তোমার কাছে এ বর মাগি
“বন্ধুরা! ১৫ নভেম্বর আমি মোহনপুর বাই ইলেকশনের জন্য নমিনেশন পেপার জমা দিয়েছিলাম। সেদিন ছিল নমিনেশন পেপার জমা দেওয়ার শেষ দিন। একই দিনে নমিনেশন পেপার জমা দিয়েছিলেন উৎপল বসুমল্লিক। কাগজে তার ছবিও বেরিয়েছিল,” মাঠভর্তি জনতার দিকে খবরের কাগজ নাড়াচ্ছে নতুন দলের স্বাগত সরকার, “১৬ নভেম্বর রাতে তাঁর স্ট্রোক হয়। অর্থাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। তিনি এখন অচৈতন্য অবস্থায় আইসিইউতে ভর্তি। কিন্তু জনাদেশ পার্টি সেই খবরটা মানুষকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। জনগণের চাপে, নতুন দলের চাপে পড়ে প্রেস মিট করে বলেছে। মিটিংয়ে দাঁড়িয়ে বলার সাহস নেই। আপনাদের ফেস করার সাহস নেই। ওরা কথায়-কথায় বলে, ‘আমাদের সংগঠন এতটাই শক্তিশালী যে, ল্যাম্প পোস্টকে ভোটে দাঁড় করালেও জিতে যাবে।’ কিন্তু সংগঠনের জোর কি মোহনপুরের মানুষের জোরের থেকে বেশি? আপনারাই বলুন!”
“না!” মোহনপুরের মাঠ গর্জে উঠল।
“ধন্যবাদ!” হাত নেড়ে জনগণকে বসতে বলে স্বাগত, “আগামী পাঁচ ডিসেম্বর ভোট। আজ ২৮ নভেম্বর, নির্বাচনি প্রচার আরও কয়েকদিন চলবে। আমরা আমাদের কথা তো বলবই। জনাদেশ পার্টির বিরুদ্ধে বিষোদ্গারও করব। কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই, নির্বাচনি যুদ্ধ মাঠে ময়দানে হয়, জনসভায় হয়, স্ট্রিট কর্নারে হয়, রোড শো-তে হয়। ব্যক্তিগত সম্পর্কে তার ছায়া পড়ে না। উৎপল ও তাঁর স্ত্রী শুক্লা আমার বহুদিনের পরিচিত। শুক্লাকে এই কঠিন সময়ে মন শক্ত রাখতে হবে। আমরা ওর পাশে আছি।”
হাততালিতে মোহনপুরের ময়দান ফেটে পড়ল।
“আগামী ৫ ডিসেম্বর সকাল-সকাল ভোট দিতে যাবেন। নতুন দলের প্রতীক চিহ্ন ‘বাল্ব’। বাল্ব চিহ্নওয়ালা বোতাম টিপে আমাকে, আমার নতুন দলকে জয়যুক্ত করুন। ধন্যবাদ,” বক্তব্য শেষ করল স্বাগত।
মলয় টিভি অফ করল। সন্ধে সাতটা বাজে। পার্টি অফিসের তিনতলার ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো ফ্ল্যাট টিভিতে মোহনপুরের নির্বাচনি প্রচারের সরাসরি সম্প্রসারণ দেখানো হচ্ছে। উৎপল বসুমল্লিকের স্ট্রোক হওয়ার পরে এই উপনির্বাচন মিডিয়ার আতশ কাচের তলায়। জনাদেশ পার্টি ও নতুন দলের ক্যাডাররা প্রতি ইঞ্চিতে প্রচারের কার্পেট বোম্বিং চালাচ্ছে। এই রাজ্যের প্রতিটি হেভিওয়েট পলিটিশিয়ান মোহনপুরের মিটিং বা রোড শো করেছে। দু’দলই বুঝতে পারছে, ভোটের রেজ়াল্ট জলের মতো স্বচ্ছ। জনাদেশ পার্টি গোহারান হারছে। পার্টির হোলটাইমাররাও এমন প্রার্থীকে ভোট দেবে না যার এক পা স্বর্গের দিকে বাড়ানো।
মলয় ছাড়া এই ঘরে উপস্থিত মনোময়, শুক্লা এবং রাজ্য কমিটির আরও তিন সদস্য। ওরা তিনজন স্ট্যাম্প-সদস্য। মলয় মুস্তাফি যা বলবে, তাতেই সায় দেবে। ভিতরে-ভিতরে অসহায়বোধ করে মনোময়। উৎপল নিজে ঝুলে রইল। তাকেও ঝুলিয়ে দিয়ে গেল।
মলয় শুক্লাকে বলল, “তোমাকে একটা কথা বলি। উৎপলকে এভাবে বাঁচিয়ে রাখা মানে কষ্ট দেওয়া। তুমি দীর্ঘদিনের পার্টি সদস্য, আমাদের লড়াইয়ের সঙ্গী, তোমাকে একথা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই যে, উৎপল আর ফিরে আসবে না।”
“জানি,” সংক্ষিপ্ত জবাব শুক্লার।
“আমাদের পার্টির ফিনানশিয়াল কন্ডিশন কোনওদিনও ভাল ছিল না। আজও নেই। বিরোধীরা প্রচার করে যে, জনাদেশ পার্টির কোটি- কোটি টাকার সম্পত্তি আছে। আসল সত্য এই যে, পার্টি সদস্য আর সিমপ্যাথাইজারদের আর্থিক সাহায্য আর অনুদানে আমাদের সংসার চলে। এক সময় বোলবোলাও হয়েছিল, ঠিক কথা। সেইসব দুর্নীতি পার্টিতে আর নেই। আমাদের এখন অভাবের সংসার।”
“আপনি কী বলতে চাইছেন?” ভিজে গলায় প্রশ্ন করে শুক্লা।
“সেন্টিনেল খুব কস্টলি জায়গা। ওখানে উৎপলের পিছনে প্রতিদিন অত টাকা খরচ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমি চাইছি উৎপলকে সেন্টিনেল থেকে বের করে অন্য জায়গায় ভর্তি করা হোক।”
“উৎপল ভেন্টিলেটরের সাহায্যে বেঁচে আছে। যেখানেই ভর্তি করবেন, জলের মতো টাকা খরচ হবে,” শুক্লা মাথা নিচু করে বলে।
“তা হলে ওকে ভেন্টিলেটরের সাপোর্ট থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক।”
“এই কাজটা কি করা যায়?” প্রশ্ন তুলেছে মনোময়, “মানে, আমি বলতে চাইছি, আমরা এই কথাটা কি সেন্টিনেলকে বলতে পারি? আর আমরা বললেই কি সেন্টিনেল রাজি হবে?”
“আগে তো ডায়লগ ওপেন করতে হবে,” মনোময়কে থামিয়েছে মলয়, “এবং ডায়লগ ওপেন করতে পারে শুক্লা।”
“আমি গত ক’দিন ধরে কথাটা ভাবছিলাম, “ রুমাল দিয়ে চোখ মোছে শুক্লা, “উৎপল চলে গেলে আমার কী হবে, সেটা আমার ব্যাপার। আমি ডিল করব। কিন্তু নির্বাচনি প্রক্রিয়ার কী হবে?”
“মোহনপুরে বাই ইলেকশন বন্ধ হয়ে যাবে,” জানাল মলয়, “নির্বাচন কমিশন আবার নতুন নির্বাচন ঘোষণা করবেন। আবার সব দল প্রার্থী দেবে। আবার প্রচার করতে হবে।”
“জনাদেশ পার্টির পরবর্তী প্রার্থী কে হবে?” জানতে চায় শুক্লা।
মনোময় বলে, “আমাকেই হতে হবে। এই এলাকায় উৎপলের বদলি হিসেবে আমার গ্রহণযোগ্যতা সব থেকে বেশি। একদিকে উৎপলের মৃত্যুর সিমপ্যাথি ওয়েভ। অন্যদিকে স্ট্রং ক্যান্ডিডেট। হারা সিট ড্যাংডেঙিয়ে জিতে যাব।”
মলয় শুক্লার দিকে তাকাল। রাজ্য কমিটির তিনজন সদস্য তাকাল মলয়ের দিকে। মনোময়ের আনক্যানি ফিলিং হচ্ছে। ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছে, কোনও একটা ষড়যন্ত্র আছে। কোনও গটআপ গেম আছে। যেটা সে ধরতে পারছে না!
শুক্লা মাথা নিচু করে ভাবছে। মনোময় বলল, “শুক্লা, কিছু বলো।”
শুক্লা মাথা তুলেছে। মলয়ের দিকে তাকিয়ে বলছে, “বাংলায় একটা কথা আছে। কিছু পেতে গেলে কিছু হারাতে হয়। কথাটা উলটে দিয়ে বলতে চাই, কিছু হারাতে হলে কিছু পেতে হয়। স্বামী হারিয়ে আমি কী পাব?”
“তোমার স্বামী মারা গিয়েছে শুক্লা, “ তড়িঘড়ি বলে মনোময়, “এখন চাওয়া পাওয়ার হিসেব কোরো না।”
“উৎপল এখনও মারা যায়নি। আমি অনুমতি না দিলে উৎপল ভেন্টিলেটরেই থাকবে। হোলটাইমারের চিকিৎসার খরচ পাৰ্টিকেই বইতে হবে। সেটা যখন সম্ভব নয়, তখন আমার কথা শুনতে হবে। বৈধব্যের বিনিময়ে আমি একটা জিনিস চাই। মোহনপুরের বাই ইলেকশনের প্রার্থী হতে চাই,” শোকতাপহীন, ঠান্ডা, ক্যালকুলেটিভ গলায় বলছে শুক্লা, “আমি দাঁড়ালে সিমপ্যাথি ওয়েভের সুনামি বইবে। পার্টির জয় সুনিশ্চিত। এখন আপনারা সিদ্ধান্ত নিন।”
মনোময়ের তলপেটে দমাস করে লাথি এসে পড়ল। সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে, এই পরিকল্পনা কার। অবশ্যই মলয় মুস্তাফির। সাজানো এই মিটিংয়ের আগেই শুক্লা ও রাজ্য কমিটির তিন সদস্যর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল মলয়। শুক্লাকে জেতালে রাজ্য কমিটিতে তার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হবে। রাগে, ক্ষোভে, অপমানে মনোময়ের গা চিড়বিড় করছে!
কিন্তু কিছু করার নেই। শুক্লার প্রস্তাবটা এত অব্যর্থ যে, এর বিরোধিতা করা অসম্ভব। শুক্লা গৃহবধূ নয়। রাজনীতিতে পোড় খাওয়া। তার দাবির মধ্যে যুক্তি ও আবেগের চমৎকার ব্যালান্স আছে।
মনোময় শেষ চেষ্টা করল, “এই অবস্থায় তুমি ভোটে দাঁড়াতে চাইছ?” সবার সামনে সে শুক্লাকে ক্ষমতালোভী নারী প্রতিপন্ন করতে চাইছে।
“ব্যক্তিগত সম্পর্কের আগে পার্টিকে রাখার শিক্ষা আপনাদের কাছ থেকেই পেয়েছি মনোময়দা। এই সিদ্ধান্ত নিতে আমার যে কী কষ্ট হচ্ছে তা আমি আপনাদের বোঝাতে পারব না। কিন্তু আগে মতাদর্শ। তারপরে ব্যক্তিগত শোক।”
শুক্লা মাস্টারস্ট্রোক খেলেছে! এখন শুক্লার বিরোধিতা করা মানে নিজেকে ক্ষমতালিপ্সু প্রমাণ করা। মনে-মনে হার স্বীকার করে নিয়ে মনোময় বলল, “আমি ডক্টর চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলব। তখন তোমাকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে। কবে সেন্টিনেলে যাবে?”
মলয় বলল, “শুভস্য শীঘ্রম। একদিন দেরি করা মানেই অযথা সময় নষ্ট। তোমরা আজকেই কথা বলো।”
“ঠিক আছে,” পকেট থেকে মোবাইল বের করে কৃতান্তকে ফোন করে মনোময়। মলয় আবার টিভি চালিয়ে দেয়।
*
“নমস্কার,” দু’হাত জড়ো করে শুক্লাকে বললেন কৃতান্ত। শুক্লা প্রতিনমস্কার করে কৃতান্তর দিকে তাকাল। দীর্ঘদেহী, বলশালী ব্রাহ্মণসন্তানকে দেখে তার একই সঙ্গে ভয় ও ভক্তিভাব জেগেছে। নিচু গলায় বলল, “আমার নাম শুক্লা। এতদিন আমি আসিনি। মনোময়দা বারণ করেছিল।”
কৃতান্ত বসে রয়েছেন নিজের ঘরে। পরনে কালো কুর্তা, সাদা পাজামা। শুক্লা আর মনোময়কে নিয়ে রানি যখন শোওয়ার ঘরে এল, তখন তিনি ছবি আঁকছিলেন। অসমাপ্ত ইজেলে লাল রঙের একটি বাদুড় ফুটে উঠছে।
রানি চা এবং ফিশ ফ্রাই নিয়ে এসেছে। শুক্লা এবং মনোময়ের হাতে ফিশ ফ্রাইয়ের প্লেট তুলে রানি বলল, “গরম থাকতে খেয়ে নিন। নিজের হাতে বানিয়েছি। অর্জিনাল ভেটকি মাছ।”
“এখান থেকে যা,” চাপা স্বরে ধমক দেয় কৃতান্ত। কাসুন্দি মাখিয়ে ফিশ ফ্রাই মুখে পুরে মনোময় বলে, “ডক্টর চ্যাটার্জি, আমাদের দল আর উৎপলের চিকিৎসার খরচ চালাতে পারছে না। সেন্টিনেল ইজ্ টু-উ এক্সপেনসিভ।”
“অন্য নার্সিংহোমে নিয়ে যান,” সাফ জবাব কৃতান্তর, “আপনারা যদি বলেন, তাহলে আমি ডিসচার্জ সার্টিফিকেট লিখে দেব। আমাদের স্পেশ্যাল অ্যাম্বুল্যান্স আছে। পেশেন্টের কোনও প্রবলেম হবে না।”
শুক্লা আড়চোখে দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত সাড়ে আটটা বাজে। পার্টি অফিস থেকে সে আর মনোময় বেরিয়েছিল সাড়ে সাতটার সময়। নিমতলা ঘাট স্ট্রিটের এই ভাঙাচোরা বাড়িতে আসতে একঘণ্টা লেগে গেল। মনোময় ফোন করার পরে কৃতান্ত বলেছিলেন, সেন্টিনেলে যোগাযোগ করতে। মনোময় রাজি হয়নি। বলেছিল, “ব্যক্তিগত কথা আছে। আমি এবং পেশেন্টের স্ত্রী থাকব। সেন্টিনেলের বাইরে দেখা করতে চাই,” মনোময়ের ইঙ্গিত বুঝতে কৃতান্তর অসুবিধে হয়নি। তিনি মনোময় আর শুক্লাকে নষ্টনীড়ে আসতে বলেন।
মনোময় বলল, “অন্য নার্সিংহোমে গিয়ে লাভ আছে কি? সেন্টিনেল এদিককার সব থেকে ভাল নার্সিংহোম। সেখানে যখন কোনও ইমপ্রুভমেন্ট হচ্ছে না…”
কৃতান্ত চুপ। ফিশ ফ্রাই খাচ্ছে নিঃশব্দে। বাধ্য হয়ে মনোময় বলল, “উৎপলকে আমরা যদি বাড়ি নিয়ে যাই তাহলে কী হবে?”
“বাড়িতে আইসিইউ খুলবেন?” মনোময়ের দিকে তাকিয়ে শ্লেষাত্মক মন্তব্য কৃতান্তর।
“না না। আমি তা বলতে চাইনি,” লজ্জায় জিভ কাটছে মনোময়, “আমি বলতে চাইছি যে, ভেন্টিলেটর থেকে উৎপলকে বের করে নিলে কী হবে?”
শান্ত, স্নিগ্ধ, সৌম্য দৃষ্টিতে মনোময় ও শুক্লাকে দেখলেন কৃতান্ত তাঁর সারা শরীর জুড়ে রক্তকণারা নাচানাচি করছে। হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গিয়েছে, হাত কাঁপছে থরথর করে। আসন্ন মৃত্যুর গন্ধে প্রবল উত্তেজনা হচ্ছে। ডেথ কাউন্সেলিংয়ের এই তো সময়! চায়ে আলতো চুমুক দিয়ে উত্তেজনা দমন করলেন কৃতান্ত। শিরদাঁড়া সোজা করে নিজের আসনে বসে কবজিতে চিবুক রেখে বললেন, “ভেন্টিলেটর থেকে উৎপল বসুমল্লিককে বের করে নিলে উনি শারীরিক কষ্ট থেকে মুক্তি পাবেন। শুক্লাদেবী মানসিক সংকট থেকে মুক্তি পাবেন। জনাদেশ পার্টি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাবে।”
শুক্লা বলল, “আপনি তো সবই বোঝেন। উপায় থাকলে কেউ এই পাশবিক সিদ্ধান্ত নেয়?”
“ইউথ্যানেসিয়া বা নিষ্কৃতি-মৃত্যু প্রসঙ্গে পশুর উদাহরণ টানার কোনও প্রয়োজন নেই। এটা কোনও অন্যায় কাজ নয়। মৃত্যুর অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। প্যাসিভ ইউথ্যানেসিয়া ভারতে আইন স্বীকৃত। কিন্তু সেই পদ্ধতি মানলে আপনাকে কোর্ট থেকে অর্ডার আনতে হবে। সে প্রায় একমাসের মামলা।”
“না, না। অত দেরি করা যাবে না,” হড়বড়িয়ে বলে শুক্লা, “বুঝতেই তো পারছেন, উৎপল না থাকলে ইলেকশন ক্যানসেল হয়ে যাবে। তখন আমাদের নতুন ধরনের প্রবলেমের মধ্যে পড়তে হবে।”
“সে ক্ষেত্রে আপনার মৌখিক অনুমতিই যথেষ্ট। আমার আজ রাত ১০টা থেকে ডিউটি আছে। তখনই যা ঘটার ঘটে যাক।”
“আজ রাত ১০টা?” শুক্লার দিকে আড়চোখে তাকায় মনোময়। “দেরি করতে চাইলে করুন। তবে তাতে উৎপলবাবু হঠাৎ কোমা থেকে ফিরে আসবেন, এইরকম ভাবার কোনও কারণ নেই। একথা ঠিক যে, সামান্য কিছু পেশেন্ট পাঁচ, দশ বা কুড়ি বছর পরে অচেতন অবস্থা থেকে চেতনায় এসেছে। কিন্তু সেগুলো ব্যতিক্রম। মেডিক্যাল মিরাকেল! তার ভরসায় থাকলে চলবে না।”
“না না। আজ রাতেই। আসলে আমরা দেরি করতে চাইছি না। ইসুটা খুব স্পর্শকাতর। মিডিয়াও উৎপলকে নিয়ে চিন্তিত। আমি আর মনোময়দা এখনই গাড়ি নিয়ে সেন্টিনেলে যাচ্ছি। আর কোনও নিয়মকানুন মানতে হবে কি?”
চেয়ারের হাতলে আঙুল দিয়ে টরেটক্কা আওয়াজ তোলেন কৃতান্ত “উৎপলবাবুর পরলোকগমন প্রক্রিয়ার পুরোহিত হিসাবে আপনারা আমাকে নির্বাচন করেছেন। পুণ্য কাজে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু ব্রাহ্মণকে নগদ বিদায়ের ব্যবস্থা রেখেছেন তো?”
মনোময় ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “উৎপলকে মেরে ফেলার জন্য আপনি টাকা চাইছেন?”
কৃতান্ত স্থির চোখে মনোময়ের দিকে তাকালেন। রাগের চোটে চোখমুখ লাল। কৃতান্ত বললেন, “হত্যাকারী কে? পাঁচকড়ি দে। আপনি আর শুক্লাদেবী মিলে উৎপলবাবুর নিষ্কৃতি মৃত্যুর প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে এসেছেন। আর বলছেন যে, আমি মেরে ফেলছি। বাঃ। চমৎকার!”
“না… মানে…আমি ওভাবে বলতে চাইনি,” ভুল বুঝতে পেরে ড্যামেজ কন্ট্রোল করছে মনোময়, “মানে…আমি বলতে চাইছিলাম যে, উৎপল তো সেন্টিনেলে ভর্তি আছে। পেমেন্ট তো আমরা সেন্টিনেলেই করব। তার বাইরে…”
“ডোন্ট বিট অ্যারাউন্ড বুশ!” তর্জনী তুলে মনোময়কে শাসন করেন কৃতান্ত, “ন্যাকা সাজবেন না। ফোনে আপনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিগত কথা আছে। সেন্টিনেলের বাইরে দেখা করতে চাই।’ আর এখন সেন্টিনেল দেখাচ্ছেন? রাবিশ! স্পাইনলেস কোথাকার!”
শুক্লা ঘাবড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। থরথর করে কাঁপছে। কোনও মতে বলল, “আপনি মনোময়দার কথা বাদ দিন। কত টাকা দিতে হবে?”
“আমার ডেথ ফি এক লাখ টাকা। ইন হার্ড ক্যাশ। পুরোটাই অ্যাডভান্স। ইউ উইল গেট দ্য রেজ়াল্ট উইদিন হাফ অ্যান আওয়ার।”
“ঠিক আছে,” তড়িঘড়ি কৃতান্তর শোওয়ার ঘর থেকে বেরোয় শুক্লা, “আমরা রাত দশটায় সেন্টিনেলে দেখা করছি।”
“সেন্টিনেল কার পার্কিংয়ে।”
“ধন্যবাদ,” কৃতান্তর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে মনোময়। আড়চোখে লাল বাদুড়ের ছবি দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পার্টি অফিস থেকে টাকা নিয়ে সেন্টিনেলে পৌঁছতে হবে। হাতে সময় কম।
*
শুক্লা আর মনোময় বেরিয়ে যাওয়ার পরে কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থাকেন কৃতান্ত। মোবাইলে শেলিকে ফোন করেন।
“হ্যাঁ স্যার বলুন,” শেলির গলা শোনা যায়।
“আজকে তোমার নাইট ডিউটি আছে তাই তো?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“তুমি ১০টার বদলে ১১টায় এসো,” কৃতান্তর কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা। শেলি আন্দাজে ঢিল ছুড়ল। “আজ কি উৎপল বসুমল্লিক এক্সপায়ার করবেন?”
“বেশি কথা বোলো না। যা বললাম তাই কোরো,” লাইন কেটে দিয়েছেন কৃতান্ত।
*
মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে শেলি। উত্তেজিত বোধ করছে সে-ও। নিজের কথা ভেবে, রাজার কথা ভেবে, কৃতান্তর কথা ভেবে, ঐশানীর কথা ভেবে, সীমান্তর কথা ভেবে। শেলি এখন দুটো ফোন করবে। প্রথমে সীমান্তকে, তারপর ঐশানীকে।
শেলির ফোন পেয়ে সীমান্ত বলল, “বলো শেলিদি।”
“আজ বোধহয় উৎপল বসুমল্লিক এক্সপায়ার করবে।”
“কী!” চিৎকার করে ওঠে সীমান্ত, “আর ইউ শিয়োর? বস তোমাকে এই কথা বলল?”
“আমাকে দেরি করে আইসিইউতে ঢুকতে বললেন। আগে যতবার এই কথা আমাকে বা মঞ্জুলাকে বলেছেন, ততবার ওই কাণ্ড হয়েছে। লাকিলি আজ রাতে সিস্টার নমিতারই ডিউটি আছে। আমি ঐশানীকে ফোন করছি।”
“ঐশানীকে! কেন?”
“ঐশানী আমাকে সেই রকমই বলে রেখেছে। তুই ‘না’ করিস না সীমান্ত। এই জিনিসটার একটা ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত আমার রাতে ঘুম হবে না।”
“তুমি ফোন করলে করো। আমিও করছি, আমি সেন্টিনেলে যাচ্ছি।”
“এত রাতে তুই এসে কী করবি?”
“কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায় বিপজ্জনক লোক। ওর সামনে পড়লে ঐশানীর প্রাণসংশয় হতে পারে। আমি রিস্ক নিতে চাই না,” ফোন কাটে সীমান্ত।
শেলির পরের ফোন যায় ঐশানীর নম্বরে।
*
ঐশানী ঝড়ের গতিতে কপি লিখছিল। রাজনীতিবিদদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিয়ে একটা কপি আগামী তিনদিন ধরে যাবে। বাংলা ও ভারতের কোন মন্ত্রী কোন রোগে ভুগছেন— সে বিষয়ে অনেক ডকুমেন্ট জোগাড় করেছে ঐশানী। মনের ডাক্তার, ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, মায় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে।
কপি প্রায় শেষ। ক্রিপ, টানটান লেখা। শেষ প্যারাগ্রাফে এসে মনে মনে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াল ঐশানী। কপি উতরে যাবে।
গত ক’দিন খুব খারাপ যাচ্ছে। ঐশানীর কাছে এখনও টারমিনেশন লেটার আসেনি। কিন্তু ঐশানী জানে, ক্যালকাটা সিটিজ়েনে এটাই তার শেষ মাস। তারপর অন্য জায়গায় কাজ দেখতে হবে। খেলাঘর এবং তাসের দেশের বাসিন্দাদের এই খবর পৌঁছে দিয়েছে সে। কোনও তরফেই কোনও হেলদোল নেই। প্রতাপ-মালিনীর বক্তব্য, “বিয়ে করে থিতু হ। তারপর অন্য চাকরি খুঁজিস।”
সীমান্তর বক্তব্য, “ভালই হবে। অত চাপের চাকরি করার প্রয়োজন নেই। আশেপাশের কোনও স্কুলে কাজ পেয়ে যাবে।”
অদ্রীশের বক্তব্য, “আমি পুরনো জমানার লোক। বাড়ির মেয়েদের চাকরি করা পছন্দ করি না। কিন্তু আমার কথার কোনও গুরুত্ব নেই। ঐশানীকেই ঠিক করতে হবে ও কী চায়।”
ঐশানী সাংবাদিকতার জগতে এসেছে খবর খোঁজার তাগিদে। সেটাই তার প্যাশন। মাঝারি মাপের একটা ইংরেজি কাগজে এতদিন হেল্থ বিট করার পরে সাংবাদিকতার প্রতি শৈশবের সেই মুগ্ধতা আর নেই। সে তো কোনও কিছুর প্রতিই নেই। অকারণে নস্ট্যালজিয়ায় ডুবে থাকার মেয়ে ঐশানী নয়। সে জানে সংবাদপত্রের জগৎটা এই রকমই। কাটথ্রোট, গোল্লাছুট। অনেক মানুষের পরিশ্রমে যে-পণ্য তৈরি হয়ে ভোর ছ’টার মধ্যে লোকের বাড়ির উঠনে বা ব্যালকনিতে গিয়ে পড়ে, তা সকাল ১১টার মধ্যে পুরনো হয়ে যায়। প্রতিদিন মরে গিয়ে প্রতিদিন বেড়ে ওঠার এই জীবনচক্রের নেশায় পড়ে গিয়েছে ঐশানী। বাবা-মা, ভাবী স্বামী ও ভাবী শ্বশুরের কথায় সে থোড়াই জার্নালিজম ছাড়বে!
নাছোড় ঐশানীকে নেবে কোন কাগজ? পূর্বভারতের সংবাদপত্রের জগতে এখন ওপেনিং কম। অর্থনৈতিক ডামাডোলের কারণে বেশ কয়েকটা কাগজ উঠে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঐশানীকে হয় অন্য রাজ্যে চলে যেতে হবে, নয় অডিও-ভিশুয়াল মিডিয়ায় শিফ্ট করতে হবে। দিল্লি, মুম্বই বা বেঙ্গালুরুতে ওপেনিং আছে। কিন্তু ঐশানীর যাওয়ার ইচ্ছে নেই। আর নিউজ় চ্যানেল ঐশানীর প্যাশনের জায়গা নয়। এমন পরিস্থিতিতে সে কনফিউজড। তরুণ তার সঙ্গে বিশেষ কথা বলছে না। লিমাও না। দু’জনেই জানে যে, ক্যালকাটা সিটিজ়েনে এটাই ঐশানীর শেষ মাস।
মোবাইল বাজছে। কপির শেষ প্যারাগ্রাফ লিখতে-লিখতে ঐশানী দেখল সীমান্তর ফোন। লেখাটা শেষ করে ধরবে? দোনামোনা করতে করতে লাইন কেটে গেল। লেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ঐশানী
আবার মোবাইল বাজছে। এবার শেলি। বিরক্ত হয়ে ফোন ধরল ঐশানী। শেলি জানে যে, এই সময়টা অফিসে প্রচণ্ড চাপ যায়। তাও কেন যে ফোন করে!
“বলো,” ফোন কানে দিয়ে নিচু গলায় বলে সে।
“পৌনে ১০টার মধ্যে সেন্টিনেলের আইসিইউতে ঢোকো। ইউ নো হোয়াট আই মিন!” খুব ঠান্ডা গলায়, কেটে-কেটে বলল শেলি।
রিফ্লেক্সবশত মেশিনে কপি সেভ করছে ঐশানী। মেশিন বন্ধ করছে। ফোনে বলছে, “তুত্… তুমি এখন কোথায়?”
“বাড়িতে,” জবাব দেয় শেলি, “বসের ফোন এসেছিল। বললেন, আমি যেন নাইট ডিউটিতে দেরি করে পৌঁছই। কিছু যে হবে এটা আমি গ্যারান্টি করতে পারছি না। তবে…” সামান্য থামে শেলি, “আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘উৎপল বসুমল্লিক কি আজ এক্সপায়ার করবেন? প্রশ্ন শুনে আমাকে ধমকে চুপ করিয়ে দিলেন।”
ঘড়ি দেখছে ঐশানী। ন’টা বাজে। সে কি পারবে পৌনে দশটার মধ্যে সেন্টিনেলে পৌঁছতে? ধর্মতলা থেকে পূর্ব কলকাতা অনেকটা রাস্তা!
“আমি সীমান্তকে ইনফর্ম করেছি। ও বারাসত থেকে আসছে,” ফোন কেটে দেয় শেলি।
ড্রয়ার থেকে ন্যাপস্যাক বের করেছে ঐশানী। এর মধ্যে নতুন স্পাই ক্যামটা রাখা আছে।
লিমা পাশ থেকে বলল, “বেরোচ্ছিস? কপি কই?”
“পরে,” সংক্ষিপ্ত জবাব ঐশানীর।
“কোথায় যাচ্ছিস?” তীক্ষ্ম চিৎকার করে জানতে চায় লিমা। সে আন্দাজ করেছে যে, ঐশানী খবরের সন্ধানে দৌড়চ্ছে। কী এমন খবর, যা সে জানে না অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী জানে!
লিমার কৌতূহলের আগুনে ঘি ঢেলে বলল, “মিড ডে মিল খেয়ে কিছু বাচ্চা মারা গিয়েছে। ৭০ জন বাচ্চা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি।”
“ঢপ মারার জায়গা পাস না? এরকম কোনও ইনসিডেন্ট নেই, “ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে লিমা। তরুণ মহাকরণ বিটের অতনুর সঙ্গে কথা বলছিল। লিমার চিৎকার শুনে এদিকে তাকিয়েছে। ঐশানীকে দেখে বলল, “কোথায় যাচ্ছিস? কপি কই?”
ঐশানী শুধু প্রথম প্রশ্নটার উত্তর দিল, “জাহান্নামে!”
*
আজ কপাল ভাল। অফিসের সামনেই ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেন্টিনেলে যাওয়ার প্রস্তাব দিতে এক কথায় রাজি হয়ে গেল। ঐশানী বুঝল, উৎপলের সূত্রে ক্যালকাটা সিটিজেন থেকে সেন্টিনেলের রুট এখন ট্যাক্সিওয়ালাদের মধ্যে জনপ্রিয়।
ট্যাক্সি ছাড়ার মুহূর্তে আবার সেই পরিচিত, অস্বস্তিকর গন্ধটা নাকে এসে ঝটকা মারল। ছাতিম ফুলের গন্ধ। এখনও কি হেমন্তকাল যায়নি? এই ঝাঁঝালো গন্ধ কি ঐশানীর পিছু ছাড়বে না?
পার্ক সার্কাস ফ্লাইওভারে উঠে ঘড়ি দেখল ঐশানী। ন’টা দশ বাজে। সওয়া ন’টার মধ্যে সাত মাথার মোড়ে পৌঁছে যাবে। ওখানে এখন কেমন ট্র্যাফিক জ্যাম কে জানে! হালকা টেনশন হচ্ছে।
আজকের এই মুহূর্তটার জন্য সে অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করে আছে। কলকাতা শহরের বুকে নামজাদা নার্সিংহোমের আইসিইউতে নামজাদা চিকিৎসক একের পর এক ইউথ্যানেসিয়া করছেন। যা ভারতে বেআইনি। যা হত্যার সমান। হত্যা পিছু তাঁর সম্মানদক্ষিণা এক লক্ষ টাকা। এই খবর ক্যালকাটা সিটিজ়েনে বেরলে সেনসেশন পড়ে যাবে। আড়াইশো হত্যার অপরাধে অপরাধী কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়ের জেল তো হবেই। রেয়ারেস্ট অফ রেয়ার ক্রাইম করার জন্য মৃতুদণ্ডও হতে পারে। এই রকম ইনভেস্টিগেটিং জার্নালিজম করতেই তো সাংবাদিকতাকে ভালবেসেছিল ঐশানী।
সাতমাথার মোড়ে জ্যাম। সওয়া ন’টা বাজে। অধৈর্য হয়ে সীমান্তকে ফোন করে ঐশানী। ফোন বেজে কেটে যায়। বেচারি সীমান্ত বাইক চালিয়ে বারাসত থেকে সেন্টিনেল আসছে। এখন ফোন বাজলেও ধরবে না। কুয়াশামাখা রাস্তার দিকে তাকিয়ে ঐশানী বলে, “সিগন্যাল, তুমি সবুজ হও! প্লিজ, প্লিজ সবুজ হও!”
সিগন্যাল সবুজ। ট্যাক্সি তপসিয়া রোড ধরে সায়েন্স সিটির দিকে দৌড়চ্ছে। ঐশানী নিজের প্ল্যান ছকে নিল। সাততলা পর্যন্ত পৌঁছতে কোনও সমস্যা হবে না। তারপরে সিস্টার নমিতার হেলপ লাগবে। অশোক লুনিয়া যে-দিন মারা গেল, সে দিনই সিস্টার নমিতার সঙ্গে কথা বলে প্ল্যান ছকা হয়েছে। কিন্তু খাতায় কলমে যে-প্ল্যান হয়, তা বাস্তবায়িত করার সময়ে দেখা যায় যে, অনেক লুপহোল রয়েছে। সে রকম কিছু হবে না তো?
ট্যাক্সি চলে এসেছে সায়েন্স সিটির কাছে। এখানে আবার জ্যাম। ঘড়ি দেখল ঐশানী। সাড়ে ন’টা বাজে। আর ১৫ মিনিটের মধ্যে সে সেন্টিনেলে পৌঁছতে পারবে না? উত্তেজনায় নীচের ঠোঁট কামড়ে আবার সীমান্তকে ফোন করে।
শেলি ফোনে বলল সিস্টার নমিতার আজ নাইট ডিউটি আছে। এটা একটা সুবিধে হল। সিস্টার মণিদীপা বা সিস্টার অন্বেষা থাকলে মুশকিল হত। কিন্তু সীমান্ত ফোন ধরছে না কেন? অসহ্য টেনশনে মোবাইলের লাল বোতাম টেপে ঐশানী। সিগন্যাল সবুজ। ট্যাক্সি ডানদিকে ঘুরল। ঐশানী সীমান্তকে এসএমএস করল, “তুমি এখন কোথায়?”
ঘড়িতে পৌনে ১০টা। ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল সেন্টিনেলের সামনে। ন্যাপস্যাক থেকে স্কার্ফ বের করে মাথায় জড়ায় ঐশানী। সেন্টিনেলের বাইরে, ভিতরে, ওয়েটিং রুমে বা আইসিইউয়ের সামনের ক্যাফেতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জার্নালিস্টরা থাকবেই। তারা ঐশানীকে চিনে ফেললে প্ল্যান ভন্ডুল হয়ে যাবে।
ট্যাক্সি ভাড়া মিটিয়ে, প্রধান ফটক ব্যবহার না করে পাশের দরজা দিয়ে ঢুকল ঐশানী। এটা সেন্টিনেলের স্টাফেরা ব্যবহার করে। এ দিকে সাংবাদিকদের ভিড় থাকে না।
লিফটের সামনে কয়েকজন সাংবাদিক দাঁড়িয়ে। ঐশানী ডিসিশন নিল, তিনতলা পর্যন্ত হেঁটে উঠবে। তারপর লিফ্ট। দোতলায় পৌঁছে কাচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল ঐশানী। সেন্টিনেলের প্রধান ফটক আলোয় ঝলমল করছে। রোগীর বাড়ির লোক, সাংবাদিকদের জটলার মধ্যে কালো এসইউভি ঢুকল! সীমান্তর কাছে ঐশানী শুনেছে এই গাড়ি কৃতান্তর।
আর দেরি করা যাবে না। লাফাতে-লাফাতে সিঁড়ি টপকায় ঐশানী। আবার সীমান্তকে ফোন করে। আবারও রিং হয়ে হয়ে লাইন কেটে যায়।
তিনতলায় লিফ্ট পেয়ে গেল ঐশানী। সাততলায় পৌঁছে কোনও দিকে না তাকিয়ে আইসিইউ-এর পাশের দরজা দিয়ে ডাক্তারদের রেস্টরুমে ঢুকল।
সিস্টার নমিতা কানে মোবাইল গুঁজে ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঐশানীকে দেখে বলল, “তুমি এসে গিয়েছ? বাঁচালে। ডক্টর ঘোষ ফোন ধরছেন না।”
“সীমান্ত চলে আসবে,” সিস্টার নমিতার কাছ থেকে রোগীদের পরার ঢলঢলে ওভারল নেয় ঐশানী, “আপনার বস চলে এসেছেন।”
“তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হও,” ঐশানীকে এক ধাক্কায় মেয়েদের রেস্টরুমে পাঠিয়ে দিয়েছে সিস্টার নমিতা। পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে ঐশানী পোশাক বদলে রেডি। সিস্টার নমিতা তাকে নিয়ে আইসিইউতে ঢুকল। বলল, “আট নম্বরে উৎপল। ন’য়ে তুমি।”
“দশে ঝিমলি?” ফিসফিস করে বলে ঐশানী।
“চুপ!” ঐশানীকে আইসিইউয়ের রেলিং দেওয়া খাটে শুইয়ে তুলে পরদা টেনে দেয় সিস্টার নমিতা। সবুজ কম্বলের নীচে ঢুকে ঐশানী মোবাইল ফোন সাইলেন্ট মোডে পাঠায়। স্পাই ক্যাম পরদার ফাঁকে রেখে অন করে দেখে নেয়। চমৎকার ছবি আসছে। এখন কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়ের প্রতীক্ষা।
আর, বাই দ্য ওয়ে, সীমান্ত কোথায় গেল?
*
কার পার্কিংয়ে কালো এসইউভি থেকে নামলেন কৃতান্ত। আজ শরীর আবার টলমল করছে। মনে হচ্ছে, শীতঘুম থেকে জেগেছে অজগর সাপ। খোলস ছেড়ে সর্পিল গতিতে এগচ্ছে। এখন তার খাবার চাই! অনেকদিন এ শরীর অভুক্ত। প্রাণের সন্ধানে, সরু চোখে জিভ লকলক করে সে এগোচ্ছে।
পাশের গাড়িতে বসে রয়েছে শুক্লা আর মনোময়। মনোময় একটা বান্ডিল কৃতান্তর দিকে এগিয়ে বলল, “পাঁচশোয় আছে। সব ইউজড কারেন্সি।”
এসইউভির পিছনের দরজা খুলে দেন কৃতান্ত। মনোময় সেখানে বান্ডিল রেখে দিল। আবার এসইউভিতে বসে ইঞ্জিন বন্ধ করেন কৃতান্ত। গাড়ি থেকে নেমে রিমোট টিপে গাড়ি লক করে বলেন, “আপনারা এখানে বসে না থেকে ওয়েটিং রুমে যান।”
মনোময় আর শুক্লা গাড়ি থেকে নামছে। কৃতান্ত কার পার্কিং থেকে বেরিয়ে লিফটের কাছে গেলেন। আশা করা যায় যে শেলি এখনও আসেনি।
লিটম্যান সেলাম করে সরে দাঁড়াল। কৃতান্ত লিফটে উঠলেন। সারা শরীর জুড়ে প্রবল আনচান। চেতনা জুড়ে তীব্র মৃত্যুতৃষ্ণা। হননকাল এক মুহূর্তের। কিন্তু তার আগের এই মিনিটগুলো কৃতান্ত খুব এনজয় করেন। এ যেন মৃত্যুর সঙ্গে ফোরপ্লে। হাতে হাত, অধরে অধর, স্পর্শে বিদ্যুৎ, মাথায় চিড়িক-চিড়িক স্পার্ক। গাঢ় শ্বাস নিয়ে সাততলার মেঝেতে পা রাখলেন কৃতান্ত। পুরো ফ্লোর ফাঁকা। ক্যাফে খালি। নিজের ক্লোজেট খুলে অ্যাপ্রন, মাস্ক ও টুপি নিয়ে কৃতান্ত বললেন, “সিস্টার, শেলি এসেছে?”
সিস্টার নমিতা উত্তর দিল, “না।”
“আপনার কি শরীর খারাপ? গলাটা অন্যরকম লাগছে।”
“হ্যাঁ। মাথাব্যথা করছে। ট্যাবলেট খেয়েছি। আপনি প্লিজ আমাকে আধঘণ্টা সময় দিন,” অনুরোধ করছে সিস্টার নমিতা। পোশাক বদলে বাথরুম থেকে বেরোলেন কৃতান্ত। সিস্টার নমিতা রেস্ট নিক। এই ফাঁকে কাজ সেরে ফেলতে হবে।
আইসিইউ জুড়ে হালকা নীল আলো। দশ নম্বর বেডের দিকে তাকাতে গিয়ে ন’নম্বর বেডের দিকে চোখ পড়ল। নতুন পেশেন্ট ভর্তি হয়েছে। সিস্টার কিছু বলল না তো!
এই নিয়ে পরে ভাবা যাবে। আট নম্বর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে উৎপলের পাল্স দেখলেন কৃতান্ত। স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুকের শব্দ শুনলেন। গলায় হাত রেখে ক্যারোটিভ আর্টারির স্পন্দন অনুভব করলেন। খসখসে, মৃতপ্রায় ত্বক স্পর্শ করলে নেশা হয়ে যায়! মাথা বুঁদ হয়ে আসে। নাকের পাটা ফুলে ওঠে!
কোটের পকেট থেকে সিরিঞ্জ বের করলেন কৃতান্ত। ৫০ মিলিলিটারের এই সিরিঞ্জে আছে মারণ বিষ। যা উৎপলের শরীরে প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে। উৎপলের হাতে আইভি লাইন করা আছে। স্যালাইনের পাইপে সিরিঞ্জের ছুঁচ ফোটালেন কৃতান্ত। সিরিঞ্জের পিস্টন টিপে ভরে দিলেন পঞ্চাশ মিলিলিটার বিষ।
আসলে ৫০ মিলিলিটার হাওয়া! ফাঁকা সিরিঞ্জের পিস্টন টেনে, সিরিঞ্জে হাওয়া ভরে, সেই হাওয়া উৎপলের ধমনীতে পাঠালেন কৃতান্ত। রক্তের মধ্যে তৈরি হল এয়ার বাবল। হাওয়ার বুদ্বুদ। একটু বাদেই রেসপিরেটরি ডিসট্রেসে মারা যাবেন উৎপল।
ভেন্টিলেটরের টাচ স্ক্রিনে আঙুল রেখে উৎপলের রক্তের অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমাচ্ছেন কৃতান্ত। এভাবেও উৎপলকে মারা যেত। কিন্তু সেই মৃত্যুতে কৃতান্তর স্বাক্ষর থাকত না। প্রকৃত শিল্পীর মতো তিনিও তাঁর সৃষ্টির এক কোণে স্বাক্ষর রেখে যান, ‘কৃ চ’।
পাশের বেড থেকে খশখশ শব্দ আসছে। ন’নম্বর বিছানার দিকে তাকালেন কৃতান্ত। এই বেডের নতুন পেশেন্টের কথা সিস্টার তাকে ইনফর্ম করেনি। পেশেন্ট দেখার জন্য বেডের পরদা সরাতে যাবেন কৃতাস্ত, এমন সময় একসঙ্গে তিনটে ঘটনা ঘটল।
আট নম্বর বেডে শায়িত উৎপল বসুমল্লিক মারা গেল। বেডসাইড মনিটরের আঁকাবাঁকা রেখা স্ট্রেট লাইন হয়ে গেল। যাবতীয় মেশিন অ্যালার্ম দিতে শুরু করল।
ন’নম্বর বেডের পরদা সরিয়ে একটি মেয়ে বলল, “এটা আপনার জীবনের কত নম্বর হত্যা ডক্টর চট্টোপাধ্যায়? নাকি ‘ডক্টর ডেথ’ বলে সম্বোধন করব?”
কৃতান্ত কোনও উত্তর দেওয়ার আগে দশ নম্বর বেড থেকে শোনা গেল ক্ষীণ গলায় ডাক, “গাঁ… গাঁ…। গাঁ… গাঁ গাঁ… গাঁ।”
ন’নম্বর বেডের মেয়েটিকে বা তার হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে এক লাফে দশ নম্বর বিছানার পাশে গিয়ে পরদা সরালেন কৃতান্ত। চিৎকার করে বললেন, “ঝিমলি কথা বলছে! সিস্টার, ঝিমলি কথা বলছে। মেডিক্যাল মির্যাকল। শি ইজ ব্যাক ফ্রম কোমা আফটার টোয়েন্টি ইয়াস।”
সিস্টার নমিতা দৌড়ে এসে বলল, “সাইলেন্স! এটা আইসিইউ!”
