আছে তো হাতখানি
ঐশানী চেয়েছিল চুপচাপ কাজ সেরে আইসিইউ থেকে বেরিয়ে যেতে। স্পাইক্যামে নিখুঁত ফুটেজ আছে। কৃতান্ত আইসিইউতে ঢুকলেন, এদিক ওদিক তাকালেন, আট নম্বর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে কোটের পকেট থেকে সিরিঞ্জ বের করলেন, সিরিঞ্জে হাওয়া ভরে উৎপলের আইভি চ্যানেলে পুশ করলেন। ভেন্টিলেটরের টাচ স্ক্রিনে আঙুল ছুঁইয়ে কী সব করলেন। তার অল্পক্ষণের মধ্যে উৎপলের মৃত্যু হল।
উৎপল মারা যাবার পরে কৃতান্ত ন’নম্বর বেডের দিকে ঘুরতেই ঐশানী বুঝে গিয়েছিল, তাকে এবার কৃতান্তর মুখোমুখি হতে হবে। ‘অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স’, এই তত্ত্ব মেনে সে কৃতান্তকে যা বলার বলেছিল। . দশ নম্বর বিছানা থেকে খসখসে গলায় ‘গাঁ-গাঁ’ সম্বোধন শোনামাত্র আইসিইউ-এর পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে গেল।
ঐশানীকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে কৃতান্ত ছুটে গেলেন দশ নম্বর বেডের পাশে। তাঁর চিৎকার শুনে সিস্টার নমিতা কাল্পনিক মাথাব্যথা ভুলে স্কেল হাতে সিস্টারদের রেস্টরুম থেকে দৌড়ে এল। ঐশানী ওভারঅল পরে ন’নম্বর বেড থেকে নামল। ওভারঅলের গলায় ঝোলানো স্পাইক্যাম রেকর্ড করছে প্রতিটি মুহূর্ত।
সিস্টার নমিতার হাত ধরে তাঁকে দশ নম্বর বেডের পাশে টেনে এনেছেন কৃতান্ত। বলছেন, “সিস্টার, দেখুন ঝিমলি কথা বলছে। ঝিমলি মোস্ট প্রোব্যাবলি ‘বাবা’ বলছে! টিউবের জন্য বোঝা যাচ্ছে না,” সিস্টার নমিতা অবাক হয়ে ঝিমলির দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
ঐশানী মনস্থির করতে পারছে না কী করবে! দশটা দশ বাজে। অফিস পৌঁছতে এগারোটা। এত বড় স্কুপের কপি লেখা, লিগ্যাল সেলকে দেখিয়ে নেওয়া, রেকর্ড ক্রস চেক করা, আরও ঘণ্টাতিনেক। উত্তর বা দক্ষিণবঙ্গ সংস্করণ, জেলা এডিশনে না গেলেও লেট সিটি এডিশনে খবরটা ধরানো যাবে। আর, কাল না গেলেও পরশু যাবে। এই স্কুপের মার নেই! এ হল ‘মাদার অফ অল নিউজ়’! এখনই এখান থেকে বেরিয়ে অফিস চলে গেলে আগামিকালের বাইলাইনে জ্বলজ্বল করবে তার নাম।
কিন্তু ঐশানীর সাংবাদিক নাক বলছে, আর একটা খবরের জন্ম হচ্ছে। অথবা আগের খবরটিই আড়ে বহরে বাড়ছে। কুড়ি বছর বাদে কোমা থেকে ফিরে আসা, এই খবর শুধু কলকাতা বা বাংলা বা ভারতে নয়, সারা বিশ্বের মেডিক্যাল মিরাকেলের মধ্যে পড়ে। এই খবরও এক্সক্লুসিভ। একে ছেড়ে ঐশানী যায় কী করে?
যন্ত্রমানবীর মতো, অনুভূতিহীন কণ্ঠে ঐশানী বলে, “নমস্কার। আমি ক্যালকাটা সিটিজেনের স্পেশ্যাল করেসপনডেন্ট ঐশানী। উৎপল বসুমল্লিক কীভাবে মারা গেলেন, আপনি আমাদের জানাবেন, ডক্টর চট্টোপাধ্যায়?”
ঠোঁটের উপরে তর্জনী রেখে, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কৃতান্ত বললেন, “শশশ!” তারপর ঝিমলির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ঝিমলি, আমায় চিনতে পারছিস?”
“গাঁ… গাঁ!” টিকটিকির মতো সরু আর রোগা প্রাণীটি বলে ওঠে।
ভেন্টিলেটরের প্যানেলের টাচ স্ক্রিনে কৃতান্তর অভ্যস্ত আঙুল চলছে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমাচ্ছেন, আর্টারিয়াল লাইন থেকে ব্লাড টেনে ব্লাড গ্যাস অ্যানালিসিস করছেন। মনিটরে প্রেশার এবং পাল্স রেট দেখছেন। বলছেন, “স্ট্রেঞ্জ! সব প্যারামিটার মিরাকুলাসলি নর্মাল!”
সিস্টার নমিতা বললেন, “উইন অফ করবেন?”
“অ্যাবসলিউটলি! তবে তার আগে দেখে নেব, নিজে থেকে শ্বাস নিতে পারছে কিনা!”
ঐশানী বোকার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে দেখল, ঝিমলির শ্বাসনালি থেকে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রে টি-র মতো দেখতে পাইপ পরানো হল। ঝিমলি কিছু বলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কৃতান্ত পাইপ খুলে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তোতাপাখির মতো ঝিমলি বলে উঠল, “বা… বা!”
“শ্বাস নিতে অসুবিধে হচ্ছে?” জানতে চায় সিস্টার নমিতা। উত্তর না দিয়ে ঝিমলি বলল, “বাবা। কোথায়?”
সিস্টার নমিতা বলল, “নিজে থেকে রেসপিরেশন নিচ্ছে। আইভি চ্যানেল কি খুলে দেব?”
“একদম নয়। ওটা থাকবে,” কৃতান্ত এখন আদ্যন্ত পেশাদার, “তবে মুখে সামান্য জল দেওয়া যেতে পারে।”
সিস্টার নমিতা মিনারেল ওয়াটারের বোতল নিয়ে এসেছে। এক চামচ জল ঝিমলির মুখে দিলেন কৃতান্ত। ঝিমলি জলের বিন্দু শুষে নিল।
ঐশানীর স্পাইক্যামে অবিশ্বাস্য এক দৃশ্যের রেকর্ডিং হচ্ছে। ঝিমলিকে আর এক চামচ জল খাইয়ে কৃতান্ত বললেন, “আর নয়।”
সিস্টার নমিতা আর কৃতান্তর টিম যন্ত্রের মতো কাজ করছে। তার শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি একে একে খোলা হচ্ছে। প্রতি ধাপের শেষে একরাশ টেনশন। কিন্তু ঝিমলির কোনও শারীরিক সমস্যা নেই। কুড়ি বছরের শীতঘুম থেকে উঠেছে চঞ্চল এক শালিক ছানা। রোগা-রোগা, কাঠি-কাঠি হাতে কৃতান্তর কোটের হাতা খিমচে ধরে সে শুধু বলছে, “বাবা কোথায়? বাবা কোথায়?”
ঐশানীর সাংবাদিক সত্তা বলছে, নার্ভ শক্ত রাখো। ইমোশনাল হওয়ার কোনও কারণ নেই। সংবাদ সংগ্রহ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া তোমার কাজ। ঐশানীর ব্যক্তিসত্তা বলছে, তা কী করে হয়? কুড়ি বছর বাদে জ্ঞানে ফিরে আসার পরে ঝিমলি তার বাবার জন্য যে-আকুতি প্রকাশ করছে, তাতে আমি আকুল হব না?
সিস্টার নমিতা এবং কৃতান্ত মিলে চাকা লাগানো রেল্ড কট ঠেলতে ঠেলতে রিকভারি রুমে নিয়ে গেলেন। পাশাপাশি হাঁটছে ঐশানী। আইসিইউতে ভর্তি থাকার পরে যেসব রোগী বিপন্মুক্ত হয়, তাদের রিকভারি রুমে রাখা হয়। এখন এই রুমে ঝিমলি ছাড়া আর কোনও পেশেন্ট নেই।
এই ঘরেও নীলচে আলো জ্বলছে। দু’দিকের খালি বিছানার সারির মাঝখানে ঝিমলির কট ঢোকানো হল। সিস্টার নমিতা ঈষদুষ্ণ গরম জলে ঝিমলির শরীর স্পাঞ্জ করে দিল। গায়ে ছড়িয়ে দিল সুগন্ধী। কৃতান্তকে জিজ্ঞাসা করল, “ফিজিওথেরাপিস্টকে এখন ডাকব?”
“না!” উত্তেজিত হয়ে হাত নাড়েন কৃতান্ত। ঝিমলিকে বলেন, “ডান হাত মাথার উপরে তোল। দেখি পারিস কিনা!”
‘ডান’ শব্দটা শুনে ঝিমলি কনফিউজড! পায়রার মতো ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের দু’দিক দেখছে। বলছে, “ডান… ডান… ডান…”
“অন্য দিকটাকে বলে বাঁ দিক। ডান দিক আর বাঁ দিক। রাইট অ্যান্ড লেফ্ট!” কৃতান্ত এখন ধৈর্যশীল শিক্ষক।
“রাইট অর রং!” মুচকি হাসে ঝিমলি। ডান হাত তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলে, “নাথিং ইজ লেফ্ট।”
“দ্যাট্স নট রাইট,” শিশুর মতো হাসছেন কৃতান্ত। ঝিমলির ডান হাত নিজের হাতে নিয়েছেন। ঝিমলির চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। সে ফিসফিস করে বলছে, “সায়ক কোথায়?”
কৃতান্ত নিরুত্তর। ঝিমলি আবার বলল, “সায়ক কোথায়?”
আত্মবিশ্বাসী, দাম্ভিক, অহঙ্কারী কৃতান্ত এখন শিশুর মতো হয়ে গিয়েছেন। দু’ চোখে জল, ঠোঁটের কোণে অনাবিল হাসি। ঝিমলির আঙুল নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে খেলা করছেন। সদ্যোজাত সন্তানকে প্রথমবার স্পর্শ করার সময় নতুন পিতার চোখেমুখে যে-বিস্ময়, যে-নির্মল আমোদ খেলা করে, সেইসব অনুভূতিমালা আঁকা রয়েছে কৃতান্তর মুখে।
ঐশানী বলল, “ডক্টর চ্যাটার্জি, আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আপনি রেস্টরুমে আসবেন?”
“কল মি ডক্টর চট্টোপাধ্যায়!” ঐশানীর স্পাইক্যামের দিকে তাকিয়ে বললেন কৃতান্ত, “ঝিমলি যদি ফিরে না আসত, তাহলে আমি তোমার সঙ্গে অন্যরকম ব্যবহার করতাম। কিন্তু পাশার দান পালটে গিয়েছে। আই নাও কনসিডার ইউ অ্যাজ লেডি লাক, যার জন্য এই অসম্ভব সম্ভব হল। তুমি কী বলবে বলো। আমি শুনব।”
“আমার পরিচয় আগেই দিয়েছি। আপনি উৎপল বসুমল্লিকের ভেন-এ এয়ার ইনজেক্ট করলেন। দ্যাট মেক্স ইউ আ কিলার। এই নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
কৃতান্ত সিস্টার নমিতাকে বললেন, “আমি আর ঐশানী রেস্টরুমে আছি। এখন আমাদের বিরক্ত করবেন না।”
সিস্টার নমিতা বললেন, “আট নম্বর বেডের ডেথের খবর কি পেশেন্ট পার্টিকে জানিয়ে দেব? বডি হ্যান্ডওভার করতে হবে।”
কৃতান্ত টাই ঠিক করে বললেন, “বডি হ্যান্ডওভার করা যাবে না। আনন্যাচারাল ডেথ যখন, পোস্টমর্টেম হবে। পুলিশকেও ইনফর্ম করতে হবে। কী ঐশানী, তাই তো?”
কৃতান্তর হাবভাব দেখে অবাক লাগছে ঐশানীর। সদ্য মার্ডার করার পরে একটা লোক এত শান্ত, এত ধীরস্থির থাকে কী করে? নিজেই পুলিশ ডাকতে বলছে! এর কি অন্য কোনও প্ল্যান আছে? সুইসাইড করে বসবে না তো? ভিতরে-ভিতরে ঘাবড়ে গেলেও কোনও বহিঃপ্রকাশ নেই ঐশানীর। রেস্টরুমের চেয়ারে বসে বলে, “উৎপল বসুমল্লিক, অশোক লুনিয়া বা নন্দিনী সরকারের মার্ডারগুলো আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?”
“ব্যাখ্যা করব না। জাস্টিফাই করব। এগুলো মার্ডার নয়। আমার আপত্তি আছে। আমি মানুষকে তার কষ্ট থেকে মুক্তি দিই। প্ৰাণ থাকলেই সে মানুষ হয়ে যায় না। তাহলে তো অ্যাবরশনও অপরাধ। কিন্তু ১৮ সপ্তাহ বয়স হওয়ার আগে অ্যাবরশন আইনসম্মত। সেটাও তো প্রাণ নেওয়া। তাই না?”
“সেটা ঠিক করার অধিকার আপনার বা আমার নেই। ভারতীয় সংবিধান, ইন্ডিয়ান পেনাল কোড, সুপ্রিম কোর্ট সেসব ঠিক করে রেখেছে।”
“আইনও সংশোধন হয়। কিছুদিন আগে পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে গিয়ে কেউ ব্যর্থ হলে তার সাজা হত এক বছরের জেল। কেন্দ্রীয় সরকার বিল পাশ করে সে আইন তুলে দিল।”
“আপনি কু-যুক্তি সাজাচ্ছেন। ভারতবর্ষে প্যাসিভ ইউথ্যানেসিয়া আইনি স্বীকৃতি আছে। আপনি যা করছেন, তা কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার।”
“তোমার কথামতো নিষ্কৃতি-মৃত্যুকে আমি হত্যা বলেই সম্বোধন করছি। ঐশানী, তুমি কি জানো, কখনও-কখনও, ফর গ্রেটার গুড়, এই রকমের হত্যার প্রয়োজন আছে? এই হত্যা না হলে, রোগীর বাড়ির লোক পথের ভিখিরি হয়ে যায়। অবসাদ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। সেইসব মৃত্যু হত্যা নয়? তার দায় কে নেবে? আমাদের সোসাইটি? আমাদের সরকার? আমাদের এক্সপেনসিভ হেল্থ সিস্টেম? তুমি?”
“এতই যদি পরোপকারের ইচ্ছা, তা হলে নিজের মেয়ের ইউথ্যানেসিয়া করেননি কেন?”
এই প্রশ্নে কৃতান্ত দমলেন। গভীর শ্বাস নিলেন। হাতের আঙুল চুলের মধ্যে চালিয়ে ব্যাকব্রাশ করলেন, রুমাল দিয়ে মুখ মুছলেন। আত্মদর্পী মুখে সূক্ষ্ম ভাঙাচোরার খেলা শুরু হয়েছে। চোখ সজল হয়ে আসছে। ভিজে গলায় বললেন, “তোমার বাবা তোমাকে ভালবাসেন?”
ঐশানী কৃতান্তর গেমপ্ল্যান বুঝতে পারছে না। ধরা পড়ার পরেও এত কনফিডেন্স কোথা থেকে আসছে। লোকটা তাকে মেরে ফেলার ছক কষছে না তো? ঐশানী কি এখান থেকে পালিয়ে যাবে? না কি, অবিশ্বাস্য এই নিউজ়ের শেষ জানা অবধি দাঁতে দাঁত দিয়ে লড়ে যাবে? লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয় ঐশানী। বলে, “সব বাবাই তাঁর মেয়েকে ভালবাসেন।”
“কলেজে পড়া মেয়ে রেপড হয়ে কোমায় চলে গেছে। মেয়েটার বাবা ডাক্তার। সে তখন কী করবে? নিজে যে আইসিইউতে কাজ করে, সেখানেই ভর্তি করল। আকাশছোঁয়া খরচ সামলাতে গিয়ে পাগলের মতো অবস্থা। আইসিইউ এবং অন্যান্য প্র্যাকটিস থেকে যা রোজগার হয়, তার পুরোটাই বেরিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসা বাবদ। এই সময় তার কাছে একটা অফার আসে। অচেতন এক বৃদ্ধের পুত্র বাবার নিষ্কৃতি-মৃত্যুর জন্য আবেদন করে। মনে রেখো ঐশানী, সেটা ১৯৯৬ সাল। প্যাসিভ ইউথ্যানেসিয়া তখনও এ দেশে লিগ্যাল নয়। আমি সেই রোগী এবং তার পুত্রের যন্ত্রণা লাঘব করলাম। সেই বাবদ সম্মানদক্ষিণা নিলাম। যা পেলাম, তাতে ঝিমলিকে আরও তিন মাস বাঁচিয়ে রাখা গেল। এর মধ্যে আবারও প্রস্তাব এল। এবার সাহস করে আমি ডেথ ফি বাড়ালাম। অবাক কাণ্ড! রোগীর বাড়ির লোক রাজি হয়ে গেল….”
ঐশানীর মোবাইল বাজছে। স্ক্রিনে দেখাচ্ছে, “সীমান্ত কলিং”। কি প্যাডের লাল বোতাম টেপে ঐশানী। সীমান্তর সঙ্গে পরে কথা বলা যাবে। এখন কৃতান্তর কথা শোনা জরুরি।
“অনেক করেছি। আর নয়। উৎপল বসুমল্লিক আমার শেষ ক্লায়েন্ট। আমি আর নিষ্কৃতি-মৃত্যু ঘটাব না। আজ থেকে আমি কনভার্ট। আজ থেকে আমি ইউথ্যানেসিয়া বিরোধী।”
“টাকার প্রয়োজন ফুরল বলে দল বদলালেন?” শ্লেষের সঙ্গে বলে ঐশানী। আবার সীমান্ত ফোন করছে। আবার মোবাইলের লাল বোতাম টিপে ফোন কাটে ঐশানী। বলে, “সারা প্রফেশনাল লাইফ ইউথ্যানেসিয়ার জন্য ওকালতি করে, ইললিগাল অ্যাকটিভ ইউথ্যানেসিয়ার চর্চা করে, ধরা পড়ে যাওয়ামাত্র পালটি খাচ্ছেন? চমৎকার!”
“ওভাবে বোলো না!” কপালে ঘুসি মেরে বললেন কৃতান্ত।
“তাহলে কীভাবে বলব? আপনি এতদিন নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন। ঈশ্বর বা মাদার নেচারের উপহার আমাদের এই প্ৰাণ। এই প্রাণ যিনি দিয়েছেন, তিনিই আবার ফেরত নেবেন। আপনাকে সেই অধিকার কেউ দেয়নি ডক্টর চট্টোপাধ্যায়। অর্থের বিনিময়ে প্রাণ যে নেয়, সে একজন পেশাদার খুনে। সে সাইকোপ্যাথ। সে এই দুনিয়ার সবচেয়ে মারাত্মক সিরিয়াল কিলার। ধরা পড়ে গিয়ে আজ যদি সে বলে, আমি আর খুন করব না, তাহলে তার অপরাধ এক সুতোও কমে না।”
“ওহ! মা গো!” আবার কপালে করাঘাত করেন কৃতান্ত, “তোমার পয়েন্ট অব ভিউতে গন্ডগোল আছে ঐশানী। আমি নিজেকে অপরাধী বলে মনে করি না। আমি কোনও পেশাদার খুনে বা সিরিয়াল কিলার নই। আমি শুধুমাত্র কিছু মানুষকে কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়েছি। হতে পারে তা আমি করেছি অর্থের বিনিময়ে, কিন্তু তার পিছনে একটা দর্শন ছিল। যে-মানুষ কখনও ফিরে আসবে না, তার জন্য অর্থব্যয় করা অর্থহীন। আমার মেয়ে ঝিমলি ২০ বছর বাদে ফিরে এসে দেখাল, আমার দর্শন ভুল। কোটিতে একটা হলেও মানুষ অচেতন অবস্থা থেকে চেতনায় আসে। আবার তার কাছের লোককে চিনতে পারে। আবার ‘বাবা’ বলে ডাকে…” হাউহাউ করে কাঁদছেন কৃতান্ত, “সমস্ত কালোর শেষে আলো থাকে, এই কথা যারা বলত, তাদের আমি হেসে উড়িয়ে দিতাম। বলতাম, ‘এসকেপিস্ট মুভি আর লিটারেচারে ওইসব রাবিশ থাকে। আসলে আমরা সবাই নর্দমার পাঁকে ডুবে আছি। কেউ আগে মরব, আর কেউ পরে,’ কিন্তু আজ আমার ভুল ভাঙল। তুমি আমাকে শাস্তি দাও, ঐশানী। তুমি যা শাস্তি দেবে, আমি মাথা পেতে নেব।”
“আমি আপনাকে শাস্তি দেওয়ার কে? আমি একজন সাংবাদিক। আমার কাজ পাঠকের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়া। সেই কাজ করতে গিয়ে আপনাকে যদি খুনের অপরাধে পুলিশ গ্রেফতার করে, তা হলে আমার কিছু করার নেই,” চেয়ার থেকে উঠে মেয়েদের রেস্টরুমে ঢোকে ঐশানী। ওভারঅল খুলে জিন্স, টিশার্ট, স্নিকার গলিয়ে টি-শার্টের গলায় স্পাই-ক্যাম ঝোলায়। এবার বসকে ফোন করা যাক।
“কী ব্যাপার?” অসহিষ্ণু গলায় বলে তরুণ, “আই সিরিয়াসলি হোপ দ্যাট দিস ফোন কল ইজ় ইম্পর্ট্যান্ট, অ্যান্ড জাস্টিফাইজ ইয়োর রান ফ্রম দ্য অফিস।”
“ডক্টর কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায় সেন্টিনেলের আইসিইউতে উৎপল বসুমল্লিককে মার্ডার করেছেন। মোস্ট প্রোব্যাবলি জনাদেশ পার্টির থেকে টাকা নিয়ে। আমার কাছে ক্রাইম ভিডিয়ো আছে,” বলতে- বলতে ঐশানী খেয়াল করল, আবার সীমান্তর ফোন ঢুকছে। বেচারি অনেকবার ফোন করেছে। এই ফোনটা চুকিয়েই ঐশানী সীমান্তকে ফোন করবে। ও প্রান্তে তরুণ শব্দহীন।
“চুপ কেন বস?” কেটে কেটে বলে ঐশানী, “ডু ইউ থিঙ্ক দিস জাস্টিফাইজ় মাই রান ফ্রম দ্য অফিস?”
“তুই এখন কোথায়? আর ইউ সেফ?” ফিসফিস করে বলে তরুণ।
“তোমার কিল লিস্টে যে-আটজনের নাম আছে, তার থেকে আমার নাম বাদ যাবে কি?”
“তুই কি আমাকে ব্ল্যাকমেল করছিস?”
“না বস। জাস্ট সিকিয়োরিং মাই জব। আমার কাছে এখনও দোদমা রয়েছে। এক নম্বর স্তুপ, ইউথ্যানেসিয়ার নাম করে অন্তত আড়াইশোজন অচেতন রোগীকে হত্যা করেছেন তাদের চিকিৎসক। দু’নম্বর স্কুপ, ২০ বছর পরে কোমা থেকে ফিরলেন এক নারী। যার পিতা ওই চিকিৎসক।”
“তুই এখনও সেন্টিনেলে তো? আমি তোকে আনতে যাচ্ছি।”
আবার একটা ফোন ঢুকছে। কী হল রে বাবা? এতবার কে ফোন করছে? কেন করছে? ঐশানী তরুণকে বলল, “তুমি এখানে আসতে পার।”
“ওকে বাই,” ফোন কেটে দিয়েছে তরুণ। ফোন চোখের সামনে এনে ঐশানী দেখল, শুধু সীমান্তর ফোন থেকেই নয়, অদ্রীশ, প্রতাপ, মালিনী এবং শেলির মোবাইল থেকেও ফোন ঢুকেছে।
ছেলেদের রেস্টরুমে ঢুকে ঐশানী থমকে দাঁড়াল। কৃতান্ত তার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। কানে মোবাইল। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সিস্টার নমিতা। সেও অবাক হয়ে ঐশানীকে দেখছে।
সীমান্তর নম্বর ডায়াল করে ঐশানী। এনগেজ্ড টোন আসছে। ফোন কেটে ঐশানী বলে, “সিস্টার, কী হল? কী দেখছেন?”
সিস্টার নমিতা এখনও ঐশানীর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এক পা এক পা করে সে ঐশানীর দিকে এগিয়ে এল। ঐশানী দেখল, সিস্টার নমিতা কাঁদছে।
“কী হল সিস্টার?” নমিতার কাঁধ ধরে ঝাঁকাচ্ছে ঐশানী। সিস্টার কৃতান্তর দিকে তাকাল। কৃতান্তর চোখেও জল। তিনি বললেন, “হা ঈশ্বর!”
কী ব্যাপার কে জানে! ঐশানীকে এখন কৃতান্তর সঙ্গে আইসিইউ- এর বাইরে যেতে হবে। কৃতান্ত যখন শুক্লাকে বলবেন যে, উৎপল মারা গিয়েছে, সেই মুহূর্তটার রেকর্ডিং চাই-ই চাই। এত বড় একটা সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঐশানী নিজেও এই সংবাদের অংশ হয়ে গিয়েছে। এবার এর থেকে বেরতে হবে। ফিরতে হবে নিজস্ব রুটিনে।
যেভাবে আলিবাবার গল্পে ‘খুল যা সিম সিম’ বললেই ডাকাত সর্দারের গুপ্তধনের গুহার দরজা দু’দিকে সরে যেত, সেইভাবে খুলে গেল আইসিইউ-এর দরজা। ঐশানী দেখল, দু’জন ট্রলিবয় এক রোগীকে নিয়ে ঢুকছে। পিছনে মঞ্জুলা, শেলি আর ইমার্জেন্সির সিস্টার। শুয়ে থাকা মানুষটির গায়ে পাতা লিনেনের গায়ে রক্তের আলপনা।
মঞ্জুলা কৃতান্তকে বললেন, “রোড ট্র্যাফিক অ্যাক্সিডেন্ট। বাইকে আসছিল। একটা ট্রাকের সঙ্গে হেড অন কলিশন হয়েছে। হিউজ ব্লাড লস হলেও বড় চোট নেই। ফ্র্যাকচারও নেই। হি ইজ্ ইন কোমা। সিটি স্ক্যান করে দেখতে হবে ব্রেনে হেমারেজ আছে কিনা!”
আইসিইউ-এর দরজার বাইরে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসার বললেন, “ঐশানী কে?”
“আমি। কেন?” অবাক হয়ে বলে ঐশানী।
“আপনি ফোন ধরছিলেন না কেন? ভিকটিমের মোবাইলের কল লিস্টে ‘লাস্ট ডায়াল্ড নম্বর’ হিসেবে আপনার নম্বর ছিল। ওই মোবাইল থেকে আপনাকে অনেকবার ফোন করেছি। আপনি ফোন ধরলে ভিকটিমকে আইডেন্টিফাই করতে এত সময় লাগত না।”
ভিকটিম! রোড ট্র্যাফিক অ্যাক্সিডেন্ট? কী বলছেন এই পুলিশ অফিসার?
“আলটিমেটলি ভিকটিমের বাবাকে ফোন করে জানতে পারি যে, উনি সেন্টিনেলের মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের ডাক্তার।”
সেন্টিনেলের মেডিসিন ডিপার্টমেেেন্টর ডাক্তার? অসম্ভব! এ হতেই পারে না! ঐশানী আবার ছাতিম ফুলের গন্ধ পাচ্ছে। পায়ে-পায়ে সে ট্রলির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
নীলচে আলোয় রহস্যময় লাগছে সীমান্তর মুখ। তার মাথায় ব্যান্ডেজ, তার কপালে স্টিচ, তার চোখের নীচে রক্ত জমে ব্ল্যাক আই হয়ে রয়েছে, তার নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে অধরে জমে আছে। সে অজ্ঞান। কৃতান্ত আর মঞ্জুলা মিলে গ্লাসগো কোমা স্কেলে সীমান্তর চেতনাহীনতা মাপছেন। কৃতান্ত বললেন, “গ্লাসগো কোমা স্কেলে সাত খুব একটা ভাল স্কোর নয়। আটের উপরে হলে নিশ্চিন্ত হতাম।”
মঞ্জুলা বলল, “কী হবে?”
কৃতান্ত কঠিন গলায় বললেন, “সীমান্ত কোল্যাপ্স করছে। উই শুড পুট হিম ইন ভেন্টিলেটর ইমিডিয়েটলি। সিস্টার, কুইক! বাড়ির লোককে বলুন যে, ব্লাড লাগবে।”
আইসিইউ-এর বন্ধ দরজা ঠেলে ঐশানী বেরিয়ে আসে। বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রতাপ, মালিনী, অদ্রীশ, ভোলাদা, পারুল। ক্যাফে থেকে দৌড়ে এসে তরুণ বলল, “চল। কুইক।”
ঐশানীর চোখ জ্বালা করছে, পায়ের তলার মাটি টলমল করছে, চারিদিক বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। স্পাইক্যাম তরুণের হাতে তুলে দিতে গিয়ে সে মেঝেতে আছড়ে পড়ে গেল। ছাতিম ফুলের গন্ধে নাক ঝাঁ-ঝাঁ করছে।
