ইনজুরি টাইম – ৫০

৫০

বিকেল সাড়ে তিনটে: অসম্ভব থমথমে দেখাচ্ছিল গোটা এলাকাটাকে। প্রচুর পুলিশ রাস্তার দুই পাশে। প্রচণ্ড গরমে দুপুরে অনেক দোকানই বন্ধ থাকে কিন্তু আজ যেন একটা অঘোষিত বনধের চেহারা নিয়েছে গাজোল। বিদ্রোহীর মোড় যেন জনশূন্য। দ্রুত গতিতে বালুরঘাটের দিকে চলে যাওয়া বাস, লরিগুলোর গর্জন যেন আজ বেশি কানে লাগছে।

ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁলো তবু রাস্তায় তেমন লোকের সংখ্যা বাড়ল না। প্রতীক চলে এসেছিলেন বাড়িতে কিন্তু একটা চাপা উৎকণ্ঠা তাঁর মনের মধ্যে কাজ করছিল। সাড়ে পাঁচটা নাগাদ বেরিয়ে প্রথমেই তিনি গেলেন কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেখানে আহত রিয়াজুলের চিকিৎসা চলছে। চোট অনেক জায়গায় লাগলেও একটা স্বস্তির ব্যাপার এই, যে, কোনো হাড় ভাঙেনি। রিয়াজুলের মা তার বেডের পাশে দিশেহারা হয়ে বসেছিলেন। প্রভাতী সংঘের ছেলেরা ভিড় করেছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, নার্স, আয়ারা তাদের বেরিয়ে যেতে বলছে।

দৃশ্যটা ভালো লাগছিল না প্রতীকের। ছোটখাটো উত্তেজনা তিনি দেখেছেন বটে কিন্তু সেগুলো সামলাতে এসপি-কে আসতে হয়নি। এলাকায় পুলিশি টহলেরও প্রয়োজন হয়নি।

তবে একটাই বাঁচোয়া। খবরওয়ালারা এখনও উৎপাত শুরু করেনি। স্থানীয় কয়েকটা কাগজের সাংবাদিককে প্রতীক দেখেছেন অবশ্য। তবে বিধায়ক অমল বরাট দাবড়ানি দিয়ে তাদের সরিয়ে দিয়েছেন।

তখন সন্ধে নেমেছে। বাড়ি ফেরার পথে চায়ের দোকান খোলা দেখে গতি কমালেন প্রতীক। এই সেই চায়ের দোকান যেখানে অস্ত্র উদ্ধারের রাতে ছদ্মবেশে বসে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। এই একটিই জায়গা আছে যেখানে লজ্জাজনক একটা মিথ্যে অপবাদ মাথায় নিয়ে বসলেও তাঁর মাথা নিচু হয় না। এখানে সবাই সত্যিটা জানে। প্রতীক আশা করেননি উত্তেজনার পরেও এই দোকান খোলা পাবেন।

তিনি বেঞ্চে বসলেন। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না তাঁর। স্ত্রী অন্তরা বারে বারে তাঁকে কটা দিনের জন্য আলিপুরদুয়ারে গিয়ে থাকতে বলছেন। কিন্তু এখান থেকে চলে যাওয়া মানে একরকম হার স্বীকার করে নেওয়া। এলাকার বিধায়ক তাই চাইছেন। আজ উত্তেজনার জায়গায় বরাটের তাঁর প্রতি ঘৃণাভরা চাহনি প্রতীকের চোখ এড়ায়নি। সে চাহনি দেখতে দেখতে ভিতরে ভিতরে জেদি হয়ে উঠছিলেন প্রতীক। ডিপার্টমেন্ট তাঁর জন্য কেমন ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন তা প্রতীক জানেন না, কিন্তু মনে মনে তিনি চাইছেন গাজোল ছেড়ে যাওয়ার আগে ওই লোকটাকে শায়েস্তা করে যেতে।

অন্তরা বারবার ফোন করে স্বামীর খোঁজ নিচ্ছিলেন আর “আসছি,” “কাছেই আছি” জাতীয় কথা বলে বাড়ি ফেরাটা দূরে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করছিলেন প্রতীক।

সন্ধে সাড়ে ছ’টা তখন, দিনের আলো প্রায় নিভে এসেছে, এমন সময় প্রতীক দেখলেন একটা ছেলেকে গার্লস স্কুল পেরিয়ে এসে চায়ের দোকান ছাড়িয়ে বিধানপল্লীর দিকে চলে যেতে। চায়ের দোকানের মালিকও দেখেছে তাকে। সে বলল, “দেখেছেন, সাহস দেখেছেন? এত বড় কাণ্ডটা করেছে, তারপরেও রাস্তায় বেরিয়েছে। বেশি মাস্তানি। পুলিশ ছেড়ে না দিয়ে হাজতে ঢুকিয়ে দিলেই পারতো।’’

ছেলেটার নাম বাবলা। আজ রিয়াজুলকে যারা বিনা দোষে মেরেছে তাদের অন্যতম। ভারত সেবকের লোকাল লিডার পবিত্র দত্তের খুব ন্যাওটা হয়েছে আজকাল। সেই কারণেই দুঃসাহসটা বেশি।

ঠিকই বলেছে দোকানের মালিক জীবনদা। এদের হাজতেই জায়গা হওয়া উচিত ছিল, মনে মনে বললেন প্রতীক। আলো কমার সঙ্গে সঙ্গেই মশার উৎপাত বেড়েছে, তাই বেঞ্চ ছাড়লেন তিনি। চায়ের দাম মিটিয়ে সবে বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছেন, এমন সময় প্রতীককে প্রায় ধাক্কা দিয়ে আরেকজন ব্যক্তি দ্রুত ছুটে গেল বাবলা একটু আগে যে পথে গেছে, সে পথে। আবছা আলোয় ব্যক্তির চেহারাটা স্পষ্ট দেখতে পাননি কিন্তু তিনি বিপদের গন্ধ পেয়েছেন। দৌড়লেন তিনি সেই ছায়ামূর্তিকে অনুসরণ করে। একটা সরু গলি দিয়ে বাঁ দিকে ঢুকল সে, প্রতীকও গতি বাড়াতে শুরু করলেন। শুনশান সরু গলিতে একটা বাড়ির বাইরে বাল্ব জ্বলছে; সেই আলোয় দেখা যাচ্ছে ছায়ামূর্তি তেড়ে যাচ্ছে বাবলার দিকে।

পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে বাবলা ফিরে তাকাল এবং তার দিকে আক্রমণ ধেয়ে আসছে দেখেই পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করল। ছুটলেন প্রতীকও। গলি পেরিয়ে একটা ছোট মাঠে এসে পড়েছেন তিনি। মাঠের এক প্রান্তে তিনি, অপর প্রান্তে বাবলা আর তার আক্রমণকারী। সন্ধের আকাশে একটা বেগুনি রঙ ধরেছে। সেই আলোয় প্রতীক দেখলেন আক্রমণকারী বাবলাকে লক্ষ্য করে কিছু একটা ছুঁড়ে মারল। লম্বা, অর্ধেক চাঁদের মতো আকারের জিনিসটা অল্প উচ্চতায় গিয়ে আছড়ে পড়ল বাবলার পায়ে।

আর্তনাদ করে মাটিতে পড়ে গেছে বাবলা। ছায়ামূর্তি বিদ্যুতের গতিতে এগিয়ে গিয়ে সেই জিনিসটা হাতে তুলে নিয়েছে। প্রচণ্ড গতিতে ছুটে এসে কোনো রকমে সেই হাতটা যন্ত্রণাকাতর বাবলার গলার উপরে নেমে আসার আগেই তাকে ধাক্কা মেরে বাঁ পাশে সরিয়ে দিলেন প্রতীক। সে দমবার পাত্র নয়। মাটিতে ছিটকে পড়লেও কাটারিটা ছাড়েনি। আবার উঠে আসছে; মুখে সাপের মতো ফোঁসফোঁস শব্দ তার।

তাকে জাপটে ধরলেন প্রতীক সেন। তার চেহারা বড়সড় বটে কিন্তু পুলিশের দৈহিক দৃঢ়তার সঙ্গে পারবে কেন? পারলও না। প্রবল ধ্বস্তাধ্বস্তির শেষে কাটারিটা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন প্রতীক। সজোরে এক থাপ্পড় কষালেন তার গালে। সে ছিটকে পড়ল মাটিতে। সন্ধের অন্ধকার এতক্ষণে সয়ে এসেছে দুজনের চোখেই। ছেলেটাকে চিনতে পারলেন প্রতীক।

“কী করছিস ইসমাইল,” তিনি ধমকে উঠলেন।

প্রভাতী সংঘের ছেলেদের মুখ ভালোই চেনেন তিনি। ইসমাইলকে তার লম্বা-চওড়া চেহারার জন্য আরো বেশি করে চেনেন। কিন্তু ছেলেটার চোখে এই মুহূর্তে যে ভয়ংকর আগুন জ্বলছে, তা তিনি আগে কখনো দেখেননি।

থাপ্পড় খেয়ে কিছুটা দূরে ছিটকে পড়েছিল ইসমাইল। তাকে মাটি থেকে টেনে তুলে একটা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে প্রতীক বললেন, “বাড়ি যা, নিজের কাজ কর। আগুন লাগাস না, সামলাতে পারবি না কিন্তু। এখনও বাচ্চা আছিস।”

পাশে মাটিতে পড়ে তখনও যন্ত্রণায় ছটফট করছে বাবলা।

প্রতীকের বাড়ির কাছেই এক বয়স্ক ডাক্তারের ছোট্ট চেম্বার আছে। ভদ্রলোক ভালোমানুষ, তবে পসার একেবারেই নেই। সেখানেই বাবলাকে প্রায় চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেলেন তিনি। একেই এলাকা তেতে আছে সকাল থাকে, তার উপরে এই ঘটনা জানাজানি হলে আর রক্ষে থাকবে না।

প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসা কাটারিটা বাবলার প্যান্টটাকে ফালা করে দিয়ে চামড়ায় গেঁথে গিয়েছিল। সে প্যান্ট গোটাতেই ক্ষতের অবস্থা দেখে বয়স্ক ডাক্তার শিউরে উঠলেন। তাঁর বিস্ফারিত চাহনিতে এমন ক্ষতের কারণ খুঁজে বেড়ানোর ছাপ স্পষ্ট পড়তে পারলেন প্রতীক। তিনি ঠোঁটে আঙুল রেখে যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিলেন। বাবলা কথা বলার অবস্থায় নেই; মুখ বিকৃত করে ছটফট করছে।

স্টিচ করা হল দ্রুত। তারপর বাবলার পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে বৃদ্ধ ডাক্তার বললেন, “কী সব কাণ্ড হচ্ছে বলুন তো এলাকায়? কয়েকদিন আগে; অনেক রাত তখন, ঘুম ভেঙে গেল দরজা ধাক্কানোর শব্দে। দরজা খুলে দেখি একটা লোক দাঁড়িয়ে। ‘কী চাই ভাই’ জিজ্ঞেস করতে সে তার ডান হাতখানা তুলে দেখাল। দেখেই বুঝলাম। সব্বনেশে কাণ্ড। গুলি কবজি ছুঁয়ে চলে গেছে। ভাবা যায়!”

প্রতীক সেন বৃদ্ধের কথায় বিশেষ কান দিচ্ছিলেন না, কিন্তু বয়ানের শেষাংশটা তাঁকে চমকে দিল। কয়েকদিন আগে— অনেক রাতে—  লোক— কবজি ছুঁয়ে গুলি চলে গেছে! মিলে যাচ্ছে যে!

“বলেন কী! তারপর?” উত্তেজনা চেপে রেখে প্রশ্ন করলেন প্রতীক।

“তারপর আর কী? এসেছে যখন, ফিরিয়ে তো দেওয়া যায় না। বললাম তাকে হাসপাতালে যান, নয়তো নিদেনপক্ষে হেলথসেন্টারে যান। তা যাবে না। অগত্যা আমার এই সামান্য ডিসপেনসাির কী আর ওই কাজের জন্য? তবু করে দিলাম যা পারি। বুঝতেই পারছিলাম পুলিশ কেস এড়াতে চায় তাই বড় জায়গায় যাবে না। চেহারাও ভদ্দরলোকের মতো না। মরুক গে।”

“কী করে হল জিজ্ঞেস করেছিলেন? এখান থেকে বেরিয়ে কোন দিকে গেছে দেখেছেন?”

“জিজ্ঞেস করে কী হবে? সত্যি থোড়াই বলবে সে! তবে বেরিয়ে বড় রাস্তার দিকেই গেছে। সেটা দেখেছি,” ডাক্তার কাজ শেষ করে বেসিনের দিকে যেতে যেতে জবাব দিলেন।

ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়ে যেতে বাবলা একটু শান্ত হল। সেই সুযোগে প্রতীক তার কানের কাছে মুখ এনে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, “যদি আর ঝামেলা বাড়াতে না চাস, এই ঘটনা পাঁচ কান করিস না। ফল ভালো হবে না কিন্তু। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে, কিছু একটা বলে দিস; কিন্তু আসলে কী হয়েছে কাউকে বলিস না। বুঝতে পারছিস তো, সকালে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিস তোরা! এবার তুই যদি নালিশ করিস পার্টি অফিসে গিয়ে, তাহলে এলাকায় আগুন জ্বলবে। তুই কিন্তু পার পাবি না। এবার পায়ের উপর দিয়ে গেছে, পরের বার আর ঠেকানো যাবে না। বুঝলি?”

বাবলা মন দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনে ঘাড় কাত করল বটে, কিন্তু প্রতীক সেন স্বস্তি পেলেন না। অল্প বয়স, প্রতিহিংসার আগুন জ্বলবেই ওর মাথার ভিতরে। আর একবার যদি সত্যিটা জানাজানি হয়…

গত দু’ দিন ধরে পদ যাওয়ার যন্ত্রণা প্রতীককে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। এই প্রথম তাঁর মনে হচ্ছে যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। এলাকায় রাজনীতির যা সমীকরণ তাতে এই উত্তেজনাকে নিরপেক্ষভাবে প্রশমিত করা কঠিন হত। তিনি নিরপেক্ষই থাকতে চাইতেন এবং ফলস্বরূপ নেতাদের বিরাগভাজন হতেন। তার চেয়ে এই ভালো হয়েছে।

৫১

ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠীর নির্দেশে আগের রাতেই দেবেন দত্ত স্থানীয় ছেলেপুলেদের রিসর্টের বাইরে ডেকে একটা দল তৈরি করে দিয়েছিলেন। ভোরের আলো ফুটতেই সেই দলকে নিয়ে এনএটিসি’র দুই অফিসার গিয়ে পৌঁছোলেন মূর্তি নদীর ধারে। ঠিক ব্রিজের নিচ থেকে এক কিলোমিটার মতো জায়গা জুড়ে তাঁরা তল্লাশি চালাতে চান নদীর জলে।

ছেলেদের নামিয়ে দেওয়া হল। নদীর ধারে জুতো খুলে রেখে, প্যান্ট গুটিয়ে জলে নামলেন ধর্মেন্দ্র ও সুনীলও।

হাঁটুর নিচ দিয়ে বেগে বয়ে যাচ্ছে মূর্তির জল। এই এলাকায় গরম সেরকম ভয়াবহ আকার নিতে না পারলেও একটা গুমোট ভাব আছে বাতাসে। তাই জলে দাঁড়িয়ে থাকতে মন্দ লাগছিল না ধর্মেন্দ্র’র। হাঁটতে গিয়ে প্রতি পদে বাধা পেতে হচ্ছে নুড়ি আর বোল্ডারে, কিন্তু স্থানীয় ছেলেগুলো দিব্যি টুকটুক করে নদীর মধ্যে এদিকওদিক হাঁটাচলা করছে। পায়ের পাশ দিয়ে মাঝে মাঝেই পালিয়ে যাচ্ছে চুনো মাছ, বয়ে যাচ্ছে অনেক আবর্জনাও।

সামনে তাকালেই দূরে ভুটান পাহাড়ের আউটলাইন আর দু’ পাশে মূর্তি নদীর জল।

ওরা ব্রিজকে পিছনে ফেলে চলে এসেছেন বেশ কিছুটা, ছেলেরা জলের মধ্যে বসে বসে বিভিন্ন বোল্ডার সরিয়ে সরিয়ে খুঁজছে কিছু। সেদিনের আদিবাসী মেয়েটা যদি ঠিক দেখে থাকে, তাহলে সে জিনিসের সন্ধান পাওয়াটা একেবারে অসম্ভব নয়। সেই আশাতেই এই অভিযান।

তল্লাশির চাপা উত্তেজনা তো আছেই, ছোটবেলা এই অঞ্চলে কেটেছে তাই চল্লিশোর্ধ্ব সুনীল রক্ষিতের বেশ লাগছিল নদীর জলে পা ডুবিয়ে হাঁটতে। মাঝে মাঝেই যেন ছোটবেলার টুকরো স্মৃতি ভেসে আসতে চাইছিল চোখের সামনে। বেলা বাড়ছে, রোদের তাপও বাড়ছে। তাতে অবশ্য সুবিধেও হচ্ছে ওদের। জলের তলা আগের চেয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

প্রায় ঘণ্টাখানেক তল্লাশির পর অনেকটা দূর থেকে একটি ছেলে চিৎকার করে উঠল। সে হাত নাড়ছে। সেই হাতে কিছু রয়েছে। বোল্ডারের বাধাকে অবহেলা করে দ্রুত তার দিকে এগোতে শুরু করলেন দুই তদন্তকারী অফিসার। ছেলেটাও বেশ উত্তেজিতভাবে এগিয়ে আসছে তাঁদের দিকে। একটা জয়ের ছাপ তার অভিব্যক্তিতে।

যা খুঁজছিলেন তা হাতে পেয়ে গেলেন ধর্মেন্দ্র, সুনীলেরা। জিনিসটার চেহারার সঙ্গে দেবেন দত্তের দেওয়া বর্ণনাও মিলে যাচ্ছে। ধর্মেন্দ্র’র হাতে জলে ভেজা জিনিসটা হল একটা ছোট মোবাইল ফোন, একেবারে বেসিক মডেল। কেবলমাত্র কল আর টেক্সট মেসেজ করা যায় এই ফোনে, তবে তার চেয়েও বড় কথা ছোট্ট এই যন্ত্রটা লুকিয়ে রাখাও খুব সহজ।

ধর্মেন্দ্র ও সুনীল চোখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।

সকাল পৌনে সাতটা নাগাদ কলকাতায় এনএটিসি টিমের বাকি দুই সদস্যের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশ চলে গেল। সাক্ষ্য ও তথ্য সন্দেহ তৈরি করছিল গোড়া থেকেই, আর তাই সন্দেহভাজন ব্যক্তির মোবাইলের টাওয়ার ট্র্যাক করাও চলছিল একটানা। সকাল সোয়া আটটায় ধর্মতলায় দূরপাল্লার বাসস্ট্যান্ডে শিলিগুড়ির বাস থেকে মাটিতে পা ফেলা মাত্রই এনএটিসি’র জালে জড়িয়ে পড়ল অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানার ম্যানেজার শুভঙ্কর সাহা।

খবর ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। সকাল দশটা নাগাদ সমস্ত বৈদ্যুতিন মাধ্যম ফ্ল্যাশ করতে লাগল ব্রেকিং নিউজ: অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানা হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্যকর মোড়! গ্রেফতার করা হল তাঁর ম্যানেজার শুভঙ্কর সাহাকে!

এগারোটা নাগাদ কাজে বেরনোর আগে ভাত খেতে বসেছিলেন রবিউল আলম। খাওয়া যখন মাঝপথে, ফোনে খবরটা পেলেন তিনি। ছেলেকে বললেন টিভিতে বাংলা নিউজ চ্যানেল দিতে। যা দেখার দেখে নিলেন। থালার এক প্রান্তে সাদা ভাত সাদাই রয়ে গেল। হাত ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লেন রবিউল। ভবিষ্যৎটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন তিনি।

ডুয়ার্সে তাঁদের কাজ শেষ, তাই রিসর্টের ম্যানেজার দেবেন দত্তের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন এনএটিসি’র দুই অফিসার। দেবেনের দাবি খুন হওয়ার বিকেলে আয়েশা ও সঞ্জয় যখন বেরোচ্ছেন রিসর্ট থেকে, তাঁদের কিছুটা পিছনে ছিল শুভঙ্কর। দেবেনের ঘরটা রিসর্টের প্রবেশ পথের বেশ কাছাকাছি। ঠিক সেই সময়ে কারেন্ট চলে যাওয়ায় নিজের ঘরের কাচের জানালা খুলেছিলেন দেবেন। মসৃণ চ্যানেলের উপর দিয়ে জানালার কাচের প্যানেল সরে যায়, কোনো শব্দ হয়নি। তাই শুভঙ্করও সতর্ক হয়নি। দেবেন দেখেছিলেন শুভঙ্কর পকেট থেকে মোবাইল বের করছে। শুভঙ্করকে “লাইফ থ্রেট!” কথাটা উচ্চারণ করতে শুনেছিলেন দেবেন। তিনি দেখেছিলেন সে ফোন কেটে অত্যন্ত ভাবলেশহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে রিসর্ট ছাড়ছে।

সেই সন্ধ্যায় মেটেলি থানার সাব-ইন্সপেক্টরের প্রশ্নের জবাবে শুভঙ্কর যখন দাবি করে থানা থেকে অ্যালার্ট কল পেয়েও সে ম্যাডামকে সতর্ক করার সুযোগ পায়নি, তখন দেবেনের সন্দেহ হয়।

শুভঙ্কর যে সত্যি বলছে না, এই সন্দেহ করেছিলেন থানার এসআই অর্জুন দাসও। এদিকে আদিবাসী মেয়েটি সেদিন ধর্মেন্দ্রদের জানিয়েছে সেই বিকেলে গুলি চলার ঠিক আগের মুহূর্তে সে যখন নদীর পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে বড় রাস্তার দিকে এগোচ্ছে, এক বাবুকে সে দেখেছিল চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে। গুলির শব্দ হওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরে তিনি হঠাৎ ব্রিজের দিকে ছুটতে শুরু করেন।

মেটেলি থানার পুলিশ অল্প সময়েই তদন্ত অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মৃত দুই ব্যক্তির দেহ তল্লাশি করে অস্ত্র ছাড়াও তারা পেয়েছিল তিনটি মোবাইল। তারা অনুসন্ধান করে দেখেছে এই তিনটির একটি মোবাইল থেকে ঘটনার দু’ দিন আগে থেকে ঘনঘন যোগাযোগ রাখা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট নম্বরে।

তারা দুটি ফোনের টাওয়ার লোকেশন চেক করে দেখেছেন কলগুলো গোড়ার দিকে শিলিগুড়ি, পরে মালবাজার অঞ্চল এবং একেবারে শেষে ধুপঝোরা থেকে এলেও প্রতিটি কলই রিসিভ করা হয়েছে ধুপঝোরায় বসে। মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন অনুযায়ী সেই জায়গাটা মূর্তির এই রিসর্টের আশেপাশে। সেই নম্বরটি থেকে অপর নম্বরটিতে একটি কল যায় খুনের দিন সন্ধে ছ’টা আট মিনিটে। আয়েশা ও সঞ্জয়শেখর খুন হন ছ’টা একুশ মিনিটে এবং তারপর থেকে এই নম্বরটি নট রিচেবল হয়ে যায়।

এই তথ্য ধর্মেন্দ্রদের ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে কাজ মিটে যাওয়ার পরেই প্রমাণ লোপাট করার জন্য ওই নম্বর এবং সেই নম্বরধারী ডিভাইসটাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বহমান নদীর জলের চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে সেই কাজের জন্য?

দেবেন গতকাল ধর্মেন্দ্রদের জানিয়েছিলেন আয়েশাও সঞ্জয়ের খুনের আগের রাতে তিনি শুভঙ্করকে রিসর্টের লনে পায়চারি করতে দেখেছিলেন। সে খুব নিচু গলায় কারোর সঙ্গে কথা বলছিল এবং কল ডিসকানেক্ট করার পরে সে যখন মোবাইলটি পকেটে রাখছে, দেবেন লক্ষ করেছিলেন ফোন থেকে সে সিমটা খুলে নিচ্ছে। শুভঙ্করের নিজস্ব ব্যবহারের মোবাইলটির সঙ্গে দেবেনের সে রাত্রে দেখা মোবাইলটির বর্ণনা মিলছিল না। অতএব প্রশ্ন উঠছিল, দ্বিতীয় মোবাইলটি গেল কোথায়?

মূর্তি নদী থেকে সেই মোবাইলটা পাওয়া গেছে। সেটার বারোটা বাজলেও সিমটা যে মেটেলি থানার উল্লিখিত নম্বরের, সেটা ধর্মেন্দ্ররা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছেন। ওদিকে হক’কে আয়েশার শেষ ফিল্মের প্রোডাকশন টিমের সদস্যা সঞ্চিতা জানিয়েছে অভিনেত্রী কথায় কথায় তাকে জানিয়েছিলেন কোথায় একটু নিরিবিলিতে ঘুরতে যাওয়া যায়, সেই বিষয়ে আলোচনায় শুভঙ্করই তাকে ডুয়ার্সের কথা বলে এবং বুকিংয়ের সমস্ত দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেয়। ধরে নেওয়া যায় কাজটা মসৃণভাবে করার জন্যই ধুপঝোরাকে বাছা হয়েছিল। কাজটা হয়েছিল মসৃণভাবেই। শুধুমাত্র কয়েকটা বেহেড মাতাল ড্রাঙ্কেন ড্রাইভিং করে সমস্ত খেলাটা মাটি করে দিয়ে এনএটিসি’র সুবিধে করে দিয়েছে।

৫২

বিকেলে হাইস্কুলের মাঠের পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস দেখছিল হক। একটু স্বস্তি পেয়েছে সে আজ। শুভঙ্কর সাহার ধরা পড়াটা একটা বড় সাফল্য এবং এর কৃতিত্ব পুরোটাই ধরম আর সুনীলের। তার ভেবে ভালো লাগছিল যে কেসের উপযুক্ত দুজন তদন্তকারীকেই সে বেছে নিয়েছিল। বাকিটাও ওরা সামলে নেবে। অবশ্য মনে মনে উত্তরবঙ্গের ছোট্ট থানার সাব-ইন্সপেক্টরকেও কুর্নিশ জানাচ্ছিল সে। কেউ কাউকে চেনে না, চাইলে অসহযোগিতাও করতে পারত কিন্তু তা না করে এই যে একটা দলগত প্রয়াস, এটাই প্রয়োজন এই মুহূর্তে। একটা আন্তর্জাতিক চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। সে চক্রের অনেকটা অংশ এখনও এনএটিসি’র নাগালের বাইরে, তবু যে ধাপে ধাপে এগোনো যাচ্ছে তার কারণ রাজ্য পুলিশ, আইবি এবং এনএটিসি’র মধ্যে একটা অলিখিত সমন্বয় কাজ করছে। ঘোজাডাঙা ভোমরা সীমান্তে পোস্টেড আইবি অফিসার যেভাবে তাদের সাহায্য করেছেন তা না করলে তিন সন্দেহভাজন ব্যক্তির স্কেচ আঁকানো সম্ভব হত না। হকের কাছে গত পরশু গভীর রাতে সূত্র মারফত খবর এসেছে ওই স্কেচ নজরে আসতেই কলকাতা পুলিশের এসটিএফ সক্রিয় হয়েছে।

মাঠের ফুটবল প্র্যাকটিস যেন যুদ্ধের মহড়ার চেহারা নিয়েছে। কোচ রণজয় অসম্ভব পরিশ্রম করছেন ছেলেদের সঙ্গে। তাঁর ফিজিক্যাল ফিটনেস, ছেলেদের ইন্সট্রাকশন দেওয়ার কায়দা বেশ আকর্ষণীয়। আজও একবার বল গড়িয়ে হকের পায়ের কাছে চলে এসেছিল। সে দু’ বার পায়ে নাচিয়ে বল উপরে তুলে হেড দিয়ে সেটা মাঠে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।

গতকাল বিকেলে এলাকা একেবারে শুনশান ছিল। আজও একটা থমথমে ভাব রয়েছে, তবে দোকান, বাজার খুলেছে। সন্ধে হয়ে আসছে, দোকানে দোকানে আলো জ্বলে উঠেছে। প্র্যাকটিসও শেষ হল এক সময়ে। ছেলেরা একে একে মাঠ ছাড়ছে। হক একটা দোকানে দাঁড়িয়ে দেখছিল সব। তার কান খাড়া, সে শুনছে স্থানীয় মানুষের বিভিন্ন আলোচনা। সে আলোচনায় মামুলি থেকে গভীর, সব রকম বিষয়ই ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে।

এখন আলোচনা চলছে আসন্ন ফুটবল টুর্নামেন্ট নিয়ে। সিকিম, নেপালের পাশাপাশি বাংলাদেশের ফুটবল টিমও খেলতো আসে; এবার নেপালের টিমটা আসছে না, সেই কথা বলাবলি করছিলেন দুজন। হক তার চাহনিতে একটা ভীষণ সারল্য নিয়ে এসে প্রশ্ন করল, “বাংলাদেশ সে ভি টিম আতা হ্যায়?”

দুজনের একজন বলল, “হাঁ, বড়িয়া টিম। আগেরবার তো ফাইনালে জিতে যেত। ওদের যো মেন প্লেয়ার হ্যায়, ও লাল লার্ড দেখকে নিকাল গিয়া সেকেন্ড হাফ মে; ব্যস আর গোল শোধ দিতে পারল না।”

“তব তো সাপোর্টার ভি আতা হোগা,” চোখ বড় বড় করে কৌতূহল প্রকাশ করল হক।

“হ্যাঁ, আসে তো। আগেরবার পঞ্চাশজনের মতো এসেছিল।”

হকের যা জানার ছিল তা জানা হয়ে গিয়েছে। অনেক সমর্থক আসে। এবারেও আসবে। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে হবে। সে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এসে বিধানপল্লীর দিকে হাঁটছিল। তার কাছে খবর আছে সাসপেন্ডেড এসআই প্রতীক সেন এই অঞ্চলেই থাকেন এবং একটা চায়ের দোকানে তাঁকে প্রায়ই বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে অতি সম্প্রতি।

চায়ের দোকানে পৌঁছলেও সেই ভদ্রলোককে হক দেখতে পেল না। তবে কায়দা করে দোকান মালিকের থেকে জেনে নিল প্রতীক সেন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়েছেন সন্ধে ছ’টা নাগাদ। একটি টোটোয় চড়ে যেতে দেখা গিয়েছে তাঁদের। পায়ের কাছে দুটো ব্যাগ ছিল যা দেখে দোকান মালিকের অনুমান স্ত্রীকে ট্রেনে তুলতে গিয়েছেন তিনি।

এক কাপ চা খেয়ে প্রতীকের বাড়ির সন্ধান জেনে নিয়ে উঠে পড়ল হক। আজ ভদ্রলোকের সঙ্গে তাকে আলাপ করতেই হবে, নাহলে কাজ আটকে থাকছে। প্রতীকের বাড়িটা একটা গলির মধ্যে। সে গলিতে নিয়নের আলো জ্বলছে বটে তবে সে আলো দপদপ করছে। হক বাড়িটার সামনে দিয়ে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে একটা খালি জমির ধারে দাঁড়াল। যদি ভদ্রলোক স্টেশনেই গিয়ে থাকেন তাহলে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরবেন নিশ্চয়ই।

অপেক্ষা করতে করতে এক সময় হকের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে গলির মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হক দেখতে পাচ্ছে দুজন লোক এগিয়ে আসছে গলি দিয়ে। গামছা দিয়ে তাদের মুখ, মাথা ঢাকা, হাতে মোটা লাঠি। সামনেই একটা ঝোপ দেখে তার আড়ালে চলে গেল হক। লোক দুটোকে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। তারা প্রতীক সেনের বাড়িটা পেরিয়েই ডান দিকে একটা ছোট ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছে। একজন ঘন ঘন বাড়ির দেওয়ালের এপাশ থেকে উঁকি মেরে গলির মুখে দেখছে, আবার আড়ালে চলে আসছে।

কিছুক্ষণ পরে গলির মুখে একজন মানুষের অবয়ব দেখা দিল। ঝোপের আড়াল থেকে হক স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না অবয়বটাকে কিন্তু গামছায় মুখ ঢাকা দুজন সতর্ক হয়েছে। তারা তৈরি হচ্ছে। হক অনুমান করে নিতে পারল ওদের মতলবটা। সেও ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। প্রতীক সেন বাড়ির সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তালা খুলছেন। এক্ষুনি তাঁর উপরে নেমে আসবে ডান্ডা! হক দৌড়ল। লোক দুটো তার থেকে অনেকটা এগিয়ে আছে কাজেই প্রথম আক্রমণটা ঠেকানো তার পক্ষে সম্ভব হবে না।

হলও না। হঠাৎ সামনে লাঠিধারীকে চলে আসতে দেখে হতচকিত প্রতীক সেন সামলে উঠতে পারলেন না। তবে লাঠি মাথায় না নেমে নামল তাঁর কাঁধে।

“শুয়োরের বাচ্চা! চাকরি গেছে, তবু গাড়পাকামো যায়নি! ছোঁকছোঁক করে বেড়াচ্ছিস? কাটারি খেয়ে মরে পড়ে থাকতো শালা। তোকে বাঁচাতে যেতে কে বলেছে”— হুঙ্কার দিয়ে উঠল লাঠিধারী। সে ততক্ষণে আবার লাঠি উঁচিয়ে নামিয়ে আনতে উদ্যত হয়েছে; প্রতীক বসে পড়েছেন বাড়ির সিঁড়িতে, কোনো রকমে এক হাত সামনে এনে আক্রমণটা ঠেকানোর জন্য তৈরি হচ্ছেন। কিন্তু লাঠি তাঁর গোড়ালি ছোঁয়ার আগেই ঘটে গেল আরেকটি ঘটনা। লাঠিধারী হঠাৎ ছিটকে গিয়ে পড়ল কিছুটা দূরে। অন্ধকার থেকে আরেকজন লাঠিধারী বেরিয়ে এসেছিল কিন্তু তার থুতনিতে এক জোরালো লাথি কষিয়েছে এক তৃতীয় ব্যক্তি। সেও ছিটকে পড়ল মাটিতে। প্রথম আক্রমণকারী ততক্ষণে আবার উঠে এসেছে কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তির চেহারার কাছে সে নিতান্তই শিশু। তার লাঠিওয়ালা হাতকে ধরে পিছনে মুচড়ে শরীরটাকে কাঁধে তুলে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিল লোকটা। দ্বিতীয় আক্রমণকারী তাই দেখে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে উধাও হয়ে গেল। আছাড় খেয়ে যে পড়েছে, তার ছটফটানিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে তৃতীয় ব্যক্তি তাকে মাটি থেকে তুলে একই কায়দায় এবার বাঁ হাতটাও মুচড়ে দিল। তারপর একটা লাথি মেরে লোকটাকে ছিটকে ফেলল রাস্তার ধারের নর্দমার মধ্যে।

“পড়ে থাক ওখানে। জল খা। যাওয়ার সময় নিয়ে যাব,” বলল সে।

যন্ত্রণায় কাঁধে হাত দিয়ে বসে পড়েছিলেন প্রতীক। সেই অবস্থাতেই দেখলেন কয়েক মুহূর্তের অ্যাকশন। যে লোকটা তাঁকে বাঁচিয়েছে এবং এই মুহূর্তে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে, তাকে চেনেন তিনি। এই তো সে! গতকাল সকালে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল বিদ্রোহীর মাঠের বাইরে। শংকর শর্মা না কী যেন নাম বলেছিল!

লোকটা এগিয়ে এসেছে। প্রতীকের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই হাত ধরে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। লোকটা তার প্যান্টের পিছনের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কালো জিনিস বের করল। ভাঁজ খুলতেই প্রকাশ পেল তার প্রকৃত পরিচয়।

৫৩

এনএটিসি’র বিধাননগরের অফিসের ঘরের দরজা খুলতেই চেয়ারে টান হয়ে বসল শুভঙ্কর। যে ব্যক্তি ঢুকছেন তাঁকে গতকাল অবধি ডুয়ার্সের রিসর্টে দেখেছে সে।

ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠী শুভঙ্করের মুখোমুখি আরেকটা চেয়ার টেনে বসলেন। তারপর মাঝের টেবিলে কেস সংক্রান্ত কাগজপত্র রেখে একটা অদ্ভুত হাসি দিয়ে কথা শুরু করলেন, “শুভঙ্কর সাহা! আপনাকে যে এখানে গল্পগুজব করার জন্য নিয়ে আসা হয়নি, সেটা তো বুঝতেই পারছেন! ইউ আর স্মার্ট, ভেরি স্মার্ট! ইউ হ্যাভ গাটস, অ্যান্ড উই হ্যাভ ডকুমেন্টস অ্যান্ড এভিডেন্সেস। তো, বতাইয়ে। কেয়া আপ খুদ বাতচিত শুরু করেঙ্গে ইয়া ফির আপকো মজবুর করনা পড়েগা? চুজ ইয়োর ওয়ে।”

শুভঙ্কর কোনো জবাব দিল না। সে মাথা নিচু করে বসে রইল। কিছুক্ষণ আগে তাকে চা, বিস্কুট দেওয়া হয়েছিল। দাঁতের ফাঁকে লেগে থাকা সেই বিস্কুটের নরম অংশ জিভ দিয়ে আনমনে ঠেলছিল সে।

ধর্মেন্দ্র খুব মন দিয়ে জরিপ করছিলেন উলটোদিকে বসা মানুষটাকে। এরকম মক্কেল হ্যান্ডেল করা তাঁর অভ্যেস আছে। যদিও ধর্মেন্দ্র বাংলা ও হিন্দিতে সমান সাবলীল, তিনি বাংলাই বেছে নিলেন।

“ঠিক আছে। তাহলে আমরাই শুরু করি। রিসর্টের ম্যানেজার বলছেন মেটেলি থানা থেকে মিস আয়েশা সুলতানাকে যে অ্যালার্ট কল দেওয়া হয়েছিল সেটা রিসিভ করেও আপনি টোট্যালি রিলাক্ট্যান্ট ছিলেন। আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী মেটেলি থানা থেকে আপনার ফোনে কল আসে বিকেল পাঁচটা পঞ্চান্নতে, ঘটনা ঘটে সন্ধে ছ’টা একুশে। এতটা সময়ের মধ্যেও আপনি মিস আয়েশা সুলতানাকে সতর্ক করে উঠতে পারলেন না। এনি এক্সপ্ল্যানেশন?”

শুভঙ্কর একবার ধর্মেন্দ্র’র চোখে চোখ রেখেই নামিয়ে নিল। রিসর্টের ম্যানেজার যে তাকে ওই কলটা রিসিভ করতে দেখেছে সেটা তার ধারণার বাইরে ছিল।

“মিস্টার সাহা, আই থিঙ্ক আই হ্যাভ অলরেডি ওয়ার্নড ইউ। ইফ ইউ ডু নট স্পিক, উই ক্যান মেক ইউ স্পিক। আপনি কি হার্ড ওয়েটাই চাইছেন? খুব সিম্পল একটা প্রশ্ন। আপনি সুযোগ পেলেন না কেন মিস সুলতানাকে অ্যালার্ট করার? এটা বলতে কত টাইম দিতে হবে আপনাকে,” ইংরিজি-বাংলা মিশে গেল ধর্মেন্দ্র’র প্রশ্নে।

“ম্যাডাম আমার চেয়ে অনেকটা আগে ছিলেন। ওঁরা নিজেদের মতো সময় কাটাচ্ছিলেন। আমি ডিস্টার্ব করতে চাইনি। ভেবেছিলাম রিসর্টে ফিরে বলবো। এত তাড়াতাড়ি কিছু ঘটবে সেটা ভাবিনি,” চোয়াল শক্ত করে জবাব দিল শুভঙ্কর।

ধর্মেন্দ্র এবার একটা প্লাস্টিকে মোড়া মোবাইল শুভঙ্করের সামনে রাখলেন। পাশে রাখা ফাইল থেকে একটা প্রিন্ট আউট টেনে বের করে নিয়ে বললেন, “থানায় আপনি বলেছেন মিস সুলতানার মোবাইলটা আপনার কাছেই থাকত; আপনিই মেইনলি অপারেট করতেন। রাইট?”

শুভঙ্কর উপরে নিচে মাথা নাড়ল।

“কিন্তু পুলিশ ওঁর মোবাইলটা ওঁর বডির পাশেই পেয়েছে। এটা কী ব্যাপার?”

“ম্যাডাম ছবি তোলার জন্য আমার কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়েছিলেন,” শুভঙ্কর জবাব দিল।

“টাইম?”

“মনে নেই।”

“মোবাইলটা তাঁর কাছেই রয়ে গিয়েছিল মানে ডেফিনিটলি সেটা মার্ডারের ইমিডিয়েট আগে হবে। নাহলে সেটা আপনার হাতেই আবার ফেরত আসার কথা, অ্যাজ ফার ইওর ক্লেইম অব অপারেটিং হার ফোন ইজ কনসার্নড!”

শুভঙ্কর আবার চুপ। সে বুঝতে পারছে দ্রুত জবাব দিতে গিয়ে ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে।

“স্ট্রেঞ্জ! একজন মানুষের লাইফ থ্রেট আছে বলে আপনি অ্যালার্ট কল পেলেন, অথচ যার লাইফ থ্রেট তাকে জানালেন না! তিনি আপনার কাছে এলেন, মোবাইল নিলেন, তাও আপনি বলছেন তাকে জানানোর সুযোগ পাননি!”

ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ নীরবতা নামল। পাশের নির্মীয়মান ভবন থেকে গ্রিল ঝালাই করার মৃদু শব্দ আসছিল এতক্ষণ, এখন তাও থেমেছে।

“সোচিয়ে মিস্টার সাহা। সময় হ্যায় আপকে পাস। উস দিন ভি থা। অনেক ভাবতে হবে আপনাকে। নাহলে যাদের আড়াল করার জন্য এত মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন তাদের বাঁচাতে পারবেন না,” মুচকি হেসে বললেন ধর্মেন্দ্র। বলতে বলতে ফাইল থেকে আরেকটা প্রিন্ট আউট বের করে আগেরটার পাশে রাখলেন তিনি। সামান্য ঝুঁকে কিছু পড়ে নিলেন। তারপর…

“আপনি পুলিশকেও বলেছেন, আমাদেরও বলেছেন যে জুতোয় কিছু ঢুকে যাওয়ায় সেটা বের করতে সময় লেগেছিল তাই মোটরবাইক বোর্ন অ্যাসাইল্যান্টদের দেখতে পেয়েও আপনি স্পটে যেতে পারেননি। ফেয়ার এনাফ। ওই রাস্তায় জুতোয় কিছু ঢুকতেই পারে। কিন্তু…”

চোখ তুলল শুভঙ্কর, আবার চকিতে নামিয়ে নিল।

“এক আদিবাসী মহিলা, যে ওই সময় রিসর্টের দিক থেকে ব্রিজের দিকে যাচ্ছিল সে বলছে এক বাবু সেই সময় বড় রাস্তার মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা মিলিয়ে দেখেছি মিস্টার সাহা, আপনি সেদিন হলদে শার্ট পরেছিলেন। আদিবাসী মহিলার স্টেটমেন্টেও হলদে শার্ট পরা বাবুর কথাই আছে। কাইন্ডলি এক্সপ্লেইন!”

শুভঙ্করের চোয়াল ক্রমশ শক্ত হতে লাগল, মাথার শিরা ফুলে উঠতে শুরু করল।

পরবর্তী আধ ঘণ্টায় একের পর এক প্রশ্নবাণে শুভঙ্কর সাহার চারপাশ দিয়ে খাঁচা খাড়া করে দিয়েছিলেন এনএটিসি’র অফিসার। আয়েশার মৃতদেহের উপরে ঝুঁকে পড়ে তিনি বেঁচে আছেন কিনা সেটা বোঝার ভান করার সময়ে শুভঙ্কর কায়দা করে ব্রিজের রেলিং গলিয়ে যে মোবাইলটা জলে ফেলে দিয়েছিল, সেটাও তার সামনে এসে উপস্থিত হবে তা সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। দাবায় চেকমেট হওয়া রাজার মতো সামনে এগোলেও ঘুঁটি, পাশে সরলেও ঘুঁটি, এরকম পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছিল সে। আত্মসমর্পণ করে সমস্ত তথ্য দিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ তার সামনে খোলা ছিল না।

তাকে আয়েশা সুলতানার উপরে চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখার জন্যই কাজে নিযুক্ত করা হয়েছিল। আয়েশার অন্দরমহলে তার প্রবেশের পথ মসৃণ করার জন্য তাঁর আগের ম্যানেজারকে প্রাণের হুমকি দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে মোটা টাকা দেওয়া হয়েছিল, বিনিময়ে শর্ত ছিল আয়েশার সঙ্গে কোনোভাবেই আর যোগাযোগ রাখা চলবে না।

ব্যস্ত নায়িকা, তার উপর একা মানুষ। একজন সবসময়ের ম্যানেজার যে আয়েশার প্রয়োজন হবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই রবিউল আলম চালটা চেলেছিলেন। শুভঙ্করের উপরে দায়িত্ব ছিল যেভাবেই হোক আয়েশাকে কলকাতার বাইরে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু ব্যস্ত নায়িকার সমস্ত ডেট বুকড, তাঁর বাইরে যাওয়ার সুযোগ কোথায়? অবশেষে বর্তমানে যে ছবির কাজ তিনি করছিলেন তাতে তাঁর অংশের শ্যুটিং শেষ হয়ে যেতে একটু অবসরের সুযোগ আসে। ডাবিংয়ের দেরি আছে, এদিকে পরিচালক সঞ্জয়শেখরের সঙ্গেও একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ার বাসনা জাগছে তাই আয়েশা একটু ছুটি চেয়েছিলেন। শুভঙ্কর অল্প সময়েই তাঁর স্নেহের পাত্র হয়ে উঠেছিল। তার পরামর্শ মেনে ডুয়ার্স যেতেই রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। অতঃপর, একেবারেই ছুটি হয়ে গেল তাঁর।

সঞ্জয়শেখরের উপরেও সন্ত্রাসবাদীদের রাগ জমেছিল ‘আড়াল সরিয়ে’ ছবির সময় থেকেই। এনএটিসি ইতিমধ্যেই তদন্ত করে জেনেছে প্রথমে এই ছবিটা হওয়ার কথা ছিল ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশের যে প্রোডাকশান হাউস এপারের প্রযোজকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল, তারা প্রোজেক্ট থেকে বেরিয়ে যায়। সম্ভাব্য কারণটা কী হতে পারে সেটা এনএটিসি’র পক্ষে অনুমান করা খুব কঠিন ছিল না।

কাগজপত্র গুছিয়ে চেয়ার ছাড়লেন ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠী। শুভঙ্কর সাহা’র বিরুদ্ধে মামলাটা ভালো করে সাজাতে হবে। তারই সঙ্গে আরেক বড় মাছকে এবার জালে তুলতে হবে।

ঘরের দরজা আলতো শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। স্তব্ধতা যেন অদৃশ্য দুই হাত বাড়িয়ে শুভঙ্করের গলা লক্ষ্য করে এগিয়ে আসতে লাগল।

৫৪

পটুয়াটোলা লেনের হোটেলে অতিথিদের বকেয়া ভাড়া ও সমস্ত বিল মিটিয়ে দিয়ে শিয়ালদহ স্টেশন ধরে পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্ম ধরে হাঁটছিল লিটন মণ্ডল। হঠাৎ এভাবে স্কেচ বেরিয়ে পড়বে এটা তার অতিথিরা হয়তো অনুমান করতে পারেনি। গতকাল রাতে টিভিতে খবর দেখার পরেই দলের তৃতীয় সদস্যের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তারা হোটেল ছাড়ে। নরেন্দ্রপুর স্টেশনের কাছে লিটন তার এক পরিচিতের বাড়িতে অতিথিদের আশ্রয় নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

লিটন কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রিবাতের বারোজন লিঙ্কম্যানের একজন। অতি সাধারণ চেহারার লিটন মণ্ডল পেশায় ট্যাক্সি ড্রাইভার। বছর দেড়েক আগে এক সন্ধ্যায় এক মাঝবয়সি মানুষ সওয়ার হয়েছিল তার ট্যাক্সিতে। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে মোমিনপুর বেশ লম্বা পথ। গোটা রাস্তা ভদ্রলোক অনেক গল্প করেছিলেন তার সঙ্গে। কলকাতা শহরের প্রতিটি গলিঘুঁজি সে হাতের তালুর মতো চেনে, এ কথা জেনে খুশি হয়েছিলেন। যেহেতু অ্যাপ-বেসড ট্যাক্সির চালক ছিল লিটন, তার ফোন নম্বর ভদ্রলোক এমনিতেই পেয়ে গিয়েছিলেন। পরদিন গভীর রাতে সিএমআরআই হাসপাতালের গেটের বাইরে লিটনকে ডেকে পাঠান তিনি। সেই থেকে লিটনের কাজ গোটা কলকাতা শহরের ট্র্যাফিক ব্যবস্থার উপরে নজর রাখা এবং রিবাত-এর বিভিন্ন সদস্যকে নির্বিঘ্নে কলকাতা শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুসারে এমন বাসস্থানের সন্ধান দেওয়া যেখানে আচমকা উপদ্রব হওয়ার সম্ভাবনা কম।  

আপাতত তার আর কাজ নেই, তাই লিটন হাবড়া লোকালে চড়ে বসল। মধ্যমগ্রামে নেমে সে অটো ধরে চলে যাবে অন্য ডেরায়। আপাতত কিছুদিন আর কলকাতামুখী হবে না সে।

ট্রেন উলটোডাঙা ছাড়ার পরেই বেশ গতি নিয়েছিল; জানালার ধারের সিটে বসে ফুরফুরে হাওয়া লিটনের চোখে ঘুম নামিয়ে আনছিল। তার পক্ষে অনুমান করা সম্ভব ছিল না, উলটোদিকের সিটে গাদাগাদি করে বসা চারজন সহযাত্রীর মধ্যে দুজনের একটি বিশেষ পরিচয় আছে।

দমদমে ট্রেন দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। দুলকি চালে একটা মালগাড়ি চলে যাচ্ছিল, অসম্ভব ভিড়ে লিটনের অস্বস্তি বাড়ছিল। এই গরমে ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়লে আর টেকা যায় না। লিটন মোবাইল বের করে ফেসবুকে তার প্রোফাইল ঘাঁটতে শুরু করল।

হঠাৎই তার আঙুল আটকে গেল নিউজফিডের উপরে। ইদানীং তাকেও দলের নির্দেশে ফেসবুকে বিভিন্ন খবরের চ্যানেলের পেজে চোখ রাখতে হয়। পথ চলতে চলতে টিভি দেখা সম্ভব নয়, তাই এই ব্যবস্থা। সেখানেই একটি পেজে বলছে— অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানা হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ‘সময়ের চাকা’ সংবাদপত্রের সম্পাদক রবিউল আলমের দফতরে পৌঁছল এনএটিসি’র তদন্তকারী দল!

বুক ঢিব ঢিব করতে লাগল লিটনের। সে ছোট্ট একটা মাছি মাত্র, কিন্তু এসব ব্যাপারে মাছিদেরই কপালে বেশি ভোগান্তি জোটে। একটা ভয় দ্রুত লিটনকে যেন চেপে ধরতে চাইছে। নিজেকে বড্ড একা লাগছে তার। দলের নির্দেশ, সে কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না, তার সঙ্গে প্রয়োজনে যোগাযোগ করে নেওয়া হবে। তাই এই মুহূর্তে তার কী করণীয়, সেটা লিটনকে বলার কেউ নেই।

লিটন ঠিক করে নিল, মধ্যমগ্রাম নয়, বিরাটিতে ট্রেন থেকে নেমে পড়বে সে। কিছুক্ষণ এক পরিচিতের বাড়িতে গা ঢাকা দিয়ে থেকে গভীর রাতে মধ্যমগ্রামের দিকে যাবে। মালগাড়ির শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পরে হাবড়া লোকাল নড়ল। হাতে ঘড়ি নেই, তাই ঘন ঘন মোবাইলেই সময় দেখছিল লিটন। রবিউল আলমের মতো লোক যদি জালে জড়িয়ে যায় তাহলে তো সর্বনাশ! এত দ্রুত ওই লোকটা অবধি পৌঁছে গেল কী করে সরকারি গোয়েন্দারা? নিশ্চয়ই কেউ খবর ফাঁস করেছে। কে? শুভঙ্কর সাহা? নাম শুনেছে লিটন। আজ সকালে সে ধরা পড়েছে ধর্মতলায়, তাও জেনেছে সে।

গলা বাড়িয়ে বাইরেটা দেখল লিটন। ট্রেন দুর্গানগর ছেড়ে গতি নিয়েছে। এবার উঠে পড়তে হবে। উলটোদিকে বসা একটা লোক বিশ্রীভাবে পা বাড়িয়ে রেখে ঘুমোচ্ছে। তাকে পায়ে টোকা মেরে ঘুম ভাঙিয়ে পা সরাতে বলল লিটন।

বেশ ভিড় আছে দরজার সামনে। সেই ভালো একদিকে। নেমে ভিড়ের সঙ্গে মিশে অনেকটা চলে যাওয়া যাবে।

ট্রেনের গতি কমল। প্ল্যাটফর্মের ফলের স্টলগুলো পেরিয়ে গেল কামরার দরজা। লিটন নামল। পায়ের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সামনে বেশ কিছু মানুষ দুলকি চালে চলেছে। তাদের ধাক্কা দিয়ে এগোতে গেলে আবার হিতে বিপরীত হতে পারে।

প্ল্যাটফর্ম যখন প্রায় শেষ হয়ে এসে ঢাল শুরু হচ্ছে, ঠিক তখন তার শার্টের কলারে পড়ল একটা মোক্ষম টান।

“কী… কী ব্যাপার?” লিটন ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্ন করল সামনে দাঁড়ানো দুজনকে। এদেরই একজন ঘুমিয়ে কাদা হয়েছিল ট্রেনের কামরায়।

“লিটন মণ্ডল! রাধিকা হোটেলের বন্ধুদের যে গতকাল পার্ক সার্কাস স্টেশনে ছেড়ে দিয়ে এলে, সেই বন্ধুদের গল্পটা বলবে না? চলো, তোমার কাছে গল্পটা শুনবো। চলো চলো,” বলল লোকটা।

দ্বিতীয়জন ততক্ষণে লিটনের পিছনে চলে গেছে একটু একটু করে। লিটন বুঝতে পারল, তার পালাবার পথ নেই।

টিমের সিনিয়রের তরফ থেকে ভেসে আসা কাঁচা খিস্তি শুনতে শুনতে কান গরম হয়ে উঠছিল এসটিএফের নজরদারের। কাল সারারাত নরেন্দ্রপুরে তিনজন টার্গেটের উপরে নজর রেখেছিল সে। আজ সন্ধ্যায় তিনজনই শিয়ালদহগামী ট্রেনে ওঠে এবং নেমে যায় যাদবপুর স্টেশনে। কিন্তু সেখানে এক সোনার চেন ছিনতাইবাজকে নিয়ে তুমুল তাণ্ডব চলছিল। বিরাট ভিড় তৈরি হয়েছিল টিকিট কাউন্টারের সামনে, ছিল উত্তেজনাও। সেই হৈ হট্টগোলের মধ্যে এসটিএফের নজরদার হারিয়ে ফেলে তার টার্গেটদের। বিভিন্ন দিকে ছুটে বেরিয়েও সে আর তাদের কোনো হদিশ পায়নি।

খিস্তি যে জুটবে তা সে জানতোই। আসলে ডিপার্টমেন্ট চাইছিল কোনো একটা কাজ চলছে এরকম সময় টার্গেটদের ধরতে। সেক্ষেত্রে পরে মামলা সাজাতে সুবিধে হয়। দুম করে একটা বাড়ির মধ্যে থেকে তিনজনকে ধরাই যায় কিন্তু কেস একটু ঠুনকো হয়ে যায় আদালতে। স্কেচের সঙ্গে মুখের মিল আছে এই যুক্তি প্রাথমিকভাবে খাটলেও পরবর্তীকালে চার্জশিট দিতে গিয়ে অসুবিধেয় পড়তে হয়।

ওপার থেকে বাপ-মা তুলে খিস্তি যে করছিল সেও উপর মহল থেকে খিস্তির ভয়ে ভীত। একটা বড় সুযোগ এসে গিয়েছিল কিছু করে দেখানোর। ব্যর্থ হলে তার জন্যও অপেক্ষা করে আছে একরাশ অস্বস্তি।

লাইন কেটে মোবাইলে গুগল ম্যাপ খুলে বসলেন এসটিএফের অফিসার। যাদবপুর এলাকাটা জুম করলেন তিনি। কোন কোন দিকে পালাতে পারে টার্গেটরা সেটা আগে অনুমান করা দরকার। মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে বলা যায় যে কামরায় একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে চলেছে বুঝেই তারা সুযোগের সদ্ব্যবহারটা করেছে। এমনও হতে পারে তাদের উপরে নজর রাখা হচ্ছে এটা বুঝতে পেরে ছিনতাইয়ের ঘটনাটা তারাই সাজিয়েছে যাতে একটা ডামাডোল তৈরি করে পালিয়ে যাওয়া যায়। এসব দলে কার সঙ্গে কার কী যোগসাজশ, তা বোঝা কঠিন। বর্ডার পেরিয়ে ভুয়ো পরিচিতি নিয়ে যারা অন্য দেশে অন্য পরিচয়ে বাস করতে পারে, তাদের চোখকান খোলা নেই; মাথা ভোঁতা, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *