এলেম নতুন দেশে

এলেম নতুন দেশে

দেড়টার সময় বেরিয়েছিল লিমা আর ঐশানী। সেন্টিনেলের সাততলা বাড়িটা ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসে। সায়েন্স সিটি পেরিয়ে কসবার দিকে কিছুটা গেলেই ডানদিকে পড়ে। অফিসের পুলকারে সেখানে পৌঁছে লিমা ডক্টর কুইলার আন্ডারে ভরতি হয়। গাইনি ওয়ার্ড তিনতলায়। সেখানকার কেবিনে লিমাকে গ্যারাজ করে করিডরে বেরিয়েছিল ঐশানী। এবার সীমান্তকে ফোন করা যেতে পারে।

সীমান্তর কাছে শুনে সেন্টিনেলের ইতিহাস ও ভূগোল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা ছিল ঐশানীর। গত শতকের আটের দশকের গোড়ার দিকে পাঁচ অনাবাসী ভারতীয় চিকিৎসক মিলে সেন্টিনেলের জন্ম দেয়। এরা সবাই কলকাতার ছেলে। এমআরসিপি অথবা এফআরসিএস করতে ইংল্যান্ডে গিয়েছিল। বছরদশেক ওখানে থাকার পরে কলকাতার জন্য মনকেমন শুরু হয়। যেসব চিকিৎসক দীর্ঘদিন বিদেশবাস করার পরে কলকাতায় নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চান, তাঁদের সামনে দুটো অপশন। প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করা, অথবা কর্পোরেট হসপিটালে স্পেশালিস্ট হিসেবে যোগদান করা।

এই পাঁচজন সেই দু’টি চেনা রাস্তায় না হেঁটে নিজেরাই জমি কিনে নার্সিংহোম তৈরি করেন। নাম দেন সেন্টিনেল নার্সিংহোম। ৩৫ বছর আগে তৈরি তিনতলা সেই নার্সিংহোম আজ নাম ও চেহারা বদলে, সাততলা সেন্টিনেল মেডিক্যাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট বা এসএমআরআই। সেন্টিনেলের পাঁচতলার মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে সীমান্ত কাজ করে।

সেন্টিনেলের প্রতি ফ্লোরেই ক্যাফে আছে। কফি ছাড়াও চা, কোল্ড ড্রিংক, বিস্কুট, বার্গার, এইসব পাওয়া যায়। ঐশানী যখন সীমান্তকে ফোন করল, তখন সে আইসিইউ-এর ডাক্তারদের রেস্টরুমে বসে কফি খাচ্ছে। ঐশানী বলেছিল, “আমি সেন্টিনেলের তিনতলায়। তুমি নীচে আসবে, না আমি উপরে যাব?”

“তুমি সেন্টিনেলে!” সীমান্ত অবাক, “গাইনি ফ্লোরে কী করছ?”

“অ্যাবরশন করাতে এসেছি,” ঠান্ডা গলায় বলেছিল ঐশানী।

“কার? তোমার ওই শুঁটকি কলিগটার?”

“কী করে বুঝলে?”

“তোমার সোশ্যাল সার্কল খুব ছোট পুঁটুরানি। এসব বুঝতে সময় লাগে না। তুমি এখানে এসো না। আমি নামছি। পাঁচতলার মেডিসিনে আর সাততলার আইসিইউতে আজ তোমাদের পেশার লোকেদের ভিড়।”

“আমিও নন্দিনী সরকারের জন্যই এসেছি।”

“খোদ হর্স তোমার কাছে যাচ্ছে। তুমি খবর পাবে হর্সেজ় মাউথ থেকে।”

ঐশানী উপরে ওঠেনি। তিনতলায় ক্যাফেতে বসে নন্দিনী সরকারের শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়েছিল সীমান্ত।

“জি ইউ এল এল এ আই এন…” স্মার্টফোনের ইন্টারনেটে সার্চ করেছে ঐশানী, “ফরাসি না জানা লোক বলবে ‘গুলেন বেরি সিনড্রোম’। তুমি বলছ এর উচ্চারণ ‘গুল্যা বারি সিনড্রোম’…”

“তোমরা মুখে যে-গোলাপ জল বা গুলাবারি মাখো, তার ল-য়ের পাশে একটা য-ফলা আর মাথায় একটা চন্দ্রবিন্দু বসালে যে শব্দটা তৈরি হবে সেটাই নন্দিনীর হয়েছে,” কফিতে চুমুক সীমান্তর, “সেন্টিনেলের তরফ থেকে একটু বাদে প্রেস রিলিজ আছে। সাংবাদিকদের সেটা পড়ে শোনাবেন আমাদের সার্জন এবং পাবলিক রিলেশন অফিসার মঞ্জুলা সেন। কপিটা আমিই লিখেছি।”

“পিআরও নিজে কপি লিখতে পারে না?”

“মঞ্জুলাদি সার্জন। গত কয়েক বছর হল হাতে ফাইন ট্রেমর শুরু হয়েছে। ট্রেমর মানে…”

“হাত কাঁপা। আমি জানি।”

“মঞ্জুলাদি আর ওটি করতে পারে না, বা লিখতে পারে না। ওই জন্যে আইসিইউতে শিফ্‌ট করেছে। প্লাস এখানকার পিআরও। দিনরাত এখানেই পড়ে থাকে। এনিওয়ে, যেটা বলছিলাম। আমার কপিতে গুল্যা বারি সিনড্রোমের কথা বলা নেই। বলা আছে অ্যাসেন্ডিং প্যারালিসিসের কথা। পেশেন্টের সঙ্গে ডাক্তারের একটা অলিখিত নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট থাকে। রুগির অনুমতি ছাড়া চিকিৎসক রুগির সবচেয়ে কাছের জনকেও কিছু বলতে পারে না…”

“প্রেস রিলিজ়ে যা বলা হচ্ছে, তাতে নন্দিনীর অনুমতি আছে?” সীমান্তকে থামিয়ে জানতে চেয়েছিল ঐশানী।

সীমান্ত বলেছিল, “নন্দিনী এখনও ভেন্টিলেটরে। অনুমতি দেওয়া বা না দেওয়ার ঊর্ধ্বে। এসব ক্ষেত্রে রুগির কাছের লোক যা বলবে, সেটাই আমাদের মানতে হবে।”

“নন্দিনীর কাছের লোক মানে ওঁর হাজব্যান্ড।”

“হ্যাঁ। অমল সরকার। থরো জেন্টলম্যান। উনি চাইছেন না যে, নন্দিনী সম্পর্কে বেশি কথা মানুষ জানুক। তাই প্রেস রিলিজে শুধু অ্যাসেন্ডিং প্যারালিসিসের কথা বলা হয়েছে। নন্দিনী যে কোমায়, নন্দিনী যে ভেন্টিলেটরে, নন্দিনীর যে গুল্যা বারি সিনড্রোম হয়েছে, এগুলো জানানো হয়নি। আমি তোমাকে জানালাম। তুমি সাবধানে লিখো পুঁটুরানি। আমাকে বিপদে ফেলো না। বাই দ্য ওয়ে, তুমি কিন্তু আজ আমার সঙ্গে বারাসত যাচ্ছ।”

“আমি ছাড়াও সিসির আরও দু’জন নন্দিনীকে নিয়ে কাজ করছে। তুমি চাপ নিয়ো না পুচুসোনা! আর হ্যাঁ, আজ বারাসত যাব, “ সীমান্তকে টাটা করে ঐশানী সাততলায় দৌড়েছিল।

মঞ্জুলা সেন গড়গড় করে প্রেস রিলিজ় পড়ছে। টালিগঞ্জ বিটের অত্রি আড়চোখে ঐশানীকে মাপল।

প্রেস মিটের পরে মঞ্জুলাকে আলাদা করে পাকড়াও করে ঐশানী, “ম্যাডাম, আমি ক্যালকাটা সিটিজ়েনের ঐশানী। আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে।”

সিসির হেল্থ বিট করার সুবাদে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা ঐশানীর নাম জানে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ফেসবুক-বন্ধু। তবে সরাসরি আলাপ নেই।

মঞ্জুলাও ঐশানীর ফেসবুক-বন্ধু। তবে সীমান্তর ব্যাপারটা জানে না। একগাল হেসে মঞ্জুলা বলল, “হাই ঐশানী! কেমন আছ?”

“ভাল ম্যাডাম!” একগাল হেসে পরিবেশ হালকা করে ঐশানী, “প্রেস মিটের সময় ‘অ্যাসেন্ডিং প্যারালিসিস’ শব্দটা ইন্টারনেটে সার্চ করে দেখলাম এটার অন্যতম প্রধান কারণ গুলেন বেরি সিনড্রোম।”

“উচ্চারণটা গুল্যা বারি,” ঐশানীকে সংশোধন করে মঞ্জুলা, “আমি যা বলেছি তাতে স্টিক করো। এক্সট্রা কিছু অ্যাড করতে যেয়ো না।”

“ঠিক আছে ম্যাডাম। আপনি আমায় জাস্ট একটা ইনফর্মেশন দিন। নন্দিনীর স্পাইনাল ফ্লুইড কি ট্যাপ করা হয়েছে?”

“হ্যাঁ ডার্লিং, হয়েছে। আর একটাও কথা নয়। ঠিক আছে?” মুচকি হেসে গটগটিয়ে চলে যায় মঞ্জুলা। ঐশানী ফিরে আসে তিনতলার কফিশপে। ল্যাপটপে কপি রেডি করে অফিসে মেল করে দেয়।

তিনমিনিটের মাথায় তরুণের ফোন, “যা লিখেছিস তার প্রমাণ আছে?”

“আছে। তোমায় পাঠাব, না আমার কাছে রাখব?”

“আমায় পাঠা। শুনে দেখি। টপিকটা সেনসিটিভ,” উত্তর দেয় তরুণ। স্মার্টফোন থেকে তিনটে অডিও ক্লিপ ব্লু টুথের মাধ্যমে ল্যাপটপে ট্রান্সফার করেছিল ঐশানী। প্রথম ক্লিপে সীমান্ত আর তার কথোপকথন। দ্বিতীয় ক্লিপে মঞ্জুলার সঙ্গে তার কথোপকথন। তিন নম্বর ক্লিপে সেন্টিনেলের প্রেস মিট। নতুন মেল কম্পোজ় করে অ্যাটাচমেন্ট হিসেবে ক্লিপ তিনটে জুড়েছিল।

১৫ মিনিট বাদে আবার তরুণের ফোন। “গুড জব, সীমান্ত যে তোর লাভার এটা আগে বলিসনি তো!”

“অফিসে আমি পার্সোনাল লাইফ টানি না। আজ প্রসঙ্গ উঠল, তাই জানতে পারলে। বাই দ্য ওয়ে, সীমান্তর আইডেন্টিটি যেন ডিসক্লো না হয়। ও আমার সোর্স,” ঐশানী ফোন কাটল। ফোনালাপের মধ্যে একাধিকবার লিমার ফোন ঢুকেছে। তাড়াতাড়ি লিমার কেবিনে ঢোকে ঐশানী।

কেবিনের সিস্টার ভুরু কুঁচকে লিমাকে মাপছে। লিমা ব্যাগে ল্যাপটপ ঢোকাচ্ছে। ঐশানীকে চোখ মেরে বলল, “অ্যাবরশন হয়ে গিয়েছে। ডক্টর কুইলা ছুটি দিয়েছেন। এবার আমি বাড়ি যাব।”

কেবিন থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগতে-এগতে লিমা বলল, “কপি মেল করে দিয়েছি। তোর কী খবর?”

“আমিও তাই,” কাজের আলোচনা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসে ঐশানী, “তুই কোনদিকে যাবি?”

“আমি পিজি ফিরব,” অফিসের পুলকারে উঠে বলল লিমা, “তুইও ওঠ। আমায় ড্রপ করার পরে তোকে বাড়ি পৌঁছে দেবে।”

“তুই বেরিয়ে যা। আমি ট্যাক্সি নিয়ে নেব।” পুলকারের ড্রাইভারের দিকে হাত নাড়ে ঐশানী। পুলকার বেরিয়ে যায়। সেন্টিনেলের বেসমেন্টের কার পার্কিংয়ে দাঁড়িয়ে ফোন করে ঐশানী। ছ’টা বাজে। সীমান্তর ডিউটি এক্ষুনি শেষ হল।

বাইপাস দিয়ে ঝড়ের গতিতে যাচ্ছে সীমান্তর বাইক। স্পিডোমিটারের কাঁটা ১০০ থেকে ১২০-র মধ্যে ওঠানামা করছে। হেলমেট পরে থাকা সত্ত্বেও ঐশানীর কান ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। সবুজ টি-শার্ট আর গোলাপি জ্যাকেটের মধ্যে দিয়ে অক্টোবরের ঠান্ডা বাতাস ছুঁচ ফোটাচ্ছে। ঐশানী যদি জানত যে, আজ বারাসত যেতে হবে, তাহলে হুডি গলিয়ে বেরত।

তিনতলার ক্যাফেতে সীমান্ত ঐশানীকে বলেছিল, “তুমি আজ আমার সঙ্গে বারাসত যাচ্ছ।” ঐশানী আপত্তি করেনি। ব্যস্ততা এবং দূরত্বের কারণে সীমান্তর সঙ্গে সপ্তাহে একবারের বেশি দেখা হয় না। হোয়াট্সঅ্যাপ, স্কাইপ আর ফোনালাপে কত দিন চলে? আজ যখন কাজের খাতিরে সীমান্তর কাছে চলেই এসেছে, এবং অফিসে ফেরার তাড়া নেই, তাহলে ঘুরে আসাই যায়। কাকুর সঙ্গেও অনেকদিন দেখা হয়নি।

কাকু মানে সীমান্তর বাবা অদ্রীশ ঘোষ। ৫৭ বছরের মানুষটি পেশায় উকিল। ফরসা, লম্বা, ব্যাকব্রাশ করা চুল, সুগঠিত চেহারা। সীমান্তর মা সুধা মারা গিয়েছে ১৪ বছর আগে। অদ্রীশ বিপত্নীক বৃদ্ধদের মতো থাকে না। নিয়মিত চুল কলপ করে, চোখে বিদেশি কোম্পানির চশমা, গায়ে বিদেশি সুগন্ধ, ধোপদুরস্ত পাজামা-পাঞ্জাবি আর বিদ্যাসাগরী চটি ছাড়া বাড়িতে অন্য পোশাকে দেখা যায় না। অদ্রীশের সাংঘাতিক বই পড়ার নেশা। প্র্যাকটিসিং লইয়ারদের বাড়িতে বুকরাক ভর্তি আইনি বই থাকেই। পেশাগত পড়াশোনার বাইরে অদ্রীশের কাছে বইয়ের বিশাল সংগ্রহ।

অদ্রীশ রোজ রাতে দু’পেগ সিঙ্গল মল্ট খায়। রোজ সকালবেলা হাঁটতে বেরয়। ভাবি শ্বশুরকে ঐশানী ‘কাকু’ বলেই ডাকে। অদ্রীশ ঐশানীকে খুবই পছন্দ করে। মাঝেমাঝেই ফোনে অনুযোগ করে, “তাসের দেশে আবার কবে আসবি? একেবারে বিয়ের পর?”

অদ্রীশের বাড়ির নাম ‘তাসের দেশ’। বারাসতের চাঁপাডালির মোড় থেকে যে-রাস্তাটা মোহনপুরের দিকে চলে গিয়েছে, সেই রাস্তায় চাঁপাডালির মোড় থেকে হাঁটা দূরত্বে এই বাড়ি।

তাসের দেশ নাম হলেও বাড়ির নকশায় বা গ্রিলের ডিজাইনে বোকাবোকা হরতন-চিড়েতন, ইস্কাবন-রুইতনের অনুষঙ্গ নেই। নাম ছাড়া এ বাড়িতে কোথাও তাস নেই। বাবা বা ছেলে, কেউই তাস খেলতে পারে না।

একতলায় পাশাপাশি দু’টি চেম্বার। একটি উকিলের। অন্যটি ডাক্তারের। বাবার চেম্বারে ভিড় লেগেই থাকে। ছেলের চেম্বার মাছি তাড়ায়। সেন্টিনেলে চাকরি করার কারণে সীমান্ত চেম্বারে সময় দিতে পারে না।

দু’টি চেম্বার ও সংলগ্ন বাথরুম ছাড়া একতলায় একটি বিশাল ড্রইংরুম। দোতলায় দু’টি মাস্টার বেডরুম, একটি গেস্ট রুম, কিচেন ও ডাইনিং স্পেস। তিনতলায় ঠাকুরঘর ও পারুলের ঘর। পারুল সকাল সাতটায় তাসের দেশে ঢোকে। রাত ন’টায় বেরয়। তার বিশ্রামের জন্য ঘর চাই বইকী! পারুল রাতে মোহনপুরে নিজের বাড়ি ফিরে যায়।

অদ্রীশ, সীমান্ত এবং পারুল ছাড়া এই বাড়িতে আর একটি প্রাণী থাকে। তার নাম বেগম। বেগম একটা গ্রেট ডেন কুকুর। সুধা মারা যাওয়ার পরে গ্যালিফ স্ট্রিট থেকে কুকুরটি কিনে আনে অদ্রীশ। স্ত্রীর মৃত্যুশোকের চেয়েও অসহ্য লাগত খাঁ-খাঁ বাড়ি। সীমান্ত তখন মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে। একটা কুকুর থাকলে অন্তত ঘেউঘেউ আওয়াজ তো হবে!

তিনমাসের সেই বেগম আজ ১৪ বছরের বৃদ্ধা। চোখে ছানি পড়ে গেছে। হাঁটুতে আথ্রাইটিস। নিত্যনতুন ব্যামোয় ভুগে ধপধপে ফরসা, বিশাল গ্রেট ডেন এখন শীর্ণকায়। লোম উঠে গিয়ে ফরসা চেহারায় ধূসর ছোপ। ওষুধ লাগালেও গায়ের পোকা যাচ্ছে না। গত পরশু এবং কাল রক্তবমি করেছিল। আজ সকাল থেকে দাঁড়াতে পারছে না। বারাসতের বিখ্যাত পশু চিকিৎসক মিলন দত্ত বেগমের চিকিৎসা করে। সে জানিয়ে দিয়েছে, বেগম আর বাঁচবে না। ১৪ বছর একটা কুকুরের জীবনে অনেক বয়স।

বাইক চালাতে-চালাতে সীমান্ত বলল, “কেমন লাগছে?”

ঝোড়ো হাওয়ায় কথা শোনা যাচ্ছে না। সীমান্তকে দু’হাতে জাপটে ধরে, পিঠে মাথা রেখে ঐশানী চেঁচাল, “কী বললে?”

“অন্য সময় বুকে হাত দিতে গেলে চিৎকার করো। এখন আমার পিঠে বুকদুটো ঠেসে ধরছ। কী ব্যাপার বলো তো?” উত্তেজিত হয়ে চেঁচায় সীমান্ত।

“হাত দিতে পারবে না বলেই এইরকম করেছি। আর তোমাদের আবার হাত লাগে নাকি? বাসেট্রামে তো কনুই দিয়ে কাজ সারো। ছেলেদের মোটোই হল, ‘তোমার সঙ্গে প্রাণের খেলা খেলব। সকাল বিকেল এলবো দিয়ে ঠেলব’!”

“এলবো দিয়ে ঠেলব! এটা দারুণ দিয়েছ,” হো হো করে হাসছে সীমান্ত, “আসলে এলবো হোক বা হাত, কন্ট্রোল আমার হাতে। এখন কন্ট্রোল তোমার হাতে, সরি বুকে। এটা মেনে নিতে অসুবিধা হচ্ছে। আমি সেক্সুয়ালি এক্সপ্লয়েটেড ফিল করেছি।”

“গুড! এক্সপ্লয়েটেড হওয়া প্র্যাকটিস করো,” হাত বাড়িয়ে সীমান্তর থাইয়ে চিমটি কাটে ঐশানী। সীমান্ত চেঁচিয়ে বলে, “ওরকম কোরো না! অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে। তখন যে এক্সপ্লয়েট করছে, আর যে এক্সপ্লয়েটেড হচ্ছে, দু’জনেই হেড ইনজুরি নিয়ে অক্কা পাবে!”

সীমান্তর বাইক ফ্লাইওভার ধরেছে। ভুজিয়াওয়ালার মোড় পর্যন্ত মসৃণ রাস্তা। পাখির মতো উড়ছে বাইক। একশো দশ… কুড়ি … তিরিশ …

ভিআইপি রোড আর যশোর রোডের ক্রসিংয়ে কুচ্ছিত জ্যাম থাকে। সেটা অ্যাভয়েড করার জন্য এয়ারপোর্টের রাস্তায় ঢোকে সীমান্ত। এয়ারপোর্টের আড়াই নম্বর গেট দিয়ে বেরিয়ে যশোর রোডে পড়ে।

সরু রাস্তা, অজস্র গাড়ি, ধোঁয়াশা, লরির হেড লাইট। চাঁপাডালির মোড়ে পৌঁছতে আরও ৪০ মিনিট। তাসের দেশের গ্যারাজে সীমান্ত যখন বাইক ঢোকাল, ঘড়িতে সাড়ে সাতটা।

বাইক থেকে নেমে স্ট্রেচিং করতে-করতে ঐশানী বলল, “আমি ফিরব কী করে?”

“বারাসত থেকে গাদা গাদা চার্টার্ড বাস ধর্মতলা যায়। শিয়ালদহ পৌঁছতে ম্যাক্সিমাম একঘণ্টা। টেনশন করছ কেন?”

“যদি না পাই?”

“উত্তরবঙ্গ পরিবহণের সরকারি বাস সারারাত চলে। বসিরহাট কলকাতার স্টেটবাসও থাকবে। ডাকবাংলোর মোড় থেকে ধরিয়ে দেব। টেনশন কোরো না।”

“ভাবছিলাম রাত্তিরে থেকে যাব,” সীমান্তর পেটে খোঁচা মারে ঐশানী।

সীমান্ত বলে, “কোনও প্রবলেম নেই। তবে ডোন্ট এক্সপেক্ট সেক্স। আজ বেগম মারা যাবে। বাবার সাংঘাতিক মন খারাপ। আমারও মন ভাল নেই।”

একতলায় দুটো চেম্বারই তালা বন্ধ। অন্ধকার ড্রইংরুম পেরিয়ে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠে ঐশানী। গোটা ফ্লোর শুনশান। তিনতলা থেকে অদ্রীশের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ঐশানী বলল, “বেগম আজই মারা যাবে, এটা কী করে জানলে?”

সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠতে-উঠতে সীমান্ত বলল, “মিলনদা বেগমের মার্সি কিলিং করবে।”

“মার্সি কিলিং!” তিনতলায় পৌঁছে থমকায় ঐশানী। পুরনো আমলের আরামকেদারায় বসে রয়েছে অদ্রীশ। আরাম করে শরীর এলিয়ে বসে থাকা নয়। গালে হাত দিয়ে, শিরদাঁড়া সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে টেনশনের বসে থাকা। ছয়ফুটিয়া গ্রেট ডেন পাশ ফিরে শুয়ে রয়েছে। বছর চল্লিশের এক ভদ্রলোক পঞ্চাশ মিলিলিটারের মোটা সিরিঞ্জ দিয়ে ঘোলাটে ওষুধ বেগমের পায়ে ইনজেক্ট করছে। এক কোণে দাঁড়িয়ে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছে পারুল।

ঐশানী পারুলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পারুল ঐশানীর কাঁধে মাথা রেখে বলল, “কত মানুষ চেষ্টা করেও বাচ্চা পায় না। কত মানুষের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা নেই। অথচ দেখো, দিব্যি একজনকে মেরে ফেললাম!”

সিরিঞ্জের পুরো তরল বেগমের শরীরে প্রবেশ করেছে। বেগম হঠাৎ ঝটকা মেরে উঠে বসল। ঘোলাটে চোখে ঐশানীকে দেখে সামান্য লেজ নাড়াল। ঐশানীর মনে পড়ে গেল, সে তাসের দেশে এলে বেগম গাঁউগাঁউ চিৎকার করে তার কাঁধে দু’পা তুলে দাঁড়িয়ে গোলাপি জিভ দিয়ে সারা মুখ চেটে দিত। প্রথম-প্রথম ভয় পেত ঐশানী। পরের দিকে অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। বেগমকে সরিয়ে বাথরুম গিয়ে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুত।

বেগম উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সামনের দু’পা উঠলেও পিছনের পা দুটো উঠল না। বসে থাকা অবস্থায় থরথর করে কাঁপছে। পারুল ঐশানীর কাঁধ খিমচে ধরেছে। অদ্রীশ হাতের চেটোয় মুখ লুকোল।

মিনিটখানেকের কনভালশন। নিথর হয়ে গেল বেগম। অ্যাটাচি বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে মিলন বলল, “বেগমের ক্রিমেশনের কী হবে?”

“বাগানের ছাতিমগাছের নীচে আমি আর দাদা মিলে গর্ত করে রেখেছি,” কাঁদতে-কাঁদতে মিলনকে বলে পারুল, “চলুন ডাক্তারবাবু, আপনাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিই।”

“আসছি স্যার,” অদ্রীশের কাঁধ স্পর্শ করে মিলন। পারুলের সঙ্গে নীচে চলে যায়। সীমান্ত এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। এবার বলল, “বাবা, ঐশানী এসেছে।”

“জানি,” ঐশানীর দিকে তাকাল অদ্রীশ, “আমি আর ঐশানী আমার ঘরে বসছি। তুই মিলনের প্রফেশনাল ফি দিয়ে আয়।”

“আচ্ছা,” তড়বড়িয়ে নীচে যায় সীমান্ত।

অদ্রীশের ঘরের চেয়ারে বসে ঐশানী বলল, “জান কাকু, আজ সকাল থেকেই কিছু একটা হয়েছে। বারবার মৃত্যু আর হত্যার নানা অনুষঙ্গ আমার চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে।”

অদ্রীশ চুপ।

ঐশানী বলে, “মার্সি কিলিং শব্দটা অক্সিমোরন। ‘ক্ষমা’ আর ‘হত্যা’ একে অপরের পাশে বসতেই পারে না।”

অদ্রীশ ঐশানীর দিকে তাকিয়ে হাসল। তার দু’চোখে টলটল করছে অশ্রু। বলল, “তুই এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছিস, যে বিষয়টা নিয়ে কনটেমপোরারি বায়োএথিক্‌সে সবচেয়ে বেশি চর্চা এবং গবেষণা হচ্ছে। এর এথিকাল, মরাল, এবং লিগাল ইসু নিয়ে সারা পৃথিবী তোলপাড় হচ্ছে।”

“তুমি কীসের কথা বলছ?”

“ইউথ্যানেসিয়া।”

“গ্রিক ভাষায় ‘ইউ’ মানে ভাল। ‘থ্যানাটস’ মানে মৃত্যু। ইউথ্যানেসিয়া মানে স্বেচ্ছামৃত্যু।”

“স্বেচ্ছামৃত্যু শব্দটা নিয়ে আমার আপত্তি আছে। মহাভারতে ভীষ্মর স্বেচ্ছামৃত্যুর সঙ্গে ইউথ্যানেসিয়ার তফাত আছে। আমি প্রেফার করি ‘নিষ্কৃতি-মৃত্যু’ বা ‘স্বেচ্ছা-প্রস্থান’। ইউথ্যানেসিয়ার সংজ্ঞা হল, ‘প্র্যাকটিস অফ ইনটেনশনালি এন্ডিং আ লাইফ, ইন অর্ডার টু রিলিভ পেন অ্যান্ড সাফারিং।”

দেওয়ালঘড়ির দিকে তাকায় ঐশানী। আটটা বাজে। আজ বাড়ি ফিরতে প্রবলেম হবে। সীমান্ত যতই বড়-বড় কথা বলুক না কেন, এইসব মফস্সল এলাকা রাত আটটার পর শুনশান হয়ে যায়।

ঐশানীর দোটানা আন্দাজ করে অদ্রীশ বলল, “রাত্তিরে থেকে যাবি? আমি তোর বাবা-মা-কে ফোন করব?”

“থাকা যাবে না কাকু,” কাঁচুমাচু মুখ করে বলে ঐশানী, “কমফর্টেব্‌ল ফিল করব না। তা ছাড়া কাল অফিস আছে। সীমান্ত আমাকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে দিক। বাকিটা আমি ম্যানেজ করে নেব।”

“কোনও দরকার নেই,” চেয়ার থেকে উঠে জানালা দিয়ে নীচে তাকাল অদ্রীশ, “আমি নিজে গাড়ি চালিয়ে তোকে বাড়ি পৌঁছে দেব। টেনশন না করে বোস। ওদের কাজ শেষ। পারুল কফি করবে।”

ঐশানীর বেজায় খিদে পেয়েছে। সে পারুলের জন্য অপেক্ষা না করে কিচেনে হানা দিল। ফ্রিজে হিমায়িত চিকেন নাগেট্স আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই রয়েছে। ঝটপট ভেজে নিয়ে, সাদা প্লেটের উপর পেপার ন্যাপকিন বিছিয়ে সাজিয়ে ফেলল মুখরোচক খানা। ছোট্ট বাটিতে নিয়েছে কাসুন্দি। এইসব করার ফাঁকে গ্যাসে জলও চড়িয়ে দিয়েছে। ফুটতে না ফুটতেই কফি, দুধ আর চিনি মিশিয়ে রেডি করে ফেলেছে গরমাগরম কফি। ট্রেতে তিন মাগ কফি আর স্ন্যাক্স নিয়ে আবার অদ্রীশের ঘরে। বেগমকে কবর দিয়ে উপরে এসে সীমান্ত বাথরুমে ঢুকে গিয়েছে। পারুল চলে গিয়েছে তিনতলায়। ঐশানী আন্দাজ করল সে-ও স্নান করছে।

অদ্রীশ চেয়ারে বসে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে। বিশাল ফোটোফ্রেম থেকে সুধা হাসিমুখে অদ্রীশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সুধা মারা গিয়েছে ৩৭ বছর বয়সে। মৃত মানুষের বয়স বাড়ে না। ৫৭ বছরের অদ্রীশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ৩৭ বছরের স্ত্রী। বেঁচে থাকলে সুধা ৫১ হত।

ঐশানী বলে, “কী ভাবছ কাকু?”

“বাড়িটা আবার নিঃশব্দ হয়ে গেল,” নিচু গলায় বলে অদ্রীশ। সীমান্ত স্নান সেরে বারমুডা-টিশার্ট গলিয়ে ঘরে ঢুকেছে। চিকেন নাগেট কাসুন্দিতে ডুবিয়ে মুখে পুরে বলল, “কুকুর পোষার অনেক হ্যাপা। কুকুর আনকন্ডিশনাল ভালবাসে। মানুষের মতো জাজমেন্টাল নয়। যার ফলে কুকুর সম্পর্কে কোনও খারাপ স্মৃতি থাকে না। মরে গেলে কষ্ট অনেক বেশি হয়।”

ঐশানী দেখল সীমান্তর চোখ লাল। বোধহয় বাথরুমে কেঁদেছে। ঐশানী কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “কাকু, খাও। তোমার জন্য বানালাম।”

“হুম!” গলা খাঁকরে অদ্রীশ আবার স্বমহিমায়। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাচ্ছে, কফিতে চুমুক দিচ্ছে, ‘অ্যাকটিভ’ আর ‘প্যাসিভ’ ইউথ্যানেসিয়ার তফাত বোঝাচ্ছে। সীমান্ত অবাক হয়ে বলল, “বেগমের মার্সি কিলিং থেকে ইউথ্যানেসিয়ার প্রসঙ্গ এল বুঝি?”

“হ্যাঁ,” ঘাড় নাড়ে ঐশানী, “আসলে প্রাণ নেওয়ার অধিকার মানুষের আছে কিনা, এটা নিয়ে আমি বদার্ড। মার্সি কিলিং তো আসলে কিলিং। ইন ফ্যাক্ট, আত্মহত্যাও কি হত্যা নয়? শব্দটার মধ্যেই তো ‘হত্যা’ রয়েছে। আমি যতদূর জানি, আত্মহত্যা করতে গিয়ে কেউ ব্যর্থ হলে ইন্ডিয়ান পেনাল কোডে তার শাস্তির ব্যবস্থা আছে।”

ঘরের সবাই চুপ। কফির মাগ থেকে ধোঁয়া উঠছে। চিকেন নাগেট আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ঠান্ডা হয়ে আসছে। দরজায় দাঁড়িয়ে পারুল ইশারায় ঐশানীকে চুপ করতে বলছে।

হঠাৎ ঐশানী নিজের ভুল বুঝতে পারল। তার মনে ছিল না যে, সুধা আত্মহত্যা করেছিল। কেরোসিনে স্নান করে শাড়ির আঁচলে লাইটার ধরিয়েছিল। দিনের বেলা। তিনতলার ছাদে। পাড়ার সবাই সে দৃশ্য দেখেছিল।

ভিতরে কত কষ্ট থাকলে এত পেনফুল মৃত্যুর পথ কেউ বেছে নেয়! অথচ আপাতদৃষ্টিতে সুধা খুব সুখী মহিলা ছিল। সফল, কেয়ারিং স্বামী, হিরের টুকরো ছেলে। তবুও…

কোনও সুইসাইড নোট ছিল না। সীমান্ত বা অদ্রীশ আজও জানে না সুধা কেন নিজেকে হত্যা করেছিল। সুধার মৃত্যু প্রসঙ্গ তাসের দেশে কখনও কেউ তোলে না।

অদ্রীশ বলল, “তুই ভুল জানিস ঐশানী। আইপিসির ৩০৯ নম্বর ধারা মেনে আত্মহত্যা করতে গিয়ে কেউ ব্যর্থ হলে তাকে সাজা হিসেবে সর্বোচ্চ এক বছরের জেল খাটতে হত। ওই ধারা বিলোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। মানসিক বা শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষই আত্মহত্যার কথা ভাবে। আত্মহত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হল বলে তাকে সাজা দেওয়াটা রাষ্ট্রের তরফে ক্রুয়েলটির পরিচয়। আর তোর যদি মনে হয় নিজেকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে নেওয়াটা অন্যায়, তা হলে সেই অন্যায় ভ্যান গঘ করেছেন, ভার্জিনিয়া উল্ফ করেছেন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে করেছেন, মেরিলিন মনরো করেছেন, রবিন উইলিয়াম্স করেছেন, গুরু দত্ত করেছেন, মনমোহন দেশাই করেছেন।”

মাথা নিচু করে ঐশানী বলল, “সরি কাকু!”

চেয়ার থেকে উঠে অদ্রীশ বলল, “চল! তোকে বাড়ি দিয়ে আসি। অনেক রাত হল।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *