ইনজুরি টাইম – ৪০

৪০

পদাতিক এক্সপ্রেসের এসি টু টায়ার কামরার আপার বার্থে উঠেই গা এলিয়ে দিল হক। মাথার মধ্যে অজস্র ভাবনা ও প্রশ্ন ছটফট করছে, একে অপরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি লাগিয়ে ফেলছে। ঠান্ডা মাথায় প্রতিটা ভাবনাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করা দরকার।

আজ দক্ষিণ কলকাতার রেস্তোরাঁয় সঞ্চিতা যা বলে গেল সেগুলো খুবই তাৎপর্যপুর্ণ। কিন্তু তার দেওয়া তথ্যগুলির ভিত্তিতে সন্দেহের তির যেদিকে ঘুরে যেতে চাইছে সেই দিকটা এখনও অন্ধকারে। একটু গভীরে গিয়ে বিষয়টা অনুসন্ধান করার নির্দেশ তার অধীনস্থ দুই কর্মীকে দিয়ে এসেছে হক।

এবার ভাবনা মালদার গাজোলে গিয়ে কীভাবে সে কাজ শুরু করবে। এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে সন্দেহজনক কিছুর প্রতি নজর রাখলেই তো শুধু হবে না, কোনো রকম বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিলেও কালক্ষেপ না করে অ্যাকশনে নেমে পড়তে হবে। কিন্তু আপাতত সে একাই যাচ্ছে সেখানে। ফারাক্কায় এনএটিসি’র একটি শাখা অফিস আছে বটে কিন্তু সেখানে তেমন দক্ষ কর্মী নেই যাদের সাহায্য আপৎকালীন পরিস্থিতিতে পাওয়া যেতে পারে। আবার এই মুহূর্তে কেবল একটা সন্দেহের বশে তিনজনের টিম নিয়ে গাজোলে গিয়ে বসে থাকাও মুশকিল। দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরা করলেই তা মানুষের নজর কাড়ে। যার বা যাদের উপর নজর রাখতে যাওয়া, তারা চোখকান খোলা রাখেনি, এমনটা ভাবা মূর্খামি।

গত তিন বছরে হক চারটে এমন মিশন লিড করেছে যেখানে শেষ পর্যায়ে গিয়ে প্রতিপক্ষ আঁচ করে নিতে পেরেছে তাদের উপর নজর রাখা হয়েছে। ভয়াবহ এনকাউন্টারের শেষে জঙ্গিরা নিকেশ হয়েছে ঠিকই কিন্তু অপূরণীয় ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে এনএটিসিকেও। স্যামুয়েল গোমেজের মতো ক্ষুরধার অফিসারকে হারিয়েছে সংস্থা। একবার হক নিজেও কয়েক ইঞ্চির জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে। সে জানে আন্ডারকভার এজেন্ট হিসেবে তার উপর কেন এতটা ভরসা করে তার সংস্থা। কিন্তু প্রতিকূলতা এক এক জায়গায় এক এক রকম। সব ছক সব জায়গায় কাজ করে না যে।

কামরার ছাদে লাগানো নীলচে বাতিটাও নিভে যেতেই অন্ধকার নামল। চোখ বুজল হক। একটা নতুন ছক ভেসে উঠছে সেই ঘন অন্ধকার পর্দার উপরে। কখনো কখনো সে নাকচ করে দিচ্ছে নিজের ভাবনাকে, কখনো বা মনে মনে টিক মার্ক দিচ্ছে নতুন আইডিয়াকে। নিজের জন্য একটা ভূমিকা সে ভেবে বের করেছে। এসএমএসের মাধ্যমে তার সেই ভাবনা পৌঁছে গেল সুভাষ গোয়েলের কাছে। উত্তর ভারতের নামী প্রাইভেট হসপিটাল চেইন কিওর প্লাসের ডিরেক্টর নিখিল সেখাওয়াতের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে খুব ভালো সম্পর্ক এনএটিসি’র ডিআইজি’র। এক সময় এনএটিসি’র দ্বারাই বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল কিওর প্লাসের এলাহাবাদের হাসপাতাল। ভারত সেবকের ছাত্র সংগঠনের একদল কর্মী, হাসপাতালের ক্যান্টিন থেকে রোগীদের আপত্তিকর খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে, এই অভিযোগে হামলা করেছিল সেখানে।আসলে তাদের উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রের বেশে কিছু সন্ত্রাসবাদীকে হাসপাতালে ঢুকিয়ে দিয়ে নাশকতা চালানো। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হাসপাতালটিতে যারা চিকিৎসা পরিষেবা নিতে আসত তাদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে সে সময়ে এলাহাবাদের পরিস্থিতি একটু উত্তপ্ত ছিলই। সুভাষ গোয়েল এজেন্ট মারফত খবরটি পেয়েই সেখাওয়াতকে জানাতে তিনি দ্রুত নিরাপত্তা জোরদার করতে পেরেছিলেন।

হকের টেক্সট মেসেজ পেয়ে গোয়েল দ্রুত যোগাযোগ করলেন সেই নিখিল সেখাওয়াতের সঙ্গে। এনএটিসিকে সাহায্য করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না কিওর প্লাসের ডিরেক্টর।

মধ্যরাত পেরিয়ে গিয়েছিল, হকের চোখ লেগে এসেছিল এমন সময় একটা শব্দ তাকে জাগিয়ে তুলল। প্যান্টের পকেটের মধ্যে মোবাইল বাজছে। স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে— ‘ধর্মেন্দ্র’!

