খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি
“আমি একটা ট্যাটু করিয়েছি,” ঘোষণা করল ঐশানী।
“কী করিয়েছিস?” চিৎকার করে উঠল প্রতাপ, ঐশানীর বাবা।
“আমার কানে তো কোনও প্রবলেম নেই। অকারণে চ্যাঁচাচ্ছ কেন?”
“আহা! মেয়েটাকে বকছ কেন?” ঐশানীর পক্ষ নিয়েছে মালিনী, ঐশানীর মা, “এখন ছেলেমেয়েরা ওসব ট্যাটু-ফ্যাটু করে। আমিও ভাবছি করাব। বিবি গাঙ্গুলি স্ট্রিটে নতুন একটা ট্যাটু পার্লার হয়েছে।”
“দ্যাট্স গুড,” ফরাসি কায়দায় কাঁধ ঝাঁকাল ঐশানী।
মালিনী ছদ্ম উৎসাহ দেখিয়ে বলল, “কী ট্যাটু করালি রে?”
মোদ্দা কথাটা হল, ট্যাটু করানোটা প্রতাপের মতো মালিনীরও অপছন্দ। কিন্তু আজকালকার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পেরে ওঠা যায় না! যেটাই বারণ করা হবে, সেটা তিনগুণ উৎসাহ নিয়ে করবে। তাই প্রতাপ আর মালিনী মিলে ‘খারাপ পুলিশ / ভাল পুলিশ’-এর ভূমিকায় অভিনয় করে। প্রতাপ ধমক দেয়, আর মালিনী প্রশ্রয়।
“সীমান্তর নাম ট্যাটু করলাম,” জানাল ঐশানী, “বাংলায়। তবে ট্রাইবাল ফন্ট। হঠাৎ দেখলে বাংলা বলে মনে হবে না।”
“সীমান্তর নাম!” আবার চিৎকার করে প্রতাপ, “ছেলেটার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করছিস, ঠিক আছে। তা বলে একেবারে নাম ট্যাটু করে ফেললি। তুই আদৌ ছেলেটাকে বিয়ে করবি তো?”
“ওফ! তুমি ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ো না তো!” প্রতাপকে থামিয়ে মালিনী বলে, “হাউ সুইট! দেখা তো ট্যাটুটা। কেমন দেখতে লাগছে দেখি।”
“দেখানো যাবে না মা,” মাথা নিচু করে বলে ঐশানী। এবার মালিনীও চিলচিৎকার করে ওঠে, “দেখানো যাবে না মানে! কোথায় ট্যাটু করিয়েছিস?”
“বলা যাবে না!” ঐশানী লজ্জায় লাল হয়ে দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।
প্রতাপ দে-র বয়স ৫৫ বছর। তার চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং, সবই চোখে না পড়ার মতো। সার্পেন্টাইন লেনে নিজের দোতলা বাড়ি। বাড়ির নাম ‘খেলাঘর’। প্রতাপ হাওড়ার লালবাবা কলেজের বাংলার অধ্যাপক। রাজনীতিতে আগ্রহ নেই, খেলাধুলোতেও উৎসাহ কম। কলেজে বা পাড়ায় বন্ধুবান্ধব নেই। নেশা বলতে খবরের কাগজ পড়া আর টিভিতে আটের দশকের বস্তাপচা হিন্দি সিনেমা দেখা। গম্ভীর, ভাবুক, ব্রুডিং টাইপ।
মানিনীর বয়স ৫০। বহিরঙ্গে এবং অন্তরঙ্গে মালিনী প্রতাপের একদম বিপরীত। মালিনী মারকাটারি সুন্দরী। ফরসা, লম্বা, টিকালো নাক, টানাটানা চোখ, পানপাতার মতো মুখ, একঢাল চুল, যাকে বলে সনাতনী বাঙালি সৌন্দর্য। ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত কলকাতার একটি নার্সিংহোমে পাবলিক রিলেশন অফিসার বা পিআরও ছিল। পর্যাপ্ত টাকা জমিয়ে, হঠাৎ সব কিছু ছেড়ে দিয়ে ফুলটাইম হোমমেকার। টাকাপয়সার জন্য প্রতাপের কাছে হাত পাতে না। স্কুল আর কলেজের বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে নিয়মিত ইংরেজি সিনেমা অথবা নিউ এজ বাংলা সিনেমা দেখে। টেলিভিশনে তার পছন্দ ইংরেজি মিনি সিরিজ়। ‘ফ্রেস’, ‘শার্লক’ বা ‘সেক্স অ্যান্ড দ্য সিটি’র রিপিট টেলিকাস্ট গোগ্রাসে গেলে। মালিনী মনে করে, ৬০-৭০ বছরের জীবনে টেনশন নিয়ে লাভ নেই, হেসেখেলে কাটাও। ভাবলে অবাক লাগে, প্রতাপ আর মালিনীর লভ ম্যারেজ। আপাতদৃষ্টিতে সুখী সংসার। সমস্যা একটাই। প্রতাপ আর মালিনীর মানসিক যোগাযোগ ফুরিয়ে গিয়েছে, শারীরিক সম্পর্ক বহুকাল নেই। মানসিক সম্পর্ক কবে মরে গেল, কেউ জানতেও পারেনি। তবে প্রতাপের জীবনে অন্য কোনও নারী নেই, মালিনীর জীবনে নেই অন্য পুরুষ। থাকলে বরং ভাল হত। ঝগড়া হত, রাগারাগি হত, মিটমাটও হত। কিন্তু এখন এক ছাদের তলায় দু’জন মানুষ দিনের পর দিন কাটায়, কোনও কথা হয় না। যেটুকু হয়, ঐশানীকে নিয়ে।
বাথরুম থেকে স্নান সেরে বেরিয়েছে ঐশানী। পরনে রিপড জিন্স, সবুজ টি-শার্ট আর গোলাপি জ্যাকেট। টেবিলে বসে বলল, “ব্রেকফাস্ট।”
ঐশানীর বয়স ২৭। বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা ক্যালকাটা গার্লস স্কুলে। তারপর ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে ফিজিওলজিতে বিএসসি এবং এমএসসি। মাস্টার্স করে বেরনোর পরে দিল্লি থেকে প্রকাশিত ইংরেজি খবরের কাগজ ‘সিটিজেন’-এর কলকাতা এডিশন ‘ক্যালকাটা সিটিজেন’ বা ‘সিসি’তে চাকরি জুটিয়েছে।
মালিনী নার্সিংহোমের পিআরও ছিল বলে ছোটবেলা থেকে বাড়িতে ডাক্তারি টার্মিনোলজি এবং ডাক্তারি সমস্যা শুনে বড় হয়েছে ঐশানী। কলেজে সাবজেক্ট ছিল ফিজিওলজি। পাবলিক হেল্থ নিয়ে ইনবিল্ট উৎসাহ আছে। সেই জন্যই হয়তো, ‘সিসি’তে দেড় বছর টালিগঞ্জ বিট আর এডুকেশন বিটে কাজ করার পরে চলে এসেছে হেল্থ বিটে। সরকারি হাসপাতালের বেহাল অবস্থা, বেসরকারি নার্সিংহোমের জুলুমবাজি, এইসব নিয়ে ঐশানীর রিপোর্টিংয়ের গোড়ায় লেখা থাকে, স্পেশ্যাল করেসপন্ডেন্ট, সিসি। নিজস্ব সংবাদদাতা, ক্যালকাটা সিটিজেন।
নিজের নামে খবর প্রকাশিত হওয়াকে কাগুজে ভাষায় ‘বাইলাইন’ বলে। সেইরকম সুযোগ এখনও পর্যন্ত দু’বার এসেছে ঐশানীর জীবনে। ভবিষ্যতে আরও আসবে। তবে তার জন্য ঐশানীকে যোগ্য হয়ে উঠতে হবে, খাটতে হবে। মুখে-মুখে চাউর হওয়ার মতো ‘স্টোরি’ করতে হবে।
সাংবাদিকতার পেশায় ঐশানী এসেছে, কারণ কাজটা তার ভাল লাগে। যখন থেকে অল্পবিস্তর জ্ঞানবুদ্ধি হল, তখন থেকেই সে সংবাদ সংগ্রহের নেশায় মেতেছিল। প্রতাপ-মালিনীর ভিন্ন রুচির কল্যাণে কলকাতা থেকে প্রকাশিত অধিকাংশ বাংলা এবং ইংরেজি সংবাদপত্র ‘খেলাঘরে’ আসে। ছোটবেলা থেকেই ঐশানী রোজ পাঁচটা খবরের কাগজ পড়ে। খবরের কাগজের চরিত্র অনুযায়ী কীভাবে প্রথম পাতার প্রধান সংবাদ বদলে যায়, একই খবর থাকলেও হেডলাইন কীভাবে বদলে যায়, খবরের ইন্ট্রো কীভাবে ইন্টারেস্টিং করা যায়, কোনও একটি খবর নিয়ে সম্পাদকীয় অভিমত কীভাবে এক কাগজ থেকে অন্য কাগজে বদলে যায়…এসব ঐশানীকে টানত। এমনকী, সে মন দিয়ে দেখত পাতা সাজানোর কায়দা, ফন্ট বা হরফের রকমফের, কাগজের বানান ভুল, ছবির কোয়ালিটি। যে হকারকাকু বাড়িতে কাগজ দিতে আসত, তাকে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করত, কোন কাগজের সার্কুলেশন বেশি, কোন কাগজের কম। কেন বেশি, কেন কম। হকারকাকুও ছিল কাগজ-পাগলা, সে ধৈর্য ধরে উত্তর দিত। ঐশানীর মনে হত, সে এক অজানা জগতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইন্টারনেটের কল্যাণে বিদেশের সংবাদপত্র পড়া ধরে ঐশানী। তার সামনে খুলে গেল বিশাল এক জাদুঘরের তালা। সংবাদপত্রের জগৎ কত বিশাল, এটা বোঝার পরেই সে সিদ্ধান্ত নেয়, সাংবাদিক হবে।
বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ার কারণে, অথবা পারিবারিক উত্তাপের অভাবের কারণে ঐশানীর জীবনদর্শন অনেকটা বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইনের মতো, ‘আমি আমার মতো’। দিনরাত চিউইংগাম চিবনো, মোবাইল ফোনে বকবক করা, ইয়ার প্লাগ কানে গুঁজে রাখা, সোশ্যাল মিডিয়ায় আটকে থাকা, পুরো কলেজ লাইফ এই রকমের জিনিসগুলো করেই কাটিয়েছে। প্রতাপ আর মালিনী আলাদা- আলাদাভাবে একই চিন্তা করে যে, মেয়েটা পড়ল কখন? তবে পড়েছে নিশ্চয়ই। রেজ়াল্ট তো ভালই। ক্যালকাটা সিটিজেনে ভাল চাকরিও বাগিয়েছে। মাইনে শুনে প্রতাপের চোখ রসগোল্লা হয়ে গিয়েছিল! তবে সিসি যেমন টাকা দেয়, তেমন খাটিয়েও নেয়। দুপুর ১২টার মধ্যে অফিসে ঢুকতে হয়। বেরনোর ঠিকঠিকানা নেই। কখনও রাত ১১টা, কখনও ১২টা, কখনও একটা। ঐশানীর সামাজিক জীবন তলানিতে ঠেকেছে।
ভোলাদা ব্রেকফাস্ট নিয়ে এসেছে। ‘খেলাঘর’-এর ‘ম্যান ফ্রাইডে’ ভোলাদার বাড়ি বারাসতের মোহনপুরে। সারা সপ্তাহ সার্পেন্টাইন লেনে থাকে। শনিবার রাতে মোহনপুরে পারুলের কাছে চলে যায়। সোমবার সকালে আবার ‘খেলাঘর’। বছর পঁয়ত্রিশের ভোলাদা আর বছর ত্রিশের পারুলের বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর আগে, এখনও বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। এদের বিয়ের দিনই সীমান্তর সঙ্গে ঐশানীর আলাপ। অর্থাৎ একটা প্রেম যেদিন বিবাহে গড়াল, সেইদিন অন্য একটা প্রেমের জন্ম হল। ভোলাদার সঙ্গে পারুলের প্রেম হয়েছিল বনগাঁ লোকালে। ওইরকম ভিড় ট্রেনে কী করে প্রেম হয় ভগবান জানে! যাই হোক, হয়েছিল। ভোলাদা একদিন খেলাঘরে এসে জানাল, সে বিয়ে করতে চায়। পাত্রী ঠিক করে ফেলেছে।
প্রতাপ তার চরিত্র অনুযায়ী কোনও কথা বলেনি। ভুরু কুঁচকে একবার ভোলাদার দিকে তাকিয়ে টিভিতে ‘লভ এইট্টি সিক্স’ দেখছিল। মালিনী উত্তেজিত হয়ে বলেছিল, “মেয়েটার কী নাম? কোথায় থাকে? কী করে? কোনও ছবি আছে?”
ভোলাদা মালিনীর হাতে ছবি তুলে দিয়ে বলেছিল, “ও অদ্রীশ ঘোষ নামে বারাসতের এক উকিলবাবুর বাড়িতে কাজ করে।”
“ও-টা কে?”
ফরসা লোকেরা লজ্জায় লাল হয়। শ্যামলা ভোলাদা ব্লাশ করে বেগুনি হয়ে বলেছিল, “ওর নাম পারুল।”
ভোলাদার জন্যে মেয়ে দেখতে বারাসতে অদ্রীশ ঘোষের বাড়ি গিয়েছিল মালিনী আর ঐশানী। ছাপা শাড়ি পরে পারুল চায়ের ট্রে নিয়ে বসার ঘরে এসেছিল। অদ্রীশ বলেছিল, “আমার ছেলের নাম সীমান্ত। ও ডাক্তার, পেশার কারণে অনেকটা সময় বাড়ির বাইরে থাকে। তাই বলে এত ব্যস্ত নয় যে, দরকারের সময় হাওয়া হয়ে যাবে!”
বাড়ির বাইরে বাইকের ডিকডিক-ডিকডিক শব্দ। বাইক জিনিসটা ঐশানী দু’চক্ষে দেখতে পারে না। কলকাতায় বাইকার গ্যাং সম্প্রতি বড্ড বেড়েছে। রাতের কলকাতায় নিয়মিত ঘুরতে হয় বলে ঐশানী জানে, ১৫-১৬ বছরের ছেলেরা বারমুডা আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে, বিয়ার টানতে টানতে রাজারহাটের রাস্তায় বা পার্কসার্কাস ফ্লাইওভারে দেড়শো কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিবেগে বাইক চালায়। কারও মাথায় হেলমেট থাকে না। কাউকে ধাক্কা মারলে সে জাস্ট ছিটকে স্বর্গে
চলে যাবে।
বাইকচালক দুদ্দাড়িয়ে ঘরে ঢুকে হেলমেট খুলে বলেছিল, “সরি বাবা। লেট হয়ে গেল,” মালিনী আর ঐশানীর দিকে হাত নেড়ে বলেছিল, “হাই, আমি সীমান্ত।”
সেটা কি চৈত্রমাস ছিল? ছিল কি প্রহরশেষ? মনে নেই ঐশানীর শুধু মনে আছে রাঙা আলোয় সীমান্তর চোখ ধকধক করছিল। নিজের সর্বনাশ দেখেছিল ঐশানী! তার বুকে আওয়াজ হচ্ছিল, ডিকডিক ডিকড়িক… ডিকড়িক-ডিকডি….
টেবিলের দিকে তাকাল ঐশানী। প্রতাপের প্লেটে পরোটা আর আলুর দম। মালিনীর সামনে এক বোল ফ্রুট স্যালাড। ঐশানীর সামনে আধবাটি দই, একমুঠো চিঁড়ে, আর তিনটে কিশমিশের মতো জিনিস।
পরোটা মুখে পুরে প্রতাপ বলল, “গুগুলো কী? খায়, না মাথায় মাখে?”
“এগুলো ফ্লাক্সসিড,” একটা সিড চিবোচ্ছে ঐশানী।
“সেটা কী?”
“হেল্থ ফুড। ক্যালরি নেই অথচ পুষ্টিগুণে ভরপুর,” বাকি দুটো সিড মুখে পোরে ঐশানী।
প্রতাপ হতাশ হয়ে ঘাড় নাড়ে, “পৃথিবীর যাবতীয় সুখাদ্য শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। এবং শরীরের পক্ষে ভাল খাবার মানেই জঘন্য খেতে। পাঁঠার মাংস আর চিরতার জলের তুলনা করে দেখ। ওসব ডায়েট করে বেঁচে থাকার মানে কী? ডায়েট একটা ধ্যাষ্টামো।”
“বাবা, ওরকম বোলো না! ডায়েট ফুড নিয়ে আমার একটা বড় লেখা গত রবিবারের ‘সিসি’-তে গেল। অ্যাটকিন্স ডায়েট, ডিএনএ ডায়েট, ব্লাড গ্রুপ ডায়েট, জেনারেল মোটরস ডায়েট…”
“সব জেনেও তুই ওই জঞ্জালগুলো খাচ্ছিস? তোর এখন ওজন কত?”
“ওরেবাব্বা! সে অনেক! বলা যাবে না,” এক চিমটে চিঁড়ে মুখে ফেলে ঐশানী, “তুমি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করছ কেন? মেন্টাল ট্রমা হয় জান না?”
ভোলাদা বিরক্ত হয়ে বলল, “মেয়েদের চেহারা হবে শাঁসেজলে! ক্যাকলাসের মতো চেহারা হলে সীমান্ত ঘুরেও দেখবে না।”
“আহ্ ভোলাদা!” আপত্তি করে ঐশানী, “মেয়েরা নিজেদের ভাল লাগার জন্য সাজে। অন্য কেউ দেখবে বলে নয়। এই সব ফালতু ধ্যানধারণা এবার ছাড়ো। সময় বদলাচ্ছে।”
“তা হবে!” দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভোলাদা, “বাড়ি থেকে বেরনোর আগে আমাকে আবার জিজ্ঞেস কোরো না, ‘ভোলাদা, কেমন লাগছে বলো তো!’ আমি জবাব দেব না।”
প্রতাপ হালকা হেসে বলল, “ভোলা একদম ঠিক বলেছে। তুই বিউটি ইন্ডাস্ট্রির ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছিস। হ্যাঙ্গার মার্কা চেহারা দেখেই বোঝা যায়, ওজন ৬০ কিলো। এরকম আরও কয়েকদিন চললে টিবি হয়ে যাবে।”
“৬০ কিলো! আর ইউ ম্যাড? বাবা হয়ে মেয়েকে অভিশাপ দিচ্ছ? আমার ওজন ৫৬ কিলো! যেভাবেই হোক ৫৩-য় পৌঁছতে হবে,” এক চামচ দই খেয়ে বলে ঐশানী।
প্রতাপ তিতিবিরক্ত হয়ে বলল, “পাগলামির একটা লিমিট থাকে। তুই সেটা ক্রস করে যাচ্ছিস। সকালে এক চিমটে চিঁড়ে, দুপুরে দু’টুকরো শসা, রাতে তিনগ্রাম সেদ্ধ চিকেন, জাস্ট মিনিংলেস।”
“হোয়াটএভার…” ফরাসি কায়দায় কাঁধ ঝাঁকিয়ে, খাবার টেবিল থেকে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল ঐশানী।
ভোলাদা ঐশানীর প্লেট তুলে রান্নাঘরে চলে গেল। প্লেটে খানিকটা দই আর চিঁড়ে পড়ে আছে।
মালিনী এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি। চুপচাপ স্যালাড খাচ্ছিল। বোল ফাঁকা করে বলল, “ভোলা চা।” প্রতাপ বলল, “ভোলা কফি।”
ঐশানী নিজের ঘরে ঢুকে গোঁজ হয়ে বসে আছে। আজ সপ্তাহের প্রথম দিন। অফিস যাওয়ার আগে এইসব ফালতু ঝামেলার কোনও মানে হয়! বাবা-মা-রা এত বোরিং হয় কেন কে জানে! তার তো মাঝে মাঝে ‘খেলাঘর’ ছেড়ে পালাতে ইচ্ছা করে।
‘খেলাঘর’! দারুণ ইন্টারেস্টিং একটা বাড়ি। তেমনই ইন্টারেস্টিং এই সার্পেন্টাইন লেন। শিয়ালদা আর বৌবাজারের মধ্যে সাপের মতো একেবেঁকে চলেছে সরু এক রাস্তা। সর্পিল চলনের জন্যেই নাম সার্পেন্টাইন।
নেবুতলা পার্কের পাশে দোতলা, তিনকোনা বাড়িটা সত্যিই খেলাঘরের মতো দেখতে। ‘খেলাঘর’ প্রতাপের ঠাকুরদার তৈরি। দুই রাস্তার ক্রসিংয়ে অবস্থিত তিনকোনা বাড়ি কলকাতায় প্রচুর দেখা যায়। রাস্তার উপরে লাল সিমেন্টের রোয়াক। তিনধাপ সিঁড়ি টপকে সেখানে উঠতে হয়। পাড়ার বুড়োরা দিনের বেলা আড্ডা মারে। সন্ধেবেলা আড্ডাবাজের চেহারা বদলে যায়। আপিসবাবুরা বারমুডা, লুঙ্গি বা পাজামা পরে জমিয়ে বসে। থেকে-থেকেই ঠুংঠাং ঘণ্টি নেড়ে চলে যায় হাতে টানা রিকশা। মাঝে-মাঝে দু’-একটা হলুদ ট্যাক্সি অথবা লাল চারচাকা পাড়ার মধ্যে দিয়ে শর্টকাট করতে গিয়ে ফেঁসে যায়, শুরু হয় হইহল্লা।
ঐশানীর ঘরের জানলাও কখনও খোলা হয় না। আধো অন্ধকার ঘরের তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রিতে বাঁধা থাকে, সব সময়।
ঘরে এখন কোনও আলো জ্বলছে না। ল্যাপটপে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট খোলা রয়েছে। মনিটরে একের পর এক নোটিফিকেশন জমা হচ্ছে। টকটকে লাল রঙের বিনব্যাগে হেলান দিয়ে ঐশানী চোখ বুজে বসে রয়েছে। ঐশানী একটা ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কলেজজীবন শেষ হওয়া আর চাকরিজীবন শুরু হওয়ার মধ্যে কোনও বিরতি ছিল না বলে ছাত্রজীবনের ভারটা এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে সে। ঐশানী বুঝতে পারে, এই ঘর একজন কলেজ পড়ুয়ার ঘর। সাতাশ বছর বয়সে এসে এত ছবিছাবাওয়ালা, আধো-অন্ধকার ঘর তার অসহ্য লাগে। ইচ্ছে হয় ঘর সাফ করে সব জানালা খুলে দিতে। সার্পেন্টাইন লেনের ধুলোমাখা বাতাস ঘরে ঢুকুক। কিন্তু ভিতর থেকে ঐশানী কোনও তাগিদ পায় না। মনে হয়, যেমন চলছে চলুক না। খারাপ কী?
সমস্যা শুধু বাইরে নয়। সমস্যা ভেতরেও। বাড়ি, চাকরি আর প্রেমের ত্রিকোণ দৌড়ে সে ক্লান্ত। একবার খেলাঘর, একবার সিটিজেন কলকাতা, একবার সীমান্তর সঙ্গে বুড়ি ছোঁওয়া প্রেম করতে করতেই দিন শেষ হয়ে যায়। নতুন দিন আসে, সঙ্গে নিয়ে আসে পুরনো রুটিন।
ঐশানীর মনে হচ্ছে, তার বিয়ে করে ফেলা উচিত। তাহলে অন্তত দিনভর দৌড়াদৌড়িটা কমবে। বারাসত থেকে ধর্মতলা যাতায়াতের পথে, সপ্তাহে একবার সার্পেন্টাইন লেন ঘুরে যাবে। ২৭ বছর কি অনেক বয়স? কে জানে! এই যে ঐশানী কম খেয়ে ওজন কমাচ্ছে, ট্যাটু করছে, এর মধ্যে কি মিডলাইফ ক্রাইসিস নেই? কথাটা ভেবেই হেসে ফেলে ঐশানী। ২৭ বছর বয়সে মিডলাইফ ক্রাইসিস? লোকে শুনলে হাসবে!
মোবাইলে সময় দেখে ঐশানী। সকাল ন’টা। বাবার কলেজে বেরনোর সময় হয়েছে। এবার ঘর থেকে বেরনো উচিত। ল্যাপটপ বন্ধ করে সে।
প্রতাপ সকালবেলা শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে বালিঘাট স্টেশনে নামে। সেখান থেকে লালবাবা কলেজ বাসে মাত্র ১০ মিনিট। সব মিলিয়ে একঘণ্টার মামলা। প্রতাপের ক্লাস কোনওদিনই ১২টার আগে শুরু হয় না। কিন্তু ডিপার্টমেন্টে কাজের পাহাড়। ফুলটাইম অধ্যাপকের সংখ্যা কম। নন-টিচিং স্টাফ কম থাকার কারণে ক্লারিকাল কাজও করতে হয়। সঙ্গে পরীক্ষার খাতা দেখার রুটিন যন্ত্রণা তো আছেই।
প্রতাপ ‘খেলাঘর’ থেকে সাড়ে ন’টার সময় বেরয়। দুপুরের খাবার সঙ্গে যায়। চার ডাব্বাওয়ালা টিফিন বাক্সে ভাত, ডাল, সবজি, মাছের ঝোল। প্রতাপ গুছিয়ে খেতে ভালবাসে। রাত্তিরেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না।
টিফিনকৌটো এবং অন্যান্য কাজের জিনিস ঝোলায় ভরে প্রতাপ বেরনোর জন্য রেডি, এমন সময় ঐশানী ঘর থেকে বেরল। নিয়ন গ্রিন টিশার্টের হাতা গুটিয়ে বলল, “এইখানে ট্যাটু করিয়েছি।”
প্রতাপ আর মালিনী দেখল, বাইসেপ বরাবর গোল করে কাঁটাতারের বেড়া ট্যাটু করিয়েছে ঐশানী।
প্রতাপ মুচকি হেসে বলল, “আজেবাজে কথা বলে ঘাবড়ে দিচ্ছিলি কেন?”
“এমনি”, বাইসেপ ফোলানোর চেষ্টা করছে ঐশানী। মালিনী সভয়ে বলল, “না খেয়ে-খেয়ে বাইসেপটা টিকটিকির ল্যাজের মতো সরু হয়ে গিয়েছে। ওকে আর কষ্ট দিস না। ছিঁড়ে যেতে পারে!”
মালিনীর কথায় পাত্তা না দিয়ে ঐশানী বলল, “‘ওয়েটিং রুম’ সিনেমাটায় নন্দিনী সরকার এইরকম ট্যাটু করেছিল।”
“তুই বাংলা সিনেমা দেখিস,” মালিনী এত অবাক, যেন বাইসেপের প্রসঙ্গ ভুলে গিয়েছে।
“বাংলা সিনেমার নাম ‘ওয়েটিং রুম’?” জানতে চায় প্রতাপ।
ঐশানী কপাল চাপড়ে বলে, “প্রথমে বাবার প্রশ্নের উত্তর দিই। বাংলা সিনেমার নাম ‘অটোগ্রাফ’, ‘বেডরুম’, ‘ল্যাপটপ’ এইসব হতে পারে। তাহলে ‘ওয়েটিং রুম’ কী দোষ করল? আর মা, হ্যাঁ, আমি সিনেমা দেখি। সিনেমার চরিত্ররা কখনও বাংলায় কথা বলে, কখনও হিন্দিতে। ইংরেজি, জাপানি, চাইনিজ বা কোরিয়ান ল্যাঙ্গোয়েজেও বলে। তবে সিনেমার নিজস্ব একটা ভাষা আছে। সেটা সবাই বুঝতে পারে।”
“ওফ! জ্ঞান দিস না,” হাত নাড়ে মালিনী, ““ওয়েটিং রুম’ দারুণ সিনেমা। তার মধ্যে নন্দিনী সরকারের ট্যাটুটাই তোর ভাল লাগল? নন্দিনীর লং স্কার্টটা চোখে পড়ল না?”
ঐশানী খুব মন দিয়ে মালিনীকে দেখল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। ভাবটা এমন, তুমি আমাকে ফ্যাশন শেখাচ্ছ? হায় রে কপাল!
ঐশানী নিজের জিনসের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “দেখি, তুমি কত ফ্যাশন কনশাস। এই জিন্সটাকে কী বলে?”
মালিনী নাক কুঁচকে বলে, “ছেঁড়া জিন্স পরেছিস কেন? আমাকে দিয়ে দে। ওর বদলে স্টিলের বাসন কিনব।”
ভোলাদা ফুট কাটে, “এমন দিন শিগগিরি আসছে, যখন এ বাড়ির সবাই গামছা পরে থাকবে আর স্টিলের গামলায় চা খাবে।”
ঐশানী হেসে ফেলে। পুরনো কাপড়জামার বদলে স্টিলের বাসন কেনার বাতিক আছে মালিনীর। ও সেটা নিয়ে ঝগড়া না করে বলল, “এই জিন্সকে বলে রিপড জিন্স।”
“রিপ অফ মানে ছেঁড়া। যার নাম চালভাজা, তারই নাম মুড়ি,” ঠোঁট ওলটায় মালিনী, “নন্দিনীর লং স্কার্ট তোর পছন্দ হয়নি?”
প্রতাপ এতক্ষণ চুপচাপ মা-মেয়ের আলোচনা শুনছিল। এবার চেয়ার ছেড়ে উঠল। বেরতে হবে। ট্রেনের সময় হয়ে গিয়েছে।
“লং স্কার্ট পছন্দ হয়নি। তবে অন্য একটা জিনিস পছন্দ হয়েছে। ওর ওই হেয়ারকাট, যেখানে মাথার পিছন আর কানের পাশটা শেভ করা। আর মাথার মাঝখানের চুলটা ক্রপ করা। আমি আজ ওইরকম চুল কাটব।”
প্রতাপ বেরতে পারল না। চেয়ারে বসে পড়ল। মালিনী চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে বলল, “রাস্তার পাগলিদের মতো বাটিছাঁট করলে বাড়ি থেকে বের করে দেব।”
ঐশানী মুচকি হেসে আবার নিজের ঘরে ঢুকে গেল। বাবা-মা’কে যথেষ্ট শক দেওয়া হয়েছে। এবার অফিসের জন্য রেডি হওয়া যাক। সেখানে বাঘের মতো ক্ষুধার্ত বস আর শেয়ালের মতো ধূর্ত সহকর্মী অপেক্ষা করে আছে।
