সোনার হরিণ নেই – ২৪

চব্বিশ

বেশ সকালেই ঘুম ভাঙল বাপীর। চোখ মেলে তাকানোর আগে পর্যন্ত হালকা মেঘের মতো ও একটা ভেলায় চেপে ভেসে বেড়াচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরটা অকারণ খুশিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছিল।

চোখ মেলে তাকানোর পরেই ভেতরটা আর ততো খুশি নয়। কলকাতার সব চেয়ে সেরা হোটেলের আরামের গদীতে শুয়ে আছে। এই কলকাতায় ও আছে মিষ্টি নেই। বাতাস ছাড়া আলো যেমন, আপাতত মিষ্টি ছাড়া কলকাতা তেমন। আজকের দিনটা যাবে। কালকের দিনটা যাবে। তার পরের দিন সেই বিকেলে মিষ্টি এখানে এই ঘরে আসবে। ভাবতে গেলে বিতিকিচ্ছিরি লম্বা সময়।

বিছানায় গা ছেড়ে চোখ পাকিয়ে বাপী কিছু মিষ্টি চিন্তায় ডুব দিল। বানারজুলির সাহেব বাংলোর দশ বছরের মিষ্টি, কলকাতার কলেজে-পড়া আঠের বছরের মিষ্টি, আর এয়ার অফিসের চাকুরে বাইশ বছরের মিষ্টি—এই তিন মিষ্টিই চোখের সামনে ঘোরা-ফেরা করে গেল। লোভাতুর তন্ময়তায় বাপী দেখছে। কারো থেকে চোখ ফেরানো সহজ নয়। যখন যাকে দেখছে, বাপী নিজের সেই বয়সের চোখ দিয়েই তাকে দেখছে।

উঠল। মুখ হাত ধুয়ে টেলিফোনে দুকাপের এক পট চা আনিয়ে নিল শুধু। এখানে গায়ত্রী রাই নেই যে শুধু চা খেতে চাইলে ঠাণ্ডা চোখে বকবে।

চা খেতে খেতে সকৌতুকে নিজের বরাতের ওপর চোখ বোলাচ্ছে বাপী। চার বছর আগে এই কলকাতা শহরে সে পায়ে হেঁটে চষে বেড়াতো। বেশি খিদে, পেলে ঠোঙায় মুড়ি কিনে খেতে খেতে পথ চলত। রাস্তার কল থেকে জল খেত। ঝকঝকে এই হোটেলের দরজার সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সুন্দরী মেয়েদের আনাগোনা দেখত। আজ এই হোটেলেই সে একজন সম্ভ্রান্ত আগন্তুক। বিলাসবহুল একটা সুইট তার দখলে। টেলিফোন তুলে হুকুম করলেই যথেচ্ছ ভোগের উপকরণ নাগালের মধ্যে। কিন্তু আশ্চর্য, এই ভোগবিলাসের সঙ্গে তবু ঠিক নাড়ির যোগ নেই বাপীর।

ঝপ করে যে মুখখানা সামনে এগিয়ে এলো, তার একমাথা চুল, গালবোঝাই কাঁচা-পাকা দাড়ি, চওড়া কপালে মেপে সিঁদুর ঘষা। টালি এলাকার বাসিন্দা ব্রুকলিন পিওন রতন বণিকের মুখ। জোর গলায় বাপীর দিন-ফেরার ভবিষ্যদ্বাণী শুধু সে-ই করেছিল। বউকেও বলেছিল, হবে যখন দেখে নিস, বিপুলবাবুর ভাগ্যিখানা কালবোশেখীর ঝড়ের মতোই সব দিক তোলপাড় করে নেমে আসবে একদিন। ওই খুপরি ঘরের আশ্রয় ছেড়ে আসার দিনও বলেছিল আপনার কপালের রং অনেকটা ভালো হয়ে গেছে, আমার কথা মিলিয়ে নেবেন, দিন ফিরতে ভুলবেন না যেন।

বাপীর মনটা সবার আগে ওই রতন বণিকের সঙ্গে দেখা করার জন্য আকুলিবিকুলি করে উঠল। কিন্তু যাবে কি করে। তামাম দুনিয়ায় এই একজনের কাছে নিজের বিবেক সব থেকে বেশি অপরাধী। কাল মিষ্টির দেখা পেয়েছে বলেই সেই বিবেকের চাবুক এই সকালেও অনুভব করল। কমলা বণিকের ঢলঢলে কালো মুখখানা জোর করেই স্মৃতির গভীর থেকে টেনে উপড়ে ফেলে দিতে চাইল। সম্ভব হলে রতন বণিকের সঙ্গে দেখা একবার করবে। মুখে কিছু না বলেও বুকের তলায় কৃতজ্ঞতা উজাড় করে দিয়ে আসতে পারবে। বলতে পারবে তোমাকে ভুলি নি কোনদিন, ভুলব না। কিন্তু ওর ঘরের ত্রিসীমানায় গিয়ে নয়। সময় পেলে ওর আপিসে গিয়ে দেখা করে আসবে।

খবরের কাগজ পড়ল। মিষ্টি এখানে নেই, কলকাতায় বসে কাগজে আর এমন কি খবর পড়ার আছে। ধীরেসুস্থে শেভ করল। তারপর অনেকক্ষণ ধরে স্নান সারল। পিছনের সব কালো ধুয়ে-মুছে ফেলার মতো স্নান একখানা। ভুটান জঙ্গলের উদ্দাম ফকির তাকে সামনে এগোতে বলেছিল, পিছনে তাকাতে বলে নি।

ঘড়ির কাঁটা বেলা দশটার ওধারে সরতেই রিসিভার তুলে বিজয় মেহেরার আপিসের নম্বর চাইল। দু মিনিটের মধ্যে ওদিক থেকে মেহেরার ব্যস্ত গলা—মেহেরা হিয়ার!

এদিক থেকে কপট গাম্ভীর্যে বাপী বলল, বানারজুলির বাপী তরফদার।

—ফ্রেন্ড! সঙ্গে সঙ্গে ওধারে গলা উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়ল।

ঊর্মিলার ফ্রেন্ড তাই তারও ফ্রেন্ড।—এই কলকাতা থেকে কথা বলছ? কবে এসেছ? কোথায় উঠেছ?

—ধীরে বন্ধু ধীরে। তোমার বুকের তলার দাপাদাপি ফোনে শোনা যাচ্ছে। কখন দেখা হবে?

ওধার থেকে দরাজ হাসির শব্দ। হোটেলের হদিস দিয়ে বাপী ওকে চলে আসতে বলল। কিন্তু সেই বিকেল ছটার আগে বিজয়ের দম ফেলার সময় নেই। একটা বড় টেন্ডারের ফয়সালা হবে আজই। ওদিক থেকে তার আরজি, কলকাতায় সে আনকোরা নতুন এখনো, বলতে গেলে এখন পর্যন্ত কিছুই চেনে না, তার থেকে ফ্রেন্ড যদি ঠিক ছ’টায় তার খিদিরপুরের ফার্মে চলে আসে তো খুব ভালো হয়—ছটার পর থেকে রাত পর্যন্ত সে তার খাতিরের গেস্ট।

বাপী রাজি হতে খুশির হাসি হেসে ফোন ছেড়ে দিল। এত ব্যস্ত বলেই হয়তো ফোনে তার প্রেমিকার সম্পর্কে একটি কথাও জিজ্ঞাসা করল না।

কিন্তু বিকেল ছ’টা দূরের পাল্লা। বাপী এতক্ষণ করে কি। তক্ষুনি বন্ধু নিশীথ সেনের কথা মনে হল। এখনো যুদ্ধের আপিসের চাকরি করছে, না হবু কবিরাজ পাকা কবিরাজ হয়ে বসেছে এতদিনে, জানে না। চার বছরের মধ্যে চিঠিপত্রেও যোগাযোগ নেই। নোট বই-এ ওর বাড়ির ফোন নম্বর লেখা আছে।

দুটো চোখের মতো কান দুটোও বাপীর জোরালো। ও-দিকের গলার আওয়াজ পেয়েই মনে হল নিশীথ ফোন ধরেছে। অর্থাৎ কবিরাজই হয়েছে, আপিস থাকলে এ-সময় তার বাড়ি থাকার কথা নয়।

গম্ভীর সুরে জিজ্ঞাসা করল, সিনিয়র কোবরেজ মশাই কথা বলছেন, না জুনিয়র?

—জুনিয়র। আপনার কাকে চাই?

—আপনাকেই। চট করে একবার না এলেই নয়।

—কোথায়?

হোটেলের নাম আর সুইট নম্বর বলল। ওদিকের বিমূঢ় মূর্তিখানা না দেখেও বাপী আঁচ করতে পারে। অমন একখানা হোটেলের কোনো রোগী ওর শরণাপন্ন ভাববে কি করে, বিশ্বাসই বা করবে কি করে।

—আমার নাম বাপী। চেনা-চেনা লাগছে?

—বা-আ-বাপী! কানের পর্দায় দ্বিতীয় দফা বিস্ময় আছড়ে পড়ল।—বাপী তুই? এতকালের মধ্যে একটা খবর নেই, কোন্ ভাগাড়ে ডুব দিয়ে বসেছিলি? ওই হোটেলের কারো সঙ্গে দেখা করতে এসেছিস?

একটি কথারও জবাব না দিয়ে বাপী বলল, আধ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি, চলে আয়। বিকেলের আগে ছাড়া পাচ্ছিস না বাড়ীতে বলে আসিস।

ঘড়ি ধরে আধ ঘণ্টার মধ্যেই দরজার বাইরে প্যাঁক করে আওয়াজ হল। বাপী তখন হাফ পার্টিশনের এ-ধারে আরামের শয্যায় শুয়ে। কাম ইন।

ঘরে ঢুকে নিশীথ পার্টিশনের ও-ধার থেকে সন্তর্পণে গলা বাড়ালো। এ কোন্ স্বপ্নপুরীতে এসে হাজির হয়েছে ভেবে পাচ্ছে না। ঘাড় ফিরিয়ে ওকে দেখে বাপী ডাকল, হাঁ করে দেখছিস কি? ভিতরে আয়।

বেঁটে-খাটো নিশীথের দু চোখ সত্যি ছানাবড়া। চোখে দেখেও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। ভিতরে দাঁড়িয়ে চারদিক দেখে নিল আর এক দফা। লোয়ার ডিভিশন চাকরি যোগাড় করে যাকে জলপাইগুড়ি থেকে টেনে এনেছিল চার বছরের মধ্যে তার এমন ভাগ্য বিশ্বাস করে কি করে?

—এ-ঘরে সত্যি তুই থাকিস নাকি?

—পাগল! বাপীর ভূত থাকে। বোস্

উঠে বসে গদীর বিছানাটা চাপড়ে দিল। এমন বিছানায় বসেও অস্বস্তি নিশীথের।—কি ব্যাপার রে? চেহারাখানা আগের থেকেও তো ঢের খোলতাই হয়েছে—গুপ্তধনের হদিস-টদিস পেয়েছিস নাকি?

বাপী হাসছে মিটি-মিটি। জবাব দিল, পুরুষের ভাগ্য।

—ভাগ্যের জোরে তো মশার দশা গিয়ে একেবারে হাতির দশা চলছে মনে হচ্ছে—খুলে বলবি কিছু, না কি?

ওপর-পড়া হয়ে সে-ই খুঁটিয়ে জিগ্যেস করে বন্ধুর ভাগ্যের জোয়ারের মোটামুটি হদিস পেল। বনজ ওষুধের কাঁচা বা শুখা মাল হোলসেল দোকান থেকে ওদেরও কিনতে হয়। ওই সব বড় বড় হোলসেলাররা আবার যাদের কাছ থেকে মাল কেনে তারা কত মুনাফা লোটে নিশীথের ধারণা নেই। বাপী এই নামজাদা হোটেলে এসে ওঠা থেকে কিছুটা বোঝা যাচ্ছে।

ফোঁস করে বড় নিঃশ্বাস ফেলল একটা।—বরাত বটে একখানা তোর, পেলি কি করে?

গায়ত্রী রাইয়ের প্রসঙ্গ ধামাচাপা। এখনো তার নাম উল্লেখ করল না। এমন ভাগ্য দেখে ওর আনন্দে আটখানা হওয়া সহজ নয়। একসময় বাপী ওরও করুণার পাত্র ছিল তো বটেই।

—তুই যা বললি তাই, সবই বরাত রে ভাই। তোর খবর বল্ শুনি, বিয়ে—থা করেছিস?

নিজের প্রসঙ্গেও নিশীথ বীতশ্রদ্ধ। সরকারী আপিসের সেই টেম্পোরারি চাকরি কবেই গেছে। বাবার দাপটে আদাজল খেয়ে কোবরেজিতেই লেগে যেতে হয়েছে। বছর আড়াই আগে কিছু টাকা খরচ করে বাবা কাশীর কোথা থেকে আয়ুর্বেদের একটা চটকদার ডিপ্লোমা এনে দিয়েছে ওকে। রোগী এলে বাবা ওকেই আগে সামনে ঠেলে দিতে চেষ্টা করে, আর ছেলের সম্পর্কে আয়ুর্বেদীয় জ্ঞানগম্যির গুণকীর্তন শোনায়। কিন্তু লোকে তাতে খুব একটা ভোলে না। বাবার সঙ্গে ছেলের এখন বিয়ে নিয়েই মন-কষাকষি চলছে। ছেলের জন্য বাবা এখন একটি জ্যান্ত পুঁটলি ঘরে আনতে চায়। মেয়ের গায়ের রং ময়লা আর ওর মতোই বেঁটে-খাটো। বাবার চোখে সব দিক থেকে রাজ-যোটক! মেয়ের বাপের বাজারে নিজস্ব বড় একটা মুদি দোকান। অঢেল কাঁচা পয়সা। তিনটি মাত্র মেয়ে। ছেলে নেই। মেয়ে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ে এখন ঘরে বসে বিশ্রাম করছে। এমন রূপগুণের পুঁটলিকে বিয়ে করতে আপত্তি দেখে বাবার উঠতে বসতে হুমকি। কথায় কথায় মাকে শোনায়, কুঁজোর আবার চিত হয়ে শুয়ে চাঁদ দেখার সাধ!

সখেদে আবার একটা গরম নিঃশ্বাস ছাড়ল নিশীথ।—আমার অবস্থাখানা বোঝ একবার—

সহানুভূতির দায়ে বাপী তাকে একনম্বরি লাঞ্চ খাইয়ে কিছুটা তুষ্ট করল। ডাইনিং হল-এ নগদ খরচায় এ-পর্ব সমাধা করেছে। বিল মেটাবার সময় বাপীর ঢাউস ব্যাগে একশ টাকার নোটের তাড়া দেখেও নিশীথের দু-চোখ গোল!

হাতে অঢেল সময় এখনো। বেরিয়ে এসে বাপী একটা ট্যাক্সি নিল। বনজ ওষুধের পাইকিরি বাজারটা একবার ঘুরে দেখবে। চার বছরে ব্যবসার স্বার্থ ওরও রক্তে এসে গেছে।

পাইকারদের আসল ঘাঁটি বড়বাজারে। দমদম আর উল্টোডাঙার দিকে তাদের গোডাউন। নিশীথ ওকে বড়বাজারে নিয়ে এলো। মাঝারি দুজন ডিলারের সঙ্গে ওর কিছু যোগাযোগ আছে। বড় মাঝারি ডিলারদের বহু ঘাঁটিতে হানা দেবার ফলে বাপীর আগ্রহ চারগুণ বেড়ে গেল। এমন সোনার বাজার এখানে কল্পনা করে নি। বাপীর বেশভূষা চেহারাপত্র আর ছাপা কার্ড দেখে আর কথাবার্তা শুনে মালিকরা খাতিরই দেখিয়েছে। ভারতের এত জায়গায় যাদের শাখা-প্রশাখা, তার বাঙালী পার্টনার আর জেনারেল ম্যানেজারকে হেলাফেলা করবেই বা কেন।

ঘুরে ঘুরে বাপী মোটামুটি তথ্য যোগাড় করল, আগের দিন হলে গায়ত্রী রাই তক্ষুনি তাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে কলকাতায় চালান করত হয়তো। দেশজোড়া নাম আছে, এখানকার এমন কটা বড় কবিরাজি কারখানাতেই কম করে তিরিশ লক্ষ টাকার বনজ উপকরণ লাগে। গ্রীষ্মকালে কবিরাজির মন্দা বাজার, শীতকালে জমজমাট। এছাড়া বড় ফার্মেসিউটিক্যাল ফার্মগুলোতেও পনের বিশ লক্ষ টাকার মাল সরবরাহ হয়ে থাকে। আর মাঝারি বা ছোট কবিরাজি বা ওষুধ তৈরির কারখানাগুলোর চাহিদা যোগ করলে তা-ও কম ব্যাপার নয়! এখানে বাসে বা ট্রেনে বেশির ভাগ মাল আসে মোকাম থেকে।

ব্যবসা সম্পর্কে বাপীর কথাবার্তা শুনে আর তৎপরতা দেখেও নিশীথ চুপ মেরে গেছে। উদ্দেশ্যও বুঝেছে। ওকে নিয়ে সেই ট্যাক্সিতেই বাপী দমদম চলে গেছে গোডাউনগুলো দেখতে। তারপর বাপীই বলেছে, ব্রোকারের মারফৎ শুধু মাল চালান দেওয়া নয়, সুযোগমতো যতো শিগগীর পারে গোডাউন ভাড়া করে এখানে রিজিয়ন্যাল সেন্টার খুলবে।

ব্যাপারখানা কত বড় নিশীথের এরপর আঁচ করতে অসুবিধে হয় নি। উত্তরবাংলা বিহার মধ্যপ্রদেশের অনেক জায়গায় ওদের রিজিয়ন্যাল সেন্টার আছে, আর সে-সব জায়গায় রিজিয়ন্যাল ম্যানেজার কাজ করছে কথায় কথায় তাও জেনে নিয়েছে।

ফিরতি পথে ট্যাক্সিতে বসে নিশীথ জিজ্ঞাসা করল, এইসব রিজিয়ন্যাল ম্যানেজারদের মাইনে কত রে?

মাইনে শুনে আর তার ওপর বরাদ্দ কমিশনের অঙ্ক শুনে নিশীথ নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল। তারপর আবার চুপ।

কলেজ স্ট্রীটে বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থামতে নিশীথ ওকেও জোর করে নামাতে চাইল। কিন্তু ঘড়িতে তখন পাঁচটা বাজে। ছটায় খিদিরপুরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। শুনে অনুনয়ের সুরে নিশীথ বলল, আচ্ছা এক মিনিটের জন্য একবার নেমে আয়।

কি হল না বুঝে বাপী নেমে এলো। নিশীথের দু চোখ এমন চকচক করছে কেন হঠাৎ বাপী বুঝছে না। পরক্ষণে বোঝা গেল।

—এখানে তোদের রিজিয়ন্যাল অফিস হলে আমার ম্যানেজারের চাকরিটা পাবার ব্যবস্থা করে দিতে পারবি?

ভিতরে ভিতরে বাপী বিরক্ত। এ ব্যাপারে সে নির্মম। তক্ষুনি বলল, আমার কি হাত বল, মালিক খুব কড়া লোক

—তুই চেষ্টা করলেই হবে ভাই। আঙুল তুলে তিনখানা বাড়ির পরের একটু পুরনো বাড়ি দেখালো।—ওই বাড়ির দোতলায় একটি মেয়ে থাকে, বাবা মা নেই, কাকাদের কাছে থাকে। এবারে বি-এ পাশ করেছে। মেয়েটা ফর্সা নয়, কিন্তু ভারী সুশ্রী, আর কি মিষ্টি গান গায়। রোজ সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে আমি শুনি। আজ পর্যন্ত কথা হয় নি বটে, তবু ওই মেয়েও আমাকে বেশ লক্ষ্য করেছে জানি। কিন্তু কোবরেজের ছেলে কোবরেজ হয়ে সেদিকে হাত বাড়াতে গেলে ওরা ঝেঁটিয়ে বিদেয় করবে। একটা ভালো চাকরি পেলে আশা ছিল…।

চোখে-মুখে প্রত্যাশা উপচে পড়ছে। বাপীর মনে আছে ও-ই একদিন বলেছিল, কবিরাজের ছেলে হবু কোবরেজের সঙ্গে কোনো আধুনিক মেয়ে প্রেমে পড়েছে এমনটা নাটক-নভেলেও দেখা যায় না। বাপী দেখছে ওকে। এই আবেদন যে কত মোক্ষম নিশীথও জানে না।

—ঠিক আছে, লেগে থাক। আমি চেষ্টা করব।

বলতে পারত, এখানে রিজিয়ন্যাল ইউনিট হলে চাকরি তোর হয়েই গেছে ধরে নিতে পারিস। কিন্তু অতটা বলে কি করে, একটু আগেই বলেছে ওর হাত নেই আর মালিক কড়া লোক।

.

বিজয় মেহেরা আগেও সুপুরুষ ছিল। এখন আরো খোলতাই হয়েছে। ফর্সা মুখে লালচে আভা, মাথার পাতলা চুল এখন বাদামী গোছের। আগের থেকেও কমনীয় জোরালো পুরুষে ছাঁদ।

সহজ আনন্দে বাপীকে জাপটে ধরল। বলল, মাত্র দশ মিনিট আগে ফ্রি হলাম। তারপরেই তুমি আসছ মনে পড়তে দশটা মিনিট যেন দশ ঘণ্টা!

বাপীর ভালো লাগছে। ছেলে কাজের সময় কাজ-পাগল আর প্রেমের সময় প্রেম-পাগল। টিপ্পনী কাটল, আমি আসছি বলে, না ডলির দূত আসছে বলে?

হা-হা শব্দে হাসল। তারপর পাল্টা জবাব দিল, তুমিও আমার কাছে কম নও। লন্ডনে থাকতে ডলির যত চিঠি পেয়েছি তার সবগুলোতে ফ্রেন্ড-এর একগাদা করে প্রশংসা। মাঝে মাঝে ভয় ধরেছে, আমার কপাল না ভাঙে।

অফিস আর ফ্যাক্টরি এলাকার মধ্যেই একদিকে রেসিডেনসিয়াল কোয়ার্টারস। তাছাড়া মস্ত ক্লাব আছে, অঢেল খানাপিনার ব্যবস্থাও আছে সেখানে। দু’ঘরের সুন্দর একটা ফ্ল্যাটে থাকে। আগে বাপীকে সেখানে নিয়ে এলো।

—ডলি কেমন আছে বলো।

—খুব ভালো। পাকা ফলটির মতো তৈরি।

এক্ষুনি ছুটে গিয়ে দেখতে পাচ্ছে না বলে গলা দিয়ে একটা হাল্কা-খেদের আওয়াজ বার করল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, তুমি কলকাতায় এসেছ কেন?

নির্জলা সত্যি কথাটা বলে কি করে। জবাব দিল, ডলির তাগিদে।

খুশি। হাসছে—একেবারে গ্রীন সিগন্যাল নিয়ে এসেছ তাহলে?

বাধ্য হয়ে এবারও সত্যের অপলাশ—অতটা নয়, রেড থেকে ইয়োলো হব—হব বলতে পারো।

সঙ্গে সঙ্গে অসহিষ্ণু রাগের ঝাপটা।—এতদিন পরে ইয়েলো হব-হব। অথচ ডলি প্রত্যেক চিঠিতে আমাকে লিখেছে ফ্রেন্ড যখন ফয়সলার ভার নিয়েছে তোমার কোনো ভাবনা নেই! আমি কি ভিখিরি নাকি যে কবে তিনি দয়া করবেন সেই আশায় বসে থাকব!

এবারে বাপীও গম্ভীর একটু। প্রায় অনুযোগের সুরে বলল, আচ্ছা বিজয়, তোমার হবু শাশুড়ী কেমন আছেন একবারও জিগ্যেস করলে না তো?

অপ্রস্তুত একটু।—ডলি লিখেছিল বটে শরীর ভালো যাচ্ছে না, কেমন আছেন?

—বেশ খারাপ।

—কি হয়েছে? এবারে উদ্বিগ্ন একটু।

—হার্টের কি-সব ভাল্ব-টাল্ব ড্যামেজ। ফরেনে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা ভাবছি।…এর মধ্যে তোমার গ্রীন সিগন্যালটাই যদি বড় করে দেখো সেটা কেমন হবে?

সমস্যাটা অস্বীকার করা গেল না।—গেলে ডলিও সঙ্গে যাবে?

একমাত্র মেয়ে কাছে থাকবে না সেটা হয় কিনা তুমিই ভাবো বিজয়ের বেজার মুখ। এই থেকেই বোঝা গেল ছেলেটার মায়া দয়া আছে। তবু বলল, বিয়েটা হয়ে যেতে বাধা কি, তারপর না-হয় যাক।

—সে চেষ্টাও করতে পারি। তাছাড়া বাইরে উনি যেতে চাইবেন কিনা তাও জানি না। মোট কথা, এমন একটা অবস্থার মধ্যে তাঁর মুখ না তাকিয়ে তুমি যদি তড়িঘড়ি কিছু করে ফেলার জন্য জুলুম করো তাহলে আমাদের সকলকেই মুশকিলে ফেলবে। তোমাকে ধৈর্য ধরে আর একটু অপেক্ষা করতে হবে।

বিজয় চুপ খানিকক্ষণ। তারপর হালছাড়া গোছের বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ঠিক আছে।…তবে আমি আশা করেছিলাম, ডলির মায়ের মন খানিকটা তৈরি হয়ে আছে।

—ওই চাকরি ছেড়ে তুমি ব্যবসায় চলে এসো, দশ মিনিটের মধ্যে আমি তাঁর মন তৈরি করে দিচ্ছি।

—তা কখনো হয়!

—তা যখন হয় না, এমন একটা অসুখের সময় একমাত্র মেয়েকে চোখের আড়াল করা কত শক্ত সেটাও তোমাকে বুঝতে হবে। তুমি শুধু ঠাণ্ডা মাথায় একটু অপেক্ষা করো, আমি দেখছি কত তাড়াতাড়ি কি করা যায়।

বিজয় ক্লাব ক্যানটিনে ডিনারে নিয়ে গেল তাকে। খাওয়ার ফাঁকে তার চাকরি—বাকরির খোঁজও নিতে ভুলল না বাপী। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করেছে এই দু’ঘণ্টা সময়ের মধ্যে, ওর কম করে গোটা পনের সিগারেট খাওয়া সারা।

খাওয়া শেষ করেই আবার সিগারেট ধরাতে বাপী বলল, তোমার সিগারেটের মাত্রা বেড়েছে মনে হচ্ছে—

—তা কি করব। সমস্ত দিন খাটাখাটুনির পর এই তো সঙ্গী।

—ড্রিংক-এর মাত্রা বাড়েনি তো?

নিঃসংকোচে হেসেই জবাব দিল, তাও বেড়েছে, আজ তোমার কম্প্যানি পেলাম বলে দরকার হল না—ভালো চাও তো তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করো।

বাপীও হেসেই সাবধান করল, এ দুয়ের কোনোটাই কিন্তু তোমার হবু শাশুড়ী ভালো চোখে দেখবেন না।

সিগারেটে আরামের টান দিয়ে বিজয় বলল, তাঁর সামনে প্লেন ওয়াটার ছেড়ে ডিসটিলড ওয়াটার খাবো।

আবার আসবে কথা দিয়ে বাপী হোটেলে ফেরার ট্যাক্সি ধরল।

ভোরের আলোয় চোখ মেলার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা ছেলের মতো বাপীর মনে হল, আর মাত্র এই দিন আর রাতটা কাটলে তারপর যা কিছু সব মিষ্টি। এই দিন আর রাতটাকে চোখের পলকে পিছনে ঠেলে দিতে পারলে দিত। কিন্তু মিষ্টির প্রতীক্ষাটুকুও খুব মিষ্টি গোছের কিছু।

নিশীথের দুপুরে আসার কথা। বাপী ওকে সকালেই আসতে বলেছিল, কিন্তু সকালে পাশে না থাকলে বাবা এই বয়সেও কটু কথা শোনায়। চায়ের পাট শেষ করে দাড়ি কামাতে কামাতে বাপী ভাবছিল ও এলে একবার ব্রুকলিনে গিয়ে আগে রতন বণিকের সঙ্গে দেখা করবে। তারপর আজ আর কোনো কাজটাজ নয়, দুপুরের শোয়ে নিশীথকে নিয়ে একটা সিনেমা দেখবে। কতকালের মধ্যেও সিনেমা-টিনেমার ধারেকাছে ঘেঁষেনি।

সকাল তখন সোয়া নটা। ঘরের টেলিফোন বাজল। বিজয় আর নিশীথ দুজনেই টেলিফোন নম্বর নিয়েছিল। ওদেরই একজন হবে ধরে নিয়ে সাড়া দিল।

ওদিক থেকে অপরিচিত গলায় প্রশ্ন এলো, বাপী তরফদার?

সায় দেবার পর যা শুনল, বাপীর হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে ওঠার দাখিল।—আমি সুদীপ নন্দী…মিষ্টির দাদা, তোমাদের বানারজুলির দীপুদা…চিনতে পারছ?

সহজ হবার দায়ে বাপী চুপ একটু। তাছাড়া হঠাৎ এমন একজনের টেলিফোন, অপ্রীতিকর কিছু শোনার আশঙ্কাই বেশি। জবাব দিল, আমি চিনতে পেরেছি, তোমার মনে আছে সেটাই আশ্চর্য।

ওদিক থেকে মোলায়েম হাসির শব্দ।—আমার মনে থাকবে না কেন, আমি তো তখন অ্যাডাল্ট।…তুমি এত বড় হয়েছ জেনে মা আর আমি খুব খুশি হয়েছি। সেদিন বাড়ির দোরগোড়ায় এসেও না দেখা করে চলে গেছ শুনে মা মিষ্টির ওপরেই খুব রাগ করেছে।

রোসো বাপী তরফদার, রোসো। বুকের তলায় লাফঝাঁপে বে-সামাল হয়ো না। হেসে বলল, রাত হয়ে গেছল, মিষ্টি তো দিল্লি থেকে আজ রাতেই ফিরছে?

—হ্যাঁ। আমি কাল দিনে দুবার আর সন্ধের পর একবার তোমাকে ফোন করেছিলাম…তুমি ঘরে ছিলে না।

—তাই নাকি? বাপীর গলায় অন্তরঙ্গ খেদ।—জানি না তো, অপারেটারকে বলে রাখলে আমিই ফোন করতাম…

—তাতে আর কি হয়েছে…তুমি আজ বিকেলেই এসো না একবার, এখানেই চা-টা খাবে? মা-ও বার বার বলছেন তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে…অবশ্য এসো—আসবে তো?

বুকের তলায় আবারও খুশির দামাল বাতাস। মিষ্টি দিল্লি রওনা হবার আগে এদের তাহলে যা বোঝাবার বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। নইলে এদের কাছ থেকে এমন আমন্ত্রণের আর কোনো অর্থ হয় না। আপত্তি করার কোনো প্রশ্ন নেই। জিজ্ঞাসা করল, বিকেলে কখন?

—আমি পাঁচটার মধ্যে কোর্ট থেকে ফিরব…ধরো সাড়ে পাঁচটা ছটা?

—তুমি কোর্টে প্র্যাকটিস করছ?

—হ্যাঁ, হাইকোর্টে। বিলেত থেকে ফিরে এসে ব্যারিস্টারি করছি, মিষ্টি বলেনি?

বাপী তাড়াতাড়ি সামাল দিল, হ্যাঁ তাই তো, চার বছর আগেই শুনেছিলাম তুমি ব্যারিস্টারি পড়তে গেছ। ঠিক আছে বিকেলে যাব, কিন্তু একটা শর্তে।

—কি?

রাতে আমার এখানে তোমার ডিনারের নেমন্তন্ন। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে ফিরব।

—ওয়ান্ডারফুল! বানারজুলির গাঁট্টা-মারা সুদীপ নন্দীর অস্তিত্ব নেই আর।— তোমার হোটেলের ডিনার মানে তো মস্ত ব্যাপার! গলা খাটো করে জিগ্যেস করলো, বিলিতি খাওয়াবে তো?

—নিশ্চয়, যা তোমার ইচ্ছে আর যত ইচ্ছে। ডান?

—ডান।

—ঠিক আছে, ছটার মধ্যে যাচ্ছি।

রিসিভার নামিয়ে বাপী হাওয়ায় ভাসল খানিকক্ষণ।…মিষ্টি বেশি রাতে ফিরবে, কোনো অছিলায় আজই তার সঙ্গে দেখাটা হয় না? কি করে হবে, বাপী যে আবার আনন্দে কাঁসি হারিয়ে বোকার মতো দীপুদাকে হোটেলে ডিনারের নেমন্তন্ন করে বসল! তাহলেও ভালোই করেছে। ওই মা-ছেলেকে বশে আনতে পারাটাও কম ব্যাপার নয়।

নিশীথকে টেলিফোন করে আসতে বারণ করে দিল। জরুরী কাজ পড়ে গেছে। পরে কবে কখন দেখা হবে, টেলিফোনে জানাবে। এই দিন আর ওর সঙ্গ ভালো লাগবে না, সিনেমা-টিনেমাও না।

ফের বাতাসে সাঁতার কাটার ফাঁকে আবার মনে হল কিছু। ও অনেক বড় হয়েছে, মিষ্টির মা আর দাদার এত খাতির অনেকটা এই কারণে। তা না হলে উল্টে ওর ওপর অসন্তুষ্ট হত তারা। এই দুজনের কাছে বড় হওয়াটা আরো জাঁকিয়ে তোলার তাগিদ। রিসিভার তুলে সোজা ম্যানেজারকে চাইল। বক্তব্য, আজ বিকেল থেকে ওর জন্য ভালো একটা সার্ভিস-কার অ্যারেঞ্জ করা সম্ভব কিনা। শুধু আজকের জন্য নয়, পর পর কয়েকদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই গাড়ি তার হেপাজতে থাকবে। তার জন্য যত খরচ লাগুক, আপত্তি নেই।

ঘণ্টা দুই বাদে ম্যানেজার জানালো, ভালো সার্ভিস-কারই পাওয়া গেছে। গাড়ি নিচে আছে, সে ইচ্ছে করলে দেখে যেতে পারে।

বাপী তক্ষুনি নেমে এলো। তখন বিলিতি গাড়িরই ছড়াছড়ি বেশি। ঝকঝকে গাড়ি। তকমা-পরা ড্রাইভার। তাকে ঠিক পাঁচটায় আসতে বলে বাপী হৃষ্টচিত্তে ওপরে উঠে এলো।

সাতাশি নম্বরের সেই বাড়ি। মাত্র চার বছর আগে এই বাড়িরই দোরগোড়ায় পাড়ার স্তাবকের দল কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে ওকে ছেঁকে ধরেছিল, ছিঁড়ে খেতে চেয়েছিল। আজ সেই বাড়িতেই বাপী তরফদার সমাদরের অতিথি। টাকা যার, মামলা তার। বাপী সেই মেজাজেই দূর থেকে দোতলার বারান্দার দিকে তাকালো। রেলিং-এর কাছে মনোরমা নন্দী দাঁড়িয়ে। পাশে দীপুদা।

এই গাড়ি দেখেও তাদের চোখ ঠিকরেছে বাপী আঁচ করতে পারে। গাড়ি থামতে ড্রাইভার আগে নেমে শশব্যস্তে দরজা খুলে দিল। বাপী নামল।

দীপুদা ছুটে নেমে এসে ওকে সাদরে জাপটে ধরে ভিতরে নিয়ে গেল। মনোরমা নন্দীও নেমে এসেছেন। এখন আর ব্যঙ্গ করে বাপীর তাঁকে মেমসায়েব বলতে ইচ্ছে করছে না। হাসিমুখে এগিয়ে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।—বাঃ, ভারী সুন্দর চেহারা হয়েছে তো তোমার, না জানলে আমি চিনতেই পারতুম না! বোসো বোসো।

অন্তরঙ্গ হেসে দীপুদা বলল, কেন, ছেলেবেলাতেই তো বেশ চেহারা ছিল ওর।

মিসেস নন্দীর মুখের হাসি খুব প্রাঞ্জল ঠেকল না বাপীর। হাসির ওধারে যাচাইয়ের চোখ। ছেলের কথার জবাবে বললেন, তা ছিল, কিন্তু কি দুষ্টু, কি দুষ্টুই না ছিল তখন!

হৃষ্টমুখে দীপুদা মন্তব্য করল, অমন দুষ্টু ছিল বলে আমি তখনই জানতাম ও কালে-দিনে বড় হবে।

বাপীর মজাই লাগছে। তার কানে এখনো মহিলার শাসনের স্পর্শ লেগে আছে। পিঠের চাবুকের দাগ আজও মেলায়নি। দীপুদার কথায় কথায় গাঁট্টা মারাও ভোলেনি। কিন্তু আজ টাকা যার, মামলা তার।

মনোরমা নন্দীর বাবা মারা গেছেন শুনল। এক মেয়ে, তাই বাড়িটা এখন তাঁর। দীপুদা বিয়ে করেছে। ছেলেও আছে। বউকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিল। বেশ সুশ্রী, কিন্তু রোগা। তাদের দেড় বছরের ফুটফুটে ছেলেটাকে বাপী আদর করে কোলে তুলে নিল। চারদিক তাকিয়ে বাপীর কেন যেন মনে হল বিলেত—ফেরত দীপুদার ব্যারিস্টারির পসার তেমন জমজমাট নয়।

আদর-আপ্যায়নের ত্রুটি নেই তা বলে। মনোরমা নন্দী জোর করেই অনেক কিছু খাওয়ালেন। শাঁসালো ডিনারের লোভে দীপুদা সামান্য খেল। মা-ছেলে তারপর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওর খবর নিতে লাগল। অর্থাৎ ঠিক কত বড় হয়েছে আঁচ করার চেষ্টা। মহিলা শেষে জিজ্ঞেসই করে ফেললে, এত বড় ফার্মের তুমিই সকলের ওপরে, না তোমার ওপরে আর কেউ আছে?

—মালিক আছেন। তবে আমাকেই সব করতে হয়।

—মাইনে তো তাহলে অনেক পাও নিশ্চয়?

সত্যি যা তার চেয়ে ঢের বেশি বাড়িয়ে বলার লোভ সামলালো বাপী।— অনেক আর কি…হাজার আড়াই।…তবে আসল রোজগার পার্টনারশিপের শেয়ার আর কমিশন থেকে, সেটা মাইনের থেকে অনেক বেশি।

বাহান্ন সালে যুদ্ধোত্তর স্বাধীন ভারতের আর্থিক কাঠামোর দিকে তাকালে রোজগারের এই জলুস যে কোনো মধ্যবিত্তের চোখ ঠিকরে দেবার মতো। যুদ্ধের আপিসগুলো গোটানোর ফলে যে সময় ঘরে ঘরে বেকার, সামগ্রিক ব্যবসার বাজারও মন্দা।

মা আর ছেলে দুজনের কারো মুখে কথা সরে না খানিকক্ষণ। নিজের বিত্তের ঢাক বাজানো এই প্রথম। বাপীর নিজেরই কান জুড়লো। চোখও। বানারজুলির গরিব কেরানীর ছেলে এতদিনে তার হেনস্থার জবাব দিতে পেরেছে।

বাইরেটা শুধু সহজ নয়, অন্তরঙ্গও।—আপনাদের খবর কি বলুন— মেসোমশাই এখন কোথায় পোস্টেড?

বানারজুলির সেই দাপটের বড়সাহেবকে আজ অনায়াসে মেসোমশাই বলতে পারল। মনোরমা নন্দী জবাব দিলেন, তাঁর তো সেন্টারের চাকরি এখন, উড়িষ্যায় আছেন। টান-ধরা তপতপে মুখ।—খবরের কথা আর কি বলব, কি যে মতি হল মেয়েটার, আমাদের সুখ-শান্তি সবই গেছে।

বাপী হতভম্ব হঠাৎ। এই কথা কেন! মিষ্টি এয়ার অফিসে কাজ করছে বলে? জিজ্ঞাসা করল, মিষ্টি কি করেছে?

এবারে মা আর ছেলে দুজনেই অবাক একটু। মনোরমা নন্দী ফিরে জিগ্যেস করলেন, কেন সেদিন মিষ্টি তোমাকে বলেনি কিছু?

বাপী আরো বিমূঢ়। মাথা নাড়ল। কিছু বলেনি।

সুদীপ নন্দীর ব্যারিস্টারি মাথাও যেন বিভ্রান্ত একটু।—হোটেল থেকে ফিরে মায়ের কাছে তোমার সম্পর্কে কত কথা বলল, মায়ের কাছে তোমার কার্ড নিয়ে বাড়িতে ডাকার কথাও বলে গেছে—আর নিজের সম্পর্কে ও তোমাকে কিছু জানায়নি!

অজ্ঞাত আশঙ্কায় বাপী দুজনকেই দেখে নিল একবার করে। আবারও মাথা নেড়ে জিগ্যেস করল, সুখ-শান্তি নষ্ট হবার মতো মিষ্টি কি করেছে?

কি জবাব দেবেন ভেবে না পেয়ে মনোরমা নন্দী ছেলের দিকে তাকালেন। দীপুদা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে বলল, মা আবার বেশি-বেশি ভাবছে, তেমন সাংঘাতিক কিছু নয়—চলো তোমার হোটেলেই তো যাচ্ছি, শুনবে’খন।

বাপীও উঠে দাঁড়াল। দীপুদার এ কথায়ও স্বস্তি বোধ করল না। মনোরমা নন্দীর মুখখানাই আর এক দফা দেখে নিল। ওই মুখে সুখ-শান্তির অভাবের অসহিষ্ণুতা স্পষ্ট এখন। নিজের ঘড়ির দিকে তাকালো, তারপর আবার মনোরমা নন্দীর দিকে।—মিষ্টির ফিরতে রাত হবে, তবু আমাকে একবার ফোন করতে বলবেন তো!

ফের বিপাকে পড়ার মুখ মহিলার। জবাব দিলেন না, এমন কি মাথাও নাড়লেন না।

বাপীর অপরিসীম ধৈর্য। গাড়িতে দীপুদাকে একটি কথাও জিগ্যেস করল না। হোটেলে ফিরেও আগে তার জমজমাট ডিনার ব্যবস্থা করল। আস্ত একটা খাস বিলিতি বোতল সোডা ইত্যাদি নিজের সুইটে আনিয়ে নিল। খানাপিনা শুরু করার পরেও দীপুদা খানিকক্ষণ নিজের কথাই চালিয়ে গেল। বিলেতে কতদিন ছিল, কেমন ছিল, এখানে ফিরে সব দেখেশুনে সে-তুলনায় কতটা বীতশ্রদ্ধ, সুযোগ—সুবিধে হলে সপরিবারে আবার সেইখানেই চলে যাবার বাসনা, এ-দেশে কেউ মানুষের দাম দেয় না, টাকা-পয়সার অভাব নেই যখন বাপী যেন ও-দেশটা ঘুরে দেখে আসে, ইত্যাদি। বাপীর হার্ড ড্রিংক চলে না শুনেও হতাশ একটু। নিজের গেলাস বার দুই খালি হবার পরেও নিষ্ফল অনুরোধ, দেখই না একটু টেস্ট করে, খারাপ লাগবে না।

তার গেলাস আরো এক দফা খালি হবার পর বাপী নিজের হাতে বোতলের জিনিস এবার একটু বেশিই ঢেলে দিল। সোডা মেশালো। তারপর ঠাণ্ডা মুখে জিজ্ঞেস করল, মাসিমা কি বলছিলেন, মিষ্টি কি করেছে?

এবারে সুদীপ নন্দী গলগল করে যা বলে গেল তাতে ব্যারিস্টারি বাকচাতুরি থেকে স্থূল গোছের উষ্মাই বেশি।

বি-এ পরীক্ষার আগেই মিষ্টি উল্টোদিকের বাড়ির এক ছেলেকে বিয়ে করেছে। গোপনে রেজিস্ট্রি বিয়ে। ছেলের নাম অসিত চ্যাটার্জি, মিষ্টির থেকে কম করে আট বছরের বড়। ছেলেটা রূপে কার্তিক, গুণে মাকাল ফল। দুবারের চেষ্টায় আর-এ পাশ করেছে। সাড়ে তিনশ’ না চারশ টাকা মাইনেয় সবে একটা ফার্মে ঢুকেছিল। এখনো পাঁচশ’ টাকার বেশি মাইনে পায় কিনা সন্দেহ। মিষ্টিটা এত বোকা গাধা কে জানত, ছয় মাস না যেতে হাড় কালি। ছেলের বাপ-মা আর বাড়ির সব এমন গোঁড়া যে জানাজানি হবার পর বউ ঘরে নেওয়া দূরে থাক, তারা ছেলেকেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে। মুখ দেখাদেখি বন্ধ

দীপুদা আগে কিছু জানত না। মিষ্টির বিয়ের এক মাস বাদে সে বিলেত থেকে ফিরেছে। এসে দেখে বাবা ছুটি নিয়ে কলকাতায় বসে আছে, আর মায়ের মুখ কালি। গুণধর জামাইয়ের এত দেমাক যে শ্বশুর-শাশুড়ী ভুরু কোঁচকালেও তার অপমান হয়। হুমকি দিয়ে কথা বলতেও ছাড়ে না। মিষ্টির বি-এ পরীক্ষা হতেই জোর করে তাকে নিয়ে গিয়ে আলাদা ঘরভাড়া করেছে। কিন্তু চলে কি করে? ওদিকে তো গুণের ঘাট নেই। মদের নেশা জুয়ার নেশা সবই আছে। এসব অবশ্য পরে জানা গেছে।

ছ’মাস না যেতে মিষ্টি মরতেই বসেছিল। ছেলেপুলে হবে, এদিকে টাকা—পয়সার জোর নেই, উঠতে বসতে অশান্তিরও শেষ নেই। অত সুন্দর মেয়েটার দিকে তাকালে তখন ভয় করে। বাছাধনের তখন টনক নড়ল, বউকে মায়ের কাছে পাঠাতে চাইল। কিন্তু মিষ্টির আবার তখন এমন গোঁ, কিছুতে আসবে না। আসবে কি করে, বাবা মা দাদা কাকে না অপমান করেছে অসিত চাটুজ্জে?

দীপুদাদের অজান্তে এরপর মিষ্টি শেষই হতে বসেছিল। পেটের ছেলে নষ্ট হয়ে গেছে। তার ফলেই প্রাণ-সঙ্কট। অসিত চ্যাটার্জি সস্তার একটা হাসপাতালে এনে ফেলেছিল ওকে। সেখানেও আজেবাজে ডাক্তার দিয়ে অপারেশন হয়েছে। পরে দীপুদা আর তার মা কলকাতার সব থেকে বড় ডাক্তার নিয়ে আসতে সে আবার অপারেশন করেছে। তাইতেই রক্ষা সেই বড় ডাক্তারও বলেছে, বাজে হাতে পড়ে মেয়েটার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তবে প্রাণে যে বেঁচেছে এই ঢের।

এরপর টানা ছ’মাস মিষ্টি মায়ের কাছে ছিল। মেয়েটার শরীরের বাঁধুনি ভালো বলতে হবে, তিন মাস না যেতেই আগের শ্রী-স্বাস্থ্য সবই ফিরে পেয়েছে। পরের তিন মাসের মধ্যে এয়ার অফিসের চাকরিটাও নিজের চেষ্টাতেই পেয়ে গেছে। মা ওকে আর ছাড়তেই চায় নি। কতবার করে বলেছে, ভুল যা হয়েছে—হয়েছে, কাগজের বিয়ে ছিঁড়ে ফেললেই ছেঁড়ে। দীপুদাও বোনকে অনেক বুঝিয়েছে। কিন্তু মাথায় যে কি ওটার, হাঁ না কিছুই বলে না, শুধু হাসে। তাইতেই মা আর সে ভেবেছিল হয়তো রাজি হবে। কিন্তু ছ’মাস পার হতে নিজে থেকে আবার ওই অসিত চ্যাটার্জির কাছেই চলে গেল।

এখন অবশ্য লোকটা অনেকখানি ঢিট হয়েছে। তবু অমন একটা বাজে লোকের সঙ্গে বোন সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে এ দীপুদা বা তার মা বিশ্বাসই করে না। কিন্তু ও-মেয়ের মাথায় কি আছে কে জানে, মা তাগিদ দিলে হাসে, আবার বেশি বললে বিরক্ত হয়। মনোহরপুকুর রোডে মোটামুটি একটা ভালো ফ্ল্যাটেই থাকে এখন। সেদিন বাপী ওকে মায়ের বাড়ি পৌঁছে দিতে ঘণ্টাখানেক সেখানে থেকে তারপর নিজের বাড়ি চলে গেছে। আজ মিষ্টি ফিরবে বটে, কিন্তু তাদের সঙ্গে দেখা হবে না বা কথা হবে না। কারণ ওর বাড়িতে টেলিফোনও নেই।

.

সমস্ত রাত চোখে-পাতায় এক হয়নি বাপীর। ঘুমোতে চেষ্টাও করেনি।

তার জগৎ অন্ধকার। এ অন্ধকার দূর করার মতো আলো নেই কোথাও। আগুন আছে। সেই আগুন বুকের তলায়। এ আগুন বাইরে নিয়ে এলে ওই অন্ধকারে যে ক্রুদ্ধ হিংস্র পশুটা থাবা চাটছে, সেটাও পুড়বে। বাপী তরফদার আর ওকে ধ্বংস করতে চায় না।

পরদিনই বানারজুলি চলে যাবার চিন্তা বাতিল। সকালে নিশীথ টেলিফোন করে আসতে চেয়েছে। বাপী বলেছে, আজ না, খুব ব্যস্ত। সঙ্গে সঙ্গে রিসিভার নামিয়ে রেখেছে। একটু বাদে আবার টেলিফোন। বিজয় মেহেরা। তাকেও বলেছে, আজ না।

সকাল পেরিয়ে দুপুরও গড়াতে চলল। বাপী নরম গদীতে শুয়ে। অপেক্ষা করছে। এই বিকেলে মিষ্টি আসবে কথা দিয়ে গেছে। বাপীর ধারণা আসবে। সমস্ত ঘটনা ওর কানে দেবার জন্যেই মাকে আর দাদাকে বলে গেছে ওকে বাড়িতে চা’য়ে ডাকতে। নিজে কেন বলেনি? ভয়ে? তাই যদি হয়, তাহলে বিকেলে আর আসবে না। কিন্তু অত ভীতু বাপী ওই মেয়েকে এখনো কেন ভাবছে না, জানে না।

…এলে কি হবে?

বাপী তাও জানে না।

এলো। একলা নয়। সঙ্গে অসিত চ্যাটার্জি। তার পরনের ট্রাউজার বা কোট তেমন দামী নয়। চোখে আগের মতোই সোনার চশমা। গায়ের রং আগের তুলনায় কিছুটা ঝলসেছে। বিব্রত হাসি-হাসি মুখ

মিষ্টির পরনে গাঢ় খয়েরি রংয়ের দামী শাড়ী। গায়ে চকচকে সাদা ব্লাউস। সিঁথিতে সরু সিঁদুরের আঁচড়। কপালে লাল টিপ। কালকের চেয়ে ঢের বেশি সুন্দর। হিংস্র উল্লাসে ভোগের রসাতলে টেনে নিয়ে যাবার মতোই লোভনীয়। নিজের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ের ক্ষমতা কি বাপীর জানা ছিল! দু-হাত বাড়িয়ে সরগরম অভ্যর্থনা জানালো।—এসো অসিতদা এসো—চার বছর আগে লেকে তোমার সেই গলাধাক্কা খাবার পর থেকে তুমি আমারও হীরো হয়ে বসে আছ জানো না—

এরকম অভ্যর্থনার জন্য লোকটা প্রস্তুত ছিল না বোঝা যায়। খুব স্বেচ্ছায় হয়তো আসেনি এখানে। মিষ্টির বাড়ির রাস্তায় আর লেকে যাকে অত হেনস্থা করা হয়েছে, সে এখন এই হোটেলের এমন ঘরের বাসিন্দা, সে-কারণেও হয়তো সহজ হওয়া মুশকিল। মিনমিন করে জবাব দিল, ও-সব ছেলেবেলার ব্যাপার তুমি এখনো মনে করে বসে আছ…

হাত ধরে বাপী সাদরে তাকে গদীর বিছানাতেই বসিয়ে দিল। আধা পার্টিশনের ওধার থেকে একটা সোফা মিষ্টির সামনে টেনে আনল। তারপর নিজের খাটের একদিকে বসে ওই সোনার চশমার ওপর চড়াও হল আবার। —কাল দীপুদার মুখে সব শোনার পর থেকে কেবল তোমার কথাই ভাবছিলাম। তুমি একটা পুরুষের মতো পুরুষ, আমাকে তোমার শিষ্য করে নিলে বর্তে যাই।

চকচকে চশমার ওধারের চোখ দুটো স্বস্তি বোধ করছে না খুব। আবারও শুকনো হাসি টেনে বলল, কি যে বলো, কত বড় একজন মানুষ তুমি এখন…

—গুলি মেরে দাও, ধন-জন-যৌবন জোয়ারের জল—এলো তো এলো, গেল তো গেল। কিন্তু তুমি যে কেরামতি দেখিয়েছ, সন অফ কুবেরও ভেড়ার মতো তোমার দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকবে।

মিষ্টি বাপীর দিকেই চেয়ে আছে। ঠোঁটের ফাঁকে হাসি ছুঁয়ে আছে। কিন্তু এর নাম হাসি নয়, হাসির মতো কিছু। ও মুখ দেখছে না, ভেতর দেখছে।

ও-রকম করে হাসলে আর অমন করে চেয়ে থাকলে বাপী কি করে বেশিক্ষণ এই হাসির মুখোশ ধরে রাখতে পারবে? ওর ভিতরটা কি-রকম লোলুপ হিংস্র ব্যভিচারী হয়ে উঠেছে মিষ্টি কি তা আঁচ করতে পারছে? পারলে অমন করে হাসত না। ও-ভাবে চেয়ে থাকতে পারত না।

টেবিলের ওপর বিলিতি মদের বোতলটা পড়ে আছে। দীপুদা ছ’আনা শেষ করে গেছে, বাকিটা আছে। অসিত চ্যাটার্জি ঘন ঘন ওই বোতলটার দিকে তাকাচ্ছে।

বাপী উঠে ছোট সেন্টার টেবিল তার সামনে পেতে দিল। তারপর বোতলটা এনে রেখে জিগ্যেস করল, জল চাই, না সোডা?

অসিত চ্যাটার্জির দু চোখ খুশিতে চিকচিক করছে এখন।—জলই ভালো, কিন্তু মিলু রেগে যাচ্ছে।

মিলু শুনেই কানের পর্দা দুটো ছেঁড়ার দাখিল বাপীর। মালবিকা ওর মিলু। জলের জাগ্ আর একটা গেলাস তার সামনে রেখে বাপী তাচ্ছিল্যের সুরে জবাব দিল, শিবঠাকুরকেও পার্বতী গাঁজাখোর বলে গাল পাড়ত,—এসব দেখে মেজাজ — না চড়ালে ওদের মান থাকে না। কাল দীপুদা মাত্র অতটুকু সাবাড় করে রেখে গেছে, আজ তোমার কেরামতি দেখাও।

দীপুদার নামটা সবুজ নিশানের কাজ করল। গেলাসে বোতলের জিনিস একটু বেশিই ঢেলে নিয়ে অসিত চ্যাটার্জি মিষ্টিকে বলল, এমন জিনিস পেলে কে আর লোভ সামলাতে পারে। বাপীকে জিগ্যেস করল, তোমার গেলাস কোথায়?

—আজ তুমিই চালাও। আমি এরপর দিনক্ষণ দেখে হাতেখড়ি দেব ভাবছি। রোসো, কিছু খাবার-দাবার আনাই—

আধঘণ্টার মধ্যে অসিত চ্যাটার্জি ভিন্ন মানুষ। বাপী যে এমন রত্ন ছেলে সে ভাবতেই পারেনি। মিলুও কখনো বলেনি। মাত্র একদিনের আলাপে বাপী আপনার জন হয়ে গেছে তার, অথচ পান থেকে চুন খসলে আপনার জনেরাই দূরে সরে যায়,—যাচ্ছেও, ইত্যাদি।

মিষ্টির তাড়া খেয়ে আরো ঘণ্টাখানেক বাদে উঠল। বোতলের নিচে দু’ইঞ্চির মতো জিনিস পড়ে আছে। মিষ্টি খাবার ছোঁয়নি, শুধু এক পেয়ালা চা খেয়েছে। কিন্তু সে খাবারও প্রায় সবটাই অসিত চ্যাটার্জির উদরে গেছে। এখন ভালো মতো দাঁড়াতেও পারছে না। মিষ্টির মুখ লালচে দেখাচ্ছে এখন। কিন্তু রাগ যার ওপর হবার কথা, অর্থাৎ বাপীর দিকে সাহস করে যেন তাকাতেও পারছে না।

অন্তরঙ্গ জনের মতো লোকটাকে ধরে বাপী লিফট-এ নিচে নামল। দরজার কাছে এসে মিষ্টি অস্ফুট স্বরে বলল, আমি একটা ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে আসছি।

—ট্যাক্সির দরকার নেই, গাড়ি আছে। আঙুল নেড়ে বাপী তার সার্ভিস-কারের তকমা-পরা ড্রাইভারকে ডাকল। গাড়ি নিয়ে লোকটা সমস্ত দিন বসেই আছে।

সাহেবকে আর মেমসাহেবকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে এসো।

থমথমে দু চোখ মিষ্টির মুখের ওপর স্থির কয়েক পলক। এতক্ষণ দুটো চোখ দিয়ে আর হিংস্র সত্তা দিয়ে যে আদিম পশু ওই তাজা নরম দেহটা ছিন্নভিন্ন করছিল, এখনো সে মুখোশের আড়ালে।

তাকালো মিষ্টিও। এখনো অভিযোগ নেই। শুধু কিছু যেন বোঝাতে চায়। ঠোঁটের ফাঁকে আবার সেই রকমই হাসির ছোঁয়া লাগল। যার নাম ঠিক হাসি নয়। হাসির মতো কিছু।

ঘুরে লম্বা লম্বা পা ফেলে বাপী তার ঘরে ফিরে চলল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *