২৫
বলটা আঙুল ছুঁয়ে কোনাকুনিভাবে গোলে ঢুকে যেতেই অশ্বিন শুনতে পেল একটা চিৎকার, “আরে অশ্বিন, কী সব গোল খাচ্ছিস বো…”
পুরো কথাটা সৌভিকের মুখ থেকে বেরিয়ে আসার আগেই তার পিঠে হাত রাখলেন কোচ স্যার। তাঁর মুখ থেকে শুধু ‘উহ’ করে একটা শব্দ বেরিয়ে এল। সৌভিক জিভ কাটল বটে কিন্তু তার মটকা গরম হয়ে রয়েছে।
“দেখছেন স্যার, কী করছে! টুর্নামেন্ট এগিয়ে আসছে আর ওর এই পারফরম্যান্স!’’
গোলপোস্টের পিছনের পাঁচিলের নিচের ঝোপে বলটা গিয়ে পড়েছিল। সেটা কুড়িয়ে নিতে গিয়ে সৌভিক যে গালাগালটা দিতে গিয়েও দিতে পারল না সেটাই নিজেকে দিতে ইচ্ছে করছিল অশ্বিনের। ঘেন্না হচ্ছে তার আজ নিজের উপর। প্রাণ দিয়েই খেলতো চাইছে, উড়ে আসা বলের নাগাল পেতে শরীর ছুঁড়ে দিচ্ছে হাওয়ায়, কিন্তু কোথায় যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।
আসলে তার মাথায় ঘুরছে গতকাল রাত্রে খাওয়ার সময়ে বাবার বলা কথাগুলো।
প্র্যাকটিসে বাকি সময়টা আর গোল না খেলেও সকলেই বুঝতে পারছিল অশ্বিন আজ ছন্দে নেই। যে সিচ্যুয়েশনে গোল ছেড়ে বেরিয়ে এসে বল ক্লিয়ার করে দেওয়ার কথা সেখানে পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকছে, যেখানে বল ফিস্ট করে বিপদ এড়ানোর প্রয়োজন, সেখানে গ্রিপ করার ঝুঁকি নিচ্ছে। একবার থামাতে পারলেও সৌভিককে তাই বাকি সময়ে খিস্তি দেওয়া থেকে আটকাতে পারলেন না রণজয়।
প্র্যাকটিসের শেষে বাকিরা চলে গেলেও মাঠে স্যারের সঙ্গে ছিল জয়, রাজা আর পল্টু। অশ্বিন মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ছিল, কিন্তু স্যার তাকে দাঁড়াতে বললেন। ওরা মাঠের ধারে দাঁড়িয়েছিল, স্যারের সঙ্গে সঙ্গে অশ্বিনের দিকে এগোতে লাগল।
“কী হয়েছে বল তো তোর?” অশ্বিনের কাঁধে হাত রাখলেন স্যার।
অশ্বিন কয়েক মুহূর্ত মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।
“আরে, কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে?” স্যার আর জয় একসঙ্গে প্রশ্ন করল।
অশ্বিনের গলা কান্নায় জড়িয়ে এল, “আমার টুর্নামেন্টে খেলা হবে না স্যার। বাবা কাল বলেছে আলিপুরদুয়ারে কোন বন্ধুকে আমার একটা চাকরি করে দেওয়ার জন্য বলেছে। বাবা বলছে ওখানে চলে যেতে হবে। বাবার শরীর খারাপ, কাজ নেই। ঘরে টাকাপয়সার টানাটানি। আপনি তো জানেন স্যার।”
“হ্যাঁ জানি। কিন্তু তার জন্য কান্নাকাটি করছিস কেন,” স্যার বললেন।
“এখান থেকে চলে যেতে হবে স্যার। খেলা ছেড়ে দিতে হবে। আমি পারব না স্যার। আমার পাড়া ছেড়ে আমি যাব না।”
অশ্বিন কেঁদেই চলেছে, ওরা চুপ। পল্টুর খুব খারাপ লাগছিল অশ্বিনদাকে এভাবে কাঁদতে দেখে। তারও এই মুহূর্তে বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। এখানে এসে পৌঁছনোর পরে বাবাকে জানানোর পর থেকে আর ওদের মধ্যে কথা হয়নি। কে জানে বাবা কেমন আছে!
অশ্বিন কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়েছিল। স্যারও বসলেন। ওর পিঠে হাত রেখে বললেন, “দেখ অশ্বিন, তুই বড় হয়েছিস। বাস্তবটা তো মেনে নিতে হবে। খেলাধুলো ঠিক আছে, কিন্তু সেটাই তো শেষ না জীবনের। তুই তো বুঝতে পারছিস তোর বাড়ির অবস্থা ভালো না। তোর বাবা তোকে বড় করেছে এতদিন। এখন তিনি অসুস্থ। রোজগার নেই। তোকে তো দায়িত্ব নিতেই হবে।”
অশ্বিন এই কথার কোনো জবাব দিল না। চোখ মুছল বটে কিন্তু ফোঁপাতে লাগল।
জয় আর রাজা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ওদের মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরছে। অশ্বিন যদি সত্যিই টুর্নামেন্টের আগে চলে যায় তবে তো মহাবিপদ। টিমের গোলকিপার হিসেবে যে অন্য কারোর কথা তারা ভাবতেই পারছে না। গত বছরের চ্যাম্পিয়ন তারা। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গৌরব ধরে রাখার একটা বাড়তি চাপ এমনিতেই রয়েছে ওদের উপর। আজ অশ্বিনের খেলা দেখে ওরা শিউরে উঠছিল। তবু খেলা খারাপ হলে আরো প্র্যাকটিস করে ভুলগুলো শুধরে নেওয়া যায়, কিন্তু তাই বলে অশ্বিন খেলবেই না! সর্বনাশ হবে যে তাহলে!
টিমের গোলকিপারকে শান্ত করতে দুই স্ট্রাইকার আর কোচের বেশ কিছুটা সময় লাগল। শেষে স্যার অশ্বিনকে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে ওর পিঠে হাত রেখে বললেন, “তুই বাড়ি যা অশ্বিন। আমি কথা বলবো তোর বাবার সঙ্গে। দরকারে আমরা সবাই যাবো তোর বাড়ি। ওঁকে বুঝিয়ে বলবো আমরা।
অশ্বিন ছলছলে চোখে ফিরে তাকাল কোচ স্যারের দিকে। বলল, “আমি খেলা ছেড়ে দিতে রাজি আছি স্যার, কিন্তু আমার বাড়ি, পাড়া, বন্ধুদের ছেড়ে যাবো না। কিছুতেই না।”
অন্যান্য দিনের মতো জয় আজ অশ্বিনের সঙ্গে গেল না। তার মাথায় অন্য চিন্তা ঘুরছে। ওরা স্যারের সঙ্গে মাঠের ধারের ফুটপাথ ধরে বিদ্রোহীর মোড়ের দিকে যাচ্ছিল। জয় বলল, “স্যার, একটা কথা বলবো?”
“হ্যাঁ বল না। জিজ্ঞেস করার কী আছে?”
“বলছি স্যার, অশ্বিন যদি খেলতো না পারে তাহলে কি আমি গোলে খেলব? ওর মতো পারব না কিন্তু পারব। আগে খেলেছি।”
স্যার ওর মাথায় একটা চাটি মেরে বললেন, “ধুর পাগল, খেপেছিস নাকি? তুই গোলে চলে গেলে মাঝমাঠটার কী হবে? অত চিন্তা করিস না। তুই তোর খেলায় মন দে। দমে ঘাটতি হচ্ছে আজকাল। ভাবিস না যে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। বল অবধি পৌঁছাতেই পারছিস না। বিপক্ষে কিন্তু এলাকার টিম থাকবে না, যে মেরে বেরিয়ে যাবি। নেপাল আর বাংলাদেশের টিমগুলো আগের বছর কেমন নাচিয়েছিল তোদের, ভুলে যাসনি তো? বিড়ি ফিড়ি বেশি ফুঁকছিস নাকি আজকাল?’’
জয় ঘাবড়ে গেল স্যারের এই কথায়। সত্যিই কি তার দমে ঘাটতি হচ্ছে? কিন্তু তার তো নিজের খেলায় কোনো গোলমাল মনে হয়নি!
“নিজের খেলা ইমপ্রুভ কর, অশ্বিনকে নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি ওর বাবার সঙ্গে কথা বলে দেখছি, যদি টুর্নামেন্টটা খেলতে দেয়। কিন্তু…”
“কিন্তু কী স্যার?” বাকি তিনজন একসঙ্গে প্রশ্ন করল।
স্যার যেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেছেন হঠাৎ, রাজার মনে হল। রাস্তার দিকে চেয়ে রয়েছেন, কী যেন ভাবছেন।
“কী ভাবছেন স্যার?” রাজা প্রশ্ন করল।
স্যার মাথা নেড়ে বললেন, “না মানে ভাবছি অন্য কথা। যাক গে। তোরা বাড়ি যা। রেডি হ মেন্টালি। হ্যাজার্ড তো যুদ্ধে থাকবেই। ফুটবলটাও যুদ্ধ। তাতে একজন সৈনিক দুর্বল বা আহত হলে বাকিদের বাড়তি দায়িত্ব নিতে হয়। তোদেরও নিতে হবে।”
জয়ের মনে অনেকদিন ধরে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এর আগে জিজ্ঞেস করেওছে, কিন্তু স্যার ভাসা ভাসা জবাব দিয়েছেন। আজও কি তাই দেবেন?
“স্যার, বলছি যে টুর্নামেন্ট এগিয়ে আসছে। আমাদেরকে ভিডিও দেখাবেন না? ইসমাইলরা দেখছে। আমরা তো দেখছি না। আমরা তো টেকনিক্যালি কমজোর হয়ে থাকছি স্যার। অপোনেন্ট স্ট্রং হলে আমাদেরকেও তো ট্যাকল করতে হবে। আপনি ওদের যে স্কিলগুলো শেখাচ্ছেন, সেগুলো আমরা শিখব কবে,” জয় বলল।
স্যার কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন ওর দিকে। জয় বুঝতে পারল না স্যার রেগে গেলেন কিনা। তবে পরক্ষণেই হাসি ফুটল স্যারের মুখে। তিনি বললেন, “ওদের যা শেখাচ্ছি সেটা ভাইজ্যাগের ক্যাম্পের জন্য। সেখানে অন্য লেভেলের লড়াই। ঠিক আছে। তুই বলছিস অনেকদিন ধরে। এবার তোদেরও দেখাবো। কিন্তু টুর্নামেন্টের আগে না। তোরা যা শিখেছিস, টুর্নামেন্টে তাতেই সোনা ফেলবে। এখন অন্য জিনিস রপ্ত করতে গেলে সব তালগোল পাকিয়ে যাবে। ভালো করে খেল, ট্রফিটা ধরে রাখ, তারপর নেক্সট লেভেল।”
যে যার বাড়ির দিকে হাঁটা দিল মাঠ থেকে বেরিয়ে। জয় আর ধীমান থাকে কাছাকাছি। ধীমান ঘামে ভেজা জার্সিটা খুলতে খুলতে বলল, “আজ রাতে আসছিস তো? রিয়ালের খেলা বস, একা একা জমবে না।”
ধীমানের বাবা নেই, মা খুব একটা শাসন করেন না। তাই প্রায়ই রাত্রে চুপিচুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে জয় চলে যায় ওর বাড়ি। খেলা তো দেখেই, আরো অনেক কিছুই দেখে।
জয় একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। তার মাথায় স্যারের একটু আগে বলা কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।ধীমানকে তাই প্রশ্নটা আরেকবার করতে হল।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ আসবো তো।”
“ট্যাবলেট আনবি তো?” ধীমান চোখ মারল।
জয় দাঁড়িয়ে পড়ল প্রশ্নটা শুনে।
“কী বে, কী ভাবছিস?”
