ইনজুরি টাইম – ৫৫

৫৫

বিদ্রোহীর মোড়ে আজ বেশ ব্যস্ততা। এসে গেছে সেই দিন, যার স্বপ্ন ছুটিয়েছে সুমনাকে মালদা থেকে কলকাতা। আজ ‘দশভুজা’ পৃথিবীর আলো দেখবে। হাইস্কুলের মাঠের এক ধারে মঞ্চ তৈরি হয়েছে, বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছেন স্থানীয় বিধায়ক ও পুলিশকর্তা। মাঠে স্থানীয় মানুষেরা ভিড় করেছে। সুমনার বান্ধবীরা ব্যস্তভাবে এদিকওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে, হিমশিম খাচ্ছে সমস্ত কাজ গুছিয়ে তুলতে।

কিন্তু সুমনার মুখে হাসি নেই। তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে কিন্তু সে যেন সবকিছুর মধ্যে থেকেও অদৃশ্য একটা কাচের বুদবুদের ঘেরাটোপে রয়েছে। কোনো অনুভুতিই স্পর্শ করছে না তাকে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন বলে যিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আজ তাঁর মৃত্যু নিয়ে তোলপাড় চলছে রাজ্যজুড়ে। সেসব খবর শুনতে বা জানতে ইচ্ছেও করে না সুমনার, কিন্তু একটা চোরা কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে যায় খবরের কাগজ আর টিভি চ্যানেলের নির্দিষ্ট শিরোনামের দিকে।

সেই ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই আরেকটা ধাক্কা খেয়েছে সে। যে মানুষটাকে ভগবানের মতো সম্মান, শ্রদ্ধা করে, সেও আজ একঘরে। তবু তাঁকে সেদিন সন্ধেবেলা মনের কথাটা বলতে পেরে একটু হালকা হতে পেরেছিল সুমনা। পৃথিবীতে যত পরীক্ষা, সবই কি সৎ মানুষদের জন্য? সুমনার মনে প্রশ্নটা ইদানীং ঘনঘন কড়া নেড়ে যাচ্ছে। তার দু’ চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল শ্রদ্ধার মানুষটাকে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে একবার দেখতে পেল সুমনা। তার মানসিক ভার লাঘব হল কিছুটা।

নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার কিছু পরে অনুষ্ঠান শুরু হল। অতিথিরা মিলে ‘দশভুজা’র অফিসের দরজায় ফিতে কাটলেন। সুমনার মনে হচ্ছিল তার শরীর ও মনের কোনায় কোনায় জমে থাকা যন্ত্রণাগুলোর উপরে কেউ যেন মলম বুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সংসারে অত্যাচারিত, অবহেলিত কত মেয়ে বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন খুঁজে পাবে ‘দশভুজা’তে। শারীরিক অত্যাচারের পরে চিকিৎসা খরচ, আইনি লড়াইয়ের জন্য পায়ের তলায় একটু মাটি যদি দশভুজা দিতে পারে তাদের, তবে তাই অনেক!

ফিতে কেটে মঞ্চে ফিরে এসে আসার পরপরই বিধায়ক বক্তৃতা দিতে উঠলেন। বক্তৃতাটা ‘স্থানীয় মানুষেরা সরকারের ভরসায় বসে না থেকে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে; এটা প্রশংসনীয়’— এই লাইন থেকে ক্রমে ক্রমে এলাকায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার দিকে সরতে শুরু করতেই ভিড়ের মধ্যে একটা গুঞ্জন শুরু হল। মঞ্চে বসে থানার নতুন বড়কর্তা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিলেন। তিনদিন আগের ঘটনার রেশ একেবারে মিলিয়ে যায়নি এখনও। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো বিশেষ লেখালেখি করেনি তাই রক্ষে, নাহলে জল কতদূর গড়াতো তার ঠিক নেই। আহত ছেলেটার পরিবার ও প্রতিবেশীরা ফুঁসছে রাগে। ওদিকে অপর পক্ষও জামার হাতা গুটিয়ে বসেই আছে। এই অবস্থায় আবার আগুনে ঘি ঢালা…

মাঠের ভিড় থেকে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছিল হক। ছিলেন প্রতীক সেনও। যে কোনো মুহূর্তে একটা গোলমাল বাঁধবে, এই আশঙ্কা প্রতীকের মনে উত্তেজনা তৈরি করছিল।

অনুষ্ঠানের একেবারে শেষভাগে ভারত সেবকের সাংসদ মঞ্চে এলেন এবং তিনি আসছেন এই ঘোষণা হওয়া মাত্রই বিধায়ক মঞ্চ ছাড়লেন। পবিত্র দত্তের ভাষণও ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এমন সময়ে একটা হৈ হৈ শুরু হল মাঠে। কালো ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে হাইস্কুলের মাথায়। স্কুলের পিছনের রাস্তা থেকে কিছু মানুষ ‘আগুন, আগুন’ করে ছুটে এল। মাঠের ভিড় পাতলা হয়ে এল নিমেষে কারণ অনেকেই সেই চিৎকারে সাড়া দিয়ে ধোঁয়ার দিকে ছুটেছে। হক অনুসরণ করল তাদের। প্রতীক সেনও ছুটলেন। তিনি কিছুক্ষণ আগেও মাঠের এক প্রান্তে ভারত সেবকের ছেলেদের জটলায় বাবলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। এখন গোটা দলটাই উধাও।

সর্বনাশ! একটু দূরেই একটা দোতলা বাড়ির নিচতলায় দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। স্থানীয় ছেলেরা বালতি বালতি জল ছুঁড়ে ছুঁড়ে সে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও তাকে কাবু করতে পারছে না। ‘দমকল দমকল’ চিৎকার শুরু হয়েছে কারণ আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। এক বয়স্কা মহিলার কাছে গিয়ে জড়ো হয়েছেন অনেকে। মহিলা দাবি করছেন কিছুক্ষণ আগে ‘পার্টির’ কয়েকটা ছেলে ঘুরঘুর করছিল বাড়িটার আশপাশ দিয়ে। তাদের হাতে একটা কাচের বোতল ছিল। তার মুখে আগুন দিয়ে তারাই নাকি বাড়ির বারান্দা দিয়ে সেটা ছুঁড়ে ভিতরে ফেলে পালিয়েছে। প্রতীক নিশ্চিত হলেন তাঁর সেদিন সন্ধের সতর্কবার্তাকে আদৌ গ্রাহ্য করেনি বাবলা।

‘ইসমাইল’ বলে আরেক মহিলা চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর চিৎকারের তীব্রতায় হক চমকে উঠে পিছনে ফিরে দেখল এক মাঝবয়সি মহিলা অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ছেন এক ভদ্রলোকের গায়ে। ফতুয়া-লুঙ্গি পরা ভদ্রলোকের দিশেহারা অবস্থা। কয়েকজন তাদের দিকে এগিয়ে গেল। ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছে হক ধরতে পারল পরমুহূর্তেই যখন বাড়ির দোতলার জানালায় একটি ছেলেকে হাত নাড়তে দেখা গেল। এই ছেলেটাকে চেনে হক। ওর নাম ইসমাইল। যেভাবে হাত নাড়ছে ছেলেটা তাতে মনে হচ্ছে সেও দিশেহারা। স্থানীয় মানুষের কথায় হক জানল বাড়িটা ইসমাইলদেরই এবং তার বোন রাবেয়া আজ পাঁচদিন ধরে অসুস্থ তাই সে বাড়িতে বোনের সঙ্গে রয়েছে। বাবা-মা গিয়েছিলেন মাঠে অনুষ্ঠান দেখতে।

আগুন ক্রমশ গ্রাস করছে বাড়িটাকে, কাছের টিউবওয়েল থেকে আনা জল অপ্রতুল ঠেকছে, কেউ কেউ ‘ছেলেমেয়ে দুটোকে কেউ বাঁচাও’ বলে চেঁচামেচি করছেন। হঠাৎই সকলকে চমকে দিয়ে মাথায় টুপি পরা এক ব্যক্তি ছুটে চলে গেল বাড়ির দিকে। সকলকে অবাক করে একতলার বারান্দার গ্রিল বেয়ে কার্নিশে উঠে, সেখান থেকে পাইপ বেয়ে দোতলা আর একতলার মাঝে দেওয়ালের গায়ে একটা সরু খাঁজে পা রেখেই সেখান থেকে লাফিয়ে পড়ে একটা পাইপ ধরে, সেটাকে বেয়ে দোতলায় উঠে টানা বারান্দা দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল সে। গোটা ঘটনাটাই ঘটল অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায়। এবার চেনা গেল তাকে। ফুটবল টিমের কোচ।

কর্তব্যের তাগিদ কড়া নাড়ছিল হকের বিবেকের দরজাতেও। সে যে পরিচয়ে নিয়ে এখানে ঘোরাফেরা করছে সেটার আড়ালে কী আছে তা প্রকাশ করা নীতিবিরুদ্ধ, কিন্তু কিছু কিছু পরিস্থিতিতে খোলস ছেড়ে বেরোতেই হয়। সেও ছুটে গেল বাড়ির দিকে। প্রয়োজনীয় শারীরিক কসরত জানা আছে তারও। একই কায়দায় সেও দ্রুত পৌঁছে গেল বাড়ির দোতলায়।

ফুটবল টিমের ছেলেরাও এসে পড়েছিল মাঠে। তারা বাড়ির বারান্দার ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল। রণজয় আর হক ধরাধরি করে ইসমাইলের বোন রাবেয়াকে বারান্দায় নিয়ে এলেন। এই মুহূর্তে অবশ্য মেয়েটিকে অসুস্থ মনে হচ্ছে না, বরং ভয়ংকর আতঙ্কিত দেখাচ্ছে। সে আঁকড়ে ধরে আছে রণজয়কে। রণজয় বলছেন ভয়ের কিছু নেই, নিচে যারা আছে তোমাকে লুফে নেবে। সে তবু ঘনঘন মাথা নাড়ছে।

শেষে রণজয় মেয়েটাকে পিঠে নিয়েই যেভাবে উঠেছিলেন সেইভাবেই নেমে এলেন একতলার বারান্দার কার্নিশে। এবার আর ভয় পেল না মেয়েটি। উচ্চতা কমে এসেছে, তাই সে লাফিয়ে পড়ল ফুটবল টিমের গ্রিপে।

ইসমাইল বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। হক ইশারায় ইসমাইলকে দেখিয়ে দিল পাইপ। সেই পাইপ বেয়ে দুই তলার মাঝের খাঁজ অবধি আসতে পারল সে। তারপরে আর টাল সামলাতে পারল না। পড়ে গেল কার্নিশের উপরে। তবে সতর্ক ছিল তাই খুব চোট পেল না। কার্নিশ ধরে নেমে গেল নিচে। এক লাফে নেমে এলেন রণজয়ও। ফুটবল কোচ আর অচেনা বড়সড় চেহারার লোকটিকে নিয়ে হৈ হুল্লোড় শুরু করে দিল সকলে। হক হাত বাড়িয়ে করমর্দন করল ফুটবল কোচের সঙ্গে।

বাড়ির সদস্যরা নিরাপদ তাই আগুন নেভানোর কাজে গতি এল। এখানে আর থাকার প্রয়োজন নেই বুঝে হক তার অস্থায়ী বাসস্থানের পথে হাঁটা দিল। তারও মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। চোখের সামনে দুজন বিপন্ন মানুষ, অথচ কিছু করা যাচ্ছে না তাদের জন্য, এটা ভাবতে ভালো লাগছিল না।

হাঁটতে হাঁটতে এক সময়ে দাঁড়িয়ে পড়ল হক। কী যেন একটা চিন্তা তার মাথার মধ্যে কোনো বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ছে। কী যেন একটা জিনিস আবছাভাবে খেলা করছে তার চোখের সামনে। একটানা একটা শক্তিশালী আলোর দিকে চেয়ে থাকার পরে চোখ অন্যদিকে সরালেও যেমন সেই আলোর একটা অবয়ব ফিকে হয়ে চোখের সামনে ভাসতে থাকে, অনেকটা সেরকম। কপালে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে হকের। সে হাতড়ে বেড়াচ্ছে মেমোরি ব্যাঙ্ক, প্রয়োজনীয় ফাইলটা খুঁজে পাচ্ছে না।

৫৬

ঢাকা শহরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ চত্বরে এক জনসভার সামনে জমায়েতের উপরে নজর রাখছিল শোহরাব হোসেন। সাদা পোশাকের শোহরাবকে ইনটেলিজেন্সের দক্ষ অফিসার বলে চেনার উপায় নেই সাধারণ মানুষের। সভামঞ্চে রয়েছেন কিছু বিশিষ্টজন। আছেন দুই প্রখ্যাত সাহিত্যিক, দুই সমাজকর্মী এবং জনা কয়েক রাজনীতিবিদ। এছাড়াও সভা জমানোর জন্য গান গাইতে এসেছে একটি জনপ্রিয় রক ব্যান্ড। ইদানীং এই জাতীয় সভাকে ঘিরে প্রায়ই উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে তাই পুলিশি নজরদারির পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়িয়েছে সরকার।

আলোচনা সভার মূল বিষয় ‘সন্ত্রাসের শিকড়’। সবে অতিথিরা মঞ্চে উঠছেন এখন। শোহরাব একবার ঘড়ি দেখে নিল। এখন সাতটা। অন্তত ন’টা অবধি তার এই তল্লাট ছাড়ার উপায় নেই।

তার দক্ষ একজোড়া চোখ ছুটে বেড়াচ্ছিল শাহবাগ চত্বরের এ কোনা থেকে ও কোনা। ভিড়ের মধ্যে প্রচুর যুবক-যুবতী উপস্থিত আছে। তাদের আগ্রহ মঞ্চে উপবিষ্ট এক তরুণ সাহিত্যিককে কাছ থেকে দেখা। তারা হাত নেড়ে পছন্দের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মরিয়া চেষ্টা করে চলেছে। তিনিও মাঝে মাঝে মৃদু হাত নেড়ে সৌজন্য ফিরিয়ে দিচ্ছেন।

রাত পৌনে আটটা নাগাদ শোহরাব তার প্যান্টের পকেটে মৃদু কাঁপুনি অনুভব করল। মোবাইল ভাইব্রেট করছে। কলারের নাম দেখে তার কপালে ভাঁজ পড়ল। এই ব্যক্তি হঠাৎ তার সঙ্গে যোগাযোগ করছে কেন? একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন শোহরাবের সহকর্মী। হাত ও চোখের ইশারায় শোহরাব তাঁকে বুঝিয়ে দিল সে কিছুক্ষণের জন্য তার জায়গা থেকে সরবে, তিনি যেন একটু সামলে নেন।

সভার ভিড় থেকে সরে এল শোহরাব। হাঁটতে শুরু করল কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের দিকে। মোবাইল ততক্ষণে স্তব্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু পালটা যোগাযোগ করা প্রয়োজন। কলার তার বিশেষ পরিচিত। বছর দুয়েক আগে কক্সবাজারে একটি তদন্তের কাজে সে এসেছিল। সেই সময়ে আলাপ হয় দুজনের। পরবর্তীকালে কয়েকবার দুই তরফে তথ্যের আদানপ্রদান হয়েছে। খোশগল্প করার জন্য অবশ্যই সে ব্যক্তি ফোন করেনি। নিঃসন্দেহে প্রয়োজনটা জরুরি।

সভা থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছে শোহরাব; এখানে লাউডস্পিকারের মাধ্যমে ভেসে আসা সভার বক্তৃতা ফোনে কথা বলায় বিশেষ সমস্যা সৃষ্টি করবে না।

“আসসালামু আলাইকুম”— শোহরাব সৌজন্য জানাল কলারকে। ওপার থেকে এল জবাবি সৌজন্য। তারপরে এল একটি সাহায্য চাইবার প্রসঙ্গ।

“জী জনাব, বলেন,” শোহরাব সাড়া দিল।

পরবর্তী মিনিট তিনেক কানে মোবাইল ধরে বেশ বিস্ময়ের সঙ্গে এদিকওদিক চোখ ঘোরাতে লাগল সে। এক অদ্ভুত সাহায্য চাওয়া হচ্ছে তার কাছে। শোহরাব অবাক হচ্ছিল আবার মজাও পাচ্ছিল। এরকম বাঁধাধরা রুটিনের বাইরে গিয়ে কাজ করাতেই তো মজা।

সাহায্য না করার প্রশ্ন নেই। ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স ট্রিটি’, বা ‘এমল্যাট’ অনুসারে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের মধ্যে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে অভিযুক্তদের সম্পর্কে তথ্য বিনিময় হওয়ার কথা। যদিও ওপার থেকে আসা এই সহযোগিতার অনুরোধে কোনো সরকারি সিলমোহর নেই, তবুও উভয় দেশের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে শোহরাব সাহায্যের হাত বাড়াতে দ্বিধা করল না।

কাজটা চ্যালেঞ্জিং। এমন একটা তথ্যের যে প্রয়োজন হতে পারে তা যেন ভাবাই যাচ্ছে না।

শোহরাব সাহায্যপ্রার্থীর কাছে কিছুটা সময় চেয়ে নিল। তারপর ফিরে চলল শাহবাগ চত্বরের দিকে। বক্তৃতা জোরালো হচ্ছে। বর্ষীয়ান সমাজকর্মীর কণ্ঠ ভেসে আসছে—

“সমাজে এই বিষ যারা ধীরে ধীরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, একটু একটু করে যে বিষবৃক্ষের শিকড় মাটি কামড়ে ধরছে, সে বৃক্ষ কিন্তু আমাদের ফুল, ফল, ছায়া দেওয়ার জন্য নয়। এটা আমাদের মানতে হবে। সন্ত্রাসবাদী সন্ত্রাসবাদীই, তারা কারোর বন্ধু নয়, হতে পারে না। সন্ত্রাস আজ সারা পৃথিবী জুড়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ভয়াবহ রূপ তার। সে অস্ত্র করছে কিশোর মনকে। তাদের সরল মনে ঢুকিয়ে দিচ্ছে বিষ। কেন করতে পারছে? রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা মঞ্চে আছেন। জানি তারা দারিদ্রের কথা, সরকারের কর্মসংস্থান করায় ব্যর্থতার কথা বলবেন। কিন্তু বাস্তব বলে, দারিদ্রই একমাত্র কারণ নয়। কিছুদিন আগেই যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেছে দেশের রাজধানীর একেবারে কেন্দ্রে, তাতে জড়িতরা কিন্তু কেউ দরিদ্র ঘরের ছিল না। সমস্যা অন্যত্র। সমস্যা অনেক গভীরে। সতর্ক হতে হবে অভিভাবকদের। তাঁদের অবহেলা তাঁদের সন্তানদের অবসাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে না তো? একাকীত্ব তাদের অসাধুসঙ্গে নিয়ে ফেলছে না তো? অতিরিক্ত রুক্ষ শাসনের ফলে তাদের নরম মনে ধীরে ধীরে ক্ষোভ জমাট বেঁধে প্রতিহিংসার আগুনে পরিণত হচ্ছে না তো? সতর্ক হোন। শাসন তো নিশ্চয়ই করবেন সন্তানদের, কিন্তু অবহেলা নয়। তাঁদের কাছে টেনে নেন। এখানে আমি প্রশাসনের কথাও বলব। তারা অপরাধীকে সাজা দিবেন নিশ্চয়ই, কিন্তু কেবলই যেন লাঠির ঘা না পড়ে। একটু সহমর্মিতাও দেখান। নাহলে কিন্তু যে বিষ ক্রমশ ছড়াচ্ছে, তা একটু একটু করে গ্রাস করে নেবে গোটা সমাজকে।

‘‘ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র হলেও ভাষার টানে দুই বাংলা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। এ কথা নতুন করে বলার দরকার হয় না। ওপারের মানুষেরা যেমন এপারে এসে আমাদের থেকে উষ্ণতা পান, তেমনি আমরাও যখন সে দেশে মেহমান হয়ে যাই, একই রকম আন্তরিকতা পেয়ে থাকি। কোথাও কোনো সমস্যা নাই। ভাষা তো আছেই, সামগ্রিক সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানেই দুই বাংলা একে অপরের কাছাকাছি। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ; কিছু গোষ্ঠী আড়াল থেকে ঘুঁটি চালছে। তাদের কার্যকলাপের কারণে দুই বাংলার যে উষ্ণ সম্পর্ক তা আহত হচ্ছে প্রায়শই। যারা এই আঘাত নামিয়ে আনছে, তাদেরকে যেন আমরা কোনোমতেই মদত না দিই। তারা যতই ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করুক যে তারা আমাদের আপন, আদতে তারা তা নয়। হতে পারে না…”

সভা ভাঙলো সোয়া ন’টা নাগাদ। অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। বিশিষ্ট সমাজকর্মী তাঁর ভাষণের জন্য করতালি ও গালাগালি দুটোই একসঙ্গে হজম করতে করতে মঞ্চ ছাড়লেন। শাহবাগ চত্বর ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছিল। পুলিশি বেষ্টনী সরছিল, নিরাপত্তাকর্মীরা হাঁফ ছাড়ছিলেন। শোহরাব তার অফিস থেকে পাঠানো গাড়িতে গিয়ে উঠল সহকর্মীকে নিয়ে। গাড়ি চলতে শুরু করল, মঞ্চের আলো একটা একটা করে নিভে যেতে লাগল। শাহবাগ চত্বরে ফিরে এল রাতের স্বাভাবিক আলো-আঁধারি।

ঘরে বসে অত্যন্ত জরুরি কিছু পয়েন্ট নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছিল হক। পয়েন্টগুলো একের পর এক সাজালে একটা অস্পষ্ট ছবি ফুটে উঠছে। সে ইতিমধ্যেই ধর্মেন্দ্র ও সুনীলকে নির্দেশ দিয়েছে জনা দশেকের একটা ফোর্স তৈরি করে কাল বা পরশুর মধ্যে মালদায় চলে আসতে। এখানে তার যে সোর্স আছে তাকে বলা হয়ে গেছে সেই ফোর্সের থাকার বন্দোবস্ত করতে। কিছু হোক বা না হোক, সতর্ক থাকা দরকার। কলকাতায় এই মুহূর্তে কিছু হওয়ার নেই। শুভঙ্কর সাহাকে গতকাল কোর্টে পেশ করে আপাতত চোদ্দ দিনের জন্য কাস্টডিতে নেওয়া গেছে। সে নিতান্তই ছোট্ট মাছ ছিল। গভীর জলের মাছ হলেন রবিউল আলম। তাঁকেও এনএটিসি পরশু রাতেই তাঁর অফিস থেকে গ্রেফতার করতে পারতো কিন্তু সেটা হয়তো হঠকারিতা হয়ে যেত। সেয়ানা মাল, সেই সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে। যদিও যারা এতদিন তাঁকে এতটা বাড়তে দিয়েছে কেবল ভোটব্যাঙ্ক আগলে রাখার জন্য, বেগতিক দেখে এখন তারাই ক্রমশ দূরত্ব বাড়াচ্ছে রবিউলের সঙ্গে; তবু তিনি সহজে ভেঙে পড়ার মানুষ নন। সেই জন্যই তাঁর মতো লোককে কলকাতায় বসিয়েছিল রিবাত।

প্রথম দফার জেরায় তিনি প্রায় কিছুই বলেননি। অসুবিধে নেই। মালটাকে নজরবন্দি করে রাখা আছে। পালাবার পথ নেই। আইনি দিকগুলো মজবুত করে তাঁকে কদিন পরে গ্রেফতার করলেও হবে। বরং মালটার বয়ানে অসঙ্গতির জন্য অপেক্ষা করা যাক। আজ না হয় কাল, হবে তো সেটা বটেই।

“আসবো আঙ্কেল?”— দরজার বাইরে থেকে শব্দ এল।

হক উঠে গিয়ে দরজা খুলল। রাজা আর পল্টু দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। প্রবুদ্ধবাবুকে সে আজ বলেছিল ওদের সঙ্গে কথা বলতে চায়।

৫৭

বার পুজো হয়ে যাওয়ার পরে দু’ দিকের পোস্টে নতুন জাল লাগতেই যেন একটা পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার মতো আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল অশ্বিন, সৌভিক, ইসমাইল, জামশেদদের মধ্যে। আর একটু পরেই টুর্নামেন্ট শুরু। কলকাতা আর বাংলাদেশ থেকে টিম এসে গেছে। কলকাতার টিমকে মালদা স্টেশন থেকে সৌভিকরাই আপ্যায়ন করে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের টিমটা এসেছে হিলি বর্ডার দিয়ে। শ্যামলকাকা এলাকার বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের রিসিভ করতে। কলকাতার টিম স্টেশনের কাছেই একটা বড় হোটেলে উঠেছে আর বাংলাদেশের অতিথিদের জন্য বিধানপল্লীতেই একটা বড় অনুষ্ঠান বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। ঝাঁ চকচকে নতুন বাড়ি, সবক’টা ঘরে এসি। এলাহি ব্যবস্থা। বেশ কিছু সমর্থকও এসেছেন দলের সঙ্গে। তারা স্থানীয় মানুষদের কাছে খোঁজ নিচ্ছেন কোথায় হোটেল পাওয়া যায়।

আটটা টিমের মধ্যে তিনদিন ব্যাপী প্রতিযোগিতা। আজ লিগ রাউণ্ড, আগামীকাল লিগের সেকেন্ড লেগ, তারপর দুটো সেমি ফাইনাল আর পরশু ফাইনাল।

সকাল দশটায় বলে শট মেরে এলাকার প্রাক্তন নামী ফুটবলার সুশান্ত মণ্ডল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করলেন। তরুণ বয়সে কলকাতার প্রধান দুই বড় ক্লাবেই খেলেছেন সুশান্তজেঠু। এখন অসুস্থ, তবু মাঝে মাঝে মাঠে এসে প্রভাতী সংঘের ছেলেদের নানা উপদেশ দেন। উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন এমএলএ অমল বরাট এবং জেলার এসপি যতীন্দ্র দুবেও।

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন এবং আয়োজক টিম হিসেবে প্রথম ম্যাচেই খেলবে প্রভাতী সংঘ। নতুন ডিজাইনের জার্সিতে টিমের সকলকে দারুণ দেখাচ্ছে। কোচ নানা টিপস দিয়ে চলেছেন ওদের। এখানকার বাঁধাধরা ধারাভাষ্যকার অজয়দা মাইকে টোকা দিয়ে দেখে নিচ্ছে সেটা ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা।

মাঠের দুই ধারে প্রচুর মানুষের ভিড়। লোক উঠে পড়েছে হাইস্কুলের টানা বারান্দাতেও। নামী রেফারি টস করলেন। প্রভাতী সংঘের অধিনায়ক অশ্বিন হাত মেলাল প্রতিপক্ষ রায়গঞ্জের টিমের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। সেন্টার থেকে বল চলে গেল সৌভিকের কাছে এবং শুরুতেই হড়কাল সে। বিপক্ষের মিডফিল্ডার বল কেড়ে নিল। তার নিখুঁত পাস গিয়ে জমা পড়ল রাইট উইংয়ের পায়ে। একটা লম্বা দৌড়; ডজ করে সে জামশেদ আর ধীমানকে কাটিয়ে বিপজ্জনকভাবে ঢুকে পড়ল প্রভাতী সংঘের পেনাল্টি বক্সে। জোরালো শট ছুটে গেল গোলপোস্ট লক্ষ্য করে কিন্তু জমা পড়ে গেল সতর্ক অশ্বিনের হাতে।

সবাই চলে এসেছে এই প্রান্তে, বিপক্ষের অর্ধ প্রায় ফাঁকা। সুযোগ বুঝে লম্বা ভলিতে অশ্বিন বল পাঠিয়ে দিল ইসমাইলের কাছে। দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাক। ওদিকের লেফট উইং এসে ট্যাকেল করতে গেল কিন্তু বড় শরীরের ইসমাইলের তীব্র গতি তাকে ছিটকে সরিয়ে দিল। মাঠের বাইরে একটা হো হো রোল উঠল। সৌভিকও দ্রুত চলে এল সাপোর্টে। পাস বাড়াল ইসমাইল। বিপক্ষের ডিফেন্ডার কড়া ট্যাকেল করতে গেল সৌভিককে, কিন্তু লাভ হল না। তার পা থেকে বল কেড়ে নিয়েছে নঈম। আবার মাঠের ধার থেকে হো হো শব্দ বাড়ছে। সামনে ফাঁকা মাঠ; নঈম বল ভাসিয়ে দিল ইসমাইলকে লক্ষ্য করে। নিখুঁতভাবে সেই বল রিসিভ করে ইসমাইল বিপক্ষের লেফটব্যাককে কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। এই মুহূর্তে সামনে শুধু গোলকিপার। সে এগিয়ে আসছে অ্যাঙ্গেল ছোট করে দেওয়ার জন্য। দ্রুত ইনসাইড আউটসাইড ডজ মেরেই ইসমাইল জোরালো শট নিল গোলে। বারপোস্টের আধ ইঞ্চির মতো দূরত্ব দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে বলটা হাইস্কুলের দেওয়ালে ধাক্কা খেল। বোমা ফাটার মতো একটা শব্দ হল। ধারাভাষ্যকার অজয়দা চেঁচিয়ে উঠল “গেম অঅঅন!”

লড়াইটা হাড্ডাহাড্ডি হলেও প্রভাতী সংঘ জিতে গেল ২-১ স্কোরলাইনে। একটা গোল তারা পেনাল্টিতে হজম করেছে। অশ্বিনের অনুমানে কোনো ভুল হয়নি। কিন্তু তার হাতে লেগে বল বারের ভিতরদিক ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়। একমাত্র সৌভিককে একটু নড়বড়ে দেখিয়েছে আজ, বাকিরা ফর্মে, তাই সকলেই বেশ চাঙ্গা। পরের ম্যাচ কলকাতা আর কালিয়াচকের টিমের মধ্যে। কালিয়াচকের টিমটার খেলা নজর করা দরকার তাই অশ্বিনরা সাইডলাইন বরাবর বসে পড়ল।

খেলা দেখতে দেখতে অশ্বিনরা চোখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। শ্যামলকাকা সেদিন ভুল বলেননি। কালিয়াচকের এই টিমটা স্কিল আর পাওয়ার গেম; দুটোতেই তুখোড়। তিন গোলে তারা এগিয়ে গেল বিরতিতেই। স্যার অবশ্য বলছিলেন চিন্তার কিছু নেই।

“ওদের একটা ওভার কনফিডেন্ট ভাব আছে, লক্ষ কর। ম্যান মার্কিং করছে না। এটার সুযোগ আমাদের নিতে হবে। তোরা ফাস্ট খেলবি। পজিশন চেঞ্জ করবি একদম চোখের নিমেষে। বেশিক্ষণ পায়ে বল রাখবি না, কুইক পাস। বল রাখলেই কিন্তু পাওয়ার গেমে বিট করে দেবে,” রণজয় ফিসফিস করে বলছিলেন ইসমাইল, নঈমদের।

দ্বিতীয়ার্ধে কলকাতার টিম তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো খেলল এবং দুটো গোল শোধও দিয়ে দিল। খেলায় চোরাগোপ্তা মারামারি ভালোই চলেছে, তাই তিন মিনিট ইনজুরি টাইম দিলেন রেফারি। কলকাতার স্ট্রাইকারের একটা দুর্দান্ত শট বারে লেগে ফিরে আসতেই শেষ বাঁশি বেজে গেল।

অশ্বিনদের পরের ম্যাচ তিনটে নাগাদ, লাঞ্চের পরে। এখন পৌনে একটা বাজে। ওরা ঠিক করল বিএসএ গ্রাউন্ডে গিয়ে একটু প্র্যাকটিস সেরে নেবে। যেহেতু বিএসএ-তে সেমিফাইনাল আর ফাইনাল হবে, মাঠ ভালো করে পরিষ্কার করার কাজ চলছে। অশ্বিনরা মাঠের এক ধারে প্র্যাকটিস করল আধ ঘণ্টা। তার মধ্যেই লাঞ্চের ডাক পড়ল। মাঝে আর ব্রেক নেই। একটার পর একটা খেলা, রাত ন’টা অবধি।

খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে হাইস্কুলে। বন্দোবস্ত দেখে অশ্বিন, ধীমান, রাজাদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। এত ভালো খাবার এর আগে ওরা কোথাও খেলতে গিয়ে পায়নি।

৫৮

বিকেলে হকের কাছে আরেকটা স্বস্তির খবর এসে পৌঁছল। ঘাটাল বিস্ফোরণে জড়িত সন্দেহে রিবাতের সদস্য শাফাকত আলির বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে এনএটিসি। এর ফলে তাকে এবার এদেশে নিয়ে এসে জেরা করা যাবে। নাশকতার কী পরিকল্পনা তারা করে রেখেছে সেটা জানতেই হবে। এখনও পর্যন্ত আয়েশা সুলতানার কেসে এনএটিসি ভালো গতিতে এগোলেও আরো বড় ঘটনাটা রুখতে না পারলে সেই সাফল্য ফিকে হতে সময় লাগবে না। আর তিনদিন বাদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসবেন কলকাতায়। তার আগে একটা বড় পদক্ষেপ করতে পারলে…

হকের মাথার মধ্যে অনেক চিন্তা একে অপরের সঙ্গে জট পাকিয়ে রয়েছে। একটা সন্দেহের আলো দপদপ করে মাঝে মাঝেই জ্বলে উঠছে। আসলে বাংলাদেশের বন্ধু শোহরাব হোসেন এখনও তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে উঠতে পারেনি। সে নিজে এতটাই ব্যস্ত যে এই কাজের জন্য সময় বের করা কঠিন। সে সময়ও চেয়ে রেখেছে সেই কারণে।

বিদ্রোহীর মোড়ে হাইস্কুলের মাঠে লোক উপচে পড়েছে বাংলাদেশি টিমের খেলা দেখতে। হক দেখছিল একটা বছর বারো-তেরোর ছেলে একটা ছোট ডায়রি আর পেন নিয়ে প্রতিবেশী দেশের প্লেয়ারদের পিছনে পিছনে ছুটছে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। হক মাঠের দিক থেকে সরে এল। প্রতীক সেনের সঙ্গে তার সমস্ত বিষয়ে কথা হয়েছে সেই রাত্রে। এরই মধ্যে দুজনে একবার বামনগোলার দিক থেকে ঘুরে এসেছে। সেখানকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তারা পেয়েছে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। আজ আবার তারা সেদিকেই যাবে কারণ একেবারে প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলেপিলেদের মধ্যে কিছু হ্যান্ডবিল বিলি করা হচ্ছিল বলে একটা খবর প্রতীক সেন পেয়েছেন সূত্র মারফত। সে হ্যান্ডবিলের বক্তব্য নাকি ভয়াবহ। দেখা দরকার। অদৃশ্য একটা জাল যে পাতা রয়েছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে সেটা ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে।

মোটরবাইক থাকলেও হক প্রতীক সেনকে সেটা বের করতে বারণ করল। বদলে একটা টোটো ভাড়া করল ওরা। টোটোচালকের বামনগোলার দিকে নিত্য যাতায়াত জেনে হক তার সঙ্গে খোশগল্প শুরু করল। মিটিমিটি হাসছিলেন সাদা পোশাকের সাসপেন্ডেড এসআই। আসলে প্রশ্নগুলোর জবাবের মধ্যে থেকেই যে অনেক তথ্য বের করে নিচ্ছে এনএটিসি’র আন্ডারকভার এজেন্ট, সেটা বেচারা টোটোচালকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।

গন্তব্যে পৌঁছে ওরা দুজন দু’দিকে চলে গেল। এখান থেকে গাজোলের দূরত্ব অনেক, তাই প্রতীক সেনের চেহারা কারো চেনা লাগার সম্ভাবনা কম। তাতে তাঁর সুবিধেই হচ্ছিল। অন্য পরিচয় সামনে রেখে তিনি অনুসন্ধান করছিলেন। মানুষের সন্দেহ এড়িয়ে এই ধরনের অনুসন্ধান অনেক সময় ব্যর্থও হয়। তিনি টের পাচ্ছিলেন স্থানীয় ছেলেপুলেরা বেশ সতর্ক, তারা মুখ খুলতে চাইছে না। কিওর প্লাসের উচ্চপদস্থ কর্মীর পরিচয় এখানে কোনো কাজে লাগবে না তাই হক আগে থেকেই নিজের জন্য অন্য ভূমিকা ভেবে নিয়েছিল। নাম তার মোখতার শেখ, একটি ওষুধ কোম্পানির গোডাউনের জন্য সে ঘর ভাড়া খুঁজতে এসেছে। স্থানীয় মানুষদের থেকে ঘর ভাড়া দিতে পারে এমন কয়েকজনের সন্ধান পেল। কথা বলার সুযোগ নিয়ে তাদের ঘরবাড়ির উপর চোখ বোলানোটাই ছিল তার উদ্দেশ্য। অবশেষে একটা ছোট্ট দর্জির দোকানের মালিকের সঙ্গে কথা বলার সময় টেবিলে বিলবইয়ের নিচে চাপা দেওয়া একটি হ্যান্ডবিল হকের নজরে পড়ল। সৌভাগ্যবশত গোডাউনের জন্য ঘর দেখার জন্য দোকানের মধ্যে দিয়েই যেতে হল তাকে এবং কৌশলে দোকান মালিকের দৃষ্টি ও মনোযোগকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে কায়দা করে বিলবইয়ের নিচ থেকে সবুজ রঙের হ্যান্ডবিলটি আস্তে করে টেনে বের করে নিল সে।

এদিকে প্রতীক সেন ততক্ষণে বিভিন্ন কথাবার্তার মাধ্যমে এক বৃদ্ধকে আসল প্রসঙ্গের দিকে নিয়ে গিয়েছেন। বৃদ্ধের বক্তব্য এলাকার ছেলেপুলেরা ইদানীং বিপদের হাতছানি দেখে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা আরো স্পষ্টভাবে বোঝার জন্য প্রতীক বৃদ্ধকে একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, “ছেলেপুলেদের ভড়কাচ্ছে কারা? আপনারা সামলাতে পারছেন না?”

বৃদ্ধ মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, “একটা লোক আসছিল। ছেলেদেরকে কবরখানার মাঠের পিছন দিকে নিয়ে গিয়ে কীসব কথাবার্তা বলতো। কদিন ধরে তাকে আর আসতে দেখছি না।”

পরিকল্পনামতো ফেরার পথে প্রতীক সেন আলাদা রওনা হলেন। হকের পরামর্শ মেনে প্রতীক তাঁর বাড়ির উপরে নজর রাখার জন্য দুজনকে রেখেছেন এখন। বাড়িতে ফিরে তাদের একজনকে ছুটি দিয়ে দিলেন তিনি। বেচারা একটু খেলা দেখতে যাওয়ার জন্য উসখুস করছিল, মুখ ফুটে বলতে পারছিল না। কিছুক্ষণ বাদে দ্বিতীয়জনকে চায়ের দোকানে পাঠালেন প্রতীক সেন। সেই সুযোগে বাড়িতে ঢুকল হক। তার প্যান্টের পকেট থেকে বেরিয়ে এল ভাঁজ করে রাখা হ্যান্ডবিলটা। তার ভাষা ও বয়ান দেখে দুজন চোখ চাওয়াচাওয়ি করল।

“এসব যে চলছে, একেবারেই জানতেন না?” প্রতীককে প্রশ্ন করল হক।

“ভাসা ভাসা খবর আসছিল। তাও একেবারে রিসেন্টলি। খুব কংক্রিট কিছু জানতে পারিনি।”

হক তার মোবাইলে হ্যান্ডবিলটার ছবি তুলে কাগজটা প্রতীকের হাতে দিয়ে বলল, “এই হ্যান্ডবিল এখানেই ছাপা হচ্ছে কিনা খোঁজ নিন।”

এদিকে লিগে তাদের তৃতীয় ম্যাচ খেলতো নামল প্রভাতী সংঘ। বিপক্ষে বাংলাদেশের গ্রিন বুটস। পরপর দুটো ম্যাচ জিতে প্রভাতী সংঘ স্বস্তিতে, এদিকে গ্রিন বুটস তাদের প্রথম ম্যাচ ড্র করেছে। টিমটাকে এমন কিছু আহামরি মনে হয়নি অশ্বিনদের।

কিন্তু খেলার শুরুতেই ঘটে গেল অঘটন। গ্রিন বুটস-এর স্ট্রাইকারের নিচু ক্রস ওদের প্লেয়ারের পায়ে পৌঁছনোর আগেই ধীমানের হাঁটুতে ধাক্কা খেয়ে গতিপথ পরিবর্তন করে ঢুকে গেল গোলে। দেড় মিনিটের মাথায় স্কোরলাইন দাঁড়াল— গ্রিন বুটস ১ : প্রভাতী সংঘ ০।

মাঠের বাইরের গুঞ্জনে তখন হতাশার ছাপ; সন্ধের আকাশে একটা কালচে নীল রঙ, ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠেছে। খেলা দেখতে দেখতে আকাশের দিকে চোখ চলে গেল পল্টুর। চমকে উঠল সে। আরে, আকাশের রঙটা অনেকটা যেন তার স্বপ্নের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কেমন যেন একটা ভয় পল্টুর শরীরে হাত বুলিয়ে দিয়ে গেল নিমেষে।

সমতা ফেরানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে প্রভাতী সংঘ। গ্রিন বুটস-এর তিন-চারজন খেলোয়াড়ের বয়স একটু বেশি; তারা দমে পেরে উঠছে না কিন্তু সেই খামতি বাকিরা ঢেকে দিচ্ছে। তবু ছত্রিশ মিনিটের মাথায় জয়ের মাপা কর্নার কিকে মাথা ছুঁয়ে গোল করে ফলাফল ১-১ করে দিল সৌভিক। সেলিব্রেশনের সময়ে তার হালকা লাগছিল। আগের দুটো ম্যাচ খুব খারাপ গেছে তার। স্যার কেমনভাবে যেন তাকিয়েছিলেন ওর দিকে। এবার নিশ্চয়ই তিনিও খুশি হবেন। কোচ স্যারকে খুঁজল সৌভিকের চোখ। ওই তো তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু খুশি হয়েছেন কিনা সে বুঝতে পারল না।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ফ্রি কিক থেকে গ্রিন বুটস-এর নিশ্চিত গোল পুরো শরীর ছুঁড়ে দিয়ে বাঁচাল অশ্বিন। বলটা যখন উড়ে আসছিল সে নিজেও ভাবেনি হাতটা পৌঁছবে বলে। গোল বাঁচিয়ে অনেকটা উপর থেকে মাটিতে পড়লেও ব্যথা টের পায় না অশ্বিন। আজও পেল না। তার হাতে লেগেও বল মাঠের মধ্যেই ছিল। সেই ফিরতি বলেই আবার শট নিয়েছে গ্রিন বুটস-এর প্লেয়ার। আবারও ফিস্ট করে বলকে ছিটকে সরিয়ে দিল অশ্বিন। কর্নার কিক! কয়েক সেকেন্ডের জন্য খেলা থামল বল বসানোর জন্য। ‘সাবাশ অশ্বিন’, ‘লাভলি অশ্বিন’, ‘একঘর’ জাতীয় চিৎকারগুলো প্রভাতী সংঘের গোলরক্ষকের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছিল।

কর্নার কিক থেকে বিপদ হতে পারতো কিন্তু ধীমান দারুণ ব্লক করল এবং দ্রুত লম্বা শটে বল পাঠিয়ে দিল সেন্টারের কাছাকাছি। অশ্বিন দেখতে পাচ্ছে বল এখন সৌভিকের পায়ে। গ্রিন বুটস-এর রাইট উইং তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। জার্সি টানাটানি চলছে কিন্তু আটকাতে পারছে না সৌভিককে। সে দুজন বিপক্ষ খেলোয়ারের মাঝখান দিয়ে গলে গিয়ে বল জমা করে দিল ইসমাইলের পায়ে। আবার একটা বিদ্যুৎগতির দৌড় ইসমাইলের এবং পেনাল্টি বক্সের মধ্যে সে, জয় এবং বিপক্ষ গোলকিপার। ততক্ষণে বক্সে এসে গেছে সৌভিকও। পাস বাড়াল ইসমাইল। ডামি রান করে বল টপকে গেল জয়, ছুটে এসে শট নিল সৌভিক। গোলরক্ষকের নাগাল এড়িয়ে বারের একেবারে গা ঘেঁষে বল জড়িয়ে গেল জালে। ২-১!

৫৯

খেলার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ঘটে গেল দুর্ঘটনা। অবশ্য প্রভাতী সংঘের ছেলেরা পরিকল্পনার গন্ধ পাচ্ছিল। ভয়ংকর চোট পেয়ে মাঠের বাইরে চলে গেল সৌভিক। মাঠের বাইরে শুয়ে কাতরাচ্ছিল সে। আইস প্যাক, স্প্রে কোনো কিছুতেই যন্ত্রণা কমছিল না। মাঠের পাশেই একটা ফার্স্ট এইডের স্টল করা হয়েছে। সেখানে এক ডাক্তার বসেছেন। তিনি বললেন চোট গুরুতর। এক্স রে করাতে হবে। কান্না পাচ্ছিল সৌভিকের। ম্যাচটা তারা জিতল তারই গোলে; দারুণভাবে ফর্মে ফিরছিল সে আর ঠিক তখনই এই বিপত্তি। রেফারি গ্রিন বুটস-এর প্লেয়ারটাকে লাল কার্ড দেখিয়েছ। বেশ হয়েছে। শালা বুড়ো মাল! দমে পারছে না তাই এলপাথাড়ি পা চালাচ্ছে। কিন্তু ও মাল তো একটা ম্যাচ বসবে। সৌভিকের ভয় হচ্ছে সে বোধহয় বাকি টুর্নামেন্টে আর মাঠেই নামতে পারবে না।

তাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হল ক্লাবের তরফ থেকে। এদিকে সৌভিকের অনুপস্থিতি দিনের একেবারে শেষ ম্যাচে দলকে ভোগাল। বেশ কয়েকটা হাফ চান্স মিস করে প্রভাতী সংঘ কালিয়াচকের টিমের কাছে হেরে গেল ২-১ এ। এবার অশ্বিনের অনুমান ঠিক হয়নি পেনাল্টির সময়ে। দ্বিতীয় গোলটার ক্ষেত্রে তার করার কিছু ছিল না। কর্নার থেকে ভেসে আসা বল ভিড়ে গোঁতাগুঁতি করতে করতে কোনো রকমে মাথা ছুঁয়ে গোলে ঢুকিয়ে দিয়েছিল কালিয়াচকের ঢ্যাঙা স্ট্রাইকার।

দিনটা হতাশা দিয়ে শেষ হলে সাফল্যগুলোও কেমন যেন বিস্বাদ লাগে। অশ্বিনদেরও তাই লাগছিল। মাঠে আলো নিভে আসছিল একটা একটা করে। জয় অনেকক্ষণ ধরেই স্যারকে লক্ষ করছিল। ওঁকে যেন সন্ধে থেকেই একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। সে গিয়ে জিজ্ঞেস করল কারণটা।

স্যার ওর পিঠে একটা চাপড় মেরে বললেন, “বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল। আমার মায়ের শরীরটা খুব খারাপ। হসপিটালে নিয়ে যেতে হতে পারে। তাই একটু চিন্তা করছি। তোদের ও নিয়ে ভাবতে হবে না। খেলা ভালো হচ্ছে, এই ফর্মটা ধরে রাখ।”

জয় চিন্তিত হয়ে পড়ল। মা’কে হসপিটালে ভর্তি হতে হবে! স্যার আবার টুর্নামেন্টের মাঝখানে ওদের ছেড়ে চলে যাবেন না তো! তাহলে তো মুশকিল।

জয়ের মুখে খবর শোনামাত্র টিমের সকলের মুখের উপরেই যেন মেঘ নেমে এল। সর্বনাশ! ওই মানুষটা একদিন না থাকলে প্র্যাকটিসেই ওদের মন বসে না, আর এ তো টুর্নামেন্ট।

একটু দূরত্ব রেখে ওদের পিছন পিছনই হাঁটছিল হক। তার সঙ্গে ইতিমধ্যেই এনএটিসি’র এখানকার সোর্স রাজেশের কয়েকবার চোখে চোখে কথা হয়ে গেছে। এখন অবধি সন্দেহজনক কিছু দুজনের কারোরই চোখে পড়েনি। বাংলাদেশি সমর্থকেরা স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে মিলেমিশেই খেলা উপভোগ করেছে। কারোর কোনো গোপন উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হয়নি ওদের। তবু নজর রাখতে হবে। আগামী পরশু সমাপ্তি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নাকি উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী আসছেন।

মোবাইল জানান দিল নোটিফিকেশন এসেছে। ধর্মেন্দ্র’র হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ। লেখা আছে— ‘‘স্টার্টেড ফর মালদা!”

বাড়ির পথে হাঁটছিলেন কোচ রণজয় বিশ্বাসও। তাঁর চোখেমুখে সামান্য হলেও উদ্বেগ ফুটে উঠছিল। স্যারকে এরকম দেখতে ছাত্রদের ভালো লাগছিল না। ধীমান স্যারের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বলল, “চিন্তা করবেন না স্যার, জেঠিমা ভালো হয়ে যাবেন দেখবেন।”

স্যার মৃদু হেসে বাড়ির দিকে চলে গেলেন।

অশ্বিন আর জয় বাড়ির রাস্তায় না গিয়ে সৌভিকদের গলিতে ঢুকল। ছেলেটার কী অবস্থা একবার খোঁজ নেওয়া দরকার। ও যদি বসে যায়, মাথায় হাত পড়বে টিমের। লিগ টেবিলের একেবারে উপরে আছে প্রভাতী সংঘ, তাই সেমিফাইনালে যাওয়া নিয়ে হয়তো চাপ হবে না, কিন্তু সেই স্টেজে সৌভিক খেলতো না পারলে বিপদ হবে।

টিমের এক নম্বর স্ট্রাইকারের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল ওরা। তার মা দরজা খুলে দিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *