ইনজুরি টাইম – ২০

২০

ম্যাডামের থেকে কিছুটা সময়ের জন্য পিছিয়ে পড়েছিল শুভঙ্কর। তবে তার নজর ছিল ব্রিজের দিকেই। একটা বাইককে ওঁদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখেওছিল সে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে যে এমন ঘটনা ঘটে যাবে তা তার অনুমান করতে পারার কথা নয়। শুভঙ্কর দৌড়ে গেল ম্যাডামের দিকে। ব্রিজের দেওয়ালে এলিয়ে পড়েছে তাঁর দেহ, সাদা সিফনের শাড়ির উপর তখনও কয়েক ফোঁটা রক্ত টাটকা বুদবুদের মতো জেগে আছে।

আয়েশার নিষ্প্রাণ চোখ যেন শুভঙ্করের দিকেই চেয়ে আছে। তাঁর আলগা হয়ে যাওয়া হাতের মুঠোর পাশে পড়ে আছে মোবাইলটা। একটু আগেও যে মানুষটা এত প্রাণোচ্ছলভাবে হাঁটছিল ব্রিজের উপর দিয়ে, তার এই পরিণতি যেন কল্পনাই করা যায় না। ভয়ানক দৃশ্য। শিউরে উঠতে হয়। আয়েশার স্তব্ধ চাহনির দিকে শুভঙ্করের চোখ চলে যাচ্ছে বারবার। সে চোখ সরিয়ে নিল।

উপর্যুপরি গুলির শব্দ ব্রিজ থেকে হোটেল ফেরত পর্যটকদেরও কানে গিয়েছিল। অনেকে ছুটে এল শুভঙ্করকে অনুসরণ করে। ভয়, আতঙ্ক, ক্রোধ, বিস্ময় মিশ্রিত অভিব্যক্তি প্রকাশ পাচ্ছিল সকলের শরীরী ভাষায়। ইতিমধ্যেই ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন এগিয়ে গিয়ে সঞ্জয়শেখরের দেহটা সোজা করে পরীক্ষা করতে শুরু করেছে।

স্থানীয় লোকেদের তৎপরতায় মেটেলি থানায় খবর পৌঁছে গেল দ্রুত। ইন্সপেক্টর দীপঙ্কর বাগচী চারজন কনস্টেবলকে নিয়ে স্পটে পৌঁছে গেলেন আধ ঘণ্টার মধ্যে। ইতিমধ্যে মিষ্টির গন্ধ পাওয়া মাছির মতো দুজন স্থানীয় সাংবাদিকও ব্রিজের উপর এসে হাজির হয়েছিল। তাদের থেকে খবর পেয়ে উত্তরবঙ্গের এক নম্বর নিউজ চ্যানেলের ওবি ভ্যানও এসে উপস্থিত হল।

প্রত্যক্ষদর্শী বলতে একমাত্র শুভঙ্কর। তার বয়ানের ভিত্তিতেই হাইরোডের দিকে আততায়ীদের খোঁজে পাঠানোর জন্য পার্শ্ববর্তী থানা থেকে ফোর্স আনিয়ে নিলেন দীপঙ্কর বাগচী। আট জন পুলিশকর্মী দু’ ভাগে ভাগ হয়ে গেলেন। এক দল একটি পুলিশ ভ্যান নিয়ে খানুয়া মোড় থেকে ডান দিকে ঘুরে জলদাপাড়ার রাস্তা ধরল, দ্বিতীয় দল আরেকটি গাড়ি নিয়ে গেল উলটোদিকে। শুভঙ্কর যদিও মনে করতে পারছে না বাইকটা ব্রিজ থেকে নেমে সোজা গিয়েছিল না ডান দিকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরে পড়েছিল, তবু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইন্সপেক্টর দল দুটিকে হাইরোডেই পাঠালেন। খুন করে যারা পালাচ্ছে তারা মসৃণ রাস্তাই চাইবে যাতে দ্রুত অনেকটা দূরে চলে যাওয়া যায়। জঙ্গলের মধ্যে সেই সুবিধে নেই।

পুলিশের ডাক্তারের নির্দেশে লাশ দুটো চালান করা হল পোস্টমর্টেমের জন্য। শুভঙ্করকে নিয়ে রিসর্টে পৌঁছোলেন বাগচী। তাকে মানসিক ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠার সময় দিলেন অফিসার। তারপর জেনে নিলেন ঘটনাক্রম। রিসর্টের ম্যানেজারও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইন্সপেক্টরকে অনেক তথ্য জোগালেন। মনে মনে সেসব নোট করে নিচ্ছিলেন বাগচী। ইতিমধ্যে দুজন কনস্টেবল আয়েশার ঘরেও তদন্ত চালিয়ে এসে রিপোর্ট দিয়েছে।

মার্ডার কেসের আই উইটনেস বলে কথা। তাও আবার সেলিব্রিটির মার্ডার। অফিসিয়াল জবানবন্দি চাই। বাগচীর ইচ্ছে করছিল না এই অবস্থায় বিধ্বস্ত ভদ্রলোকটিকে থানায় নিয়ে যেতে, কিন্তু উপায় নেই। শুভঙ্কর অবশ্য থানায় যেতে আপত্তি করল না। শুধু বাগচীর অনুমতি নিয়ে গায়ের জামাটা বদলে নিল। যদিও গ্রীষ্মের দাবদাহ এখানে নেই, তবুও আচমকা শারীরিক ও মানসিক উত্তেজনার কারণে ঘামে তার জামাটা একেবারে ভিজে সপসপে হয়ে গেছে।

রিসর্টের সামনে থেকে বাগচী যখন থানা থেকে পাঠানো দ্বিতীয় ভ্যানে উঠছেন, তাঁর বুকপকেটে মোবাইল বেজে উঠল। ওপারের বার্তা তাঁর ভুরুতে গভীর ভাঁজ ফেলল।

বেশ জোরালো একটা “হোয়াট” বেরিয়ে এল তাঁর গলা দিয়ে। বড় খবরের আশায় সাংবাদিকেরা রিসর্টের বাইরে অপেক্ষা করছিলই। ইন্সপেক্টরের প্রতিক্রিয়া দেখে প্রায় হামলে পড়ল “হোয়াট”-এর রহস্য জানতে।

গাড়িতে উঠতে উঠতে দৃশ্যতই বিরক্ত বাগচী বললেন, “সাউথ খয়েরবারির কাছে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। স্করপিওর সঙ্গে একটা মোটরবাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। একজন বাইক আরোহী মারা গেছে। আমরা খতিয়ে দেখছি এই বাইকই সেই বাইক কিনা।”

২১

ঘন অন্ধকারে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বেশ কিছুক্ষণ ছুটে বেড়ানোর পর এক জায়গায় এসে থেমেছিল জামাল। বড় রাস্তা থেকে অনেকটা ভিতরে চলে এসেছে সে। একটা মোটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসল সে। আর এক পা’ও এগোনোর শক্তি নেই তার শরীরে। যন্ত্রণায় তার দুই পা আর বাঁ কনুইটা টনটন করছে। বাইকটা চিৎ হয়ে পড়ার সময় কনুইটা প্রথমে রাস্তার উপর পড়েছিল। তারপর মাথাটা ঠুকে যায়। যে মিশনে তারা এসেছে তাতে ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধ, তাই দলের সহযোদ্ধাকে কিছুটা দূরে ছিটকে গিয়ে পড়তে দেখেও তাকে উদ্ধার করার জন্য সময় নষ্ট করেনি জামাল। এটাই নিয়ম তাদের দলে, এটাই কমান্ডার-ইন-চিফের নির্দেশ।

মাথার যন্ত্রণাটাও ক্রমশ বাড়ছে। জামাল বুঝল তার পক্ষে এই চোট খাওয়া শরীর নিয়ে বেশিক্ষণ পালিয়ে বেড়ানো সহজ হবে না। যে গাড়িটার সঙ্গে তাদের বাইকের ধাক্কা লেগেছে, তাদের ড্রাইভার নেমে রাস্তার ধারে এসে পৌঁছোনোর আগেই সে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, তবু পুলিশ খোঁজ করতে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকবেই। মূর্তি ব্রিজের ঘটনা এতক্ষণেও পুলিশের কানে যায়নি, এটা হতেই পারে না। হাইওয়ের উপরে বাইক অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়ে তারা দ্রুত এদিকে আসবে।

কমান্ডারকে আপডেট দেওয়া এবং পরবর্তী নির্দেশ পাওয়ার জন্য কানে ফোন লাগাল জামাল। স্পিকারের মধ্যে দিয়ে ভেসে আসা রিঙটোনের মৃদু শব্দও যেন তার কানে হাতুড়ি পেটানোর মতো ঠেকছে। ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেল। জামালের শরীরটা যেন সব বাঁধন আলগা করে ফেলতে চাইছে। সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়ছে যন্ত্রণা। চোখ দুটো যেন বন্ধ হয়ে আসছে। ঠোঁটের কাছে কিছু একটা সুড়সুড় করছে বুঝে জিভ দিয়ে সেটাকে সরিয়ে দিতে যেতেই জামাল নোনতা স্বাদ টের পেল। এই স্বাদ সে জানে। মাথা থেকে বেরিয়ে আসা রক্ত নামছে মুখ বেয়ে।

ফোনটা বেজে উঠল। প্রায় জড়িয়ে আসা গলায় জামাল কমান্ডারকে জানাল বর্তমান পরিস্থিতি। ইখলাস রুবেল স্পষ্টভাবে জানতে চাইছে তার চোট কতটা গুরুতর। জামাল লুকোনোর চেষ্টা করল না। চোট লুকিয়ে পালিয়ে বাঁচতে গিয়ে শেষে পুলিশের হাতে পড়লে তার দুই কূলই যাবে। জামাল জানাল তার অবস্থা। ফোনের ওপারে ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা। তারপর ভেসে এল একটাই শব্দ— “ডিডাক্ট।”

জামালের শরীর, মনের উপরে যেন মুহূর্তে এক আশ্চর্য শীতলতা নেমে এল। এই নির্দেশের অর্থ সে জানে। তাদের যুদ্ধে এই নির্দেশ পাওয়া এক সৈনিকের জন্য পরম গৌরবের, কিন্তু সেটা মিশনকে সফল করার জন্য পাওয়া গেলে তবেই। জামালের কাছে এই নির্দেশের অর্থ সে এই মুহূর্তে দলের কাছে বোঝা। আবেগহীন সৈনিক জামালের চোখ সহসা ছলছল করে উঠল। এভাবে যে সব হিসেব গুলিয়ে যাবে তা সে ভাবতেই পারেনি। অপারেশনটা একেবারে মসৃণ হয়েছিল। পুলিশ ভ্যান নিয়ে তাদের খোঁজে বেরোনোর আগেই খাকি পোশাকদের নাগালের বাইরে চলে যেত তারা। কোত্থেকে কী যে হয়ে গেল!

নির্দেশ নির্দেশই। তা অমান্য করার প্রশ্ন ওঠে না। বাঁ হাতটা প্রায় অকেজো, ডান হাতটাকে অতি কষ্টে পিছনে ঠেলে নিতম্বের ঠিক উপরে গোঁজা ধাতব যন্ত্রটাকে বের করে আনল জামাল। কানের ঠিক উপরে ইটালিয়ান অটোমেটিক নাইন এমএম পিস্তল রেবেটা নাইন্টি টু এফএস-এর নল ছুঁইয়ে চোখ বুজে ফেলল সে। কত দৃশ্য ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে। এতকাল স্মৃতির কোন বন্ধ ঘরে আটকা পড়েছিল তারা, জামাল জানতোও না। ট্রিগারে আঙুল রাখল সে। শেষবারের মতো স্মরণ করে নিল তার ঈশ্বরকে।

জঙ্গলের বাইরে রাস্তার উপরে পুলিশ ভ্যান এসে পৌঁছেছিল আধ ঘণ্টা আগে। মৃতদেহটাকে তুলে রাখা হয়েছিল ভ্যানের পিছনের সিটে। একজন পুলিশকর্মী প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান নিচ্ছিলেন। বাইকে আরোহী কজন ছিল তা তিনি মনে করতে পারছেন না। কিন্তু জঙ্গলের শুকনো পাতার উপর দিয়ে কারোর হাঁটাচলার শব্দ তিনি শুনেছেন বলে দাবি করছেন। দুজন পুলিশকর্মী জায়গাটা চিহ্নিত করে নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করেছিল। তাদের এক হাতে সার্ভিস রিভলভার, আরেক হাতে শক্তিশালী টর্চ।

অনেকক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে তল্লাশির পরে এবার কোন দিক যাবে, সে দিশা না পেয়ে সবে তারা এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে, এমন সময় ‘ঠাস’ করে একটা শব্দ সন্ধের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খান খান করে দিয়ে ভেসে এল কিছু দূর থেকে। আশেপাশের গাছে পাখিদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। ক্রমশ বাড়ছে তাদের গলার জোর। শব্দটাকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেল দুই পুলিশকর্মী। বিভিন্ন দিকে চঞ্চলভাবে ঘোরাঘুরি করার পর এক জায়গায় স্থির হল একটি টর্চের জোরালো সাদা আলো।

একটা গাছের মোটা কাণ্ডের আড়াল থেকে চেক চেক একটা কাপড় দেখা যাচ্ছে। জামার হাতা। এবার স্পষ্ট হল বাকি জিনিসগুলো। মাটিতে এলিয়ে পড়েছে একটা হাত, তাতে ঝকঝক করছে কিছু। এগিয়ে গেল ওরা। যেটা ঝকঝক করছে সেটার চেহারা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। নাইন এমএম পিস্তল। ওরা দুজন গাছটার দু’ পাশ থাকে ছুটে সামনে গিয়ে রিভলভার তাক করল। টর্চের আলোয় দেখা গেল গাছের গুঁড়ির কাছে এলিয়ে পড়ে থাকা একটা দেহ। মাথা রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

মোবাইলের বোতাম টিপে জামালের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল ইখলাস রুবেল। এক মুহূর্তের জন্য বিহ্বল হয়েছিল তার মতো যান্ত্রিক পিশাচও। তারপর মোবাইল থেকে সিমটা বের করে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছিল আগুনে। ওই সিমটার অস্তিত্ব তার এবং তার মিশনের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। চোখ বুজল ইখলাস রুবেল। অল্প কিছুদিনের মধ্যে দলের চারজন সম্পদ সে হারিয়েছে। বীরভূমের বিস্ফোরণের রহস্য নিয়ে এখনও হাতড়ে বেড়াচ্ছে এই বাংলার পুলিশ আর এনএটিসি। বিস্ফোরণ হঠাৎ ঘটল কীভাবে তা তারা এখনও খুঁজে বের করতে পারেনি। তারা এখনও জানে না বিস্ফোরণের আগের মুহূর্তে ছদ্মবেশী ইখলাস রুবেল ছিল ওই ঘরে। সে বুঝতে পেরেছিল আবু আনসার ইনটেলিজেন্সের খোচরদের নজরে পড়ে গেছে। আবু আনসারের পালিয়ে বাঁচার রাস্তা বন্ধ হয়ে আসছিল। উপায় ছিল একটাই। যে কাজের জন্য পরিচয় ভাঁড়িয়ে বসে থাকা, তা যখন করা সম্ভবই হল না, তখন সমস্ত সরঞ্জাম সমেত নিজেদের উড়িয়ে দাও। আজকের জামালের মতো ইখলাস রুবেলের নির্দেশ আবুও অমান্য করেনি সেদিন। রুবেল অবশ্য জবাবটা বীরভুমের মাটিতেই দিয়ে এসেছিল ইনটেলিজেন্সের সেই খোচরকে ধাওয়া করে গিয়ে তাকে নিকেশ করে ফেলে। মৃত্যুর আগের মুহূর্তে লোকটার চাহনি ভীষণ তৃপ্তি দিয়েছিল রুবেলকে। কাতরভাবে প্রাণভিক্ষা চাইছিল তার চোখ। রুবেলের ছুরি যখন তার গলায় চেপে বসেছিল, থরথর করে কেঁপেছিল লোকটার গোটা শরীর। সারা পৃথিবীটাই তাদের ভয়ে এই ভাবে কাঁপবে, এই স্বপ্নই সে দেখে।

চোখ খুলল ইখলাস রুবেল। বারবার ব্যর্থতার খবর তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠছে। সে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে নিল অপারেশনের পরবর্তী ধাপের জন্য। আত্মগোপন করে থাকার সময় ফুরিয়ে আসছে। এবার তাকে সামনে আসতে হবে। স্বমহিমায়।

২২

প্রায় দশ মিনিট স্তব্ধ বাসের মধ্যে বসে থাকার পর অধৈর্য হয়ে নেমে এল সুমনা। মে মাসের গরমে বাসের এই তপ্ত পরিবেশে টেকা কঠিন। গ্রীষ্মকালে গরম পড়ে ঠিকই কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে যেন পারদটা ধাপে ধাপে বাড়ছে। এখন সন্ধে সাড়ে সাতটা, তাতেও এই অসহনীয় অবস্থা। তাদের ছোটবেলায় সন্ধেবেলা এত গরম কখনোই থাকত না। সুমনার কামিজটা ঘামে ভিজে ওর শরীরের সঙ্গে একেবারে লেগে গেছে। বাস চললে তবু জানালা দিয়ে যে হাওয়া আসে তাতে স্বস্তি পাওয়া যায়। একবার তার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলে শরীর হাঁসফাস করে ওঠে।

কিসের জন্য এত যানজট সুমনা বুঝতে পারল না। সে নেমেছে রাঙাভিটায়। এখান থেকে বিদ্রোহীর মোড় অবধি গাড়ির লম্বা লাইন। হাঁটতে হাঁটতে সুমনার চোখ যাচ্ছিল বাসগুলোর দিকে, কানে আসছিল টুকরো টুকরো কথা। সে অনুমান করতে পারছিল এমন যানজট তারই মতো অন্য অনেককেই অবাক করেছে।

সারাদিনের ঘাম শুষে ওড়নাটাও ন্যাতা হয়ে গেছে। মুখের ঘাম মুছতে সেটার একটা মাথা নাকের কাছাকাছি আনতেই বোঁটকা গন্ধে তার গা গুলিয়ে উঠল। না, এই ঘামে ভেজা পোশাক তাড়াতাড়ি ছেড়ে ভালো করে স্নান না করলে শান্তি নেই। সুমনা গতি বাড়াল। আমন্ত্রণের পালা আজ মিটে গেছে। এবার শুধু আসল দিনে শুভ কাজটা সুষ্ঠুভাবে শুরু করতে পারলেই শান্তি। কত দিনের স্বপ্ন তার। এতদিন মনে হতো ধুর, কত দেরি… আর আজ যেন বিশ্বাসই হতে চাইছে না যে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাদেই তার জীবনের সেই মুহূর্তটা উপস্থিত হবে।

বিদ্রোহীর মোড়ে পৌঁছে টোটোয় উঠতে গিয়েও একটা ব্যাপার লক্ষ করে থমকে দাঁড়াল সুমনা। সামনেই বড় স্টেশনারি দোকানটার সামনে একটা বড়সড় ভিড়। বেশ বোঝা যায় দোকানের টিভির দিকেই সকলের নজর। আইপিএল চলছে বটে কিন্তু আজ কলকাতার খেলা নেই। তাহলে এত মানুষ আগ্রহ নিয়ে কী দেখছে? সুমনা দোকানের দিকে এগোল। একটা কণ্ঠস্বর ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। না এটা কখনোই খেলার কমেন্ট্রি নয়। খবর চলছে টিভিতে। একটা মহিলা কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। সুমনার পায়ের গতিবৃদ্ধির সঙ্গে শব্দটাও স্পষ্ট হতে থাকল— “তাঁর এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর এখনও টলিউডের কেউ বিশ্বাসই করতে পারছেন না। সকলেই বিস্মিত, শোকাহত। আজ সন্ধে ছ’ টা নাগাদ ডুয়ার্সের মূর্তি নদীর কাছে ব্রিজের উপর দুষ্কৃতীদের গুলিতে…”

এর বেশি আর শোনা হয়ে উঠল না সুমনার কারণ ব্যাগের মধ্যে থেকে মোবাইল বেজে উঠে তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। ব্যাগ থেকে ফোন বের করল সুমনা। তার বান্ধবী শর্মিলা কল করছে। ভিড় থেকে সামান্য সরে এসে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাল সুমনা।

“তুই কোথায়?”— শর্মিলার গলায় ভীষণ উত্তেজনা।

“এই তো বাড়ি ফিরছি। কেন রে?” সুমনা জবাব দিল।

“তুই খবর শুনিসনি?”

“কী… কী খবর? না শুনিনি তো! কী হয়েছে রে? এখানেও দেখছি সবাই টিভিতে খবর দেখছে।”

“সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে সুমি। আয়েশা সুলতানা মার্ডার্ড,” উত্তেজনায় শর্মিলার গলা কেঁপে গেল।

ফোন নামিয়ে নিল সুমনা। তার মাথা কাজ করছে না। আশেপাশের অন্ধকারের উপর আচমকা যেন আরেক পোঁচ চাপিয়ে দিয়েছে কেউ। একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছে সে। হাবার মতো দাঁড়িয়ে পড়েছে। এ কী শুনল সে? শর্মিলা ঠিক বলছে? ও ভুল শোনেনি তো! সুমনার কানে আসছে নিউজ চ্যানেলের সঞ্চালিকার কণ্ঠস্বর— মৃতদেহ পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। দুষ্কৃতীদের খোঁজে চারদিকে তল্লাশি শুরু করেছে পুলিশ। পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।

সুমনা নিজের বুকের মধ্যেকার ঢিপ ঢিপ শব্দটাও যেন শুনতে পাচ্ছে। তার শরীর যেন অসাড় হয়ে আসছে। তবু সে কোনো রকমে নিজেকে টেনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল দোকানের ভিড়ের মধ্যে। সে যে কয়েকদিন আগে এই আয়েশা সুলতানার হাত থেকে স্মারক নিয়েছে সে কথা এ তল্লাটে প্রায় সকলেই জানে। তার বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন ভিড়ের মধ্যে। সুমনাকে দেখতে পেয়েই বলে উঠলেন, “দেখ দেখি সুমি, কী কাণ্ড!”

এবার আরো অনেকেই সুমনাকে দেখতে পেয়ে দু’ পাশে সরে যেতে লাগল যাতে সে টিভিটা স্পষ্ট দেখতে পায়।

হ্যাঁ, ওই তো ব্রিজের লোহার রেলিঙয়ের ধারে পড়ে আছে মানুষটার শরীর। বীভৎস দৃশ্য তাই মৃতদেহের মুখ থেকে কোমর অবধি ব্লার করে দেওয়া হয়েছে। আরো একজনের মৃতদেহ দেখাচ্ছে টিভিতে। সুমনা পাথরের মূর্তির মতো চেয়ে রইল টিভির দিকে। তার মনের অবস্থা অনুমান করতে পেরে দোকানের মালিক একটা প্লাস্টিকের টুল এগিয়ে দিলেন দোকানের সামনে। ধপ করে তার উপর বসে পড়ল সুমনা। টিভিতে যে মানুষটাকে দেখাচ্ছে তার সঙ্গে মাত্র কয়েক মুহূর্তের আলাপ সুমনার তবু কেন যেন তার মনে হয়েছিল মানুষটা বড় আপন। সেই টিভি শোয়ের পরে সুমনা আয়েশা সুলতানার সম্বন্ধে অনেক পড়েছে, জেনেছে। সে জানে সম্প্রতি যে ছবিটার পরে তাঁর এত জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, সেটার জন্যই তাঁকে হুমকি, ধমকিও দেওয়া হচ্ছিল। তিনি নাকি নিজের ধর্মের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, এই ছিল ক্ষোভের কারণ। সুমনার মনের গভীরতম কক্ষ থেকে যেন একটা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে। তবে কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারা কথা বলবে সেই সব মেয়েরই পরিণতি হবে মৃত্যু? তার মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে মালালা ইউসুফযাই, আয়েশা সুলতানা আর তার মধ্যে কোনো তফাত নেই। একটা জায়গাতেই আয়েশা ওদের থেকে আলাদা। ওরা আক্রমণের শিকার হয়েও বেঁচে আছে, তিনি নেই।

২৩

থানায় টেবিলে মাথা নিচু করে বসেছিল শুভঙ্কর। বাইরে পুলিশকর্মীদের সঙ্গে মিডিয়ার প্রায় খণ্ডযুদ্ধ চলছে। খুব দ্রুত ঘটনাক্রম পট পরিবর্তন করছে। একে জোড়া সেলিব্রিটি খুন তার ওপর জোড়া খুনির মৃত্যু। একটা বৈদ্যুতিন মাধ্যমের প্রতিনিধি গাড়ি নিয়েই পুলিশের ভ্যানের পিছন পিছন রওনা হয়ে গিয়েছিল মূর্তি ব্রিজ থেকে। তাকে অনুসরণ করে বাকিরাও পৌঁছে গেছে। সেইসব মাধ্যমেরই অন্য প্রতিনিধিরা এখন থানায় ঢুকে আসতে চাইছে। পুলিশ সাউথ খয়েরবাড়ির কাছে দুজনকে মৃত অবস্থায় পেয়েছে। একজনের দেহ রাস্তাতেই পড়েছিল। আরেকজনকে পাশের জঙ্গলের মধ্যে পাওয়া গেছে। তার হাতে পিস্তল ধরা ছিল, যা দেখে পুলিশের অনুমান লোকটি আত্মহত্যা করেছে।

থানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দীপঙ্কর বাগচী মিডিয়াকে বাইট দিচ্ছেন আর শুভঙ্কর ভিতরে বসে সে কথা শুনে আরো শিহরিত হচ্ছে। তাদের রিসর্টের ম্যানেজারকেও পুলিশ তুলে এনেছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। ভদ্রলোকের চাহনিটা একটু যেন অস্বস্তিকর ঠেকছে শুভঙ্করের কাছে। অদ্ভুত একটা দৃষ্টি, যেন মাথার মধ্যে সমস্ত ভাবনাচিন্তা তালগোল পাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে।

মিনিট পনেরো পরে ছিপছিপে চেহারার আরেক উর্দিধারী এসে টেবিলে শুভঙ্করের উলটোদিকে বসলেন। শুভঙ্কর দেখল উর্দিধারীর বুকের ব্যাজে লেখা আছে অর্জুন দাস, এসআই। ভদ্রলোকের বয়স চল্লিশের মধ্যে, দেখতেও বেশ, কেবল সরু গোঁফটা ছাড়া। অর্জুন টেবিলের উপরে রাখা একটা ছোট কাগজ তুলে নিয়ে একটা মোবাইল নম্বর পড়ে শোনালেন। তারপর বললেন, “এই নম্বরটা কার?”

“ম্যাডামের,” শুভঙ্কর জড়ানো গলায় জবাব দিল।

“এই নম্বরে আজ বিকেল পাঁচটা পঞ্চান্নতে একটা কল গেছিল। একজন পুরুষ কলটা রিসিভ করেছিলেন। কে?”

“আ-আমি। ম্যাডামের ফোন আমার কাছেই থাকে। উনি যখন বিজি থাকেন, ওঁর সব ফোন আমিই রিসিভ করি।”

“আজ বিকেলের কলটা এই থানা থেকে করা হয়েছিল। আপনি বলছেন কলটা আপনিই রিসিভ করেছিলেম। আমরা জানিয়েছিলাম মিস আয়েশা সুলতানার লাইফ থ্রেট আছে। ওঁকে অ্যালার্ট করুন। করেছিলেন?”

শুভঙ্কর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। সে আড়চোখে দেখে নিল রিসর্টের ম্যানেজারকে। ভদ্রলোকও যেন এই মুহূর্তে বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে ওর জবাব শোনার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছেন।

“করেছিলেন অ্যালার্ট?” অর্জুনের গলায় ঝাঁঝ বাড়ল।

“না মানে আমি বলার সুযোগটুকুও পাইনি। ম্যাডাম আর সঞ্জয়বাবু হাঁটতে বেরিয়েছিলেন বিকেলে।”

“আপনি কোথায় ছিলেন?” শুভঙ্করকে মাঝপথে থামিয়ে বিদ্যুৎ -গতিতে ধেয়ে এল অর্জুনের প্রশ্নবাণ।

“আমি ওঁদের পিছন পিছনই হাঁটিছিলাম। ফোনটা ডিসকানেক্ট করে সবে ম্যাডামকে অ্যালার্ট করতে যাব, এমন সময় ম্যাডাম দৌড়ে এসে ফোনটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন সঞ্জয়বাবুর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য। আমার জুতোয় কিছু একটা ঢুকেছিল, তাই একটু দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। ওইটুকু সময়ের মধ্যেই যে এত বড় ঘটনা ঘটে যাবে, তা তো ভাবতে পারিনি।”

অর্জুন দাস কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন শুভঙ্করের দিকে। তারপর একবার দরজার দিকে চাইলেন। দীপঙ্কর বাগচী ঢুকছেন দেখে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বাগচী তাঁকে বসার ইশারা করে “ক্যারি অন” বলে ভিতরের ঘরে চলে গেলেন।

“মিস আয়েশা সুলতানা! ওঁর যে এরকম জীবনের ঝুঁকি আছে, সেটা কি উনি বা আপনি কখনো আঁচ করতে পেরেছিলেন আগে?” প্রশ্ন করলেন অর্জুন।

শুভঙ্কর ফের মাথা নিচু করে বলল, “ফেসবুকে হুমকি টুমকি আসছিল। কয়েকবার থ্রেট কলও এসেছে। তারপর থেকেই ম্যাডাম আর ফোন রিসিভ করেন না, মানে করতেন না। উনি একটু ডিস্টার্বড থাকতেন ব্যাপারটা নিয়ে প্রথম প্রথম। রিসেন্টলি ক্যাজুয়ালি নিচ্ছিলেন। কিন্তু ভয় কখনোই পাননি।”

“আপনি ওঁর ম্যানেজারের কাজ করছেন কতদিন?”

“সাত-আট মাস হবে। পুজোর পর থেকে আছি।”

“ওঁর সঙ্গে কারোর কোনো শত্রুতা, কোনো সম্পর্ক, অ্যাফেয়ার…কিছু জানেন?”

“শত্রুতা জানি না। অ্যাফেয়ার বলতে সঞ্জয়বাবুর সঙ্গে একটা ক্লোজনেজ তৈরি হচ্ছিল ওই সিনেমাটার পর থেকেই। সঞ্জয়বাবু গতকাল রিসর্টে ম্যাডামের সঙ্গেই ছিলেন। এর বাইরে কিছু জানি না,” শুভঙ্কর জবাব দিল।

এর পর আরো দু-একটা প্রশ্ন করে এসআই অর্জুন দাস শুভঙ্করকে পাশের বেঞ্চে গিয়ে বসার নির্দেশ দিয়ে রিসর্টের ম্যানেজার দেবেন দত্তকে ডেকে নিলেন। শুভঙ্করের সঙ্গে দেবেনের চোখাচোখি হল। দেবেনের চাহনিতে এখন আবার সেই তালগোল পাকানো ভাব। বাইরের হট্টগোল অর্জুনের কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল, তাই তিনি দেবেন দত্তকে ভিতরের ঘরে ডেকে নিলেন।

শুভঙ্করের চোখ গেল দেওয়ালে টাঙানো টিভি সেটে। টিভি সেটে কোনো শব্দ নেই, শুধু এক নাগাড়ে আয়েশা, সঞ্জয়ের হত্যা আর তারপর দুর্ঘটনায় আততায়ীদের মৃত্যুর খবর দেখিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝেই মোটাসোটা চেহারার একটা লোকের বাইট দেখাচ্ছে। স্ক্রিনের নিচের দিকে সেই ব্যক্তিকে একটি গ্রাফিক অ্যারো চিহ্নিত করছেন ‘স্করপিওর চালক’ বলে।

শুভঙ্করেরও এই মুহূর্তে মাথা ঠিক কাজ করছে না। ভবিষ্যৎটা ঠিক ভাবতে পারছে না সে। এমন অঘটন যে ঘটতে পারে তা যে তার চিন্তাতেই আসেনি কখনো।

২৪

রাত আটটা দশ, সূত্র মারফত হকের কাছে পৌঁছে গেল আয়েশা সুলতানা ও চিত্র পরিচালক সঞ্জয়শেখরের দুষ্কৃতীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়ার খবর। ঘটনাস্থলের নাম শোনামাত্র গোটা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন সড়কপথের মানচিত্রটা স্পষ্ট ভেসে উঠল তার চোখের সামনে।

এমন একটা জায়গায় ঘটনাটা ঘটেছে যেখানে থেকে সড়কপথে দেশের বিভিন্ন দিকে চলে যাওয়া যায় দ্রুত। এক্ষেত্রে দুষ্কৃতীরা পালাতে পারেনি, সেটা নেহাতই তাদের দুর্ভাগ্য এবং হকের মতো মানুষদের জন্য বাড়তি সুবিধে। তবু তাদের সম্ভাব্য প্ল্যানটা কী ছিল, সেটা আন্দাজ করা যাচ্ছে।

আয়েশার খবরে অবাক হয়নি হক, তবে ডিআইজি গোয়েলের মুখটা মনে করে একটু হতাশ বোধ করল সে। কিছু করার ছিল না, এনএটিসি ময়দানে নেমেছিল বড্ড দেরিতে। সরকারি তদন্তকারী সংস্থা অবশ্যই প্রশ্নের মুখে নানান সাফাই দেবে, কিন্তু সত্যিটা সত্যিই। এমন বহু তদন্তেই এনএটিসি বিগত দু-তিন বছরে ব্যর্থ হয়েছে অপরাধের শিকড়ে পৌঁছোতে। নেপথ্যে একটাই কারণ, ইনটেলিজেন্সের তৎপরতার অভাব। ইন্টেলিজেন্স ইনপুট জোগাড়ের কাজ যারা করে গ্রাউন্ড লেভেলে, তাদের জীবনের ঝুঁকি আছে, এ কথা ঠিক। অনেক ইনফর্মারকে সংস্থা হারিয়েছে গত কয়েক বছরে। এরও নেপথ্যে কারণ আছে। আইবিতে যারা রয়েছে তারা খবর সংগ্রহ করতে যতটা দক্ষ, নিজেদের পরিচিতি গোপন করতে ততটা নয়। বহু ক্ষেত্রেই দুষ্কৃতীরা ধরে ফেলছে তাদের ছদ্মবেশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটার উদ্দেশ্য আর সঙ্গে সঙ্গে ছক বদলে ফেলছে। মেদিনীপুরের বিস্ফোরণের পিছনেও এরকমই কিছু হয়ে থাকবে বলে হকের দৃঢ় ধারণা। সেখানেও আইবি’র যে এজেন্ট ষড়যন্ত্রটা ধরে ফেলেছিল, তার রক্তাক্ত শরীর উদ্ধার করেছে পুলিশ।

ডিআইজি গোয়েলের কথা ভাবতে ভাবতেই তাঁর ফোন এল। স্বাভাবিকভাবেই তিনি উষ্মা প্রকাশ করলেন এনএটিসি’র আরেকটা ব্যর্থতার জন্য। হক সাফাই দেওয়ায় বিশ্বাস করে না। তার বলতে ইচ্ছে করল না যে অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে গতকাল রাত্রে পাঁচজন সম্ভাব্য টার্গেটকে চিহ্নিত করে তাঁদের অ্যালার্ট করার কাজটা সংশ্লিষ্ট থানাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবার সেই স্তরে যদি কোনো গাফিলতি হয়ে থাকে, তার দায় এনএটিসি’র হতে পারে না। কিন্তু হক সেসব কথায় গেল না। ডিআইজি’র কলটা ডিসকানেক্ট করার আগে সে কেবল একটাই কথা বলল, “উই অ্যাক্টেড লেট স্যার।”

ডিআইজি আরো একবার তাকে নির্দেশ দিয়েছেন তদন্তকারী দল তৈরি করে এক্ষুনি কাজে নেমে পড়তে। এই নির্দেশ না এলেও চলতো। হক জানে তাকে কী করতে হবে, কোন পথে এগোতে হবে। সে চেয়ার ছেড়ে তার ঘরের জানলায় গিয়ে দাঁড়াল। গতকালের মতোই দেশের রাজধানী রাতের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। চূড়ান্ত ব্যস্ততার ছবি ভেসে উঠছে। এবার তাকেও ব্যস্ত হয়ে উঠতে হবে। হকের ঘরে টিভিতে ফুটবল খেলা চলছিল একটু আগে। তার মনে হচ্ছিল সেও এই মুহূর্তে সেরকম একটা খেলার অংশ যেখানে প্রতিপক্ষ রিবাত এক গোলে এগিয়ে গেছে। কিন্তু এবার গোল শোধের লড়াই শুরু করতে হবে। দুজন হত্যাকারী মারা গেছে। তাদের কাছ থেকে পুলিশ মোবাইল পেয়েছে। ওই দুটো মোবাইলই আপাতত সূত্রধরের কাজ করবে হকের জন্য।

জানালা থেকে ঘরের এক কোণে রাখা স্টাডি টেবিলে ফিরে এল হক, সাজিয়ে ফেলল অপারেশনের ব্লুপ্রিন্টটা। একজন ডিএসপি পদমর্যাদার অফিসারের নেতৃত্বে দুজন সাব-ইন্সপেক্টর ও পাঁচজন অ্যাসিস্ট্যান্টকে নিয়ে গড়তে হবে তদন্তকারী দল। সে নিজেই ডিএসপি পদমর্যাদার অফিসার। তার অধীনে থাকবে ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠী ও সুনীল রক্ষিত। দুজনই তুখোড় অফিসার। সেয়ানে সেয়ানে লড়াইয়ের জন্য এদের ছাড়া দল গঠনের কথা ভাবাই যায় না।

মোবাইলের কন্ট্যাক্ট লিস্ট থেকে হক একে একে ফোন করল ধর্মেন্দ্র ও সুনীলকে। কাল সকালের ফ্লাইটেই সে চলে যাবে কলকাতা, চলে আসবে ওরা দুজনও। সেখানে মিটিং করেই ওদের পাঠাতে হবে মার্ডার সাইটে আর এদিকে সন্দেহভাজন ও নিহতদের পরিচিতদের জিজ্ঞাসাবাদ দিয়ে শুরু হবে কাজ। সুভাষ গোয়েল ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন এনএটিসি যাতে দ্রুত এই কেসের হ্যান্ডওভার পায় তার জন্য তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে তদ্বির শুরু করেছেন।

হকের তৃতীয় কলটা গেল এনএটিসি’র রিসার্চ উইঙের সুজান ডি ক্রুজের কাছে। নির্দেশ একটাই— আয়েশা সুলতানা ও সঞ্জয়শেখরের ব্যাকগ্রাউন্ড ও সাম্প্রতিক গতিবিধির ডিটেইল বের করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *