মরুদস্যু – ১

এক

‘আমি আগে ভাবতাম মরুভূমি মানেই ধু-ধু বালি আর উঁচুনিচু বালির ঢিবি,’ বলল গোয়েন্দা সহকারী, কালো মানিক মুসা আমান, ‘এখন দেখছি ওসব কিচ্ছু নেই… এ কেমনতর মরু?’

‘বইপত্র পড়লে জানতে অ্যারিযোনার মরুভূমি এমনই,’ বলল নথি রবিন মিলফোর্ড।

‘না, বই পড়িনি, পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে আমার পছন্দ নিজ চোখে দেখে শেখা,’ শ্রাগ করল মুসা। ‘তা ছাড়া, মরুভূমি দেখবার জিনিস, তাই বা কে বলল?’

ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের সাদা গাড়ির পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছে গোয়েন্দা-প্রধান কিশোর পাশা, মৃদু হাসছে দুই বন্ধুর তর্ক শুনে। ওর পাশেই রবিন, একটু দূরে মুসা।

ফ্যাকাসে সবুজ গাছের সারির দিকে চেয়ে আছে সবাই। আরেক পাশে গাঢ় সবুজ ঝোপ ও ক্যাকটাসের ঝাড়, সবই গজিয়েছে বালি-রঙা মাটির বুকে। এক শ’ গজ দূরে আকাশে আঙুল তুলেছে সারি সারি পাহাড়ের খাড়া, পাথুরে ক্লিফ। বহু দূরে দিগন্তের কোলে আবছা দেখা যায় বাদামি সব টিলা ও পাহাড়।

এখন শীতকাল, কিন্তু কিশোর মুসা রবিনের পরনে টি শার্ট ও জিন্স। ঠাণ্ডা লাগছে না কারও। জানুয়ারি, শীতের ছুটি। হাতেও কোনও কাজ নেই, এমন সময় আমন্ত্রণ এল বৈমানিক ওমর ভাইয়ের কাছ থেকে: অ্যারিযোনায় চলেছে সে পুরনো বিমানের প্রদর্শনী দেখতে, ইচ্ছে করলে যেতে পারে তিন গোয়েন্দাও। বিমানের ওই মেলা দেখা হলে ঘুরে আসবে ওরা মরুভূমির দুই শ’ মাইল গভীরের বিশাল এক পার্ক থেকে। ওখানেই রয়েছে ওমর শরীফের কলেজের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফিলিপ রায়ান। সে ওই পার্কের হেড রেঞ্জার।

নতুন এলাকা ঘুরতে পারবে, তাই খুশি কিশোর-মুসা-রবিন। অভিভাবকদের অনুমতি পেতেও কোনও অসুবিধে হয়নি।

ওমর শরীফের ওই বিমান প্রদর্শনী দেখে ওরা ভাড়া নিয়েছে একটা মোবাইল হোম, চলে এসেছে এই নির্জন ক্যাকটাস পার্কে।

এখন ওদের সবার পরনে সানগ্লাস, নইলে সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় ঝলসে যেত চোখ।

পাহাড়ের দিকে চেয়ে আনমনে ভাবল কিশোর, অর্গান পাইপ ক্যাকটাস ন্যাশনাল মনুমেন্ট পার্কের রেঞ্জারের দায়িত্ব নিশ্চয়ই দারুণ আকর্ষণীয়। মস্ত এ দেশের নীচের আটচল্লিশটা স্টেটের সমস্ত প্রিয়ার্ভের ভিতর সবচেয়ে চমৎকার পার্ক এটা, ইউএস ও মেক্সিকোর সীমান্ত জুড়ে।

আরেকবার হেড রেঞ্জার ফিলিপ রায়ানকে দেখল কিশোর। ওর মনে হলো মানুষটার জন্ম হয়েছে যেন পার্ক রেঞ্জারদের নেতা হওয়ার জন্যই। কুচকুচে কালো চুল ঢাকা পড়েছে কাউবয় হ্যাটের নীচে, পরনে সবুজ শার্ট। শিরা ওঠা হাতদুটো বড়সড়। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

কিশোরের মনে হলো: অ্যারিযোনার এই মরু-পার্ক অভিযানে চমৎকার কাটবে সময়, তবে তার সঙ্গে যদি থাকত জমজমাট কোনও রহস্য- কেমন হতো?

গত কয়েক সপ্তাহ ওদের হাতে কোনও কেস নেই।

যেন পেরুতে চাইছে না সময়।

সচেতন হয়ে উঠে মৃদু হাসল কিশোর।

সব ইচ্ছে কি আর পূরণ হয়?

সরে গিয়ে গাড়ির ট্রাঙ্ক থেকে পানির বড় গ্যালন বের করেছে ফিলিপ রায়ান, আরেক হাতে কয়েকটা প্লাস্টিকের কাপ। পাঁচটা কাপে পানি ঢালল সে, এক এক করে ওমর শরীফ এবং তিন গোয়েন্দাকে দিল চারটে কাপ, তারপর নিজের কাপ নিয়ে চুমুক দিল। রবিনের প্রশ্নের জবাবে জানাল, ‘জানুয়ারিতে আবহাওয়া এমনই— সারাদিনের তাপমাত্রা পঞ্চাশ বা ষাট ডিগ্রি। কিন্তু গ্রীষ্মের সময় কমপক্ষে এক শ’ ফারেনহাইট। আর সে-কারণেই আইন করা হয়েছে, অবশ্যই প্রত্যেকের সঙ্গে পানি থাকতে হবে।’

‘এসব গাছের তো তেমন পানি লাগে না,’ ক্যাকটাসগুলোর দিকে চেয়ে মন্তব্য করল মুসা। ‘মনে হচ্ছে খুব শক্ত শরীর।’

‘কাঁটাগুলো খুব ছুঁচালো।’ ছোট এক ক্যাকটাস দেখাল রবিন।

মৃদু হাসল ফিলিপ। ‘ওটার নাম জাম্পিং চোয়া। মূল গাছ থেকে সহজেই ভেঙে পড়ে ছোট ছোট সব টুকরো, গেঁথে যায় হাতে-পায়ের মাংসে। ক্যাটল রেঞ্জে গেলে দেখবে বহু গরুর ঠোঁটে ওই জিনিস আটকে আছে।’

‘খাইছে!’ ওই ক্যাকটাসের কাছ থেকে সরে গেল মুসা।

‘রবিন, যা বলছিলাম,’ বলল হেড রেঞ্জার, ‘বৃষ্টি এখানে হয় না বললেই চলে, কয়েক মাস পর যখন বাদল নামে, তখন এসব গাছ তাদের টিশ্যুর ভেতর জমিয়ে রাখে প্রচুর পানি, বছরের শুকনো দিনগুলো যেন ওতেই চালিয়ে নেয়া যায়।’

হাতওয়ালা এক রকেট শিপ চোখে পড়েছে মুসার। বিদঘুটে ক্যাকটাসটা দেখাল ও। ‘ওটা অন্যগুলোর মত না। নাম কী?’

‘স্যাগুয়েরো ক্যাকটাস,’ চট করে বলে দিল রবিন।

‘ঠিক,’ বলল হেড রেঞ্জার, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমের মরুভূমির কথা উঠলেই অনেকে চট করে বলে এই ক্যাকটাসের নাম।’

দূরে আরেকটা ক্যাকটাসের দিকে হাত তুলল সে। ‘ওই লম্বা ক্যাকটাসটা দেখছ?’ গাছটা দৈর্ঘ্যে পনেরো ফুট হবে, একই গোড়া থেকে জন্মেছে পাইপের মত আরও শাখা। উপরে উঠে গোল হয়ে গেছে মাথা। ‘ওটা অর্গান পাইপ ক্যাকটাস। ওগুলোর কারণে এই পার্কের নাম হয়েছে অর্গান পাইপ ক্যাকটাস ন্যাশনাল মনুমেন্ট। আইন অনুযায়ী এ পার্কের প্রতিটি প্রাণী ও গাছ সংরক্ষিত। এখান থেকে কিছু সরিয়ে নেয়া পুরোপুরি বেআইনী।’

চট্‌ করে হাতঘড়ি দেখে নিল ফিলিপ রায়ান। ‘ঠিক আছে, এবার ফিরব ক্যাম্প গ্রাউণ্ডে। সাপারের আগে অফিসে জরুরি কয়েকটা কাজ সেরে নিতে হবে।

‘বাড়ি ফিরেই ব্যবস্থা করতে হবে গ্রাবের,’ উৎসাহ নিয়ে বলল মুসা। ‘অ্যারিযোনার আপনারা তো খাবারকে ওই গ্রাবই বলেন, ঠিক?

‘আজকাল আর কেউ বলে না,’ আস্তে করে মাথা নাড়ল হেড রেঞ্জার। ‘পশ্চিমের সবই বদলে যাচ্ছে।’

‘রাতে ক্যাম্প গ্রাউণ্ডে আমাদের সঙ্গে ডিনার সারবে, ফিলিপ?’ বন্ধুর দিকে চাইল ওমর শরীফ।

‘কেন নয়? সঠিক সময়ে হাজির হব, কিন্তু তার আগে সেরে নেব জরুরি কিছু কাজ,’ বলল ফিলিপ রায়ান, ‘জানি খুব জমবে আড্ডা, গত কয়েক বছর তো দেখাই হয়নি তোমার সঙ্গে। …বলো তো, ওমর, কত বছর দেখা নেই আমাদের?’

‘সাত-আট বছর তো হবেই,’ বলল বৈমানিক।

গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসল রায়ান, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘ভাবলে মনে হয়: আমরা বাঁচিই বা কয়টা দিন!’

গাড়িতে উঠে পড়েছে তিন গোয়েন্দা ও ওমর শরীফ।

রওনা হয়ে গেল হেড রেঞ্জার।

পাহাড়, রুক্ষ প্রান্তর ও ঘন হয়ে জন্মানো ঝোপ-ক্যাকটাসের দিকে চেয়ে রইল কিশোর-মুসা-রবিন।

কয়েক মুহূর্ত পর মুখ খুলল ফিলিপ রায়ান, ‘নিশ্চয়ই এই মরুভূমিকে খুব পাথুরে মনে হচ্ছে তোমাদের? দিনের বেলায় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তাপ। তখন ছায়ায় লুকিয়ে থাকে বেশিরভাগ প্রাণী। তারপর রাত নামলে বেরোয় খাবারের খোঁজে। অনেকে ভাবতে পারে রাতে কী-ই বা পাকে ওরা?’

খাবারের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে গেল মুসা। চোঁ-চোঁ করতে শুরু করেছে ওর পেট। উদাস চোখে দূরে চেয়ে রইল।

‘তীক্ষ্ণ নাইট ভিশন আর ঘ্রাণশক্তির গুণে ওরা খুঁজে নেয় খাবার, বলল রবিন।

‘ঠিক বলেছ,’ সায় দিল হেড রেঞ্জার। ‘ওদের অনেকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করে নানা গাছের বীজ বা পাতা। আবার তাদেরকে শিকার করে হিংস্র প্রাণীরা। যেমন কয়োটিরা। সন্দেহ নেই আজ রাতে ওদের ডাক শুনবে তোমরা। সারারাত চিৎকার করবে ওরা।’

পাহাড় ঘুরে আবারও ক্যাম্পসাইটের দিকে ফিরছে কাঁচা-মাটির ওয়ান-ওয়ে রাস্তা।

‘ওই ক্লিফগুলো বেশ খাড়া,’ একটু পর মন্তব্য করল রবিন।

ওদিক দেখে নিল কিশোর। ‘এদিকে অনেক টুরিস্ট আসে। তাদের ভেতর যারা ক্লাইমার, তারা পাহাড়ে উঠতে গিয়ে আহত হলে তখন কী ব্যবস্থা করা হয়?’ তিন গোয়েন্দার তিনজনই ট্রেইণ্ড রক ক্লাইমার। বাড়ি থেকে রওনা দেয়ার সময় দড়ি-দড়া ও গিয়ার এনেছে ওরা, সুযোগ পেলে পাহাড় বেয়ে চূড়ায় উঠবে।

‘প্রতি বছর দুর্ঘটনা ঘটছে,’ বলল হেড রেঞ্জার। ‘এমন বছর নেই যখন জখম হয় না কেউ। আমাদের পাশের ওই ছোট পাহাড়ের নাম ডায়ারো— মানে শয়তানের পাহাড়। প্রতি শীতে দু’চারজনকে পাই যারা পাহাড়ে নিরাপদে উঠতে জানে না। বেশিরভাগই মাঝামাঝি উঠে হাল ছেড়ে দেয়। তখন ওদেরকে উদ্ধার করি আমরা। তবে গ্রীষ্মের সময় ক্লাইমারদের নিয়ে ভাবতে হয় না। পাথর তখন এমনই গরম, হাত রাখলেই ফোস্কা পড়ে।’

মাঝারি গতি তুলে ছুটে চলেছে গাড়ি।

বামের জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে আছে মুসা ও রবিন। আর তাই ডানদিকে চোখ পড়ল না ওদের। কিন্তু দেখেছে কিশোর, রাস্তার এদিকের ঝোপঝাড় পিষে দেয়া হয়েছে। কাজটা বড় কোনও ট্রাকের।

‘একমিনিট!’ মুখ খুলল কিশোর। ‘থামুন, মিস্টার রায়ান! কে যেন রাস্তা থেকে নেমে ড্রাইভ করেছে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে!’

জোরে ব্রেক কষে থামল ফরেস্ট অফিসের গাড়ি।

‘কোথায়?’ জানতে চাইল হেড রেঞ্জার।

‘ডানদিকে,’ বলল কিশোর। ‘একটু পিছিয়ে যান।’

ব্যাক গিয়ার দিল রেঞ্জার।

কয়েক সেকেণ্ড পিছিয়ে থেমে গেল গাড়ি।

কাঁচা রাস্তায় হঠাৎ বাঁক নিয়ে ডানের ঝোপঝাড় চেপ্টে দিয়ে ঢুকে পড়েছিল ভারী কোনও ট্রাক। থেমেছে গিয়ে পঁচিশ-ত্রিশ গজ দূরে। দু’দিকের চাকার চিহ্ন থেকে ছয় ফুট পিছনে বড়সড় এক গর্ত।

কিশোর দেখল, ওখানে ছোট কয়েকটা ক্যাকটাস ভেঙে দিয়েছে অসাবধানী ড্রাইভার। জখম থেকে ঝরছে সাদা তরল।

‘এখানে হয়েছিলটা কী?’ বলল মুসা। ‘মনে হচ্ছে যুদ্ধ করেছে কেউ!’

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল ফিলিপ রায়ান, তারপর বড় করে শ্বাস ফেলে বলল, ‘একে বিপর্যয় বলতে পারো। ডাকাতের কাজ। ওরা মানবে না এটা জাতীয় উদ্যান, সবই পাবলিকের সম্পত্তি। যা খুশি করছে। আর আমরাও ক্রমেই কঠোর হচ্ছি, একবার ধরতে পারলে আদালতে পাঠাব। এ ধরনের ডাকাতির শাস্তি যথেষ্ট কঠিন। বেশ কয়েক বছরের জেলও হতে পারে।’

‘কীভাবে আপনারা ডাকাত ঠেকাবেন ভাবছেন?’ জানতে চাইল কিশোর।

মুসা দরজা খুলে নেমে পড়বে ঠিক করেছে, এমনসময় হাতের ইশারায় নিষেধ করল রেঞ্জার। ‘আপাতত এখানে থামছি না আমরা। কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে নিজ চোখে দেখেছি।’

গিয়ার ফেলে রওনা হয়ে গেল সে।

‘ওসব চাকার চিহ্ন কিন্তু অফ রোড ভেহিকেলের নয়,’ বলল কিশোর। ‘পিছনের জোড়া চাকার দুই সারি দাগ জানাচ্ছে ওটা বড় কোনও ট্রাক।’

‘আসলে এখানে কী ঘটছে, ফিলিপ?’ নরম স্বরে জানতে চাইল ওমর শরীফ।

আস্তে করে মাথা নাড়ল রেঞ্জার। ‘সকালে এসে দেখে গেছি চাকার দাগ। সবসময় নিয়ম নেমে চলি, কাজেই টু শব্দ করিনি কারও কাছে। আইন হচ্ছে: তদন্ত করার সময় বাইরের কারও কাছে এসব নিয়ে আলাপ করা যাবে না।’

‘কিন্তু মরুভূমিতে কারা চালিয়ে আনবে এত বড় ট্রাক?’ নিচু স্বরে বলল কিশোর।

‘মরুদস্যু,’ বলল ফিলিপ রায়ান।

‘মরুদস্যু?’ একইসঙ্গে জানতে চাইল কিশোর-মুসা-রবিন।

‘হ্যাঁ,’ মাথা দোলাল রেঞ্জার। ‘ওরা ক্যাকটাস ডাকাত। লুটপাট করছে বড় বড় গাছ। বেশিরভাগই স্যাগুয়েরো বা অর্গান পাইপ। যাই হোক, আমি বোধহয় বুঝতে পেরেছি কার নির্দেশে চলছে এসব। সে আমারই এক কর্মী। নাম ডোনাল্ড ওয়াইলি। হয়তো দু-চার দিনের ভেতর গ্রেফতার করতে পারব।’

‘কীভাবে বুঝলেন সে-ই ক্যাকটাস সরাচ্ছে?’ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল কিশোর। ‘জানতে পারি আপনার ক’জন কর্মী?’

‘পার্কের এদিকে মাত্র তিনজন,’ বলল রেঞ্জার। ‘কিন্তু আগে ডোনাল্ড ওয়াইলি ছিল ফিনিক্সের ল্যাণ্ডস্কেপার, গাছের নার্সারি ছিল ওর। খুব ভাল করে বোঝে মরুভূমির গাছপালা। ওর পক্ষে বড় স্পেসিমেন নষ্ট না করে সরিয়ে নেয়া খুবই সহজ।’

একটু দূরের এক অর্গান পাইপ ক্যাকটাসের দিকে আঙুল তাক করল মুসা। ‘ওসব লম্বা ডানা দেখে মনে হচ্ছে, সরাতে গেলে মট্ করে ভেঙে পড়বে গাছ।’

আস্তে করে মাথা দোলাল ফিলিপ রায়ান। কথাটা ঠিক। ওটা অনেক বড় গাছ। কিন্তু দড়ি আর কাঠের ফ্রেম ব্যবহার করলে সরিয়ে নেয়া যায়। এসব ডাকাত নিজেদের কাজ জানে। চুপচাপ সরিয়ে ফেলছে সবচেয়ে বড় অর্গান পাইপ ক্যাকটাসও।’

‘কিন্তু কথা অন্যখানে,’ বলল মুসা, ‘কেউ কেন ডাকাতি করবে এই জিনিস?’

‘বিপুল টাকার জন্য,’ বলল হেড রেঞ্জার রায়ান। ‘দক্ষিণ-পশ্চিমের শহরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ডেয়ার্ট ল্যাণ্ডস্কেপিং। লোকজন তাদের বাগানে রাখতে চাইছে ক্যাকটাস আর মরুভূমির ফ্লোরা। যারা মরুভূমির মত করে সাজানো বাগানসহ বাড়ি কিনতে চায়, সেসব আগ্রহী ক্রেতারা বহু টাকা খরচ করছে ডেভেলপারদের পিছনে। তারা আবার জোগাড় করছে এসব ক্যাকটাস। দুর্লভ এবং ভাল স্পেসিমেনের জন্যে হাজার হাজার ডলার খরচ করছে।’

‘কত দাম হবে ভাল স্পেসিমেনের?’ জানতে চাইল রবিন।

‘কমপক্ষে দশ থেকে বারো হাজার ডলার।’

চট্ করে হিসাব কষল কিশোর।

বাংলাদেশি টাকায় একটা ভাল ক্যাকটাসের দাম হতে পারে আট লাখ তিরিশ হাজার টাকা থেকে শুরু করে নয় লাখ ছিয়ানব্বুই হাজার টাকা!

‘মরুভূমি নষ্ট করলে রাষ্ট্রীয়ভাবে শাস্তি দেয়া হবে, তার পরও…’ চুপ হয়ে গেল ওমর শরীফ, কাঁধ ঝাঁকাল।

‘এ ধরনের ডাকাতির নাম দেয়া হয়েছে ক্যাকটাস রাসলিং,’ বলল ফিলিপ রায়ান। ‘আগে যেমন পশ্চিমের বুনো এলাকায় ক্যাটল রাসলিং হতো, ঠিক তেমনই কুকীর্তি চলছে এখানে।’

‘আপনি কতগুলো ক্যাকটাস হারিয়েছেন?’ জানতে চাইল কিশোর। ‘ঠিক জানি না,’ একটু দ্বিধা নিয়ে বলল রেঞ্জার। ‘দশ-বারোটা হবে। তবে আশা করি শীঘ্রি হাতে-নাতে ধরতে পারব ডোনাল্ড ওয়াইলিকে। আমি খুবই খুশি হব তোমরা কাউকে কিছু না বললে। প্রায় তিনমাস ধরে তদন্ত করছি। এখন যদি তোমাদের কারণে সতর্ক হয়ে ওঠে লোকটা, এরপর হয়তো আর ধরতেই পারব না তাকে। তার চেয়েও বড় কথা, তোমাদেরকে এসব জানাবার অধিকারই নেই আমার। আমি মুখ খুলেছি প্রমাণ হলে শাস্তি হবে আমারই।’

‘বিশ্বাস রাখতে পারো আমাদের ওপর,’ বলল ওমর শরীফ।

‘মুসা-রবিন আর আমি হয়তো সাহায্য করতে পারব আপনার তদন্তে, বলল কিশোর।

ভুরু কুঁচকে গেল ফিলিপ রায়ানের, ভাবছে। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, ‘কিছু মনে নিয়ো না, কিন্তু আমার ধারণা মরুভূমিতে খুব একটা কাজে আসবে না অপেশাদার কিশোর গোয়েন্দা।’

মুখ আরও কালো হয়ে গেল মুসার। বলল, ‘আপনি আমাদের অ্যামেচার ভাবছেন? আপনি হয়তো জানেন না…’

‘বাদ দাও, মুসা, বাধা দিল কিশোর। ‘আমরা ছুটি কাটাব, কিন্তু খোলা রাখব কান। কিছু জানলে জানিয়ে দেব মিস্টার রায়ানকে।‘

‘ভাল বুদ্ধি,’ বলল হেড রেঞ্জার। ‘কিন্তু কাউকে আবার বলে বোসো না এসব। এ তদন্ত শেষ করতে হলে এমন লোক চাই, যে চারপাশ চেনে। ফিনিক্সের ক্যাকটাস কপদের সঙ্গেও আলাপ করেছি। সমস্যা হচ্ছে: সরকারের তরফ থেকে যথেষ্ট বাজেট নেই। সবধরনের খরচ কমাচ্ছে সরকার, ছাঁটাই করছে লোক, ফলে কঠিন হয়ে উঠছে সহজ কাজও। আজকাল সরকারের দক্ষতা নিয়েও সন্দেহ জাগে আমার মনে।’’

‘ক্যাকটাস ক?’ বন্ধুর দিকে চাইল ওমর শরীফ। ‘মানে ক্যাকটাস বিষয়ক পুলিশ?’

‘হ্যাঁ,’ বলল ফিলিপ রায়ান। ‘অ্যারিযোনার ক্যাকটাস বিষয়ক গোয়েন্দা পুলিশ তারা— ক্যাকটাস কপ। তাদের কাজ ক্যাকটাস রাসলারদের ধরা।’

হেসে ফেলল মুসা। ‘শুনে মনে হচ্ছে গরু রাসলারদের ধরতে রওনা হবে দুর্ধর্ষ মার্শাল।’ কাঁধ ঝাঁকাল ও। ‘আমরা আসলে পুরনো সেই বুনো পশ্চিমেই আছি, তাই না?’

‘সত্যিকারের সেই বুনো পশ্চিম আর নেই,’ বলল রায়ান। ‘কিন্তু কিছু কিছু জিনিস কখনও বদলে যায় না।’

মরুভূমি থেকে ভেসে উঠছে অনেক ধুলোবালি, দূরের রাস্তার দিকে আঙুল তুলল কিশোর। ‘ওই বালির ঝড়ের দিকে দেখুন, খুব জোরে গাড়ি নিয়ে আসছে কেউ।’

‘টুরিস্টরা কখনও কখনও এসব রাস্তায় তুমুল গতি তোলে, এমন ভঙ্গি নেয়, যেন ইণ্ডি ফাইভ হান্ড্রেড প্রতিযোগিতায় নেমেছে,’ বলল হেড রেঞ্জার। ‘এসব দেখলে আমার মাথায় রক্ত চেপে যায়। কয়েক সেকেণ্ড পর চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার। ‘তুমি ঠিকই বলেছ, কিশোর!

বিপুল গতি তুলে বাঁক পেরিয়ে এল ছোট এক নীল পিকআপ, ছিটকে আসছে কিশোরদের গাড়িতে গুঁতো দিতে!

গতি যেন আরও বাড়ছে ওই পিকআপের!

যে-কোনও সময়ে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার ফলে মারা পড়বে সবাই!