গল্প
উপন্যাস
পরিশিষ্ট

তুঙ্গভদ্রার তীরে – চতুর্থ পর্ব

চতুর্থ পর্ব – এক

রাজার প্রতি আক্রমণের সংবাদ প্রচারিত হইলে কিছুদিন খুব উত্তেজিত আলোড়ন চলিল। তারপর ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হইল। রাজার ক্ষত দু’চার দিনের মধ্যেই আরোগ্য হইল, তিনি নিয়মিত সভায় আসিতে লাগিলেন। রাজ্যের লোক নিশ্চিন্ত হইল।

কুমার কম্পনের মৃতদেহ কোলে লইয়া তাঁহার দুই পত্নী কৃষ্ণা দেবী ও গিরিজা দেবী সহমৃতা হইয়াছেন। বিনা দোষে দুই অভাগিনীর অকালে জীবনান্ত হইল।

বিজয়নগরের জীবনযাত্রা আবার পুরাতন প্রণালীতে প্রবাহিত হইতে লাগিল। এদিকে আকাশে নববর্ষার সূচনা দেখা যাইতেছে। কুমারী বিদ্যুন্মালা যথারীতি পম্পাপতির মন্দিরে যাতায়াত করিতেছেন। তাঁহার অন্তরে হরিষে বিষাদ। শ্রাবণ মাস দুর্বার গতিতে অগ্রসর হইয়া আসিতেছে; কিন্তু অর্জুনকে তিনি কাছে পাইয়াছেন। অর্জুন সারা দিন রাজার কাছে থাকে, রাজা সভায় যাইলে তাঁহার পিছনে যায়, সিংহাসনের পিছনে দাঁড়াইয়া থাকে। তিনি বিরাম-ভবনে আসিলে কখনো তাঁহার কক্ষে থাকে, কখনো কক্ষের আশেপাশে অলিন্দে চত্বরে ঘুরিয়া বেড়ায়। বিদ্যুন্মালার মন সর্বদা সেই দিকে পড়িয়া থাকে। তিনি সুযোগ খুঁজিয়া বেড়ান; যখনি দেখেন অর্জুন অলিন্দে একাকী আছে তখনি লঘুপদে আসিয়া তাহার দেহে হাত রাখিয়া স্পর্শ করিয়া যান, অস্ফুট কণ্ঠে একটি-দুইটি কথা বলেন। কিন্তু এই সুখ ক্ষণিকের, ইহাতে ভবিষ্যতের আশ্বাস নাই। বিদ্যুন্মালার মন হর্ষ-বিষাদে দোল খাইতে থাকে।

মণিকঙ্কণার জীবনে নূতন এক আনন্দময় অধ্যায় আরম্ভ হইয়াছে। পূর্বে সে চুরি করিয়া রাজাকে দেখিয়া যাইত, এখন রাজা যখনই বিরাম-ভবনে আসেন সে তাঁহার কাছে আসিয়া বসে। রাজার মনের উপর একটা দাগ পড়িয়াছে, প্রায়ই বিমনা হইয়া বিশ্বাসঘাতক ভ্রাতার কথা চিন্তা করেন, লোভী কৃতঘ্ন ভ্রাতার জন্য প্রাণ কাঁদে। মণিকঙ্কণা পালঙ্কের পাশে বসিয়া নানাপ্রকার গল্প জুড়িয়া দেয়— কলিঙ্গ দেশের কথা, পিতামাতার কথা, আরো কত রকম কথা। তারপর পানের বাটা লইয়া পান সাজিতে বসে, নিজের দেশের খদিরাদি উপকরণ দিয়া পান সাজিয়া রাজাকে খাওয়ায়। পিঙ্গলা কখনো ঘরে আসিলে তাকে বলে— ‘তুই যা, আমি রাজার কাছে আছি।’

মণিকঙ্কণার সংসর্গে রাজার মন উৎফুল্ল হয়, তিনি কম্পনের কথা ভুলিয়া যান।

প্রত্যেক মানুষেরই অন্তরের নিমগ্ন প্রদেশে একটি নিভৃত রস-সত্তা আছে, রাজার সেই রস-সত্তা মণিকঙ্কণার সান্নিধ্যে উন্মোচিত হয়। মণিকঙ্কণার সহিত রাজা একটি নিবিড় অন্তরঙ্গতা অনুভব করেন। ইহা পতি-পত্নীর স্বাভাবিক প্রীতির সম্বন্ধ নয়, যেন তদপেক্ষাও নিগূঢ়-ঘনিষ্ঠ একটি রসোল্লাস।

একদিন রাজা রহস্য করিয়া বলিলেন— ‘কঙ্কণা, তোমার ভগিনীর সঙ্গে সঙ্গে তোমার বিয়েটাও দেব স্থির করেছি, কিন্তু কার সঙ্গে বিয়ে দেব ভেবে পাচ্ছি না।’

মণিকঙ্কণা ক্ষণেক অবাক হইয়া চাহিল, তারপর বলিল— ‘আমি কাকে চাই আমি জানি।’

রাজা বুঝিলেন, গূঢ় হাস্য করিয়া বলিলেন— ‘কিন্তু তুমি যাকে চাও সে যদি তোমাকে না চায়?’

মণিকঙ্কণা বলিল— ‘তাহলে চিরজীবন কুমারী থাকব। দিনান্তে যদি একবার দেখতে পাই তাহলেই আমার যথেষ্ট।’

রাজার হৃদয় প্রগাঢ় রসমাধুর্যে পূর্ণ হইয়া উঠিল, তিনি মণিকঙ্কণার বেণীতে একটু টান দিয়া বলিলেন— ‘আচ্ছা সে দেখা যাবে।’—

আষাঢ়ের নীলাঞ্জন মেঘ একদিন অপরাহ্ণে ঝড় লইয়া আসিল, প্রবলবেগে রকাপাত করিয়া চলিয়া গেল। দশদিক শীতল হইল।

দামোদর স্বামী নিজ গৃহের উঠান হইতে কিছু করকা-শিলা চয়ন করিয়া বস্ত্রখণ্ডে বাঁধিয়া রাখিয়াছিলেন। সন্ধ্যার সময় লাঠি ধরিয়া রসরাজ আসিলেন। দামোদর স্বামী বলিলেন— ‘এস বন্ধু, আজ করকা সহযোগে মাধ্বী পান করা যাক।’

দামোদরের স্ত্রী-পরিবার নাই, একটি যুবতী দাসী তাঁহার সেবা করে। দাসী আসিয়া ঘরে দীপ জ্বলিয়া মন্দুরা পাতিয়া দিয়া গেল। দুই বন্ধু মাধ্বীর ভাণ্ড লইয়া বসিলেন। দামোদর করকা-শিলার পুঁটলি খুলিলেন; করকাখণ্ডগুলি জমাট বাঁধিয়া শুভ্র বিম্বফলের আকার ধারণ করিয়াছে। তিনি সন্তর্পণে শীতল পিণ্ডটি তুলিয়া মাধ্বীর ভাণ্ডে ছাড়িয়া দিলেন। মাধ্বী শীতল হইলে দুইজনে পাত্রে ঢালিয়া পান করিতে লাগিলেন।

দাসী আসিয়া থালিকায় ভর্জিত বেসনের ঝাল-বড়া রাখিয়া গেল।

পানাহারের সঙ্গে সঙ্গে জল্পনা চলিল। কেবল নিদান শাস্ত্রের আলোচনা নয়, মাধ্বীর মাদক প্রভাব যত বাড়িতে লাগিল, দুই বৃদ্ধের জিহ্বা ততই শিথিল হইল। রসের প্রসঙ্গ আরম্ভ হইল। রসরাজ উৎকল-প্রেয়সীদের রতি-চাতুর্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করিলেন; প্রত্যুত্তরে দামোদর স্বামী কর্ণাটককামিনীদের বিলাসবিভ্রম ও রসনৈপুণ্যের আলোচনায় পঞ্চমুখ হইলেন।

রাত্রি বাড়িতে লাগিল, সুধাভাণ্ড শেষ হইয়া আসিল। দু’জনেরই মাথায় রুমঝুম অপ্সরীর নুপুর বাজিতেছে, কণ্ঠস্বর গদ্‌গদ। রাজা-রানীদের সম্বন্ধে গুপ্তকথার আদান-প্রদান আরম্ভ হইয়া গেল।

দামোদর স্বামী গলার মধ্যে সংহত গভীর হাস্য করিলেন, জড়াইয়া জড়াইয়া বলিলেন— ‘বন্ধু, একটি গুপ্ত কথা আছে যা রাজা আর আমি জানি, আর কেউ জানে না।’

রসরাজ মধুভাণ্ডটি দুই হাতে তুলিয়া লইয়া শেষ করিলেন, বলিলেন— ‘তাই নাকি!’

দামোদর বলিলেন— ‘হুঁ। রাজার মধ্যমা রানী অসূর্যম্পশ্যা, শুনেছ কি?’

রসরাজ আবার বলিলেন— ‘তাই নাকি! কিন্তু অসূর্যম্পশ্যা কেন? এ দেশে তো ও রীতি নেই।’

দামোদর বলিলেন— ‘না। প্রকৃত রহস্য কেউ জানে না। একবার মধ্যমার রোগ হয়েছিল, আমি চিকিৎসা করেছিলাম। তাই আমি জানি।’

‘তাই নাকি। রহস্যটা কী?’

‘মধ্যমা অপূর্ব সুন্দরী, কিন্তু দাঁত নেই; জন্মাবধি একটিও দাঁত গজায়নি। একেবারে ফোক্‌লা।’

‘তাই নাকি! এ রকম তো দেখা যায় না।’ রসরাজ দুলিয়া দুলিয়া হাসিতে লাগিলেন— ‘হুঁ হুঁ হুঁ। রানী ফোক্লা।’

দামোদর বলিলেন— ‘রাজা কিন্তু সেজন্য মধ্যমাকে কম স্নেহ করেন না! রাজাদের সব রকম চাই— খি খি খি— বুঝলে?’

রসরাজ বলিলেন— ‘তা বটে। সব যদি এক রকম হয় তাহলে পাঁচটা বিয়ে করে লাভ কি!’

কিছুক্ষণ পরে হাসি থামিলে দামোদর ভাণ্ড পরীক্ষা করিলেন; ভাণ্ড শূন্য দেখিয়া বলিলেন— ‘রাত হয়েছে, চল তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। তুমি কানা মানুষ, কোথায় যেতে কোথায় যাবে।’

দুই বন্ধু বাহির হইলেন। অতিথি-ভবন বেশি দূর নয়, সেখানে উপস্থিত হইয়া রসরাজ বলিলেন— ‘তুমি একলা ফিরবে, চল তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।’

দু’জনে ফিরিলেন। দামোদর নিজ গৃহের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া বলিলেন— ‘তাই তো, তুমি এখন ফিরবে কি করে? চল তোমাকে পৌঁছে দিই।’

এইভাবে পরস্পরকে পৌঁছাইয়া দেওয়া কতক্ষণ চলিল বলা যায় না। পরদিন প্রাতঃকালে দেখা গেল দুই বন্ধু দামোদর স্বামীর বহিঃকক্ষে মন্দুরার উপর শয়ন করিয়া পরম আরামে নিদ্রা যাইতেছেন।

গুহার মধ্যে বলরাম ও মঞ্জিরার প্রণয় ঘনাবর্ত দুগ্ধের ন্যায় যৌবনের তাপে ক্রমশ গাঢ় হইতেছে। অর্জুন আজকাল দিনের বেলা গুহায় থাকে না, রাজার সঙ্গে থাকে, তাই তাঁহাদের সমাগম নিরঙ্কুশ। মঞ্জিরা দ্বিপ্রহরে কেবল বলরামের খাবার লইয়া আসে। বলরামের আহার শেষ হইলে দু’জনে ঘনিষ্ঠভাবে বসিয়া গল্প করে। কখনো বলরাম চুল্লী জ্বালিয়া কাজ আরম্ভ করে, মঞ্জিরা হাপরের দড়ি টানে; বায়ুর প্রবাহে অগ্নি উদ্দীপ্ত হয়, আগুনের মধ্যে লোহার পত্রিকা রক্তিমবর্ণ ধারণ করে। বলরাম আগুন হইতে পত্রিকা বাহির করিয়া এক লৌহদণ্ডের চারিপাশে ঠুকিয়া ঠুকিয়া পেঁচ দিয়া জড়ায়; লোহা ঠাণ্ডা হইলে আবার আগুনে রক্তবর্ণ করিয়া লৌহদণ্ডের চারিপাশে জড়ায়। এইভাবে ধীরে ধীরে লোহার নল প্রস্তুত হইতে থাকে। ক্ষুদ্র কামানের অর্থাৎ বন্দুকের নল তৈরি করিবার ইহাই তাহার গুপ্ত কৌশল।

কখনো তাহারা মৃদঙ্গ ও বাঁশি লইয়া বসে। বলরাম মঞ্জিরার চোখে চোখ রাখিয়া গায়—

প্রিয়ে চারুশীলে প্রিয়ে চারুশীলে

মুঞ্চ ময়ি মানমনিদানম্‌।

মঞ্জিরা শান্ত ধীর প্রকৃতির মেয়ে, বলরামের একটু প্রগল্ভতা বেশি। কিন্তু তাহাদের আসক্তি শালীনতার গণ্ডী অতিক্রম করিয়া যায় না।

এইভাবে চলিতেছে, হঠাৎ একদিন দ্বিপ্রহরে মঞ্জিরা আসিল না। তাহার পরিবর্তে অন্য একটি মেয়ে খাবার লইয়া আসিল।

বলরাম চক্ষু পাকাইয়া বলিল— ‘তুমি কে? মঞ্জিরা কোথায়?’

নূতনা বলিল— ‘আমি সুভদ্রা। মঞ্জিরা বাপের বাড়ি গিয়েছে, তাই আমি খাবার নিয়ে এসেছি।’

‘বাপের বাড়ি গিয়েছে!’ মঞ্জিরার বাপের বাড়ি থাকিতে পারে একথা পূর্বে বলরামের মনে আসে নাই— ‘বাপের বাড়ি গিয়েছে কেন?’

‘তার আন্নার অসুখ, খবর পেয়ে কাল রাত্রেই সে চলে গেছে।’

‘আন্না মানে তো দাদা! দাদার অসুখ!— তা কবে ফিরবে?’

‘তা কি জানি!’

‘হুঁ। মঞ্জিরার বাপের নাম কি?’

‘বীরভদ্র। তিনি রাজার হাতিশালে কাজ করেন।’

‘হুঁ। বাড়ি কোথায়?’

‘নীচু নগরে। পান-সুপারি রাস্তার পুবে তুঙ্গভদ্রার তীরে তাঁর বাড়ি।’

‘বটে।’ বলরাম আহারে বসিল। নবাগতা সুভদ্রা মঞ্জিরার সখী, বলরামের ভাবভঙ্গি দেখিয়া মুচকি মুচকি হাসিতে লাগিল।

আহারের পর সুভদ্রা পাত্রাদি লইয়া প্রস্থান করিবার পর বলরাম চিন্তা করিতে লাগিল। কি করা যায়! মঞ্জিরা কবে আসিবে কিছুই ঠিক নাই। তাহার পিতা হস্তিপক বীরভদ্রকে হস্তিশালা হইতে খুঁজিয়া বাহির করা যায়। কিন্তু তাহাতে লাভ কি! মঞ্জিরার বাপকে দর্শন করিলে তো প্রাণ জুড়াইবে না। বরং তাঁহার গৃহ খুঁজিয়া বাহির করিলে কাজ হইবে।

তৃতীয় প্রহরে বলরাম পরিষ্কার বস্ত্র উত্তরীয় পরিধান করিয়া বাহির হইল। নীচু নগরে অর্থাৎ মধ্যবিত্ত পল্লীতে তুঙ্গভদ্রার তীরে খোঁজাখুঁজি করিবার পর রাজ-হস্তিপক বীরভদ্রের গৃহ পাওয়া গেল।

প্রস্তরনির্মিত ক্ষুদ্র গৃহ। বলরাম দ্বারে করাঘাত করিলে মঞ্জিরা দ্বার খুলিয়া দাঁড়াইল। বলরামকে দেখিয়া তাহার মুখে বিস্ময়ানন্দ ভরা হাসি ফুটিয়া উঠিল।

বলরাম মুখ গম্ভীর করিয়া বলিল— ‘খবর না দিয়ে পালিয়ে এসেছ যে!’

মঞ্জিরা থতমত হইয়া বলিল— ‘সময় পেলাম না। কাল রাত্রে বাবা ডাকতে গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে চলে এলাম।’

‘আন্না কেমন আছে?’

মঞ্জিরার মুখ মলিন হইল, সে ছলছল চক্ষে বলিল— ‘ভাল না। কাল খুব বাড়াবাড়ি গিয়েছে। বৈদ্য মহাশয় বলছেন, ‘ত্রিদোষ’।

দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া আরো কিছুক্ষণ কথা হইল, তারপর বলরাম ‘কাল আবার আসব বলিয়া চলিয়া গেল।

অতঃপর বলরাম প্রত্যহ আসে, দ্বারের কাছে দু’দণ্ড দাঁড়াইয়া কথা বলিয়া যায়। মঞ্জিরার আন্না ক্রমশ আরোগ্য হইয়া উঠিতেছে। প্রাণের আশঙ্কা আর নাই।

একদিন অনিবার্যভাবেই মঞ্জিরার পিতা বীরভদ্রের সহিত বলরামের দেখা হইয়া গেল। দীর্ঘায়িত গৌরবর্ণ মানুষ, বয়স অনুমান চল্লিশ; প্রকৃতি শান্ত ও গম্ভীর। মঞ্জিরাকে অপরিচিত যুবার সহিত কথা কহিতে দেখিয়া সপ্রশ্ন নেত্রে চাহিলেন। বলরাম বলিল— ‘আপনি মঞ্জিরার পিতা? নমস্কার। মঞ্জিরার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে— তাই—’

বীরভদ্র শিষ্টতা সহকারে বলরামকে ভিতরে আসিয়া বসিতে বলিলেন। দুইজনে আস্তরণের উপর উপবিষ্ট হইলে বীরভদ্র বলরামের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। মঞ্জিরা একটু আড়ালে থাকিয়া তাঁহাদের কথাবার্তা শুনিতে লাগিল।

বলরাম নিজের পরিচয় দিল, মঞ্জিরার সহিত কি করিয়া পরিচয় হইল তাহা জানাইল। শুনিয়া বীরভদ্র বলিলেন— ‘বাপু, তুমি দেখছি গুণবান ব্যক্তি। ভাগ্যবানও বটে, কারণ রাজার নজরে পড়েছ।’

বীরভদ্রকে প্রসন্ন দেখিয়া বলরাম ভাবিল, এই সুযোগ, এমন সুযোগ হয়তো আর আসিবে না। যা থাকে কপালে। সে হাত জোড় করিয়া সবিনয়ে বলিল— ‘মহাশয়, আপনার শ্রীচরণে আমার একটি নিবেদন আছে।’

বীরভদ্র একটু চকিত হইলেন, বলিলেন— ‘কী নিবেদন?’

বলরাম বলিল— ‘আপনার কন্যা মঞ্জিরাকে আমি বিবাহ করতে চাই। আপনি অনুমতি দিন।’

বীরভদ্র নূতন চক্ষে বলরামকে নিরীক্ষণ করিলেন, তারপর ধীরে ধীরে বলিলেন— ‘বাপু, তুমি যোগ্য পাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু তুমি বিদেশী, তোমার হাতে কন্যা দান করতে শঙ্কা হয়।’

বলরাম বলিল— ‘মহাশয়, আমি বিদেশ থেকে এসেছি বটে, কিন্তু কোনো দিন ফিরে যাব এমন সম্ভাবনা নেই। বিজয়নগরই আমার গৃহ, বিজয়নগরই আমার দেশ।’

বীরভদ্র বলিলেন— ‘তা ভাল। কিন্তু এ বিষয়ে মঞ্জিরার মন জানা প্রয়োজন। দ্বিতীয় কথা, মঞ্জিরা রাজপুরীতে কাজ করে, রাজাই তার প্রকৃত অভিভাবক। তিনি যদি অনুমতি দেন আমার আপত্তি হবে না।’

‘যথা আজ্ঞা’— বলরাম আশান্বিত মনে গাত্রোত্থান করিল। রাজার অনুমতি সংগ্রহ করা কঠিন হইবে না।

মঞ্জিরা আড়াল হইতে সব শুনিয়াছিল। তাহার দেহ ক্ষণে ক্ষণে পুলকিত হইল, মন আশার আনন্দে দুরু দুরু করিতে লাগিল।

বিজয়নগর হইতে বহু দূরে তুঙ্গভদ্রার গিরি-বলয়িত উপকূলের ক্ষুদ্র গ্রামটিতে চিপিটক ও মন্দোদরীর দাম্পত্য জীবন আরম্ভ হইয়া গিয়াছিল। একই গুহায় বাস করিয়া ছদ্ম দাম্পত্য বেশিদিন বজায় রাখা কঠিন। অগ্নি এবং ঘৃত যত পুরাতনই হোক, তাহাদের সান্নিধ্যের ফল অনিবার্য। চিপিটক ও মন্দোদরীর দাম্পত্য ব্যবহারে কপটতার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট ছিল না।

চিপিটক মনকে বুঝাইয়াছিলেন, ইহা সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। তিনি বিজয়নগরে ফিরিয়া যাইবার সংকল্প ত্যাগ করেন নাই। মন্দোদরী কিন্তু পরমানন্দে ছিল। এখানে আসিবার পর দারুব্রহ্ম তাহার প্রতি প্রসন্ন হইয়াছেন, সে একটি পুরুষ পাইয়াছে। আর কী চাই!

কিন্তু জনসমাজে বাস করিতে হইলে কিছু কাজ করিতে হয়, কেহ বসিয়া খাওয়ায় না। মন্দোদরী নিজের কাজ জুটাইয়া লইয়াছিল। সে অল্পকাল মধ্যে গ্রামের ভাষা আয়ত্ত করিয়াছিল। তৃতীয় প্রহরে গ্রামের যুবতীরা গা ধুইতে নদীতে যাইত, মন্দোদরী তাহাদের সঙ্গে যাইত। সকলে মিলিয়া গা ধুইত, তারপর গ্রামের আম্রকুঞ্জের ছায়ায় গিয়া বসিত। মন্দোদরী নানা ছাঁদে চুল বাঁধিতে জানে, সে একে একে সকলের চুল বাঁধিয়া দিত এবং সঙ্গে সঙ্গে গল্প বলিত। মেয়েরা চুল বাঁধিতে বাঁধিতে অবহিত হইয়া রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী শুনিত। তারপর সূর্য পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হইলে যে যার কুটিরে ফিরিয়া যাইত। মন্দোদরীকে রাঁধিতে হইত না, গ্রামবধূরা পালা করিয়া তাহার গুহায় অন্নব্যঞ্জন দিয়া যাইত।

চিপিটকমূর্তি কিন্তু রাজশ্যালক, সুতরাং অকর্মার ধাড়ি। গ্রামে চিপিটক বিতরণের কাজ থাকিলে হয়তো করিতে পারিতেন, কিন্তু অন্য কোনো শ্রমসাধ্য কাজে তাঁহার রুচি নাই। দেখিয়া শুনিয়া মোড়ল বলিল— ‘কর্তা, তোমাকে দিয়ে অন্য কাজ হবে না, তুমি ছাগল চরাও।’

চিপিটক দেখিলেন, ছাগল চরানোতে কোনো পরিশ্রম নাই; ছাগলেরা আপনিই চরিয়া খায়, তাহাদের মাঠে ছাড়িয়া দিয়া গাছতলায় বসিয়া থাকিলেই হইল। তিনি রাজী হইলেন।

অতঃপর চিপিটক ছাগল চরাইতেছেন। কিন্তু তাঁহার চিত্তে সুখ নাই, মন পড়িয়া আছে বিজয়নগরে। গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়া চক্ষু মুদিয়া তিনি আকাশ-পাতাল চিন্তা করেন।

এদেশের ছাগলগুলি আকারে আয়তনে বেশ বৃহৎ, রামছাগলের চেয়েও বৃহৎ ও হৃষ্টপুষ্ট; কাবুলী গর্দভের আকার। গাঁয়ের ছেলেরা তাহাদের পিঠে চড়িয়া ছুটাছুটি করে। দেখিয়া দেখিয়া একদিন তাঁহার মাথায় একটি বুদ্ধি গজাইল। ছাগলের পিঠে চড়িয়া তিনি যদি নদীর ধার দিয়া পশ্চিম দিকে যাত্রা করেন তবে অচিরাৎ বিজয়নগরে পৌঁছিতে পারিবেন।

যেমন চিন্তা তেমনি কাজ। চিপিটক একটি বলিষ্ঠ পাঁঠা ধরিয়া তাহার পৃষ্ঠে চড়িয়া বসিলেন এবং নদীর কিনার দিয়া তাহাকে উজানে চালিত করিলেন। চিপিটকের দেহ শীর্ণ ও লঘু, তাহাকে পৃষ্ঠে বহন করিতে অতিকায় পাঁঠার কোনোই কষ্ট হইল না।

কিন্তু নদীর তীর সর্বত্র সমতল নয়, তীরের পাহাড় মাঝে মাঝে নদী পর্যন্ত নামিয়া আসিয়া দুর্লঙ্ঘ্য বাধার সৃষ্টি করিয়াছে। এইরূপ একটি ক্রমোচ্চ পাহাড়ের সম্মুখীন হইয়া ছাগল স্থির হইয়া দাঁড়াইল; সে গ্রাম হইতে অর্ধক্রোশ আসিয়াছে, এখন পর্বত ডিঙাইয়া আর অগ্রসর হইতে রাজী নয়। চিপিটক তাহাকে তাড়না করিলেন, মুখে নানাপ্রকার শব্দ করিলেন, কিন্তু ছাগল নড়িল না। চিপিটক তখন দুই পায়ের গোড়ালি দিয়া সবেগে ছাগলের পেটে গুঁতা মারিলেন। ছাগল হঠাৎ চার পায়ে শূন্যে লাফাইয়া উঠিয়া গা ঝাড়া দিল। চিপিটক তাহার পৃষ্ঠচ্যুত হইয়া মাটিতে পড়িলেন। ছাগল লাফাইতে লাফাইতে গ্রামে ফিরিয়া গেল।

পতনের ফলে চিপিটকের অষ্ঠি মচকাইয়া গিয়াছিল, তিনি লেংচাইতে লেংচাইতে গৃহে ফিরিলেন।

অতঃপর কিছুদিন কাটিলে তাঁহার মাথায় আর একটি বুদ্ধি অবতীর্ণ হইল; এটি তেমন মারাত্মক নয়, এমনকি সুবুদ্ধিও বলা যাইতে পারে। তিনি মন্দোদরীকে আদেশ করিলেন— ‘তুই রোজ দুপুরবেলা নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকবি। আমাদের নৌকো তিনটের ফেরার সময় হয়েছে, একদিন না একদিন এই পথে যেতেই হবে। তুই চোখ মেলে থাকবি, তাদের দেখতে পেলেই ডাকবি।’

মন্দোদরী বলিল— ‘আচ্ছা।’

চিপিটক দ্বিপ্রহরে ছাগল চরাইতে চরাইতে গাছতলায় ঘুমাইয়া পড়েন। মন্দোদরী গজেন্দ্রগমনে নদীতীরে যায়, উঁচু পাথরের ছায়ায় শুইয়া ঘুমায়। নৌকা সম্বন্ধে তাহার মোটেই আগ্রহ নাই, সে পরম সুখে আছে। অপরাহ্ণে গাঁয়ের মেয়েরা গা ধুইতে আসিলে সে তাহাদের সঙ্গে গা ধুইয়া ফিরিয়া যায়। চিপিটককে বলে— ‘কোথায় নৌকা!’

এইভাবে দিন কাটিতেছে।

দুই

গ্রীষ্মকালীন ঝড়-ঝাপ্‌টা অপগত হইয়া বিজয়নগরে বর্ষা নামিয়াছে। রাজ-পৌরভূমির চারিদিকে ময়ূরের ষড়জসংবাদিনী কেকাধ্বনি শুনা যাইতেছে। ময়ূরগুলি কোথা হইতে আসিয়া উচ্চভূমিতে অথবা শৈলশীর্ষে উঠিয়াছে এবং পেখম মেলিয়া মেঘের পানে উৎকণ্ঠ হইয়া ডাকিতেছে।

এদেশে বেশি বৃষ্টি হয় না; কখনো রিম্‌ঝিম্‌ কখনো ঝিরিঝিরি। কিন্তু আকাশ সর্বদা মেঘ-মেদুর হইয়া থাকে। গ্রীষ্মের কঠোর তাপ অপগত হইয়া মধুর শৈত্য মানুষের দেহে সুধা সিঞ্চন করিতে থাকে। দিবাভাগে সূর্যদেব যেন অঙ্গে ধূসর আস্তরণ টানিয়া ঘুমাইয়া পড়েন; রাত্রিগুলি দেবভোগ্য স্বর্গের রাত্রি হইয়া দাঁড়ায়। পীতবর্ণ তৃণপাদপ ধীরে ধীরে হরিৎ বর্ণ ধারণ করে; পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গাঢ় সবুজের রেখা। তুঙ্গভদ্রার শীর্ণ ধারা অলক্ষিতে পূর্ণ হইয়া উঠিতে থাকে।

বর্ষা সমাগমে অর্জুন ও বলরামকে গুহা ছাড়িতে হইয়াছিল। গুহার ছাদের ফুটা দিয়া জল পড়ে। মন্ত্রী মহাশয় তাহাদের বাসের অন্য ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। কুমার কম্পনের নূতন প্রাসাদ শূন্য পড়িয়া ছিল, তাহারা প্রাসাদের নিম্নতলে আশ্রয় পাইয়াছিল। বলরাম গৃহের রন্ধনশালায় কামারশালা পাতিয়াছিল।

চাতুর্মাস্য ব্রতারম্ভের দিনটি আরম্ভ হইল টিপি টিপি বৃষ্টি লইয়া। অর্জুন প্রত্যূষে উঠিয়া রাজ সকাশে চলিল। চারিদিক অন্ধকার, মেঘের আড়ালে রাত্রি শেষ হইয়াছে কিনা বোঝা যায় না। হেমকূট পর্বতের শৃঙ্গে এখনো ধিকি ধিকি আগুন জ্বলিতেছে।

সভা-ভবনের নিকটে আসিয়া অর্জুন দ্বিতলের একটি বিশেষ গবাক্ষের দিকে দৃষ্টি উৎক্ষিপ্ত করিল। গবাক্ষে আবছায়া একটি মুখ দৃষ্টিগোচর হইল। বিদ্যুন্মালা দাঁড়াইয়া আছেন। তিনি প্রত্যহ এই সময় অর্জুনের দর্শনাশায় গবাক্ষে আসিয়া দাঁড়াইয়া থাকেন।

অর্জুনের হৃদয় মথিত করিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস পড়িল। ইহার শেষ কোথায়?

রাজার বিরাম-ভবনে সকলে জাগিয়া উঠিয়াছে। গতরাত্রে রাজা বিরাম-ভবনেই ছিলেন, তিনি স্নান সারিয়া পূজায় বসিয়াছেন। অর্জুন সোপান দিয়া উপরে আসিয়া রাজার কক্ষে দাঁড়াইল। কক্ষে কেহ নাই, অর্জুন রাজার অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া রহিল। ছায়াচ্ছন্ন কক্ষ, বাতায়নগুলি অচ্ছাভ আলোর চতুষ্কোণ রচনা করিয়াছে।

সহসা পাশের একটি পর্দা-ঢাকা দ্বার দিয়া বিদ্যুন্মালা প্রবেশ করিলেন। তাঁহার চোখে বিভ্রান্ত ব্যাকুলতা। তিনি লঘু পদে অর্জুনের কাছে আসিয়া তাহার হাতে হাত রাখিলেন, সংহত স্বরে বলিলেন— ‘আজ কী দিন জানো? চাতুর্মাস্য আরম্ভের দিন। কাল শ্রাবণ মাস পড়বে।’

অর্জুন নির্বাক দাঁড়াইয়া রহিল। বিদ্যুন্মালা আরো কাছে আসিয়া অর্জুনের স্কন্ধে হাত রাখিয়া বলিলেন— ‘তুমি কি আমাকে সত্যই চাও না? আমি কি তবে আত্মহত্যা করব? কী করব তুমি বলে দাও।’

এই সময় একটি দ্বারের পর্দা একটু নড়িল। পিঙ্গলা কক্ষে প্রবেশ করিতে গিয়া থমকিয়া রহিল। দেখিল, বিদ্যুন্মালা অর্জুনের কাঁধে হাত রাখিয়া নিম্নস্বরে কথা বলিতেছেন। অর্জুন বা বিদ্যুন্মালা পিঙ্গলাকে দেখিতে পাইলেন না।

অর্জুন অতি কষ্টে কণ্ঠ হইতে স্বর বাহির করিল— ‘আমি কি বলব? তুমি যাও, এখনি রাজা আসবেন।’

বিদ্যুন্মালা বলিলেন— ‘আমি যাচ্ছি। কিন্তু আজ সন্ধ্যার পর আমি তোমার কাছে যাব।’

বিদ্যুন্মালা নিঃশব্দ পদে অন্তর্হিতা হইলেন।

অল্পক্ষণ পরে পিঙ্গলা অন্য দ্বার দিয়া প্রবেশ করিল, অর্জুনের প্রতি একটি সুতীক্ষ্ণ বঙ্কিম কটাক্ষপাত করিয়া বলিল— ‘এই যে অর্জুন ভদ্র! আপনি একলা রয়েছেন। মহারাজের পূজা শেষ হয়েছে, তিনি এখনি আসবেন।’

অর্জুন গলার মধ্যে শব্দ করিল; কথা বলিতে পারিল না। তাহার বুকের মধ্যে তোলপাড় করিতেছিল।

দুই দণ্ড পরে মণিকঙ্কণা ও বিদ্যুন্মালা পম্পাপতির মন্দিরে চলিয়া গেলেন।

নিজ কক্ষে দেবরায় সভারোহণের জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন। পালঙ্কের কাছে দাঁড়াইয়া পিঙ্গলা তাঁহার বাহুতে অঙ্গদ পরাইয়া দিতেছিল। অর্জুন দূরে দ্বারের নিকট প্রতীক্ষা করিতেছিল।

রাজার কপালে কুঙ্কুম তিলক পরাইতে পরাইতে পিঙ্গলা মৃদুস্বরে রাজাকে কিছু বলিল। রাজা পূর্ণদৃষ্টিতে তাহার পানে চাহিলেন। পিঙ্গলা আবার কিছু বলিল। রাজা আরো কিছুক্ষণ তাহার পানে চাহিয়া থাকিয়া অর্জুনের দিকে মুখ ফিরাইলেন। স্বর ঈষৎ চড়াইয়া বলিলেন— ‘অর্জুনবর্মা, তুমি সভায় গিয়ে বলো আজ আমি সভায় যাব না। তুমি সভা থেকে গৃহে ফিরে যাও, আজ আর তোমাকে প্রয়োজন হবে না।’

রাজাকে প্রণাম করিয়া অর্জুন চলিয়া গেল। সোপান দিয়া নামিতে নামিতে তাহার হৃৎপিণ্ড আশঙ্কায় ধক্‌ধক্‌ করিতে লাগিল। রাজার কণ্ঠস্বরে আজ যেন অনভ্যস্ত কঠিনতা ছিল। তিনি কি কিছু জানিতে পারিয়াছেন? পিঙ্গলা কি—?

অপরাধ না করিয়াও যাহারা অপরাধীর অধিক মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করে অর্জুনের অবস্থা তাহাদের মত।

বিরামকক্ষে দেবরায় পালঙ্কে বসিয়াছিলেন। তিনি পিঙ্গলার পানে গম্ভীর চক্ষু তুলিয়া বলিলেন— ‘অর্জুন সম্বন্ধে গোপন কথা কী আছে?’

পিঙ্গলা রাজার পায়ের কাছে ভূমিতলে বসিল, করজোড়ে বলিল— ‘আর্য, অভয় দিন।’

রাজা বলিলেন— ‘নির্ভয়ে বল।’

পিঙ্গলা তখন ধীরে ধীরে বলিতে আরম্ভ করিল— ‘কিছুদিন থেকে দাসীদের মধ্যে কানাকানি শুনছিলাম; দেবী বিদ্যুন্মালা নাকি অন্তরালে অর্জুনবর্মার সঙ্গে বাক্যালাপ করেন। আমি শুনেও গ্রাহ্য করিনি। অর্জুনবর্মা দেবী বিদ্যুন্মালার সঙ্গে নৌকোয় এসেছেন, তাঁকে নদী থেকে উদ্ধার করেছিলেন। সুতরাং তাঁদের মধ্যে বাক্যালাপ অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আজ আমি নিজের চোখে দেখেছি মহারাজ।’

‘কী দেখেছ?’

তখন পিঙ্গলা যাহা দেখিয়াছিল, শুনিয়াছিল, রাজাকে শুনাইল। বিদ্যুন্মালা অর্জুনের কাঁধে হাত রাখিয়া অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যাহা যাহা বলিয়াছিলেন তাহার পুনরাবৃত্তি করিল। কিছু বাড়াইয়া বলিল না, কিছু কমাইয়াও বলিল না। রাজা শুনিয়া বজ্রগর্ভ মেঘের ন্যায় মুখ অন্ধকার করিয়া বসিয়া রহিলেন।

বলরাম একটি নূতন কামান প্রস্তুত করিয়াছিল। সেদিন সন্ধ্যাবেলা সেটি থলিতে ভরিয়া সে বাহির হইল। অর্জুনকে বলিয়া গেল— ‘রাজাকে কামান দিতে যাচ্ছি। সেই সঙ্গে বিয়ের কথাটাও পাকা করে আসব। একটা বৌ না হলে ঘর-দোর আর মানাচ্ছে না।’

অর্জুন নিজ শয্যায় লম্বমান হইয়া ছাদের পানে চাহিয়া ছিল, উঠিয়া প্রদীপ জ্বালিল, তারপর ঘরময় পদচারণ করিয়া বেড়াইতে লাগিল। ভালবাসা পাইয়াও সুখ নাই; একটা অনির্দিষ্ট আশঙ্কা তাহার অন্তঃকরণকে গ্রাস করিয়া রাখিয়াছে; যেন মরণাধিক একটা মহাবিপদ অলক্ষ্যে ওত পাতিয়া আছে, কখন অকস্মাৎ ঘাড়ে লাফাইয়া পড়িবে। এই শঙ্কার হাত হইতে পলকের জন্য নিস্তার নাই। মাঝে মাঝে তাহার ইচ্ছা হইয়াছে, চুপি চুপি কাহাকেও না বলিয়া বিজয়নগর ছাড়িয়া পলাইয়া যায়। কিন্তু কোথায় পলাইবে? বিজয়নগর তাহার হৃদয়কে লৌহজটিল বন্ধনে পাকে পাকে জড়াইয়া ধরিয়াছে। বিজয়নগর ছাড়িয়া আর সে মুসলমান রাজ্যে ফিরিয়া যাইতে পরিবে না। প্রাণ যায় সেও ভাল।

কঙ্কণ-কিঙ্কিণীর মৃদু শব্দে অর্জুন দাঁড়াইয়া পড়িল। ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল বিদ্যুন্মালা দ্বারের সম্মুখে আসিয়া কক্ষের এদিক-ওদিক দৃষ্টিপাত করিতেছেন। বলরাম নাই দেখিয়া তিনি অর্জুনের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন। দীপের স্নিগ্ধ আলোকস্পর্শে তাঁহার সর্বাঙ্গে রত্নালঙ্কার ঝলমল করিয়া উঠিল।

বিদ্যুন্মালা ভঙ্গুর হাসিয়া গদ্‌গদ কণ্ঠে বলিলেন— ‘আমি মরতে চাই না, আমি তোমাকে চাই। আমার লজ্জা নেই, অভিমান নেই, আমি শুধু তোমাকে চাই।’ দুই বাহু বাড়াইয়া তিনি অর্জুনের গলা জড়াইয়া লইলেন। একটি ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলিয়া তাহার বুকে মাথা রাখিলেন।

অর্জুন জগৎ ভুলিয়া গেল। তাহার বাহু অবশে বিদ্যুন্মালার দেহ দৃঢ় বন্ধনে বেষ্টন করিয়া লইল।

হিয়ে হিয় রাখনু। যুগ কাটিল কি মুহূর্ত কাটিল ধারণা নাই। হৃদয় কোন্‌ অতলস্পর্শ অমৃতসাগরে ডুবিয়া গিয়াছে। প্রতি অঙ্গে রোমহর্ষণ।

তারপর এই আত্মবিস্মৃত রসোল্লাসের অতল হইতে দুইজনে উঠিয়া আসিলেন। চক্ষু মেলিয়া দেখিলেন, কে একজন তাঁহাদের পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে।

তবু সহজে মোহতন্দ্রা কাটিতে চায় না। ধীরে ধীরে তাঁহারা চেতনার বহির্লোকে ফিরিয়া আসিলেন। যিনি দাঁড়াইয়া আছেন তিনি— মহারাজ দেবরায়!

এই ভয়ঙ্কর সত্য সম্পূর্ণরূপে অন্তরে প্রবেশ করিলে দুইজনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ন্যায় বিচ্ছিন্ন হইয়া দাঁড়াইলেন। রাজা বিদ্যুন্মালার দিকে তাকাইলেন না, অর্জুনের উপর দৃষ্টি স্থির রাখিয়া ভয়াল কণ্ঠে বলিলেন— ‘অর্জুনবর্মা!’

অর্জুন নতমুখে রহিল, মুখে কথা যোগাইল না। রাজা যে-দৃশ্য দেখিয়াছেন তাহার একমাত্র অর্থ হয়, দ্বিতীয় অর্থ হয় না; সুতরাং বাক্যব্যয় নিষ্প্রয়োজন।

রাজার কটি হইতে তরবারি বিলম্বিত ছিল, রাজা তাহার মুষ্টিতে হাত রাখিলেন। বিদ্যুন্মালা ত্রাস-বিস্ফারিত নেত্রে রাজার পানে চাহিয়া ছিলেন। তিনি সহসা মুখে অব্যক্ত আকুতি করিয়া রাজার পদতলে পতিত হইলেন; ব্যাকুল কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন— ‘রাজাধিরাজ, অর্জুনবর্মাকে ক্ষমা করুন। ওঁর কোনো দোষ নেই, আমি অপরাধিনী। হত্যা করতে হয় আমাকে হত্যা করুন।’

রাজা বিরাগপূর্ণ নেত্রে বিদ্যুন্মালার পানে চাহিলেন। বিদ্যুন্মালা ঊর্ধ্বমুখী হইয়া বলিতে লাগিলেন— ‘রাজাধিরাজ, আমি অর্জুনবর্মাকে প্রলুব্ধ করেছিলাম, কিন্তু উনি আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে সম্মত হননি। ওঁর অপরাধ নেই, আমি অপরাধিনী, আমাকে দণ্ড দিন।’

রাজার মুখের কোনো পরিবর্তন হইল না, তিনি আরো কিছুক্ষণ ঘৃণাপূর্ণ চক্ষে চাহিয়া থাকিয়া দুই হাতে তালি বাজাইলেন। অমনি ছয়জন অসিধারিণী প্রতিহারিণী কক্ষে প্রবেশ করিল, তাহাদের অগ্রে পিঙ্গলা।

রাজা বলিলেন— ‘রাজকুমারীকে মহলে নিয়ে যাও।’

পিঙ্গলা বিদ্যুন্মালার হাত ধরিয়া তুলিল, সহজ স্বরে বলিল— ‘আসুন দেবি।’

বিদ্যুন্মালা একবার রাজার দিকে একবার অর্জুনের দিকে চাহিলেন, তারপর অধর দংশন করিয়া গর্বিত পদক্ষেপে দাসীদের সঙ্গে প্রস্থান করিলেন। তিনি রাজকন্যা, দাসী-কিঙ্করীর সম্মুখে দীনতা প্রকাশ করা চলিবে না।

কক্ষে রহিলেন রাজা এবং অর্জুন। রাজা বহ্নিমান শৈলশৃঙ্গের ন্যায় জ্বলিতেছেন, অর্জুন তাঁহার সম্মুখে মুহ্যমান। রাজার হাত আবার তরবারির মুষ্টির উপর পড়িল; তিনি বলিলেন— ‘রাজকন্যা যা বলে গেলেন তা সত্য?’

অর্জুন জানে রাজকন্যার কথা সত্য, কিন্তু নিজের প্রাণ রক্ষার জন্য তাঁহার স্কন্ধে সমস্ত দোষ চাপাইতে পরিবে না। সে একবার মুখ তুলিয়া আবার মুখ নত করিল; ধীরে ধীরে বলিল— ‘আমিও সমান অপরাধী মহারাজ।’

রাজা গর্জিয়া উঠিলেন— ‘কৃতঘ্ন! বিশ্বাসঘাতক! এ অপরাধের দণ্ড জানো?’

অর্জুন মুখ তুলিল না, বলিল— ‘জানি মহারাজ’

রাজা বলিলেন— ‘মৃত্যুদণ্ডই তোমার একমাত্র দণ্ড। কিন্তু তুমি একদিন আমার প্রাণরক্ষা করেছিলে, আমিও তোমার প্রাণদান করলাম। যাও, এই দণ্ডে আমার রাজ্য ত্যাগ কর। অহোরাত্র পরে যদি তোমাকে বিজয়নগর রাজ্যে পাওয়া যায় তোমার প্রাণদণ্ড হবে। বিজয়নগরে তোমার স্থান নেই।’

অর্জুনের কাছে ইহা প্রাণদণ্ডের চেয়েও কঠিন আজ্ঞা। কিন্তু সে নতজানু হইয়া যুক্তকরে বলিল— ‘যথা আজ্ঞা মহারাজ।’

দু’দণ্ড পরে বলরাম গৃহে প্রবেশ করিতে করিতে বলিল— ‘রাজার সাক্ষাৎ পেলাম না, তিনি বিরাম-ভবনে নেই। একি! অর্জুন—?’

অর্জুন ভূমির উপর জানু মুড়িয়া জানুর উপর মাথা রাখিয়া বসিয়া আছে, বলরামের কথায় পাংশু মুখ তুলিল। বলরাম কামানের থলি ফেলিয়া দ্রুত তাহার কাছে আসিয়া বসিল; ব্যগ্রকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল— ‘কী হয়েছে অর্জুন?’

অর্জুন ভগ্নস্বরে বলিল— ‘রাজা আমাকে বিজয়নগর থেকে নির্বাসন দিয়েছেন।

‘অ্যাঁ! সে কী! কেন? কেন?’

অর্জুন অনেকক্ষণ নীরবে বসিয়া রহিল, তারপর নতমুখে অর্ধস্ফুট কণ্ঠে বলরামকে সকল কথা বলিল, কিছু গোপন করিল না। শুনিয়া বলরাম কিছুক্ষণ মেঝের উপর আঙুল দিয়া আঁক-জোক কাটিল। শেষে উঠিয়া গিয়া নিজ শয্যায় শয়ন করিল।

রাজ-রসবতীর দাসী রাত্রির খাবার লইয়া আসিল। মঞ্জিরা নয়, অন্য দাসী; মঞ্জিরা এখনো পিত্রালয় হইতে ফিরিয়া আসে নাই। দাসীকে কেহ লক্ষ্য করিল না দেখিয়া সে খাবার রাখিয়া চলিয়া গেল। অবশেষে গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া অর্জুন উঠিল, লাঠি দু’টি হাতে লইয়া বলরামের শয্যার পাশে গিয়া দাঁড়াইল, ধীরে ধীরে বলিল— ‘বলরাম ভাই, এবার আমি যাই।’

বলরাম ধড়মড় করিয়া শয্যায় উঠিয়া বসিল; বলিল— ‘যাবে! দাঁড়াও— একটু দাঁড়াও।’

সে উঠিয়া দ্রুতহস্তে নিজের জিনিসপত্র গুছাইল, নবনির্মিত কামান ইত্যাদি ছালার মধ্যে ভরিল। অর্জুন অবাক হইয়া দেখিতেছিল; বলিল— ‘এ কী, তুমিও যাবে নাকি?’

বলরাম বলিল— ‘হ্যাঁ, তুমিও যেখানে আমিও সেখানে।’

অর্জুন কুন্ঠিত হইয়া বলিল— ‘কিন্তু— রাজার কামান তৈরি—!’

বলরাম বলিল— ‘কামান তৈরি রইল।’

ক্ষণেক স্তব্ধ থাকিয়া অর্জুন বলিল— ‘আর— মঞ্জিরা?’

বলরাম বলিল— ‘মঞ্জিরা রইল। যেখানে মেয়েমানুষ সেখানেই আপদ। চল, বেরিয়ে পড়া যাক— আরে, খাবার দিয়ে গেছে দেখছি। এস, খেয়ে নিই। আবার কবে রাজভোগ জুটবে কে জানে।’

অর্জুনের ক্ষুধা-তৃষ্ণা ছিল না, তবু সে বলরামের সঙ্গে খাইতে বসিল। আহারান্তে দুই বন্ধু বাহিরে আসিল। বলরাম বলিল— ‘চল, আগে বাজারে যাই।’

পান-সুপারির বাজার তখনো সব বন্ধ হয় নাই; বলরাম চিঁড়া ও গুড় কিনিয়া ঝোলায় রাখিল, ঝোলা কাঁধে ফেলিয়া বলিল— ‘পাথেয় সংগ্রহ হল। এবার চল।’

‘কোন্‌ দিকে যাবে?’

‘পশ্চিম দিকে। পুব দিকের সীমান্ত অনেক দূরে, পশ্চিমের সীমান্ত কাছে। শুনেছি, পশ্চিম দিকে সমুদ্রতীরে কয়েকটি ছোট ছোট রাজ্য আছে।’

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। নগরের কর্ম-কলধ্বনি শান্ত হইয়া আসিতেছে। হেমকূট চূড়ায় অগ্নিস্তম্ভ অস্থির শিখায় জ্বলিতেছে। অর্জুন একটি গভীর নিশ্বাস ফেলিল। তারপর হৃদয়ে অবরুদ্ধ আবেগ লইয়া অন্ধকার নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়াইল। সহায়হীন যাত্রাপথে বন্ধু তাহার সঙ্গ লইয়াছে ইহাই তাহার একমাত্র ভরসা।

তিন

মহারাজ দেবরায় ক্রোধে ক্ষিপ্ত হইয়া গিয়াছিলেন, তথাপি তাঁহার ন্যায়বুদ্ধি ক্রোধের অগ্নিবন্যায় ভাসিয়া যায় নাই। তিনি স্বভাবতই ধীর প্রকৃতির মানুষ, নচেৎ সেদিন অর্জুন প্রাণে বাঁচিত না।

কিন্তু মানুষ যতই ধীরপ্রকৃতির হোক, এমন একটা দৃশ্য চোখে দেখিবার পর সহজে মাথা ঠাণ্ডা হয় না। নিজের বাগ্‌দত্তা বধূ অন্য পুরুষের আলিঙ্গনবদ্ধ! কয়জন রাজা রক্তদর্শন না করিয়া শান্ত হইতে পারেন?

দেবরায় বিরাম-ভবনে ফিরিয়া আসিলেন, কটি হইতে তরবারি খুলিয়া দূরে নিক্ষেপ করিয়া পালঙ্কের পাশে বসিলেন। পিঙ্গলা বোধহয় শিলাকুট্টিমের উপর তরবারির ঝনৎকার শুনিতে পাইয়াছিল, দ্রুত আসিয়া রাজার পায়ের কাছে বসিল, জিজ্ঞাসু নেত্রে রাজার মুখের পানে চাহিল।

রাজা একবার কক্ষের চারিদিকে কষায়িত দৃষ্টি ফিরাইলেন, তারপর কঠিন স্বরে বলিলেন— ‘বিদ্যুন্মালাকে স্বতন্ত্র কক্ষে রাখো, দ্বারে প্রহরিণী থাকবে। আমার বিনা আদেশে কোথাও বেরুতে পাবে না।’

পিঙ্গলা বলিল— ‘ভাল মহারাজ। কিন্তু বিদ্যুন্মালা ও মণিকঙ্কণা প্রত্যহ প্রাতে পম্পাপতির মন্দিরে যান। তার কি হবে?’

দেবরায় বিবেচনা করিলেন। ক্রোধের যুক্তিহীনতা কিঞ্চিৎ উপশম হইল। — পরপুরুষ স্পর্শের দোষ ক্ষালনের জন্য পম্পাপতির পূজা, অথচ—। এ কী বিড়ম্বনা! যা হোক, হঠাৎ পম্পাপতির মন্দিরে যাতায়াত বন্ধ করিয়া দিলে লোকে নানাপ্রকার সন্দেহ করিবে। তাহা বাঞ্ছনীয় নয়। রাজ-অন্তঃপুরের কলঙ্ককথা যতক্ষণ চাপা থাকে ততক্ষণই ভাল। বিদ্যুন্মালা হাজার হোক রাজকন্যা, তাহার সম্বন্ধে সমুচিত চিন্তা করিয়া কাজ করিতে হইবে। রাজা বলিলেন— ‘আপাতত যেমন চলছে চলুক। ব্রত উদ্‌যাপনের আর বিলম্ব কত?’

‘আর এক পক্ষ আছে আর্য।’

এক পক্ষ সময় আছে। রাজা পিঙ্গলাকে বিদায় করিয়া চিন্তা করিতে বসিলেন। রাজপরিবারে এমন উৎকট ব্যাপার বড় একটা ঘটে না। কিন্তু ঘটিলে বিষম সমস্যার উৎপত্তি হয়।

মন্ত্রী লক্ষ্মণ মল্লপ একবার আসিলেন। রাজা তাঁহাকে এ বিষয়ে কিছু বলিলেন না। লক্ষ্মণ মল্লপ রাজার বিমনা ভাব ও বাক্যালাপে অনৌৎসুক্য দেখিয়া দুই-চারিটা কাজের কথা বলিয়া প্রস্থান করিলেন।

— স্ত্রীজাতির মন স্বভাবতই চঞ্চল। অধিকাংশ নারীই বিকীর্ণমন্মথা। কিন্তু বিদ্যুন্মালাকে দেখিয়া চপল-স্বভাব মনে হয় না। সে গম্ভীর প্রকৃতির নারী। রাজকুমারীসুলভ আত্মাভিমান তাহার মনে আছে। তবে সে এমন একটা কাজ করিয়া বসিল কেন!

অর্জুন তাঁহার প্রাণ বাঁচাইয়াছিল, নদী হইতে উদ্ধার করিয়াছিল। অঙ্গস্পর্শ না করিয়া নদী হইতে উদ্ধার করা যায় না, অনিবার্যভাবেই অঙ্গস্পর্শ ঘটিয়াছিল। কিসে কি হয় বলা যায় না, সম্ভবত অঙ্গস্পর্শের ফলেই বিদ্যুন্মালা অর্জুনের প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছিল। নারীর মন একবার যাহার প্রতি ধাবিত হয়, সহজে নিবৃত্ত হয় না।

আর অর্জুন! সে প্রভুর সহিত এমন বিশ্বাসঘাতকতা করিল! অর্জুনের চরিত্র স্বভাবতই সৎ, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই; তাহার প্রত্যেক কার্যে তাহার সৎস্বভাব সুপরিস্ফুট। হয়তো বিদ্যুন্মালার কথাই সত্য, সে অর্জুনকে প্রলুব্ধ করিয়াছিল। রমণীর কুহক-ফাঁদে আবদ্ধ হইয়া কত সচ্চরিত্র যুবার সর্বনাশ হইয়াছে তাহার আর ইয়ত্তা নাই।

অর্জুন শাস্তি পাইয়াছে। এখন প্রশ্ন এই : বিদ্যুন্মালাকে লইয়া কী করা যায়? জানিয়া শুনিয়া তাহাকে বিবাহ করা অসম্ভব। অথচ বিবাহ না করিয়া তাহাকে পিতৃরাজ্যে ফিরাইয়া দেওয়াও যায় না। গজপতি ভানুদেব সামান্য ব্যক্তি নন, তিনি এই অপমান সহ্য করিবেন না। আবার যুদ্ধ বাধিবে, যে মিত্র হইয়াছে সে আবার শত্রু হইবে। …বিষ খাওয়াইয়া কিংবা অন্য কোনো উপায়ে বিদ্যুন্মালার প্রাণনাশ করিয়া অপঘাত বলিয়া রটনা করিয়া দিলে সমস্যার সমাধান হয়। কিন্তু—

মণিকঙ্কণা প্রবেশ করিল। তাহার মুখ শুষ্ক, চক্ষু দু’টি আতঙ্কে বিস্ফারিত। দ্বিধাজড়িত পদে সে পালঙ্কের পাশে আসিয়া দাঁড়াইল, শঙ্কা-সংহত কণ্ঠে বলিল— ‘মহারাজ, কি হয়েছে? মালা কী করেছে?’

বিদ্যুন্মালা ভিতরে ভিতরে কী করিতেছে মণিকঙ্কণা কিছুই জানিতে পারে নাই। এখন বিদ্যুন্মালাকে সহসা বন্দিনী অবস্থায় পৃথক কক্ষে রক্ষিত হইতে দেখিয়া মণিকঙ্কণা আশঙ্কায় একেবারে দিশাহারা হইয়া গিয়াছে।

দেবরায় অপলক নেত্রে কিয়ৎকাল তাহার মুখের পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন— ‘তুমি জানো না?’

মণিকঙ্কণা পালঙ্কের পাশে বসিয়া পড়িল, রাজার পায়ের উপর হাত রাখিয়া বলিল— ‘না মহারাজ, আমি কিছু জানি না। কিন্তু আমার বড় ভয় করছে।’

সহসা মহারাজ দেবরায়ের মনের উষ্মা সম্পূর্ণ তিরোহিত হইল। পৃথিবীতে বিদ্যুন্মালাও আছে, মণিকঙ্কণাও আছে; সরলতা ও কপটতা পাশাপাশি বাস করিতেছে। তিনি মণিকঙ্কণাকে কাছে টানিয়া আনিয়া ঈষৎ গাঢ় স্বরে বলিলেন— ‘তাহলে তোমার জেনে কাজ নেই। আজ থেকে তুমি আর বিদ্যুন্মালা পৃথক থাকবে।’

মণিকঙ্কণা আর প্রশ্ন করিল না, রাজার জানুর উপর মাথা রাখিয়া অস্ফুট স্বরে বলিল— ‘যথা আজ্ঞা মহারাজ।’

অর্জুন ও বলরাম চলিয়াছিল। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের তলে অস্পষ্ট পথরেখা ধরিয়া চলিয়াছিল। কেহ কথা বলিতেছিল না, বলিবার আছেই বা কি?

একে একে নগরের সপ্ত তোরণ পার হইয়া মধ্যরাত্রে তাহারা নগরসীমানার বাহিরে উপস্থিত হইল। অতঃপর রাজপথের স্পষ্ট নির্দেশ আর পাওয়া যায় না; নদী যেমন সমুদ্রে প্রবেশ করিয়া আপনার অস্তিত্ব হারাইয়া ফেলে, রাজপথও তেমনি উন্মুক্ত শিলাতরঙ্গিত প্রান্তরে আসিয়া আপনাকে হারাইয়া ফেলিয়াছে। পথ-বিপথ নির্ণয় করিয়া অগ্রসর হওয়া দুষ্কর।

চলিতে চলিতে টিপিটিপি বৃষ্টি আরম্ভ হইল। বলরাম এতক্ষণ নীরবে চলিয়াছিল, এখন অট্টহাস্য করিয়া উঠিল, বলিল— ‘আকাশের দেবরাজ আর বিজয়নগরের দেবরায়, দু’জনেই আমাদের প্রতি বিরূপ।’

কয়েক পা চলিবার পর অর্জুন বলিল— ‘বিজয়নগরের দেবরায়ের দোষ নেই। দোষ আমার।’

বলরাম বলিল— ‘কারুর দোষ নয়, দোষ ভাগ্যের। দৈবজ্ঞ ঠাকুর ঠিক বলেছিলেন।’

‘হুঁ। আমার সঙ্গদোষে তোমারও সর্বনাশ হল।’

‘সে আমার ভাগ্য।’

টিপিটিপি বৃষ্টি পড়িয়া চলিয়াছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের মৃদু স্ফুরণ অদৃশ্য প্রকৃতিকে পলকের জন্য দৃশ্যমান করিয়া লুপ্ত হইতেছে। থমকিয়া থমকিয়া বায়ুর একটা তরঙ্গ বহিতে আরম্ভ করিল। পথিক দু’জন এতক্ষণ বিশেষ অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে নাই, এখন রোমাঞ্চকর শৈত্য অনুভব করিতে লাগিল।

রাত্রি তৃতীয় প্রহর অতীত হইবার পর বিদ্যুতের আলোকে অদূরে একটি দেউল চোখে পড়িল। দেউলটি ভগ্নপ্রায়, কিন্তু তাহার ছাদযুক্ত বহিরঙ্গন এখনো দাঁড়াইয়া আছে। পরিত্যক্ত দেবালয়। এখানে মানুষ কেহ থাকে বলিয়া মনে হয় না। বলরাম বলিল— ‘এস, খানিক বিশ্রাম করা যাক। দিনের আলো ফুটলে আবার বেরিয়ে পড়া যাবে।’

দুইজনে ছাদের নীচে গিয়া বসিল। এখানে বিরক্তিকর বৃষ্টি ও বাতাস নাই, ভূমিতলও শুষ্ক। কিছুক্ষণ বসিয়া থাকিবার পর বলরাম পদদ্বয় প্রসারিত করিয়া শয়ন করিল। অর্জুনের দেহ অপেক্ষা মন অধিক ক্লান্ত, সে জানুর উপর মাথা রাখিয়া অবসন্ন মনে ভাবিতে লাগিল— বিদ্যুন্মালার ভাগ্যে কী আছে…

দু’জনেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, ঘুম ভাঙ্গিল পাখির ডাকে। আকাশের মেঘ ভেদ করিয়া দিনের আলো ফুটিয়াছে। কয়েকটা চটক পক্ষী মণ্ডপের তলে উড়িয়া কিচিরমিচির করিতেছে। আশেপাশে কোথাও মানুষের চিহ্ন নাই। দেউলে দেবতার বিগ্রহ নাই।

অর্জুন ও বলরাম আবার বাহির হইয়া পড়িল। বৃষ্টি থামিয়াছে, মেঘের গায়ে ফাটল ধরিয়াছে, তাহার ভিতর দিয়া নীল আকাশ দেখা যাইতেছে। বলরাম ঝুলি হইতে একমুঠি চিঁড়া বাহির করিয়া অর্জুনকে দিল, নিজে একমুঠি লইল, বলিল— ‘খেতে খেতে চল।’

বলরাম চিঁড়া চিবাইতে চিবাইতে চারিদিকে চাহিতে চাহিতে চলিল। বলিল— ‘এখানে মানুষ-জন নেই বটে, কিন্তু আগে জনবসতি ছিল, হয়তো গ্রাম ছিল। এখনো তার চিহ্ন পড়ে রয়েছে চারিদিকে। কতদিন আগে গ্রাম ছিল কে জানে!’

অর্জুন একবার চক্ষু তুলিয়া ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গৃহের ভগ্নাবশেষগুলি দেখিল, বলিল— ‘পঞ্চাশ-ষাট বছরের বেশি নয়। হয়তো মুসলমানেরা এদিক থেকে বিজয়নগর আক্রমণ করেছিল, তারপর গ্রাম ছারখার করে দিয়ে চলে গেছে।’

‘তাই হবে।’

ক্রমে সূর্যোদয় হইল, ছিন্ন মেঘের ফাঁকে কাঁচা রৌদ্র চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল, পাশে তুঙ্গভদ্রার জল ঝলমল করিয়া উঠিল।

তাহারা পশ্চিমদিকে যাইতেছে, ডানদিকে তুঙ্গভদ্রা। কিন্তু তাহারা তুঙ্গভদ্রার বেশি কাছে যাইতেছে না, সাত-আট রজ্জু দূর দিয়া যাইতেছে; তুঙ্গভদ্রার তীরে সেনা-গুল্ম আছে, সৈনিকদের হতে পড়িলে হাঙ্গামা বাধিতে পারে।

পথে একটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনী পড়িল। বর্ষার জলে খরস্রোতা কিন্তু অগভীর, দক্ষিণ দিক হইতে আসিয়া তুঙ্গভদ্রায় মিলিয়াছে। অর্জুন ও বলরাম জলে নামিয়া অঞ্জলি ভরিয়া জল পান করিল। তারপর এক-হাঁটু জল পার হইয়া চলিতে লাগিল।

তরঙ্গায়িত ভূমি, শিলাখণ্ডের ফাঁকে ফাঁকে তৃণোদ্‌গম হইয়াছে, পথের চিহ্ন নাই। আকাশে কখনো রৌদ্র কখনো ছায়া। দুই পান্থ চলিয়াছে। সূর্যাস্তের পূর্বে বিজয়নগর রাজ্যের সীমানা পার হইয়া যাইতে হইবে।

দ্বিপ্রহরে তাহারা একটি পয়োনালকের তীরে বসিয়া গুড় সহযোগে চিঁড়া ভক্ষণ করিল, তারপর পয়ঃপ্রণালীতে জল পান করিয়া আবার চলিতে লাগিল।

অপরাহ্ণে তাহারা একটি বিস্তীর্ণ উপত্যকায় পৌঁছিল। উপত্যকার পশ্চিম প্রান্তে অপেক্ষাকৃত উচ্চ পর্বত প্রাকারের ন্যায় দাঁড়াইয়া আছে। বোধহয় এই পর্বতই বিজয়নগর রাজ্যের অপরান্ত।

উপত্যকার উপর দিয়া যাইতে যাইতে দুই পান্থ লক্ষ্য করিল, আশেপাশে নিকটে দূরে বহু স্তূপ রহিয়াছে; স্তূপগুলির অভ্যন্তরস্থ পাথর দেখা যায় না, বহু যুগের ধূলা ও বালুকায় ঢাকা পড়িয়াছে। মনে হয়, সুদূর অতীতকালে এই উপত্যকায় একটি সমৃদ্ধ জনপদ ছিল; তারপর কালের আগুনে পুড়িয়া ভস্মস্তূপে পরিণত হইয়াছে। মানুষের হস্তাবলেপের সব চিহ্ন নিঃশেষে মুছিয়া গিয়াছে।

অর্জুন ও বলরাম প্রাকারসদৃশ পর্বতের পদমূলে যখন পৌঁছিল তখন সূর্যাস্ত হয় নাই বটে, কিন্তু সূর্য পর্বতের আড়ালে ঢাকা পড়িয়াছে। পর্বতের পৃষ্ঠদেশে এক সারি উচ্চ পাষাণ-স্তম্ভ দেখিয়া বোঝা যায় ইহাই বিজয়নগর রাজ্যের পশ্চিম সীমানা।

বলরাম ঊর্ধ্বে চাহিয়া বলিল— ‘এই পাহাড়টা পার হলেই আমরা মুক্ত। চল, বেলা থাকতে থাকতে পার হয়ে যাই।’

পর্বতগাত্র পিচ্ছিল। সাবধানে উপরে উঠিতে উঠিতে বলরাম মন্তব্য করিল— ‘ওপারে কাদের রাজ্য কে জানে।’

অর্জুন বলিল— ‘যদি মুসলমান রাজ্য হয়—’

বলরাম বলিল— ‘যদি মুসলমান রাজ্য হয়, অন্য রাজ্যে চলে যাব। দক্ষিণে সমুদ্রতীরে দু’একটি স্বাধীন হিন্দুরাজ্য আছে।’

পাহাড়ে বেশি দূর উঠিতে হইল না, অল্প দূরে উঠিয়া তাহারা দেখিল সম্মুখেই একটি গুহার মুখ। বহুকাল পূর্বে এই গুহা মানুষের দ্বারা ব্যবহৃত হইত, গুহার মুখে উচ্চ খিলান দিয়া বাঁধানো ছিল। এখন খিলান ভাঙ্গিয়া পড়িয়া গুহামুখে স্তূপীভূত হইয়াছে। কিন্তু গুহার মুখ একেবারে বন্ধ হইয়া যায় নাই।

বলরাম গুহার মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারিয়া বলিল— ‘আমাদের দেখছি গুহা-ভাগ্য প্রবল, যেখানে যাই সেখানেই গুহা।’

বলরাম একটি প্রস্তরখণ্ডের উপর বসিল, আকাশের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া বলিল— ‘রাত্রে বোধহয় আবার বৃষ্টি হবে। পাহাড়ের ওপারে আশ্রয় পাওয়া যাবে কিনা ঠিক নেই। — কি বল? আজ রাত্রিটা গুহাতেই কাটাবে?’

অর্জুন নির্লিপ্ত স্বরে বলিল— ‘তোমার যেমন ইচ্ছা।’

‘তবে এস, এই বেলা গুহায় ঢুকে পড়া যাক।’ বলরাম উঠিয়া গুহায় প্রবেশের উপক্রম করিল।

এই সময় অর্জুনের দৃষ্টি পড়িল গুহামুখের একটি প্রস্তরফলকের উপর। অসমতল প্রস্তরফলকের গাত্রে প্রাচীন কর্ণাটী লিপিতে কয়েকটি আঁকাবাঁকা শব্দ খোদিত রহিয়াছে।

অপটু হস্তে পাষাণ কাটিয়া কেহ এই শব্দগুলি খোদিত করিয়াছিল। বহুকালের রৌদ্রবৃষ্টির প্রকোপে অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে, তবু যত্ন করিলে পাঠোদ্ধার করা যায়— ‘দেবদাসী তনুশ্রী গৌড়নিবাসী শিল্পী মীনকেতুকে কামনা করিয়াছিল।’

অর্জুন কিছুক্ষণ এই শিলালেখের প্রতি চাহিয়া রহিল, তারপর বাহিরে একটি শিলাখণ্ডের উপর গিয়া বসিল। বলরাম বলিল— ‘কি হল?’

অর্জুন উত্তর দিল না, বহু দূর অতীতের এক পরিচয়হীনা নারীর কথা ভাবিতে লাগিল। কবে কে জানে, তনুশ্রী নামে এক দেবদাসী ছিল…সম্মুখের উপত্যকায় নগরী ছিল, নগরীর দেবমন্দিরে তনুশ্রী ছিল দেবদাসী… সেকালে দেবদাসীদের বিবাহ হইত না, তাহারা দেবভোগ্যা…তারপর কোথা হইতে আসিল মীনকেতু নামে এক শিল্পী…হয়তো সে পাষাণ-শিল্পে দক্ষ ছিল, যে মন্দিরে তনুশ্রী ছিল দেবদাসীদের অন্যতমা সেই মন্দিরের শিল্পশোভা রচনার জন্য শিল্পী মীনকেতু আসিয়াছিল…তারপর তনুশ্রী কামনা করিল শিল্পী মীনকেতুকে…অন্তর্গূঢ় তীব্র কামনা…দিন কাটিল মাস কাটিল, কিন্তু তনুশ্রীর কামনা পূর্ণ হইল না…শিল্পী মীনকেতু একদিন কাজ শেষ করিয়া চলিয়া গেল, হয়তো তনুশ্রীকে নিজের বজ্রসূচী উপহার দিয়া গেল…তারপর একদিন অন্তরের গোপন দাহ আর সহ্য করিতে না পারিয়া তনুশ্রী চুপি চুপি গুহামুখে আসিয়া পাষাণ-গাত্রে নিজের মর্মজ্বালা খোদিত করিয়া রাখিল; অনিপুণ হস্তের স্বল্পাক্ষর ভাষায় তাহার হৃদয়ের ক্রন্দন প্রকাশ পাইল— দেবদাসী তনুশ্রী গৌড়নিবাসী শিল্পী মীনকেতুকে কামনা করিয়াছিল। — কামনা পূর্ণ হয় নাই, পূর্ণ হইলে মর্মান্তিক গোপন কথা পাষণে উৎকীর্ণ হইত না।

সামান্যা দেবদাসী তনুশ্রীকে কেহ মনে করিয়া রাখে নাই, কিন্তু তাহার ব্যর্থ কামনা পাষাণফলকে কালজয়ী হইয়া আছে। ইহাই কি সকল ব্যর্থ কামনার অন্তিম নিয়তি!

অর্জুন তন্ময় হইয়া ভাবিতেছিল, কয়েক বিন্দু বৃষ্টির জল তাহার মাথায় পড়িল। সে ঊর্ধ্বে একবার নেত্রপাত করিয়া দেখিল, সন্ধ্যার আকাশে মেঘ পুঞ্জীভূত হইয়াছে। ঝরিয়া-পড়া বারিবিন্দু যেন দেবদাসী তনুশ্রীর অশ্রুজল।

অর্জুন উঠিয়া বলরামকে বলিল— ‘চল, গুহায় যাই।’

চার

গুহার প্রবেশ-মুখ বেশ প্রশস্ত, কিন্তু ক্রমশ সঙ্কীর্ণ হইয়া ভিতর দিকের অন্ধকারে অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। ভূমিতলে শুষ্ক প্রস্তরপট্ট। এখানে শয়ন করিলে আর কোনো সুখ না থাক, বৃষ্টিতে ভিজিবার ভয় নাই।

দুইজনে প্রস্তরপট্টের খানিকটা ঝাড়িয়া-ঝুড়িয়া উপবেশন করিল। বলরাম বলিল— ‘মন্দ হল না। যদি বাঘ ভালুক না থাকে আরামে রাত কাটবে। এস, এবার রাজভোগ সেবন করে শুয়ে পড়া যাক। অনেক হাঁটা হয়েছে।’

গুহার বাহিরে ধূসর আকাশ হইতে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টিপাত হইতেছে। গুহার মধ্যে অন্ধকার ঘন হইতেছে। দুইজনে শুষ্ক চিঁড়া-গুড় সেবন করিয়া পাশাপাশি শয়ন করিল।

দু’জনেই পরিশ্রান্ত। বলরাম অচিরাৎ ঘুমাইয়া পড়িল। অর্জুনের কিন্তু তৎক্ষণাৎ ঘুম আসিল না। গুহার ভিতর ও বাহির অন্ধকারে ডুবিয়া গেল; রাত্রি গভীর হইতে লাগিল।

ক্লান্ত চক্ষু অন্ধকারে মেলিয়া অর্জুন চিন্তা করিতে লাগিল দুইটি নারীর কথা; এক, বহুযুগের পরপার হইতে আগতা তনুশ্রী, দ্বিতীয়— বিদ্যুন্মালা। একজন সামান্যা দেবদাসী, অন্যা রাজকুমারী। কিন্তু তাহাদের জীবনের এক স্থানে ঐক্য আছে; তাহারা যাহা কামনা করিয়াছিল তাহা পায় নাই। নিয়তির পক্ষপাত নাই, নিয়তির কাছে রাজকন্যা এবং দেবদাসী সমান। — অর্জুনের মনের মধ্যে রাজকন্যা ও দেবদাসী একাকার হইয়া গেল।

গুহার মধ্যে শীতল জলসিক্ত বায়ুর মন্দ প্রবাহ রহিয়াছে। বায়ুপ্রবাহ গুহা-মুখের দিক হইতে আসিতেছে না, ভিতর দিক হইতে আসিতেছে। অর্জুন কিছুক্ষণ তাহা অনুভব করিয়া ভাবিল— গুহার মধ্যে তো বায়ু-চলাচল থাকে না, বদ্ধ বাতাস থাকে; তবে কি এ-গুহা নয়, সুড়ঙ্গ? পাহাড়ের পেট ফুঁড়িয়া অপর পাশে বাহির হইয়াছে? তাহা যদি হয়, পর্বত লঙ্ঘনের ক্লেশ বাঁচিয়া যাইবে।

ক্রমে তাহার চক্ষু মুদিয়া আসিতে লাগিল। অল্পকাল মধ্যেই সে ঘুমাইয়া পড়িত, কিন্তু এই সময় একটি অতি ক্ষীণ শব্দ তাহার কর্ণে প্রবেশ করিয়া আবার তাহাকে সজাগ করিয়া তুলিল। শব্দ নয়, যেন বাতাসের মৃদু অথচ দ্রুত স্পন্দন; বহুদূর হইতে আসিতেছে। বাদ্যভাণ্ডের শব্দ। কিছুক্ষণ শুনিবার পর অর্জুন উঠিয়া বসিল।

হ্যাঁ, তাই বটে। বহু দূরে কিড়ি কিড়ি নাকাড়া বাজিতেছে। কিছুক্ষণের জন্য থামিয়া যাইতেছে, আবার বাজিতেছে। — কিন্তু এই জনপ্রাণীহীন গিরিপ্রান্তরে এত রাত্রে নাকাড়া বাজায় কে? শব্দটা এতই ক্ষীণ যে, কোন্‌ দিক হইতে আসিতেছে অনুমান করা যায় না।

অর্জুন বলরামের গায়ে হাত রাখিতেই সে উঠিয়া বসিল। অন্ধকারে কেহ কাহাকেও দেখিল না, বলরাম বলিল— ‘কী?’

অর্জুন বলিল— ‘কান পেতে শোনো। কিছু শুনতে পাচ্ছ?’

বলরাম কিছুক্ষণ স্থির হইয়া বসিয়া শুনিল; শেষে বলিল— ‘অনেক দূরে নাকাড়া বাজছে! এ কি ভৌতিক কাণ্ড না কি? কারা নাকাড়া বাজাচ্ছে? হুক্ক-বুক্ক?’

অর্জুন বলিল— ‘না, মুসলমান নাকাড়া বাজাচ্ছে। আমি ওদের বাজনা চিনি।’

‘আমিও চিনি।’ বলরাম আরও খানিকক্ষণ শুনিয়া বলিল— ‘তাই বটে। খিটি মিটি খিটি মিটি খিট্‌ খিট্‌। কিন্তু মুসলমান এখানে এল কোথা থেকে?’

‘পাহাড়ের ওপারে হয়তো বহমনী রাজ্য।’

‘তা হতে পারে, কিন্তু পাহাড় ডিঙ্গিয়ে এতদূরে নাকাড়ার শব্দ আসবে?’

‘কেন আসবে না। এই গুহা যদি সুড়ঙ্গ হয়, তাহলে আসতে পারে।’

‘সুড়ঙ্গ!’

অর্জুন বায়ু-চলাচলের কথা বলিল। শুনিয়া বলরাম বলিল— ‘সম্ভব। উপত্যকায় যখন মানুষের বসতি ছিল, তখন তারা এই সুড়ঙ্গ দিয়ে পাহাড় পার হত। এখন মানুষ নেই, গুহাটা পড়ে আছে। — কিন্তু মুসলমানেরা গুহার ওপারে কী করছে? ওপারে কি নগর আছে?’

‘জানি না। সম্ভব মনে হয় না।’

বলরাম একটু নীরব থাকিয়া বলিল— ‘আজ রাত্রে আর ভেবে কোনো লাভ নেই। শুয়ে পড়। কাল সকালে উঠে দেখা যাবে।’

বলরাম শয়ন করিল। অর্জুন উৎকর্ণভাবে বসিয়া রহিল, কিন্তু দূরাগত নাকাড়াধ্বনি আর শোনা গেল না। তখন সেও শয়ন করিল।

পরদিন প্রাতে যখন তাহাদের ঘুম ভাঙ্গিল তখন সূর্যোদয় হইয়াছে, মেঘভাঙ্গা সজল রৌদ্র গুহা-মুখে প্রবেশ করিয়াছে। বলরাম বলিল— ‘এস দেখা যাক, এটা গুহা কি সুড়ঙ্গ।’

দুইজনে গুহার অভ্যন্তরের দিকে চলিল। নবোদিত সূর্যের আলো অনেক দূর পর্যন্ত গিয়াছে, সেই আলোতে পথ দেখিয়া চলিল। গুহা ক্রমশ সংকীর্ণ হইয়া আসিতেছে, দুইজন পাশাপাশি চলা যায় না। অর্জুন আগে আগে চলিল।

অনুমান দুই রজ্জু সিধা গিয়া রন্ধ্র তেরছাভাবে মোড় ঘুরিল। এখানে আর সূর্যের আলো নাই; প্রথমটা ছায়া-ছায়া, তারপর সূচীভেদ্য অন্ধকার।

অর্জুন তাহার লাঠি দু’টি ভল্লের ন্যায় সম্মুখে বাড়াইয়া সন্তর্পণে অগ্রসর হইল। অনুমান আর দুই রজ্জু গিয়া লাঠি প্রাচীরে ঠেকিল। আবার একটা মোড়, এবার বাঁ দিকে।

মোড় ঘুরিয়া কয়েক পা গিয়া অর্জুন দাঁড়াইয়া পড়িল। হঠাৎ অন্ধকার স্বচ্ছ হইয়াছে, বেশ খানিকটা দূরে চতুষ্কোণ রন্ধ্রের মুখে সবুজ আলোর ঝিলিমিলি।

অর্জুন বলিল— ‘সুড়ঙ্গই বটে।’

সঙ্কীর্ণ সুড়ঙ্গ ক্রমশ প্রশস্ত হইয়াছে, কিন্তু সুড়ঙ্গের শেষে নির্গমনের রন্ধ্রটি বৃহৎ নয়; প্রস্থ অনুমান দুই হস্ত, খাড়াই তিন হস্ত। একজন মানুষের বেশি একসঙ্গে প্রবেশ করিতে পারে না।

অর্জুন ও বলরাম রন্ধ্রমুখ দিয়া বাহিরে উঁকি মারিল। যাহা দেখিল তাহাতে তাহাদের দেহ শক্ত হইয়া উঠিল।

রন্ধ্রমুখের চারিপাশে ও নিম্নে যে-সব ঝোপ-ঝাড় জন্মিয়াছিল তাহা কাটিয়া পরিষ্কৃত হইয়াছে; রন্ধ্রমুখ হইতে জমি ক্রমশ ঢালু হইয়া প্রায় বিশ হাত নীচে সমতল হইয়াছে। সমতল ভূমিতে বড় বড় গাছের বন। গাছগুলি কিন্তু ঘন-সন্নিবিষ্ট নয়, গাছের ফাঁকে ফাঁকে বহুদূর পর্যন্ত নিষ্পাদপ ভূমি দেখা যায়। উন্মুক্ত ভূমির উপর সারি সারি অসংখ্য তালপাতার ছাউনি। ছাউনিতে অগণিত মানুষ। মানুষগুলি মুসলমান সৈনিক, তাহাদের বেশভূষা ও অস্ত্রশস্ত্র দেখিয়া বোঝা যায়। মাটির উপর লম্বমান অনেকগুলি তালগাছের কাণ্ডের ন্যায় বৃহৎ কামান; সৈনিকেরা কামানের গায়ে দড়ি বাঁধিয়া সেগুলিকে পাহাড়ের দিকে টানিয়া আনিতেছে। বেশি চেঁচামেচি সোরগোল নাই, প্রায় নিঃশব্দে কাজ হইতেছে।

বলরাম কিছুক্ষণ এই দৃশ্য নিরীক্ষণ করিয়া অর্জুনের হাত ধরিয়া ভিতর দিকে টানিয়া লইল। রন্ধ্রমুখ হইতে কিছু দূরে বসিয়া দুইজনে পরস্পরের মুখের পানে চাহিয়া রহিল। শেষে বলরাম হ্রস্বকণ্ঠে বলিল— ‘গুহার মধ্যে প্রতিধ্বনি হয়, আস্তে কথা বল। কী বুঝলে?’

একটু চুপ করিয়া থাকিয়া অর্জুন বলিল— ‘ওরা বহমনী রাজ্যের সৈন্য।’

বলরাম বলিল— ‘হুঁ। কত সৈন্য?’

‘ছাউনি দেখে মনে হয় দশ হাজারের কম নয়। পিছনে আরো থাকতে পারে।’

‘হুঁ। ওদের মতলব কি?’

‘অতর্কিতে বিজয়নগর আক্রমণ করা ছাড়া আর কী মতলব থাকতে পারে? ওরা এই সুড়ঙ্গের সন্ধান জানে, তাই সুড়ঙ্গের মুখ থেকে ঝোপ-ঝাড় কেটে পরিষ্কার করে রেখেছে। এইদিক দিয়ে সৈন্যরা বিজয়নগরে প্রবেশ করবে।’

‘আর কামানগুলো? সেগুলো তো সুড়ঙ্গ দিয়ে আনা যাবে না।’

‘সেইজন্যেই বোধহয় ওদের দেরি হচ্ছে। কামানগুলোকে আগে পাহাড় ডিঙ্গিয়ে নিয়ে যাবে, তারপর নিজেরা সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকবে।’

‘আমারও তাই মনে হয়।’ বলরাম থলি হইতে চিঁড়া-গুড় বাহির করিয়া অর্জুনকে দিল, নিজেও লইল। বলিল— ‘এখন আমাদের কর্তব্য কি?’

অর্জুন বলিল— ‘এদের কার্যকলাপ আরো কিছুক্ষণ লক্ষ্য করা দরকার। আমরা যা অনুমান করছি তা ভুলও হতে পারে।’

দু’জনে নির্জলা প্রাতরাশ শেষ করিল। বলরাম বলিল— ‘ইতিমধ্যে আমার ছোট্ট কামানে বারুদ গেদে তৈরি হয়ে থাকি। যদি কেউ সুড়ঙ্গে মাথা গলায় তাকে বধ করব।’

অর্জুন বলিল— ‘প্রস্তুত থাকা ভাল। আমারও ভল্ল আছে।’

বলরাম থলি হইতে কামান বাহির করিল। কামানে বারুদ ও গুলি ভরিয়া নারিকেল ছোবড়ার দড়ির মুখে চক্‌মকি ঠুকিয়া আগুন ধরাইল। তারপর দুইজনে রন্ধ্রমুখের অন্ধকারে প্রচ্ছন্ন থাকিয়া সৈন্যদের কার্যবিধি দেখিতে লাগিল।

যত বেলা বাড়িতেছে সৈনিকদের কর্মতৎপরতাও তত বাড়িতেছে। কয়েকজন সেনানীপদস্থ ব্যক্তি সিপাহীদের কর্ম পরিদর্শন করিতেছে। স্পষ্টই বোঝা যায়, কামানগুলিকে টানিয়া পাহাড়ে তুলিবার চেষ্টা হইতেছে। কিন্তু কামানগুলি এতই গুরুভার যে, কার্য অতি ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতেছে।

দ্বিপ্রহরে কিটি কিটি নাকাড়া বাজিল। এই নাকাড়ার ক্ষীণ শব্দ কাল রাত্রে তাহারা শুনিয়াছিল। সৈনিকেরা কর্মে বিরাম দিয়া মধ্যাহ্ন ভোজনে বসিল। বলরাম ও অর্জুন তখন রন্ধ্রমুখ হইতে সরিয়া আসিল। বলরাম বলিল— ‘আর সন্দেহ নেই। এখন কর্তব্য কী বল।’

অর্জুন বলিল— ‘কর্তব্য অবিলম্বে রাজাকে সংবাদ দেওয়া।’

বলরাম কিছুক্ষণ মাথা চুলকাইল। রাজা অর্জুনকে নির্বাসন দিয়াছেন, কিন্তু অর্জুন বিজয়নগরকে মাতৃভূমি জ্ঞান করে, বিজয়নগরকে সে অনিষ্ট হইতে রক্ষা করিবে। বলরামেরও রক্ত তপ্ত হইয়া উঠিল। সে বলিল— ‘ঠিক কথা। কিন্তু রাজাকে অবিলম্বে সংবাদ কি করে দেওয়া যায়! আমি যেতে পারি, কিন্তু পায়ে হেঁটে যেতে সময় লাগবে। ততক্ষণে—’ বলরাম রন্ধ্রমুখের দিকে হস্ত সঞ্চালন করিল।

অর্জুন বলিল— ‘তুমি যাবে না, আমি যাব।’

বলরাম চমকিয়া বলিল— ‘তুমি যাবে! কিন্তু রাজ্যের মধ্যে ধরা পড়লেই তো তোমার মুণ্ড যাবে।’

অর্জুন বলিল— ‘যায় যাক। আমার জীবনের কোনো মূল্য নেই। যদি বিজয়নগরকে রক্ষা করতে পারি—’

‘অর্জুন, আমার কথা শোনো। তুমি থাকো, আমি যাচ্ছি। কাল এই সময় পৌঁছুতে পারব।’

‘না। ততক্ষণে শত্রু কামান নিয়ে পাহাড় পার হবে। আমি লাঠিতে চড়ে শীঘ্র যাব, আজ রাত্রেই রাজাকে সংবাদ দিতে পারব।’

‘কিন্তু— তুমি বিজয়নগরকে এত ভালবাসো?’

‘বিজয়নগরকে বেশি ভালবাসি, কি রাজাকে বেশি ভালবাসি, কি বিদ্যুন্মালাকে বেশি ভালবাসি, তা জানি না। কিন্তু আমি যাব।’

এই সময় বাধা পড়িল। রন্ধ্রমুখের বাহিরে মানুষের কণ্ঠস্বর। বলরাম ও অর্জুন দ্রুত উঠিয়া গুহামুখের পাশের দিকে সরিয়া গেল; বলরাম একবার গলা বাড়াইয়া দেখিল, তারপর অর্জুনের কানের কাছে মুখ আনিয়া ফিস্‌ফিস্‌ করিয়া বলিল— ‘তিন-চারজন সেনানী এদিক পানে আসছে। তৈরি থাকো, ওরা গুহার মধ্যে পা বাড়ালেই কামান দাগব।’ বলরাম ক্ষিপ্র হস্তে কামান ও আগুনের পলিতা হাতে লইয়া দাঁড়াইল।

সেনানীরা ঢালু জমি দিয়া উপরে উঠিতেছে, তাহাদের বাক্যাংশ বিচ্ছিন্নভাবে শোনা গেল—

‘কামানগুলো আগে পাহাড়ের ওপারে নিয়ে যেতে হবে, তারপর…’

‘সৈন্যরা যখন ইচ্ছা সুড়ঙ্গ পার হতে পারে…’

‘তুমি সুড়ঙ্গে ঢুকে দেখেছ?’

‘দেখেছি। মাঝখানে অন্ধকার বটে, কিন্তু মশাল জ্বাললে…’

‘এস দেখি।’

রন্ধ্রের মুখ সংকীর্ণ, একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তি প্রবেশ করিতে পারে না। বলরাম রন্ধ্রমুখের দিকে কামান লক্ষ্য করিয়া দাঁড়াইল।

একটা মানুষ রন্ধ্রমুখে দেখা গেল। সে রন্ধ্রে প্রবেশ করিবার জন্য পা বাড়াইয়াছে অমনি বলরামের কামান ছুটিল। গুহামধ্যে বিকট প্রতিধ্বনি উঠিল।

প্রবেশোম্মুখ লোকটার বুকে গুলি লাগিয়াছিল, সে রন্ধ্রের বাহিরে পড়িয়া গেল, তারপর ঢালু জমির উপর গড়াইতে গড়াইতে নীচে নামিয়া গেল। অন্য যাহারা সঙ্গে ছিল তাহারা এই অভাবনীয় বিপর্যয়ে ভয় পাইয়া চিৎকার করিতে করিতে ছুটিয়া পলাইল।

বলরাম উত্তেজিতভাবে অর্জুনের কানে কানে বলিল— ‘তুমি যাও, রাজাকে খবর দাও। আমি এখানে আছি। যতক্ষণ বারুদ আছে ততক্ষণ কাউকে গুহায় ঢুকতে দেব না।’ সে আবার কামানে গুলি-বারুদ ভরিতে লাগিল।

‘চললাম।’ অর্জুন একবার বলরামকে ভাল করিয়া দেখিয়া লইয়া সুড়ঙ্গমধ্যে প্রবেশ করিল। হয়তো আর দেখা হইবে না।

পাঁচ

সুড়ঙ্গের পূর্ব প্রান্তে নির্গত হইয়া অর্জুন আকাশের পানে চাহিল। মেঘ-ঢাকা আকাশে ছাই-ঢাকা অঙ্গারের মত সূর্য একটু পশ্চিমে ঢলিয়াছে। এখনো দেড় প্রহর বেলা আছে। এই বেলা বাহির হইয়া পড়িলে সন্ধার পর বিজয়নগরে পৌঁছানো যাইবে। অর্জুন উপত্যকায় নামিল, তারপর লাঠিতে চড়িয়া পূর্বমুখে দীর্ঘায়িত পদদ্বয় চালিত করিয়া দিল।

তেজস্বী অশ্ব যেরূপ শীঘ্র চলে, অর্জুন সেইরূপ শীঘ্র চলিয়াছে। তবু তাহার মনঃপূত হইতেছে না, আরো শীঘ্র চলিতে পারিলে ভাল হয়। তাহার আশঙ্কা, যদি ঝড়বৃষ্টি আরম্ভ হয়, যদি ঘন মেঘের অন্তরালে সূর্য আকাশে অস্তমিত হয়, তাহা হইলে পথ চিনিয়া বিজয়নগরে ফিরিয়া যাওয়া সম্ভব হইবে না। পথের একমাত্র নির্দেশ দূরে বাম দিকে তুঙ্গভদ্রার উদ্বেল ধারা। তুঙ্গভদ্রার সমান্তরালে চলিলে পথ ভুলিবার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু যদি প্রবল বারিধারায় চারিদিক আচ্ছন্ন হইয়া যায়, তুঙ্গভদ্রাকে দেখা যাইবে না।

অর্জুন দুই দণ্ডে উপত্যকা পার হইল। তারপর উদ্‌ঘাতপূর্ণ শিলাবিকীর্ণ ভূমি, সাবধানে না চলিলে অপঘাতের সম্ভাবনা। অর্জুন সতর্কভাবে চলিতে লাগিল, তাহার গতি অপেক্ষাকৃত মন্থর হইল। তবু এইভাবে চলিলে সন্ধ্যার অব্যবহিত পরে পৌঁছানো যাইতে পারে। এখনো প্রায় বিশ ক্রোশ পথ বাকি।

সূর্য দিগন্তের দিকে আরো নামিয়া পড়িল। দিক্‌চক্রে গাঢ় মেঘ, পুঞ্জীভূত হইয়াছে, তাই সূর্যাস্তের পূর্বেই চতুর্দিক ছায়াচ্ছন্ন, দূরের দৃশ্য অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে।

তারপর হঠাৎ একটি দুর্ঘটনা হইল। অর্জুনের একটি লাঠি পাথরের ফাটলের মধ্যে আটকাইয়া গিয়া দ্বিখণ্ডিত হইয়া ভাঙ্গিয়া গেল। অর্জুন প্রস্তুত ছিল না, হুমড়ি খাইয়া মাটিতে পড়িল।

ত্বরিতে উঠিয়া সে ভগ্ন লাঠি পরীক্ষা করিল। লাঠি ঠিক মাঝখানে ভাঙিয়াছে, ব্যবহারের উপায় নাই। অর্জুন কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়া দাঁড়াইল, তারপর ভাঙ্গা লাঠি ফেলিয়া দিয়া ছুটিতে আরম্ভ করিল। প্রস্তর-কর্কশ ভূমির উপর দিয়া নগ্নপদে ছুটিয়া চলিল।

সূর্য অস্ত গেল। যেটুকু আলো ছিল তাহাও নিভিয়া গেল, আকাশের অষ্ট দিক হইতে যেন দলে দলে বাদুড় আসিয়া আকাশ ছাইয়া ফেলিল। দিক্‌চিহ্নহীন ভূমিতলে আর কিছু দেখা যায় না।

অর্জুন তবু ছুটিয়া চলিয়াছে। শিলাঘাতে চরণ ক্ষতবিক্ষত, কোন্‌ দিকে চলিয়াছে তাহার জ্ঞান নাই, তবু অন্তরের দুরন্ত প্রেরণায় ছুটিয়া চলিয়াছে।

রাত্রি কত? প্রথম প্রহর কি অতীত হইয়া গিয়াছে! তবে কি আজ রাত্রে রাজার কাছে পৌঁছানো যাইবে না? অর্জুন থমকিয়া দাঁড়াইয়া চতুর্দিকে চাহিল। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে সহসা চোখে পড়িল বাম দিকে দিগন্তরেখার কাছে ক্ষুদ্র রক্তাভ একটি আলোকপিণ্ড। প্রথমটা সে কিছুই বুঝিতে পারিল না; তারপর মনে পড়িল— হেমকূট পর্বতের মাথায় অগ্নিস্তম্ভ। সে দিগ্‌ভ্রান্তভাবে দক্ষিণে চলিয়াছিল।

একটা নিশানা যখন পাওয়া গিয়াছে তখন আর ভাবনা নাই। বিজয়নগর এখনো অনেক দূরে, কিন্তু সেখান হইতে আলোর হাতছানি আসিয়াছে। অর্জুন অগ্নিবিন্দুটি সম্মুখে রাখিয়া আবার দৌড়াতে আরম্ভ করিল।

মনে হইতেছে যেন অগ্নিবিন্দুটি আকারে বড় হইতেছে, শিখা দেখা যাইতেছে। বিজয়নগর আর বেশি দূর নয়।

তারপর হঠাৎ সব লণ্ডভণ্ড হইয়া গেল। অন্ধকারে ছুটিতে ছুটিতে সহসা তাহার পায়ের তলা হইতে মাটি সরিয়া গেল, ক্ষণকাল শূন্যে পড়িতে পড়িতে সে ঝপাং করিয়া জলে পড়িল, পতনের বেগে জলে ডুবিয়া গেল। তারপর যখন সে মাথা জাগাইল, তখন ভরা নদীর খরস্রোত তাহাকে ঠেলিয়া লইয়া চলিয়াছে।

আবার তুঙ্গভদ্রার জলে অবগাহন। কিন্তু এবার ভয় নাই। তুঙ্গভদ্রা তাহাকে বিজয়নগর পৌঁছাইয়া দিবে।

অর্জুন চলিয়া যাইবার পর বলরাম কামানে গুলি-বারুদ ভরিয়া সুড়ঙ্গের মধ্যে বসিয়া রহিল। রন্ধ্রমুখের বাহির হইতে বহু কণ্ঠের উত্তেজিত কলরব আসিতেছে। কিন্তু রন্ধ্রমুখের কাছে কেহ আসিতেছে না। বলরাম দাঁত খিঁচাইয়া হিংস্র হাসি হাসিল, মনে মনে বলিল— ‘যিনি এদিকে আসবেন তাঁকে শহীদী’র শরবৎ পান করাব।’*

দু’দণ্ড অপেক্ষা করিবার পর কেহ আসিতেছে না দেখিয়া বলরাম গুড়ি মারিয়া গুহামুখের নিকটে আসিল। বাহিরে দৃষ্টি প্রেরণ করিয়া দেখিল, পঞ্চাশ হাত দূরে হৈ হৈ কাণ্ড বাধিয়া গিয়াছে। ভিমরুলের চাকে ঢিল মারিলে যেরূপ হয় পরিস্থিতি প্রায় সেইরূপ; বিক্ষিপ্ত চঞ্চল পতঙ্গের মত অগণিত মুসলমান সৈনিক বিভ্রান্তভাবে ছুটাছুটি করিতেছে, অধিকাংশ সৈনিক কটি হইতে তরবারি বাহির করিয়া আস্ফালন করিতেছে। কিন্তু মৃতদেহটা যেখানে গড়াইয়া পড়িয়াছিল সেখানেই পড়িয়া আছে, কেহ তাহার নিকটে আসিতে সাহস করে নাই। একদল সৈনিক অর্ধচন্দ্রাকারে কাতার দিয়া পঞ্চাশ হাত দূরে দাঁড়াইয়া আছে এবং একদৃষ্টে মৃতদেহের পানে তাকাইয়া আছে।

তাহাদের ভীতি ও বিভ্রান্তির যথেষ্ট কারণ ছিল। তাহারা ভাবিয়াছিল কাছাকাছি শত্রু নাই। তাহারা ইতিপূর্বে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়া সুড়ঙ্গের এপার ওপর দেখিয়া আসিয়াছে, জনমানবের দর্শন পায় নাই। হঠাৎ এ কী হইল? গুহার মধ্য হইতে কাহারা অস্ত্র নিক্ষেপ করিল! কেমন অস্ত্র! তীর নয়, তীর হইলে দেহে বিঁধিয়া থাকিত। তবে কেমন অস্ত্র? আততায়ী মানুষ না জিন্‌! ছোট কামান যে থাকিতে পারে ইহা তাহাদের বুদ্ধির অতীত।

সেনানীরা নিজেদের মধ্যে এই অভাবনীয় ঘটনার আলোচনা করিতে লাগিলেন, কিন্তু কোনো স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারিলেন না। সকলেরই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। পাহাড় ডিঙ্গাইয়া কামান লইয়া যাওয়ার কাজও স্থগিত হইল। মৃতদেহটা সারাদিন পড়িয়া রহিল।

সূর্যাস্তের পর অন্ধকার গাঢ় হইলে একদল সৈনিক চুপি চুপি আসিয়া ভীত-চকিত নেত্রে রন্ধ্রের পানে চাহিতে চাহিতে মৃতদেহ তুলিয়া লইয়া গেল। তারপর দীর্ঘকাল কোনো পক্ষেরই আর সাড়াশব্দ নাই।

মধ্যরাত্রে বলরাম কামান কোলে বসিয়া বসিয়া একটু ঝিমাইয়া পড়িয়াছিল, হঠাৎ একটা জ্বলন্ত মশাল গুহার মধ্যে আসিয়া পড়িল। বলরাম চমকিয়া আরো কোণের দিকে সরিয়া গেল, যাহাতে মশালের আলোকে তাহাকে দেখা না যায়। কামান উদ্যত করিয়া সে বসিয়া রহিল।

কিন্তু কেহ গুহায় প্রবেশ করিল না। মশালটা প্রচুর ধূম বিকীর্ণ করিতে করিতে নিভিয়া গেল।

দণ্ড দুই পরে আর একটা জ্বলন্ত মশাল আসিয়া পড়িল। বলরাম শত্রুপক্ষের মতলব বুঝিল; তাহারা আগুন ও ধোঁয়ার সাহায্যে লুক্কায়িত আততায়ীকে বাহিরে আনিতে চাহে। সে চুপটি করিয়া রহিল।

ওদিকে বহমনী সেনানীদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনার অন্ত ছিল না। যদি গুহায় লুক্কায়িত জীব বা জীবগণ মানুষ হয় তবে তাহারা নিশ্চয় বিজয়নগরের মানুষ। যদি বিজয়নগরের মানুষ আক্রমণের কথা জানিতে পারিয়া থাকে তাহা হইলে অতর্কিত আক্রমণ ব্যর্থ হইয়াছে। এখন কী কর্তব্য? গুহানিবদ্ধ জীব সম্বন্ধে নিঃসংশয় না হওয়া পর্যন্ত কিছু করা যায় না।

রাত্রি তৃতীয় প্রহরে আবার রন্ধ্রমুখের কাছে মশালের আলো দেখা গেল। এবার মশাল গুহামধ্যে নিক্ষিপ্ত হইল না; একজন কেহ গুহার বাহিরে অদৃশ্য থাকিয়া মশালটাকে ভিতরে প্রবিষ্ট করাইয়া ঘুরাইতে লাগিল।

বলরাম চুপটি করিয়া রহিল।

লোকটা তখন সাহস পাইয়া গুহার মধ্যে পা বাড়াইল। সে গুহার মধ্যে পদার্পণ করিয়াছে অমনি ভয়ঙ্কর প্রতিধ্বনি তুলিয়া বলরামের কামান গর্জন করিয়া উঠিল। লোকটা গলার মধ্যে কাকুতির ন্যায় শব্দ করিয়া পড়িয়া গেল, মশাল মাটিতে পড়িয়া দপ্‌দপ্‌ করিতে লাগিল।

লোকটা আর শব্দ করিল না, রন্ধ্রমুখের কাছে অনড় পড়িয়া রহিল। মশালের নিবন্ত আলোয় বলরাম আবার কামানে গুলি-বারুদ ভরিল। তাহার ইচ্ছা হইল উচ্চৈঃস্বরে গান ধরে— হরে মুরারে মধুকৈটভারে! কিন্তু সে ইচ্ছা দমন করিল।

অতঃপর আর কেহ আসিল না। মশালও না।

মহারাজ দেবরায় সান্ধ্য আহার শেষ করিয়া বিরামকক্ষে আসিয়া বসিয়াছিলেন। মন্ত্রী লক্ষ্মণ মল্লপ পালঙ্কের সন্নিকটে হর্ম্যতলে বসিয়া কোলের কাছে পানের বাটা লইয়া সুপারি কাটিতেছিলেন। কক্ষে অন্য কেহ ছিল না; কক্ষের চারি কোণে দীপগুচ্ছ জ্বলিতেছিল। মন্ত্রী ও রাজা নিম্নস্বরে জল্পনা করিতেছিলেন।

মণিকঙ্কণা মাঝে মাঝে আসিয়া দ্বারের ফাঁকে উঁকি মারিতেছিল। মন্ত্রীটা এখনো বসিয়া ফিস্‌ফিস্ করিতেছে। সে নিরাশ হইয়া ফিরিয়া যাইতেছিল।

রাজা শেষ পর্যন্ত বিদ্যুন্মালা সম্বন্ধে সকল কথা মন্ত্রীকে বলিয়াছিলেন। সমস্যা দাঁড়াইয়াছিল, বিদ্যুন্মালাকে লইয়া কী করা যায়! অনেক আলোচনা করিয়াও সমস্যার নিষ্পত্তি হয় নাই।

সহসা বহির্দ্বারের ওপারে প্রতীহার-ভূমি হইতে উচ্চ বাক্যালাপের শব্দ শোনা গেল। মন্ত্রী ভ্রূ তুলিয়া দ্বারের পানে চাহিলেন, রাজা ভ্রূ কুঞ্চিত করিলেন। তারপর একটি প্রতিহারিণী দ্বারের সম্মুখে আসিয়া উত্তেজিত কণ্ঠে বলিল— ‘অর্জুনবর্মা মহারাজের সাক্ষাৎ চান।’

রাজা ও মন্ত্রী সবিস্ময় দৃষ্টি বিনিময় করিলেন। তারপর মন্ত্রী পানের বাটা সরাইয়া দাঁড়াইলেন, বলিলেন— ‘আমি দেখছি।’

মন্ত্রী দ্রুতপদে দ্বারের বাহিরে চলিয়া গেলেন। রাজা কঠিন চক্ষে সেইদিকে চাহিয়া ভ্রূবদ্ধ ললাটে বসিয়া রহিলেন।

বেশ কিছুক্ষণ পরে মন্ত্রী অর্জুনকে লইয়া ফিরিয়া আসিলেন। অর্জুনের সর্বাঙ্গে জল ঝরিতেছে, বস্ত্র ও পদদ্বয় কর্দমাক্ত। সে টলিতে টলিতে আসিয়া রাজার সম্মুখে যুক্তকর ঊর্ধ্বে তুলিয়া অভিবাদন করিল, তারপর ছিন্নমূল বৃক্ষবৎ সশব্দে মাটিতে পড়িয়া গেল।

মন্ত্রী ত্বরিতে তাহার বক্ষে হাত রাখিয়া দেখিলেন, বলিলেন— ‘অবসন্ন অবস্থায় মুর্ছা গিয়াছে। এখনি জ্ঞান হবে।’ তিনি অর্জুনের মুখে যে দু’চার কথা শুনিয়াছিলেন তাহা রাজাকে নিবেদন করিলেন। রাজার মেরুদণ্ড ঋজু হইল।

‘সত্য কথা?’

‘সত্য বলেই মনে হয়। মিথ্যা সংবাদ দেবার জন্য ফিরে আসবে কেন?’

কিয়ৎকাল পরে অর্জুনের জ্ঞান হইল। সে ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিল, তারপর দণ্ডায়মান হইল; স্খলিত স্বরে বলিল— ‘মহারাজ, শত্রুসৈন্য পশ্চিম সীমান্তে রাজ্য আক্রমণের চেষ্টা করছে।’

রাজা বলিলেন— ‘বিশদভাবে বল।’

অর্জুন বিস্তারিতভাবে সকল কথা বলিল। শুনিয়া রাজা মন্ত্রীর দিকে ফিরিলেন— ‘আর্য লক্ষ্মণ—’

কিন্তু মন্ত্রীকে দেখিতে পাইলেন না। মন্ত্রী কখন অলক্ষিতে অন্তর্হিত হইয়াছেন।

সহসা বাহিরে ঘোর রবে রণ-দুন্দুভি বাজিয়া উঠিল। আকাশ-বাতাস আলোড়িত করিয়া বাজিয়া চলিল, দূর দূরান্তরে নিনাদিত হইল। বহু দূরে অন্য দুন্দুভি রাজপুরীর দুন্দুভিধ্বনি তুলিয়া লইয়া বাজিতে লাগিল। রাজ্যময় বার্তা ঘোষিত হইল— শত্রু রাজ্য আক্রমণ করিয়াছে সতর্ক হও, সকলে সতর্ক হও, সৈন্যগণ প্রস্তুত হও।

ধন্নায়ক লক্ষ্মণ মল্লপ কটিতে তরবারি বাঁধিতে বাঁধিতে ফিরিয়া আসিলেন। রাজা ও মন্ত্রীতে দ্রুত বাক্যালাপ হইল—

‘সব প্রস্তুত।’

‘রাজধানীতে কত সৈন্য আছে?’

‘ত্রিশ হাজার।’

রাজা বলিলেন— ‘বহমনী যখন পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ করেছে তখন পূর্বদিক থেকেও একসঙ্গে আক্রমণ করবে।’

লক্ষ্মণ মল্লপ বলিলেন— ‘আমারও তাই মনে হয়। — এখন আদেশ?’

‘রাজধানী রক্ষার জন্য নগরপাল নরসিংহ মল্লের অধীনে দশ হাজার সৈন্য থাক। আমি দশ হাজার সৈন্য নিয়ে পশ্চিম সীমান্তে যাচ্ছি, আপনি দশ হাজার নিয়ে পূর্ব সীমান্তে যান।’

‘ভাল। কখন যাত্রা করা যাবে?’

‘মধ্য রাত্রি অতীত হবার পূর্বেই।’

‘তবে মশালের ব্যবস্থা করি। জয়োস্তু মহারাজ।’ মন্ত্রী চলিয়া গেলেন। অর্জুনের দিকে কেহ দৃক্‌পাত করিল না। দুন্দুভি বাজিয়া চলিল।

মণিকঙ্কণা এত রাত্রে দুন্দুভির শব্দ শুনিয়া হতচকিত হইয়া গিয়াছিল, সে রাজার কাছে ছুটিয়া আসিল। অর্জুনকে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল— ‘এ কি!’

রাজা বলিলেন— ‘মণিকঙ্কণা! আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। পিঙ্গলাকে ডাকো, আমার রণসজ্জা নিয়ে আসুক।’

মণিকঙ্কণা বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া পিছু হটতে হটিতে চলিয়া গেল।

‘মহারাজ—’

রাজা অর্জুনের দিকে চাহিলেন। অর্জুনের অস্তিত্ব তিনি ভুলিয়া গিয়াছিলেন।

অর্জুন বলিল— ‘মহারাজ, আমি আপনার আজ্ঞা লঙ্ঘন করেছি, বিজয়নগরে ফিরে এসেছি, সেজন্য দণ্ডার্হ।’

রাজা বলিলেন— ‘তোমার দণ্ড আপাতত স্থগিত রইল। তুমি কারাগারে বন্দী থাকবে। আমি যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তোমার বিচার করব। যদি তোমার সংবাদ মিথ্যা হয়—’

অর্জুন যুক্তকরে বলিল— ‘একটি ভিক্ষা আছে। আমাকে আপনার সঙ্গে নিয়ে চলুন। যদি আমার সংবাদ মিথ্যা হয়, তৎক্ষণাৎ আমার মুণ্ডচ্ছেদ করবেন।’

রাজা ক্ষণেক বিবেচনা করিলেন— ‘উত্তম। তুমি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।’

‘ধন্য মহারাজ।’

পিঙ্গলা রাজার বর্মচর্ম শিরস্ত্রাণ ও তরবারি লইয়া প্রবেশ করিল।

ছয়

সে-রাত্রে বিজয়নগর রাজ্যে কাহারো নিদ্রা আসিল না। রাত্রির আকাশ ভরিয়া রণদুন্দুভির নিনাদ স্পন্দিত হইতে লাগিল।

দুন্দুভিধ্বনির তাৎপর্য বুঝিতে কাহারো বিলম্ব হয় নাই। যুদ্ধ! শত্রু আক্রমণ করিয়াছে। দূর গ্রামে গ্রামে গৃহস্থেরা দুন্দুভি শুনিয়া শয্যায় উঠিয়া বসিল, ঘরে অস্ত্রশস্ত্র যাহা ছিল তাহাতে শাণ দিতে লাগিল। নগরের সাধারণ জনগণ পরস্পরের গৃহে গিয়া উত্তেজিত জল্পনা-কল্পনা আরম্ভ করিয়া দিল; ধনী ব্যক্তিরা সোনাদানা লুকাইতে প্রবৃত্ত হইলেন। গণ্যমান্য রাজপুরুষেরা রাজসভার দিকে ছুটিলেন। সৈনিকেরা বর্মচর্ম পরিয়া প্রস্তুত হইল। অনেকদিন পরে যুদ্ধ। সৈনিকদের মনে হর্ষোদ্দীপনা, মুখে হাসি; সৈনিকবধূদের চোখে আশঙ্কার অশ্রুজল।

রাত্রি দ্বিপ্রহরে রাজা ও লক্ষ্মণ মল্লপ দুই দল সৈন্য লইয়া পূর্ব ও পশ্চিমে যাত্রা করিলেন। অশ্বারোহী সৈনিকদের হস্তধৃত মশালশ্রেণী অন্ধকারে জ্বলন্ত ধূমকেতুর ন্যায় বিপরীত মুখে ছুটিয়া চলিল।

তিন রানী নিজ নিজ ভবনে দ্বার রুদ্ধ করিয়া অন্ধকার শয্যায় শয়ন করিলেন। পদ্মালয়াম্বিকা শিশুপুত্র মল্লিকার্জুনকে বুকে লইয়া আকাশ-পাতাল চিন্তা করিতে লাগিলেন; যুদ্ধ ব্যাপারে নারীর করণীয় কিছু নাই, তাহারা কেবল কাল্পনিক বিভীষিকার আগুনে দগ্ধ হইতে পারে।

বিদ্যুন্মালা নিজের স্বতন্ত্র কক্ষে ছিলেন। তিনি কক্ষের বাহিরে যাইতেন না, মণিকঙ্কণা মাঝে মাঝে দ্বারের নিকট হইতে তাঁহাকে দেখিয়া যাইত। এক গৃহে থাকিয়াও দুই ভগিনীর মাঝখানে দূরত্বের সৃষ্টি হইয়াছিল। আজ বিদ্যুন্মালা নিজ শয্যায় জাগিয়া শুইয়াছিলেন, মণিকঙ্কণা আসিয়া তাঁহার শয্যাপার্শ্বে বসিল, জলভরা চোখে বলিল— ‘রাজা যুদ্ধে চলে গেলেন।’

বিদ্যুন্মালা সবিশেষ কিছু জানিতেন না, কিন্তু রাজপুরীতে উত্তেজিত ছুটাছুটি দেখিয়া ও দুন্দুভিধ্বনি শুনিয়া বুঝিয়াছিলেন, গুরুতর কিছু ঘটিয়াছে। তিনি মণিকঙ্কণার হাতের উপর হাত রাখিলেন, কিছু বলিলেন না। মণিকঙ্কণা আবার বলিল— ‘অর্জুনবর্মা এসেছিলেন।’

বিদ্যুন্মালা উঠিয়া বসিলেন, মণিকঙ্কণার মুখের কাছে মুখ আনিয়া সংহত স্বরে বলিলেন— ‘কি বললি? কে এসেছিলেন?’

মণিকঙ্কণা বলিল— ‘অর্জুনবর্মা এসেছিলেন। মাথার চুল থেকে জল ঝরে পড়ছে, কাপড় ভিজে; পাগলের মত চেহারা। রাজাকে কী বললেন, রাজা তাঁকে নিয়ে যুদ্ধে চলে গেলেন।’

বিদ্যুন্মালার দেহ কাঁপিতে লাগিল, তিনি চক্ষু মুদিয়া আবার শুইয়া পড়িলেন, তিনি জানিতেন, রাজা অর্জুনবর্মাকে নির্বাসন দিয়াছেন। তারপর হঠাৎ কী হইল! অর্জুনবর্মা ফিরিয়া আসিলেন কেন? অনিশ্চয়ের সংশয়ে তাঁহার অন্তর মথিত হইয়া উঠিল।

মণিকঙ্কণার অন্তরে অন্য প্রকার মন্থন চলিতেছে। রাজা যুদ্ধে গিয়াছেন। যাহারা যুদ্ধে যায় তাহারা সকলে ফিরিয়া আসে না। রাজা যদি ফিরিয়া না আসেন! সে অবসন্নভাবে বিদ্যুন্মালার পাশে শয়ন করিল, বাহু দিয়া তাঁহার কণ্ঠ জডাইয়া লইয়া ম্রিয়মাণ স্বরে বলিল— ‘মালা, কি হবে ভাই?’

বিদ্যুন্মালা উত্তর দিলেন না। সারা রাত্রি দুই ভগিনী পরস্পরের গলা জড়াইয়া জাগিয়া রহিলেন।

বলরাম রাত্রে ঘুমায় নাই, রন্ধ্রের মধ্যে একটি মৃতদেহকে সঙ্গী লইয়া জাগিয়া ছিল। আবার যদি কেহ আসে, তাহাকে শহীদী’র শরবৎ পান করাইতে হইবে। …অর্জুন কি বিজয়নগরে পৌঁছিয়াছে? রাজাকে সংবাদ দিতে পারিয়াছে? সংবাদ পাইয়া রাজা কি তৎক্ষণাৎ সৈন্য সাজাইয়া বাহির হইবেন! যদি বিলম্ব করেন—

সকাল হইল। রৌদ্রোজ্জ্বল প্রভাত, সাময়িকভাবে মেঘ সরিয়া গিয়াছে। বলরামের কৌতূহল হইল, দেখি তো মিঞা সাহেবরা কি করিতেছে। সে পাশের দিক দিয়া রন্ধ্রমুখের কাছে গিয়া বাহিরে উঁকি মারিল। যাহা দেখিল তাহাতে তাহার হৃৎপিণ্ড ধক্‌ করিয়া উঠিল।

মুসলমান সৈনিকেরা একটা প্রকাণ্ড কামান ঘুরাইয়া সুড়ঙ্গের দিকে লক্ষ্য স্থির করিয়াছে এবং তাহাতে বারুদ ভরিতেছে। উদ্দেশ্য সহজেই অনুমান করা যায়; কামান দাগিয়া তাহারা গুহামুখ ভাঙ্গিয়া দিবে, সেখানে যে অদৃশ্য শত্রু লুকাইয়া আছে তাহাকে বধ করিবে।

বলরাম দেখিল, কামানের গোলা রন্ধ্রের মধ্যে প্রবেশ করিলে জীবনের আশা নাই। সে আর বিলম্ব করিল না, ঝোলা লইয়া যে-পথে আসিয়াছিল সেই পথে দ্রুত ফিরিয়া চলিল। প্রথম বাঁকের মুখে আসিয়া সে দেখিল এই স্থান বহুলাংশে নিরাপদ; কামানের গোলা সিধা পথে চলে, মোড় ঘুরিয়া আসিতে পরিবে না। সে বাঁক অতিক্রম করিয়া সুড়ঙ্গমধ্যে দাঁড়াইয়া রহিল।

কিছুক্ষণ পরে বিকট শব্দ করিয়া কামানের গোলা রন্ধ্রমধ্যে আসিয়া পড়িল। বড় বড় পাথরের চাঁই ভাঙ্গিয়া রন্ধ্রমুখ বন্ধ হইয়া গেল। ভাগ্যক্রমে ভগ্ন প্রস্তরখণ্ডগুলা বলরামের নিকট পৌঁছিল না।

এতক্ষণ যতটুকু আলো ছিল তাহাও আর রহিল না। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে বলরাম হাত বাড়াইয়া গুহাপ্রাচীর অনুভব করিতে করিতে পূর্বমুখে চলিল। মুসলমানেরা যদি ইতিমধ্যে পাহাড় ডিঙ্গাইয়া সুড়ঙ্গের পূর্বদিকে পৌঁছিয়া থাকে, তাহা হইলে—!

অর্জুন রাজাকে লইয়া ফিরিবে কিনা, কখন ফিরিবে, কে জানে!

কিছুদূর অগ্রসর হইবার পর একটা ধ্বনির অনুরণন বলরামের কানে আসিল। মানুষের কণ্ঠস্বর, দূর হইতে আসিতেছে। কিন্তু পাষাণগাত্রে প্রতিহত হইয়া বিকৃত হইয়াছে। শব্দের অর্থবোধ হয় না।

বলরাম স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া শুনিল। ধ্বনি ক্রমশ কাছে আসিতেছে, স্পষ্ট হইতেছে। তারপর কণ্ঠস্বর পরিষ্কার হইল— ‘বলরাম ভাই!’

মহাবিস্ময়ে বলরাম চিৎকার করিয়া উঠিল— ‘অর্জুন ভাই!’

অন্ধকারে হাতে হাত ঠেকিল, দুই বন্ধু আলিঙ্গনবদ্ধ হইল।

‘বলরাম ভাই, তুমি বেঁচে আছ!’

‘আছি। তুমি রাজার দর্শন পেয়েছ?’

‘পেয়েছি। রাজা দশ হাজার সৈন্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। কামানের শব্দ শুনলাম। ওরা কামান দাগছে?’

‘হ্যাঁ। কামান দেগে গুহার মুখ উড়িয়ে দিয়েছে।’

‘যাক, আর ভয় নেই। এস।’

বিজয়নগরের দশ হাজার সৈন্য পর্বতের পদমূলে সমবেত হইয়াছিল। রাজার আদেশে তাহারা ঘোড়া ছাড়িয়া দিয়া পর্বতপৃষ্ঠে আরোহণ করিল।

পর্বতের পরপারে বহমনী সৈন্যদল যখন দেখিল বিজয়নগরবাহিনী সত্যই উপস্থিত আছে তখন তাহারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল না, কামান ও ছত্রাবাস ফেলিয়া চলিয়া গেল।

সেকালের মুসলমানেরা দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিল, সম্মুখ-যুদ্ধে কখনো পশ্চাৎপদ হইত না। কিন্তু গুলবর্গার বহমনী সুলতান আহমদ শা’র নিকট খবর পৌঁছিয়াছিল যে, তাঁহার অতর্কিত আক্রমণ ব্যর্থ হইয়াছে।

বর্ষাকাল বিজয় অভিযানের উপযুক্ত কাল নয়; অবশ্য অতর্কিত আক্রমণ করিয়া পররাজ্য খানিকটা দখল করিয়া বসিতে পারিলে লাভ আছে, কিন্তু সম্মুখ-যুদ্ধ অসমীচীন। তিনি তাই সৈন্যদলকে ফিরিয়া আসিবার আদেশ পাঠাইয়াছিলেন।

বহমনী সৈন্যদল যুদ্ধ-স্পৃহা দমন করিয়া চলিয়া গেল। বিজয়নগরের সৈন্যদলও নিজ রাজ্যের সীমানা লঙ্ঘন করিল না। অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধ স্থগিত রহিল।

মহারাজ দেবরায় দুই হাজার সৈন্য পশ্চিম সীমান্তে রাখিয়া রাজধানীতে ফিরিয়া আসিলেন। অর্জুন ও বলরাম তাঁহার সঙ্গে আসিল।

ওদিকে পূর্ব-সীমানা হইতে ধন্নায়ক লক্ষ্মণও ফিরিয়া আসিলেন। সেখানে শত্রুসৈন্য নদী পার হইবার উদ্যোগ করিতেছিল, নদীর পরপারে বিজয়নগরের বাহিনী উপস্থিত হইয়াছে দেখিয়া তাহারা বিমর্ষভাবে প্রস্থান করিল।

অতঃপর রাজা ও মন্ত্রী বহিঃশত্রু সম্বন্ধে অনেকটা নিশ্চিন্ত হইয়া আভ্যন্তরিক চিন্তায় মনোনিবেশ করিয়াছেন।

শ্রাবণ মাস সমাগত। রাজগুরু বিবাহের দিন স্থির করিয়াছেন; শ্রাবণের শুক্লা ত্রয়োদশীতে বিবাহ। সুতরাং বিবাহের কথাই সর্বাগ্রে চিন্তনীয়।

রাজা ও মন্ত্রী মিলিয়া মতলব স্থির করিয়াছেন যাহাতে সব দিক রক্ষা হয়। মতলব স্থির করিয়া তাঁহার রাজগুরুর সঙ্গে পরামর্শ করিয়াছেন। রাজগুরু পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করিয়া এই সামান্য কৈতবে সম্মতি দিয়াছেন।

একদিন দ্বিপ্রহরে মধ্যাহ্ন ভোজন সমাপন করিয়া মহারাজ বিরামকক্ষে আসিয়া বসিলেন। পিঙ্গলার হাত হইতে পান লইয়া বলিলেন— ‘বিদ্যুন্মালাকে পাঠিয়ে দাও। আর মণিকঙ্কণাকে আটকে রাখো। সে যেন এখন এখানে না আসে।’

কিছুক্ষণ পরে বিদ্যুন্মালা ধীরে ধীরে কক্ষে প্রবেশ করিলেন। এই কয়দিনে তাঁহার শরীর কৃশ হইয়াছে, মুখে রক্তহীন পাণ্ডুতা। গতিভঙ্গি ঈষৎ আড়ষ্ট। তিনি রাজার সম্মুখে আসিয়া নতমুখে দাঁড়াইলেন।

রাজা ক্ষণকাল তাঁহার মুখের পানে চাহিয়া গম্ভীরকণ্ঠে বলিলেন— ‘শেষবার প্রশ্ন করছি। তুমি আমাকে বিবাহ করতে চাও না?’

বিদ্যুন্মালা নত নয়নে নির্বাক রহিলেন।

রাজা বলিলেন— ‘অর্জুনকেই তুমি আমার চেয়ে যোগ্যতর পাত্র মনে কর!’

এবারও বিদ্যুন্মালা নীরব, কেবল তাঁহার অধর ঈষৎ কম্পিত হইল।

রাজা একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস মোচন করিয়া বলিলেন— ‘স্ত্রীজাতির চরিত্র সত্যই দুর্জ্ঞেয়। যা হোক, তুমি যখন পণ করেছ অর্জুনকে ছাড়া আর কাউকে বিবাহ করবে না তখন তাই হবে, অর্জুনের সঙ্গেই তোমার বিবাহ দেব।’

বিদ্যুন্মালার মুখ অতর্কিত ভাবসংঘাতে অনির্বচনীয় হইয়া উঠিল, অধরোষ্ঠ বিবৃত হইয়া থর থর কাঁপিতে লাগিল। তিনি একবার ভয়সঙ্কুল চক্ষু রাজার দিকে তুলিয়া আবার নত করিয়া ফেলিলেন। তারপর কম্পিত দেহে ভূমির উপর রাজার পদমূলে বসিয়া পড়িলেন।

রাজা আঙ্গুল তুলিয়া বলিলেন— ‘কিন্তু একটি শর্ত আছে।’

বিদ্যুন্মালা ভয়ে ভয়ে আবার চক্ষু তুলিলেন। শর্ত! কিরূপ শর্ত!

রাজা বলিলেন— ‘তোমার বিদ্যুন্মালা নাম আর চলবে না। আজ থেকে তোমার নাম— মণিকঙ্কণা। বুঝলে?’

বিদ্যুন্মালা কিছুই বুঝিলেন না। কিন্তু ইহাই যদি শর্ত হয় তবে ভয়ের কী আছে? তিনি ক্ষীণ বাষ্পরুদ্ধ স্বরে বলিলেন— ‘যথা আজ্ঞা আর্য।’

রাজা তখন ব্যাখ্যা করিয়া বলিলেন— ‘আমি গজপতি ভানুদেবের কন্যা বিদ্যুন্মালাকে বিবাহ করব বলে তাকে এখানে এনেছি। কিন্তু তুমি যদি অর্জুনকে বিবাহ কর, তাহলে আমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হয়। সুতরাং আজ থেকে তোমার নাম মণিকঙ্কণা। — যাও, আসল মণিকঙ্কণাকে পাঠিয়ে দাও।’

বিদ্যুন্মালা নত হইয়া রাজার পায়ের উপর মাথা রাখিলেন; উদ্বেলিত অশ্রুধারায় রাজার চরণ নিষিক্ত হইল।

বিদ্যুন্মালা চলিয়া যাইবার পর মণিকঙ্কণা আসিল। তাহারও গতিভঙ্গি শঙ্কাজড়িত, চক্ষু সংশয়ে বিস্ফারিত। সে অস্ফুট বাক্য উচ্চারণ করিল— ‘মহারাজ, আমাকে ডেকেছেন?’

রাজা বলিলেন— ‘হ্যাঁ। এস, আমার কাছে বোসো।’

মণিকঙ্কণা আসিয়া পালঙ্কের পাশে বসিল, বলিল— ‘মালা কাঁদছে কেন?’

রাজা বলিলেন— ‘আমি বকেছি। আমাকে বিয়ে করতে চায় না, তাই বকেছি।’

মণিকঙ্কণার মুখ ধীরে ধীরে উৎফুল্ল হইয়া উঠিতে লাগিল। সে একদৃষ্টি রাজার মুখের পানে চাহিয়া রহিল।

রাজা বলিলেন— ‘ও যখন আমাকে বিবাহ করতে চায় না তখন তোমাকেই আমি বিবাহ করব। — কেমন, রাজী?’

মণিকঙ্কণার মুখখানি আনন্দে উত্তেজনায় ভাস্বর হইয়া উঠিল। রাজা তর্জনী তুলিয়া বলিলেন— ‘কিন্তু একটি শর্ত আছে। আজ থেকে তোমার নাম— বিদ্যুন্মালা। মণিকঙ্কণা নামটা আমার মোটেই পছন্দ নয়।’

এই শর্ত! বিগলিত হাস্যে মণিকঙ্কণা মহারাজের কোলের উপর লুটাইয়া পড়িল।

সন্ধ্যার পর মহারাজের বিরামকক্ষে দীপাবলী জ্বলিয়াছে। রাজা একটি কোষাবদ্ধ তরবারি কোলের উপর লইয়া পালঙ্কে বসিয়া আছেন। পালঙ্কের পাশে ভূমিতে বসিয়া মন্ত্রী নির্লিপ্তভাবে কুচকুচ সুপারি কাটিতেছেন।

অর্জুনবর্মা আসিয়া প্রণাম করিয়া দাঁড়াইল। নাগরিকের ন্যায় পরিচ্ছন্ন বেশবাস; হাতে অস্ত্র নাই। রাজা তাহার আপাদমস্তক দেখিলেন। তারপর ধীর গম্ভীর স্বরে বলিলেন— ‘অর্জুনবর্মা, আমার আদেশে তুমি বিজয়নগর থেকে নির্বাসিত হয়েছিলে। সে আদেশ আমি প্রত্যাহার করলাম। তুমি দেশভক্তির চূড়ান্ত পরিচয় দিয়েছ। নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে মাতৃভূমিকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছ। তোমাকে আমার তুরঙ্গ বাহিনীর সেনানী নিযুক্ত করলাম। এই নাও তরবারি।’

অর্জুন নতজানু হইয়া দুই হস্তে তরবারি গ্রহণ করিল। তারপর রাজা হাত নাড়িয়া তাহাকে বিদায় দিবার উপক্রম করিলে মন্ত্রী রাজার মুখের পানে চাহিয়া হাসিলেন; রাজা তখন বলিলেন— ‘হ্যাঁ, ভাল কথা। আগামী শুক্ল ত্রয়োদশী তিথিতে কলিঙ্গ-রাজকন্যার সঙ্গে তোমার বিবাহ। প্রস্তুত থেকো।’

অর্জুন হতবুদ্ধিভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল, তারপর আভূমি প্রণাম করিয়া চলিয়া গেল।

অর্জুনের পর বলরাম আসিল। প্রণাম করিয়া রাজার পায়ের কাছে মাটিতে বসিল। রাজা কিছুক্ষণ কঠোর নেত্রে তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন— ‘তুমি আমার অজ্ঞাতসারে অর্জুনের সঙ্গে পালিয়েছিলে, সেজন্য দণ্ডার্হ।’

বলরাম হাত জোড় করিল— ‘মহারাজ, ছেলেটা বড় কাতর হয়ে পড়েছিল তাই সঙ্গে গিয়েছিলাম।’

মহারাজ বলিলেন— ‘হুঁ! তুমি ক’টা ম্লেচ্ছ মেরেছ?’

বলরাম বিরসমুখে বলিল— ‘আজ্ঞা, মাত্র দু’টি।’

‘আনুপূর্বিক বল।’

বলরাম সেদিন বিজয়নগর ত্যাগের পর হইতে সমস্ত ঘটনা বিবৃত করিল। শুনিয়া রাজা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন, শেষে দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন— ‘সমস্তই দৈবের লীলা। হয়তো এইজন্যই হুক্ক-বু্ক্ক এসেছিলেন। যা হোক, উপস্থিত তোমাদের ক্ষিপ্রবুদ্ধির জন্য বিপদ নিবারিত হয়েছে। তুমি যদিও দণ্ডনীয় তবু তোমাকে পুরস্কৃত করব।’ — উপাধানের তলদেশ হইতে একটি সোনার অঙ্গদ বাহির করিয়া রাজা বলরামকে দিলেন— ‘এই নাও অঙ্গদ, পরিধান কর। এখন থেকে তুমি প্রধান রাজকর্মকার, অস্ত্রাগারের সমস্ত কর্মকার তোমার অধীনে কাজ করবে।’

বলরাম বাহুতে অঙ্গদ পরিল, মাটিতে মাথা ঠেকাইয়া প্রণাম করিল, তারপর আবার হাত জোড় করিল— ‘মহারাজ, দীনের একটি নিবেদন আছে।’

রাজা বলিলেন— ‘ভয় নেই, তোমার গুপ্তবিদ্যা প্রকাশ করতে হবে না।’

বলরাম বলিল— ‘ধন্য মহারাজ। আর একটি নিবেদন আছে।’

‘আবার নিবেদন! কী নিবেদন?’

‘মহারাজ, আমি বিবাহ করতে চাই।’

মহারাজের মুখে ধীরে ধীরে কৌতুকহাস্য ফুটিয়া উঠিল— ‘তুমিও বিবাহ করতে চাও! কাকে?’

‘মহারাজ, তার নাম মঞ্জিরা। আপনার অন্তঃপুরে রন্ধনশালার দাসী।’

‘তার পিতৃ-পরিচয় আছে?’

‘আছে মহারাজ। মঞ্জিরার পিতার নাম বীরভদ্র, তিনি মহারাজের হাতিশালার একজন হস্তিপক। তাঁর অনুমতি চাইতে গিয়েছিলাম; তিনি বললেন, মহারাজ যদি অনুমতি দেন তাঁর আপত্তি নেই।’

রাজা কৌতূহল-ভরা চক্ষে কিছুক্ষণ বলরামকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন— ‘বীরভদ্রের যদি আপত্তি না থাকে আমারও আপত্তি নেই। তুমি ধূর্ত বাঙ্গালী, তোমাকে বেঁধে রাখবার জন্য কঠিন শৃঙ্খল চাই। — এখন যাও, আগামী শুক্ল ত্রয়োদশীর দিন তোমার বিবাহ হবে।’

বলরাম মহানন্দে প্রণাম করিতে করিতে পিছু হটিয়া কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল।

রাজা মন্ত্রীর পানে চাহিয়া হাসিলেন— ‘মন্দ হল না। একসঙ্গে তিনটে বিবাহ। যত বেশি হয় ততই ভাল। বরযাত্রীদের চোখে ধুলো দেওয়া সহজ হবে।’

সাত

রাজা এবং রাজকুলোদ্ভব পাত্র-পাত্রীদের বিবাহ হইবে পম্পাপতির মন্দিরে, ইহাই চিরাচরিত বিধি। রাজার অনুমতি থাকিলে অন্য বিবাহও পম্পাপতির মন্দিরে সম্পাদিত হইতে পারে।

রাজার বিবাহের তিথি জনসাধারণের মধ্যে প্রচারিত হইবার পর রাজ্যময় উৎসবের ধুম পড়িয়া গেল। রাজা ইতিপূর্বে তিনবার বিবাহ করিয়াছেন, চতুর্থ বারে বেশি ধূমধাম হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সদ্য বিপন্মুক্তির পর রাজার বিবাহ, তাই উৎসব একটু বেশি জাঁকিয়া উঠিল। গৃহে গৃহে পুষ্পমালা দুলিল, নানা বর্ণের কেতন উড়িল। নাগরিকরা দলবদ্ধভাবে গীত গাহিতে গাহিতে নগর প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল। চতুষ্পথে চতুষ্পথে বাজীকরের খেলা; মাঠে মাঠে মল্লযোদ্ধাদের বাহ্বাস্ফোট, হাতির লড়াই; তুঙ্গভদ্রার বুকে বিচিত্র নৌকাপুঞ্জের সম্মিলিত জলকেলি। বিজয়নগরের প্রজাগণ রাজাকে ভালবাসে, স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া উৎসবে গা ঢালিয়া দিয়াছে।

রাজসভার প্রাঙ্গণেও বিপুল মণ্ডপ রচিত হইয়াছে। সেখানে অহোরাত্র পান ভোজন, রঙ্গরস, নৃত্যগীত চলিয়াছে।

তারপর বিবাহের দিন আসিয়া উপস্থিত হইল।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নগরে বিরাট হৈ হৈ পড়িয়া গেল। হাতি-ঘোড়ার শোভাযাত্রা; সৈন্যবাহিনী বাজনা বাজাইয়া সদর্পে কুচকাওয়াজ করিতে লাগিল। দলে দলে নাগরিক নাগরিকা মহার্ঘ বস্ত্রালঙ্কারে ভূষিত হইয়া পম্পাপতির মন্দিরের দিকে ধাবিত হইল; তাহারা রাজার বিবাহ দেখিবে।

রাজবৈদ্য দামোদর স্বামী একটি ভৃঙ্গারে কোহল লইয়া অতিথি-ভবনে উপস্থিত হইলেন। রসরাজ সবেমাত্র প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া জলযোগে বসিয়াছিলেন; দামোদর স্বামী দ্বারের নিকট হইতে ডাকিলেন— ‘বন্ধু, আমি এসেছি।’

ক্ষীণদৃষ্টি রসরাজ গলা শুনিয়া চিনিতে পারিলেন— ‘আরে বন্ধু, এস এস।’

দামোদর আসিয়া বসিলেন, ভৃঙ্গারটি সম্মুখে রাখিয়া বলিলেন— ‘আজ মহা আনন্দের দিন, তাই তোমার জন্য একটু কোহল এনেছি। সদ্য প্রস্তুত তাজা কোহল, তুমি একটু চেখে দেখ।’

‘এ বড় উত্তম কথা। আমার কোহল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সুতরাং এস, তোমার কোহলই পান করা যাক।’

দুই বন্ধুর উৎসব আরম্ভ হইয়া গেল।

ওদিকে অন্যান্য কন্যাযাত্রীরাও উপেক্ষিত হয় নাই। এতদিন তাহারা রাজার আতিথ্যে পানাহার বিষয়ে পরম আনন্দেই ছিল, কিন্তু আজ তাহাদের সমাদর দশগুণ বাড়িয়া গেল। রাজপুরী হইতে ভারে ভারে মিষ্টান্ন পক্বান্ন পরমান্ন আসিল। সেই সঙ্গে কলস কলস সুরা। একদল রাজপুরুষ আসিয়া মিষ্টভাষায় সকলকে অনুরোধ উপরোধ নির্বন্ধ আরম্ভ করিয়া দিলেন; একবার স্বয়ং রাজা আসিয়া সকলকে দর্শন দিয়া গেলেন। কন্যাযাত্রীরা মাতিয়া উঠিল; অপর্যাপ্ত পানাহারের সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গভঙ্গি সহকারে নৃত্যগীত লম্ফঝম্প ক্রীড়াকৌতুক আরম্ভ করিয়া দিল।

ফলে, বিবাহের লগ্নকাল যখন উপস্থিত হইল তখন দেখা গেল অধিকাংশ কন্যাযাত্রীই ধরাশায়ী; যাহাদের একটু সংজ্ঞা আছে তাহারা বিগলিত কণ্ঠে অশ্লীল গান গাহিতেছে এবং নিজ উরুদেশে মৃদঙ্গ বাজাইতেছে।

রসরাজের অবস্থাও অনুরূপ। বস্তুত গান না গাহিলেও তিনি মৃদুস্বরে কাব্যশাস্ত্রের রসালো স্থানগুলি আবৃত্তি করিতেছেন এবং মদাসক্ত মসৃণ হাস্য করিতেছেন। কয়েকজন রাজপুরুষ আসিয়া তাঁহাকে গরুর গাড়িতে তুলিয়া বিবাহস্থলে লইয়া গেল। কারণ, তিনি কন্যাকর্তা, বিবাহ-বাসরে তাঁহার উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন।

রাজপুরুষেরা রসরাজকে লইয়া বিবাহসভার পুরোভাগে বসাইয়া দিল। পাশাপাশি তিন জোড়া বর-কন্যা বসিয়া আছে; রসরাজ দেখিলেন— ছয় জোড়া বর-কন্যা। তিনি পাত্র-পাত্রীর মুখ-চোখ ভাল করিয়া দেখিতে পাইলেন না, কিন্তু ভাল করিয়া দেখিবার কী আছে? তাঁহার মনে বড় আনন্দ হইল। তিনি আনন্দাশ্রু মোচন করিলেন, হাত তুলিয়া সকলকে আশীর্বাদ করিলেন এবং অচিরাৎ উপবিষ্ট অবস্থাতেই ঘুমাইয়া পড়িলেন।

যথাকলে বিবাহক্রিয়া শেষ হইল। সকলে জানিল, কলিঙ্গের রাজকন্যা বিদ্যুন্মালার সঙ্গে রাজার বিবাহ হইয়াছে। সন্দেহের কোনো কারণ নাই, তাই কেহ কিছু সন্দেহ করিল না। দর্শকেরা আনন্দধ্বনি করিতে করিতে সন্তুষ্টচিত্রে গৃহে ফিরিয়া গেল।

আট

তৃতীয় দিন প্রত্যূষে কন্যাযাত্রীর দল মহা বাদ্যোদ্যম করিয়া বহিত্রে উঠিল। শ্রাবণের ভরা তুঙ্গভদ্রা দুই কূল প্লাবিত করিয়া ছুটিয়াছে, বহিত্র তিনটি স্রোতের মুখে ভাসিয়া চলিল। যাত্রীরা এই কয় মাস রাজ-সমাদরে খুবই সুখে ছিল, কিন্তু তবু ভিতরে ভিতরে গৃহের পানে মন টানিতে আরম্ভ করিয়াছিল। সকলে বহিত্রের পাটাতনে বসিয়া জল্পনা করিতে লাগিল, বহিত্রগুলি দেড় মাসে কলিঙ্গপত্তনে ফিরিবে কিংবা দুই মাসে ফিরিবে। স্রোতের মুখে নৌকা শীঘ্র চলে। মন আরো শীঘ্র চলে।

বিজয়নগর হইতে দূরে তুঙ্গাভদ্রার শিলাবন্ধুর সৈকতে ছোট্ট গ্রামটির কথা ভুলিলে চলিবে না। সেখানে মন্দোদরীকে লইয়া চিপিটকমূর্তি আছেন। মন্দোদরীর মনে কোনো খেদ নাই। সে একটি স্বামী পাইয়াছে গ্রামবধূরা তাহাকে রাঁধিয়া খাওয়ায়; ইতিমধ্যে সে গ্রামের ভাষা আয়ত্ত করিয়াছে, সকলের সঙ্গে প্রাণ খুলিয়া কথা বলিতে পারে। আর কী চাই? গ্রামে তাহার মন বসিয়া গিয়াছে, সারা জীবন এই গ্রামে কাটাইতে পারিলে সে আর কিছু চায় না।

চিপিটকের মনের অবস্থা কিন্তু মন্দোদরীর মত নয়। এই তিন মাসে গ্রামের পরিবেশ তাঁহার কাছে সহনীয় হইয়াছে, কিন্তু স্বদেশে ফিরিবার আশা তিনি ছাড়েন নাই। এখানে ছাগল চরানো বিশেষ কষ্টকর কর্ম নয়, কিন্তু আত্মমর্যাদার হানিকর। তিনি রাজ-শ্যালক— একথা কিছুতেই ভুলিতে পারেন না।

সেদিন দ্বিপ্রহরে আকাশ লঘু মেঘে ঢাকা ছিল, সূর্য থাকিয়া থাকিয়া ঘোমটা সরাইয়া নববধূর মত সলজ্জ দৃষ্টিপাত করিতেছিল। চিপিটক ভোজনান্তে ছাগলের পাল লইয়া বনের দিকে যাইবার পূর্বে মন্দোদরীকে বলিয়া গেলেন— ‘নদীর ধারে যাবি। যদি নৌকা আসে—’

মন্দোদরী বলিল— ‘আচ্ছা গো আচ্ছা। তিন মাস ধরে নদীর ধারে যাচ্ছি, আজও যাব। কিন্তু কোথায় নৌকা! তারা কি এখনো বসে আছে, কোন্‌কালে দেশে ফিরে গেছে।’

‘তবু যাস্‌।’ চিপিটক গভীর নিশ্বাস ফেলিয়া ছাগল চরাইতে চলিয়া গেলেন। তাঁহার আশার প্রদীপ ক্রমেই নির্বাপিত হইয়া আসিতেছে।

তারপর গ্রামের মেয়েরা ঘরের কাজকর্ম সারিয়া নদীতে জল আনিতে গেল, তখন মন্দোদরীও কলস কাঁখে তাহাদের সঙ্গে গল্প করিতে করিতে চলিল। মেয়েরা নদীর ঘাটে বেশিক্ষণ রহিল না, গা ধুইয়া নিজ নিজ কলসে জল ভরিয়া গ্রামে ফিরিয়া গেল। মন্দোদরী বালুর উপর পা ছড়াইয়া বসিয়া রহিল।

স্নিগ্ধ পরিবেশ। আকাশে মেঘ ও সূর্যের লুকোচুরি খেলা, সম্মুখে খরস্রোতা নদীর কলধ্বনি। একাকিনী বসিয়া বসিয়া মন্দোদরীর ঘুম আসিতে লাগিল। বার দুই হাই তুলিয়া সে বালুর উপর কাত হইয়া শয়ন করিল, তারপর ঘুমাইয়া পড়িল। দিবানিদ্রার অভ্যাস তাহার এখনো যায় নাই।

বেলা তৃতীয় প্রহর অতীত হইবার পর মুখে সূক্ষ্ম বৃষ্টির ছিটা লাগিয়া তাহার ঘুম ভাঙ্গিল। সে চোখ মুছিতে মুছিতে উঠিয়া বসিল। তারপর সম্মুখে নদীর দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া একেবারে নিষ্পলক হইয়া গেল।

বৃষ্টির সূক্ষ্ম পর্দার ভিতর দিয়া দেখা গেল, আগে পিছে তিনটি বহিত্র নদীর মাঝখান দিয়া পূর্বমুখে চলিয়াছে। পাল-তোলা বহিত্র তিনটি মনে হয় কোন্‌ অচিন দেশের পাখি।

কিন্তু মন্দোদরীর প্রাণে বিন্দুমাত্র কবিত্ব নাই। সে দেখিল, অচিন দেশের পাখি নয়, তিনটি অত্যন্ত পরিচিত বহিত্র কলিঙ্গ দেশে ফিরিয়া চলিয়াছে।

মন্দোদরীর বুকের মধ্যে দুম্‌ দুম্‌ শব্দ হইতে লাগিল। সে ক্ষণকাল ব্যায়ত চক্ষে চাহিয়া থাকিয়া মুখে আঁচল ঢাকা দিয়া আবার শুইয়া পড়িল। কী আপদ! নৌকাগুলি এতদিন বিজয়নগরেই ছিল! এতদিন ধরিয়া কী করিতেছিল? ভাগ্যে গ্রামের অন্য কেহ দেখিয়া ফেলে নাই। জয় দারুব্রহ্ম!

তিন-চারি দণ্ড শুইয়া থাকিবার পর সে মুখের আঁচল সরাইয়া সন্তর্পণে উঁকি মারিল, তারপর গা ঝাড়া দিয়া উঠিয়া বসিল।

নৌকা তিনটি চলিয়া গিয়াছে, তুঙ্গভদ্রার বুক শূন্য।

সূর্য ডুবু ডুবু হইল। মন্দোদরী কলস কাঁখে লইয়া গজেন্দ্রগমনে ফিরিয়া চলিল।

চিপিটক গ্রামে গুহার সম্মুখে বসিয়া অপেক্ষা করিতেছিলেন, মন্দোদরীকে আসিতে দেখিয়া তাহার পানে সপ্রশ্ন ভ্রূভঙ্গি করিলেন। মন্দোদরী কলসটি গুহামুখের কাছে নামাইয়া হাত উল্টাইয়া বলিল— ‘কোথায় নৌকো! মিছিমিছি ভূতের বেগার। কাল থেকে আমি আর যেতে পারব না, যেতে হয় তুমি যেও।’ বলিয়া মন্দোদরী গুহামধ্যে প্রবেশ করিল।

চিপিটক আকাশের পানে চোখ তুলিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন।

—-

*সেকালে মুসলমানদের মধ্যে প্রবাদ-বাক্য প্রচলিত ছিল, হিন্দুকে মারিতে গিয়া যদি কোন মুসলমান মরে তবে সে শহীদী’র শরবৎ পান করে। অর্থাৎ স্বর্গে যায়!