৫
ট্রেন ‘গৌড় মালদা’ স্টেশন ছাড়াতেই দীপেশের ছটফটানি বাড়তে শুরু করল। আর মেরেকেটে মিনিট দশেক, তারপরেই মালদা টাউন। উফ, মাসখানেকের জন্য শান্তি। বাবা বলেছিলেন আজ রাতের পদাতিকে এসি থ্রি টায়ারে টিকিট করে দেওয়ার কথা, যাতে গরমে কষ্ট না হয়, কিন্তু সে পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করতে রাজি হয়নি। গতকালের গৌড়ে তৎকাল কোটায় টিকিট পেয়ে যাওয়ায় দীপেশ আর বাবাকে বিশেষ ভাবনাচিন্তার সুযোগ দেয়নি।
স্লিপার কামরা বলে বেশ গরম লেগেছে বটে কিন্তু মাসির বাড়িতে কটা দিন ব্যাপক কাটবে, সেই আনন্দে মশগুল হয়ে থাকায় কষ্টটা আর গায়ে মাখেনি দীপেশ। তবে সারা রাত সে বন্ধু পল্টুর খেয়াল রেখেছে। আঙ্কেল খুব দুশ্চিন্তা করছিলেন বড় কোনো সঙ্গী ছাড়া ওদের দুজনের এভাবে এতদূর যাওয়ার ব্যাপারে। জেনারেল কামরায় হলেও ট্রেনে থাকতে চেয়েছিলেন। দীপেশই তাঁকে ভরসা দিয়েছে। ক্লাস নাইন হলেও গত এক বছরে দু’ বার সে একা কলকাতা থেকে মালদা গেছে ও ফিরেছে। এবার অবশ্য ওরা একজন পরিচিতকে পেয়ে গেছে ট্রেনে। সুমনাদি। দীপেশের মাসতুতো দাদা রাজার বন্ধু জয়দার আপন দিদি সে। সুমনাদি এলাকায় নানারকম সামাজিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত। একবার গরমের ছুটিতে গাজোলে গিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেছিল দীপেশ। সেই অনুষ্ঠানেরও সব ব্যবস্থা সুমনাদি আর তার দলবলই করেছিল। গত বছর কারা যেন অ্যাসিড ছুড়ে দিদির মুখটা নষ্ট করে দিয়েছিল। তারপর দু’ বার মাসির বাড়ি গিয়ে আর তাকে আর এলাকায় দেখেনি দীপেশ। তাই গতকাল রাত্রে যখন ট্রেনে সুমনাদি কথা বলতে আসে, দীপেশ গোড়ায় চিনতে পারেনি। তারপর অবশ্য অনেকবার দিদি উঠে এসে এসে ওদের খোঁজ নিয়ে গেছে।
দীপেশের মা নেই, বাবা বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থাকেন কাজে, তাই বেশ ছোটবেলা থেকেই ছুটির পাকা ঠিকানা তার মাসির বাড়ি। মাসিরা থাকে গাজোলের কাছে, রাঙাভিটায়। সেখানে রাজাদার সাইকেলে চেপে এদিকওদিক চলে যায় সে। একবার তো হিলি বর্ডার অবধি গিয়েছিল। মাঝে কেবলমাত্র একটা রেললাইন আর তার ওপারেই অন্য দেশ শুরু হয়ে যাচ্ছে, এটা ভেবে বেশ অবাক লেগেছিল তার। রাজা খবর দিয়েছে সে নতুন বাইক কিনেছে, কাজেই মজাটাও এবার দ্বিগুণ হবে ভেবে ভিতরে ভিতরে ফুটছে দীপেশ।
বাঙ্ক থেমে নেমে আপার বার্থে পাশ ফিরে শোওয়া পল্টুকে ডাকতেই সে ঘাড় ফেরাল। দীপেশ ভেবেছিল তার বন্ধু এখনও ঘুমিয়ে আছে, এদিকে নামার সময় হল। কিন্তু পল্টুর চাহনিতেই সে বুঝতে পারল ব্যাটা অনেকক্ষণ ধরেই জেগে আছে। সেদিন ডাক্তারবাবু একটা হালকা ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন। সেটা খাওয়ার পর থেকে পল্টু ভালোই আছে, তবে ঘুমটা রোজ সকাল সকালই ভাঙে। বন্ধুর ইশারা পেয়েই লাফ দিয়ে নিচে নেমে এল সে। পিঠের ব্যাগ থেকে টুথপেস্ট আর ব্রাশ বের করে নিল। দীপেশ খ্যাচখ্যাচ করে উঠেছিল এখন ব্রাশ করতে গেলে লেট হয়ে যাবে বলে, কিন্তু পল্টু সেকথা শুনল না। এই ক’ মাসে হোমের সব নিয়ম তার মনের মধ্যে একেবারে গেঁথে গেছে। কাজ সেরে জায়গার জিনিস যখন জায়গায় রাখছে সে, টের পেল ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। দীপেশের মেসো পেশায় উকিল। ওঁর এক অ্যাসিস্ট্যান্ট আছেন। নাম অতনু। গতকাল শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ছাড়ামাত্র মেসোকে জানিয়েছিল সে। তিনি তখনই বলে দিয়েছিলেন স্টেশনে অতনুদা থাকবে। প্ল্যাটফর্মে নেমেই তাই দীপেশ এদিকওদিক খুঁজতে লাগল। স্টেশনের গেটের কাছে যখন পৌঁছেছে তখন দেখল গাড়ি থেকে নেমে অতনুদা হন্তদন্ত হয়ে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। দীপেশ তাকে দেখেই হাত নাড়ল।
অতনুদা এগিয়ে এসে ওদের ব্যাগগুলো নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “কী কাণ্ড, রথবাড়ির মোড়ের কাছে লরি উলটে বিশাল জ্যাম! স্যার একটু আগে ফোন করে বললেন তুমি এখনও পৌঁছওনি! নেটে কারেন্ট স্ট্যাটাস বলছে ট্রেন ঢুকে গেছে মালদা।”
মেসোর নতুন কেনা হুন্ডাই ইয়ন গাড়িটায় এই প্রথম চড়ল দীপেশ। এটার ছবি সে দেখেছে ফেসবুকে; রাজাদা পোস্ট করেছিল। দিব্যি গাড়ি, বেশ আরামের। পল্টুকে আগে বসতে দিয়ে তারপর বসল সে। তারপর হুকুম দিল, “অতনুদা, এসিটা চালিয়ে দাও না, ট্রেনে সারারাত গরমে ঘুমোতে পারিনি।” দীপেশ সুমনাদিকেও গাড়িতে চলে আসতে বলেছিল, কিন্তু সে রাজি হল না।
অচেনা জায়গা, অচেনা মানুষের মধ্যে এসে পড়লে পল্টু চুপচাপ হয়ে যায়। গরমে আপার বাঙ্কে তার গতকাল সারারাত খুব কষ্ট হয়েছে। গাড়ির ভিতরেও তার দমবন্ধ লাগছিল, কিন্তু জানালার কাচ নামিয়ে দেওয়ার কথা বলতে সাহস করছিল না। দীপেশ এসি চালাতে বলায় সে স্বস্তি পেল। মালদা স্টেশন থেকে রাঙাভিটা অনেকটা পথ, কিন্তু সবে দিনের শুরু আর তার উপর হাইওয়ে, তাই গাড়ি যেন উড়ে উড়ে চলছিল। আশপাশ দেখতে দেখতে পল্টুর মনটা ভালো লাগছিল। বিরামপুরে তার বাড়ির আশেপাশে কত খোলা জায়গা, মাঠ, পুকুরপাড়। কলকাতায় তার হোমের গায়েও একটা মাঠ আছে বটে, কিন্তু চারপাশে তাকালে কেবলই উঁচু উঁচু বাড়ি ছাড়া কিছু চোখে পড়ে না। অনেকদিন বাদে আবার রাস্তার দু’ ধারে খোলা জমি, গাছগাছালি দেখতে দেখতে বাড়ির কথা মনে পড়ছিল তার। দীপেশ বলেছে রাজাদার বাইকে চেপে তাকে হিলি বর্ডার নিয়ে যাবে। রেললাইনের এপার থেকে নিজের দেশকে দেখতে পাবে, এটা ভেবেই পল্টুর মনের ভিতরটা কেমন করে উঠছে মায়ের জন্য। ইস, বর্ডারে যে পুলিশের পোশাকের লোকগুলো পাহারা দেয়, তারা যদি একবার ওপারে যেতে দিত, এক ছুটে বাড়ি গিয়ে মাকে একবার দেখে আসত, ভাবছিল পল্টু।
এখন পৌনে সাতটা। মা এখন উঠোনে উনুন ধরিয়ে ভাত চাপাচ্ছে। বাবা যদি আগামীকাল পৌঁছে যায় বাড়ি, তাহলে এই সময় বাগানে ফুলের গাছগুলোতে জল দেবে। কতরকম ফুল যে ফোটে ওদের উঠোনের বাগানে বছরভর। শীতকালে তো কথাই নেই। পুরো উঠোনটা রঙিন হয়ে ওঠে। পল্টুর স্কুল কাছেই ছিল, তাই বাড়ি থেকে বেরোতে খুব দেরি না হলে সে হেঁটেই যাতায়াত করতো। বিকেলে কোনো রকমে বাড়িতে ব্যাগখানা নামিয়ে রেখেই মাঠে ছুট। মাটির তাল দিয়ে মূর্তি গড়ার জন্য তাকে নিয়ে এত মাতামাতি। এমনকী সেই কারণে আজ তাকে ঘর ছেড়ে অন্য দেশে এসে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু পল্টুর ফুটবলে পারদর্শিতার কথা কেউ বলে না। চমৎকার খেলতো সে। এখনও হোমের মাঠে তার পায়ে একবার বল পড়লে অপনেন্টের প্লেয়ারদের ঘাম ছুটে যায়। চারপাশে এত সবুজ দেখে টিভির সিনেমার মতো পরপর অনেক ছবি মনে পড়ে যাচ্ছে পল্টুর। দীপেশের কাছে পল্টু ওর দাদা রাজার কথা শুনেছে। রাজাও ফুটবল খেলে। পল্টুর ভেবে আনন্দ হচ্ছে যে সেও ওদের সঙ্গে মাঠে নামতে পারবে।
রাঙাভিটা পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। দীপেশের মাসির বাড়ির দরজায় মেসো আর রাজাদা দাঁড়িয়েই ছিল ওদের জন্য। রাজা দৌড়ে এল গাড়ির কাছে। পল্টুকে দেখে মেসো প্রবুদ্ধ সরকার বললেন, “এই তাহলে পীযূষ! ওয়েলকাম টু মালদা। তোমার গল্প অনেক শুনেছি তোমার রুমমেটের কাছে। এবার তোমার থেকে শুনব, যাকে বলে স্ট্রেইট ফ্রম দ্য হর্সেস মাউথ। এসো।”
সুমনা ভেবে রেখেছিল কলকাতায় তার জরুরি কাজের রিপোর্টটা সঙ্গীদের দিয়ে তবে কাজে বেরোবে, কিন্তু রথবাড়ি মোড়ে অ্যাক্সিডেন্টের ফলে গাজোলের বাস ছাড়তে বেশ দেরি হল। মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল সুমনার কিন্তু ঠান্ডা একটা বাতাস এসে তার মেজাজটা যেন একেবারে বদলে দিয়ে গেল। এমনিতেই উত্তরবঙ্গে মে মাসে সেরকম গা জ্বালানো গরম পড়ে না। কলকাতায় গত দু’ দিনে তার ত্রাহি মধুসুদন অবস্থা হয়েছিল। তার উপর গতকাল সন্ধ্যায় এখানে বেশ এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ছাড়ার সময়ে বাবাকে জানিয়েছিল সুমনা, বৃষ্টির খবরটা তিনিই তখন দেন।
শিয়ালদহ স্টেশন থেকে একখানা পত্রিকা কিনেছিল সে। তাতে মালালা ইউসুফযাইকে নিয়ে একটা প্রতিবেদন আছে। ট্রেনে তার কুপে এক বৃদ্ধ দম্পতি ছিল। তাদের অসুবিধের কথা ভেবে আর আলো জ্বেলে রাখেনি সুমনা, তাই লেখাটা পড়াও হয়নি। সে বাসের সিটে বেশ গুছিয়ে বসে সঙ্গের ছোট সাইডব্যাগটা থেকে পত্রিকাটা বের করে নিল। বিদ্রোহীর মোড়ে যখন বাস থামল, মালালার কাহিনি সুমনাকে প্রায় আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। টোটোয় চেপে বাড়ির পথে যেতে যেতেও ওই অসাধারণ চরিত্রটার সম্বন্ধেই ভাবছিল। ঘোর কাটল গার্লস স্কুলের কাছাকাছি পৌঁছে। সামনে বেশ ভিড়, একটা হইচই চলছে কিছু নিয়ে। সুমনা অনুমান করতে পারল স্কুলেই কিছু হয়েছে কারণ বেশ কিছু পুরুষ, মহিলা ব্যস্তভাবে স্কুলের গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকছেন, আবার অনেকে বেরিয়ে আসছেন। এঁরা নিশ্চয়ই ছাত্রীদের অভিভাবক হবেন।
আরেকটু এগিয়ে টোটো দাঁড়িয়ে পড়ল কারণ এই উত্তেজনাময় জটলা ভেদ করে যাওয়া সম্ভব নয়। সুমনা নামল টোটো থেকে। জানা দরকার বৃত্তান্তটা। রাস্তার ধারেই মধুকাকার বিড়ির দোকান। সুমনাকে প্রশ্ন করতে হল না, তাকে এগিয়ে আসতে দেখেই মধুকাকা বলে উঠল, “কী কাণ্ড জানিস! কেলাস সেভেনের একটা মেয়েকে নাকি কল্যাণস্যার বাথরুমে নিয়ে গিয়ে কী করেছে।” কী করেছে তা সুমনা আন্দাজ করতে পারল। এই স্কুলের বেশ কিছু মেয়ে তার কাছে পড়তে আসে। তাদের কাছে নতুন জয়েন করা এই কল্যাণস্যার সম্বন্ধে বেশ কিছু গল্প শুনেছে সে। মটকা গরম হয়ে যায় তার এসব শুনলে। যারা গল্প করেছে তাদের মায়েদের সুমনা বলেছে স্কুলকে জানাতে। তারা গা করেননি। আজ বোধহয় মাত্রাটা ছাড়িয়ে গেছে, তাই প্রতিবাদ ফেটে বেরিয়ে এসেছে। মানুষের এই দোষ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকতে থাকতে তারা প্রতিবাদে গর্জে ওঠে না, ফলে পরে মাসুলটা দিতে হয় বেশি। সুমনা তার নিজের জীবন দিয়ে এই সত্য উপলব্ধি করেছে। সেও তো অনেকটা সময় চুপ করেই থেকেছে। না থেকে আগেই ঘুরে দাঁড়ালে হয়তো…
মিনিট দশেক পরে ভিড়ের মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠল কারণ থানার দিক থেকে তিনজন খাকি উর্দিধারী পুলিশকর্মী এগিয়ে আসছেন। তাঁদের একজন গাজোল থানার এসআই প্রতীক সেন। সুমনা দোকানের সামনে থেকে সরে এসে রাস্তার মাঝে দাঁড়াল। খাকি পোশাকের ওই মানুষটা তার কাছে ভগবান। যদিও এখন তিনি এখানে গুরুতর কাজে আসছেন তবু সামনে উপস্থিত থেকেও একবার নিজের মুখটা প্রতীকবাবুকে না দেখানোর স্পর্ধা সুমনার পক্ষে দেখানো সম্ভব নয়। এই মুখ অবশ্য আর দেখানোর যোগ্য নেই আজ বছর দেড়েক হল। সুমনার বাড়ি মশালদিঘিতে। আরেকটু ভিতরে ফতেপুর। সেখানকার এক যুবক দীর্ঘদিন ধরে তাকে উত্যক্ত করছিল। লুচ্চা লাফাঙ্গাদের সুমনা কোনোকালেই পাত্তা দেয়নি। স্কুলে পড়াকালীনও প্রচুর ছেলে ঝোলাঝুলি করেছে, সে ফিরেও তাকায়নি। রূপের দেমাগ ছিল একটু, আর সেটা থাকাও স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু ফতেপুরের এই রোমিওর মতো বেপরোয়া, বেয়াদপ সে দেখেনি। সে যেখানে যেত, লোফারটা বড়লোক বাপের দেওয়া উপহার রয়্যাল এনফিল্ডে চেপে ধাওয়া করতো। সেই অবধি সুমনা চুপ করে ছিল, কিন্তু তার ওড়নায় যেদিন টান দিয়েছিল সে সন্ধের অন্ধকারে, সেদিন আর গর্জে উঠতে দ্বিধা করেনি। নরম অথচ দৃঢ় হাতের থাপ্পড় আছড়ে পড়েছিল লুচ্চাটার গালে। কটমট করে চেয়েছিল সে। সুমনা জানত, এর জবাব তাকে পেতে হবে, কিন্তু থাপ্পড়ের জবাব যে গেলাস ভর্তি অ্যাসিড হয়ে আসবে, তা সে ভাবেনি। বিদ্রোহীর মোড়ের কাছেই দিনেদুপুরে সুমনার রূপের অহঙ্কার তীব্র যন্ত্রণার সঙ্গে মিলেমিশে আছড়ে পড়েছিল পিচঢালা রাস্তায়।
কুকীর্তিটা যে করেছিল তার বাপ ছিল তস্য গুণধর। এলাকায় প্রভাব ছিল বেশ তাই পুলিশে রিপোর্ট করা সত্ত্বেও সে ধরা পড়েনি। তার রয়্যাল এনফিল্ড সদর্পে ঘুরে বেরিয়েছে গোটা গাজোল, তবু সেই অপরাধী পুলিশের খাতায় ফেরারই থেকে গিয়েছে প্রায় আট মাস। পরিস্থিতি বদলায় প্রতীকবাবু গাজোল থানায় বদলি হয়ে আসার পর। সুমনার বাবা নতুন করে তাঁর কাছে সুবিচারের আশায় গিয়েছিলেন। সঙ্গে সুমনাও ছিল। দেখেছিল এক প্রতিবাদী পুরুষের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠতে। আটচল্লিশ ঘণ্টাও লাগেনি এতদিনের ফেরারকে কলার ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে লকআপে পুরতে। সুমনা কখনোই লড়াই থেকে সরেনি, কিন্তু অপরাধী ধরা না পড়লে তার লড়াই কোনো জায়গা পেত না। এখন কোর্টে কেস চলছে।
প্রতীকবাবু দুজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বেশ দ্রুত এগিয়ে আসছিলেন, সুমনাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন। প্রশ্ন করলেন, “কলকাতা গেছ শুনছিলাম। কাজ হল?”
“হ্যাঁ স্যার, খুব ভালো কাজ হয়েছে। উনি আসবেন বলেছেন।”
“বাহ, ভালো খবর,” বলে প্রতীকবাবু ইতিমধ্যেই তাঁকে ঘিরে ধরা অভিভাবকদের সঙ্গে স্কুলের গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। শক্তপোক্ত চেহারা, মোটা গোঁফের এই তরুণ পুলিশ অফিসার অল্প সময়েই এলাকায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তাঁর কাজের জন্য। লোকটাকে দেখলেই কেমন যেন ভরসা পাওয়া যায়।
৬
ঢাকা নিউ মার্কেট থেকে সামান্য দূরে গোপন ডেরায় বসে ইন্ডিয়ার এনএটিসি টিমের শাফাকতকে জেরা করার খবর মন দিয়ে দেখছিল পাঁচজন। ঝাঁ চকচকে জামদানি শাড়ির বিপণীর স্টকরুমের কোনা দিয়ে একটা সরু সিঁড়ি উঠে গিয়েছে কয়েক ধাপ। তার পরেই মোটা প্লাই পেতে তৈরি করা মেঝের উপর বসে আছে ওরা। ছোট্ট টিভি সেটে খবর চলছে লো ভলিউমে। বাইরের কারোর পক্ষে অনুমান করাই কঠিন শাড়ির ব্যবসার আড়ালে এখানে অন্য কিছু চলছে।
ঘাটালের বিস্ফোরণ এবং তার ঠিক পরেই শাফাকতের এভাবে এনএটিসি’র জেরার সামনে পড়া তাদের সযত্নে আঁকা নীল নকশাটাকে একেবারে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। শরীর জ্বলে যাচ্ছে ওদের। এমন বিস্ফোরণ তো আকছারই হয় ওপারে। বীরভূমে তো এই ঘটনা খোলামকুচি। পুলিশ দায়সারা ভাবে তদন্ত চালায়। ঘাটালের ঘটনাতে ওদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এতো তৎপর হয়ে এনএটিসি’র মতো ভারি সংস্থাকে তদন্তভার দিয়ে দেবে, এটাও অপ্রত্যাশিত।
যে কাজে তারা নেমেছে, তাতে সাবধানতা বজায় রাখতে হচ্ছে পদে পদে, কিন্তু পরপর দুটো ধাক্কার ফলে সেটা আরো বাড়াতে হবে। দলের অন্যতম কমান্ডার ইখলাস রুবেল অবশ্য ইতিমধ্যেই ওদের মাথা ঠান্ডা রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। সে জানিয়েছে এনএটিসিকে কড়া জবাবের একটা বড় প্ল্যান সে ইতিমধ্যেই ছকতে শুরু করেছে। এনএটিসি’র নাকের ডগায় এমন একটা ঘটনা সে ঘটাতে চায় যা ওই গোয়েন্দা সংস্থার ধারণারও বাইরে। তবু ওরা ভিতরে ভিতরে ছটফট করছে। আবু আনসারের মতো দক্ষ সৈনিককে হারানো একটা বড় ধাক্কা আর তার পরিচয় গোয়েন্দাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়া আরো বড় ক্ষতি। ওরা জানে যে বিস্ফোরণটাকে দুর্ঘটনা বলে এখনও মনে করছে ওদেশের সরকারি গোয়েন্দারা তা আসলে ইচ্ছাকৃতভাবেই ঘটানো হয়েছে। সম্ভবত আনসার আঁচ করতে পেরেছিল সে ওপারের ইনটেলিজেন্সের খোচরদের নজরে পড়ে গেছে। এরকম পরিস্থিতিতে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে সুরক্ষিত রাখতে কমান্ডারদের আত্মাহুতি দেওয়ারই নির্দেশ আছে।
ওপারে পঞ্চায়েত নির্বাচন এগিয়ে আসছে তাই ইনটেলিজেন্সের নজরদারি বেড়েছে এবং তারই ফলে আনসার ধরা পড়ে গেছে, এটা এখন পরিষ্কার। সেই কারণেই সম্ভবত এনএটিসি এত দ্রুত ময়দানে নেমে পড়েছে। কিন্তু রিবাত তা বলে গুটিয়ে থাকবে না। কাঁটার জবাবে কাঁটা ফুঁড়তে হবে। একটা বড় আঘাত হানতে হবে। কীভাবে সেটা হবে, ইখলাস রুবেল কী পরিকল্পনা করছে, টিভির পর্দায় চোখ রেখে সেসবই ভাবছিল ওই পাঁচজনের একজন।
ওর নাম ইজাজ। যে লড়াইয়ের শপথ ইজাজরা নিয়েছে, তাতে পদে পদে বিপদের হাতছানি আছে, তবু ভয় পেলে চলবে না। ওদের এই মানসিকতা একদিনে তৈরি হয়নি। প্রথম যখন দলে যোগ দেয়, দলের দর্শন, পরিকল্পনা শুনে ওরা শিউরে উঠতো। প্রথম ট্রেনিংয়ে গিয়ে যখন মালমশলা দিয়ে বিস্ফোরক তৈরি করতে শিখেছিল, বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দ শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু সেই বিস্ফোরকের সশব্দ অভিঘাত ওদের মনে এক অদ্ভুত উল্লাস সৃষ্টি করেছিল। জীবনটার মানেই যেন বদলে যাচ্ছিল খুব দ্রুত। প্রথম প্রথম মনে হতো মাথার মধ্যে কোনো অজানা শক্তি বাসা বেঁধেছে, সেই-ই নানারকম কুকর্ম করিয়ে নিচ্ছে ওদের দিয়ে। তখন দুঃস্বপ্ন দেখে প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেত ওদের। এখন কিছু হয়না। গত মাসে রাজশাহীর ব্যস্ত রাস্তার উপর তরতাজা জোয়ানটার কোমরের পাশ দিয়ে খচখচ করে ছুরিটা চালানোর সময় এক অদ্ভুত তৃপ্তি অনুভব করছিল ইজাজ। কত বয়স হবে ছেলেটার? উনিশ-কুড়ি? কতটুকু দেখেছে দুনিয়ার যে ব্লগে বড় বড় কথা লেখে? নিজের ধর্মের নিন্দা করা সহজ, গভীরে গিয়ে ভাবা সহজ নয়। দিন দিন ধর্মকে নিয়ে সমালোচনা করাটা একটা রোগে পরিণত হচ্ছে ছেলেছোকরাদের মধ্যে। রিবাত এই বেয়াদপি বরদাস্ত করবে না। গত সপ্তাহের ছেলেটাকে নিয়ে চারটে ব্লগার গেল, তবু ওদের স্পর্ধা যেন কমছে না।
সীমান্তের ওপারে মানুষের ঔদ্ধত্য আরো বেশি। খুব ধীর গতিতে সেখানকার যুবকদের মধ্যে জেহাদের ভাবনা ঢোকানোর কাজটা শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পকেটে কাজ শুরু করেছে ইজাজদের সহযোদ্ধারা। পুলিশের ক্ষমতা নেই ওদের রোখার, কিন্তু এনএটিসি’র মতো সংস্থা একবার নাক গলিয়েছে মানে জল অনেকদূর গড়াবে। ইখলাস কী প্ল্যান ফাঁদছে, ওরা জানে না। রিবাতে সেটাই নিয়ম। একেকটা অ্যাসাইনমেন্ট একেকটা ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করে তাদের দেওয়া হয়। যারা অ্যাসাইনমেন্ট পায় শুধু তারাই জানে কী করণীয়, কীভাবে করণীয়। বাকিরা কোনো আঁচও পায়না। এটাও করা হয় পরিকল্পনাকে সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যেই। ইজাজ জানে না তার নেতৃত্বে যে পাঁচজনের টিমটা আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে রয়েছে গত সপ্তাহের রাজশাহীর মিশনের পর, তাদের জন্য সামনে আর কোনো অ্যাসাইনমেন্ট আছে কিনা, কিন্তু সে মনেপ্রাণে চাইছে এনএটিসি’র সঙ্গে টক্কর নিতে।
আবু আনসারকে নিজে হাতে তৈরি করেছিল ইজাজ। চাবুক যোদ্ধা হয়ে উঠেছিল আবু। তার মৃত্যুটা ইজাজকে আবেগপ্রবণ করে তুলছে। ইজাজ জানে, প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করে যে লড়াইতে ওরা নেমেছে, সেখানে আবেগের চেয়ে বড় শত্রু কিছু নেই। তবু এক এক সময়ে মনকে বশে রাখা একটু যেন কঠিন হয়ে পড়ে। সবাই ইখলাস রুবেল হতে পারে না। সন্দেহজনক জায়গায় ইখলাসকে দেখে ফেলে আব্বাকে বলে দেবে বলে ভয় দেখিয়েছিল তার ছোট বোন। পরের দিন বাড়ির পিছনে মেয়েটার রক্তাক্ত দেহ পাওয়া গিয়েছিল। ইখলাসের আব্বা-আম্মি হত্যাকারীকে খুঁজে পাননি, কিন্তু ইজাজরা জানে সে কে।
শুধু ইজাজ নয়, ওদের সকলেরই মেজাজটা বিগড়ে গিয়েছিল টিভির খবরটা দেখে। একটু হালকা হওয়া দরকার। রিমোটের বোতাম টিপে খেলার চ্যানেলে চলে গেল ইজাজ। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-শ্রীলংকা টেস্ট ম্যাচ চলছে। বিকেল হয়ে গেছে, দিনের খেলা শেষ হল বলে। এবার তার নির্দেশে বাকি চারজন বেরিয়ে পড়ল। খারাপের মধ্যেও ভালোর বীজ লুকিয়ে থাকে। শাফাকতকে ধরতে পেরে ঢাকা পুলিশ এখন এতটাই উচ্ছ্বসিত যে এখন কিছুদিন কলার তুলে, গা ছাড়া ভাব নিয়ে কাজ করবে। নজরদারি একটু আলগা হবে। এই ফাঁকেই ওদের চারজনকে চার দিকে সরে পড়তে হবে। একসঙ্গে থাকা মানেই নজরে পড়া।
ঢাকা নিউ মার্কেটের রাস্তায় বিকেলের ব্যস্ততা তুঙ্গে। ফুটপাথে হরেক মালের পসরার সামনে থিকথিকে ভিড়। পহেলা বৈশাখ গেছে, কিন্তু মানুষের কেনাকাটার মেজাজ এখনও বহাল। আমজনতার এই ঘন ভিড় অবশ্য ওদের জন্য স্বস্তির। নিজস্ব কোডওয়ার্ডে নিজেদের মধ্যে কথা সেরে নিয়ে ভিড়ে মিশে গেল ওরা।
৭
সন্ধেবেলা সুমনাদের বাড়ির উঠোনে জমিয়ে আড্ডা চলছিল ছয় বান্ধবীর। সকলে এসেছে ওর কাছে কলকাতার অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে। সেখানে একটি টিভি চ্যানেলের রিয়েলিটি শোতে অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিল সুমনা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে লড়াই করছে যে নারীরা তাদের নিয়ে বিশেষ এপিসোডে সে ডাক পেয়েছিল। সুমনার গত দেড় বছরের লড়াই, অ্যাসিডের ঝাঁঝে একটা চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বেঁচে ফিরে এসে অপরাধীকে ধরার জন্য বারংবার থানায় যাওয়া, বিভিন্ন এনজিও, মিডিয়াতে গিয়ে নিজের কথা বলা গোটা মালদায় তাকে পরিচিত করে তুলেছে। সাহায্য কেউ তেমন না করলেও, ‘আমাদের এলাকার মেয়ে’ মার্কা একটা গর্বের ফলে তার নাম অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সুবাদেই দৃষ্টান্ত হিসেবে তাকে বেছে নিয়েছিল টিভি চ্যানেল।
তবে সুমনা আর তার বান্ধবীদের উত্তেজনার কারণ কেবল ওই শো নয়। ওই অনুষ্ঠানেই বিচারক হয়ে এসেছিলেন নামী অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানা। তাঁর সাম্প্রতিক একটি ছবি দর্শকমহলে বিপুল সাড়া ফেলেছে। ছবিতে মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক মেয়ের চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন আয়েশা। ছবিটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন বহু বড় ফিল্ম সমালোচক, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী। তবে বিতর্কও তাড়া করেছে আয়েশাকে। ফেসবুকে প্রচুর মানুষ, যাদের সিংহভাগ ওপার বাংলার, তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন অভিনেত্রীকে। নিজের ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা এমন নারীকে কুপিয়ে খুন করা উচিত, এমন হুমকিও দেখা গেছে।
সেই আয়েশা সুলতানার সঙ্গে সেলফি তুলেছে সুমনা শোয়ের শ্যুটিং ব্রেকের পর। তার চেয়েও যেটা বড় খবর, তা হল, এই মাসের ২৫ তারিখ সুমনাদের প্রতিষ্ঠান ‘দশভুজা’র উদ্বোধনে তিনি উপস্থিত থাকবেন বলে কথা দিয়েছেন। এলাকার মহিলারা যাতে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে তার জন্য একটা এনজিও খোলার ভাবনা অনেকদিন থেকেই ছিল সুমনার। প্রথম দিকে তার সেই উদ্যোগের জন্য এদিকওদিক ছুটে বেড়ানোকে কেউ আমল না দিলেও, অ্যাসিড হামলার পরেও তাকে দমতে না দেখে তারা আচরণ বদলেছেন। স্থানীয় বিধায়ক অমল বরাট আর্থিক অনুদান দিয়েছেন, এলাকার কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সেসব সাহায্যের মধ্যে করুণা মিশে থাকলেও সুমনা তা গ্রহণ করেছে কারণ সে তার স্বপ্নকে সফল হতে দেখতে চায়। বিদ্রোহীর মোড়ের কাছেই একটা ঘর নিয়ে আপাতত দশভুজা কাজ শুরু করবে। মহিলাদের নানারকম প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে এবং সমাজের সমস্ত শ্রেণীর মহিলারা যোগ দিতে পারবেন সেখানে।
রান্নাঘরে খুন্তি নাড়তে নাড়তে মেয়ে আর তার বান্ধবীদের খোশগল্প শুনতে পাচ্ছিলেন মা অলোকা দেবী। বুক কাঁপছিল তাঁর। এত বড় একটা ফাঁড়া গেল, সারা জীবনের মতো মেয়েটার অমন সুন্দর মুখটা শেষ হয়ে গেল, একটা চোখ চলে গেল, তবু মেয়ের জেদ গেল না। আরো কত সর্বনাশ যে লেখা আছে ওর কপালে! সামনে তার মেয়ের লড়াই, তার উদ্যোগ নিয়ে সবাই তারিফ করে ঠিকই, কিন্তু আড়ালে তাদেরই অনেকে “ও মেয়েও ত্যাঁদড় কম না,” “বেশি উচ্ছৃঙ্খল হলে এমনই হয়,” জাতীয় কথা বলে থাকেন। সামান্য গৃহবধূ হলেও নানান সূত্র মারফত সেসব খবর অলোকা দেবীর কানে এসে পৌঁছোয়। তাঁর স্বামী লাল পার্টির হোলটাইমার ছিলেন, তাই এলাকায় অলোকা দেবীর যথেষ্ট পরিচিতি। মেয়েটার সর্বনাশ হওয়ার পর থেকে ওর বাবা একেবারে ভেঙে গেছেন বটে, কিন্তু বাড়িতে মানুষের আনাগোনা কমেনি। এদের উপর মাঝে মাঝে রাগ হয় অলোক দেবীর। “আমরা তোর পাশে আছি” বলে অনেকেই মেয়েটাকে চাগিয়ে দিচ্ছে। বিপদ একটা হলে এরা কিন্তু আর পাশে থাকবে না। সুমনাকে সেকথা প্রায়ই বোঝানোর চেষ্টা করেন তিনি, কিন্তু এই মেয়ে কি কথা শোনার পাত্রী!
কলকাতা শহরের সঙ্গে এই উত্তরবঙ্গের এক জেলার গ্রামাঞ্চলের তুলনা চলে না। কলকাতার মানুষ আধুনিক, তাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। গ্রামের দিকে মেয়েদের এতটা অগ্রসর হওয়া এখনও ভালো চোখে দেখা হয় না। তার উপরে আবার সিনেমা আর্টিস্ট না কাকে নিয়ে আসার কথা ভাবছে পাগলিটা। কী হবে এই মেয়ের ভবিষ্যৎ, ভেবে মাঝে মাঝেই শিউরে ওঠেন অলোকা দেবী। নিজের যোগ্যতার জোরে একটা চাকরি পেয়েছিল। যারা কাজ দিয়েছিল তাদের অসীম দয়া, মেয়ের মুখটা জ্বলেপুড়ে কদাকার হওয়ার পরেও তারা তাঁকে ছাড়াননি। কিন্তু মেয়ের কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ আছে? এনজিও খুললেই চাকরি ছাড়ার জন্য এক পা তুলে তৈরি। মাইনে খারাপ পায় না, কিন্তু চাকরি ছাড়া মানে সে পথ বন্ধ হবে। দশটা স্কুলছাত্রী পড়িয়ে আর কটা টাকা হয়! আগে আরো অনেক মেয়ে আসত, কিন্তু ওই ঘটনার পর…। সংসারটার কী হবে তখন, অলোকা ভেবে পান না।
সুমনা পুরো ছবির মতো তার প্ল্যান সাজিয়ে ফেলেছে। উদ্বোধনের দিন কী কী অনুষ্ঠান হবে, কোথা থেকে খাবার আসবে, সব তার ভাবা হয়ে গেছে। আর মাত্র কয়েকটা দিন, হু হু করে কেটে যাবে। আরো একটা বাসনা আছে তার মনে, কিন্তু সেটা সে এখনই সবাইকে বলতে চায় না। ওদের কথাবার্তা বেশ জমে উঠেছিল, এমন সময় আলম এসে দাঁড়াল বাড়ির দরজায়। আলম স্থানীয় দর্জি সিরাজুলচাচার দোকানে কাজ করে। আলমের যে আসার কথা ছিল তা ভুলেই গিয়েছিল সুমনা। তার চেয়েও বড় কথা, যে কারণে সিরাজুলচাচার কাছে যাওয়া সেটাই তার মাথায় ছিল না। আগামী পরশু শ্যামলকাকার বাড়িতে অনুষ্ঠান। ওঁর ছেলের জন্মদিন। সুমনার দশভুজাতেও তাঁর মোটা অনুদান আছে। সেই শ্যামলকাকার বাড়ির অনুষ্ঠানে তো আর যে সে পোশাকে যাওয়া চলে না। সুমনার মামার দেওয়া একটা জমকালো সালোয়ার ছিল। অ্যাসিড হামলার পর আর সাজগোজের কোনো অবকাশ নেই ভেবে অনেক ভালো ভালো পোশাক একে, ওকে দিয়ে দিলেও সালোয়ারটা যত্ন করে সরিয়ে রেখেছিল সে। গত দেড় বছরে চেহারা ভেঙে প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে, তাই সালোয়ারটা একটু চাপাতে দিয়েছিল গত সপ্তাহে। আলম সেটাই নিয়ে এসেছে।
আলমের হাত থেকে সালোয়ারের প্যাকেটটা সুমনা নেওয়া মাত্রই ওদের আলোচনার অভিমুখ আচমকা বদলে গেল। এই মুহূর্তের আলোচনার বিষয় পরশু কে, কী পোশাক পরে শ্যামলকাকার বাড়ির অনুষ্ঠানে যাচ্ছে।
৮
ডিরেক্টর ‘প্যাক আপ’ বলতেই হাফ ছাড়লেন আয়েশা। এটাই আপাতত তাঁর শেষ শট, কাল থেকে দিন কুড়ির ছুটি। গত ছ’ মাস একটানা অসম্ভব কাজের চাপ গিয়েছে তাঁর। একটা ডেটও খালি রাখতে পারেননি। তার মধ্যে অসীম সেনের ছবির জন্য হায়দ্রাবাদে দীর্ঘ আউটডোর শ্যুটিংয়ের ধকল আয়েশাকে শারীরিকভাবে বেশ ক্লান্ত করে তুলেছে। খ্যাতি ভালো লাগে বটে কিন্তু সে খালি হাতে আসে না, চাপিয়ে দেয় বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। ছবি নয় নয় করে ছ’ টা করা হয়ে গেলেও তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়েছে গত পুজোয় ‘আড়াল সরিয়ে’ ছবিটাই। সাধারণ দর্শক তো বটেই, বিদগ্ধ অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে বলিউডের প্রখ্যাত সিনে সমালোচকেরা অবধি যে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন তাঁকে, তা আয়েশার প্রত্যাশার বাইরে ছিল।
কিন্তু উৎপাতটাও আসে এর পরপরই। চারজন ডিরেক্টর গত ছ’ মাসে একই ধরনের স্ক্রিপ্ট নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তাঁদেরকে আয়েশা কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারেননি যে ‘আড়াল সরিয়ে’ সমাজে যে জোরালো বার্তাটা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে, সেটা বারবার করা যায় না। উলটে সেই ছবির চিত্রনাট্যের ছায়ায় ক্রমাগত ছবি তৈরি হতে থাকলে সেই বার্তাটাই শক্তি হারিয়ে একসময় খেলো হয়ে উঠবে। এক পরিচালক তো রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে বলেই বসলেন এক লাফে হঠাৎ স্টারডম পেয়ে যাওয়ায় আয়েশা সুলতানা আর ছোট, মাঝারি পরিচালক, প্রযোজকদের মানুষ বলেই গণ্য করছেন না। শুনে খারাপ লেগেছিল তাঁর, তবু সেই পরিচালককে অপমান করেননি।
তিনি নিজে যে ধর্মের মানুষ, সেই ধর্মেরই বিভিন্ন অন্ধকার দিক, গোঁড়ামির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো একটা চরিত্র করার জন্য তাঁকে নিজের মনের সঙ্গে যথেষ্ট লড়তে হয়েছে। নিজে মুর্শিদাবাদের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা আয়েশা সেই গোঁড়ামিগুলোর সঙ্গে ভীষণভাবে পরিচিত। ফিল্মলাইনে আসার পথে নিজের পরিবারের বিভিন্ন বাধাবিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। তিন তালাকের মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে ছবি করতে রাজি হওয়ার আগে আগুপিছু অনেক ভাবতে হয়েছে আয়েশাকে। গুরুত্বপূর্ণ শটগুলো দেওয়ার আগে, সংলাপগুলো বলার আগে নিজেকে বারবার বোঝাতে হয়েছে যা করতে, বলতে যাচ্ছেন তা আয়েশা সুলতানার কথা বা কাজ নয়, সেগুলো বলছে এবং করছে একান্তই হেনা নামক একটি চরিত্র। ‘আড়াল সরিয়ে’ ছবির চিত্রনাট্য তাঁকে সেই মানসিক জোরটা জুগিয়েছে কারণ তরুণ পরিচালক সঞ্জয়শেখর একটা আন্তরিক তাগিদ থেকে সেটা লিখেছিলেন। বাকিরা কেবল সেই ফর্মুলা কাজে লাগিয়ে ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য নিশ্চিত করতে ঠুনকো চিত্রনাট্য নিয়ে চলে আসছিলেন আয়েশাকে কাস্ট করতে।
সঞ্জয়শেখরের ছবি আয়েশাকে শুধু খ্যাতিই দেয়নি, সঙ্গে দিয়েছে অনেক বিড়ম্বনাও। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টক শো, রিয়েলিটি শোতে আমন্ত্রণ রাখতে গিয়ে দিনশেষের প্রাপ্য সামান্য বিশ্রামটার সঙ্গেও আপোস করতে হয়েছে তাঁকে। তার চেয়েও বড় কথা যেটা তা হল বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম থেকে ধেয়ে আসা ধর্মান্ধদের তীব্র আক্রমণ। স্তম্ভিত হয়ে আয়েশা দেখেছেন, আক্রমণের ঝাঁঝে প্রবীণ, গোঁড়া মানুষদের ছাপিয়ে গিয়েছেন তরুণ-তরুণীরা। রীতিমতো হুমকির সুরে কথা বলেছেন অনেকে। অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন কিছু নিউজ চ্যানেলের সঞ্চালকও।
সব মিলিয়ে মনের ভিতরে একটা আন্দোলন চলছিল। আয়েশা বুঝতে পারছিলেন তাঁর কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একটা বিরতি নেবেন। তাঁর ম্যানেজার শুভঙ্কর ডুয়ার্সের কথা বলেছে এবং সে প্রস্তাব আয়েশার বেশ মনে ধরেছে। শুভঙ্করও তাঁর সঙ্গে যাবে। ছেলেটি ভালো, মাত্র তিন মাসেই বেশ কাজ বুঝে নিয়েছে। আয়েশার আগের ম্যানেজার রথীনদা হঠাৎই গত পুজোর পর কাজ ছেড়ে দেন। বলা নেই, কওয়া নেই, একেবারে বেপাত্তা হয়ে যান। এতগুলো দিনেও তাঁর দুটো নম্বরে বারে বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন আয়েশা। হ্যাঁ, তাঁর সারাদিনে কাজের টেনশনের প্রতিফলন মাঝে মাঝে রথীনদার উপরে দুর্ব্যবহারের আকারে আছড়ে পড়েছে এ কথা ঠিক। প্রবীণ মানুষ, হয়তো মনে ব্যথাও পেয়েছেন, তবু এভাবে কিছুমাত্র না জানিয়ে তাঁর উধাও হয়ে যাওয়াটা তাঁর মাঝে মাঝে রীতিমতো রহস্যজনক মনে হয়।
অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পয়সাটাই সবাই দেখে। কী পরিমাণ ঝঞ্ঝাট যে তাঁদের পোয়াতে হয় তার খবর কেউ রাখে না। বারোটা থেকে দুটো অমুক প্রোডাকশনের ডেট, আড়াইটে থেকে পাঁচটা তমুক ফ্লোরে কাজ। একার মাথায় বিভিন্ন চরিত্রদের পাশাপাশি এত খুঁটিনাটি মনে রাখা সম্ভব হয় না, তাই ম্যানেজার একটা লাগেই। শুভঙ্করের সঙ্গে আয়েশার দেখা হয় গত নভেম্বরে, সোনার তরী হোটেলে একটা ছবির সাকসেস পার্টিতে। কেরিয়ারের একেবারে গোড়ার দিকে আয়েশা রবিউল আলমের পরিচালনায় পরপর তিনটে ছবি করেছিলেন। ছবিগুলো একেবারেই চলেনি। রবিউল পেশায় সাংবাদিক ও লেখক ছিলেন। পরিচালক হিসেবে চরম ব্যর্থতারপর ছবি বানানো ছেড়ে এখন আবার একটি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। সেই রবিউল ভাইয়েরই সুপারিশে শুভঙ্কর দেখা করেছিল সেদিন ওই পার্টিতে। ছেলেটার কথাবার্তা, আচরণ ভালো লাগায় তাকে দ্রুত কাজে রেখে দেন আয়েশা।
গাড়িতে বাড়ির পথে যেতে যেতে আয়েশা লক্ষ করছিলেন সামনের সিটে বসে শুভঙ্কর একমনে মোবাইলে ফেসবুক দেখে যাচ্ছে। আয়েশারই প্রোফাইল ওটা, ইদানীং শুভঙ্করই অপারেট করে।
আয়েশা বললেন, “কী অবস্থা শুভ? আক্রমণের ঝাঁঝ একটু কম, নাকি সেই একইরকম চলছে?”
শুভঙ্কর মোবাইলে এতটাই মনোযোগী যে প্রশ্নটা শুনতেই পেল না। ড্রাইভার মলয় বাঁ কনুই দিয়ে একটা খোঁচা দিতে তার ঘোর কাটল। ম্যাডাম দ্বিতীয়বার প্রশ্নটা করার পর সে জবাব দিল, “যার চোখে যেটা ঠিক!”
জবাবটা বিশেষ পছন্দ হল না আয়েশার। তিনি প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য বললেন, “শুভ, তুমি যখন এসেছিলে, বেশ হাসিখুশি ছিলে। দিন দিন বড্ড চুপচাপ হয়ে যাচ্ছ। প্রেম টেম আসছে নাকি?”
এবার শুভঙ্কর তার সুন্দর হাসিটা দিল, “কী যে বলেন ম্যাডাম! এত ব্যস্ততা, প্রেমের সুযোগ কোথায়?”
“বাজে কথা বোলো না বন্ধু, রোজ লাঞ্চ ব্রেকে জুনিয়র আর্ট ডিজাইনার মেয়েটার সঙ্গে যে খোশগল্প চলে, তা আমার নজরে পড়েনি ভেবেছ? কী যেন নাম মেয়েটির… বারে বারে ভুলে যাই।”
“সঞ্চিতা,” দ্রুত জবাব দিল শুভঙ্কর। হা হা করে হেসে উঠলেন আয়েশা। বিজয়ীর হাসি। নামটা তাঁর দিব্যি মনে ছিল। আসলে ছেলেটাকে ফাঁদে ফেলছিলেন।
“হুম, নাম একদম ঠোঁটের গোড়ায়। ওয়াহ ওয়াহ,” বলে আরেক দফা হেসে নিলেন আয়েশা।
গাড়ি যখন প্রায় বাড়ির কাছাকাছি, তখন শুভঙ্করের হাতের পাশে রাখা আয়েশার মোবাইলটা বেজে উঠল। এখন ওসব দায়িত্ব সেই সামলায়। একটু বিরক্তি প্রকাশ করে আয়েশা বললেন, “এখন আবার কে?”
“ওই মেয়েটা ম্যাডাম,” মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে জবাব দিল তাঁর ম্যানেজার।
“কোন মেয়ে?”
“ওই যে মালদার মেয়েটা ম্যাডাম, সেদিন রিয়েলিটি শোতে এসেছিল। ওই অ্যাসিড অ্যাটাক ভিকটিম। সে ফোন করছে।”
“ওহ, তার আবার কী চাই? কথা তো দিয়েছি যাবো বলে। বারে বারে উৎপাত কেন তবুও? ভালো লাগে না। এই এক সমস্যা,” রাগ ঝরে পড়ল অভিনেত্রীর গলায়। মেয়েটিকে তাঁর ভালো লেগেছে। এত বড় একটা কোপ নেমে আসার পরেও ভয়ে কুঁকড়ে না থেকে বুক চিতিয়ে লড়েছে। তার অনুরোধও সেই কারণে তিনি রেখেছেন। অবশ্য রাখা সম্ভব হয়েছে অন্য কারণে। ওদের ওখানে অনুষ্ঠানের দিনই মালদা কলেজ অডিটোরিয়ামে একটা মডেল হান্ট ইভেন্টের গ্র্যান্ড ফিনালেতে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত তিনি। সেখানে যাওয়ার একটা আগ্রহ ছিলই আয়েশার, তাই একসঙ্গে দুটো জায়গায় মুখ দেখানো হয়ে যাবে দেখে মেয়েটিকে আর নিরাশ করেননি তিনি। বড় কাতর ছিল তার অনুরোধ। কিন্তু তাই বলে অসময়ে ফোন করাটা…
শুভঙ্কর বলল, “দুপুরেও দু’ বার করেছে। প্রথমবার ধরিনি। পরেরবার ধরলাম। ওদের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির ছবি পাঠিয়েছে আপনার মেইলে, আপনি পেয়েছেন কিনা, তাই জানতে চায়। আমি বলে দিয়েছি ম্যাডাম এখন শ্যুটে আছেন। আপনি পরে ফোন করবেন। মনে হয় সেই কারণেই এখন আবার করছে।
ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেল। তারকাদের অনেক কিছু উপেক্ষা করতে জানতে হয়। আয়েশা সেটা উপলব্ধি করেছেন বিগত কয়েক বছরে। তিনি বললেন, “ছাড়ো ওসব। রিসর্টে বুকিং নিয়ে কোনো সমস্যা নেই তো! কাল সকালে ওখানে একটা ফোন কোরো। কটা দিনের জন্য বিশ্রাম নিতে যাওয়া, কোনো হ্যাঙ্গাম যেন না হয়।”
হ্যাঙ্গাম বলতে অভিনেত্রী ঠিক কী বোঝালেন তা শুভঙ্কর জানে। ম্যাডামের নতুন বন্ধু, সঞ্জয়শেখরও আসছেন ডুয়ার্সে। উপলক্ষ নতুন একটি স্ক্রিপ্ট নিয়ে নিভৃতে আলোচনা, কিন্তু ঘোমটার আড়ালে কী খেলা চলছে তা সে বোঝে। কয়েক সপ্তাহ ধরেই অভিনেত্রীর কলকাতার ফ্ল্যাটে নতুন বন্ধুর আসা-যাওয়া বেড়েছে। শুভঙ্করের উপর নির্দেশ আছে ডুয়ার্সের রিসর্টের যে অংশে আয়েশা থাকবেন, সেখানে সঞ্জয়শেখর এবং হোটেলের কর্মীরা ছাড়া আর কেউ যাতে না এসে পড়ে সেটা নিশ্চিত করা।
৯
শ্যামলেন্দু নস্করের বাড়িতে একেবারে চাঁদের হাট বসেছে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এলাকাবাসী তো এসেছেনই, উপস্থিত হওয়ার কথা স্থানীয় বিধায়কেরও। একটু রাত হলেও অল্প সময়ের জন্য মুখ দেখিয়ে যাবেন বলে কথা দিয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ পবিত্র দত্ত। পবিত্রবাবু মালদার অন্যতম বড় ডাক্তার। গোটা জেলায় তাঁর খ্যাতি। সেভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না কোনোদিনই তবে তাঁর সুনামকে কাজে লাগাতে পারবে আশা করে গত বিধানসভা নির্বাচনে জাতীয় জনবিকাশ পার্টি টিকিট দিয়েছিল। শাসকদলের বিধায়কের বিরুদ্ধে ভোটে লড়ে কপাল জোরে জামানতটা বাঁচাতে পেরেছেন পবিত্রবাবু। তারপর, মাস তিনেক আগে কেন্দ্রের শাসকদল ভারত সেবক তাঁকে প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ড থেকে প্রার্থী করে রাজ্যসভায় নিয়ে যেতে পেরেছে। স্থানীয় বিধায়ক অমল বরাটের সঙ্গে আগে পবিত্রবাবুর কোনো সমস্যা ছিল না, কিন্তু ইদানীং একটা তিক্ততা তৈরি হয়েছে। আজ এই অনুষ্ঠানেও একে অপরকে যে এড়িয়ে যেতে চাইছেন, সেটা শ্যামলেন্দু দিব্যি অনুমান করতে পারছেন।
আশেপাশের প্রবীণ মানুষেরা শ্যামলেন্দুকে তাঁর এলাকার জনকল্যাণের জন্য নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের জন্য প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছিলেন। নিজের প্রশংসা শুনতে সকলেরই ভালো লাগে, কিন্তু কখনো কখনো সেগুলো একটু অস্বস্তির কারণও হয়ে ওঠে। শ্যামলেন্দুর জন্য যেমন হচ্ছে। সকলের তারিফ বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করতে করতে তিনি ভাবছিলেন মাটির উপরের সবুজ দেখে যারা আপ্লুত, তারা যদি একটু সেই মাটিকে তৈরি করার পরিশ্রম আর ঝুঁকির কথাও জানতো, তবে হতো সঠিক বিচার। যে সাম্রাজ্য তিনি তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন এতো বছরে, তা কোনো জাদুমন্ত্রের দ্বারা সম্ভব হয়নি। অনেকরকম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে এগোতে হয়েছে। নানারকম মূল্যও চোকাতে হয়েছে সময় সময়। আজও হচ্ছে। সেসব কথা সামনে আসে না তাই, নাহলে প্রশংসকেদের চাহনি বদলে যেতে এক মুহূর্তও লাগতো না।
অতিথিদের দেখভাল যতটা সম্ভব নিজেই করছিলেন শ্যামলেন্দু, কিন্তু তাতে বাধা পড়ল অনুগামী শিবু এসে তাঁর কানে কানে কিছু বলায়। কপালে ভাঁজ পড়ল শ্যামলেন্দু নস্করের। একটু ভালো সময় কাটানোর জো নেই, অস্বস্তি সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়াচ্ছে। এই মুহূর্তে শ্যামলেন্দুর অস্বস্তির কারণ একটা ফোনকল, যেটা কোনোমতেই অতিথি-অভ্যাগতদের মাঝে বসে রিসিভ করা সম্ভব নয়। তাঁকে উঠে যেতে হবে নিজের কাজের ঘরে, যেটা করতে একেবারেই মন চাইছিল না শ্যামলেন্দুর।
ঘরে ঢুকেই দরজায় ছিটকিনি তুলে দিলেন শ্যামলেন্দু। এগিয়ে গেলেন স্টাডি টেবলের উপর নামিয়ে রাখা টেলিফোন রিসিভারটার দিকে। ওপারে যিনি আছেন তিনি কোনো সম্বোধন পছন্দ করেন না, সরাসরি কাজের কথায় চলে যেতে ভালোবাসেন। শ্যামলেন্দুও তাই রিসিভার কানে তুলেই শুধু “হুম” বললেন।
“আনন্দ-ফূর্তি তো ভালোই চলছে, কিন্তু আমাদের কাজের কতদূর কী এগোল,” ওপার থেকে গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন ভেসে এল।
“সে তো আমার জানার কথা নয়। আমার যা করণীয় তা তো করেছি, করেই চলেছি,” শ্যামলেন্দু দৃঢ়ভাবে জবাব দিলেন।
“এতদিন যে গতিতে গাড়ি চলেছে, এখন আর তা করলে হবে না। গাড়ি ছোটাতে হবে এবার। বিস্তারিত আলোচনা যাদের করার তারা করে নেবে খুব শিগগিরি। সেই মতো ব্যবস্থা যেন হয়ে যায়।”
কথাটায় একটা শাসনের সুর ছিল যেটা শ্যামলেন্দুর কানে বিঁধল। কিন্তু তিনি প্রতিবাদী হয়ে উঠতে চেয়েও পারলেন না। হাত-পা বাঁধা তাঁর। একই সুরে আরো কিছু নির্দেশ ভেসে এল তাঁর কাছে। কথা চলল প্রায় মিনিট পনেরো, তারপর ওপারের ব্যক্তির যা বলার ছিল তা বলা হয়ে গেছে বুঝে তিনি আলতো করে রিসিভারকে যথাস্থানে নামিয়ে রাখলেন। রাগ, অপমান, ভয়, দুশ্চিন্তা মেশানো একটা জমাট অনুভুতি কিছুক্ষণের জন্য শ্যামলেন্দুর চিন্তাভাবনাগুলোকে যেন দলা পাকিয়ে দিল। ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং এরিয়ায় যাওয়ার সময় একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন তিনি। আজকাল মদ প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। কিন্তু আজ অন্যমনস্কভাবে ওয়েটারের এগিয়ে দেওয়া ট্রে থেকে একটা স্কচের গেলাস তুলে নিলেন।
গেলাসে বুদবুদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে ভেসে থাকা বরফের টুকরোটার সঙ্গে নিজের বর্তমান পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন শ্যামলেন্দু। পানীয়তে শীতল একটা চুমুক দিতেই অবশ্য ঘোর কেটে গেল। ডাইনিং এরিয়ায় শ্যামলেন্দুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন বিধায়ক অমল বরাট। তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হতে হতেই এসে পড়লেন পবিত্রবাবুও।
রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলেও দুই যুযুধান সচেতনভাবে বিতর্ক এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। শ্যামলেন্দু স্বস্তি পাচ্ছিলেন। রাজনীতিতে লড়াই, তর্ক তো থাকবেই। মাঝেসাঝে কিঞ্চিৎ উত্তেজনা অবধিও ঠিক আছে। কিন্তু তিনি বর্তমানে এমন একটা অবস্থার মধ্যে রয়েছেন যেখানে রাজনৈতিক উত্তেজনা একেবারেই কাম্য নয়। একটা কাজ ঠান্ডা মাথায় করে দিতে হবে তাঁকে। দায়িত্বটা তাঁর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই জানা, কিন্তু একটু আগে বহু দূর থেকে আসা দূরভাষ বার্তা থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট, কাজটা যে সময়ে হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে অনেকটা এগিয়ে আসছে। এদিকে পঞ্চায়েত নির্বাচনের দামামা বাজল বলে। ভোটের স্বার্থে গরম গরম কথায় এলাকাকে তাতিয়ে দিতে চাইবে সব পক্ষই। তার মধ্যে এরকম একটা গুরুতর দায়িত্ব পালন করা বেশ চাপের ব্যাপার। এলাকা ঠান্ডা থাকতে থাকতে কাজটা উতরে দিতে হবে শ্যামলেন্দুকে। না পারলে…
দশটা নাগাদ আবির্ভাব হল প্রভাতী সংঘের ছেলেদের। অল্পবয়সি ছেলের দল নেমন্তন্ন বাড়িতে আসতে এত দেরি করছে দেখে শ্যামলেন্দু অনুমান করেছিলেন তারা নিশ্চয়ই তাদের কোচের জন্য অপেক্ষা করছে। তাঁর অনুমানটা একেবারে মিলে গেছে। ছেলেদের সোজা খাওয়ার জায়গায় পাঠিয়ে দিয়ে রণজয় এগিয়ে এলেন শ্যামলেন্দুর দিকে। তার সঙ্গে আরেকটি অল্পবয়সি ছেলে এসেছে; বেশ তাগড়া চেহারা তার। তাকে নিজের ভাই বলে পরিচয় দিলেন ফুটবল কোচ। শ্যামলেন্দু ডাইনিং এরিয়ায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, “এখানে এখন রাজনীতির আসর বসেছে। স্পোর্টসম্যানদের উপযুক্ত পরিবেশ নয়। চলুন আমার ঘরে গিয়ে বসা যাক।”
রণজয় হেসে প্রস্তাবে সায় দিলেন। শ্যামলেন্দুর নির্দেশে খাদ্য ও পানীয় পৌঁছে গেল তাঁর স্টাডিরুমে।
দীপেশ আর রাজার সঙ্গে নেমন্তন্ন বাড়িতে এসেছে পল্টুও। সে অবশ্য আসতে চায়নি। এমনিতেই গত দু’ দিনে অনেকগুলো অচেনা মানুষের মধ্যে পড়ে সে একটু কুঁকড়ে রয়েছে, তার উপর একেবারে অজানা জায়গায় নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ার ইচ্ছে মোটেই হচ্ছিল না তার। কিন্তু রাজাদা ছাড়েনি ওকে। নতুন এই দাদার সঙ্গে অবশ্য বেশ দ্রুত ভাব জমে উঠেছে পল্টুর। এখানে আসার পথে ওদের কোচ রণজয়স্যারের সঙ্গে আলাপ হয়েও বেশ ভালো লেগেছে তার। পল্টু ফুটবল খেলে শুনে স্যার আগামীকাল থেকেই মাঠে চলে আসতে বলেছেন ওকে। বেশ খুশি হয়েছে পল্টু। দীপেশের মেসো মানুষ ভালো, কিন্তু বাড়িতে ওকে একা পেলেই বিরামপুরের সেই ঘটনাটা নিয়ে তিনি এত খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জানতে চান যে পল্টুর ভালো লাগে না।
রণজয়স্যার চলে যেতেই টিমের ছেলেরা হইহই শুরু করে দিল। পল্টুর ইচ্ছে করল না। সে অতিথিদের বসার জায়গায় নিজের জন্য একটু জায়গা করে নিল। এত বড় বাড়ি সে আগে কখনো দেখেনি। বিরামপুরে ওদের বাড়ি থেকে কিছু দূরে শিল্পী আবেদীন সাহেবের বাড়ি। আবেদীন সাহেব প্রবীণ মানুষ, বেশ বড়লোক এবং এলাকায় খুব নামডাক। কিন্তু তাঁর বাড়িও এই বাড়ির জৌলুশের কাছে কিছুই না। অতিথিদের বসার জায়গাটা সুন্দর করে সাজানো। দেওয়ালে হাতে আঁকা সুন্দর সব ছবি টাঙানো। প্রতিটা ছবির নিচে একটা করে ছোট আলো সেগুলোকে যেন আরো জীবন্ত করে তুলেছে। ঘরের এক কোণে একটা বিরাট ধাতুর মূর্তি চোখে পড়ল পল্টুর। একটা ঘোড়া সামনের দুটো পা উঠিয়ে রেখেছে আর তার পিঠে একজন সৈনিক বসে আছে, হাতে বল্লম।
মূর্তিটার মধ্যে কেমন যেন একটা মায়া আছে। সে যেন ওকে টানছে অদৃশ্য হাতছানি দিয়ে। বসে থাকতে পারল না পল্টু। এগিয়ে গেল মূর্তিটার দিকে। ঘোড়াটার মসৃণ শরীর আর গায়ে পরানো যুদ্ধের বেশের উপর হাত বোলাতে বোলাতে পল্টু যেন ভুলেই যাচ্ছিল সে কোথায় আছে।
রণজয়কে খুব ভালো লাগে শ্যামলেন্দুর। শুধু যে খেলা বোঝে বা ভালোবাসে তাই না, অনেক স্বপ্ন আছে ছেলেটার মধ্যে। এবারের ফ্রেন্ডশিপ কাপ নিয়ে ছেলেটা অন্যভাবে ভাবছে। নতুন কিছু করতে চাইছে। এই যে ভাইজাগের অ্যাকাডেমিতে প্লেয়ার পাঠানোর পরিকল্পনা, এসব তো ভাবাই যায়নি আগে। এতদিন ক্লাবের ছেলেরা ফুটবল খেলতো বটে কিন্তু সে ছিল খেলতো হয় বলে খেলার মতো। খুব অল্প সময়ে ছেলেগুলোর হাবভাবই বদলে গেছে। কিছুক্ষণ আগের ফোনকলটা শ্যামলেন্দুর উৎসবের মেজাজটা ম্লান করে দিয়েছিল। রণজয়ের ফুটবলকেন্দ্রিক আলোচনা তাঁকে আবার চাঙ্গা করে তুলছে।
রণজয় খেলোয়াড় মানুষ এবং স্বাস্থ্যসচেতন। খাওয়াদাওয়া একদম মাপা। সে পর্ব দ্রুত সেরে তিনি উঠে পড়লেন। মালদার পরে শিলিগুড়িতেও অ্যাকাডেমি গড়ার প্রয়াস নিয়েছেন। একটা জমিও পেয়েছেন সস্তায়। সেই ব্যাপারে কথা বলতে আগামীকাল ভোরে শিলিগুড়ি রওনা হবেন বলে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। বিদায়ী অতিথির উদ্দেশে শ্যামলেন্দু বললেন, “আপনার এই উদ্যমী মানসিকতাটা আমার খুব ভালো লাগে।”
রণজয় আবার ফিরে এলেন শ্যামলেন্দুর টেবিলের কাছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললেন, “অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আমার এই ছোট ভাইটার কথা তো বললামই। আপনার তো মালদা জুড়ে কর্মকাণ্ড। যদি ওকে কোথাও একটু কোনো কাজে লাগিয়ে দিতে পারেন, তবে খুব উপকার হয় দাদা। ওর রিমোট এলাকায় কাজ নিয়েও কোনো অসুবিধে নেই। পরিশ্রমী ছেলে, কিন্তু পড়াশোনা বেশিদূর এগোতে পারেনি তাই চাকরি জুটছে না। যা কাজ দেবেন পারবে। একটা রোজগারের ব্যবস্থা হওয়া খুব দরকার।”
শ্যামলেন্দু ইতিমধ্যেই রণজয়ের ভাইয়ের নাম জেনেছেন। ছেলেটিকে আরেকবার ভালো করে জরিপ করে নিলেন তিনি। চেহারাটা তেমন বড়সড় না হলেও চাহনি আর কথাবার্তায় একটা বুদ্ধির ছাপ আছে। সাহসও হয়তো আছে। তাঁর কারবারে এমন বেশ কিছু কাজ থাকে যা সামলানোর জন্য বুদ্ধিমান ও সাহসী ছেলে দরকার হয়। একটু ভেবে নিয়ে তিনি জবাব দিলেন, “ঠিক আছে, একটু ভেবে নিই। ও সবে এসেছে। কটা দিন একটু এদিক-ওদিক ঘুরে টুরে বেড়াক। আমি এর মধ্যেই খবর দেবো।”
আসর যখন ভেঙেছে, এলাকায় নিশুতি রাতের সঙ্গে হ্যালোজেন তীব্র লড়াই চালাচ্ছে, তখন শ্যামলেন্দু বাড়ির গেটে এসে দাঁড়ালেন তাঁর দুই রাজনৈতিক অতিথিকে নিয়ে। অমল বরাট এখনও ঠিকঠাক পা ফেলছেন, কিন্তু ডাক্তারবাবুর অবস্থা সঙ্গিন। তাঁকে রীতিমতো ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলে দিতে হল। কথা জড়িয়ে গেছে, তবু সেই অবস্থাতেই গাড়ির জানালা দিয়ে আঙুল বের করে অমল বরাটের উদ্দেশে তিনি বললেন, “যা করছেন আপনি আর আপনার দল, ঠিক করছেন না। মূল্য চোকাতে হবে, অনেক বড় মূল্য চোকাতে হবে। মিলিয়ে নেবেন।”
