চল রে চল সবে ভারতসন্তান
সারাদিন মোট ১০টা মিটিং করতে হয়েছে। রাজনৈতিক পথসভা নয়। সবক’টা দলীয় মিটিং। উলটোপালটা বকে পার পাওয়ার উপায় নেই। যারা মিটিংয়ে উপস্থিত আছে তারা সবাই জনাদেশ পার্টির নেতা। কেউ গ্রামের, কেউ শহরের, কেউ জেলার, কেউ রাজ্যের— কিন্তু নেতা সবাই। সবার নিজস্ব বক্তব্য আছে। আছে পার্টি লাইনের মধ্যে থেকে ছড়ি ঘোরানোর নয়া তরিকা। বাজে কথা থেকে কাজের কথাটুকু ছেঁকে নিতে নিতে ক্লান্ত উৎপল।
উৎপল বসুমল্লিক। জনাদেশ পার্টির রাজ্য কমিটির দুদে প্রেসিডেন্ট। জনাদেশ পার্টি ক্ষমতায় এসেছিল ১৯৮০ সালে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পশ্চিমবাংলার রাজপাট সামলে এখন সে অথর্ব, বেতো বাঘ। রাজনৈতিক দিশাহীন, করাপশনে জর্জরিত। বিকল্প রাজনৈতিক সংগঠন না থাকায় এতদিন জনাদেশ পার্টি একতরফা ছড়ি ঘুরিয়েছে। কিন্তু গত ১০ বছর ধরে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন দল উঠে আসছে।
স্বগত সরকারের প্রতিষ্ঠা করা পার্টির নাম ‘নতুন দল’। স্বাগত নিজে দীর্ঘদিন জনাদেশ পার্টির কর্মসূচি ও কর্মনীতির ধারা ও উপধারা উল্লেখ করে ঝগড়া করত। উৎপল আর তার সঙ্গী মনোময় দাশের সঙ্গে পেরে না উঠে অবশেষে পার্টি ছেড়ে দেয়।
জনাদেশ পার্টি কেউ ছাড়তে পারে না। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্টি তাকে বহিষ্কার করে। ছেড়ে দেওয়া অথবা ছাড়িয়ে দেওয়া, ঘটনা যাই হোক না কেন, স্বাগত পার্টির বাইরে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকেনি। সারা বাংলা টইটই করে ঘুরে বেড়িয়েছে। আগে গণভিত্তি স্থাপন করেছে। তারপর প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন দল।
আর পাঁচটা দলের সঙ্গে নতুন দলের তফাত আছে। শুধুমাত্র নির্বাচন কেন্দ্রিক কর্মসূচি থাকে না। নানান সেবামূলক কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও বন্যা, খরা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সারা বছর মানুষের পাশে থাকে। উৎপল শুনেছে ওদের পার্টির ক্লাসও হয়। অর্থাৎ ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলেছে স্বাগত।
আগামী বিধানসভা ভোটের এখনও দেড় বছর দেরি আছে। কিন্তু একাধিক নির্বাচিত জনপ্রিতিনিধির মৃত্যু হয়েছে। সামনেই উপ-নির্বাচন। উপ-নির্বাচনের সবক’টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে নতুন দল। রাজ্য কমিটির অভ্যন্তরীণ হিসেবে বলছে, প্রতিটি আসনে জনাদেশ আর নতুন দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। নতুন দল হয়তো কয়েকটা আসনে জিতবে। রাজ্য কমিটির নেতাদের কপালে ভাঁজ।
আজকের দশটা মিটিং-এর একটাই অ্যাজেন্ডা ছিল। আগামী উপ-নির্বাচন। উৎপল সংগঠক হিসেবে উপ-নির্বাচনের থিঙ্ক ট্যাংক। পাশাপাশি মোহনপুর উপ-নির্বাচনের মাঠঘাট চষে বেড়ানো দলীয় প্রার্থী।
উৎপলের পক্ষে দুটো দিক সামলানো সম্ভব। কেননা সে ভুঁইফোঁড় নেতা বা আর্মচেয়ার পলিটিশিয়ান নয়। কলেজে ছাত্র রাজনীতি করতে-করতে বৃহত্তর রাজনীতির আঙিনায় এসেছে। এবং তরতরিয়ে উত্থান। মিডিয়া বরাবর বলে আসছে, নতুন দলকে ঠেকাতে গেলে জনাদেশ পার্টির তরফে নতুন মুখ প্রয়োজন। এবং পাবলিক উৎপলকে পছন্দ করে।
ভোটে দাঁড়ানো, নির্বাচনে জেতা বা হারা উৎপলের কাছে নতুন ঘটনা নয়। কলেজে ইউনিয়নের ভোটে সে জিতেছে। মিউনিসিপ্যালিটির ভোটে হেরেছে। কর্পোরেশনের ভোটে জিতেছে। বিধানসভা ভোটে জিতেছে। ৬০ বছর বয়সে এসে এগুলো ম্যাটার করে না। যেটা ম্যাটার করে সেটা হল মিডিয়ার চাপ। অতীতে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার রমরমা ছিল না। খবরের কাগজের পেনিট্রেশনও কম ছিল। এখন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া তার দুই বাহুর মধ্যে পুরো পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে নিয়েছে। টিভি দেখে বা কাগজ পড়ে মানুষ ভোট দেয় একথা আজও উৎপল বিশ্বাস করে না। কিন্তু প্রতিদিন যেভাবে প্রতিটি ঘটনা মানুষের শোওয়ার ঘরে ঢুকে যাচ্ছে তার একটা প্রভাব তো আছেই।
মিটিংয়ে উপস্থিত লোকজন আস্তে-আস্তে বিদায় নিচ্ছে। এতক্ষণ মিটিং হলের এককোণে বসে টেলিফোনে কথা বলছিল উৎপলের বন্ধু, ছায়াসঙ্গী, রাজ্য কমিটির আর এক সদস্য মনোময় দাশ। সে এবার এগিয়ে এসে বলল, “আমি আজ পার্টি অফিসে থেকে যাব। তুই বাড়ি যা। রাত দশটা বাজে। শুক্লা না খেয়ে বসে আছে।”
সাইড ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় উৎপল। টুকটুক করে পার্টি অফিসের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাড়িবারান্দায় দাঁড়ায়। তাকে দেখে একটি সাদা অ্যাম্বাসাডর এগিয়ে আসে। গাড়িতে উঠে নাক টানে উৎপল, “মাস্তা, কিছু খেয়েছিস নাকি? গন্ধ আসছে কেন?”
ড্রাইভারের আসন থেকে উৎপলের বয়সি মানুষটি বলে, “আমি খাইনি। হাফবান্টি খাচ্ছিল। গাড়িতে গন্ধ রয়ে গিয়েছে।”
উৎপল মাস্তার কথা বিশ্বাস করল না। গাড়ি থেকে নেমে বলল, “আমি তোর মুখ শুঁকব।”
“শোঁকো। হ্যাঃ! হ্যাঃ।” উৎপলের মুখের কাছে এসে দু’বার শ্বাস ছাড়ে মাত্তা। উৎপল মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেন, “ইস! কী দুর্গন্ধ! কত দিন দাঁত মাজিস না?”
ড্রাইভারের আসনে বসে মান্তা বলে, “দাঁত না মাজলে পুলিশে ধরবে?”
উৎপল এখনও গাড়িতে ওঠেনি। সে বলল, “মাতালটা কোথায়?” গাড়ি থেকে মান্তা ইশারা করল, “ওই কোণে শুয়ে আছে।”
মান্তা আর হাফবান্টির জন্য খারাপ লাগে উৎপলের। ছেলে দুটোকে নিজের হাতে তৈরি করেছিল। আদর্শগত নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। সেগুলোর জন্য নিয়মিত বকুনিও খেত। কিন্তু ‘৯৫ সালে একটা বাজে ঘটনার সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলল। উৎপল ওদের বহুবার বলেছিল, আজেবাজে মেয়ের পাল্লায় পড়িস না। সেকথা শুনলে তো! একটা বেশ্যা আর একটা দালাল মিলে ওদের দু’জনকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রেসকোর্সের মাঠে নিয়ে গিয়েছিল। কী হয়েছিল কে জানে! ছেলেদুটো মেন্টালি আপসেট হয়ে পড়ে। উৎপলই ময়দান থানার মেজবাবুকে বলেকয়ে ওদের বাঁচায়।
তরুণ তুর্কিরা থানাপুলিশের হাত থেকে বাঁচল বটে, কিন্তু ওদের রাজনৈতিক উত্থান বন্ধ হয়ে গেল। ডানাছাঁটার কাজটা উৎপলই করেছে। জমানা বদলাচ্ছে। এখন আর শুধু মাস্ল পাওয়ার দিয়ে হবে না। ব্রেন এবং মাস্ল একসঙ্গে চাই। অনেক নতুন শার্প শুটার আসছে, যাদের ক্ষুরধার বুদ্ধি। অ্যাকশন স্কোয়াডে তাদের নিয়ে, মান্তা আর হাফবান্টিকে গাড়ি চালানো আর পার্টি অফিস দেখাশোনার দায়িত্ব দেয় উৎপল। আগের সেই ঝাঁ চকচকে ভাব ওদের মধ্যে আর নেই। বয়স বেড়েছে, পার্টি ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে, তবে উৎপলের প্রতি বিশ্বস্ততা যায়নি কারও।
হাফবান্টি খাটিয়ায় শুয়ে রয়েছে। মদ খেয়ে আউট। মুখের চারিদিকে মাছি উড়ছে। দৃশ্যটা দেখে গা গুলিয়ে উঠল উৎপলের। মাথা ঘুরে গেল। দেওয়াল ধরে দাঁড়াল সে। এইসব ছেলেদের জন্যই আজ পার্টির এই হাল! পার্টি অফিসের মধ্যে মাল খেয়ে পড়ে রয়েছে।
রাগের চোটে রগ দপদপ করছে। কোনওরকমে গাড়িতে উঠে বসল উৎপল, মান্তাকে বলল, “বাড়ি চল। শরীরটা ভাল লাগছে না।”
“মনাদা আসবে না?” জানতে চায় মান্তা।
“মনোময়… আসবে…” জড়ানো গলায় বলে উৎপল।
উৎপলের কথা শুনে মান্তা ভাবে অভিন্নহৃদয় বন্ধুও এল বলে। সে গাড়িতে স্টার্ট না দিয়ে বসে থাকে।
উৎপলের সামনে মান্তা সিগারেট খায় না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বোর হয়ে, গাড়ি থেকে নেমে হাফবান্টির খাটিয়ায় বসে একটা সিগারেট ফুঁকে আবার গাড়িতে ফেরত এল। উৎপলকে জিজ্ঞাসা করল, “দাদা এল?”
উৎপল কোনও উত্তর দিল না।
“ধুর বাবা!” গজর-গজর করতে-করতে পার্টি অফিসে ঢোকে মান্তা। দোতলায় উঠে তার চোখ ছানাবড়া। মনোময় রুটি আর ডাল দিয়ে রাতের খাবার সারছে। অবাক হয়ে মান্তা বলল, “তুমি যাবে না? দাদা তো গাড়িতে বসে আছে!”
মনোময় অবাক হয়ে বলল, “উৎপলের মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? আমি তো ওকে বললাম যে, রাতটা এখানে থেকে যাব। কাল ভোরবেলা অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে একটা ডেলিগেশন আসবে…”
কী জানি বাবা! মাথা চুলকোতে চুলকোতে গাড়ির কাছে ফিরে যায় মাস্তা। মনোময় খাবার থালা নিয়ে পিছন পিছন আসে। গাড়ির পিছনের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বলে, “কাল থেকে ক্যাম্পেন শুরু। এখনই পেগলে গেলে চলবে?”
উৎপল চুপ। মনোময় হাতের থালা মেঝেতে রেখে উৎপলকে ধাক্কা দেয়। পাশবালিশের মতো গড়িয়ে পড়ে উৎপল।
মান্তা একলাফে ড্রাইভারের আসনে বসেছে। মনোময় ড্রাইভারের পিছনের সিটে বসে উৎপলের মাথা নিজের কোলে নিল। তার হাত চটচট করছে। হাত তুলে মনোময় দেখল, হাতময় রক্ত।
উৎপলের নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। পাল্স দৌড়চ্ছে টগবগ করে। মনোময় বলল, “মান্তা, তাড়াতাড়ি চল।”
“কোথায়?”
“সেন্টিনেল মেডিক্যাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট, “ রক্তমাখা হাতে বুকপকেট থেকে মোবাইল বের করে অদ্রীশ ঘোষের নম্বর ডায়াল করে মনোময়। বারাসতের এই উকিলের সঙ্গে একসময় উৎপল আর মনোময়ের দহরম মহরম ছিল। ওঁর ছেলে সেন্টিনেলে আছে।
*
“বন্ধুরা, একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না। স্বাগত সরকারের নতুন দল সত্যিই একটি নতুন দল, বয়স মাত্র পাঁচ বছর। অর্থাৎ দলটি এখন তার শৈশবে। আর এই শিশু দলের হয়ে যিনি দাঁড়িয়েছেন তাঁর নাম স্বাগত সরকার। যিনি আমাদের পার্টি থেকে বহিষ্কৃত। কেন বহিষ্কার? সেকথা আপনাদের অজানা নয়। জনাদেশ পার্টি ক্ষমতালিপ্সাকে ঘৃণার চোখে দেখে। অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে ঘৃণার চোখে দেখে। এই দুই অভিযোগ ছিল শিশু দলের ধেড়ে খোকার নামে। তাই বহিষ্কার। আপনারা ধেড়ে খোকাকে ভোট দিলে এমন একটা রাজনৈতিক দলকে স্বাগত জানাবেন, যার প্রশাসন চালানোর যোগ্যতা শূন্য। ক্ষমতালোভী ও দুর্নীতিগ্রস্ত এই দলের হাতে মোহনপুর বিধানসভা আপনারা তুলে দিতে চান?”
একটানা অনেকক্ষণ বলে পড় নিয়েছে মনোময়। সে একটা প্রশ্ন করেছে। আজ থেকে দশ বছর আগেও মোহনপুরের ময়দান গর্জে উঠে বলত, “না!” জনগণেশের সেই হুঙ্কার বুঝিয়ে দিত পরবর্তী ভোটের রেজাল্ট কী হতে চলেছে। কিন্তু আজ আর সে দিন নেই। পাটির সর্বক্ষণের কর্মীদের প্র্যাকটিস করা চিৎকার ছাড়া বাকি জনসভা নিস্তব্ধ। খুচরো এক-দুটো হাততালি পড়ল।
শ্রোতৃবৰ্গকে ধন্যবাদ জানিয়ে মনোময় মাইক ছাড়ছে এমন সময় ভিড়ের থেকে একজন চেঁচিয়ে বলল, “উৎপলদা কোথায়? নির্বাচনি জনসভাতেই যদি প্রার্থীকে দেখা না যায়, তাহলে পরে কী হবে?”
মনোময় সামনের দিকে তাকাল। যে বলেছে তাকে তার বন্ধুরা চাঁটিয়ে বসিয়ে দিল।
কিন্তু এই প্রশ্ন মনোময়কে রোজ ফেস করতে হচ্ছে। প্রশ্ন করছে মানুষ, প্রশ্ন করছে মিডিয়া। এবার এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। মানুষকে উত্তর দেওয়ার সময় এসেছে। আজই পার্টি অফিসে গিয়ে ক্রাইসিস নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
*
পার্টির রাজ্য সম্পাদক মলয় মুস্তাফি কম কথার মানুষ। সন্ধের মিটিংয়ে নিজে থেকেই বললেন, “আমাদের উৎপলের কী খবর?”
মনোময় বলল, “সেন্টিনেলের আইসিইউতে ভর্তি আছে। ডক্টর কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়ের আন্ডারে। আমি একটু আগেই ফোনে ওঁর সঙ্গে কথা বললাম। উনি বলছেন, উৎপলের সারভাইভ করার চান্স নেই।”
“উৎপলের হয়েছিল কী?”
“ও হাই ব্লাড প্রেশারের রোগী। বোধহয় কয়েকদিন প্রেশারের ওষুধ খায়নি। যেদিন আমাদের নির্বাচনি প্রচার শুরু হল, তার আগের দিন রাত দশটা পর্যন্ত এখানে মিটিং করেছে। তারপর নিজেই নেমে, গাড়িতে গিয়ে বসেছে। আমি নীচে গিয়ে দেখি, সে অজ্ঞান। নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। আমি তখনই ওকে নিয়ে সেন্টিনেলে দৌড়ই। আমাদের বারাসতের এক ডাক্তার ওখানে কাজ করে। সিটি স্ক্যান করে বলল, স্ট্রোক হয়েছে। শিরা ছিঁড়ে ব্রেনে হেমারেজ। স্ক্যানে দেখা যাচ্ছে, অনেকটা জায়গা জুড়ে রক্ত জমাট বেঁধে আছে।”
মলয় বলল, “উৎপলের প্রসঙ্গটা আগে শেষ করা যাক। তারপর নির্বাচনের প্রসঙ্গে আসছি। আচ্ছা মনোময়, উৎপল কি ভেন্টিলেটরে আছে?”
“হ্যাঁ। ডক্টর চ্যাটার্জি বলেছেন যে, ভেন্টিলেটর থেকে বের করে নিলেই ও মরে যাবে। সেই রাতে আমি এত হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম যে, তোমাদের কাউকে কিছু জানাইনি। বোকার মতো ভেবেছিলাম, ও দু’-এক দিনের মধ্যে উঠে বসবে। তখন সব জানাব। এইরকম জটিল পরিস্থিতি হবে, কে জানত!”
মলয় বলল, “এখানেই নির্বাচনের প্রসঙ্গটা আসছে। ১৫ নভেম্বর প্রার্থী ঘোষণা করা হল। ১৬ নভেম্বর উৎপলের স্ট্রোক হল। এখনও পর্যন্ত কেউ জানে না যে, আমাদের প্রার্থী কোথায়। কিন্তু এখন জানাতে হবে। শুধু তাই না, বলতে হবে সে কোমায় আচ্ছন্ন।”
মনোময় বলল, “শুক্লা খুব কান্নাকাটি করছে।”
মলয় বলল, “সত্যি কথাটা জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত।”
“আমরা যদি বলে দিই যে, উৎপল মৃত্যুশয্যায়, তা হলে একটা ভোটও পাব না।”
“হ্যাঁ, বলে দেব। সত্য গোপন করে পার্টির ব্লান্ডার ছাড়া কিছু হয়নি। সত্যি কথা বলে দেখা যাক না! কী আর হবে? বড়জোর মোহনপুর বাই ইলেকশন হেরে যাব। তার বেশি তো কিছু নয়!”
মনোময় এবং মলয় দু’জনেই রাজ্য কমিটির সদস্য। পার্টিলাইন নিয়ে মতাদর্শগত তফাতও সুবিদিত। উৎপল আর মনোময়ের লবি এতকাল পার্টি কর্মসূচির নিয়ন্ত্রক ছিল। আজ মলয়কে আপার হ্যান্ড নিতে দেখে মনোময় ঠান্ডা চোখে তার দিকে তাকাল। মলয়ও শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মনোময়ের দিকে।
উৎপলের অনুপস্থিতিতে পার্টি কোন পথে চলবে?