জয় বলল, “ওগুলো তোকেই দিয়ে দেবো। আমি আর ওসবের মধ্যে নেই।”
“মানে,” ধীমান কোমরে হাত দিয়ে প্রতিবাদের ভঙ্গিতে দাঁড়াল।
“শুনলি না, স্যার আজ বলল দমে ঘাটতি হচ্ছে। ওগুলো তুই রাখ ভাই।”
জয় মনে মনে বলল ধীমানের যা পারফরম্যান্স যাচ্ছে তাতে ফার্স্ট ইলেভেনে এবার চান্স পাবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু জয়ের উপর অনেক দায়িত্ব। আর অশ্বিন যদি খেলতো না পারে, তাহলে আরো চাপ। লাল বড়িগুলো একটা আমেজ দেয় বটে। দিব্যি ফুরফুরে লাগে, মনে হয় এক্ষুনি একটা বাস উলটে ফেলে দিতে পারবে সে। টেবিলফ্যানের হাওয়ায় তার মনে হয় যেন জলের উপর দিয়ে উড়ে চলেছে। কিন্তু তারপর কেমন যেন ব্যথা ব্যথা করে শরীরে। পরে অবশ্য ঠিকও হয়ে যায়। কিন্তু সে জিনিস যদি ফুটবলের ক্ষতি করে, জয় তাহলে আর তা ছোঁবে না।
২৬
লকআপের লোহার গেটে শব্দ হতেই মিন্টুর ঝিমুনি উধাও হয়ে গেল। গেটটা খুলছে আর লোহার কব্জায় ক্যাঁ ক্যাঁ করে একটা শব্দ হচ্ছে। গত দু’ দিনে এই শব্দটায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে মিন্টু। শুনলেই মনে হয় ভিতরে বন্দি আসামীর হয়ে কেঁদেকেটে কিছু বলতে চাইছে গেটটা।
গেট ঠেলে ভিতরে আসছেন এসআই প্রতীক সেন। অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে এই ঘরে ঝিমোনো আর মশার কামড় খাওয়া ছাড়া কোনো কাজ নেই মিন্টুর। বৌটাও এবার আর দেখা করতে আসেনি। এসেই বা কী হবে? ঘরে তো আর কানাকড়িও নেই যে বেচে তার জামিনের টাকা জোগাড় করবে।
প্রতীক সেন এসে মিন্টুর দাড়িগোঁফওয়ালা মুখের উপর ঝুঁকলেন। তাঁর দৃষ্টি মিন্টুর সারা শরীরে একটা শিরশিরানি তৈরি করল।
“শোন মিন্টু,” প্রতীক সেন বললেন, “সেদিন যা বলেছিলি পাক্কা খবর তো? আজ রাতেই হবে?”
মিন্টু কাঁপা গলায় বলল, “পাক্কা খবর স্যার। আজ রাতেই হবে। কোথা দিয়ে আসবে, কোথায় ঢুকবে, সবই তো বলেছি।”
প্রতীক সেন মিন্টুর থুতনিটা হাতের মুঠোয় ধরে বললেন, “যা বলেছিস, যদি সত্যি হয়, এবারও যাতে জামিন পেয়ে যাস সেই ব্যবস্থা করবো। খাঁচা থেকে বেরিয়ে একদম পাখি ফুড়ুত হয়ে যাবি। এই তল্লাটে যেন আর না দেখি বেশ কিছুদিন। আর যদি তোর খবর ভুল হয়…”
মিন্টু মাথা নিচু করল। বড় বড় লোকেদের মেজাজমর্জি বোঝা শক্ত। যে প্ল্যানের কথা সে বলেছে প্রতীক সেনকে, তাতে তারও সামিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন যদি প্ল্যান বদলে যায়, তা কি তার দোষ?
“স্যার,” মিন্টু কাঁপা গলায় ডাকল। প্রতীক সেন লকআপের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঘুরে দাঁড়ালেন।
“বল।”
“স্যার, আমার বৌটার কোনো খবর জানেন?”
“বৌ! হারামজাদা, কুকম্ম করার বেলায় মনে থাকে না, এখন বৌ চো…” মুখ সামলে নিলেন প্রতীক সেন। এসব মালেদের সঙ্গে এই ভাষাতেই কথা বলতে হয়। ওরা এতেই স্বচ্ছন্দ। কিন্তু…
“বৌ-বাচ্চাকে গাড্ডায় ফেলার মতো কাজ করতে লজ্জা করে না? এখন দরদ দেখাচ্ছিস? একদম রুল গরম করে না দুই পা ফাঁক করে গুঁজে দেবো শুয়োরের বাচ্চা,” গর্জে উঠলেন তিনি।
মিন্টু কুঁকড়ে গেল তাঁর দাবড়ানিতে। তার সারা শরীর কাঁপছে। ভয় নয়, আতঙ্কে। আগেরবার সাজা কেটে বেরোনোর পরেই বৌটা মাথায় হাত রাখিয়ে মা কালীর দিব্যি কাটিয়ে বলেছিল আবার এই কাজ করলে সে লাইনে গলা দেবে ছেলে সমেত। মিন্টুর শরীর ঠেলে একটা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে।
প্রতীক সেন লকআপের গেটের হুড়কো আঁটতে আঁটতে বললেন, “আর ন্যাকা সাজতে হবে না। তোর বৌ তোর আর মুখ দেখবে না বলেছে। বেশ হয়েছে শালা! পচে মরা দরকার তোদের মতো মালগুলোর।”
“না স্যার। বৌটা বলেছিল আমি আবার জেলে গেলে ও লাইনে গলা দেবে। ও আসছে না; একটু দেখুন স্যার, একটু দেখুন। আপনার পায়ে পড়ি স্যার,” মিন্টু বলতে বলতে হামাগুড়ি দিয়ে প্রতীকের দিকে এগিয়ে এল।
তার ফোঁপানির শব্দকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে টেবিলে ফিরে এলেন প্রতীক সেন। তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই ছিল কনস্টেবল নির্মল দাঁ। প্রতীক তাকে ডেকে নিয়ে বললেন, “মালটার বাড়ি চেনো?”
