ইনজুরি টাইম – ৪৫

৪৫

ধুকধুক… ধুকধুক… অন্ধকার গর্তের মধ্যে হাঁটু মুড়ে বসে আছে পল্টু; শুনতে পাচ্ছে তার হৃদ্স্পন্দন। তার ভীষণ ভয় করছে। সে মাথা তুলে দেখছে একটু দূরেই দু-তিনজন লোক কী যেন আলোচনা করছে। আলোচনা হচ্ছে তাকে নিয়েই। আকাশটা কেমন অদ্ভুত নীলচে দেখাচ্ছে। এরকম আকাশের রঙ সে সচরাচর দেখে না।

একটা জন্তু এসে পল্টুর জামার কলার কামড়ে ধরে তাকে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে নিয়ে গিয়ে ফেলল লোকগুলোর সামনে। তাদের মধ্যে একজনের চেহারা দৈত্যের মতো। লোকটা পল্টুর দিকে হাত বাড়িয়েছে। কী ভয়ংকর সেই হাত। কালো লোমে ভর্তি, আঙুলের ডগায় বাঘের মতো বিরাট বিরাট নখ।

“পল্টু পাস পাস, পল্টু পাস,” কে যেন চেঁচাচ্ছে একটু দূর থেকে।

আরে! পায়ের কাছে বল এল কোত্থেকে!— পল্টু চমকে উঠল।

লোকটা ওর পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে প্রচণ্ড শক্তিশালী একটা শট নিল। টিভির স্ক্রিন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। লোকটা সারা শরীর কাঁপিয়ে বিশ্রীভাবে হেসে উঠল। তারপর পল্টুর দিকে আবার হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বলল, “হাই, আই অ্যাম শংকর শর্মা!”

একটা কাঁপুনিতে পল্টু টের পেল তার ঘুম ভেঙে গেছে। পাশে রাজাদা আর দীপেশ অঘোরে ঘুমোচ্ছে।

পল্টু উঠে বসল। গায়ে হাত দিয়ে দেখল স্যান্ডো গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। ব্যাপারটা বুঝতে পারল সে। কারেন্ট চলে গেছে। ইনভারটরে এসি চলার প্রশ্ন নেই, তাই শুধু ফ্যান চলছে। পল্টুর চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোনো অভ্যেস, কিন্তু গরমের ঠ্যালায় তার ঘুম ভেঙে গেছে।

কিন্তু স্বপ্নটা! দিব্যি ভালো ছিল সে ডাক্তারবাবুর ওষুধ খেয়ে। অনেকদিন বাদে আজ আবার সেই স্বপ্ন। একটু পিছিয়ে যেতেই পল্টু হিসেবটা মিলিয়ে ফেলতে পারল। রাত্রে খাওয়ার সময়ে মেসোমশাই বলেছিলেন টিভিতে নাকি জঙ্গিদের স্কেচ দেখাচ্ছে। রাজাদা আর দীপেশ ওঠেনি; ওরা টুর্নামেন্ট নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, কিন্তু পল্টু একবার গলা বাড়িয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে বসার ঘরের দিকে নজর দিয়েছিল। স্কেচগুলো এক ঝলক দেখে ফেলেছিল সে।

খাটের পাশে রাখা টুলের উপর থেকে জলের বোতল নিয়ে অনেকটা জল খেয়ে ফেলল পল্টু। টয়লেট থেকে ঘুরে এল, তারপর বারান্দার দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু মাঝে মাঝে কয়েকটা টোটো বিশ্রী চাপা শব্দ করে রাস্তা দিয়ে এদিকওদিক যাচ্ছে। তাদের হেডলাইটগুলোকে দেখে যেন কেমন লাগছে!

ঘরে গরম হলেও বাইরে দাঁড়িয়ে পল্টুর আরাম লাগছিল। একটা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। সে হাওয়ায় কেমন যেন একটা বৃষ্টি বৃষ্টি গন্ধ। নিশ্চয়ই ধারেকাছে কোথাও হচ্ছে। আকাশে এক ঝলক বিদ্যুৎ দ্রুত গাছের শিকড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ল। ভালো লাগছিল পল্টুর। এসব দেখেই সে বড় হয়েছে। এখন কলকাতায় হোমের জানালা দিয়ে কেবলই এক ফালি আকাশ দেখতে পায়।

কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, পল্টুর খেয়ালও ছিল না। নানা রকম চিন্তা; মায়ের কথা, বাবার কথা ভিড় করছিল মনে। বাবার সঙ্গে আজ সকালেই ফোনে কথা হয়েছে তার; তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন সেই স্বপ্ন আর দেখেছে কিনা, আর আজ রাতেই…

পল্টুর ঘোর কাটল একটা শব্দে। নিচে কোল্যাপসিবল গেট খোলার শব্দ হচ্ছে। রাতের অন্ধকার এতক্ষণে তার চোখে সয়ে এসেছে, তার উপর মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। পল্টু দেখল গেট বন্ধ করে শংকর শর্মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এক ঝলক বিদ্যুতের আলোয় তাঁকে চিনে নিতে অসুবিধে হল না পল্টুর। কোথায় যাচ্ছে এত রাতে লোকটা? তাও এই লোডশেডিংয়ের মধ্যে, ঘুটঘুটে অন্ধকারে?

আজ সকালে হ্যান্ডশেকের সময়েই পল্টুর কেমন যেন মনে হয়েছিল লোকটাকে? কে ও? কী করতে এসেছে এই বাড়িতে?

এক সময় কারেন্ট এল। রাজাদাদের বাড়িটা যেহেতু বড় রাস্তার উপর, আশপাশটা নিয়নের আলোয় ভেসে গেল দ্রুত। পল্টুর কিন্তু অন্ধকারটাই ভালো লাগছিল। সে বারান্দার দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে ফিরে এল ঘরে। বিছানায় গা এলিয়ে দিলেও তার ঘুম আসতে চাইছে না। এমন বেশ কয়েকদিন বাদে হচ্ছে।

একবার ভাবল মাটির মূর্তিটা নিয়ে বসবে কিনা। সেটার কাজ অনেক দূর এগিয়েছে, এবার ফিনিশিং টাচ দেওয়া বাকি। এখন সেটা ওদের ঘরেরই কোনায় আছে। কিন্তু এখন কাজ করতে গেলে ঘরের আলো জ্বালতে হয়; তাতে আবার রাজাদা’র অসুবিধে হবে। কাল থেকে ওদের টুর্নামেন্টের প্র্যাকটিস শুরু হবে। রাজাদা খুব উত্তেজিত। পল্টুরও ভেবে আনন্দ হচ্ছে। সেও তো যাবে মাঠে। বাকিদের মতো পল্টুরও দারুণ লাগে রণজয়স্যারকে।

মূর্তির চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে জোর করে চোখ বুজল সে।

রাত দেড়টা, অথচ চোখের পাতা এক করতে পারছিল না সঞ্চিতা। গতকাল এনএটিসি’র এক অফিসারের হালকা জেরা আর তারপরেই আজ সন্ধ্যায় দুই ব্যক্তির বাড়িতে ঢুকে এসে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে যাওয়া, সব মিলে তার মনের উপরে একটা চাপ সৃষ্টি করেছে। যে বয়স্ক ভদ্রলোক এসেছিলেন তিনি নিজেকে সংবাদপত্রের সম্পাদক বলে পরিচয় দিয়ে কায়দা করে অনেক কিছু জানার চেষ্টা করছিলেন বটে কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তির চোখের শীতল চাহনি বারবার সঞ্চিতার চোখ টানছিল। তাছাড়া এনএটিসি তাকে আয়েশা সুলতানা সম্বন্ধে কী কী প্রশ্ন করেছে সেটা জানার জন্য তো কোনো সাংবাদিককেই পাঠানো যেত, সম্পাদকের আসার প্রয়োজন হল কেন?

ভদ্রলোক নিজেকে আয়েশার পরিচিত বলে দাবি করছিলেন বটে, হত্যার ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত সে কথাও বলছিলেন কিন্তু সঞ্চিতার মনে হচ্ছিল সেটা ভান ছাড়া কিছুই নয়। সঞ্চিতা রবিউল আলমকে বলেছে কী কী প্রশ্ন এনএটিসি’র অফিসার গতকাল করেছে তাকে, কিন্তু যা গোপন করে গেছে তা হল গোটা ঘটনাটা সম্বন্ধে তার একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ।

মন ভালো লাগছিল না সঞ্চিতার। প্রোডাকশন ইউনিটের সদস্য হওয়ার কারণে অনেক তারকা, মহাতারকা, উঠতি অভিনেতা, অভিনেত্রীদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ তার হয়েছে। কারোর কারোর সঙ্গে একটু গভীর আলাপও হয়েছে। কিন্তু লম্বা প্রোজেক্টের কারণে আয়েশা সুলতানার সঙ্গে তার একটা অন্যরকম ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। সব সময়ই যে খুব মিষ্টি কথা বলেছেন ম্যাডাম তাকে, তা একেবারেই নয়। অসম্ভব মুডি মানুষ আর বদমেজাজি ছিলেন; অনেক সময়ই খুব রুক্ষ ব্যবহার করেছেন, কিন্তু মুড ভালো থাকলে যেন ভগবান। কত গল্প করেছেন। ছোটবেলার কথা, ‘আড়াল সরিয়ে’ ছবির পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রমাগত আক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের কথা, এমনকী সঞ্জয়শেখরকে যে তাঁর ভালো লাগছে, সেই আলোচনাও করেছেন। আর… না সেটা নিয়ে আর ভাবতেই চায় না সঞ্চিতা।

পোস্টমর্টেম হওয়ার পরে গতকাল ম্যাডামের দেহের সৎকার হয়েছে। সঞ্চিতার সেখানে যেতে ইচ্ছে করেনি। স্টুডিওতে লাঞ্চ ব্রেকে মোবাইলে নিউজ চ্যানেলের পেজে লাইভ দেখেছে আর ঝাপসা চোখ মুছেছে বারে বারে। সেই যন্ত্রণা, আবেগ থেকেই এনএটিসি’র অফিসারকে সে অনেক কিছু বলে ফেলেছে গতকাল, কিন্তু আজ সে সতর্ক ছিল। যে চলে গেছে, গেছে। তাকে তো কাজ করে খেতে হবে। শুধু শুধু ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। কিন্তু তবু বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে এক ব্যক্তির সন্দেহজনক আচরণ। কানে বাজছে কিছু কথা যা সঞ্চিতার কপালে ভাঁজ ফেলেছে।

না, আর ভাবতে চাইছে না সঞ্চিতা। ঘুম আসছে না কিছুতেই, তাই সে বিছানা ছেড়ে কাচের শোকেসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পাল্লা খুলে বের করে নিল ব্যালেন্টাইনের বোতল। গেলাস রাখা থাকে বোতলের পাশেই। ঢেলে নিল বাদামি তরল। ঘরের নীল নাইটল্যাম্পটা সেই বাদামি তরলভরা গেলাসের মধ্যে যেন অন্য রঙে ধরা দিচ্ছে। মানুষও বোধহয় এরকমই হয়। রঙ বদলায় সময়ে সময়ে।

৪৬

সকালে জমজমাট প্র্যাকটিস সেশনের পরে ফুরফুরে মেজাজে ছিল অশ্বিন। বাবা রাজি হয়েছেন টুর্নামেন্ট অবধি তাকে এখানে থাকতে দিতে। সে গাজোল ছেড়ে চলে যেতে চায় না শুনে বলেছেন বালুরঘাটে তার একটা চাকরির জন্য চেষ্টা করছেন। সে চাকরি হলে ধকল হবে; রোজ যাতায়াতেই চলে যাবে ঘণ্টা চারেক, তবু বাড়িতে, পাড়ায় তো থাকতে পারবে। খেলা হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে দেখা তো হবে।

মন হালকা আর তাই আজ সে প্র্যাকটিসেও ছিল চাঙ্গা। স্যার খুব খুশি ছিলেন আজ। গতকাল শেষ রাতে বৃষ্টি হয়েছে, মাঠের মাটিতে, ঘাসে তার রেশ রয়ে গিয়েছিল। শরীর পুরো স্ট্রেচ করে, ডাইভ দিয়ে শট বাঁচানোর পর তার নাক যখন চলে আসছিল ঘাসের খুব কাছে, আনন্দ হচ্ছিল অশ্বিনের। হয়তো এটাই তার শেষ সিজন; সে জান লড়িয়ে খেলবে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন দলের ক্যাপ্টেন সে। কাপটা যেন ক্লাবঘরেই থেকে যায় টুর্নামেন্টের পরে, সেটা সে নিশ্চিত করবেই; ঠিক যেমন আজ নিশ্চিত করছিল প্রতিটা সেভ।

আটটা নাগাদ শ্যামলকাকা মাঠে এলেন। হাতে একটা ক্লিপবোর্ডে লাগানো এক দিস্তে কাগজ। আনন্দে অশ্বিন আর সকলের মন নেচে উঠছিল। এটার মানে ওরা জানে। টুর্নামেন্টের ফিক্সচার তৈরি হবে। ফ্রেন্ডশিপ কাপ গাজোলে এই প্রথমবার হচ্ছে কিন্তু অন্যান্য টুর্নামেন্ট হতেই থাকে। এভাবেই মাঠে বসে ফিক্সচার তৈরি হয়। শ্যামলকাকা অবশ্য শুরুতেই একটা মনখারাপের খবর শোনালেন। যে যে টিম গতবার খেলেছিল তাদের সকলের সঙ্গেই তিনি যোগাযোগ করেছেন ইতিমধ্যেই, কিন্তু নেপালের টিমটা জানিয়েছে এত অল্প সময়ের নোটিসে তারা টিম পাঠাতে পারবে না। স্বাভাবিক; টুর্নামেন্ট তো এই সময় হয় না।ওদের ব্যাজার মুখ দেখে শ্যামলকাকা বললেন, “আরে মুখ ঝুলিয়ে দিলি কেন তোরা? নেপালের টিম আসবে না তো কী হয়েছে? কলকাতার দুটো টিম আসবে তার বদলে। আর কালিয়াচকের টিমটা কিন্তু সলিড। সেয়ানে সেয়ানে টক্কর হবে, দেখে নিস।”

বাংলাদেশের টিমটা অবশ্য আসবে এবং সেটা ওদের কাছে একটা স্বস্তির খবর। দুটো টিমই না এলে ব্যাপারটার মধ্যে যে একটা ইন্টারন্যাশনাল গন্ধ আছে, সেটা উবে যেত।

ফিক্সচার হল, চা, সিঙ্গাড়া, জিলিপি দিয়ে মিটিংও হল। শেষে শ্যামলকাকা বললেন, “শোন, ট্রফির ডিজাইন চেঞ্জ হচ্ছে সে তো বলেইছি। আমি কলকাতায় কলেজ স্ট্রিটে খোঁজ নিয়েছি একজনকে দিয়ে। ওখানে বড্ড দাম চাইছে। বাজেট ক্রস করে যাবে। শিলিগুড়ি থেকে আনাবো। তবে কিটব্যাগ এবার চ্যাম্পিয়ন আর রানার্স, দুই দলই পাবে। ওগুলো কলকাতা থেকেই আসবে। টপ কোয়ালিটি।”

মিটিং শেষ হতে হতে প্রায় পৌনে নটা হয়ে গেল। যে যার মতো দৌড়ল বাড়ির দিকে। স্যার শুধু সৌভিককে রেখে দিলেন মাঠে। ওর খেলা নিয়ে তিনি খুশি নন।

মাঠের পাঁচিলের গায়েই দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিলেন প্রতীক সেন। বাড়ি থেকে বেরোনোর মানসিকতা ছিল না, কিন্তু স্ত্রী অন্তরা একরকম জোর করেই তাঁকে বের করেছেন।

“এটা ঠিক না। তুমি এভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিলে সবাই ভাববে অভিযোগটাই সত্যি। তুমি তো বলছো কেউ বিশ্বাস করেনি তোমার বিরুদ্ধে ওই নালিশ, তাহলে কেন লুকিয়ে থাকবে চোরের মতো? যাও সকলের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মেশো, দেখো না মানুষ কী বলে,” বলেছিলেন তিনি তাঁর অবসাদের কিনারায় জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীকে। চাকরির ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করে দু’ দিনের জন্য ছুটে আসা সহধর্মিণীর কথাটা ফেলতে প্রতীকের মন চায়নি।

মাঠে এসে অবশ্য প্রতীকের ভালোই লাগছিল। বলটা একবার ছিটকে চলে এসেছিল তাঁর দিকে। পায়ের পাতায় হালকা নাচিয়ে সেটাকে মাঠে ফেরত পাঠানোর সময় বেশ চনমনে বোধ করছিলেন তিনি। অনেক পরিচিত মানুষ সকালে মাঠের বাইরের বাজারে আসেন। কারোর চোখেই তাঁর প্রতি ঘৃণা দেখেননি প্রতীক। কয়েকজন কথা বলতে একটু ইতস্তত করছিল বটে, মুখে একটা যেন অপ্রস্তুতের হাসি, কিন্তু “সবই বুঝতে পারছি আমরা, আপনি ভেঙে পড়বেন না” জাতীয় কথাই বেশি শুনেছেন তিনি।

মাঠ ফাঁকা হয়ে এলে প্রতীকও বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। অনেকক্ষণ থেকেই কিছুটা দূরে বেশ লম্বা, পেটানো চেহারার এক ভদ্রলোককে লক্ষ করছিলেন তিনি। ভদ্রলোকও বার কয়েক ছুটে আসা বল জোরালো শটে মাঠে ফেরত পাঠিয়েছেন। প্রতীক লক্ষ করলেন ভদ্রলোক তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছেন।

“আপনার সঙ্গে দু’ মিনিট কথা বলা যায়?” ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন।

মুহূর্তেই একটা অস্বস্তি মাথাচাড়া দিল প্রতীকের মনে।

“কী ব্যাপারে বলুন তো?” তিনিও পালটা বললেন।

“আই অ্যাম শংকর শর্মা। কানপুর থেকে আসছি। অ্যাকচুয়ালি আমাদের একটা হসপিটাল চেইন আছে নর্থ ইন্ডিয়াতে। নাম কিওর প্লাস। আমাদের কাম্পানি এখানেও একটা প্রোজেক্ট করতে ইন্টারেস্টেড। সেই ব্যাপারে একটু সার্ভে করতে এসেছি,” ভদ্রলোক বাংলায় বললেন। সে বাংলায় অবাঙালি টান স্পষ্ট। প্রতীক সেন অনুমান করতে পারলেন ভদ্রলোক তাঁর পরিচয় জেনেছেন, কিন্তু বর্তমান অবস্থা জানেন না।

“নো কমেন্ট” বলে এড়িয়ে গিয়ে তিনি পায়ের গতি বাড়াতে উদ্যত হলেন।

“এক্সকিউজ মি মিস্টার সেন! আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাইছিলাম। সিনস ইউ আর দ্য মেইন ল এনফোর্সার হিয়ার”— শংকর শর্মা বললেন।

প্রতীক থামলেন। “ইউ আর” কথাটা যেন কানে একটা ধাক্কা দিল। সামান্য দূরত্ব থেকে তিনি বললেন, “আই ওয়াজ!”

শংকর শর্মার চোখে ধরা পড়ছিল একটি অভিমানী মানুষের অভিব্যক্তি। এই অভিমান স্বাভাবিক। কিন্তু অভিমানের দেওয়াল ভেঙে যত দ্রুত সম্ভব তাঁকে পৌঁছাতে হবে মানুষটার কাছে।

৪৭

মেটেলি থানার সামনে গাড়ি থামার শব্দ হতেই বুকটা মুচড়ে উঠল সাব-ইন্সপেক্টর অর্জুন দাসের। তিনি নিশ্চিত, এনএটিসি’র দুই অফিসার আসছেন সরকারিভাবে আয়েশা সুলতানা ও সঞ্জয়শেখরের মার্ডার কেসের হ্যান্ডওভার নিতে। গতকাল রাতেই তিনি জেনেছেন এই হ্যান্ডওভার এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

ভারি বুটের শব্দ তুলে ভিতরে ঢুকে এলেন ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠী ও সুনীল রক্ষিত। কাগজপত্রের কাজ হতে যতটুকু সময় লাগল ততটুকুকেই কাজে লাগিয়ে ধর্মেন্দ্র অর্জুনের থেকে জেনে নিলেন কিছু প্রশ্নের উত্তর। এখনও অবধি তৈরি হওয়া ডকুমেন্টস বলছে স্থানীয় থানা বেশ দক্ষতার সঙ্গে তদন্তটা করছিল। কিন্তু এই তদন্তকে ত্বরান্বিত করতে হবে।

কাগজপত্র হস্তান্তর হয়ে যাওয়ার পরে সেসব নিজের জিম্মায় নিয়ে ধর্মেন্দ্র অর্জুনের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখলেন, “এনি স্পেশাল রিমার্ক?”

অর্জুনের মুখে একটা শ্লেষের হাসি ফুটল। তাঁর বলতে ইচ্ছে করছিল “আমরা কিছুই পারি না, তাই তো আপনাদের মতো অফিসারদের লাগে। আমরা আর কী রিমার্ক দেবো?” কিন্তু তিনি তা করলেন না। তদন্তের গোড়া থেকেই যে জিনিসটা তাঁর মনে বারবার প্রশ্ন তুলেছে সেটার কথা জানালেন প্রশ্নকর্তাকে। তিনি জবাবে “থ্যাঙ্ক ইউ” বলে হ্যান্ডশেক করে থানা থেকে বেরিয়ে গেলেন সঙ্গীসমেত। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ জোরাল থেকে আবার ফিকে হয়ে মিলিয়ে গেল। ওই গাড়ির পরবর্তী গন্তব্য জানেন অর্জুন। এনএটিসি’র দুই অফিসার যাচ্ছেন মর্গে, যেখানে আয়েশা সুলতানা ও সঞ্জয়শেখরের আততায়ীদের মৃতদেহ এখনও রাখা আছে। তাদের দেহের পোস্টমর্টেম রিপোর্টও দেখে নিয়েছেন তাঁরা ইতিমধ্যেই।

একটু হতাশ বোধ করছিলেন অর্জুন দাস। তিনি দেখতে পাচ্ছেন সামান্য দূরত্বে এক মহিলা বেঞ্চে বসে আছেন মাথায় হাত দিয়ে। তাঁর সঙ্গে এসেছেন আরো দুজন। মহিলা তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে নালিশ করতে এসেছেন।

একটা দীর্ঘঃশ্বাস অর্জুনের বুক ঠেলে বেরিয়ে এল। তাঁদের মতো ছোট ছোট থানার পুলিশকর্মীদের এসব কেস নিয়েই জীবন কেটে যাবে। হাই প্রোফাইল কেসের জন্য ভাগ্য লাগে। যদিও বা জোটে, কাক, চিল এসে ছোঁ মেরে নিয়ে চলে যাবে!

যেহেতু কেস আর পুলিশের হাতে নেই তাই তাদের নির্দেশ মেনে শুভঙ্করেরও ডুয়ার্সের রিসর্টে বন্দি হয়ে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এনএটিসি’র দুই অফিসার এগারোটা নাগাদ তার সঙ্গে আরেক দফা কথা বলে তাকে কলকাতা ফিরে যাওয়ার ছাড়পত্র দিয়েছেন, কিন্তু সঙ্গে বলেছেন এই মুহূর্তে কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা যেন সে না করে। শুভঙ্কর ঘাড় কাত করে হ্যাঁ বলেছে কারণ তার কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সে রিসর্টে বলে গাড়ির ব্যবস্থা করে নিয়েছে। এত অল্প সময়ে ট্রেনে টিকিট পাওয়া কঠিন, তাই গাড়িতে শিলিগুড়ি পৌঁছে সেখান থেকে কলকাতার বাস ধরে নেবে সে।

দুপুর নাগাদ শুভঙ্কর বেরিয়ে যাওয়ার পরে ধর্মেন্দ্র ও সুনীল রিসর্টের ম্যানেজার দেবেন দত্তকে ডেকে পাঠালেন তাঁদের ঘরে। ভদ্রলোককে প্রথমবার দেখেই ধর্মেন্দ্রর একটু স্নায়বিক প্রকৃতির বলে মনে হয়েছিল। যেন কোনোকিছু নিয়ে অসম্ভব মানসিক চাপে আছেন, এমন একটা শরীরী ভাষা।

ধর্মেন্দ্রর মুখোমুখি দেবেন যখন বসলেন, তাঁর দু’ হাত থরথর করে কাঁপছিল।

“লোকাল পুলিশের অবজারভেশন, আপনি ওদের সব প্রশ্নের সঠিক জবাব দেননি। তাঁরা মনে করছেন আপনি যা বলেছেন তার বাইরেও কিছু জানেন, কিন্তু চেপে গেছেন। এমনটা মনে করার কোনো কারণ আছে কী?” সুনীল রক্ষিত প্রশ্ন করলেন পরিষ্কার বাংলাতেই।

দেবেন মাথা নিচু করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। ধর্মেন্দ্র তাঁর দিকে নজর রাখার পাশাপাশি থানা থেকে নিয়ে আসা কাগজপত্রে চোখ বোলাচ্ছিলেন দ্রুত। এবার ফাইল ভাঁজ করে রেখে দেবেনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

“ডরনে কা কোই বাত নেহি। জো ভি মালুম হ্যায় আপ কো, জো কুছ ভি দেখা হ্যায় আপ নে, বতা দিজিয়ে,” বললেন তিনি।

দেবেন দত্ত চোখ বুজলেন। ধীরে ধীরে ফিরে গেলেন সেই আলো আবছায়ার বিকেলে। একটা একটা করে ফ্রেম মনে করার চেষ্টা করলেন। সেদিন একটি হিসেব মেলাতে পারেননি তিনি। রাত্রে থানায় যখন তিনি বসে, সে হিসেব আরো গুলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সে কথা বললে তাঁকে বিপদে পড়তে হবে না তো!

কিছুটা সময় কেটে গেল অপার নিস্তব্ধতায়। তারপর মুখ খুললেন দেবেন দত্ত। তাঁর বয়ান আর আদিবাসী মেয়েটির বয়ানকে জুড়লে কাহিনির একটি অদেখা দিক বেরিয়ে আসছে। ঠিক যেমন আড়ালে রাখা ক্যামেরা একটি ঘটনার অন্য দৃষ্টিকোণ তুলে ধরে।

দেবেনের বয়ান মোবাইলের ভিডিও ক্যামেরায় নথিভুক্ত হচ্ছিল দ্রুত। সে কাজ মিটে যেতে ধর্মেন্দ্র ত্রিপাঠী তাঁকে নিস্তার দিলেন, তবে সঙ্গে যোগ করলেন, প্রয়োজন হলেই কলকাতায় তাঁর ডাক পড়বে। সে ডাক এড়ানোর চেষ্টা করলে ফল ভালো হবে না।

স্নায়বিক প্রকৃতির রিসর্ট ম্যানেজারকে এখন যেন একটু হালকা মনে হচ্ছে। যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ছে লোকটার। তিনি বেরিয়ে যেতেই এনএটিসি’র দুই সাব-ইন্সপেক্টর টাটকা হাতে পাওয়া তথ্য নিয়ে গভীর আলোচনায় ডুবলেন।

দুপুর একটা: মালদা স্টেশন সংলগ্ন ঝলঝলিয়ায় বড় রাস্তার উপরে অবস্থিত ‘হোটেল গ্ল্যামার’-এর একশো বারো নম্বর রুমের কলিংবেল বাজালেন সুখেন্দু সরকার। শংকর শর্মা নামের এক ব্যক্তি গতকাল অনেক রাতে তাঁকে ফোন করেছিলেন। কিছু বিষয়ে একটু কথা বলতে চান। ভদ্রলোক গাজোলে তাঁর কোম্পানির কিছু প্রোজেক্ট নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন। এক্সক্লুসিভ একটা খবরের আশায় অভিজ্ঞ সাংবাদিক দেখা করতে রাজি হয়েছেন।

দরজা খুললেন বেশ স্বাস্থ্যবান এক ব্যক্তি। নিজের পরিচয় দিলেন, তারপর বেশ আপ্যায়ন করে বসালেন সুখেন্দুকে। সামান্য কুশল বিনিময়ের পরে শুরু হল আলোচনা। টেবিলের উপর থেকে কিছু ব্রোশিওর-লিফলেট সুখেন্দুুর হাতে তুলে দিলেন শংকর শর্মা। এলাকার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা কী, প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ প্রোজেক্ট করতে গেলে লোকাল পলিটিশিয়ানদের থেকে সহযোগিতা পাওয়া যাবে নাকি বাধা পেতে হবে, সেই ব্যাপারেই মূলত আলোচনা চলছিল। কিন্তু কথাপ্রসঙ্গে গাজোলে সাম্প্রতিককালে ঘটেছে এবং কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে এমন কিছু বিষয়ও সামনে চলে আসছিল। এক্সক্লুসিভ খবর বের করার মূল্য হিসেবে তথ্যগুলো দিচ্ছিলেন সুখেন্দু সরকার।

৪৮

ঢাকা শহরের ব্যস্ততম অঞ্চল থেকে কিছুটা দূরে নিজেদের গোপন ডেরায় গ্রীষ্মের দুপুরে সহযোদ্ধাদের নিয়ে মিটিংয়ে বসেছিল ইজাজ। গতকাল রাত্রে এসে গেছে সেই বার্তা যার জন্য অধীর আগ্রহে সে অপেক্ষা ও প্রার্থনা করে গিয়েছে। ইখলাস রুবেল কারোর আবেগকে গুরুত্ব দেয় না, সে যে কাজের জন্য যাকে সেরা মনে করবে তাকেই সেই দায়িত্ব দেবে। তাই ইজাজের মনে আশঙ্কা ছিল। অবশেষে মেঘ কেটে গেছে।

কিন্তু যে নির্দেশ এসেছে রুবেলের তরফ থেকে তা ইজাজ এবং তার সহযোদ্ধাদের বেশ অবাক করেছে। এমন কিছুর জন্য তারা একেবারেই তৈরি ছিল না। এক সময় যা অভ্যেসের অংশ ছিল তা আজ আর নেই। নদী ছেড়ে জীবন সরু নালা দিয়ে বয়ে চলেছে। তাই সেই অতীত জীবনের ছায়ায় ফেরাটা বেশ কঠিন। কিন্তু নির্দেশ নির্দেশই। মানতে হবে। আর ব্যাপারটার মধ্যে একটা অন্যরকম চ্যালেঞ্জের গন্ধও আছে।

প্রায় দেড় ঘণ্টার মিটিংয়ে ইজাজ তার সহযোদ্ধাদের বুঝিয়ে দিল তাদের কী ভূমিকা হতে চলেছে আসন্ন অপারেশনে। তারপর ডেরা থেকে বেরিয়ে পড়ল সকলে। বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে হবে তাদের এবার। ইজাজ নিজে গেল শহরের দিকে। ব্যস্ত রাস্তার উপরে একটি প্রকাশনা সংস্থা নতুন দোকান খুলেছে। ডেরায় আসার পথে ইজাজ সেই দোকানের সামনে পুলিশি নিরাপত্তার ঘেরাটোপ দেখে এসেছে। কান খাড়া রাখতে হয় তাদের মতো মানুষদের। সে কানে খবর পৌঁছেও গেছে। এপার বাংলা এবং ওপার বাংলার দুই বিশিষ্ট ও বর্ষীয়ান সাহিত্যিক আসছেন দোকান উদ্বোধন করতে। তাই নিয়ে পুলিশি ঘেরাটোপের বাইরে অপেক্ষারত সাধারণ মানুষদের উন্মাদনা তুঙ্গে। বেশ বড়সড় একটা ভিড় তৈরি হয়েছে।

ইজাজ একেবারে স্বাভাবিকভাবে হেলতে দুলতে এগিয়ে চলল ভিড়টার দিকে। কিছুদিন আগের শেষ ব্লগার হত্যার ঘটনার পর থেকেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোয় কড়া নজর রাখছে পুলিশ। উর্দিধারীরা তো আছেই, এদিকে ওদিকে নিশ্চয়ই সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে সাদা পোশাকের ইন্টেলিজেন্স অফিসারেরাও। ইজাজ বুঝেছিল এই নজরদারির বেষ্টনীর মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়াটা তার সহযোদ্ধাদের জন্য একটু ঝুঁকির হতে পারে, তাই সে নিজেই দায়িত্বটা নিয়েছে। ওরা দলে তুলনামূলকভাবে নতুন, এখনও শিখছে। সে এতদিনে পাকা খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে।

ভিড় পেরিয়ে যেতে যেতে ইজাজ ভাবছিল দুই বাংলার মধ্যে এই যে মিল, বিশেষত সাংস্কৃতিক জগতে, সেটা মন্দ নয়। এপারের বহু গুণী মানুষ ওপারে যান, তাদের প্রতিভার কদর পান ওখানে। একইভাবে ওপারের বেশ কিছু বিশিষ্ট মানুষ এপারের মানুষের কাছে অসম্ভব শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পান। এই মেলবন্ধন নিয়ে রিবাতের মতো গোষ্ঠীর কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হল এই যে কেবলই সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানে বিষয়টা থেমে থাকে না। গণ্ডি পেরিয়ে যায় মাঝেমধ্যেই, আর সেখানেই তাদের আপত্তি।

অভিনেত্রী আয়েশা সুলতানার হাজার হাজার ভক্ত আছে বাংলাদেশে এবং সে কারণেই সেই অভিনেত্রীর গণ্ডি পেরোনোর দুঃসাহস এখানকার মানুষের মধ্যে এক ভয়ংকর প্রভাব ফেলেছিল। যারা ধর্মকে সম্মান করে তারা যেমন ওই মহিলাকে তীব্র আক্রমণ করেছে, তেমনি বহু মানুষ, বিশেষত মেয়েরা সমর্থনও করেছে। ইজাজেরা খবর পাচ্ছিল দেশের কোনায় কোনায় আয়েশা সুলতানার ‘আড়াল সরিয়ে’ ছবির আইনজীবী চরিত্র অল্পবয়সি মহিলাদের সাহসী করে তুলছিল। সেটা বরদাস্ত করার জিনিস নয়, আর তাই…

অত্যন্ত মসৃণভাবে পুলিশি ঘেরাটোপ পেরিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা বাইকে স্টার্ট দিল ইজাজ।

গ্রীষ্মের দাবদাহকে অগ্রাহ্য করে সাভারে নিজেদের মাঠে প্র্যাকটিসে গা ঘামাচ্ছিল গ্রিন বুটস ফুটবল টিমের ছেলেরা। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট সকালেই জানিয়েছেন মালদার ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য তাদের যেতে হবে আর ক’দিন বাদেই। ক্লাব প্রেসিডেন্ট মলয় দত্ত এই এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তি। হিন্দু হলেও এখানকার মানুষেরা তাঁকে কোনোদিন খারাপ নজরে দেখেনি, সকলেই ইজ্জত করে। তিনিও স্থানীয় সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছেন বাপ-ঠাকুরদার মতোই। বস্তুত, তাঁর কথার ধরন, চলনবলন দেখে অনুমান করাই কঠিন তিনি ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। সেই মলয়দা সকালে এসে বেশ কড়া পেপ টক দিয়ে গেছেন টিমকে। গত বছর মালদার ওই টুর্নামেন্টের ফাইনালে দুর্দান্ত খেলেও শেষে প্রভাতী সংঘ টিমের কাছে হেরে যায় গ্রিন বুটস। এবারে কোনোমতেই তার পুনরাবৃত্তি হওয়া চলবে না।

সকালে তিনি যখন বলছিলেন, “শোন, তোরা মেহমান বলে গুটাইয়া থাকবি না। আমরা মেহেরবানি নিতে যাইতাসি না, খ্যালতে যাইতাসি। আমাদেরকে ডাকসে আমাদের খ্যালা দেখার লগে, বুঝলা? জান লড়ায়া খেলবি। তেমন হইলে তোদের আমি বড় হোটেলে থাকার বন্দোবস্ত করুম। কোনো সমস্যা নাই। তোরা খেলায় মন লাগা,” তখন টিমের ছেলেদের মধ্যে একটা আলাদা শক্তি কাজ করছিল। আগেরবার মালদায় যেখানে তাদের থাকার জায়গা নিয়ে একটা বিশ্রী বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। মলয়দা যেতে পারেননি তাঁর মা মারা যাওয়ায়। কিন্তু খবর পেয়ে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠেছিলেন। টিম তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ফোনে। তারপর গ্রিন বুটস-এর একটি অন্য হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে টুর্নামেন্ট কর্তৃপক্ষ। মলয়দা অবশ্য বলছেন এবার টুর্নামেন্টের যিনি মূল উদ্যোক্তা, সেই শ্যামলেন্দু নস্কর লোক ভালো, দুজনের ভালো আলাপও আছে।

তরুণ কোচ আখতার আলি বাবলু প্র্যাকটিসে বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন আজ। টুর্নামেন্টটা এত এগিয়ে আসবে তা তাঁর জানা ছিল না। ওপার বাংলায় গিয়ে খেলতো হবে। ইজ্জতের ব্যাপার। আগেরবার রানার্স হয়ে মাথা নিচু করে ফিরেছিল টিম, তাই এবার বাড়তি চাপ। তবে তাঁকে আশ্বস্ত করছে টিমের ছেলেদের ফর্ম। একদম ঠিকঠাক খেলছে ওরা। ফিটনেস টপ লেভেলে, স্কিলেও গত বছরের তুলনায় অনেক উন্নতি হয়েছে। ক্লাব প্রেসিডেন্ট ট্রফির স্বপ্ন দেখবেন সেটাই স্বাভাবিক, তবে খেলার প্রশিক্ষক হিসেবে বাবলু যে বাস্তবটা দেখতে পাচ্ছেন তা হল গ্রিন বুটস অন্তত সেমিফাইনাল অবধি চোখ বুজে চলে যাবে। ওপারের বেশিরভাগ টিমই তেমন পদের নয়। স্কিলে ভালো হলেও পাওয়ার গেমে গ্রিন বুটসের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না।

বিকেল ফুরিয়ে আসছিল; মাঠে সোনালি রোদের আলোয় খেলোয়াড়-দের ছায়াগুলো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছিল। এক সময় বাঁশি বাজিয়ে প্র্যাকটিসের অবসান ঘোষণা করলেন বাবলু। আজ তাঁর একটু বাড়ি ফেরার তাড়াও আছে। কিন্তু বাড়ি ফেরা হল না। ঠিক যেই মুহূর্তে ব্যাগখানা পিঠে তুলতে গেছেন, বাবলুর মোবাইল বেজে উঠল। ক্লাব প্রেসিডেন্টের ফোন। একবার তাঁর বাড়িতে ডাকছেন। এক ভদ্রলোক নাকি দেখা করতে এসেছেন।

৪৯

সাইকেলটা খুব সাবধানে, ধীরে ধীরে চালাচ্ছিল রিয়াজুল। মটকা একেবারে আগুন হয়ে আছে তার। ওদিকে জোরদার প্র্যাকটিস চলছে মাঠে, আর এদিকে তাকে সেসব ছেড়ে সেই সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে গোলামের মাংসের দোকানে। তার আব্বা নেই, আম্মি আর চাচা-চাচির সঙ্গে থাকে। চাচার ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা, রাঙাভিটায় বড় অফিস। আজ নাকি এমএলএ সাহেবের অফিসে বড় মিটিং, খাওয়া দাওয়া হবে; তার বরাত পেয়েছে চাচা। কিন্তু চাচার বাজার করার লোক আজ চারদিন ধরে বিছানায়, তাই গতকাল রাতেই রিয়াজুলকে তিনি বলে রেখেছিলেন মাংসটা তাকে একটু এনে দিতে হবে।

আট কিলো মাংস সাইকেলের হাতলে ঝুলিয়ে চালানো খুব সহজ কাজ নয়। আর গোলামের দোকানও ওদের এলাকা থেকে কম দূর নয়। অন্যান্য অর্ডার হলে পাড়ার দোকান থেকেই মাংস নেওয়া হয়, কিন্তু ভিআইপি’র দাওয়াত বলে কথা, বড় বড় রেওয়াজি বোটি চাই বিরিয়ানির জন্য। সেই কোয়ালিটি গোলাম ছাড়া কেউ দিতে পারবে না।

এক জায়গায় সাইকেল থামিয়ে একবার ডান দিকের হাতলে ঝোলানো কালো প্লাস্টিকের প্যাকেটটা পরীক্ষা করে নিল রিয়াজুল। দু’ দিকে চার চার কিলো করে ভাগ করলেও এই প্যাকেটটার অবস্থা একটু বেশি খারাপ। সে সাইকেলের গতি বাড়াল। প্যাকেট ছেঁড়ার আগেই তাকে চাচার অফিসে সাইকেল ঢুকিয়ে দিতে হবে। অফিসের পিছনেই রান্নার জায়গা। সেখানে প্যাকেট দুটো নামিয়ে তবে তার ছুটি।

কিন্তু গতি বাড়িয়ে, মোটরবাইকগুলোকে পাশ কাটিয়ে, ভ্যান, টোটোর সঙ্গে ঠোকাঠুকি এড়িয়ে অনেকটা পথ চলে এলেও শেষ রক্ষা করতে পারল না রিয়াজুল। উলটোদিক থেকে বেপরোয়াভাবে ধেয়ে আসা একটা লরিকে দেখে খুব দ্রুত রাস্তার একেবারে ডান দিকে চেপে এলেও সামনে কয়েকটা স্কুলের মেয়ে যাচ্ছে দেখে জোরে সাইকেলের ব্রেক কষতেই হল তাকে। প্রবল ঝাঁকুনিতে মাংসের প্যাকেটটা দুলে উঠতেই তার একদিকের দুর্বল হাতল ছিঁড়ে সেটা পড়ে গেল মাটিতে। রাস্তার ধারে ঘাসের উপরে ছড়িয়ে পড়ল মাংসের বড় বড় টুকরো। মেয়েগুলো টেরও পেল না কত বড় সর্বনাশ করল তারা।

রিয়াজুল এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি ঘটনার পরে। সাইকেল স্ট্যান্ড করে দ্রুত মাংসের টুকরো কুড়োতে শুরু করেছিল। কিন্তু সামান্য সময়ের পরেই সে টের পেল একটা সমবেত “ওই ওই” ধ্বনি। ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখল ছয়-সাতটা ছেলের একটা দল তেড়ে আসছে তার দিকে।

“অ্যাই শুয়োরের বাচ্চা, মন্দিরের সামনে মাংস ছড়াচ্ছিস!”

চিৎকারটা কানে আসতেই চমকে আশপাশে নজর দিল রিয়াজুল।

সর্বনাশ! তাই তো; ঘটনাটা যে একেবারে মোক্ষম জায়গায় ঘটেছে! যারা হিংস্র বাঘের মতো তার দিকে ছুটে আসছে তাদের চেনে রিয়াজুল। সবক’টা ভারত সেবক পার্টিতে ভিড়েছে। আগে ওদের সঙ্গেই খেলাধূলা করতো। বছরের পর বছর এক ক্লাসে থেকে যেত। এখন পার্টিবাজি করে। রিয়াজুল, ইসমাইল, জামশেদদের একেবারে দেখতে পারে না ওরা। সবসময় একটা ঘৃণা। ওদের মধ্যে দাসু বলে একটা মাল আছে। ইসমাইলকে গত বছর খেলার মাঠে জাতপাত নিয়ে কী যেন বলেছিল। ইসমাইল খেলার মধ্যেই এমন মেরেছিল যে মালটা আর তিন মাস ঠিক করে হাঁটতে পারেনি। মাঠে আর নামেনি হারামিটা, এখন পার্টি অফিসে ঘুরঘুর করে।

রিয়াজুলকে ওরা ঘিরে ফেলল দ্রুত। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার ধার ধারল না, শুরু করে দিল মারধর। রিয়াজুল বারবার চেষ্টা করেও বলে উঠতে পারল না ওরা যা ভাবছে তা নয়। প্রথমত মাটিতে যে মাংস পড়ে আছে তা খাসির এবং দ্বিতীয়ত, ঘটনাটা একেবারেই ইচ্ছাকৃত নয়।

চড়, কিল তো পড়ছিলই, কেউ একজন কোমরের বেল্টও খুলে নিয়ে চালাতে শুরু করেছিল।

শান্তিপূর্ণ গাজোলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল একটা উত্তেজনা। এসব খবর চাপা থাকে না। এলাকার দুই সম্প্রদায়ের মানুষ দ্রুত জড়ো হচ্ছিল মন্দিরের কাছে, প্র্যাকটিস লাটে তুলে মাঠ ফাঁকা করে ইসমাইল, সৌভিক, জামশেদ, অশ্বিনরাও একসঙ্গে ছুটছিল সেদিকে। কে কোন সম্প্রদায়ের সেটা বড় কথা নয়; রিয়াজুল তাদের বন্ধু, সে মার খাচ্ছে। তাকে বাঁচাতে হবে। সবাই মিলে।

বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেলেও উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। বিরাট পুলিশবাহিনী নিয়ে এলাকায় পৌঁছলেও থানায় একেবারে নতুন আসা সাব-ইন্সপেক্টর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিলেন। খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন সাসপেন্ডেড এসআই প্রতীক সেনও। দূর থেকে দেখছিলেন ঘটনাপ্রবাহ। এই ধরনের অশান্তির স্ফুলিঙ্গ যে দাবানল সৃষ্টি করে এক্ষেত্রে হয়তো তা হবে না কিন্তু এলাকার মানুষের মানসিকতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল প্রতীকের মনে হচ্ছিল একটা ছাই চাপা আগুন জ্বলতে থাকবে ধিকিধিকি। একটা নিরীহ, নির্দোষ ছেলেকে মেরে প্রায় আধমরা করে ছেড়েছে কতগুলো উন্মাদ। তার সম্প্রদায়ের মানুষেরা ভিতরে ভিতরে জ্বলছে। ব্যাপারটাকে হয়তো অন্যভাবেও নিয়ন্ত্রণ হয়তো করা যেত কিন্তু শাসকদলের বিধায়ক আর ভারত সেবকের নেতা ঘটনার মধ্যে ঢুকে পড়ে সেটাকে আরো জটিল করে তুলেছেন। শেষমেশ এসপি যতীন্দ্র দুবে আসায় পারদ ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে।

যতীন্দ্র’র সঙ্গে একবার চোখাচোখি হয়েছিল সামান্য দূরত্বে দাঁড়ানো প্রতীক সেনের। যেন দেখতেই পাননি এমন একটা ভান করে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু ওই এক ঝলকেই তিনি বুঝেছিলেন যতীন্দ্র দুবের চোখ তাঁকে খুঁজছে ভিতরে ভিতরে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *