দিন পরে যায় দিন

দিন পরে যায় দিন

খবরের কাগজ হিসেবে ‘ক্যালকাটা সিটিজেন’ বেশ ওজনদার। ইংরেজি সংবাদপত্রের জগতে নতুন খবরের কাগজের জন্ম হওয়া এবং বছর তিনেকের মধ্যে দেহ রাখার লম্বা লিস্টি আছে। সিসি সেইসব কাগজের মধ্যে পড়ে না। গত ১০ বছর ধরে কাগজটা রমরমিয়ে চলছে অডিট ব্যুরো অফ সার্কুলেশনের হিসেব অনুসারে পূর্ব ভারত থেকে প্রকাশিত খবরের কাগজের মধ্যে সিসির অবস্থান উপরের দিকে।

ক্যালকাটা সিটিজেনের সম্পাদক পুষ্কর ভৌমিক। সাংবাদিক মহলে ডাকনাম পিবি। ১০ বছর আগে জওহরলাল নেহরু রোডের একটি বহুতলের বেসমেন্ট-সহ নীচের চারটে তলা জুড়ে শুরু হয়েছিল সিসির পথ চলা। বেসমেন্টে কার পার্কিং এবং গোডাউন। একতলায় প্রেস, বিজ্ঞাপনের বিভাগ ও ফ্রন্ট অফিস। দুই ও তিনতলা জুড়ে খবরের কাগজের অফিস। চারতলাটি এখনও ফাঁকা। তবে যে হারে কাগজের বিক্রি বাড়ছে, নেট এডিশন ঢুকছে, তাতে ফ্লোর আর বেশিদিন ফাঁকা থাকবে না।

যারা কাগজটি পছন্দ করে না, তারা বলে সদ্য যারা ইংরেজি শিখেছে, কাগজটা তাদের জন্য। কিন্তু পিবির সাফকথা, “কপি লিখবে মফস্সলের কলেজ ছাত্রছাত্রীর কথা ভেবে। বালিগঞ্জের বাসিন্দার জন্য অন্য কাগজ আছে।”

সিসির বিক্রি জেলা এবং মফস্সলে। কলকাতার লোকে এই কাগজ কম পড়ে। পিবি তা নিয়ে চিন্তিত নন। তিনি বলেন, “বাঙালি মূলত অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত একটি জনগোষ্ঠী। এরা ভাবে, এরা সব জানে। আসলে কিস্সু জানে না। রবীন্দ্রনাথ পড়েনি, বঙ্কিমচন্দ্র পড়েনি, শরৎচন্দ্র-র ‘দেবদাস’ গপ্‌পোটা সিনেমা দেখে জানে। এখানে কুন্দেরা, মার্কেজ়, মুরাকামি, পামুক চলবে না।” পিবি এই বিশ্বাস সব স্তরের কর্মচারীর মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। সিসির মূল আকর্ষণ রাজনৈতিক খবর। তারপরেই খেলার পাতা।

ঐশানীর বসের নাম তরুণ দাশ। চিফ এই রিপোর্টারের বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে। টালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে একা থাকে। ঐশানী যদ্দুর জানে, বিয়ে একটা হয়েছিল। কিন্তু ওয়কোহলিক স্বামীর সঙ্গে সেই মহিলা দু’বছরও থাকতে পারেনি। মিউচুয়াল ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে।

তরুণ যেমন বেঁটে তেমন মোটা। ফুটবলের মতো চেহারা নিয়ে খরগোশের ক্ষিপ্রতায় কাজ করে। ডেস্ক এবং রিপোর্টিংয়ের সাংবাদিকদের ধমকে, চমকে, ভালবেসে, আদর করে, চাকরি খাওয়ার ভয় দেখিয়ে, ইনসেনটিভ দিয়ে কাজ উদ্ধার করা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত চাকরিগুলোর মধ্যে একটা। তরুণ সেটা অনায়াসে করে।

চিফ রিপোর্টারের কিউবিকলের নাম টর্চার চেম্বার। সেখানে ঢুকলে কড়া কফি, এক্সট্রা চিজ় দেওয়া বার্গার আর কোলার মিশ্রণে তৈরি বিচিত্র এক গন্ধ নাকে আসে। টেবিলে ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, একটা ল্যান্ডফোন, একাধিক মোবাইল, তাড়াতাড়া কাগজ নিয়ে সকাল ১০টায় তরুণের দিন শুরু হয়। শেষ হয় রাত ১২টায়। অসম্ভব রাগী, প্রচণ্ড ডিম্যান্ডিং, নিজেকে ‘আই অ্যাম দ্য বেস্ট’ ভাবা তরুণের জীবনের একটাই লক্ষ্য, ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’। তাঁর মতে, কর্মচারীরা গাধা। চাবকে কাজ আদায় না করলে চলবে না।

সিসিতে জয়েন করার পরে তরুণের হাত দিয়ে একের পর এক স্কুপ বেরিয়েছে। জনাদেশ সরকারের গণভিত্তি টলিয়ে দেওয়ার মতো খবর। লোকটা সারা পৃথিবী ঘুরেছে। বন্যা, খরা, মহামারী, টাইফুন, টর্নেডো দেখা তরুণের একটাই আফসোস, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখা হল না!

এই লোক ঐশানীর বস। আর সহকর্মীর নাম নীলিমা রায়। সবাই লিমা বলে ডাকে। ঐশানীর সমবয়সি, রোগাপাতলা লিমার ইউনিফর্ম হল জিন্‌স আর মেসেজ টি-শার্ট। মেয়েটা এত রোগা যে, বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে দিয়ে গেলেও গায়ে জল লাগে না। ওজন ৪০ কিলোর আশেপাশে। ঐশানী বহুবার বলেছে, “দ্যাখ লিমা, তোর এড্‌স অথবা ক্যানসার, কিছু একটা হয়েছে।”

লিমা শ্রাগ করে বলেছে, “তুই যা ধুমসি, আমাকে হিংসে তো করবিই!” ইন ফ্যাক্ট, লিমার ফিগার দেখে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগেই ঐশানী ডায়েটিং শুরু করেছে।

যাদবপুর এইট বি বাস স্ট্যান্ডের লাগোয়া মেয়েদের পিজি অ্যাকোমডেশনে থাকে লিমা। আদি বাড়ি বলে কিছু নেই। রেলের চাকরির সূত্রে ভারতের দূরদূরান্তে পোস্টিং হত লিমার বাবার। সেসব জায়গায় না থাকত স্কুল, না থাকত কলেজ বা জনবসতি। তা সত্ত্বেও লিমা বারো ক্লাসের পরীক্ষায় অসম্ভব ভাল রেজ়াল্ট করে। বাকি পড়াশোনা কলকাতায়। বাবা-মা নিয়ে শব্দ খরচ করে না লিমা। ঐশানী এইটুকু জানে যে, লিমার বাবা-মা এখন অরুণাচল প্রদেশে আছেন।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে। ‘স্মল টাউন মেন্টালিটি’। ছোট শহরের বাসিন্দারা কথাবার্তায়, আদবকায়দায়, পোশাক আশাকে মেট্রোপলিটন শহরের সঙ্গে পাল্লা দিতে চায়। এই ব্যামো শুধু ছোট শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মুম্বই নিউইয়র্ক হতে চায়, কলকাতা মুম্বই হতে চায়, শিলিগুড়ি কলকাতা হতে চায়।

স্থান আসলে কিছু হতে চায় না, হতে চায় মানুষ। যেমন লিমা চায়। সিসির ওয়র্কস্টেশনে কালীঠাকুরের মূর্তিতে সকালবেলা প্রণাম না করে তার দিন শুরু হয় না। আবার উন্নতি করার জন্য অবলীলায় ঐশানীর পিঠে ছুরি মারতে পারে। তরুণের মতো লিমার জীবনেরও মোটো, ‘লিভ অ্যান্ড লেট ডাই’। লিমাও বিশ্বাস করে, ‘আয়াম দ্য বেস্ট’। ঐশানী একটা কথা বুঝতে পারে না যে নিজেকে সেরা মনে করে, যে তার চারপাশের সবাইকে বোকা ভাবে, সে এত ইনসিকিয়োরিটিতে ভোগে কেন? ইচ্ছে না থাকলেও পিজি অ্যাকোমডেশনের মালিক ফটুদার সঙ্গে সপ্তাহে একবার শুতে হবে, এ আবার কেমন কথা!

সেক্স নিয়ে ঐশানীর ছুৎমার্গ নেই। কে কার সঙ্গে শোবে, কেন শোবে, কোথায় শোবে, এই নিয়ে চিন্তাই করে না। তবে নিজের ব্যাপারে ও পিউরিটান। সীমান্তকে চুমু খেয়েছে। কিন্তু সময় এবং সুযোগ পেলেও আর এগনোর ইচ্ছে নেই। লিমার ব্যাপারটা ঐশানী সমর্থন করে না।

লিমা নিজেই বলেছে, “ফন্টু ইজ ক্লামজি ইন বেড। জাস্ট কিস্সু পারে না।”

“তাহলে শুস কেন?” জানতে চেয়েছে ঐশানী।

“বেশ করি। তোর কোনও প্রবলেম আছে?”

“আছে। যে-কাজটা ভাল লাগে না, সেটা করিস কেন?”

“পিজির মালিককে হাতে রাখতে। কোনদিন পিজির ভাড়া বাড়িয়ে আমাকে ভাগানোর চেষ্টা করবে, তখন আমার একটা লিভারেজ চাই। ফন্টুর ‘ক্ষুদ্র ও বাঁকা’ লিভারটা সেই জন্য।”

“ভ্যাট!” লিমার বাজে কথা হাত দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে ঐশানী ভাবে, এই কোলিগের সঙ্গে তাকে ঘর করতে হবে।

সকালবেলা হেঁটে অফিসে আসে ঐশানী। খেলাঘর থেকে বেরিয়ে গলির মধ্যে দিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই সুবোধ মল্লিক স্কোয়্যার। লেনিন সরণি ধরে ধর্মতলার দিকে হাঁটার সময়ে কোনও ট্রাম পেলে ঐশানী উঠে পড়ে, না পেলে হন্টন। চৌরঙ্গি থেকে জাদুঘর পর্যন্ত যাওয়ার জন্য এগারো নম্বরই ভরসা। জওহরলাল নেহরু রোডে এত সিগন্যাল যে, হেঁটে বাসের চেয়ে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়। হেঁটে অফিস গেলেও বাড়ি ফেরার সময় ঐশানী পুলকার নেয়। বেশি রাতে কলকাতা শহরে হাঁটাচলা করাটা মেয়ে বা ছেলে, দু’দলের পক্ষেই বেশ রিস্কি।

ঐশানীর অফিস তিনতলায়। সেন্সরে আইকার্ড ছুঁইয়ে লবিতে পৌঁছল ও। লিফটের বদলে সিঁড়ি ধরল। টানা ৪০ মিনিট হাঁটার ফলে ঘেমেনেয়ে একাকার! সবার আগে টয়লেটে গিয়ে গায়ে ডিও ছড়াতে হবে।

নিজের ওয়র্কস্টেশনটি সচেতনভাবে পলিটিকালি কারেক্ট রেখেছে ঐশানী। স্কুলের গ্রুপ ফোটো আর ইয়ার প্ল্যানার সাঁটা আছে সবুজ ফেল্টবোর্ডে। আর আছে ছোট্ট টবে একটা অর্কিড।

বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে, ড্রয়ারে ব্যাগ রেখে লিমার দিকে তাকাল ঐশানী। লিমার টেবিলে দু’-তিনটে ইয়াব্বড়ো ফাইল। একটা ফাইল খুলে সে আজকের ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পড়ছে। ঐশানীকে আড়চোখে দেখে বলল, “গতকাল কিছু মিস করে গেলাম কি না দেখছি। বাই দ্য ওয়ে আই নিড ইয়োর হেলপ।”

বাবা! এ তো ভূতের মুখে রামনাম! লিমার সাহায্য লাগবে, তাও আবার তার প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে! বড় খবর। ঐশানী একটিও শব্দ খরচ না করে নিজের চেয়ারে বসে মেশিন অন করল। অফিশিয়াল মেলগুলো চেক করা যাক। এক্ষুনি টর্চার চেম্বারে ডাক পড়বে।

“উত্তর দিচ্ছিস না যে।” চেয়ার ঘুরিয়ে বসেছে লিমা।

“বল।”

“আজ সন্ধেবেলা অ্যাবরশন করাতে যাব। তুই সঙ্গে থাকবি। বসকে বলা আছে।”

মনিটর থেকে চোখ সরিয়ে লিমার দিকে অবাক হয়ে তাকাল ঐশানী। তার মনে একগাদা প্রশ্ন গিজগিজ করছে। লিমা সত্যিই প্রেগন্যান্ট? বাচ্চাটার বাবা কে? অ্যাবরশন করানো কি এতটাই ক্যাজুয়াল একটা ব্যাপার? নাকি লিমা প্রসঙ্গটা ক্যাজুয়াল রাখার চেষ্টা করছে? অ্যাবরশন করাতে কোথায় যাবে? কে অ্যাবরশন করবে? দু’ঘণ্টার মধ্যে সব হয়ে যাবে? লিমার পিজিতে কিছু বুঝতে পারবে না?

লিমা খুব মন দিয়ে ঐশানীকে দেখছে। নিচু গলায় বলল, “এত চাপ নিচ্ছিস কেন? অ্যাবরশন আমার হবে, তোর নয়।”

“না… মানে…”

“বাচ্চাটা ফন্টুর। কৌতূহল মিটল?”

“ওফ! আমি জিজ্ঞাসা করিনি।”

“ওটাই একমাত্র কোয়্যারি। এবার বল। যাবি তো?”

“তুই যে বলেছিলি ফন্ট কিছু পারে না!”

“বাচ্চা করার মধ্যে আবার পারাপারির কী আছে? এ তো ভ্যাকসিনের বিজ্ঞাপন ‘দো বুঁদ জিন্দগি কী!”

বিরক্ত হতে গিয়ে হেসে ফেলে ঐশানী। লিমার হাত ছুঁয়ে বলে, “আচ্ছা যাব। কিন্তু তোরা প্রিকশন নিস না কেন?”

“মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন!” কপাল চাপড়ায় লিমা, “আসলে ফন্ট ওরালটাই প্রেফার করে। একদিন অন্য রুটে গেল আর সেদিনই ক্যাচ কট কট!”

“থাক থাক,” নিজের মেশিনে মাথা গোঁজে ঐশানী, “আমাকে কাজ করতে দে। এক্ষুনি টর্চার শুরু হবে।”

অফিসে ঢুকেই তরুণের সঙ্গে মিটিং সেরে নিতে হয়। সেই মিটিংয়ে গতকালের স্টোরির কাটাছেঁড়া আর আগামিকালের স্টোরি নিয়ে ব্রেন স্টর্মিং হয়। স্টোরির ফিডব্যাক ভাল থাকলে কোনও প্রশংসা নেই। যদি বানান ভুল, তথ্যগত ত্রুটি বা ভুলভাল মন্তব্য থাকে, খিস্তি করে ভূত ভাগিয়ে দেয়। মেয়ে বলেও রেয়াত করে না।

ইন্টারকম বাজছে। রিসিভারে হাত না দিয়ে দু’জনে উঠল। তরুণের কিউবিল থেকে মহাকরণ বিটের অতনু বেরচ্ছে। লিমাকে বলল, “নো চাপ। বসের আজ মেজাজ ভাল।”

গুড নিউজ়! ঐশানী আর লিমা টর্চার চেম্বারে ঢুকে চেয়ারে বসল।

বার্গারে কামড় দিয়ে হাফকাপ কফি গলায় ঢেলে গোরুর মতো জাবর কাটতে কাটতে তরুণ বলল, “গতকালের স্টোরি ঠিক আছে। কফি খাবি?”

ঐশানী আর লিমা একসঙ্গে ঘাড় নাড়ল। অত চিনি দেওয়া কফি খেলে একদিনে ওজন মগডালে উঠে যাবে। বাকি হাফ কাপ গলায় ঢেলে তরুণ বলল, “আজকের ইনসিডেন্ট?”

হেল্থ বিট করার সুবাদে ঐশানী আর লিমার কাজ হল কলকাতা এবং আশেপাশের সরকারি হাসপাতালের সুপার, বেসরকারি নার্সিংহোমের পরিচিত ডাক্তার, বিভিন্ন ইউনিয়নের নেতা, এদের ফোন করে খবরের সন্ধান করা। সরকারি হাসপাতালের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা, ডায়েটের খারাপ কোয়ালিটি, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সাপ্লাই, এই সব ইনসিডেন্ট যে-কোনও কাগজের হেল্থ বিটের প্রধান বিষয়।

ঐশানী বলল, “এবার ফোনাফোনি শুরু করব।”

“ইনসিডেন্ট ছাড়া তোর মাথায় নতুন কিছু আছে? “চুল আর ক্লিপ ছাড়া আর কিছু নেই।”

“হুম!” মাথা নিচু করে তরুণ বলল, “হাসতে হবে?”

“এটা জোক নয়।”

“এনিওয়ে,” আড়মোড়া ভেঙে লিমাকে নিয়ে পড়ল তরুণ, “তোর মাথাতেও কি চুল আর ক্লিপ ছাড়া কিছু নেই?”

“হত্যার অধিকার নিয়ে একটা স্টোরি করছি।”

“আমাদের কাগজের জন্য?” সরু চোখে লিমার দিকে তাকাল তরুণ। লিমা শ্রাগ করে বলল, “মফস্সলের সদ্য ইংরেজি শেখা ছেলেমেয়েদের জন্য কপি লেখার মানে এই নয় যে, নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময়েও আইকিউ ৩০-এ নামাতে হবে। হত্যার অধিকার মানে হল…”

“তোর আইকিউ ৩০-এ নামেনি লিমা। ৩০-এ উঠেছে। এনিওয়ে, বল।”

“হত্যা কাকে বলে? ভারতীয় দণ্ডবিধির দফা ৩০২ বা দফা ৩০৪, কালপেল হোমিসাইড অ্যামাউন্টিং টু মার্ডার বা কালপেল হোমিসাইড নট অ্যামাউন্টিং টু মার্ডার, এর মধ্যে হত্যাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। খুনের সংজ্ঞা কে ঠিক করবে? মানুষ? আর রাষ্ট্র যখন আসামিকে ফাঁসিতে চড়ায়, সেটা খুন নয়? রাষ্ট্রের বিচার কে করবে? হু উইল গার্ড দ্য গার্ডস?”

কথার মধ্যেই তরুণ গুনগুন করে মান্না দের গান গাইছে। ‘মানুষ খুন হলে পরে, মানুষই তার বিচার করে। নেই তো খুনির মাপ। তবে কেন পায় না বিচার নিহত গোলাপ?’ ১৫ সেকেন্ড সুর ভাঁজার পরে বলল, “ঐশানী, লিমার আইডিয়া কেমন লাগল?”

“সেনসিটিভ ইস্যু। এই নিয়ে কিছু লেখার আগে আমি একশোবার ভাবতাম।”

“আমি ঐশানীর সঙ্গে একমত নই,” কোলায় চুমুক দেয় তরুণ, “লিমা, ইউ উইল গেট টু ডেজ় টু কমপ্লিট দ্য স্টোরি।”

“ঠিক হ্যায়।”

কোলার ক্যান টেবিলে রেখে তরুণ বলল, “ঐশানী, ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত বাচ্চার বোনম্যারো ট্র্যান্সপ্লান্টেশন নিয়ে তুই যে স্টোরি করলি, সেটার ফিডব্যাক ভালই।”

“সে তো লাস্ট উইকে, “ অবাক হয়ে বলল ঐশানী, “আজ সেই প্রসঙ্গ কেন?”

ঢেকুর তুলে তরুণ বলল, “বোনম্যারো ট্র্যান্সপ্লান্টের খরচা তোলার জন্য বাচ্চাটার স্কুলের বন্ধুরা রবি ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ মঞ্চস্থ করছে। অসুস্থ বাচ্চাটার সঙ্গে ‘ডাকঘর’-এর অমলকে মিলিয়ে তোর সেই স্টোরি সব্বাই গপগপিয়ে খেয়েছে। ‘ডাকঘর’ করে পাঁচহাজার টাকা উঠেছিল। টাকার অভাবে বোনম্যারো ট্র্যান্সপ্লান্ট হয়নি। বাচ্চাটা মরে গিয়েছে। কিন্তু সেকথা পাঠকের না জানলেও চলবে। তুই পাঠককে ডিসটার্ব করিস না, পাঠককে ‘ভাল থাকা’-র ইলিউশন দিস।”

“তুমি আমার প্রশংসা করছ, না নিন্দে।”

“তোকে নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ নেই। আমি তোর লেখার কথা বলছি।”

“হোয়াটএভার…”

“বাউড়িয়ার কারখানা থেকে বিষাক্ত গ্যাস লিক হওয়ার ফলে কারখানার ১০জন লেবারার মারা গিয়েছিল। একজন বেঁচে ছিল। তুই সেই লোকটাকে নিয়ে স্টোরি করলি। তোর স্টোরিতে লোকটার স্ট্রাগলের কথা ছিল। সে কীভাবে কারখানার দোতলা থেকে ঝাঁপ মেরে প্রাণে বেঁচেছিল, তার রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা ছিল। ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা দিয়ে স্টোরি শেষ হয়েছিল। তুই সত্য, শিব ও সুন্দরের উপাসক।”

“হোয়াটস রং ইন দ্যাট?”

“যে-দশজন লেবারার অক্সিজেন না পেয়ে, বিষাক্ত গ্যাস ফুসফুসে নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে মরে গেল, তারা মরার সময়ে ঈশ্বরকে কী বলেছিল, সেটা কখনও ভেবে দেখেছিস? হ্যাভ ইউ এভার বিন নিয়ার ডেথ?”

“আহ! দ্যাট্স দ্য পয়েন্ট। এতক্ষণে বুঝলাম। এটা আমার ইন্টারনাল বিল্ডআপ তরুণদা। জীবনের প্রতি আমার একটা পজিটিভ অ্যাটিটিউড আছে। সেটা আমার লেখাতে এসে যায়। তুমি যদি বলো যে, হেলথ বিটে মৃত্যু চেতনা আনতে হবে, তাহলে সেটা করে দেব। আমি ভাষাশ্রমিক। যেমন কাজ দেবে, উত্তরে দেব।”

লিমা চুপচাপ কথোপকথন শুনছিল। বলল, “সকালবেলায় প্রচুর বাজে ভাট হচ্ছে। কাজের কথা হোক।”

তরুণ বলল, “কাজের কথা বলার আগে একটু ভাট ভাল। নাও, লেট মি কাম টু দ্য পয়েন্ট। অ্যাকট্রেস নন্দিনী সরকার আজ সকালে সেন্টিনেল মেডিকাল রিসার্চ ইন্সটিটিউটের আইসিইউতে ভর্তি হয়েছে কী হয়েছে, ক্লিয়ার নয়। সেন্টিনেলের ডাক্তাররা মুখে কুলুপ এঁটেছে। কেউ বলছে সুইসাইড অ্যাটেম্পট। টালিগঞ্জ বিটের অত্রি অলরেডি সেন্টিনেলে পৌঁছে গিয়েছে।”

ঐশানী অভিব্যক্তিশূন্য মুখে তরুণের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মাথায় নানান প্রসঙ্গ ঘুরপাক খাচ্ছে। আজ সকালেই মায়ের সঙ্গে নন্দিনী সরকারকে নিয়ে আলোচনা হল। ‘ওয়েটিং রুম’ সিনেমায় নন্দিনীর লং স্কার্ট, ট্যাটু আর হেয়ারকাট নিয়ে কত কথা। সেই নন্দিনী আইসিউতে?

আর এমন একটা নার্সিংহোমে, যেখানে সীমান্ত মেডিকাল অফিসার? যে-খবর সিসির টালিগঞ্জ বিট পাবে না, যে খবর লিমা পাবে না, সেই খবর এক ফোনে পেয়ে যাবে ঐশানী। এই স্টোরি তাকে করতেই হবে।

আগ বাড়িয়ে কিছু বলবে না ঐশানী। দেখা যাক তরুণ কী ভাবছে। লিমাকে অ্যাবরশন করাতে নিয়ে যাওয়ার ঝামেলাটা আজকেই ঘাড়ে চাপল? ধুর বাবা। টর্চার চেম্বার থেকে বেরিয়েই লিমাকে কাটাতে হবে। আগামীকাল অ্যাবরশন করালে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।

বিচ্ছিরি ঢেকুর তুলে তরুণ ঐশানীকে বলল, “অ্যাবরশনের গপপো ফেঁদে লিমা সেন্টিনেলে ভরতি হচ্ছে, ডক্টর কুইলার আন্ডারে। ঘণ্টাপাঁচেক অ্যাডমিট থেকে রাত্তিরেই চলে আসবে।”

লিমার পিঠে থাপ্পড় কষিয়ে ঐশানী বলল, “তুই খুব বদ!” তারপর তরুণকে বলল, “সেন্টিনেলের সিকিউরিটি খুব স্ট্রং। তুমি যদি ভেবে থাক যে, গাইনি ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে লিমা আইসিইউতে যাবে, ভুল ভেবেছ।”

“আমাকে শেষ করতে দে,” ট্রাফিক সার্জেন্টের কায়দায় হাত তুলল তরুণ, “নন্দিনী সরকারের স্টোরির জন্যে আমি তিনজনকে রাখছি। টালিগঞ্জ বিটের অত্রি আর হেল্থের তোরা দু’জন। দেখা যাক, কওন কিতনা পানি মে! রাত ন’টার মধ্যে কপি চাই। ঠিক আছে?”

এই ‘ঠিক আছে’র মানে ‘এবার আয়’। ইঙ্গিত বুঝতে পেরে লিমা চেয়ার ঠেলে উঠে টর্চার চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল। ঐশানী ভুরু কুঁচকে বসে রয়েছে। তরুণ বলল, “কী হল? ধ্যানফ্যান করছিস নাকি?”

“তুমি একটু আগে বলছিলে, কোনও স্টোরি আছে কিনা। এখনই মাথায় একটা আইডিয়া এল। মেডিক্যাল টার্মিনেশন অফ প্রেগন্যান্সি বা অ্যাবরশনের বিভিন্ন দিক নিয়ে স্টোরি হতে পারে। ল্যাম্পপোস্টে সাঁটা ঋতুবন্ধের বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে এমটিপি ক্লিনিক, সবই তো সাপ্লাই আর ডিমান্ডের তত্ত্ব মেনে। অ্যাবরশনের ইভলিউশন, ইতিহাস, রকমফের, ইকনমি, এথিক্যাল ও লিগাল দিক নিয়ে স্টোরি হতে পারে।”

“নট আ ব্যাড আইডিয়া!” কাগজে খসখস করে তরুণ লেখে, ‘এমটিপি— ঐশানী’। বলল, “নন্দিনীর কেসটা সামলে এই কাজটা শুরু কর। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বড় সাপ্লিমেন্ট যাবে। তার আগে জমা করিস। ঠিক আছে?”

ঐশানী বলল, “আচ্ছা, অ্যাবরশন কি মার্ডার?”

“মানে?” তরুণ অবাক!

“না…মানে…” ফাম্বল করছে ঐশানী, “লিমার বলা মার্ডার সংক্রান্ত কথাগুলো মনে পড়ছে। ‘ডেথ বাই হ্যাঙ্গিং’ মার্ডার নয়। আবার অ্যাবরশনও মার্ডার নয়। তা হলে খুন কাকে বলে?”

তরুণ ক্যাজুয়ালি বলল, “ভ্রূণহত্যা মার্ডার নয়, কেননা ভ্রূণ মানুষ নয়। তার কোনও ওপিনিয়ন নেই।”

“আমার ঠাকুরমা ১০০ বছর বয়সে, দু’বছর একটানা ভুগে, দগদগে বেডসোর নিয়ে মারা যায়। রোজ কাঁদতে-কাঁদতে আমার বাবাকে বলত, “ওরে! তুই আমাকে ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেল।’ সেই মতামত কি গুরুত্বপূর্ণ?”

“হোপফুলি তোর বাবা কাজটা করেননি।”

“করেনি বলেই ঠাকুরমা দগ্ধে-দগ্ধে মরেছে। ইসুটা তাই আমাকে খুব ভাবায়,” টর্চার চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসে ঐশানী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *