যে পথে যেতে হবে, সে পথে তুমি একা
গুবগুব করে পায়রা ডাকছে। ঘুম ভেঙে যাওয়ায় চাদরের থেকে হাত বের করে মোবাইলে সময় দেখলেন কৃতান্ত। সাড়ে পাঁচটা বাজে। মোবাইলের স্ক্রিন জানাচ্ছে, আজ ১৩ নভেম্বর, শুক্রবার।
ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ। বিছানায় শুয়ে আড়মোড়া ভাঙলেন কৃতান্ত। চাদরের ওমে শরীর গরম হয়ে রয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উত্তেজনা। কৃতান্ত জানেন, তাঁর শরীরে এখন অ্যাড্রিনালিন হরমোনের ক্ষরণ হচ্ছে পুরোদমে। কানের লতি ঝাঁ-ঝাঁ করছে। গাল গরম, পাল্স চলছে দ্রুত।
বিছানা থেকে ওঠেন কৃতান্ত। অন্ধকারে হাতড়ে আলমারি থেকে বের করেন লাল ল্যাঙোট। নগ্ন শরীরে ল্যাঙোট জড়িয়ে ঠান্ডায় হি-হি করে কাঁপতে থাকেন। অ্যাড্রিনালিনে সিক্ত শরীর এতক্ষণে কাবু হয়েছে। ইজ়েলের পাশ থেকে গমের দানা ভরতি কাচের বাটি আর একটা খালি বাটি নিয়ে ছাদের দিকে এগোলেন। এখন তাঁর ব্যায়াম করার সময়। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, কখনওই ব্যায়ামের রুটিনের হেলদোল হয় না।
নোংরা, সিমেন্ট-চটা, দাঁত বের করা সিঁড়ি টপকে দোতলার ছাদে পৌঁছলেন কৃতান্ত। বিশাল বড় ন্যাড়া ছাদ। নোংরা হলেও একটা কোণ সাফসুতরো। এইখানে তিনি রোজ ব্যায়াম করেন। বিভিন্ন ওজনের ডাম্বেল ও বারবেল রাখা রয়েছে। আছে শক্তপোক্ত একটি বেঞ্চি।
বেঞ্চির উপরে বাটি রেখে ছাদে গমের দানা ছড়িয়ে দিলেন। আশপাশ থেকে পায়রার দল পাখা ঝাপটে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কৃতান্ত খালি হাতের ব্যায়াম শুরু করলেন। আকাশ এখনও অন্ধকার। নিমতলা ঘাট থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠে চারপাশ আরও অন্ধকার করে দিচ্ছে।
পনেরো মিনিটের ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ় শেষ। আর এক মুঠো গমের দানা ছড়িয়ে শুরু করলেন ডাম্বেল ও বারবেল নিয়ে কসরত। দাঁড়িয়ে, বেঞ্চিতে বসে, শুয়ে ব্যায়াম। শেষ করতে লাগল আধঘণ্টা। অল্প হলেও অন্ধকার কেটেছে। ছাদময় একগাদা পায়রা বকবকম করে গমের দানা খাচ্ছে আর ঘাড় ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাদা রঙের একটা গেরোবাজ খুব দাদাগিরি করছে। একে তাকে ঠুকরে নিজেই সব খেয়ে নিচ্ছে। ব্যাটা বদের ধাড়ি! আর এক মুঠো গমের দানা ছড়িয়ে বাটি খালি করলেন কৃতান্ত। অন্য বাটিটা পাশে পড়ে রয়েছে।
এবার পরের রাউন্ড। টানা ২০০টি ডন ও বৈঠক দিয়ে আজকের মতো ব্যায়াম শেষ। ল্যাঙোট পরে ছাদে আসার সময় ঠান্ডায় কাঁপছিলেন কৃতান্ত। এখন ঘেমেনেয়ে স্নান করেছেন। শরীর আবার গরম।
আশেপাশে তাকালেন কৃতান্ত। অন্ধকারে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে একের পর এক বাড়ি। গেরস্থরা ভোরঘুমে আচ্ছন্ন।
মুখ দিয়ে চুকচুক আওয়াজ করে পায়রাগুলোর দিকে এগোলেন কৃতান্ত। তাঁকে দেখে একটা পায়রাও পালাল না। এই লোকটাকে তারা চেনে। এ রোজ ভোরবেলা তাদের দানা খাওয়ায়।
গেরোবাজটার কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে কৃতান্ত বললেন, “আয়…”
দানায় ঠোক্কর মেরে, ঘাড়ের পালক ফুলিয়ে, বকম বকম আওয়াজ তুলে জীবনের শেষ কয়েক পা হাঁটল গেরোবাজ। ঝটপট ডানার শব্দ। সাদা পালকের ঝরে পড়া। কট করে আওয়াজ। কেউ কিছু বোঝার আগেই পঞ্চাশ ষাটটা পায়রা ডানা ঝাপটে ভোরের আকাশে উড়ে গেল।
গেরোবাজের মুন্ডু একদিকে পড়ে রয়েছে। পুঁতির মতো চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আছে। মুন্ডুহীন ধড় কৃতান্তর হাতে। যেভাবে বোতল উলটে জল ঢালে, সেইভাবে ধড়টি উলটে ফাঁকা কাচের বাটিতে রক্ত সংগ্রহ করছেন কৃতান্ত। বাটিতে এক চিমটে অ্যান্টি কোঅ্যাগুলেন্ট পাউডার দেওয়া আছে। এ এমন এক রাসায়নিক পদার্থ, যা রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না।
পেইন্টিং-এর জন্য লাল রং সংগ্রহ করে, কাচের বাটি দুটো নিয়ে নীচে নামলেন কৃতান্ত। রানির ঘরে ধাক্কা দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেন। রানি এই ধাক্কার মানে বোঝে। সে এখন গেরোবাজের মুন্ডু আর ধড় ছাদ থেকে নিয়ে আসবে। পলিথিনের প্যাকেটে ভরে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে। প্রতি মাসেই এই কাজ তাকে দু’বার করতে হয়।
কৃতান্ত স্নানে ঢুকলেন সাড়ে ছ’টায়। ধবধবে সাদা পাজামা আর কুচকুচে কালো পাঞ্জাবি পরে ফ্রেশ হয়ে বেরোলেন সওয়া সাতটায়। রানি এককাপ চা আর খবরের কাগজ রেখে গিয়েছে। কাগজ পরে পড়লেও চলবে। এখন ছবি আঁকার সময়।
গতকাল বিকেল থেকে একটা কম্পোজিশন মাথায় ঘুরছে। উজ্জ্বল হলুদ রঙের সর্ষেখেত দেখতে পাচ্ছেন কৃতান্ত। নীল আকাশ দেখতে পাচ্ছেন। আর কিছু? কোনও স্ট্রাকচার? কোনও হিউম্যান বিয়িং? নাহ! আর কিস্সু নয়।
অ্যাকোয়ামেরিন ব্লু-এর টিউব থেকে প্যালেটে তেল রং ঢাললেন কৃতান্ত। অন্যদিন সাদা কাগজে জটিংস করে নেন। অনেক সময় চারকোল বুলিয়ে প্রাথমিক ধারণাটুকু ফুটিয়ে তোলেন। আজ সে সব ভাল লাগছে না। আজ ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ।
নীল আকাশ তো হল। এবার? তুলি বদলালেন কৃতান্ত। চওড়া ব্রাশের বোল্ড স্ট্রোকে এঁকে ফেললেন সর্ষেখেত। এ তো ক্যালেন্ডার আর্ট! সুখী-সুখী, খুশি-খুশি, কিউট-কিউট!
একটা সরু তুলি রক্তে ডোবালেন কৃতাত্ত। নীল আকাশের এক কোণে আঁকলেন একটা তক্ষক। বৃষ্টির ফোঁটার মতো সে সর্ষেখেতের দিকে নেমে আসছে। আঁকলেন গোসাপ, আঁকলেন সাপ, আঁকলেন শুঁয়োপোকা, কেন্নো, টিকটিকি, গিরগিটি। ক্যানভাসে এখন লাল রঙের বৃষ্টি। সরীসৃপেরা নেমে আসছে! সর্ষেখেত ভেদ করে তারা ঢুকে যাচ্ছে মাটির গভীরে।
প্রকৃত শিল্পীর মতোই থামতে জানেন কৃতান্ত। আঁকা শেষ করে খানিকটা দূরে গিয়ে ফ্রেমটা দেখলেন। এই নৈরাজ্য ও নীলিমা তাঁর মনমতো। এক কোণে সই করলেন। ‘কৃ চ’। স্বাক্ষর ছাড়া শিল্পের কী দাম? নিজের প্রতিটি শিল্পকর্মে স্বাক্ষর করেন কৃতান্ত।
আঁকা শেষ করে বাথরুমে গিয়ে কাচের বাটি ভরতি রক্ত কমোডে ফেলে ফ্লাশ টেনে দিলেন। সাবান দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে ফিরে এলেন।
রানি টেবিলে ব্রেকফাস্ট রেখে গিয়েছে। ব্রেকফাস্ট মানে পরোটা ও কষা মাংস। সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ। সারা বছর এই রুটিনে বদল হয় না। ঘি চপচপে পরোটা ও তেল চুকচুকে পাঁঠার মাংস সকালবেলায় খেতে কৃতান্তর কোনও সমস্যাই হয় না। তিনি বিশ্বাস করেন রাজার মতো প্রাতরাশ করা উচিত। কিন্তু রাতের খাবার ভিক্ষুকের মতো খাওয়া উচিত। বিকেল চারটের পর থেকে কৃতান্ত কার্বোহাইড্রেট স্পর্শ করেন না। রাতে খান আটটা ডিমের সাদা অংশের অমলেট ও একটি ফল।
প্রাতরাশ শেষ করে সজোরে উদগার তুললেন কৃতান্ত। মুখ ধুয়ে আলমারির সামনে দাঁড়ালেন। আজ নতুন সুট পরতে হবে। আজ ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ।
কালো সুট ও লাল টাই পরে চেয়ারে বসলেন কৃতান্ত। রানি ঘরে ঢুকে মেঝেয় বসে কৃতান্তকে মোজা পরিয়ে দিল। শু র্যাক থেকে জুতো বের করে জুতো পরিয়ে ফিতে বেঁধে দিল। ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠলেন কৃতান্ত।
কালো এসইউভির সব কাচ তোলা। এসি চলছে। গন্তব্য সেন্টিনেল। নিমতলা ঘাট স্ট্রিটের সরু রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে কচ্ছপের গতিতে। পথচারী, বাজারফেরতা মানুষজন, আলুর বস্তা কাঁধে মুটে, টানা- রিকশা, টেম্পো, অটো, ঠেলাগাড়ি… যে যার নিজস্ব গতিতে এগোচ্ছে, রাস্তা পারাপার করছে। এই সময় খুব মজা পান কৃতান্ত। রোজ তাঁর মনে হয়, এক ঝটকায় ফিথ গিয়ারে গাড়ি তুলে একশো চল্লিশ কিলোমিটার পার আওয়ারে এই রাস্তাটুকু পেরিয়ে যাওয়া যাক। ছিন্নভিন্ন লাশ, কাটা হাত-পা, থ্যাতলানো ঘিলু, দুমড়ে যাওয়া অটো আর ভেঙে যাওয়া রিকশার ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাক পিছনে।
কৃতান্ত ছোটবেলা থেকেই প্রাণীহত্যা করে আনন্দ পেতেন। লাল পিঁপড়ে পায়ের আঙুল দিয়ে পিষে দেওয়া, লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ঢ্যামনা সাপ মারা, ইঁদুর-ছুঁচো-বেজি মারা, পাড়ার নেড়িকুত্তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া— এইসব করে তিনি বরাবর আনন্দ পান। জ্যান্ত মাছ বঁটিতে কাটা বা পুজোয় পাঁঠাবলি দেওয়ার কাজ তিনি সাগ্রহে করেছেন।
শিশু মাত্রেই অল্পবিস্তর ভায়োলেন্ট হয়। পোকামাকড় মারা নিয়ে বাবা-মা কিছু বলেননি। বালক বা কিশোরবেলায় কৃতান্তর হত্যাকাঙ্ক্ষা দেখে তাঁরা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কৃতান্ত ডাক্তারি পড়তে ঢোকার পরে নিশ্চিন্ত হন।
পড়াশোনায় ব্রিলিয়ান্ট কৃতান্ত নিজের এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তিনি একজন সাইকোপ্যাথ মানুষকে অত্যাচার করে, প্রহার করে তিনি আনন্দ পান। তিনি কোনও সাইকিয়াট্রিস্ট বা কাউন্সেলারের কাছে যাননি। কোনও ওষুধ খাননি। নিজের অসুখ সারাতে ধর্মগ্রন্থের সাহায্য নিয়েছিলেন। বেদ থেকে উপনিষদ, গীতা থেকে কোরান, বাইবেল থেকে ত্রিপিটক, সব বইতে মুক্তির পথ খুঁজেছেন। শাকাহারী হয়ে গিয়েছিলেন। নিয়মিত যোগব্যায়াম, ধ্যান ও প্রাণায়ামের মাধ্যমে হত্যাকাঙ্ক্ষা কন্ট্রোল করেছিলেন।
পাশাপাশি চলছিল অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা। অত্যন্ত ভাল রেজাল্ট করার পরে, বাবা-মায়ের দেখা পাত্রী বিমলাকে বিয়ে করেন। বিয়ের কিছুদিন পরে এক মেয়ে হয়। দিনটা ছিল ১৯৭৩ সালের ১৩ নভেম্বর। শুক্রবার, ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ।
নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে টিকিটিকির করে গাড়ি চালানোর পর্ব শেষ। মূল রাস্তায় পড়ে গাড়ি থার্ড গিয়ারে। কলকাতা শহর ঘুম থেকে উঠে সবে আড়মোড়া ভাঙছে। অফিস যাওয়ার ধুন্ধুমার-পর্ব শুরু হওয়ার আগে সামান্য ক্ষণের আলস্য।
সেন্টিনেলের বেসমেন্টে গাড়ি রেখে সাততলায় উঠলেন কৃতান্ত। এত সকালে তিনি কখনও আসেন না। রেস্টরুমে ঢুকতেই সিস্টার নমিতা বলল, “আসুন স্যার। শেলিদি সকালে বাড়ি যাননি। আপনার জন্য বসে আছেন।”
শেলি বলল, “গুড মর্নিং স্যার।”
“ভেরি গুড মর্নিং। তুমি রয়ে গেলে?”
“মনটা খারাপ স্যার,” একটা কলম নাড়াচাড়া করতে করতে বলল শেলি, “রাজার ব্লাড কাউন্টে আবার সমস্যা। ওকে আবার মুম্বই নিয়ে যেতে হবে। ছুটির দরকার ছিল।”
রাজার নাম শুনে কৃতান্তর দৃষ্টি নরম। বললেন, “কবে যাবে?”
“আমি ওদের মেল করেছি। উত্তর দিক। তারপরে আমি আপনার কাছে ছুটির অ্যাপ্লিকেশন করব। বাই দ্য ওয়ে, ১০ নম্বর পেশেন্টের ব্যাপারটা কী স্যার? ওই পেশেন্ট প্রতি বছর এই সময়ে মাসখানেকের জন্যে সেন্টিনেলে ভর্তি হয়। বাড়ির লোক ছুটি করে নিয়ে চলে যায়। অথচ পেশেন্টের কোনও ইমপ্রুভমেন্ট নেই। আপনি ১০ নম্বর বেডের কাছে যেতে বারণ করেছেন বলে যাই না। মঞ্জুলাও যায় না। ওকে সিস্টার নমিতা আর আপনি দেখেন। তাই সামান্য কৌতূহল… ‘
কৃতান্ত অভিব্যক্তিহীন মুখে শেলির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওই পেশেন্ট নিয়ে আগে তো কখনও জানতে চাওনি!”
শেলি বলল, “সরি স্যার, ভুল হয়ে গিয়েছে। আমি যাচ্ছি। রাজার কাছে যেতে হবে।”
আবার রাজার নাম শুনে মুখের পেশি নরম হল কৃতান্তর। তিনি বললেন, “ছেলের জন্য টাকাপয়সা লাগবে?”
“না স্যার। এখনও পর্যন্ত চালিয়ে নিচ্ছি। পরে কী হবে জানি না।”
“তুমি বোসো,” চেয়ারের দিকে ইশারা করেন কৃতান্ত। নিজেও বসেন। শেলি চেয়ারে বসে অ্যাপ্রনের পকেটে পেন গুঁজল। কৃতান্ত বললেন, “১০ নম্বর পেশেন্ট সারা বছর থাকে মানিকতলার হরিপদ দত্ত লেনের জীবনরেখা নার্সিংহোমে। নার্সিংহোমের মালিকের নাম ডক্টর পূর্ণেন্দু হালদার। পেশায় কার্ডিওলজিস্ট। আমাদের সিস্টার নমিতা পূর্ণেন্দুর স্ত্রী। পূর্ণেন্দু আর আমি মেডিক্যাল কলেজের ব্যাচমেট। জীবনরেখা ৩০ বছরের পুরনো। কর্পোরেট সেক্টর কলকাতায় ঢোকার আগে রমরমিয়ে চলত। এখনও চলে। তবে টিমটিম করে।”
শেলি বলে, “সেন্টিনেল বড়লোকদের জন্য। জীবনরেখা মধ্যবিত্তদের জন্য। কিন্তু দশ নম্বর পেশেন্টের ব্যাপারটা…’
শেলির কথার মধ্যে রেস্টরুমে ঢুকেছেন কৃতান্তর বয়সি এক ভদ্রলোক। সঙ্গে মাঝবয়সি আর একজন। সমবয়সি মানুষটিকে দেখিয়ে কৃতান্ত বললেন, “শেলি, এ আমার বন্ধু ডক্টর পূর্ণেন্দু হালদার। পূর্ণেন্দু, এ হল শেলি। সেন্টিনেলের আইসিইউ-র আরএমও।”
পূর্ণেন্দু হাত জোড় করে বললেন, “নমস্কার,” তারপর মাঝবয়সি লোকটিকে দেখিয়ে বললেন, “এ হল সায়ক। আমার ছেলে।”
সিস্টার নমিতা কৃতান্তকে বলল, “জন্মদিনে মেয়ের জন্য কী আনা হল?”
“কার মেয়ে?” অবাক হয়ে বলে শেলি।
কৃতান্ত বললেন, “তোমাকে আগে বলা হয়নি। আমার একটি মেয়ে আছে।”
কৃতান্ত যে বিবাহিত, এই তথ্যটাই জানত না শেলি। কৃতান্তর অসম্ভব দেমাক। ওঁর থেকে দূরে-দূরে থাকে শেলি। পারিবারিক জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস পায়নি। কিন্তু এখন দূরে থাকার সময় নয়। ঐশানীর সঙ্গে কথা বলে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে সে। শেলি বলে, “১০ নম্বর বেডের পেশেন্টের সঙ্গে আপনার মেয়ের কী সম্পর্ক?”
শেলির দিকে তাকিয়ে কুটিল হাসলেন কৃতান্ত, “আমার মেয়ে ঝিমলি গত ২০ বছর ধরে কোমায়। গত ২০ বছর ধরে প্রতিটি দিনই ঝিমলির জন্মদিন। তবে ১৯৭৩ সালে, আজকের দিনে ও জন্মেছিল।”
শেলি বেকুবের মতো কৃতান্তর দিকে তাকাল।
কৃতান্ত বললেন, “নমিতা, আপনি চায়ের বন্দোবস্ত করুন। শেলির মুখ দেখে মনে হচ্ছে, ধাতস্থ হতে সময় লাগবে।”
“আচ্ছা,” রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে ক্যাফের দিকে যায় সিস্টার নমিতা। পূর্ণেন্দু আর সায়ক দুটো চেয়ারে বসলেন। শেলি খেয়াল করল, সায়ক খুঁড়িয়ে হাঁটে। আর, তার গালে সেলাইয়ের দাগ।
সিস্টার নমিতা চা নিয়ে এসেছে। চায়ে চুমুক দিয়ে কৃতান্ত বললেন, “ঝিমলি পড়ত প্রেসিডেন্সি কলেজে। সায়কের সঙ্গে প্রেম করত। এই অ্যাক্টিভিটিতে আমার এবং পূর্ণেন্দুর প্রচ্ছন্ন মদত ছিল।”
পূর্ণেন্দু আড়চোখে সায়কের দিকে তাকালেন। কৃতান্ত বললেন, “১৯৯৫ সালের ২০ অক্টোবর, শুক্রবার, ওরা মেট্রো সিনেমা হলে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ দেখতে গিয়েছিল। সিনেমাটা দেখেছ, শেলি?”
কী করবে বুঝতে না পেরে এক চুমুক চা খায় শেলি, “হ্যাঁ। অনেকবার।”
“আমিও অনেকবার দেখেছি। সায়ক ওই সিনেমাটা আর দেখে না। টিভিতে শুরু হলে চ্যানেল চেঞ্জ করে দেয়।”
সায়কের মাথা নিচু। কৃতান্ত বললেন, “ওই সিনেমাটা দেখে বেরনোর পরে ওরা ট্রামে চেপে খিদিরপুরে যাচ্ছিল। অচেনা দুটো মাতাল রেসকোর্স গ্রাউন্ডে ওদের টেনে নামায়। একজন মেরে সায়কের ডান পা ভেঙে দেয়, কাঁধের হাড় সরিয়ে দেয়। সায়কের নীচের পাটির দুটো দাঁত নেই। মাথায় আর গালে স্টিচ হয়েছিল।”
পূর্ণেন্দু চেয়ার থেকে উঠে বন্ধুর কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, “থাক না…”
এক ঝটকায় হাত সরিয়ে দিয়ে কৃতান্ত শেলিকে বললেন, “দুই মাতাল মিলে আমার মেয়েকে রেপ করে। ওর স্ক্যাল্প এবং ভ্যাজাইনা থেকে এত ব্লিডিং হয়েছিল যে, শি ওয়াজ় ইন শক। আমি আর পূর্ণেন্দু অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কোমা থেকে ফেরাতে পারিনি।”
কৃতান্তর দুই ভুরু উপরে উঠে গিয়েছে। নাকের পাটা ফোলা। গালে লালচে আভা। লাল টাই আর একটু বেশি লাল। দু’হাতের দশ আঙুলে টরেটক্কা করতে-করতে কৃতান্ত বললেন, “বছরখানেক ঝিমলিকে বালিগঞ্জ নার্সিংহোমে রেখেছিলাম। তারপরে জীবনরেখায় শিফ্ট করি।”
কৃতান্তর দিকে তাকিয়ে শেলি বলল, “বালিগঞ্জ নার্সিংহোমেই রাখলে পারতেন। বনেদি ক্লিনিক। স্টেট অফ দ্য আর্ট যন্ত্রপাতি আছে।”
কৃতান্ত প্রসঙ্গ বদলে বললেন, “সায়ক ওয়াজ ইন গ্রেট মেন্টাল ট্রমা। বিয়ে পর্যন্ত করল না। এরাই আমার এক্সটেনডেড ফ্যামিলি। ঝিমলিকে আমি সেন্টিনেলের আইসিইউতে বছরে একবার মাসখানেকের জন্যে রাখি। এই হেমন্তে। ওর জন্মদিনের আশেপাশে।”
শেলি চুপ। কৃতান্ত চেয়ার থেকে উঠে বললেন, “আমার মেয়েকে দেখবে?”
শেলি বলল, “ওঁরা যাবেন না?”
সিস্টার নমিতা বলল, “ওরা সারাবছর দেখে। আজকের দিনটা স্যারের জন্যে।”
কৃতান্ত ঘষাকাচের দরজা ঠেলে ছেলেদের রেস্টরুমে ঢুকে গিয়েছেন। মেয়েদের রেস্টরুমে ঢুকল শেলি। অ্যাপ্রন ও পাজামা গলাল। মাথায় টুপি, মুখে মুখোশ, হাতে গ্লাস পরে, পেন অ্যাপ্রনের বুক পকেটে গুঁজে রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে দেখল, আইসিইউতে ঢুকছেন কৃতান্ত
হালকা নীল আলোয় দেখা যাচ্ছে আইসিইউ-এর ২০টি বেডের মধ্যে ১২টা বেডে পেশেন্ট আছে। বেডগুলো পরদা দিয়ে ঘেরা। ১০ নম্বর বিছানাও পরদা দিয়ে ঘেরা।
কৃতান্ত নিশ্চিত পদক্ষেপে পরদাটানা বেডের সামনে দাঁড়ালেন। শেলিকে বললেন, “তুমি আগে যাও। বার্থডে উইশ করো।”
শেলির খুব অস্বস্তি হচ্ছে। ঈষৎ কৌতূহলও হচ্ছে। অস্বস্তি এই কারণে যে, কোমাচ্ছন্ন সন্তানের প্রতি পিতৃস্নেহ ২০ বছর ধরে জাগ্রত থাকে, এটা সে ভাবেনি। আর কৌতূহল হচ্ছে পেশেন্ট দেখার জন্য।
পরদা সরিয়ে ভিতরে ঢুকল শেলি। যে-দৃশ্য দেখল, সেটা এতটাই বিবমিষা উদ্রেককারী যে, পরদা সরিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল।
বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কৃতান্তর সেন্টিমেন্টে আঘাত লাগবে। তা ছাড়া, স্পাই ক্যাম কাজ করছে। দম আটকে বিছানার দিকে আবার তাকাল শেলি।
ধবধবে সাদা চাদরের উপরে একটি প্রাণী শুয়ে রয়েছে। অবয়ব মানুষের মতো, কেন না একটা মাথা, দুটো চোখ, দুটো কান একটা নাক, একটা মুখ, দুটো হাত— সবই দৃশ্যমান। তবে প্রাণীটার সঙ্গে মানুষের থেকে টিকটিকির মিল বেশি। ঝিমলিকে দেখে মনে হচ্ছে কঙ্কালের উপরে ফ্যাকাশে চামড়া কেউ সেলোটেপ দিয়ে লাগিয়ে রেখেছে। চামড়ার আস্তরণের তলায় চর্বি বা পেশির অস্তিত্ব নেই। মুখটা মিশরের মমির মতো। গাল তোবড়ানো, মুখে টিউব ঢোকানো, হাতে ফ্লুইড চলছে। ক্যাথিটারের ইউরিন ব্যাগ খাটের রেলিংয়ে বাঁধা। আঙুলে পাল্স অক্সিমিটার ক্লিপ লাগানো। বুকে লাগানো কার্ডিয়াক মনিটরের তার। গত ২০ বছর ধরে ঝিমলি এইভাবে বেঁচে আছে!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেলি। কার্গিল যুদ্ধ হল, বাবরি মসজিদ ধ্বংস হল, নতুন শতক এল, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ইন্ডিয়ার ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন হলেন। রিটায়ার করলেন। ঝিমলি যাকে ভালবাসত, সেই সায়ক এখন চল্লিশের ঘরে। অথচ ঝিমলি সেই ২২ বছরেই আটকে আছে!
ঝিমলির জন্য শেলির খারাপ লাগছে না। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে আটকে থাকা এই শরীরটির প্রতি কোনও অনুভূতি কাজ করছে না। শেলির খারাপ লাগছে তার বসের জন্য। কৃতান্তকে শুনিয়ে সে বলল, “শুভ জন্মদিন ঝিমলি!”
কৃতান্ত এখন শেলির পাশে দাঁড়িয়ে। শিল্পীর আঙুল দিয়ে পার্চমেন্টের মতো খসখসে, ঝিমলির চামড়ায় হাত বোলাচ্ছেন কৃতান্ত। বলছেন, “আয়-আয় চাঁদমামা ‘টি’ দিয়ে যা। ঝিমলির কপালে চাঁদ ‘টি’ দিয়ে যা।” ফিসফিসে কণ্ঠস্বরে বলছেন, “চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে, কদমতলায় কে? হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে ঝিমলিসোনার বে!”
বৌদ্ধ গুম্ফায় তিব্বতি মঙ্কদের মন্ত্রোচ্চারণের মতো শোনাচ্ছে কৃতান্তর কণ্ঠস্বর। কৃতান্ত গাইছেন, “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ। হ্যাপি বার্থডে টু ইউ। হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার ঝিমলি। হ্যাপি বার্থডে টু ইউ,” গাইতে- গাইতে কোটের পকেট থেকে একটা খাম বের করে ঝিমলির মাথার পাশে রাখলেন কৃতান্ত। গান বন্ধ করে পরদা সরিয়ে বেরিয়ে এলেন।
*
“তুমি এখন বাড়ি ফিরবে?” রেস্টরুমে বসে জানতে চাইলেন কৃতান্ত। “আপনি যদি বলেন, তা হলে…” শেলি অর্ধেক বাক্য বলে চুপ করে গেল। কৃতান্ত বললেন, “এতক্ষণ যখন রয়ে গেলে, তখন সন্ধে সাতটা অবধি সামলে দাও। মঞ্জুলাকে আমি বলে দিচ্ছি, কাল তোমার ছুটি। সারাদিন রাজার সঙ্গে কাটাতে পারবে।”
“আচ্ছা স্যার।”
সায়ক আর পূর্ণেন্দু রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। সিস্টার নমিতা রয়ে গেল।
“কী মনে হল?” রেস্টরুমে বসে ক্যাজুয়ালি প্রশ্ন ছুড়লেন কৃতান্ত। শেলি বিন্দুমাত্র না ভেবে উত্তর দিল, “সেন্টিনেলে রাখলে কী বিশাল খরচ হত, সেটাই ভাবছি।”
“জীবনরেখার খরচ কিন্তু কম নয়।”
“তা ঠিক…মানে…ডক্টর পূর্ণেন্দু হালদার আপনার ক্লাসমেট….”
“ক্লাসমেট বলে কি ও আইসিইউ-এর এসির ইলেকট্রিক বিল মেটাবে? অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম মেটাবে? ভেন্টিলেটর মেশিন রান করার খরচ মেটাবে? তাও ২০ বছর ধরে? আর আইসিইউয়ের একটা বেড ২০ বছর ধরে অকুপাই করে রাখা মানে তার ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপানো। আমি পূর্ণেন্দুকে মাসে এক লাখ টাকা পে করি। এমাসের চেকটা ঝিমলির বালিশের পাশে রেখে এলাম। ওটা সিস্টার নমিতা নিয়ে নিয়েছে।”
শেলি ঘাড় নেড়ে বলল, “আপনার স্ত্রী…
“বিমলা পাগল হয়ে গিয়েছে, স্কিৎজোফ্রেনিয়া। খুব ভায়োলেন্ট। অ্যাসাইলামে রাখতে বাধ্য হয়েছি। ওখানেও মাসে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। এত খরচ বেয়ার করা কি সম্ভব? আমি তাই ইউথ্যানেসিয়া করার জন্য ‘ডেথ ফি’ নিই।”
“ডেথ ফি!” আঁতকে উঠে কৃতান্তর দিকে তাকায় শেলি। সীমান্তর বাবা তা হলে ঠিকই বলেছিলেন।
“আমি ছোটবেলা থেকে প্রাণীহত্যা করতে ভালবাসি। ভায়োলেন্ট টাইপ। বেদ উপনিষদ পড়ে, শাকাহারী হয়ে, ধ্যান ও প্রাণায়াম করে নিজেকে বদলে ফেলেছিলাম। কিন্তু ২০ বছর আগের সেই রাত সব ওলটপালট করে দিল। হাসপাতাল, থানাপুলিশ, কোর্টকাছারি, কি লাভ হল না। বিমলাকে অ্যাসাইলামে পাঠিয়ে, ঝিমলিকে জীবনরেখায় শুইয়ে নষ্টনীড়ে এসে জীবনের ব্যালান্সশিট করতে বসলাম। কৃতান্ত চাটুজ্যের জমার ঘরে কী আছে? খরচের ঘরেই বা কী আছে?”
“২৫ বছর আগে স্বাস্থ্য পরিষেবা অনেক বেশি ব্যয়বহুল ছিল। ভেন্টিলেটরওয়ালা নার্সিংহোম পেতে ঘাম ছুটে যেত। তুমি তখন জিজ্ঞাসা করলে, বালিগঞ্জ নার্সিংহোমে ওকে রেখে দিইনি কেন। কারণটা হল, আমার কাছে টাকা ছিল না। বাধ্য হয়ে ওকে জীবনরেখায় শিফ্ট করি। সেখানকার খরচ জোগাড় করতেও কালঘাম ছুটে যেত। প্রতি মাসে পূর্ণেন্দুর কাছে ৫০-৬০ হাজার টাকা ধার হয়ে যেত। আমি তখন বালিগঞ্জ নার্সিংহোমের আইসিইউ-র আরএমও। আমার কাছে এক পেশেন্ট পার্টি এসে বলল, সে আইসিইউ-এর খরচ সামলাতে পারছে না।”
“আপনি ‘ডেথ ফি’-কে জাস্টিফাই করতে চাইছেন?”
“করতে চাইছি বলা ভুল শেলি। জাস্টিফাই করছি। পাশাপাশি একথাও ঠিক যে, কাজটা করতে আমার ভাল লাগে। স্ট্রেস রিলিজ় করার জন্য, টেনশন কমানোর জন্য কাজটা আমি এমনিই করি। এখন কেউ যদি সেই কাজের জন্য টাকা অফার করে, তাহলে তো সোনায় সোহাগা! ঝিমলি কোমায় চলে যাওয়ার পরে আমি আবার আগের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। বেদ-উপনিষদ গঙ্গায় ফেলে দিলাম। শাকাহার ত্যাগ করলাম। যোগব্যায়াম ছেড়ে ডন বৈঠক ধরলাম, পশুপাখি মারতে লাগলাম। সেই সময় পেশেন্টের বাড়ির লোক আমার কাছে এল নিষ্কৃতি মৃত্যুর প্রস্তাব নিয়ে। আমি ছেড়ে দেব? তুমি বলো?”
“অতদিন আগে প্যাসিভ ইউথ্যানেসিয়া লিগ্যাল হয়নি,” ঠান্ডা গলায় বলে শেলি। সে বুঝতে পারছে, ঐশানীর অবজার্ভেশন একশো শতাংশ সত্যি ছিল।
“তুমি বলতে চাইছ যে, আমি মানুষ খুন করেছিলাম। তাই তো?” হাসতে-হাসতে জানতে চান কৃতান্ত। শেলি চুপ করে থাকে। মৌনতা যে সম্মতির লক্ষণ, এটা আশা করি কৃতান্ত জানেন।
“দেখো শেলি, ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রাণ নেওয়ার সামাজিক স্বীকৃতি আছে। আমরণ অনশন প্রতিবাদের হাতিয়ার। সতীদাহ বা অন্তর্জলী যাত্রা বা জহরব্রতকে মানুষ পুণ্যকর্ম মনে করে।”
“অতীতে করত।”
“এখনও করে। সতীদাহ রদ করে আইন পাশ হয়েছে আজ থেকে অনেক বছর আগে। রাজস্থানের ঝুনঝুনুতে রানি সতীর মন্দিরে ভক্তসমাগম দেখলে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। বেনারসে এমন বাড়ি আছে, যেখানে মৃত্যুপথযাত্রীকে রেখে আসা যায়। তিনদিনের মধ্যে মারা গেলে ভাল। মারা না গেলে ফেরত নিয়ে যেতে হয়। কেননা লম্বা লাইন থাকে। সেই তুলনায় আমি বিজ্ঞানসম্মতভাবে মানুষের কষ্ট লাঘব করি। প্যাসিভ ইউথ্যানেসিয়ার যে আইনি পদ্ধতি আছে তা অত্যন্ত জটিল। আমি ওইসব চক্করে যাই না। নিজের মতো কাজ সারি।”
শেলি বলল, “এসব কথা আজ হঠাৎ আমাকে বললেন কেন স্যার? আমি তো পুলিশ বা মিডিয়াকে ইনফর্ম করতে পারি। অথবা সেন্টিনেলের ম্যানেজমেন্টকে।”
হা-হা করে হেসে উঠলেন কৃতান্ত। এত জোরে হাসছেন যে, চোখে জল এসে গিয়েছে। মুখ টকটকে লাল। হাসছেন না কাঁদছেন, না দুটোই করছেন, বোঝা অসম্ভব।
“তুমি তা করবে না। তোমার ছেলের জন্যেই করবে না।”
শেলি চুপ। কৃতান্ত সঠিক জায়গায় আঘাত করেছেন। কৃতান্ত বললেন, “আজ ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ। ঝিমলির জন্মদিন এলে আমি মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ি। তোমায় এত কথা বললাম, তার কারণ, এবার আমার ক্লান্তি আসছে। ওস্তাদ শিল্পীর গুণ হল থামতে জানা। আমাকেও এবার থামতে হবে। মানুষের যন্ত্রণা লাঘব করে করে আমি ক্লান্ত। এবার রিটায়ার করার পালা।”
কৃতান্ত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর মোবাইল বাজল। স্ক্রিনের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে কৃতান্ত বললেন, “দেখো কাণ্ড! আমি রিটায়ার করতে চাইলেও মানুষ আমাকে রিটায়ার করতে দেবে না!”
“কার ফোন স্যার?” জানতে চায় শেলি।
“আরতি লুনিয়ার। ওর হাজব্যান্ড অশোক লুনিয়া রি-ব্লিডিং নিয়ে ভরতি হয়েছে,” ফোন ধরে কৃতান্ত বললেন, “হ্যালো,” তারপর স্পিকার ফোন অন করে দেন।
শেলি দু’দিকের কথাই শুনতে পাচ্ছে।
“স্যার আমি নেহা বলছি। অশোক লুনিয়ার মেয়ে।”
“হ্যাঁ নেহা। বলো।”
“আমরা আর পারছি না স্যার,” প্রত্যাশিতভাবে হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে নেহা, “একমাস হয়ে গেল, পাপার কোনও ইমপ্রুভমেন্ট নেই। মাই মাদার ইজ় প্ল্যানিং টু সেল কারস…”
শেলির দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন কৃতান্ত। নেহা বলছে, “দাদার মত হল, ইট্স আ গন কেস। আর কোনও টাকাপয়সা দেবে না। সেন্টিনেলে আমাদের আউটস্ট্যান্ডিং এখন চারলাখ টাকা…’
কৃতান্ত এখনও কোনও কথা বলেননি।
“স্যার, প্যাসিভ ইউথ্যানেসিয়া তো ইন্ডিয়াতে লিগ্যাল। এই নিয়ে আপনার কোনও আইডিয়া আছে?”
এতক্ষণে কৃতান্ত মুখ খুললেন। “তুমি কোথায়?”
“আইসিইউ-এর সামনে কফিশপে। মা-ও রয়েছেন।”
“আমি রেস্টরুমে আছি। তোমরা ভেতরে এসো,” ফোন কাটেন কৃতান্ত।
*
“COME TO SENTINEL ASAP.” এই ছোট্ট মেসেজটা ঐশানীর মোবাইলে পাঠাল শেলি। আড়চোখে দেখল আরতি আর নেহা আইসিইউ-এর ছেলেদের রেস্টরুমে ঢুকল। মেয়েদের রেস্টরুমে ঢুকে ঐশানীকে ফোন করল শেলি। মোবাইল রিং হয়ে গেল। কেউ ধরল না! কী হল রে বাবা!
ছেলেদের রেস্টরুমে উঁকি মেরে শেলি দেখে, আরতি আর নেহাকে সামনে বসিয়ে কৃতান্ত শুরু করেছেন ডেথ কাউন্সেলিং। প্রত্যাশিতভাবেই সতীদাহ প্রথা এবং জহরব্রতর কথা আসছে। এরপর আসবে ডেথ ফি-র প্রসঙ্গ। ঐশানীকে আবার ফোন করল শেলি। রিং হয়ে গেল। কেউ ধরল না।
*
শেলির মেসেজ যখন ঐশানীর মোবাইলে ঢোকে তখন সে খাবার টেবিলে বসে ভোলাদার সঙ্গে ঝগড়া করছে। ঝগড়ার ইসু খুব সাধারণ। চিনির বদলে ঐশানী সুগার ফ্রি ট্যাবলেট ধরেছে। ভোলাদা সেই দেখে বলেছে, “মড়ক লাগলেও গাঁয়ের মেয়েদের চেহারা তোমার মতো ডিগডিগে হয় না।”
ঐশানী জুতসই উত্তর দিতে যাচ্ছিল। এমন সময় মেসেজটা ঢুকল। একঝলক মেসেজ পড়ে খাবার টেবিল থেকে উঠল ঐশানী। অফিসের পোশাক পরাই ছিল। নিজের ঘরে ঢুকে ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে বেরোল। ক্যালকাটা সিটিজেন রেখে মালিনী চ্যাঁচাল, “খাবি না?”
ঐশানী উত্তর দিল না।
এক ছুটে প্রাচী সিনেমা হলের সামনে। অফিসের টাইমের ভিড়ে এলাকা জ্যামজমাট। ট্র্যাফিক পুলিশের চোখ রাঙানিকে পাত্তা দিল না ঐশানী। কবি কোকিল বিদ্যাপতি সেতুতে দৌড়ে উঠল। বাস, ট্রাম, গাড়ি, ট্যাক্সির গোলকধাঁধা পেরিয়ে ডানদিকে ঘুরে বেলেঘাটা মেন রোডে পড়ল। শিয়ালদা কোর্টের সামনে অনেক ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথম যে খালি ট্যাক্সি দেখতে পেল, তাকে বলল, “সেন্টিনেল নার্সিংহোম।”
“একশো টাকা এক্সট্রা লাগবে,” ঘুমঘুম চোখে বলল ড্রাইভার। তার কোলে দুটো একশো টাকার নোট ফেলে পিছনের দরজা খুলে ঐশানী বলল, “দুশো টাকা এক্সট্রা দিলাম। যত তাড়াতাড়ি পারেন চলুন।”
ড্রাইভার নোট দুটো মাথায় ঠেকিয়ে বলল, “বউনি হল,” ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়ে বলল, “দেখি কত তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যায়। রাস্তার অবস্থা তো জানেন।”
বেলেঘাটা মেন রোড। রাসমণি বাজার। চিংড়িঘাটা। শেলির ফোন বাজছে। ধরল না ঐশানী। সে কি পারবে, ডক্টর ডেথ কুকর্ম সেরে ফেলার আগে সেন্টিনেলে পৌঁছতে? একটা লোক দিনের পর দিন ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করছে। তার মুখোশ খুলে দেওয়ার কাজটা ঐশানী পারবে না? এত বড় খবর সে মিস করে যাবে?
বাইপাসে পড়েছে ট্যাক্সি। অপেক্ষাকৃত ফাঁকা রাস্তা। ঐশানী বলল, “আর একটু জোরে যাওয়া যায় না?”
“খুব খারাপ পেশেন্ট?” গিয়ার বদলায় ড্রাইভার।
“খুব খারাপ। মারা যাবে,” জবাব দেয় ঐশানী। আবার শেলির ফোন এসেছে। ফোন রিসিভ করল না ঐশানী। সামনেই সেন্টিনেল।
ট্যাক্সিভাড়া মিটিয়ে লিফটের দিকে দৌড়য় ঐশানী। সিকিয়োরিটি দৌড়ে এসে বলে, “কোথায় যাবেন?” ঐশানী প্রেস কার্ড দেখিয়ে বলে, “পিআরও মঞ্জুলার সঙ্গে দেখা করতে,” সিকিয়োরিটি সরে যায়।
লিফটে চারপাঁচজন লোক। ঐশানী ঢোকামাত্র দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ঐশানী দেখল তিন, চার, পাঁচ এবং ছয়— সব ক’টা তলার বোতামে আলো জ্বলছে। “শিট!” কপালে হাত দিয়ে বলে সে।
আবার শেলির ফোন বাজছে! দাঁতে দাঁত চিপে কল রিজেক্ট করে ঐশানী। শেলি এতবার ফোন করছে কেন? ঐশানী তো এসে গিয়েছে!
তিনতলায় লিফ্ট দাঁড়াল। দু’জন সিস্টার নামল। চারতলায় এক ডাক্তার নামল। পাঁচতলায় এক সিস্টার নামল। ছ’তলায় নামল ওয়ার্ডবয়। ঐশানী দেখল, সাততলা থেকে কেউ লিফটের জন্য বোতাম টিপেছে। আবার শেলি ফোন করছে।
… সাততলা আসছে। ফোন ধরে ঐশানী, “আমি এসে গিয়েছি।”
সাততলা! লিফটের দরজা খুলে গিয়েছে। ঐশানী বেরতে গিয়ে দেখল, সামনে একটা ট্রলি। ট্রলিতে সাদা লিনেনে ঢাকা দেওয়া একটা শরীর। ট্রলির পাশে দাঁড়িয়ে দুই মহিলা কাঁদছে।
ঐশানী লিফট থেকে বেরিয়ে ফোন কাটল। ক্যাফেতে দাঁড়িয়ে শেলি চোখের ইশারায় কাছে আসতে বারণ করল, ট্রলি দেখাল।
যা বোঝার বুঝে গিয়েছে ঐশানী। তার দেরি হয়ে গিয়েছে। ডক্টর কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায় আর একটা হত্যা সম্পন্ন করলেন। কেউ জানতে পারল না।
লিফটে ট্রলি ঢুকে গিয়েছে। দুই মহিলাও এখন লিফটে। ঐশানী আবার লিফটে ঢুকতে গেল। এমন সময় কালো সুট আর লাল টাই পরা এক চিকিৎসক বললেন, “আপনি তো এইমাত্র এলেন। এক্ষুনি নীচে যাবেন?”
এই কণ্ঠস্বর ঐশানীর চেনা। ফোনে কথা হয়েছিল। ইনিই ডক্টর ডেথ
কৃতান্ত লিফটে উঠছেন। শেলির দিকে না তাকিয়ে ঐশানীও লিটে উঠল। বলল, “হ্যাঁ। আমি নীচে যাব। ভুল করে এই ফ্লোরে চলে এসেছি।”
লিফটম্যান ‘জি’ বাটন টিপেছে। শেলি ক্যাফে থেকে দেখল, লিফটের মাঝখানে এক মৃতদেহ। তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে ঐশানী আর কৃতান্ত একে অপরের দিকে তাকিয়ে। লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