“হুম” এপার থেকে এক কথার সাড়া গিয়ে পৌঁছলো ধর্মেন্দ্র’র কাছে। মিনিট দুয়েকের বার্তার পরে সে অপেক্ষা করতে লাগল হকের তরফ থেকে নির্দেশের জন্য। এই মুহূর্তে সে এবং সুনীল উঠেছে মূর্তি নদীর ধারে সেই রিসর্টেই যেখানে অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানা ছিলেন। আয়েশার সেক্রেটারি শুভঙ্কর ও রিসর্টের ম্যানেজার দেবেন দত্তের সঙ্গে এক দফা কথাবার্তাও হয়ে গেছে তাদের। কী কী উঠে এসেছে সেই কথোপকথন থেকে সেই রিপোর্ট দেওয়ার জন্যই এই কল।

টাটকা তথ্যগুলো হকের ঘুমকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। রাত বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ট্রেনের গতি। যেন একটা নেশাগ্রস্ত মানুষ একটা বিশেষ ছন্দে, বিশেষ তালে মৃদু নাচছে, মৃদু দুলছে। দুলুনি দিয়ে উঠল হকের মস্তিষ্কও। সাইড ব্যাগ থেকে পকেট রাউটার বের করে মোবাইলে আন্তর্জালকে স্বাগত জানাল হক। মোবাইলের নেট কাজ করছে না। হক খুলে ফেলল একটি বিশেষ ওয়েবসাইট। একটি উঠতি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রের ওয়েব ভার্সান উপলব্ধ এখানে। একটির পর একটি ওয়েবপেজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ল হক। তারপরে ফেসবুকে ঢুকল এক বিশেষ ব্যক্তির প্রোফাইল ঘাঁটতে।ব্যক্তির নাম— রবিউল আলম।

ঠিক সেই মুহূর্তে গাজোল থানায় খাকি উর্দি খুলে ফেলে সাধারণ পোশাক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিলেন প্রতীক সেন। গত রাতের দুঃসাহসিক অভিযানে তাঁর সহযোদ্ধারা এই মুহূর্তে থমথমে মুখে চেয়ে আছে প্রতীকের দিকে। একটু দূরে কনস্টেবল নির্মল দাঁ অবশ্য নির্লিপ্ত। পরেশ কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে প্রতীক বললেন, “অনেক রাত হল। আজ থাক, পরে কথা হবে।”

প্রতীক অনুভব করতে পারছিলেন তাঁর লুকিয়ে রাখা বেদনাকে। কিন্তু তিনি জানেন এখন মাথা গরম করে ফেললে তাঁরই মতো ওই সৎ কর্মীগুলোর মাথার উপরেও শাস্তির খাঁড়া নেমে আসবে।

রাত পৌনে একটা, চারিদিক নিস্তব্ধ। কিন্তু থানা থেকে বেরিয়ে অস্থায়ী বাসস্থানের দিকে দু’ পা এগোতেই একটা মৃদু গুঞ্জন প্রতীকের কানে এল। সেই গুঞ্জনকে অনুসরণ করে দেখলেন প্রভাতী সংঘের দিক থেকে সাত-আটজনের একটা দল এগিয়ে আসছে। কিছু একটা বিষয় নিয়ে বেশ জোর গলায় আলোচনা করতে করতে আসছে ওরা। ঘন ঘন হাত নাড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে প্রত্যেকেই বেশ উত্তেজিত।

যদিও কারোর হাতেই বিড়ি বা সিগারেট নেই, তবু নিয়নের আলোয় প্রতীকের চেহারাটা স্পষ্ট হতেই ওরা থমকে দাঁড়াল। প্রতীক বুঝলেন ওদের এই দাঁড়িয়ে পড়ার কারণটা। ওরা চেনে তাঁকে, একজন কড়া পুলিশ অফিসার হিসেবে জানে। তিনি যে অনির্দিষ্টকালের জন্য সেই পরিচিতি খুইয়ে এসেছেন কয়েক ঘণ্টা আগে, সে খবর বোধহয় ওদের কান অবধি পৌঁছয়নি এখনও।

“ক্লাবে মিটিং ছিল স্যার। এবার টুর্নামেন্ট এগিয়ে আসছে তো, তাই শ্যামলকাকা ডেকেছিলেন,” ধীমান বলল।

বলার প্রয়োজন ছিল না, কারণ প্রতীক প্রশ্ন করেননি। সম্ভবত তাঁর চাহনিতে প্রশ্নটা পড়ে নিয়েছে ওরা। সাসপেন্ডেড এসআই প্রতীক সেন আর দাঁড়ালেন না, বুটের শব্দ তুলে প্রায়ান্ধকার গলির দিকে এগিয়ে গেলেন। অনেকদিন আগে একটি সিনেমায় একটি সংলাপ ব্যবহৃত হয়েছিল। প্রতীকের ওই সিনেমাটা শুধু ওই একটি ডায়ালগের জন্যই ভালো লাগে। এই মুহূর্তে সেই সংলাপটাও প্রতীকের কানে বাজছে— ‘‘ওয়ান্স আ পুলিশম্যান, অলওয়েজ আ পুলিশম্যান!”

৪১

মাঠে আজ প্রভাতী সংঘের ছেলেদের মধ্যে বাড়তি উদ্যম। গতকাল রাতে মিটিংয়ে শ্যামলেন্দু নস্কর জানিয়ে দিয়েছেন আর মাত্র দশদিন। তারপরেই ফ্রেন্ডশিপ কাপের খেলা। মালদা জেলা তো বটেই, গোটা উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবল প্রতিযোগিতা। সারা বছর রাজা, জয়, ধীমান, ইসমাইল, রিয়াজুল, অশ্বিনরা দিন গুনতে থাকে এই টুর্নামেন্টটার জন্য। আর এবার সেই খেলা হচ্ছে ওদের পাড়ায়। শ্যামলকাকা ঘোষণা করেছেন, এবার প্রভাতী সংঘের জার্সি হবে নতুন ডিজাইনের। এমনকী ফ্রেন্ডশিপ কাপের পুরোনো ট্রফির বদলে আসবে নতুন ট্রফি।

প্র্যাকটিসে প্রত্যেকেই জান লড়িয়ে দিচ্ছে আজ। সৌভিক অসাধারণ দুটো গোল করল, অশ্বিনও জাত চেনাল বেশ কয়েকবার। রণজয়স্যার শরীর খারাপের জন্য গতকাল মাঠে আসেননি, কিন্তু আজ মাঠময় তাঁর ছুটে বেড়ানো, এক্সারসাইজ করা, বল রিসিভ করা সবকিছু ওদের মধ্যে যেন একটা আলাদা শক্তির তরঙ্গ বইয়ে দিচ্ছে। স্যার আজ অশ্বিনের পিছনে বাড়তি সময় দিচ্ছেন। বিপদ বুঝে কীভাবে দ্রুত গোল থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারের পা থেকে বল ছিনিয়ে নিতে হবে, বারবার সেটাই প্র্যাকটিস করাচ্ছেন।

মাঠের ধারে বসে পল্টু সব দেখছিল। ইসমাইল ছেলেটা দুর্দান্ত ফর্মে আছে, কিন্তু ভালো খেলার পাশাপাশি ভীষণ ফাউল করার অভ্যেস আছে ওর। স্যার বারবার ওকে গিয়ে সাবধান করছেন। বড় টুর্নামেন্ট, তাই নিয়মকানুনও বেশ কড়া। ফার্স্ট ডিভিশন লিগের ম্যাচ খেলানো রেফারিরা নাকি আসবেন ম্যাচ পরিচালনা করতে। বেমক্কা ফাউল করলে তাঁদের চোখ এড়াবে না। ইসমাইলের মতো চাবুক স্ট্রাইকার কার্ড দেখে মাঠের বাইরে চলে গেলে বিপদ।

দীপেশের মুখে সেসব শুনতে শুনতে পল্টু চলে যাচ্ছিল বিরামপুরে। না, কোনো রেফারির পরিচালনায় সে কোনোদিন খেলেনি। কিন্তু মারামারির শিকার সেও হয়েছে। পল্টু বুঝতে পারছিল ঘাসের উপর জড়ো করা ওর পা দুটো কথা বলে উঠতে চাইছে। রাজাদাদের সঙ্গে প্র্যাকটিস সে করে বটে কিন্তু এরকম একটা টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগও যদি সে পেত। ওর খেলা দেখে স্যার প্রশংসা করেছেন, কিন্তু বাইরের ছেলে হয়ে এভাবে প্রভাতী সংঘের টিমে ঢুকে পড়া সম্ভব নয়। পল্টু বোঝে সেটা।

তবে টুর্নামেন্ট আর মাত্র দশ দিন বাদে, এটা শুনে সে খুব খুশি। জুনের ষোলো তারিখের আগে স্কুল খুলবে না, আর তিন দিনের টুর্নামেন্ট জুনের এক তারিখ শুরু হলেও সে দিব্যি খেলা দেখে কলকাতায় ফিরতে পারবে।

পল্টু দেখছিল মাঠের ব্যস্ততা থেমেছে। স্যার সকলকে মাঝখানে ডেকে নিয়েছেন। তাঁকে ঘিরে সকলে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পল্টুও দৌড়ে গেল সেদিকে। স্যার প্লেয়ারদের চাঙ্গা করছেন নানা রকম কথা বলে। পল্টু জানে একে পেপ টক বলে। সেও শুনতে শুনতে তেতে উঠছিল।

ছোট্ট ভাষণের শেষে স্যার বললেন, “নিজেদের মধ্যে খেলার আজই লাস্ট দিন ছিল। কাল থেকে স্পেশাল ট্রেনিং। রাত জেগে ফেসবুক করা বন্ধ। প্র্যাকটিসে কাউকে ঝিমোতে দেখলে স্ট্রেট বের করে দেবো। আর সবাইকে বলছি; কে কোথায় কিসের নেশা করছিস আমি সব জানি। প্র্যাকটিসে যদি তার এফেক্ট হয়, এবারের মতো আউট। তখন কিন্তু গতবারের মতো বাড়ি গিয়ে কান্নাকাটি করলে শুনবো না। তাই এখনও সময় আছে, বন্ধ কর। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের উপর চাপ বেশি, মনে রাখতে হবে সবাইকে। আমরা যেমন জিততে নামবো, বিপক্ষও আমাদের হারাতে নামবে। তারা কিন্তু আমাদের ওয়াচ করবে। আমাদের গেম, স্ট্র্যাটেজি সব নোট করবে। তাই আমাদের নিখুঁত হতে হবে। আমি অ্যাগ্রেসন চাই। নেশাখোর চাই না। লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম।”

স্যার কারোর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলেননি, কিন্তু পল্টু লক্ষ করল জয়দা আর ধীমানদা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

স্যার চলে গেলেন। ওঁর বাড়ির দিকে থাকে জামশেদ আর রজত। তারাও তাঁর পিছন পিছন চলল। বাকিরা এগোতে লাগল মাঠের ধারের ফুটপাথ ধরে বিদ্রোহীর মোড়ের দিকে। গত পরশুর কালবৈশাখীর পরে গতকাল একটু ঠান্ডা ভাব ছিল। আজ আবার অসহ্য গুমোট। ওদের জার্সিগুলো ঘামে ভিজে গায়ের সঙ্গে একেবারে সেঁটে রয়েছে। পল্টু দেখল একটু আগে মাথা হেঁট করে দাঁড়ানো ধীমানদা এখন আবার ইয়ার্কি মারছে। সে পিঠের ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে রিয়াজুলকে কিছু দেখানোর চেষ্টা করছে কিন্তু রিয়াজুল হাত নেড়ে বোঝাচ্ছে সে দেখতে চায় না। ফুটপাথের উপরেই একটা টিউবওয়েল আছে। সেখানে জার্সি ধুতে গিয়ে ইসমাইল একটু পিছিয়ে পড়েছিল। এবার সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল রিয়াজুল আর ধীমানের মাঝে।

“কেন বে ওকে দেখাচ্ছিস ওসব? ও দেখতে চেয়েছে? তোর মাল তোর কাছে রাখ বাল, বুঝলি,” আঙুল তুলে ধীমানকে শাসিয়ে দিল ইসমাইল।

“এত খার খাচ্ছিস কেন? তোকে দেখিয়েছি?” ধীমান পালটা প্রশ্ন করল।

“ওকেও দেখাবি না, বললাম তো। আমাদের দেখাবি না এসব। তোরা দেখ,” বলে ধীমানের বুকে একটা আলতো ঠেলা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে রিয়াজুলকে প্রায় আগলে নিয়ে রাঙাভিটার দিকে চলে গেল ইসমাইল।

ধীমান কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল সেদিকে চেয়ে। জয় এসে ওর কাঁধে হাত রাখতেই ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল, “কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে গাণ্ডুগুলো আজকাল! দেখলি, কীরকম করে রিয়াজকে নিয়ে চলে গেল? ওর বাপ যেন! এতদিন তো নতুন পানু দে, নতুন পানু দে করে মাথা চাটতো, এখন এমন ভাব করছে যেন ও জিনিস চোখে দেখাও পাপ! আজব বিটকেল মাল মাইরি!”

রাজা আর দীপেশের সঙ্গে যখন বাড়িতে ঢুকছে, পল্টু আবিষ্কার করল মেসোমশাইয়ের স্টাডির বাইরে এক জোড়া ভারি বুট। কেউ এসেছে। আসবে যে, সেটা পল্টু গতকাল সন্ধে থেকেই অনুমান করতে পেরেছে। একদম গেটের সামনেই একটা ঘর আছে। একজন লোককে ডেকে মাসিমা কাল রাত সাড়ে দশটা অবধি সেটা পরিষ্কার করিয়েছেন।

রোজকারের নিয়ম মতো বাগানের কলতলায় হাত-পা ধুয়ে ওরা তিনজন দোতলায় চলে যাচ্ছিল, কিন্তু মেসোমশাই রাজাদাকে ডাকলেন। সঙ্গে একটা “তোরাও আয়” যোগ করে দিলেন।

স্টাডিতে মেসোমশাইয়ের সঙ্গে রয়েছেন বেশ বড়সড়, শক্তপোক্ত চেহারার একজন মানুষ। তাঁর এক হাতে চায়ের কাপ। তিনি কাপ টেবিলের উপরে নামিয়ে রেখে ওদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন হ্যান্ডশেকের জন্য।

“আমার এক পুরোনো বন্ধুর ভাই ইনি। আজ থেকে কিছুদিন আমাদের বাড়িতেই থাকবেন। এখানে একটা কাজে এসেছেন। তোমরা যে ঘরে রোজ নাচানাচি করছো, ডাবলু ডাবলু ই করছো তার ঠিকে নিচেই কিন্তু ওঁর ঘর। কাজেই দেখবে ওঁর যেন ডিস্টার্ব না হয়,” মেসোমশাই বললেন।

ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করায় ওরা নিজেদের নাম বলল। দীপেশটা বেশি পাকা, সে পালটা বলে বসল, “আঙ্কেল, আপনার নাম?”

“ওঁর নাম— ওঁর নাম…”

“আই অ্যাম শঙ্কর শর্মা। তোমরা আমাকে শঙ্কুকাকু বলতে পারো,” ভদ্রলোক একটু হিন্দি টানে বাংলায় বললেন।

ওরা তিনজন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

প্রবুদ্ধ সরকার একটা হাঁফ ছেড়ে লজ্জা মেশানো চাহনি দিলেন তাঁর নতুন অতিথির দিকে। বললেন, “এক্সট্রিমলি সরি। মানে এত দ্রুত সব হল যে নামটা এখনও মেমোরিতে ঠিক রেজিস্টার করেনি।”

অতিথি তার হাতটা সামান্য তুলে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন… কোনো ব্যাপার না, ঠিক আছে।

ঘরে ফিরেই ঘামা জার্সি, প্যান্ট ধুয়ে লাগোয়া বারান্দায় দড়িতে মেলে দিচ্ছিল পল্টু। মেসোমশাইয়ের গলা শুনে রেলিং দিয়ে গলা বাড়াল। দেখল, মেসোমশাই বাড়ির গেটের সামনে অতনুদাকে শঙ্কর শর্মার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলছেন, “রাত্রে মেন গেটে তো তুমিই তালা দিতে এতদিন! আজ থেকে আর দিতে হবে না। এঁর বাইরে বাইরে কাজ, ফিরতে রাত হবে। উনিই তালা দিয়ে দেবেন। একটা ডুপ্লিকেট চাবি করিয়ে আনো বাজার থেকে।”

৪২

সংবাদপত্রের অফিস থেকে সন্ধেবেলা যখন বেরোচ্ছিলেন রবিউল আলম, তাঁর হাঁটাচলার মধ্যে একটা ব্যস্ততা লক্ষ করছিলেন সহকর্মীরা। আজ বিকেল থেকেই এক ব্যক্তি এসে বসেছিলেন সম্পাদক রবিউলের কেবিনে। এই ব্যক্তিকেই ইদানীং বেশ ঘনঘন আসতে দেখছে সকলে। তাদের দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় মাঝে মাঝেই বড় বড় মানুষদের লেখা ছাপা হয়। এদের অধিকাংশই সম্পাদক সাহেবের ব্যক্তিগত পরিচিতির বৃত্তের মানুষ আর তাই তাঁরা তাদের সৌজন্য সংখ্যাটা নিতে এসে আলমের কেবিনে আমন্ত্রণ পেয়ে থাকেন। কিন্তু তাঁদের চেহারার মধ্যে একটা এমন ছাপ আছে যা এই ব্যক্তির মধ্যে দেখতে পান না অনেকেই।

অফিসের নিচেই একটা গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। আলম তাঁর অতিথিকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ড্রাইভারকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সেই গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। মালিক বেরিয়ে আসছে দেখে ড্রাইভারটি রাস্তার উলটোদিকের চায়ের দোকান থেকে দ্রুত চলে এসেছিল কিন্তু মালিকের আচরণে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

আলম আজ একটু উদ্বিগ্ন । তার কারণ আছে। তিনি খবর পেয়েছেন সঞ্জয়শেখরের শেষ ছবির প্রোডাকশন টিমের এক মহিলা সদস্যকে গতকাল এনএটিসি’র এক অফিসার জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন দক্ষিণ কলকাতার একটি রেস্তোরাঁয়। আলম জানতে চান কতটুকু সে বলেছে সেই অফিসারকে।

তার পাশের সিটেই পাথরের মতো বসে আছে যে ব্যক্তি, উদ্বিগ্ন সেও। তবে তার অভিব্যক্তিতে তা প্রকাশ পাচ্ছে না। প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে; এই জায়গায় এসে আসল লক্ষ্যটা ভ্রষ্ট হয়, এমন কোনো কিছু করা চলবে না। মেয়েটি কতটুকু বলেছে সেটা জানা দরকার যাতে প্রয়োজনে এখনও আসল অপারেশনের নীল নকশায় প্রয়োজনীয় রদবদল করে ফেলা যায়।

আসল কাজের সময় যে এগিয়ে আসছে তা সেই ব্যক্তিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে খবর চলে গেছে পটুয়াটোলা লেনের সস্তার হোটেলের দুটি ঘরেও। এখন শুধু অন্তিম নির্দেশ অনুসারে কাজটা সেরে ফেলা।

গাড়ি কিছুটা এগোনোর পরে আলম তার সঙ্গীর উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন, “এতবার আপনাকে বললাম, শুনলেন না। শহরে আমার একটা অন্য পরিচিতি আছে। এরকম একটা কাজে আমাকে নিয়ে যাওয়াটা কী ঠিক হচ্ছে? মানে, পরে জানাজানি হলে তো…”

পাশে বসা ব্যক্তি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল আলমের দিকে। তাঁর মনে হল সারা শরীর জুড়ে একটা বরফঠান্ডা কোনো প্রাণী যেন খেলা করে চলে গেল। ব্যক্তি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনিই তো যাবেন। আয়েশা সুলতানা আপনার বন্ধু। ফিল্মমেকার হিসেবে তাকে প্রথম ব্রেক দিয়েছিলেন। সে মানুষটা মারা গেল। একবার সমবেদনা জানাতে যাবেন না?”

আলমের মুখে এই কথার কোনো জবাব জোগাল না। তিনি অসহায়ের মতো সামনে তাকালেন। গাড়ি বড় রাস্তায় পড়েছে। উলটোদিক থেকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসা গাড়িগুলোর হেডলাইট এক এক মুহূর্তের জন্য তাঁর সঙ্গীটির ইস্পাত কঠিন মুখাবয়বটি স্পষ্ট করে দিয়ে চলে যাচ্ছে। আলম জানেন তার উদ্দেশ্য। কিন্তু আজ যার বাড়িতে যাচ্ছেন, সেই মহিলাটির সঙ্গে কী হতে পারে তা তিনি আন্দাজ করতে পারছেন না।

উদ্বেগের মুহূর্তে চোখ বুজে নেওয়া আলমের অভ্যেস। আজও অভ্যেস অনুযায়ীই কাজ করলেন তিনি। সজাগ রইল তাঁর পাশের এক জোড়া চোখ। কিন্তু আলম বা তাঁর সঙ্গীটির পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে তারাও এই মুহূর্তে নজরবন্দি। কে নজর রেখেছে, কেন রেখেছে, কবে থেকে রেখেছে কিছুই জানেন না তাঁরা।

কলকাতা শহরে রাত বাড়ছে; ক্রমশ ফাঁকা হয়ে আসছে রাস্তা, উলটোদিক থেকে আসা গাড়ি সংখ্যা কমছে। এগিয়ে চলেছে আলমের সঙ্গীর গাড়িটি এবং…

ঝিমুনি এসে গিয়েছিল আলমের, ঝটকা লাগল পাঞ্জাবির পকেটে মোবাইল বেজে ওঠায়। স্ক্রিনে কলারের নামটা দেখামাত্রই আলমের ঠোঁটের গোড়ায় খিস্তি এসে গেল। বালের নিউজ এডিটর হয়েছে শালা! একটা সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না। প্রতিদিন তার কোনো না কোনো খবর লেট সিটি এডিশনে ঢোকানো না ঢোকানো নিয়ে মনে সংশয় দেখা দেয় আর ফলে একটা বিরক্তিকর কল আলমকে রিসিভ করতে হয়।

আজও প্রবল বিরক্তি ফুটে উঠছিল আলমের অভিব্যক্তিতে, “হ্যাঁ বলো রাজর্ষি” বলার সময়। কিন্তু অন্যদিনের চেয়ে সেই বিরক্তি উধাও হল দ্রুত। বদলে সেখানে মাথাচাড়া দিল উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা। পাশে বসা সঙ্গীটির দৃষ্টি এড়াল না কিছুই। আলমের সারা শরীর যেন কেমন করছে। মাথার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানা ও চিত্র পরিচালক সঞ্জয়শেখরের হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার তুলে দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল অ্যান্টি টেররিস্ট সেলের হাতে। রাজর্ষি জানতে চাইছে লেট সিটির পেজ ওয়ানে খবরটা যাবে কিনা!

এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন সম্পাদক রবিউল আলম। কী করা উচিত? সদ্য সদ্য স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তারপরেও কি অবস্থান সামান্য পালটানো উচিত নয়? ঘন ঘন কপালে হাত ঘষছিলেন আলম। ওদিকে রাজর্ষি “আলমদা শুনতে পাচ্ছেন, আলমদা ক্যান ইউ হিয়ার মি” করে যাচ্ছে।

একটা দম নিলেন রবিউল আলম। তারপর বললেন, “নিয়ে নাও, কিন্তু কোনো হাইলাইট করবে না। জাস্ট স্নিপেট একটা। এর বেশি নয়।”

সেই মুহূর্তে নয়ডা সেক্টর ২৪-এ এনএটিসি’র সদর দফতর থেকে একরাশ স্বস্তি নিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন ডিআইজি সুভাষ গোয়েল। যেনতেন প্রকারেণ আজই যাতে হোম মিনিস্ট্রি থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা এসে যায় তার জন্য ভীষণভাবে তদবির করেছিলেন তিনি। ঘণ্টা দেড়েক হল সেই নির্দেশিকা এসেছে। তাই দিনের শেষে তাঁর এই স্বস্তি। বহু যুদ্ধের সৈনিক গোয়েল জানেন এটা আদৌ উচ্ছ্বাস প্রকাশের সময় নয়, বরং একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে সামনের বৃহত্তর লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে এখন এনএটিসিকে। তবু এই অভিনেত্রীর হত্যার নেপথ্যে দ্রুত পৌঁছনোর রাস্তাটা তো খুলল। গোয়েল জানেন কেসটা যে হাতে নিয়েছে তার মাথায় গোটা জিনিসটা ছকা আছে এবং এই মুহূর্তে সে পৌঁছেও গেছে এমন জায়গায় যেখান থেকে হয়তো অবিশ্বাস্যভাবে কোনো সূত্র বেরিয়ে আসবে।

অফিসের বাইরে এসে গাড়িতে উঠেই খবরটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনার জন্য মোবাইলের কল লগে আঙুল রাখলেন গোয়েল। বেছে নিলেন ‘হক’কে।

“হোয়াট নেক্সট হক?” আবেগ, উত্তেজনাহীন যান্ত্রিক শীতল প্রশ্ন এসে ধাক্কা দিল হকের কানে।

“স্কেচগুলো এবার প্রকাশ করে দেওয়ার সময় হয়েছে। দ্যাট ইজ দ্য নেক্সট স্টেপ। ধর্মেন্দ্র আর সুনীলকে অলরেডি বলেছি প্রোব এক্সপেডাইট করতে। কাল সকালেই তারা কাজে নেমে পড়বে পুরোদমে,” হক ইংরিজিতে জবাব দিল।

“মেক ইট ফাস্ট”— গোয়েল নির্দেশ দিয়ে ফোন ছাড়লেন।

তাঁর পরবর্তী কল গেল অন্য ঠিকানায়। বাংলাদেশে ধৃত রিবাতের সক্রিয় সদস্য শাফাকতের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ার কাজটাকে ত্বরান্বিত করা দরকার এবারে। একটি বিস্ফোরণ, দুটি হত্যা এবং দুটি অস্ত্র— ভাবলে বিচ্ছিন্ন মনে হলেও তদন্ত বলছে তিনটি ঘটনাই একটি অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। তবে অদৃশ্য হলেও আঙুল চালালে সে সুতোর স্পর্শ অনুভব করা যাচ্ছে। আর দেরি নয়।

৪৩

ফোন পকেটে পুরে বিদ্রোহীর মোড় থেকে বাঁ দিকে ঘুরে হেঁটে যাচ্ছিল হক। তার কপালে গভীর খাঁজ এই মুহূর্তে। একটা স্বস্তির খবর আসে তো সঙ্গে নিয়ে আসে কিছুটা হতাশা। এখানে এসেই সে সূত্র মারফত খবর পেয়েছে, যে এসআইয়ের নেতৃত্বে অস্ত্র উদ্ধারের অপারেশনটা হয়েছিল, তাঁকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে গতকাল। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

গতকাল কাগজে খবরটা পড়েই তার দ্রুত মালদায় আসার পিছনে অন্যতম কারণ ছিল ওই এসআইয়ের মনোভাব বোঝা। এনএটিসি যতই শক্তিশালী হোক, অচেনা জায়গা, তাও মফস্বলের গলিঘুঁজি, বনবাদাড়ে কাজ করতে গেলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের একটু সাহায্য তাদের লাগবেই। যে অফিসার এরকম দুঃসাহসিক অপারেশনে নামতে পারেন, তাও সুন্দর পরিকল্পনা সাজিয়ে, তাঁর উপরে হয়তো একটু নির্ভর করা যেত। কাগজেই হক পড়ে নিয়েছিল যেখান থেকে অস্ত্রগুলো উদ্ধার হয় সেটা ছিল স্থানীয় বিধায়কের দখল করা একটি জমি। সুতরাং এসআইয়ের সাসপেন্ড হওয়ার একটা স্পষ্ট কারণ অনুমান করাই যাচ্ছে। মোবাইলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটেও বিভিন্ন বৈদ্যুতিন মাধ্যমের অফিসিয়াল পেজে প্রশ্ন উঠেছে এই সিদ্ধান্তকে নিয়ে।

হাঁটতে হাঁটতে থানা পেরিয়ে গেল হক। যার মাধ্যমে এখানে তার আসা, সেই ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় তাকে অপেক্ষা করতে বলেছে। জায়গাটা চিনে নিতে হকের বিশেষ অসুবিধে হল না। সেই ব্যক্তিও এসে পড়ল সময়ের মধ্যেই।

“কোনো আপডেট? সন্দেহজনক কিছু কি তোমার চোখে পড়েছে কিছুদিনের মধ্যে?” হক প্রশ্ন করল তাকে।

“চাপা ক্রাইমের গন্ধ লেগে আছে অনেক ঘটনাতেই, কিন্তু আমাদের মাথা গলাতে হবে, সেরকম কিছু এখনও নজরে পড়েনি স্যার।”

“যে পুলিশ অফিসার সাসপেন্ড হয়েছেন তাঁকে চেনো?”

“মুখ চিনি, আলাপ নেই।”

“কোথায় থাকেন?”

“কাছেই।”

“ডিটেইল দাও। ধরতে হবে, কথা বলতে হবে। এরিয়ার একটা পিকচার পেতে হবে,” হক নির্দেশের সুরে বলল। একটি পেনড্রাইভ দ্বিতীয় ব্যক্তির হাতে দিল সে। তার মধ্যে আছে কিছু ডকুমেন্ট যেগুলির কালার প্রিন্ট-আউট নিতে হবে।

দ্বিতীয় ব্যক্তি চলে গেল। বেশিক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলা তাদের সিস্টেমের মধ্যে পড়ে না। হকও তার অস্থায়ী বাসস্থানের দিকে পা বাড়াল। পথে পড়ল একটা চা আর খাবারের দোকান। সেখানে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে এক কাপ চায়ের সঙ্গে সে গিলে নিল কিছু টাটকা খবর। হকের খিদে ছিল না, কিন্তু দোকানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। দু-তিনজন খদ্দের নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। এসআইয়ের সাসপেনশনই সেই আলোচনার প্রধান বিষয়, তবে কথায় কথায় জড়িয়ে পেঁচিয়ে চলে আসছিল এলাকার দুই প্রধান রাজনীতিবিদের রেষারেষির প্রসঙ্গ।

চা শেষ করে হক ফিরছিল। তার সামনে এই মুহূর্তে বিদ্রোহীর মোড়। সেখান থেকে রাস্তা চলে গেছে চার দিকে। তার অস্থায়ী বাসার পথ সে জানে, কিন্তু তার কোভার্ট অপারেশন এবার কোন রাস্তা ধরবে? উত্তর পাচ্ছিল না হক। অনেক ভাবনাচিন্তা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল এনএটিসি’র সফলতম আন্ডারকভার এজেন্টের মাথার ভিতরে। কিন্তু চিন্তা বাধাপ্রাপ্ত হল মোবাইলের নোটিফিকেশনের শব্দে। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ। বার্তাটি হল— ‘আপনার ঘরে টেলিভিশন লেগে গেছে, কেবল কানেকশন হয়ে গেছে!’

অবসন্ন পদক্ষেপে বাড়ি ফিরছিলেন প্রতীক সেন। যত এগোচ্ছেন ততই তাঁর পায়ের গতি কমে আসছে। গতকাল রাত্রে খবরটা পেয়েই তাঁর স্ত্রী জানিয়েছিলেন তিনি আসছেন। আলিপুরদুয়ারে ব্যাঙ্ককর্মী তিনি। ঘণ্টা খানেক আগে তিনি জানিয়েছেন এসে পৌঁছনোর কথা। প্রতীক জানেন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ছিটেফোঁটাও তাঁর স্ত্রী অন্তরা বিশ্বাস করেননি, তবু যেন তাঁর মুখোমুখি হতে হবে আর কয়েক মুহূর্ত পরে, এই ভাবনা তাঁর পা টেনে ধরছে। কীভাবে মুখ দেখাবেন তিনি স্ত্রীকে? মানুষের পরিচয় সমাজ কখন, কীভাবে পালটে দেয়, কেউ বলতে পারে না। তকমা এঁটে দিতে লাগে এক মুহূর্ত, লেগে যাওয়া তকমা তুলতে হয়তো জীবন চলে যায়।

মাথা উঁচু করে, বুক চিতিয়ে হাঁটাই তাঁর অভ্যেস, কিন্তু শরীরটা যেন ঝুঁকে যেতে চাইছে আজ। প্রতি মুহূর্তে মনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতীক সেন।

চব্বিশ ঘণ্টা আগেও যারা তাঁর সহকর্মী ছিল, লড়েছিল তাঁর নেতৃত্বে, তারা লুকিয়ে খোঁজ নিয়েছে, ভরসা জুগিয়েছে। আপাতত এটুকুই প্রতীকের কাছে লড়াই করার অক্সিজেন।

তাঁর চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল এসপি যতীন্দ্র দুবের গতকাল সন্ধেবেলার মুখটা। প্রতীক বুঝতে পেরেছিলেন দুবে’র অসহায়তাটা। কিন্তু তিনি দায় ঝেড়ে ফেলে আপাতত স্বস্তিতে, যদিও সংবাদমাধ্যম অস্বস্তি তৈরি করে চলেছে অন্যভাবে।

হাঁটতে হাঁটতে মোড় ঘুরেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন প্রতীক। সামান্য দূরত্বে দাঁড়িয়ে যে মেয়েটি তাঁর দিকে চেয়ে আছে, তাকে তিনি খুব ভালো করে চেনেন। বড্ড অপ্রস্তুত বোধ করছেন প্রতীক এই মুহূর্তে, বুঝতে পারছেন না কী করবেন! না চেনার ভান করে মেয়েটিকে এড়িয়ে চলে যাবেন, নাকি কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব করে তার সঙ্গে দুটো কথা বলবেন? এলাকাবাসী হয়ে প্রতীকের দণ্ডপ্রাপ্তির খবর সে রাখে না, তা হতে পারে না।

মেয়েটিই এগিয়ে এল। না, তার অভিব্যক্তিতে প্রতীক কোনো ঘৃণা দেখছেন না। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন তিনি, “কী খবর সুমনা, অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি কতদূর?” প্রশ্ন করলেন প্রতীক।

সুমনা আরো একটু এগিয়ে এল তাঁর দিকে। রাস্তার অল্প তেজের আলোয় তার অ্যাসিডে পোড়া ক্ষতবিক্ষত মুখটা আরো বীভৎস দেখাচ্ছে। কিন্তু তার চাহনিতে যেন একটা প্রতিবাদ ফুটে উঠছে।

“আমি বিশ্বাস করি না স্যার। যে যা বলুক; যাই রটাক, আমি বিশ্বাস করি না। আমার চোখে, আমার বাবা-মা’র চোখে আপনি যা ছিলেন তাই থাকবেন,” বলে সুমনা তাঁকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

দিনের শেষের প্রাপ্তিটুকু সর্বহারা ভিখিরির মতো কুড়িয়ে নিয়ে ঝোলায় ভরে গতি বাড়ালেন সাসপেন্ডেড এসআই প্রতীক সেন।

৪৪

পটুয়াটোলা লেনের হোটেলের ঘরে তিনজন রাতের খাবার নিয়ে বসেছিল। কিন্তু মুখের গ্রাস আটকে রইল মুখেই। সামনে লো ভলিউমে টিভি চলছে। কমান্ডার ইন চিফের নির্দেশ, যতক্ষণ ঘরে থাকা, খবরের উপরে নজর রাখতে হবে। সেই খবরের চ্যানেলেই এই মুহূর্তে দেখাচ্ছে একটি চাঞ্চল্যকর ব্যাপার। স্ক্রিনে ফুটে উঠছে তিনটি পেনসিল স্কেচ, উপরে ফ্ল্যাশ করছে— ‘সন্দেহভাজনদের স্কেচ’, আর সঞ্চালিকা একনাগাড়ে বলে চলেছেন, সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তির স্কেচ আজ প্রকাশ করল এনএটিসি। অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানার হত্যার তদন্তভার হাতে পাওয়ার পরেই শুরু এনএটিসি’র তৎপরতা। এই তিন ব্যক্তি সম্প্রতি বসিরহাটের ঘোজাডাঙা-ভোমরা সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবাংলায় ঢুকেছে বলে এনএটিসি সূত্রে খবর… এ রাজ্যে কোনো বড় ধরনের নাশকতামুলক কার্যকলাপের পরিকল্পনার জন্যই তারা এসেছে, এমনটাই কিন্তু মনে করা হচ্ছে… এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় খবর, অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানার হত্যার তদন্তভার হাতে নেওয়ার পরেই এনএটিসি’র তরফে শুরু হল তৎপরতা…

তিনজন একে অপরের দিকে চাইল। প্রত্যক্ষদর্শীর দেওয়া বয়ানের ভিত্তিতে আঁকা এই স্কেচ কখনোই নিখুঁত হয় না, কিন্তু এক্ষেত্রে ছবিগুলো ভীষণই কাছাকাছি গেছে। যে তিনজনের স্কেচ সামনে এসেছে তাদের একজন এই মুহূর্তে এই ঘরে নেই। বাকি দুজন একটু উদ্বিগ্ন বোধ করতে লাগল। সে রাতে সংগ্রামপুরে থেকেই পরদিন ভোরে তারা কলকাতা চলে আসে। ওইটুকু সময়ের মধ্যেই তাদের নজর করে ফেলল কে বা কারা? তারা চলে আসার পরেই কলকাতা পুলিশের এসটিএফ রেইড করেছিল ওখানে। আর ঘণ্টাখানেক দেরি হলেই সব হিসেব গোলমাল হয়ে যেত। কিন্তু তিনজন ব্যক্তি এসেছে এই খবর দেওয়া আর তাদের স্পষ্ট স্কেচ তৈরি করে ফেলা এক জিনিস নয়।

তবে কি গেমপ্ল্যান বদলাতে হবে? আর তো বেশি দূরে নয় সেই তারিখ। এখন কি আবার সবকিছু নতুন করে সাজানোর সময় আছে?

ঘরের তৃতীয় ব্যক্তি কিঞ্চিৎ স্বস্তিতে কারণ সে সীমান্ত পেরিয়ে এসেছিল কিছুদিন আগে এবং একা আসার ফলে সে কারোর চোখে সন্দেহভাজন হয়নি। তার নাম কাসেম। সে খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়ল। হাত ধুয়ে মোবাইল তুলে নিয়ে সামসেরকে ধরল। সে এখন কোথায় আছে জানা দরকার, তাকে সতর্ক করে দেওয়া দরকার।

অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানার শেষ ছবির প্রোডাকশন ইউনিটের সদস্যা সঞ্চিতা পালের ঘরে বেজে উঠল ফোন। কলারের নাম দেখে সামসেরের কপালে ভাঁজ পড়ল। গুরুতর কিছু না ঘটলে এ সময়ে এই নম্বরে ফোন আসার কথা নয় কাসেমের তরফ থেকে। সোফা ছেড়ে উঠল সামসের। মোবাইল হাতে একটু দূরে সরে গেল।

রাত ১১.৪৪: কলকাতা পুলিশের এসটিএফ প্রধান সৌম্যজিত বটব্যাল তখনও তাঁর চেয়ারে। সামনে রাখা ভারি রিসিভার বিশ্রী শব্দে বেজে উঠল। রিসিভার তুলে ওপারের বক্তার কথা শুনতে শুনতে বটব্যালের কপালেও ভাঁজ পড়ছিল। সে যা বলছে তা যদি সত্যি হয়, তাহলে ব্যাপার গুরুতর।

এক মিনিটের কথোপকথন; মেদহীন বার্তা!

“কিপ আ ওয়াচ। উইল ডিসকাস টুমরো, ফার্স্ট আওয়ার” বলে বটব্যাল রিসিভার নামালেন।

সামনেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। বিরোধী দলগুলি, বিশেষত বাড়ন্ত বাচ্চা ভারত সেবক সমানে আস্ফালন করে চলেছে। তাদের কাছে নাকি শাসকদলের কিছু নেতা ও ঘনিষ্ঠদের নাশকতামূলক ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার ও মদত দেওয়ার প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে এবং উপযুক্ত সময়ে তা তারা সামনে আনবে। উপরে উপরে সে সব হুমকিকে অবহেলা করলেও প্রশাসন কিন্তু সতর্ক হয়েছে। এসটিএফের কাছে টাটকা নির্দেশ এসেছে; সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের উপরে নজরদারি বাড়াতে হবে। সেই অনুযায়ী ‘সময়ের চাকা’ সংবাদপত্রের সম্পাদক রবিউল আলমের উপর বিশেষ নজর রাখছে দফতর। একটু আগেই যে ফোনটা এল, সেটা করেছিলেন দফতরের এক দক্ষ কর্মী। তিনি জানিয়েছেন কিছুক্ষণ আগে সংবাদমাধ্যমগুলোতে এনএটিসি’র তরফ থেকে প্রকাশ করা যে তিনটি স্কেচ দেখানো হচ্ছিল, তার একটির সঙ্গে বেশ মিলে যায়, এমন চেহারার এক ব্যক্তিকে ইদানীং রবিউলের অফিসে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। এমনকী আজ সন্ধেতেও তার গাড়িতে চড়ে রবিউল গিয়েছিলেন দক্ষিণ কলকাতার একটি অঞ্চলে। ফিরে আসেন সাড়ে নটা নাগাদ। কলার আগাগোড়া তাদের অনুসরণ করেছেন।

কবজি ঘুরিয়ে ঘড়ি দেখলেন বটব্যাল। এবার বেরোতে হবে। কিন্তু চেয়ারটা যেন টেনে ধরছে তাঁকে। একটু আগেও ক্লান্ত বোধ করছিলেন তিনি কিন্তু ফোনটা আসার পর থেকেই তাঁর মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করছে। একটু গুরুতর কেস হলেই কখনো সিবিআই কখনো এনএটিসি চলে আসছে; ক্রেডিট নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমগুলো রয়েইছে এই সংস্থাগুলোর উপরে পুষ্পবৃষ্টি করার জন্য। যেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অফিসারেরা সব অপার্থিব সুপারহিরো! কেন, এসটিএফের ক্ষমতা কি কম? দেখিয়ে দিতে পারি আমরাও… একটা জেদ যেন মাথা তুলতে শুরু করেছে বটব্যালের মনের মধ্যে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *