১০
থানার লম্বা বারান্দায় লাল চায়ের গেলাস হাতে গম্ভীরভাবে পায়চারি করছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর প্রতীক সেন। মেজাজটা মোটেই ভালো নেই তাঁর। ঘৃণ্য অপরাধ করেও কিছু শয়তান আইনের হাত ফস্কে বেরিয়ে যায় আজকাল, কেবল তাদের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে। একটা তেরো বছরের কিশোরীকে স্কুলে পিটি ক্লাসে ইনস্ট্রাকশন দেওয়ার নাম করে যৌন নিগ্রহ করা পশুও আজ সকালে কলার তুলে লকআপ থেকে বেরিয়ে চলে গেল। যে কিশোরী অভিযোগ এনেছিল, তার বাবা-মা থানায় এসে হাতজোড় করে বলে গেলেন তাঁদের মেয়ের বুঝতে ভুল হয়েছে।
এমনটা যে হবে তা প্রতীক আন্দাজ করেছিলেন গতকাল সকালেই, যখন বিধায়ক শ্রী বরাট মহাশয় ফোন করে মৃদু গলায় বলেছিলেন, “ছুটকোছাটকা শিকার ধরে কী বীরত্ব জাহির করছেন? এসব ইগনোর করুন, বড় শিকারে মন দিন।” তারপর সন্ধ্যায় তিনি কিশোরীর বাবা-মাকে ডেকে পাঠান তাঁর অফিসে, সে খবরও প্রতীক পেয়েছেন। স্বাভাবিক। কল্যাণ মণ্ডল আর জনা তিনেক মাল, যারা শাসকদলের ক্যাডার হিসেবেই পরিচিত, কিছুদিন আগে চাকরি পেয়েছে গার্লস স্কুলে। কল্যাণের পেটে কিছু বিদ্যা আছে, খেলাধূলায় ভালো ছিল তাই একেবারে পিটি টিচার হয়ে বসেছে। বাকি দুজন ঢুকেছে নন টিচিং স্টাফ হয়ে। স্কুলের বিভিন্ন বিষয়ে তারা বেপরোয়াভাবে ছড়ি ঘোরাচ্ছে, সে খবর প্রতীক প্রায়ই পান।
অসহায়ের মতো একটা নোংরা লোককে মুক্তি দিতে হল, এটা মনে পড়লেই শরীরটা জ্বলে যাচ্ছে প্রতীকের। ইচ্ছে হচ্ছে মেয়েটার বাড়িতে গিয়ে বাপ-মাকেই তুলে এনে লকআপে ঢুকিয়ে দিতে। থাকুক পড়ে লকআপে! এতই যখন প্রাণের ভয়, সমাজের ভয়, তখন একেবারে নিরাপদে ওই অন্ধকার খুপরির মধ্যেই বাস করুক। এই ধরনের ঘৃণ্য ঘটনা সামনে এলেই সমাজ নিয়ে অনেক বিশিষ্টজন অনেক কথা বলেন খবরের কাগজে, টিভি চ্যানেলে। আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ প্রশাসন ব্যর্থ, এই বাক্যটি তাঁদের মুখে যেন লেগেই থাকে। বিনা কষ্টে উগড়ে দেন। অথচ অপরাধের শিকার যারা, তারাই যে সমাজে একঘরে হওয়ার ভয়ে গুটিয়ে গিয়ে অপরাধীদের মদত দেন, সে ব্যাপারে কারোর মুখে রা থাকে না।
গত মাসে আলালের কাছে একটা মেয়েকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল চার যুবক। মেয়েটি লড়ে নিজের ইজ্জত কোনো রকমে বাঁচাতে পেরেছিল। থানায় সে যখন অভিযোগ করতে আসে, সাহসিকতার জন্য তার তারিফ করেছিলেন প্রতীক। মেয়েটির দেওয়া তথ্যপ্রমাণ ও দুষ্কৃতীদের চেহারার বর্ণনার ভিত্তিতে চারজনকে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে হিলির কাছে পাকড়াও করে প্রতীকের বাহিনী। এবং তারপরেই গল্পে অভাবনীয় মোচড়। টিআই প্যারেডে এসে অপরাধীদের শনাক্ত করতে অস্বীকার করে মেয়েটি।
প্রতীকের চোখের সামনে বিধানপল্লীর সুমনার বিকৃত মুখটা ভেসে উঠছিল। সত্যিকারের এক ব্যতিক্রম এই মেয়েটি। এতটুকু পিছিয়ে যায়নি লড়াই থেকে। তার বাবার মেরুদণ্ডের জোরও তারিফযোগ্য। মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও অবস্থান বদল করেননি। সবাই যদি সুমনার পরিবারের মতো একটু লড়তে প্রস্তুত থাকতো…
মাঝরাতের নিস্তব্ধতায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে একটু দূর থেকে ভেসে আসা মিউজিক সিস্টেমের শব্দ। ফুর্তি চলছে শ্যামলেন্দু নস্করের বাড়িতে। খানাপিনার আসর যে ভেঙেছে তা প্রতীক টের পেয়েছেন ঘণ্টাখানেক আগে। বেহেড মাতাল হয়ে এলাকার মেজো ভিআইপি পবিত্র দত্ত এসেছিলেন থানায়। পুলিশ শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে না, চোরা গলি দিয়ে অনেক বেনোজল ঢুকছে, এ জাতীয় অনেক অভিযোগ করে শেষটায় প্রতীককে স্যাক করিয়ে দেওয়ার হুমকি অবধি দিয়ে গেছেন। অবশ্য নেশার ঘোরে স্যাক কথাটা ডাক্তারবাবু উচ্চারণ করতে পারেননি, অঙ্গভঙ্গি দিয়ে বক্তব্য পেশ করেছেন।
অবশেষে বাজনা যখন থামল, তখন রাত প্রায় দুটো। নিজের চেয়ারে বসে একটা বইতে মন দিয়েছিলেন গাজোল থানার এসআই। নাইট শিফট থাকলেই তাঁর সঙ্গী হয় কোনো না কোনো বই। আজ পড়ছিলেন দিল্লির প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার নিরজ কুমারের লেখা ‘ডায়াল ডি ফর ডন’। কিন্তু তাঁর মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটালো একটা শব্দ। টেবিলের উপরে রাখা প্রতীকের দ্বিতীয় মোবাইলটা বাজছে। এই নম্বরটা একেবারে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষকে দেওয়া আছে এবং তারা সকলেই প্রতীকের কাজের জগতের। তাঁর স্ত্রী পর্যন্ত জানেন না এই নম্বর। ফোনের ওপারে কে আছে তা মোবাইলটার দিকে হাত বাড়ানোর আগেই অনুমান করে নিতে পারলেন প্রতীক, কারণ এরকম বেয়াড়া সময়ে একমাত্র সে-ই যোগাযোগ করে।
“বলো,” সোজাসুজি কাজের কথায় চলে গেলেন সাব-ইন্সপেক্টর প্রতীক সেন।
“স্যার, গোলাপি ঢুকছে। আবার মিন্টু,” ওপার থেকে বার্তা এল।
“চার। চল্লিশ লাখের মতো হবে। আগের বারের জায়গাতেই। চলে আসুন স্যার।”
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল প্রতীক সেনের। মোবাইল পকেটে ভরে উঠে পড়লেন তিনি। এতক্ষণ একটা অবসাদ যেন ক্রমশ গ্রাস করছিল তাঁকে। এখন শরীরের মধ্যে রক্তটা যেন হঠাৎ হাই ফ্লেম পেয়ে গেছে।
১১
জাল নোট পাচার মালদায় কোনো নতুন ঘটনা নয়। এক সময় যে শহরের প্রাচীন রূপ এই বাংলার রাজধানী ছিল, আজ খবরের কাগজ খুললে সে কথা মনে করাই কঠিন হয়ে পড়ে। খবরে মালদা মানেই এখন বিএসএফের হাতে জাল নোট পাচারকারী ধৃত, নয়তো আফিম চাষ। এছাড়া কালিয়াচক তো আছেই নানারকম কুকীর্তির জন্য খবরে আসার জন্য। প্রতীকের গা জ্বলে যায় খবরগুলো কানে এলে। এই শহরেই বড় হয়েছেন তিনি। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল তাঁকে কলকাতার বড় কলেজে পড়তে পাঠানোর কিন্তু ভালোবাসার শহর ছেড়ে যাবেন না বলে বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধে জেদ বজায় রেখে গেছেন তিনি। পুলিশে চাকরি পাওয়াতে প্রতীকের মা একেবারেই খুশি হননি। প্রতিদিনই রাত্রে খাওয়ার পাতে এখনও তিনি ছেলের কোনো না কোনো বিপদে পড়ার আশঙ্কা করেন। বাবা অবশ্য এখন গর্ব প্রকাশ করেন তাঁর বন্ধুবৃত্তে।
মায়ের আশঙ্কা যে খুব অমূলক তা কিন্তু নয়। প্রতীক জানেন এই জেলাটা তার ভৌগোলিক অবস্থান ও বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে বিপদের একটি আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে। গাজোল থানার জুরিসডিকশন তো বটেই, তার বাইরেও বহু জায়গা থেকে পুলিশের খোচরেরা প্রায়ই এমন সব খবর পাঠায় যা প্রতীকের মতো কর্মীদের কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ ফেলে। বিশ্বস্ত সূত্র থেকে প্রতীক সম্প্রতি এমন খবরও পেয়েছেন যে এই জাল নোট ব্যবহার করে অস্ত্রভান্ডার গড়ে তোলার চেষ্টা করছে কোনো জঙ্গি সংগঠন। প্রতীকেরা জানেন তাঁদের হাত বাঁধা, তবু যতটুকু করা সম্ভব আইনের রক্ষক হিসেবে ততটুকু করতে পিছপা হওয়ার কথা তিনি ভাবতে পারেন না। পারলে এই নিশুতি রাতে তিনজন কনস্টেবলকে নিয়ে পায়ে হেঁটে কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিতেন না। শ্যামলেন্দু নস্করের মেহফিলে দামি স্কচের নিমন্ত্রণ কিন্তু তাঁরও ছিল।
থানার গাড়ি আছে, প্রতীকের রয়্যাল এনফিল্ডও রাখা আছে থানার বাইরেই। তবু পায়ে হেঁটে অভিযানে বেরোনোর কারণ নৈঃশব্দ বজায় রাখা। এই নোট পাচার করতে গিয়ে মিন্টু এর আগে তাঁর হাতেই ধরা পড়েছিল। বেশ কিছুদিন হাজতে কাটিয়েছে মালটা তবু তার শিক্ষা হয়নি। তবে মিন্টু প্রতীক সেনের আসল লক্ষ্য নয়। মিন্টুর মতো বেকার দরিদ্র ছেলেদের যৎসামান্য মজুরি দিয়ে যারা এই অন্যায়গুলো করিয়ে নেয়, তাদেরই নাগাল পেতে চান গাজোল থানার এসআই। কারণ ইদানীং ব্যাপারটা আর শুধু জাল নোটে সীমাবদ্ধ নেই। ছোট ছোট স্কুলের ছেলেদের এই ঝুঁকির কারবারে টেনে নিচ্ছে আড়ালে থাকা শয়তানেরা। বাংলাদেশ থেকে জাল নোটের পাশাপাশি চলে আসছে ছোট্ট ছোট্ট লাল ট্যাবলেট। ডাক্তারি ভাষায় তার নাম মেথামফেটামিন, কিন্তু সীমান্তের ওপারের নেশাখোরেদের কাছে তার এক অন্য পরিচয় আছে — ইয়াবা। এক ভয়ানক মাদক যার প্রলোভন বহু যুবক-যুবতী থেকে শুরু করে তরতাজা তরুণদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার জগতের চোরাগলিতে। সীমান্তের এপারে ইয়াবার চল কিছুদিন আগে পর্যন্তও ছিল না কিন্তু অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের কঠোর মাদক বিরোধী অভিযানের ফলে বহু কারবারি ধরা পড়েছে, পুলিশের গুলিতে মারাও গেছে পঞ্চাশের কাছাকাছি মানুষ। তাই শিয়রে সমন বুঝে বিপদ এড়াতে তারা সেই মাদক অনেক কম দামে পাচার করে দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে। মারণ নেশা দ্রুত থাবা গেড়েছে। স্কুলে যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছেলেরা চলে যাচ্ছে গোপন ঠেকে। বিপন্ন হচ্ছে তাদের পৃথিবীটা।
গাজোল থেকে জোড়গাছি অনেকটা পথ। প্রথমদিকে কিছুটা পথ একটা সাইকেল ভ্যানে এসেছেন প্রতীক ও তাঁর সঙ্গীরা এখন একটু দৌড়ে একটু দ্রুত হেঁটে অপারেশনের জায়গায় পৌঁছোচ্ছেন। যেহেতু মাস তিনেক আগে এই জায়গাতেই মিন্টুকে ধরেছিলেন প্রতীক, সেহেতু সেটা খুঁজে পেতে বিশেষ বেগ পেতে হল না তাঁদের। এটাই মোক্ষম চাল অপরাধীদের। সাধারণত যে জায়গা দিয়ে একবার পাচার হয় একটা লম্বা সময় অবধি সেটাকে এড়িয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। তাই যেখানে একবার পাচারকারী ধরা পড়েছে সেখানে আর দ্বিতীয়বার চেষ্টা করবে না এটা ভেবে নেওয়াই স্বাভাবিক। এই ভেবে নেওয়ারই সুযোগ নিতে চেয়েছে ওরা।
গ্রামাঞ্চলের শেষ প্রান্তে কিছুটা খোলা জায়গা। তার দুই ধারে অযত্নে বেড়ে ওঠা ঝোপঝাড় প্রায় জঙ্গলের চেহারা নিয়েছে। প্রতীক একজন কন্সটেবলকে নিয়ে বাঁ দিকের জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন। বাকি দুজনকে নির্দেশ দিলেন ডান দিকের জঙ্গলের একেবারে শেষ প্রান্তে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে। পরিকল্পনা হল ডান দিক থেকে হঠাৎ দুষ্কৃতীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে ওরা। প্রতীক এবং তাঁর সঙ্গী ততক্ষণে আড়াল থেকে বেরিয়ে ওদের পিছন ফিরে পালাবার পথে দেওয়াল তুলবেন। শুকনো ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটলে শব্দ ঠেকানো কঠিন, তবুও তাঁরা যতটা সম্ভব সতর্ক থাকছিলেন। অন্ধকার যত ঘনই হোক, কিছুক্ষণ পরে পাতলা হয়ে আসে। টর্চের আলো ছাড়াও এখন চারপাশটা মোটামুটি ঠাহর করা যাচ্ছে। এসআইয়ের নির্দেশে পজিশন নিয়েই সকলে মোবাইলগুলো সাইলেন্ট মোডে দিয়ে দিল।
সময় কাটছিল। প্রতীক তাঁর হাতঘড়ির নিজস্ব আলোর বোতাম টিপে এক ঝলকে দেখে নিলেন। ৪.১৫। এখনও আকাশ পুরো অন্ধকার কিন্তু গ্রীষ্মকালে আলো ফোটে তাড়াতাড়ি। সেটার ঝুঁকি কি নেবে পাচারকারীরা? তবে কি ভুল তথ্য দিল তাঁকে খোচর? সবে সন্দেহটা দানা বাঁধতে শুরু করেছে মনে, এমন সময় খোলা জমির শেষ প্রান্তে একটা শব্দ পেয়ে সতর্ক হল দুই কনস্টেবল। তারা একটা জিনিসকে এগিয়ে আসতে দেখছে। চাকার শব্দ হচ্ছে। একটা সাইকেল ভ্যান। কনস্টেবল পরেশ মাঝি স্যারকে এসএমএসে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দিল দ্রুত। বেশিক্ষণ মোবাইলের আলো জ্বালা যাবে না। সাইকেল ভ্যানটা পরেশদের খুব কাছাকাছি এসে পড়েছে। একটু এগিয়ে সেটা থামল। ভ্যানচালকের অঙ্গভঙ্গি ওরা বুঝতে পারছে। সে জামার বুকপকেট থেকে মোবাইল বের করল, নম্বর ডায়াল করল তারপর কানে দিল। ওইটুকু সময়ে মোবাইলের আলোয় তার মুখটা দেখতে পেল পরেশ। না, এ তাদের চেনা মাল নয়। এসব পাচারকারীদের নিজেদের মধ্যে কথা বলার বিশেষ ভাষা আছে। সাধারণ মানুষ চট করে ধরতে পারবে না কিন্তু পরেশরা জানে। সে শুনল ভ্যানওয়ালা বলছে বেশিক্ষণ এই জায়গায় তার পক্ষে অপেক্ষা করা ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাবে কারণ ভোরের আলো ফুটছে। ওপারের জবাব বোঝার উপায় নেই তবে ভ্যানচালকের দ্রুত মোবাইল বুকপকেটে চালান দেওয়া দেখে ওরা অনুমান করে নিল যার জন্য প্রতীক্ষা সে বেশি দূরে নেই।
পরেশের মেসেজ পেয়েই প্রতীক সেন ডান দিকে নজর রেখেছিলেন। মিনিটখানেক পরেই একটা আবছা চেহারাকে তিনি তাদের ঝোপ পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে দেখলেন। মিন্টুর হাঁটাচলার ভঙ্গি প্রতীকের জানা তাই তিনি নিশ্চিত হলেন ভুল খবর পাননি। মিন্টুকে আরো একশো হাত মতো এগিয়ে যেতে দিতে হবে যাতে ঝোপঝাড় থেকে তাদের বেরিয়ে আসার সময় যে শব্দ হবে তা তার কানে না যায়। প্রতীক অ্যাকশনের জন্য তৈরি হয়ে নিলেন। যে জায়গাটায় তাঁরা বসেছেন সেখানে সম্ভবত লাল পিঁপড়ের ঢিপি ছিল। প্রতীকের পা ছেঁকে ধরেছে তারা। মোজা ভেদ করে হুল ফোটাচ্ছে। পাশে বসা কনস্টেবল তাপসেরও যে একই অবস্থা সেটা তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসা অস্ফুটে ‘উফ’, ‘উরিশালা’, থেকেই তিনি বুঝতে পারছেন।
ওদিকে পরেশ এবং বিপিনও তৈরি হয়ে নিল। ভ্যানচালক ও উলটোদিক থেকে আসা ব্যক্তির মধ্যেকার ব্যবধান কমে এসেছে। ভোরের আকাশে এখন একটা গাঢ় বেগুনি রঙ ধরেছে। অনেকটাই বেড়েছে দৃশ্যমানতা। বোঝা যাচ্ছে সাইকেল ভ্যানের উপর রাখা কিছু জিনিসের মধ্যে থেকে হাতড়ে চালক কিছু বের করে দিচ্ছে দ্বিতীয় ব্যক্তিকে। চূড়ান্ত মুহূর্ত উপস্থিত বুঝে বিপিনকে কনুইয়ের একটা আলতো টোকা মেরে পরেশ ঝোপঝাড়ের মধ্যে থেকে প্রায় লাফিয়ে ওই দুজনের সামনে এসে পড়ল। দুজনেই হতচকিত। ভ্যানচালক পালানোর চেষ্টা করতে গেল কিন্তু ততক্ষণে আরেক পাশ থেকে বিপিন দৌড়ে বেরিয়ে এসেছে। সে ছুটে গিয়ে ভ্যানের উপর চড়েই লাফিয়ে পড়ল ভ্যানচালকের উপরে। পরেশ ততক্ষণে আচমকা লাথিতে দ্বিতীয়জনকে ছিটকে ফেলেছে ভ্যানের সামনের চাকার উপর। বিপদের হাত থেকে বাঁচার জন্য এই ধরনের দুষ্কৃতীরা সঙ্গে হাতিয়ার রাখে। দুজনের একজনকেও সে হাতিয়ার বের করার সুযোগ দেওয়া যাবে না। ওরা পেলও না সুযোগ। পরিকল্পনা মাফিক দ্বিতীয় ব্যক্তিকে পিছন ফিরে পালাতে দেওয়া মাত্রই ওদিক থেকে ছুটে আসা প্রতীক সেনের সামনে পড়ল সে। প্রতীকের হাতের জোরালো টর্চের আলোয় লোকটার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। হ্যাঁ, মিন্টুই।
দুজনকে বাগে পেতে বেশি সময় লাগল না প্রতীক আর তাঁর দলের। ভ্যানের উপর শাকসবজি বোঝাই করা ছিল। তারই আড়ালে ছিল চারটে কালো পলিথিনের প্যাকেট। টর্চের আলোয় সেগুলোর মধ্যে থেকে উঁকি দিল গোলাপি রঙের দু’ হাজার টাকার বান্ডিল।
পরেশের লাথিটা ছোটখাটো চেহারার মিন্টুর ঠোঁটে লেগেছিল। এখন সেখান থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসছে। সেই অবস্থাতেই তার মাথায় শক্তিশালী একটা থাপ্পড় মেরে প্রতীক বললেন, “ঘরে বৌ আছে, ছোট দুটো বাচ্চা আছে। আগেরবার ছেড়ে দিয়েছিলাম অল্পের উপর। তবু শুধরোলি না।”
থানায় বলা ছিল এদিক থেকে খবর দিলেই গাড়ি রওনা হয়ে যাবে। সে গাড়ি পৌঁছোতে লাগল মিনিট কুড়ি। জামার কলার ধরে দুজনকে তোলা হল গাড়িতে। সাইকেল ভ্যানটাকেও বাজেয়াপ্ত করা হল। বিপিন সেটার দায়িত্ব নিল। জোড়গাছি থেকে পুলিশের মাহিন্দ্রা আর সবজিবোঝাই ভ্যান যখন রওনা দিয়েছে গাজোল থানার দিকে, ভোরের আলোয় তখন চারপাশ বেশ স্পষ্ট। মিন্টু এতক্ষণে আঘাতের যন্ত্রণাটা অনেকটা হজম করে ফেলেছে। সে কাঁপা গলায় এসআই প্রতীক সেনের উদ্দেশে বলল, “আপনারা শুধু আমাদের মতো ছিঁচকেদেরই ধরেন। ওদিকে যে লোহালক্কর ঢুকছে, তারা ঠিক পার পেয়ে যাবে।”
প্রতীক সেনের চোয়াল শক্ত হল। মিন্টুর বক্তব্যে এক শ্রেণীর অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশের চোখ বুজে থাকার অপমানজনক ইঙ্গিত ছিল বটে, কিন্তু তাঁর কানে ধাক্কা মেরেছে অন্য একটি শব্দ— লোহালক্কর!
মিন্টুর দিকে কড়া একটা নজর দিয়ে প্রতীক বললেন, “আগে ঘরে চল। একটু খাতিরযত্ন করি, তারপর তোর গল্প শুনবো।”
১২
ইসমাইলের বাড়িয়ে দেওয়া পা টপকে, রাজাকে মোক্ষমভাবে কাটিয়ে সামনে এগিয়ে আসা অশ্বিনের মাথার উপর দিয়ে হালকা চেপে বলটা বারপোস্টের তলায় পাঠিয়ে দেওয়া মাত্রই স্যার “ব্র্যাভো পল্টু” বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। জয় সিটি বাজিয়ে সকলের কানে তালা লাগিয়ে দিল। পল্টু নিজেও ভাবতে পারেনি নিয়মিত প্র্যাকটিসে থাকা ছেলেগুলোর সঙ্গে সে এঁটে উঠতে পারবে কিন্তু গোলটা করার পর তার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। অনেকদিন বাদে সে যেন ফিরে যাচ্ছে বিরামপুরে তার পাড়ার মাঠে।
খেলা চলল আরো মিনিট পনেরো এবং বাকিদের রীতিমতো নাস্তানাবুদ করতে পারলেও অশ্বিনের দুর্ভেদ্য প্রাচীরে বারবার ধাক্কা খেলো পল্টু। অবাক হচ্ছিল সে। কীভাবে ঠিক সময়ে গোল থেকে বেরিয়ে এসে স্লাইড করে স্ট্রাইকারের পা থেকে বল ছিনিয়ে নিতে হয়, সেটা অশ্বিনকে দেখে শেখা উচিত। কর্নার কিক থেকে তিনটে নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দিল অশ্বিন স্রেফ নিখুঁতভাবে হেডারকে আগে থেকে চিহ্নিত করে নিয়ে। শেষের দিকে পায়ে একটু চোট লাগায় মাঠের বাইরে বসেছিল পল্টু। খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে অশ্বিনের বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিশ্চিত পেনাল্টি গোলটা বাঁচানো দেখে সে চিৎকার করে হাততালি দিয়ে উঠল।
খেলার পর রণজিৎস্যার অশ্বিনের পিঠে হাত রেখে বললেন, “শোন অশ্বিন, এবার কিন্তু ফ্রেন্ডশিপ কাপে ক্যাপ্টেন তোকেই হতে হবে। তুই বাকিদের চেয়ে বড় আর গোলকিপারের সবচেয়ে বড় সুবিধে হল ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসা ছেলে যেমন সামনে কে কী করছে সব দেখতে পায়, গোলকিপারও তেমন সামনের প্রতিটা প্লেয়ারের পজিশন দেখতে পায়।”
অশ্বিন ক্যাপ্টেন হবে শুনে সকলেই উচ্ছ্বসিত হল। একমাত্র একটু দুঃখ পেতে পারতো গত বছরের ক্যাপ্টেন পিনাকী, কিন্তু সে এবার টিমেই নেই। পিনাকীর বাবা গত বছর পুজোর সময় ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান। তারপর থেকে ওঁর ব্যবসার কাজ সেই দেখে। খেলাধুলো তার মাথায় উঠেছে এখন। স্যারের এ হেন ঘোষণা শুনে অশ্বিন হাবার মতো চেয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর স্যারকে প্রণাম করতে গেল। স্যার ওকে থামিয়ে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, “এসব নয়। টুর্নামেন্ট কিন্তু কঠিন হবে। প্রতিযোগিতা কঠিন না হলে আর মজা কিসের। জান লড়িয়ে খেলবি। যদি প্রভাতী সংঘ ফ্রেন্ডশিপ কাপ ধরে রাখতে পারে তাহলেই আমি খুশি।”
স্যার আজ সাড়ে ছ’টায় মাঠ ছাড়লেন। শিলিগুড়িতে অ্যাকাডেমির জমির ব্যাপারে কথাবার্তা আছে তাই আগামীকাল ও পরশু প্র্যাকটিসে আসবেন না। কিন্তু কড়া নির্দেশ দিয়ে গেলেন, “জাস্ট প্র্যাকটিস এই দু’ দিন। কোনো রকম ম্যাচ ফ্যাচ খেলতে যাবি না নিজেদের মধ্যে বা অন্য কোনো টিমের সঙ্গে। এখন কোনো রকম ভুলভাল ইনজুরি হলে কিন্তু টুর্নামেন্টে ডাগ আউটে বসে চোখের জল ফেলতে হবে বলে দিলাম।”
পল্টুর খুব খারাপ লাগছিল। রাজাদা বলছিল ফ্রেন্ডশিপ কাপ হবে জুলাই মাসে। গরমের ছুটির পর স্কুল খুলে যাবে জুনের মাঝামাঝি কাজেই কোনোভাবেই এখানে থাকা যাবে না। সে অবশ্য প্রভাতী সংঘের টিমে ঢুকতে পারবে না তবু ভালো খেলা তো দেখতে পারত। সে কিছুটা মনমরা হয়ে দীপেশ আর রাজাদার সঙ্গে মাঠ ছাড়ছিল। দীপেশের খেলায় আগ্রহ নেই। তার আর তর সইছে না চিকেনের দোকানে যাওয়ার জন্য। আজ মেসো চিকেন হরিয়ালি তন্দুর বানাবে, মাংস নেওয়ার জন্য রাজাদাকে কাল রাতে টাকা দিয়ে রেখেছে। হাইস্কুলের মাঠের ঠিক বাইরেই পরপর মুরগির মাংসের দোকান। তাগড়া তাগড়া কালো, বাদামি দেশি মুরগি গলা কাঁপিয়ে কক কক করছে খাঁচায় বসে। দীপেশের জিভ নোনতা হয়ে উঠছিল।
পল্টুর গা শিরশির করে উঠল মাংসের দোকানের বঁটির গায়ে লেগে থাকা রক্ত আর একপাশে ডাঁই করে রাখা রক্তমাখা মুরগির পালক দেখে। সে চোখ সরিয়ে নিল অন্যদিকে। তার শরীরের মধ্যে কেমন যেন করছে।
সবে রাজাদার পছন্দসই একটা মুরগিকে কেটেকুটে পিস করতে বসেছে দোকানদার, এমন সময় জয় লক্ষ্য করল বেশ কিছু লোক বিদ্রোহীর মোড় পেরিয়ে থানার দিকে ছুটছে। দূর থেকে ভেসে আসা “ধরা পড়েছে” কথাটা ওদের কানে এসেছে।
জয় বলল, “তোরা মাংস কেন, আমি যাই। কী হয়েছে কেসটা দেখি একটু।”
রাজাদা প্রতিবাদ করে উঠল, “আমরাও যাবো। দাঁড়া না দুমিনিট। হয়েই তো গেছে।”
দোকানদার ঝটপট মাংস সাইজ করে প্যাকেটে ভরে রাজার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “চলো, আমিও যাই, দেখে আসি আবার কোন বাওয়াল লাগল।”
ওরা যখন থানার কাছে পৌঁছোল তখন সেখানে বেশ ভিড় জমে গেছে। অনেকেই বুঝতে চাইছে প্রকৃত ঘটনা। থানার গেটের সামনে একটা মাঝবয়সি বড়সড় চেহারার লোক দাঁড়িয়েছিল। সে ভিড়ের দিকে এগিয়ে আসতেই সকলে, “কী হয়েছে, কী হয়েছে” করে হামলে পড়ল। লোকটা বলল, “কী আবার? জাল নোট। তার সঙ্গে সাইকেল ভ্যানের সবজির মধ্যে লাল বড়িও পেয়েছে।”
‘লাল বড়ি’ শুনে পল্টু চমকে উঠল। বিরামপুরে যে লাল বড়ির কথা সে খুব শুনেছে, ওরা কি তার কথাই বলছে, ওর মনে প্রশ্ন জাগলো।
দীপেশ সরলভাবে প্রশ্ন করল, “লাল বড়িটা কী জিনিস রাজাদা?”
গলা নামিয়ে উত্তরটা জয় দিল, “আছে আছে। ঘ্যামা জিনিস। আমার কাছে আছে চারটে। একদিন টেস্ট করবি নাকি?”
পল্টু বলল, “ইয়াবা!”
রাজা আর জয় চমকে উঠল সেটা শুনে।
১৩
পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকে আসা রোদের আলো আয়েশার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। অচেনা জায়গায় প্রথম রাতের পর যখন ঘুম ভাঙে, আশপাশটা সাময়িকভাবে একটু অচেনা লাগে। সেই ঘোরটুকু কেটে যেতেই আয়েশার চোখ গেল তাঁর বাঁ পাশে। বাঁ দিকে পাশ ফিরে গভীর ঘুমে ডুবে রয়েছেন সঞ্জয়শেখর। তাঁর উন্মুক্ত পৃষ্ঠদেশের দিকে চাইতেই আয়েশার গোটা শরীরে একটা তরঙ্গের দুরন্তপনা শুরু হল। আবার যেন তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠছে সে। সঞ্জয়শেখরের মনটা কিছুদিন ধরে চিনছিলেন আয়েশা, একে অপরের শরীরের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন গত রাতে। এই তৃপ্তিটাই আয়েশার শরীরকে কেউ দিতে পারেনি আগে। এমন স্পর্শ তিনি আগে পাননি। এখনও যেন আয়েশার গোটা শরীরে সেই স্পর্শ লেগে আছে।
গত রাতে সঞ্জয়শেখর যে মুহূর্তে তাঁর কোমরের কাছে হাত রেখেছিলেন, আয়েশা বুঝেছিলেন আত্মসমর্পণ স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। মন একেক সময় আড়ষ্ট হতে চাইলেও শরীর যেন বড় অবাধ্য হয়ে উঠছিল নতুনের নেশায়। বহিরাগতের প্রবেশ যখন ক্রমশ গতি পাচ্ছে, আয়েশার মনে হচ্ছিল সে মুহূর্তের যেন কোনো শেষ না আসে।
চোখের ক্লান্তি কাটলেও আয়েশার মন আর দেহ এখনও পড়ে আছে গত রাতেই। তবু বিছানা ছেড়ে উঠলেন তিনি। তাঁর মন বাতানুকূল যন্ত্রের কৃত্রিমতা নয়, চাইছে প্রাকৃতিক বাতাস। দুধসাদা নাইটগাউনে নিজের সমস্ত ঐশ্বর্যকে মুড়ে নিয়ে ঘরের বাইরে এলেন আয়েশা। পাশের ঘরটি শুভঙ্করের কিন্তু তাকে ঘরের বাইরেই পেলেন আয়েশা। টানা বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে সে চায়ে তৃপ্তির চুমুক দিচ্ছে।
ম্যাডামের দিকে চোখ যেতেই যেন শুভঙ্করের মনে হল তার সব ভাবনাচিন্তা হঠাৎ থমকে গেছে। কী অপরূপ দেখাচ্ছে ম্যাডামকে। সাদা গাউনের পাতলা দেওয়াল ভেদ করে ফুটে উঠছে অন্দরমহলের ছাপ, এল চুল গালের উপর দিয়ে এসে পড়েছে বুকের উপর। শুভঙ্করের চাহনিতে সব তালগোল পাকিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতটা সহজেই পড়ে ফেলতে পারলেন আয়েশা। কেরিয়ারের একেবারে গোড়ার দিকে বেশ কয়েকবার এমন ঘোর লেগে যাওয়া চাহনি দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর।
“সব ঠিক আছে তো শুভ? আমি কিন্তু লনে হাঁটতে যাবো,” বারান্দার রেলিংয়ের ওপারে বিছিয়ে থাকা সবুজ ঘাসের গালিচার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন অভিনেত্রী।
শুভ চায়ের কাপ বেতের টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল, “হ্যাঁ ম্যাডাম, ম্যানেজারকে বলা আছে। এমনিতেই এটা রিসর্টের প্রিমিয়াম জোন। সাধারণ গেস্টরা এদিকে আসে না। আর আমরা ছাড়া এই জোনে এখন কোনো বুকিং নেই।”
“গুড” বলে আয়েশা স্লিপার জোড়া বারান্দায় ছেড়ে রেখে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন ছাঁটা ঘাসের লনে।
আহা, কী আরাম! মে মাস হলেও কলকাতার দহনজ্বালা এখানে নেই। রোদের তাপ গায়ে লাগছে বটে কিন্তু বাতাসে একটা আরামের ছোঁয়া আছে, একটা বন্য ঘ্রাণ আছে। দু’ হাত দু’ দিকে প্রসারিত করে, চোখ বুজে বড় করে শ্বাস নিলেন আয়েশা। নাক হয়ে সুড়ঙ্গপথে যেন একটা টাটকা তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর শরীরের বাকি অংশে। এই গালিচার উপর ছুটে বেড়াতে ইচ্ছে করছে তাঁর, শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে এই কচি ঘাসের বিছানায়। আয়েশার মনে পড়ছে গত বছর মে মাসের কথা। একটি টিভি কমার্শিয়ালের জন্য এই ডুয়ার্সেই শ্যুটিং করতে এসেছিলেন তিনি। সেখানেও এরকম ঘাসের উপর খালি পায়ে হেঁটে বেড়াতে হয়েছিল তাঁকে শটের জন্য। সেদিনের অভিব্যক্তিটা ছিল কৃত্রিম, কিন্তু আজ যেন সবুজ ঘাস তার স্পর্শ আর গন্ধ দিয়ে সতেজতা ছড়িয়ে দিচ্ছে তাঁর শরীর-মন জুড়ে। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে আয়েশার, বিগত কয়েক মাসের মানসিক চাপ, কাজের জায়গার কঠোর পরিশ্রম সবকিছু ভুলে জীবনটাকে নতুন করে দেখতে ইচ্ছে করছে।
একা একা এই আনন্দ উপভোগ করা যায়! আয়েশা ছুটে গেলেন তাঁর ঘরে, সঞ্জয়শেখরের প্রবল অনিচ্ছা ও ক্লান্তিকে অগ্রাহ্য করে তাঁকেও নামালেন সবুজ ঘাসের গালিচায়। আয়েশার শিশুসুলভ উচ্ছলতা সঞ্জয়শেখরকে বাধ্য করল আড়ষ্টতা ভেঙে সাবলীল হতে। তাঁরও মনে একটা তরঙ্গ খেলা করছে। আয়েশাকে তাঁর ভালো লাগতে শুরু করে “আড়াল সরিয়ে” ছবির কাজ চলাকালীন। প্রতিটা শটের আগে যখন ব্রিফ করতেন ফ্লোরে, সঞ্জয় অনুভব করতেন তাঁর কল্পনায় যে দৃশ্য সাজানো আছে, আয়েশা তাঁর ভাবনায় সেই দৃশ্যকে আরো সুন্দর করে সাজিয়ে নিচ্ছেন। সঞ্জয় বাহবা কুড়িয়েছেন বটে ছবিটি দক্ষ হাতে পরিচালনা করার জন্য কিন্তু তিনি জানেন প্রতিটি দৃশ্যে আয়েশা যদি নিজেকে নিংড়ে না দিতেন, “আড়াল সরিয়ে” জনপ্রিয়তাও পেতো না, মৌলবাদীদের তীব্র আক্রমণও তার দিকে ধেয়ে আসতো না।
ঘাসের সতেজতা আরাম দিলেও প্রখর গ্রীষ্মের রোদ ওঁদের গালিচায় বসে থাকতে দিল না বেশিক্ষণ। বাতানুকূল স্যুইটে ফিরে এসে উৎকৃষ্ট চায়ে তৃপ্তি খুঁজলেন ওঁরা। আয়েশা চাইছিলেন সঞ্জয়শেখর আরো কিছুক্ষণ তাঁকে সঙ্গ দিন কিন্তু তা হল না। সঞ্জয় উঠেছেন সামান্য দূরে অন্য একটি হোটেলে। দুজনের মধ্যে কথা হয়ে রইল বিকেলে রোদ পড়লে দুজনে মূর্তি নদীর ধারে হাঁটবেন।
সঞ্জয় তাঁর আগামী ছবির চিত্রনাট্যের স্পাইরাল বাইন্ডিং করা কপি গতকাল নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি রিসর্ট ছাড়ার পর শত চেষ্টা করেও সেই ফাইলে মন বসাতে পারলেন না আয়েশা। অক্ষর, শব্দ সব ছাপিয়ে বারবার আয়েশার চোখের সামনে ভেসে উঠছেন গত রাতের সঞ্জয়শেখর। তাঁর পৌরুষ, যা ছাপ রেখে গিয়েছে আয়েশার শরীরের আনাচেকানাচে, যেন আবার তৃষ্ণার্ত করে তুলছে তাঁকে।
১৪
নয়ডা সেক্টর ২৪এ এনএটিসি’র সদর দফতরে নিজের কেবিনে চিন্তান্বিত মুখে বসেছিলেন ডিআইজি সুভাষ গোয়েল। পশ্চিমবঙ্গের ঘাটালে বিস্ফোরণের পরে কেটে গেছে প্রায় কুড়ি দিন। ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ এবং ঢাকায় গিয়ে রিবাতের বড় মাথাকে জেরা করে আসার পর তদন্ত তেমন গতি পায়নি। নানান সূত্রকে সজাগ করে দেওয়া সত্ত্বেও গত বাহাত্তর ঘণ্টায় রিবাতের উপপ্রধান ইখলাস রুবেলের বর্তমান অবস্থান সম্বন্ধে কোনো খবর আসেনি।
দলের মাথা জাহির আহমেদ এই মুহূর্তে তুরস্কে, সে খবর সুভাষ জানেন।
জাহিরকে নিয়ে গোয়েল উদ্িবগ্ন নন কারণ তিনি কেবল হুকুম করেন। নিজেকে স্পিরিচুয়াল স্পিকার হিসেবে পরিচয় দিয়ে দেশে দেশে ভাষণ দিয়ে বেড়ান। আসলে সেসব ভাষণের নেপথ্যে কোন উদ্দেশ্য কাজ করে তা গোয়েল জানেন, এনএটিসি জানে এবং কেন্দ্রীয় সরকারও জানে। কিন্তু রিবাতের আসল মাস্টারমাইন্ড তাদের কমান্ডার-ইন-চিফ ইখলাস। ভয়ংকর শয়তান। যেমন তার শারীরিক দক্ষতা, তেমনই তার মেধা। বাংলা ছাড়া পাঁচটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারে। অসাধারণ অভিনয় ক্ষমতা এবং বরফের মতো ঠান্ডা মাথা। করাচিতে দেড় বছর এবং প্যারিসে এক বছর সে কাটিয়ে এসেছে, পুলিশ তার টিকিও ছুঁতে পারেনি। গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে রিবাতের বিভিন্ন মডিউল তৈরি ও তাদের তদারকির কাজ সে করে চলেছে।
ঘাটালে যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বিস্ফোরণে তারাও যে ইখলাসেরই বসানো লোক, সে বিষয়ে এনএটিসি এখন নিশ্চিত। এরই মধ্যে বসিরহাট সহ উত্তর চব্বিশ পরগণার একাধিক থানাকে আইবি সতর্ক করে জানিয়েছে যে সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পার হয়ে বসিরহাটে ঢুকেছে। গতকালই কলকাতা পুলিশের এসটিএফ তল্লাশি চালিয়েছে বসিরহাটের সংগ্রামপুরে কিন্তু তেমন কারোর সন্ধান পায়নি। কিন্তু সূত্র মারফত তাদের কাছে খবর এসেছে যে ওই তিনজন ইতিমধ্যেই কলকাতার দিকে চলে গেছে।
ক্যানসারের মতো ধীরে ধীরে অনগ্রসর শ্রেণীর যুবসমাজে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে যারা, তাদের ঘায়েল করতে গেলে ইখলাস রুবেলের মতো পান্ডাকে বাগে পেতেই হবে। কিন্তু অভিজ্ঞ অফিসার সুভাষ গোয়েল বুঝতে পারছেন কাজটি অত্যন্ত কঠিন। এই লড়াইতে জিততে গেলে তাঁর দরকার এমন একজন সৈনিককে, যে ওই ইখলাস রুবেলের মতোই সাধারণের ভিড়ে মিশে নজরদারি চালাতে পারে। আছে সেরকম একজন। গত তিন বছরে এনএটিসি’র চারটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পিছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার বাপ-মায়ের দেওয়া একটা নাম অবশ্যই আছে কিন্তু তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং ক্ষিপ্রতার কারণে ডিপার্টমেন্টে সকলে তাকে একটি কোড নেমেই চেনে— হক (HAWK)। সেই হককেই তলব পাঠিয়েছেন গোয়েল। পশ্চিমবঙ্গই যে রিবাতের টার্গেট সেটা ধরেই নেওয়া যায় আর তাই এই যুদ্ধে সেই রাজ্যের প্রতিটি কোনা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হকই গোয়েলের সেরা বাজি। কোথা থেকে সে আসছে তা জানেন না গোয়েলও কারণ কর্তব্যরত হক তার বিচরণের আকাশ সম্পর্কে কাউকে জানায় না। সে কাজ করে গোপনে কিন্তু আড়ালে থেকে নয়। সাধারণের ভিড়ে মিশে। এই মুহূর্তে সেভাবেই হয়তো নজরদারি চালাচ্ছে এমন কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের উপরে, যাদের গতিবিধিতে কোনো অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু সেই অসম্ভবটাকেই সম্ভব করে তোলে হক। এই জায়গাতেই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও বুদ্ধি সংস্থার বহু দক্ষ অফিসারের থেকে তাকে এগিয়ে রাখে।
ঘড়ি দেখলেন গোয়েল। বড়জোর আর আধ ঘণ্টা। তার মধ্যেই হকের এসে পৌঁছে যাওয়া উচিত তাঁর কাছে।
নয়াদিল্লির মান্ডি হাউস মেট্রো স্টেশনে ট্রেনের শাটার দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে একজন দ্রুত ঢুকে এল কামরায়। তার দ্রুততা ছাড়া চেহারায় আর এমন কিছুই নেই যা কামরার বাকি যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। প্রত্যেকে নিজেদের চিন্তায় মগ্ন। একদল তরুণ-তরুণী দিল্লি ইউনিভার্সিটির নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করছে, দুজন মধ্যবয়সি মহিলা একে অপরের সঙ্গে তাঁদের বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যা নিয়ে উত্তেজিত কথাবার্তায় মগ্ন। সামান্য দূরে একটি ছোট্ট শিশু বারবার ঘুমে ঢলে পড়ছে তার মায়ের গায়ে।
কিছুটা পথ পেরোতেই অন্ধকার সুড়ঙ্গ ছেড়ে ট্রেন বাইরের প্রকৃতির স্বাদ দিল। প্রায় পৌনে ছ’টা এখন, বিকেলের সোনা রোদ ট্রেনের কামরাকে যেন ভাসিয়ে দিচ্ছে আলোয়। দরজার কাছে দাঁড়ানো প্যান্ট-শার্ট পরা বেতের মতো শরীরের তরুণীর গালে রোদের আলো যেন ঠিকরে ফেরত আসছে। অনেকেই স্থির দৃষ্টিতে চেখে নিতে চাইছে সেই রূপসীর রূপের ছটা।
ট্রেন অক্ষরধাম পেরিয়ে ছুটে চলেছে ময়ূর বিহারের পথে।
নগরায়নের চেহারাটা মাটি থেকে অনেকটা উচ্চতায় ধাবমান এই ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখতে দেখতে যে কারোরই মনে হতে বাধ্য যে হ্যাঁ এটিই দেশের রাজধানী বটে। ঝাঁ চকচকে সব ইমারত, তাদের কেউ কেউ দৈত্যের মতো চেহারা নিয়ে পশ্চিমের সূর্যের সামনে দেওয়াল তুলেছে। সুপরিকল্পিত নকশা অবলম্বনে গড়ে ওঠা শহরাঞ্চলকে উপর থেকে ভারি সুন্দর দেখায়। মনে হয় সব কিছু বড় শান্ত এখানে। কিন্তু তারই অনেক গলিতে, ঘটে যায় কত ঘটনা। আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো বাজপাখির নজর এড়ায় না কোনো কিছুই।
ট্রেন যখন নয়ডা সিটি সেন্টারে এসে থামল তখন রোদের তাপ আরেকটু কমে এসেছে। সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত রাস্তায় নেমে এসে অটোয় উঠল মান্ডি হাউস থেকে ট্রেনে ওঠা সেই চরিত্র। মুখে শুধু বলল, “এনটিপিসি।” এই এনটিপিসি’র বহুতল অফিসের ঠিক পাশেই ন্যাশনাল অ্যান্টি টেররিস্ট সেলের সদর দফতর। সেখানে বসে তখন টেবিলের উপর রাখা কাচের পেপারওয়েটটা অন্যমনস্কভাবে ঘোরাচ্ছিলেন ডিআইজি গোয়েল। কর্কশ শব্দে কাচের গোলকটা ঘুরছে তার নিজস্ব ছন্দে ও গতিতে। এক সময় হাত দিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন গোয়েল, কারণ তাঁর কানে আসছে আরেকটি শব্দ। ভারি বুটের শব্দ। এই শব্দ ভীষণ চেনা তাঁর। সে এসে গেছে।
ঠক ঠক ঠক— শব্দ হল গোয়েলের কেবিনের দরজায়।
“কাম ইন,” নির্দেশ দিলেন তিনি।
দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির, স্বাস্থ্যবান এক তরুণ। গায়ের রঙ মাজা, পরনে সাদা শার্ট, টাক ইন করা। ঢুকেই সে তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একটা স্যালুট করল। গোয়েল বুঝে নিলেন হক কোনো মিশনের মাঝপথ থেকে নয়, নতুন অ্যাসাইনমেন্টের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েই এসেছে।
