তার বিদায়বেলার মালাখানি

তার বিদায়বেলার মালাখানি

সাদা এসইউভি ভিআইপি রোডে পড়তে হাত থেকে আংটি খুলে মালিনীকে দিল ঐশানী। মালিনী বলল, “ফিট করছে, না লুজ?”

“ফিট করেছে। তবে এসব জিনিস পরে রাস্তাঘাটে ঘোরাঘুরি করা যায় না,” জবাব দেয় ঐশানী। তার ভিতরে চাপা টেনশন কাজ করছে। টেনশনের কারণ তরুণের ফোন। আশীর্বাদ পর্ব মেটার পরে ছাদে গিয়ে বসকে ফোন করেছিল ঐশানী! “জরুরি তলব কেন? আমি তো ফার্স্ট হাফে ছুটি নিয়েছি!”

“সেকেন্ড হাফ ক’টায় শুরু হয়?” কাঠখোট্টা প্রশ্ন তরুণের।

“মনে হচ্ছে ঢুকতে দেরি হবে। তুমি যদি বল, তাহলে সিএল নিয়ে নিই?” পালটা চাপ দিয়েছিল ঐশানী। চাপ বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে তরুণ বলে, “ক’টা নাগাদ ঢুকতে পারবি?”

“অ্যারাউন্ড চারটে, “ আধ ঘণ্টা দেরি করে সময় বলেছিল ঐশানী।

“চলে আয়। কথা আছে,” বস লাইন কেটে দিয়েছে। ঐশানী জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, কী কথা? করল না। তরুণকে সে খুব ভাল করে চেনে। কিছুতেই মুখ খুলবে না!

গাড়ির পিছনের আসনে সবাই চুপচাপ। ভোলাদা জানলায় মাথা রেখে নাক ডাকাচ্ছে। প্রতাপ আর মালিনীর সাড়াশব্দ নেই। ঐশানী বলল, “রাজুদা, আমাকে উল্টোডাঙায় নামিয়ে দিয়ে তোমরা বেরিয়ে যাও। আর ভোলাদাকে সামনে বসিয়ে নিও।”

রাজু ঘাড় নেড়ে বলল, “ভোলাদার বউ ব্যাপক রান্না করে!”

ঐশানী মৃদু হেসে বলল, “তুমি ভাল করে খেয়েছ তো?”

“গলা পর্যন্ত।” বাঙ্গুর অ্যাভিনিউয়ের ক্রসিং পেরিয়ে বলে রাজু।

সব্বাই ভরপেট খেয়েছে। ঐশানী অবশ্য একটা কচুরি, একটা আলু আর একটা বিলাসভোগ খেয়েই সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। পারুল দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থাও করেছিল। সেটা ওখানে খাওয়া হয়নি। দুটো বড় টিফিন বাক্স ভরতি ঘি-ভাত, রুইমাছের মাথা দিয়ে সোনামুগের ডাল, ঝিরিঝিরি করে আলুভাজা, তেল কই, রেওয়াজি খাসির কালিয়া আর জলপাইয়ের চাটনি যাচ্ছে তাসের দেশ থেকে খেলাঘরে। অদ্রীশ বারবার আক্ষেপ করছিল, “আপনাদের প্ল্যানিং ভুল। ঐশানীকে ছাড়ার জন্য আপনার গাড়ি চলে যাক। আপনারা থেকে যান। আমি নিজে আপনাদের পৌঁছে দেব।”

মালিনী রাজি হয়নি। বিনয়ের সঙ্গে বলেছে, “অন্য একদিন আসব দাদা! আজ ছেড়ে দিন। সন্ধেবেলা পুরুতঠাকুর আর ডেকরেটরের লোককে ডেকেছি।”

অকাট্য যুক্তি! অদ্রীশ আর জোর করেনি।

“উল্টোডাঙা থেকে কীভাবে যাবি?” জানতে চায় প্রতাপ।

“ট্রেন ধরে দমদম চলে যাব। ওখান থেকে মেট্রোয় ময়দান স্টেশন, “ নিজের রুটম্যাপ জানায় ঐশানী, “আসলে একটা নির্দিষ্ট রুটে যাতায়াত করে বদভ্যাস হয়ে গেছে। অন্য রাস্তায় যাবার কথা ভাবলেই ইরিটেশন হয়।”

“তা বললে চলবে? তোমার জীবন এখন অন্য রাস্তাতেই বইবে। নতুন বাড়ি, নতুন ঠিকানা, নতুন পদবি, নতুন ঘর-গেরস্থালি, নতুন রুটে অফিস যাওয়া…এসব মেনে নিতে হয়। মেয়েদের কোনও বাড়ি থাকে না। কখনও বাপের বাড়ি, কখনও শ্বশুরবাড়ি, কখনও স্বামীর ফ্ল্যাট, কখনও ছেলের আশ্রয়, কখনও বৃদ্ধাশ্রম—এই করে জীবন কেটে যায়,” মন্তব্য করে মালিনী।

“কী সুইট বললে গো!” হাততালি দেয় ঐশানী, “ব্যাকগ্রাউন্ডে বেহালা আর ফ্রুট বাজলে খুব ভাল হত। বাই দ্য ওয়ে, আমি বিয়ের পরে পদবি চেঞ্জ করব না। ফর দ্য টাইম বিয়িং অ্যাড্রেসও চেঞ্জ করব না। তাহলে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট—সব কিছু বদলাতে হবে। সে মহা হ্যাপা!”

উল্টোডাঙা চলে এসেছে। ঐশানী গাড়ি থেকে নামল। ভোলাদা চলে এল রাজুর পাশে। রাজু গাড়ি নিয়ে ফুলবাগানের দিকে ঘুরল। ঐশানী লাফাতে-লাফাতে এগল স্টেশনের দিকে।

*

নিজের ওয়র্কস্টেশনে বসে ঘড়ি দেখল ঐশানী। সাড়ে তিনটে বাজে। খেয়াল করল, লিমার মেশিন শাট ডাউন করা, ড্রয়ারে চাবি মারা। হয় অ্যাসাইনমেন্টে গেছে, অথবা ডুব দিয়েছে। দ্বিতীয়টা যদি সত্যি হয় তাহলে বসের বারবার ফোন করার একটা মানে পাওয়া যায়।

মেশিন অন করে কফি ভেন্ডিং মেশিনের কাছে যায় ঐশানী। কাগজের কাপে আধকাপ কফি ঢেলে ছোট চুমুক দেয়। কড়াইশুঁটির কচুরি খেয়ে পেট ভার লাগছে। বসের ডাকের জন্য অপেক্ষা না করে টর্চার চেম্বারে উঁকি মারে। “আমি এসে গিয়েছি।”

তরুণ মেশিনের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বসে রয়েছে। একহাতে বিশাল বড় এগরোল। অন্য হাতে মোবাইল। সেটা কানে গুঁজে “হুঁ…হ্যাঁ…” বলছে। ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।

ফোন রেখে তরুণ বলল, “উৎপল বসুমল্লিক সেন্টিনেলে ভরতি আছে এটা তুই জানতিস?”

“না…” ফাম্বল করে ঐশানী। উৎপলকে নিয়ে কী একটা কথা অদ্রীশ বলছিল বটে! সীমান্তর প্রেমে ঐশানী এতই বিভোর ছিল যে, খেয়াল করেনি। সীমান্তও বলেনি!

“তুই না জার্নালিস্ট!” বাঘের মতো গর্জন তরুণের, “তোর নাং সেন্টিনেলে আছে। আর আমাকে জনাদেশ পার্টির প্রেস মিট থেকে খবর পেতে হচ্ছে? লোকটার স্ট্রোক হয়েছে। লোকটা ইলেকশন ক্যাম্পেন করছে না। নমিনেশন পেপার জমা হয়ে যাওয়ার পরে, ইলেকশনের আগে ক্যান্ডিডেট কোমায় চলে গিয়েছে। জনাদেশ পার্টি এই তথ্য গোপন রেখেছে। ইট ইজ আ হিউজ নিউজ। আর তুই কিছু জানিসই না? হোয়াট ডু ইউ থিঙ্ক? তোর চাকরি থাকবে?”

“আমি…মানে…আমাকে…”

“আমার কাছে কাঁদুনি গেয়ে লাভ নেই। পিবি হুকুম করেছে। দিস ইজ় ইয়োর লাস্ট অ্যাসাইনমেন্ট। যদি সাকসেসফুল হোস, যার চান্স ওয়ান পার্সেন্ট, তাহলে আমি তোর কজ় নিয়ে পিবিকে পারসু করব। আর যদি ফেল করিস, যেটা তুই করবিই, তাহলে প্যাক ইয়োর ব্যাগ অ্যান্ড লিভ। তোর টারমিনেশন লেটার কম্পোজ করে রেখেছি। এন্টার মারব, আর তোর মেলবক্সে ঢুকবে!”

তরুণের গাঁকগাঁক চিৎকার টর্চার চেম্বারের বাইরে সবাই শুনতে পাচ্ছে। ঐশানীর মাথা ঝনঝন করছে। অপমানে মাথা নিচু করে বসে থাকে সে। ঠোঁটে ঠোঁট টিপে, ভুরু কুঁচকে চোখের জল আটকায়। কান্না মানে দুর্বলতা। অশ্রু দেখে তরুণ হাসবে। এখন তাকে তরবারির মতো ধারালো হতে হবে। হতে হবে লঙ্কার মতো ঝাঁঝালো।

চাকরিটা রাখতে হবে অ্যাট এনি কস্ট। কিন্তু তার আগে বসকে সামলাতে হবে। খানিকটা গরমে। অনেকটা নরমে। ডিপ ব্রিদ করে ঐশানী। রাগলে চলবে না। তবে রাগের অভিনয় করতে হবে।

তর্জনী তুলে ঐশানী বলে, “এক নম্বর কথা। বিশাখা গাইডলাইন মনে করিয়ে দিচ্ছি। ‘নাং’-এর মতো শব্দ যেন ফারদার না শুনি। এক্ষুনি বলো যে, অন্যায় করেছ। ওয়র্কপ্লেসে মেয়েদের সঙ্গে এইভাবে কথা বলা যায় না!”

তরুণ অবাক হয়ে দেখছে। রোলে কামড় দিয়ে বলল, “সরি!”

ঐশানী বলল, “অন্যায় করার পরে লোকে দাঁত বের করে ‘সরি’ বলে। অনেকদিন ধরে এর একটা জুতসই উত্তর খুঁজছিলাম। এক্ষুনি পেয়ে গেলাম।”

প্রসঙ্গ বদলে যাওয়ায় তরুণ অবাক। বলল, “একটা তো আছে। ‘সরি ওন্ট মেন্ড ইট’।”

ঐশানী বলল, “ওটা পুরনো হয়ে গিয়েছে। নতুন উত্তরটা শুনে নাও,” তরুণের দিকে আঙুল তুলে বলল, “ইউ উইল বি সরিয়ার। ইট্স আ প্রমিস!”

তরুণ রোল চিবোতে গিয়ে বিষম খেল, হো হো করে হাসল, তারপর কাশতে কাশতে বলল, “তোর ওই বিশাখা, ললিতা, সুদামা, আয়ান ঘোষ, কোনও গাইডলাইন দিয়ে আমাকে ‘সরিয়ার বা ‘সরিয়েস্ট’ করতে পারবি না। পিবি বলেছে, ইনএফিশিয়েন্টদের ছাঁটতে হবে। দিল্লি অফিসের অর্ডার। একে পিঙ্ক স্লিপ ধরানো বলতে পারিস। বিল্বপত্তর শোঁকানো বলতে পারিস। ডাউনসাইজিং বলতে পারিস। রি-স্ট্রাকচারিং বলতে পারিস। আমি আটজনের একটা লিস্ট বানিয়েছি। নাম দিয়েছি ‘কিল লিস্ট’। দুঃখজনকভাবে লিস্টে তোর নাম আছে। এখন দায়িত্ব তোর ঘাড়ে। নিজেকে এই লিস্টের বাইরে বের কর। প্রমাণ কর, ইউ আর ওয়র্থ ইয়োর টেক হোম স্যালারি। এ তো সরকারি চাকরি নয় যে, কাজ না করলেও মাইনে হবে। এটা প্রাইভেট সেক্টর। এখানে মাইনে উপার্জন করতে হয়। বুঝলি মিস বিশাখা?”

“লিমা কোথায়?” তরুণের কথায় পাত্তা না দিয়ে জানতে চায় ঐশানী।

সারকাজমের হাসি হেসে তরুণ বলে, “সেন্টিনেলে, অবভিয়াসলি! এত বড় একটা কাণ্ড ঘটেছে, যেটা হেল্থ রিলেটেড সেখানে লিমা তোর মতো অফিসে বসে থাকবে নাকি! শি ইজ আ স্মার্ট গার্ল। ওর নাম কিল লিস্টে নেই।”

“হেল্থ বিটে একজন রিপোর্টার দিয়ে কাগজ চলবে?” আবার রেগে গিয়েছে ঐশানী।

“চলছে তো! তুই কোন কাজটা করছিস আমায় বলবি?”

“ফরগেট ইট! লিমাকে কী দায়িত্ব দিয়েছ?”

“উৎপলের হেল্থ কন্ডিশন। কবে হল, কী হল, কী ভাবে সেন্টিনেলে গেল, এখন কেমন আছে, এইসব। আমি জানি যে, এই খবর তুই এক ফোনে জেনে যাবি, তাই তোকে এর বাইরে রেখেছি।”

“এটা পার্শিয়ালিটি। এটা ইচ্ছে করে আমার হাত পা বেঁধে দেওয়া, আপত্তি করে ঐশানী।

“এটা পার্শিয়ালিটি নয় মিস ললিতা…” ঠান্ডা গলায় বলছে তরুণ, “একে বলে জঙ্গলের রাজত্ব। একে বলে ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’। আমার ভূমিকা নাৎজি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সেই ইহুদি জহ্লাদের মতো, যার কাজ হল প্রতিদিন একশো ইহুদিকে হত্যা করা। সংখ্যাটা কমে নিরানব্বই হলেই আমার ঘাড়ে কোপ পড়বে। বাঁচার জন্য আমাকে খুন করতে হয় মিস সুদামা! সেন্টিনেলের আইসিইউ নিয়ে স্টোরির কী ডেভেলপমেন্ট? লিমা তো মুখ খুলছে না!”

“এই নিয়ে পরে কথা বলব,” কথা ঘোরায় ঐশানী। শেলির স্পাই ক্যামের ছবি থেকে অনেক কিছু জানা গিয়েছে। কিন্তু আরও অনেক কিছু জানা বাকি। ইস্কাবনের টেক্কা এখন আস্তিন থেকে বের করতে চায় না ঐশানী। টর্চার চেম্বার থেকে বেরনোর সময় শুনতে পায়, তরুণ নিজের কম্পোজ় করা মেলটা পড়ছে, “অ্যাই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি টু সে দ্যাট ইয়োর সারভিস ইজ় নো লঙ্গার রিকোয়ার্ড। প্লিজ় কনট্যাক্ট এইচ আর ডিপার্টমেন্ট।”

বাকিটা না শুনে স্টেশনে ফেরে ঐশানী। সীমান্তকে ফোন করতে হবে।

*

সীমান্তকে তিনবার ফোন করল ঐশানী। তিনবারই রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। কী করবে বুঝতে না পেরে মেশিন অন করছে ঐশানী, এমন সময় সীমান্তর ফোন। মোবাইল কানে দিয়ে ঐশানী বলল, “ফোন ধরলে না কেন?”

“ঘুমোচ্ছিলাম পুঁটুরানি। ভালমন্দ খাওয়ার পরে একপ্রস্থ ভাতঘুম না দিলে চলে? তা ছাড়া আজ নাইট ডিউটি আছে। সারা রাত জাগতে হবে।”

সীমান্ত নিজেই বিষয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ায় খুশি হল ঐশানী। বলল, “উৎপল বসুমল্লিক সেন্টিনেলে ভরতি আছে এই কথাটা আমায় বলনি তো!”

সামান্য থমকায় সীমান্ত। সদ্য ঘুম ভাঙায় রিফ্লেক্স ঢিলেঢালা। চিন্তাভাবনা গুছিয়ে নিয়ে বলল, “ডাক্তার ও রোগীর মধ্যেকার কথাবার্তা সবার সঙ্গে শেয়ার করার জন্য নয়। দিস ইজ় প্রিভিলেজ্ড ইনফর্মেশন।”

সীমান্তকে থামিয়ে ঐশানী বলে, “তুমি অতীতে আমাকে নন্দিনী সরকারের কথা বলেছ।”

সীমান্ত বলে, “জনাদেশ পার্টির মনোময় দাশ সেন্টিনেলে এসে ক্যাটিগরিকালি আমাদের বারণ করে গিয়েছেন যাতে আমরা উৎপল সম্পর্কে কোথাও মুখ না খুলি। ম্যানেজমেন্টের তরফে মঞ্জুলা সবাইকে এই কথা বলেছে। জনাদেশ পার্টি ইজ ইন পাওয়ার। রাষ্ট্রের কথা না শুনলে গর্দান যাবে।”

“তোমার যুক্তি মেনে নিলে সবাই সব জানল কী ভাবে?”

“সেন্টিনেলের তরফে কোনও প্রেস বিজ্ঞপ্তি করা হয়নি ঐশানী। এটা জনাদেশ পার্টি প্রেস মিট করে জানিয়েছে।”

“ও…” চুপ করে যায় ঐশানী।

“এনি প্রবলেম, পুঁটুরানি?” জানতে চাইছে সীমান্ত। জীবনের অভিজ্ঞতা ঐশানীকে শিখিয়েছে, এমন অনেক কথা আছে, যা কারও সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। বাবা-মা বা প্রেমিকের সঙ্গেও না। অফিসের জটিলতা কি সীমান্তর সঙ্গে শেয়ার করা যায়? ঐশানী সন্তর্পণে বলল, “হালকা একটা প্রবলেম।”

“কী ব্যাপার পুঁটুরানি? ঝেড়ে কাশো!”

“আমার চাকরিটা বোধহয় থাকবে না…”

“বাঁচা গিয়েছে। ওরকম ঢপের চাকরি করার থেকে না করা ভাল!”

“পুচুসোনা!”

“ঢপের চাকরিকে ঢপের চাকরি বললেই দোষ! আচ্ছা, আমার ঘাট হয়েছে। সরি। কে তোমার চাকরিতে থাবা বসাচ্ছে শুনি! আমি তোমার অফিসে গিয়ে তার গুষ্টি উদ্ধার করে আসছি।”

“ব্যাপারটা ওরকম নয় পুচুসোনা। আমাদের পেশায় কাটথ্রোট কম্পিটিশন। কাজে একটু ঢিলে দিয়েছ কি অন্য একজন তোমার ঘাড়ে পা দিয়ে উপরে উঠে যাবে।”

“তুমি আবার কাজে ঢিলে দিলে কোথায়? ক’দিন আগেই তো নন্দিনীকে নিয়ে এক্সক্লুসিভ খবর করলে। তোমার বসের কি মেমরি লস হয়েছে? অশোক লুনিয়া মারা যাবার পরে সিস্টার নমিতাকে পর্যন্ত পটিয়ে ফেলেছ! সে-ও এখন তোমার দলে।”

সীমান্তর মুখে কথাটা শুনে মৃদু হাসল ঐশানী। অশোকের মৃত্যুর দিন কৃতান্তর সঙ্গে লিফটে চেপে একতলায় নেমে আসার পরে আবার সে সাততলায় উঠেছিল। শেলির সঙ্গে ঢুকেছিল আইসিইউতে।

সিস্টার নমিতাকে কনভিন্স করতে ঐশানীর কোনও প্রবলেমই হয়নি। মহিলা নিজেই আত্মগ্লানিতে ভুগছে। শেলির মুখে যখন জানল যে, কৃতান্তর মানুষ মারার কারবারের কথা ঐশানী জেনে গিয়েছে, তখন হাতজোড় করে বলল, “ডক্টর চট্টোপাধ্যায় আমার বস। একই সঙ্গে আমার স্বামীর বন্ধু। তাই কিছু করতে পারছি না। না হলে কবেই পুলিশে খবর দিতাম।”

“দেননি কেন? আপনি নিজেও তো ফাঁসবেন, “ ধমক দিয়েছিল ঐশানী।

“আমার বরও তাই বলে। এঁকে অনেকবার বারণও করেছে কিন্তু উনি কি শোনার পাত্র? তা ছাড়া উনি মেয়েকে এত ভালবাসেন যে মায়া হয়।”

“মায়া পরে করবেন। আগে নিজেকে বাঁচান,” সিস্টার নমিতাকে বলেছিল ঐশানী, “এখন আমার প্ল্যানটা শুনুন। খুব মন দিয়ে শুনুন। পরে হয়তো আর বলার সুযোগ পাব না।”

সিস্টার নমিতার প্রসঙ্গ মাথা থেকে তাড়ায় ঐশানী। এখন ওসব ভাবার সময় নয়। সীমান্ত তার পেশা নিয়ে কিছু কথা বলেছে। তার উত্তর দিতে হবে।

ঐশানী বলে, “নন্দিনী এখন অতীত পুচুসোনা। অমল সরকার ছাড়া আর কেউ তাকে মনে রাখেনি। খবরের কাগজের আয়ু বেলা ১১ টা পর্যন্ত। তারপর তাকেও আর কেউ মনে রাখে না। ওসব বাদ দাও। আমাকে একটা কথা বলো! বিয়ের প্রসঙ্গ মাথায় ঢোকার পরে আমি কি কমপ্লেসেন্ট হয়ে গিয়েছি? আমার কি কাজে মনোযোগ কমে গিয়েছে?”

“সেটা আমারও হয়েছে পুঁটুরানি, “ লজ্জা-লজ্জা গলায় বলে সীমান্ত, “উষ্টুম ধুষ্টুম স্বপ্ন দেখছি। যার কোনও মাথামুন্ডু নেই। কখনও দেখছি তোমার সঙ্গে মাসকাবারি বাজার করতে শপিং মলে গিয়েছি। কখনও দেখছি, দু’জন মিলে গোয়া বেড়াতে গিয়েছি। কখনও দেখছি তুমি প্রেগন্যান্ট। কখনও দেখছি আমাদের গুবলু-গুবলু দুটো বাচ্চা হয়েছে!”

সীমান্তর কথা শুনে ঐশানীর গালে লাল আভা। কান গরম! সে বলল, “ক্যান ইউ ইমাজিন, আমার চাকরি খাবার জন্য বস ছুরিতে শান দিচ্ছে, আর আমি তোমার সঙ্গে সিলি সমস্ত বিষয় নিয়ে কথা বলছি। উফ! লভ ইজ্ সাচ আ হরিবল থিং!”

“উফ! তোমার কথা শুনে আয়্যাম ফিলিং টেরিলি হর্নি! আবার তোমাকে হরিদাসীর গুপ্তকথায় দেখতে ইচ্ছে করছে!”

“উম্‌ পুচুসোনা!” মোবাইলে চুমু খায় ঐশানী।

সীমান্ত বলে, “প্রেম ব্যাপারটা নেচারের চক্রান্ত। একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে কাছাকাছি রাখলে শরীর থেকে নানা নিউরো- ট্রান্সমিটার আর হরমোন বেরোয়। জন্তুজানোয়ারের ক্ষেত্রে মেটিং ডান্স হয়। সিংহ কেশর ফুলিয়ে ঘোরে, ময়ূর পেখম তুলে নাচে, কোকিল কুহু কুহু ডাকে, আর মানুষ প্রেম করে। বছরখানেক এক ছাদের তলায় থাকলেই সব প্রেম উড়ে যায়। তখন বাচ্চাকাচ্চা, কাঁথাকানি, রেশনবাজার নিয়ে দু’জনেই ব্যতিব্যস্ত!”

“কাকু তো সেটাই বলছিলেন। বিরহই নাকি আসল প্রেম! দূরত্বই নাকি ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়।

“উম্‌ম! পুঁটুরানি, আমার খুব বিরহ পেয়েছে।” ফোনে পুচুত করে চুমু খেল সীমান্ত। ঐশানী চোখের কোণ দিয়ে দেখল, লিমা নিজে আসনে বসল। ঐশানী বলল, “উই উইল টক লেটার। ওকে?”

“আশেপাশে লোক চলে এসেছে পুঁটুরানি? পুচুত!” সীমান্ত নাছোড়। এক পায়ের উপরে অন্য পা রেখে ঐশানী বলল, “ইয়াপ দ্যাট্স রাইট!”

“একটা হামি দাও। পিলিজ।” খুকখুক করে হাসছে সীমান্ত। ঐশানী বলল, “বাই দেন। কিপ ইন টাচ!” তারপর ফোন কাটল।

লিমা মেশিন অন করে কপি লিখতে শুরু করেছে। মোবাইলের ইয়ারফোন কানে লাগিয়ে ইন্টারভিউ শুনছে আর ঝড়ের গতিতে লিখছে। ক্যামেরা থেকে একগাদা ছবি ট্রান্সফার করল মেশিনে। দু’- তিনটে ছবি বেছে নিয়ে চিফ ফোটোগ্রাফারের কাছে পাঠাবে। চিফ ফোটোগ্রাফার যে-ছবিটা অ্যাপ্রুভ করবে, সেটা স্ক্যানে পাঠাবে। পাতা সাজানোর কাজ শুরু হবে তারপর

সাতদিন আগে স্টেরিলাইজেশন ক্যাম্পে বন্ধ্যাকরণ করতে গিয়ে পাঁচজন বউ মরে গিয়েছে। গতকাল ছানি কাটাতে গিয়ে পঞ্জাবে ৬০জন অন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফ্রি ক্যাম্পের যৌক্তিকতা নিয়ে কপি লিখতে বসল ঐশানী। মেটিরিয়াল রেডি আছে, ঝটপট নেমে যাবে।

লেখা থামিয়ে, কান থেকে ইয়ারফোন খুলে লিমা হঠাৎ বলল, “তোকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।”

“মানে!” অবাক হয়ে বলল ঐশানী।

লিমা বলল, “একটা ক্লিশেড কমেন্ট আছে। ইনার গ্লো। তোকে দেখে কথাটা মনে পড়ল। আজ তোর চোখমুখ ঝকঝক করছে। ইউ আর লুকিং ফ্যাব!”

ক্যালকাটা সিটিজেনে এতদিন চাকরি করার পরে প্রশংসা বা নিন্দা, দুটোকেই সন্দেহের চোখে দেখে ঐশানী। সে জানে, সমস্ত কথার পিছনে উদ্দেশ্য থাকে। ভাল হোক বা খারাপ, উদ্দেশ্য থাকেই। লিমার কমপ্লিমেন্টের পিছনেও উদ্দেশ্য আছে। সেটা কী, জানার চেষ্টা না করে ঐশানী লিখতে লাগল।

“কী লিখছিস?” একটু বাদে প্রশ্ন লিমার।

“রুটিন,” জবাব দেয় ঐশানী। কি বোর্ডের টরেটক্কা থামিয়ে লিমা বলল, “উৎপলকে নিয়ে কাজ দেয়নি?”

“না।”

“দেওয়া উচিত ছিল। তুই নন্দিনীকে নিয়ে অত ভাল কপি করলি। তারপরে এটা আমার ঘাড়ে চাপানো ঠিক হয়নি। দিস ইজ নট মাই কাপ অফ টি,” হাই তোলে লিমা।

কোলিগের মতলব ঐশানীর কাছে জলের মতো স্বচ্ছ। বোঝাই যাচ্ছে, লিমা কোনও জম্পেশ স্কুপ জোগাড় করেছে। তার কৃতিত্বে ঐশানী যেন ভাগ না বসাতে পারে, সেইজন্য ভুলভাল বকছে।

ঐশানী বলল, “ন্যাকামো করছিস কেন? বস কাজটা তোকে করতে দিয়েছে। আমাকে নয়। আর তার কারণটাও জলের মতো পরিষ্কার। এই কাজটা আমি তোর থেকে একশো গুণ বেটার করতে পারতাম। কিন্তু বস সেটা চায় না।”

“ডোন্ট ক্রস ইয়োর লিমিট!” কপি লেখা বন্ধ করে তর্জনী তুলেছে লিমা, “বস এই কাজটা আমায় দিয়েছে কেন না তুই একটা লেজি বাম! তোর কোনও অ্যাম্বিশন না থাকতে পারে। কিন্তু আমার আছে। আগামী পাঁচবছরের মধ্যে ওই টর্চার চেম্বারের চেয়ারে আমি নিজেকে দেখতে চাই। আগামী ১০ বছরের মধ্যে নিজেকে এডিটরের চেয়ারে দেখতে চাই। ওখানে পৌঁছনোর জন্য যা-যা করার দরকার, আমি সব করব।”

“এ আর নতুন কথা কী?” ঠান্ডা গলায় বলে ঐশানী, “পিজির ভাড়া যাতে না বাড়ে, সেটা অ্যাশিয়োর করার জন্যে বাড়িওয়ালার সঙ্গে রেগুলার শুচ্ছিস। তোর অ্যাম্বিশন নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই।”

“আমাকে তাহলে ঠিকই চিনেছিস!” উত্তেজনায় লিমার নাকের পাটা ফুলে গিয়েছে। গলার পেশি শক্ত। রগের শিরা দপদপ করছে। গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “তোর মতো কামচোর, অলস, লেজি, ওয়র্থলেস, ফালতু কোলিগকে ছেঁটে ফেলতে আমার এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না। ইউ আর গন ঐশানী। জাস্ট গন!”

প্রশংসার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল। গালাগালির পিছনেও উদ্দেশ্য আছে। ঐশানী ঠান্ডা মাথায় ভাবার চেষ্টা করে লিমার আসল প্ল্যান কী? ও কি ঐশানীকে রাগাতে চাইছে?

ঐশানী মুচকি হেসে বলল, “টিভি সিরিয়ালের ভ্যাম্পের মতো জঘন্য ডায়লগ দিচ্ছিস কেন? মন দিয়ে নিজের কাজ কর। আমার মনটা আজকে খুব ভাল। তুই চেষ্টা করেও আমাকে রাগাতে পারবি না।”

লিমা মন দিয়ে ঐশানীকে দেখল। গালে হাত দিয়ে বলল, “মাই গড! ইনার গ্লো এই কারণে? আর ইউ ইন লাভ?”

লিমাকে উসকে দিয়ে ঐশানী আর তার দিকে তাকাচ্ছে না। নিজের মেশিনে ঝড়ের গতিতে টাইপ করছে। কিন্তু লিমার কৌতূহল শেষ হয়নি। “ইউ হ্যাড সেক্স টুডে?”

দু’জনের কেউ খেয়াল করেনি যে, তাদের কথার মধ্যে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে তরুণ। কড়া কফির গন্ধ পেয়ে লিমা তাড়াতাড়ি কানে ইয়ারফোন লাগাল। ঐশানী মনিটরের দিকে তাকাল।

তরুণ বলল, “লিসন এভরিবডি! মোহনপুরের বাই ইলেকশন নিয়ে নতুন ক্রাইসিস দেখা দিয়েছে। জনাদেশ পার্টির প্রার্থী উৎপল বসুমল্লিক নার্সিংহোমে ভর্তি ছিলেন, এটা আজ লোকে জেনেছে। নতুন দলের স্বাগত সরকার তারপরে প্রেস মিট করে বলেছেন যে, প্রার্থীর স্বাস্থ্যের অবস্থা গোপন করে জনাদেশ পার্টি ভোটদাতাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। স্বাগত হুমকি দিয়েছেন, এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে ভোটদাতারা মৃতপ্রায় উৎপলের জামানত জব্দ করুক।”

মহাকরণ বিটের অতনু বলল, “উৎপল বেঁচে থাকলে ভোট হবে, সেটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু বাই ইলেকশনের আগে উৎপল যদি মারা যান, তা হলে কী হবে?”

“গুড কোশ্চেন।” অতনুর পিঠ চাপড়ে দিল তরুণ, “তা হলে বাই ইলেকশন ক্যানসেল হয়ে যাবে। নতুন করে ভোট হবে। জনাদেশ পার্টি কোনও ইয়ং ক্যান্ডিডেট দাঁড় করাবে। উৎপলের জন্যে সিমপ্যাথি ওয়েভ থাকবে। মোস্ট প্রোব্যাবলি জনাদেশ পার্টি জিতে যাবে।”

“অর্থাৎ স্বাগত সরকারের প্রেস মিট আসলে আকুতি। যেন ইলেকশন ক্যানসেল না হয়,” বলে অতনু, “উৎপল যদি বেঁচে থাকেন তা হলে অ্যাডভান্টেজ নতুন দলের। উৎপল যদি মারা যান, তা হলে অ্যাডভান্টেজ জনাদেশ পার্টির। মোহনপুরের বাই ইলেকশন জমে গেল।”

“একদম!” টেবিলে ঘুসি মারে তরুণ, “একদল চাইছে, উৎপল মরুক। আর একদল চাইছে, উৎপল বাঁচুক। আর যাকে নিয়ে এত কথা, সে লোকটা বাঁচা আর মরার মাঝখানে ঝুলে রয়েছে।”

লিমা বলল, “আমার কপির ভ্যালু কমে গেল। আমি স্বাগতর ইন্টারভিউ করেছিলাম।”

তরুণ বলল, “লিমা, আই নিড দ্যাট কপি অ্যাজ় রেগুলার নিউজ আইটেম। ওটা কমপ্লিট কর। বাকিদের জন্যে বলছি, কনটেক্সট বদলে গিয়েছে। ফ্রন্ট পেজও বদলাবে। সবাই আমার ঘরে চলে আয়। মিটিং করব। আর ঐশানী…

ফ্রি ক্যাম্পে বন্ধ্যাকরণ আর ছানি অপারেশনের জটিলতা নিয়ে কপি লিখতে-লিখতে ঐশানী তরুণের দিকে তাকায়। বস এখন কী বলবে?

তরুণ বলল, “তুই সেন্টিনেলে বেরিয়ে যা। ফারদার ডেভেলপমেন্ট মেল করবি। আজ রাতে বাড়ি ফেরা হবে না।

যা শোনার, ঐশানী শুনে নিয়েছে। মনের মধ্যে অঙ্ক মেলাচ্ছে। জনাদেশ পার্টির চাহিদা পূরণ করতে হলে উৎপলকে মরতে হবে। সেক্ষেত্রে ডক্টর ডেথের ভূমিকা ভাইটাল। এত দিনে ঐশানী কৃতান্তকে বাগে পাবে।

ঐশানীর মাথায় রক্ত চলাচল বেড়ে গিয়েছে। সারাদিন ধরে ‘ভাল লাগা’ আর ‘মন্দ লাগা’-র ঢেঁ-কুচকুচ খেলায় ‘ভাল লাগা’ আবার উপর দিকে। ক্যালকাটা সিটিজেনের এই ক্রাইসিসে ঐশানী বস আর কোলিগের কাঁধে কাঁধ দিয়ে লড়বে। চাকরি থাকবে কি থাকবে না, সেটা এখন সেকেন্ডারি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *