে পড়েছে দেখে উপরে বসা নজরদার চূড়ান্ত মুহূর্তের জন্য তৈরি হয়ে নিল। সামান্য দূরত্বেই একটা বেড়ার ঝুপড়ির মধ্যে আলো জ্বলছে। তাদের কাছে যা খবর, তা অনুযায়ী ভ্যানের গন্তব্য ওই ঝুপড়িটাই। তাকে এমনভাবে লাফিয়ে পড়তে হবে ভ্যানওয়ালার সামনে যাতে সে কোনোভাবেই সতর্ক না হতে পারে। জাল নোটের কারবারি আর এই কারবারিদের হিংস্রতায় কোনো তুলনা হয় না। মুহূর্তের অসাবধানতায় প্রাণ চলে যেতে পারে এদের হাতে। নজরদার লক্ষ করল সামনেই একটা ঝুপড়ির সামনে একটা আলো বেশ দ্রুত ডান দিক-বাঁ দিক নড়াচড়া করছে। মোবাইলের আলো নাড়িয়ে ভ্যানওয়ালাকে সিগন্যাল দেওয়া হচ্ছে। নজরদার গাছের ডাল বেয়ে কাণ্ডের শক্ত দিকটায় চলে এল। সামান্য শব্দ হল তাতে এবং সতর্ক ভ্যানওয়ালা দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সে শব্দকে অনুসরণ করে মাথা তুলতেই ঘাড়ে একটা প্রচণ্ড আঘাতে দুমড়ে মাটিতে পড়ে গেল। তার পিঠের উপরে চড়ে বসেছে কেউ। নজরদার ভ্যানওয়ালার ছটফট করতে থাকা ডান হাতটা মুচড়ে পিছমোড়ে করে দিল। প্রচণ্ড একটা ধ্বস্তাধ্বস্তি চলছে, তারই মধ্যে সে নজর করল ঝুপড়ির দিক থেকে কেউ এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। নজরদার বুঝতে পারল, এক নয়, বুনো গাছপালার উপরে পায়ের খসখস শব্দ বলছে ব্যক্তি একাধিক। পরক্ষণেই নজরদারের পিছন দিক থেকেও কিছু পায়ের শব্দ ভেসে এল। নজরদার তার কোমরে গোঁজা সার্ভিস রিভলভারটা উঠিয়ে নিয়ে তার বাঁট দিয়ে ভ্যানওয়ালার মাথার পিছনে একটা বাড়ি মারতেই সে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। হাঁটু দিয়ে তার পাঁজরে একটা জোর ধাক্কা মেরে উঠে পড়ল নজরদার। ঝুপড়ির মধ্যে আরো কেউ রয়ে গেছে কিনা বলা যায় না। এদিকে তারা মোটে তিনজন।

দুই পক্ষ মুখোমুখি হতেই ফতুয়া- লুঙ্গি পরা পেটানো চেহারার লোকটা প্রতিপক্ষের একজনের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দ্বিতীয়জন বেগতিক বুঝে পিছন ফিরে দৌড়তে শুরু করল ঝুপড়ির দিকে। তাকে ধাওয়া করল বাকি দুজন। বিশেষ দূরত্বে পৌঁছাতে পারল না সে। বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে আছে; তার উপরে পা হড়কে পড়ে গেল।

“পরেশ, গামছাটা,” চেঁচিয়ে উঠলেন ফতুয়া-লুঙ্গি পরা প্রতীক সেন। পরেশের ছুঁড়ে দেওয়া গামছা দিয়ে তিনি ইতিমধ্যেই ঘায়েল করে ফেলে টার্গেটের হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেললেন দ্রুত। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল আরেক সহকর্মী।

“এই মাল দুটোকে সামলা,” বলে তিনিও কোমর থেকে পিস্তল বের করে দ্রুত ছুটলেন ঝুপড়ির দিকে। ঝুপড়ির মধ্যে ঢুকতেই এক বোরখাধারী প্রতীক সেনের রাস্তা আটকানোর চেষ্টা করল। এক মুহূর্তের মধ্যে থতমত খেলেও অভিজ্ঞ পুলিশকর্মী দ্রুত ধরে ফেললেন চালাকিটা। এই চেহারা কোনোমতেই একজন মহিলার নয়। এটা আসলে প্রতিপক্ষের গতি কমানোর কৌশল।

প্রতীক এক ধাক্কায় বোরখাধারীকে ছিটকে সরিয়ে দিলেন কিছুটা দূরে। সে মাটিতে পড়তে গিয়েও পড়ল না। তার হাতের ভঙ্গি দেখে প্রতীক দ্রুত অনুমান করে নিলেন সে বোরখা উঠিয়ে লুকিয়ে রাখা পিস্তল বের করার চেষ্টা করছে।

“শুয়োরের বাচ্চা, তোর হাত গুঁড়িয়ে দেবো,” চেঁচিয়ে উঠলেন প্রতীক সেন। বোরখাধারী পিস্তল বেরও করে ফেলেছিল, কিন্তু প্রতীকের সার্ভিস রিভলভারের গুলি চকিতে ছুটে এসে তার কবজি ছুঁয়ে চলে যেতেই পিস্তল খসে পড়ল হাত থেকে। ঝুপড়ির মধ্যে আরেক ব্যক্তি ছিল। সে গোটা ঘটনার ক্ষিপ্রতায় এতটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছে যে কোনো নড়াচড়ার সুযোগ পেল না। সে বসেছিল একটা গর্তের পাশে ডাঁই করে রাখা মাটির স্তূপের পাশে। তার হাতে শাবল, হাতেপায়ে মাটি লেগে আছে। সহজেই অনুমান করা যায় গর্তটা খোড়ার জন্যই তাকে আনা হয়েছে। প্রতীকের দুই সঙ্গীর একজন দ্রুত কবজা করে ফেলল তাকে। দ্বিতীয়জন দাঁড়িয়ে রইল। এদিকে বোরখাধারী পিস্তল হারালেও সাহস হারায়নি। সে বেড়ার ঝুপড়ির দেওয়ালে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ধাক্কা মারতেই দেওয়াল ফাঁকা হয়ে গেল। ঝুপড়ির চাল টলমল করে হেলে পড়ল সেদিকে। সেই দুর্যোগ সামলে ঝুপড়ির বাইরে যখন পৌঁছলেন প্রতীক, ততক্ষণে সে উধাও হয়ে গিয়েছে।

কপালে ভাঁজ পড়ল এসআইয়ের। যাদের হাতেনাতে ধরতে এসেছিলেন তারা দুঃসাহসী বটে কিন্তু এতটা বেপরোয়া নয়। কে ছিল ওই লোকটা?

ঝুপড়ির মধ্যে থেকে তার ফেলে যাওয়া পিস্তলটা কুড়িয়ে নিলেন প্রতীক সেন। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাইকেল-ভ্যানের সামনে পৌঁছে দেখলেন তার উপর জড়ো করে রাখা আছে বিরাট আকারের গোটা পাঁচেক কুমড়ো। তার একটাকে হাতে তুলতেই অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলেন প্রতীক ও তাঁর সঙ্গীরা। প্রতীক তাদের দিকে মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, “কী বুঝছো? একে বলে লোহালক্কর।”

পাঁচটা কুমড়োকে মাটিতে আছড়ে ভাঙা হল। তিনটে একেবারে তরতাজা হলদে মাংসল ফসল, কিন্তু বাকি দুটোকে মাটিতে ফেলতেই তারা নিখুঁত দুটো টুকরোতে ভাগ হয়ে গেল। দেখা গেল খোল বাদে সেগুলোতে বিশেষ মাংস নেই। সেগুলোকে কেটে ভিতর থেকে সবকিছু বের করে নেওয়া হয়েছে। ভিতরের মাংসল দেওয়াল অনেকখানি চেঁছে ফেলে গর্ভটিকে ব্যবহার করা হয়েছে গোপন চেম্বার হিসেবে। সেই গর্ভে ভরা রয়েছে কয়েকটা প্লাস্টিকের মোড়ক। এভাবেই ভ্যানে করে বিভিন্ন বাজারে সবজি আসে অন্যান্য জায়গা থেকে। এক ভ্যানভর্তি কুমড়োর মাধ্যমে এভাবে চোরাই জিনিস চালান হচ্ছে, এটা কল্পনা যদি বা করা যায়, সনাক্তকরণ অত্যন্ত দুরূহ কাজ।

প্লাস্টিকের প্যাকেটগুলো খুলতেই একে একে বেরিয়ে এল ছ’ টা ওয়ান শটার আর চারটে নাইন এমএম পিস্তল। সবই বেআইনি অস্ত্র কারখানায় তৈরি মাল। এছাড়াও বেরোল গোটা সত্তর-আশি রাউন্ড বুলেট ও ডজনখানেক পেটো।

“এ যে সোনার ভান্ডার স্যার,” পরেশ অস্ত্রগুলোর উপরে ঝুঁকে পড়ে বলল।

প্রতীক সেন তাঁর শিকারের থেকে চোখ সরালেন না। শুধু বললেন, “ভান্ডারটা কার তাও বুঝতে পারছো নিশ্চয়ই। এই জমিটা আমাদের মাননীয় বিধায়ক অমল বরাটের। অবশ্যই জবরদখল করা। পাহারার জন্য এই ঝুপড়িটা বানিয়ে কয়েকটা কুকুর পুষেছিল। ভোটের দামামা বাজল বলে। এলাকাবাসীকে ধমকাতে, চমকাতে হবে। ত্রাস সৃষ্টি করতে হবে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের মনে। কিন্তু…”

“কিন্তু কী স্যার?” কৌতুহলী পরেশ প্রশ্ন করল।

কপালের ঘাম মুছতে মুছতে এসআই বললেন, “আমি ভাবছি অন্য কথা।”

৩২

সেবক রোডের হোটেলের সুইটে থমথমে মুখে বসেছিলেন শ্যামলেন্দু নস্কর। তাঁর হৃদয় তোলপাড় করে দিচ্ছে আজ ভোরের একটি ঘটনা। রাস্তায় এক জায়গায় তাঁর গাড়ি থামায় তিনজন অপরিচিত ব্যক্তি। প্রত্যেকের মুখ ঢাকা ছিল কাপড়ে। সটান গাড়ির সামনে চলে এসে দরজা খুলে তারা শ্যামলেন্দুকে নেমে আসতে বলে। ঘটনায় হতচকিত শ্যামলেন্দু বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী করবেন। যে ব্যক্তি ইশারায় তাঁকে নেমে আসতে বলছিল তার চোখের চাহনি শ্যামলেন্দুর মনে ভয় সৃষ্টি করেছিল দ্রুত। তিনি নেমেছিলেন গাড়ি থেকে। স্বভাবে ডাকাবুকো বিভাস ‘দাদা’র এহেন হেনস্থা দেখে একটু চড়াও হতে গিয়েছিল, কিন্তু সেই মুখ ঢাকা ব্যক্তির বরফঠান্ডা অথচ হিংস্র চাহনি এবং হাত তুলে থামার ইশারা তাকেও যেন স্তব্ধ করে দিয়েছিল। গাড়ি, বিভাস ও ড্রাইভার রয়ে গিয়েছিল রাস্তাতেই, মুখ ঢাকা আগন্তুকেরা শ্যামলেন্দুকে কিছু দূর হাঁটিয়ে এনে তুলেছিল অন্য একটি গাড়িতে। তখন সবে অন্ধকার কাটতে শুরু করেছে আকাশে, তাই নিঃশব্দে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটা কারোর নজর করার সম্ভাবনা খুব কম ছিল।

জীবনে এত অপমানিত কোনোদিন বোধ করেননি শ্যামলেন্দু নস্কর। গাজোলে তাঁকে রাজার মতো সম্মান করে মানুষ, এলাকার বিধায়ক অবধি বিভিন্ন কারণে তাঁর উপরে নির্ভরশীল। আর তাঁকেই কিনা এমন অপহরণের কায়দায় তুলে আনা! কারা এরা? এদের দলের পান্ডা, যিনি এই মুহূর্তে তুরস্কে আছেন, মানুষকে আধ্যাত্মিক চেতনার ভাষণ দেওয়ার আড়ালে কী করে বেড়ান তা শ্যামলেন্দু জানেন। তাঁকে শিখণ্ডী করে তিনি কোন কার্যসিদ্ধি করতে চাইছেন, তাও তাঁর জানা। কিন্তু এই বাংলার মাটিতে সেই ব্যক্তির যে সেনাপতি গোটা কাজটা আড়াল থেকে পরিচালনা করছে, তার দুঃসাহস, স্পর্ধা শ্যামলেন্দু বিস্মিত করছে। গতকাল দুপুরে তুরস্ক থেকে ফোন পাওয়ার পরেই ঢাকায় তাঁর বেআইনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক সমাজবিরোধীর কাছে প্রশ্ন করে এই ইখলাস রুবেল সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন শ্যামলেন্দু। ওপার থেকে যে কয়েক টুকরো তথ্য এসেছিল তা শুনে তাঁর মনের ভিতরকার উত্তেজনা বহু গুণে বেড়ে গেছে। এমন ভয়ংকর বুদ্ধিমান শয়তান নাকি বিশেষ জন্মায় না পৃথিবীর বুকে। তুখোড় মেধা ছিল পড়াশোনায়, তেমনই ছিল শরীরচর্চার অভ্যেস। স্বভাবে হিংস্র না হলেও নিজের অধিকারটা বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে তার কাঠিন্য নাকি নজর করা যেত ছেলেবেলা থেকেই। কুমিল্যার অলিতে গলিতে আজও কথা উড়ে বেড়ায় যে সন্ত্রাসবাদীদের দলে তার ভিড়ে যাওয়ার খবর জানতে পেরে ইখলাসের ছোট বোন আব্বাকে তা জানিয়ে দিতে চাওয়ায় দাদার হাতেই খুন হয়। সংসারের সমস্ত পিছুটান থেকে মুক্ত হয়ে জেহাদের রাস্তায় চলে যাওয়ার জন্য সে নিজে তার আব্বা-আম্মিকে গভীর রাতে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে হত্যা করে।

এমন হিংস্র একটা মানুষ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই নাকি তাঁর সামনে উপস্থিত হবে! এই মুহূর্তে সুইটে তিনজন মানুষের নজরবন্দি শ্যামলেন্দু নস্কর। তাঁকে চা দেওয়া হয়েছে কিন্তু তাঁর মুখে রোচেনি। সামনেই কাচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে তিনজনের একজন। গোপনীয়তা রক্ষায় জানালার পর্দা টানা, কিন্তু তা ভেদ করে ভোরের আবছা আলো ঘরে প্রবেশ করছে।

চাপা উত্তেজনা কাটাতে পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে তিন প্রহরীর একজনের দিকে অনুমতির ভঙ্গিতে দেখালেন শ্যামলেন্দু। সে কেবল চোখজোড়া ঘরের ছাদের দিকে ইশারা করে বুঝিয়ে দিল এই ঘরে স্মোকিং অ্যালার্ম আছে। অসহায়ভাবে ফের গুম হলেন শ্যামলেন্দু।

কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা, তারপর একজনের মোবাইল বেজে উঠল। মোবাইলে চোখ রেখে সে ইশারা করতেই বাকি দুজন তটস্থ হল। শ্যামলেন্দুর চোখ গেল ঘরের দরজার দিকে। এতক্ষণ দরজার তলা দিয়ে হালকা আলো প্রবেশ করছিল। এখন সেখানে জমাট অন্ধকার। কাঠের দরজায় লাগানো ধাতব লকের হাতল নিচের দিকে নামল মৃদু শব্দে। ধীরে ধীরে খুলতে লাগল দরজা। উৎকণ্ঠায় দামি সোফা থেকে কিছুটা উঠে পড়েছেন শ্যামলেন্দু। দরজাটা একটু একটু করে সরছে আর একটু একটু করে দৃশ্যমান হচ্ছে একটি চেহারা। ট্রেকিংয়ের জুতোর মতো মোটা সোলওয়ালা শু, গাঢ় সবুজ প্যান্ট ও ফুল হাতা টাইট টিশার্ট পরা এক ব্যক্তি প্রবেশ করছে ঘরে। সবশেষে উদ্ভাসিত হল তার মুখ। মাথার কালো টুপি সরিয়ে সে যখন বরফঠান্ডা চাহনি উপহার দিল, শ্যামলেন্দুর মনে হচ্ছিল তিনি নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছেন।

জীবনে কোনো ঘটনায় এতটা স্তম্ভিত হননি শ্যামলেন্দু নস্কর, যতটা হচ্ছেন এই মুহূর্তে।

৩৩. হাফ টাইম…

নিউ মাল জংশন স্টেশনে নেমেই সারাদিনের জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করে নিল এনএটিসি’র দুই সাব-ইন্সপেক্টর। নিয়ম অনুযায়ী থানায় তাদের যেতেই হবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য, কিন্তু তার আগে এলাকায় সদ্য ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে বাতাসে কোনো খবর ভেসে বেড়াচ্ছে কিনা সেটা বুঝে নেওয়া দরকার। এভাবেই বহু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ লিড পেয়ে যান সরকারি গোয়েন্দারা। তাই নিজস্ব কায়দায় গাড়ির চালকের সঙ্গে গল্প জুড়লেন ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠী। তাঁর পাশে বসা মধ্যবয়স্ক সুনীল রক্ষিত শুধু কান খাড়া রেখে দিলেন, চোখ রাখলেন জানালার বাইরে।

টুকটাক প্রশ্নের উত্তরে চালক যা বলছিল তাতে নোট নেওয়ার মতো কিছু ছিল না। শুধু এটুকু জানা গেল মৃত আয়েশা সুলতানার সেক্রেটারি শুভঙ্কর এখনও ওই রিসর্টেই আছে। গতকাল তার ম্যাডামের অন্ত্যেষ্টিতে যোগ দিতে সে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তার বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও স্থানীয় পুলিশ থাকে অনুমতি দেয়নি। এছাড়াও জানা গেল সাউথ খয়েরবাড়ির কাছে হাইওয়ের উপরে যে গাড়িটার সঙ্গে দুই দুষ্কৃতীর বাইকের ধাক্কা লাগে, তারা আজ সকালে মোটা জরিমানা দিয়ে মুক্তি পেয়েছে।

রাস্তা ফাঁকা তাই গাড়িতে মেটেলি থানা পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগল না। বিতর্কিত কেসে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মীদের দেখলে পুলিশকর্মীদের মধ্যে একটা আড়ষ্টতা কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রেই অসহযোগিতা করে থাকে তারা। ধর্মেন্দ্র ও সুনীলের সেরকম অভিজ্ঞতা হল না। ডিউটিতে ছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর অর্জুন দাস। এনএটিসি’র দুই অফিসারের পরিচয় ও আবির্ভাবের হেতু জানার পরে তিনি তাঁদের প্রশ্নের জবাব দিতে বিশেষ দ্বিধা করলেন না।

প্রাথমিক কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর জেনে নিয়ে, বাস্তব পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে একটা ধারণা করে নিলেন ধর্মেন্দ্র ও সুনীল। পুলিশ তদন্তের স্বার্থে খুনের স্পট এবং তারপরে রিসর্ট থেকে কী কী জিনিস বাজেয়াপ্ত করেছে তার লিস্টটা এনএটিসি কে পেতে হবে। পুলিশের তরফে অসহযোগিতা থাকলে এই কাজের জন্য তাদের স্থানীয় কোর্ট থেকে আগাম অনুমতি নিতে হতো, কিন্তু অর্জুন দাস তাঁদের হাতে লিস্ট তুলে না দিলেও সেটা দেখাতে আপত্তি করলেন না। মোবাইলের ক্যামেরায় দ্রুত সেই লিস্টের ছবি তুলে নিলেন ধর্মেন্দ্র।

কোন রিসর্টে আয়েশা সুলতানা উঠেছিলেন তা জেনে নিয়ে ধর্মেন্দ্র ও সুনীল বেরিয়ে পড়লেন গাড়ি নিয়ে। তাঁদের অনুরোধে এসআই একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে যেতে বললেন খুনের স্পটটা চিনিয়ে দেওয়ার জন্য। কোর্ট খুলতে এখনও দেরি আছে। সেখানে যাওয়ার আগে আসল জায়গাটা সরেজমিনে দেখে আসা প্রয়োজন।

মূর্তি নদীর উপরে লোহার রেলিংওয়ালা ব্রিজের উপরে যখন গাড়ি থামল, দূরের আকাশে তখন জমাট বাঁধা কালচে মেঘ। এতক্ষণ ভ্যাপসা গরমে বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল ওঁদের। এখন কিন্তু বেশ সুন্দর একটা ঠান্ডা হাওয়া বইছে।

হত্যাকাণ্ডের পরে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সজাগ, তাই অচেনা গাড়ি থেকে দুজন মানুষকে নামতে দেখে ব্রিজের দুই মাথা থেকে দুই পাহারাদার ছুটে এসেছিল। উর্দিধারী কনস্টেবলকে দেখে তারা দাঁড়িয়ে পড়ল বটে, কিন্তু আড়চোখে ধর্মেন্দ্র দেখে নিলেন তাদের চাহনি থেকে সন্দেহ যাচ্ছে না।

কনস্টেবলটি বেশ চটপটে ও বুদ্ধিমান। তাকে একবার বলাতেই সে সেই সন্ধের ঘটনাটা রিকনসট্রাক্ট করার কাজে ধর্মেন্দ্রদের সাহায্য করতে রাজি হয়ে গেল। গুলি লাগার পরে আয়েশা এবং সঞ্জয়শেখর কোথায়, কোন ভঙ্গিতে পড়েছিলেন, সে অভিনয় করে দেখিয়ে দিল। সুনীল পটাপট সেই অ্যাকশনের ছবি তুলে নিলেন। তারপর কনস্টেবলটি দেখিয়ে দিল ঠিক কোন জায়গা থেকে ছয়টি ফাঁকা কার্তুজ তারা কুড়িয়ে পেয়েছিল সেদিন।

ব্রিজের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে চারপাশ ভালো করে জরিপ করে নিলেন ধর্মেন্দ্র। তিনি দেখতে পাচ্ছেন তাঁদের দেখে কৌতূহলী স্থানীয় মানুষেরা ক্রমশ জড়ো হচ্ছে ব্রিজের দুই ধারে।

“কোই আই উইটনেস নেহি মিলা?” কনস্টেবলকে প্রশ্ন করলেন সুনীল।

কনস্টেবল জগন্নাথ হোড় এবার একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সেদিনের ঘটনার কোনো প্রকৃত সাক্ষী আছে বলে তার অন্তত জানা নেই। সে দু’ দিকে মাথা নাড়ল।

সুনীলের অভিজ্ঞ চোখ বলছিল ব্রিজের মুখে যে কজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে; যাদের মধ্যে দু-তিনজন আদিবাসী মহিলাও রয়েছে। তাদের সঙ্গে একবার কথা বলা যেতে পারে।

কনস্টেবলসহ তারা সেদিকে এগোতেই কৌতূহলী মানুষের সংখ্যা দ্রুত কমতে লাগল। কিন্তু দাঁড়িয়ে রইল দুই আদিবাসী মহিলা। সুনীলের পরামর্শ মেনে ধর্মেন্দ্র তাদেরকে হাতের ইশারায় ডাকলেন। একজন পিছোতে শুরু করল সেই ইশারা বুঝে, আরেকজন দাঁড়িয়ে রইল জায়গায়। ওঁরা লক্ষ করলেন যে মহিলাটি পিছোতে শুরু করেছিল সে দ্বিতীয়জনকে টেনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু সে হাত ছাড়িয়ে নিচ্ছে। ধর্মেন্দ্র দ্রুত পৌঁছলেন ওদের কাছে।

সুনীলের ছোটবেলা কেটেছে এই ডুয়ার্স অঞ্চলে, তাই এখানকার আদিবাসীদের রোজনামচা সম্বন্ধে তাঁর একটা স্পষ্ট ধারণা আছে। জানা আছে তাদের ভাষাও।

সে মেয়েটিকে সেই ভাষায় কিছু বলার পরে তার চোখে বিস্ময় জেগে উঠতে দেখলেন ধর্মেন্দ্র। মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, প্যান্ট-শার্ট পরা এক ভদ্রলোকের মুখে নিজের মাটির ভাষা শুনে মহিলাটি অবাক হয়েছে।

সুনীল তাকে আরো কিছু বলতে সে তার সঙ্গে গাড়ি অবধি এগিয়ে গেল। তার সঙ্গীটি কাপড়ের আঁচল দাঁতে কামড়ে প্রবল কৌতূহল ও সংশয়ের সঙ্গে ঘটনাপ্রবাহ দেখতে লাগল।

সুনীলের অনুমান একেবারে মিথ্যে হয়নি। মহিলাটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সে জানতে পারল সেদিন সন্ধ্যায় যখন ব্রিজের উপরে ঘটনাটি ঘটে তখন সে মূর্তি নদীর দিক থেকে ব্রিজ ধরে সামনের জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিল। সেদিন যখন ঘটনাটা ঘটে, সে নদীর পাশের বড় রাস্তা ধরে এগোচ্ছিল ব্রিজের দিকে। সেই সময়ে সে কী দেখেছিল তা জানাল। সুনীলের মনে হল না মহিলার বয়ানে কোনো ধোঁয়াশা আছে। সে চটপট বয়ানের নোট নিয়ে মহিলাকে মুক্তি দিল। সঙ্গী ফিরে যাচ্ছে দেখে দূরে দাঁড়ানো মেয়েটি দৌড়ে এগিয়ে এসেছিল। তার হাঁটাচলার মধ্যে একটা চঞ্চলতা; বেশ বোঝা যাচ্ছে সে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে জানতে চাইছে এই শহুরে লোকগুলো তার সঙ্গে কী কথা বলছিল। সুনীলের সঙ্গে যে কথা বলে গেল, সে কিন্তু একেবারে শান্তভাবে হেঁটে চলেছে। ওরা এগিয়ে যাচ্ছে গরুমারা ন্যাশনাল পার্কের মূর্তি বিটের গেটের দিকে।

ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠী এগিয়ে এলেন তাঁর সহকর্মীর দিকে।

“কেয়া বাতাই? দেখা কুছ উসনে?” তিনি প্রশ্ন করলেন।

সুনীল ইতিবাচকভাবে ঘাড় নাড়লেন। তার চাহনি বলে দিল কনস্টেবল জগন্নাথ হোড়ের সামনে সে কথা আলোচনা করা অনুচিত হবে।

পরবর্তী গন্তব্য বাইক অ্যাক্সিডেন্ট ও জঙ্গলের মধ্যে যেখানে মাথায় গুলির ক্ষত নিয়ে পড়েছিলে এক দুষ্কৃতী, সেই দুটো স্পট। গাড়িতে উঠে চালককে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন সুনীল।

৩৪

হোটেলের সুইটে নরম গদিওয়ালা সোফায় বসা শ্যামলেন্দু নস্করের মনে হচ্ছিল তিনি যেন ডুবে যাচ্ছেন। জল নাকি চোরাবালি, তা তিনি জানেন না, শুধু মনে হচ্ছে ক্রমশ তাঁর শরীরটা ডুবে যাচ্ছে।

থরথর করে কাঁপছে শ্যামলেন্দুর দুই পা। মাথার মধ্যে সমস্ত হিসেব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। একটু আগেই তিন প্রহরীর একজনকে দায়িত্বে রেখে বাকি দুজনকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে ইখলাস রুবেল।

শ্যামলেন্দুর মস্তিষ্ক যেন সেই চরিত্রকে বর্ণনা করার উপযুক্ত সমস্ত শব্দ, বিশেষ্য, বিশেষণ হাতড়ে বেড়াচ্ছে অভিধানের পাতা থেকে। এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় সে ছিল এই ঘরে। তার বক্তব্য, তার চাহিদা, তার নির্দেশিকা সব তালগোল পাকিয়ে পড়ে আছে শ্যামলেন্দুর মাথার এক কোনায়। তিনি শুধু ভেবে যাচ্ছেন কী ভয়ংকর এক মানুষের পাল্লায় তিনি পড়েছেন। ডুবে যাওয়ার অনুভুতিটাও সেই কারণেই হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, যে গর্তে তিনি পড়েছেন, তার থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো রাস্তাই নেই। একমাত্র উদ্ধার করতে পারে ওই ইখলাস রুবেলই। বিনিময়ে, সে যা করতে বলে গেছে, তার তৈরি করা নীল নকশা ধরে সেই কাজ শ্যামলেন্দুকে করে দিতে হবে।

টাকার নেশায় যখন বাংলাদেশে বিভিন্ন বেআইনি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন শ্যামলেন্দু, সে সময় তাঁর মা একদিন ঘরে ডেকে সাবধান করেছিলেন। সেদিন মায়ের সামনে মাথা হেঁট করে দাঁড়ালেও সেটা নিছকই অভিনয় ছিল। আজ সোফার ঠিক বিপরীতে দেওয়ালে টাঙানো আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে চোখ যেতেই মাথাটা আবার হেঁট হল। আজকেরটা অভিনয় নয়। আজ নিজের কাছেই নিজে ছোট হয়ে যাচ্ছেন শ্যামলেন্দু। পাঁকে নিজে থেকে পা না ডোবালে আজ এভাবে গোটা শরীর নোংরা হতো না।

একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছেন শ্যামলেন্দু নস্কর। এক জোড়া বরফঠান্ডা চাহনি বারবার ভেসে উঠছে তাঁর চোখের সামনে।

উফ, কী সাংঘাতিক! এই সেই ইখলাস রুবেল! বাংলাদেশে চার-চারটে জঙ্গিহানা, তিনজন তরুণ লেখক ও এক প্রবীণ প্রকাশকের নারকীয় হত্যার নেপথ্য নায়ক!

সে এসেছিল, তার কথা বলে চলেও গেছে, কিন্তু শ্যামলেন্দুকে যেন পক্ষাঘাতে আক্রান্ত এক অসহায় রোগীতে পরিণত করে দিয়ে গেছে।

নিজেকে সামলে উঠতে একটু সময় লাগল শ্যামলেন্দুর। তারপরে তিনি প্রহরীটির দিকে চাইলেন। করুণ মুখে বললেন, “একটা জানালা একটু খোলা যায় ভাই? শরীরটা বড় অস্থির করছে।”

জানালা খুলল। শ্যামলেন্দু তাঁর অবসন্ন শরীরটাকে কোনো রকমে টেনে নিয়ে গেলেন তার সামনে। বড্ড চাপ হয়ে যাচ্ছে মাথার উপরে। একটা সিগারেট বড্ড দরকার। কিন্তু তিনি নিরুপায়। তবে বাতাসে একটা ঠান্ডা ভাব আছে। সেটা শ্যামলেন্দুকে সামান্য হলেও স্বস্তি দিচ্ছিল।

বিলাসবহুল সুইটে নিজের ইচ্ছেমতো চা, কফি বানিয়ে নেওয়ার বন্দোবস্ত আছে। তাঁর নিজের শরীরে আজ চা করে খাওয়ার ক্ষমতা নেই, কিন্তু প্রাণটা একটু চা চা করছে। তাই আগেরবারের চা কাপেই পড়ে ঠান্ডা হয়ে গেলেও এবার প্রহরীর প্রস্তাব তিনি ফেরালেন না। ইলেকট্রিক কেটলির গায়ের জানালা দিয়ে ভিতরের শান্ত জলের ক্রমশ অশান্ত হয়ে ওঠা দেখতে দেখতে শ্যামলেন্দুর মনে হচ্ছিল, তাঁর মনের মধ্যেও এই মুহূর্তে একটা ইলেকট্রিক কেটলি চলছে। তার ভিতরের সমস্ত কিছু তোলপাড় করে দিচ্ছে একটা ভাবনা।

চা তৈরি করে বেশ যত্নের সঙ্গে কাপ প্লেটের উপরে বসিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে দিল প্রহরী।

চায়ে আলতো চুমুক দিয়ে বাইরে তাকালেন শ্যামলেন্দু। চমৎকার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে হোটেলটা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই অজস্র নুড়ির গা বেয়ে তিরতির করে বয়ে চলা মহানন্দাকে দেখা যাচ্ছে। তার উপরে দিগন্তজোড়া উন্মুক্ত আকাশ। এই মুহূর্তে আকাশের রঙ ধূসর। কালো মেঘ দানা বাঁধছে সেখানে। কেমন যেন একটা অশুভ সংকেত, শ্যামলেন্দুর মনে হল। কথা বলার মতো মানসিক অবস্থায় তিনি নেই, তবু সামনের প্রাকৃতিক দৃশ্যই যেন তাঁকে দিয়ে তিন শব্দের একটা বাক্য বলিয়ে নিল।

আপন মনে বাইরের দিকে চেয়ে তিনি বললেন, “দুর্যোগ ঘনিয়ে আসছে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *