স্বপনে দোঁহে ছিনু কী মোহে
শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে ঐশানী ডিক্লেয়ার করল, “আমি পার্লারে যাচ্ছি,” প্রতাপ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “এত সকালে পার্লার খোলে?”
ঐশানী স্যান্ডো গেঞ্জি আর বারমুডা পরে আছে। খসখস করে মাথা চুলকে বলল, “আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে।”
মালিনী ক্যালকাটা সিটিজ়েনের শব্দছক সমাধান করছে। বলল, “কী করাবি, ওয়্যাক্সিং?”
“না না…” মসৃণ পায়ে হাত বুলিয়ে ঘাড় নাড়ে ঐশানী, “ন্যাভেল পিয়ার্সিং করাব।”
“কী!” একসঙ্গে চিৎকার করেছে প্রতাপ ও মালিনী। ভোলাদা ঘাড় নেড়ে বলছে, “এগুলো ঠিক না। এগুলো একদমই ঠিক না।”
ঐশানী বিরক্ত হয়ে বলল, “আচ্ছা ভোলাদা। তুমি কেন আপত্তি করছ? তুমি ন্যাভেল পিয়ার্সিং মানে জানো?”
“জানি না,” প্রতাপ আর মালিনীর ব্রেকফাস্ট ঠক করে টেবিলে রেখে ভোলাদা বলে, “তবে তুমি যখন করাচ্ছ, তখন সেটা ভাল কিছু নয়, এ আমি শিয়োর। তা ছাড়া তোমার বাবা-মা-র মুখ দেখেছ? ভয়ের চোটে পাঙাশপানা হয়ে গিয়েছে!”
“ন্যাভেল পিয়ার্সিং মানে নাভিতে ফুটো করা,” বরফঠান্ডা গলায় বলে মালিনী।
ভোলাদা আঁতকে উঠে বলে, “নাভিতে ফুটো? ওরে বাবা গো! কেন?”
“ওখানে রিং পরবে,” ফ্রুট স্যালাড মুখে দিয়ে বলে মালিনী।
“এতক্ষণে বুঝেছি,” ঘাড় নাড়ছে ভোলাদা, “কান আর নাক বিঁধিয়ে শান্তি হচ্ছে না।”
“শান্তির কথা উঠছে না,” আপত্তি করে ঐশানী, “ওগুলো খুব কমন হয়ে গিয়েছে। ছেলেরাও করে।”
প্রতাপ বলল, “ছেলেরা আজকাল নাকে নথও পরছে?”
“ফ্যাশন শোতে নোজ রিং পরে তো!” বাবাকে জানায় ঐশানী। “ভুরুতে, ঠোঁটে বা জিভেও রিং পরা যায়। তবে আমি ন্যাভেলটা প্রেফার করছি। ভেরি কুল!”
প্রতাপ লুচি আর ছোলার ডাল মুখে পুরে বলল, “এটা আজকেই করতে হবে? বাধ্যতামূলক? তুই কি জানিস যে, আজ আমরা সবাই মিলে বারাসত যাচ্ছি?”
“বারাসত যাওয়ার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক বাবা? আমি আজ দেরি করে অফিস যাব। আর যিনি পিয়ার্সিং করবেন, তাঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া খুব টাফ!”
“ছাই টাফ!” ঐশানীর খাবার টেবিলে রেখে ঝাঁঝিয়ে ওঠে ভোলাদা, “তোমার বিয়ে ফাইনাল করতে যাচ্ছি। আজকের দিনে এইসব অনাছিস্টি কাণ্ড না করলেই নয়? ফট করে রক্ত বেরলে বা পেকে গেলে কী হবে?”
চিঁড়ে-দই খেতে-খেতে ঐশানী ভোলাদাকে বোঝায়, “আজকাল পিয়ার্সিংয়ের জন্য গান ব্যবহার করা হয়।”
“গান! অ্যাজ় ইন বন্দুক?” জানতে চাইছে প্ৰতাপ।
“হ্যাঁ। রক্তপাতহীন পাঁচমিনিটের মামলা। এই নিয়ে এত চেল্লামেল্লির কিছু হয়নি। তাছাড়া আমি চুলও কাটব,” আবার খসখস করে মাথা চুলকোয় ঐশানী।
“নট আ ব্যাড আইডিয়া!” প্রতাপের দিকে তাকিয়ে হাসে মালিনী, “তুই ফ্রন্ট ফ্রিঞ্জ ট্রাই করতে পারিস। ভাল মানাবে।”
“আমি ভাবছি ন্যাড়া হব,” ব্রেকফাস্ট শেষ করে চেয়ার থেকে উঠেছে ঐশানী।
“ন্যাড়া! কেন? আমি তো এখনও বেঁচে…” অবাক হয়ে বলে প্রতাপ। মালিনী তাড়াতাড়ি প্রতাপের মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে, “এইসব অলক্ষুনে কথা না বললেই নয়। ও যা পারে করুক। সেদিন বলল, নন্দিনী সরকারের মতো বাটি ছাঁট দেবে। আজ বলছে ন্যাড়া হবে। আমরা ওকে নিয়ে কেন চিন্তা করব? ও যা ইচ্ছে করুক!”