“চিনি স্যার। মশালদিঘির দিকে,” নির্মল জবাব দিল।
“হুম। খোঁজ নিয়ে দেখো তো একবার। যাও বেরোও,” এসআই নির্দেশ দিলেন। থানার ভিতরের ঘরে তিনি বসেন। সামনের ঘরে ডায়রি, এফআইআর নেওয়ার কাজ করে তাপস আর বিপিন। তাদের ডেকে নিলেন প্রতীক। ছকতে শুরু করলেন আজ রাতের প্ল্যান। হালে থানায় কনস্টেবলের সংখ্যা বাড়লেও, আজ রাতের কাজের জন্য যে দুঃসাহসিকতার প্রয়োজন তা পরেশ আর বিপিন ছাড়া কারোর নেই। পরেশ বোনের বিয়ের জন্য ছুটিতে, কিন্তু তাকে বাদ দিতে গেলে থাকবে শুধু বিপিন। তাই একেবারেই ইচ্ছে না থাকলেও পরেশকে ডেকে পাঠাতেই হবে তাঁকে। চাকরিতে নতুন ঢোকা নির্মলের উপরে প্রতীকের ভরসা কম, কিন্তু উপায় নেই। প্রতিবেশী থানার কাছে ফোর্স চেয়ে ফোন করা যায় কিন্তু কার কোথায় কী সেটিং হয়ে আছে বোঝা মুশকিল। নাহ, যা করার এই সীমিত শক্তি নিয়েই করতে হবে। অপারেশন করে শুধু একটা অপরাধকে আটকালেই হবে না, হাতেনাতে ধরতে হবে প্রত্যেককে। বাজেয়াপ্ত করতে হবে প্রতিটা আইটেম।
তাপস আর বিপিনের সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাখানেক আলোচনার পর বেরিয়ে এল নীল নকশা। বিপিনের প্রস্তাব মেনে শুধু টার্গেটকে অনুসরণ করে মিনিট টু মিনিট ইনপুট দেওয়ার জন্য একজন খোচরকে অপারেশনে সামিল করতে রাজি হলেন তিনি। আলোচনার শেষে দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে তাকালেন। দুপুর দেড়টা। দেখতে দেখতে সময় চলে যাবে। প্রস্তুতির জন্য পরেশকে একটু আগে ছেড়ে দিতে হবে তাঁকে। নিজেকেও তৈরি হতে হবে।
টেবিলের ড্রয়ারে রাখা এলাকার ম্যাপটা বের করে নিলেন এসআই প্রতীক সেন। প্রতিটি অলিগলি, মাঠ, ডোবাকে চিহ্নিত করতে হবে, যাতে একটা শুয়োরের বাচ্চাও পালাতে না পারে।
২৭
দিল্লিতে দলের হাই কমান্ডের সঙ্গে বৈঠকের ফাঁকে নিউজ চ্যানেলে চোখ রেখেছিলেন ভারত সেবকের রাজ্যসভার সাংসদ পবিত্র দত্ত ও পশ্চিমবঙ্গ শাখার সভাপতি সন্তোষ সাহা। চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে শাসকদল বঙ্গবিকাশ পার্টির সাংবাদিক সম্মেলন। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী এবং দলের সমস্ত বিধায়ক। আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে সকলকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী ও দলনেত্রী সুতপা তালুকদার।
অনেকে বক্তব্য রাখার পর মুখ্যমন্ত্রী উঠে দাঁড়াতে বললেন গাজোলের বিধায়ক অমল বরাটকে। বিধায়ক হিসেবে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করলেন। পবিত্র দত্তের সেই দৃশ্য সহ্য হচ্ছিল না, তিনি রিমোটের বোতাম টিপে চ্যানেলকে নির্বাক করলেন।
সন্তোষ সাহা ভাবলেশহীনভাবে চাইলেন তাঁর দিকে। তাঁর চাহনিই অব্যক্ত প্রশ্নটা করে দিল। পবিত্র দত্ত উত্তেজিতভাবে বললেন, “কাজ? কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছে এই লোকটা? কী করছে, কীভাবে একটা অন্যায়কে মদত দিচ্ছে, রোজ খবর পাচ্ছি। এই যদি চলতে থাকে তাহলে খুব শিগগিরি রাজ্যের মানচিত্রটা নতুন করে আঁকতে হবে।”
সন্তোষ সাহা লোক ডেকে দুটো সফট ড্রিঙ্ক আনাতে দিলেন। সে লোক ঘরের বাইরে যেতেই পবিত্র দত্তের দিকে অত্যন্ত ঝুঁকে ঠান্ডা গলায় বললেন, “এত মাথা গরম করে ফেলছেন কেন আপনি?”
“করবো না? কী চলছে দেখেও মাথা ঠান্ডা করে বসে থাকা যায়? আপনি বললেন হাই কমান্ডকে রিপোর্ট দিতে। দিলাম। সবই তো দেখলেন আপনি। তিনি তো এমনভাবে হাসলেন যেন একটা স্কুলের বাচ্চার নালিশ শুনছে ক্লাসের টিচার। তা হলে আর আমার বলে কী লাভ হল? কিছুই তো করতে পারছি না।”
“আপনি করবেন কেন? আমরা আছি তো।”
“আপনারা? আছেন? কই, মনে তো হচ্ছে না। আমার ছেলেমেয়েরা মুখিয়ে আছে অ্যাকশনের জন্য কিন্তু মিনিমাম একটা গো অ্যাহেড আপনাদের থেকে পাচ্ছি না বলে কিছু করতে পারছি না,” হাত ছুড়ে উত্তেজনা প্রকাশ করলেন পবিত্র।
সফট ড্রিঙ্ক এসে গিয়েছিল। একটা বোতল পবিত্র’র দিকে এগিয়ে দিয়ে রাজ্য সভাপতি বললেন, “নিন, ঠান্ডা খান। মন, মাথা শীতল করুন। এত চিন্তার কিছু নেই। একটু লংটার্মে চিন্তাভাবনা করুন।”
“মানে,” পবিত্র’র মুখে স্ট্র ঢুকতে গিয়েও বেরিয়ে এল।
“মানে একটু বড় ফায়দার কথা ভাবুন। আপনি অত কষ্ট করে দিল্লিতে এসে যা বললেন, হাই কমান্ডের কাছে আগে থেকেই সেই রিপোর্ট আছে। কিন্তু সব অ্যাকশনের একটা সঠিক সময় আছে তো! হা রে রে রে করে উঠলেই হল,” সন্তোষ সাহা নাকের উপর নেমে আসা সোনালি ফ্রেমের চশমাটাকে ঠেলে যথাস্থানে পাঠাতে পাঠাতে বললেন।
পবিত্র দত্ত রাজনীতির প্যাঁচপয়জার এখনও তেমন বোঝেন না। কিন্তু এমন একটা স্পর্শকাতর ব্যাপারেও বড় ফায়দা, ছোট ফায়দা দেখবে দল? তিনি সপ্রশ্ন চোখে দলের রাজ্য সভাপতির দিকে চাইলেন।
সন্তোষ সামান্য কোল্ড ড্রিঙ্ক খাদ্যনালীতে চালান করে বললেন, “সামনে পঞ্চায়েত ভোট। দিন ঘোষণা হতে দিন। প্রচারের সময় এই নিয়ে কেমন ঝড়টা তোলা হয় শুধু দেখবেন। এখন এই নিয়ে হাঙ্গামা করলে ভোটের আগে ওরা সতর্ক হয়ে যাবে। আপনি যেটা করতে চাইছেন সেটা শর্ট টার্ম ফায়দা। আমি যেটা বলছি সেটা লং টার্ম। তফাতটা বোঝা গেল?”
পবিত্র দত্ত হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন তাঁর দিকে। নিজেকে ভীষণ মূর্খ মনে হচ্ছে তাঁর।
সন্তোষ সাহা এবার মুচকি হেসে উঠে পড়লেন। হতভম্ব পবিত্র দত্তের পিঠে হাত রেখে মুচকি হেসে বললেন, “ভুলে যাবেন না, আপনি প্রতিবেশী রাজ্য থেকে সংসদে গেছেন। সেই রাজ্য নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। এদিকটা ছেড়ে দিন।”
প্রেস কনফারেন্সে কপালে ভালো ভালো কথা জুটলেও সেই পালা মিটতেই মুখ্যমন্ত্রী তাঁর প্রাইভেট কেবিনে ডেকে নিলেন গাজোলের বিধায়ক অমল বরাটকে। ঘরে ওঁরা দুজন ছাড়াও উপস্থিত রয়েছেন এক ব্যক্তি। এঁর নাম রবিউল আলম। কিছুদিন হল শাসকদলের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। কিছু একটা উদ্দেশ্য নিয়েই যে এই ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা, বঙ্গবিকাশের নেতা, নেত্রী ও কর্মীরা তা বেশ আঁচ করতে পারছেন।
রবিউলের সামনেই মুখ্যমন্ত্রী অমল বরাটকে বললেন, “আপনাদের দুজনকে এখানে ডেকেছি একটা বিশেষ কথা বলার জন্য। দুজনকেই একটা ওয়ার্নিং দেওয়ার আছে আমার।”
চমকে উঠলেন দুজনেই। চোখে চোখে প্রশ্ন আদানপ্রদান হল।
চায়ের ব্যবস্থা করাই ছিল। সুতপা তালুকদার নিজে হাতে তিনটি কাপে চা ঢেলে ওঁদের দুজনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখুন অমলবাবু, আমার কাছে কিছু খবর এসে পৌঁছেছে। কে দিয়েছে সেটা অবশ্যই বলবো না কিন্তু আমি জানি খবরগুলো অথেনটিক। আমি আপনাকে খোলাখুলি আর বলছি না, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। এতদিন যা করেছেন, ঠিক আছে। এবার কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখতে হবে। পঞ্চায়েত ভোট আসছে। অপজিশন কোনো অস্ত্র হাতে পেয়ে যাক, সেটা আমি চাই না।”
বরাট বলতে গিয়েছিলেন কিছু কথা কিন্তু তাঁর মুখ থেকে কেবল “কিন্তু ম্যাডাম” এর বেশি বেরোতে পারল না। দলনেত্রী গর্জে উঠে বললেন, “কোনো কিন্তু না। বন্ধ করতে হবে মানে করতে হবে। একা না পারেন জেলা সভাপতির সঙ্গে বসুন। আলোচনা করুন। মোট কথা সতর্ক হতেই হবে।”
এর পর আর কিছু বলার থাকে না তাই বরাট মাথা নিচু করে বসে রইলেন। মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে কয়েক মুহূর্ত জরিপ করে নিয়ে এবার রবিউলের দিকে ফিরলেন।
“আলম ভাই, একটু কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে। এটা কমাতে হবে,” বেশ কড়াভাবে বললেন সুতপা।
ষাটোর্ধ্ব রবিউল আলম নেত্রীর এমন একটা মেজাজের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি হকচকিয়ে গেলেন, “কো… কোনটা ম্যাডাম?”
“কোনটা? বুঝতে পারছেন না? আপনার খবরের কাগজে সম্পাদকীয়র পাতায় আর্টিকেলের নামে যা ছাপছেন আজকাল, সেগুলোর কথা বলছি। এগুলো বন্ধ করতে হবে আলম ভাই।”
রবিউল বিস্মিত হলেন এই কথায়। এমন নির্দেশ যে তিনি কল্পনাই করতে পারেন না। কিছুই অস্বাভাবিক হচ্ছে না তাঁর সংবাদপত্রে, এটা বোঝানোর জন্য তিনি জবাবে বললেন, “হঠাৎ কেন এ কথা বলছেন ম্যাডাম? ওই লেখাগুলো তো সবসময়ই আমরা ছাপি।”
“আরে সবসময় করি মানে কী? সবসময় সব কিছু করা যায়? পরিস্থিতি বুঝে তো কাজ করতে হবে আপনাকে। আপনি শীতকালে কম্বল গায়ে দেন। এখন মে মাস, এখনও দেবেন? অনেক কমপ্লেইন আসছে আলম ভাই, তাই ওয়ার্নিংটা দিলাম। কী করছে আপনার কাগজ, বলুন তো? একজন অভিনেত্রী, অল্পবয়সি একটা মেয়ে ওরকম নৃশংসভাবে মারা গেল, আপনার কাগজ তাতেও তাকে গালাগালি করছে! এ কী? একটা মানুষ মারা গেছে। একটা-দুটো দিন তো অন্যরকম লিখবেন আপনারা! আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির লোকেরা কিন্তু খুব হার্ট হয়েছে। এটা কিন্তু ঠিক হয়নি, একদমই ঠিক হয়নি।”
রবিউল শরীরে একটু কাঁপুনি অনুভব করলেন মুখ্যমন্ত্রীর এই কথায়।
“ম্যাডাম, ও মেয়ে ভালো না। আপনি তো জানেন আমার কাগজের রিডার মূলত কারা। তাদের সেন্টিমেন্ট অনুযায়ীই…”
“আরে রাখুন আপনার সেন্টিমেন্ট। কিসের সেন্টিমেন্ট? এগুলো ভদ্রতা, সৌজন্যর ব্যাপার। আমাদের পলিটিক্যাল পার্টির মধ্যে শত্রুতা নেই? সর্বক্ষণই তো এ ওকে গালাগালি করছে। তা বলে কোনো বড় নেতা মারা গেলে, সে যে দলই হোক, তখনও গালাগাল করবো? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী যখন মারা যান, আমাদের দলের ঠাসা কর্মসূচী ছিল। আমরা সমস্ত বাতিল করেছিলাম তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। আর আপনি ভালো মেয়ে না বলছেন? আমি তো শুনেছি আপনার সঙ্গে তার ভালো পরিচয় ছিল। কয়েকটা ফিল্মও করেছে। সে মানুষটা মরে গেল আর আপনিও আপনার কলামে ওভাবে তাকে আক্রমণ করলেন? ভাববেন না আমি দেখেনি। আমি কিন্তু দেখেই বলছি। আমি জানি না, জানার দরকারও নেই আপনাদের পার্সোনাল কী ঝামেলা আছে বা না আছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে ব্যস। ভুলে যাবেন না সরকারের বিজ্ঞাপনের উপরেই কিন্তু দাঁড়িয়ে আছেন। একনাগাড়ে এভাবে অভিযোগ আসতে থাকলে আমাদেরও কিন্তু অ্যাকশন নিতে হবে,” প্রায় ধমকে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বরাট ও আলম বুঝে গিয়েছিলেন এর পর আর তাঁদের শোনার কিছু ছিল না। আলম থমথমে মুখে গাড়িতে বসে তাঁর অফিসে রওনা হয়ে গেলেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই হঠাৎ অবস্থান বদল সম্বন্ধে কোনো আঁচই তিনি পাননি আগে। এতদিন কোনো সমস্যা ছিল না, হঠাৎ কী হল ওঁর? আলমের সব চিন্তাভাবনা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল।
বরাট অবশ্য বিশেষ গায়ে মাখেননি তাঁর প্রতি ম্যাডামের নির্দেশকে। গ্রামীণ ভোটব্যাংক ধরে রাখাটা কত বড় চ্যালেঞ্জ সেটা ভূমিপুত্ররাই সবচেয়ে ভালো বোঝে। উনি কলকাতায় বসে যতই লেকচার মারুন, আমি জানি কীভাবে ভোট ধরে রাখবো। এখনও মালদায় আমাদের পায়ের নিচে জমি অন্যান্য জায়গার মতো শক্ত না। এমন কিচ্ছু করা যাবে না যাতে মাইনরিটি ভোটব্যাংক চটে যায়। এমনিতেই ভারত সেবক জেনারেল ভোটারদের যথেষ্ট প্রভাবিত করছে। উনি যা বলার বলেছেন, আমি জানি কী করতে হবে— মনে মনে বললেন বরাট। সোজা আঙুলে এবার ভোটে ঘি তেমন উঠবে না তাই আঙুল বাঁকাতে হবে। সেই ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আজ রাতেই হবে সে কাজ।
২৮
কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে বিলাসবহুল হোটেলের সুইটে কোর টিমকে নিয়ে জরুরি মিটিংয়ে বসেছে হক। এনএটিসি’র বিধান নগরের দফতরে এখন পাশের নির্মীয়মান ভবনটিকে উদ্বোধনের জন্য সাজিয়ে তোলার ব্যস্ততা। সেখানে এই মুহূর্তে এরকম চূড়ান্ত গোপন একটি মিটিং করার সুযোগ নেই। অগত্যা হোটেল।
দলের বাকি চার সদস্যকে মিশনের সমস্ত খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিচ্ছিল হক, জবাব দিচ্ছিল তাদের বিভিন্ন যৌক্তিক প্রশ্নেরও। তার নির্দেশে ইতিমধ্যেই ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠী ঘাটালের বিস্ফোরণ ও আয়েশা সুলতানার হত্যার ব্যাপারে বিশদে গবেষণা সেরে নিয়েছে। তার কাছ থেকে সেই সব তথ্য নিজের নোটবুকে লিপিবদ্ধ করার পরে হক তাকে এবং সুনীল রক্ষিতকে নির্দেশ দিল আয়েশা সুলতানা আর সঞ্জয়শেখরের মার্ডার কেসের এনকোয়েরির জন্য উত্তরবঙ্গের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যেতে। ডিআইজি গোয়েল ইতিমধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে এই কেসের গুরুত্ব বর্ণনা করে চিঠি পাঠিয়েছেন এবং হকের অনুমান তার লোকেরা উত্তরবঙ্গে প্রাথমিক অনুসন্ধানের কাজ করতে করতেই এনএটিসি’র হাতে কেস টেক ওভার করার জন্য যা প্রয়োজন, সেই নোটিফিকেশনটা এসে যাবে। সেটা এসে গেলেই ফরেনসিক টিমকে পাঠাতে হবে অনুসন্ধানের জন্য।
বিদ্যুতের মতো ক্ষিপ্রতায় দুই সাব-ইন্সপেক্টর উধাও হয়ে গেল হোটেলের সুইট থেকে। এবার হকের নিজের ভূমিকা বেছে নেওয়া এবং সেটা সাজানোর পালা। তার সামনে টেবিলের উপর ছড়িয়ে রয়েছে এখনও পর্যন্ত ঘাটাল বিস্ফোরণ সম্বন্ধে উঠে আসা সমস্ত তথ্য। এছাড়াও রয়েছে ডিআইজি গোয়েলের দেওয়া ইখলাস রুবেল সম্পর্কীয় ফাইল। গতকাল রাত্রেই তার হাতে এসে পৌঁছেছে আয়েশা সুলতানা এবং সঞ্জয়শেখরের সাম্প্রতিক অতীত সম্বন্ধে সুজান ডি ক্রুজের পাঠানো নথি। একে একে সমস্ত কিছুতে চোখ বোলাতে বোলাতে হক এই সিদ্ধান্তে আসছিল যে এই মিশনের জন্যও তাকে কোভার্ট অপারেশনের পথই নিতে হবে। সাধারণের ভিড়ে মিশে গিয়ে কাজ না করলে রিবাতের মতো ভয়ংকর শক্তির লুকিয়ে থাকা মাথা অবধি পৌঁছনো সম্ভব হবে না। এনএটিসি যে এই কেসের ব্যাপারে কিছুমাত্রও ক্লু পেয়েছে সেটা বিপক্ষ শিবিরকে বুঝতে দেওয়া যাবে না।
কী ভয়ংকরভাবে একটা জঙ্গি গোষ্ঠী গত দেড় বছরে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তাদের জাল বিছিয়ে ফেলেছে তা ভেবে শিউরে উঠছিল হক। কিন্তু সে বুঝে উঠতে পারছে না শুরু কোথা থেকে করবে? আয়েশা সুলতানার দুই হত্যাকারীই মারা গিয়ে হককে একটা ডেড এন্ডে এনে ফেলে দিয়েছে। যে বাইকটা তারা চালাচ্ছিল, মেটেলি থানার পুলিশ সেটার মালিককে চিহ্নিত করতে পারলেও এই মুহূর্তে সে বেপাত্তা। বাইকটা আনা হয়েছিল উত্তরবঙ্গের হ্যামিল্টনগঞ্জের গোপাল সমাদ্দারের কাছ থেকে। তাহলে কোথা থেকে শুরু করা যাবে? কেবল মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ালে তো হবে না, বিস্ফোরণ এবং হত্যা, এই দুটো ঘটনার সঙ্গে যোগসূত্র আছে এমন একটা জায়গাকে চিহ্নিত করে সেখানে পৌঁছাতে হবে।
আইবি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী কয়েকদিন আগেই বসিরহাটের ঘোজাডাঙা সীমান্ত পার করে যে তিনজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি দেশে ঢুকেছে, তাদের হদিশ এখনও পায়নি কলকাতা পুলিশের এসটিএফ। কিন্তু তাদের ভরসায় বসে থাকলে এনএটিসি’র চলবে না।
টিমের বাকি দুই অ্যাসিস্ট্যান্টকে ঘোজাডাঙা পৌঁছনোর জন্য একটা গাড়ির বন্দোবস্ত করতে বলে ঘর খালি করল হক। কিছুটা সময় সে একাই থাকতে চায়। সে হাতে তুলে নিল ইখলাস রুবেল সম্পর্কীয় সেই হাই ভোল্টেজ ফাইলটা।
ইখলাস রুবেল! অসাধারণ একটি চরিত্র। যতটুকু নথি তার সম্বন্ধে পাওয়া গেছে তা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার, খারাপ পথে না গেলে এই ব্যক্তির মধ্যে বাংলাদেশ এক রত্ন পেতে পারত। স্কুলে বরাবরের প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান অধিকারী থেকেছে। তারপরে কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সেকেন্ড ইয়ার অবধিও তার রেজাল্ট ঈর্ষণীয়। নথি বলছে তার বড় দাদা আমেরিকার এক বড় বহুজাতিক সংস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত ছিল। ২০০৮ সালে আমেরিকার টেক্সাসে একটি জঙ্গিহানার পরে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপরে প্রতিহিংসাপরায়ণ শহরবাসীর আক্রোশ নেমে আসে। খুব অল্প সময়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তিরিশেরও বেশি মুসলিম তরুণ-তরুণীকে, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিক। একমাত্র বাংলাদেশি যার মৃত্যু হয়েছিল সে সময়, তার নাম ইশতিয়াক শুভ্র। ইখলাস রুবেলের বড় ভাই।
বাংলাদেশ থেকে উঠে আসা বিভিন্ন তথ্যের ইঙ্গিত বড় ভাইয়ের এই অকস্মাৎ ও নৃশংস হত্যা যুবক ইখলাসকে ভীষণভাবে ধাক্কা দিয়েছিল। সে সময়ে রুবেল ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছে। দাদার মৃত্যু তার পড়াশোনা তো বটেই, মানসিক স্থিতির উপরেও ভয়ানক প্রভাব ফেলেছিল। একটা গভীর অবসাদের মধ্যে চলে গিয়েছিল সে কিছু সময়ের জন্য। মাদকের নেশাও ধরেছিল। কিন্তু এর পরেই প্রতিহিংসার আগুন তার মনের মধ্যে জ্বলে ওঠে। তারই জেরে হঠাৎই একদিন ঢাকা শহরের অনতিদূরে রাস্তার উপরে খুন হয়ে যায় দুই আমেরিকান পর্যটক। যদিও খুনির হদিশ পাওয়া সম্ভব হয়নি পুলিশের পক্ষে, প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী আততায়ী রুবেলই ছিল। সেই যে সে উধাও হয়ে যায় ঢাকা শহর থেকে, প্রকাশ্যে তাকে আর কেউ সেখানে দেখেনি। এরপরে ইখলাস রুবেলকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এই ধরনের প্রতিভাকে নিজেদের স্বার্থে গ্রাস করে নেওয়ার জন্য কিছু গোষ্ঠী সদাসতর্ক নজর রেখেছে সমাজে। সেরকমই এক গোষ্ঠী টেনে নেয় ইখলাসকে। বাকিটা অন্ধকারময় ইতিহাস।
কিন্তু এই মিশনের ক্ষেত্রে হকের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ইখলাসের স্কুল, কলেজ থেকে এমন কোনো নথিই সে দেশের পুলিশ জোগাড় করতে পারেনি যাতে তার ছবি আছে। ব্যাপারটা স্পষ্ট যে, কোনো ক্ষমতাশালী হাত ইখলাসের চেহারা তুলে ধরতে পারে এমন সমস্ত নথি ধ্বংস করে দিয়েছে।
কীভাবে তাহলে এমন একটা ভয়ংকর মানুষের নাগাল পাওয়া যাবে?
উত্তর খুঁজে না পেয়ে মোবাইলে ইখলাসের সেই জঙ্গি ট্রেনিংয়ের ভিডিওতে চোখ রাখল হক। একটা সিল্যুয়েট মাত্র। তা দিয়ে একটা মানুষকে কতটা চেনা সম্ভব? মন দিয়ে ভিডিওটা দেখছিল সে কিন্তু তাতে বাধা পড়ল কল এসে যাওয়ায়। গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে। কথা বলতে হবে ঘোজাডাঙায় পোস্টেড আইবি এজেন্টের সঙ্গে। আইবি’র তরফ থেকে প্রয়োজনীয় সবুজ সংকেত ইতিমধ্যেই এসে গেছে।
তৈরি হয়ে নিল হক। ডেস্টিনেশন ঘোজাডাঙা!
২৯
পড়ন্ত বিকেলে বাড়ির উঠোনে পাতা ক্যাম্প খাটের উপর বসে উদাসভাবে আকাশের দিকে চেয়ে ছিল সুমনা। আজ আকাশ বড্ড গুমোট হয়ে আছে, গাছের পাতা নড়ছে না যেন। উঠোনের মেঝে থেকে যেন তাপ উঠে আসছে। সে দরদর করে ঘামছিল কিন্তু সেটা যেন টেরই পাচ্ছিল না।
আর মাত্র চারদিন বাদে ‘দশভুজা’র উদ্বোধন, অথচ সুমনা যেন সে ব্যাপারে একেবারেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। একটু আগে সর্বক্ষণের সঙ্গী বান্ধবীরা বিরক্ত হয়ে যে যার বাড়ি চলে গেছে। সুমনা যেন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে। মাত্র কয়েক মুহূর্তের আলাপ হয়েছিল একটা মানুষের সঙ্গে। কিন্তু সুমনার বড় ভালো লেগেছিল।
সেই মানুষটার এমন নৃশংস মৃত্যু! ভাবলেই সুমনার সারা শরীর কেমন করে উঠছে। নিউজ চ্যানেলে দুপুরে বলছিল আয়েশার মোবাইলে দেখা গেছে তিনি সঞ্জয়শেখরের সঙ্গে তাঁর একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড করতে যাচ্ছিলেন। ছবির উপরে ‘গালা অ্যানাউন্সমেন্ট’ অবধি লেখা হয়েছিল। পুলিশের ধারণা এই পোস্টটা লিখতে লিখতেই অভিনেত্রী দুষ্কৃতীদের আক্রমণের শিকার হন। মোবাইলটা তাঁর হাত থেকে পড়ে যায় এবং এক সময় লক হয়ে যায়। কী আশ্চর্য বিচার ভগবানের! একজন মানুষ আনন্দের সঙ্গে নিজের একটা সম্পর্কের কথা সকলকে জানাতে চেয়েছিলেন আর সেই মুহূর্তেই কিনা!
সুমনার চোখে জল চলে এসেছিল টিভির দিকে চেয়ে। তার জীবনের উপর দিয়ে যখন কালবৈশাখীর তাণ্ডব চলেছে, তখনও একবারের জন্য কেউ কাঁদতে দেখেনি তাকে। কিন্তু এই সামান্য পরিচিত মানুষটা যেন বড্ড কাছের হয়ে উঠেছিলেন।
আলো পড়ে আসছিল, কিছুটা দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছিল বিকেলের নমাজের সুর। মা তুলসীতলায় সন্ধে দেওয়ার জন্য বেরিয়ে এসেছিলেন। সুমনার পিঠে হাত রেখে বললেন, “তুই শোক করে কী করবি বল? যার যেভাবে যাওয়া লেখা থাকে। এত গুমরে থাকিস না। এত লড়াই করে যে কাজটা করলি সেটার শুরুটা তো ঠিক মতো করতে হবে। এতো মানুষকে নিমন্ত্রণ করা হয়ে গেছে। আর এখন তুই এমন হাল ছেড়ে বসে আছিস। এতো মনখারাপ করিস না। ওঠ। সন্ধেবেলা এরকম কান্নাকাটি করে না। যা, গা ধো গিয়ে, আজ ভীষণ গরম। ম্যাক্সিটা ঘেমে জল হয়ে গেছে, সে খেয়ালও নেই!”
সুমনা মায়ের শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতেই উঠোনের দরজা ঠেলে তার ভাই জয় বগলে ফুটবল নিয়ে ঢুকল। বাবাও বাড়ির টানা বারান্দায় বসেছিলেন। ছেলেকে দেখে রসিকতা করে বললেন, “কী ব্যাপার? আজ এত তাড়াতাড়ি খেলা ভেঙে গেল। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার না হওয়া অবধি তো তোমাদের প্র্যাকটিস শেষ হয় না!”
বাবার কথার ধরনটা জয়ের মোটেই পছন্দ হল না। ইচ্ছে করছিল খ্যাচখ্যাচ করে একটা জবাব দিয়ে দিতে। কিন্তু আজ রাতের কথা ভেবে সে নিজেকে সামলে নিল। রাত্রে ইউয়েফা কাপ ফাইনাল, রিয়াল মাদ্রিদ বনাম লিভারপুলের জম্পেশ খেলা। বাবার সঙ্গে এখন লাগতে গেলে আর ধীমানের বাড়ি যাওয়া হবে না। সে মাথা নিচু করে জুতোর ফিতে আলগা করতে করতে বলল, “স্যারের শরীরটা ভালো না। তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলেন, বললেন সন্ধেবেলা ডাক্তার দেখাতে যাবেন।”
জয় বলটাকে তার নির্দিষ্ট জায়গায় গড়িয়ে দিয়ে দড়িতে ঝোলানো গামছা টেনে নিয়ে কুয়োতলায় চলে গেল স্নান করতে। এখন থেকে রাত অবধি কোনো গোলমাল করা যাবে না। পড়াশোনায় সাংঘাতিক মনোযোগ দেখাতে হবে।
জয়ের স্নান যখন শেষের পথে, বেশ জোরে মেঘ ডেকে উঠল। জয় শুনল তার বাবা গর্জনরত মেঘের উদ্দেশে বলছে, “নাম নাম, একটু ঝমঝমিয়ে নাম। আর টেকা যাচ্ছে না।”
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবহাওয়া বদলে গেল। একটা দমকা হাওয়া যেন হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের উঠোনে। মায়ের যত্নের গাছগুলির শুকনো পাতা উঠোনময় ছুটোছুটি করতে লাগল। আকাশে বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল। জয় আর তার বাবা দ্রুত ঢুকে পড়ল ঘরে। সুমনা ঠায় বসে রইল। দমকা ঠান্ডা হাওয়াকে অনুসরণ করে এল বৃষ্টি। তপ্ত উঠোন, মাঠ, রাস্তা, পুকুর যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। ক্যাম্পখাটে বসে ভিজতে লাগল সুমনা। তার ভালো লাগছে জলের এই স্পর্শ।
কিছুটা দূরত্বে বিধানপল্লীতে নিজের প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে থেকে সেই মুহূর্তে গাড়িতে উঠছিলেন শ্যামলেন্দু। সর্বক্ষণের অনুগামী বিভাস ও গাড়ির ড্রাইভার স্পষ্ট বুঝতে পারছিল দাদার মেজাজ ঠিক নেই। বস্তুতই একটু উদ্বিগ্ন ও বিরক্ত হয়েছেন তিনি। সেই বিশেষ ব্যক্তির ফোনকল আবার এসেছিল ঘণ্টাখানেক আগে এবং শ্যামলেন্দুকে আগামীকাল ভোরে শিলিগুড়িতে পৌঁছনোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। শিলিগুড়ির সেবক রোডের এক বিলাসবহুল হোটেলে তাঁকে পৌঁছাতে বলা হয়েছে। উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে রুমের নম্বরও। শ্যামলেন্দু জেনেছেন সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসছেন এক ব্যক্তি। অত্যন্ত গোপনীয় একটি বৈঠক করবেন তিনি। তিনি কোথা থেকে আসছেন, কী তাঁর পরিচয়, তা জানেন না শ্যামলেন্দু। জানেন শুধু নামটুকু। ইখলাস রুবেল।
