১
মাঠের ধার থেকে বলটা তুলে নিয়ে পিছন ফিরে থমকে গেল পল্টু। অদ্ভুত ব্যাপার! বন্ধুরা সব গেল কোথায়? এত বড় মাঠটাতে পল্টু একা দাঁড়িয়ে এখন। হঠাৎ যেন ঝপ করে সন্ধে নেমেছে। পশ্চিমের আকাশে এক আশ্চর্য কালচে নীল রং ধরেছে। এরকম আগে কখনও দেখেনি সে।
বন্ধুর সাইকেলের পিছনে বসে মাঠ পেরিয়ে গ্রামের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আকাশটা দেখে কেমন যেন ভয় করতে লাগল পল্টুর। এক সময় তার দু’ চোখ লেগে এসেছিল। ঘুম ভাঙতেই চমকে উঠল সে। এ কী! এ কার সাইকেলে চেপে চলেছে সে। এ তো তার বন্ধু সাহজাদ নয়! এ তো কোনো মানুষই নয়, বিরাট লোমশ একটা জানোয়ার। ভয় পেয়ে জানোয়ারটার হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য তার বিরাট লোমশ পিঠে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কিল, ঘুষি, আঁচড় মারতে লাগল পল্টু। জানোয়ারটার কোনো হেলদোল নেই, সাইকেল এগিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। আকাশে এখন বেগুনি রঙ। পল্টু বুঝে উঠতে পারছে না সে কোথায় চলেছে।
এক জায়গায় এসে সাইকেল থামল। পল্টুর নরম গালে এসে পড়ল একটা বিরাট থাপ্পড়। ছিটকে সাইকেল থেকে সে মুখ থুবড়ে পড়ল একটা গর্তের মধ্যে। দূর থেকে মুখে কাপড় বাঁধা দুটো লোক এগিয়ে এল ওর দিকে। পল্টুকে ওরা একটা লম্বা কাঠের পোলের সঙ্গে বেঁধে ফেলল। তারপর মুখ ঢাকা একজন এসে দাঁড়াল ওর সামনে। তার হাতে একটা প্রকাণ্ড কুড়াল। লোকটার চোখ দিয়ে লাল আগুন বেরোচ্ছে, সে দু’ হাতে কুড়াল ধরে ব্যাটসম্যানের ছক্কা মারার মতো ভঙ্গি করছে। প্রবল গতিতে কুড়াল এগিয়ে আসছে পল্টুর গলা লক্ষ্য করে। ভয়ে পল্টু প্রাণপণে চিৎকার করে উঠতে চাইছে কিন্তু তার যে মুখ বাঁধা। তার শরীরের ঝাঁকুনির অভিঘাতে কাঠের পোলটা থরথর করে কাঁপছে। কুড়াল আর পল্টুর গলার মধ্যেকার ব্যবধান ঝড়ের বেগে কমে আসছে। এক ঝটকায় পল্টুর মুণ্ডুটা উড়ে গিয়ে পাশের একটা পাথরের উপর আছড়ে পড়ল…
আর ঠিক তখনই ঠংঠনাং শব্দে স্টিলের গ্লাসটা পড়ল মাটিতে আর বিছানায় শোওয়া অবস্থা থেকে প্রবল চিৎকার করে উঠে বসল পল্টু। তারই হাতের বেপরোয়া ঝটকায় গ্লাসটা খাটের পাশে রাখা টুলের উপর থেকে পড়েছে। পাশের খাটে শোয় ওর রুম পার্টনার দীপেশ। চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেছে তারও। দীপেশ তাড়াতাড়ি উঠে আগে ঘরের কোণের সুইচবোর্ড হাতড়ে আলো জ্বালল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটল করিডর দিয়ে। করিডরের আরেক প্রান্তে অজয়দার ঘর। ওদের দেখাশোনার দায়িত্বে অজয়দাই আছে। বেশ কয়েকবার জোরে দরজা ধাক্কানোর পর অজয়দা দরজা খুলল।
“আবার! কখন?”
“এইমাত্র। আমি ঘরে আলো জ্বেলে এসেছি। তুমি একটু গিয়ে দেখ। আমি আঙ্কেলকে খবরটা দিয়ে আসি,” দীপেশ ব্যস্তভাবে বলল, তারপর এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। ওদিকটায় রাতের দিকে একদম যেতে চায় না দীপেশ। সে এমনিতে সাহসী ছেলে, কিন্তু গত মাসে সিঁড়ির সামনের ঘরের দেবজ্যোতি হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করার পর থেকেই অন্ধকারে ওদিকে তাকালে ওর শরীরের মধ্যে কেমন যেন করে। তার উপর কয়েকদিন ধরে ওদিকের টিউবলাইটটাও বিগড়েছে। বিদ্যুৎ চমকানোর মতো জ্বলে-নেভে খালি।
তবু দীপেশ গিয়ে সিঁড়ির ধারে রাখা ল্যান্ডলাইন থেকে পল্টুর বাবার মোবাইল নম্বর ডায়াল করল। কলকাতা থেকে অনেক দূরে মালতীপুরে প্রশান্ত গাঙ্গুলির মোবাইল শব্দ করে উঠল। ঘুম চোখে নম্বরটা দেখেই বিছানায় উঠে বসলেন তিনি, কারণ সেটা তাঁর চেনা।
প্রশান্তবাবু প্রথম কথাই বললেন, “কী হয়েছে? আবার?”
“হ্যাঁ আঙ্কেল, এইমাত্র ঘুমের মধ্যে চেঁচিয়ে উঠেছে। আমি অজয়দাকে ওর কাছে বসিয়ে রেখে আপনাকে খবর দিতে এলাম।”
উদ্িবগ্ন প্রশান্তবাবু বোঝার চেষ্টা করছিলেন ব্যাপারটা কতটা গুরুতর আকার নিয়েছে কিন্তু দীপেশ তাঁকে বলার সুযোগ পেল না। আবার ওদের ঘর থেকে পল্টুর চিৎকার ভেসে এল।
“আঙ্কেল, আমি এখন ছাড়ছি” বলে ফোন ফেলে দীপেশ দৌড়ল ঘরের দিকে। অসাবধানতায় রিসিভারটা জায়গামতো বসাতে পারেনি সে। সেটা ঝুলন্ত অবস্থায় দুলতে লাগল ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো।
“আর কদিন পরেই তো লম্বা গরমের ছুটি। পীযূষকে কিছুদিনের জন্য একটু বাইরে নিয়ে যান না। একটা চেঞ্জ ওর মনের জন্য খুব দরকার,” রাইটিং প্যাডে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বলছিলেন মনোবিদ সমীর আচার্য। গত ছ’ মাস ধরে তাঁরই চিকিৎসার অধীনে আছে পল্টু। পীযূষ তার ভালো নাম। একটা দুঃস্বপ্ন মাঝেমধ্যেই তাকে তাড়া করে আসে। এটার শুরু গত বছরে। একটা ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতারপর ওর বাবা ওকে নিয়ে বর্ডার পেরিয়ে ইন্ডিয়াতে চলে এসেছেন। পল্টুদের বাড়ি বাংলাদেশের যশোরে, বিরামপুর গ্রামে, কিন্তু আপাতত তার ঠিকানা কলকাতার একটি হোম। বাবা প্রশান্ত গাঙ্গুলি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একেবারে মাধ্যমিক পাশ করার পর ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। ততদিনে ওর মানসিক ধাক্কাটাও অনেকটা কেটে যাবে আর যাদের রোষে ও পড়েছিল তাদেরও মেজাজ হয়তো ঠান্ডা হবে।
ইন্ডিয়াতে আসার পরে নতুন করে কোনো বিপদ না হলেও মনের মধ্যে সেই ঘটনাটার একটা চোরাস্রোত রয়েই গেছে। স্কুলে দু’ দিন দুটো ঘটনায় একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল পল্টু। সেই দু’ রাত্রেই গতকালের স্বপ্নটা দেখেছিল সে। আজ যখন ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করছিলেন আবার তেমন কিছু ঘটেছে কিনা, পল্টুর মনে পড়ছিল গতকাল দুপুরের কথা। গতকাল ছিল রবিবার, স্কুল ছুটি। তাই সকালের পড়া সেরে হোমের অনেকেই ইনডোর প্লে রুমে জড়ো হয়েছিল। কেউ কেউ টেবিল টেনিস খেলছিল, কেউ বা চেস নিয়ে বসেছিল। পীযূষের খুব একটা খেলার মেজাজ ছিল না তাই সে ঘরের এক কোণে ক্যান্টিনের হেড বঙ্কিমকাকুর পাশে চেয়ারে বসেছিল।
বঙ্কিমকাকু খবরের চ্যানেলগুলো ঘোরাতে ঘোরাতে এক জায়গায় আটকে গিয়েছিল। চ্যানেলটায় তখন একটা বড় বিস্ফোরণের খবর আর দৃশ্য দেখাচ্ছিল। মেদিনীপুরের ঘাটালে একটা বড় পুরোনো বাড়ির মধ্যে হঠাৎ বিরাট বিস্ফোরণের শব্দে এলাকা কেঁপে ওঠে। প্রথমে সবাই ভেবেছিল গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে শব্দ হয়েছে। কিন্তু পরে পুলিশ অনুসন্ধান করে দেখেছে ওই বাড়িতে বিপুল পরিমাণে বোমা আর বিস্ফোরক মজুত করা ছিল। টিভিতে সেই বাড়ির ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা রক্ত দেখে গা গুলিয়ে উঠেছিল পল্টুর। পুলিশের লোকেরা যে কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের মুখ ঢাকা হলেও টিভির দিকে তাকিয়ে ওর সারা গা কেমন যেন শিরশির করে উঠেছিল। পল্টু বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারেনি টিভির সামনে, তার গা গোলাচ্ছিল। তারপর গতকাল সারাদিন তার চোখের সামনে টিভির দৃশ্যগুলো ভেসেছে। ডাক্তারবাবুকে ওই ব্যাপারে কিছু বলেনি সে, কিন্তু বাবাকে উনি যা বলছিলেন তা শুনে পল্টুর মনে হয়েছে গতকালের ওই টিভির দৃশ্যগুলোই ওর রাত্রে সেই দুঃস্বপ্ন দেখার জন্য দায়ী।
আজ সন্ধেবেলায় পল্টু আর ওর বাবার সঙ্গে দীপেশ আর তার বাবাও ডাক্তারের কাছে এসেছেন। দীপেশের বাবা অলোক ব্যানার্জি বেশ কয়েক মাস বিদেশে কাটিয়ে গতকালই বাড়ি ফিরেছেন আর ছেলের কাছে তার ক্লাসমেট কাম রুম পার্টনারের অদ্ভুত সমস্যার কথা জানতে পেরে কিছুটা উদ্বেগ আর কৌতূহল নিয়ে প্রশান্তর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে ওঁরা কাছেই একটা শপিং মলের উপরে ফুডকোর্টে বসেছিলেন। দীপেশ পল্টুকে নিয়ে নিচের ফ্লোরে স্টারমার্কের স্টোরে গেল বই দেখতে। এই সুযোগে অলোকবাবু প্রশ্ন করলেন, “ঘটনাটা ঠিক কী বলুন তো! ডক্টরকে দেখে বেশ চিন্তিত মনে হল আজ।”
প্রশান্ত চায়ে চুমুক দিয়ে ফ্যাকাসে মুখ করে বললেন, “ছেলেটা আমার খুব প্রতিভা নিয়ে জন্মেছে। নিজের ছেলে বলে বলছি না, কিন্তু ওর মধ্যে একটা দারুণ শিল্পী সত্তা আছে। খুব ছোট থেকেই মাটির তাল নিয়ে পুতুল বানানোর দিকে ওর ঝোঁক। তারপর যত বড় হয়েছে, তত হাতও খুলেছে। স্কুল ছুটির পর কাছেই এক শিল্পীর বাড়িতে চলে যেত। সেখানে কদিন ভদ্রলোকের কাছে কীসব শিখল, তারপর থেকে নিজে নিজেই দারুণ সব মূর্তি বানাতে শুরু করল। প্রথমে মাটি, তারপর প্লাস্টার, এখন তো সিমেন্টের মূর্তিও বানায়। বললে বিশ্বাস করবেন না দাদা, আমাদের এলাকায় একটা ক্লাব আছে। সাংস্কৃতিক ক্লাব। ওরা পল্টুর তৈরি রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের মূর্তি বসিয়েছে। আমাদের বাসায় গোয়াল আছে। ওর জন্য সেখানে কিছুটা জায়গা করে দিতে হয়েছে। সেখানে রামকৃষ্ণ থেকে নেতাজী, ইন্দিরা গান্ধী থেকে বঙ্গবন্ধু, সবার মূর্তি আছে।”
“বুঝলাম। এ তো সত্যিই রিমার্কেবল ব্যাপার। কিন্তু এতে সমস্যাটা কোথায়?” দিশেহারার মতো প্রশ্ন ছুঁড়লেন অলোকবাবু।
“সমস্যা বিরাট। পাশাপাশি দুই দেশ, এক ভাষা হলেও আপনাদের আর আমাদের সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে আকাশপাতাল তফাত। বাংলাদেশে মূর্তিপূজা ও স্থাপনের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে রেখেছে বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠন। বহু জায়গায় বহু মনীষীর মূর্তি তারা ভেঙে তছনছ করেছে। এদিকে পীযূষের ভালো কাজের কথা চারিদিকে জানাজানি হয়েছে, কয়েকটা বড় পত্রপত্রিকায় ওর ছবিসহ প্রতিবেদনও বেরিয়েছে। আমাদের ওখানকার ডিএম সাহেব বাড়িতে এসে ওকে পুরস্কার দিয়ে গেছেন। ব্যস, সেটাই হল সমস্যা,” কথা শেষ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রশান্তবাবু।
“কী রকম?”
আমার ফোনে কয়েকবার অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে শাসিয়েছে। “পোলারে ত্যাদরামি বন্ধ করতি ক, বাসায় আগুন জ্বলবো না হলি,” এই জাতীয় কথা বলেছে। যে শিল্পীর কাছে ও যেত, একদিন তাঁর বাড়িতে আগুনও লাগিয়ে দিল। ভদ্রলোক মেয়ের বাড়ি গিয়েছিলেন তাই প্রাণে বেঁচে গেছেন। সেই দেখে আমি ছেলেকে বারণও করেছিলাম। কিন্তু ততদিনে কাগজে লেখাটেখা বেরিয়েছে, অনেকেই আসছে এতটুকু ছেলে কেমন করে এত সুন্দর মূর্তি বানায়, তাই দেখতে। ছোট মানুষ, ও’ও উৎসাহ পেয়ে গিয়ে মূর্তি বানানো চালিয়ে গেছে। একদিন বেশ রাতে বাসায় এসে শাসিয়ে গেল কয়েকজন। তারপর হল সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপারটা। গত বর্ষার কথা। ওর জন্মদিন ছিল। মাঠে খেলছিল। রোজই খেলতো যায়। একটা বদখত ছেলে আছে। আমাদের পাড়া থেকে একটু দূরে থাকে। নতুন এসেছে এলাকায়। তার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল। সে রোজ সাইকেলে করে বাড়ি ফেরার সময় পীযূষকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিত। সেদিন ওকে অন্য কোথাও একটা নিয়ে গিয়ে কাদের হাতে যেন তুলে দিয়েছিল। ওর মুখ, হাত বেঁধে একটা গর্তে ফেলে রেখেছিল তারা। সেই গর্তের মধ্যে বসেই শুনেছে ওরা ওকে বিক্রি করে দেওয়ার কথা বলছিল। আরেক দলের আসার কথা ছিল, কিন্তু তাদের মোটরবাইক খারাপ হয়ে যাওয়ার ফলে দেরি হচ্ছিল। এসবই ছেলের মুখেই শোনা। কী ভাগ্য আমার, ছেলেটা কোনো রকমে হাতের বাঁধনটা খুলতে পেরে পালিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ে। বোধহয় বাচ্চা ছেলে মনে করে খুব শক্ত করে বাঁধেনি। বড় রাস্তায় একটা রিকশাওয়ালাকে বলায় সে পৌঁছে দিয়েছিল বাসায়। আমরা এদিকে চিন্তায় অস্থির। রাত আটটা বাজতে যায়, ছেলের পাত্তা নেই। সেই বন্ধুর বাসায় গিয়ে দেখি তালাবন্ধ। তারপর ছেলে ফেরার পর সব শুনে সঙ্গে সঙ্গে লোকাল থানায় যাই ওকে নিয়ে। বড়বাবু ওর কাছ থেকে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানলেন। তারপর বললেন, “যাদের কথা মনে হচ্ছে, তাদের হাত কত লম্বা জানেন? চেষ্টা করবো তাদের ধরার, কিন্তু ছেলেকে বাঁচাতে চাইলে দূরে কোথাও নিয়ে যান। পারলে ইন্ডিয়া চলে যান। সেখানে এসব সমস্যা নাই।”
ফুডকোর্টের কোণের টেবিলে ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা নামল। বিদেশবিভুঁই ঘুরে বেড়ানো অলোকবাবু নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বৃত্তান্তের পরবর্তী অংশটা তিনি ইতিমধ্যেই জেনেছেন। পীযূষদের পিসির বাড়ি বসিরহাট লাইনে, মালতীপুর। এই ঘটনার কিছুদিন পরে সেখানে ওকে নিয়ে চলে আসেন প্রশান্ত। কলকাতায় ছেলের স্টুডেন্ট ভিসার জন্য অ্যাপলাই করেন। তারপর মধ্য কলকাতায় খান্না সিনেমার কাছে সরকারি স্কুলে পীযূষ ভর্তি হয় জানুয়ারি মাসে। স্কুলের কাছেই একটা হোম আছে যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা থাকে। পীযূষের সেখানে থাকার ব্যবস্থা হয়। প্রশান্তবাবুও এখন মালতীপুরেই থাকেন, যাতে পীযূষের ওই মানসিক সমস্যাটা কখনো বড় আকার ধারণ করলে অল্প সময়ে চলে আসতে পারেন। তিনি এখন মাঝে মাঝে যশোরে গিয়ে তাঁর বাড়িতে খোঁজখবর করে আসেন।
“সাংঘাতিক ব্যাপার! ভাবা যায় না। হ্যাঁ, এরকম এক্সপিরিয়েন্স হলে দুঃস্বপ্ন দেখা অস্বাভাবিক নয়। ছোট্ট ছেলে, ওর মনের উপর গভীর প্রভাব পড়েছে,” অলোকবাবু বললেন।
“ঘটনার পরপর আমাদের বাসায় তো এই ঘটনা প্রায়ই হতো। এখানে আসার পরেও এর মধ্যে দু’ বার হয়েছে। প্রথমবারের পর দীপেশকে আমার নম্বর দিয়ে গিয়েছিলাম, যাতে এমন হলে সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারি। আপনার ছেলে বড় ভালো, অভিভাবকের মতো পীযূষের খেয়াল রাখে। হোমের হেডও বলেন সে কথা।”
“আচ্ছা যে ছেলেটির সঙ্গে পীযূষের বন্ধুত্ব হয়েছিল, তাকে পুলিশ ধরেনি?” অলোকবাবু জানতে চাইলেন।
প্রশান্তবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিলেন, “খোঁজা হয়েছিল কিন্তু সেই সন্ধে থেকেই সে বেপাত্তা। পুলিশের সন্দেহ সে কোনো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।”
ওদের কথা শেষ হওয়ার আগেই দীপেশ আর পীযূষ ফিরে এল। অলোকবাবু ছেলের বন্ধুর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “ডাক্তার কিন্তু ভালোই অ্যাডভাইস করেছেন। ওর একটা চেঞ্জ দরকার। ঘুরেই আসুন না কদিন কোনো জায়গা থেকে।”
প্রশান্ত মাথা নিচু করে বসেছিলেন। অপরাধীর মতো স্বরে বললেন, “সে তো শুনলাম দাদা, কিন্তু আমি পড়েছি মহা সমস্যায়। আমার মায়ের শরীরটা একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। ভেবেছিলাম ছুটিটা পড়লেই পীযূষকে ওর পিসির কাছে রেখে দিন কুড়ির জন্য বিরামপুর থেকে ঘুরে আসব। আমার স্ত্রী একা সামলে উঠতে পারছেন না। এখন কী করি বলুন তো!”
দীপেশ মন দিয়ে বড়দের কথা শুনছিল। এবার বলল, “আঙ্কেল, একটা আইডিয়া দেব?”
অলোকবাবু আর প্রশান্তবাবু একসঙ্গে তার দিকে চাইলেন।
“বলছি যে আমি তো ছুটিতে মালদা যাচ্ছি মাসির বাড়িতে। পল্টু যাক না আমার সঙ্গে। ওখানে বিরাট মাঠ আছে। খেলা হয়। ওর ভালো লাগবে।”
প্রশান্ত জবাব খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি ছেলের মুখের দিকে অসহায়ভাবে চাইলেন। তাঁর মনে হল পল্টুর অপছন্দ হয়নি প্রস্তাবটা।
২
মে মাসের শুরু
সাধনের ওষুধের দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চটার উপর বসে সারাদিনের ‘ইনকাম’ গুনে নিচ্ছিল লুলো। সে জন্ম বিকলাঙ্গ, তার উপর আবার বাপ-মা-মরা ছেলে, ফলে একমাত্র কাকা বহুদিন হল ঘর থেকে বের করে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে লুলো তাতে দমে যায়নি। তার শারীরিক দুর্বলতাকেই সম্পদ করে পেটের ভাতের বন্দোবস্ত করে নিয়েছে। ঘোজাডাঙায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের অফিসের কাছেই বাটি পেতে বসে থাকে সে। ওপার থেকে আসা অতিথিরা তাদের সঙ্গের ভারতীয় মুদ্রার যৎসামান্য অংশ প্রায়ই তার টোল খাওয়া বাটিতে রেখে যান। হাঁটুর পর থেকে অস্বাভাবিকরকম সরু দুটো পা, তাই নিয়ে সে যখন ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে ধুলোয় ভরা পিচের রাস্তা দিয়ে এদিকওদিক এগোয়, তখন দেখে মায়া হয় বৈকি! তার নাম ছিল আসলে লালু, শারীরিক বিশেষত্বকে ‘মর্যাদা’ দিয়ে এলাকার লোক সেটা সামান্য অদল-বদল করে লুলো করে নিয়েছে।
সাধনের দোকানের পাশেই নিমাই মণ্ডলের ভাতের হোটেল। তিনিও দয়াবান, তাই লালুর ইনকাম কোনো কোনোদিন কম হলেও দুপুরে আর রাত্রে চারটে চুপসে যাওয়া লুচি আর বাসনের তলায় পড়ে থাকা ঘুগনি তার কপালে জুটেই যায়। এক-আধদিন অবশ্য বরাত খোলে। লুলোর অনেকদিন হয়ে গেল এখানে, তাই যেসব ট্রাকগুলো নিয়মিত মাল নিয়ে বর্ডার পেরিয়ে ভোমরা দিয়ে ওপারের সাতক্ষীরায় ঢোকে, তাদের চালকেরা তাকে চেনে আর মাঝে-সাঝে মেজাজ খোশ থাকলে হেল্পারের জানালা দিয়ে দলামোচা করা দু-তিনটে একশো টাকার নোট এসে পড়ে তার কোলে। সেই সব দিনে লুলো নিমাইদার হোটেলে ডিম ভাত পায়। রাত্রে নিমাইদার হোটেলের ভিতরেই মাথা গোঁজে লুলো। যেদিন বড় নোট পায় সেদিন আর দাদা তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করার জন্য বেশি গালমন্দ করে না।
আগে বড় নোট পেলেই লুলো সন্ধে হওয়ার অপেক্ষায় থাকত। নিমাই মণ্ডলের হোটেলের পাশেই ভজন ফুচকার স্ট্যান্ড পাততো। হেব্বি আলুটা মাখত মাইরি। কী যে হল, কিছুদিন আগে পুলিশের লোকেরা একদিন রাতের দিকে ভজনকে ধরে নিয়ে গেল। দিন দশেক হল তার জায়গায় আরেকজন ফুচকার স্ট্যান্ড পাতছে। নতুন এই লোকটাকে মোটেই পছন্দ হয়নি লুলোর। সে নাকি ভজনের ভাই। কিন্তু ব্যবহার মোটেই ভজনের মতো নয়। ভালো আলুও মাখতে পারে না। লুলো এর মধ্যে দু’ দিন খেয়েছে তার কাছে, মোটেই ভক্তি হয়নি। মাঝে মাঝেই ফুচকা ফাটাতে গিয়ে একেবারে ভেঙে ফেলে। ও ফুচকা দেবে কী, সারাক্ষণই ফোনে কথা বলতে থাকে।
আজ অন্যান্য দিনের তুলনায় ইনকাম অনেকটা বেশি হয়েছে তাই ফুচকা খাওয়া চলতে পারে। নাহয় একটু খারাপ খাবে, তবু খেতে তো পাবে, এই ভেবে সবে ফুচকাওয়ালার দিকে এগোতে শুরু করেছে লুলো, এমন সময় সে দেখল লোকটা স্ট্যান্ড ফেলে নিমাইদার দোকানে ঢুকে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। অগত্যা লুলোও ঢুকল সেখানে। একবার খাওয়ার লোভ যখন লেগেছে, কিছু একটা খেতেই হবে। উলটোদিকের বেঞ্চে তিনটে লোক কচুরি খাচ্ছে। লুলো দেখেছে ওদের। একটু আগেই বর্ডার পেরিয়ে এসেছে ওরা। লুলো শোনার চেষ্টা করছিল ওদের কথা। ওরা কথা বলছিল খুব কম, হাত আর চোখের ইশারায় কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিল একে অপরকে। কিন্তু ওদের চলাফেরার মধ্যে অন্যান্য যারা আসে, তাদের যেমন একটু চিন্তিত, ঘাবড়ে যাওয়া বলে মনে হয়, তেমন মনে হচ্ছিল না লুলোর। নিমাইদা একবার জিজ্ঞেস করল ওরা কোথায় যাবে। একজন জবাবে বলল রাতটা সংগ্রামপুরে কাটিয়ে কাল কলকাতায় যাবে। সেখানে কোন বড় হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে এসেছে।
লোকগুলোর খাওয়া হয়ে গেছে। তারা বেরোচ্ছে। ওদের পিছন পিছন নতুন ফুচকাওয়ালাটাও বেরোল। মরুক গে। নিমাইদার হোটেলের আলোয় লুলো আরেকবার তার ঝোলা উলটে আজকের ইনকাম গুনতে শুরু করল। সেই দেখে হোটেলের কর্মচারী বিশু মুখ বেঁকিয়ে বলল, “ইস, ঢ্যামনা পয়সা গুনছে দেখো, যেন কত কোটি টাকা পেয়েছে।”
লুলোর মাথা গরম হয়ে গেল। সে গর্জে উঠল, “ওই, এদ্দম গায়াগায়ি দিয়ি য়া, বয়ে দিয়াম।”
নিমাই মণ্ডলের হোটেল থেকে একটু দূরেই একটা ভ্যান দাঁড়িয়েছিল। লোকগুলো তাতে চেপে বসল। ভ্যান গড়াতে শুরু করল। ফুচকাওয়ালা তার পকেট থেকে মোবাইল বের করে নির্দিষ্ট নম্বর ডায়াল করল। দু’ বার বাজতে না বাজতেই ওপার থেকে ‘হ্যালো’ ভেসে এল।
রাতের অন্ধকার চিরে সাইকেল ভ্যান দ্রুত গতিতে মেরুদণ্ডী পেরিয়ে সংগ্রামপুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ভ্যানের তিন সওয়ারির একজন হোয়াটসঅ্যাপে টাইপ করল, “সংগ্রাম শুরু!” কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। বেজে উঠল তার মোবাইল। জবাব এসেছে, “দুই বোড়ে ঘোরাঘুরি, ঘোড়াটার হুড়োহুড়ি। বুধ ১১.১৫।”
মেসেজটা অন্য দুজনকে ফরোয়ার্ড করে দিল সে। তারা বুঝে নিল কী করতে বলা হচ্ছে! একই মেসেজ গিয়ে পৌঁছোল কলকাতার পটুয়াটোলা লেনে একটি হোটেলের দোতলার ঘরে। সেখানে আজ দিন পনেরো হল দুই ব্যক্তি এসে থাকছে। একই সঙ্গে বেজে উঠল দুজনের মোবাইল। নির্দেশানুসারে পরিকল্পনা ফাঁদতে বসে গেল তারা।
এক সময় ভ্যানের গতি কমে এল। সওয়ারি তিনজন নেমে পড়ল। রাস্তার ধারে হাফ প্যান্ট পরা এক মাঝবয়সি মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। থাকার কথাই ছিল। উনি ভোলাদা, বসিরহাটে ইটিন্ডা রোডের উপর জামাকাপড়ের দোকান চালান।
৩
ভোরের আজানের সুর ভেসে আসতেই জয়ের পাতলা হয়ে আসা ঘুমটা একেবারে বিদায় নিল। জয়ের মতো আরো কুড়িজন ছেলের জন্য এই আজানই ইদানীং অ্যালার্মক্লকের কাজ করছে। এবার বিছানা ছাড়তে হবে এবং চটপট তৈরি হয়ে নিয়ে ছুটতে হবে বিদ্রোহীর মোড়ে, হাইস্কুলের মাঠে। গত পনেরো দিন জয়ের ফুটবল প্র্যাকটিস বন্ধ ছিল শরীর খারাপের জন্য। গতকাল সে আপদ বিদায় হয়েছে। ওফ, প্রাণটা একেবারে হাঁফিয়ে উঠেছিল জয়ের।
ফুটবল ছাড়া জয় আর তার বন্ধুরা জীবনটা ভাবতে পারে না। বিশেষত গত বছর নতুন কোচ রণজয়স্যার আসার পর থেকে ফুটবলকে ওরা আরো ভালোবাসতে শুরু করেছে। আগে খেলাটা ছিল বিকেলের অভ্যেস মাত্র, কিন্তু রণজয়স্যার এখানে অ্যাকাডেমি চালু করার পর থেকে ওঁর ট্রেনিংয়ে ওদের টিমটার পুরো ভোলই বদলে গিয়েছে।
প্রত্যেক বছর পনেরোই আগস্ট হাইস্কুলের মাঠে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা হয়। রণজয়স্যারের কোচিংয়ে জয়রা গত বছর সে টুর্নামেন্টই শুধু জেতেনি, অ্যাকাডেমি চালু হওয়ার পর সেপ্টেম্বরে মালদায় ফ্রেন্ডশিপ কাপ আর পুজোর একেবারে মুখে বহরমপুরে ফাইনালে সেখানকার হোমটিমকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়ে এসেছে। রণজয়স্যার শুধু যে দুর্দান্ত কিছু স্কিল শিখিয়েছেন ওদের তাই নয়, ওদের মানসিকভাবেও অনেক চাঙ্গা করে দিয়েছেন। এত সুন্দর ভোকাল টনিক দেন স্যার, যে জয়দের প্রায় নেশা হয়ে গেছে। কাকভোরে উঠে মাঠে কসরত করতে এক-আধদিন একটু অনিচ্ছা জাগলেও, স্যারের ওই এনার্জেটিক মেজাজটা উপভোগ করার সুযোগ ওরা কেউ হারাতে চায় না।
আজান শেষ হতেই খেলার পোশাকে বেরিয়ে পড়ল জয়। দৌড়োতে দৌড়োতে মাঠে যাওয়ার পথে অশ্বিনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল জয়ের। জয়, অশ্বিন, সৌভিক, নঈম, সরফরাজ, ধীমান, ইসমাইল, রিয়াজুল, জামশেদ, রাজা, আবু আর বাপ্পা হল ওদের টিম প্রভাতী সংঘের প্রথম একাদশ। এছাড়াও আছে রজত, শুভাশিস, ধৃতিমান, মহিম আর শতদ্রু। অশ্বিন হল প্রভাতী সংঘের একেবারে পাকা গোলকিপার। ম্যাচে পারফরমেন্সের ভিত্তিতে কেউ ইন কেউ আউট হয়, কিন্তু অশ্বিনের জায়গা বারপোস্টের নিচে একেবারে সিমেন্ট করা। স্যারও ওর খুব তারিফ করেন। অশ্বিনের ঝাঁপিয়ে পড়ে, ফিস্ট করে নিশ্চিত গোল বাঁচানোর বিভিন্ন ভঙ্গি দেখে স্যার ইদানীং ওকে ইয়াসিন বলে ডাকছেন। জয়রা জানে লেভ ইয়াসিনের কথা। প্রবাদপ্রতিম গোলকিপার। তবে জয়ের আবার অলিভার কান আর ম্যানুয়েল নয়ারকে বেশি পছন্দ। অশ্বিন অসাধারণ সেভ করলেই সে প্রায়ই ‘কান’ ‘কান’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। অশ্বিন অবশ্য ওদের থেকে বছর তিনেকের বড়, কিন্তু চেহারায় সেটা বোঝা যায় না। জয়ের মাঝে মাঝেই মনে হয় ওকে দাদা ডাকা উচিত, কিন্তু অশ্বিন ওসবে কিছু মনে করে না।
ওরা মাঠে পৌঁছে দেখল স্যার হাজির, স্ট্রেচিং করছেন। স্যারের অ্যাথলিটের মতো ছিপছিপে চেহারায় ওঁর কালো জার্সি আর কালচে সবুজ ট্র্যাক প্যান্টটা দারুণ মানায়। ওদের দেখেই একবার রিস্টওয়াচে চোখ রেখে স্যার যেন বুঝিয়ে দিলেন ওরা লেট। ফুটবল মাঠের একটা অদ্ভুত গন্ধ আছে। শুকনো মাটি, আর ঘাসের গন্ধ মিলে একটা পাঁচমেশালি ব্যাপার। আর বৃষ্টি হলে কাদার গন্ধ মিশে ব্যাপারটা আরো কড়া হয়। লম্বা বিরতির পরে মাঠে ফিরেই গন্ধটা পেয়ে মনটা ভরে গেল জয়ের। ওহ, দম যেন বন্ধ হয়ে আসছিল একেবারে।
প্রতিদিনের মতোই জমজমাট প্র্যাকটিস শুরু হল। এক্সারসাইজের পাশপাশি ড্রিবলিং, বল রিসিভিং আর বল সোয়ার্ভ করানোয় মন দিচ্ছিল সবাই। এটা একদম নতুন ব্যাপার ওদের কাছে। স্যার কিন্তু এরই মধ্যে টিমের দুজনকে বল বেঁকিয়ে গোলে ঢোকানোয় বেশ পারদর্শী করে তুলেছেন। বিশেষত সৌভিক তো আজকাল প্রায়ই অশ্বিনকে বিট করে হিউম্যান ওয়ালের উপর দিয়ে বল পাঠিয়ে জালে জড়িয়ে দিচ্ছে। আজ অবশ্য অশ্বিন সম্পূর্ণ অপরাজিত। সৌভিক তো কোন ছার, স্যার পর্যন্ত একবারও বিট করতে পারলেন না ওকে। প্রতিটা সেভের পরেই স্যার তালি দিয়ে ‘সাবাশ ইয়াসিন’ বলে অশ্বিনের তারিফ করছিলেন। আশ্চর্য! অশ্বিনের যেন ফর্মের কোনো নড়াচড়াই নেই। টিমের বাকি প্রায় সবাইকেই কিন্তু অল্পস্বল্প বকা খেতে হল আজ স্যারের কাছে।
এখন অ্যাকাডেমি হওয়ার ফলে সুবিধে হয়েছে, আশপাশের আরো কিছু ক্লাবের ছেলেরা ভর্তি হতে পেরেছে সেখানে আর তাই তাদের সঙ্গে প্র্যাকটিস করতে করতে প্রভাতী সংেঘর ছেলেরা নিজেদের আরো মজবুত করে নিতে পারছে। সাড়ে পাঁচটা থেকে সাতটা অবধি ট্রেনিং সেশন চলে রোজ। তার মধ্যে শেষ আধ ঘণ্টা ভোকাল টনিক। ফুটবল খেলাটাকে যে একটা লড়াই হিসেবে দেখতে হবে সেটা স্যার একটু একটু করে ওদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। জয়ের খুব আক্ষেপ হয় আজকাল। বিকেলে স্যার অ্যাকাডেমির অনেক ছাত্রকে ওঁর ঘরে নানারকম ভিডিও দেখান। প্রতিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতাগুলো কীভাবে নজর করতে হবে, সেগুলো বোঝান ভিডিও দেখিয়ে। কিন্তু বিকেলে প্রাইভেট টিউশনের কারণে স্যারের বাড়িতে ওদের অনেকেরই যাওয়া হয় না। ওরা বেশিরভাগই এবার ক্লাস টেনে উঠেছে তাই অন্যান্য বারের তুলনায় এবার পড়ার চাপ অনেক বেশি। নেহাত ফুটবলটা নেশার মতো, তাই বাবার সঙ্গে রোজ ঝগড়া করে প্র্যাকটিসটা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিটা সে আদায় করে নিয়েছে। এর উপর বিকেলে পড়া বাদ দিয়ে ভিডিও দেখতে গেলে আর দেখতে হবে না। গত পরশু ভূগোলের ক্লাস টেস্টে ধেড়িয়ে আসায় বাবা ইতিমধ্যেই হলুদ কার্ড দেখিয়ে রেখেছে, আর একটু জেদাজেদি করলেই লাল নিশ্চিত।
স্যার অবশ্য জয়, অশ্বিন, সৌভিকদের ভিডিও দেখতে যাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ জোর করেন না। অশ্বিন একবার যেতে চেয়েছিল। স্যার বলেছিলেন ওসব সূক্ষ্ম টেকনিক্যাল ব্যাপার বোঝার আগে বেসিক স্কিলগুলোর উন্নতি করতে হবে। আপাতত ওরা সেটাতেই মন দিক। জয়দের খুব হিংসে হয় আবু, ইসমাইল, জামশেদদের কথা ভেবে। ওদের পড়াশোনার বিশেষ বালাই নেই। পারিবারিক ব্যবসায় ঢুকে গেছে স্কুলে থাকতে থাকতেই, তাই নিয়মিত স্যারের বাড়িতে ভিডিও দেখতে যেতে পারে। জয় বুঝতে পারে ইসমাইলরা ওদের থেকে কনফিডেন্সে অনেক এগিয়ে গেছে ইদানীং। হবেই তো, স্যারের কাছ থেকে কত নতুন জিনিস শিখতে পারছে রোজ। ওদের হাবভাবই আজকাল বদলে গেছে। প্র্যাকটিসের সময় ওদের সঙ্গে কড়া ট্যাকল হলে জয়রা প্রায় ছিটকে পড়ে। তখন ইসমাইল বা রিয়াজুল যেভাবে তাকায়, মাঝে মাঝে বেশ অচেনা লাগে। এমনিতে অবশ্য ওদের বন্ধুত্বে কোনো খাদ নেই। ধীমানের মোবাইলে হামলে পড়ে ট্রিপল এক্স ভিডিও না দেখলে ওদের বাড়ি ফেরার পথটা বড্ড ক্লান্তিকর মনে হয়।
আজ সেশনের একেবারে শেষে স্যার এমন দুটো খবর দিলেন যে ক্লাবের সকলেরই মাথা ঘুরে গেল। এক, মালদার সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা ফ্রেন্ডশিপ কাপ এবার গাজোলে হবে। ফ্রেন্ডশিপ নাম কারণ এটাই একমাত্র প্রতিযোগিতা যেখানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের টিমের পাশাপাশি অংশ নেয় সিকিম এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল এবং বাংলাদেশের একটা করে টিম। এক কথায় আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্ট, দারুণ প্রাইজ মানি দেয়। ফাইনালের দুটো টিম এক নম্বর স্পোর্ট কিটস উপহার পায় খেলার আগে। গত বছর অসাধারণ খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জয়, অশ্বিনরা।
গাজোলের হাইস্কুলের মাঠও বেশ বড়, আর স্যার অ্যাকাডেমি চালু করার পর থেকে মাঠটার বেশ যত্নও করা হয়। তাই বড় মাপের টুর্নামেন্ট হতেই পারে। খবরটা শুনেই মনে মনে হিসেব করে নিচ্ছিল প্রভাতী সংঘের ছেলেরা। স্যার বললেন এবার অ্যাকাডেমির অন্যান্য মেম্বারদের থেকেও প্লেয়ার তুলে টিমটাকে স্ট্রং করার কথা ভাবছেন। নিজেদের এলাকায় টুর্নামেন্ট মানে ইজ্জতের প্রশ্ন। প্র্যাকটিসে জান লড়িয়ে দিতে হবে, মনে মনে বলছিল জয়। কিন্তু এরপর স্যার যেটা বললেন সেটা শুনে আবু, ইসমাইল, জামশেদরা নাচানাচি করতে লাগলেও জয়দের মুখ ভার হল। স্যার ভাইজ্যাগের কোন একটা অ্যাকাডেমির সঙ্গে কথা বলেছেন। এখান থেকে পাঁচ-ছ’ জন সেরা প্লেয়ারকে তিনি দু’ সপ্তাহের জন্য ভাইজাগের অ্যাকাডেমিতে পাঠাবেন আরো উন্নত ট্রেনিংয়ের জন্য। দফায় দফায় পাঁচ-ছয়জন করে যাবে। যাওয়া, থাকা-খাওয়া সবকিছুর ব্যবস্থাই স্যারের অ্যাকাডেমির তরফ থেকে করা হবে। কিন্তু এই দুর্দান্ত সুযোগটা প্রভাতী সংঘের খুব কম ছেলেই নিতে পারবে। এখন নাহয় গরমের ছুটির সময় আসছে, কিন্তু তারপর স্কুল খুললেই প্রি-টেস্ট, টেস্টের টেনশন শুরু হয়ে যাবে। মাধ্যমিকের ভয়ে এমনিতেই কাঁটা হয়ে আছে সব, তার ওপর স্কুল কামাই করে বাইরে ফুটবল ক্যাম্পে যাওয়া! নাহ্, অসম্ভব। জয় যেন দেখতে পেল ওর বাবা চোখ রাঙিয়ে খুব জোরে খেলা শেষের হুইসল বাজাচ্ছেন। পরনে রেফারির কালো জার্সি আর হাফ প্যান্ট।
ব্যাজার মুখে মাঠ ছাড়ছিল জয়, অশ্বিনরা। স্যার সেটা দেখেই বোধহয় ওদের ডাকলেন। অশ্বিনের কাঁধে একটা চাপড় মেরে বললেন, “আরে এত আপসেট হওয়ার কী আছে? অ্যাকাডেমিও থাকবে, তোদের ক্লাবও থাকবে। পরের বছর পাঠাবো তোদের। এখন মন দিয়ে প্র্যাকটিস কর। ফ্রেন্ডশিপ কাপটা গাজোলেই রাখতে হবে কিন্তু।”
কথাটা শুনে জয় খুশি হল, প্রসঙ্গ বদলে বলল, “স্যার পরশু শ্যামলকাকার ছেলের জন্মদিনের পার্টিতে আসছেন তো? খুব মজা হবে।”
শ্যামলকাকা অর্থাৎ শ্যামলেন্দু নস্কর মালদার গাজোলের নামকরা লোক। ব্যবসায়ী মানুষ, বিধানপল্লীতে ঝাঁ চকচকে বাড়ি তাঁর। মালদা তো বটেই, রায়গঞ্জ, শিলিগুড়ি আর ওদিকে বারাসতে কয়েকটা রিয়েল এস্টেট প্রোজেক্ট করছেন। তাছাড়া পুরোনো পৈতৃক ব্যবসা তো আছেই। এলাকায় সবাই তাঁকে রাজার মতো মানে। মানুষ ভালো, বিভিন্ন সামাজিক কাজে সাহায্য দেন। স্থানীয় বিধায়কও শ্যামলকাকাকে খুব সম্মান করে।
স্যার হেসে বললেন, “একবার যেতে তো হবেই। নিজে ফোন করেছিলেন। কিন্তু আমার এক ভাই কদিনের জন্য আসছে এখানে। ওকে নিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে কিনা তাই ভাবছি। বাইরের লোক তো!”
মাঠ থেকে বেরিয়েই বড় রাস্তা। সামনেই বিদ্রোহীর মোড় থেকে চারদিকে রাস্তা চলে গেছে। জয় আর কয়েকজন স্যারকে হাত নেড়ে মোড় থেকে ডান দিকে চলে গেল গার্লস স্কুলের দিকে আর রণজয় রাঙাভিটার দিকে পা বাড়ালেন। অশ্বিনও তাঁর পাশে পাশে হাঁটছে দেখে রণজয় জিজ্ঞেস করলেন, “এদিকে কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
অশ্বিন শুকনো মুখে বলল, “বাস ধরবো স্যার। একটু ঝলঝলিয়া যাব।”
“ঝলঝলিয়া! সে তো অনেক দূর রে, প্রায় স্টেশনের কাছে। ওখানে কী কাজ তোর?”
অশ্বিন কোনো জবাব দিল না, শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে রইল।
“কী রে, কী সমস্যা তোর? বল দেখি। কেমন যেন দেখাচ্ছে তোকে। মাঠেও আজ চুপচাপ ছিলি খুব।”
ভরসা পেয়ে অশ্বিন বলল, “বাড়িতে খুব টানাটানি যাচ্ছে স্যার। বাবা প্রায় দু’ মাস ধরে অসুস্থ। কাজে যেতে পারছে না। সব ছুটি শেষ। এ মাসে মাইনে পায়নি। ঘরে একদম টাকা নেই, এদিকে ডাক্তার কয়েকটা টেস্ট করাতে বলেছে। খরচের ব্যাপার। তাই বাবা বলল ঝলঝলিয়া যেতে। ওখানে বাবার এক বন্ধুর হোটেল আছে। বাবা তাকে বলেছে। কিছু টাকা ধার দেবে। সেটা আনতে যাচ্ছি।”
রণজয় ধমকের সুরে জবাব দিলেন, “সে কথা এতদিন বলিসনি কেন ইডিয়ট? স্কুল, খেলা ফেলে এখন তুই এসব করবি? ঝলঝলিয়া যেতে হবে না। আমার সঙ্গে চল। আমি দিচ্ছি।”
অশ্বিন প্রতিবাদ করে উঠল, “না না স্যার। বাবার ওঁকে বলা আছে। আপনার থেকে নিয়েছি শুনলে বাবা রেগে যাবে। তাছাড়া আপনার থেকে নিলে কীভাবে শোধ করবো? না স্যার, আমি যাই।”
“থাপ্পড় খাবি? কী বললি? বাবা বকবে? ঠিক আছে তুই বাড়ি যা, আমি একটু পরেই যাচ্ছি তোর বাড়ি। দেখি তোর বাবা কেমন বকে। আমি চিনি তোর বাড়ি। যা দৌড়ো, আমি আসছি।”
স্যারের এই ধমকটাকে আর অগ্রাহ্য করতে পারল না অশ্বিন। স্যার ভালো লোক, টাকা ধার দিয়ে রোজ দু’ বেলা ফেরত পাওয়ার জন্য তাগাদা দিতে আসবেন না। গত মাসে পাশের পাড়ার জহরজেঠু মাত্র তিনশো টাকা ধার দিয়ে এত জ্বালিয়েছে যে এবার অনেক কষ্ট সত্ত্বেও বাবা আর ওঁকে বলেনি। স্যার সেরকম করবেন না নিশ্চয়ই।
অশ্বিন দিক পরিবর্তন করে বাড়ির পথ ধরল। রনজয় দেখছিলেন তার মাথা নিচু করে হেঁটে যাওয়াটা। অভাব যে মানুষকে কখন কোন পথে নিয়ে যায়, কেউ বলতে পারে না। আর্থিক টানাটানিই একমাত্র অভাব নয়। অভাবের অনেক রূপ। শিক্ষাদীক্ষার অভাব, চেতনার অভাব, সুস্থ পরিবেশের অভাব, মানুষের থেকে একটু ভালো ব্যবহারের অভাব, তালিকাটা বেশ লম্বা। রণজয় বোঝেন সেসব।
৪
ঢাকায় বাংলাদেশ পুলিশের হেফাজতে ধৃত শাফাকতকে ম্যারাথন জেরা করে এয়ারপোর্টে ফেরার পথে গাড়িতে গম্ভীর মুখে বসেছিলেন ন্যাশনাল অ্যান্টি টেররিস্ট সেল (এনএটিসি)-এর ডিআইজি সুভাষ গোয়েল। দিন পনেরো আগে মেদিনীপুরের ঘাটালে ভয়াবহ বিস্ফোরণের তদন্তভার গত সপ্তাহে এনএটিসির হাতে তুলে দিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। কাজে নেমেই তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন নমুনা দেখে নিশ্চিত হতে পেরেছিলেন, সাধারণ রাজনৈতিক গুন্ডারা ওখানে বাসা বাঁধেনি, ওই বাড়িটা হয়ে উঠেছিল জঙ্গিদের ডেরা।
বিস্ফোরণে যে দুজন মারা গেছে ওই বাড়ির দোতলার ঘরে তাদের কিছু জিনিসপত্র তদন্তকারীরা উদ্ধার করতে পেরেছিল। আধপোড়া সেসব কাগজপত্রের মধ্যে ছিল কয়েকটি আইকার্ড এবং দুজন ব্যক্তিরই ছবি দেওয়া একাধিক আধার কার্ড। তার প্রতিটিতে তাদের পরিচয় আলাদা। সেগুলো যে ভুয়ো তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। পাওয়া গিয়েছে একটি পাসপোর্টও, যেটা প্রমাণ করে মৃতদের একজন বাংলাদেশের নাগরিক, যদিও ঘাটালের ওই বাড়িতে সে আজ থেকে দেড় বছর আগে এসে উঠেছিল নিজেকে কটকের ছেলে পরিচয় দিয়ে। ওই বাড়ির মালিক, যিনি একটু দূরে আরেকটা নতুন বাড়িতে থাকেন এবং কিছু উপরি রোজগারের লোভে ছেলেটিকে দুটো ঘর ভাড়া দিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলে স্থানীয় পুলিশ জেনেছিল তিনি মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীদের থেকে খবর পেতেন যে বাড়িতে অচেনা ছেলেছোকরার আনাগোনা বাড়ছে। সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে তিনি অস্বাভাবিক কিছু দেখেননি। ভাড়াটেটি নিজের নাম বলেছিল সজল, পরিচয় দিয়েছিল খড়গপুরের নামী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র হিসেবে। সজল সেদিন তাঁকে বলে তার দেশ থেকে আরেক বন্ধু আসবে এখানে পড়তে, সেও যদি এই ঘরটায় থাকার অনুমতি পায় তাহলে ভাড়াটা ভাগ হয়ে গিয়ে দুজনেরই সুবিধে হয়। বাড়িওয়ালা রবি সামন্ত আপত্তি করেননি। দ্বিতীয় যে চরিত্রটি এসেছিল, সে বাড়ির বাইরে বেরতো খুব কম। পাড়ার লোকের মনে একটু একটু সন্দেহ জাগতে শুরু করেছিল কলেজ ছাত্র কলেজ যায় না কেন, সেই ব্যাপারে। রবি সামন্তের সঙ্গে একবারই সজল তার পরিচয় করিয়েছিল মাস চারেক আগে। সে তার নাম বলেছিল শুভদীপ। তার আসল নাম কী, এখনও সেটা ধরা যায়নি কারণ সব মিলিয়ে জাল আধার কার্ডের সংখ্যা সাত। তবে নিজেকে যে সজল বলেছিল, পাসপোর্ট বলছে তার আসল পরিচয় আবু আনসার।
ঘাটালের ওই বিধ্বস্ত বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা আরো কিছু নমুনা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী ‘রিবাত’-এর যোগাযোগের। পশ্চিমবঙ্গ এবং তার লাগোয়া কয়েকটি রাজ্যে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের জন্য মডিউল গড়ে তোলার কাজ চালাচ্ছে জঙ্গিগোষ্ঠী রিবাত। ইনটেলিজেন্সের লোকেরা অনেকদিন ধরেই সেই সন্দেহ করছে। সন্দেহটা যে নিতান্তই অমূলক নয় ঘাটালের ঘটনা সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এরা এত বাড়তে পারছে স্থানীয় প্রশাসনের ঔদাসীন্যে। ইনটেলিজেন্স ইনপুট পৌঁছে গেলেও থানাগুলো আমল দেয় না। তাদের এই গাছাড়া মনোভাবের পিছনে শুধুই যে আলসেমি আছে তা নয়। আছে আরো ঘৃণ্য জিনিস— ভোটব্যাংক পলিটিক্স।
ঘাটালের ঘটনায় স্থানীয় মানুষদের বয়ানের ভিত্তিতে আশপাশ থেকে কয়েকজন সন্দেহভাজন যুবককে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। এনএটিসির গোয়েন্দারা তাদের জেরা করে জানতে পেরেছেন খুব সূক্ষ্মভাবে তাদের মগজধোলাইয়ের কাজটা চালাচ্ছিল আবু আনসার এবং তার সহযোগী। জেহাদের তত্ত্ব একটু একটু করে ঢুকিয়ে দিচ্ছিল তাদের মাথায়। ধৃতেরা জানিয়েছে সেই সহযোগী নিজেকে রিয়াজ বলে পরিচয় দিয়েছিল। এত কিছু ঘটছিল চোখের সামনে অথচ স্থানীয় পুলিশ কিছুই জানতে পারেনি এতদিনে, এটা অবাস্তব। আসলে জানলেও তাদের কিছু করার নেই। তাদের বলা আছে চোখ বুজে থাকতে। অথচ তাদের এই অপদার্থতা আর মেরুদণ্ডহীনতার জন্য সমগ্র ফোর্সের পাশাপাশি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গালমন্দ খাচ্ছে আজ।
গত সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশের হাতে রিবাতের অন্যতম বড় মাথা শাফাকত ধরা পড়ে। খবর পেয়ে এনএটিসির একটি তদন্তকারী দল নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন সুভাষ গোয়েল। ঘাটাল থেকে গোয়েন্দাদের হাতে আসা তথ্যপ্রমাণ বলছে এই মডিউলটার সঙ্গেও শাফাকতের গভীর যোগাযোগ ছিল, কিন্তু পাঁচ ঘণ্টার জেরার পরেও তেমন কিছু নতুন তথ্য তার কাছে থেকে বের করতে পারেননি গোয়েল ও তাঁর দলবল। বরং মাঝে মাঝেই হুংকারের সুরে সে বলেছে গোটা এশিয়ায় রিবাতের সৈনিকেরা ছড়িয়ে পড়েছে এবং খুব শীঘ্রই ভারতবর্ষের পূর্ব দিকে এক কম্পন সৃষ্টি করে গোটা দেশকে এক বড় বার্তা দেবে দলের কমান্ডারেরা। শাফাকতকে সুভাষ গোয়েল জিজ্ঞেস করেছিলেন রিবাতের কমান্ডার-ইন-চিফ ইখলাস রুবেলের বর্তমান অবস্থান সম্বন্ধে। জবাব যে সে দেবে না সে ব্যাপারে সুভাষ নিশ্চিতই ছিলেন, কিন্তু তাঁকে চমকে দিয়ে শাফাকত জানিয়েছে ইখলাস রুবেলের গতিবিধির কোনো খবর কারোর কাছে থাকে না। সে প্রয়োজনে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেয়। কিন্তু তার নাগাল কেউ পায় না।
শাফাকতকে দেশে নিয়ে গিয়ে জেরা করা প্রয়োজন, কিন্তু যতক্ষণ না তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে পারছে এনএটিসি, ততদিন সেটা সম্ভব নয়। সবে তদন্ত শুরু করেছে সংস্থা, এত তাড়াহুড়ো করে চার্জশিট দিলে পরে হিতে বিপরীত হতে পারে। এনএটিসি’র কাছে খবর ছিল বছর দুয়েক আগে বীরভূমে যে অস্ত্র কারখানার হদিশ পাওয়া গিয়েছিল তার পিছনেও এই শাফাকতেরই মাথা ছিল। সেই থেকেই সংস্থার নজরে ছিল শাফাকত। হঠাৎই বাংলাদেশ পুলিশের হাতে অন্য একটি মামলায় তার ধরা পড়ে যাওয়াটা একটা প্রাইজ ক্যাচ হতে পারে এনএটিসি’র জন্য। কিন্তু চার্জশিট তৈরি হতে হতে সে যদি এখানে জামিন পেয়ে যায় তাহলে আজকের পরিশ্রমটা জলে যাবে।
প্লেনের উইন্ডো সিট থেকে সামনে মেঘের দেশের সৌন্দর্য দেখছিলেন বটে সুভাষ, কিন্তু সে দৃশ্য তাঁকে মোটেই রোমাঞ্চিত করছিল না। তাঁর মস্তিষ্কেও এই মুহূর্তে ঘন মেঘের আনাগোনা। বারবার তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে শাফাকতের ভাবলেশহীন মুখ আর ঠান্ডা দৃষ্টিটা। সে আজ প্রায় হুমকির সুরে বলেছে খুব শীঘ্রই নেক্সট টার্গেটকে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে হত্যা করবে রিবাতের সেনারা এবং তারপরে আরো বড় ধাক্কা দিয়ে ইন্ডিয়ার সরকারকে একটা বার্তা দেবে। চিন্তার ভাঁজ পড়ছে ডিআইজি গোয়েলের কপালে। কে হতে পারে টার্গেট? বড় ধাক্কা বলতেই বিস্ফোরণের কথা মনে হয়। ঘাটালের বাড়িটাতেও বিস্ফোরক বোঝাই করা ছিল। কিন্তু কোথায় তারা সেই নাশকতা ঘটানোর কথা ভাবছে, নানারকম চাপ সৃষ্টি করেও শাফাকতের থেকে সে ব্যাপারে কোনো রকম ইঙ্গিত পায়নি গোয়েন্দারা আজ। শারীরিক অত্যাচারকে এই ধরনের জঙ্গিরা এমনভাবে জয় করে নিয়েছে যে ওই কৌশল এখন আর কাজ করে না।
কিন্তু একটা হত্যার নিশানা স্থির করা হয়েছে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার উপর আক্রমণ ধেয়ে আসবে এটা জেনেও যদি তাকে রক্ষা না করা যায় তাহলে এনএটিসি’র মতো সংস্থার যোগ্যতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তার চেয়েও বড় বিড়ম্বনা হয়তো অপেক্ষা করে আছে এনএটিসি’র জন্য। আজ জেরার মুখে যেভাবে যেচে শাফাকত ভারতে রিবাতের নতুন টার্গেট সেট হয়ে যাওয়ার কথা বলেছে তাতে একটা চ্যালেঞ্জের গন্ধ ছিল। বাংলাদেশ পুলিশের বড়কর্তাদের উপস্থিতিতে সে কথাটি বলেছে এবং ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে প্লেনে চড়ার আগে গোয়েল খবর পেয়েছেন যে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এক পুলিশকর্তা বাইট দিতে গিয়ে সেকথা ফাঁস করে দিয়েছেন। সুতরাং অঘটন যদি একটা ঘটে তখন প্রশ্ন উঠবে অভিযুক্তকে জেরা করে তথ্য পেয়েও এনএটিসি’র গোয়েন্দারা নাশকতার ছক বানচাল করতে ব্যর্থ হলেন কেন?
আর অল্প কিছুদিন পরেই কলকাতায় বিধাননগরে এনএটিসি’র নতুন ভবনের উদ্বোধন করতে আসবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং। তার আশপাশ দিয়ে যদি কোনো বড় নাশকতার ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে মুখ পুড়বে সরকারেরও। ২০০৮ সালে মুম্বইতে পৃথিবী কাঁপানো জঙ্গিহানার পর দেশের সর্বত্র সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ রুখতে গড়া হয়েছিল ন্যাশনাল অ্যান্টি টেররিস্ট সেল। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন ঘটনায় সংস্থা অসাধারণ সাফল্য যেমন পেয়েছে, তেমন ব্যর্থতার জন্য ধিক্কারও কম জোটেনি। তবু ২০১৪-এর অক্টোবরে সিমলার এক হোটেল থেকে কুখ্যাত লশকর জঙ্গি আক্রমুল হকের গ্রেফতার এনএটিসি’র এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় সাফল্য। উত্তর ভারতে তীর্থযাত্রীদের উপর একটা বড় ধরনের নাশকতার ছক বানচাল করে দেওয়া গিয়েছিল আক্রামুলকে গ্রেফতার করতে পারায়। সেই অপারেশনও লিড করেছিলেন গোয়েল।
সেই তিনিই শাফাকতের মতো জঙ্গিনেতা ধরা পড়া মাত্র তড়িঘড়ি ঢাকায় গিয়ে তাকে জেরা করে আসার পরেও রিবাতের পরবর্তী টার্গেট কে, সেটা বের করতে পারলেন না, এটা ভেবেই নিজের কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছেন এনএটিসি’র ডিআইজি। দুটো কেসের মধ্যে ফারাক গড়ে দিয়েছে হেফাজতের ঠিকানার চরিত্র। আক্রামুল ধরা পড়েছিল ভারতে, সুতরাং তাকে নিজেদের মতো করে বিভিন্ন কৌশল খাটিয়ে জেরা করতে পেরেছিলেন গোয়েলরা। শাফাকত ধরা পড়েছে বিদেশের পুলিশের হাতে, তাও অন্য একটি মামলায়। সেখানে জোর খাটানোর সুযোগ কম।
হাজার হাজার ফুট উচ্চতা থেকে একটু আগে চালের দানার মতো দেখাচ্ছিল যে বাড়িঘরগুলোকে, সেগুলো আকারে বাড়তে শুরু করেছে। প্রস্তুত হয়ে নিলেন সুভাষ গোয়েল। তদন্তকারী দলের বাকি সদস্যরা কলকাতায় নেমেই কানেক্টেড ফ্লাইট ধরে দিল্লি ফিরে যাবেন, কিন্তু তিনি শহরেই থেকে যাবেন এই বেলাটা। বিধাননগরে এনএটিসি’র অফিসে কিছু কাজ আছে তাঁর। কথা বলা দরকার সংস্থার নিজস্ব এবং কয়েকজন আইবি’র সোর্সদের সঙ্গে।
