গল্প
উপন্যাস
পরিশিষ্ট

১০. কালিদাসের কুটির প্রাঙ্গণ

কালিদাসের কুটির প্রাঙ্গণ। কুন্তলকুমারীকে সঙ্গে লইয়া মালিনী বেদীর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। কালিদাস নাই; কেবল বেদীর উপর মালার স্তূপ পড়িয়া আছে। যেন কবি ক্লান্তভাবে এই সম্মানের বোঝা এখানে ফেলিয়া গিয়াছেন।

মালিনী নিজেকে অনেকটা সামলাইয়া লইয়াছে, তাহার মুখের ভাব দৃঢ়। রাজকুমারী হৈমশ্রী যেন স্বপ্নলোকে বিচরণ করিতেছেন। মালিনী ঘরের উদ্দেশে ডাকিল— ‘কবি, ওগো কবি! তুমি কোথায়?’

ঘরের ভিতর হইতে সাড়া আসিল না। কুন্তলকুমারী শঙ্কিত দীন নেত্রে মালিনীর পানে চাহিলেন।

মালাগুলি জড়াজড়ি হইয়া বেদীর উপর পড়িয়া আছে, তাহার মধ্য হইতে মালিনী নিজের মালাটি বাছিয়া বাহির করিয়া লইল। পর পর লাল সাদা ফুলে গাঁথা মালা— চিনিতে কষ্ট হয় না। মালাটি সে রাজকুমারীর হাতে ধরাইয়া দিয়া বলিল— ‘নাও— আমার সঙ্গে এস। উনি ঘরেই আছেন, হয়তো পুজোয় বসেছেন।’

মালিনী অগ্রবর্তিনী হইয়া কক্ষে প্রবেশ করিল, হৈমশ্রী কম্প্রবক্ষে দ্বিধাজড়িত পদে তাহার পিছনে চলিলেন।

কুটিরে একটিমাত্র কক্ষ, আয়তনেও ক্ষুদ্র। এক পাশে কালিদাসের দীন শয্যা গুটানো রহিয়াছে, আর এক কোণে একটি দীপখণ্ড, তাহার পাশে অনুচ্চ কাষ্ঠাসনের উপর কুমারসম্ভবের পুঁথি রহিয়াছে। কিন্তু কালিদাস ঘরে নাই।

হৈমশ্রীর দেহের সমস্ত শক্তি যেন ফুরাইয়া গিয়াছিল, তিনি পুঁথির সম্মুখে জানু ভাঙ্গিয়া বসিয়া পড়িলেন, অস্ফুট কণ্ঠে বলিলেন— ‘কই, কোথায় তিনি?’

মালিনী সবই লক্ষ্য করিতেছিল, বুঝি বা তাহার মনে অনুকম্পাও জাগিয়াছিল। সে বাহিরে যাইতে যাইতে আশ্বাসের ভঙ্গিতে বলিল— ‘তুমি থাক, আমি দেখছি। বুঝি নদীতে স্নান করতে গেছেন।’

মালিনী অদৃশ্য হইলে হৈমশ্রী হাতের মালাটি কুমারসম্ভবের পুঁথির উপর রাখিলেন, তারপর আর আত্মসংবরণ করিতে না পারিয়া পুঁথির উপর মাথা রাখিয়া সহসা কাঁদিয়া উঠিলেন।

শিপ্রার তীরে কালিদাস একাকী নদীর ধারে বসিয়া আছেন। মাঝে মাঝে নুড়ি কুড়াইয়া লইয়া অলস-হস্তে জলে ফেলিতেছেন। রাজসভার উত্তেজনা কাটিয়া গিয়া নিঃসঙ্গ জীবনের শূন্যতার অনুভূতি তাঁহার অন্তরকে গ্রাস করিয়া ধরিয়াছে। অন্তর্লোকে শ্রান্ত বাণী ধ্বনিত হইতেছে— কেন? কিসের জন্য? কাহার জন্য?

মালিনী নিঃশব্দে তাঁহার পিছনে আসিয়া দাঁড়াইল। কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া হ্রস্বকণ্ঠে ডাকিল— ‘কবি!’

কালিদাস চমকিয়া মুখ তুলিলেন— ‘মালিনী!’

মালিনী বলিল— ‘কি ভাবা হচ্ছিল?’

কালিদাস একটু চুপ করিয়া রহিলেন, শেষে বলিলেন— ‘ভাবছিলাম— অতীতের কথা।’

মালিনী মৃদুস্বরে বলিল— ‘কিন্তু ভাবনা সুখের নয়— কেমন?’

কালিদাস ম্লান হাসিয়া বলিলেন— ‘না, সুখের নয়। কিন্তু এ জগতে সকলে সুখ পায় না মালিনী।’

মালিনী বহমানা শিপ্রার জলে একটি নুড়ি ফেলিল— ‘না, সকলে পায় না। কিন্তু তুমি পাবে।’

কালিদাস ভ্রূ তুলিয়া মালিনীর পানে চাহিলেন, তারপর মৃদু ঘাড় নাড়িলেন— ‘কীর্তি যশ সম্মান— তাতে সুখ নেই মালিনী। সুখ আছে শুধু— প্রেমে।’

মালিনীর মুখে বিচিত্র হাসি ফুটিয়া উঠিল; সে কবির পানে একবার চোখ পাতিয়া যেন তাঁহাকে দৃষ্টি-রসে অভিষিক্ত করিয়া দিল, তারপর মুখ টিপিয়া বলিল— ‘প্রেমে জ্বালাও আছে কবি। নাও, ওঠ এখন। তোমাকে ডাকতে এসেছিলুম, একজন তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’

‘ও— কে তিনি?’

‘আগে চলই না, দেখতে পাবে।’

কালিদাস উঠিলেন। শিপ্রার পরপারে সূর্যদেব তখন দিগ্‌বলয় স্পর্শ করিয়াছেন।

প্রাঙ্গণ-দ্বারে পৌঁছিয়া কালিদাস দ্বার ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিলেন। মালিনী কিন্তু ভিতরে আসিল না, চৌকাঠের বাহিরে দাঁড়াইয়া রহিল। কালিদাস তাহার দিকে ফিরিয়া চোখের ইঙ্গিতে তাহাকে ভিতরে আহ্বান করিলেন, মালিনী কিন্তু একটু ফিকা হাসিয়া মাথা নাড়িল।

এই সময় কুটিরের ভিতর হইতে শঙ্খধ্বনি হইল। কালিদাস মহা বিস্ময়ে সেইদিকে ফিরিলেন। মালিনী এই অবকাশে ধীরে ধীরে প্রাঙ্গণ-দ্বার বন্ধ করিয়া দিল, তাহার মুখের ব্যথা-বিদ্ধ হাসি কবাটের আড়ালে ঢাকা পড়িয়া গেল।

ওদিকে কালিদাস দ্রুত অনুসন্ধিৎসায় কুটিরের পানে চলিয়াছিলেন— তাঁহার ঘরে শঙ্খ বাজায় কে? সহসা সম্মুখে এক অপরূপ মূর্তি দেখিয়া তিনি স্থাণুবৎ দাঁড়াইয়া পড়িলেন। এ কি!

কুটির হইতে হৈমশ্রী বাহির হইয়া আসিতেছেন। গললগ্নীকৃত অঞ্চলপ্রান্ত, এক হস্তে দীপ অন্য হস্তে মালা। কালিদাসকে দেখিয়া তাঁহার গতি শ্লথ হইল না, স্থির দৃষ্টিতে স্বামীর পানে চাহিয়া তিনি কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। চোখ দু’টিতে এখন আর জল নাই, অধর যদিও থাকিয়া থাকিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে তবু অধরপ্রান্তে যেন একটু হাসির আভাস নিদাঘ-বিদ্যুতের ন্যায় স্ফুরিত হইতেছে। তিনি প্রদীপটি বেদীর উপর রাখিলেন, তারপর দুই হাতে স্বামীর গলায় মালা পরাইয়া দিয়া নতজানু হইয়া তাঁহার পদপ্রান্তে বসিয়া পড়িলেন। অস্ফুট স্বরে বলিলেন— ‘আর্যপুত্র!’

কালিদাস জড়মূর্তির মত দাঁড়াইয়া ছিলেন; যাহা কল্পনারও অতীত তাহাই চক্ষের সম্মুখে ঘটিতে দেখিয়া তাঁহার চিন্তা করিবার শক্তিও প্রায় লোপ পাইয়াছিল। এখন তিনি চমকিয়া চেতনা ফিরিয়া পাইলেন। নত হইয়া রাজকুমারী হৈমশ্রীকে দুই হাত ধরিয়া তুলিবার চেষ্টা করিয়া বিহ্বল কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন— ‘দেবি, দেবি— না না, পায়ের কাছে নয়—’

কুন্তলকুমারী স্বামীর মুখের পানে চোখ তুলিয়া দেখিলেন সেখানে প্রীতি ও ক্ষমা ভিন্ন আর কিছুরই স্থান নাই, এতটুকু অভিমান পর্যন্ত নাই। যে অশ্রুকে রাজনন্দিনী এত যত্নে চাপিয়া রাখিয়াছিলেন তাহা আর বাঁধন মানিল না, বাঁধ ভাঙিয়া বাহির হইবার উপক্রম করিল।

কালিদাস তাঁহাকে হাত ধরিয়া তুলিতেই দু’জনে মুখোমুখি দাঁড়াইলেন। অমনি মহাকালের মন্দির হইতে সন্ধ্যারতির শঙ্খঘণ্টাধ্বনি ভাসিয়া আসিল। —

অতঃপর কিছুক্ষণ কাটিয়াছে। ভাব-প্লাবনের প্রথম উদ্দাম উচ্ছ্বাস প্রশমিত হইয়াছে। উভয়ে বেদীর উপর উঠিয়া দাঁড়াইয়াছেন, তাঁহাদের হাত পরস্পর নিবদ্ধ।

কালিদাস মিনতি করিয়া বলিতেছেন— ‘কিন্তু দেবি, এ যে অসম্ভব। এই দীন পর্ণকুটিরে— না না, এ হতে পারে না—’

হৈমশ্রী বলিলেন— ‘যেখানে আমার স্বামী থাকতে পারেন সেখানে আমিও থাকতে পারব।’

কালিদাস বলিলেন— ‘না না, তুমি রাজার মেয়ে—’

হৈমশ্রী বলিলেন— ‘আমার ও পরিচয় আজ থেকে মুছে গেছে, এখন আমি মহাকবি কালিদাসের স্ত্রী!’

কালিদাসের মুখে ক্ষোভের সহিত আনন্দও ফুটিয়া উঠিল— ‘কিন্তু— এই দারিদ্র্য— তুমি সহ্য করতে পারবে কেন? চিরদিন ঐশ্বর্যের মধ্যে পালিত হয়েছ, রাজদুহিতা তুমি—’

হৈমশ্রী ঈষৎ ভ্রূভঙ্গ করিয়া চাহিলেন— ‘আর্যপুত্র, আপনার উমাও তো রাজদুহিতা— গিরিরাজসুতা; কিন্তু কৈ, তাঁকে মহেশ্বরের লতাগৃহে পাঠাতে আপনার তো আপত্তি হয়নি। তবে?’

কালিদাসের মুখে আর কথা রহিল না। হৈমশ্রীর দক্ষিণ হস্তটি ধীরে ধীরে উঠিয়া কবির বাম স্কন্ধের উপর আশ্রয় লইল।

সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে! শিপ্রার পরপারে দিগন্তের অস্তচ্ছটা ক্রমশ মেদুর হইয়া আসিতেছে। সেইদিকে চাহিয়া কালিদাস সহসা নিস্পন্দ হইয়া রহিলেন; হৈমশ্রীও তাঁহার দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া সেইদিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন।

এক শ্রেণী উষ্ট্র শিপ্রার কিনারা ধরিয়া চলিয়াছে।

হৈমশ্রী কালিদাসের পানে একটি অপাঙ্গদৃষ্টি প্রেরণ করিলেন, নিরীহভাবে প্রশ্ন করিলেন— ‘ও কী আর্যপুত্র?’

কালিদাসের মুখেও একটু হাসি খেলিয়া গেল, তিনি গম্ভীর হইয়া বলিলেন— ‘ওর নাম উষ্ট।’

হৈমশ্রী হাসি চাপিয়া বলিলেন— ‘কী— কী নাম বললেন আর্যপুত্র?’

কালিদাস তাড়াতাড়ি নিজেকে সংশোধন করিলেন— ‘না না, উষ্ট নয়, উষ্ট নয়— উট্র!’

উভয়ে একসঙ্গে কলহাস্য করিয়া উঠিলেন। কুন্তলকুমারীর যে হস্তটি স্কন্ধ পর্যন্ত উঠিয়াছিল, তাহা ক্রমে কালিদাসের কণ্ঠ বেষ্টন করিয়া লইল। কালিদাসও তাঁহার মাথাটি নিজের বুকের উপরে সবলে চাপিয়া ঊর্ধ্বে আকাশের পানে চাহিলেন।

পূর্ব দিগন্ত উদ্ভাসিত করিয়া শারদ পূর্ণিমার চাঁদ উঠতেছে।

এইরূপে এক বসন্ত পূর্ণিমার তিথিতে স্বয়ংবর-সভায় যে কাহিনী আরম্ভ হইয়াছিল, আর এক পূর্ণিমার সন্ধ্যায় শিপ্রাতীরের পর্ণকুটিরে তাহা পরিসমাপ্তি লাভ করিল।