৩৫
গাজোল থানায় এসআইয়ের ঘরে তুমুল ব্যস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে টেবিলের উপরে সাজানো উদ্ধার করা অস্ত্রের ছবি তোলার জন্য। স্থানীয় সাংবাদিকেরা তো আছেনই, বারুদের গন্ধে এসে হাজির হয়েছেন রাজ্যের সর্বাধিক বিক্রিত সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরাও। শিলিগুড়ি থেকে এসে উপস্থিত হয়েছে কয়েকটি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের ওবি ভ্যানও। ফটোগ্রাফারদের মধ্যে রীতিমতো কুস্তি চলছে সবার আগে ছবি তুলে নিজের নিজের হাউজে পাঠানোর জন্য।
টেবিলের অপর প্রান্তে শান্ত ভাব নিয়ে বসে আছেন এসআই প্রতীক সেন; সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্ররোচনামূলক প্রশ্নেরও জবাব দিচ্ছেন যথাসম্ভব ঠান্ডা স্বরে। তিনি জানেন প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা তুলে তাঁকে উস্কানো চলছে মেজাজ গরম করে দেওয়ার জন্য, যাতে তিনি উত্তেজিত হয়ে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নামে কিছু বলে ফেলেন। একটার পর একটা ফাঁদ পাতা চলছে তাঁর সামনে এবং তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন সতর্কভাবে।
প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তোলা চলল। সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীরা থানা ছেড়ে যাওয়ার পরে প্রতীক সেন মন দিয়ে প্রতিটি অস্ত্র দেখছিলেন। সাইকেল ভ্যান থেকে তাঁরা যা উদ্ধার করেছিলেন সেখানেই অস্ত্র কারবারিদের সংগ্রহের শেষ হয়নি। পরে আবার ওই ঝুপড়িতে ফিরে গিয়ে চিরুনি তল্লাশি করে বেরিয়েছে পাঁচটি রাইফেল।
কিন্তু একটাই হিসেব মেলাতে পারছিলেন না প্রতীক। রাইফেল বা ওয়ান শটার, যা পাওয়া গেছে সবই লোকাল মেড। কিন্তু এদের মধ্যে বড্ড বেমানান দেখাচ্ছে যাকে, সে হল একটি রেবেটা নাইন্টিটু এফএস নাইনএমএম পিস্তল। মসৃণ শরীরের এই কালো আগ্নেয়াস্ত্রটি অত্যন্ত দামি। এ জিনিস তৈরি হয় ইতালিতে। এই জিনিস ঝুপড়ির পাহারাদারদের কাছে এল কোত্থেকে? এটা সেই বোরখাধারীর হাত থেকে খসে পড়েছিল। লোকটির ক্ষিপ্রতা তখনই প্রতীকের মনে সন্দেহ জাগিয়েছিল। তার ফেলে যাওয়া আগ্নেয়াস্ত্রটি সেই সন্দেহ আরো জোরদার করছে। এই জিনিস নিয়ে যারা ঘোরাফেরা করছে তারা কোনো রাজনৈতিক দলের পোষা গুন্ডা নয়। এদের হাতে বিপুল অর্থ। কিন্তু এরা কারা?
আফসোস হচ্ছিল প্রতীকের। লোকটা ওরকম বেপরোয়াভাবে ঝুপড়ির দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবে এটা তিনি ভাবতে পারেননি। লোকটাকে ধরা খুব দরকার ছিল।
তিনি জানেন সংবাদমাধ্যমে আজ এই অস্ত্র উদ্ধার অভিযান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে। বৈদ্যুতিন মাধ্যমগুলোতে হয়তো বিশেষজ্ঞরা বসে পড়বেন ময়নাতদন্ত করতে। ঝুপড়িটা স্থানীয় বিধায়কের জবরদখল করা জমির উপরে ছিল সেই খবর যেহেতু স্থানীয় মানুষের মুখ থেকে সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যেই জেনে ফেলেছে, সেহেতু রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরাও যোগ দেবেন সেই আলোচনায়। কিন্তু প্রতীকের চিন্তার জায়গা ওই রেবেটা নাইন্টিটু এফএসটি। প্রাক্তন কয়েকজন পুলিশকর্তাও টিভি চ্যানেলের আলোচনায় মুখ দেখান ইদানীং। তাঁদের মধ্যে কেউ যদি একবার এই ইতালিজাত আগ্নেয়াস্ত্রটির অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাহলে প্রতীক সেনের জন্য নতুন সংকট তৈরি হবে। এলাকায় আইনশৃঙ্খলার অবনতির দায় এসে পড়বে তাঁর ঘাড়ে। কেউ মনে রাখবে না গভীর রাত্রে তাঁদের দুঃসাহসিক এই অভিযানের কথা। স্থানীয় যে মধ্যবয়স্ক সাংবাদিক আজ তাঁকে প্রশ্ন করছিলেন, তাঁর অভিব্যক্তিতে একটা প্রসন্নতা লক্ষ করেছেন প্রতীক। সুখেন্দু সরকার দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘উত্তরবার্তা’র সঙ্গে যুক্ত। ‘উত্তরবার্তা’র মালদা এডিশনের চিফ রিপোর্টার তিনি। প্রশ্নোত্তর পর্বের শেষে নোটপ্যাড শার্টের বুকপকেটে রেখে সুখেন্দু প্রতীকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে “দারুণ কাজ করেছেন” বলে গেছেন। কিন্তু প্রতীক জানেন খবরকে মুখরোচক করে তুলতে সেই তিনিও উলটো কথায় তাঁর প্রতিবেদন ভরিয়ে দিতে গিয়ে একবারও ভাববেন না।
প্রতীক সেন গিয়ে দাঁড়ালেন লকআপের গেটের সামনে। প্রায়ান্ধকার কুঠুরি থেকে প্রবল ঔৎসুক্য নিয়ে এতক্ষণ সব দেখছিল মিন্টু। প্রতীক লকআপের লোহার শিকের গেটের ওপার থেকে বললেন, “তোর ইনফরমেশন ঠিক ছিল মিন্টু।”
“আ… আ… আমাকে এবার ছেড়ে দেবেন তো স্যার? আর এই লাইনে কাজ করবো না; পায়ে পড়ি স্যার, ছেড়ে দিন,” মিন্টু কান্নাজড়ানো গলায় বলল। সে আবার হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসেছে প্রতীকের পা ছোঁবে বলে।
প্রতীক সেন কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ধমকে উঠলেন, “চুপ কর। তুই প্রতিবারই এই কথা বলিস। তারপর আবার সেই এক কাজই করিস। তোরা হলি কুত্তার ল্যাজ। কোনোদিন সিধা হবি না। রুলের বাড়ি, বাটামের বাড়ি দিয়ে তোদের সিধা করা যাবে না। তোদের যা দাওয়াই তা প্রয়োগ করার অনুমতি দেয় না এই রাষ্ট্র। যেমন বসে আছিস বসে থাক। দেখছি তোর জামিনটা যাতে নেক্সট হিয়ারিংয়ের দিনে হয়ে যায়।”
“আমার বৌটার কোনো খবর পেলেন স্যার?” মিন্টু অসহায়ভাবে জানতে চাইল। একটা তীব্র তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টি তার দিকে নিক্ষেপ করে এসআই বললেন, “হ্যাঁ পেয়েছি। ফুল তুলছে। তোর জন্য বরণডালা সাজাচ্ছে। তুই বাড়ি গেলে তোকে বরণ করবে। চোপ শালা!”
প্রতীক সেন ও মিন্টুর এই কথোপকথনের সাক্ষী হয়ে রইল কনস্টেবল নির্মল দাঁ। গত রাত্রে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানেও সে দলে ছিল। তবে সেভাবে অ্যাকশনে হাত লাগায়নি। ওটা যে তার মুরোদে কুলোবে না তা প্রতীক জানতেন। কিন্তু জানতেন না লোকটির মনের মধ্যে কোন চিন্তা ঘোরাফেরা করছে।
৩৬
বিকেল চারটে নাগাদ এনএটিসি’র বিধাননগরের অফিসে বসে অত্যন্ত গোপন কিছু কাজ সারছিল হক। যদিও যে নিরিবিলি পরিবেশটা তার দরকার ছিল সেটা সে পাচ্ছে না এই মুহূর্তে। পাশেই সংস্থার নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। আর মাত্র কিছুদিন। তারপরে স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসবেন ভবন উদ্বোধন করতে, তাই যুদ্ধকালীন দ্রুততায় কাজ চলছে সেখানে। সারাক্ষণ ড্রিল মেশিন আর হাতুড়ির শব্দ হকের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে বারবার।
একটু আগেই ধুপঝোরা থেকে ফোনে ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠী জানিয়েছে স্থানীয় কোর্ট থেকে পুলিশের সিজার লিস্ট চাইবার প্রয়োজনীয় অনুমতি তারা পেয়ে গেছে। সেই লিস্টের এবং জিনিসগুলোর ছবি সে পাঠিয়েও দিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে। একটার পর একটা ছবি দেখে মোবাইলে একটা নোট বানিয়ে নিচ্ছিল হক। এই ছোট্ট ছোট্ট তথ্যগুলোই তাদের এগিয়ে দেয় অপারেশনের পরের ধাপে।
কিছুক্ষণ পরেই নয়ডা অফিস থেকে ডিআইজি গোয়েলের পাঠানো মেইল হককে আরেকটু স্বস্তি দিল। আয়েশা সুলতানা হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার সরকারিভাবে হাতে তুলে নিতে এনএটিসি’র যে নোটিফিকেশনটি দরকার, গোয়েল জানিয়েছেন সেটা আগামীকালের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে এসে যাবে।
হক মনে মনে ঠিক করে নিল তার আজকের বাকি কাজগুলো। ধর্মেন্দ্র জানিয়েছে যেদিন আয়েশা খুন হন সেদিন মেটেলি থানায় ফোন করে এক মহিলা জানান কলকাতায় আয়েশার বাড়িতে স্থানীয় থানা থেকে ফোন করে জানানো হয়েছিল অভিনেত্রীর প্রাণনাশের সম্ভাবনা আছে। এই খবর আয়েশার বাড়ির পরিচারক জানিয়েছিল এই মহিলাকে। তিনি নাকি ক্রমাগত আয়েশাকে ফোনে ধরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে বিকেলে বাধ্য হয়ে মেটেলি থানায় খবরটা দেন। মেটেলি থানার অর্জুন দাস সেই বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আয়েশার সেক্রেটারি শুভঙ্করকে, কিন্তু বোধহয় একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল।
এই মহিলার নাম অর্জুন দাস ধর্মেন্দ্রকে জানিয়েছেন। হক তার নিজস্ব সোর্সকে কাজে লাগিয়ে মিনিট পনেরোর মধ্যেই মহিলার সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে গেল। মহিলার নাম সঞ্চিতা; যে প্রোডাকশনের সঙ্গে আয়েশা শেষ কাজ করেছিলেন, সেই টিমেরই একজন।
তাকে মোবাইলে ধরল হক। সমস্ত বৃত্তান্ত শুনে সে রাজি হল হকের সঙ্গে বাইরে দেখা করে কথা বলতে।
ল্যাপটপ গুটিয়ে ব্যাগে ভরে বেরোনোর জন্য তৈরি হল হক। সে যখন ঘর থেকে বেরিয়ে টয়লেটের দিকে যাচ্ছে তখন করিডরে বেঞ্চে বসে এক বয়স্ক সাবস্টাফ খবরের কাগজ হাতে নিয়ে ঝিমোচ্ছিল। ফেরার পথে হক দেখল লোকটি ঘুমের দেশে চলে গিয়েছে এবং তার হাত থেকে কাগজটা খসে পড়েছে মাটিতে। কাগজের মাস্টহেডটা হকের চেনা। বহুল প্রচারিত একটি সান্ধ্য দৈনিক। কিন্তু সেটাকে মাটি থেকে কুড়িয়ে নিতে গিয়ে হকের হাত আটকে গেল। কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাতেই বড় ছবি দিয়ে একটা প্রতিবেদন বেরিয়েছে। মালদার গাজোলে অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। ছবিটা বেশ স্পষ্ট তাই টেবিলের উপরে সাজানো অস্ত্রগুলোকে সহজেই চেনা যাচ্ছে। একটি জিনিস হকের কপালে গভীর ভাঁজ ফেলল। সে মাটিতে উবু হয়ে বসেই দ্রুত পড়ে ফেলল প্রতিবেদনটা। হ্যাঁ, যা অনুমান করেছে তাই। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে একটি রেবেটা নাইন্টিটু এফএস নাইনএমএম পিস্তল।
হকের হৃদ্স্পন্দন গতি পেতে শুরু করেছে। প্যান্টের পকেট থেকে বেরিয়ে এল মোবাইল। চোখের সামনে চলে এল ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠীর পাঠানো সিজার লিস্ট। সেখানেও রয়েছে একটি রেবেটা নাইন্টিটু এফএস। এই পিস্তলটা মেটেলি থানার পুলিশ উদ্ধার করেছে। জঙ্গলের মধ্যে মাথায় গুলি খাওয়া দুষ্কৃতীর হাতে এটি ধরা ছিল।
হকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। অবশেষে তার মনে হচ্ছে টানেলের শেষে সামান্য আলোর বিন্দু সে দেখতে পাচ্ছে। এনএটিসি’র গোয়েন্দাদের কাছে খবর ছিল মাস চারেক আগে দুটি রেবেটা পিস্তল চোরাইপথে এদেশে ঢুকেছে এবং একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের হাতেই পৌঁছেছে সে দুটি। সে সংগঠনের পরিচয় সম্বন্ধে এনএটিসি এবং আইবি নিশ্চিত হতে পারেনি এতদিন। আজকের এই ঘটনার পরে আর অনিশ্চয়তার কোনো জায়গা থাকছে না। সংগঠনটির নাম ‘রিবাত’।
তার চেয়েও বড় কথা দুটি পিস্তলের একটি পাওয়া গেছে মালদাতে। তবে কী…
দ্রুত পরিকল্পনা ছকে নিল হক। তার মোবাইলের কল লিস্ট থেকে নির্বাচিত হল একটি নাম। এনএটিসি’র মালদার এজেন্ট। তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েই ঘরে ফিরে প্রস্তুতি সেরে ফেলল হক। আর এক মিনিটও নষ্ট করা চলবে না। সঞ্চিতা নামের মেয়েটির সঙ্গে সাক্ষাৎ সেরেই মালদার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে।
তার দলের বাকি দুই সদস্যের একজন অফিসেই ছিল। তাকে ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা করতে বলে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল হক। গন্তব্য সাদার্ন এভিনিউয়ের একটি রেস্তোরাঁ।
৩৭
বেনারসের ঘাটে বসে দিগন্ত বিস্তৃত গঙ্গাবক্ষে সূর্যাস্ত দেখছিলেন অমল বরাট। দেখছিলেন বটে, কিন্তু উপভোগ করতে পারছিলেন না। তাঁর বর্তমান মানসিক অবস্থা ঘাটের গা ঘেঁষে ওই অল্প অল্প দুলতে থাকা নৌকোগুলোর মতো। সাধারণত এলাকায় গোলমেলে কাজের সময় অনেক দূরে বসে থাকাই রাজনীতিবিদদের দস্তুর। তাতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সহজেই ‘আমি বাইরে আছি, বিস্তারিত না জেনে মন্তব্য করবো না’ জাতীয় কথা বলে অস্বস্তিটা এড়িয়ে যাওয়া যায়। সেই কারণেই গতকাল কলকাতায় পার্টি মিটিং সেরেই তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন হাওড়া স্টেশন। ট্রেনের টিকিট, হোটেলের ব্যবস্থা করাই ছিল। তাছাড়া বিশ্বনাথের মন্দিরে একবার পুজো দেওয়ার ইচ্ছেটাও অনেকদিন ধরেই মনের মধ্যে বেড়ে উঠছিল। ভেবেছিলেন পুজো দিয়ে একটু শান্তি পাবেন।
কিন্তু বরাটের অস্বস্তি যে ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সাংবাদিকদের উৎপাত তো আছেই, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে দলের ছেলেদের তরফ থেকে ক্রমাগত আসতে থাকা প্রতি মুহূর্তের আপডেট। রাগে ফুঁসছেন অমল বরাট। এই ভাবে লোহালক্কড় এসে পৌঁছনোর প্ল্যানটা মাটি হয়ে গেল! ভারত সেবক যেভাবে প্রভাব বাড়াচ্ছে গাজোলে, তাতে প্রান্তিক এলাকায় ত্রাস বজায় না রাখলে চলবে না। সেই ব্যবস্থাই করছিলেন তিনি। এখনও ধরে নেওয়া যায় মাস দেড়েক বাকি আছে ভোটের। এখন থেকে আতঙ্কটা তৈরি করে রাখতে পারলে ভারত সেবকের তাজা রক্তের নেতারা আর মনোনয়ন জমা দেওয়ারই সাহস করবে না। এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার জন্য বরাটের বাহিনী তৈরিই ছিল। তেমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। গ্রামের রাস্তায় সারাদিনে বাইক নিয়ে চক্কর আর কোথাও সাপ ফণা তুলছে দেখলেই রাতের দিকে সেই অঞ্চলে একটু টেনশন। যে অসুখের যে দাওয়াই।
সব পণ্ড করে দিল একটা লোক। মুখটা মনে পড়তেই রাগে বরাটের সারা শরীর কাঁপতে লাগল। প্রতীক সেন! শালা যবে থেকে গাজোলে এসে ঘাঁটি গেড়েছে, একটার পর একটা কাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে। গত ছয়-সাত মাসে অন্তত তিরিশজন রাজনৈতিক কর্মীকে হাজতে পুরেছে এই লোকটা, যার মধ্যে সতেরোজনই বরাটের পার্টির। ক’দিন আগে গার্লস স্কুলের ঘটনায় তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুগামীকে হেনস্থা করেছে। নেহাত স্কুলের ওই ছাত্রীটির পরিবার তাঁর হুমকিতে ভয় পেয়ে শেষে পিছিয়ে আসে নাহলে বরাটের মুখ আরো পুড়তো।
তবু সেই অবধি মেনে নিয়েছিলেন বরাট। প্রতীক সেনকে ফোনে হালকা চমকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর নয়!
ভাবতে ভাবতেই বরাটের মোবাইল কথা বলে উঠল। মোবাইলের স্ক্রিনে কলারের নাম দেখামাত্রই বরাটের যেন গ্রীষ্মের দাবদাহটা হঠাৎ বেশি করে অনুভূত হতে লাগল। জেলা সভাপতি রয়েছেন ওপারে। বর্ষীয়ান নেতা, কিছুদিন হল জাতীয় জনবিকাশের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে বঙ্গবিকাশে এসেছেন এবং এসেই আগের সভাপতিকে সরিয়ে সিংহাসনে চড়ে বসেছেন। সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে সুনাম আছে। লোকটিকে বরাটের প্রথম দিন থেকেই পছন্দ নয়। বেশি নীতি আদর্শ কপচায়, চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে। হারামি বুড়ো শালা।
বরাট অনুমান করতে পারছিলেন বর্ষীয়ান সভাপতি কী বলতে পারেন। অনুমান মিলেও গেল। সভাপতির নির্দেশ এই পরিস্থিতিতে পালিয়ে বাঁচা চলবে না, বরাটকে অবিলম্বে ফিরতে হবে এলাকায়। সারাদিন সংবাদমাধ্যমগুলো শাসকদলকে তুলোধোনা করেছে। ফায়দা তুলতে মাঠে নেমে পড়েছে ভারত সেবকের স্থানীয় নেতারা। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। বরাট এখনই গাজোলে ফেরার রাস্তা না ধরলে দল তাঁর মাথা থেকে হাত তুলে নেবে। কলকাতায় পার্টির প্রধান কার্যালয় থেকে নাকি সেরকমই বার্তা এসেছে।
কথা শেষ করে বরাটের ইচ্ছে করছিল মোবাইলটা দূরের গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলে দিতে। পশ্চিমের আকাশে কেউ যেন সোনা ঢেলে দিয়েছে। সেই সোনা গলে পড়েছে গঙ্গায়, ভেসে বেড়াচ্ছে জলে, রাংতার টুকরোর মতো নাচছে ঢেউয়ের তালে। শেষ বিকেলের রোদের আলোয় বরাটের মুখটা যেন একটু বেশিই হলদেটে দেখাচ্ছে। প্রচণ্ড গরম এখানে, তবু এতক্ষণ গঙ্গার হাওয়াটা খুব খারাপ লাগছিল না। কিন্তু হঠাৎ যেন পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
উঠে পড়লেন বরাট। অস্তগামী সূর্যকে একটা প্রণাম ঠুকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করলেন। মোবাইলটা ছায়াসঙ্গী অনুগামীকে দিয়ে বললেন, “এসপি কে ফোন লাগা তো।”
মালদা এসপি’র হটলাইন কথা বলে উঠল। বিশেষ অবাক হলেন না এসপি যতীন্দ্র দুবে। তাঁর শান্ত স্নিগ্ধ “নমস্কার অমলদা”কে তছনছ করে দিল বিধায়কের ব্লেডের মতো ধারাল “রাখুন আপনার নমস্কার!”
“কী ভেবেছেন বলুন তো আপনারা? এরকম বুঝি কথা ছিল? গাড়ে বেশি রস হয়ে গেছে আপনাদের ওই প্রতীক সেনের? একটার পর একটা ঝঞ্ঝাট পাকিয়ে যাচ্ছে শালা, আর আপনি বসে বসে দেখছেন,” প্রায় চেঁচিয়ে উঠেছেন বরাট।
যতীন্দ্র বলার চেষ্টা করলেন, “বুঝতে পারছি স্যার। কিন্তু একটু বোঝার চেষ্টা করুন…”
“আপনি বোঝার চেষ্টা করুন। আমাকে বেশি জ্ঞান মাড়াতে আসবেন না। সহ্যের একটা সীমা আছে। ওই শুয়োরের বাচ্চাকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে না সরালে আপনি কী করে বসে থাকেন মালদায় আমিও বুঝে নেবো। এর বেশি পরিষ্কার করে বলতে হবে?”— বিধায়কের হুঙ্কার যেন উর্দিধারী এসপি’র কানে হাতুড়ির বাড়ি মারল।
তিনি তবু বলার চেষ্টা করলেন, “আমি বুঝতে পারছি স্যার, কিন্তু আপনি এতটা বিচলিত হবেন না প্লিজ।”
“কী হবো না? বিচলিত হবো না? সারাদিন ধরে আমার গুষ্টির ষষ্ঠীপুজো করছে টিভিতে, আপনি জানেন না? হারামির বাচ্চা আবার টিভিতে বাইট দিয়ে বলেছে ঝুপড়িটা আমার জবরদখল করা জমির উপরে ছিল। এরপর আরো কিছু বলবে, তার জন্য অপেক্ষা করবো? কোনো কথা শুনতে চাই না। চব্বিশ ঘণ্টা টাইম দিলাম। কাল ফিরে যেন ওই হারামিকে আর থানায় না দেখি। দেখলে, আপনি জানেন কী হবে।”
ঔদ্ধত্যে ভরা কন্ঠস্বর হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল।
মোবাইল নামিয়ে রেখে থমথমে মুখে বসে রইলেন এসপি যতীন্দ্র দুবে। বড় অসহায় লাগে এইসব পরিস্থিতিতে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে না পারলে সমাজ আঙুল তোলে, বজায় রাখতে গেলে চোখ রাঙায় সমাজের দ্বারা নির্বাচিত জন প্রতিনিধিরা। তারা বাতানুকূল অফিসে বসে ঠিক করে দেয় পুলিশ অফিসারদের ভাগ্য। কে চেয়ারে থাকবে আর কে ভাগাড়ে বদলি হবে অপরাধের শাস্তিস্বরূপ, সেসব স্থির করতে তাদের লাগে দু’ মিনিট। তাদের অঙ্গুলিহেলনে চলতে পারলে ইনাম জোটে আর সামান্য মতের বিরুদ্ধে কথা বললেই নেমে আসে শাস্তির খাঁড়া। সমাজ দেখে সব, বোঝে সব, কিন্তু তবু এই মুখোশধারী শয়তানেরাই থেকে যায় তাদের মাথার উপরে। বদলায় শুধু প্রতীক, ঝান্ডার রঙ।
বড্ড দিশেহারা বোধ করছিলেন যতীন্দ্র দুবে। বরাটের হুকুম তামিল না করে কোনো উপায় নেই। দলের একেবারে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ভালো খাতির লোকটার। তার নির্দেশ অমান্য করলে যতীন্দ্রকে তাঁর উপরমহলের কাছে হয়তো জবাবদিহি করতে হবে। অতএব…
কোন যুক্তিতে গাজোল থানার এসআই-কে তিনি দণ্ড দেবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না যতীন্দ্র দুবে। তিনি জানেন প্রতীক সেনের সততা ও দক্ষতা সম্বন্ধে। ক’টা লোকের বুকের পাটা থাকে এমন দুঃসাহসিক অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ার! প্রতীক এমন অভিযানে এর আগেও বহুবার নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই কারণেই এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাঁকে আলিপুরদুয়ার থেকে বদলি করে আনা হয়েছিল গাজোলে। ফলও মিলেছিল হাতেনাতে। আর সেই লোকটাকেই কিনা!
যতীন্দ্র দুবের কাজটা সহজ করে দিলেন অমল বরাট। সন্ধে সাতটা নাগাদ তিনি ফোনে জানিয়ে দিলেন কোন অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতীক সেনকে শাস্তি দেওয়া যাবে এবং কে প্রতীকের ‘অপকর্মের’ সাক্ষী হিসেবে সামনে আসবে।
ফোন ছেড়ে এসি’র রিমোটের বোতাম টিপে ঘরের তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি কমিয়ে নিলেন অমল বরাট। মনে মনে ধন্যবাদ দিলেন গাজোল থানার কনস্টেবল নির্মল দাঁকে।
৩৮
বিকেলে রাজাদাদের বাড়ির বাগানে আপন মনে এক তাল মাটি জড়ো করে একটা মূর্তি তৈরি করছিল পল্টু। গতকাল থেকে তার শরীরটা ভালো নেই তাই আর রাজাদা, দীপেশের সঙ্গে মাঠের দিকে যায়নি। মেসোমশাই বাগানের এক কোণে ঘর তুলবেন, তাই আজ সকাল থেকে মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু হয়েছে। প্রকাণ্ড গর্তের পাশে স্তূপীকৃত নরম মাটি দেখে পল্টুর ধামাচাপা পড়ে যাওয়া শখটা আবার চাগাড় দিয়ে উঠেছে।
মেসোমশাইও বাগানেই ছিলেন, এক মনে পল্টুর নিপুণ হাতের কাজ দেখছিলেন। এরকম একটা নিষ্পাপ ছেলে, শুধু শখ করে কয়েকটা মূর্তি বানাতো আর তার একটু পরিচিতি হয়েছিল, এই অপরাধে আজ তাকে দেশছাড়া হতে হয়েছে, এ কথা ভাবলেই তাঁর মনে বিস্ময় জাগে। তিনি বারবার প্রশ্ন করে পল্টুর কাছ থেকে জানতে চান বিরামপুরে সেই সন্ধ্যায় তার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল? আজও চাইছিলেন।
এই প্রশ্নগুলোর জবাব বারবার দিতে পল্টুর ভালো লাগে না। তার মনখারাপ হয়। তবু সে মূর্তি থেকে চোখ না সরিয়েই জবাব দিচ্ছিল। তার সঙ্গে সেই সন্ধের অন্ধকারে যা করেছিল কয়েকটা অচেনা লোক তা তো সে ভুলবে না-ই, কোনোদিন তার মন থেকে মুছে যাবে না দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আবেদিন সাহেবের বাড়ির সেই দৃশ্যটাও। সেদিন পল্টু তাঁর বাড়িতেই যাচ্ছিল। আবেদিন সাহেব যে বাড়িতে নেই তা সে জানতো না। সে যখন বাড়ির কাছাকাছি, তখন বাড়ির পিছনে খোলা জমির উপর দিয়ে তিনজন মানুষকে ছুটে চলে যেতে দেখেছিল। এর ঠিক পরেই একটা প্রচণ্ড আলোর ঝলকানি আর শব্দ। চমকে উঠে দৌড়ে পালাতে গিয়ে মাটিতে ছিটকে পড়েছিল পল্টু। তিনজন মানুষকে পালিয়ে যেতে দেখেছিল সে, কিন্তু আজ অবধি সেই কথা কাউকে বলেনি ।
পল্টুর নিপুণ হাতে ধীরে ধীরে মাটির তাল একটা অবয়বে পরিণত হচ্ছিল। সেদিন শ্যামলেন্দুকাকার বাড়ির ওই ঘোড়ার মূর্তিটার নকশা তার মনে ভীষণভাবে গেঁথে গেছে। ওটা তার চাই, আর সে বানিয়েই নেবে।
সন্ধে হয়ে আসছিল আর বাগানে মশার প্রকোপ বাড়ছিল। মেসোমশাই বললেন, “চলো পীযূষ, ভিতরে যাই এবার। তোমার শরীর ভালো না, এর মধ্যে আবার মশার কামড় খেয়ে কাজ নেই। ওটা ওই অবধি থাক। আবার কাল সকালে কোরো।’’
নিজের কাজে এতটাই নিমগ্ন হয়ে গিয়েছিল পল্টু, যে মেসোমশাইয়ের কথাটা সে শুনতেই পেল না। তার ঘোর কাটল কলিংবেলের শব্দ ভেসে আসায়। মেসোমশাই “এই সময় আবার কে,” বলে উঠে গেলেন। পল্টু জানে এটা মাসিমার স্তব করার সময়; এদিকে রাজাদা, দীপেশও বাড়িতে নেই, অগত্যা তাঁকেই দরজা খুলতে হবে। মেসোমশাই আরেকবার বললেন, “চলো ভিতরে যাই।”
পল্টু তার অসম্পূর্ণ মূর্তিখানা বাগানের আরেক কোণে পড়ে থাকা একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ তুলে এনে তা দিয়ে ঢেকে কলতলায় গায়ে লেগে থাকা মাটি ধুয়ে বাড়িতে ঢুকল।
দরজা খুলে যাকে দেখলেন, তার পরিচয় প্রবুদ্ধ সরকারের জানা ছিল। অল্পবয়সি এই ছেলেটির নাম রাজেশ, কাছেই একটি অটোমোবাইলের শোরুমে চাকরি করে। প্রবুদ্ধ’র নতুন গাড়িটা ওই শোরুম থেকেই এসেছিল। সেই সুবাদে রাজেশের সঙ্গে আলাপ হয়। গাড়ি ডেলিভারির দিন সে এসেছিল এই বাড়িতে। চা, জলখাবার খেতে খেতে সামান্য গল্পগুজবও হয়েছিল দুজনের মধ্যে। এরপরেও এলাকায় কোথাও কোথাও তার সঙ্গে দেখা হয়েছে প্রবুদ্ধ’র।
“কী ব্যাপার?” প্রবুদ্ধ দরজার ফাঁক চওড়া করতে করতে প্রশ্ন করলেন। রাজেশ এমনিতে হাসিখুশি, কিন্তু আজ যেন একটু গম্ভীর দেখাচ্ছে।
“আপনার সঙ্গে একটু জরুরি দরকার ছিল। একটা হেল্প চাই,” সে জবাব দিল।
“ভিতরে এসো,” দরজা থেকে সরে আসতে আসতে বললেন প্রবুদ্ধ।
ঘণ্টা দুয়েক হল শিলিগুড়ি থেকে ফিরেছেন শ্যামলেন্দু নস্কর। লম্বা সফরের কারণে শরীর যত না ক্লান্ত, তার চেয়েও বেশি ভারাক্রান্ত তাঁর মন। বেডরুমে এসি মেশিন থেকে বেরিয়ে আসা কৃত্রিম শীতল বাতাসও তাঁকে এতটুকু স্বস্তি দিতে পারেনি। ঘরের পরিবেশ বড্ড বদ্ধ মনে হচ্ছে তাঁর।
বিছানা ছাড়লেন শ্যামলেন্দু। স্যান্ডো গেঞ্জির উপরে সকালের পাঞ্জাবিটাই চাপিয়ে নিলেন। একটু টাটকা বাতাস লাগানো দরকার মনটাতে। স্বামী সাধারণত বিকেলের দিকে বাড়ির বাইরে পা রাখেন না, তাই আজ নিয়ম ভাঙছে দেখে শ্যামলেন্দুর স্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, “কোথায় বেরোচ্ছ?”
একটু অন্যমনস্ক ছিলেন শ্যামলেন্দু, তাই স্ত্রী’র করা প্রশ্নটা তাঁর মস্তিষ্কে টোকা দিতে একটু সময় নিল।
“একটু কাজে যাচ্ছি,” বলে তিনি ঘর ছাড়লেন। আজ বাইরে থেকে ফেরা ইস্তক স্বামীর আচরণ কেমন যেন ঠেকছে স্ত্রী শিখার চোখে। না বলে কয়ে মানুষটা গতকাল সারারাত কোথায় কাটিয়ে এল, সে প্রশ্ন বারবার তাঁর মনে চিমটি কেটে পালিয়ে যাচ্ছে।
একতলায় গ্যারাজ থেকে বাইক বের করলেন শ্যামলেন্দু। এক সময়ের বাহন তাঁর, এখন ছেলে চালায়। ইদানীং দামি গাড়ির বিলাসে অভ্যস্ত শ্যামলেন্দুর বাইক আর ভালো লাগে না। ছেলে আজই সকালে তাঁর কাজে কলকাতা গেছে, তাই চাবিখানা সহজেই পেয়ে গেছেন তিনি।
পুরোনো বাহনের পিঠে সওয়ার হয়ে বিদ্রোহীর মোড়ে পৌঁছলেন শ্যামলেন্দু। হাইস্কুলের মাঠে ক্লাবের ছেলেরা ফুটবলের প্র্যাকটিসে ব্যস্ত। বাইক মাঠের বাইরের লম্বা ফুটপাথের ধারে দাঁড় করিয়ে ছেলেদের দিকে এগোলেন তিনি।
শ্যামলকাকা মাঠে এসেছেন! সকলের চাহনিতে বিস্ময়। প্রায় সকলেই খেলা থামিয়ে ছুটে এল তাঁর দিকে।
শ্যামলেন্দু বললেন, “প্র্যাকটিস কেমন চলছে?”
জয় জবাব দিল, “খুব ভালো চলছে শ্যামলকাকা। স্যারের গতকাল থেকে শরীরটা খারাপ; আজ মাঠে আসেননি, তাই আমরা নিজেদের মতো করছি।”
শ্যামলেন্দুর চোখ চকিতে একবার কোচের বাড়ির দিকে গিয়েই ফিরে এল ছেলেদের উপর।
“ও আচ্ছা। যাইহোক, যেটা তোদের বলতে এলাম। আজ রাত্রে ক্লাবে মিটিং। টুর্নামেন্ট কিন্তু এগিয়ে আসছে। এবার কিছু নতুন জিনিস প্ল্যান করছি। আলোচনা আছে। চলে আসবি সবাই ঠিক আটটায়।”
সকলে সোৎসাহে ঘাড় নাড়ল। উত্তেজিত বোধ করছিল ওরা, একটু একটু বুক ধুকপুকও করছিল কারোর কারোর। শ্যামলকাকা নিজে মাঠে নেমে পড়েছেন মানে টুর্নামেন্টের আর সত্যিই দেরি নেই।
“স্যারকে খবর দিই তাহলে শ্যামলকাকা,” প্রশ্ন করল ধীমান।
“হ্যাঁ দে। যদি শরীর ভালো থাকে আসবেন নিশ্চয়ই। নাহলেও পরে ওঁর সঙ্গে বসে কথা বলতে হবে,” শ্যামলেন্দু কথা শেষ করে হাঁটতে শুরু করলেন বাইকের দিকে।
কোরাসে প্রশ্ন এল, “খেলা কবে থেকে শ্যামলকাকা?”
“খুব শিগগিরি, বড়জোর আর দিন দশ-বারো। গেট রেডি।”
বাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই স্ত্রী জয়িতা গিয়ে উপস্থিত হলেন প্রবুদ্ধ’র স্টাডিতে। স্বামীকে যেন একটু বিচলিত দেখাচ্ছে। যেন গভীর কোনো চিন্তায় হঠাৎ ডুবে গেছেন।
“কী হয়েছে গো? কিছু চিন্তার ব্যাপার? কে এসেছিল?” জয়িতা প্রশ্ন করলেন।
“একটু চিন্তারই ব্যাপার। শোনো, বাইরের ঘরটা পরিষ্কার করাতে হবে। একজন থাকবেন,” ধীর স্বরে বললেন প্রবুদ্ধ।
“থাকবে মানে? কি, ভাড়াটে,” প্রশ্ন বেরিয়ে এল জয়িতার মুখ থেকে। তাঁর আইনজীবী স্বামী অত্যন্ত সাবধানী মানুষ। এরকম হুট করে ভাড়াটে তিনি বসাবেন না। ঘরটা ফাঁকা পড়ে আছে চার মাস, কিন্তু আজ সকাল অবধিও নতুন ভাড়াটে আসবে এমন কোনো কথা তাঁকে বলতে শোনেননি জয়িতা।
“হ্যাঁ, ভাড়াটে। তোমার কাছে সুবলের নম্বর আছে তো? ওকে এখনই ডেকে পাঠাও। আজ রাতের মধ্যেই ঘর পরিষ্কার করাতে হবে।”
“কী ব্যাপার বলো তো! এত তাড়াহুড়ো করছো তুমি!”
স্ত্রী’র প্রশ্নের গোছানো কোনো জবাব খুঁজে পাচ্ছিলেন না দাপুটে আইনজীবী প্রবুদ্ধ সরকার। পাওয়ার কথাও নয়। এই মুহূর্তে তিনি নিজেই যে একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছেন। হাসিখুশি যে ছেলেটিকে তিনি এতদিন অটোমোবাইল শোরুমের ছাপোষা কর্মচারী বলে চিনতেন, তার যে সম্পূর্ণ অন্য একটি পরিচয় আছে তা জানতে পেরে তাঁর মনের অবস্থা হয়েছে ফুটবল মাঠে বিপক্ষের কড়া ট্যাকেলের পরে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়া খেলোয়াড়ের মতো। তবে কি এলাকায় কোনো বিপদের মেঘ ঘনিয়ে আসছে?
৩৯
রাত আটটা নাগাদ যখন এসপি’র অফিসে ঢুকছেন, তখন বুকের ভিতরের ধুকপুকুনি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিলেন প্রতীক সেন। জরুরি তলবটা এসেছিল আধ ঘণ্টা আগে। প্রতীকের মন কু ডেকেছিল যতীন্দ্র দুবের কণ্ঠস্বর কানে আসা মাত্র। বড় কোনো মিশনে সাফল্য পেলে এমন তলব আসে বটে কিন্তু সেই মিশন যদি কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির স্বার্থে আঘাত হানে, সেক্ষেত্রে পরিণাম বিপরীতও হয়।
অফিসে পা রাখা মাত্রই কনস্টেবল নির্মল দাঁকে বসে থাকতে দেখে প্রতীকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এই লোকটির আচরণ সাম্প্রতিককালে বারবার তাঁর কপালে ভাঁজ ফেলেছে।
আচরণবিধি মেনে এসপি’র চেয়ার থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকলেন গাজোল থানার এসআই।
দুবে পালটা সৌজন্য দেখালেন বটে কিন্তু তাতে উষ্ণতার অভাব প্রতীকের চোখ এড়াল না। তাঁকে বসতে অবধি বললেন না এসপি।
“আপনার বিরুদ্ধে খুব সিরিয়াস কিছু চার্জ আছে। আমার কাছে রিপোর্ট এসেছে। ডিপার্টমেন্ট এই নিয়ে কোনো হাঙ্গামা চায় না। নো প্রেস, নো মিডিয়া। আপনাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ডিউটি থেকে সাসপেন্ড করা হল,” একটা যন্ত্রের মতো বলে ফেললেন এসপি যতীন্দ্র দুবে।
মন যেহেতু প্রস্তুত ছিল, প্রতীক একেবারেই ধাক্কা খেলেন না বিপরীতে বসা মানুষটির বক্তব্যে। তিনি শুধু বললেন, “আমার বিরুদ্ধে চার্জগুলো যদি জানতে পারতাম।”
যতীন্দ্র দুবে এবার চোখের ইশারায় নির্মল দাঁকে অফিসের বাইরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। ঘর ছেড়ে যাওয়া অবধি তার সন্দিগ্ধ দৃষ্টি প্রতীকের শরীরের প্রতিটি রগে আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
“চার্জ অনেক, তার মধ্যে দুটো গুরুতর। এক, গতকাল অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়ে ঝুপড়িতে আপনি একজন মহিলার গায়ে হাত তুলেছেন। যেটা আপনি করতে পারেন না। মহিলা মলেস্টেশনের চার্জ আনতে চান, কিন্তু ডিপার্টমেন্ট ব্যাপারটা ততদূর গড়াতে দিতে চায় না। ফিজিক্যাল অ্যাসল্টের কেস ফাইল করা হয়েছে আপনার বিরুদ্ধে,” এসপি বললেন।
অনেক সম্ভাবনাই মাথায় ঘুরেছে আজ ফোনে দুবে’র তলবটা পাওয়ার পর থেকে কিন্তু এটা তাঁর কল্পনারও বাইরে ছিল। ঠান্ডা মাথার মানুষ হিসেবে পরিচিত প্রতীক সেন মুহূর্তেই মেজাজ হারালেন তাঁর বিরুদ্ধে আনা এই ঘৃণ্য অভিযোগটি শুনে।
“মিথ্যা কথা স্যার। ব্ল্যাটান্ট লাই। ঝুপড়িতে কোনো মহিলা ছিল না। বোরখা পরা যে ব্যক্তি ছিল সে মহিলা হতে পারে না,” টেবিল চাপড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন প্রতীক সেন।
“কী করে বলছেন আপনি এই কথা? সেই ব্যক্তি কি বোরখা খুলে নিজের আইডেন্টিটি ডিজক্লোজ করেছিল?”
“ইটস অবভিয়াস স্যার! ওরকম চেহারা কোনো মহিলার হতে পারে না!”
“আপনি আমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না। সেই ব্যক্তি কি নিজের আইডেন্টিটি ডিজক্লোজ করেছিল? ইয়েস অর নো। এক কথায় জবাব দিন,” পালটা ধমকে উঠলেন এবার এসপি’ও।
প্রতীক দিশাহারা বোধ করছেন। কী জবাব দেবেন এই প্রশ্নের? সেই ব্যক্তি গুলি চালাতে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তে সে প্রকৃতই মহিলা না পুরুষ সেই বাছবিচার করতে গেলে তার হাতেই অনেকের প্রাণ যেতে পারতো।
প্রতীক এসপি’র থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে রাখলেন। তাঁর অভিব্যক্তিতে চূড়ান্ত হতাশার ছায়া যতীন্দ্র দুবের দৃষ্টি এড়াল না।
“সেই মহিলা আর তাঁর স্বামী এখানেই আছেন। এই মুহূর্তে তাঁকে ডাকলে তিনি এসে আপনাকে আইডেন্টিফাই করবেন। আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন এ সে নয়?”
জীবনে প্রথমবার উর্দি গায়ে গলা ধরে আসছিল প্রতীক সেনের। বেশ কষ্ট করে তিনি কয়েকটি কথা কেবল উচ্চারণ করতে পারলেন, “এটা ষড়যন্ত্র স্যার। কে করছে, কেন করছে সব আপনি জানেন। গতকাল ঝুপড়িতে বোরখা পরে কোনো মহিলা ছিল না। আর আমি তাকে ধাক্কা মারা ছাড়া কিছুই করিনি। তাও সেটা সেল্ফ ডিফেন্সে। বরং সে পিস্তল বের করেছিল। আমি জোর দিয়ে বলছি স্যার ওটা কোনো মহিলা হতে পারে না!”
“হতে যে পারে না, সেটা তো প্রমাণ করতে হবে। আপনি বলছেন ওরকম চেহারা কোনো মহিলার হতে পারে না। এটা তো যুক্তি হতে পারে না,” জবাব দিলেন এসপি।
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন প্রতীক সেন। একটা ঝড় যেন তোলপাড় করে দিচ্ছে তাঁর মনের ভিতরটা। জীবন বাজি রেখে অপরাধ দমন করতে যাওয়ার এই পরিণাম! আইনের রক্ষক! গালভরা কথা! রক্ষক হতে গেলে এই ইনাম জুটবে কারণ তোমার রক্ষক হয়ে ওঠার চেষ্টা ভক্ষকের স্বার্থসিদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সারা দেশ জুড়ে চলছে এই অনাচার। দুঃসাহসী অভিযান চালিয়ে অপরাধী ধরছেন তাঁর মতো পুলিশকর্মীরা আর রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে তারা কলার তুলে উদ্ধত ভঙ্গিতে লকআপ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় উপহার দিয়ে যাচ্ছে তীব্র তাচ্ছিল্যভরা চাহনি।
উলটোদিকে বসা বিধ্বস্ত মানুষটাকে একটু সামলে নেওয়ার ফুরসত দিলেন যতীন্দ্র দুবে। একই রকম মানসিক অবস্থা তাঁরও, কিন্তু তিনি নিরুপায়।
প্রতীক বুঝতে পারছিলেন তাঁর করণীয় কিছু নেই। বরং অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ করতে গেলে নিজের জন্য আরো কিছুটা অপমানকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হবে। এসপি’র অফিসের কর্মীরা রগড় দেখবে, খবর রটবে হাওয়ায়।
তিনি স্যালুট ঠুকে বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় এসপি বললেন, “এখানেই শেষ নয় সেন। আপনি লকআপে বন্দি ক্রিমিন্যালদের জামিন পাইয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠছেন, এই অভিযোগও উঠছে। এটা কি একজন পুলিশ অফিসারের ডিউটি? এফআইসিএন কেসে অ্যারেস্টেড দুজন ক্রিমিন্যালকে এর আগেও আপনি নিজের উদ্যোগে নাকি জামিন পাইয়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন কদিন আগে সেম কেসে ধরা পড়েছে। আপনিই ধরেছেন। আবারও নেক্সট হিয়ারিংয়ের ডেটে যাতে সে বেল পায়, সেই চেষ্টা করছেন আপনি। দিস ইজ আ সিরিয়াস চার্জ, সেন! দিস ইজ নেগলিজেন্স অফ ডিউটি! কিছু বলার আছে আপনার?”
প্রতীকের কিছু বলার ছিল না। তিনি জানেন এই অভিযোগটা এসপি’র কানে কে তুলেছে। একটু আগে সেই ব্যক্তি এই ঘরেই উপস্থিত ছিল। হ্যাঁ, নেগলিজেন্স অফ ডিউটিই বটে। নেপথ্যে থেকে গরিব মানুষদের দিয়ে অপরাধ করায় যারা তাদের দিকে চোখ তুলে তাকিও না, পেটের দায়ে সেই অপরাধ করে যারা, তাদের জেলের ঘানি টানাও শুধু। এটাই ডিউটি। বহু ক্ষেত্রেই ধরা পড়া আসামীরা পরবর্তীকালে পুলিশের খোচর হয়ে কাজ করে। নিজেদের কাজের সুবিধের জন্যই সেরকম খোচর তৈরি করতে হয়, তাদের পুষতে হয়। গোপন মিশনের ক্ষেত্রে যে জিনিসটা পুলিশ ফোর্সকে প্রথম পদক্ষেপটা নিতে সাহায্য করে, পুলিশের ভাষায় তাকে বলে টিপ অফ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেসব টিপ অফ আসে এই ধরনের খোচরদের থেকে। অনেক রাঘব বোয়ালকে পুলিশ তার জালে জড়াতে পারে এই টিপ অফের কারণেই। কিন্তু…
এসপি’কে স্যালুট করে পিছন ফিরলেন প্রতীক সেন। আজ তাঁর শক্তিশালী বুটজোড়া যেন বোবা হয়ে গেছে। মেঝের উপর কোনো শব্দ তারা তুলছে না। নাকি তিনি শুনতে পাচ্ছেন না?
একজন সৎ অফিসারের ঘামে ভেজা উর্দির পিঠটা এভাবে দেখতে ভালো লাগছিল না যতীন্দ্র দুবের। তিনি চোখ নামিয়ে রাখলেন টেবিলের উপরে খোলা ফাইলে। সেখানে দৃষ্টিকে আটকে রেখেই বললেন, “আপনাকে অফিসিয়ালি নোট ইস্যু করা হবে। আবারও বলছি, ডিপার্টমেন্ট এটা নিয়ে কোনো হাঙ্গামা চায় না। তাই নো প্রেস, নো মিডিয়া প্লিজ। তাদেরকে যা বলার ডিপার্টমেন্ট বলবে।”