প্রতাপ আর মালিনীর ব্রেকফাস্ট এখনও শেষ হয়নি। দু’জনে চেয়ার থেকে উঠে মালিনীর বেডরুমে ঢুকল। ধড়াম করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
ভোলাদার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল ঐশানী। বলল, “আমি জাস্ট আইব্রাওটা করে আসছি।”
‘ক্লিওপেট্রা’ পার্লারটা বেশ ভাল। মালকিন খুব মিশুকে। স্টাফরাও হেলপফুল। আইব্রাও করতে গিয়ে চুলে ফ্রন্ট ফ্রিঞ্জ করে, আন্ডারআর্ম করে দশটা নাগাদ খেলাঘরে ফিরল ঐশানী। প্রতাপ আর মালিনী এখনও শোওয়ার ঘরের দরজা খোলেনি। অথচ বারাসতের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা সাড়ে দশটায়। রাগে গনগন করতে-করতে নিজের ঘরে ঢুকল ঐশানী। স্নান আর মেকআপ সেরে, জিন্স-টিশার্ট গলিয়ে বেরতে-বেরতে দশটা কুড়ি। ঐশানীর প্ল্যান, বাবা-মাকে গুছিয়ে ঝাড় দেবে।
ওমা! কত্তা-গিন্নি মিলে সেজেগুজে ডাইনিং টেবিল সংলগ্ন চেয়ারে বসে রয়েছে। প্রতাপের পরনে সাদা পাজামা, ইটরঙা কুর্তা আর হলুদ জহরকোট। মালিনীর পরনে কাঁচা হলুদরঙা বালুচরি শাড়ি। আফটার শেভ আর মেয়েলি সুগন্ধের মিশ্রণে ঘর ম ম করছে।
ভোলাদাও আজ কেতাদুরস্ত। কর্ডের প্যান্ট আর স্ট্রাইপ টি-শার্টে চমৎকার লাগছে। তিনজনে একসঙ্গে ঐশানীকে দেখে বলল, “বাহ!”
মালিনী বলল, “ফ্রন্ট ফ্রিঞ্জে চমৎকার মানিয়েছে।”
প্রতাপ বলল, “আমরা কি একটু বেশি সেজে ফেললাম?”
ভোলাদা জবাব দিল, “আমরা বেশি সাজিনি। খুকি কম সেজেছে।”
“খুকি বলবে না,” রাগে গজগজ করতে-করতে সিঁড়ি দিয়ে নামে ঐশানী। নেহাত অফিস আছে। না হলে সে-ও এদের মতো মাঞ্জা দিত। আজ তার বিয়ে ফাইনাল হচ্ছে। ইয়ার্কির কথা?
*
পাকা দেখা বা আশীর্বাদ নয়, বিয়ে ফাইনাল! এই শব্দবন্ধ তৈরি করেছে অদ্রীশ। গত সপ্তাহে একদিন রাত্তিরে মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়ে গিয়েছিল। ইসিজি করানোর পর দেখা গেল, সামান্য গন্ডগোল। রিপোর্ট শোনামাত্র সীমান্তকে তলব করে অদ্রীশ বলেছিল, “আমার আয়ু আর বছরদুয়েক। মরার আগে নাতিনাতনির মুখ দেখতে চাই। তোমরা বিয়ে ফাইনাল করো।”
“কার্ডিওলজিতে ডিএম করব। এখন বি.এ. ফাইনালে বসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়,” সহজ উত্তর সীমান্তর।
“এইসব বোকা-বোকা রসিকতা আমার যৌবন বয়সেও ব্যাকডেটেড ছিল,” ছেলেকে এক ধমকে চুপ করিয়ে মোবাইলে মালিনীকে ধরেছিল অদ্রীশ, “নমস্কার ম্যাডাম। একটা জরুরি ব্যাপারে আপনার সঙ্গে দরকার ছিল। পাঁচ মিনিট কথা বলা যাবে?”
“মাত্র পাঁচ মিনিট!” মিষ্টি হাসছিল মালিনী।
“একে বিপত্নীক, তার উপরে ইসিজিতে গন্ডগোল ধরা পড়েছে। প্লাস, আপনি আমার ভাবি বেয়ান। ফ্লার্ট করা সংগত হবে না। আপাতত পাঁচ মিনিটই যথেষ্ট।”
“আমাদেরও বয়স হয়ে গেল, না?” দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল মালিনী, “বলে ফেলুন, আপনার জরুরি কথা।”
“সীমান্ত আর ঐশানীর রকমসকম আমার ভাল লাগছে না। ওরা আদৌ প্রেম করে, না করে না?” চিন্তিত গলায় বলে অদ্রীশ। সীমান্ত নিঃশব্দে হাত পা নেড়ে প্রতিবাদ করছে। পারলে বাবার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়।
“জানি না দাদা,” ওপ্রান্ত থেকে জানিয়েছিল মালিনী, “কখনও মনে হয় প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, কখনও মনে হয় ভাইফোঁটা দেবে। কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলে, সীমান্ত আমার বন্ধু। আমি এদের ঠিক বুঝতে পারি না।”
“রিস্ক নিয়ে লাভ নেই, বুঝলেন,” ষড়যন্ত্রী গলায় বলেছিল অদ্রীশ, “ওদের বিয়েটা দিয়ে দেওয়া যাক। ফুলশয্যার রাত্তিরে ‘হম তুম এক কামরে মে বন্ধ হো, অওর চাবি খো যায়ে’ গাইতে গাইতে ভাইবোনগিরি ছুটে যাবে! আপনি নেক্সট শনিবার সকালে সপরিবারে আমার বাড়ি চলে আসুন। ওদের বিয়েটা ফাইনাল করা যাক। এরা যা ঢ্যাঁড়স, এরা নিজে থেকে কিছু করে উঠতে পারবে বলে মনে হয় না।”
অদ্রীশের কথা শুনতে-শুনতে সীমান্ত কপাল চাপড়াচ্ছিল। অদ্রীশ ফোন কাটতে বলল, “তোমার কি কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই? একজন মহিলার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় জান না?”
“পাকামি মারিস না,” সীমান্তর ধমক ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল অদ্রীশ, “তোর বসের সঙ্গে কথা বলে দেখ, যাতে শনিবার অফ নেওয়া যায়। ওই দিনই বিয়ের ফাইনাল করব।”
“বাবা… আমি একবার ঐশানীর সঙ্গে কথা বলি…”
“বল না! এক হাজারবার কথা বল। এসএমএস কর, জি-টকে কথা বল, ফেসবুকে চ্যাট কর, হোয়াট্সঅ্যাপ কর। নো প্রবলেম। শুধু শনিবার সকালে সশরীরে তাসের দেশে উপস্থিত থাকবি। এর অন্যথা যেন না হয়। আর, পারুলকে পাঠিয়ে দে। আমি ওই দিনের মেনু ঠিক করব।”
সীমান্তর কাছ থেকে সেদিনই পুরো প্রসঙ্গটা শুনেছিল ঐশানী। ‘বিয়ে ফাইনাল’ প্রসঙ্গ নিয়ে খেলাঘরে প্রতাপ আর মালিনী যথেষ্ট হাসাহাসি করেছে।
অনেক…অনেকদিন পরে প্রতাপ আর মালিনীর সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতা ফিরে আসছে। এক অপরের সঙ্গে কথা বলছে, ঝগড়া করছে। ঐশানীর বুক থেকে বোঝা হালকা হচ্ছে। তার অবর্তমানে এই দু’জন একা-একা এক ছাদের নীচে কীভাবে দিন কাটাবে—এই ভেবে চিন্তা হত। আজ হচ্ছে না। দোতলার শোওয়ার ঘরে কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ দরজা তাকে স্বস্তি দিয়েছে। প্রতাপ আর মালিনীর পোশাকের কালার কো-অর্ডিনেশন দেখে সে খুব খুশি।
প্রতাপের গাড়ি নেই। দরকার পড়লে এজেন্সিতে ফোন করে গাড়ি ডেকে নেয়। আজ এজেন্সি থেকে একটা সাদা এসইউভি পাঠিয়েছে। সঙ্গে চেনা ড্রাইভার রাজু।
খেলাঘরের সদর দরজা বন্ধ করার সময় ঐশানী ফিসফিস করে বলল, “নো লুজ টক, “ গলা তুলে বলল, “আমি কিন্তু সামনে বসব!”
“তা হলে আমি কোথায় বসব?” আপত্তি করে প্রতাপ। ঐশানী অলরেডি ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে গিয়েছে। পিছনের বাঁদিকে বসল মালিনী। ডানদিকে ভোলাদা। দু’জনের মাঝখানে চিঁড়ে চ্যাপটা হয়ে বসে প্রতাপ বলল, “এটা ব্রেড আর্নার অফ দ্য ফ্যামিলির জায়গা হতে পারে না। বাঙালি পুরুষের মধ্যে পৌরুষ কমে যাচ্ছে বলেই দেশের এই অবস্থা! এটা যদি হরিয়ানভি ফ্যামিলি হত, তাহলে মা আর মেয়েকে বনেটে ঢুকিয়ে বাড়ির কত্তা পিছনের সিটে একা শুয়ে শুয়ে যেত!”
রাজু গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বলল, “ওরকম বলবেন না স্যার। হরিয়ানায় মেয়ের খুব অভাব। ওরা বিহার, বাংলা, কেরল থেকে মেয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। খুব বাজে কন্ডিশন!”
পাড়ার ড্রাইভারের মুখে হরিয়ানার সামাজিক সমস্যা নিয়ে জ্ঞানের কথা শুনে প্রতাপ ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে গেল। ঐশানী খিলখিল করে হেসে বলল, “পাঁচটা বর হওয়া কিন্তু হেবি ব্যাপার। কোনও দিনও বোর লাগবে না।”
পিছন থেকে ভোলাদা বিরক্ত হয়ে বলল, “গাড়িতে ওঠার আগে আমায় জ্ঞান দিলে যে, ‘নো লুজ টক’। এখন নিজেই আটভাট বকছ।”
ঐশানী চুপ করে গেল! পিছনের আসনে বাবা-মা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছে। কত দিন বাদে ওরা একে অপরের স্পর্শ পাচ্ছে? কে জানে!
*
তাসের দেশের সামনে গাড়ি দাঁড়াল সওয়া এগারোটায়। গেটের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে অদ্রীশ আর পারুল। দোতলার জানালা দিয়ে শঙ্কিত মুখে উঁকি মারছে সীমান্ত।
গাড়ি থেকে সবার আগে নামল ভোলাদা। পারুলকে বলল, “আজ কিন্তু আমি কন্যাপক্ষ। ঠিকমতো খাতির করতে হবে।”
“ন্যাকার মরণ!” কনুইয়ের এক ঠেলায় ভোলাদাকে সরিয়ে পারুল মালিনীকে বলল, “কেমন আছ দিদি? আগের থেকে একটু রোগা হয়েছ বলে মনে হচ্ছে!”
“কী ক্লেভার কমেন্ট!” হাততালি দেয় প্রতাপ, “এই একটা কথায় পাত্রীর মা গলে জল হয়ে গেল!”
মুচকি হেসে পারুল বলল, “আপনার জন্য রেওয়াজি খাসির মাংস হয়েছে!”
“ও! এই মেয়েটা না!” সুভুত করে লালা গিলে প্রতাপ বলে, “চলো-চলো! সবাই ভিতরে চলো। গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে।”
হা-হা করে হাসতে হাসতে অদ্রীশ প্রতাপকে জড়িয়ে ধরে। সবাই মিলে তাসের দেশে ঢোকে। সাদা এসইউভি সামনের রাস্তায় পার্ক করল রাজু। তার মুখের মিচকে হাসি দেখে ঐশানী বুঝল, ছোকরার বুঝতে কিছু বাকি নেই।
দোতলায় সবাই মিলে জমিয়ে বসেছে। প্রতাপ বলল, “আপনাদের এখানে তো বাই ইলেকশন। কে জিতবে? জনাদেশ পার্টি না নতুন দল?”
অদ্রীশ বলল, “হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার কথা। তবে জনাদেশ পার্টির উৎপল বসুমল্লিককে ক্যাম্পেন করতে দেখা যাচ্ছে না। হপ্তাখানেক আগে ওর বন্ধু মনোময় আমাকে ফোন করে সীমান্তর ফোন নম্বর নিয়েছিল। কী ব্যাপার রে সীমান্ত? উৎপলের শরীর খারাপ নাকি?”
সীমান্ত ইলেকট্রিক শেভারে দাড়ি কামাচ্ছিল। বলল, “ধুস! এই রেজারগুলো ফালতু! কোনও কাজ হয় না। শুধুমুধু একগাদা খরচ!”
সীমান্ত উত্তর না দেওয়ায় অদ্রীশ বুঝে গেল যে, এই নিয়ে কথা বলা যাবে না। প্রসঙ্গ পালটে বলল, “মোহনপুর মূলত গ্রাম। মিউনিসিপ্যালিটি আর পঞ্চায়েতের পার্সেন্টেজ ফর্টি সিক্সটি। জনাদেশ পার্টির গণভিত্তি গ্রামে। নতুন দল শহুরে পার্টি। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলেও উৎপল জিতবে।”
“আজকাল গ্রাম আর শহরে খুব একটা ফারাক নেই,” কফির কাপ টেবিলে রেখে বলে পারুল, “একটা খবরের কাগজ দশজন মিলে পড়ে। টিভি তো সবার বাড়িতে।”
“মোহনপুরের বিলাসভোগ খুব বিখ্যাত শুনেছি!” কফিতে চুমুক দিয়ে বলে প্রতাপ। মালিনী বলে, “খাইখাই বাতিক বন্ধ করে কাজের কথা বলো,” অদ্রীশ হো-হো করে হাসছে। ভোলাদা পারুলের সঙ্গে রান্নাঘরে চলে গেল।
এরা এখন আড্ডা মারবে। তারপর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া করবে। সীমান্ত আর ঐশানী চুপিসাড়ে একতলায় নেমে আসে। পরবর্তী একঘণ্টা তাদের কেউ বিরক্ত করবে না।
*
অদ্রীশের চেম্বারের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে ঐশানীকে জড়িয়ে ধরে সীমান্ত। চোখে চোখ রেখে বলে, “বিয়ে ফাইনাল হওয়ার আগে সেমিফাইনালটা হয়ে যাক, কী বলো পুঁটুরানি?”
“আর ইউ ম্যাড পুচুসোনা? উপরে বাবা-মা রয়েছে। ভোলাদা- পারুলদি রয়েছে। কাকু রয়েছে!” ফিসফিস করে ঐশানী, “যে কেউ চলে আসতে পারে। কাকুর মক্কেলরাও চলে আসতে পারে।”
“কেউ আসবে না,” বাঁহাত দিয়ে ঐশানীকে জড়িয়ে ধরে ডানহাত দিয়ে কপাল থেকে চুলের গুছি সরিয়ে দেয় সীমান্ত, “এটা বাবা আর পারুলদির প্ল্যান। খাওয়াদাওয়া আর বিয়ের আলোচনায় তোমার বাবা- মাকে ব্যস্ত রাখবে। নো টেনশন।”
খুকখুক করে হেসে ঐশানী বলে, “কাকু লোকটা জিনিয়াস! বাকি বুড়োদের উদ্দেশে আমার বলতে ইচ্ছে করছে, ‘আমাদের দেশে হবে সেই বুড়ো কবে? কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।”
সীমান্ত এই ফাঁকে ঐশানীর টিশার্ট খুলে দিয়েছে। লেস দেওয়া গোলাপি অন্তর্বাস দেখে বলল, “ওরেব্বাস! এই মিষ্টি দেখতে জিনিসটা কী?”
“এলিজাবেথস সিক্রেট!” লজ্জায় লাল হয়ে বলে ঐশানী।
“এলিজাবেথের গুপ্তকথা? সেটা আবার কী?”
“এটা মেয়েদের আন্ডারগারমেন্ট কোম্পানির নাম। হাঁদা কোথাকার!”
নিজের টিশার্ট খুলে সীমান্ত বলে, “একটা কোম্পানির নাম এলিজাবেথস সিক্রেট! আমাদের ‘হরিদাসীর গুপ্তকথা’ তাহলে কী, সেমিজ কারখানা?”
“জানি না। যাও!” মক্কেলদের বসার জন্য যে-সোফা রাখা আছে তার এককোণে পা তুলে বসেছে ঐশানী। সীমান্ত তার পাশে বসে কপালে চুমু খেয়ে বলল, “বাইকের পিছনে বসে তো অনেক বড় বড় কথা বলো। এখন এত চুপচাপ কেন? লজ্জা করছে?”
ঐশানী নিজেও কথাটা ভাবছিল। সে এতটা লাজুক নয়! সীমান্তর সঙ্গে অতীতে কখনও দরজা বন্ধ করে ঘনিষ্ঠ হয়নি অথবা শুধু অন্তর্বাস পরে বসে থাকেনি। কিন্তু হালকা ফুলকা চুমু, জড়িয়ে ধরা আর একটু ঘনিষ্ঠ হওয়া, এসব তো হয়েছে। তা হলে লজ্জা কেন?
“লজ্জা নয়।” মনে যে উত্তরটা এল, সেটা বলে ফেলে ঐশানী, “আমি বিয়েটা নিয়ে একটু টেনশনে আছি।”
“কেন?” ঐশানীকে নিজের কোলে বসিয়ে জানতে চায় সীমান্ত। হাঁটু ভাঁজ করে বসে থাকার ফলে সীমান্তর বুকের সামনে ঐশানীর দুই পা। ঐশানীর দুই হাঁটুর ওপরে মুখ রেখে প্রশ্ন করেছে সীমাস্ত।
“কাকু জোর না করলে আমিই হয়তো বলতাম। আমার মনে হচ্ছে যে, বিয়েটা সেরে ফেলার এটাই আইডিয়াল টাইম। তুমি কার্ডিওলজিতে ডিএম করা শুরু করলে তিন বছরের জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। ততদিনে আমারও বয়স বেড়ে যাবে। আর আমার চাকরির কোনও স্থিরতা নেই। দিল হয় তো শিলচর বা গুয়াহাটি, পটনা বা ভুবনেশ্বরে পাঠিয়ে। তার থেকে এই ভাল। ঝটপট বিয়ে করে গোটা দু’য়েক বাচ্চা করে ফেলি।”
“দুটো বাচ্চা!” সীমাস্ত আর একটু হলে কোল থেকে ফেলে দিচ্ছিল। ঐশানী প্রাণের দায়ে সীমান্তকে জড়িয়ে ধরে বলল, “নট লেস দ্যান টু। আমি এক মেয়ে। তুমিও এক ছেলে। এক সন্তানের অনেক জ্বালা। বাড়ির সমস্ত চাপ, বাবা-মার সমস্ত এক্সপেক্টেশন, তাদের সম্পর্কের যাবতীয় আন্ডারকারেন্ট একা বইতে হয়। টু টাফ!”
সীমান্ত ঐশানীর কানে-কানে বলল, “ফর গড্স সেক হোল্ড ইয়োর টাং, অ্যান্ড লেট মি লভ।”
ভ্যাবাচাকা খেয়ে ঐশানী চুপ করে গিয়েছে। তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে সীমান্ত চোখে চোখ রেখেছে। চার চোখ এত কাছাকাছি যে, সীমান্তর চোখের পাতা ঐশানীর আইল্যাশ স্পর্শ করছে। পলকহীন সীমান্ত তাকিয়ে রয়েছে।
“এভাবে একটানা তাকিয়ে থাকলে আমার অস্বস্তি হয়, “ নিচু গলায় স্বগতোক্তি ঐশানীর। দৃষ্টি না সরিয়ে ঐশানীর বাঁ চোখের পাতায় চুমু খেল সীমান্ত। ঐশানী দু’চোখ বন্ধ করে ফেলল। সীমান্ত ডান চোখের পাতায় চুমু খেল। কপালে, গালে, কানে, ঘাড়ে চুমু খেল। কানে সীমান্তর শ্বাস পড়তে ঐশানীর দু’হাতে পদ্মকাঁটা ফুটেছে। শিউরে উঠে ঐশানী বলল, “উপরে চলো পুচুসোনা। বাবা-মা কী ভাববে!”
ঐশানীকে কোলে বসিয়ে রেখে হাত বাড়িয়ে মেঝে থেকে টিশার্ট তোলে সীমান্ত। বলে, “এগুলো পরার জন্য তোমাকে আমার কোল থেকে নামতে হবে।”
লজ্জায় লাল হয়ে ঐশানী বলে, “আমি যেন নিজের ইচ্ছেয় তোমার কোলে বসেছি! বদমাইশ কোথাকার!” তারপর সীমান্তর কোল থেকে তড়াক করে নেমে টিশার্ট গলায়। সীমান্তও টিশার্ট পরে নিয়েছে। আবার ঐশানীকে পাঁজাকোলা করে সোফার এককোণে ঠেসে ধরে বলল, “বিয়ের পরে আমরা কোথায় বেড়াতে যাব?”
“আমি হানিমুনের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা সেভ করেছি,” ষড়যন্ত্রীর ভঙ্গিমায় জানায় ঐশানী। “তোমার স্টকে কত আছে?”
“আমি লাখখানেক ছাড়তে পারি।”
“দেড়লাখ টাকায় ইউরোপ ঘুরে আসা যাবে না? রোজই তো কাগজে অ্যাড দেখি। দশ দিনে লন্ডন, ভেনিস, সুইস অ্যাপস…
“আমার দ্বারা ওই পাগলামো হবে না পুঁটুরানি। লন্ডনে ব্রেকফাস্ট, ভেনিসে লাঞ্চ, প্যারিসে ডিনারের হপ স্কিপ অ্যান্ড জাম্প আমার জন্য নয়। ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার জন্য আমি বেড়াতে যাব না। তোমার সঙ্গে ঘুরতে যাব। লেট্স গো টু গোয়া। সাউথ গোয়াটা ফাঁকা। টুরিস্টের উপদ্রব নেই। সান, স্যান্ড, সার্ফ অ্যান্ড সেক্স… ফ্যান্টাস্টিক!”
“ওখানে কোন বিচে যেন নুডিটি অ্যালাউড?”
“জানি না। খোঁজ নিতে হবে। আমি কিন্তু পুঁটুরানিকে ন্যাংটো হয়ে সবার সামনে ঘুরতে দেব না। অন্ততপক্ষে হরিদাসীর গুপ্তকথা পরে থাকতে হবে।”
“এই হচ্ছে ছেলেদের নিয়ে সমস্যা। এখনও বিয়ে হল না, অথচ অধিকারবোধ ফলাতে শুরু করেছে!”
“ঠিক আছে। তুমিও ঘুরো, আমিও ঘুরব।”
“একদম না। আমি তাহলে খুব রেগে যাব কিন্তু!” হাসতে হাসতে বলে ঐশানী, “মেমের কথা ভেবেই লকলকানি শুরু হয়ে গেল। জানোয়ার কোথাকার!”
“ছেলেরা নুড হলে মেমের কথা ভেবে লকলকানি। আর তোমরা নুড হলে?”
“আমরা নিজেদের এক্সপ্রেস করতে চাই। উই ওয়ান্ট টু ব্রেক ফ্রি! বুঝলে পুচুসোনা?”
সীমান্ত চুমু দিয়ে ঐশানীর বাক্যবাণ বন্ধ করে বলল, “বিয়ের পরে আমাদের রুটিন কী হবে পুঁটুরানি?”
“দ্যাট্স আ গুড কোয়েশ্চেন,” দু’হাত দিয়ে সীমান্তকে ঠেলে সরিয়ে সোফায় বসেছে ঐশানী। আঙুল দিয়ে চুল ঠিক করে বলছে, “পুটুরানি সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে ঘুম থেকে উঠবে। সকালের চা-টা পুঁটুরানিই বানাবে। প্রোভাইডেড, ছুটির দিনে পুচুসোনা বা কাকু চা বানাবে।”
“আমি বানাব,” হাত তুলেছে সীমান্ত, “তবে আমি কফি প্রেফার করি।”
“চলবে। ব্রেকফাস্টের দায়িত্ব পারুলদির। লাঞ্চের দায়িত্বও। আমি লাঞ্চ নিয়ে অফিস যাব। পারুলদি পারবে তো?”
“আরামসে। আমি ন’টায় বাড়ি থেকে বেরই। বাবা বেরয় সাড়ে ন’টায়। দু’জনেই ভাত খেয়ে বেরই। তোমার অফিস থেকে ফিরতে- ফিরতে ক’টা হয়?”
“পুঁটুরানি সপ্তাহে তিনদিন সাড়ে ন’টায় ফেরে, তিনদিন সাড়ে এগারোটায়। তবে ইমার্জেন্সি অ্যারাইজ় করলে ফেরার ঠিকঠিকানা থাকে না।”
“আমারও ফেরার ঠিক নেই। উইকলি দু’ থেকে তিনটে নাইট ডিউটি পড়ে। পুচুসোনা আর পুঁটুরানি বাচ্চা মানুষ করবে কী ভাবে?”
সীমান্তর কথা শুনে খিলখিল করে হাসছে ঐশানী। সীমান্তর নাক দু’আঙুলে টিপে বলল, “পুচুসোনা আগে ভাবুক বাচ্চা কী করে করবে! তারপর বাচ্চা মানুষের কথা!”
সীমান্ত তড়াক করে সোফা থেকে উঠে বলল, “এবার উপরে চলো। আর দেরি করলে তোমার বাবা-মা ভাববেন যে, আমরা এখানে বাচ্চা তৈরি করছি।”
“ভ্যাট!” সীমান্তর কাঁধে চাঁটি মারে ঐশানী। হাত দিয়ে চুল ঠিক করে, টিশার্ট টেনেটুনে দরজার ছিটকিনি খোলে।
“আচ্ছা, বেগমের কথা মনে পড়ে তোমার?” সিঁড়ি দিয়ে উঠতে- উঠতে প্রশ্ন করে ঐশানী। গলার আওয়াজ উচ্চগ্রামে। যাতে দোতলার লোকে শুনতে পায়।
দোতলায় কেউ নেই। আভেনে রান্না চাপানো রয়েছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে, পারুল তিনতলায় গিয়েছে। এক্ষুনি নামবে।
বলতে না বলতেই সিঁড়ি দিয়ে নামছে ভোলাদা আর পারুল। হাতে পাঁজা করা বাসন। ঐশানীকে দেখে পারুল বলল, “তাড়াতাড়ি উপরে যাও। বিয়ের দিন ঠিক করা নিয়ে তোমার বাবা-মার মধ্যে ঝগড়া লেগেছে!
কিছু না লাগার থেকে ঝগড়া লাগা ভাল! মনে মনে বলে ঐশানী। খেলাঘরের বরফ-ঠান্ডা অভ্যন্তর আর বাবা-মায়ের সম্পর্কের শৈত্য দেখে ঐশানীর মনে হত সে একটা কোল্ড স্টোরেজে বাস করছে। মনে হয়, সে কফিনবন্দি। সার্পেন্টাইন লেনের খেলাঘরে এক ফালি রোদ ঢোকানোর জন্য সে কত কাণ্ডই না করেছে। কখনও ট্যাটু করতে চেয়ে, কখনও ন্যাভেল পিয়ার্সিং করতে চেয়ে, কখনও ন্যাড়া হতে চেয়ে, কখনও খাটো পোশাক পরে অবাধ্য মেয়ের ইমেজ তৈরি করেছে। যাতে তাকে ঠিক পথে আনার জন্য বাবা আর মা পরস্পরের কাছাকাছি আসে। মালিনী দোতলায় আর প্রতাপ একতলায় শোওয়া বন্ধ করে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার প্রাত্যহিক, মানডেন কথোপকথন ফিরে আসে। কেন বেশি সরষের তেল লাগছে, কেন এক কিলো আলুতে সপ্তাহ কুলোচ্ছে না, এইসব কূটকচালিতে খেলাঘর তার ছোটবেলার খেলাঘর হয়ে ওঠে! হেমন্তের আকাশপ্রদীপের উষ্ণতায় কোল্ড স্টোরেজ আবার যেন গরম হয়ে ওঠে!
আজ ঐশানীর স্বপ্ন সফল হচ্ছে। সে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে বলে বাবা-মা আবার লাভবার্ডের মতো কলকল করে কথা বলছে।
তিনতলায় উঠে ঐশানীর চোখ কপালে উঠল। মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে বসে অদ্রীশ, প্রতাপ আর মালিনী কড়াইশুঁটির কচুরি দিয়ে আলুর দম সাঁটাচ্ছে। একপাশে রাখা রয়েছে মোহনপুরের বিখ্যাত মিষ্টি বিলাসভোগ।
অদ্রীশ আর প্রতাপ ভোজনরসিক। তারা তো গপগপিয়ে খাবেই। ক্যালরি কনশাস মালিনীও আজ নিয়ম মানছে না! ঐশানী আর সীমান্তকে দেখে একমুখ কচুরি নিয়ে অদ্রীশ বলল, “কোটায় চিলিস?”
“মুখে খাবার নিয়ে কথা বোলো না,” অদ্রীশকে চুপ করায় ঐশানী, “আমরা একতলায় ছিলাম। তোমরা রাক্ষসের মতো খাচ্ছ কেন?”
মালিনীর খাওয়া শেষ। সে ছাদের বেসিনে মুখ ধুয়ে, তোয়ালেতে হাত মুছে বলল, “তোরা খাবি না? পারুল খুব ভাল রান্না করেছে!”
“পরে খাবে,” গালে একটা বিলাসভোগ ফেলে চেয়ার থেকে উঠেছে প্রতাপ। হাত মুখ ধুয়ে বলছে, “আগে শুভ কাজটা হয়ে যাক!”
“শুভ কাজ!” সীমান্ত ভুরু কুঁচকে অদ্রীশের দিকে তাকিয়েছে, “আমাদের বিয়েটা এখনই দেবে নাকি! তোমাদের কী মতলব বলো তো?”
অদ্রীশের খাওয়া শেষ। হাতমুখ ধুয়ে বলল, “এখন বিয়ে ফাইনাল হবে। যাকে বাঙালিরা বলে আশীর্বাদ। অবাঙালিরা বলে সগাই। আর সাহেবরা বলে এনগেজমেন্ট।”
“এনগেজমেন্টের জন্য তো রিং লাগে। আই মিন আংটি…” ফাম্বল করছে সীমান্ত, “আমি সেরকম কিছুর ব্যবস্থা করিনি। মানে বাবা তো কিছু…”
অদ্রীশ ছেলের পিঠে হাত দিয়ে বলল, “সুধা চলে যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিল, যে-আংটিটা দিয়ে আমার মা সুধাকে আশীর্বাদ করেছিল, তুই যেন সেই আংটি তোর বউয়ের হাতে পরিয়ে দিস। এয়ারলুম বলে কথা!
সবাই দোতলায় নামছে। অদ্রীশের শোওয়ার ঘরের মেঝেয় দুটো আসন পেতেছে ভোলাদা।
অদ্রীশ বলল, “এই আসন সুধার হাতের কাজ। আজকের দিনে অ্যান্টিক পিস!”
“একদম ঠিক!” মোবাইলের ক্যামেরায় পটাপট আসনের ছবি তুলছে ঐশানী। “কে আগে বসবে? আমি না সীমান্ত?”
“লেডিজ ফার্স্ট!” মন্তব্য অদ্রীশের, “তুই ওই আসনটায় বোস, আমি এটায় বসছি।”
জিন্স পরে হাঁটু মুড়ে বসেছে ঐশানী। তার সামনে বসল অদ্রীশ। পারুল কোথা থেকে শাঁখ নিয়ে চলে এসেছে। ছোট পেতলের রেকাবিতে রাখা রয়েছে ধান আর দুবো। ভোলাদা রেখেছে পিতলের দীপদান।
অদ্রীশ পকেট থেকে একটা আংটি বের করল। সোনার আংটির মাঝখানে হিরে। তাকে ঘিরে গোল করে পান্না আর চুনি বসানো। ঐশানী বলল, “ওয়াও! ইট্স বিউটিফুল। বিয়ে ফাইনালের সময় একটা সেলফি তুলব?”
“না!” ঐশানীর মাথায় চাঁটি মারে অদ্রীশ। লজ্জা পেয়ে মোবাইল সায়লেন্ট মোডে পাঠায় ঐশানী। এগুলো লাইফের স্পেশ্যাল মোমেন্ট। এখন ছ্যাবলামো ঠিক না।
ঐশানীকে আংটি পরিয়ে অদ্রীশ বলল, “জানিস ঐশানী, ভালবাসা প্র্যাকটিস করতে হয়। নারচার করতে হয়। বিবাহ পরবর্তী জীবনে দিনরাত একসঙ্গে থাকতে-থাকতে দু’জনেই দু’জনকে টেক্ ফর গ্র্যান্টেড ধরে নেয়। ওই জন্যই মাঝে-মাঝে দূরে চলে যাওয়া উচিত। তোর বাপমা একসঙ্গে থাকে। তাদের মধ্যে কেমন প্রেম আমি জানি না। ভোলা আর পারুলের সপ্তাহে একদিন মোলাকাত হয়। ওদের প্রেমের তীব্রতা আর একটু বেশি। আমি সুধাকে দেখিনি গত ২০ বছর। আমাদের মধ্যে যে কী তীব্র ভালবাসা…সে আমি তোকে বলে বোঝাতে পারব না!”
অদ্রীশের ইমোশনাল আউটবার্স্ট দেখে ঐশানী আর একটু হলে কেঁদে ফেলছিল। অদ্রীশকে চুপ করিয়ে তীব্র স্বরে উলু দিচ্ছে পারুল আর মালিনী। অদ্রীশ ধান দুব্বো দিয়ে ঐশানীকে আশীর্বাদ করছে। ঐশানী অদ্রীশের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে।
নিজেকে হঠাৎ খুব খুশি, খুব পূর্ণ লাগছে ঐশানীর। সে আসন থেকে উঠে পড়েছে। সেখানে বসেছে সীমান্ত। তার সামনে বসেছে প্রতাপ। পকেট থেকে আংটির বাক্স বের করেছে…
ঐশানী হঠাৎ ছাতিম ফুলের গন্ধ পেল! সেই তীব্র, নাকে জ্বালা- ধরানো, চোখে জল আনা গন্ধ! ফুরিয়ে আসা হেমন্তকাল আর জাঁকিয়ে বসতে থাকা শীতের মাঝামাঝি সময়েও সপ্তপর্ণী গাছ ফুল ফুটিয়ে চলেছে? আশ্চর্য!
দোতলার জানলা দিয়ে বাইরে তাকায় ঐশানী। দেখে, বেগমকে যে ছাতিম গাছের তলায় কবর দেওয়া হয়েছিল, সেই গাছ থেকে গন্ধ আসছে। সপ্তপর্ণীর সাতটা পাতা, সাত আঙুল নেড়ে নিজেদের মধ্যে ইশারায় কথা বলছে!
তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করে ঐশানী। মালিনী আর পারুলের উলু শুনে চমকে ঘরের দিকে ফিরে দেখে, সীমান্ত প্রতাপকে প্রণাম করছে।
সীমান্তর আশীর্বাদ হয়ে গেল! ঐশানী দেখতে পেল না? ধুস! মন খুঁতখুঁত করছে! দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকায় ঐশানী। একটা বাজে। এবার অফিস যেতে হবে। জিনসের পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখে ফাইভ মিস্ড কল্স! সবক’টা ফোনই তার বসের।
