১৫
আধ ঘণ্টা ব্রিফিংয়ের শেষে হকের হাতে সুভাষ গোয়েল তুলে দিলেন এখনও পর্যন্ত এনএটিসি’র হাতে আসা ঘাটাল বিস্ফোরণের অনুসন্ধান সংক্রান্ত সমস্ত নথি। ইখলাস রুবেল সম্বন্ধে তেমন কোনো নতুন তথ্য নেই দফতরের হাতে। যা আছে তা হল বছর চারেক আগে সে যখন পশ্চিম পাকিস্তানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিল সেই সময়কার একটি ভিডিও ফুটেজ। দলের নবাগতদের দেখানোর জন্য এই ধরনের কিছু ভিডিও তুলে রাখে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলো। গত বছর কুপওয়ারায় সৈন্যবাহিনীর গুলিতে নিহত এক পাক জঙ্গির মোবাইল ফোন থেকে এই ফুটেজটা পাওয়া যায়। পরে সেটি গিয়ে পৌঁছোয় বাংলাদেশ পুলিশের কাছে। শাফাকতকে ঢাকায় জেরা করার দিনই ফুটেজটি প্রতিবেশী দেশের পুলিশকর্তার কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন গোয়েল।
কিন্তু সমস্যা হল ভিডিওটি তোলা হয়েছিল সূর্যাস্তের সময়, সম্ভবত কম আলোর সুবিধে নেওয়ার জন্যই। তাই যাদের প্রশিক্ষণ নিতে দেখা যাচ্ছে ছবিতে তাদের সিল্যুয়েট ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। পড়ন্ত রোদের আলোয় এক ঝলক তাদের কারোর কারোর মুখ বোঝা যাচ্ছে বটে কিন্তু একজন কুখ্যাত জঙ্গিকে চিহ্নিত করার জন্য তা নিতান্তই অপ্রতুল। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের কাছেও ইখলাস রুবেলের কোনো ছবি নেই কারণ দু’ বছর আগে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে ইখলাসদের কুমিল্যার বাড়িটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। মধ্যরাতে আগুন লাগে বাড়িতে এবং ইখলাসের আব্বা-আম্মা অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করেন। ঘরে থাকার কথা ছিল তারও কিন্তু সে ছিল না। পুলিশের কাছে পাড়া-প্রতিবেশীরা অনেকেই অগ্নিকাণ্ডটা ইখলাসের ঘটানো বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন সেই সময়ে।
তার সামনে এগিয়ে দেওয়া ফাইল-পত্রে চোখ বুলিয়ে নিয়ে হক গোয়েলের দিকে চাইল। ডিআইজি ইংরিজিতে প্রশ্ন করলেন, “কোন পথে এগোবে ভাবছো?”
হক জবাব দিল, “একটু স্টাডি না করে কোনো পরিকল্পনা ছকা কঠিন। একটা কথা জোর দিয়েই বলা যায় যে ভারতের পূর্ব ও উত্তর পূর্ব অঞ্চল এবং বাংলাদেশ, এই অলিন্দেই সে ঘোরাফেরা করছে। নাহলে রিবাতের নতুন মডিউল তৈরির কাজ সে তদারকি করতে পারবে না। কিন্তু চিন্তা অন্য জায়গায়।”
“কী ভাবছো?”
“ভাবছি শাফাকতের হুমকিটার কথা। ওদের নতুন টার্গেটকে খুব শীঘ্রই খতম করবে। এটা একটা জটিল পরিস্থিতি।”
“কীরকম”— গোয়েল চেয়ারে হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে টান হলেন।
“দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অংশে ওদের টার্গেট কারা সেটা বের করতে ইনটেলিজেন্সের যে সময় লাগবে তার মধ্যেই অঘটন ঘটে যাওয়া আশ্চর্যের নয়। আপনি ইনটেলিজেন্সের যা ইনপুট পেয়েছেন তা অত্যন্ত দুর্বল। এর উপরে ভিত্তি করে কোনো প্ল্যানিং সম্ভব নয়। বরং…”
“বরং? বলে যাও হক।”
হক একটু রহস্যময় হাসি হেসে বলল, “যা ভাবছি তা বলতে অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু আপনি তো জানেন স্যার, আমার কাজ করার ধরন একটু প্রথাগত ধারার বাইরে।”
“জানি। আর সেই কারণেই তোমাকে এবং শুধুই তোমাকে ডেকেছি। এই মিশন কমপ্লিটলি তোমার। কীভাবে এগোবে তুমি ঠিক করবে, ব্লুপ্রিন্ট তুমি বানাবে, টিম তুমি লোক বেছে নিয়ে তৈরি করবে। হ্যাপি? এবার বলো কী সেই কথা যেটা বলতে হেজিটেট করছো।”
“স্পষ্ট কথা স্পষ্টভাবে বলাই ভালো স্যার। নতুন এই টার্গেটকে রক্ষা করা আমাদের পক্ষে খুব কঠিন যদিও চেষ্টা যে আপ্রাণ করা হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আমার ধারণা সেই অপ্রীতিকর ঘটনাটা ঘটে যাওয়া আমাদের জন্য উপকারই হবে। ঘটনাটা যেখানে ঘটবে সেখান থেকেই অপরাধীদের ধাওয়া করা শুরু হবে, যাতে তাদের বৃহত্তর লক্ষ্যটা ভেস্তে দেওয়া যায়। এই মুহূর্তে এই কেসে এগোনোর কোনো রাস্তা দেখছি না স্যার।”
হকের কথা গোয়েলের মুখমণ্ডলে একরাশ মেঘ নামিয়ে আনল। অভিজ্ঞ অফিসার জানেন অনেক ক্ষেত্রেই সন্ত্রাসবাদীদের বড় ছক বানচাল করার জন্য তাদেরকে ছোটোখাটো নাশকতামূলক কাজ করতে দেওয়া হয়, আগাম খবর থাকা সত্ত্বেও। এটা করা হয় নতুন সূত্র পাওয়ার জন্য। কিন্তু আগাম খবর এবং প্রকাশ্য হুমকির পরেও একজন বা একাধিক মানুষের প্রাণহানি হতে দেওয়া, এটা ঠিক…
হক তার বক্তব্য পেশ করেই ডিআইজির শরীরী ভাষায় নজর রেখেছিল। সে বুঝতে পারছে গোয়েলের মনের মধ্যে একটা তীব্র দ্বন্দ্ব চলছে এই মুহূর্তে। কিন্তু সে নিজে কোনো আশার আলো দেখছে না। যুদ্ধের ভাষায় যাকে কোল্যাটেরাল ড্যামেজ বা আনুষঙ্গিক ক্ষতি বলে এ হল তাই। একরকমের বলিদান। নিশ্চিতভাবেই সন্ত্রাসবাদীদের করে যাওয়া একটি হত্যালীলা এনএটিসি’র মাথা নিচু করবে, কিন্তু সেটা সাময়িক।
হক এবং নিজের জন্য হালকা সন্ধ্যার খাবার অর্ডার করেছিলেন গোয়েল। মনটাকে একটু ভারমুক্ত করতে সে খাবারে মন দিলেন। খাওয়া যখন শেষের পথে, তিনি প্রশ্ন করলেন, “তোমাকে কোথায় নামাবো? আমি তো বাড়ি ফিরবো, চলো একসঙ্গেই যাওয়া যাক। জানি হক কখনো তার অবস্থান স্পষ্ট করে না, তবু কোনো একটা পয়েন্ট বলো।”
হক হেসে জবাব দিল, “আজ সেই গোপনীয়তার কোনো প্রয়োজন নেই স্যার। কাজ শেষ করে আসছি। আমাকে সেক্টর সিক্সটিনে ছেড়ে দিতে পারেন।”
ডিআইজি গোয়েল খুব ঈশ্বরভক্ত না হলেও ভগবান মানেন। নয়ডা সেক্টর ২৪এ তাঁদের অফিসের খুব কাছেই, বড় রাস্তা ও উপর দিয়ে চলে যাওয়া ফ্লাইওভারের ওপারে ইস্কনের সুসজ্জিত মন্দিরটিতে তিনি মাঝেসাঝে যান। আজও যাওয়ার কথা মনে হল। অফিস থেকে বেরিয়ে মন্দিরের কাছে গাড়ি থামিয়ে নামলেন তিনি। হক সেই ফাঁকে গাড়িতে বসে মোবাইলের ফ্ল্যাশবালব জ্বেলে ইখলাস রুবেল ও বিস্ফোরণ সংক্রান্ত নথিগুলোতে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিল।
১৬
বাড়ি থেকে বেরিয়েই ছাতাটা খুলে নিল সুমনা। সবে সকাল সাড়ে নটা, কিন্তু রোদের তাপ যেন চারপাশের কংক্রিট আর রাস্তার পিচ থেকে ঠেকে ঠিকরে তাড়া করে আসছে। গ্রীষ্মের দাবদাহকে আগে আমল দিতো না সে, কিন্তু অ্যাসিড হামলার পর থেকে শরীরের জ্বলে যাওয়া অংশগুলো রোদের তাপ সহ্য করতে পারে না। সঙ্গের ওড়নাটা দিয়ে নাক, কান, মাথা পেঁচিয়ে নিল সুমনা। চোখের উপর রোদচশমা নামিয়ে এনে নব ঘুরিয়ে গ্যাসের ফ্লেম কমানোর মতো চোখ ঝলসে দেওয়া আলোর তেজ কিছুটা কমিয়ে নিল।
সুমনার আজ ঠাসা কর্মসূচী। গতকাল সন্ধেবেলা ‘দশভুজা’র উদ্বোধনের আমন্ত্রণপত্রগুলো সে হাতে পেয়েছে। আজ সেগুলো বিশিষ্ট অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়ার পালা। গাজোল থানার এসআই, বিধায়ক আর রাজ্যসভার সাংসদ ছাড়াও তাকে যেতে হবে স্টেশনের দিকে। ওখানে তার বাবার তিনজন পরিচিতের বাড়ি। এরপর বিকেলে তাকে যেতে হবে বালিয়াডাঙ্গা, সেখানে থাকেন সুমনার স্কুলের এক প্রাক্তন শিক্ষিকা, গায়ত্রীদি। অ্যাসিড হামলার পর সে যখন হাসপাতালে যমের সঙ্গে লড়ছে, তখন খবর পেয়ে অশক্ত শরীরেও গায়ত্রীদি এসে তাকে দেখে গেছেন। সুমনার নতুন উদ্যোগের কথা জানতে পেরে ফোন করেছিলেন। অন্যের মুখ থেকে খবরটা শুনতে হল বলে মৃদু অনুযোগও করেছিলেন।
সুমনার পথে প্রথমেই পড়ল গাজোল থানা। এসআই প্রতীক সেনকে সাধারণত হাসি-খুশিই দেখে সে, কিন্তু আজ যেন ভীষণই গম্ভীর দেখাচ্ছে। সুমনার বাড়িয়ে দেওয়া কার্ডটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে তিনি টেবিলের উপর রেখে দিলেন। খুব একটা কথা বলার মেজাজে প্রতীক আছেন বলে ওর মনে হল না। তবু সৌজন্যর খাতিরে সুমনা প্রশ্ন করল, “আপনাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। কিছু হয়েছে নাকি আবার আশেপাশে? আমি তো কিছু শুনিনি!”
প্রতীক সেন যেন একটু অন্যমনস্ক ছিলেন, সুমনার কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললেন, “না, নতুন কিছু না। ঝামেলা তো লেগেই আছে।”
সুমনা হেসে থানা থেকে বেরিয়ে এল। তার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে একটু আগেই প্রতীক সেনের কাছে খবর এসেছে তার ভাই জয় ক্রমশ মাদকের নেশায় ডুবতে শুরু করেছে। বদসঙ্গে পড়লে যা হয় আর কি— প্রতীক ইচ্ছে করেই ব্যাপারটা চেপে গিয়েছেন সুমনার কাছে। একটা ভালো কাজের স্বপ্ন নিয়ে, প্রবল উৎসাহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া মেয়েকে সকাল সকাল মানসিক ধাক্কা দিতে তাঁর মন সায় দেয়নি। তাঁর মাথায় আরো অনেক চিন্তা ক্রমশ ভিড় বাড়াচ্ছে। জালনোট পাচারের কেসে মিন্টু আর সেই ভ্যানচালকের আপাতত চোদ্দ দিনের জেল হেফাজত হয়েছে। গতকাল কোর্ট থেকেই সটান হাজতে গেছে ওরা। কিন্তু তার আগে প্রতীকের জেরার মুখে যে বিস্ফোরক তথ্য মিন্টু সরবরাহ করে গেছে তাতে যদি সত্যতা থাকে তাহলে বড় ঘটনা ঘটে যাওয়া এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। সেই কাজের জন্য প্রস্তুতির পাশাপাশি এই মাদকের জাল যারা ছড়াচ্ছে জেলা জুড়ে, তাদেরও শায়েস্তা করতে হবে। তাই ঠিক এই মুহূর্তে কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার মতো মনের অবস্থা তাঁর নেই।
বিদ্রোহীর মোড় থেকে বাঁ দিকে গেলেই হাইস্কুল আর তার থেকে দু’ পা এগোলেই বিধায়ক অমল বরাটের অফিস। এই বিধায়ক লোকটিকে সুমনার একেবারেই পছন্দ হয় না, কিন্তু স্থানীয় ক্ষমতার রাশ যার হাতে, তাকে একটু হলেও মান্য করতে হয়। এর আগের বিধানসভা নির্বাচনে এই বরাটের বিপরীতে লাল পার্টির প্রার্থী হয়েছিলেন তাঁর বাবা। স্রেফ ভোটে জেতার জন্য এই লোকটা তার বাবার নামে নোংরা কুৎসা ছড়িয়েছিল এলাকা জুড়ে। আজ সুমনাদের বাড়িতে গল্পগুজব করতে আসে এমন অনেক স্থানীয় মানুষ সেদিন সেই মিথ্যেগুলো বিশ্বাস করেছিল। যে মানুষটার নামে মিথ্যেগুলো বলা হচ্ছে সে দীর্ঘদিনের পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও।
সুমনাকে অফিসে ঢুকতে দেখে বরাট একটা ফিকে হাসি উপহার দিলেন এবং তাঁকে ঘিরে বসে থাকা অনুগামীদের ইশারায় ঘর খালি করতে বললেন। এই মেকি হাসিটা সুমনার আরো বিরক্তিকর লাগে। সে জানে তার পাগল প্রেমিকের ভালোবাসার ছোঁয়া তার মুখটার যা হাল করেছে, তাতে সেটার দিকে চোখ গেলে কারো মুখেই হাসি ফোটার কথা নয়। তবু এই লোকদেখানো সৌজন্য কেউ দেখালে সুমনার সারা শরীর রাগে জ্বলে ওঠে।
আমন্ত্রণপত্রটি বেশ মন দিয়ে উলটেপালটে দেখে বিধায়ক বললেন, “ভালো, খুব ভালো। এভাবেই তো মানুষকে এক জায়গায় করে নিয়ে কাজ করতে হয়। আপনাদের মতো মানুষদের পাশে পার্টি সবসময় আছে। যে কোনো দরকারে যোগাযোগ করবেন। পার্টির ছেলেরা তৈরি আছে।”
সুমনার খুব ইচ্ছে করছিল লোকটাকে বলতে যে নিজের প্রভাবের জোরে যে অশিক্ষিতগুলোকে গার্লস স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়েছেন দয়া করে সেগুলোকে ফিরিয়ে নিন, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। একটা নতুন কাজ শুরু করতে চলেছে সে, তাতে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা খুব দরকার। বিধায়ককে খেপিয়ে দিয়ে শেষে সেই কাজ পণ্ড হওয়ার ব্যবস্থা করার কোনো মানে হয় না। আজ বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মা পই পই করে তাকে বলে দিয়েছে যাদের কাছে যাচ্ছে তাদের সঙ্গে কোনো রকম তর্কে না যেতে।
অমল বরাটকে আরো একবার অনুষ্ঠানের দিন উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে রোদের তেজ আরো বেড়েছে, বড় রাস্তার ওপারে হাইস্কুলের মাঠের হলদেটে মাটি থেকে যেন হলকা উঠে আসছে। এই তীব্র দাবদাহের দিনে বাসের মধ্যে এক মিনিট বসলেই মনে হয় প্রাণটা বেরিয়ে যাবে। বাসের লোহার শরীর তেতে থাকে, সিটগুলো যেন ছ্যাঁকা দেয়। তবু তাকে যেতেই হবে আজ।
হাইস্কুলের মাঠের পাশের রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগোলেই ডান দিকের গলিতে রাজ্যসভার এমপি পবিত্রবাবুর বাড়ি। সেখানেও একই ছবি। বেশ কিছু স্থানীয় যুবক ও মহিলার দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন নেতা। তাঁর এক চ্যালা সুমনাকে অফিস রুমের লাগোয়া ছোট আরেকটা ঘরে বসাল।
সুমনার বয়স ৩৬ বছর। চোখের সামনে জেলার রাজনৈতিক চিত্রটা ধীরে ধীরে পালটাতে দেখেছে সে। কলেজে থাকাকালীন বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্তও ছিল। আজকের শাসকদল বঙ্গবিকাশ পার্টির খুব একটা প্রভাব এখানে আগে ছিল না। এখনও যতটুকু আছে তাও জাতীয় জনবিকাশের কর্মীরা দল ভেঙে সেখানে গিয়ে ভিড়েছে বলে। বেঙ্গল কমিউনিস্ট ব্লকের দীর্ঘ শাসনকালে মূল প্রতিপক্ষ এখানে জাতীয় জনবিকাশই ছিল। তাই তাদেরই বলে বলিয়ান হয়ে বঙ্গবিকাশের বিধায়ক আজ এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এটা তবু মেনে নেওয়া যায়।
কিন্তু সুমনার মনে বিস্ময় জাগে ভারত সেবকের উত্থান দেখে। এই দলটার কোনো অস্তিত্বই ছিল না এখানে বছর দুয়েক আগে অথচ এখন রীতিমতো টক্কর নেওয়ার মতো একটা শক্তি হয়ে উঠেছে। সুমনাদের বাড়িতে রাজনৈতিক আলোচনা নিশ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক। সেই আলোচনা থেকে সুমনা বুঝতে পারে ক্রমশ জাতপাতের রাজনীতিকে হাতিয়ার করে মানুষের মনে একটা জায়গা করে নিচ্ছে এই দলটি। মালদায় হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায় কোনোদিনই নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ করেনি। স্কুল-জীবনে ঈদের দিনে ক্লাসমেটদের বাড়িতে পাত পেড়ে খাওয়া যেমন স্বাভাবিক ছিল, তেমনই ছিল সরস্বতী পুজোর দিনে সবার বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে, দল বেঁধে স্কুলে যাওয়া। কিন্তু বিগত কিছু দিনে এই ভেদাভেদটা যেন একটু একটু করে মাথা তুলছে। সুমনা নিজে সেরকম কয়েকটা ঘটনা অতি সম্প্রতি দেখেছে।
সে লক্ষ্য করল পবিত্র দত্তের অফিসেও সেরকমই কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। জেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ক্রমশ নাকি কিছু মানুষ মুসলমান পরিবারের তরুণ সদস্যদের মধ্যে জেহাদের বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে এবং শাসকদল স্রেফ ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার জন্য সেই বিপদকে মদত দিচ্ছে। চারজন মহিলা ছিলেন অফিসে। তাঁরা বেশ উত্তেজিতভাবে কথা বলছেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে দশাসই চেহারা যাঁর, তিনি পবিত্রবাবুর সামনে রাখা কাঠের টেবিলে একটা জোরালো চাপড় মেরে বললেন, “আপনি বিশ্বাস করুন, এই খবর ভুল না। চলছে এই মগজধোলাই। এমনভাবে চলছে যে উপর থেকে দেখে কারোর বোঝার উপায় নেই। কিন্তু ছেলেদুটোর সঙ্গে আমি নিজে কথা বলেছি। মনে পাপ না থাকলে কেউ সামান্য একটা কথার জবাব দিতে অত হড়কায়? আপনি একবার গ্রিন সিগন্যাল দিন না, আমরা বুঝে নেবো।”
পবিত্রবাবু এমনিতেই ঠান্ডা মানুষ, তার উপর পার্টিকর্মীর রণং দেহি মূর্তি দেখে আরো যেন থতমত খেয়ে গেছেন। মহিলাকে শান্ত করে বললেন, “এভাবে হয় না। এখানে আমাদের এখনও সেই স্ট্রেংথ নেই। শেষে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। আপনাদের রিপোর্টকে অবশ্যই গুরুত্ব দিচ্ছি। আগামীকাল দিল্লি যাচ্ছি। জেলা সভাপতির সঙ্গেই যাচ্ছি। সব আলোচনা হবে সেখানে। তাঁর নির্দেশ ছাড়া এগোনোটা ঝুঁকির হয়ে যাবে।”
কর্মীরা বোধহয় একটু দমে গেল। ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল অফিস। চ্যালার ইশারায় পবিত্রবাবু সুমনাকে ডেকে নিলেন।
“কেমন আছো সুমনা? প্রোগ্রামের প্রস্তুতি কমপ্লিট?”
আজ সাংসদ হয়ে বড় মানুষ হলে কী হবে, গাজোলের মানুষের কাছে পবিত্রবাবুর পুরোনো পরিচয় ‘ডাক্তারবাবু’ই রয়ে গেছে। সুমনাও হেসে বলল, “প্রায় শেষের পথে ডাক্তারবাবু। এই তো নিমন্ত্রণের পালা আজ কালের মধ্যেই সেরে ফেলবো। তারপর আর কী?”
সুমনা পবিত্রবাবুর টেবিলের উপর কার্ডখানা রেখেছিল, কিন্তু তিনি সেটার প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখালেন না। বরং টেবিলের ড্রয়ারে টান দিয়ে বললেন, “দাঁড়াও তোমার চেকটা বের করে দিই। আমি রেডি করেই রেখেছি।”
চেকটা হাতে নিয়ে সুমনা বলল, “শুধু চেক নয়, আপনাকেও কিন্তু আসতে হবে। ছোটবেলা থেকে অসুখবিসুখে আপনার যত্নই পেয়ে এসেছি। আপনি আমার অনুষ্ঠানে আশীর্বাদ করতে আসবেন না, এ কিন্তু চলবে না।”
পবিত্রবাবু হেসে ফেললেন, “দেখেছো! আমি যাব না বলিনি অথচ তুমি জানো আমি সেটা বলতে পারি। এর মানে আমি কেন যেতে চাইছি না তাও তোমার জানা। তাহলে?”
“জানি ডাক্তারবাবু। কিন্তু সেটা রাজনীতির ব্যাপার। আপনি অমল বরাটের সঙ্গে এক মঞ্চে থাকতে চান না। কিন্তু আজকের রাজনীতিবিদ স্ট্যাম্পটাই কি আপনার একমাত্র পরিচয়? গাজোলের মানুষ যে ডাক্তার বলতে এতকাল ঈশ্বরের মতো আপনাকে বিশ্বাস, ভরসা করে এল, তার কোনো দাম নেই?”
ডাক্তার সাংসদ পবিত্র দত্ত সুমনার এই প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে পেলেন না। কথাটা ঠিকই বলছে মেয়েটা। যতদিন কেবল ডাক্তার পরিচয়ে বেঁচেছেন, জীবন এত জটিল ছিল না। সবার একটাই পরিচয় ছিল, রোগী। সাংসদ হলেও বাড়ির একতলার চেম্বারে এখনও নিয়মিত বসেন তিনি এবং ইদানীং প্রায়ই উলটোদিকের চেয়ারে বসা রোগীর চোখে তাঁর প্রতি একটা অবিশ্বাস, সন্দেহের ছাপ দেখতে পান। ইনজেকশন নিতে হবে বললে কেউ কেউ এমনভাবে তাকান আজকাল যেন তাঁদের হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। আর এর কারণ হল তাঁরা বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মী। কুড়ি বছর ধরে পবিত্র ডাক্তারের চিকিৎসায় ভরসা রেখে এসেছেন রাঙাভিটার রাখাল সমাদ্দার। বিসিবি’র হোলটাইমার ছিলেন। গত সপ্তাহে তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে পেসমেকার বসিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিতে সেই তিনিই কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে গেলেন, “দেখি আরো দু-তিনজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে।” এছাড়া এলাকার মুসলমান পরিবারের মানুষেরা তো তাঁর চেম্বার রীতিমতো এড়িয়েই চলেন আজকাল। নামকেওয়াস্তে একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র খুলেছে কাছে। সেখানে যাবেন তবু পবিত্র ডাক্তারের কাছে আর নয়!
পবিত্রবাবু অস্বস্তি কাটানোর জন্য হাতঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, “আমি আগামীকাল দিল্লি যাচ্ছি। সেখানে বেশ কিছু কাজ আছে। তারপরে কিছুদিন রাঁচিতে থাকবো। যদি তোমার অনুষ্ঠানের মধ্যে ফিরে আসি, নিশ্চয়ই যাবো। কথা দিলাম।”
১৭
ডিআইজি গোয়েলের দেওয়া নথিগুলো টেবিলের উপর পাশাপাশি সাজিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবেছিল হক। এরকম চ্যালেঞ্জের মুখে এনএটিসি এর আগে পড়েছে বলে সে মনে করতে পারছে না। ভারতবর্ষের পূর্বদিক একটা বিরাট অঞ্চল। সেখানে কোনো একজন ব্যক্তি যদি সন্ত্রাসবাদীদের টার্গেট হন, তাঁকে চিহ্নিত করা সহজ কাজ নয়। সবচেয়ে বড় কথা, সেই ব্যক্তি কেন টার্গেট হয়ে উঠল সেটা আগে জানতে হবে।
গভীর মনোযোগ দিয়ে এনএটিসি’র সিক্রেট ওয়েবসাইটে মজুত রিবাতের রেকর্ডগুলো দেখছিল হক। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তাদের সন্ত্রাসের শিকার যারা হয়েছে, তাদের ডিটেইল পড়ছিল। ব্লগার ছাড়াও রিবাতের রোষের শিকার হয়েছে সে দেশের দুই তরুণ প্রকাশক, যারা মুক্তচিন্তাপন্থীদের বই প্রকাশ করেছিল। এছাড়াও এক ফিল্ম প্রোডিউসারকে তাদের চোখরাঙানি দেখতে হয়েছে। তবে তাঁর প্রাণ নেয়নি জঙ্গিরা।
প্রায় এক ঘণ্টা আন্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা তথ্য ঘেঁটে হক এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোল যে ভারতবর্ষের মাটিতে রিবাতের সম্ভাব্য টার্গেটকে চিহ্নিত করতে হলে এনএটিসি’র সাইবার সেলের সাহায্য নেওয়া ছাড়া গতি নেই। হক তাদের সাইবার সেলের সবচেয়ে দক্ষ পাঁচজন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিল। এদের মতো দ্রুত কাজ বোধহয় কোনো আধুনিক প্রযুক্তির বলে বলীয়ান যন্ত্রের পক্ষেও করা সম্ভব নয়। এর আগে যতবার এই সেলের সাহায্য হকের প্রয়োজন হয়েছে, এদের কাজের ক্ষিপ্রতা তাকে অবাক করেছে।
আজও ব্যতিক্রম হল না। তার নির্দেশ গিয়েছিল রাত সোয়া আটটায়, সোয়া নটায় চলে এল রিপোর্ট। ইন্টারনেটের বিভিন্ন স্তর এবং সোশ্যাল মিডিয়ার গভীরে গিয়ে অনুসন্ধান করে তৈরি করা হয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতবর্ষের পূর্ব অংশে রিবাতের টার্গেট হতে পারে এমন পাঁচজন ব্যক্তির নামের একটি তালিকা হকের হাতে চলে এসেছে। সেই তালিকায় রয়েছেন কলামনিস্ট জহিদুল, যিনি আদতে বাংলাদেশের মানুষ হলেও বছর দুয়েক আগে প্রাণ বাঁচাতে এ দেশে চলে আসেন। এখন পাকাপাকিভাবে ভারতের নাগরিক এবং একটি নামী ইংরিজি দৈনিকে তাঁর মুসলিম মৌলবাদ বিরোধী যে কলামগুলো বেরোয়, সেগুলো বিপুল প্রশংসা ও তীব্র আক্রমণ, দুইই ডেকে আনে।
দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রাক্তন পুলিশ অফিসার অজিত বর্মন। দেখা যাচ্ছে ভারতের মাটিতে রিবাতের মডিউল তৈরির প্রচেষ্টা গোড়ার দিকে ভীষণভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে বহরমপুরের এই পুলিশকর্তার দক্ষতার কারণে। যদিও আজ তিনি অবসরপ্রাপ্ত, তাঁর উপর রিবাতের লোকেদের রাগ পড়েনি যেহেতু কলকাতা পুলিশের এসটিএফের একজন পরামর্শদাতা হিসেবে তিনি মাঝেসাঝে কাজ করে থাকেন। গত নভেম্বরে মেটিয়াবুরুজের নিকটবর্তী রামনগরে যে চারজন লস্কর জঙ্গির নাগাল পেয়েছিল এসটিএফ, সেই টিমের পরামর্শদাতা ছিলেন এই অফিসার।
তৃতীয় ব্যক্তির নাম আয়েশা সুলতানা। টলিউড অভিনেত্রী, যিনি সম্প্রতি একটি ছবিতে তাঁর দৃঢ় চরিত্রের জন্য বিপুল প্রশংসা পেয়েছেন এবং চূড়ান্ত আক্রমণেরও শিকার হয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়াতে। চতুর্থ ও পঞ্চম ব্যক্তি দুই অধ্যাপক, জাকির ইকবাল ও জাহির ইকবাল। এঁরা সহোদর ভাই এবং কলকাতার দুটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্ত। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার, এঁরা মুসলিম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মৌলবাদ বিরোধী ভাবনায় ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন এবং প্রায়ই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই বিষয়ক প্রবন্ধ লেখেন।
খুব মন দিয়ে সাইবার সেলের রিপোর্ট ও তার সঙ্গে পাঠানো সাপোর্টিং ডকুমেন্টস দেখে নিয়ে হক তার কাজের দ্বিতীয় ধাপে চলে গেল। এখন কাজ হল ঠিক এই মুহূর্তে এই পাঁচজন ব্যক্তির অবস্থান খুঁজে বের করা এবং প্রাথমিকভাবে তাদের সতর্ক করে দেওয়া এবং তারপর তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার বন্দোবস্ত করা। শুধু এই ব্যক্তিদের জানালেই হবে না, যেখানে তারা বসবাস করেন এবং এই মুহূর্তে যদি সেই জায়গার পরিবর্তে অন্য কোথাও তাঁদের অবস্থান হয়ে থাকে তাহলে সেই অঞ্চলের থানাকেও সজাগ করতে হবে।
এই কাজ করার জন্যও এনএটিসিতে রয়েছে একটি বিশেষ শাখা। সেখানে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠিয়ে হক উঠে পড়ল কম্পিউটারের সামনে থেকে। তার মন বলছে দুর্ঘটনা যদি কিছু ঘটার হয় তাহলে তা খুব শীঘ্রই ঘটবে। ডিআইজি গোয়েল অনেক ভরসা করে তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু হকের মন বলছে একটু দেরি হয়ে গেছে। তবু চেষ্টা করতে হবে।
ঘরের কাচের জানালার সামনে এসে দাঁড়াল এনএটিসি’র সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সিক্রেট এজেন্ট। জানালা দিয়ে দূরে তীব্র গতিতে ছুটে যেতে দেখা যাচ্ছে মেট্রো রেলেকে। তীব্র উত্তেজনা ক্রমশ গতি পাচ্ছে তার মনের ভিতরেও। কী হতে চলেছে এরপর, হক অনুমান করতে পারছে না।
১৮
রিসর্টের সবুজ ঘাসের উপর গার্ডেন চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে পড়ন্ত বিকেলের বাতাস উপভোগ করছিলেন আয়েশা। উত্তরবঙ্গ হলেও গ্রীষ্মের উষ্মা যথেষ্টই প্রকাশ পাচ্ছে আবহাওয়ায়। তবে সূর্য ডুবে যাওয়ার পরেই তাপমাত্রাটা যেন এক লাফে কিছুটা নেমে যায়। বাতাসে একটা স্নিগ্ধ ভাব আসে, শরীর, মন যেন জুড়িয়ে যায়।
মোবাইলের ক্লকে সময় দেখলেন আয়েশা। সঞ্জয়ের এখনও দেখা নেই! অথচ এই সময়ে ওঁদের দুজনের হাঁটতে যাওয়ার কথা। এখানে আসার দিন থেকেই আয়েশার ইচ্ছে মূর্তি নদীর উপর দিয়ে চলে যাওয়া ব্রিজটা ধরে হেঁটে বেড়ানোর। গতকাল তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও বেরোনো হয়নি। রিসর্টের ম্যানেজার আয়েশার প্ল্যান জানতেন, তাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বলে গিয়েছিলেন, “রুম থেকে বেরোবেন না ম্যাডাম, হাতি বেরিয়েছে রোডে।” আয়েশার খুব ইচ্ছে হয়েছিল সচক্ষে হাতির তাণ্ডব দেখেন, কিন্তু সঞ্জয় তাঁকে ঘরের বাইরেই যেতে দেননি।
আজ সান্ধ্যভ্রমণের জন্য একেবারে প্রস্তুত হয়েই ঘরের বাইরে এসেছেন আয়েশা।
গরমকালের কথা মনে রেখে সঙ্গে সব হালকা রঙের পোশাক এনেছেন। আজ পরেছেন ধবধবে সাদা সিফনের শাড়ি, সঙ্গে সাদা চিকনের ব্লাউজ। একটু আগে ম্যানেজার নিজে এসে ফ্রুট জুস দিয়ে গেলেন। বলে গেলেন, “ইউ আর লুকিং ভেরি প্রিটি ম্যাডাম।” আসলে আয়েশার রূপের ছটা তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল। সাদা শাড়িতে দীর্ঘাঙ্গী ও বেতের মতো ছিপছিপে শরীরের আয়েশার যৌন আবেদন যেন বড্ড বেশি স্পষ্ট হয়েছে আজ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রস্তুত হতে হতে সেটা নিজেও বুঝেছেন আয়েশা। পুরুষমানুষের চাহনির ভাষা তিনি ভালোই পড়তে পারেন। অভিনেত্রীর দেখভালের জন্য একজন বিশেষ বেয়ারাকে নিয়োগ করা সত্ত্বেও ম্যানেজার কেন নিজেই মাঝে মাঝে চলে আসছেন পরিষেবা দিতে, তা আয়েশা ভালোই বুঝতে পারছেন।
সঞ্জয় যখন এসে পৌঁছোলেন, আকাশে আলো আরো কমে এসেছে। তিনি একটু নিরস্ত করার চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু নায়িকা যে আজ কোনো বাধাই মানবে না, তা বেশ বুঝতে পারলেন। ওরা যখন রিসর্টের গেটে, তখন শুভঙ্করের কাছে রাখা আয়েশার মোবাইলটা বেজে উঠল। আয়েশা সঞ্জয়শেখরের সঙ্গে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন রিসর্টের গেট পেরিয়ে তাই শুভঙ্কর কী বলছে তা তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু লক্ষ্য করছিলেন কথা বলতে বলতে শুভঙ্করের ভুরুজোড়া কুঁচকে যাচ্ছে। সে কেবল দু’ বার ‘ওকে’ বলে ফোন ছেড়ে দিল।
“কার ফোন শুভ? কোনো টেনশন?” শুভঙ্কর গেটের বাইরে পৌঁছনোর পর জিজ্ঞেস করলেন আয়েশা।
শুভঙ্কর যেন একটু থতমত খেয়ে গেল। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “নো ম্যাডাম, নাথিং সিরিয়াস।”
“যাক। তুমিও কি আমাদের পিছন পিছন যাবে নাকি? এত বডিগার্ডগিরি করতে হবে না শুভ। তুমি রুমে থাকো বা নিজের মতো এনজয় করো। তুমিও ঘুরতেই এসেছো। নিজেকে টাইম দাও একটু,” সামান্য শাসনের ভঙ্গিতে বললেন আয়েশা।
শুভঙ্কর মোবাইলটা পকেটে রাখতে রাখতে বলল, “তা কী করে হয় ম্যাডাম। আমাকে তো থাকতেই হবে। বাট আই উইল কিপ আ ডিসট্যান্স, ডোন্ট ওয়ারি।”
“আর কীই বা বলার থাকে এরপর? যা খুশি করো,” বলে আয়েশা একটু রাগতভাবেই এগিয়ে গেলেন সঞ্জয়ের সঙ্গে।
গ্রীষ্মের সন্ধে, তাই সূর্য অনেকক্ষণ অস্ত যাওয়া সত্ত্বেও আশপাশ বেশ দেখা যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে আপনমনে বয়ে চলা মূর্তি নদীর স্রোতকেও। নদীর পাড়ে কিছু যুগল বসে আছে। পাছে তারা কেউ চিনে ফেলে সেলফির জন্য উৎপাত করে তাই একখানা স্কার্ফ দিয়ে মাথা পেঁচিয়ে নিলেন আয়েশা। সানগ্লাসটাও পরে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সঞ্জয় আপত্তি জানালেন, “তুমি একজন হিরোইন, সেলিব্রিটি। তোমাকে কোথাও দেখলে পাবলিক একটু মাতামাতি করবেই। তার জন্য এভাবে কালো চশমার মধ্যে দিয়ে প্রকৃতি দেখবে? তাহলে আর আসা কেন? ডাইনিং রুমে বসে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক দেখলেই হয়!”
আয়েশা হেসে ফেললেন। তাঁর সেই হাসি সঞ্জয়ের মনে যেন জলতরঙ্গ বাজিয়ে দিয়ে গেল। কখন যেন নিজের অজান্তেই আয়েশার কোমরে হাত রেখেছেন তিনি। ব্লাউজ আর কোমরের মাঝে তার শরীরের অনাবৃত অংশের স্পর্শ পাচ্ছেন তিনি। কেমন যেন একটা অস্থির করে তোলা অনুভূতি। আয়েশাও ক্রমশ সঞ্জয়ের কাছ ঘেঁষছেন। আশেপাশের সবকিছু যেন মিলিয়ে যাচ্ছে পড়ন্ত বিকেলের আঁচ কমে আসা আলোয়, কেবল একখণ্ড ধবধবে মেঘেতে চড়ে তিনি যেন এগিয়ে চলেছেন অজানার উদ্দেশ্যে, সঞ্জয়ের এমনই মনে হচ্ছিল। রিসর্টগুলো পেরিয়ে রাস্তার বাঁ দিকে সরকারি বনবাংলোকে ফেলে ওঁরা গিয়ে পৌঁছোলেন তিন মাথার মোড়ে। এখান থেকে বাঁ দিক ঘুরে সামান্য এগোলেই মূর্তি নদীর উপরে সেই ব্রিজ। রাস্তার উলটোদিকে গভীর জঙ্গল যেন অনেক রহস্য বুকে নিয়ে বসে ওঁদের দেখছে। ব্রিজের উপর দিয়ে আরো কিছু মানুষ হাঁটছে, কেউ বা ছবি তুলছে।
সঞ্জয়ের হাতটা ধরে টান দিয়ে আয়েশা দ্রুত এগোতে লাগলেন ব্রিজের দিকে। এই প্রথম তাঁর মনে হচ্ছে নতুন সম্পর্কটার কথা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া উচিত। বয়ে চলা মূর্তি নদীকে পিছনে রেখে তোলা একটা সেলফিই সেই ঘোষণার জন্য আদর্শ ফ্রেম। শুভঙ্করকে ডেকে তার হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় কেড়ে নিয়ে এসে সেলফি তুলে ফেললেন খচ খচ করে।
ব্রিজের মাঝামাঝি এসে আয়েশা দাঁড়িয়ে পড়লেন। একটু আগে তোলা সেলফিগুলোকে ফেসবুকে আপলোড করে দিলেন চটপট। সঙ্গে একটা মানানসই ক্যাপশান দিতে যাচ্ছেন, এমন সময়ে একটা শব্দ আয়েশার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাল। একটা মোটরবাইক ওঁদের বেশ কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। দুটো লোক বসে আছে বাইকের উপরে। বাইকের ইঞ্জিন চালু রয়েছে, তাই শব্দও চলছে। আয়েশা দেখলেন পিছনে বসা লোকটি খুব দ্রুত তার বাঁ হাতটা উপরে তুলল। সে হাতে কালচে একটা জিনিস ধরে আছে সে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই আয়েশা পেটে আর বুকের বাঁ দিকে তীব্র জ্বালা ও যন্ত্রণা অনুভব করলেন। পরপর যেন আগুনের গোলা এসে বিঁধছে তাঁর শরীরের অন্যান্য অংশেও। অসম্ভব যন্ত্রণায় তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কাতর আর্তনাদটাও যেন শক্তি হারিয়েছে। মুহূর্তেই ব্রিজের দেওয়ালে এলিয়ে পড়লেন আয়েশা। সব যেন কেমন বেশি করে অন্ধকার হয়ে আসছে।
মাথায় গুলির আঘাত নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন সঞ্জয়শেখর। তাঁর শরীর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাথর হল। আয়েশার চোখের কোল গড়িয়ে নেমে এল এক বিন্দু জল। ধবধবে সাদা সিফনের শাড়ির গায়ে সদ্য বেরিয়ে আসা রক্তের দাগ দ্রুত গাঢ় হতে লাগল। পরপর আটবার গুলির শব্দ জঙ্গলের গাছে বাসা বাঁধা হাজার হাজার পাখির মধ্যে এক অপ্রত্যাশিত চাঞ্চল্য সৃষ্টি করল। মোটরবাইকটা দ্রুত এগিয়ে গেল জলদাপাড়ার দিকে। মোবাইলটা আয়েশার হাতেই রয়ে গিয়েছিল, সেটা মুঠো আলগা হওয়ায় মাটিতে পড়ল। নতুন সম্পর্কের ঘোষণা অসম্পূর্ণই রয়ে গেল।
১৯
খানুয়া মোড় পেরিয়ে ডান দিকে হাইওয়ে ধরে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা নির্জন জায়গায় থামল মোটরবাইক। বাইকের পিছনে বসা সওয়ারি প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে সাফল্যের বার্তা পাঠিয়ে দিল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে। লেখা হল একটিমাত্র শব্দ— ‘হিট’।
কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চারজন ব্যক্তির মোবাইলে গিয়ে পৌঁছোল সেই বার্তা। তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে নিল মিশনের পরবর্তী ধাপের জন্য। এই মুহূর্তে শহরের চারটি নির্দিষ্ট জায়গায় রেইকি চালাচ্ছে তারা। আজকের মিশনের সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার রেশ থাকতে থাকতেই আরো বড় আঘাতটা, যার জন্য কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে তাদের এদেশে আসা, সেটা হানতে হবে। সে কাজকে ত্বরান্বিত করতে সঠিক সময়ে এসে উপস্থিত হবে তাদের আরো কয়েকজন সহযোদ্ধা। কিন্তু কবে, কীভাবে তা তারা এখনও জানে না। জানে কেবল একজনই। গোটা পরিকল্পনাটা যে সাজাচ্ছে, সেই কমান্ডার-ইন-চিফ ইখলাস রুবেল। কোথায় আছে সে, কী ভাবছে, ওরা কেউ জানে না। রুবেল সময় ও প্রয়োজনমতো ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেয়।
কাজ শেষ হলে জানানোর কথা ছিল ওদের, তাই শ্যুটার কমান্ডার-ইন-চিফের কাছেও বার্তা পাঠিয়ে দিল। কিন্তু কোথায় বসে এই মুহূর্তে সে এই বার্তা পড়ছে তা একমাত্র সেই জানে। ওদের কাছে ইখলাস রুবেল একটা জীবন্ত রহস্য। কীভাবে যেন সকলের মাঝে থেকেও নিজেকে অদৃশ্য করে রাখতে পারে। কেউ বলতে পারে না, এই মুহূর্তেই হয়তো রাস্তার ধারের এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে থেকে সে বেরিয়ে আসবে।
মেসেজ পাঠানো হয়ে গিয়েছিল তাই বাইক আবার চলতে শুরু করল। অজানা ডেরা থেকে রুবেলের পরবর্তী নির্দেশ এসে গেল— জলদাপাড়ার কাছে ট্রাক অপেক্ষা করবে। বাইক তাতে চড়িয়ে ওদের চলে যেতে হবে গোপন আস্তানায়। সেটা কোথায় ওরা জানে না।
একবার পিছনে ফিরে দেখে নিল শ্যুটার। না এখনও পিছনে পুলিশের ভ্যান ধাওয়া করে আসছে না। এমন আচমকা ঘটনাটা ঘটে গেছে যে পুলিশ ফোর্সের পক্ষে পরিস্থিতি সামলে উঠতে সময় লাগবে। সবচেয়ে বড় সুবিধে মূর্তি ব্রিজের উপরে সে মুহূর্তে আয়েশা সুলতানা আর ওই নচ্ছার ফিল্ম ডিরেক্টর ছাড়া আর কেউ ছিল না। সুতরাং অপারেশান সেরে বাইকটা দ্রুত কোনদিকে গেছে সেটা পুলিশকে কেউ বলতে পারবে না।
বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে, গাছে গাছে পাখিদের বচসা চলছে। অনেক দূরে রাস্তার উলটোদিক থেকে অনেকটা সময়ের ব্যবধানে একেকটা ট্যুরিস্ট গাড়ি আসছে। জলদাপাড়া থেকে ট্যুরিস্টরা আলো থাকতে থাকতেই ফেরে। সুতরাং ভয়ের কিছু নেই। ওরা মনে মনে উল্লসিত হচ্ছিল। নিয়তি কবেই বা কাকে তার উপস্থিতি সম্বন্ধে আগাম জানান দিয়েছে?
ছ’জন যুবকের একটি দল জলদাপাড়া ছেড়েছিল সন্ধের দিকে। হলং বাংলোর সামনের জলাশয়ে দলের একজন পা হড়কে পড়ে যায়। তার ফলেই ওদের এই দেরি। পা হড়কে পড়ে যাওয়ার অবশ্য স্পষ্ট কারণ ছিল। ওরা কেউই সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ ছিল না। ফেরার পথে জলদাপাড়ার নিরাপত্তাকর্মী গোলমালটা আঁচ করতে পেরেছিল তাদের গাড়ির ঘন ঘন ডান দিক, বাঁ দিকে নড়াচড়া দেখে। সে গাড়িটি আটকেও দিয়েছিল। কিন্তু বড়লোকের ছেলেরা একটি গোলাপি পাত্তির বিনিময়ে তার হাত থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে।
স্টিয়ারিংয়ে বসেছে অনুপ। চোখে ঝাপসা দেখছে, যেন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে সে। বাকি সদস্যদের অবস্থা আরো খারাপ। সব ঘুমে ঢুলছে। রিসর্ট থেকে পইপই করে বারণ করেছিল ড্রাইভারের হাত থেকে স্টিয়ারিং সরাতে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। এই ধরনের ট্যুরিস্ট গাড়ির ড্রাইভারেরা কখনোই অন ডিউটি মদ্যপান করে না। অনুপরা তাদের ড্রাইভারকে রীতিমতো জোর করেই খাইয়ে দিয়েছে চার পাত্তর। কারণ একটাই। সাঁ সাঁ গতিতে হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ছোটানো যাবে। পেটে মদ, গাড়ির জানালা দিয়ে তীব্র গতিতে ঢুকে আসা সন্ধের মিঠে বাতাস। ধুমকি আর কাকে বলে!
গাড়ি যে বিপজ্জনকভাবে কখনো ডান দিকে কখনো বাঁ দিকে সরে যাচ্ছে, সেটা বুঝলেও হাতকে নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থায় অনুপ নেই। ডান হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে সে বাঁ হাত দিয়ে মাঝে মাঝেই চোখ ডলে নিচ্ছে। বাইরে ঘন অন্ধকার, হেডলাইটের আলোটা ঘোলাটে লাগছে। উলটোদিক থেকে যে কটা গাড়ি আসছে তাদের মাঝে অনেকটা করে গ্যাপ, এই যা বাঁচোয়া। কিন্তু তবু…
তবু ঘটনাটা এড়ানো গেল না। খারাপ কাজও অনেক সময় ভালো কাজের মঞ্চ তৈরি করে দেয়। তেমনই দিল মদ্যপ অনুপের বেসামাল হাত। মদের ঘোরে জঙ্গলের দিকে থেকে পাক খেতে খেতে উড়ে আসা একটা বড় খবরের কাগজের দলাকে কী না কী ভেবে খুব দ্রুত পাশ কাটানোর জন্য স্টিয়ারিংকে সজোরে ডান দিকে ঘুরিয়ে দিল অনুপ। গাড়িটা দ্রুত অনেকটা সরে গেল ডান দিকে। উলটোদিক থেকে আসা একটা মোটরবাইককে অনুপ খেয়ালই করেনি। বাইকওয়ালারা ভাবতেই পারেনি আচমকা অনুপদের স্করপিও এতটা সরে আসবে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও তারা আটকাতে পারল না মুখোমুখি সংঘর্ষটা। স্করপিও এবং বাইক, দুটিরই গতি ছিল যথেষ্ট। স্করপিওর দৈত্যাকার শরীরে ধাক্কা খায়ে বাইকটা ছিটকে গিয়ে পড়ল রাস্তার একেবারে ধারে। ধড়াম করে একটা শব্দ শুধু শুনতে পেল অনুপ। তার ঘোর কাটল। গাড়ি সামান্য এগিয়ে ব্রেক কষল সে। গাড়ির বাকিদেরও যেন ঘুম ভাঙলো। অনুপ গাড়ি থেকে নামল। পিছন ফিরে দেখল রাস্তার একেবারে ধারে একটা গাছের গোড়ায় একটা মানুষ পড়ে আছে। সন্ধের অন্ধকারে তার অবয়ব বড় অস্পষ্ট। বাইকটা রাস্তার উপরে যেন হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে। অনুপের নেশা পালিয়েছে। সে ছুটে গেল রাস্তার ধারে। একটা শব্দ শুনতে পেল সে। শুকনো পাতার উপর দিয়ে কেউ হেঁটে বা দৌড়ে গেলে যেমন শব্দ হয়। বাইকে কজন সওয়ারি ছিল, মাতাল অনুপ তা লক্ষ্য করার সুযোগ পায়নি। সে বুঝতে পারল না শব্দটা কিসের।
রাস্তার ধারে পড়ে থাকা লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল অনুপ। ইতিমধ্যে তার বন্ধু সোমু আর পার্থও এসে পড়েছে। পার্থ মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালল। লোকটার মাথা ভেসে যাচ্ছে রক্তে। বেঁচে আছে বলে মনে হয় না। ভয়ানক দৃশ্য দেখে গা শিরশির করে উঠল ওদের। সোমু একটু দূরে ছিটকে গেল। একটা শব্দ বেরিয়ে আসছে ওর গলা থেকে। বমি করছে মালটা। গা গোলাচ্ছে অনুপেরও। কী হবে এখন?
